কাজির বিচার

সাহিত্যের ব্যবসায়ে নামিবার একেবারে গোড়াতেই যাঁহার সাহচর্য লাভ করিয়া কাজী নজরুল ইসলাম ‘বিশেষ লাভবান’ হইয়াছিলেন তাঁহার ভালো নাম মুজফ্ফর আহমদ । উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে লেখা কথা দুটি সুশীলকুমার গুপ্ত মহাশয়ের। তাঁহার বাক্য আরও দুই প্রস্ত উদ্ধার করিলে অন্যায় হইবে না। গুপ্ত মহাশয় প্রকাশ করিতেছেন:

‘মুজফ্ফর আহমদ শুধু একজন জনগণ-বন্ধু ও প্রসিদ্ধ শ্রমিক নেতাই নন, তাঁর মত সাহিত্যপ্রাণ ও দরদী বন্ধু সত্যই দুর্লভ। এ কথা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, মুজফ্ফর আহমদের বৈপ্লবিক আদর্শে অনেকাংশে প্রেরণা গ্রহণ করে নজরুল অগি্নবীণা হাতে বাংলা কাব্যের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে আবির্ভূত হয়েছিলেন জাতীয় চারণের বেশে।’ [গুপ্ত ১৩৮৪ :২৯]

আর স্বয়ং মুজফ্ফর আহমদই লিখিয়াছেন, ‘নজরুল ইসলাম নিছক কবি ও সাহিত্যিক ছিল না।’ অর্থাৎ তাঁহার একটি ছকও ছিল। কি সেই ছকটি? এতদিনে সে ছকের কথা সবাই জানিয়া গিয়াছেন সন্দেহ নাই। কিন্তু তাঁহার জীবন প্রভাতে কেন, মধ্যাহ্নেও সে কথা সকলে জানিতেন কিনা সন্দেহ। মুজফ্ফর আহমদ জানাইতেছেন, ‘সে যে রাজনীতিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন সৈনিকও ছিল এ কথা তার কোনো কোনো সাহিত্যিক বন্ধু বুঝতে চাইতেন না। তাঁদের মধ্যে কবি শ্রীমোহিতলাল মজুমদারও ছিলেন।’ [আহমদ ১৩৬৬:২৪]

NazrulArmyনজরুল ইসলামের কবি প্রতিভা সম্বন্ধে মুজফ্ফর আহমদের একটা প্রস্তাব আছে। সেই প্রস্তাবানুসারে ‘কবিরূপী নজরুল’ ও ‘স্বাধীনতার সৈনিক নজরুল’—এই দুই নজরুলের সমন্বয় যেখানে হইয়াছিল সেখানেই তাঁহার কবি প্রতিভা আশ্চর্যরূপে বিকশিত হইয়াছিল। ১৯২০ সালের মধ্যভাগে [প্রথম সংখ্যার প্রকাশ ১২ জুলাই তারিখে] মুজফ্ফর আহমদ আর কাজী নজরুল ইসলামের যুগ্ম সম্পাদনায় সান্ধ্য দৈনিক ‘নবযুগ’ প্রকাশিত হইতে শুরু করে। পত্রিকার আয়ু দীর্ঘ হয় নাই—এ কথা সত্য, কিন্তু তাঁহার ছাপ দীর্ঘদিন থাকিয়া গিয়াছে। কারণের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁহার অনন্তগামী প্রতিভা। ‘বাঙলা দেশে নজরুলের মতো ভাগ্যবান কবি’ মুজফ্ফর আহমদের ধারণা ‘বোধ হয় আর কেউ জন্মাননি।’ তিনি লিখিয়াছেন :

মাসিক পত্রে মাত্র কয়েকটি কবিতা ছাপা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নজরুলের কবি খ্যাতি দেশময় ছড়িয়ে পড়ল। সে এক রকম রাতারাতি বাঙলার খ্যাতিমান কবিদের সঙ্গে আসন পেয়ে গেল। রবীন্দ্রনাথ তখন জীবিত, তাঁর প্রতিভা দিকে দিকে বিকীর্ণ। নজরুলের কণ্ঠে তখন গীত হচ্ছিল রবীন্দ্র সঙ্গীত! প্রসিদ্ধ রবীন্দ্র সঙ্গীত গায়ক শ্রীহরিদাস চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে সে তখন পরিচিত হয়েছে এবং তাঁর সঙ্গে একত্রে গানও গাইছে। সে মুখে আবৃত্তি করছে রবীন্দ্রনাথের কবিতা। এমন কি রবীন্দ্র কবিতার প্যারোডি ক’রে সে ‘নবযুগ’-এর হেডিং পর্যন্ত দিচ্ছে। যেমন—
আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার
পরান সখা ফৈসুল হে আমার।
ফৈসুল [ওরফে ফয়সাল] ইরাকের রাজা ছিলেন। এই নজরুল, বাইশ বছরের যুবক হঠাৎ কিনা রচনা করল এমন সব কবিতা যে সব সম্পূর্ণরূপে রবীন্দ্র প্রভাবমুক্ত, যে সব সম্পূর্ণরূপে তার একান্ত নিজস্ব। তাই তো সে রাতারাতি কবি প্রসিদ্ধি লাভ করত পারল।’ [আহমদ ১৩৬৬: ২৪-২৫]

প্রশ্ন হইতেছে: কি যাদু বলে নজরুল ইসলাম রবীন্দ্র প্রভাবের বাহিরে দাঁড়াইয়া থাকিতে পারিলেন? ইহার একপ্রস্ত জবাব—আমরা আগেই ইশারা করিয়াছি—মুজফ্ফর আহমদ লিখিয়াছেন। পড়ি তাঁহার বাক্যে: ‘এই সাহিত্যিক বন্ধুদের [ইঁহাদের মধ্যে কবি মোহিতলাল মজুমদারও ছিলেন] এটা লক্ষ করা উচিত ছিল যে কেন ‘নবযুগ’-এ কাজ করার সময়ে নজরুলের কবি প্রতিভা এমন আশ্চর্যরূপে বিকশিত হয়েছিল। এখানে দুই নজরুলের সমন্বয় ঘটেছিল—কবিরূপী নজরুলের ও স্বাধীনতার সৈনিক নজরুলের। তাই নজরুল এই সময়ে কবিতার এমন বিচিত্র সৃষ্টি করতে পেরেছিল, যে সৃষ্টি তার অভিনবত্বে সমস্ত দেশকে চমকে দিল।’ [আহমদ ১৩৬৬:২৪]

নজরুল ইসলামকে যাঁহারা গোড়াতেই ভুল বুঝিয়াছিলেন তাঁহাদের আদর্শ বা নমুনা [যাহাই বলুন] ছিলেন মোহিতলাল মজুমদার। মোহিতলাল মজুমদারের সহিত নজরুল ইসলামের তুলনা করিয়াছেন মুজফ্ফর আহমদ। মোহিতলালের যে ছবি মুজফ্ফর আহমদ আঁকিয়াছেন তাহা খুটাইয়া দেখিলে তাঁহাকে বিলক্ষণ চেনা যায়। ‘মুখচেনা বুদ্ধিজীবী’ পরিচয়ে। ‘মুখচেনা বুদ্ধিজীবী’ কথাটা আমি এস্তেমাল করিতেছি ইতালীয় বুদ্ধিজীবী মহাত্মা আন্তনিয়ো গ্রামসির লেখা হইতে। ‘মুখচেনা’ শব্দের ইংরেজি তর্জমা ‘ট্র্যাডিশনাল’। মোহিতলালকে তাই ‘মুখচেনা বুদ্ধিজীবী’ বলিতে বিশেষ অন্যায় নাই। বিশেষত মুজফ্ফর আহমদ লিখিয়াছেন:

মোহিতলাল ছিলেন অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক লোক। তাঁর পরিচয়ের পরিধি ছিল অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। অল্পসংখ্যক সাহিত্যিক ও সাহিত্যরসিক লোকের সঙ্গেই তিনি শুধু মেলামেশা করতেন। তার বাইরে তাঁর পরিচয় ছিল তাঁর স্কুলের ছাত্র ও শিক্ষকদের সঙ্গে। তিনি ছিলেন হাইস্কুলের হেড মাস্টার। এক সময়ে তিনি বন্দোবস্ত বিভাগের কানুনগো ছিলেন। সেই সময়ে সাধারণ মানুষদের সঙ্গে তাঁর কিছু সংযোগ ঘ’টে থাকবে, তার পরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার আর কোনো সংযোগ ছিল না। তাঁর মধ্যে পসন্দ-অপসন্দের মনোভাব এত প্রবল ছিল যে, সাহিত্যিকদের মধ্যেও বেশীর ভাগ লোকের সঙ্গে তিনি মিশতে পারতেন না। [আহমদ ১৩৬৬: ৪৬]

আর নজরুল ইসলাম ছিলেন, মুজফ্ফর আহমদের বিচারে, ‘মোহিতলালের সম্পূর্ণ উল্টা’। আমরা সেই হিসাবে নজরুল ইসলামকে জনসাধারণের পরমাত্মীয় বা ‘আত্মার আত্মীয়’ বুদ্ধিজীবী বলিতে পারি। ‘আত্মার আত্মীয়’ কথাটা এখানে আমি আন্তনিয়ো গ্রামসি প্রবর্তিত ‘অর্গানিক’ শব্দের কাজ চালাইবার যোগ্য তর্জমারূপে গ্রহণ করিতেছি। মুজফ্ফর আহমদের সাক্ষ্যও আমার এই প্রস্তাবের পথ পরিষ্কার করিয়াছে। তিনি লিখিয়াই গিয়াছেন, ‘সকল স্তরের লোকের সঙ্গে তার মতো ব্যাপক পরিচয় কম লোকেরই ছিল। যাঁরা নজরুলের কবিতা বোঝেননি তাঁরা তার কবিতার সুর, ধ্বনি ও ছন্দ ঝঙ্কারে মুগ্ধ হয়েছেন। তাই হয়ে তাঁরা আরও বেশি তার কবিতা শুনতে চেয়েছেন; অশিক্ষিত সাধারণকেও নজরুল তার গানের দ্বারা আকর্ষণ করেছে। সে শুধু গায়ক ছিল না হাজার হাজার গানের সে রচয়িতাও। এই কারণে নজরুল সর্বস্তরের মানুষের—বহু মানুষের কবি হতে পেরেছেন। আর মোহিতলাল শুধু বিদগ্ধ সমাজের অর্থাৎ গণিতসংখ্যক মানুষের কবি। [আহমদ ১৩৬৬: ৪৭]

মুখচেনা বা গণিত বুদ্ধিজীবীর সহিত গণদেবতা বা পরমাত্মীয় বুদ্ধিজীবীর যে ভেদ মোহিতলালের সহিত নজরুলের ভেদও ছিল সেই গোছেরই। মুজফ্ফর আহমদই তাহা পরিষ্কার করিয়া বলিয়াছেন। আমরা পড়িতেছি: ‘নজরুল জনগণের প্রতিনিধি ছিল। মোহিতলাল তা ছিলেন না এবং চেষ্টা করলেও তাঁর স্বভাবের দোষে তিনি তা হতে পারতেন না। অত্যন্ত খোলাখুলিভাবে নজরুল ছিল দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন সৈনিক। এখানেও তার সঙ্গে মোহিতলালের বিরাট পার্থক্য ছিল। রুশিয়ার সর্বহারা বিপ্লবকে নজরুল মনে-প্রাণে সমর্থন করেছে, নানাভাবে সে-বিপ্লবের বন্দনা সে করেছে। এই ব্যাপারেও তার সঙ্গে মোহিতলালের মিল ছিল না।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৪৭]

‘মোহিতলাল মজুমদার নজরুল ইসলাম সম্বন্ধে স্নেহান্ধ ছিলেন। খুব ঘনিষ্ঠভাবে মিশেও তিনি নজরুলের স্বভাব কেন যে বোঝেননি তা ভেবে আজও আমি আশ্চর্য হয়ে যাই’—এই আক্ষেপও করিয়াছেন মুজফ্ফর আহমদ। [আহমদ ১৩৬৬: ৪৭-৪৮]

মোহিতলালের ভুলটা কোথায় তাহাও দেখাইয়া দিয়াছেন মহান মুজফ্ফর আহমদ। লিখিয়াছেন, ‘তিনি প্রাণপণে নজরুলকে নিজের আকৃতিতে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে থাকলেন। এই ভাবে গঠিত হওয়ার মানে আত্ম-বিলুপ্তি। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কোনও ব্যক্তি কি তা সহ্য করতে পারে?’ [আহমদ ১৩৬৬: ৪৯]

শুদ্ধ কি তাহাই? ‘মোহিতলাল নজরুলকে শেলি, কীট্স, বায়রন আর ব্রাউনিং পড়তে বলতেন তার ‘বুদ্ধির দীপায়নের জন্যে’। দূরে থেকে যাঁরা শুনবেন তাঁরা বলবেন ভালোই তো বলতেন মোহিতলাল। কিন্তু নজরুলের জন্যে বিদেশি কবিদের কাব্য চর্চার প্রয়োজন ছিল কি? সে ছিল আমাদের দেশের মাটির সন্তান। দেশের মাটি হতেই রস গ্রহণ করত সে। মাটির কাছাকাছি যে কবির বাণী শোনার জন্যে রবীন্দ্রনাথ কান পেতে ছিলেন নজরুল ছিল সেই কবি।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৪৯]

মোহিতলাল মজুমদারের কথা এতখানি জুড়িয়া বলিবার আরও একটা কারণ আমার মাথায় আছে। এই কারণের নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মুজফ্ফর আহমদ আক্ষেপ করিয়াছেন খুব ঘনিষ্ঠভাবে মিশিয়াও মোহিতলাল নজরুল ইসলামকে অথবা বলা যাউক তাঁহার স্বভাবকে বুঝিতে পারিলেন না। তাহা হইলে কে তাহাকে বুঝিতে পারিয়াছিলেন? মুজফ্ফর আহমদ উত্তরে বলিয়াছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ’। মুজফ্ফর আহমদ প্রাতঃস্মরণীয় মহাপুরুষ। আমরা সবিনয়ে নিবেদন করিব তাঁহার এই উত্তরটি কিন্তু অসত্য, বড় জোর অর্ধসত্য। তাঁহার আপনকার কথাই তাঁহার ধারণাকে অসত্য প্রমাণ করিতেছে।

মুজফ্ফর আহমদ লিখিয়াছেন, ‘কিন্তু রবীন্দ্রনাথ দূরে থেকেও নজরুলকে বুঝেছিলেন।’ প্রমাণ? তিনি নিবেদন করিতেছেন, ‘কবি রূপে প্রথম পরিচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নজরুল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করেছিল এবং তার স্নেহও সে পেয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ তাকে শান্তিনিকেতনে থাকার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, নজরুল ছেলেদের কিছু কিছু ড্রিল শেখাবে। আর দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিকটে গান শিখবে।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৪৮]

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নজরুলকে গান শিখাইতে চাহিয়াছিলেন। ইহাতে স্নেহের প্রমাণ অকাট্য। কিন্তু তাঁহার সব্যসাচী প্রতিভার মধ্যে শুদ্ধ ড্রিল শিখাইবার দক্ষতাই জ্যেষ্ঠকবির দৃষ্টি কাড়িয়াছিল ভাবিতে গা ছমছম করে। আজও করে। শান্তিনিকেতনে নজরুলকে কি একটি বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান যাইত না? ১৯৩৫ সালে কাজী আবদুল ওদুদকে কি নিজাম বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রণ করা হয় নাই? কথা বাড়াইলে আরও বাড়াইতে পারি। কিন্তু বাড়াইবার সময় আসে নাই।

Nazrul_at_Sitakunda_1929মুজফ্ফর আহমদ কহিতেছেন, ‘এই সময়েই রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁচার কথাটা বলেছিলেন। তিনি সম্ভবত নজরুলের কাব্য-সাধনা ও রাজনীতিক সংগ্রামে সমন্বয়ের চেষ্টা দেখে এই কথাটি ব’লে থাকবেন।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৪৮]

তলোয়ার দিয়া দাড়ি চাঁছিবার গল্পটি এতদিনে পুরাতন হইয়া গিয়াছে। তথাপি তাঁহার তাৎপর্য এখনও তাজাবতাজা রহিয়াছে বলিয়া ভ্রম হয়। কথাটি নানান জনে নানান ভাবে বয়ান করিয়াছেন। একটা বয়ান পাওয়া যাইতেছে সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়ের লেখায়। তাঁহার লেখার কিছু অংশ সুশীলকুমার গুপ্ত উদ্ধার করিয়াছেন। নিবেদন করি:

‘জোড়াসাঁকোর বাড়িতেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাবার সময় তেমন-তেমন বড়লোককেও সমীহ করে যেতে দেখেছি, অতি বাকপটুকেও ঢোক গিলে কথা বলতে শুনেছি। কিন্তু নজরুলের প্রথম ঠাকুরবাড়িতে আবির্ভাব সে যেন ঝড়ের মত। অনেকে বলত, তোর এসব দাপাদাপি চলবে না জোড়াসাঁকোর বাড়িতে, সাহসই হবে না তোর এমনিভাবে কথা কইতে। নজরুল প্রমাণ করে দিলে যে সে তা পারে। তাই একদিন সকালবেলা “দে গরুর গা ধুইয়ে” এই রব তুলতে তুলতে সে কবির ঘরে গিয়ে উঠল। কিন্তু তাকে জানতেন বলে কবি বিন্দুমাত্রও অসন্তুষ্ট হলেন না। শুনেছি অনেক কথাবার্তার পর কবি নাকি বলেছিলেন, “নজরুল, তুমি নাকি তরোয়াল দিয়ে আজকাল দাড়ি কামাচ্ছ—ক্ষুরই ও-কার্যের জন্যে প্রশস্ত—এ কথা পূর্বাচার্যগণ বলে গেছেন”।’ [গুপ্ত ১৩৮৪: ৩০; চট্টোপাধ্যায় ১৩৫১: ৩৮]

এ বিষয়ে মুজফ্ফর আহমদের ভাষ্য এই রকম: ‘রবীন্দ্রনাথ একবার নজরুলকে তলওয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁচার কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন তিনি সত্যই। কিন্তু কথাটা নানান জনে নানানভাবে লিখেছেন। সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরও এক জায়গায় কথাটা লিখেছেন। আমি নজরুলের মুখে যা [শুনেছিলেম] তা হচ্ছে এই যে, সাক্ষাতের প্রথম দিনেই রবীন্দ্রনাথ কথাটা নজরুলকে বলেছিলেন। তখনও তিনি ভাবেননি যে, নজরুল গভীরভাবে রাজনীতিক সংগ্রামে বিশ্বাসী। নজরুল কবি, কাব্যচর্চাই তার পেশা হওয়া উচিত। তার মানে রাজনীতিতে তার যাওয়া উচিত নয়—এইসব ভেবেই তিনি তলওয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁচার কথাটা বলেছিলেন। অন্তত নজরুল তাই বুঝেছিল। রবীন্দ্রনাথ শুধু ওই কথা বলেই চুপ করে যাননি। তিনি তার সঙ্গে একটি প্রস্তাবও দিয়েছিলেন; বলেছিলেন, নজরুল শান্তিনিকেতনে চলুক। সেখানে সে ছেলেদের কিছু কিছু ড্রিল শেখাবে আর গান শিখবে দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে।’ [আহমদ ১৯৭৩ :২৪০]

‘কিন্তু’, মুজফ্ফর আহমদ দাবি করিতেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ পরে নজরুলের ঝোঁক ধরতে পেরেছিলেন। তাই নজরুল যখন ‘ধূমকেতু’ বার করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদ ভিক্ষা করেছিল তখন রবীন্দ্রনাথ তাকে রাজনীতিক আশীর্বাদই করেছিলেন। তার আশীর্বাণীর সেই ক’টি ছত্র অনেকেরই মুখস্থ। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন:

কাজী নজরুল ইসলাম
কল্যাণীয়েষু,

আয় চলে আয়, রে ধূমকেতু,
আঁধারে বাঁধ অগি্নসেতু,
দুর্দিনের এই দুর্গশিরে
উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন!
অলক্ষণের তিলক রেখা
রাতের ভালে হোক না লেখা।
জাগিয়ে দে রে চমক মেরে’
আছে যারা অর্দ্ধচেতন!

শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

২৪ শে শ্রাবণ, ১৩২৯ [আহমদ ১৩৬৬: ৪৮]

‘ধূমকেতু’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা বাহির হইল ১৯২২ সালের ১২ আগস্ট তারিখে। [আহমদ ১৯৭৩: ২৪১] মুজফ্ফর আহমদ আরেক জায়গায়ও লিখিয়াছেন, “কিন্তু ‘ধূমকেতু’র জন্যে নজরুল যখন রবীন্দ্রনাথের নিকট হতে বাণী চাইল তখন তিনি তাকে বুঝে ফেলেছিলেন। তিনি বুঝে নিয়েছিলেন যে, সে নিজে যে-পথ বেছে নিয়েছে তাকে সেই পথে যেতে দিলেই সে বিকশিত হবে। তাই রবীন্দ্রনাথ যে-বাণী নজরুলকে পাঠিয়েছিলেন সেটা ছিল নজরুলের প্রতি তাঁর রাজনীতিক আশীর্বাদ।’ [আহমদ ১৯৭৩: ২৪০]

নজরুল ইসলামের ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতাটি ১৯২৬ কি ১৯২৭ সালে প্রকাশিত ‘সর্বহারা’ নামধেয় কাব্যগ্রন্থে পাওয়া যায়। সেই কবিতার সাক্ষ্য কিন্তু মুজফ্ফর আহমদের কথাটিকে সত্য প্রমাণ করে না।

‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতার গোড়ার দিকেই রবীন্দ্রনাথের কথা স্মরণ করিয়াছেন নজরুল ইসলাম। নজরুলের রাজনীতি ও জাতীয়তার সাধনা দুই বস্তুকেই যে বিচারের মুখোমুখি দাঁড়াইতে হইয়াছিল তাহার পুরানা পাথুরিয়া প্রমাণ পাওয়া যায় এই কবিতায়। যথা:

কবি-বন্ধুরা হতাশ হইয়া মোর লেখা প’ড়ে শ্বাস ফেলে!
বলে, কেজো ক্রমে হ’চ্ছে অকেজো পলিটিক্সের পাশ ঠেলে।
পড়ে না’ক বই, ব’য়ে গেছে ওটা।
কেহ বলে, বৌ-এ গিলিয়াছে গোটা।
কেহ বলে, মাটি হ’ল হয়ে মোটা জেলে ব’সে শুধু তাস খেলে!
কেহ বলে, তুই জেলে ছিলি ভালো ফের যেন তুই যাস জেলে!
গুরু ক’ন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা!
প্রতি শনিবারী চিঠিতে প্রেয়সী গালি দেন, ‘তুমি হাঁড়ি চাঁচা!’
আমি বলি, ‘প্রিয়ে, হাটে ভাঙি হাঁড়ি!’
অমনি বন্ধ চিঠি তাড়াতাড়ি।
সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে। হিন্দুরা ক’ন, ‘আড়ি চাচা!’
যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা!”

[ইসলাম ২০০৫: ৭১; ইসলাম ২০০৭: ২৩; ইসলাম ১৯৯৬ (১): ২৯২-২৯৩]

দেখা যাইতেছে তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছিবার কাজটা নজরুল ইসলাম চালাইয়া গেলেন, অন্তত বন্ধ করিলেন না। অথচ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজ গুণে তাঁহাকে বুঝিতে পারিয়া ‘রাজনীতিক আশীর্বাদ’ পাঠাইলেন। এখানেই প্রশ্ন তুলিবার একটুখানি অবসর আছে। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার রাজনীতিটা কি ছিল? খোদ মুজফ্ফর আহমদ এ ব্যাপারে কি বলেন?

মুজফ্ফর আহমদ নিজে কি ‘ধূমকেতু’র রাজনীতি সমর্থন করিতেন? এই প্রশ্নের উত্তরে আমাদের অবশ্যই বলিতে হইবে, ‘না’। এই ‘না’ উত্তরটি আরও বড় হইয়া বাজিবে যখন জানিব নজরুল ইসলাম একদা মুজফ্ফর আহমদের সহিত যুগ্ম সম্পাদকতা করিয়া ‘নবযুগ’ বাহির করিয়াছিলেন। আবার ১৯২৫ ও ১৯২৬ সাল নাগাদ প্রথমে ‘লাঙ্গল’ এবং পরে ‘গণবাণী’ বাহির করিয়াছিলেন তাঁহারা। গণ্ডগোলের মধ্যে ‘ধূমকেতু’। মুজফ্ফর আহমদের লেখা পড়িয়াই আমরা জানিয়াছি, “‘ধূমকেতু’তে জনগণের কথা একেবারেই বলা হতো না, এটা মোটেই ঠিক কথা নয়। তবে ‘ধূমকেতু’র মারফতে নজরুল মূলত তার আবেদন জানাচ্ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণীর শিক্ষিত তরুণদের বরাবরে। নিরুপদ্রব অসহযোগ আন্দোলনের খাতিরে বাংলার সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীরা তাঁদের কার্যকলাপ বন্ধ রেখেছিলেন। নজরুলের আবেদন আসলে পৌঁছে যাচ্ছিল তাঁদেরই নিকটে।” [আহমদ ১৯৭৩: ২৪১]

‘ধূমকেতু’ পত্রিকা বিষয়ে মুজফ্ফর আহমদের আরও কথা আছে। এই পত্রিকা, তাঁহার বিচারে, জনগণের নিকটে পৌঁছাইতে পারে নাই। মুজফ্ফর আহমদ জানাইতেছেন: “শিক্ষিত ভদ্রলোক শ্রেণীর ভিতরে তার প্রচার সীমাবদ্ধ ছিল। এখানেই ‘ধূমকেতু’ খুব বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীরাও এই শ্রেণীর লোক। কাজেই, নজরুলের আবেদনে তাঁরাই নূতন করে চেতনা লাভ করেছিলেন।” [আহমদ ১৯৭৩: ২৪১]

এই প্রস্তাবের সাফাই সাক্ষ্য দিবার ছলে মুজফ্ফর আহমদ আরও গাহিয়াছেন, ‘এটা আমার অনুমানের কথা নয়। শুধু যে তরুণেরা নজরুলের নিকট আসছিলেন তা নয়, সন্ত্রাসবাদী “দাদা”রাও [নেতারা] এসে তাকে আলিঙ্গন করে যাচ্ছিলেন। ১৯২৩-২৪ সালে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন আবার যে মাথা তুলল, তাতে নজরুলের অবদান ছিল। এ কথা বললে বোধ হয় অন্যায় করা হবে না। সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের দুটি বড় বিভাগের মধ্যে “যুগান্তর” বিভাগের সভ্যরা তো বলেছিলেন, “ধূমকেতু” তাঁদেরই কাগজ।’ [আহমদ ১৯৭৩: ২৪১-২৪২]

‘অনুশীলন’ দলের শ্রীঅতীন রায়চৌধুরীও ‘ধূমকেতু’কে অভিনন্দন জানাইয়াছিলেন। [আহমদ ১৩৬৬: ৮২] এককথায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশীর্বাদ—’জাগিয়ে দেরে চমক মেরে/ আছে যারা অর্দ্ধচেতন’—ফলিয়াছিল। তাহাতে নজরুলের লেখা পড়িয়া বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী যুবকেরা সত্যই চমকিয়া উঠিয়াছিলেন। [আহমদ ১৩৬৬: ৮৬] মুজফ্ফর আহমদ অকপট লিখিয়াছেন, ‘সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের প্রতি নজরুলের বড় আকর্ষণ ছিল।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৮২]

এক্ষণে প্রশ্ন হইতে পারে, কাজী নজরুল ইসলামের রাজনীতিটা কী বস্তু ছিল? ইহার উত্তর খানিক জোগাইয়াছেন মুজফ্ফর আহমদ। তিনি লিখিয়াছেন, ‘১৯২২ সালের ভদ্রশ্রেণীর মধ্যে যাঁরা রাজনীতি করতেন তাঁদের ধারণা ছিল যে, দেশের মুক্তি শুধু তারাই আনতে পারবেন, আর মজুর ও কৃষকেরা গড্ডলিকা প্রবাহের মতো তাঁদের অনুসরণ করবেন। যাঁরা রাজনীতি করতেন না তাঁরা তো মজুর-কৃষকের নাম শুনলেই নাক সিঁটকাতেন। আজ অবস্থায় বিপুল পরিবর্তন এসেছে। ভদ্রলোকেরা এখন মজুরে পরিণত হচ্ছেন। নজরুল ইসলামের চেতনায়ও পরিবর্তন এসেছিল। ১৯২২ সালের পরে মজুর, কৃষক ও জনগণকে বাদ দিয়ে নজরুলকে কল্পনা করাই যেত না।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৮৫]

নজরুল ইসলামের ‘ধূমকেতু’র সঙ্গে মুজফ্ফর আহমদের কোনো সাংগঠনিক যোগ ছিল না। ‘তার মানে’, মুজফ্ফর আহমদ লিখিতেছেন, ‘তার পরিচালনায় ও নীতিনির্ধারণে আমার কোনও হাত ছিল না।’ তবে তিনি হামিশা ‘ধূমকেতু’ অফিসে যাইতেন। অনেক সময় রাত্রে সেখানে বাসও করিতেন। তাহার পরও তিনি কবুল করিয়াছেন, ‘নজরুল যে শুধুই মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকদের নিকট তার আবেদন জানাচ্ছিল তার একটা উল্টো প্রতিক্রিয়া আমার ভিতরে হয়েছিল।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৮৩] সম্পাদকের নামেও গ্রেফতারি পরোয়ানা বাহির হইলে তখন মুজফ্ফর আহমদ নজরুল ইসলামকে রক্ষা করিতে আগাইয়া আসিলেন। পরোয়ানা জারি হইবার কয়েকদিন আগে হইতেই কয়দিন ধরিয়া কেবলই গুজব রটিতে লাগিল যে নজরুল ইসলামের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা বাহির হইবে। বন্ধুদের অনেকে বলিলেন নজরুল কিছুদিন সরিয়া থাকিলে ভালো হয়। মুজফ্ফর আহমদ লিখিয়াছেন, ‘আমি বললাম, “তুমি যদি সরেই থাকতে চাও তবে চেষ্টা করে দেখা যাক তোমায় মস্কো পাঠানো যায় কি না।” কমিউনিস্ট ইন্টরন্যাশনালে ভারতীয় ব্যাপারের যাঁরা চার্জে ছিলেন নজরুলের লেখার সংগ্রামশীলতা তাঁদের আকর্ষণ করেছিল। তাঁরাই জানিয়েছিলেন নজরুলকে একবার পাঠাতে পারলে মন্দ হয় না।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৮৬] নজরুল গা করিলেন না। গা ঢাকাও দিলেন না। কলিকাতা ছাড়িলেন, কিন্তু গেলেন কোথায়? মস্কো না, মাত্র কুমিল্লা।

শুধু এই কারণে নহে, আর আর পাঁচ কারণেও মুজফ্ফর আহমদ একটু চটিয়া ছিলেন। তাঁহার জবানীতেই শুনি সেই কাহিনী। তিনি লিখিতেছেন, ‘১৯২২ সালের নবেম্বর মাসে নজরুল আর আমি ঠিক করি যে, আমরা কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার কাজে এগিয়ে যাব। পড়াশুনা করব বলে সামান্য কিছু পুঁথিপুস্তকও কিনেছিলাম। এই ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে নজরুল তার ‘বিদ্রোহী’ লিখেছিল। কিন্তু ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নজরুল কুমিল্লায় চলে গিয়ে অনেক দিন সেখানে থাকল। সেই সময়ে চিঠিপত্রের ভিতর দিয়ে তার সঙ্গে আমার কিঞ্চিত চটাচটিও হয়ে গেল।’ [আহমদ ১৯৭৩: ২৪৮]

পরক্ষণেই মুজফ্ফর আহমদ লিখিতেছেন, ‘অবশ্য, এমন কোনো চটাচটি নয় যার জন্যে আমাদের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যাবে। কুমিল্লা গিয়ে নজরুল যে ‘প্রলয়োল্লাস’ লিখেছিল সেটা আমার দৃষ্টিতে ঠিকই ছিল। কিন্তু কলকাতায় ফিরে এসে ‘ধূমকেতু’তে লিখতে গিয়ে নিজের প্রচণ্ড আবেগের স্রোতে সে নিজেই ভেসে গেল। সে যে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার চেষ্টা করবে স্থির করেছিল তার সেই বিবেককে সে লাল পোশাক পরে, লাল কালিতে লিখে, এবং মাঝে মাঝে লাল নিশানের কথা বলে ঠিক রাখছিল।’ [আহমদ ১৯৭৩: ২৪৮]

এক্ষণে মুজফ্ফর আহমদ সিদ্ধান্ত টানিতেছেন। তাঁহার ধারণা, “কিন্তু নজরুল যদি গিরেফ্তার না হতো এবং তার ‘ধূমকেতু’ যদি চলতে থাকত তবে তার লেখা তাকে বদলাতে হতো। এই জাতীয় লেখা ক্রমাগত লেখা যায় না। ভিতরের আবেগ নিঃশেষ হয়ে আসে। তখন নজরুলকে জনগণের দিকেই ঝুঁকতে হতো।’ [আহমদ ১৯৭৩: ১৪৮]

মুজফ্ফর আহমদের এই অনুমান বা প্রার্থনা পুরাপুরি কল্পনার ফসল নহে আর মোহিতলাল মজুমদারের উপদেশও বৃথা যায় নাই। ‘পড়ে না’ক বই, বয়ে গেছে ওটা’—কথাটাও গোটা গোটা বেদবাক্য হয় নাই। শ্রমিকের ওপর লেখা ইংরেজ কবি শেলির কবিতা বা গানের ভাবানুবাদও নজরুল ইসলাম করিয়াছিলেন। ১৯২৭ সালের ৫ মে তারিখের ‘গণবাণী’ হইতে তাহার উদ্ধৃতি প্রকাশ করিয়াছেন মুজফ্ফর আহমদ। আমরাও তাহা এখানে আবার তুলিয়া দিতেছি।

ওরে ও শ্রমিক, সব মহিমার উত্তর-অধিকারী!
অলিখিত যত গল্প কাহিনী তোরা যে নায়ক তারি।।
শক্তিময়ী সে এক জননীর
স্নেহ সূত সব তোরা যে রে বীর।
পরস্পরের আশা যে রে তোরা,
মা’র সন্তাপহারী।।
নিদ্রোত্থিত কেশরীর মত
উঠ্ ঘুম ছাড়ি নব জাগ্রত!
আয় রে অজেয় আয় অগণিত দলে দলে মরুচারী।।
ঘুম ঘোরে ওরে যত শৃঙ্খল
দেহ মন বেঁধে করেছে বিকল,
ঝেড়ে ফেল সব, সমীরে যেমন ঝরায় শিশির বারি।
উহারা ক’জন? তোরা অগণন, সকল শক্তিধারী।।

[আহমদ ১৩৬৬: ৪৯]

নজরুল ইসলাম শ্রমিক শ্রেণীর আন্তর্জাতিক সঙ্গীতের যে বাংলা তর্জমা করিয়াছিলেন—জাগো অনশন-বন্দী, ওঠরে যত/ জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত!—তাহার তুলনা আজও নাই। আমাদের যুগের আরেক অমর গল্প-মহাত্মা ফ্রান্স ফানোঁ রচিত ‘লে দাম্নে দু লা তের’ [Les Damnés de la Terre] অনুবাদের শিরোনামায়ও নজরুলের অমর বাক্য ‘জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত’ নিয়োগ করা হইয়াছে। [ফানোঁ ১৯৮৮]

গত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের গোড়ার দিকে চীন দেশের নেতা জিয়াং জিয়েসি [Jiang Jieshi, ১৮৭৭-১৯৭৫] [তৎকালে ইঁহার নাম চিয়াং কাইশেক বলিয়া প্রচারিত হইত] ভারত সফরে আসিয়াছিলেন। তখন তাঁহার বন্দনার্থে একপ্রস্ত গান রচনার অনুরোধ গ্রামোফোন কোম্পানির তরফ হইতে করা হইল নজরুল ইসলামকে।

১৯৫৯ সালের স্মৃতিকথায় মুজফ্ফর আহমদ সে কথা স্মরণ করিয়া লিখিতেছেন, ‘আজ যে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে নজরুল হতবাক ও হৃত-সন্বিব্দৎ হয়েছে সে ব্যাধির আক্রমণ তখন তার শরীরে শুরু হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও নজরুল গান রচনা করেছিল।’ মুজফ্ফর আহমদের মন্তব্য: ‘এবং এই গানটি চিয়াং কাইশেকের বন্দনা নয়। যিনিই গানটি পড়বেন তিনি বুঝতে পারবেন যে তা আসলে চীন ও ভারতের নিপীড়িত মানুষের বন্দনা।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৭৪]

পুরো গানটি তুলিয়া দেওয়ার মতো। নজরুল রচনাবলীতেও এই গানটি সসম্মানে সংকলিত হইয়াছে। মুজফ্ফর আহমদ বলিয়াছেন, ‘এটি নজরুলের লেখা শেষতম গান কি-না তা বলা শক্ত, তবে তার শেষ লেখাগুলির মধ্যে এই গানটি যে অন্যতম তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৭৪]

চীন ও ভারতে মিলেছি আবার মোরা শত কোটি লোক।
চীন ভারতের জয় হোক! ঐক্যের জয় হোক! সাম্যের জয় হোক!
ধরার অর্ধ নর-নারী মোরা রহি এই দুই দেশে,
কেন আমাদের এত দুর্ভোগ নিত্য দৈন্য ক্লেশে,
সহিব না আর এই অবিচার, খুলিয়াছে আজি চোখ।।
চীন ভারতের জয় হোক! ঐক্যের জয় হোক! সাম্যের জয় হোক!

প্রাচীন চীনের প্রাচীর ও মহাভারতের হিমালয়
[আজ] এই কথা যেন কয়,
মোরা সভ্যতা শিখায়েছি পৃথিবীরে
ইহা কি সত্য নয়?
হইব সর্বজয়ী আমরাই সর্বহারার দল,
সুন্দর হবে, শান্তি লভিবে, নিপীড়িতা ধরাতল!
আমরা আনিব অভেদ ধর্ম নব বেদগাথা শ্লোক।।
চীন ভারতের জয় হোক! ঐক্যের জয় হোক! সাম্যের জয় হোক!

[আহমদ ১৩৬৬: ৭৪-৭৫; ইসলাম ১৯৯৬ [৩]: ৫৪৭-৫৪৮]

এই গানটির রচনাকাল, নজরুল রচনাবলী অনুসারে, ফেব্রুয়ারি ১৯৪২। শ্রীজগন্ময় মিত্র গ্রামোফোন কোম্পানির রেকর্ডে এই গানটি গাহিয়াছিলেন। [ইসলাম ১৯৯৬ (৩): ৫৪৮]

দোহাই

১. কাজী নজরুল ইসলাম, সঞ্চিতা, পুনর্মুদ্রণ [ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৫]।
২. কাজী নজরুল ইসলাম, সর্বহারা, পুনর্মুদ্রণ [ঢাকা: আগামী প্রকাশনী, ২০০৭]।
৩. কাজী নজরুল ইসলাম, নজরুল রচনাবলী, ১ম খণ্ড, আবদুল কাদির সম্পাদিত, সংশোধিত সংস্করণ, পুনর্মুদ্রণ [ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৬]।
৪. কাজী নজরুল ইসলাম, নজরুল রচনাবলী, ৩য় খণ্ড, আবদুল কাদির সম্পাদিত, সংশোধিত সংস্করণ, পুনর্মুদ্রণ [ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৬]।
৫. ফ্রাঞ্জ ফেনো, জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত, আমিনুল ইসলাম ভুঁইয়া অনূদিত [ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৮৮]।
৬. মুজফ্ফর আহমদ, কাজী নজরুল প্রসঙ্গে (স্মৃতিকথা), প্রথম সংস্করণ [কলিকাতা: বিংশ শতাব্দী প্রকাশনী, ১৩৬৬/১৯৫৯]।
৭. মুজফ্ফর আহমদ, কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা, পুনর্মুদ্রণ [ঢাকা : মুক্তধারা, ১৯৭৩]।
৮. সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়, ‘আমাদের নজরুল,’ কবিতা [কার্তিক-পৌষ, ১৩৫১]।
৯. সুশীলকুমার গুপ্ত, নজরুল-চরিতমানস, পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ [কলিকাতা: দে’জ পাবলিশিং, ১৩৮৪]।


প্রথম প্রকাশ: দৈনিক সমকাল

[দ্রষ্টব্য: মুজফ্ফর আহমদ নামের বানানে হ-এর নিচে হসন্ত হইবে। হসন্ত যোগে লিখিতে গেলে ছাপার সময় পরের অক্ষরের সহিত মিলিয়া যুক্তাক্ষরের রূপ গ্রহণ করিতেছে। এই অসুবিধা দূর করিতে এইখানে হসন্ত পরিহার করা হইয়াছে।–সম্পাদক]

Copyright 2012 Salimullah Khan

আহমদ ছফার নজরুল

আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, নজরুলের কাছে বাঙালি মুসলমান সমাজের ঋণ শোধ করিবার মতন নহে। তিনি এই সমাজের ‘ভাষাহীন’ পরিচয় ঘুচাইলেন। তাহাদের ঘরের ভাষাকে সাহিত্যসমাজে প্রতিষ্ঠা দিলেন। সেই প্রতিষ্ঠা বাঙালি হিন্দুসমাজ স্বীকার করিয়া লইতে বাধ্য হইলেন। আর নজরুলের কাছে বাঙালি হিন্দুদেরও ঋণ আছে। তিনি বাংলাভাষা ও বাংলা সাহিত্যকে সাম্প্রদায়িকতার হাত হইতে উদ্ধার করিলেন। দেখাইলেন বাংলা হিন্দু ও মুসলমান দুই সমাজেরই ভাষা। বাংলাভাষার নতুন বিকাশ এই জায়গা হইতে নতুন করিয়া শুরু হইতে পারে। এই নতুন ধারার পথের কড়ি (বাঙালি জাতির নতুন সংজ্ঞা) নজরুল ইসলামের রচনা হইতে সংগ্রহ করিতে হইবে। এই কীর্তিরই অপর নাম নজরুল ইসলাম।


কাজী নজরুল ইসলামএই ঢাকা শহরে কিছু লোক আছেন যাহারা আমাকে—এই নিবন্ধের অধম লেখককে—সাম্প্রদায়িক এমনকি কখনও ‘মৌলবাদী’ বলিয়াও আনন্দ লাভ করেন। তাঁহাদের এই উপহারকে আমি কখনও বা বিধাতার আশীর্বাদ বলিয়া গ্রহণ করি। কারণটা খুলিয়া বলা দরকার।

যখন দেখি এই মনীষীরা আহমদ ছফার মতন মহাত্মা ব্যক্তিকেও একই ধরনের উপাধিরত্নে বিভূষিত করিতে কুণ্ঠিত হইতেছেন না তখন আমরা সামান্য মজুর লেখক মানুষ কেন মন খারাপ করিতে যাইব। আর কে না জানে এমনও দিন ছিল যখন বাংলাদেশের মুসলমান সমাজের কোন কোন অংশ মহাসমারোহে নজরুল ইসলামকে ‘কাফের’ ফতোয়া দিতে যেমন কসুর করেন নাই, তেমনি কিছু ‘নোংরা হিন্দু ও ব্রাহ্ম লেখক’ও ঈর্ষাপরায়ণ হইয়া তাঁহাকে ইতর ভাষায় গালিগালাজ করিতেন। খোদ নজরুলের কথায়—কয়েকজন গোঁড়া ‘হিন্দুসভা’ওয়ালা তাঁহার নামে মিথ্যা কুৎসাও রটনা করিতেন।

ইঁহাদের কথা মনে রাখিয়াই তো নজরুল ইসলাম বলিয়াছিলেন, ইহাদিগকে আঙ্গুল দিয়া গণনা করা যায়। ইঁহাদের আক্রোশ সম্পূর্ণ সম্প্রদায় বা ব্যক্তিগত। এতদিনে সকলেই জানেন ইঁহাদের মধ্যে অনেকেই বিখ্যাত লেখক—মোহিতলাল মজুমদার, সজনীকান্ত দাস বা নীরদচন্দ্র চৌধুরী প্রভৃতি। ইবরাহিম খাঁকে লেখা এক পত্রযোগে নজরুল ইসলাম পরিষ্কার করিলেন, মাত্র এই কয়েকজনের অবিচারের জন্য সমস্ত হিন্দু সমাজকে তিনি দোষ দিতেছেন না এবং দিবেনও না। তাহা ছাড়া নজরুল লিখিলেন, —আজকালকার সাম্প্রদায়িক মাতলামির দিনে’, —আমি যে মুসলমান’—ইহাই হইয়া পড়িয়াছে অনেক হিন্দুর কাছে অপরাধের সামিল, —আমি যত বেশি অসাম্প্রদায়িক হই না কেন।’

নজরুল ইসলাম এই কথা লিখিয়াছিলেন সত্য সত্যই বড় দুঃখে। প্রমাণ ইবরাহিম খাঁ সাহেবের লেখা ১৯২৫ সালের চিঠির উত্তর তিনি দিয়াছিলেন প্রায় তিন বছর পর, তাহার ভাষায় ‘১৯২৭ সালের আয়ু’ যখন ফুরাইয়া আসিয়াছে তখন। ততদিনে মানে ১৯২৭ সালের ডিসেম্বর কি ১৯২৮ সালের জানুয়ারিতে।

কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী এই মূঢ়তার অধ্যায় বেশিদিন স্থায়ী হয় নাই। হিন্দু সমাজের অগ্রণী মনীষীরা নজরুল ইসলামের শক্তি স্বীকার করিয়া লইয়াছিলেন। আর মুসলমান সমাজের মধ্যেও যাঁহাদের চোখ ফুটিয়াছিল তাঁহারাও নজরুল ইসলামের মধ্যে আপনাদের ঘরের মানুষ খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন।

এই উদাহরণটি আমি সবসময়ই মনে রাখি। যাহারা নজরুল ইসলামের মতন আত্মভোলা মানুষকেও সাম্প্রদায়িক বলিতে দ্বিধা করেন নাই, তাঁহাদের ভাবশিষ্যরা আহমদ ছফাকেই বা ছাড়িবেন কেন? এই চিঠিরই আরেক স্থলে নজরুল লিখিয়াছিলেন, মুসলমান সমাজ যে আমাকে ‘কাফের’ খেতাব দিয়াছে তাহা আমি মাথা পাতিয়া গ্রহণ করিয়াছি। ইহাকে আমি কোনদিন অবিচার বলিয়া অভিযোগের বিষয় করি নাই। কারণ আমার আগে ওমর খৈয়াম, শামসুদ্দিন হাফেজ কিংবা মনসুর আল হাল্লাজকেও লোকে ‘কাফের’ বলিয়াছিল। কাফের হইতে হইলে এই রকম বড় হইতে হয়। নজরুল তাই লজ্জা পাইয়াছিলেন। ‘কাফের’ আখ্যায় বিভূষিত হইবার মতন বড় তো তিনি হয়েন নাই!

আহমদ ছফা সম্বন্ধে বর্তমান বাংলা সাহিত্যের অভিভাবকরা যে শীতল ভাব দেখাইতেছেন তাহাতে আমার বারবার সেই ১৯২০ সালের যে দশক, তাহার কথাই মনে পড়িতেছে। আমার ধারণা মহাত্মা আহমদ ছফাও বিষয়টা জানিতেন।

আহমদ ছফা

আহমদ ছফা

যৌবনের প্রারম্ভে, ১৯৬৯ কি ১৯৭০ সালে, বিশ্ববিদ্যালয় কি বাংলা একাডেমীর বৃত্তি পাওয়ার আশায় আহমদ ছফা প্রথমে ইংরেজিতে একটি প্রবন্ধ (নাম ‘লিটারারি আইডিয়েল্স্ অব বেঙ্গল’) লেখেন। লেখাটি ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী সম্পাদিত বাংলা একাডেমীর ইংরেজি পত্রিকায় প্রথম ছাপা হয়। বাংলাদেশ কায়েম হইবার পর আহমদ ছফা সেই প্রবন্ধটির স্বাধীন তর্জমা করেন ‘বাংলার সাহিত্যাদর্শ’ নামে। ঐ প্রবন্ধে তিনি বাংলার সাহিত্যাদর্শ বলিতে চারিজন বড় লেখকের নাম উল্লেখ করেন। প্রথমে মাইকেল মধুসূদন দত্ত, দুই নম্বরে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, তৃতীয় স্থানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সবশেষে কাজী নজরুল ইসলামের নাম নিলেন তিনি।

‘বাংলার সাহিত্যাদর্শ’ প্রবন্ধের উপসংহারে আহমদ ছফা সিদ্ধান্ত করিয়াছিলেন, আমাদের সাহিত্যের এই পর্যন্ত যত আদর্শ দাঁড়াইয়াছে তাহাদের সর্বশেষ আদর্শ নির্মাতা কাজী নজরুল ইসলাম এবং শ্রেষ্ঠ কবিদের মধ্যে তিনিই সর্বশেষ। আহমদ ছফা লিখিলেন, কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মের ‘পূর্ণ মূল্যায়ন’ তখনও হয় নাই।

সেই অপূর্ণ মূল্যায়নের পাতা পূর্ণ তিনিও সেই দিন করেন নাই। তবে কিছু দিকচিহ্ন তিনি রাখিয়া গিয়াছিলেন সেখানেও। আহমদ ছফার লেখায় পড়ি, নজরুল ইসলামের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সাহিত্যে অনেক কয়টি পরিবর্তন ঘটিয়া যায়। এক নম্বরে তাহার আবির্ভাব মাত্রই বাংলা কবিতার যাহাকে বলে ‘ভরকেন্দ্র’ তাহার পালা বদলাইয়া গেল। কবিতা ‘গজদন্ত মিনার’ ছাড়িয়া রাজপথে নামিয়া আসিল। স্বরূপ প্রকাশ করিল সমাজশক্তির শরিক হিসাবে। সমাজের নির্যাতিত সাধারণ কবিতায় স্বীকৃতি পাইলেন। কাজী নজরুলের কবিতা তাহাদের ভাগ্যলিপি আকারে লেখা হইল।

বিশেষ মুসলমান সাধারণের অভিজ্ঞতা বাংলা সাহিত্যে যথাযথ যোগ্যতায় রূপ পাইল। আহমদ ছফার চোখেও স্পষ্ট হইল ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কিত পুরাণ ও রূপকথা, মুসলমান বাড়িতে ব্যবহার্য আরবি, ফারসি, উর্দু শব্দসম্ভার এন্তার ব্যবহৃত হইল তাঁহার লেখায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের দুই প্রধান সমাজ হিন্দু ও মুসলমানের অভিজ্ঞতা ও বাসনার আশ্চর্য সমন্বয় তিনি করিতে সমর্থ হইলেন। বাংলা গদ্যেও তিনি নতুন পাতা খুলিলেন। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, বাংলা গদ্যে যাঁহারা ‘আঞ্চলিক’ ভাষা ব্যবহার করিয়াছেন নজরুল তাঁহাদের পথিকৃৎমণ্ডলীর সদস্য।

এককথায়, মুসলমান কবি, হিন্দু-মুসলমান কবি ও মার্কসপন্থী—কবি যুগপৎ এই তিন খেতাব তাহার প্রাপ্য। আহমদ ছফার বিচারে এই তিন পরিচয়ই তিনি একসঙ্গে কাঁধে লইবার যোগ্য হইয়া উঠিলেন। আহমদ ছফার কথাটি অপূর্ব—এমন দাবি আমি করিতেছি না। শুধু বলিতেছি আহমদ ছফা এই বক্তব্য মানিয়া লইয়াছিলেন। আহমদ ছফার আগে অনেকেই বিশেষ করে আবুল কালাম শামসুদ্দিন ও মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী এই প্রস্তাবের কাছাকাছি কথা বলিয়া রাখিয়াছিলেন।

খুব অল্প কথায় আহমদ ছফা বলিতে পারিয়াছেন যে, জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসুর মতন পাশ্চাত্য ব্যবসায়ী কবিকেও একদিন রবীন্দ্রনাথের সর্বগ্রাসী প্রভাব হইতে বাহির হইয়া আসিবার তাগিদে ধরিয়াছিল। তখন নজরুল ইসলামই তাহাদের আশ্রয়স্থল ছিলেন।

অন্যদিকে সুকান্ত ভট্টাচার্য কিংবা সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রভৃতি কবি যাহারা ‘মার্কসবাদী’ বলিয়া খ্যাত হইয়াছেন তাহারাও নজরুল ইসলাম ছাড়া কল্পনীয় নহেন। আহমদ ছফার মতে এই বিপ্লবের কবিকুলও নজরুল ইসলামের ভাব ছাড়াইয়া যাইতে পারেন নাই।

নজরুল ইসলাম মুসলমান কবি কিন্তু মাত্র মুসলমানের বা শুদ্ধ এসলামী পুনর্জাগরণের কবি ছিলেন না। এখানেই তাঁহার সহিত ফররুখ আহমদ আর তালিম হোসেনের মতো কবিকুলের ব্যবধান। তাঁহারা যেখানে বন্দী, নজরুল ইসলাম সে জগতের মুক্তবিহঙ্গ।

জীবনের উপান্তে আসিয়া—প্রায় কুড়ি বছর পর আহমদ ছফা নজরুল ইসলাম সম্বন্ধে আর একটি বড় প্রবন্ধ লিখিয়াছিলেন। নাম ‘নজরুলের কাছে আমাদের ঋণ’। এই প্রবন্ধটিতে তিনি আরও কিছু কথা যোগ করিলেন। এইবার তিনি নজরুলের ভাষা হইতে যাত্রা করিলেন। বিশ বছর আগেও ছফা খেয়াল করিয়াছিলেন নজরুলের ভাষায়—গদ্য ও পদ্য উভয় আকারেই নতুন হাওয়ার দোলা। নতুন প্রবন্ধেও তিনি নজরুল ইসলামের কবিতার উৎকর্ষ বা অপকর্ষ নিরূপণের চেষ্টা করিলেন না। শুদ্ধ ভাষার প্রশ্নেই কথা বলিলেন।

আহমদ ছফার প্রস্তাবানুসারে, কলিকাতার উইলিয়াম দুর্গ হইতে যে বাংলা ভাষাটি গিরিগাত্রের সংকীর্ণ স্রোতস্বিনীর মতো বাড়িতে বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় পরিণতি মানিয়াছিল, ছফার রূপক মোতাবেক ‘ভরাযৌবনা প্রমত্তা পদ্মার আকার’ ধারণ করিয়াছিল, নজরুল ইসলাম সেই ভাষারই সাধক—এ সত্যে সন্দেহ নাই। কিন্তু নজরুল ইসলাম ভাষাকে যেমনটি পাইয়াছিলেন তেমনটি ছাড়িয়া দেন নাই। তিনি বাংলা ভাষার গতিপথে নতুন ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করিয়া দিলেন।

সকলেই জানেন, নজরুল ইসলাম বাংলাভাষায় বিস্তর আরবি-ফারসি শব্দ এস্তেমাল করিয়াছিলেন। সেই অপরাধে কেহ কেহ তাহাকে অপরাধীও করিয়াছিলেন। তাহার স্মৃতি ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায় আছে :

‘আমপারা’-পড়া হামবড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মে’রে!
হিন্দুরা ভাবে, পার্শী শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে!

আরবি, ফারসি শব্দের ব্যবহার বাংলা কবিতায় নজরুল ইসলামই প্রথম করেন নাই। তিনি জানিতেন, তাঁহার বহু আগে ভারতচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও সত্যেন্দ্রনাথ প্রভৃতি একই কাজ দেদার করিয়া গিয়াছেন।

তাহা হইলে, নজরুল ইসলামের নতুন নিশানটা কোথায় সে জওয়াব ‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ’ প্রবন্ধে পাওয়া যায়। কবি লিখিতেছেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ সুদ্ধ অনেক সাহিত্য সাধক ভুলিয়া গিয়াছেন যে, ‘বাংলার কাব্যলক্ষ্মীর ভক্ত অর্ধেক মুসলমান।’ তাহারা এই সকল সাহিত্যিকের নিকট শুদ্ধ টুপি আর আচকানই দাবি করিতেছেন না। চাহিতেছেন মাঝেমধ্যে বেহালার সঙ্গে সারেঙ্গীর সুরও শুনিতে। শুনিতে চাহিতেছেন ফুলবনের কোকিলের গানের বিরতিতে বাগিচায় বুলবুলির সুর।

আহমদ ছফা এই বেদনার মর্ম সঠিক ধরিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, মোহিতলাল মজুমদার কিংবা সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার ছিল নিছক নিরীক্ষার ধারা। অথচ ‘কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যে ক্রিয়াশীল একটা ঐতিহাসিক কর্তব্যবোধ।’ আহমদ ছফার বয়ান অনুসারে, নজরুল ইসলাম আপনকার কাব্যভাষা তৈয়ার করিবার জন্য দেশে তৎকালীন প্রচলিত ভাষারীতির ‘পাশাপাশি’ গৌণভাবে হইলেও, মুসলমান লিখিত পুঁথিসাহিত্যের ভাষাশৈলীটির দ্বারস্থ হইয়াছিলেন। তাহার সৃষ্টিশীলতার স্পর্শে পুঁথিসাহিত্যের ভাষার মধ্যে নতুন একটা ব্যঞ্জনার সৃষ্টি হইয়াছে।

অনেকে এই প্রশ্নে আহমদ ছফার সহিত একমত পোষণ করিবেন না। হুমায়ুন কবির পুঁথিসাহিত্যের কথা তুলিয়া নজরুল ইসলাম ও জসীমউদ্দীন উভয়কেই সামন্ত যুগের কবি বলিতে পিছপা হন নাই। হয়তো সেই বেদনা মনে রাখিয়াই একদিন জসীমউদ্দীন বলিয়াছিলেন, নজরুল ইসলামের মধ্যে পুঁথিসাহিত্যের কোন আছর ঘটে নাই। তিনি পুঁথিসাহিত্যের ‘মানসপুত্র’ নহেন। প্রকৃত সত্যের জন্য আমরা শুধু নজরুল ইসলামের জীবনীনির্ভর যুক্তির উপর দাঁড়াইব না। পুঁথির সহিত নজরুল ইসলামের পরিচয় তো ছিলই। কিন্তু তিনি নিছক পুঁথির লেখক হইতে চাহেন নাই। কিন্তু তাহার লেখা বাংলা আলাদা হইতেছে যে গুণে, তাহার মধ্যে পুঁথিসাহিত্যের একটা হিস্যা আছে। এই বক্তব্য আহমদ ছফার।

পলাশির যুদ্ধ পর্যন্ত সময়ে বাংলাভাষা যতদূর বাড়িয়া উঠিয়াছিল তাহাতেই আরবি-ফারসি বা যাবনী শব্দ বেশ মিশাল হইয়া যায়। যুদ্ধের পরও সেই ধারা বেশ কিছুদিন বহিয়া যাইতেছিল। ইংরেজ প্রশাসন ভাষার উপর হাত দিতেই—আঠার শতকের শেষ নাগাদ—বাংলাভাষার আরেকটা বাঁক তৈরী হইল। সরকারি মনীষীরা বাংলা হইতে যাবনী শব্দ তাড়াইবার কর্মসূচী সেলাই করিলেন। তাঁহাদের চেষ্টা সম্পূর্ণ সফল হয় নাই, কিন্তু তাহার ছাপ এখনও বাংলায় থাকিয়া গিয়াছে।

দুঃখের মধ্যে, ইংরেজ আমলে বাংলায় শিক্ষাদীক্ষার প্রসার সীমিত থাকায় এই ভাষা-সংস্কার কর্মসূচীও সর্বত্রগামী হয় নাই। কিন্তু বিচিত্রপথে গিয়াছে একথা স্বীকার করিতে দোষ নাই। মুসলমান সমাজের একাংশ যখন বাংলাভাষায় লিখিতে শুরু করিল তখন তাহাদের আশ্রয় হইল এই নতুন ভাষাই। ওদিকে মুসলমান কৃষক সমাজে এখনও পুরানা ভাষার—পুরানা রীতির জোয়ার।

মুসলমান লেখকরা—যেমন কায়কোবাদ বা মীর মশাররফ হোসেন—ইংরেজি যুগের বাংলা ভাষায় লিখিতে গিয়া কিছু সমস্যায় পড়িলেন। প্রতিবেশী হিন্দু সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য হইতে হইলে, তাহাদের উপহাসের পাত্র না হইতে চাহিলে, কিছু কিছু সীমানা মানিয়া চলিতে বাধ্য বোধ করিলেন। নহিলে আপন সমাজে, পরিবারে, সংসারে সচরাচর ব্যবহৃত আরবি-ফারসি শব্দ তাহাদের রচনায় যতটা সম্ভব পরিহারের চেষ্টা কেন?

ঠিক এই জায়গাতেই নজরুলের ভাষায় একটা বিপ্লব পদবাচ্য ঘটনা দেখা দিল। আহমদ ছফা আপন স্বভাবসিদ্ধ রীতিতে যাহা লিখিলেন তাহার বয়ান অনেকটা এই রকম: নজরুল ইসলাম মুসলমান সমাজের ঘরে-সংসারে ব্যবহৃত শব্দ-বাক্য ব্যবহার করিতে করিতে এমন একটা কাণ্ড বাধাইলেন যাহাতে বাংলাভাষার অভিধান সংকলকদের কাজ বাড়িয়া গেল। অভিধানের প্রতিটি নতুন সংস্করণে নতুন নতুন শব্দ যোজনার প্রয়োজন দেখা দিল। নজরুল ইসলামের এইটাই একমাত্র কৃতিত্ব নহে।

তিনি শুধু আরবি-ফারসি মিশাল বাংলা লেখেন নাই। তিনি বাংলাই লিখিয়াছেন যাহাতে আরবি-ফারসি শব্দ আর দশ শব্দের মতন বসিয়াছে। ইচ্ছা করিলে কোন ‘বিদেশি’ শব্দ ব্যবহার না করিয়া ‘বিশুদ্ধ’ সংস্কৃত প্রধান বাংলায়ও তিনি লিখিতে পারিতেন, তাহারও বিস্তর প্রমাণ তাহার গানে-কবিতায় পদ্যে-গদ্যে ছড়াইয়া।

নজরুল পুঁথিসাহিত্য লেখেন নাই। কিন্তু তিনি যাহা লিখিয়াছেন তাহাতে পুঁথিসাহিত্য বাদ যায় নাই। আহমদ ছফার কথায়, তিনি পুঁথির প্রাণের আগুন লইয়াছেন, জীর্ণ কংকাল বহিয়া বেড়ান নাই। তিনি পুঁথির শব্দ লইয়াছেন। কিন্তু তাহার বাক্য বমন করেন নাই। তাহার ভাষা-কাঠামো তিনি বদলাইয়া লইলেন।

পরিশেষে, আহমদ ছফার সিদ্ধান্ত, নজরুল ইসলাম নতুন যুগের প্রবর্তন করিলেন। এই প্রবর্তনার সারকথা কি? আমি ছফার প্রস্তাব পুনরায় তুলিতেছি: পুঁথি লেখকেরা যে ভাষারীতি গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহার উদ্দেশ্য বা ফলাফল দাঁড়াইয়াছিল বাঙালি মুসলমান স্বতন্ত্র—একথা প্রমাণ করা। আর নজরুল ইসলামের ভাষা ব্যবহার সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশে ঘটিয়াছে। তিনি চাহিলেন বাঙালি মুসলমান বাঙালি সমাজের অংশ—একথা প্রমাণ করিতে। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, নজরুলের কাছে বাঙালি মুসলমান সমাজের ঋণ শোধ করিবার মতন নহে। তিনি এই সমাজের ‘ভাষাহীন’ পরিচয় ঘুচাইলেন। তাহাদের ঘরের ভাষাকে সাহিত্যসমাজে প্রতিষ্ঠা দিলেন। সেই প্রতিষ্ঠা বাঙালি হিন্দুসমাজ স্বীকার করিয়া লইতে বাধ্য হইলেন। আর নজরুলের কাছে বাঙালি হিন্দুদেরও ঋণ আছে। তিনি বাংলাভাষা ও বাংলা সাহিত্যকে সাম্প্রদায়িকতার হাত হইতে উদ্ধার করিলেন। দেখাইলেন বাংলা হিন্দু ও মুসলমান দুই সমাজেরই ভাষা। বাংলাভাষার নতুন বিকাশ এই জায়গা হইতে নতুন করিয়া শুরু হইতে পারে। এই নতুন ধারার পথের কড়ি (বাঙালি জাতির নতুন সংজ্ঞা) নজরুল ইসলামের রচনা হইতে সংগ্রহ করিতে হইবে।

এই কীর্তিরই অপর নাম নজরুল ইসলাম।

কবি নজরুল ইসলাম ১৯৪২ সালের মাঝামাঝি জুলাই মাসে দুরারোগ্য রোগের আঘাতে বাকশক্তি হারাইয়াছিলেন। তাহার এক বছরের মাথায় ১৯৪৩ সালের জুন মাসের শেষ তারিখে আহমদ ছফা এই ধরাপৃষ্ঠে ভূমিষ্ঠ হইলেন। পরাধীন বাংলাদেশের মানে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম তখন এক উচ্চপর্যায়ে উঠিয়াছে। আহমদ ছফা প্রায়ই কহিতেন, যেদিন তাহার জন্ম হয় সেদিন সুভাষচন্দ্র বসু জাপান রেডিও হইতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম নতুন করিয়া ঘোষণা করিয়াছিলেন।

নজরুল ইসলামের জন্মের ৪৪ বছর পর আহমদ ছফার জন্ম নেহায়েত কাকতালীয় ঘটনা নাও হইতে পারে। আহমদ ছফার এন্তেকালের দশ বছরের মাথায় আমরাও হয়তো বলিতে পারিব—আমাদের সাহিত্যের সর্বশেষ আদর্শ আর সর্বশেষ বিচারক আহমদ ছফার সাহিত্যকর্মের মর্ম আমরা এখনও ধরিতে পারি নাই।


প্রথম প্রকাশ: দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার শুক্রবারের সাময়িকীতে ১ জুলাই ২০১১

Copyright 2011 Salimullah Khan

নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক মত

kazi (2)

ইংরেজি ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত নজরুল রচনাবলী প্রথম খণ্ডের সম্পাদকীয় নিবেদনে আবদুল কাদির জানাইয়াছিলেন, নজরুল ইসলামের দেশাত্মবোধের [অর্থাৎ রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণার] স্বরূপ নির্ণয়ের চেষ্টা নানাজনে নানাভাবে করিয়াছেন। কিন্তু এ প্রশ্নে কোনো ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয় নাই।

আবদুল কাদির লিখিয়াছিলেন, “রাজনীতিক পরাধীনতা ও অর্থনৈতিক পরবশতা থেকে তিনি দেশ ও জাতির সর্বাঙ্গীণ মুক্তি চেয়েছিলেন; তার পথও তিনি নির্দেশ করেছিলেন। সেদিনে তার সেই পথকে কেউ ভেবেছেন সন্ত্রাসবাদ—কারণ তিনি ক্ষুদিরামের আত্মত্যাগের উদাহরণ দিয়ে তরুণদের অগ্নিমন্ত্রে আহ্বান করেছিলেন; কেউ ভেবেছেন [তাঁর সেই পথ] দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নিয়মতান্ত্রিকতা—কারণ তিনি ‘চিত্তনামা’ লিখেছিলেন; কেউ ভেবেছেন প্যান-ইসলামিজম্—কারণ তিনি আনোয়ার পাশার প্রশস্তি গেয়েছিলেন; আবার কেউ ভেবেছেন মহাত্মা গান্ধীর চরকা-তত্ত্ব—কারণ তিনি গান্ধীজীকে তাঁর রচিত ‘চরকার গান’ শুনিয়ে আনন্দ দিয়েছিলেন।” আবদুল কাদিরের ধারণা এই সকল ভাবনার কোনোটাই নজরুল ইসলামের রাষ্ট্রচিন্তা কী রকম তাহার সত্য পরিচয় প্রকাশ করিতে পারে নাই।

আবদুল কাদির দাবি করিয়াছেন, নজরুল ইসলাম অন্তত আপনকার সাহিত্য সাধনার প্রথম যুগে ছিলেন ‘কামাল-পন্থী’। আবদুল কাদিরের কথায়, ‘কামাল আতাতুর্কের সুশৃঙ্খল সংগ্রামের পথই তিনি ভেবেছিলেন স্বদেশের স্বাধীনতা উদ্ধারের জন্য সর্বাপেক্ষা সমীচীন পথ।’

প্রমাণস্বরূপ তিনি ১৯২২ সালের শেষদিকে প্রকাশিত ‘কামাল’ শিরোনামক প্রবন্ধ হইতে খানিক তুলিয়া ধরিয়াছিলেন। নজরুল ইসলাম লিখিয়াছিলেন, ‘এই তো সত্যিকারের মুসলিম। এই তো ইসলামের রক্তকেতন। দাড়ি রেখে গোশত খেয়ে নামাজ-রোজা করে যে খিলাফত উদ্ধার হবে না, দেশ উদ্ধার হবে না, তা সত্য মুসলমান কামাল বুঝেছিল, তা না হলে সে এতদিন আমাদের বাঙলার কাছা-খোলা মোল্লাদের মতন সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে কাছা না খুলে কাবার দিকে মুখ করে হর্দম ওঠ্বোস্ শুরু করে দিত। কিন্তু সে দেখলে যে বাবা, যত পেল্লাই দাড়িই রাখি আর ওঠ্বোস্ করি, যতই পেটে খিল ধরাই, ওতে আল্লার আরশ কেঁপে উঠবে না। আল্লার আরশ কাঁপাতে হলে হাইদরি হাঁক হাঁকা চাই, মারের চোটে স্রষ্টারও পিলে চমকিয়ে দেওয়া চাই। ওসব ধর্মের ভণ্ডামি দিয়ে ইসলামের উদ্ধার হবে না—ইসলামের বিশেষ তলোয়ার, দাড়িও নয়, নামাজ-রোজাও নয়।’

আবদুল কাদিরের সিদ্ধান্ত ছিল এই রকম—কামাল আতাতুর্কের ‘প্রবল দেশপ্রেম, মুক্ত বিচারবুদ্ধি ও উদার মানবিকতা’ নজরুল ইসলামের ‘প্রথম যুগের রচনায় প্রভূত প্রেরণা’ যোগাইয়াছিল।

পর্যায়ক্রমে প্রকাশিত নজরুল রচনাবলীর দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ খণ্ডের ‘নিবেদন’ উপলক্ষে আবদুল কাদির নজরুল ইসলামের সাহিত্য সাধনার বিবর্তন কোন পথে ঘটিয়াছিল তাহার একটা ভালো ইতিহাস—অন্তত বলা যায় ইতিহাসের রূপরেখা—লিখিয়াছিলেন। তাহার প্রস্তাব অনুসারে জানা যাইতেছে, ‘নজরুল তাঁর সাহিত্যজীবনের দ্বিতীয় যুগের সূচনায় যে মতবাদের প্রবক্তা হন, তা প্রত্যক্ষত: গণতান্ত্রিক সমাজবাদ [ডেমোক্রেটিক সোস্যালিজম্]। তার পরিচালিত ‘লাঙলে’ হয়েছিল তাঁরই কালোপযোগী কর্ষণা।’

প্রমাণাকারে আবদুল কাদির ‘লাঙল’ পত্রিকায় প্রকাশিত নজরুলের লেখা এক ইশতেহার হইতে কিছু অংশ উদ্ধার করেন। তাহাতে বলা হইয়াছিল: ‘নারী-পুরুষ নির্বিশেষে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ভারতের পূর্ণ-স্বাধীনতা-সূচক স্বরাজ্য লাভই এই [শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ সম্প্রদায়] দলের উদ্দেশ্য।’

এই সম্প্রদায় বা দলের ‘উদ্দেশ্য’ ও ‘চরম দাবী’ বিবৃত করিয়া নজরুল ইসলাম আরও লিখিয়াছিলেন, ‘আধুনিক কল-কারখানা, খনি, রেলওয়ে, টেলিগ্রাফ, ট্রামওয়ে, স্টীমার প্রভৃতি সাধারণের হিতকরী জিনিস, লাভের জন্য ব্যবহৃত না হইয়া, দেশের উপকারের জন্য ব্যবহৃত হইবে এবং এতদসংক্রান্ত কর্মীগণের তত্ত্বাবধানে জাতীয় সম্পত্তিরূপে পরিচালিত হইবে।’ নজরুল ইসলাম আরও যোগ করিলেন, ‘ভূমির চরম স্বত্ব আত্ম-অভাব-পূরণ-ক্ষম স্বায়ত্তশাসন-বিশিষ্ট পল্লী-তন্ত্রের উপর বর্তিবে—এই পল্লী-তন্ত্র ভদ্র-শূদ্র সকল শ্রেণীর শ্রমজীবীর হাতে থাকিবে।’ এই ধ্যান-ধারণাকেই আবদুল কাদির ‘ডেমোক্রেটিক সোস্যালিজম’ নাম দিয়াছিলেন। আবার এই যুগের রাজনৈতিক চিন্তাদর্শকে, মানে নজরুলের দ্বিতীয় যুগকে, ধীমান আবদুল কাদির আরও এক নাম দিয়েছেন। সেই নাম: ‘দেশের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা ও সমাজতান্ত্রিক মানবিকতা’ ওরফে সোস্যালিস্টিক হিয়ুমেনিজম।

১৯২০ সাল হইতে নজরুল ইসলামের নতুন জীবনের সূত্রপাত ধরিলে বলিতে হয় গোটা ছয় বছরের মাথায় এই জীবনের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব শেষ হইয়া যায়। দেশের গণআন্দোলন ক্রমশ সংকীর্ণ খাতে বইতে শুরু করে ১৯২৬ সালের গোড়া হইতেই। আবদুল কাদির মনে করেন, ‘সেদিন কবি যে প্রবল আবেগ নিয়ে দেশের গণআন্দোলনের পুরোধারী চারণ হয়েছিলেন, তাতে ভাটা পড়ল দুটি কারণে।’

“প্রথম কারণ: ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ২রা এপ্রিল শুক্রবার থেকে কলকাতায় রাজরাজেশ্বরী মিছিল উপলক্ষে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের সূত্রপাত। দ্বিতীয় কারণ: ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ২২শে মে কৃষ্ণনগরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে কংগ্রেসকর্মী সংঘের সদস্যদের উদ্যোগে ‘হিন্দু-মুসলিম প্যাক্ট’ নাকচ করে প্রস্তাব গ্রহণ।” আবদুল কাদির বিলাপ করিলেন, “নজরুল কৃষ্ণনগর সম্মেলনের উদ্বোধন করেছিলেন ‘কাণ্ডারি হুঁশিয়ার’ গেয়ে কিন্তু কাণ্ডারিদের কানে তার আবেদন পৌঁছাল না!”

ইহার পর নজরুল ইসলাম ধীরে ধীরে সঙ্গীত সাধনার দিকে বেশি বেশি করিয়া ঝুঁকিতে লাগিলেন। আবদুল কাদিরের যুগবিভাগ অনুসরণ করিলে বলিতে হয় সঙ্গীত সাধনাই নজরুল ইসলামের তৃতীয় যুগের প্রধান ঝোঁক। এই ক্রমে তিনি কবি-জীবনের চতুর্থ বা শেষ যুগে ঢুকিয়া গেলেন। এই যুগে আবদুল কাদির মনে করেন, ‘ধর্মতত্ত্বাশ্রয়ী কবিতা’ ও ‘মরমীয়া গান’ ‘এক বিশেষ স্থান ও মহিমা লাভ’ করিয়াছে। পাছে লোকে কিছু বলে মনে করিয়া আবদুল কাদির বন্ধনীযোগে জানাইয়াছেন ‘ধর্মতত্ত্বাশ্রয়ী কবিতা’ বলিতে ইংরেজি শব্দবন্ধে ‘মেটাফিজিক্যাল পোয়েট্রি’ আর ‘মরমী গান’ বুঝিতে ‘মিস্টিক্যাল সংগ্স্’ আমলে লইতে হইবে। তথাস্তু!

সম্পাদকের সিদ্ধান্ত : ‘নজরুল সাহিত্যের চতুর্থ স্তরে এই অন্তর্জ্যোতিদীপ্ত আধ্যাত্মিকতাই পেয়েছে প্রাধান্য অথবা বৈশিষ্ট্য।’ মজার বিষয় তথাকথিত আধ্যাত্মিকতার এই যুগেও কিন্তু নজরুল ইসলাম তাহার প্রথম ও দ্বিতীয় এই যুগের দেশপ্রেম কিংবা গণতান্ত্রিক সমাজবদ্ধ বা মানবিকতা বিসর্জন দিলেন না। এই যুগে তিনি প্রচলিত ধর্মের ও ধর্মীয় সংস্কারের নানান রূপ ও রীতির আশ্রয় লইয়াছেন, ধর্মীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য হইতে উপমা, রূপক ও চিত্রকল্প আহরণ করিয়াছেন। এই জায়গায় দেখিতে হইবে নজরুল ইসলামের এই আধ্যাত্মিক যুগেও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কালিমা তাহাকে কখনও স্পর্শ করিয়াছিল কি-না। আমাদের ধারণা করে নাই। সেই প্রসঙ্গে অন্য জায়গায় লিখিব।

কাজী আবদুল ওদুদের মতোন স্বাধীনতা ব্যবসায়ী-মনীষীও নজরুল ইসলামকে প্রতীক পূজারি বলিতে কসুর করেন নাই। তবে তিনি প্রতীক প্রীতির প্রকারভেদ নির্ণয় করিয়া নজরুল ইসলামকে কিছুটা বাঁচাইয়াও দিয়াছেন। বলিয়াছেন, নজরুলের প্রতীক প্রীতি খানিকটা এয়ুরোপিয়া রেনেসাঁসের প্রতীক প্রীতির মতোই। পাঞ্জাবের কবি ইকবাল যে ধরনের প্রতীক প্রীতির সমঝদার ছিলেন, সেই রকম রিফরমেশনধর্মী নহে।

আবদুল ওদুদের সমস্যা হইতেছে একটি জিনিসের ব্যাখ্যা দেওয়া। নজরুল ইসলাম বাঙালি মুসলমানের প্রিয় হইয়াছেন তাঁহার ইসলামী কবিতা ও ইসলামী গান দিয়া। তাঁহার প্রভাবে সেই সমাজে নবউদ্দীপনা আসিয়াছে, এই কথাও সকলেই মানিয়া লইয়াছেন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি হিন্দু দেবদেবীর মহিমার গানও গাহিয়াছেন। এই সমস্যার উত্তর কোথায়?

আবদুল ওদুদের দাবি, হিন্দু দেবদেবীর মহিমা গান করিয়া নজরুল ইসলাম বাঙালি মুসলমানকে স্বদেশ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হইবার ডাক দিয়াছেন মাত্র। তাহাদিগকে হিন্দু হইয়া যাইতে বলেন নাই। আবদুল ওদুদের কথা একটুখানি তুলিয়া লইতেছি ‘বাংলার মুসলমান বাংলার হিন্দু থেকে পৃথক, এই আত্মচেতনা মুসলমানকে দিয়াছে আত্মরক্ষার সামান্য শক্তি, অর্থাৎ নিজেকে কোনো রকমে বজায় রাখবার শক্তি; কিন্তু মাত্র আত্মচেতনা ব্যাধি; আত্মচেতনার সঙ্গে যুক্ত হওয়া চাই আত্মবিসর্জনের ক্ষমতা। প্রতীক প্রীতির ভিতর দিয়ে নজরুল ইসলামকে ইঙ্গিত দিয়েছেন এই লোভনীয় আত্মবিসর্জনের দিকে, অর্থাৎ দূর-অতীতের স্মৃতি ও পরিবেষ্টনের মাধুর্য উভয়ের শক্তিতে সঞ্জীবিত হতে, অন্য কথায়, স্বদেশ-চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে।’

কাজী আবদুল ওদুদের এই লেখা ১৯৪৩ সালের। ততদিনে নজরুল ইসলামের মানসজীবনের এক প্রকার অবসান হইয়াছে। এই বিষয়ে নজরুল ইসলামের বক্তব্য জানিবার সুযোগ আর হইবে না। কিন্তু এই প্রস্তাবের একটা খসড়া প্রকাশ হইয়াছিল যখন নজরুল ইসলাম সবাক ছিলেন তখনও। প্রস্তাবক ছিলেন আবদুল ওদুদের প্রীতিভাজন ছাত্র খোদ আবদুল কাদির। আবদুল ওদুদের কোনো উল্লেখ না করিয়াই আবদুল কাদির তাহার শিক্ষকের অন্তত বারো বছর আগে এই প্রস্তাবটি জাহির করিয়াছিলেন। বাকি অংশ তাঁহার জবানিতেই শুনিব।

আবদুল কাদির ১৯৭৭ সালে জানাইয়াছেন তিনি ১৩৩৮ সালের শ্রাবণ-আশ্বিন সংখ্যায় ‘জয়তী’ পত্রিকার সম্পাদকীয় স্তম্ভে লিখিয়াছিলেন: “নজরুল ইসলাম বাঙলার মুসলিম রিনেসাঁসের প্রথম হুঙ্কারই শুধু নহেন, কাব্যচর্চায় ইসলামের নিয়ম-কঠোরতা উপেক্ষা করিয়া ‘নিও-প্যাগানিজমের’ সাহায্য গ্রহণ ব্যাপারেও তিনি অগ্রণী।” নজরুল রচনাবলী, চতুর্থ খণ্ডের ভূমিকা অর্থাৎ ‘সম্পাদকের নিবেদন’ প্রসঙ্গে আবদুল কাদির ১৯৭৭ সালে একটি ঘটনার উল্লেখ করিয়াছেন। ঘটনার বয়ান অনুসারে আবদুল কাদিরের সেই লেখাটি পড়িয়া নজরুল ইসলাম স্বয়ং “দৃঢ়স্বরে মন্তব্য করেন যে, তাঁর কবিতায় ও গানে বাহ্যত ‘নিও-প্যাগানিজম’ বলে যা আমাদের কাছে প্রতিভাত হচ্ছে তা প্রকৃতপক্ষে ‘সুডো-প্যাগানিজম’।” এই জায়গায় একটা কথা বলিয়া রাখিব: আবদুল কাদির তাঁহার লেখায় ইংরেজি শব্দগুলি রুমি হরফে লিখিয়াছিলেন, আমি সেইগুলি আমাদের দেশনাগরি লিপিতে তর্জমা করিয়া লইয়াছি।

এই নিবন্ধ শুরু করিয়াছিলাম বুদ্ধিমান আবদুল কাদিরের বুদ্ধি তর্পণ করিয়া। ইহার সমাপ্তিও তাহার জবানিতে হইবে। তিনিও নজরুল ইসলামের সহিত একমত হইয়াছিলেন। বলিয়াছিলেন: ‘নজরুলের কোনো কোনো রচনায় বৈষ্ণবীয় লীলাবাদ ও শৈবসুলভ শক্তি-আরাধনা দেখে যাঁরা তাঁকে স্থূলকথায় প্রতীক-পূজারী বলতে চান, তাঁদের কাছে কবির বক্তব্য যে, তিনি কখনই প্যাগান বা নিও-প্যাগান নন, তিনি কখনও কখনও কাব্য বিষয়ের অনুসরণে ও অন্তরের অনুুপ্রাণিত ভাব প্রকাশের প্রয়োজনে পরেছেন সুডো-প্যাগানের [নকল প্যাগানের] সাময়িক কবি-বেশ।’

দোহাই

১. নজরুল ইসলাম, ‘কামাল’, নজরুল রচনাবলী, ৭ম খণ্ড [ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ২০০৮], পৃ.-১৯-২০।
২. কাজী আবদুল ওদুদ, ‘প্রতীক প্রীতি’, শাশ্বত বঙ্গ পুনর্মুদ্রণ [ঢাকা :ব্র্যাক প্রকাশনা, ১৯৮৩], পৃ. ৯১-৯৩।
৩. আবদুল কাদির, নজরুল-প্রতিভার স্বরূপ, শাহাবুদ্দীন আহমদ [সম্পাদিত], [ঢাকা : নজরুল ইনস্টিটিউট, ১৯৮৯]।

প্রথম প্রকাশ: দৈনিক সমকাল

Copyright 2013 Salimullah Khan

বাজে জসীমউদ্দীন

jasim-uddinজসীমউদ্দীনের ‘সৃজনী প্রতিভা’ কেন অল্পদিনেই নিঃশেষ হইয়া গেল, তাহার এক অভিনব ব্যাখ্যা উপস্থিত করিয়াছিলেন ভারতের বিখ্যাত লেখক হুমায়ুন কবির। হুমায়ুন কবির এক ঢিলে দুই পাখি মারিতে চাহিয়াছিলেন। তাঁহার বিচারে দেশের গণমানসের অন্তর্নিহিত শক্তিকে কাজে রূপান্তরিত করিয়াছিলেন জসীমউদ্দীন। সেই রূপান্তর যতটুকু করিতে পারিয়াছিলেন তিনি, তাঁহার কাব্যসিদ্ধিও ঠিক ততখানিই।

কিন্তু কবির বলিয়াছিলেন, গণমানসের অনুবাদই প্রতিভাবানের একমাত্র ধর্ম নয়। তাঁহাকে সেই মানসের সংগঠনেও রূপান্তর ঘটাইতে হইবে। মানসের সংগঠনে সেই রূপান্তর হয় নাই বলিয়াই জসীমউদ্দীনের ‘সৃজনী প্রতিভা’ অল্পদিনেই শেষ হইয়া আসিল। গণমানসের অন্তর্নিহিত শক্তি তাঁহার ঘাড়ে চড়িয়াছে বটে, তবে ‘কল্পনা ও আবেগের নতুন নতুন রাজ্য’ জয়ে তিনি অগ্রসর হইতে পারেন নাই। আত্মকেন্দ্রিক পুনরাবৃত্তির মধ্যে তাঁহার সাধনার অগতি এই সত্যেরই পরিণতি। (কবির ২০০২: ৬১)

হুমায়ুন কবির যশস্বী বিচারক। তাঁহার কথা অনেকেই মানিয়া লইয়াছেন। (মুখোপাধ্যায় ২০০৪: ৫০-৫১)

সান্ত্বনার কথা, হুমায়ুন কবিরের ধারণা যদি সত্য হয়, তো জসীমউদ্দীন একা নহেন। একজন অন্তত সঙ্গী আছেন তাঁহার। তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। হুমায়ুন কবির লিখিয়াছেন, নজরুল ইসলামও নিপীড়িত জনমানসের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে রূপ দেওয়ার সাধনা করিয়াছিলেন। তাঁহার বিশ্বাস, নজরুল ইসলাম ‘পুরাতন পুঁথিসাহিত্যের আবহাওয়ায় লালিত’। আর বাংলার বিপুল মুসলমান কৃষকশ্রেণীর সহিত তাঁহার ‘সহজ আত্মীয়তা’ এই কারণেই। পুরাতন ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনের মধ্যেই—হুমায়ুন কবির দেখিয়াছেন— নজরুল ইসলামের ‘ভাষা ও ভঙ্গিতে বিধৃত বিপ্লবধর্ম’।

নজরুল ইসলাম ও জসীমউদ্দীন দুইজনকেই নির্দ্বিধায় তিনি বলিয়াছেন ‘পশ্চাদমুখী’। এখনকার ভাষায় আমরা হয়তো বলিব ‘প্রতিক্রিয়াশীল’। হুমায়ুন কবিরের প্রবন্ধটি বাহির হইয়াছিল বাংলা ১৩৪৯ সালে। ১৬ বৎসর পরে মুদ্রিত দ্বিতীয় সংস্করণেও তিনি এই মত বদলাইবার প্রয়োজন অনুভব করেন নাই।

হুমায়ুন কবিরের এই অভিমত অবশ্য আচানক কি সম্পূর্ণ আনকোরা ছিল না। নজরুল ইসলাম আর জসীমউদ্দীন দুই জনেরই প্রতিভা কেন অল্পদিনে নিঃশেষ হইয়া যাইবে তাহা খানিক ভবিষ্যদ্বাণী আকারে বলিয়াছিলেন কাজী আবদুল ওদুদও। ইংরেজি ১৯৩২ সালের ২৬ ডিসেম্বর কলিকাতায় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সম্মিলনের পঞ্চম অধিবেশনে তিনি জানাইয়াছিলেন, এই দুইজন মুসলমান সাহিত্যিক ‘ভাগ্যবান’, কেননা তাঁহারা বৃহত্তর দেশের—মানে দেশের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের—সমাদর লাভ করিয়াছেন।

একই কথাটি তিনি আরও সাজাইয়া-গুছাইয়া বলিলেন ইংরেজি ১৯৪৫ সালে। কাজী আবদুল ওদুদের লেখা সাধু বাংলায় তর্জমা করিয়া দিতেছি:

‘নজরুল ইসলাম একালের বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে প্রথম সাহিত্যিক যিনি বাংলার মুসলমান ও হিন্দু উভয়ের চিত্ত আন্দোলিত করিতে সক্ষম হইলেন। তাঁহার পূর্বে একালেও শক্তিশালী মুসলিম সাহিত্যিক যে বাংলায় না জন্মিয়াছেন তাহা নয়। মীর মোশাররফ হোসেন, কায়কোবাদ, এয়াকুব আলি চৌধুরী, লুৎফর রহমান, বেগম রোকেয়া, কাজী ইমদাদুল হক প্রভৃতির নাম একালের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্মরণীয় হইয়া থাকিবে। কিন্তু নজরুল ইসলামই হইতেছেন এযুগের প্রথম বাঙালি মুসলমান যিনি সমস্ত দেশের সম্ভ্রম ও সমাদর লাভ করিলেন। শুধু বাংলায় নয় ভারতেও তাঁহার যশ আজ ছড়াইয়া পড়িয়াছে। তাঁহার পরে সমস্ত দেশের সমাদর লাভ করিয়াছেন মুসলমান পল্লী-কবি জসীমউদ্দীন।’ (ওদুদ ১৯৮৩: ৭৬)

কাজী আবদুল ওদুদ সদা সত্যকথা বলিবেন, কদাচ মিথ্যা বলিবেন না। সেই ১৯৩২ সালেই তিনি জানাইয়াছিলেন, ‘এই দুই তরুণ শিল্পী’ ধন্য হইয়াছিলেন সে কালের ‘মুসলমান সমাজের অন্তরে’ তাহার সাহিত্যিক সার্থকতা সম্বন্ধে এক নব আশার সঞ্চার করিবার কারণে।

তাঁহারা যে অদূর ভবিষ্যতে আর ধন্য হইবেন না, অবাঞ্ছিত হইয়া যাইবেন তাহার ইঙ্গিতও তিনি করিতে কসুর করেন নাই। ওদুদ বলিতেছিলেন, ‘বাংলার মুসলমান সমাজে তখন সাহিত্যচর্চার যে অবস্থা, অর্থাৎ লেখক ও পাঠকের যে সমন্ধ’ তাহা শুদ্ধ অসন্তোষজনকই নয়, অনেকখানি আপত্তিকরও। ওদুদের কথার সরল তর্জমা করিতেছি: ‘পাঠক-সমাজের বিচার-শক্তি এখনো অত্যন্ত দুর্বল, সেই দুর্বলতার সুযোগ পুরাপুরি লইবার উদ্দেশ্যে আমাদের অনেক লেখককে অনেক সময়ে দেখিতে পাওয়া যায় অত্যন্ত অকিঞ্চিৎকর রচনায় হাত দিতে।’ (ওদুদ ১৯৮৩: ২৬৯)

 

হুমায়ুন কবির ও কাজী আবদুল ওদুদের কথার জওয়াব লিখিবার সময় নজরুল ইসলামের হয় নাই। জসিমউদ্দীনও সরাসরি জওয়াব লিখিয়াছিলেন কি না আমার তাহা জানিবার সুযোগ ঘটে নাই। তাঁহার অনেক লেখা—বিশেষ প্রবন্ধনিবন্ধ এখনও পত্রপত্রিকায় ছড়ানো। এই বিষয়ে জসীমউদ্দীনকে ভাগ্যবান বলিলে সত্যের অপলাপ হইতে পারে। তাঁহার পুত্র-কন্যারাও এই সম্বন্ধে সত্যকার দায়িত্বশীল বলিয়া গণ্য হইবেন না। রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা তুলিয়া লজ্জা পাইতে চাহি না।

পাকিস্তান আমলে কোন এক লেখায় সৈয়দ আলী আশরাফও একই নালিশের পুনরুক্তি করিলেন। ১৯৫১ নাগাদ মাটির কান্না বইটি পড়িয়া তিনিও বলিলেন জসীমউদ্দীন আর নতুন কিছু লিখিতে পারিতেছেন না। কবির বিদেশি তর্জমাকারিনী শ্রীমতি বার্বারা পেইন্টার জানাইয়াছেন জসীমউদ্দীন সেই নালিশ কবুল করেন নাই। তিনি বরং ঘৃণাভরে এই ব্যাখ্যা নাকচ করিয়াছিলেন। ( জসীমউদ্দীন ১৯৬৯: ২৬)

করাই স্বাভাবিক। তাহার কিছু প্রমাণ আমিও অন্য জায়গায় পাইতেছি। সওগাত পত্রিকায় পত্রস্থ এক লেখায় জসীমউদ্দীনের সাক্ষ্য পাওয়া যায়। তাঁহার দৃষ্টি আলাদা। জসীমউদ্দীন নিজেকে শুদ্ধ মুসলমানের কবি কিংবা গ্রামাঞ্চলের কবি পরিচয়ে আটক রাখিতে চাহেন নাই। তিনি যাহা করিতে চাহিয়াছেন তাহা ‘জনসাধারণের’ সাহিত্য।

পরাধীন যুগে যে বাংলা সাহিত্য গড়িয়া উঠিয়াছিল জসীমউদ্দীন সেই সাহিত্যের নাম দিয়াছেন ‘জমিদার ও ডেপুটি সাহিত্য’। তিনি লিখিয়াছেন, ‘এতদিন সাহিত্য ছিল দেশের বড়লোকদের হাতে। আমাদের বাঙলা-সাহিত্য এই সেদিনও জমিদার ও ডেপুটিদের হাতে ছিল।’ (জসীমউদ্দীন ২০০১খ: ৩১)

ইঁহাদের হাতে দেশের জনসাধারণের সাহিত্য গড়িয়া উঠিবার আশা করা বাতুলতা। কিন্তু তাহার পরও কথা থাকিয়া যায়। জসীমউদ্দীন তাহা আমল করিতে ভুল করেন নাই। তিনি বলিলেন, এই দেশের জনসাধারণ নিজেদের আনন্দ দিবার জন্য যে সাহিত্যের নীড়টি গড়িয়া তুলিয়াছিল, ইঁহারা ‘রুচি, নীতি এবং সমালোচনার কষাঘাতে’ তাহা ভাঙিয়া চুরমার করিয়া দিয়াছেন। এই অপরাধে ‘মহাকালের দরজায়’ ইঁহাদের জবাবদিহি করিতে হইবে।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস হইতে জসীমউদ্দীন কিছু সাক্ষ্যসহায় কুড়াইয়া আনিয়াছেন। স্বয়ং বাংলা ভাষার অবস্থিতিতেই প্রমাণ, এই সাহিত্য বড়লোকি সংস্কৃত সাহিত্য বর্জন করিয়াই নিজের পায়ে দাঁড়াইয়াছিল।

জসীমউদ্দীনের কথার সারমর্ম গ্রহণ করিলে এই দাঁড়াইতেছে। বাংলা সাহিত্য একদিন বিরাট সংস্কৃত সাহিত্যের সামনে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইয়াছিল। সেই কারণেই সেইদিন জয়যুক্ত হইয়াছিল জনসাধারণের রসপিপাসা। আমরা এখন যে পদার্থকে কখনও ‘জাতীয় সাহিত্য’ বলিয়া শ্লাঘা অনুভব করিতেছি তাহাই জসীমউদ্দীনের বুলিতে শুনাইত ‘জনসাধারণের সাহিত্য’।

তিনি লিখিয়াছেন, আমাদের দেশে ইংরেজের দখল কায়েম হইবার আগে পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য বলিতে আমরা ‘জনসাধারণের সাহিত্য’ বুঝিতাম। তিনি অবশ্য একথা কবুলও করিয়াছেন সংস্কৃত সাহিত্য হইতে কোন কোন কবি মণিমাণিক্য আহরণ করিয়াছিলেন, ‘কিন্তু মোটামুটি বাংলা সাহিত্য ছিল জনসাধারণের সাহিত্য।’ বাংলার মনসামঙ্গল, কবিকঙ্কণ চণ্ডী, অগণিত বৈষ্ণব কবিতা—এইগুলিকে জসীমউদ্দীন ‘গণ-সাহিত্যের পর্যায়ে’ ফেলিয়াছিলেন। (জসীমউদ্দীন ২০০১খ: ৩২)

তিনি দেখাইয়াছেন চৈতন্যের আন্দোলন আমাদের কোন ক্ষতি করে নাই। তাঁহারাও জনসাধারণের জন্য সাহিত্য রচনা করিয়াছিলেন। ‘কারণ, চৈতন্যের ধর্ম ছিল জনসাধারণের জন্য।’ কবিকঙ্কণ চণ্ডীর ‘দুর্গার কাঁচলী’ নির্মাণের সঙ্গে গাজীর গানের ‘শাড়ির বর্ণনা’, মনসামঙ্গলের বাইশ কাহন নৌকার বর্ণনার সঙ্গে গ্রাম্যগানের চৌদ্দ ডিঙ্গা মধুকোষের বর্ণনার তুলনা করিবার প্রস্তাবও তিনি পেশ করিয়াছেন। বংশীদাস, লোচনদাস, বলরামদাস, চণ্ডীদাস ও জ্ঞানদাসের পদাবলীর সহিত গ্রাম্যগানের যোগ তিনি আবিষ্কার করিয়াছেন।

হুমায়ুন কবিরের সহিত জসীমউদ্দীনের পার্থক্যের গোড়া আমরা এই জায়গাতেই দেখিতে পাইতেছি। হুমায়ুন কবির লিখিয়াছিলেন, বাংলার জীর্ণ পুরাতন সামন্ততন্ত্রের বোঁটা আলগা হইয়া আসিয়াছিল। এয়ুরোপের পহিলা ধাক্কা লাগিতেই তাহা পাকা ফলের মতন খসিয়া পড়িল। এয়ুরোপের বাড়ন্ত ধনতন্ত্র সেদিন বিপ্লবী শক্তি হিসাবেই বাংলায় আসিয়াছিল। আনিয়াছিল নতুন অর্থনৈতিক সংগঠনের সম্ভাবনা ও নতুন জগতের ভাবধারা। তাহার ফলে বাংলার কাব্যধারার বিপ্লবী রূপান্তর হইল। শুরু হইল বাংলার কাব্যের নবযুগ। তাঁহার উচ্ছ্বাসের সঙ্গে অনেকেই গা ভাসাইয়া দিবেন—বলিবেন এয়ুরোপের ছোঁয়ায় বাংলা কাব্যের পরিণতি হইয়াছে বিস্ময়কর। আজ বাংলার কাব্যসাহিত্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যের পর্যায়ে আসিয়া পৌঁছিয়াছে। (কবির ২০০২: ৩৩-৩৪)

জসীমউদ্দীনের দেখা একেবারেই আলাদা জায়গা হইতে। তিনি বলিলেন, ইংরেজ জাতির আগমনের পরে এয়ুরোপের ‘তীব্র মদিরা’ পান করিয়া আমরা ধীরে ধীরে সব খোয়াইলাম। খাঁটি এয়ুরোপের ভাবে বিভোর হইয়া সংস্কৃত অলংকার ও শব্দশাস্ত্রের পানপাত্র ভরিয়া মাইকেল যে কাব্যরস আমাদের পরিবেশন করিলেন তাঁহার সঙ্গে সঙ্গেই তাহা নিঃশেষ হইয়া গেল।

মাইকেল—জসীমউদ্দীন বলিতেছেন—অবশ্য বাংলা ভাষায় তাঁহার অসামান্য প্রতিভার জন্য বাঁচিয়া থাকিবেন। কিন্তু কাব্যের যে নতুন নাট্যমঞ্চ তিনি খুলিয়াছিলেন, যেখানে হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র প্রভৃতি দিকপাল আসর জমাইতে প্রয়াস পাইয়াছিলেন, তাহা অল্পদিনেই ভাঙ্গিয়া গেল। জসীমউদ্দীনের মতে, মাইকেলের কাব্যধারাটি যে বাংলাদেশে টিকিল না, তাহার কারণ বাংলার মাটির সঙ্গে তাঁহার কাব্যের ধারা শিকড় গাড়িতে পারে নাই।

গল্প বুনিবার যে ধারাটি মধুসূদন, হেমচন্দ্র ও নবীনচন্দ্র গ্রহণ করিলেন—জসীমউদ্দীন বলিতেছেন—তাহার সহিত বাংলার মাটির যোগ ছিল না। সেইজন্য বাংলার মাটিতে তাঁহারা শিকড় গাড়িতে পারেন নাই। গল্প বুননের যে ধারাটি চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল, রামায়ণ প্রভৃতি কাব্যে চলিতেছিল মধু হেম নবীনের ধারা তাহার সহিত কোন যোগ রাখে নাই।

এখন কি কর্তব্য? মনসামঙ্গলের, চণ্ডীমঙ্গলের বুননির উপর যদি কোন কবি মিল্টন ও হোমারের কাব্যধারার সংযোগ স্থাপন করিতে পারেন, তবেই তিনি বাংলায় অমর হইয়া থাকিবেন। জসীমউদ্দীন বলিলেন এ পদার্থ হয়তো অসম্ভব ঠেকিতে পারে। কিন্তু সাহিত্যের ইতিহাস তো ‘অসম্ভবকে সম্ভব করা’রই অপর নাম। এই জায়গায় জসীমউদ্দীন খোদ মধুসূদনকেই সাক্ষী মানিলেন। কে জানিত বাংলা পয়ারের পুরাতন পানপাত্রের মধ্যে ব্ল্যাংক ভার্স তথা খোয়া পদ্যের গতিবৈচিত্র্য ভরা যাইতে পারে?

ইংরেজ এদেশে আসিয়া আমাদের মধ্যে হিন্দু মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় সৃষ্টি করিলেন। কারণ সহজ। তাঁহাদের মধ্যেই ইংরেজ জাতি নিজেদের সমর্থক খুঁজিয়া পাইলেন। নতুন যে মধ্যবিত্ত হিন্দু দলটি নতুন শহরে আসিয়া আস্তানা তুলিলেন তাহাতে শহরের কোন বনিয়াদ ছিল না। তাহাতে ইংরেজের নগরে এয়ুরোপের পানপাত্র তাঁহারা পরিপূর্ণ মনে গ্রহণ করিলেন। শুদ্ধ কি তাহাই? নিজের দেশের গ্রাম্য জীবনের প্রাচীন ভাবধারার বনিয়াদও লাথি মারিয়া দূরে ছুঁড়িয়া ফেলিলেন তাঁহারা।

জসীমউদ্দীন সালিশ করিলেন। বলিলেন, বাংলা সাহিত্যের উৎসাহ দিবার ভার যতদিন মুসলমান রাজাদের হাতে ছিল, ততদিন তাহা জনসাধারণের সাহিত্য ছিল। ‘কারণ, আমাদের ধর্ম’, জসীমউদ্দীন বলিতেছেন, ‘জনসাধারণকে নিয়ে’। ইংরেজ আসিবার পরে বাংলাদেশ হইতে মুসলমানের প্রভাব নষ্ট হইয়া গেল। বাংলা সাহিত্য মুষ্টিমেয় কয়েকজন ভদ্রলোকের সাহিত্য হইয়া দাঁড়াইল। (জসীমউদ্দীন ২০০১খ: ৩৩-৩৪)

এদিকে হুমায়ুন কবিরের রায় ইহার ষোল আনাই বিপরীত। বাংলার ইতিহাস তিনি অন্য জায়গা হইতে পড়িয়াছেন। তাঁহার বিচারে নবাবী আমলে ফারসি সাহিত্যের প্রভাব বাংলাকে নানাভাবে আচ্ছন্ন করিয়াছে কিন্তু সে প্রভাব ছিল ভারতের আর দশ ভাষার উপরেও সমান কার্যকর। তাঁহার যুক্তি অনুসারে, অন্যান্য দেশজ ভাষার তুলনায় বিকাশের বিচারে বাংলার কাব্য সর্বশ্রেষ্ঠ। আর কোন ভারতীয় ভাষাতেই সাহিত্য সাধনা বোধ হয় এতখানি সিদ্ধিলাভ করে নাই। কিন্তু তিনি দাবি করিতেছেন ফারসির এই সর্বভারতীয় প্রভাবের ফলে ভারতের অন্যান্য ভাষার কাব্যের তুলনায় বাংলার কাব্যে কোন মূলগত পার্থক্য দেখা দেয় নাই। কবিরের ভাষায়, ‘সেদিনকার বাংলা কাব্যের উৎকর্ষ তাই গুণে এবং পরিমাণে—স্বভাবে নয়।’

কবির সিদ্ধান্ত করিয়াছেন উনিশ শতকের মাঝামাঝি হইতে বাংলার কাব্য বিকাশের যে নতুন ধারা শুরু হইল, তাহা আগাগোড়াই নতুন। ভারতের আর দশ ভাষা হইতে শুদ্ধ গুণে বা পরিমাণে নয়, গোত্রেও আলাদা হইয়া গেল বাংলার কাব্য। এই ঘটনার নাম তিনি রাখিয়াছেন বাংলার কাব্যের ‘বিস্ময়কর পরিণতি’। (কবির ২০০২: ৩৪)

জসীমউদ্দীন স্বভাবতই এই বিচারের সহিত একাত্ম হইবেন না। তিনি মনে করেন বাংলার নতুন কবিতার মধ্যেও দেশের ধারা কতক মিলিয়াছে। আর ইহাই রবীন্দ্রনাথকে মধুসূদন হইতে আলাদা করিবার কারণ। বাঙালি রবীন্দ্রনাথকে কতক গ্রহণ করিয়াছে, কারণ তাঁহার কবিতায় রহিয়াছে চারিশক্তির সমাহার—সংস্কৃত, বৈষ্ণব, বাংলার জাতীয় বা লোকজ এবং এয়ুরোপীয়। জসীমউদ্দীনের কথায়, ‘বিহারীলালের লিরিকের ধারাটি’ রবীন্দ্রনাথে আসিয়া টিকিয়া রহিল। (জসীমউদ্দীন ২০০১খ: ৩৩)

হুমায়ুন কবির ও কাজী আবদুল ওদুদের মতন অনেক মনীষী দাবি করিয়াছেন ‘পুরাতন ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন’ ছাড়া নজরুল ইসলাম ও জসীমউদ্দীন আর কিছুই করেন নাই। জসীমউদ্দীন বলিলেন কথাটি পুরাপুরি সত্য নয়। নজরুল ইসলাম তাঁহার রচনায় আরবি, পারসি বহু শব্দ প্রয়োগ করিয়াছেন একথা অসত্য নয়। কিন্তু একটা পার্থক্যের কথাও এখানে মনে রাখিতে হইবে। তিনি বাংলা সাহিত্যকে হিন্দু ও মুসলমান ভাগে ভাগ করিবার চেষ্টা করেন নাই।

জসীমউদ্দীন লিখিয়াছেন, নজরুল ইসলাম পুঁথি সাহিত্যের মানসপুত্র নহেন। তিনি তাঁহার অনেক লেখায় বরং পুঁথি সাহিত্যকে অবহেলা আর বিদ্রূপই করিয়াছেন। জসীমউদ্দীন কহিতেছেন, ‘তিনি যে কোনদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে এই পুঁথি সাহিত্য উপভোগ করিয়াছিলেন তাহারও প্রমাণ পাওয়া যায় না।’ তাঁহার রচনা হইতে খানিক তুলিয়া লইতেছি:

‘পুঁথি সাহিত্যের লেখকরা আরবী, পারসী শব্দের ধ্বনিতরঙ্গ না বুঝিয়াই এবড়োথেবড়োভাবে যেখানে ভাব প্রকাশের উপযুক্ত বাঙলা শব্দ খুঁজিয়া পান নাই সেখানে ইচ্ছামত আরবী পারসী শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন। নজরুল আরবী, পারসী শব্দের ধ্বনিতরঙ্গ বুঝিয়া কোন [কোন] রচনার মধ্যে মুসলমানী আবহাওয়া ফুটাইয়া তুলিতে এইসব শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন।’ (জসীমউদ্দীন ২০০১ক: ১০২-৩)

আমাকে লেখা এখানেই শেষ করিতে হইতেছে। শুদ্ধ একটি কথা যোগ করিয়া শেষ করিব। জসীমউদ্দীন নজরুল ইসলামকে ভর করিয়া পরোক্ষে নিজের সাফাইও গাহিয়াছেন। গাহিয়া মোটেও অন্যায় করেন নাই। তাঁহার নালিশের জবাব হুমায়ুন কবির কেন, কেহই দিতে পারিবে না। বাংলা ১৩৫০ সালে জসীমউদ্দীন লিখিয়াছিলেন, বাংলা সাহিত্য শুদ্ধমাত্র দেশের মধ্যবিত্ত সমাজের পকেটেই আবদ্ধ রহিল। দেশের জনসাধারণ আর ইহার অন্দর মহলে প্রবেশ করিতে পারিল না। আবদুল কাদিরকে লেখা পত্রের এক জায়গায় এই দুঃখই বিশদ করিতেছেন তিনি। আমি সাধু ভাষায় তাঁহার তর্জমা লিখিলাম:

‘আজ যত করিয়াই আমরা বঙ্কিমচন্দ্র, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের জন্য গৌরব বোধ করি না কেন, একথা ভাবিতে সত্যই বড় কষ্ট। আজ বঙ্গভাষার বংশীধ্বনিতে যমুনা উজান বহে না, শ্যামলী ধবলী গৃহে চলে না। বাংলার নবেল উপন্যাস শুধু কলিকাতাবাসী কয়েকজন মধ্যবিত্ত লোকের কথায় ভরা। দেশের জনসাধারণ তাহার ভিতরে নিজেদের খুঁজিয়া পায় না।’ (জসীমউদ্দীন ২০০১ক: ৩৪)

জসীমউদ্দীনের সিদ্ধান্ত আজ এই অভাজন আমাকেও নতুন করিয়া ভাবাইতেছে। কারণ আমি তাঁহার বাজে লিখিতেছি। তিনি বলিতেন, সাহিত্য যেমন বিশ্বের তেমনি তাহা ঘরেরও। বিশ্বসাহিত্যই বল আর সাম্প্রদায়িক সাহিত্যই বল, সব সাহিত্যই তৈরি হয় ঘরের প্রদীপ জ্বালাইবার জন্য। যে সাহিত্য ঘরে প্রদীপ জ্বালাইল না, সে সাহিত্য বিশ্বেও আলোকপাত করিতে পারিবে না। দেশের জনসাধারণের জন্যই এ সাহিত্য তৈরি হয়।

দোহাই

১. কাজী আবদুল ওদুদ, শাশ্বত বঙ্গ, ২য় মুদ্রণ (ঢাকা: ব্র্যাক প্রকাশনা, ১৯৮৩)।

২. জসীমউদ্দীন, জসীমউদ্দীনের প্রবন্ধসমূহ, ১ম খণ্ড, ২য় মুদ্রণ (ঢাকা: পলাশ প্রকাশনী, ২০০১ক)।

৩. জসীমউদ্দীন, জসীমউদ্দীনের প্রবন্ধসমূহ, ২য় খণ্ড, ১ম প্রকাশ (ঢাকা: পলাশ প্রকাশনী, ২০০১খ) ।

৪. হুমায়ুন কবির, বাঙলার কাব্য, ২য় সংস্করণ, পুনর্মুদ্রণ (ঢাকা: বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ২০০২)।

৫. সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়, জসীমউদ্দীন: কবি মানস ও কাব্য সাধনা, ২য় মুদ্রণ (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ২০০৪)।

৬. Jasim Uddin, Gipsy Wharf (Sojan Badiar Ghat), B. Painter and Y. Lovelock, trans. (London: George Allen and Unwin, 1969).

প্রথম প্রকাশঃ দৈনিক প্রথম আলো। ১৮ মার্চ ২০১১।

বাংলাদেশের মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ইতিহাস প্রসঙ্গে: হবীবুল্লাহ বাহারের সাক্ষ্য

‘হবীবুল্লাহ বাহার রচনাবলী’ প্রকাশিত হইয়াছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক চরম সন্ধিক্ষণে। একরকম দুঃসময়ে। ১৯৭১ সালের নবেম্বর মাসে। ঐ বছরের মার্চ মাসে এই রচনাবলীর ভূমিকা লিখিয়াছিলেন একাডেমীর তৎকালীন পরিচালক অধ্যাপক কবীর চৌধুরী। ভূমিকায় কবীর চৌধুরী একটি সমস্যার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিলেন। আমি সেই সমস্যাটিকেই আমার নিবন্ধের বিষয় নির্বাচিত করিয়াছি।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের প্রথম দিকে বাংলার মুসলমান সমাজে, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী মনে করেন, ‘পশ্চাদমুখী ধ্যানধারণা ও জীবনবোধ’ অপসারণের চেষ্টা শুরু হয়। তিনি লিখিয়াছেন: ‘নওয়াব আবদুল লতীফ ও সৈয়দ আমীর আলী প্রমুখ কতিপয় ব্যক্তির উদ্যোগে পরিচালিত এ-প্রচেষ্টার সুফল ফলে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে। আধুনিক শিক্ষা প্রসার লাভ করে; এবং আধুনিক কালের অন্যান্য মানবগোষ্ঠীর লোকজনের সাথে মেলামেশার ফলে বঙ্গীয় মুসলিম সমাজ তার ভ্রান্ত ধারণা ও জীবনবোধ ক্রমে ক্রমে কিছু কিছু করে পরিত্যাগ করতে থাকে।’ (কবীর চৌধুরী ১৯৭১: পাঁচ)

এই পরিত্যাগের প্রক্রিয়াও–কবীর চৌধুরী বলিতেছিলেন–সহজ হয় নাই। কোন পথে গেলে মুসলমান সমাজের সত্যকার উন্নতি হইবে তাহা পূর্ব হইতে কেহ বলিয়া রাখে নাই। উন্নতি চাহিয়াছিলেন সকলেই। কিন্তু কেহ কেহ উন্নতির যে পথ বাতলাইয়াছিলেন তাহা অধোগতির নামান্তর বৈ ছিল না। কবীর চৌধুরীর কথায়, ‘কিছু লোক প্যান-ইসলামিজমের মাধ্যমে পাক-ভারতের ‘জাতীয় স্বাধীনতা’ অর্জনের কৌতুকপ্রদ কার্যে কায়মনোবাক্যে আত্মনিয়োগ করেন। সামন্ততান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পতন যুগের প্রতীক সাম্রাজ্যবাদের ক্রীড়নক মুসলিম রাজা-বাদশাদের সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্যকে মুসলিম সমাজের সৌভাগ্য–দুর্ভাগ্যরূপে গণ্য করতেন অনেকে। কোন কোন মনীষী ভ্রান্ত আস্থা-অনাস্থারাজিকে ততোধিক ভ্রান্ত-যুক্তিতর্কের দ্বারা রক্ষা করার কার্যে অবতীর্ণ হন এবং যেটার সমর্থনে আদৌ কোন যুক্তি উপস্থিত করা যায় না সেটার নতুন ব্যাখ্যায় মনোযোগ দেন।’ (কবীর চৌধুরী ১৯৭১: পাঁচ-ছয়) অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর মতে হবীবুল্লাহ বাহার বাংলার মুসলমান সমাজের এই দ্বন্দ্বমুখর যুগেরই সন্তান। তাঁহার মন্তব্য যদি ভুল না হইয়া থাকে তবে, ‘তাঁর জীবনেও তাই এ-দ্বন্দ্বের পুরোপুরি সমাবেশ দেখতে পাওয়া যায়।’

ChowdhuryHabibullahBahar (190x243) (2) (190x243)

হবীবুল্লাহ বাহার

আমাদের জানিতে হইবে এই দ্বন্দ্বের প্রকাশটা কি দাঁড়াইয়াছিল? কি দাঁড়াইয়াছিল ইহার ফলাফলই বা? এই দ্বন্দ্ব হইতে পরিত্রাণ লাভের আর কি পথ খোলা ছিল? মনে রাখিতে হইবে মানুষ ইতিহাস গড়ে, তবে ‘যাচ্ছেতাই’ বলিয়া কোন ইতিহাস নাই। ইতিহাস গড়িতে হয় অতীত হইতে সরাসরি বা আড়াআড়ি পাওয়া মৌরসী বিধি অনুসারে।

হবীবুল্লাহ বাহার জন্মিয়াছিলেন যে যুগে তাহাকে–আরো ভাল কোন পদের অভাবে–বলা যায় বাংলার মুসলমান জাগরণের দ্বিতীয় যুগ। মানে মুসলমান সমাজে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গঠন যুগ। এই যুগেও প্রথম যুগের দ্বন্দ্ববিরোধ সমস্ত শেষ হইয়া যায় নাই, নতুন চেহারা লইয়াছিল মাত্র। কবীর চৌধুরী লিখিয়াছেন, ‘নির্জলা ইংরেজি স্কুলে বিদ্যার্জনের ব্যাপারটাও তখন পর্যন্ত মুসলিম সমাজ মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি। নিউ স্কীম মাদ্রাসার জনপ্রিয়তার এটাই ছিল কারণ। কাজী নজরুল ইসলামের মতো জনপ্রিয় এবং অনন্য প্রতিভাবান কবিকে নির্ভয়ে কাফের ফতোয়া দেয়ার মত আলেম এবং তাদের শিষ্য ও ভক্তের সংখ্যা তখন অসংখ্য।’ (কবীর চৌধুরী, ঐ, সাত)

হবীবুল্লাহ বাহার সেই দিনে ছিলেন নজরুল ইসলামের দলে। তিনি নিজেকে নজরুল ইসলামের ভক্ত-শিষ্য কিংবা অনুরাগী বলিয়া প্রকাশ করিতে কুণ্ঠিত হন নাই। একবার তিনি নিজের পারিবারিক সমস্ত সম্পত্তি নজরুল ইসলামের নামে লিখিয়া পড়িয়া দিতে পর্যন্ত চাহিয়াছিলেন। এই সত্যের অন্যতম সাক্ষী বেগম সুফিয়া কামাল। তিনি লিখিয়াছেন: ‘মরহুম হবীবুল্লাহ বাহারের (বাহার ভাইয়ের) সাথে আমার পরিচয় ১৯২৭ সনে। আমরা তখন কলিকাতায় ভাড়াটিয়া বাড়ীতে থাকি। একদিন দুপুর বেলা বাড়ীতে পুরুষ কেউ নেই, কলেজে-অফিসে সকলে চলে গেছেন, আমি ও আমার আম্মা বাড়ীতে ছিলাম। হঠাৎ সুফিয়া সুফিয়া ডাক শুনে বসবার ঘরে এসে দেখি, বাহার ভাই এসেছেন–উস্কো-খুস্কো চুল, অস্থির ভাব, ভয়ানক উত্তেজিত। কী ব্যাপার জিজ্ঞাসা করতেই তিনি বললেন, কাজীদাকে আমার তামাকুমুন্ডির যা সম্পত্তি আছে সে সব লিখে দিতে ইচ্ছে করেছি, তুমি আর নাহার থাকবে তাতে সাক্ষী হয়ে।’ (সুফিয়া কামাল ১৩৭৭: ৬১)

ইহা ছিল তাঁহার সাংগঠনিক প্রতিভার একদিক মাত্র। তবে বাহারের সাংগঠনিক প্রতিভা শুদ্ধ নজরুল ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ ছিল না। ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’ এবং ‘পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’ প্রভৃতি অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ‘বুলবুল’ পত্রিকা এবং প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান তাঁর সাংগঠনিক প্রতিভার সাক্ষী। কবীর চৌধুরীর মতানুসারে, ‘মুসলিম সমাজে চিন্তার মুক্তি আন্দোলনে বা আনয়নে “বুলবুল” পত্রিকার অবদানকে ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র “শিখা”র অবদানের সাথে তুলনা করা যায়।’

একটা জায়গায় অবশ্য তিনি নজরুল ইসলামকেও ছাড়াইয়া গিয়াছিলেন। সেই জায়গার অপর নাম রাজনীতি। হবীবুল্লাহ বাহারের একপ্রস্ত পূর্ণাঙ্গ জীবনকাহিনী আজও লেখা হয় নাই। আবু জাফর শামসুদ্দীন সান্তনাস্বরূপ একটা ছোট বই ছাপাইয়াছেন। তাহাতে একটি মন্তব্য পাইলাম। বুঝা যাইতেছে শামসুদ্দীন সাহেব বাহারের রাজনীতির সহিত ষোল আনা একমত নহেন। তিনি লিখিয়াছেন: ‘সাহিত্যিক বাহার সাহেব ছিলেন তাঁর গুরু কাজী নজরুল ইসলামের মতোই রোমান্টিক। রাজনীতিতে গভীরভাবে প্রবেশ করার পরেও তিনি স্বপ্নবিলাস এবং রূঢ় বাস্তবতার দোদুল্যমানতা হতে মুক্ত হতে পারেন নি।’ (শামসুদ্দীন ১৯৮৭: ৪৫)

আবু জাফর শামসুদ্দীনের এই তির্যক মন্তব্যের উপলক্ষ্য হবীবুল্লাহ বাহারের মুসলিম লীগ রাজনীতি। শামসুদ্দীন লিখিতেছেন, ‘বাহার সাহেব শুধু সাহিত্যিক সাংবাদিক ছিলেন না; ছিলেন একজন সুদক্ষ বাগ্মী। ইংরেজী বাংলা উর্দু ভাষায় তিনি ঘণ্টার পর ঘন্টা বক্তৃতা দিতে পারতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রসালো গল্প করেও মজলিসকে রাখতে পারতেন সম্মোহিত। তাঁর স্মরণশক্তিও ছিল বিস্ময়কর। গল্প ও বক্তৃতার মাঝে মাঝে তিনি বিস্মৃত ইতিহাস হতে নজীর দিতে পারতেন। তাঁকে কলকাতার বিদগ্ধ মহল “গল্প-এ-আজম” পদবী দিয়েছিলেন। আপন গুণেই বাহার মুসলিম লীগের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি হয়ে উঠেন। ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগের লক্ষৌ অধিবেশনে প্রদত্ত বাহার সাহেবের বক্তৃতা মি. জিন্নাহর প্রশংসা অর্জন করে।’ (শামসুদ্দীন ১৯৮৭: ৪৫-৪৬)

হবীবুল্লাহ বাহার ১৯৩৭ সালের ডিসেম্বর মাসে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য নির্বাচিত হইলেন। হবীবুল্লাহ বাহার কেন মুসলিম লীগে যোগ হইলেন তাহার পেছনের কথা ব্যাখ্যা করিবার কোশেস করিয়াছেন আবু জাফর শামসুদ্দীন। তিনি লিখিয়াছেন, ‘রাউন্ড টেবল কনফারেন্সের ব্যর্থতার পর বৃটিশ সরকার ঘোষিত সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ, পৃথক নির্বাচন, আসন সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রভৃতির ভিত্তিতে রচিত ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন ভারতীয় রাজনীতির মোড় সম্পূর্ণরূপে ঘুরিয়ে দেয়। বৃটিশ সরকারের ‘ভাগ করো ও শাসন করো নীতি’ পুরোপুরি সফল হয়। বৃটিশ সরকার বুঝেছিলেন যে, যদি ভারত ছেড়ে যেতেই হয়, তাহলে তার আগে এমন ব্যবস্থা করে যেতে হবে, যাতে ঐক্যবদ্ধ ভারত কখনও সাম্রাজ্যবাদের মুনাফার বাজারে সাংঘাতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে না পারে। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন ছিল সেই ষড়যন্ত্রেরই ভূমিকা বা ফাঁদ।’

ফাঁদ কেন? আবু জাফর শামসুদ্দীন লিখিতেছেন, ‘পৃথক নির্বাচন, সংরক্ষিত আসন প্রভৃতির ভিত্তিতেই যে রাজনীতি করতে হবে সেখানে যারা সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করতে চান তাদের পৃথক পৃথক পথ বেছে নিতেই হবে। মিঃ জিন্নাহ বিলেতে স্বনির্বাচিত নির্বাসন ছেড়ে ভারতে প্রত্যাবর্তন করলেন, নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভাপতিরূপে ভারত সফর করতে শুরু করলেন, মুসলিম লীগের প্লাটফরমে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আসন্ন নির্বাচনে মুসলিম সমাজকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বললেন। নির্বাচনের আগে স্ব-সৃষ্ট কৃষক প্রজা পার্টির হয়ে এবং অধিকাংশ মুসলিম আসনে জয়লাভ করার পর এ.কে. ফজলুল হক নিজেই মুসলিম লীগে যোগ দিলেন এবং হলেন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট।’ (শামসুদ্দীন ১৯৮৭: ৪৫)

তিনি কেন মুসলিম লীগে যোগ দিলেন এই প্রশ্নের একটা উত্তর হবীবুল্লাহ বাহার নিজেও দেওয়ার চেষ্টা করিয়াছিলেন। তাহা শোনা আমাদের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। আমার ভয় হইতেছে, আবু জাফর শামসুদ্দীনের মতন আরো অনেকেই এই কর্তব্যটা সঠিক পালন করেন নাই। ব্যতিক্রমের মধ্যে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। আনিসুজ্জামান জানাইতেছেন–হবীবুল্লাহ বাহার ‘মুসলমানের ব্যাপক জাগরণ কামনা করিয়াছিলেন–রাজনীতির ক্ষেত্রে, জ্ঞানের ক্ষেত্রে, ব্যক্তিগত বিচারবুদ্ধি প্রয়োগের ক্ষেত্রে।’ (আনিসুজ্জামান ১৩৭৭: ২১৪) এই কামনার কোপে–অথবা আনিসুজ্জামানের ভাষায় ‘এই বোধ থেকেই’–তিনি মুসলিম লীগের অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান দাবির দিকে ঝুঁকিয়াছিলেন।

১৯৪১ সালে হবীবুল্লাহ বাহার ‘পাকিস্তান’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। সেই বইয়ে পাকিস্তান দাবির পক্ষে তিনি যে সকল তথ্যপ্রমাণ উপস্থিত করেন সেইগুলি এখনও পর্যন্ত কেহ বস্তুনিষ্ঠ বিচারে বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খণ্ডন করেন নাই। আবু জাফর শামসুদ্দীন সে প্রশ্ন তোলেনই নাই। সুখের মধ্যে, আনিসুজ্জামান বাহার যুক্তির সারবত্তা প্রকারান্তরে স্বীকার করিয়া লইয়াছেন।

হবীবুল্লাহ বাহার লিখিয়াছেন: ‘অনেকেই প্রচার করে থাকেন মুসলমান নেতারা সরকারের ইঙ্গিতেই স্বতন্ত্র নির্বাচনের দাবী উপস্থিত করেছিলেন। এমন কি মোহাম্মদ আলী পর্যন্ত আগা খাঁ ডেপুটেশানকে অভিহিত করেছেন Command performance [কমান্ড পারফর্মেন্স অর্থাৎ কর্তার ইচ্ছায় কর্ম–সলিমুল্লাহ খান] বলে। কিন্তু একথা তাঁরা ভুলে যান, স্বতন্ত্র নির্বাচনের প্রচলন একদিনে হয়নি। নানা পরীক্ষার ভিতর দিয়ে ধীরে ধীরে এই প্রথা দেশের জীবনে শিকড় গেড়েছে। ১৮৯২ সনের আইনে যুক্ত-নির্বাচনের নীতিই প্রচলিত হয়েছিল। এমন কি ১৯০৯ সনের আইনেও স্বতন্ত্র নির্বাচন সোজাসুজি গৃহীত হয়নি। এই আইনের প্রবর্তকদেরও প্রবণতা ছিল যুক্ত-নির্বাচনের দিকে।’

তিনি আরো গিয়াছেন: ‘একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দেই। মর্লি-মিণ্টো সংস্কারে মুসলমানদের সংখ্যাতিরিক্ত আসন দেওয়ার নীতি স্বীকৃত হয়েছিল। এই নীতি অনুসারে বাংলা দেশের ব্যবস্থাপক সভায় সাধারণ নির্বাচকমণ্ডলীতে মুসলমানদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবার অধিকার ছিল। অধিকন্তু বাঙ্গলার পাঁচটি বিশেষ মুসলিম আসন নির্দিষ্ট হয়েছিল স্বতন্ত্র নির্বাচনের ভিত্তিতে। লর্ড মর্লি আশা করেছিলেন বাংলা দেশের সাধারণ নির্বাচকমণ্ডলী থেকে জনসংখ্যা অনুপাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সদস্য নির্বাচিত হবে। তা ছাড়া স্বতন্ত্র নির্বাচনের ভিত্তিতে পাঁচটি আসন হবে সংখ্যাতিরিক্ত আসন–in excess of their numerical strength. অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় একজন দোর্দণ্ডপ্রতাপ জমিদার ছাড়া মুসলিম নেতাদের কেহই সাধারণ নির্বাচকমণ্ডলী থেকে নির্বাচিত হতে পারেননি। এককথায় বলতে গেলে মর্লি-মিণ্টো শাসন-সংস্কারে স্বতন্ত্র নির্বাচনের ‘সংখ্যাতিরিক্ত’ আসনগুলোই ছিল সেকালে মুসলমানদের একমাত্র আশ্রয়স্থল। শুধু মর্লি-মিণ্টো শাসন-সংস্কার কেন, মন্টেগো-চেমসফোর্ড শাসনবিধিতেও যুক্ত-নির্বাচনের আসনগুলির একই অবস্থা দেখতে পাই। দিল্লীর যুক্ত-নির্বাচনের আসনের প্রতিযোগিতায় স্বরাজ্যদলভুক্ত জাতীয়তাবাদী ব্যারিষ্টার মিঃ আসফ আলীর অখ্যাতনামা হিন্দু উকিলের হাতে পরাজয় ইতিহাসের অন্তর্গত হওয়ার উপযুক্ত।’

তাই হবীবুল্লাহর সিদ্ধান্ত: ‘স্বতন্ত্র নির্বাচনকে মুসলমানের সাম্প্রদায়িকতা ও সরকারের উসকানির ফল বলে যাঁরা মনে করেন তাঁহাদের দৃষ্টি উপরে উল্লিখিত তথ্যগুলির দিকে আকৃষ্ট হওয়া উচিত। ১৮৯২ সনের আইন ও মর্লি-মিণ্টো শাসনবিধির নির্বাচনে হিন্দুসমাজ যদি মুসলিম প্রার্থীদের প্রতি এরূপ অপ্রেমের পরিচয় না দিতেন, ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস হয়ত অন্যভাবে লিখিত হত।’ (হবীবুল্লাহ বাহার ১৯৭১: ১৭৯-১৮০)

আনিসুজ্জামান এই বিশ্লেষণের অর্থ গ্রহণ করিয়া বলিয়াছেন: ‘পাকিস্তান আন্দোলনের ইতিহাস যারা আওরঙ্গজেবের সময় বা মুজাদ্দেদে আলফে সানীর সময় থেকে শুরু করার পক্ষপাতী, কথাটা তাদের ভেবে দেখবার যোগ্য। ‘পাকিস্তান’ লেখকের মতে ১৮৯২ থেকে ১৯৩১-এর মধ্যে হিন্দু মুসলমান মিলন প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হল বলে বাধ্য হয়েই স্বাতন্ত্র্যের এই পথ নিতে হল ভারতের মুসলমানকে।’ (আনিসুজ্জামান ১৩৭৭: ২১৫-১৬)

পাকিস্তান দাবির পক্ষে হবীবুল্লাহ বাহারের আরও একটি যুক্তি ছিল। এই যুক্তিটির উল্লেখ করিয়াছেন বসুধা চক্রবর্তী। মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জাগরণ যখন হইতেছে তখন চিন্তার একটা ধারার নাম দাঁড়াইয়াছিল ‘প্যান-ইসলামিজম’। হবীবুল্লাহ বাহারের ‘পাকিস্তান’ সেই ধারা অতিক্রমের চেষ্টা বলেই মনে করেন বসুধা চক্রবর্তী। তিনি লিখিয়াছেন: ‘পরাধীন জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের অধীর মুহূর্তে এমন কারও রাজনীতিকে এড়াবার উপায় ছিল না, যার প্রাণ একেবারে নিঃসাড় হয়ে যায়নি। জীবনকে ভালবাসা যখন স্বদেশকে ভালবাসায় প্রসারিত হয়, তখন আর তাতে কোন খাদ থাকে না, অনাবিল আদর্শবাদে তখন তা রূপ পরিগ্রহ করে। বাহার সাহেবকে তা বিচিত্র কর্মিষ্ঠতায় ডেকে নিয়েছিল আর তাঁর “বুলবুল” পত্রিকা হয়েছিল মুক্ত বুদ্ধির আধার ও আশ্রয়; কোনো দ্বিধা, কোনো সংস্কার, বা বাধানিষেধ সেখানে কোন বিষয় বিচারকে বিড়ম্বিত করেনি। “বুলবুল” এর পাতায় ঘটেছিলো জীবনের সঙ্গে অকুণ্ঠ মোকাবিলা।’

বসুধা চক্রবর্তী আরো গিয়াছেন। তাঁহার মতে: ‘কিন্তু মুক্তবুদ্ধি দিয়ে সব বিষয়ের মোকাবিলা করলেই সবকিছু সহজ হওয়ার উপায় নেই; অনেক সময়ে মুক্তবুদ্ধি প্রয়োগেই একটা সমস্যা হয়ে পড়ে। তাই যখন বেসুরো কিছু সামনে এসে দাঁড়াতো বাহার সাহেব তখন তার মধ্যে যেটুকু ভাল, যেটুকু সুসংগত তার উপর জোর দিয়ে নিজের মানসিক সামঞ্জস্য ফিরে পাবার চেষ্টা করতেন। এলো দেশে বিষম সাম্প্রদায়িক বিভেদ–ফলে স্বাতন্ত্রধর্মী রাজনীতি। বিভেদ কারোরই স্বাভাবিক কাম্য নয়। বিভেদ ভিত্তিক স্বাতন্ত্র্যও বাঞ্ছনীয় নয়। তবু তা যখন এলো, হবীবুল্লাহ বাহার তার মধ্যেও তাকে পেরিয়ে যেটুকু ভালো, যেটুকু প্রীতিকর, যেটুকু আশাপ্রদ তাকেই আঁকড়ে ধরলেন। তিনি জোর দিলেন একথার উপর যে, ভারতীয় মুসলমানের পাকিস্তান আন্দোলন প্যান ইসলামিজম থেকে তার মুখ ফিরিয়ে দেশের ভিতরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়েছে। খিলাফত আন্দোলন ও যে জাতীয় অন্যান্য আন্দোলনের পরিবেশে তার যে এক্সট্রা-টেরিটরিয়েল দৃষ্টি ও আনুগত্য প্রবল ছিল তা দূর করে দেশের ভিতরে তার ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সংকল্প যুগিয়েছে। স্বাতন্ত্র্যধর্মী রাজনীতির সঙ্গে স্বদেশপ্রেমের সমন্বয় হবীবুল্লাহ বাহার এমনি করেই খুঁজে পেয়েছিলেন।’ (বসুধা চক্রবর্তী ১৩৭৭: ৫৮-৫৯)

বাঙ্গালি মুসলমানের জাগরণের তৃতীয় যুগ (অর্থাৎ বাংলাদেশের মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দ্বিতীয় যুগ) শুরু হইল ১৯৪৭ সনের পর। এই যুগে হবীবুল্লাহ বাহার পরাজিত হইয়াছিলেন। তাহার একটি প্রকাশ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে দেখা যায়। আর একই মুদ্রারই অপর পিঠ দেখা যায় সাম্প্রদায়িক অত্যাচার অবিচারের নবপর্যায়ে। এই পর্যায়ে হবীবুল্লাহ বাহারকে তাঁহার নিজ দল ও নিজ সরকারের বিরুদ্ধেও দাঁড়াইতে হইয়াছিল। হয়ত পরোক্ষে। এমন অবস্থায় তিনি প্রবল রোগের কাছে পরাজিত হইলেন। তখন তিনি ৪৬ বছর বয়সে পা দিয়াছেন মাত্র।

পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর হবীবুল্লাহ বাহার পূর্ববাংলা সরকারের মন্ত্রীত্ব লাভ করিয়াছিলেন। মন্ত্রীত্বটা তিনি খুব নির্বিঘ্নে লাভ করিয়াছিলেন এমনও নহে। এই বিষয়ে প্রভাস চন্দ্র লাহিড়ীর বিবরণ এই রকম: ‘পূর্ববঙ্গের প্রথম মন্ত্রীসভা গঠন করেন খাজা নাজিমউদ্দিন সাহেব। পাকিস্তান সৃষ্টির সংগ্রামে যাঁকে সত্যিকারের ফিল্ড-মার্শাল আখ্যা দেওয়া যেতে পারে, সেই সুরাবর্দ্দী সাহেব পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হতে পারলেন না–মুখ্যমন্ত্রী হন খাজা নাজিমউদ্দিন। তিনি তাঁর প্রথম মন্ত্রীসভাতে হিন্দুদের সম্পর্কে নরমপন্থী কোনো মুসলিম লীগ সদস্যকেই প্রথমতঃ নেন নি। এ্যাসেম্বলির প্রথম অধিবেশনে তিন দিন পর্যন্ত মুসলিম লীগের বেশ কিছু সংখ্যক সদস্যদের বিরোধিতায় মোটেই কাজ চালাতে পারেননি তিনি। কায়েদ-ই-আজম (আমার মতে পাকিস্তান সংগ্রামের ‘অ্যাটর্নি জেনারেল’) মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কাছে জরুরী বার্তা (S.O.S.) পাঠান নাজিমউদ্দিন সাহেব। জিন্নাহ সাহেব ঢাকায় এসে একটা আপোস মীমাংসা করে দেন। আপোসের ফলে জনাব হবীবুল্লাহ্ বাহার, ডাঃ এ. এম. মালেক, জনাব তোফাজ্জল আলী–নাজিমউদ্দিন সাহেবের মন্ত্রীসভায় স্থান পান এবং অপর বিরোধী সদস্য জনাব মোহাম্মদ আলী (বগুড়ার) বার্মায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন। বাহার সাহেব জন-স্বাস্থ্য দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হন।’ (প্রভাস চন্দ্র লাহিড়ী ১৩৭৭: ৩৪-৩৫)

১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৪

 

দোহাই

১.             কবীর চৌধুরী, ‘ভূমিকা’, হবীবুল্লাহ বাহার রচনাবলী (ঢাকা: বাঙলা একাডেমী, ১৯৭১), পৃ. পাঁচ-আট।২.             বেগম সুফিয়া কামাল, ‘বাহার ভাই’, আনোয়ারা বাহার চৌধুরী ও শওকত ওসমান সম্পাদিত, হবীবুল্লাহ বাহার (ঢাকা: বাহার স্মৃতি কমিটি, ১৩৭৭ (১৯৭০), পৃ. ৬১-৬৪।
৩.            আবু জাফর শামসুদ্দীন, হবীবুল্লাহ বাহার (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৮৭)।
৪.             আনিসুজ্জামান, ‘হবীবুল্লাহ বাহার: শ্রদ্ধাঞ্জলি’, আনোয়ারা বাহার চৌধুরী ও শওকত ওসমান সম্পাদিত, ঐ, পৃ. ২১২-২১৬।
৫.             বসুধা চক্রবর্তী, ‘স্মরণ’, আনোয়ারা বাহার চৌধুরী ও শওকত ওসমান সম্পাদিত, ঐ, পৃ. ৫৮-৬০।৬.            প্রভাস চন্দ্র লাহিড়ী, ‘হবীবুল্লাহ্ বাহার স্মরণে’, আনোয়ারা বাহার চৌধুরী ও শওকত ওসমান সম্পাদিত, ঐ, পৃ. ৩৪-৩৫।