Tag Archives: আহমদ ছফা

আহমদ ছফার ট্রাউয়ারস্পিয়েল

কার সাধ্য আমাকে ঠেকায়?
আমার সাধনায় ফুল ধরছে, ফল ফলছে।
—আহমদ ছফা (২০১০ : ১৬৫)

জীবনের একপ্রান্তে পৌঁছিয়া আহমদ ছফা ‘লেনিন ঘুমাবে এবার’ (১৯৯৯) নামে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করিয়াছিলেন। পরের বছর প্রকাশিত ‘আহমদ ছফার কবিতা’ নামধেয় সংকলনটি যদি আমলে না আনি তো বলিতে হইবে ‘লেনিন ঘুমাবে এবার’ আহমদ ছফার সর্বশেষ কবিতার বই। এই বইয়ে ‘কবি ও সম্রাট’ নামে একটি কবিতা আছে। আজিকার এই নিবন্ধে এই কবিতাটি প্রসঙ্গে দুইটি কথা বলিতে চাই।

তাহার আগে কবিতা প্রসঙ্গে আহমদ ছফার একটি কৈফিয়ত শুনিয়া লইব। ‘আহমদ ছফার কবিতা’ নামক সংকলনের ভূমিকা উপলক্ষে তিনি একটা জিজ্ঞাসা পেশ করিয়াছিলেন, ‘জীবনের এই পর্যায়ে এসে আমি যখন নিজেকে প্রশ্ন করি—আমি কি কবি? আমি কি উপন্যাস লেখক, প্রবন্ধকার, ছোটগল্প লেখক অথবা অনুবাদক কিংবা শিশু সাহিত্যিক?’ এই জিজ্ঞাসার যে উত্তর তিনি দিয়াছিলেন তাহাও শুনিবার মতো : ‘আমার পক্ষে কোন কিছুই হয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। একটা গভীর অতৃপ্তিবোধ এবং দহনবেদনা আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।’ আহমদ ছফার এই উত্তরের মধ্যে সৌজন্যের প্রকাশ শতকরা একশ ভাগ আছে। তারপরও মনে হয় সৌজন্যই শেষ কথা নয়। অবশ্য অধিক কিছু আছে কিনা সে কথা বলা অপরের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়। ‘লেনিন ঘুমাবে এবার’ বইয়ে ‘কবিতার দোকান’ নামে একটি কবিতাও আছে। ঐ কবিতাটি শেষ হইয়াছে একটি চরণে : ‘আমার সাধনায় ফুল ধরছে, ফল ফলছে।’ আমার ধারণা ‘কবি ও সম্রাট’ কবিতাটিকে এই সাধনার ফুল কিংবা ফলজ্ঞানে গ্রহণ করার সুযোগও আছে।

বাংলাদেশে এই মুহূর্তে যাঁহারা কবিতায় প্রতিপত্তি লাভ ও প্রভাব বিস্তার করিয়াছেন তাঁহারা আহমদ ছফার সাধনাকে মোটের ওপর অগ্রাহ্য করিতে না পারিলেও তাঁহার কবিতা মোটেই গ্রাহ্য করেন নাই। সে স্বাধীনতা তাঁহাদের অবশ্যই আছে। কিন্তু এ দেশের যে সকল মানুষ মনে করেন আহমদ ছফার সাধনাকে অস্বীকার করা মানে এই জাতির সংস্কৃতির সহিত বিশ্বাসঘাতকতা আমিও তাহাদের মধ্যেই পড়ি। কথাটা সরাসরিই জিজ্ঞাসা করিতে চাই : আহমদ ছফাকে কি কবি  পরিচয়েও অস্বীকার করা যায়? জিজ্ঞাসাটির উত্তর তিনি নিজে দিয়াছেন এইভাবে : ‘কবিতা দিয়েই আমার লেখালেখির শুরু। কিন্তু অনবচ্ছিন্নভাবে কবিতা লেখার অভ্যাসটি আমার দীর্ঘদিন ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। কৈফিয়তস্বরূপ আমি একটা কথাই বলতে পারি, জীবনের দায় কবিতার দায়ের চাইতে অনেক বেশি নিষ্ঠুর। শুধু কবিতা নয়, সে সমস্ত রচনাকে সাহিত্যপদবাচ্য লেখা হিশেবে অনায়াসে চিহ্নিত করা সম্ভব তার বাইরেও অনেক ধরনের লেখা আমার কলম থেকে জন্ম নিয়েছে। কখনো সামাজিক দায়িত্ববোধের তাগিদ, কখনো একটি নতুন বিষয়ের প্রতি অধিকার প্রসারিত করার প্রয়াস কিংবা কখনো ভেতরের তাপচাপের কারণে নতুন নতুন বিষয়ের ওপর আমাকে মনোনিবেশ করতে হয়েছে।’

একটা কথাও এখানে অসত্য বলেন নাই আহমদ ছফা। প্রমাণ তাঁহার ‘কবি ও সম্রাট’ নামক কবিতা বা কাব্যনাটিকা। এই কবিতাটির বিষয়বস্তু সামান্যই—দক্ষিণ এশিয়া মহাদেশের অষ্টাদশ শতাব্দীর সংকট। দক্ষিণ এশিয়া মহাদেশের ইতিহাসে ইংরেজি অষ্টাদশ শতাব্দী সচরাচর একটি ক্রান্তিকাল বলিয়া গণ্য হয়। একদা ইতিহাস ব্যবসায়ী ও অন্যান্য বৃত্তিধারী পণ্ডিতেরা বলিতেন এই শতাব্দীটা ছিল মোগল সাম্রাজ্যের পতনের যুগ। কিছুদিন হইল পণ্ডিতদের মতও বদলাইতেছে। অনেকেই বলিতেছেন, এই যুগটা তো নিতান্ত পতনের যুগ ছিল না, ভারতবর্ষের নানান দিকে তখন নতুন নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের অংকুরও গজাইয়া উঠিতেছিল। নতুন নতুন রাষ্ট্র গড়িয়া ওঠার একটা তাৎপর্য তো ইহাও হইতে পারে যে এই মহাদেশে নতুন নতুন জাতিও তখন গড়িয়া উঠিতেছিল।

কিন্তু মানুষ যাহা ভাবে বিধাতা তাহা নাও তো করিতে পারেন। সকলেই জানেন, অষ্টাদশ এবং উনবিংশ এই দুই শতাব্দীতেই আমাদের এই মহাদেশ জাতীয় স্বাধীনতা পুরাপুরি হারাইয়াছিল। ভারতবর্ষের নানান প্রান্তে নানান জাতি গড়িয়া উঠিবার পথে সেদিন প্রতিবন্ধকতা হইয়া দাঁড়াইয়াছিল এয়ুরোপিয়া নানা জাতির হাতে—শেষ বিচারে ইংরেজ জাতির কামানের আঘাতে—এই মহাদেশের সকল জাতির পরাজয়। এই পরাজিতদের মধ্যে প্রধান বলিয়া যে শক্তিকে গণনা করা হয় তাহার পরিচয় সে যুগের অবনতিশীল মোগল সাম্রাজ্য। একটা কথা ভুলিয়া গেলে চলে না। খোদ মোগল সাম্রাজ্যের গর্ভেই সেদিন জাগিয়া উঠিতেছিল নতুন নতুন ভারতীয় জাতীয়তাবাদ। এই ঘটনারই একটা আলামত ছিল খোদ মোগল রাজ দরবারের ভাষা ফারসির জায়গায় উত্তর ভারতের সর্বত্র উর্দু কিংবা যাহাকে বলে বা হিন্দুস্তানি ভাষা তাহার বিকাশ।

এই নিবন্ধের অল্প জায়গার মধ্যে এই বিষয়টির উপর পূর্ণ সুবিচার করা যাইবে না। তবে যে বিষয়টি জানা না থাকিলে আহমদ ছফার কবিতাটির মূল্য নিরূপণ করা কঠিন তাহা এই রকম। ‘কবি ও সম্রাট’ কবিতার নায়ক দুইজন : একনায়ক অবনতিশীল দিল্লি সাম্রাজ্যের সম্রাট আর অন্যজনের নাম সে যুগের শ্রেষ্ঠ কবি মোহাম্মদ তকি মির—যিনি শুদ্ধমাত্র ‘মির’ নামেই অধিক পরিচিত। এই মিরের নাম ধরিয়াই পরের যুগের কবি মির্জা আসাদুল্লাহ খান ওরফে গালিব একদা লিখিয়াছিলেন, ‘গালিব, উর্দু কবিতার একমাত্র ওস্তাদ তুমি নও, লোকে বলে আগের জমানায় মির বলিয়া একজনও ছিল কিন্তু।’ [রেখতা কে তুমহি উস্তাদ নাহি হো গালিব, কেহতে হ্যায় আগলে জমানে মে কোই মির বিহ্ থা]

আহমদ ছফার কবিতার ঘটনাটি—আগেই বলিয়াছি—সামান্য। দরবারের রাজনীতি ও কবির হেনস্তা। এই ঘটনা অসামান্য হইয়া ওঠে যখন আমরা তাহাকে ইতিহাসের দীঘল পটভূমিতে দেখিতে পারি। মির তকি মিরকে সম্রাট দরবারে ডাকাইয়া আনিয়াছেন। তাঁহার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ। এই সকল অভিযোগের মধ্যে আছে গঞ্জিকাসেবন হইতে শুরু করিয়া যুবকের ধর্মকর্মে মতিহরণ পর্যন্ত। অভিযোগের ফিরিস্তি অনুসারে এমনকি কুমারির সতীত্বনাশের কারণও তাঁহার কবিতায় পাওয়া যায়। খোদ সম্রাট তাহার কিছু উচ্চারণ করিতে কসুর করেন নাই :

… অহরহ গাঁজাচণ্ডু খাও, শরাব
খানায় করো নরক গুলজার, রেণ্ডিবাড়ি করো
তুমি নিত্য গতায়াত। সবচেয়ে আপত্তির প্রত্যহ দিচ্ছ
ছেড়ে লাউডগা সাপের মতো অবাধ্য কবিতা।
হৃদয়ের বোঁটা ধরে টান দেয় এ রকম ফলাযুক্ত তীর।
তোমার শব্দের বিষ, উপমাঝঙ্কার কেড়ে নিচ্ছে
যুবকের ধর্মকর্মে মতি। নারীরা নিষিদ্ধ চিজ
বেশি ভালবাসে, তাই সবাই আশঙ্কা করে
তাবত শরিফগৃহে অগ্নিকাণ্ড হবে।

ইতিহাসে যে কবি মির (১৭২২—১৮১০) তকি মির নামে পরিচিত তাঁহার সহিত আহমদ ছফা (১৯৪৩—২০০১) নিজেকে একসারিতে দাঁড় করাইয়া দেখিতেছেন কিনা সে প্রশ্ন আমার মনে জাগিয়াছে। কথাটা আরও একভাবে ভাবা যায়—অষ্টাদশ শতাব্দীর দক্ষিণ এশিয়ার সহিত বিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশের সংকটকে কোন এক জায়গায় তিনি হয়তো তুলনা করিতেছেন। পাঠিকা এই প্রশ্নটাকেই আমার প্রথম প্রস্তাব বলিয়া ধরিয়া লইতে পারিবেন। আমার প্রস্তাব ‘কবি ও সম্রাট’ একটি রূপক কবিতা যেখানে আহমদ ছফা একটি পতনোন্মুখ সাম্রাজ্যের মুখোমুখি একটি উদয়নরত নতুন রাষ্ট্রের সম্ভাব্য নৈতিক ভিত্তির অনুসন্ধান করিয়াছেন।

আমার দ্বিতীয় প্রস্তাব, এই কবিতায় আধুনিক কবিতার গর্ভসঞ্চারের সকল লক্ষণ হাজির আছে। আধুনিক নায়কের নিয়তি স্বর্গের দেবতারা পূর্ব হইতে নিরূপণ করিয়া রাখেন নাই। এই নিয়তির স্রষ্টা একালের ইতিহাস নিজেই। এই নিয়তির নামই জার্মান ভাষার পণ্ডিতেরা রাখিয়াছিলেন ট্রাউয়ারস্পিয়েল (Trauerspiel)। এই কবিতার একমাত্র নায়ক কবি নহেন, সম্রাটও সমান নায়ক মর্যাদার দাবিদার। সমজদার পাঠিকা দেখিবেন, আহমদ ছফার সম্রাট কোনদিকেই কবির চেয়ে কম নহেন। সম্রাটের দ্বিতীয় অভিযোগেই তাহার প্রমাণ মিলিতেছে :

        মির তকি মির, তুমি কবি
আশা করি অনুভবে বুঝে নিতে পারো।
তোমার তাবত কালো জ্বলে ওঠে আরো কালো হয়ে
উচ্চারিত কথার আলোকে। নারী ও পুরুষের
মনের গোপন ঘরে যেই সব বিস্ফোরক দাহ্যবস্তু থাকে
চকিতে চকমকি ঠুকে লাগাও আগুন
যার তেজে আনন্দে কুমারি করে সতীত্বকে খুন।
তুমি স্থির হয়ে একদণ্ড থাক না কোথাও।
নগরে বন্দরে তুলে তীব্র সংবেদন ছুটে যাও
দেশ থেকে দেশান্তরে অশান্ত ঘূর্ণির মতো
যেন এক জ্যান্ত মহামারি।

সম্রাটের আরো অভিযোগ আছে। তাহাদের মধ্যে আছে ধর্ম ব্যবসায়ীদের তাপ ও চাপ দুইটাই। এখানে রাষ্ট্রের অন্তর্গত সংঘাতের কথাই সম্রাটের উদ্বেগ আকারে হাজির হইয়াছে। সম্রাটের ইচ্ছাই সার্বভৌম—কথাটা প্রকৃত প্রস্তাবে কথার কথামাত্র বলিয়া প্রমাণিত হইতেছে। খোদ সম্রাট বলিতেছেন :

ভেবে দেখো, আমাকে ফেলেছো তুমি কেমন মুশকিলে!
মোল্লারা তোমার নামে জুড়েছে চিৎকার,
কাটামুণ্ডু দাবি করে, তা নইলে ধর্ম নাকি
যাবে রসাতলে। সবকটা ধর্মস্থানে
বর্শার ফলার মতো ধারালো চকচকে প্রতিবাদ
উঠছে জেগে। সবাই সম্রাটের কাছে চায়
যোগ্য প্রতিকার—প্রজাদের ধর্মরক্ষা সম্রাটের
কাজ, অতয়েব সব দায় সম্রাটে বর্তায়।

এই সকল অভিযোগ সত্ত্বেও সম্রাট শেষ পর্যন্ত স্বীকার করেন তিনি নিজেও মির তকি মিরের একজন ভক্ত পাঠক। তিনি কবির কল্যাণই কামনা করেন। সর্বোপরি কামনা করেন নিজের সাম্রাজ্যের স্থিতিও। তাই শাস্তির পরিবর্তে কবিকে একটি পুরষ্কারই দিতে চাহিলেন তিনি। বলিলেন :

মির তকি মির, অধিকন্তু বাক্যব্যয়
নেই প্রয়োজন। তোমাকে দাওয়াত করি
চলে এসো দরবারের শান্ত ছায়াতলে।
দরবারই প্রকৃষ্ট স্থান, সমস্ত গুণের ঘটে
সম্যক বিকাশ, পায় সমাদর। এই হিন্দুস্তানে
যেইখানে যত ক্ষমতার বিস্ফোরণ ঘটে—
ধর্মতত্ত্ব শিল্পকলা অথবা বিজ্ঞান—
সম্রাটের উৎস থেকে সমস্ত সম্ভবে।

এই আকস্মিক আমন্ত্রণে দরবারের কায়েমমোকাম রাজকবি, রাজকীয় ভাঁড় ও অন্যান্য লোকজন প্রমাদ গণিতে শুরু করেন। শুদ্ধমাত্র তাঁহাদের ঈর্ষা ও চক্রান্তের কারণেই নহে, নিজের স্বভাববশতও কবি মির তকি মির রাজদরবারে সুস্থ বোধ করিতে পারেন না। তিনি রাজদরবারে যোগদানের এই সনির্বন্ধ অনুরোধ—এই রাজকীয় দাওয়াত—কবুল করিতে পারিলেন না। তাঁহার অস্বীকৃতির একটি কারণ এইভাবে বয়ান করিয়াছেন আহমদ ছফা :

আমি তো দেহাতি লোক
সর্বক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকি, এমন তৌফিক নেই
অক্ষমতা ঢাকি। বুলিতে মাটির গন্ধ, লেবাসে
মিসকিন, ভাঙ্গাচোরা মানুষের সঙ্গে কাটে দিন।
ঝলমলে দরবার কক্ষে যারা আসে যারা যায়
দিব্যকান্তি দিব্যদেহধারী, অশেষ আশিসপ্রাপ্ত
তেজবীর্য ঐশ্বর্যের অংশ অপহারী।
আমি তো সামান্য লোক ঘুরি পথেঘাটে
খুঁজে পাই আপনারে মানুষের হাটে।
যেন নবীন জান্নাতখণ্ড বাদশাহর দরবার
ধুলিমাখা দুচরণস্পর্শে হবে কলঙ্কিত
রক্তবর্ণ গালিচার পাড়। মহামান্য বাদশাহ সালামত
ফিরে যাই নিজ বাসে—চাই এজাজত।

দিল্লিশ্বর মোগল সম্রাট কবিকে তারপরও ঢের বুঝাইয়া সুজাইয়া দেখিলেন, দরবারে আসিয়া আশ্রয় লইবার অনুরোধ করিতে থাকিলেন, কিন্তু কবি কিছুতেই সে অনুজ্ঞা রাখিবেন না। কবির জন্য রাজদরবারে মাথা গুঁজিয়া থাকাটা আত্মহত্যার শামিল। এই কবিতার মধ্যে বিধৃত শিল্প ও রাষ্ট্রের—কবির হৃদয়ধর্ম ও সম্রাটের রাজধর্মের অন্তর্গত বিরোধটি এই সত্যে ধরা পড়িয়াছে। এই বিরোধ কবির পক্ষে ধরা পড়িয়াছে দুই শব্দে। কবি কি চাহেন? স্বাধীনতা কিংবা নিরাপত্তা। সমস্যার মধ্যে একটাই : কবির জন্য নিরাপত্তার অপর নাম মৃত্যু। কবি যদি স্বাধীনতা চাহিবেন তো পাইবেন মৃত্যু, এই মুত্যুর অপর নাম ‘নিরাপত্তা’। আর যদি তিনি চাহেন নিরাপত্তা, তাহা তো পাইবেনই। এই নিরাপত্তার অপর নাম তো—একটু আগেই বলিলাম—আর কিছু নয়, মৃত্যু। কবি বলেন :

সুখ নয় স্বর্গ নয় জগতপ্রাণের মাঝে ঢেলে দেবো প্রাণ।
আমি তো আমার নয়, নেপথ্যে অদৃশ্যশক্তি
আমারে চালায়, ক্ষিপ্রবেগে অর্ধেক অস্তিত্ব যেন
কেড়ে নিয়ে যায়। সম্রাট সংকটত্রাতা—সবিনয়ে
রাখি নিবেদন, সমীচীন নয় পিঞ্জিরায়
বন্দি করা কাননের পাখি।

মন্দভাগ্য কবির পক্ষে রাজদরবারের এহেন সনির্বন্ধ আমন্ত্রণ গ্রহণ করাটা কেন সম্ভব হইল না—সঙ্গত কারণেই এই প্রশ্ন জাগিতেছে। কবি নিজেই বলিতেছেন, ‘আমি তো আমার নয়, নেপথ্যে অদৃশ্যশক্তি আমারে চালায়’। এই অদৃশ্যশক্তিই কবিত্বের গোড়ার কথা। কবিত্ব—সোজা কথায়—কবির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। মির তকি মিরের জবানে উত্তরটা এই রূপ ধরিয়াছে :

জাঁহাপনা, খোদাবন্দ বাদশাহ মেহেরবান
আমার জিন্দেগি হোক আপনার খেদমতে কুরবান।
সম্রাটের আমন্ত্রণ সম্মানের উত্তরীয় হয়ে
সর্বাঙ্গ আবৃত করে রয়েছে জড়িয়ে।
আমি হই তেমন এক মন্দভাগ্য লোক
শিরোপা সম্মান আর উচ্চতর মহত্ত্বগৌরব
যার হৃদয়ধর্মের কাছে মানে পরাভব। সম্বল
হৃদয়মাত্র, নিবেদন তাই টুটাফাটা প্রাণ নিয়ে
অভ্যস্ত জীবনে আমি ফিরে যেতে চাই।

কবি যাহা বলিয়াছেন তাহার সারনাম ‘হৃদয়ধর্ম’। আর এই হৃদয়ধর্মই কবিকে চালায়। সত্যের মধ্যে, এই হৃদয়ধর্ম কবির অপর—এক্ষণে তাহা পরমের রূপ ধরিয়াছে। ইহার জবাবে সম্রাট যাহা বলিয়াছেন তাহা অনেকটা জার্মান তত্ত্বকার হেগেলের কথার সহিত মিলিয়া যায়। গ্রিক পুরাকথার আলোকে ট্রাজেডি বলিতে যাহা বুঝাইত তাহা ছিল অনেকটা এই রকমই। যেখানে দুই প্রবল পরাক্রম পরষ্পর মুখোমুখি, সেখানে দুই শক্তিকেই সমান বিক্রমশীল ধরিয়া লইতে হয় সেখানে সংঘাত অনিবার্য। সম্রাট বলিতেছেন কবির হৃদয়ধর্মের সহিত রাষ্ট্রের রাজধর্মের বিরোধ ক্ষমাহীন।

মির তকি মির, তোমার হৃদয়ধর্ম—
সম্রাটেরও রাজধর্ম আছে। দুই ধর্ম পরস্পর মুখোমুখি
পথে দাঁড়িয়েছে। সম্রাট হৃদয়ধনে ভাগ্যবান
নন, সম্রাটকে চালায় কানুন।

গ্রিক পুরাকথার নিরিখে যাহাকে আমরা ট্রাজেডি বলিয়া জানি তাহার একটা বিশিষ্ট গুণ আছে। সেখানে দেব—দেবতার লীলা বিরাজ করে। শুদ্ধমাত্র বিরাজই করে না তাঁহাদের হস্তক্ষেপে পৃথিবীচারী নরনারীর, নায়ক-নায়িকার দান উল্টাইয়া যায়। গ্রিক ট্রাজেডির নায়ক-নায়িকা—একপ্রকার বলা যাইতে পারে—তাঁহাদের যাহা কিছু আছে তাহা লইয়াই দেবতার বিধানের বিরুদ্ধে লড়াই করিয়া যায়। তাঁহারা ভাঙ্গিলেও ভাঙ্গিতে পারেন, কিন্তু কদাচ মচকাইতে চাহেন না। খোদ এয়দিপাস কিংবা তাঁহার কন্যা আন্তিগোনের কথাই ধরি না কেন। তাঁহারা ভাঙ্গিয়াছেন, কিন্তু মচকান নাই। এয়দিপাস যে তাঁহার পিতাকে খুন করিলেন, মাতাকে দয়িতাস্বরূপ কবুল করিলেন তাহা তো দেবতারাই ঠিক করিয়া রাখিয়াছিলেন। তিনি দণ্ড পাইয়াছেন, কিন্তু সে দণ্ড মাথা পাতিয়া লয়েন নাই। নিজে দোষী—একথা কদাচ কবুল করেন নাই।

একই কথা আন্তিগোনের বিষয়েও বলা যায়। আন্তিগোনে লড়িয়াছেন মাত্র একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়। তাঁহার লড়াই গোটা গ্রিক জাহানের বিধি-বিধানের বিরুদ্ধে। এতকাল ধরিয়া যে বিধিকে আমরা ‘নিয়তি’ (অর্থাৎ নিযতি) বলিয়া আসিতেছি আন্তিগোনে—মাত্র একজন মানুষ—তাহাতে যতি বা ছেদ টানিয়াছেন। গ্রিক ট্রাজেডির এই বিশেষ গুণ অনুসারে মানুষ প্রয়োজনে দেবতার সম্মুখে দাঁড়ায়। সে ভাঙ্গে কিন্তু মচকায় না। এই নীতির নামই বাসনা। বাসনার মৃত্যু নাই। বাসনা পরম।

আধুনিক জমানার গোড়ায়—বিশেষ এয়ুরোপ মহাদেশে—ট্রাজেডির রূপান্তর ঘটিয়াছে। জন্মিয়াছে ‘ট্রাউয়ারস্পিয়েল’ বা ‘দুঃখের দিনের পালা’। এয়দিপাসের সহিত কেহ যদি শেক্সপিয়র প্রণীত ‘হ্যামলেট’ তুলনায় সমালোচনা করেন দেখিবেন ট্রাজেডি আর ট্রাউয়ারস্পিয়েলের পার্থক্যটা কোথায়। মানুষের বাসনা মাত্রেরই তাহার পরের—অর্থাৎ শেষ বিচারে পরমের বাসনা। মানবজাতির ইতিহাসে পরমের নিকটতম তুলনা তাহার ভাষা। বাসনা এই ভাষার মধ্যেই ধরা পড়িয়াছে।

আহমদ ছফার ‘কবি ও সম্রাট’—কবির নিজের ভাষায়—নাট্য সংলাপ বিশেষ। ইহার সহিত তুলনা করিবার মত কীর্তি বাংলা ভাষায় বিশেষ নাই। তাই আমাদের অপোগণ্ড কবিতা ব্যবসায়ীরা যে ইহার তাৎপর্য উপলব্ধি করিতে পারেন নাই তাহাতে বিস্মিত হইবার হেতুও নাই। ইংরেজি পদকর্তা শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’ নাট্য সংলাপের সহিত ইহার তুলনা করা চলে। নায়ক হ্যামলেটের সহিত নায়ক এয়দিপাসের প্রভেদ আছে। এই প্রভেদই ট্রাজেডির সহিত ট্রাউয়ারস্পিয়েলের প্রভেদ। এয়দিপাসকে চালাইয়াছিল দেবতার ইচ্ছা বা নিয়তি আর হ্যামলেটকে চালাইতেছিল তাঁহার হৃদয়ধর্ম বা বাসনা।

আহমদ ছফার মির হ্যামলেটের সহিত তুলনীয় এক চরিত্র। হ্যামলেটের দ্বিধা তো জগদ্বিখ্যাত। মিরের দ্বিধাবিভক্তি অবশ্য অন্যরকম। আহমদ ছফার নাট্য সংলাপটির নামেই প্রকাশ ইহার নায়ক দুইজন : কবি ও সম্রাট। আসলে কবি ও সম্রাট মোটেও দুইজন নহেন—এই দুইজন একই মিরের দুই রকম প্রকাশ বৈ নয়। ট্রাউয়রস্পিয়েলের নায়কেরা এই দ্বিধার মূর্তিস্বরূপ। আহমদ ছফা মিরকে যেমন কবি ও সম্রাট আকারে দ্বিধাবিভক্ত করিয়াছেন তেমনি নিজের জীবনপাত্রের মধ্যেও মিরের পদার্থ ঢালিয়া দিয়াছেন। এইভাবে ‘কবি ও সম্রাট’ আহমদ ছফার অ্যালেগরি বা পরকথায় পরিণতি মানিয়াছে।

আহমদ ছফার কবিতা পড়িবার উপক্রমণিকা আকারে যে তিনটি প্রস্তাব এখানে পেশ করিয়াছি তাহার মূলসূত্র আমি জার্মান পণ্ডিত বাহ্ল্টার বেনিয়ামিন ও ফরাশি শিক্ষক জাক লাকাঁর লেখায় পাইয়াছি। আহমদ ছফার ট্রাউয়ারস্পিয়েল বা দুঃখের দিনের পালার শেষ এখনও হয় নাই। এখনও প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ রহিয়াছে।

দোহাই

১. আহমদ ছফা, ‘কবি ও সম্রাট,’ আহমদ ছফার কবিতা (ঢাকা : শ্রীপ্রকাশ, ২০০০), পৃ. ১২-৩৫।
২. আহমদ ছফা, ‘কবিতার দোকান,’ আহমদ ছফার কবিতাসমগ্র, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত (ঢাকা : খান ব্রাদার্স, ২০১০), পৃ. ১৫৯-১৬৫।
3. Walter Benjamin, The Origin of German Tragic Drama, John Osborne, trans., reprint (London : Verso, 2003).
4. Saifuddin Ahmad, ‘Bas ke samjhe hain isko sare ‘awam : The Emergence of Urdu Literary Culture in North India,’ Social Scientist, vol. 42, no. 3/4 (March-April 2014), pp. 3-23.
5. Fritz Lehman, ‘Urdu Literature and Mughal Decline,’ Mahfil, vol. 6, no. 2/3, (1970), pp. 125-131.
6. Muhammad Sadiq, A History of Urdu Literature, 2nd ed. (Delhi : Oxford University Press, 1995).

 

২৯ জুন ২০১৮, এনটিভি

Spirit of liberation war

Translated by Tahmidal Zami

Recently a debate has cropped up over the finer points of the question what the spirit of liberation war really means. But I hope that no one would contest some very basic points. The most fundamental point would be ‘liberation’ or the right of any nation or people to self-determination as recognized by international law.

After the March 25 midnight, that is, in the early hours of March 26, Bangladesh practically declared independence. After two weeks, the provisional government was constituted. This very fact bears out that Bangladesh was not prepared – at least not completely – for proclamation of independence. This government known as Mujibnagar Government issued ‘the Proclamation of Independence’ on 10th day of April, 1971. Accepting this Proclamation of Independence as a document of evidence would resolve the debate over a few issues. The proclamation of 10th April was issued by and under the authority of Constituent Assembly of Bangladesh composed of representatives elected in the free elections held in Bangladesh from 7th December, 1970 to 17th January, 1971. The representatives were elected to the Pakistan National Assembly and East Pakistan Provincial Assembly.

I

The Proclamation of 10th April 1971 also offers an explanation of the reasons for which Bangladesh declared independence. According to this explanation, the representatives of Bangladesh did not proclaim independence spontaneously or unilaterally. They were compelled to proclaim independence, because ‘instead of fulfilling their promise and while still conferring with the representatives of the people of Bangladesh, Pakistan authorities declared an unjust and treacherous war.’

In the very Proclamation of 10th April it was stated that ‘Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, the undisputed leader of 75 million of people of Bangladesh, in due fulfilment of the legitimate right of self-determination of the people of Bangladesh, duly made a declaration of independence at Dacca on March 26, 1971, and urged the people of Bangladesh to defend the honour and integrity of Bangladesh.’ Unfortunately in the times that followed a few kicked off a controversy on the question of Proclamation of Independence. Has anyone so far challenged the authenticity of the Proclamation of 10th April? If not, the question follows: which particular points of the Proclamation are they challenging?

The question would arise: why was independence proclaimed in the night of 26th March? The Proclamation of 10th April provides an explanation of that as well. The Proclamation lays out the explanation in five points.

Firstly, ‘free elections were held in Bangladesh from 7th December, 1970 to 17th January, 1971, to elect representatives for the purpose of framing a Constitution [for Pakistan],’

Secondly, ‘at these elections the people of Bangladesh elected 167 out of 169 representatives belonging to the Awami League,’

Thirdly, ‘General Yahya Khan [the President of Pakistan] summoned the elected representatives of the people to meet on the 3rd March, 1971, for the purpose of framing a Constitution,’

Fourthly, ‘the Assembly so summoned was arbitrarily and illegally postponed for an indefinite period [by the Pakistani Authorities],’

And finally, ‘instead of fulfilling their promise and while still conferring with the representatives of the people of Bangladesh, [the] Pakistan authorities declared an unjust and treacherous war.’

স্বাধীনতার ঘোষণা স্বাধীনতার ঘোষণা

What has been said so far – that is, ‘an unjust and treacherous war’ prosecuted by Pakistan – was the necessary and sufficient reason behind Bangladesh’s proclamation of independence. Pakistani authorities did not stop at mere declaration of war. From the midnight of 25th March, they began ‘continuously committing numerous acts of genocide and unprecedented tortures, amongst others on the civilian and unarmed people of Bangladesh.’

It was owing to Pakistan’s imposition of the unjust war and committing acts of genocide and other forms of repression that Bangladesh declared independence and the representatives of the people of Bangladesh issued the Proclamation of Independence. Through this proclamation, they laid down the lawful basis of a just war. In looking back, it therefore can be said that in response to the war, genocide, and repression waged by Pakistani authorities, the people of Bangladesh began the war of liberation to establish their effective control over the territories of Bangladesh. In this war, the critical asset of the people was their ‘heroism, bravery and revolutionary fervour’.

II

What has been said so far, i.e. just war in the face of unjust war – is only half of the truth. The question would arise: what would be the vision of the state that would be established through the just war? The Proclamation of 10th April offers an answer also to this question. The Proclamation stated that the reason that held universal sway in establishing People’s Republic of Bangladesh was ‘to ensure for the people of Bangladesh equality, human dignity and social justice’.

The people of Bangladesh engaged in armed struggle to establish effective control over the territories of Bangladesh. The unconditional surrender of Pakistani authorities on 16th December, 1971 made that control definitive. The liberation war of Bangladesh achieved victory. The spirit that inspired all classes of people of Bangladesh from 26th March to 16th December, 1971 – which finds its expression in the Proclamation of 10th April – is precisely the spirit of liberation war.

After gaining the legitimate right of national self-determination, i.e. independence, we still have to draw up the balance sheet to see what we have achieved. Why was martial law clamped over the country within four years of independence? We must ask this question. Why those who were the elected representatives of the people’s assembly or National Parliament for the four years could not exercise their ‘heroism, bravery and revolutionary fervour’ to establish their control in resisting martial law? This is another question to ask.

Since then, 15 years passed under military rule in one form or another. Since 1990 – excluding two years – legitimate system of government has been reinstated. But has there been any salving of the people’s misery and suffering? Have ‘equality, human dignity and social justice’ been established? If not, who is responsible for the lapse? The spirit of the liberation war lies not in evading these questions, but in asking them.

Pakistan became ‘independent’ on the 14th August, 1947. A little over ten years inside independence, i.e. on 27th October, 1958, military rule was thrust upon the country for the first time. In late 1964, Dr. Muhammad Shahidullah, keeping the chain of events in mind, wrote: ‘What fruit have we plucked with our independence? We profess our gratitude to the United States and other allied nations with whose financial and other support we have made a certain degree of progress. That we have not been able to achieve complete success is chiefly due to the fact that those who were at the helm of government prior to the declaration of martial law on 27th October, 1958 were servants of the English. Even after independence, they could not quite rise above the servile mentality.’ Muhammad Shahidullah also added another sentence to this: ‘Then again those who were the elected representatives of the National or Provincial Assembly were – save a few exceptions – firm believers in the principles of nepotism and pocketism, which as understood in Bengali means, patronage of one’s own kin and filling of one’s own pockets.’

Dr Shahidullah identified corruption as the main driving factor that made military rule necessary in Pakistan. But he was also aware that mere change of ruler does not bring about change in the nation’s lot. Military rule in Pakistan did not change the lot of the people of that country. The reason behind this – according to Dr Shahidullah – was the ignorance of the people of Pakistan. It would not be amiss to quote further from his powerful words: ‘For a blind man, day or night makes no difference. For an ignoramus, liberty and bondage are all the same. What can we expect when only four to five percent of the population literate in truth? An ignoramus too counts no more than a minor. Kinsfolk of a minor face no trouble in deceiving him/her to fill their pockets at his/her expense. Same thing happened in this country.’

It has been 43 years since Bangladesh has achieved independence. Bangladesh has also seen her share of progress. But what has been the change to the fortune of people – who are the society’s base and to whom the supreme power of Bangladesh belongs? In these 43 years – setting other questions aside, let us at least ask this question – what percentage of the people has been truly educated?

III

We assert on a regular basis that three million people lost their lives in the liberation war of Bangladesh. Yet, in the ensuing 43 years we have not been able to prepare a complete list of the martyrs. How then would we ensure ‘equality, human dignity and social justice’? Ahmed Sofa, the great writer, raised this question in an article published on 12th December, 2000. As of today, I have not received an adequate response to this question yet. The question thus merits some elaboration.

Ahmed Sofa was born in the Patiya upazila of the Chittagong (south) district. The name of his village is Gachbaria. It has fallen under the newly constituted Chandanaish upazila. During the liberation war, he left the country and going via Agartala, took refuge in Calcutta. At the end of the war, he came back first to Dhaka, then to his village. What followed has been described in his article: ‘Since 1972, whenever I have visited my village, I tried to make the village people agree to one matter. I repeatedly solicited the local people – including the [Union Parishad] members, Chairmen, and Matabbars – on the issue: I tried to make them understand that around 100 people of our village lost their lives at the hand of the Pakistani Army, Razakars, and Al-Badrs. The Chittagong-Cox’s Bazar road [also known as Arakan road] passes across the heart of our village. I put forth the proposal that a billboard should be planted permanently at the side of the road carrying the names of the 100 people killed in the liberation war.’

‘I proposed,’ so went on Ahmed Sofa, ‘that another line should be written on the billboard. It was like this: Wayfarer, unbeknownst to you, the village which you happen to be passing by had one of its children lay down his/her life for the liberation of the land! I have been harping on this proposition ever since 1972. Initially people would try to give me an audience with due attention. But after three or four years when I would still bring it up, people would think that I was unnecessarily trying to embarrass them. I think, if I present the proposal once again today, people would reckon me to have gone totally mad.’

What, therefore, does ‘spirit of liberation war’ signify? Why, it was not only about Ahmed Sofa’s own village – the same situation prevails all over the country. He wrote: ‘In course of my work I have had to visit a good deal around 8 to 10 districts of North Bengal, central Bengal, and South Bengal. Wherever I went, I did ask people whether anything took place there during the liberation war. In many villages the inhabitants told me that, ‘Punjabis did not set their foot in our village at all.’ People in other villages said the Punjabis did come, burnt down houses, and killed many people. I would ask, do you happen to know the name and identity of those who were killed? The villagers would respond enthusiastically, ‘why shouldn’t we? Son of so-and-so, brother of so-and-so, grandson of so-and-so, etc., etc.’

Yet, why could not anyone prepare a comprehensive list of the martyrs of the liberation war? Thus deplored Ahmed Sofa: ‘I would then say: why do you not write down the names of the people killed in the liberation war at the wayside? When anybody would pass through your village, s/he would read it and this would (then) give rise to a sense of respect in the visitor’s mind for your village. The villagers would just look at me with their mouths agape, as if unable to make sense of what I was suggesting.’

At this point our great writer is showing what has happened to the ‘spirit of liberation war’. Ahmed Sofa wrote: ‘In the different places of Bangladesh that I visited, nowhere could I find the names of the martyrs of the liberation war to have been written down with care and respect. It would not really take too much of an effort to undertake such an enterprise. It would take only a little patriotism and a little respect for the people killed in the liberation war.’ Has it been too late to mend? Could we not set the matter right today? If we cannot, then we must admit that no such thing as the ‘spirit of the liberation war’ survives today.

March 10, 2014

References

  1. Professor Dr. Muhammad Shahidullah, ‘Swadhinata,’ Dainik Paygam [Bengali daily], Biplab Sankhya [Revolution Day issue], 20 October 1964, 9 Kartik 1371 BS.
  2. Ahmed Sofa, ‘Muktijuddher Chetona Kothay Jonmay?’ Khoborer Kagoj [Bengali weekly], Year 19, issue 50, 12 December 2000, 28 Agrahayan 1407 BS.
  3. ‘The Proclamation of Independence,’ Mujibnagar, Bangladesh, dated 10th day of April, 1971, Seventh Schedule [Article 150 (2)], Constitution of the People’s Republic of Bangladesh, reprint, October 2011.

 

[The original article in Bangla was published by Bdnews24.com on March 26, 2014]

আহমদ ছফার নজরুল

আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, নজরুলের কাছে বাঙালি মুসলমান সমাজের ঋণ শোধ করিবার মতন নহে। তিনি এই সমাজের ‘ভাষাহীন’ পরিচয় ঘুচাইলেন। তাহাদের ঘরের ভাষাকে সাহিত্যসমাজে প্রতিষ্ঠা দিলেন। সেই প্রতিষ্ঠা বাঙালি হিন্দুসমাজ স্বীকার করিয়া লইতে বাধ্য হইলেন। আর নজরুলের কাছে বাঙালি হিন্দুদেরও ঋণ আছে। তিনি বাংলাভাষা ও বাংলা সাহিত্যকে সাম্প্রদায়িকতার হাত হইতে উদ্ধার করিলেন। দেখাইলেন বাংলা হিন্দু ও মুসলমান দুই সমাজেরই ভাষা। বাংলাভাষার নতুন বিকাশ এই জায়গা হইতে নতুন করিয়া শুরু হইতে পারে। এই নতুন ধারার পথের কড়ি (বাঙালি জাতির নতুন সংজ্ঞা) নজরুল ইসলামের রচনা হইতে সংগ্রহ করিতে হইবে। এই কীর্তিরই অপর নাম নজরুল ইসলাম।


কাজী নজরুল ইসলামএই ঢাকা শহরে কিছু লোক আছেন যাহারা আমাকে—এই নিবন্ধের অধম লেখককে—সাম্প্রদায়িক এমনকি কখনও ‘মৌলবাদী’ বলিয়াও আনন্দ লাভ করেন। তাঁহাদের এই উপহারকে আমি কখনও বা বিধাতার আশীর্বাদ বলিয়া গ্রহণ করি। কারণটা খুলিয়া বলা দরকার।

যখন দেখি এই মনীষীরা আহমদ ছফার মতন মহাত্মা ব্যক্তিকেও একই ধরনের উপাধিরত্নে বিভূষিত করিতে কুণ্ঠিত হইতেছেন না তখন আমরা সামান্য মজুর লেখক মানুষ কেন মন খারাপ করিতে যাইব। আর কে না জানে এমনও দিন ছিল যখন বাংলাদেশের মুসলমান সমাজের কোন কোন অংশ মহাসমারোহে নজরুল ইসলামকে ‘কাফের’ ফতোয়া দিতে যেমন কসুর করেন নাই, তেমনি কিছু ‘নোংরা হিন্দু ও ব্রাহ্ম লেখক’ও ঈর্ষাপরায়ণ হইয়া তাঁহাকে ইতর ভাষায় গালিগালাজ করিতেন। খোদ নজরুলের কথায়—কয়েকজন গোঁড়া ‘হিন্দুসভা’ওয়ালা তাঁহার নামে মিথ্যা কুৎসাও রটনা করিতেন।

ইঁহাদের কথা মনে রাখিয়াই তো নজরুল ইসলাম বলিয়াছিলেন, ইহাদিগকে আঙ্গুল দিয়া গণনা করা যায়। ইঁহাদের আক্রোশ সম্পূর্ণ সম্প্রদায় বা ব্যক্তিগত। এতদিনে সকলেই জানেন ইঁহাদের মধ্যে অনেকেই বিখ্যাত লেখক—মোহিতলাল মজুমদার, সজনীকান্ত দাস বা নীরদচন্দ্র চৌধুরী প্রভৃতি। ইবরাহিম খাঁকে লেখা এক পত্রযোগে নজরুল ইসলাম পরিষ্কার করিলেন, মাত্র এই কয়েকজনের অবিচারের জন্য সমস্ত হিন্দু সমাজকে তিনি দোষ দিতেছেন না এবং দিবেনও না। তাহা ছাড়া নজরুল লিখিলেন, —আজকালকার সাম্প্রদায়িক মাতলামির দিনে’, —আমি যে মুসলমান’—ইহাই হইয়া পড়িয়াছে অনেক হিন্দুর কাছে অপরাধের সামিল, —আমি যত বেশি অসাম্প্রদায়িক হই না কেন।’

নজরুল ইসলাম এই কথা লিখিয়াছিলেন সত্য সত্যই বড় দুঃখে। প্রমাণ ইবরাহিম খাঁ সাহেবের লেখা ১৯২৫ সালের চিঠির উত্তর তিনি দিয়াছিলেন প্রায় তিন বছর পর, তাহার ভাষায় ‘১৯২৭ সালের আয়ু’ যখন ফুরাইয়া আসিয়াছে তখন। ততদিনে মানে ১৯২৭ সালের ডিসেম্বর কি ১৯২৮ সালের জানুয়ারিতে।

কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী এই মূঢ়তার অধ্যায় বেশিদিন স্থায়ী হয় নাই। হিন্দু সমাজের অগ্রণী মনীষীরা নজরুল ইসলামের শক্তি স্বীকার করিয়া লইয়াছিলেন। আর মুসলমান সমাজের মধ্যেও যাঁহাদের চোখ ফুটিয়াছিল তাঁহারাও নজরুল ইসলামের মধ্যে আপনাদের ঘরের মানুষ খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন।

এই উদাহরণটি আমি সবসময়ই মনে রাখি। যাহারা নজরুল ইসলামের মতন আত্মভোলা মানুষকেও সাম্প্রদায়িক বলিতে দ্বিধা করেন নাই, তাঁহাদের ভাবশিষ্যরা আহমদ ছফাকেই বা ছাড়িবেন কেন? এই চিঠিরই আরেক স্থলে নজরুল লিখিয়াছিলেন, মুসলমান সমাজ যে আমাকে ‘কাফের’ খেতাব দিয়াছে তাহা আমি মাথা পাতিয়া গ্রহণ করিয়াছি। ইহাকে আমি কোনদিন অবিচার বলিয়া অভিযোগের বিষয় করি নাই। কারণ আমার আগে ওমর খৈয়াম, শামসুদ্দিন হাফেজ কিংবা মনসুর আল হাল্লাজকেও লোকে ‘কাফের’ বলিয়াছিল। কাফের হইতে হইলে এই রকম বড় হইতে হয়। নজরুল তাই লজ্জা পাইয়াছিলেন। ‘কাফের’ আখ্যায় বিভূষিত হইবার মতন বড় তো তিনি হয়েন নাই!

আহমদ ছফা সম্বন্ধে বর্তমান বাংলা সাহিত্যের অভিভাবকরা যে শীতল ভাব দেখাইতেছেন তাহাতে আমার বারবার সেই ১৯২০ সালের যে দশক, তাহার কথাই মনে পড়িতেছে। আমার ধারণা মহাত্মা আহমদ ছফাও বিষয়টা জানিতেন।

আহমদ ছফা

আহমদ ছফা

যৌবনের প্রারম্ভে, ১৯৬৯ কি ১৯৭০ সালে, বিশ্ববিদ্যালয় কি বাংলা একাডেমীর বৃত্তি পাওয়ার আশায় আহমদ ছফা প্রথমে ইংরেজিতে একটি প্রবন্ধ (নাম ‘লিটারারি আইডিয়েল্স্ অব বেঙ্গল’) লেখেন। লেখাটি ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী সম্পাদিত বাংলা একাডেমীর ইংরেজি পত্রিকায় প্রথম ছাপা হয়। বাংলাদেশ কায়েম হইবার পর আহমদ ছফা সেই প্রবন্ধটির স্বাধীন তর্জমা করেন ‘বাংলার সাহিত্যাদর্শ’ নামে। ঐ প্রবন্ধে তিনি বাংলার সাহিত্যাদর্শ বলিতে চারিজন বড় লেখকের নাম উল্লেখ করেন। প্রথমে মাইকেল মধুসূদন দত্ত, দুই নম্বরে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, তৃতীয় স্থানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সবশেষে কাজী নজরুল ইসলামের নাম নিলেন তিনি।

‘বাংলার সাহিত্যাদর্শ’ প্রবন্ধের উপসংহারে আহমদ ছফা সিদ্ধান্ত করিয়াছিলেন, আমাদের সাহিত্যের এই পর্যন্ত যত আদর্শ দাঁড়াইয়াছে তাহাদের সর্বশেষ আদর্শ নির্মাতা কাজী নজরুল ইসলাম এবং শ্রেষ্ঠ কবিদের মধ্যে তিনিই সর্বশেষ। আহমদ ছফা লিখিলেন, কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মের ‘পূর্ণ মূল্যায়ন’ তখনও হয় নাই।

সেই অপূর্ণ মূল্যায়নের পাতা পূর্ণ তিনিও সেই দিন করেন নাই। তবে কিছু দিকচিহ্ন তিনি রাখিয়া গিয়াছিলেন সেখানেও। আহমদ ছফার লেখায় পড়ি, নজরুল ইসলামের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সাহিত্যে অনেক কয়টি পরিবর্তন ঘটিয়া যায়। এক নম্বরে তাহার আবির্ভাব মাত্রই বাংলা কবিতার যাহাকে বলে ‘ভরকেন্দ্র’ তাহার পালা বদলাইয়া গেল। কবিতা ‘গজদন্ত মিনার’ ছাড়িয়া রাজপথে নামিয়া আসিল। স্বরূপ প্রকাশ করিল সমাজশক্তির শরিক হিসাবে। সমাজের নির্যাতিত সাধারণ কবিতায় স্বীকৃতি পাইলেন। কাজী নজরুলের কবিতা তাহাদের ভাগ্যলিপি আকারে লেখা হইল।

বিশেষ মুসলমান সাধারণের অভিজ্ঞতা বাংলা সাহিত্যে যথাযথ যোগ্যতায় রূপ পাইল। আহমদ ছফার চোখেও স্পষ্ট হইল ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কিত পুরাণ ও রূপকথা, মুসলমান বাড়িতে ব্যবহার্য আরবি, ফারসি, উর্দু শব্দসম্ভার এন্তার ব্যবহৃত হইল তাঁহার লেখায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের দুই প্রধান সমাজ হিন্দু ও মুসলমানের অভিজ্ঞতা ও বাসনার আশ্চর্য সমন্বয় তিনি করিতে সমর্থ হইলেন। বাংলা গদ্যেও তিনি নতুন পাতা খুলিলেন। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, বাংলা গদ্যে যাঁহারা ‘আঞ্চলিক’ ভাষা ব্যবহার করিয়াছেন নজরুল তাঁহাদের পথিকৃৎমণ্ডলীর সদস্য।

এককথায়, মুসলমান কবি, হিন্দু-মুসলমান কবি ও মার্কসপন্থী—কবি যুগপৎ এই তিন খেতাব তাহার প্রাপ্য। আহমদ ছফার বিচারে এই তিন পরিচয়ই তিনি একসঙ্গে কাঁধে লইবার যোগ্য হইয়া উঠিলেন। আহমদ ছফার কথাটি অপূর্ব—এমন দাবি আমি করিতেছি না। শুধু বলিতেছি আহমদ ছফা এই বক্তব্য মানিয়া লইয়াছিলেন। আহমদ ছফার আগে অনেকেই বিশেষ করে আবুল কালাম শামসুদ্দিন ও মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী এই প্রস্তাবের কাছাকাছি কথা বলিয়া রাখিয়াছিলেন।

খুব অল্প কথায় আহমদ ছফা বলিতে পারিয়াছেন যে, জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসুর মতন পাশ্চাত্য ব্যবসায়ী কবিকেও একদিন রবীন্দ্রনাথের সর্বগ্রাসী প্রভাব হইতে বাহির হইয়া আসিবার তাগিদে ধরিয়াছিল। তখন নজরুল ইসলামই তাহাদের আশ্রয়স্থল ছিলেন।

অন্যদিকে সুকান্ত ভট্টাচার্য কিংবা সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রভৃতি কবি যাহারা ‘মার্কসবাদী’ বলিয়া খ্যাত হইয়াছেন তাহারাও নজরুল ইসলাম ছাড়া কল্পনীয় নহেন। আহমদ ছফার মতে এই বিপ্লবের কবিকুলও নজরুল ইসলামের ভাব ছাড়াইয়া যাইতে পারেন নাই।

নজরুল ইসলাম মুসলমান কবি কিন্তু মাত্র মুসলমানের বা শুদ্ধ এসলামী পুনর্জাগরণের কবি ছিলেন না। এখানেই তাঁহার সহিত ফররুখ আহমদ আর তালিম হোসেনের মতো কবিকুলের ব্যবধান। তাঁহারা যেখানে বন্দী, নজরুল ইসলাম সে জগতের মুক্তবিহঙ্গ।

জীবনের উপান্তে আসিয়া—প্রায় কুড়ি বছর পর আহমদ ছফা নজরুল ইসলাম সম্বন্ধে আর একটি বড় প্রবন্ধ লিখিয়াছিলেন। নাম ‘নজরুলের কাছে আমাদের ঋণ’। এই প্রবন্ধটিতে তিনি আরও কিছু কথা যোগ করিলেন। এইবার তিনি নজরুলের ভাষা হইতে যাত্রা করিলেন। বিশ বছর আগেও ছফা খেয়াল করিয়াছিলেন নজরুলের ভাষায়—গদ্য ও পদ্য উভয় আকারেই নতুন হাওয়ার দোলা। নতুন প্রবন্ধেও তিনি নজরুল ইসলামের কবিতার উৎকর্ষ বা অপকর্ষ নিরূপণের চেষ্টা করিলেন না। শুদ্ধ ভাষার প্রশ্নেই কথা বলিলেন।

আহমদ ছফার প্রস্তাবানুসারে, কলিকাতার উইলিয়াম দুর্গ হইতে যে বাংলা ভাষাটি গিরিগাত্রের সংকীর্ণ স্রোতস্বিনীর মতো বাড়িতে বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় পরিণতি মানিয়াছিল, ছফার রূপক মোতাবেক ‘ভরাযৌবনা প্রমত্তা পদ্মার আকার’ ধারণ করিয়াছিল, নজরুল ইসলাম সেই ভাষারই সাধক—এ সত্যে সন্দেহ নাই। কিন্তু নজরুল ইসলাম ভাষাকে যেমনটি পাইয়াছিলেন তেমনটি ছাড়িয়া দেন নাই। তিনি বাংলা ভাষার গতিপথে নতুন ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করিয়া দিলেন।

সকলেই জানেন, নজরুল ইসলাম বাংলাভাষায় বিস্তর আরবি-ফারসি শব্দ এস্তেমাল করিয়াছিলেন। সেই অপরাধে কেহ কেহ তাহাকে অপরাধীও করিয়াছিলেন। তাহার স্মৃতি ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায় আছে :

‘আমপারা’-পড়া হামবড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মে’রে!
হিন্দুরা ভাবে, পার্শী শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে!

আরবি, ফারসি শব্দের ব্যবহার বাংলা কবিতায় নজরুল ইসলামই প্রথম করেন নাই। তিনি জানিতেন, তাঁহার বহু আগে ভারতচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও সত্যেন্দ্রনাথ প্রভৃতি একই কাজ দেদার করিয়া গিয়াছেন।

তাহা হইলে, নজরুল ইসলামের নতুন নিশানটা কোথায় সে জওয়াব ‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ’ প্রবন্ধে পাওয়া যায়। কবি লিখিতেছেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ সুদ্ধ অনেক সাহিত্য সাধক ভুলিয়া গিয়াছেন যে, ‘বাংলার কাব্যলক্ষ্মীর ভক্ত অর্ধেক মুসলমান।’ তাহারা এই সকল সাহিত্যিকের নিকট শুদ্ধ টুপি আর আচকানই দাবি করিতেছেন না। চাহিতেছেন মাঝেমধ্যে বেহালার সঙ্গে সারেঙ্গীর সুরও শুনিতে। শুনিতে চাহিতেছেন ফুলবনের কোকিলের গানের বিরতিতে বাগিচায় বুলবুলির সুর।

আহমদ ছফা এই বেদনার মর্ম সঠিক ধরিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, মোহিতলাল মজুমদার কিংবা সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার ছিল নিছক নিরীক্ষার ধারা। অথচ ‘কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যে ক্রিয়াশীল একটা ঐতিহাসিক কর্তব্যবোধ।’ আহমদ ছফার বয়ান অনুসারে, নজরুল ইসলাম আপনকার কাব্যভাষা তৈয়ার করিবার জন্য দেশে তৎকালীন প্রচলিত ভাষারীতির ‘পাশাপাশি’ গৌণভাবে হইলেও, মুসলমান লিখিত পুঁথিসাহিত্যের ভাষাশৈলীটির দ্বারস্থ হইয়াছিলেন। তাহার সৃষ্টিশীলতার স্পর্শে পুঁথিসাহিত্যের ভাষার মধ্যে নতুন একটা ব্যঞ্জনার সৃষ্টি হইয়াছে।

অনেকে এই প্রশ্নে আহমদ ছফার সহিত একমত পোষণ করিবেন না। হুমায়ুন কবির পুঁথিসাহিত্যের কথা তুলিয়া নজরুল ইসলাম ও জসীমউদ্দীন উভয়কেই সামন্ত যুগের কবি বলিতে পিছপা হন নাই। হয়তো সেই বেদনা মনে রাখিয়াই একদিন জসীমউদ্দীন বলিয়াছিলেন, নজরুল ইসলামের মধ্যে পুঁথিসাহিত্যের কোন আছর ঘটে নাই। তিনি পুঁথিসাহিত্যের ‘মানসপুত্র’ নহেন। প্রকৃত সত্যের জন্য আমরা শুধু নজরুল ইসলামের জীবনীনির্ভর যুক্তির উপর দাঁড়াইব না। পুঁথির সহিত নজরুল ইসলামের পরিচয় তো ছিলই। কিন্তু তিনি নিছক পুঁথির লেখক হইতে চাহেন নাই। কিন্তু তাহার লেখা বাংলা আলাদা হইতেছে যে গুণে, তাহার মধ্যে পুঁথিসাহিত্যের একটা হিস্যা আছে। এই বক্তব্য আহমদ ছফার।

পলাশির যুদ্ধ পর্যন্ত সময়ে বাংলাভাষা যতদূর বাড়িয়া উঠিয়াছিল তাহাতেই আরবি-ফারসি বা যাবনী শব্দ বেশ মিশাল হইয়া যায়। যুদ্ধের পরও সেই ধারা বেশ কিছুদিন বহিয়া যাইতেছিল। ইংরেজ প্রশাসন ভাষার উপর হাত দিতেই—আঠার শতকের শেষ নাগাদ—বাংলাভাষার আরেকটা বাঁক তৈরী হইল। সরকারি মনীষীরা বাংলা হইতে যাবনী শব্দ তাড়াইবার কর্মসূচী সেলাই করিলেন। তাঁহাদের চেষ্টা সম্পূর্ণ সফল হয় নাই, কিন্তু তাহার ছাপ এখনও বাংলায় থাকিয়া গিয়াছে।

দুঃখের মধ্যে, ইংরেজ আমলে বাংলায় শিক্ষাদীক্ষার প্রসার সীমিত থাকায় এই ভাষা-সংস্কার কর্মসূচীও সর্বত্রগামী হয় নাই। কিন্তু বিচিত্রপথে গিয়াছে একথা স্বীকার করিতে দোষ নাই। মুসলমান সমাজের একাংশ যখন বাংলাভাষায় লিখিতে শুরু করিল তখন তাহাদের আশ্রয় হইল এই নতুন ভাষাই। ওদিকে মুসলমান কৃষক সমাজে এখনও পুরানা ভাষার—পুরানা রীতির জোয়ার।

মুসলমান লেখকরা—যেমন কায়কোবাদ বা মীর মশাররফ হোসেন—ইংরেজি যুগের বাংলা ভাষায় লিখিতে গিয়া কিছু সমস্যায় পড়িলেন। প্রতিবেশী হিন্দু সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য হইতে হইলে, তাহাদের উপহাসের পাত্র না হইতে চাহিলে, কিছু কিছু সীমানা মানিয়া চলিতে বাধ্য বোধ করিলেন। নহিলে আপন সমাজে, পরিবারে, সংসারে সচরাচর ব্যবহৃত আরবি-ফারসি শব্দ তাহাদের রচনায় যতটা সম্ভব পরিহারের চেষ্টা কেন?

ঠিক এই জায়গাতেই নজরুলের ভাষায় একটা বিপ্লব পদবাচ্য ঘটনা দেখা দিল। আহমদ ছফা আপন স্বভাবসিদ্ধ রীতিতে যাহা লিখিলেন তাহার বয়ান অনেকটা এই রকম: নজরুল ইসলাম মুসলমান সমাজের ঘরে-সংসারে ব্যবহৃত শব্দ-বাক্য ব্যবহার করিতে করিতে এমন একটা কাণ্ড বাধাইলেন যাহাতে বাংলাভাষার অভিধান সংকলকদের কাজ বাড়িয়া গেল। অভিধানের প্রতিটি নতুন সংস্করণে নতুন নতুন শব্দ যোজনার প্রয়োজন দেখা দিল। নজরুল ইসলামের এইটাই একমাত্র কৃতিত্ব নহে।

তিনি শুধু আরবি-ফারসি মিশাল বাংলা লেখেন নাই। তিনি বাংলাই লিখিয়াছেন যাহাতে আরবি-ফারসি শব্দ আর দশ শব্দের মতন বসিয়াছে। ইচ্ছা করিলে কোন ‘বিদেশি’ শব্দ ব্যবহার না করিয়া ‘বিশুদ্ধ’ সংস্কৃত প্রধান বাংলায়ও তিনি লিখিতে পারিতেন, তাহারও বিস্তর প্রমাণ তাহার গানে-কবিতায় পদ্যে-গদ্যে ছড়াইয়া।

নজরুল পুঁথিসাহিত্য লেখেন নাই। কিন্তু তিনি যাহা লিখিয়াছেন তাহাতে পুঁথিসাহিত্য বাদ যায় নাই। আহমদ ছফার কথায়, তিনি পুঁথির প্রাণের আগুন লইয়াছেন, জীর্ণ কংকাল বহিয়া বেড়ান নাই। তিনি পুঁথির শব্দ লইয়াছেন। কিন্তু তাহার বাক্য বমন করেন নাই। তাহার ভাষা-কাঠামো তিনি বদলাইয়া লইলেন।

পরিশেষে, আহমদ ছফার সিদ্ধান্ত, নজরুল ইসলাম নতুন যুগের প্রবর্তন করিলেন। এই প্রবর্তনার সারকথা কি? আমি ছফার প্রস্তাব পুনরায় তুলিতেছি: পুঁথি লেখকেরা যে ভাষারীতি গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহার উদ্দেশ্য বা ফলাফল দাঁড়াইয়াছিল বাঙালি মুসলমান স্বতন্ত্র—একথা প্রমাণ করা। আর নজরুল ইসলামের ভাষা ব্যবহার সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশে ঘটিয়াছে। তিনি চাহিলেন বাঙালি মুসলমান বাঙালি সমাজের অংশ—একথা প্রমাণ করিতে। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, নজরুলের কাছে বাঙালি মুসলমান সমাজের ঋণ শোধ করিবার মতন নহে। তিনি এই সমাজের ‘ভাষাহীন’ পরিচয় ঘুচাইলেন। তাহাদের ঘরের ভাষাকে সাহিত্যসমাজে প্রতিষ্ঠা দিলেন। সেই প্রতিষ্ঠা বাঙালি হিন্দুসমাজ স্বীকার করিয়া লইতে বাধ্য হইলেন। আর নজরুলের কাছে বাঙালি হিন্দুদেরও ঋণ আছে। তিনি বাংলাভাষা ও বাংলা সাহিত্যকে সাম্প্রদায়িকতার হাত হইতে উদ্ধার করিলেন। দেখাইলেন বাংলা হিন্দু ও মুসলমান দুই সমাজেরই ভাষা। বাংলাভাষার নতুন বিকাশ এই জায়গা হইতে নতুন করিয়া শুরু হইতে পারে। এই নতুন ধারার পথের কড়ি (বাঙালি জাতির নতুন সংজ্ঞা) নজরুল ইসলামের রচনা হইতে সংগ্রহ করিতে হইবে।

এই কীর্তিরই অপর নাম নজরুল ইসলাম।

কবি নজরুল ইসলাম ১৯৪২ সালের মাঝামাঝি জুলাই মাসে দুরারোগ্য রোগের আঘাতে বাকশক্তি হারাইয়াছিলেন। তাহার এক বছরের মাথায় ১৯৪৩ সালের জুন মাসের শেষ তারিখে আহমদ ছফা এই ধরাপৃষ্ঠে ভূমিষ্ঠ হইলেন। পরাধীন বাংলাদেশের মানে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম তখন এক উচ্চপর্যায়ে উঠিয়াছে। আহমদ ছফা প্রায়ই কহিতেন, যেদিন তাহার জন্ম হয় সেদিন সুভাষচন্দ্র বসু জাপান রেডিও হইতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম নতুন করিয়া ঘোষণা করিয়াছিলেন।

নজরুল ইসলামের জন্মের ৪৪ বছর পর আহমদ ছফার জন্ম নেহায়েত কাকতালীয় ঘটনা নাও হইতে পারে। আহমদ ছফার এন্তেকালের দশ বছরের মাথায় আমরাও হয়তো বলিতে পারিব—আমাদের সাহিত্যের সর্বশেষ আদর্শ আর সর্বশেষ বিচারক আহমদ ছফার সাহিত্যকর্মের মর্ম আমরা এখনও ধরিতে পারি নাই।


প্রথম প্রকাশ: দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার শুক্রবারের সাময়িকীতে ১ জুলাই ২০১১

Copyright 2011 Salimullah Khan

আমার বন্ধু তারেক মাসুদ

‘I have not purchased my freedom through writing.’

– Franz Kafka, 1922

‘লেখার বিনিময়ে আমি আমার স্বাধীনতা কিনিয়া রাখি নাই।’

–ফ্রান্স কাফকা, ১৯২২

তারেক মাসুদের এন্তেকালের পরদিন সকালে উঠিয়া ‘আমার শিক্ষক তারেক মাসুদ’ নাম দিয়া একটি লেখা লিখিয়াছিলাম। আজকের লেখাটির নাম সামান্য বদলাইয়া রাখিলাম ‘আমার বন্ধু তারেক মাসুদ’। যিনি শিক্ষক তিনিই বন্ধু। আমার শিক্ষকের কথা এক নিবন্ধে শেষ করিতে পারি নাই। এখানে কিছু উদ্বৃত্ত কথা বলিব। কথা আরও থাকিলে পরে বলিব। আর উপায় কি?

তারেক মাসুদ, সলিমুল্লাহ খান ও আলম খোরশেদ [tarequemasud.org থেকে নেওয়া]

তারেক মাসুদ, সলিমুল্লাহ খান ও আলম খোরশেদ [tarequemasud.org থেকে নেওয়া]

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দশকে পড়িতে আসিয়াছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আসিয়া যে কয়জন গুণীর দেখা পাইয়াছিলাম তাঁহাদের মধ্যে তারেক মাসুদ স্থান ছিলেন সমুখে, প্রথম সারিতে। তিনি বলিয়াছিলেন চলচ্চিত্র করিবেন। আর আমি শুরুতেই এক প্রকার ধরিয়া লইয়াছিলাম নাম করিবেন। তিনি আমাকে নিরাশ করেন নাই। তারেক মাসুদের সাধনা বিফলে যায় নাই। তিনি শুদ্ধ নামই করেন নাই, তাহার মানও হইয়াছে। শুদ্ধ পুরস্কারই পাইয়াছেন এমত নহে, সত্যকার মহত্ত্বও তিনি অর্জন করিয়াছেন। তাঁহার ছবি সমাদৃত হইয়াছে, আর্থিক অনটনের কঠোর কশাঘাতে তাহাকে শেষ পর্যন্ত জর্জরিত থাকিতে হয় নাই।

আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইয়াছি। কিছুদিন হয় দেশে একটা দুর্ভিক্ষ, বেশ কয়েকটা রক্তঝরা অভ্যুত্থান ঘটিয়া গিয়াছে। দেশ স্বাধীন হইবার পাঁচ-ছয় বৎসর পরের কথা। দেশের ভবিষ্যত লইয়া নানান জল্পনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সমুখে শরিফ মিয়ার ক্যান্টিন বলিয়া একটি পরম রমণীয় খাবারের দোকান ছিল সেই সময়। সেখানেই একদিন দেখা তারেক মাসুদের সঙ্গে। পরিচয়স্বরূপ জানিলাম তিনি একাধারে ইতিহাস বিভাগ আর অন্যদিকে লেখক শিবিরে দাখেল হইয়াছেন। তখন লেখক শিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় আরো ছিলেন পিয়াস করিম। মোহন রায়হান ঢাকা কলেজের ছাত্র। তাঁহার প্রথম কেতাব ‘জ্বলে উঠি সাহসী মানুষ’ পহিলা ছাপা হইয়াছিল বাঙলাদেশ লেখক শিবিরের পতাকাতলে।

আমি লেখক শিবিরের ছায়াতলে কখনও ভিড়িবার জায়গা পাই নাই। তারেক আর মোহনের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই আমার পরিচয় ঘটে মহাত্মা আহমদ ছফার সহিত। হয়ত সেই কারণেই। লেখক শিবিরের ইতিহাস আহমদ ছফার মুখে কিছু শুনিয়াছিলাম। তাহাতেই আমার উৎসাহে ভাটা পড়ে। ছফা জানাইয়াছিলেন তিনিও ছিলেন লেখক শিবিরের আদিকালীন উদ্যোক্তাদের দলে। আদিকাল মানে বাংলাদেশ স্বাধীন হইবার আগের কাল। ঐসময় যাঁহারা ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’ প্রতিষ্ঠাকর্মটিকে মোটেও সুনজরে দেখেন নাই–বরং প্রকারান্তরে প্রতিকুলতা করিয়াছিলেন, স্বাধীনদেশে তাঁহারাই শিবিরটি দখল করিয়া লইলেন আর প্রতিষ্ঠাতাদের দিলেন বাহির করিয়া। এরকম জীবিত অন্যায়ের খবর জানিয়াশুনিয়া কি করিয়া সেই শিবিরে যোগ দিই!

একটুখানি পিছনের কথা না বলিলে ভুল ধারণা হইতে পারে। দেশ স্বাধীন হইবার পর যাহারা সরকারি দল কিংবা খোদ সরকারেরই গরিব আত্মীয় শ্রেণীর বা দুই নম্বর দল করিতেন না তাহাদের আশ্রয়স্থল হয় লেখক শিবির নামা প্রতিষ্ঠানটি। ‘প্রতিষ্ঠান’ না বলিয়া ইহাকে ‘অনুষ্ঠান’ বলিলে অন্যায় হয় না। ১৯৭১ সালের গোড়ায় রক্তঝরা সংগ্রামের দিনে গঠিত হইয়াছিল ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’। তার আগে ১৯৬০ সালের যুগে পাকিস্তান সরকারের আজ্ঞাবহ মধ্যম শ্রেণীর লেখকরা ভিড়িয়াছিলেন পাকিস্তান লেখক সংঘ নামা সরকারি শিবিরে। অনেকের মনে আছে দেশ স্বাধীনের আগে এই দলের ছাত্র শাখাটির নাম ‘ইসলামী ছাত্র সংঘ’ ছিল। লেখক শিবিরের আগুনটুকু চুরি করিয়া স্বাধীন বাংলাদেশে ইহারা ‘ইসলামী ছাত্র শিবির’ নাম গ্রহণ করেন। আহমদ ছফা বলিতেন জামায়াত আমাদের নামটা ‘হাইজ্যাক’ করিয়াছে।

জানিতে পারিলাম নতুন লেখক শিবির হইতে আহমদ ছফা বিদায় হইয়াছেন। বদরুদ্দীন উমর সমুখে আসিয়াছেন। শিবিরের কয়েকজন কর্মকর্তা সেযুগে সরকারি কাগজ ‘বিচিত্রা’ ও ‘দৈনিক বাংলা’য় কাজ করিতেন। কেমন জানি তালগোল লাগিয়া গেল আমার মনে। এই মহাত্মারা আহমদ ছফার নামটি পর্যন্ত শুনিতে রাজি ছিলেন না। কালের প্রহারে ইঁহারা এতদিনে অনেক সরকারের সেবা করিয়া লইয়াছেন। বর্তমান সরকারও ব্যতিক্রম নহে। তারেক মাসুদকে এই দলের মধ্যে দেখিয়া আমার মনে একটি অঙ্কুশ বিন্ধিয়াই রহিল।

এই সময়ে কোথা হইতে জানি শেখ মোহাম্মদ ওরফে এস এম সুলতান ঢাকায় আবির্ভূত হইলেন। সুলতানকে ঢাকা শহরের মধ্যম শ্রেণীর চিত্রশিল্পীরা বড় সুনজরে দেখিতেন না। তাঁহাদের নজরকে উচিত শিক্ষা দিবার মহান উদ্দেশ্যে আহমদ ছফা সেই সময় ‘অভিনব উদ্ভাসন’ নামে একটি নীতিদীর্ঘ প্রবন্ধ রচিয়া ফেলিলেন। ১৯৭৭ ইংরেজি পার হইতেছে। আহমদ ছফার প্রবন্ধটি কতজনের মতামত বদলাইল তাহার কোন জরিপ হয় নাই। তবে অন্তত একজনের মতামত তাহাতে বদলাইয়াছিল জানি। তিনি তারেক মাসুদ। আহমদ ছফার লেখা পড়িয়া তিনি সুলতান আবিষ্কার করিলেন।

আর অনেক আগেই চলচ্চিত্রকে জীবনের ধ্রুবতারা ঘোষণা করিয়াছিলেন তারেক মাসুদ। সেখানে আসিয়া দাঁড়াইলেন ‘কালপুরুষ’ এস এম সুলতান। তাঁহার ছবি লইয়া চলন্ত ছবি বানাইবেন তিনি। নাম রাখিলেন কোমল শব্দে ‘আদমসুরত’। যাহারা এই ছবি দেখিবেন তাহারা এই আরবি-ফারসি নামটা খুব পছন্দ করিবেন ভাবিয়া নাম রাখেন নাই তিনি। উঠন্তি মুলো পত্তনেই চিনা গিয়াছিল। শুদ্ধ উচ্চাভিলাষ নহে, দৃঢ়চেতনাও তারেক মাসুদের আরেক নাম। ‘আদমসুরত’ তারেকের পহিলা সৃষ্টি। আমরা কথায় কথায় ‘আটপৌরে জীবন’ কথাটা বলিয়া থাকি। আটপৌরে কথাটার সংস্কৃত ‘অষ্টপ্রহর’ বা আট পাহারা। এস এম সুলতানের জীবনকে দিনের আট পাহারা আবর্তনের মধ্যে ধরিয়াছিলেন তারেক মাসুদ। সকাল দুপুর, সন্ধ্যা রাত্রি নিশীথ প্রভাত–এইভাবে তিনি একটি গানের মতো বাঁধিলেন শিল্পীর জীবনবৃত্ত–তাঁহার আট পাহারা।

এই ছবির মূল পদার্থ বাহির করিবার জন্য তারেক মাসুদ ও তাহার বন্ধু মিশুক মুনীর পাকিস্তানে গিয়াছিলেন। কারণ সুলতানের জীবনবৃত্তের এক চাপ সেখানেই থাকিয়া গিয়াছিল। করাচি লাহোর ঘুরিয়া তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর সেই ছবির ছবি তুলিয়া আসিলেন। তৈরি করিলেন শিল্পীর জীবনবৃত্ত। ঢাকার কূপমণ্ডুক মধ্যম শ্রেণীর খাইয়া পরিয়া এহেন ছবিতে হাত দেওয়া সহজ কাজ ছিল না। তারেক মাসুদ এই অসাধ্য সাধন করিলেন। কি করিয়া করিলেন আজও ভাবিয়া শেষ করি নাই।

লেখক শিবিরের সভ্য হইয়াও আহমদ ছফাকে অপাংক্তেয় ভাবেন নাই তারেক মাসুদ। এখানেই তাঁহার বিশেষত্ব। এখানেই তাঁহার মহত্ত্ব। লেখক শিবিরের নেতাদের সততা সম্পর্কে আমি ছিলাম সন্দিহান। তাঁহারাও আমাকে দেখিলে চুম্বন কি আলিঙ্গন করিতেন না। তারপরও তারেক এই অভাজন সম্পাদিত একটি পত্রিকার কমিটিতে নাম লিখাইতে কুণ্ঠা করেন নাই। এইখানে তারেক মাসুদের বুদ্ধিমত্তা। আসলে ইতিহাস শিবির ছফা প্রাক্সিস কোন কিছুই তারেককে বাঁধিতে পারে নাই। তাঁহার গন্তব্য ছিল অন্য কোথাও, অন্য কোনখানে ছিল তাঁহার ঘরদুয়ার। আমরা ছিলাম তাঁহার পান্থপথ–বলা যাইতে পারে নিতান্ত সরাইখানা।

তারেকের সহিত পরিচয়ের দুগ্ধ একটুখানি ঘন হইয়া আসিলে একদিন জানিতে পারিলাম তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসিয়াছেন মাদ্রাসার পথ পার হইয়া। কি করিয়া তিনি কৌমি মাদ্রাসায় ঢুকিয়াছিলেন আর কি করিয়াই বা ঐ খাঁচা হইতে ছাড়া পাইলেন তাঁহার বয়ান তদীয় কাহিনীচিত্র ‘মাটির ময়না’ যোগে কিছু পাওয়া যাইবে। যে কায়দায় তিনি কৌমি মাদ্রাসা ছাড়িয়াছিলেন একদিন সেই কায়দায় তিনি লেখক শিবিরের খাঁচা হইতেও বাহির হইয়া গেলেন। প্রশ্ন হইল, গেলেন কোন জায়গায়? সেই জায়গাটার পরিচয় এখনও লই নাই।

এই জায়গাটার নামই কি ‘স্বাধীনতা ব্যবসায়’? ইংরেজি মতে যাহাকে বলে ‘লিবরেল’ তাহার গোড়ায় আছে লিবর বা স্বাধীন কথাটা। সেই গোড়ার রসুন হইতেই তৈরি হইয়াছে ‘লিবাটির্’, ‘লিবারেলিজম’ প্রভৃতি অমুক পদের। তাই বলি লিবারেলিজম বা লিবরের ব্যবসায় মানে বাংলায় দাঁড়ায় ‘স্বাধীনতা ব্যবসায়’। তারেক মাসুদের সম্মানে সত্য বলা কর্তব্য। তাই প্রশ্ন করিতে হয় তিনিও কি শেষের দিকে স্বাধীনতা ব্যবসায়ের পথই ধরিয়াছিলেন?

আজ এ প্রশ্নের উত্তর পুরা করা চলিবে না। কেহ কেহ বলেন তারেক মাসুদ যৌবনের অপরাহ্নে খানিক দক্ষিণে ঝুঁকিয়াছিলেন। সূর্যদেব যখন মকরক্রান্তির কাছাকাছি তখনও আমরা বলি তিনি দক্ষিণে ঝুঁকিয়াছেন। যৌবনের আদৌভাগে তারেক মাসুদের স্বপ্ন ছিল শিল্পীর স্বাধীনতা। এস এম সুলতানের জীবনবৃত্ত বানাইয়া তাঁহার স্বপ্ন ভাঙ্গিল না। একটা জিনিশ স্থির হইল কাহারও চাকরি করিবেন না তিনি । ‘স্বাধীনতা’ হইল তাহার বীজমন্ত্র। চাকরি করিলে স্বাধীনতা রক্ষা করা যায় না। আর স্বাধীনতা রক্ষা করিলে জীবনটা তরল পদার্থের মতন হইয়া যাইবে, যে পাত্রে রাখিবেন জীবন তাহার আকার ধারণ করিবে, আপনি হইবেন দশের মজুর।

১৯৮০ সাল হইতে যে দশকের শুরু তাহাতে অনেক বন্যাপ্লাবন ঘটিয়া গেল। শুরু হইল ধনতন্ত্রের নতুন বিজয়। এ সময় জীবিকার ডাকে তারেক মাসুদকেও হাত পাতিতে হইল নানান কিসিমের সাম্রাজ্যবাদী কি ধনিকবাদী সংস্থার দক্ষিণা বিভাগে। একদা এ দেশে ব্রিটিশ ধনতন্ত্র আসন গাড়িয়াছিল শুদ্ধ কৃষক সমাজকে রক্ষা করিবার অজুহাতে। এক্ষণে তাহারা আসিলেন নারীজাতির মুক্তিমন্ত্র মূলধন করিয়া। এই যুগে তারেক মাসুদ ‘সোনার বেড়ী’ নামে একটি বিজ্ঞাপন ছবিও বানাইয়াছিলেন। সেই ছবি দেখিবার দুর্ভাগ্য আমার হইয়াছিল মার্কিন মুলুকে। শিল্পী ও লেখকের দারিদ্র আমাদের সম্পূর্ণ অজানা জিনিস নহে। তারপরও আমি জানিতাম তারেক মাসুদ তাঁহার লক্ষ্য ছাড়িবেন না। তিনি লড়াই করিবেন।

muktir gaan

১৯৮৯ সালের আগেপরে কোন এক সময় তারেক মাসুদের মার্কিন মুলুকযাত্রা। সেখানে তাঁহার সহিত আমার বন্ধুত্ব অভিমানের দ্বিতীয় যুগ। আমি গিয়া পহুঁছিয়াছিলাম দুই কি তিন বছর আগে। তখন একে একে গিয়া জুটিয়াছিলেন আলম খোরশেদ, নাসির আলী মামুন। আর মাহমুদ হক নামে আমাদের আরেক বন্ধু আগে হইতেই ওখানে। সারা দুনিয়া জুড়িয়া তখন পট পরিবর্তনের হাওয়া বহিতেছে। দেশের স্বৈরশাসন হটাইবার জন্য মধ্যম শ্রেণীর নেতারা মধ্যে মধ্যে বিদেশ সফর করিতেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ততদিনে ইতিহাসের বিষয় হইয়া উঠিয়াছে। এই সময়ই তারেক মাসুদ তাঁহার ‘মুক্তির গান’ ছবিটি খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ হইতে যে সকল শরণার্থী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে আশ্রয় লইয়াছিলেন এই ছবি তাহাদের লইয়া। চিত্রগুলি গ্রহণ করিয়াছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হইতে সদলবলে উপনীত সাংবাদিক লিয়র লেবিন। এই দলিলচিত্রমণ্ডলী বা ফুটেজ আনুমানিক বিশ বছর ধরিয়া কোন বাড়ির গুদামঘরে হাজিয়া মজিয়া যাইতেছিল। তারেক সাধনাবলে এই খনি আবিষ্কার করিলেন। এই আবিষ্কার তারেক মাসুদের সেরা কীর্তির মধ্যে। সম্পাদনা করিয়া যে ছবি তিনি দাঁড় করাইলেন তাহাকে সম্পূর্ণ নতুন ছবি বলিতে হইবে। ছবির শুরুতে তিনি জহির রায়হান নির্মিত ‘স্টপ জেনোসাইড’ ছবির অংশবিশেষ কাজে লাগাইলেন আর শেষে কিছু অংশে গেরিলাযুদ্ধের অভিনয় জুড়িয়া দিলেন।

যে গানের দলটি শিবিরে শিবিরে উদ্দীপনাময় গান গাহিয়া দেশত্যাগী শরণার্থীদের (আর কখনও কখনও দেশের ভিতরে আসিয়া মুক্তিযোদ্ধা সৈনিকদের) সাহস যোগাইতেন তাঁহাদের অনেকের সহিতই তারেক মাসুদ পরিচিত ছিলেন। এমনকি তাঁহার পরিবারের সদস্যরাও ইহার মধ্যে জীবনধারণ বা চলাফেরা করিতেছেন। ফলে এই ছবির মূল্য দুই রকমই হইল তারেকের নিকট।

জার্মান দার্শনিক বাল্টার বেনিয়ামিন ছবি ও চলচ্চিত্রের দুই মূল্যের দুই নাম রাখিয়াছিলেন। এক মূল্য ছবিকে আর দশ পদার্থ হইতে আলাদা করে ও সম্ভ্রম জাগায়, দূরের হাতছানি এমনকি পবিত্রতার আমদানি ঘটায়। মার্কস কথিত পণ্যের ব্যবহার মূল্যের নকশা ধরিয়া বেনিয়ামিন ইহার নাম রাখিয়াছিলেন ছবির ‘ধর্মমূল্য’। দ্বিতীয় ধরনের মূল্য ছবিকে জনসাধারণের মধ্যে ছড়াইয়া দিবার মধ্যে। যন্ত্রবিজ্ঞানের দৌলতে একই ছবির লক্ষ লিপির ব্যবস্থা ছবিকে ‘গণতান্ত্রিক’ করিয়াছে। তবে কথা আছে, এই গণতন্ত্র বাজারে টিকিবার গণতন্ত্র। কার্ল মার্কস এই মূল্যের নাম রাখিয়াছিলেন পণ্যের ‘বিনিময় মূল্য’ বা দাম। বেনিয়ামিন ইহার নাম দিলেন শিল্পের ‘প্রদর্শন মূল্য’।

চলচ্চিত্রের ধর্ম ও প্রদর্শন–দুই মূল্য মূলধন করিয়া তারেক মাসুদ ছবিটি শেষ করিলেন ১৯৯৫ সাল নাগাদ। ছবি লইয়া ঢাকায় ফিরিবার আগে তিনি মার্কিনদেশে বিশেষ করিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী জনসাধারণের মধ্যে ছবিটির একাধিক প্রদর্শনী করেন। আমি বন্ধুতাভিমানের সুযোগ লইয়া–চলচ্চিত্রকারের অনুমতিক্রমে–দুইটা জায়গায় পরিবর্তনের প্রস্তাব করিয়াছিলাম।

তারেক মাসুদ নিজেই একটা কথা ঘন ঘন রাষ্ট্র করিতেন। কথাটা ইংরেজিতেই বলিতেন–‘ডকুফিকশন’। ‘মুক্তির গান’ ছিল তারেকের নিজ বিচারেই এক প্রকার ডকুফিকশন বা খবরকল্প কাহিনী। ইহাতেই তারেক মাসুদের পথ আমরা পরিষ্কার দেখিতে পাইলাম। একটা প্রশ্নের উত্তর আমরা আজও পাই নাই। বাংলাদেশ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করিয়া স্বাধীন হইয়াছে কিন্তু দেশের সমাজ কাঠাম আমূল বদলাইয়া যায় নাই। দেশে গণতন্ত্র কায়েম হয় নাই। কেন? ইহার উত্তর সন্ধান করিতে করিতে সেই সময় নাগাদ আমাদের শিক্ষক আহমদ ছফা ‘অলাতচক্র’ নামক কাহিনীটি লিখিয়াছিলেন। তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’ ছবিটি যেন অলাতচক্রেরই অপর পিঠ আকারে হাজির হইল।

‘অলাতচক্রে’ আহমদ ছফা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নানান সামাজিক শ্রেণীর ভূমিকা লইয়া বিচারসভা বসাইয়াছিলেন। আর আমি দেখিলাম ‘মুক্তির গান’ বানান হইল এমন কায়দায় যেখানে বাংলাদেশের জনগণের নহে, ঘোষিত হইল মধ্যম শ্রেণীর জয়। এক হিসাবে তারেক মাসুদ সত্য কথাই বলিয়াছেন। তাহার ছবি তো খবর নহে, খবরকল্প কাহিনী। আমি করজোড়ে বলিলাম কল্পাংশটা খানিক ছাঁটিয়া বা বদলাইয়া দিন । কিম্বা আহমদ ছফা যে জায়গা হইতে যুদ্ধ ও রাজনীতিকে যুক্ত করিয়াছেন তাহার কিছু অংশও থাকুক।

আহমদ ছফার পদতলে একদিন তারেকও বসিয়াছিলেন। তিনি জানিতেন কত ধানে কত চাউল। আহমদ ছফার পথ ধরা তাহার পক্ষে সহজ ছিল না। এখন পিছনে ফিরিয়া তাকাইলে বুঝি ‘মুক্তির গান’ ছবিটি প্রাণ হইতে গ্রহণ করিতে কেন পারি নাই। দুঃখের মধ্যে, তারেক মাসুদের সহিত আমার সম্পর্কটা ক্রমশ শিথিল হইতে, নিছক ধর্মমূল্য লইতে, দূরান্বয়ী হইতে শুরু করিল। এই দূরত্ব পারস্পরিক। অস্বীকার করিতে পারি নাই তারেক মাসুদ আমার পাঁচপ্রাণের বন্ধু, কিন্তু ‘মুক্তির গান’ ছবিটিও আমার বন্ধুর ছবি বলিয়া স্বীকার করিতে পারিতেছিলাম না। এই দশা ঈর্ষা করিবার দশা নহে।

‘মুক্তির গান’ ছবির অপূর্ণ বাসনা পূরণ করিতে তারেক পরে ‘মুক্তির কথা’ বানাইয়াছিলেন। আমাকে সেই মর্মে জবাবদিহিও করিয়াছিলেন তিনি। সৌভাগ্য হয় নাই ছবিটি দেখিবার। কিন্তু তাঁহার মহত্তম কীর্তি এখনও সম্মুখে পড়িয়া আছে বলিয়া বিশ্বাস করিতেন তারেক মাসুদ। ‘মাটির ময়না’ ছবিটি দেখিবার সৌভাগ্য আমার হইয়াছিল।

matirঅনেক কথা মনে নাই। একটি কথা মনে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হইবার পর কোন এক সময় তারেক মাসুদ বলিয়াছিলেন তিনি তাহার মাদ্রাসা জীবনের স্মৃতি বা অভিজ্ঞতা সম্বল করিয়া একপ্রস্ত ছবি বানাইবেন। ‘মুক্তির গান’ তাঁহাকে সেই জায়গায় পৌঁছাইয়া দিল যেখানে পৌঁছিলে আর পিছনে তাকাইতে হয় না। ‘মাটির ময়না’ সেই অমৃতের পুত্র–তারেক মাসুদের স্বপ্ন পূরণ হইল। ভারতবর্ষের নামজাদা চিত্রবিশারদ বাবা গাস্তঁ রোবের্জ বলিয়া ফেলিলেন এই ছবি সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’র সমান। অনু আর তাহার বোনের চরিত্র, অপু আর তাহার বোনের আদল পাইয়াছে। বোনের মৃত্যু দুই সংসারেই আগুন লাগিয়াছে। এই মৃত্যুকে–বোনের মৃত্যুকে– নানাভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

এক জায়গায় আসিয়া তারেক সত্যজিৎকেও অতিক্রম করিলেন। সত্যজিৎ রায় ভারতবর্ষের গ্রামীণ দারিদ্র ও ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে ‘পথের পাঁচালী’ বানাইয়াছিলেন ১৯২০ সালের যুগে লেখা এক কাহিনীর পিঠে পা রাখিয়া। তারেকের ঘটনার পট ১৯৬০ সালের দশক। পূর্ব বাংলার কোন এক গ্রাম। বাংলাদেশের গ্রামীণ দারিদ্র ও শোষণ তারেকের চোখে এসলাম ধর্মের অন্তর্গত দুই ধারার বিরোধ আকারে হাজির হইল। জনৈক কলিকাতাফেরত ইংরেজি শিক্ষিত বাঙ্গালি মুসলমান ভদ্রলোক তাহার ছেলেকে মাদ্রাসায় পড়িতে পাঠাইলেন। তিনি নিজে কিন্তু মাদ্রাসায় পড়েন নাই। ইংরেজি শিক্ষা বর্জন করিবার চিন্তা হইতেই তিনি মাদ্রাসা শিক্ষা আঁকড়াইয়া ধরিলেন। যে শিশুকে মাদ্রাসায় পাঠান হইল তাহার চোখেই ছবির বয়ান গড়িয়া উঠিয়াছে।

এমন সময় আসিল ‘স্বাধীনতার অকাল বোধন’–বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম। জাতীয় পরিচয়ের মুক্তিযুদ্ধ। মাদ্রাসা হইতে অনুরও মুক্তি হইল। এই মুক্তি প্রতীকী বা আকার হিসাবেও পড়িতে হইবে। আমি অন্তত সেইভাবেই পড়িয়াছি। তারেক মাসুদের মধ্যে আমি সেই মহান চলচ্চিত্রকারের খোঁজ পাইয়াছিলাম যাহাকে প্রশ্ন করা যায়, যাহার কাছে আরও শেখা যায়। তিনি আমাকে এই জায়গায় আর পড়াইতে রাজি হইলেন না। আমারও দুঃখের আর অবধি রহিল না।

প্রশ্ন করিয়াছিলাম বাংলা মুলুুকে এসলাম ধর্মের যে রূপকে তারেক মাসুদ কাঠগড়ায় দাঁড় করাইয়াছেন তাহার বিকল্প কি? মনে হইয়াছিল শিশু অনু যে গ্রাম্যমেলায় যাইতে চাহে, যে মাটির ময়না সে কিনিয়া আনে, যে ময়না কিনে বাবার ভয়ে লুকাইয়া রাখে তার মধ্যে সেই বিকল্প তারেক দেখিয়াছেন। ইহাকে কেহ কেহ নতুন গড়িয়া উঠা–মানে ১৯৪৭ সালের পরে গড়িয়া উঠা ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ বলিতে চাহিয়াছেন।

আমার জিজ্ঞাসাটা ছিল অন্য জায়গায়। মাদ্রাসা শিক্ষাই আমাদের সমস্ত অনুন্নতির মূল এই পরামর্শ কতখানি সৎ পরামর্শ? ইহার অর্থ কি এই নহে যে ইংরেজি শিক্ষার মধ্যেই আমাদের মুক্তির গান শোনা যাইবে। পরাধীনতার যুগ শেষ হইয়াও কেন শেষ হইতেছে না বাংলাদেশে? তাহাতে সমস্ত দোষ মাদ্রাসা শিক্ষার–এ কথা বলিলে আমরা অর্ধসত্য বলিবার দোষে দুষ্ট হই। পরাধীনতার বলে বলীয়ান নতুন মধ্যম শ্রেণীর হেজিমনি ওরফে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এই অর্ধসত্য বেশ কাজে লাগিবে এ কথা মিথ্যা নহে। কিন্তু শিল্পীর কাজ কি কেবল শাসক শ্রেণীর উপকরণ মূল্য যোগাইয়া যাওয়া?

বাংলাদেশের সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ধর্মবিশ্বাসে মুসলমান। তাহাদের মানসগঠনে এসলাম ধর্মের আগমন ঘটিবার পূর্বে যে পদার্থ ছিল এসলাম ধর্মও তাহা বিশেষ বদলাইতে পারে নাই। এই কথা নতুন করিয়া প্রচার করিয়াছিলেন মহাত্মা আহমদ ছফা। সে কথায় ইংরেজি ১৯৭৬ কিংবা ১৯৭৭ সালে আমরা কান দিয়াছিলাম। যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বদিকের রমনা ময়দানে প্রাতভ্রমণের সময় আহমদ ছফা আবুল ফজলের সাক্ষাৎ পাইলেন তখন তাঁহার মনে এই প্রস্তাবের জন্ম। আহমদ ছফা সিদ্ধান্ত করিয়াছিলেন বাঙালি মুসলমান হইতেছেন আবুল ফজলের মতন। সারাজীবন ধরিয়া প্রচার করিলেন একের ঘরে আর শেষ জীবনে ধর্না দিলেন আরেক দুয়ারে।

তারেক মাসুদ তাঁহার বাবার মধ্যে সেই বাঙ্গালি মুসলমানের প্রতিকৃতি আবিষ্কার করিলেন। এক শ্রেণীর বাঙ্গালি মুসলমান বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে সন্দেহ করিয়াছে। অনেকে তাহাদের প্রতীক আকারে মাদ্রাসা শিক্ষাকে দায়ী করেন। কিন্তু ইতিহাসকে ইচ্ছামতো পায়ের বেড়ী পরান যায় না। ইতিহাস হইতে দেখা যাইবে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মাদ্রাসা ছাত্রদের একটা বড় ভূমিকা ছিল। কৌমি বা জাতীয় মাদ্রাসার ছাত্ররা ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে লড়িয়াছিলেন কিন্তু পাকিস্তান বানাইতে রাজি হয়েন নাই।

বাংলাদেশ স্বাধীন হইয়াছে কিন্তু দেশের সমাজ কাঠাম বদলাইয়া যায় নাই। দেশে গণতন্ত্র নামে যাহা চলিতেছে তাহাতে জনগণের শাসন কায়েম হয় নাই। ইহার দায় কতখানি মাদ্রাসা শিক্ষার? আর কতখানিই বা ইংরেজি শিক্ষার? যদি আমরা বলি এসলাম ধর্ম বা তাহার ব্যাখ্যাবিশেষই ইহার জন্য দায়ী তবে আমাদের জবাবদিহি আছে। কেহ কেহ বলেন, এসলাম ধর্ম পশ্চিম এশিয়া হইতে আমদানি করা দ্রব্যবিশেষ–ইহা দেশজ পদার্থ নহে। এই বিশেষণ বিপজ্জনক–সত্য বলিতে বর্ণবিদ্বেষী বা উগ্র জাতীয়তাবাদী।

মধ্যম শ্রেণীর একাংশ আজিকালি এই বিশেষণ অঙ্গীকার করিতেছেন। আমি তাহাদের সমজদার হইতে পারি নাই। আমার ভয় হইয়াছিল তারেক মাসুদের ছবি এই বর্ণবিদ্বেষী, বর্ণাশ্রমধর্ম ব্যবসায়ী মনোভাবকে উসকাইয়া দিতে পারে। বাংলাদেশে এই ব্যবসায় ‘মানব ব্যবসায়’ ওরফে ‘হিয়ুুম্যানিজম’ আকারে উপস্থিত আছে। বর্তমানে দেশ চলিতেছে এয়ুরোপিয়া এনলাইটেনমেন্ট বা চেরাগের আলো ধার করিয়া। তাহা তো দেশজ নহে বলিয়া নিন্দার ভাগ পায় নাই। বাংলাদেশের কৃষক– মজুর কৃষক ও গৃহস্থ কৃষক– যে ধর্মবিশ্বাস আঁকড়াইয়া ধরিয়াছে শুধু তাহার মধ্যে বিদেশী দ্রব্য আমদানির সাক্ষ্য খোঁজা সত্যসন্ধানীর কাজ হইতে পারে না। পল্লবগ্রাহী বাঙালি মুসলমান সমাজের কেহ কেহ এক সময় মুখে মার্কসবাদও গ্রহণ করিয়াছিল। ‘মাটির ময়না’ ছবির এক চরিত্র বলিয়াছেন মার্কসবাদ ও হোমিওপ্যাথি সমতুল্য–দুইটাই জার্মান পদার্থ।

সত্য ও ন্যায়বিচারের খাতিরে–আজ এই শোকের মধ্যেও–মনে রাখিতে হইবে অভিজ্ঞতাই শেষ কথা নহে। ‘মাটির ময়না’ প্রসঙ্গে তারেক মাসুদ বলিতেন, ‘এই ছবির গল্প আমার নিজ জীবনবৃত্তের একটা ছিলা বা বৃত্তচাপ’। আমি বলিতাম, ‘সূর্য পূর্বদিকে উঠিবে। কারণ ইহা আমাদের অভিজ্ঞতা। তো সূর্য এই পৃথিবী নামক গ্রহের চারিদিকে ঘুরিয়া মরিতেছে, ইহাও কি আমাদের অভিজ্ঞতার অন্তর্গত নহে?’ তো কেন আমরা অভিজ্ঞতার মধ্যে এককে গ্রহণ করি, আর অন্যকে বর্জন করি? তারেক মাসুদের সঙ্গে অনেক বিনিদ্র রজনী আমরা কাটাইয়াছি। এই তর্কের শেষ হয় নাই।

‘সূর্য পৃথিবীর চারিধারে ঘুরিতেছে’, কিংবা ‘মানুষ যুক্তিশীল প্রাণী’ ইত্যাদি অর্ধসত্য ভর করিয়া পঞ্জিকা লিখিয়াছে, সভ্যতা গঠিয়াছে মানুষ। এই ক্রমে বলিতে পারি বিশ্বাস ভুল হইলেও মানুষের কীর্তি থাকিয়া যাইতে পারে। তারেক মাসুদ আকর্ষণীয় চলচ্চিত্র বানাইয়াছিলেন। এই বানানোর কাজটি সহজ ছিল না। তাঁহার ছবিতে বাংলাদেশ চিত্ররূপময় হইয়া উঠিয়াছে। তিনি তাহাতে সৌন্দর্য ছাড়াইয়া পবিত্রতার মহিমাও ফুটাইয়া তুলিয়াছেন। তিনি এককথায় বলা যায় সার্থক হইয়াছেন। যে নৈপুণ্য যে দক্ষতা তিনি দেখাইয়াছেন তাহার স্বীকৃতি তিনি কিছু পরিমাণে হইলেও পাইয়াছেন। বাঁচিয়া থাকিলে তাঁহার কীর্তিতে আরও নতুন অধ্যায় যোগ হইত, দেশের মুখোজ্জ্বল হইত সন্দেহ নাই।

আমার সবিনয় জিজ্ঞাসা, এই সার্থকতার মধ্যে কি এক প্রকারের ব্যর্থতাও লুকাইয়া নাই? এমনও কি হইতে পারে যে তিনি যে সার্থকতার মধ্যে নিজেই চিত্ররূপময় হইয়া রহিলেন, তাঁহার স্বপ্নের স্বাধীনতা তাহাতেই অপূর্ণ রহিয়া গেল?

এখন আমাদের কি কর্তব্য? তিনি যে কীর্তি রাখিয়া গেলেন আমরা কি তাহার মধ্যে শুদ্ধ নিজেদের চেহারা দেখিব? নাকি ‘কলবের মধ্যে আয়না বানাইয়া’ তাহার পারদটা মুছিয়া দিব? তাঁহাকেও দেখিব?

তারেক মাসুদের এন্তেকাল হইয়াছে অকালে। এই এন্তেকাল মানিয়া লওয়া যায় না। তাঁহার অন্তিম যাত্রা হইল জীবনের মধ্যভাগে। এই ক্ষতির পূরণ নাই। তাঁহার বিদায় সমাবেশে যে জনসাধারণ আসিয়াছিলেন তাহারা ‘সর্বস্তরের’। এ কথা সংবাদপত্র হইতে জানিয়াছি। আমি নিজেও সেখানে হাজির ছিলাম। একটা জিনিশ অবশ্য সংবাদপত্রে খুঁজিয়া পাই নাই। শহীদ মিনারের পাদদেশে আমি তিন ঘণ্টার মতো দাঁড়াইয়া ছিলাম। অনেক মানুষ, ততোধিক ফুলের শ্রদ্ধা। এইসব মিছিলে আমি মাদ্রাসার ছাত্র বিশেষ কিন্তু দেখি নাই। কথাটা মনে পড়িল। তারেক মাসুদ চলচ্চিত্রের বিনিময়েও মাদ্রাসা ছাত্রদের স্বাধীন করিতে পারেন নাই।

এক সময়ে আমরা শুনিতাম কবিতা তিন নম্বর বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাইতে পারে। এখন অত শুনি না। চলচ্চিত্রও হয়তো বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাইতে পারিবে না। কিন্তু স্বপ্ন দেখা মানুষের সংশোধনের অতীত নিয়তি। শুধু একটা কথাই সত্য– মানুষ স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নটা এক অর্থে কিছুই নহে। স্বপ্নকে আমরা যতই দূরে ঠেলিয়া দিই ততই সে আমাদের কাছে টানে। অথচ এই স্বপ্নটাই–অজ্ঞানের এই স্বতস্ফূর্ত আত্মপ্রকাশটাই–আমার একমাত্র অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতার জোরেই হয়ত আমি তারেক মাসুদকে আত্মীয় ভাবিয়াছি।

প্রথম প্রকাশ: দৈনিক যুগান্তর, সাহিত্য সাময়িকী, ১৯ আগস্ট ২০১১।