Tag Archives: চট্টগ্রামের ইতিহাস

বিষয় চট্টগ্রামের ইতিহাস ও বাংলা সাহিত্য

ধন্য আজি দীনভবন ধন্য জননী চট্টলা।
শীর্ষে শোভে শৈলচূড়াবেষ্টিত বাহিনী মেখলা॥
শত ইন্দুলেখা অলকে ঝলকে
জগত রঞ্জিছে তব প্রেমালোকে
তোমার মন্দিরে আছে থরে থরে
কত না গৌরব ডালা॥
কণ্ঠে তব গীত ‘কুরুক্ষেত্র’ গাথা
‘প্রভাস’, ‘রৈবতক’ মঙ্গল-মাতা,
কবি দাসানুদাস মাঘ কালিদাস
কীর্ত্তি লীলা॥
ঊর মা আসরে, কমলবাসিনী,
বরপুত্রগণে আশীষ জননী
পুণ্য জ্ঞানালোকে ভরিয়া পুলকে
ভুবন কর মা আলা॥
পদপ্রান্তে তব আজি সমাগত
পূত অর্ঘ্য করে কৃতী পুত্র কত,
লও মা সবার প্রীতিবিকশিত
চন্দনচর্চ্চিত মালা॥

(কার্য্য-বিবরণ ১৩১৯: ২৮)

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান মরহুম অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের স্মৃতিতর্পণ করিতে বসিয়া প্রায়ই একটি গল্প বলেন। আমি নিজে গোটা তিনবার গল্পটি তাঁহার মুখ হইতে শুনিয়াছি। এক জায়গায় গল্পটা তিনি মুখতসর লিখিয়াও ফেলিয়াছেন। ১৯৫০ সালের দশকের শেষ কি ১৯৬০ সালের দশকের শুরু ঠিক নাই। আনিসুজ্জামান সাহেব তখন মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিযুক্ত হইয়াছেন। কোন এক সেমিনারে উপস্থিত করিবার জন্য একটা ইংরেজি প্রবন্ধ লিখিয়াছেন। ‘রাশভারী’ ঐ প্রবন্ধের সুনামটি বাংলায় তর্জমা করি তো এরকম দাঁড়ায়: ‘উনবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের মুসলমান সমাজ বিষয়ে অনুসন্ধান করিবার উপকরণ’।

মজলিশে যাঁহারা হাজির ছিলেন তাঁহাদের মধ্যে প্রবীণ অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক। অনেকখানি সাধাসাধির পর ইনি কিছু প্রশ্ন করিলেন। তবে আঙ্গুলে গুনিয়া দেখিলে মাত্র তিনটি। আনিসুজ্জামান কথিত সুসমাচার অনুসারে প্রশ্ন তিনটি ছিল এরকম: বাংলাদেশ (ওরফে বেঙ্গল) কোথায়? উনবিংশ শতাব্দী (ওরফে নাইনটিনথ সেঞ্চুরি) কখন? এবং বাংলাদেশের মুসলমান (অর্থাৎ মুস্লিম্স অব বেঙ্গল) কারা? অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক সঙ্গে যোগ করিলেন, ‘এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর পেলে বাকি কথা আলোচনা করা যাবে।’ আনিসুজ্জামান মন্তব্য করিয়াছেন, ‘এরপর পুরো সভা পণ্ড হওয়ার অবস্থা।’ (আনিসুজ্জামান ২০১৫: ১২০)

মাস দুই আগে আমাকে যখন বলা হইল চট্টগ্রামে আসিয়া একটা বক্তৃতা শুনাইতে হইবে তখন স্থির করিলাম মহাজ্ঞানী ও মহাজনগণ যে পথে গমন করিয়াছেন আমিও না হয় সে পথের অনুগামী হই। আরো স্থবির হইয়া ভাবিলাম তিনটার বেশি প্রশ্ন তুলিয়া কাহাকেও বিব্রত করিব না। এই তিন প্রশ্নের উত্তর পাইলে বাকি কথা আলোচনা করা হয়তো কঠিন হইবে না। আমার প্রবন্ধের নামের মধ্যে এই তিন কথার আভাস কিছুটা আছে। প্রথম প্রশ্ন: চট্টগ্রাম কোথায়? দ্বিতীয় প্রশ্ন: ইতিহাস কখন? আর শেষ কথা: বাংলা সাহিত্যই বা কোন পদার্থ?

ইংরেজি ১৮৭২ সালে ইংরেজ রাজকর্মচারী জন বীমস (১৮৩৭-১৯০২) কলিকাতায় ছাপা একটি ক্ষুদ্র পুস্তিকায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অনুশীলন ও উন্নয়নের জন্য একটি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ (একাডেমি অব লিটারেচর ফর বেঙ্গল) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব প্রচার করেন। ইহার একুশ বছর পর ইংরেজি ১৮৯৩ (বাংলা ১৩০০) সালের ২৩ জুলাই (৮ শ্রাবণ) বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠা হয়। বীমসের লেখা ক্ষুদ্র পুস্তিকাটি বর্তমানে বিলুপ্ত হইয়াছে। কিন্তু নানা সূত্র হইতে ইহার সার বক্তব্য ছাঁকিয়া লইয়া একশত বছর পরের একজন লেখক স্মরণ করিয়াছেন:

১৮৭২ খ্রীষ্টাব্দে বীম্স্ তাঁহার এই প্রস্তাবে বলিয়াছিলেন যে ভারতের অন্যান্য প্রাদেশিক ভাষার সাহিত্য অপেক্ষা বঙ্গীয় সাহিত্য উৎকর্ষ প্রাপ্ত হইয়া ইউরোপীয় সাহিত্যের সদৃশ হইয়াছে; বঙ্গভাষাকে প্রণালীবদ্ধ করিয়া তাহার একতা সম্পাদন করিবার ও সাহিত্যে প্রয়োগযোগ্য ভাষা নির্ণয় করিবার কাল আগত হইয়াছে; বাঙ্গালা ভাষার অনুশীলন ও উন্নয়নের জন্য একটি একাডেমি স্থাপনের উপযুক্ত সময় উপস্থিত হইয়াছে; বাঙ্গালা সাহিত্যের ভাষার স্থিরতা বিধান জন্য সকল বাঙ্গালী মিলিত হইয়া সভা স্থাপন করিয়া ভাষার উন্নতি সাধন করা আবশ্যক; ক্রমবিকাশমান বাঙ্গালা ভাষা ও সাহিত্যকে একটি আদর্শ ভাষা ও সাহিত্যরূপে প্রতিষ্ঠা দানের জন্য সংস্কৃত শব্দের অহেতুক-ভার-মুক্ত ও ইতর নিম্নশ্রেণীর গ্রাম্য-শব্দ-বর্জিত বাঙ্গালা ভাষার একখানি অভিধান রচনা প্রস্তাবিত একাডেমির প্রযত্নে করা প্রয়োজন; যথোপযুক্ত বিচার বিবেচনা ও তৌলায়নের পর একাডেমি কর্তৃক গৃহীত শব্দ একাডেমির অভিধানে সঙ্কলিত হইবে; একাডেমির অভিধান প্রকাশিত হইলে তাহাতে যে শব্দের স্থান নাই তাহা সাহিত্যে ব্যবহৃত হইবে না, এবং ইহাতেই ভাষা প্রণালীবদ্ধ হইবে; রাজধানী কলিকাতায় একাডেমির আদি সভা স্থাপিত হইবে; শতাধিক সুধী সাহিত্যসেবী বঙ্গ একাডেমির সদস্য হইবেন তন্মধ্যে ৩০ জন সদস্য কলিকাতার অধিবাসী হইবেন, অবশিষ্ট সদস্যগণ অন্যত্র নিবাসী সুধীম-লীর মধ্য হইতে মনোনীত হইবেন। একাডেমিতে প্রবন্ধাদি পাঠ হইবে এবং সে বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক হইবে; গ্রন্থকারেরা নিজ নিজ গ্রন্থ প্রকাশের পূর্বে সভায় পাঠ করিবেন এবং সুধী সদস্যম-লীর পরামর্শে তাহার উন্নতি সাধন ও সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করিবেন; সভায় সঙ্গীতের আলোচনা হইবে এবং প্রাচীন কবিগণের গীত ও নব্য গীতের সমালোচনায় বাঙ্গালা ভাষায় রচিত সঙ্গীতেরও উন্নতি লাভ হইবে। (মদনমোহন ১৯৭৪: ৩-৪)

বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ প্রতিষ্ঠার লাভের মধ্যে বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলন অনুষ্ঠানের প্রেরণাকেও গণ্য করিতে হইবে। বীম্সের প্রস্তাবের সহিত সঙ্গতি রাখিয়া সিদ্ধান্ত হইয়াছিল সাহিত্য-সম্মিলন মধ্যে মধ্যে কলিকাতার বাহিরেও অনুষ্ঠিত হইবে। সেই সুবাদে পঞ্চম অধিবেশন হইয়াছিল হুগলি নগরে, আর ষষ্ঠ অধিবেশনের মোকাম নিরুপিত হয় চট্টগ্রাম।

আজ হইতে কিছু বেশি একশ বছর আগের কথা চুঁচূড়া হইতে পঞ্চম অধিবেশনের সভাপতি সারদাচরণ মিত্রের পাঠানো প্রস্তাবানুসারে বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনের ষষ্ঠ অধিবেশন বসিয়াছিল চট্টগ্রামে। সম্মিলনের ‘কার্য্য-বিবরণ’ হইতে জানা যায়: ‘চট্টগ্রামে সাহিত্য সম্মিলনের প্রস্তাব প্রথমে দেশবাসী জনসাধারণের অজ্ঞাতসারে উত্থাপিত হইয়াছিল। কিন্তু চট্টগ্রামবাসীগণ যখন এই কথা অবগত হইলেন তখনই ইহাকে কার্য্যে পরিণত করিবার জন্য কৃতসঙ্কল্প হইলেন। প্রথমে কোন কোন স্থান হইতে কিছু কিছু আপত্তিও হইয়াছিল। কারণ কয়েক মাস পূর্ব্বে বহু অর্থ ব্যয়ে চট্টগ্রামে বঙ্গীয় প্রাদেশিক রাজনৈতিক সম্মিলন হইয়াছিল। আবার এক সম্মিলনের ব্যাপার সুসম্পন্ন করা দরিদ্র দেশের পক্ষে কঠিন হইবে বলিয়াই অনেকে মনে করিয়াছিলেন। কিন্তু সকল বাধা অতিক্রম করিয়া চট্টগ্রামের শিক্ষিত সমাজ সাহিত্য সম্মিলন সুসম্পন্ন করিবার জন্য অগ্রসর হইলেন।’ (কার্য্য-বিবরণ ১৩১৯: ১-২)

সম্মিলনের ‘কার্য্য-বিবরণ’ অনুসারে স্থান ‘চট্টগ্রাম, ফেয়ারীহিল বা পরীপাহাড়ের পাদ দেশ। মিউনিসিপেল উচ্চ ইংরেজী স্কুলের প্রাঙ্গণে নির্ম্মিত মণ্ডপ।’ অধিবেশন বসিয়াছিল পর পর দুইদিন — শনিবার ও রবিবার — যথাক্রমে ৯ ও ১০ চৈত্র ১৩১৯ (২২ ও ২৩ মার্চ ১৯১৩)।

সম্মিলনের উদ্বোধন হয় উপরে প্রবন্ধের মাথায় যে গানটি টোকাইয়া লইয়াছি তাহা গাহিয়া। ইমন কল্যাণ রাগে উহা গাহিয়াছিলেন চট্টগ্রামের বনিয়াদি অনুষ্ঠান ‘আর্য্য-সঙ্গীত সমিতি’। বলাবাহুল্য, ইহাতে অদূর অতীতে পরলোকগত কবি নবীনচন্দ্র সেনের (১৮৪৭-১৯০৯) স্মৃতিই যথাধ্বনিত ও প্রতিধ্বনিত হইতেছিল। প্রকাশ থাকে যে সম্মিলনে ‘নবীনচন্দ্র সেন’ নামে একটি ‘সুন্দর চতুর্দ্দশপদী’ কবিতাও পড়া হয়। পাঠক কবিটির নাম ছিল বড়ই মধুর: ললিতচন্দ্র মিত্র। ততদিনে চল্লিশ বৎসরের অধিক হয় ইঁহার পিতা স্বনামধন্য নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র (১৮৩০-১৮৭৩) গত হইয়াছিলেন। সম্মিলনের ‘কার্য্য-বিবরণ’ হইতে কবিতাটি নিচে তুলিয়াছি।

পুণ্য পূর্ব্বাশার দ্বার করি উদঘাটিত
কনক-কিরণ-পূর্ণ তরুণ তপন
নবীন আলোকে সবে করে পুলকিত
রজনীর অন্ধকার করিয়া মোচন;
সেইরূপ একদিন, — শুভদিন গণি —
পবিত্র সাহিত্যক্ষেত্র করি উদ্ভাসিত,
পুণ্য চট্টগ্রাম হ’তে, নব দিনমণি
মেঘের আঁধার ভেদি হয় প্রকাশিত।
গুঞ্জরি তরুণ কণ্ঠে, পলাশীর রণ,
দেখাইলে বঙ্গজনে রঙ্গমতী শিলা;
ত্রিধারায় পূজা করি নর-নারায়ণ,
শিখাইলে শেষতানে অবতার-লীলা
চারু চট্টগ্রাম! তোর সার্থক জীবন,
দিয়াছ সাহিত্য, চির নবীন কিরণ।

(কার্য্য-বিবরণ ১৩১৯: ২৮)

Nabin Chanrda Sen

নবীনচন্দ্র সেন (১৮৪৭-১৯০৯)

‘কার্য্য-বিবরণ’ হইতে জানা যায়, ‘চট্টগ্রাম সাহিত্য সম্মিলনে চট্টগ্রামের সুকবি নবীনচন্দ্রের অভাব সকলেই অনুভব করিয়াছেন। তিনি লোকান্তরগত, সুতরাং দর্শনের অতীত হইলেও তাঁহার জীবন্ত প্রভাব সকল হৃদয়ের উপর নিপতিত হইয়াছিল। নবীনচন্দ্রের তৈলচিত্র সম্মিলন মণ্ডপে সভাপতির পার্শ্বে রক্ষিত হইয়াছিল, কিন্তু তাঁহার জাগ্রত স্মৃতি নিকটতর হইয়া সকলের প্রাণ স্পর্শ করিয়াছিল।’ (কার্য্য-বিবরণ ১৩১৯: ২৮)

‘কার্য্য-বিবরণের’ আরেক জায়গায় লেখা হইয়াছে, ‘সাহিত্য সম্মিলন এখনও এদেশে নূতন ব্যাপার বলা যাইতে পারে। যাঁহারা উচ্চশিক্ষা প্রাপ্ত হইয়াছে কেবল তাঁহারাই ইহাতে যোগদান করিবেন এরূপ আশা করা কিছুই অসঙ্গত নয়। কিন্তু চট্টগ্রামে দেখা গিয়াছে জনসাধারণ মহা উৎসাহে এই সম্মিলনে যোগদান করিয়াছেন। সুদূর পল্লীগ্রাম হইতে অনেক কষ্ট স্বীকার করিয়া অনেকে আসিয়া সম্মিলন দর্শন করিয়াছেন। বহুসংখ্যক মহিলাও সাহিত্য সম্মিলনে যোগদান করিয়াছিলেন। ইতিপূর্ব্বে উল্লেখ করা হইয়াছে চট্টগ্রামের দুইজন মহিলা কবির দুইটা কবিতাও পঠিত হইয়াছিল।’ (কার্য্য-বিবরণ ১৩১৯: ৭)

শুদ্ধ মহিলারা নহেন, চট্টগ্রামের বৌদ্ধ এবং মুসলমানেরাও সম্মিলনে শরিক হইয়াছিলেন। কার্য্য-বিবরণে সামান্য একটু পরে আরো লেখা হইতেছে, ‘এই সম্মিলনের আর একটী শুভ লক্ষণ এই যে হিন্দু এবং মুসলমানের কোন মতভেদ এখানে দৃষ্ট হয় নাই। হিন্দুদের সঙ্গে বৌদ্ধ এবং মুসলমানেরাও ইহাতে আগ্রহের সহিত যোগদান করিয়াছেন। দেশের নরনারী এবং যুবকবৃন্দ, দেশের জনসাধারণ সকলেই সাহিত্যচর্চ্চার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করিলে বাস্তবিকই আনন্দ হয়।’ (কার্য্য-বিবরণ ১৩১৯: ৭-৮)

এক্ষণে পাঠে আরেকটু মনোনিবেশ বা মনোযোগ করিলেই প্রশ্ন জাগিবে — ‘হিন্দু এবং মুসলমানের মতভেদের’ প্রসঙ্গটা আদৌ উঠিল কেন? ভুলিলে চলিবে না — সবে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ হইয়াছে। সম্মিলনের ‘কার্য্য-বিবরণ’ আর একপাতা ঘাঁটিলে দেখা যাইবে ‘বিষয় নির্ব্বাচন সমিতি’ সেবার সাধারণ বিভাগে পাঠের জন্য ২৩ আর বিজ্ঞান বিভাগে পাঠের জন্য ১৪ প্রবন্ধ মনোনীত করিয়াছিলেন। কার্য্য-বিবরণের জায়গাবিশেষে আছে: ‘সম্মিলনের সাধারণ বিভাগে ১৩টী প্রবন্ধ পঠিত হইয়াছিল এবং ১০টী প্রবন্ধ পঠিত বলিয়া গৃহীত হইয়াছিল। অবশিষ্ট ১০টী প্রবন্ধ নানা কারণে মনোনীত হয় নাই। বিজ্ঞান বিভাগে ১২টী প্রবন্ধ পঠিত হইয়াছিল এবং ২টী পঠিত বলিয়া গৃহীত হইয়াছিল। তন্মধ্যে ৩টী কবিতা এবং ১টী প্রবন্ধ মহিলা লিখিত। দুইজন মহিলা কবির বাসস্থান চট্টগ্রাম।’ (কার্য্য-বিবরণ ১৩১৯: ৬)

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ (১৮৭১-১৯৫৩)

আবদুল করিম
সাহিত্যবিশারদ (১৮৭১-১৯৫৩)

সম্মিলনে পঠিত মোট ২৫টি প্রবন্ধের মধ্যে একটির লেখক ছিলেন শ্রীযুক্ত মৌলবী আবদুল করিম। তাঁহার প্রবন্ধের নাম ‘বঙ্গ সাহিত্যে চট্টগ্রাম’। বলা বাহুল্য কিনা নিশ্চিত নহি, দেখিতেছি ২৫টি পঠিত এবং ১৪টি পঠিত বলিয়া গৃহীত প্রবন্ধের লেখকদের মধ্যে শ্রীযুক্ত আবদুল করিমই একমাত্র মুসলমান নাম বহন করেন। ‘বিষয় নির্ব্বাচন সমিতি’র মধ্যেও দেখিলাম তিনজন মুসলমানের নাম। ইঁহাদের মধ্যে ফরিদপুরের শ্রীযুক্ত মহম্মদ রওসান আলি চৌধুরীর সহিত চট্টগ্রামের শ্রীযুক্ত আবদুল করিম আর শ্রীযুক্ত কাজিম আলিও আছেন। চট্টগ্রাম সাহিত্য সম্মেলনের এই চিত্র জাতীয় সাহিত্য সম্মিলনেরই একটি পার্শ্বচিত্র বিশেষ। ইহাতে বিস্মিত হইবার কারণ নাই।

এই সম্মিলনের আরেকটি মজার জিনিশ ছিল নাম ‘প্রদর্শনী’। কার্য্য-বিবরণে দেখিতেছি লেখা আছে: ‘সভামণ্ডপের সম্মুখে, সরকারী রাস্তার অপর পার্শ্বে এক সুন্দর সুসজ্জিত গৃহে সাহিত্য প্রদর্শনী খোলা হইয়াছিল। উক্ত গৃহের বিবিধ প্রকোষ্ঠে নানাবিধ পুরাতন পুঁথি সংরক্ষিত হইয়াছিল। তন্মধ্যে চট্টগ্রামের প্রাচীন কবি বিরচিত বহুসংখ্যক গ্রন্থ সাহিত্য পরিষদের সহায়ক-সদস্য শ্রীযুক্ত মৌলবী আবদুল করিম কর্ত্তৃক প্রদর্শিত হইয়াছিল। বহুকাল পূর্ব্বের তালপত্রে এবং বৃক্ষত্বকে লিখিত গ্রন্থসকল সংগৃহীত ও প্রদর্শিত হইয়াছিল।’

বিবরণের ‘অধিকন্তু ন দোষায়’: ‘অভ্যর্থনা সমিতির চেষ্টায় চট্টগ্রামের কতগুলি প্রসিদ্ধ স্থান এবং দেবালয়ের আলোকচিত্র সংগৃহীত এবং প্রদর্শনী গৃহে সংরক্ষিত হইয়াছিল। তন্মধ্যে মহামুনি বৌদ্ধবিহার, চাঁদ সদাগরের দীঘি, সুলতান বায়জিৎ বস্তানি, সাহ সুজা নির্ম্মিত মসজিদ, হিন্দুতীর্থ মেধসাশ্রম এবং শ্রীচৈতন্যের প্রিয় শিষ্য এবং সহচর মুকুন্দরাম দত্তের গৃহদেবতার প্রতিকৃতি উল্লেখযোগ্য। কতগুলি ঐতিহাসিক নিদর্শনও সংগ্রহ করা হইয়াছিল। নছরৎ বাৎসার নির্ম্মিত মসজিদের ভগ্নাবশেষ হইতে ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের ইষ্টক প্রদর্শিত হইয়াছিল, বুদ্ধদেবের প্রস্তরমূর্ত্তি প্রদর্শিত হইয়াছিল। স্থানীয় উকিল শ্রীযুক্ত রজনীরঞ্জন সেন বি.এল. মহাশয় কর্তৃক সংগৃহীত আরঙ্গজেবের ফরমান বা আদেশপত্র প্রদর্শন করা হইয়াছিল।’ (কার্য্য-বিবরণ ১৩১৯: ৬-৭)

এক্ষণে প্রশ্ন করিবার অবকাশ হইতেছে, এই একমেবাদ্বিতীয়ম শ্রীযুক্ত মৌলবী আবদুল করিমটি কে? পরকালে তিনিই সাহিত্যবিশারদ পরিচয়ে মশহুর হইয়াছিলেন — একথা বলা বাহুল্যবিশেষ। আবদুল করিমকে জড়াইয়া মজার একটি অধ্যায় — ‘স্বপ্নভঙ্গ’ — পাওয়া যায় নবীনচন্দ্র সেনের আত্মজীবনী ‘আমার জীবন’ পঞ্চম ভাগে।

নবীনচন্দ্র ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের ‘পার্সোনাল অ্যাসিসটেন্ট’ বা আজিকার কথায় ‘একান্ত সহকারী’। একদা তাঁহার আপিসের দুইজন ‘এপ্রেনটিস’ তদীয় হস্তক্ষেপে ‘কেরানী’ পদে উন্নতি লাভ করিয়াছিলেন। একজন আমাদের আবদুল করিম। ইঁহাকে চিনিবার পর নবীনচন্দ্রের যে মন্তব্য ‘আমার জীবন’ গ্রন্থে উৎকীর্ণ আছে তাহা পড়িলে মনে হয় স্বয়ং নবীনচন্দ্রও নিঃসন্দেহে একটি অমূল্য রতন। ললিতচন্দ্র মিত্রের চতুর্দ্দশপদী কবিতা মোটেও অপাত্রে পড়ে নাই।

নবীনচন্দ্র লিখিতেছেন: ‘সুলেখক মাত্র তখন আপিসে ছিল না। আবদুল করিম চট্টগ্রামের প্রাচীন কাব্যাবলির সংগ্রহের দ্বারা বঙ্গ-সাহিত্যের ও চট্টগ্রামের প্রভূত উপকার সাধন করিতেছিল। সে মুসলমান, অথচ সংস্কৃতে এন্ট্রান্স পরীক্ষা দিয়াছে। বাঙ্গলা ভাষা জলের মত লিখিতে পারে। কলিকাতায় থাকিতে মাসিক পত্রিকায় তাহার প্রবন্ধাদি দেখিয়া আমি বিস্মিত হইয়াছিলাম যে, চট্টগ্রামের মুসলমানের মধ্যে এরূপ লোক আছে। চট্টগ্রামে আসিয়া দেখিলাম, সে একজন আদালতের এপ্রেনটিস মাত্র। বড় কষ্টে জীবন কাটাইতেছে।’ (নবীনচন্দ্র ১৪১৯: ৪৩০-৩১)

বিস্ময়ের কারণ আসলেই ছিল না। চট্টগ্রামের মুসলমানের মধ্যেও এই রকম লোক তখন দুইটি ছিল না। আর ‘প্রাচীন কাব্যাবলির’ সংগ্রহের দ্বারা যতই বঙ্গসাহিত্যের ও চট্টগ্রামের উপকার হৌক না কেন, ইহাতে উঁহার প্রভূত অপকারও একবার ঘটিয়াছিল। নবীনচন্দ্র সেন সেই ঘটনার যুগপদ ভুক্তভোগী ও একনম্বর সাক্ষী।

আবদুল করিমের নিয়োগ যখন কার্যত একপ্রকার কায়েমমোকাম হইল তখনকার সময়ে নলিনী নামক এক যুবকের ‘জিদে’ পড়িয়া নবীনচন্দ্র সেন একটা সংবাদপত্র প্রকাশের কাজেও জড়াইয়া পড়িলেন। নবীনচন্দ্রের ভাষায়, ‘চট্টগ্রামে আর একটা কাগজ খুলিল। সম্পাদক রোজ সন্ধ্যার সময়ে পেন্সিল কাগজ লইয়া আমার গৃহে আসিয়া উপস্থিত হইত। আমি বলিয়া যাইতাম, আর সে লিখিয়া লইত।’

‘দেখিতে দেখিতে কাগজখানির বেশ একটুখানি প্রতিপত্তি’ হইবার পর ইংরেজ ‘কমিশনর’ সন্দেহ করিলেন ইহার পিছনে খোদ নবীনচন্দ্র সেন আছেন। আপিসে নবীনচন্দ্রের দুশমনের অভাব ছিল না — একথা না বলিলেও চলে। তাহাদের কাহারো কাহারো সহায়তায় কমিশনর সাহেব তাঁহার ‘পার্সোনাল অ্যাসিস্টটেন্ট’কে ধরিয়া ফেলিলেন। এক্ষণে আবদুল করিমের নিয়োগই — ঠিক নিয়োগ নয় প্রাচীন কাব্যাবলির সংগ্রহে তাঁহার উদ্যমই — নবীনচন্দ্রেরও বিপদ ডাকিয়া আনিল।

নবীনচন্দ্র লিখিতেছেন: ‘সে উক্ত কাগজে এক বিজ্ঞাপন দিয়াছে যে, প্রাচীন কাব্য যে তাহার কাছে পাঠাইবে, এই কাগজ বিনামূল্যে এক বৎসর পাইবে। তাহার প্রাচীন কাব্য-সংগ্রহের সাহায্যার্থ সম্পাদক এই বিজ্ঞাপন দিয়াছে। আমি তাহার কিছুই জানিতাম না।’ নবীনচন্দ্র অধিক লিখিতেছেন, ‘উহা যে আমার কাগজ আর প্রমাণ চাই কি? এই বিজ্ঞাপনই যথেষ্ট। কারণ, আবদুল করিম আমার লোক, এবং সে কাগজ বিনামূল্যে দিবে বলিয়াছে।’ (নবীনচন্দ্র ১৪১৯: ৪৩১)

‘কমিশনর তখন,’ নবীনচন্দ্রের বয়ানানুসারে লিখিতেছি, ‘এই গরিব দুটিকে বরখাস্ত করিলেন’। প্রকাশ থাকে যে নবীনচন্দ্রের নিয়োজিত দ্বিতীয় কেরানিটি হিন্দুধর্মীয় বান্দা ছিলেন। আর যাইবেন কোথায়! নবীনচন্দ্র উবাচ: ‘হিন্দুটি আমার এক আত্মীয়ের জামাতা কিনা, তৎক্ষণাৎ কৈফিয়ৎ তলব করা হইল।’

বাংলা ১৩৪০ (ইংরেজি ১৯৩৩) চট্টগ্রাম জেলা সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতির অভিভাষণ দিয়াছিলেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। এতদিনে দেখা যাইতেছে তাঁহার নামের আগে ‘শ্রীযুক্ত’ এবং ‘মৌলবী’ পদ দুইটি যুগপৎ লোপ পাইয়াছে। নিজের সাহিত্য সাধনার কৈফিয়ত উপলক্ষে অভিভাষণে তিনি দাবি করিলেন, ‘বাঙ্গলার যে যুগে মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক বাঙ্গলা সাহিত্য-চর্চ্চার উন্মেষ হয়, আমরা সেই যুগেরই অস্ততারা। সেই যুগের শেষ চিহ্নস্বরূপ আমার মত এখনও যে কয়েকজন বাঁচিয়া আছেন, তাঁহাদের অন্তর্দ্ধানের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক মুসলিম বাঙ্গলা সাহিত্যের উন্মেষের যুগ যে নিশ্চিহ্ন হইয়া যাইবে, সে বিষয়ে সন্দেহ নাই।’ তারপর খানিক অভিমানের অধীনে মাথা নোয়াইয়া ‘জলের মত’ বাংলায় আবদুল করিম উচ্চারণ করিলেন:

এই যুগে যাঁহারা বাঙ্গলা ভাষার সেবায় বিভিন্নভাবে আত্মনিয়োগ করিয়াছিলেন, তন্মধ্যে আমিই ছিলাম পাল হইতে পলাতক। আমার সহ-কর্ম্মীরা কবিতা, সাহিত্য, উপন্যাস, প্রবন্ধ প্রভৃতি রচনায় মন দিয়াছিলেন। আমার সাহিত্য-সাধনা ছিল তাঁহাদের সাহিত্য-সাধনা হইতে একটু পৃথক। আমি ছিলাম বাঙ্গলা ভাষায় মুসলমানদের প্রাচীন অবদানের তথ্য উদঘাটনে তৎপর। (করিম ২০১৩: ২৫৬-৫৭)

আবদুল করিমের এই তৎপরতাও তাঁহার কোন কোন স্বজাতীয় ভাইয়ের খাতায় নিছক সাহিত্য-সাধনা পরিগণিত হয় নাই। তিনি ডানেবামে না তাকাইয়া আপন কর্তব্য করিয়া গিয়াছিলেন। আবদুল করিম বলিতেছেন:

প্রাচীন বাঙ্গলায় মুসলমানের দান সম্বন্ধে আলোচনা করিতে গিয়া আমি যে সকল নূতন তথ্যের উদঘাটন করি তাহা জাতির পক্ষে সম্মান কি অসম্মানের, গৌরব কি অগৌরবের বিষয় ছিল, সে বিচার আমি করিতে চাই না; তবে তাহা প্রকাশ করিয়া আমি কোন কোন স্বজাতীয় ভ্রাতাদের নিকট তিরস্কৃত হইয়াছি। আমি সে বিষয়ে লক্ষ্য করি নাই, আপন মনে কর্ত্তব্য করিয়া গিয়াছি। এ সকল বিষয়ে মন দেওয়ার মত অবসর আমার ছিল না, এখনও নাই, কেননা আমি মুসলমানকেই দেখিয়াছি, তাহার ধর্ম্ম ইস্লামকে দেখি নাই।’ (করিম ২০১৩: ২৫৭)

আবদুল করিমের বাংলা যেমন জলের মত পরিষ্কার তাঁহার ধর্মবোধও তেমনই মৃদুমন্দগামিনী কুলুকুলু। তিনি লিখিয়াছেন, ‘আমার সহ-কর্ম্মীরা আরবী, ইরানী, তুরানী জাতভাইদের কীর্ত্তিকলাপ আলোচনা করিয়াছেন, বাঙ্গলা ভাষার ভিতর দিয়া তাহা আপনাদের সমীপে উপস্থিত করিয়াছেন; কিন্তু আমি করিয়াছি আমার পাশের বাড়ীর মুসলমানের, আমার দেশের জাতভাইদের সাহিত্যের ক্ষেত্রে কীর্ত্তিকলাপ সংগ্রহ।’

আবদুল করিম সাহিত্য বিষয়ে হিন্দুতে আর মুসলমানে প্রভেদ করেন নাই। মুসলমানদের তিনি বলিয়াছেন ‘স্বজাতীয় ভ্রাতা’ আর হিন্দুদের নাম রাখিয়াছেন ‘আমার দেশের জাতভাই’। কথা দুইটি মনে রাখিবার মতন। তাঁহার কথায়, ‘তৎসঙ্গে যদি প্রতিবেশী হিন্দু ভাইদের জন্যও কিছু করিয়া থাকি, তজ্জন্য আমি লজ্জাবোধ করি না; কেননা ইহাও আমার কর্ত্তব্যের মধ্যে অন্যতম। আমি সোজা কথায় ইহাই বুঝি, আমার দেশের জাতভাইরা দেশের ভাষার জন্য কি করিয়াছিলেন, তাহাই যদি জানিতে না পারিলাম, তবে পরের দেশের ও বিদেশীয় ভাইদের কথা জানিয়া কি হইবে?’ (করিম ২০১৩: ২৫৭)

আবদুল করিমের সাধনার সারাংশ — ১৩৪০ বাংলার এই অভিভাষণ অনুযায়ী — এই দাঁড়াইয়াছিল। ইংরেজি ১২০০ সালের পর মুসলমান তুর্কিরা বাংলাদেশ জয় করিবার অন্যূন দুই শত বছর পর — মানে ১৪০০ পর্যন্ত — বাংলার মুসলমানগণ দেশীয় ভাষায় সাহিত্য রচনায় মন দিবার মতন শক্তি অর্জন করিতে পারেন নাই। তাঁহার কথায়, ‘অন্তত এ পর্য্যন্ত তাহার কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নাই।’ ইহা লইয়া আলোচনার জন্য আরো স্থান দরকার আছে।

ইংরেজি ১৫০০ সালের পর হইতে বাংলার মুসলমানগণ প্রত্যক্ষভাবে দেশীয় ভাষায় সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করিলেন। আবদুল করিমের মতে, ‘মনে হয়, ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমার্দ্ধও, বাঙ্গলা সাহিত্য ক্ষেত্রে মুসলমানদের নিতান্তই “হাতে খড়ির” যুগ ছিল না। কেননা ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগের বহরাম দৌলত উজীর নামক কবির “লায়লি মজনু” নামক গ্রন্থে যেরূপ পাকা বাঙ্গলা রচনার নমুনা পাওয়া যায়, কিছু কাল পূর্ব হইতে সাহিত্যের ক্ষেত্রে মুসলমানদের হাত না থাকিলে এইরূপ বাঙ্গলার আমদানী করা ও তাহার প্রচলন হওয়া অসম্ভব।’

১৬০০ ইংরেজি সালের পর — আবদুল করিমের বিশ্বাস — বাঙ্গলার মুসলিম সাহিত্যের ইতিহাসে ‘একটি স্বর্ণময় যুগ’ শুরু হইয়াছিল। তাঁহার কথায়, ‘মহাকবি আলাওলকে সপ্তদশ শতাব্দীর রবীন্দ্রনাথ বলিয়া উল্লেখ করা যায়।’ তিনি লিখিয়াছেন, ‘এই যুগের বাঙ্গলা সাহিত্যে মুসলমানদের দান অতুলনীয় ও অপরিমেয়। দৌলত কাজী, আলাওল, মোহাম্মদ খান, সৈয়দ সুলতান, নসরুল্লাহ খাঁ প্রভৃতি অসংখ্য কবি অমর প্রতিভা লইয়া এই যুগে জন্মগ্রহণ করেন।’ (করিম ২০১৩: ২৫৯)

ইংরেজি ১৭০০ সালের পরের যুগ — সকলেই জানেন — বাংলার মুসলমানদের ভাগ্যবিপর্যয়ের যুগ। আবদুল করিম লিখিয়াছেন, ‘রাজ্য হারাইয়া, শক্তি খোয়াইয়া বাঙ্গলার মুসলমান ধীরে ধীরে অধঃপতনের চরমসীমার দিকে অগ্রসর হইতে থাকেন। এই সময়ে তাহাদের সাহিত্য-সাধনায় ভাটা পড়ে এবং অধঃপতন ঘটে। মুসলমানদের মধ্যে এই সময়ে যে কম কবি জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন তাহা নহে। সম্ভবতঃ রাজনৈতিক ভাগ্যবিপর্যয়ে তাঁহাদের পূর্ব্বশক্তি লোপ পাইয়াছিল; তাই সাহিত্যসেবায় যে তীব্র অনুভূতি ও গভীর সাধনার আবশ্যক, তাহারা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হইয়া পড়ায় তাঁহার পূর্ব্বসূরিদের সমকক্ষ হইতে পারে নাই।’ (করিম ২০১৩: ২৬০)

আবদুল করিমের আবিষ্কার কয়েকটি বড় বড় প্রশ্নেরও জন্ম দিয়াছে। যেমন অধ্যাপক আহমদ শরীফ জানিতে চাহিয়াছেন — ‘আঠারো শতকের প্রথমার্ধ অবধি মুসলিম সমাজের বাঙলা সাহিত্যচর্চা আধুনিক চট্টগ্রাম বিভাগে বিশেষ করে চট্টগ্রাম জিলায় সীমিত কেন?’ আহমদ শরীফ দেখিতে পাইয়াছেন, ‘গোটা বাঙলাদেশে সেদিনেও অর্থাৎ পনেরো-ষোল-সতেরো শতকে দেশজ মুসলিমের অভাব ছিল না। অথচ সে সব মুসলিমের বাঙলা সাহিত্যাঙ্গনে বিচরণের কোন নিদর্শন মেলে না। এদিকে সতেরো শতক অবধি প্রায় পঞ্চাশ জন কাব্য-কবিতা রচয়িতার সন্ধান পেয়েছি আমরা কেবল চট্টগ্রামেই। আর পেয়েছি নোয়াখালিতে একজন, কুমিল্লায় তিনজন কবি। মুসলিম রচিত সাহিত্যের এ আঞ্চলিক বিকাশের নিশ্চিত কোন কারণ আমাদের জানা নেই।’ (শরীফ ১৯৮৩: ৩৮৮)

মুহম্মদ এনামুল হকের ধারণা কিছুটা ভিন্ন। তিনি মনে করেন বাংলার মুসলমান লেখকদের ‘সৃজনীপ্রতিভা’ ১৭০০ সনের পরেও পুরাপুরি নষ্ট হইয়া যায় নাই। তিনি লিখিয়াছেন:

এই সময়কার মুসলমান কবিদের দ্বারা রচিত বাংলা-সাহিত্যের কোন অংশ না দেখিয়া, অথবা বটতলা হইতে প্রকাশিত কয়েকখানি তথাকথিত ‘মুসলমানী পুথি’ দেখিয়া যাঁহারা বিজ্ঞের ন্যায় মত প্রকাশ করেন যে ‘মুসলমান কবিরা ধর্মমূলক বা আরবী-ফারসী-হিন্দী উপাখ্যানমূলক অনেক কাব্য রচনা করিয়াছেন বটে, কিন্তু সাহিত্য হিসাবে সেগুলি একান্ত মূল্যহীন,’ তাহারা বাংলার মুসলিম সাহিত্য সম্বন্ধে হয় একান্তই অজ্ঞ, নয় একেবারে উদাসীন, নয় সাহিত্যের রস গ্রহণ করিতে নিতান্তই অক্ষম। এ কারণে তাঁহারা সত্যই ক্ষমার পাত্র। (হক ১৯৯৪: ৪৭৪)

মুহম্মদ এনামুল হক (১৯০২-১৯৮২)

মুহম্মদ এনামুল হক (১৯০২-১৯৮২)

এনামুল হক তাই সিদ্ধান্ত করিয়াছেন: ‘বাংলা-সাহিত্যের এই সাধারণ অবনতির হাত হইতে বাংলার মুসলিম সাহিত্যও অব্যাহতি পায় নাই সত্য, তাই বলিয়া পলাশী যুদ্ধের (১৭৫৭) পরবর্তী আরও প্রায় পনের-বিশ বৎসর পর্যন্ত মুসলমানদের মধ্যে যেই সবল বাংলা-সাহিত্যের সৃষ্টি হইয়াছিল, তাহা উপেক্ষার বস্তু নহে। ইহার কোন কোন কবির কাব্য সাহিত্য-হিসাবে ভারতচন্দ্রের কাব্য, অথবা গান হিসাবে রামপ্রসাদের গান হইতে নিকৃষ্ট নহে, সে কথা জোর করিয়া বলা যায়।’ (হক ১৯৯৪: ৪৭৪)

মনে হয় বাংলা সাহিত্যের এই সংকট বিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত কাটিয়া যায় নাই। ১৯১৩ সালের চট্টগ্রাম সাহিত্য সম্মিলনে সর্বসম্মতিক্রমে সর্বমোট আটটি প্রস্তাব গৃহীত হইয়াছিল। তাহার দ্বিতীয় প্রস্তাবটি পাঠ করিলে বুঝা যাইবে ততদিনে সংকটের প্রকৃতি কোন রূপ ধারণ করিয়াছিল। নিচে প্রস্তাবটি পুরা উদ্ধৃত করিতেছি:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঙ্গলা সাহিত্যকে মোহম্মদীয় ভাবাপন্ন করিবার যে কথা তুলিয়াছেন, সে সম্বন্ধে বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদের মাননীয় সভাপতি মহাশয় বাঙ্গালার গবর্ণমেণ্টের নিকট যে মন্তব্য প্রেরণ করিয়াছেন, এই সম্মিলন সর্ব্বান্তঃকরণে তাহার পোষকতা করিতেছেন এবং এ বিষয়ে বাঙ্গালার সাহিত্য-সেবিগণের মনে যে আশঙ্কার উদয় হইয়াছে, তাহা সত্বরে নিরস্ত করিবার জন্য গবর্ণমেণ্টকে সানুনয়ে অনুরোধ করিতেছেন।
প্রস্তাবক —শ্রীযুক্ত যাত্রামোহন সেন।
সমর্থক — শ্রীযুক্ত মুন্সী রওসান আলী চৌধুরী।
অনুমোদক — শ্রীযুক্ত মাননীয় ডাঃ দেবপ্রসাদ সর্ব্বাধিকারী
এবং শ্রীযুক্ত বিপিনচন্দ্র পাল।
সর্ব্ব সম্মতিক্রমে গৃহীত হইল।

(কার্য্য-বিবরণ ১৩১৯: ৪২-৪৩)

‘বাঙ্গালা সাহিত্যকে মোহাম্মদীয় ভাবাপন্ন’ করিতে হইবে কেন? আর ‘মোহাম্মদীয় ভাব’ই বা কি বস্তু? এককথায়, বাংলা সাহিত্য কোন পদার্থ? চট্টগ্রাম সাহিত্য সম্মিলনের গোটা দেড়যুগ আগে — ইংরেজি ১৮৯৬ সালে — নবীনচন্দ্র সেন সাহিত্যক্ষেত্রে প্রতিবেশী মুসলমান সমাজের আগমন দেখিয়া আশঙ্কায় মোটেও শঙ্কিত হন নাই। কায়কোবাদের (১৮৫৭-১৯৫২) কবিতা ‘অশ্রুমালা’ পড়িয়া আলিপুর হইতে নবীনচন্দ্র সেন কবিকে যে চিঠি লিখিয়াছিলেন — দেখা যাইতেছে — তাহার প্রাণধর্ম হইতেও চট্টগ্রাম বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনের নেতারা অনেক দূরে সরিয়া আসিয়াছেন। ‘শ্রীভগবানের কৃপায় ক্ষুদ্র স্বার্থের অন্ধকার’ তখনো তিরোহিত হয় নাই। চারু চট্টগ্রামের নবীন কিরণ সে অন্ধকার তখনো ভেদ করে নাই। মনে হইতেছে আজ একশ বছর পরও নবীনচন্দ্র সেনের চিঠিই হইতে পারে এই প্রবন্ধের উপযুক্ত উপসংহার।

বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনের ষষ্ঠ বা চট্টগ্রাম অধিবেশনের উল্লেখ করিয়া এই প্রবন্ধ শুরু করিয়াছিলাম। শেষও করিব তাহার নমস্য নক্ষত্রের দোহাই দিয়াই।

প্রীতিভাজন,

আপনার ‘অশ্রুমালা’ পরম প্রীতিসহকারে পাঠ করিয়াছি এবং স্থানে স্থানে আপনার অশ্রুর সঙ্গে অশ্রু মিশাইয়াছি। জাতিভেদে সকলই ভিন্ন হইতে পারে, অশ্রু অভিন্ন। যাহার অশ্রু আছে, তাহার কবিত্ব আছে। মানব রোদনমাত্রই কবিত্বময়; অতএব বলা বাহুল্য যে আপনার কাব্যখানির স্থানে স্থানে সুন্দর কবিত্ব আছে। মুসলমান যে বাঙ্গালা ভাষায় এমন সুন্দর কবিতা লিখিতে পারেন, আমি আপনার উপহার না পাইলে বিশ্বাস করিতাম না; অল্প সুশিক্ষিত হিন্দুরই বাঙ্গালা কবিতার উপর এরূপ অধিকার আছে। যেদিন মুসলমান সমাজ হিন্দুদের সঙ্গে এরূপ সুললিত কবিতায় বঙ্গভাষায় অশ্রু বিসর্জন করিবে, সেদিন প্রকৃত প্রস্তাবে বঙ্গদেশের সুদিন হইবে। এমন দিন যদি শ্রীভগবানের কৃপায় ক্ষুদ্র স্বার্থের অন্ধকার তিরোহিত করিয়া কখনও উপস্থিত হয়, আপনার ‘অশ্রুমালা’ তাহার প্রভাত-শিশির-মালা-স্বরূপ বঙ্গসাহিত্যের ইতিহাসে স্থান লাভ করিবে। প্রীতিপ্রার্থী নবীনচন্দ্র সেন। ২.৪.৯৬, আলিপুর। (মোবারক ১৯৯৫: ৩১-৩২)

দোহাই

১.    আনিসুজ্জামান, ‘সার্,’ আনিসুজ্জামান সম্পাদিত, জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাক স্মারকগ্রন্থ, ২য় সংস্করণ (ঢাকা: বেঙ্গল পাবলিকেশন্স, ২০১৫)।
২.    আবদুল করিম, ‘প্রাচীন মুসলিম সাহিত্যের ক্রমবিকাশ ও বৈশিষ্ট্য: চট্টগ্রাম জেলা সাহিত্য সম্মিলনে সভাপতির অভিভাষণ,’ আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ রচনাবলী, আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত, ৩য় খণ্ড (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ২০১৩) পৃ. ২৫৬-৬৪।
৩.    আহমদ শরীফ, বাঙালী বাঙলা সাহিত্য, ২য় খণ্ড (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৮৩)।
৪.    বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলন চট্টগ্রাম, ষষ্ঠ অধিবেশনের কার্য্যবিবরণ (চট্টগ্রাম: মিন্টো প্রেস, ১৩১৯)।
৫.    নবীনচন্দ্র সেন, নবীনচন্দ্র রচনাবলী: আমার জীবন, সজনীকান্ত দাস সম্পাদিত, ৩য় খণ্ড, নতুন ২য় সংস্করণ (কলিকাতা: বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, ১৪১৯)।
৬.    মদনমোহন কুমার, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের ইতিহাস: প্রথম পর্ব (কলিকাতা: বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, ১৯৭৪)।
৭.    মুহম্মদ এনামুল হক, ‘নূতন দৃষ্টিতে পুরানো বাংলা,‘ মুহম্মদ এনামুল হক রচনাবলী, মনসুর মুসা সম্পাদিত, ৩য় খণ্ড (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৪), পৃ. ৪৫২-৮২।
৮.    মোবারক হোসেন, নবীনচন্দ্র সেন (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৫)।

প্রথম প্রকাশ: সুপ্রভাত বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম, ১৬ জানুয়ারি ২০১৬