Tag Archives: মাটির ময়না

আমার বন্ধু তারেক মাসুদ

‘I have not purchased my freedom through writing.’

– Franz Kafka, 1922

‘লেখার বিনিময়ে আমি আমার স্বাধীনতা কিনিয়া রাখি নাই।’

–ফ্রান্স কাফকা, ১৯২২

তারেক মাসুদের এন্তেকালের পরদিন সকালে উঠিয়া ‘আমার শিক্ষক তারেক মাসুদ’ নাম দিয়া একটি লেখা লিখিয়াছিলাম। আজকের লেখাটির নাম সামান্য বদলাইয়া রাখিলাম ‘আমার বন্ধু তারেক মাসুদ’। যিনি শিক্ষক তিনিই বন্ধু। আমার শিক্ষকের কথা এক নিবন্ধে শেষ করিতে পারি নাই। এখানে কিছু উদ্বৃত্ত কথা বলিব। কথা আরও থাকিলে পরে বলিব। আর উপায় কি?

তারেক মাসুদ, সলিমুল্লাহ খান ও আলম খোরশেদ [tarequemasud.org থেকে নেওয়া]

তারেক মাসুদ, সলিমুল্লাহ খান ও আলম খোরশেদ [tarequemasud.org থেকে নেওয়া]

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দশকে পড়িতে আসিয়াছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আসিয়া যে কয়জন গুণীর দেখা পাইয়াছিলাম তাঁহাদের মধ্যে তারেক মাসুদ স্থান ছিলেন সমুখে, প্রথম সারিতে। তিনি বলিয়াছিলেন চলচ্চিত্র করিবেন। আর আমি শুরুতেই এক প্রকার ধরিয়া লইয়াছিলাম নাম করিবেন। তিনি আমাকে নিরাশ করেন নাই। তারেক মাসুদের সাধনা বিফলে যায় নাই। তিনি শুদ্ধ নামই করেন নাই, তাহার মানও হইয়াছে। শুদ্ধ পুরস্কারই পাইয়াছেন এমত নহে, সত্যকার মহত্ত্বও তিনি অর্জন করিয়াছেন। তাঁহার ছবি সমাদৃত হইয়াছে, আর্থিক অনটনের কঠোর কশাঘাতে তাহাকে শেষ পর্যন্ত জর্জরিত থাকিতে হয় নাই।

আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইয়াছি। কিছুদিন হয় দেশে একটা দুর্ভিক্ষ, বেশ কয়েকটা রক্তঝরা অভ্যুত্থান ঘটিয়া গিয়াছে। দেশ স্বাধীন হইবার পাঁচ-ছয় বৎসর পরের কথা। দেশের ভবিষ্যত লইয়া নানান জল্পনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সমুখে শরিফ মিয়ার ক্যান্টিন বলিয়া একটি পরম রমণীয় খাবারের দোকান ছিল সেই সময়। সেখানেই একদিন দেখা তারেক মাসুদের সঙ্গে। পরিচয়স্বরূপ জানিলাম তিনি একাধারে ইতিহাস বিভাগ আর অন্যদিকে লেখক শিবিরে দাখেল হইয়াছেন। তখন লেখক শিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় আরো ছিলেন পিয়াস করিম। মোহন রায়হান ঢাকা কলেজের ছাত্র। তাঁহার প্রথম কেতাব ‘জ্বলে উঠি সাহসী মানুষ’ পহিলা ছাপা হইয়াছিল বাঙলাদেশ লেখক শিবিরের পতাকাতলে।

আমি লেখক শিবিরের ছায়াতলে কখনও ভিড়িবার জায়গা পাই নাই। তারেক আর মোহনের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই আমার পরিচয় ঘটে মহাত্মা আহমদ ছফার সহিত। হয়ত সেই কারণেই। লেখক শিবিরের ইতিহাস আহমদ ছফার মুখে কিছু শুনিয়াছিলাম। তাহাতেই আমার উৎসাহে ভাটা পড়ে। ছফা জানাইয়াছিলেন তিনিও ছিলেন লেখক শিবিরের আদিকালীন উদ্যোক্তাদের দলে। আদিকাল মানে বাংলাদেশ স্বাধীন হইবার আগের কাল। ঐসময় যাঁহারা ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’ প্রতিষ্ঠাকর্মটিকে মোটেও সুনজরে দেখেন নাই–বরং প্রকারান্তরে প্রতিকুলতা করিয়াছিলেন, স্বাধীনদেশে তাঁহারাই শিবিরটি দখল করিয়া লইলেন আর প্রতিষ্ঠাতাদের দিলেন বাহির করিয়া। এরকম জীবিত অন্যায়ের খবর জানিয়াশুনিয়া কি করিয়া সেই শিবিরে যোগ দিই!

একটুখানি পিছনের কথা না বলিলে ভুল ধারণা হইতে পারে। দেশ স্বাধীন হইবার পর যাহারা সরকারি দল কিংবা খোদ সরকারেরই গরিব আত্মীয় শ্রেণীর বা দুই নম্বর দল করিতেন না তাহাদের আশ্রয়স্থল হয় লেখক শিবির নামা প্রতিষ্ঠানটি। ‘প্রতিষ্ঠান’ না বলিয়া ইহাকে ‘অনুষ্ঠান’ বলিলে অন্যায় হয় না। ১৯৭১ সালের গোড়ায় রক্তঝরা সংগ্রামের দিনে গঠিত হইয়াছিল ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’। তার আগে ১৯৬০ সালের যুগে পাকিস্তান সরকারের আজ্ঞাবহ মধ্যম শ্রেণীর লেখকরা ভিড়িয়াছিলেন পাকিস্তান লেখক সংঘ নামা সরকারি শিবিরে। অনেকের মনে আছে দেশ স্বাধীনের আগে এই দলের ছাত্র শাখাটির নাম ‘ইসলামী ছাত্র সংঘ’ ছিল। লেখক শিবিরের আগুনটুকু চুরি করিয়া স্বাধীন বাংলাদেশে ইহারা ‘ইসলামী ছাত্র শিবির’ নাম গ্রহণ করেন। আহমদ ছফা বলিতেন জামায়াত আমাদের নামটা ‘হাইজ্যাক’ করিয়াছে।

জানিতে পারিলাম নতুন লেখক শিবির হইতে আহমদ ছফা বিদায় হইয়াছেন। বদরুদ্দীন উমর সমুখে আসিয়াছেন। শিবিরের কয়েকজন কর্মকর্তা সেযুগে সরকারি কাগজ ‘বিচিত্রা’ ও ‘দৈনিক বাংলা’য় কাজ করিতেন। কেমন জানি তালগোল লাগিয়া গেল আমার মনে। এই মহাত্মারা আহমদ ছফার নামটি পর্যন্ত শুনিতে রাজি ছিলেন না। কালের প্রহারে ইঁহারা এতদিনে অনেক সরকারের সেবা করিয়া লইয়াছেন। বর্তমান সরকারও ব্যতিক্রম নহে। তারেক মাসুদকে এই দলের মধ্যে দেখিয়া আমার মনে একটি অঙ্কুশ বিন্ধিয়াই রহিল।

এই সময়ে কোথা হইতে জানি শেখ মোহাম্মদ ওরফে এস এম সুলতান ঢাকায় আবির্ভূত হইলেন। সুলতানকে ঢাকা শহরের মধ্যম শ্রেণীর চিত্রশিল্পীরা বড় সুনজরে দেখিতেন না। তাঁহাদের নজরকে উচিত শিক্ষা দিবার মহান উদ্দেশ্যে আহমদ ছফা সেই সময় ‘অভিনব উদ্ভাসন’ নামে একটি নীতিদীর্ঘ প্রবন্ধ রচিয়া ফেলিলেন। ১৯৭৭ ইংরেজি পার হইতেছে। আহমদ ছফার প্রবন্ধটি কতজনের মতামত বদলাইল তাহার কোন জরিপ হয় নাই। তবে অন্তত একজনের মতামত তাহাতে বদলাইয়াছিল জানি। তিনি তারেক মাসুদ। আহমদ ছফার লেখা পড়িয়া তিনি সুলতান আবিষ্কার করিলেন।

আর অনেক আগেই চলচ্চিত্রকে জীবনের ধ্রুবতারা ঘোষণা করিয়াছিলেন তারেক মাসুদ। সেখানে আসিয়া দাঁড়াইলেন ‘কালপুরুষ’ এস এম সুলতান। তাঁহার ছবি লইয়া চলন্ত ছবি বানাইবেন তিনি। নাম রাখিলেন কোমল শব্দে ‘আদমসুরত’। যাহারা এই ছবি দেখিবেন তাহারা এই আরবি-ফারসি নামটা খুব পছন্দ করিবেন ভাবিয়া নাম রাখেন নাই তিনি। উঠন্তি মুলো পত্তনেই চিনা গিয়াছিল। শুদ্ধ উচ্চাভিলাষ নহে, দৃঢ়চেতনাও তারেক মাসুদের আরেক নাম। ‘আদমসুরত’ তারেকের পহিলা সৃষ্টি। আমরা কথায় কথায় ‘আটপৌরে জীবন’ কথাটা বলিয়া থাকি। আটপৌরে কথাটার সংস্কৃত ‘অষ্টপ্রহর’ বা আট পাহারা। এস এম সুলতানের জীবনকে দিনের আট পাহারা আবর্তনের মধ্যে ধরিয়াছিলেন তারেক মাসুদ। সকাল দুপুর, সন্ধ্যা রাত্রি নিশীথ প্রভাত–এইভাবে তিনি একটি গানের মতো বাঁধিলেন শিল্পীর জীবনবৃত্ত–তাঁহার আট পাহারা।

এই ছবির মূল পদার্থ বাহির করিবার জন্য তারেক মাসুদ ও তাহার বন্ধু মিশুক মুনীর পাকিস্তানে গিয়াছিলেন। কারণ সুলতানের জীবনবৃত্তের এক চাপ সেখানেই থাকিয়া গিয়াছিল। করাচি লাহোর ঘুরিয়া তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর সেই ছবির ছবি তুলিয়া আসিলেন। তৈরি করিলেন শিল্পীর জীবনবৃত্ত। ঢাকার কূপমণ্ডুক মধ্যম শ্রেণীর খাইয়া পরিয়া এহেন ছবিতে হাত দেওয়া সহজ কাজ ছিল না। তারেক মাসুদ এই অসাধ্য সাধন করিলেন। কি করিয়া করিলেন আজও ভাবিয়া শেষ করি নাই।

লেখক শিবিরের সভ্য হইয়াও আহমদ ছফাকে অপাংক্তেয় ভাবেন নাই তারেক মাসুদ। এখানেই তাঁহার বিশেষত্ব। এখানেই তাঁহার মহত্ত্ব। লেখক শিবিরের নেতাদের সততা সম্পর্কে আমি ছিলাম সন্দিহান। তাঁহারাও আমাকে দেখিলে চুম্বন কি আলিঙ্গন করিতেন না। তারপরও তারেক এই অভাজন সম্পাদিত একটি পত্রিকার কমিটিতে নাম লিখাইতে কুণ্ঠা করেন নাই। এইখানে তারেক মাসুদের বুদ্ধিমত্তা। আসলে ইতিহাস শিবির ছফা প্রাক্সিস কোন কিছুই তারেককে বাঁধিতে পারে নাই। তাঁহার গন্তব্য ছিল অন্য কোথাও, অন্য কোনখানে ছিল তাঁহার ঘরদুয়ার। আমরা ছিলাম তাঁহার পান্থপথ–বলা যাইতে পারে নিতান্ত সরাইখানা।

তারেকের সহিত পরিচয়ের দুগ্ধ একটুখানি ঘন হইয়া আসিলে একদিন জানিতে পারিলাম তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসিয়াছেন মাদ্রাসার পথ পার হইয়া। কি করিয়া তিনি কৌমি মাদ্রাসায় ঢুকিয়াছিলেন আর কি করিয়াই বা ঐ খাঁচা হইতে ছাড়া পাইলেন তাঁহার বয়ান তদীয় কাহিনীচিত্র ‘মাটির ময়না’ যোগে কিছু পাওয়া যাইবে। যে কায়দায় তিনি কৌমি মাদ্রাসা ছাড়িয়াছিলেন একদিন সেই কায়দায় তিনি লেখক শিবিরের খাঁচা হইতেও বাহির হইয়া গেলেন। প্রশ্ন হইল, গেলেন কোন জায়গায়? সেই জায়গাটার পরিচয় এখনও লই নাই।

এই জায়গাটার নামই কি ‘স্বাধীনতা ব্যবসায়’? ইংরেজি মতে যাহাকে বলে ‘লিবরেল’ তাহার গোড়ায় আছে লিবর বা স্বাধীন কথাটা। সেই গোড়ার রসুন হইতেই তৈরি হইয়াছে ‘লিবাটির্’, ‘লিবারেলিজম’ প্রভৃতি অমুক পদের। তাই বলি লিবারেলিজম বা লিবরের ব্যবসায় মানে বাংলায় দাঁড়ায় ‘স্বাধীনতা ব্যবসায়’। তারেক মাসুদের সম্মানে সত্য বলা কর্তব্য। তাই প্রশ্ন করিতে হয় তিনিও কি শেষের দিকে স্বাধীনতা ব্যবসায়ের পথই ধরিয়াছিলেন?

আজ এ প্রশ্নের উত্তর পুরা করা চলিবে না। কেহ কেহ বলেন তারেক মাসুদ যৌবনের অপরাহ্নে খানিক দক্ষিণে ঝুঁকিয়াছিলেন। সূর্যদেব যখন মকরক্রান্তির কাছাকাছি তখনও আমরা বলি তিনি দক্ষিণে ঝুঁকিয়াছেন। যৌবনের আদৌভাগে তারেক মাসুদের স্বপ্ন ছিল শিল্পীর স্বাধীনতা। এস এম সুলতানের জীবনবৃত্ত বানাইয়া তাঁহার স্বপ্ন ভাঙ্গিল না। একটা জিনিশ স্থির হইল কাহারও চাকরি করিবেন না তিনি । ‘স্বাধীনতা’ হইল তাহার বীজমন্ত্র। চাকরি করিলে স্বাধীনতা রক্ষা করা যায় না। আর স্বাধীনতা রক্ষা করিলে জীবনটা তরল পদার্থের মতন হইয়া যাইবে, যে পাত্রে রাখিবেন জীবন তাহার আকার ধারণ করিবে, আপনি হইবেন দশের মজুর।

১৯৮০ সাল হইতে যে দশকের শুরু তাহাতে অনেক বন্যাপ্লাবন ঘটিয়া গেল। শুরু হইল ধনতন্ত্রের নতুন বিজয়। এ সময় জীবিকার ডাকে তারেক মাসুদকেও হাত পাতিতে হইল নানান কিসিমের সাম্রাজ্যবাদী কি ধনিকবাদী সংস্থার দক্ষিণা বিভাগে। একদা এ দেশে ব্রিটিশ ধনতন্ত্র আসন গাড়িয়াছিল শুদ্ধ কৃষক সমাজকে রক্ষা করিবার অজুহাতে। এক্ষণে তাহারা আসিলেন নারীজাতির মুক্তিমন্ত্র মূলধন করিয়া। এই যুগে তারেক মাসুদ ‘সোনার বেড়ী’ নামে একটি বিজ্ঞাপন ছবিও বানাইয়াছিলেন। সেই ছবি দেখিবার দুর্ভাগ্য আমার হইয়াছিল মার্কিন মুলুকে। শিল্পী ও লেখকের দারিদ্র আমাদের সম্পূর্ণ অজানা জিনিস নহে। তারপরও আমি জানিতাম তারেক মাসুদ তাঁহার লক্ষ্য ছাড়িবেন না। তিনি লড়াই করিবেন।

muktir gaan

১৯৮৯ সালের আগেপরে কোন এক সময় তারেক মাসুদের মার্কিন মুলুকযাত্রা। সেখানে তাঁহার সহিত আমার বন্ধুত্ব অভিমানের দ্বিতীয় যুগ। আমি গিয়া পহুঁছিয়াছিলাম দুই কি তিন বছর আগে। তখন একে একে গিয়া জুটিয়াছিলেন আলম খোরশেদ, নাসির আলী মামুন। আর মাহমুদ হক নামে আমাদের আরেক বন্ধু আগে হইতেই ওখানে। সারা দুনিয়া জুড়িয়া তখন পট পরিবর্তনের হাওয়া বহিতেছে। দেশের স্বৈরশাসন হটাইবার জন্য মধ্যম শ্রেণীর নেতারা মধ্যে মধ্যে বিদেশ সফর করিতেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ততদিনে ইতিহাসের বিষয় হইয়া উঠিয়াছে। এই সময়ই তারেক মাসুদ তাঁহার ‘মুক্তির গান’ ছবিটি খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ হইতে যে সকল শরণার্থী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে আশ্রয় লইয়াছিলেন এই ছবি তাহাদের লইয়া। চিত্রগুলি গ্রহণ করিয়াছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হইতে সদলবলে উপনীত সাংবাদিক লিয়র লেবিন। এই দলিলচিত্রমণ্ডলী বা ফুটেজ আনুমানিক বিশ বছর ধরিয়া কোন বাড়ির গুদামঘরে হাজিয়া মজিয়া যাইতেছিল। তারেক সাধনাবলে এই খনি আবিষ্কার করিলেন। এই আবিষ্কার তারেক মাসুদের সেরা কীর্তির মধ্যে। সম্পাদনা করিয়া যে ছবি তিনি দাঁড় করাইলেন তাহাকে সম্পূর্ণ নতুন ছবি বলিতে হইবে। ছবির শুরুতে তিনি জহির রায়হান নির্মিত ‘স্টপ জেনোসাইড’ ছবির অংশবিশেষ কাজে লাগাইলেন আর শেষে কিছু অংশে গেরিলাযুদ্ধের অভিনয় জুড়িয়া দিলেন।

যে গানের দলটি শিবিরে শিবিরে উদ্দীপনাময় গান গাহিয়া দেশত্যাগী শরণার্থীদের (আর কখনও কখনও দেশের ভিতরে আসিয়া মুক্তিযোদ্ধা সৈনিকদের) সাহস যোগাইতেন তাঁহাদের অনেকের সহিতই তারেক মাসুদ পরিচিত ছিলেন। এমনকি তাঁহার পরিবারের সদস্যরাও ইহার মধ্যে জীবনধারণ বা চলাফেরা করিতেছেন। ফলে এই ছবির মূল্য দুই রকমই হইল তারেকের নিকট।

জার্মান দার্শনিক বাল্টার বেনিয়ামিন ছবি ও চলচ্চিত্রের দুই মূল্যের দুই নাম রাখিয়াছিলেন। এক মূল্য ছবিকে আর দশ পদার্থ হইতে আলাদা করে ও সম্ভ্রম জাগায়, দূরের হাতছানি এমনকি পবিত্রতার আমদানি ঘটায়। মার্কস কথিত পণ্যের ব্যবহার মূল্যের নকশা ধরিয়া বেনিয়ামিন ইহার নাম রাখিয়াছিলেন ছবির ‘ধর্মমূল্য’। দ্বিতীয় ধরনের মূল্য ছবিকে জনসাধারণের মধ্যে ছড়াইয়া দিবার মধ্যে। যন্ত্রবিজ্ঞানের দৌলতে একই ছবির লক্ষ লিপির ব্যবস্থা ছবিকে ‘গণতান্ত্রিক’ করিয়াছে। তবে কথা আছে, এই গণতন্ত্র বাজারে টিকিবার গণতন্ত্র। কার্ল মার্কস এই মূল্যের নাম রাখিয়াছিলেন পণ্যের ‘বিনিময় মূল্য’ বা দাম। বেনিয়ামিন ইহার নাম দিলেন শিল্পের ‘প্রদর্শন মূল্য’।

চলচ্চিত্রের ধর্ম ও প্রদর্শন–দুই মূল্য মূলধন করিয়া তারেক মাসুদ ছবিটি শেষ করিলেন ১৯৯৫ সাল নাগাদ। ছবি লইয়া ঢাকায় ফিরিবার আগে তিনি মার্কিনদেশে বিশেষ করিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী জনসাধারণের মধ্যে ছবিটির একাধিক প্রদর্শনী করেন। আমি বন্ধুতাভিমানের সুযোগ লইয়া–চলচ্চিত্রকারের অনুমতিক্রমে–দুইটা জায়গায় পরিবর্তনের প্রস্তাব করিয়াছিলাম।

তারেক মাসুদ নিজেই একটা কথা ঘন ঘন রাষ্ট্র করিতেন। কথাটা ইংরেজিতেই বলিতেন–‘ডকুফিকশন’। ‘মুক্তির গান’ ছিল তারেকের নিজ বিচারেই এক প্রকার ডকুফিকশন বা খবরকল্প কাহিনী। ইহাতেই তারেক মাসুদের পথ আমরা পরিষ্কার দেখিতে পাইলাম। একটা প্রশ্নের উত্তর আমরা আজও পাই নাই। বাংলাদেশ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করিয়া স্বাধীন হইয়াছে কিন্তু দেশের সমাজ কাঠাম আমূল বদলাইয়া যায় নাই। দেশে গণতন্ত্র কায়েম হয় নাই। কেন? ইহার উত্তর সন্ধান করিতে করিতে সেই সময় নাগাদ আমাদের শিক্ষক আহমদ ছফা ‘অলাতচক্র’ নামক কাহিনীটি লিখিয়াছিলেন। তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’ ছবিটি যেন অলাতচক্রেরই অপর পিঠ আকারে হাজির হইল।

‘অলাতচক্রে’ আহমদ ছফা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নানান সামাজিক শ্রেণীর ভূমিকা লইয়া বিচারসভা বসাইয়াছিলেন। আর আমি দেখিলাম ‘মুক্তির গান’ বানান হইল এমন কায়দায় যেখানে বাংলাদেশের জনগণের নহে, ঘোষিত হইল মধ্যম শ্রেণীর জয়। এক হিসাবে তারেক মাসুদ সত্য কথাই বলিয়াছেন। তাহার ছবি তো খবর নহে, খবরকল্প কাহিনী। আমি করজোড়ে বলিলাম কল্পাংশটা খানিক ছাঁটিয়া বা বদলাইয়া দিন । কিম্বা আহমদ ছফা যে জায়গা হইতে যুদ্ধ ও রাজনীতিকে যুক্ত করিয়াছেন তাহার কিছু অংশও থাকুক।

আহমদ ছফার পদতলে একদিন তারেকও বসিয়াছিলেন। তিনি জানিতেন কত ধানে কত চাউল। আহমদ ছফার পথ ধরা তাহার পক্ষে সহজ ছিল না। এখন পিছনে ফিরিয়া তাকাইলে বুঝি ‘মুক্তির গান’ ছবিটি প্রাণ হইতে গ্রহণ করিতে কেন পারি নাই। দুঃখের মধ্যে, তারেক মাসুদের সহিত আমার সম্পর্কটা ক্রমশ শিথিল হইতে, নিছক ধর্মমূল্য লইতে, দূরান্বয়ী হইতে শুরু করিল। এই দূরত্ব পারস্পরিক। অস্বীকার করিতে পারি নাই তারেক মাসুদ আমার পাঁচপ্রাণের বন্ধু, কিন্তু ‘মুক্তির গান’ ছবিটিও আমার বন্ধুর ছবি বলিয়া স্বীকার করিতে পারিতেছিলাম না। এই দশা ঈর্ষা করিবার দশা নহে।

‘মুক্তির গান’ ছবির অপূর্ণ বাসনা পূরণ করিতে তারেক পরে ‘মুক্তির কথা’ বানাইয়াছিলেন। আমাকে সেই মর্মে জবাবদিহিও করিয়াছিলেন তিনি। সৌভাগ্য হয় নাই ছবিটি দেখিবার। কিন্তু তাঁহার মহত্তম কীর্তি এখনও সম্মুখে পড়িয়া আছে বলিয়া বিশ্বাস করিতেন তারেক মাসুদ। ‘মাটির ময়না’ ছবিটি দেখিবার সৌভাগ্য আমার হইয়াছিল।

matirঅনেক কথা মনে নাই। একটি কথা মনে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হইবার পর কোন এক সময় তারেক মাসুদ বলিয়াছিলেন তিনি তাহার মাদ্রাসা জীবনের স্মৃতি বা অভিজ্ঞতা সম্বল করিয়া একপ্রস্ত ছবি বানাইবেন। ‘মুক্তির গান’ তাঁহাকে সেই জায়গায় পৌঁছাইয়া দিল যেখানে পৌঁছিলে আর পিছনে তাকাইতে হয় না। ‘মাটির ময়না’ সেই অমৃতের পুত্র–তারেক মাসুদের স্বপ্ন পূরণ হইল। ভারতবর্ষের নামজাদা চিত্রবিশারদ বাবা গাস্তঁ রোবের্জ বলিয়া ফেলিলেন এই ছবি সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’র সমান। অনু আর তাহার বোনের চরিত্র, অপু আর তাহার বোনের আদল পাইয়াছে। বোনের মৃত্যু দুই সংসারেই আগুন লাগিয়াছে। এই মৃত্যুকে–বোনের মৃত্যুকে– নানাভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

এক জায়গায় আসিয়া তারেক সত্যজিৎকেও অতিক্রম করিলেন। সত্যজিৎ রায় ভারতবর্ষের গ্রামীণ দারিদ্র ও ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে ‘পথের পাঁচালী’ বানাইয়াছিলেন ১৯২০ সালের যুগে লেখা এক কাহিনীর পিঠে পা রাখিয়া। তারেকের ঘটনার পট ১৯৬০ সালের দশক। পূর্ব বাংলার কোন এক গ্রাম। বাংলাদেশের গ্রামীণ দারিদ্র ও শোষণ তারেকের চোখে এসলাম ধর্মের অন্তর্গত দুই ধারার বিরোধ আকারে হাজির হইল। জনৈক কলিকাতাফেরত ইংরেজি শিক্ষিত বাঙ্গালি মুসলমান ভদ্রলোক তাহার ছেলেকে মাদ্রাসায় পড়িতে পাঠাইলেন। তিনি নিজে কিন্তু মাদ্রাসায় পড়েন নাই। ইংরেজি শিক্ষা বর্জন করিবার চিন্তা হইতেই তিনি মাদ্রাসা শিক্ষা আঁকড়াইয়া ধরিলেন। যে শিশুকে মাদ্রাসায় পাঠান হইল তাহার চোখেই ছবির বয়ান গড়িয়া উঠিয়াছে।

এমন সময় আসিল ‘স্বাধীনতার অকাল বোধন’–বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম। জাতীয় পরিচয়ের মুক্তিযুদ্ধ। মাদ্রাসা হইতে অনুরও মুক্তি হইল। এই মুক্তি প্রতীকী বা আকার হিসাবেও পড়িতে হইবে। আমি অন্তত সেইভাবেই পড়িয়াছি। তারেক মাসুদের মধ্যে আমি সেই মহান চলচ্চিত্রকারের খোঁজ পাইয়াছিলাম যাহাকে প্রশ্ন করা যায়, যাহার কাছে আরও শেখা যায়। তিনি আমাকে এই জায়গায় আর পড়াইতে রাজি হইলেন না। আমারও দুঃখের আর অবধি রহিল না।

প্রশ্ন করিয়াছিলাম বাংলা মুলুুকে এসলাম ধর্মের যে রূপকে তারেক মাসুদ কাঠগড়ায় দাঁড় করাইয়াছেন তাহার বিকল্প কি? মনে হইয়াছিল শিশু অনু যে গ্রাম্যমেলায় যাইতে চাহে, যে মাটির ময়না সে কিনিয়া আনে, যে ময়না কিনে বাবার ভয়ে লুকাইয়া রাখে তার মধ্যে সেই বিকল্প তারেক দেখিয়াছেন। ইহাকে কেহ কেহ নতুন গড়িয়া উঠা–মানে ১৯৪৭ সালের পরে গড়িয়া উঠা ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ বলিতে চাহিয়াছেন।

আমার জিজ্ঞাসাটা ছিল অন্য জায়গায়। মাদ্রাসা শিক্ষাই আমাদের সমস্ত অনুন্নতির মূল এই পরামর্শ কতখানি সৎ পরামর্শ? ইহার অর্থ কি এই নহে যে ইংরেজি শিক্ষার মধ্যেই আমাদের মুক্তির গান শোনা যাইবে। পরাধীনতার যুগ শেষ হইয়াও কেন শেষ হইতেছে না বাংলাদেশে? তাহাতে সমস্ত দোষ মাদ্রাসা শিক্ষার–এ কথা বলিলে আমরা অর্ধসত্য বলিবার দোষে দুষ্ট হই। পরাধীনতার বলে বলীয়ান নতুন মধ্যম শ্রেণীর হেজিমনি ওরফে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এই অর্ধসত্য বেশ কাজে লাগিবে এ কথা মিথ্যা নহে। কিন্তু শিল্পীর কাজ কি কেবল শাসক শ্রেণীর উপকরণ মূল্য যোগাইয়া যাওয়া?

বাংলাদেশের সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ধর্মবিশ্বাসে মুসলমান। তাহাদের মানসগঠনে এসলাম ধর্মের আগমন ঘটিবার পূর্বে যে পদার্থ ছিল এসলাম ধর্মও তাহা বিশেষ বদলাইতে পারে নাই। এই কথা নতুন করিয়া প্রচার করিয়াছিলেন মহাত্মা আহমদ ছফা। সে কথায় ইংরেজি ১৯৭৬ কিংবা ১৯৭৭ সালে আমরা কান দিয়াছিলাম। যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বদিকের রমনা ময়দানে প্রাতভ্রমণের সময় আহমদ ছফা আবুল ফজলের সাক্ষাৎ পাইলেন তখন তাঁহার মনে এই প্রস্তাবের জন্ম। আহমদ ছফা সিদ্ধান্ত করিয়াছিলেন বাঙালি মুসলমান হইতেছেন আবুল ফজলের মতন। সারাজীবন ধরিয়া প্রচার করিলেন একের ঘরে আর শেষ জীবনে ধর্না দিলেন আরেক দুয়ারে।

তারেক মাসুদ তাঁহার বাবার মধ্যে সেই বাঙ্গালি মুসলমানের প্রতিকৃতি আবিষ্কার করিলেন। এক শ্রেণীর বাঙ্গালি মুসলমান বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে সন্দেহ করিয়াছে। অনেকে তাহাদের প্রতীক আকারে মাদ্রাসা শিক্ষাকে দায়ী করেন। কিন্তু ইতিহাসকে ইচ্ছামতো পায়ের বেড়ী পরান যায় না। ইতিহাস হইতে দেখা যাইবে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মাদ্রাসা ছাত্রদের একটা বড় ভূমিকা ছিল। কৌমি বা জাতীয় মাদ্রাসার ছাত্ররা ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে লড়িয়াছিলেন কিন্তু পাকিস্তান বানাইতে রাজি হয়েন নাই।

বাংলাদেশ স্বাধীন হইয়াছে কিন্তু দেশের সমাজ কাঠাম বদলাইয়া যায় নাই। দেশে গণতন্ত্র নামে যাহা চলিতেছে তাহাতে জনগণের শাসন কায়েম হয় নাই। ইহার দায় কতখানি মাদ্রাসা শিক্ষার? আর কতখানিই বা ইংরেজি শিক্ষার? যদি আমরা বলি এসলাম ধর্ম বা তাহার ব্যাখ্যাবিশেষই ইহার জন্য দায়ী তবে আমাদের জবাবদিহি আছে। কেহ কেহ বলেন, এসলাম ধর্ম পশ্চিম এশিয়া হইতে আমদানি করা দ্রব্যবিশেষ–ইহা দেশজ পদার্থ নহে। এই বিশেষণ বিপজ্জনক–সত্য বলিতে বর্ণবিদ্বেষী বা উগ্র জাতীয়তাবাদী।

মধ্যম শ্রেণীর একাংশ আজিকালি এই বিশেষণ অঙ্গীকার করিতেছেন। আমি তাহাদের সমজদার হইতে পারি নাই। আমার ভয় হইয়াছিল তারেক মাসুদের ছবি এই বর্ণবিদ্বেষী, বর্ণাশ্রমধর্ম ব্যবসায়ী মনোভাবকে উসকাইয়া দিতে পারে। বাংলাদেশে এই ব্যবসায় ‘মানব ব্যবসায়’ ওরফে ‘হিয়ুুম্যানিজম’ আকারে উপস্থিত আছে। বর্তমানে দেশ চলিতেছে এয়ুরোপিয়া এনলাইটেনমেন্ট বা চেরাগের আলো ধার করিয়া। তাহা তো দেশজ নহে বলিয়া নিন্দার ভাগ পায় নাই। বাংলাদেশের কৃষক– মজুর কৃষক ও গৃহস্থ কৃষক– যে ধর্মবিশ্বাস আঁকড়াইয়া ধরিয়াছে শুধু তাহার মধ্যে বিদেশী দ্রব্য আমদানির সাক্ষ্য খোঁজা সত্যসন্ধানীর কাজ হইতে পারে না। পল্লবগ্রাহী বাঙালি মুসলমান সমাজের কেহ কেহ এক সময় মুখে মার্কসবাদও গ্রহণ করিয়াছিল। ‘মাটির ময়না’ ছবির এক চরিত্র বলিয়াছেন মার্কসবাদ ও হোমিওপ্যাথি সমতুল্য–দুইটাই জার্মান পদার্থ।

সত্য ও ন্যায়বিচারের খাতিরে–আজ এই শোকের মধ্যেও–মনে রাখিতে হইবে অভিজ্ঞতাই শেষ কথা নহে। ‘মাটির ময়না’ প্রসঙ্গে তারেক মাসুদ বলিতেন, ‘এই ছবির গল্প আমার নিজ জীবনবৃত্তের একটা ছিলা বা বৃত্তচাপ’। আমি বলিতাম, ‘সূর্য পূর্বদিকে উঠিবে। কারণ ইহা আমাদের অভিজ্ঞতা। তো সূর্য এই পৃথিবী নামক গ্রহের চারিদিকে ঘুরিয়া মরিতেছে, ইহাও কি আমাদের অভিজ্ঞতার অন্তর্গত নহে?’ তো কেন আমরা অভিজ্ঞতার মধ্যে এককে গ্রহণ করি, আর অন্যকে বর্জন করি? তারেক মাসুদের সঙ্গে অনেক বিনিদ্র রজনী আমরা কাটাইয়াছি। এই তর্কের শেষ হয় নাই।

‘সূর্য পৃথিবীর চারিধারে ঘুরিতেছে’, কিংবা ‘মানুষ যুক্তিশীল প্রাণী’ ইত্যাদি অর্ধসত্য ভর করিয়া পঞ্জিকা লিখিয়াছে, সভ্যতা গঠিয়াছে মানুষ। এই ক্রমে বলিতে পারি বিশ্বাস ভুল হইলেও মানুষের কীর্তি থাকিয়া যাইতে পারে। তারেক মাসুদ আকর্ষণীয় চলচ্চিত্র বানাইয়াছিলেন। এই বানানোর কাজটি সহজ ছিল না। তাঁহার ছবিতে বাংলাদেশ চিত্ররূপময় হইয়া উঠিয়াছে। তিনি তাহাতে সৌন্দর্য ছাড়াইয়া পবিত্রতার মহিমাও ফুটাইয়া তুলিয়াছেন। তিনি এককথায় বলা যায় সার্থক হইয়াছেন। যে নৈপুণ্য যে দক্ষতা তিনি দেখাইয়াছেন তাহার স্বীকৃতি তিনি কিছু পরিমাণে হইলেও পাইয়াছেন। বাঁচিয়া থাকিলে তাঁহার কীর্তিতে আরও নতুন অধ্যায় যোগ হইত, দেশের মুখোজ্জ্বল হইত সন্দেহ নাই।

আমার সবিনয় জিজ্ঞাসা, এই সার্থকতার মধ্যে কি এক প্রকারের ব্যর্থতাও লুকাইয়া নাই? এমনও কি হইতে পারে যে তিনি যে সার্থকতার মধ্যে নিজেই চিত্ররূপময় হইয়া রহিলেন, তাঁহার স্বপ্নের স্বাধীনতা তাহাতেই অপূর্ণ রহিয়া গেল?

এখন আমাদের কি কর্তব্য? তিনি যে কীর্তি রাখিয়া গেলেন আমরা কি তাহার মধ্যে শুদ্ধ নিজেদের চেহারা দেখিব? নাকি ‘কলবের মধ্যে আয়না বানাইয়া’ তাহার পারদটা মুছিয়া দিব? তাঁহাকেও দেখিব?

তারেক মাসুদের এন্তেকাল হইয়াছে অকালে। এই এন্তেকাল মানিয়া লওয়া যায় না। তাঁহার অন্তিম যাত্রা হইল জীবনের মধ্যভাগে। এই ক্ষতির পূরণ নাই। তাঁহার বিদায় সমাবেশে যে জনসাধারণ আসিয়াছিলেন তাহারা ‘সর্বস্তরের’। এ কথা সংবাদপত্র হইতে জানিয়াছি। আমি নিজেও সেখানে হাজির ছিলাম। একটা জিনিশ অবশ্য সংবাদপত্রে খুঁজিয়া পাই নাই। শহীদ মিনারের পাদদেশে আমি তিন ঘণ্টার মতো দাঁড়াইয়া ছিলাম। অনেক মানুষ, ততোধিক ফুলের শ্রদ্ধা। এইসব মিছিলে আমি মাদ্রাসার ছাত্র বিশেষ কিন্তু দেখি নাই। কথাটা মনে পড়িল। তারেক মাসুদ চলচ্চিত্রের বিনিময়েও মাদ্রাসা ছাত্রদের স্বাধীন করিতে পারেন নাই।

এক সময়ে আমরা শুনিতাম কবিতা তিন নম্বর বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাইতে পারে। এখন অত শুনি না। চলচ্চিত্রও হয়তো বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাইতে পারিবে না। কিন্তু স্বপ্ন দেখা মানুষের সংশোধনের অতীত নিয়তি। শুধু একটা কথাই সত্য– মানুষ স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নটা এক অর্থে কিছুই নহে। স্বপ্নকে আমরা যতই দূরে ঠেলিয়া দিই ততই সে আমাদের কাছে টানে। অথচ এই স্বপ্নটাই–অজ্ঞানের এই স্বতস্ফূর্ত আত্মপ্রকাশটাই–আমার একমাত্র অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতার জোরেই হয়ত আমি তারেক মাসুদকে আত্মীয় ভাবিয়াছি।

প্রথম প্রকাশ: দৈনিক যুগান্তর, সাহিত্য সাময়িকী, ১৯ আগস্ট ২০১১।

আমার শিক্ষক তারেক মাসুদ

tareque

‘In breaking a statue one risks becoming a statue…’

–Jean Cocteau, ‘Le Sang d’un Poète’

“যাঁহারা মূর্তি ভাঙ্গিবার কাজে হাত দিয়া থাকেন, তাঁহারা নিজেরাই মূর্তি হইয়া উঠিবার ঝুঁকি লয়েন॥”

–জাঁ কক্‌তো, ‘জনৈক কবির খুন’

 

তারেক মাসুদ এন্তেকাল করিয়াছেন। একা করেন নাই, সঙ্গে করিয়াছেন আরো চারিজন। তিনজন সঙ্গী গুরুতর জখম হইয়াছেন, একজন সামান্য। ২৯ শ্রাবণ, শনিবার, বারবেলায় এই ঘটনা ঘটিয়াছে পুরানা ঢাকা জেলার ভিতরে, নতুন জেলা মানিকগঞ্জ সদরের অদূরে। যখন পহিলা খবরটি পাইলাম, তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একদল ছাত্রছাত্রীর সহিত বসিয়া আলাপ করিতেছিলাম। যখন শুনিলাম প্রথম অবিশ্বাস করিলাম, তারপর অবাক হইলাম। শেষ পর্যন্ত বুঝিলাম বিশ্বাস করিতে হইবে অবিশ্বাসকে, যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ করিতেই হইবে। অবাককে কথা বলিতে হইবে।

এই শেষের দিকে তারেক মাসুদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ বন্ধ হইয়া গিয়াছিল। মোবাইল ফোন কোম্পানির সংযোগ যেমন মধ্যে মধ্যে বন্ধ হইয়া থাকে তেমন অনেকখানি। কিন্তু তারেক মাসুদের কথা দিনে একবার ভাবি নাই এমন দিন আমার কমই গিয়াছে। এই অন্তরের দিনেও। তিনি আমার উত্তমর্ণ। নানা সুবাদে। একাধিক কারণে।

তারেক মাসুদ উচ্চাভিলাষী ছিলেন। তাঁহার সহিত পহিলা যেদিন দেখা হইল সেদিনই তাহা টের পাইয়াছিলাম। সদ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইয়াছি। ইহা ইংরেজি মতে ১৯৭৬ সালের কথা। তারেক মাসুদ ও পিয়াস করিম একযোগে দেখা দিয়াছিলেন। সে কালের শরিফ মিয়ার ক্যান্টিন নামে খ্যাত আশ্রয়কেন্দ্রের আশপাশে তাঁহারা ঘুরিতেছিলেন। তখন লেখক শিবির নামে একটি দল জীবিত ছিল। তাহার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা হইয়াছিলেন তারেক মাসুদ।

তারেক মাসুদের সাথে আমার নতুন করিয়া পরিচয় করিয়া দিয়াছিলেন মোহন রায়হান। ১৯৭৮ সালে মোহন রায়হানের পহিলা বহি ‘জ্বলে উঠি সাহসী মানুষ’ প্রকাশ করিয়াছিলেন ‘বাঙলাদেশ লেখক শিবির’।

আমার ধারণা তাহাতে তারেক মাসুদের হাত ছিল। প্রথম দিকে তারেকের নাম সামান্য লম্বা ছিল–আবু তারেক মাসুদ। সেই নামে তিনি ছড়া লিখিতেন। সত্য বলিতে আমি তারেকের ছড়ার তুলনায় তাহার কথা বেশি শুনিতে চাহিতাম। তিনি বুদ্ধিমান ছিলেন, জোর করিয়া ছড়া শুনাইয়া তিনি কখনও আমাদিগকে লজ্জা দেন নাই। এই কাজটি আমিও কখনও কখনও করি নাই এমত নহে।

প্রথম পরিচয়েই তারেক আমাকে বলিয়াছিলেন তিনি চলচ্চিত্রকেই জীবনের ধ্রুবতারা করিয়াছেন। আমাদের বন্ধুদের বেশির ভাগই যে যাহার ধ্রুবতারা হারাইয়া ফেলিয়াছেন। তারেক হারাইতে পারেন নাই। তিনি ছিলেন সংকল্পে দৃঢ়। তিনি ইতিহাস বিভাগে পড়িতেন। এই পড়া তাহার চিন্তার পথে কোন ব্যাঘাত সৃষ্টি করিতে পারে নাই। তারেক আমাকে কথাটা নিজেই বলিয়াছিলেন, ‘ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক হওয়া আমার লক্ষ্য নহে।’

১৯৭৮ সালের শেষের দিকে আমি সিদ্ধান্ত লইয়াছিলাম একটি বিশেষ চরিত্রের পত্রিকা প্রকাশ করিব। আমি লেখক শিবিরের সদস্যপদ লাভ করিবার গৌরবে তারেকের শরিক হইতে পারি নাই। কিন্তু শিবিরের মধ্যে থাকিলেও ইতিহাস বিভাগের অধিক মর্যাদা তারেক মাসুদ শিবির জিনিসটাকে দিতে পারেন নাই। শিবিরের অন্য পাঁচটি সভ্য আমাকে যতখানি অনাত্মীয় ভাবিতেন তারেক মাসুদ ততখানি ভাবেন নাই। আমি যখন “প্রাক্সিস জর্নাল” কাগজটা বাহির করি তখন তারেক আমাকে আত্মীয় ধরিয়া লইলেন। তিনি আমাদের সম্পাদনা পরিষদে নিজের নামটি যুক্ত করিতে কুণ্ঠিত হয়েন নাই।

কয়েক বছর পর আমরা একটি পুস্তিকা বাহির করি। নাম ছিল ‘সমকালীন সাহিত্যের প্রবণতা ও শ্রেণীচরিত্র প্রসঙ্গে’ বা ইহার কাছাকাছি কিছু। এই পুস্তিকা মোটের উপর আমিই লিখিয়াছিলাম। আর আমার প্রধান সহায় হইয়াছিলেন তারেক মাসুদ। তিনি আমাকে জগতের যত নতুন খবর সবই জানাইতেন। বই আনিয়া দিতেন। সেই পুস্তিকায় প্রায় তিরিশ জনের স্বাক্ষর ছিল। আমার এবং তারেক মাসুদের নাম দুটিও বর্ণানুক্রম অনুসারে ছাপানো হইয়াছিল। আহা, পুস্তিকাটি এখন হারাইয়া কোথায় গিয়াছে জানি না! একটা কথা মনে আছে কবি অসীম সাহা নাম ছাপা না হওয়ায় পরে রবার স্ট্যাম্পযোগে যুক্ত হয়।

তারেক মাসুদের সঙ্গে আমার অনেক আলাপ হইত। সত্যের খাতিরে বলিতে হইবে চলচ্চিত্র বিষয়ে আমার আগ্রহ যাঁহারা শিক্ষকের মতন যত্ন করিয়া তৈয়ারি করিয়া দিয়াছেন তারেক মাসুদ তাঁহাদের মধ্যে একেবারে সামনের কাতারে। সত্য আরো বলিতে হইবে। আমার চরিত্রের মধ্যেই নিহিত আমার নিয়তি। শিক্ষকগণের সহিত দ্বিমত করাই আমার বিধিলিপি। শেষের দিকে আমি আর তাঁহার শিক্ষা হইতে উপকার লাভ করিতে সমর্থ ছিলাম না। হয়তো তাহাতে আমারই হয়রানি হইয়াছে।

১৯৮৬ সালে আমি মার্কিন মুলুকে চলিয়া যাই। তাহার বছর কয় পরে তারেকও সেই দেশে সাময়িক হিজরত করেন। আমি তখন জীবিকা সংগ্রহের প্রয়োজনে একটি বইপত্রের দোকানে চাকরি করি। একদিন সেই দোকানে ক্যাথারিন শাপির আসিয়া হাজির। তিনি জানাইলেন তারেক তাঁহার আত্মীয়। সংবাদটা আমার জানা হইয়াছিল তাহার কিছু আগে। তারপর একদিন দেখি সত্যসত্যই তারেক মাসুদ নতুন ইয়র্ক শহরে নাতিদীর্ঘ ছায়া ফেলিতেছেন। আমরা পাঁচ হইতে সাত বছর সেই শহরে একটানা বসবাস করিয়াছি।

শেষ পর্যন্ত তারেক মাসুদ ও ক্যাথারিন মাসুদ স্ট্যাটেন আয়ল্যান্ড নামা এক দ্বীপে বাসা লইলেন। বাসাটি ছিল কাঠের ঘর। আমরা বহুদিন সেই ঘরে ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলাম। কারণ আমি আসিতাম অনেক দূর হইতে। অধিক রাতে ফেরা সম্ভব হইত না। তারেকও তখন আমার মতন বইপত্রের দোকানে কাজ করিতেন। তাঁহার কর্মস্থল ছিল নতুন ইয়র্ক শহরের বাঁকাপথ ওরফে ব্রডওয়ে এবং ১২ রাস্তার সংযোগবিন্দুতে। এই দোকানটি পাঁচতলা। বিজ্ঞাপন অনুসারে তাহার বইপত্রের সকল তাক একটার পর একটা সাজাইলে দৈর্ঘ্য হইবে আট মাইল। নাম স্ট্রান্ড বুকস।

আমি কাজ করিতাম ৫ অ্যাভিনিউ ও ১৪ রাস্তার সংযোগস্থলে। আমার বিদ্যালয়ের বইয়ের দোকানটার নাম ছিল ‘এয়ুনিবার্সিটি প্রেস বুকস’। অনেক মধ্যাহ্নে আমরা একত্রে এয়ুনিয়ন স্কয়ার পার্কে (ব্রডওয়ে ও ১৪ রাস্তার সংযোগস্থল) বসিয়া দুপুরের খাবার খাইয়াছি। তারেক ভালো রান্নাও করিতেন। তাঁহার ‘স্যান্ডউয়িচ’ সঙ্গে থাকিত।

কাঠমিস্ত্রী হইলেও তারেক মাসুদ মন্দ করিতেন না। এই সময় তিনি সেই কাজও মাঝে মধ্যে করিতেন। নিজের বাসার ছোটখাট মেরামতির কাজ তিনি নিজেই করিয়া সারিতেন। কখনো কখনো ভাড়াও যাইতেন। এমনই এক যাত্রায়–তিনি আমাকে বলিয়াছিলেন–তিনি আবিষ্কার করিলেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু দলিলচিত্র।

ঘটনাটা শুদ্ধ কাক আসিবার পর তাল পড়িবার বিষয় নহে। ইহার পিছনে সাধনা ছিল। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের স্মৃতি হিসাবে এই দলিল অমূল্য রতন। মার্কিন চিত্রগ্রাহক লিয়ার লেবিনের সহিত পরিচয় ও উদ্ধারপর্ব এতদিনে কিংবদন্তি হইয়াছে। নতুন ইয়র্কে থাকিতেই তারেক মাসুদ ইহার প্রদর্শনী করিয়াছিলেন সেখানে। সেখান হইতে একটি পুস্তিকাও ছাপা হইয়াছিল। সেই পুস্তিকায় আর পাঁচ জনের সহিত আমিও দুই কথা লিখিয়াছিলাম।

matir moyna

এই যে শেষের দিকে আমার শিক্ষক বন্ধুর সহিত আমার যোগাযোগ স্থগিত হইয়া আসিল তাহার বীজ এখন দেখিতে পাইতেছি সেই সময়েই রোপা হইয়াছিল। আগেই বলিয়াছি তারেক মাসুদ ছিলেন একাধারে উচ্চাভিলাষী এবং দৃঢ়সংকল্প। এখন বুঝিতেছি তিনি নিজের প্রাণকেও তুচ্ছ করিতে পারিতেন ভক্তির জন্য। আমাদের সহিত তাহার বিচ্ছেদ প্রাণের সহিত প্রাণের বিচ্ছেদ বৈ নহে। তিনি নেতা, আমি বিনীত অনুসারী মাত্র এই ছেদে।

তিনি তবে ‘ভক্তি’ করিয়াছিলেন কাহাকে? তাঁহার ছবি যাহারা দেখিয়াছেন সে কথা তাহারাই ভাল বলিতে পারিবেন। বাংলাদেশের হৃদয়কে তিনি ভাষা দিতে চাহিয়াছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাস তিনি পড়িয়াছেন তাঁহার নিজের মতো করিয়া। তারেক মাসুদ যে জায়গায় জন্মিয়াছিলেন সেই ফরিদপুর অঞ্চলে ছিল পরাধীন যুগে কৃষক সংগ্রামের কেন্দ্রভূমি। বাংলাদেশের মুসলমান কৃষক–মজুর ও গৃহস্থ উভয় স্তরের কৃষকই–এসলাম ধর্মের সংস্কারকে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আদর্শ আকারে গ্রহণ করে। এই আন্দোলন বাংলাদেশে ‘ফরায়েজি’ নামে জাহির আছে।

এসলামের এই ভাষ্য তারেক মাসুদ গ্রহণ করেন নাই। এসলাম এ দেশে আসিবার আগে এ দেশে যে ধর্মাচার প্রতিষ্ঠা পাইয়াছিল তাহাকে সমূলে বিনাশ করা ছিল ফরায়েজি আন্দোলনের লক্ষ্য। তারেক মাসুদ এসলামকে লোকধর্ম হিসাবে দেখিতে চাহিয়াছিলেন। তাহার ‘মাটির ময়না’ ছবিতে এই বিশ্বাস এস্তেহার আকারে হাজির আছে।

‘মাটির ময়না’ ছবিটি বাংলাদেশে অনেকেই পছন্দ করিয়াছেন। অনেকে ইহার মধ্যে নতুন বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের নান্দীগান শুনিতে পাইয়াছেন। আমিও এই ছবিটি দেখিয়াছিলাম। আমার মনের কথাটি একদিন দুই স্তবক আকারে লিখিয়াও ফেলি। বলা বাহুল্য তিনি তাহা পছন্দ করেন নাই।

আমি কি লিখিয়াছিলাম তাহা এখন আমার মুখে আসিতেছে না। যাহাই লিখি না কেন, আমি এখনও বলিব ছবিটিতে যে ময়না মাটির নির্মিত, তাহাতে প্রাণের সঞ্চার করা কঠিন কাজ। সেই কাজে তিনি সফল হইয়াছেন কিনা তাহা বলিতে আরো সময় লাগিবে। তবে তিনি যে হাত দিয়াছিলেন তাহা আমাকে অবাক করে নাই।

বাংলাদেশে এসলামের সূচনা যে কারণেই হৌক, এসলাম প্রচারের কারণে বর্ণাশ্রম ধর্মের অবয়বে একটা বড় আঘাত নামিয়া আসে। দুঃখের মধ্যে, খোদ এসলামও এদেশে আসিয়া বর্ণাশ্রম ধর্মের আঘাতে খানিক পঙ্গু হইয়াছে। ১৯৪৭ সালের ইতিহাস বাদ দিয়া বর্তমানে বাংলাদেশের ইতিহাস সাধনা চলিতেছে। তারেক মাসুদের সাধনা তাহাকে পুরাপুরি মানিয়া লয় নাই।

বাংলাদেশে আমরা যে সাধনায় আজও সফল হই নাই–সেই মুক্তির সাধনায় তারেক মাসুদের নাম অক্ষয় অক্ষরে লিখিত থাকিবে। যে সাধনা প্রশ্ন জাগায় না, কেবল আবেগ উস্‌কাইয়া দেয় সে সাধনা ধর্মসাধনা মাত্র। আর যে সাধনা প্রশ্ন করে, ধর্মাচারের গোড়ার কথাও প্রকাশ করে তাহাকে বলে অর্থসাধনা।

আমার ভয় হয় তারেক মাসুদ কখনো ধর্মসাধনার পথে হাঁটিয়াছেন, আবার কখনো অর্থসাধনার খবর লইয়াছেন। আমার অপূর্ণ বুদ্ধিতে যতটুকু বুঝিয়াছি আমি ততটুকুই তাঁহার ধর্মসাধনার বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়াছি, কখনো অর্থসাধনার বিরুদ্ধে হাত তুলি নাই।

এখন তারেক মাসুদ আর সমুখে নাই। তাই এই কথাটি বিশেষ বলিবার আবশ্যক হইয়াছে। যৌবনের প্রারম্ভে–একটা কথা ভুলিয়া গিয়াছিলাম–আমরা দুইজনেই আহমদ ছফার পদতলে বসিয়া প্রজ্ঞা ভিক্ষা করিয়াছি। কিন্তু আমাদের পথ একসময় আলাদা হইয়া যায়।

তারপরও আজ আমি বলিব ঢাকা শহরে তারেক মাসুদ নাই বলিয়া এই শহরকে বসবাসের আরো অযোগ্য মনে হইতেছে।

প্রথম প্রকাশ: বিডিনিউজ, ১৫ আগস্ট ২০১১/ ৩০ শ্রাবণ ১৪১৮