Monthly Archives: January 2019

বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টিশীল প্রতিভাবানদের পছন্দ করে না: অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সাক্ষ্য

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ইহলোক ছাড়িয়াছেন আজ পনের বছর হইল। তিনি ইহলোকে ছিয়াশি বছরের কাছাকাছি বিচরণ করিয়াছিলেন। আরও বাঁচিয়া থাকিলে এ বছর জানুয়ারিতেই তাঁহার উমর একশত বছর হইত। তিনি অন্তত তিন মহাযুগ দেখিয়াছেন।

তাঁহার জন্মের তিন বছর আগে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ হইয়াছে। কিন্তু ক্ষতিপূরণস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। হইতে আরও সাত-আট বছর বাকি। আবদুর রাজ্জাককে জন্মিতে হইয়াছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন বাঙ্গালা প্রদেশে। যৌবনে তিনিও বাংলার মুসলমান সমাজের স্বাধিকার আন্দোলনে শামিল হইয়াছিলেন। কালক্রমে এই আন্দোলনই পাকিস্তান আন্দোলন বলিয়া অভিহিত হয়। আর পাকিস্তান জমানায় তিনি পূর্ব বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনে একপ্রকার_খানিক অগোচরে থাকিয়া_নেতৃত্বই প্রদান করিয়াছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাঁহার দরজায় পদাঘাত করিলে তিনি পিছনের খিড়কি দরজা দিয়া পলাইয়া নিজ গ্রামে_ঢাকা জেলার কেরানিগঞ্জের কলাতিয়ায়_চলিয়া যান। ফেরারি অবস্থায় পাকিস্তান সরকার তাঁহাকে ১৫ বছর কারাদণ্ড প্রদান করে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হইবার পর একদিন প্রখ্যাত ভারতীয় সংবাদবেত্তা খুশবন্ত সিংহ তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, ‘পাকিস্তানী সেনাপতিরা বলিয়া থাকেন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে হতসংখ্যা যৎসামান্য। সংখ্যাটা আপনারা বাড়াইয়া বলিতেছেন।’ উত্তরে আবদুর রাজ্জাক বলিলেন, ‘নিহতের সংখ্যা যথাযথ গোণা হয় নাই_কথাটা মিথ্যা নহে। মাত্র এক পাড়ায় ৪৫ জনের হত্যা যদি যৎসামান্য হইয়া থাকে তো উঁহাদের যাহা ইচ্ছা বলিতে দিন।’ দেশ স্বাধীন হইবার বছর দুই পর তিনি জাতীয় অধ্যাপক পদে সংবৃত হইয়াছিলেন। তাঁহার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁহাকে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পদে শেষ প্রমোশন দিয়াছিলেন।

ব্রিটিশ শাসনের যুগে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের বাসনা ছিল হিন্দু-মুসলমান সমস্যার সুরাহা। ইহার পরিণতি পাকিস্তানের সৃষ্টিতে। আর পাকিস্তানী যুগে তিনি পাঞ্জাবী-বাঙ্গালী সমস্যার সমাধান চাহিয়াছেন। ইহাতে বাংলাদেশ কায়েম হইল। আর স্বাধীন বাংলাদেশে কি চাহিয়াছিলেন তিনি? এই যুগের একনম্বর সমস্যা কি? মালিক-মজুর? নারী-পুরুষ? পাহাড়ি-বাঙ্গালি সমস্যা, না অন্য কিছু? সমস্যা হয়ত অত সহজ নহে, কিংবা সহজে বলিবার নহে। তারপরও জিজ্ঞাসা করিতে দোষ নাই, এই সমস্যায় কি আকাঙ্ক্ষা বা ভূমিকা ছিল অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের? আহমদ ছফা একদা বইয়ের উৎসর্গপত্রে লিখিয়াছিলেন, ‘অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে_অনাকাঙ্ক্ষাই যাঁর একমাত্র আকাঙ্ক্ষা।’

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সহিত যখন আমার দেখা হয় ততদিনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছাড়িয়া দিয়াছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পাড়া ছাড়িয়া যান নাই। বছর দুয়েক আগে তাঁহাকে জাতীয় অধ্যাপক পদে নিয়োগ করা হইয়াছে। আমার পরম শিক্ষক আহমদ ছফা বাধ্য না করিলে আমি হয়ত কোনদিনই আবদুর রাজ্জাকের সাক্ষাতে উপস্থিত হইবার সাহস করিতাম না। অন্য আরো দশ কারণের সহিত এই কারণেও আমি আহমদ ছফার অধমর্ণ।

আর অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সহিত দেখা না হইলে আমার জীবন দরিদ্রতর হইত। এই সত্যে সন্দেহ নাই। তাঁহার অনেক বক্তৃতার সহিত আমি সঠিক বুঝিয়া বা আঁটিয়া উঠিতে পারি নাই একথাও অসত্য নহে। ফলে তাঁহার অকৃত্রিম অনুরাগীদের কাঁহারও কাঁহারও_এমনকি খোদ আহমদ ছফার_বিরাগভাজনও আমাকে হইতে হইয়াছে। ইহাতে দুঃখ নাই। কারণ আমি যাহা সত্য মনে করিয়াছি তাহাই বলিয়াছি_সত্যের অন্যথা করি নাই।

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের আকাঙ্ক্ষা আমি বলিয়াছিলাম_’বুর্জোয়া’ আকাঙ্ক্ষা। আমাদের এই দরিদ্রতম দেশে বুর্জোয়া কথাটিকে এখনও গালি মনে করা হয়। একসময় কোন কোন দেশে ইহাকে প্রশংসার কথাও মনে করা হইত। ‘বুর্জোয়া’ কথাটা আমি এস্তেমাল করিয়াছিলাম তাঁহার একটি লিখিত বক্তৃতা পড়িয়া। আমার মনে হইয়াছিল, মতামত দিয়া যদি মানুষ চেনা যাইত তবে কোন মানুষের লেখা পড়িয়া ‘বুর্জোয়া’ শনাক্ত করিতে কোন বেগ পাইতে হইত না। কিন্তু পৃথিবী ঠিক গোলাকৃতি নহে, উত্তর-দক্ষিণে সামান্য চাপা।

কেন আমি তাঁহাকে ‘বুর্জোয়া’ বলিয়াছিলাম তাহার কৈফিয়ত দিবার জন্য এই নিবন্ধ লিখিতেছি না। প্রসঙ্গক্রমে বলিয়া রাখিতেছি, যে দেশে অর্ধেকেরও বেশি মানুষ_বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শুদ্ধ_’সামন্ত’ আর বাকি অর্ধেক ‘মুৎসুদ্দী’ বিশেষ সে দেশে ‘বুর্জোয়া’ কথাটাকে সামান্য প্রশংসাও বলা যাইতে পারে। আমার আশা, যাহারা আবদুর রাজ্জাকের নিজের লেখার সহিত অল্প পরিমাণেও পরিচয় রাখেন তাহারা আমার কথার মর্ম বুঝিতে পারিবেন।

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের প্রায় সমস্ত জীবনই কাটিয়াছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারিপাশে। প্রথমে পূর্বপাশের কথা বলিব। ছাত্রজীবনের জাবর কাটিতে গিয়া এক জায়গায় তিনি লিখিয়াছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকিবার আগের দুইটি বৎসর কাটাইয়াছি ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজে। কলেজের ছাত্র সংখ্যা ছিল দুইশতের মতো। বর্তমান হাইকোর্ট ভবনটি ছিল সেদিনকার ঢাকা কলেজ। ভবনটি তৈরি করা হইয়াছিল আসাম ও ইস্ট বেঙ্গলের লেফটেন্যান্ট গভর্নরের জন্য। এখন যাহা ফজলুল হক হল তাহাই ছিল কলেজ হোস্টেল। দুই বছর কাটিয়াছে বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব কাছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কোন যোগাযোগ তখন হয় নাই।’

এখানে প্রসঙ্গক্রমে বলিয়া রাখি, অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের যে বক্তৃতা হইতে আমি এই উদ্ধৃতি লিখিতেছি তাহা আদপে ইংরেজি ভাষায় লিখিত। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইহার বাংলা অনুবাদের ব্যবস্থা করাইয়াছিলেন। অনুবাদকের ভাষা বিশেষ প্রাঞ্জল হয় নাই বলিয়া আমি অনুবাদ সংশোধন করিতে_বলিতে পুনর্লিখন করিতে_বাধ্য হইয়াছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত চটি পুস্তিকায় অনুবাদকের নামটি মুদ্রিত হয় নাই। তবে বিখ্যাত লেখক হুমায়ুন আহমেদ এক লেখায় দাবি করিয়াছেন অনুবাদটি তাঁহার হাতের কাজ। জানিয়া ব্যথা পাইলাম।

আবদুর রাজ্জাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকিতে না ঢুকিতে ১৯৩১ সাল আসিয়া গিয়াছে। তাঁহার কথায়, ‘তখনকার বিশ্ববিদ্যালয় ছিল একটা ছোটখাট ব্যাপার। জন্মের দশ বৎসর পার হইয়াছে তবু বিশেষ একটা_বাড়ে নাই। শুদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় কেন, কোন কিছুই তখন বাড়িতেছে না। শহর যেন ক্রমেই গ্রামে পরিণত হইতেছে।’ কথার পিঠে কথার প্রমাণও পেশ করিয়াছেন তিনি। যোগ করিয়াছেন, ‘ব্যাপারটি ঘটিয়াছে গত একশত পঁচিশ বছর ধরিয়াই। আঠারোশ সনে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল দুই লক্ষ পঁচিশ হাজার। উনিশশ একত্রিশ নাগাদ তাহা নামিয়া আসিয়াছে ষাট হাজারে। এরকম একটি ক্ষয়িষ্ণু শহরের বিশ্ববিদ্যালয় তো ছোট হইবেই। বিশ্ববিদ্যালয় ভবনটি পর্যন্ত চোখে পড়িবার মত কিছু ছিল না।’

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কি পদার্থ? বিশ্ববিদ্যালয় মানে তো শুদ্ধ ভবনকোঠা নহে। আরো। বিশ্ববিদ্যালয় মানে দেশ, শহর, দেশের মানুষ, সমাজরাষ্ট্র। অধ্যাপক রাজ্জাক বলিতেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়ের ঘটনাটি আরো আগের এবং উহা মনে রাখিবার মতন ঘটনা বটে। মুসলিম সাহিত্য সমাজের সভা হইবে। সভার স্থান মুসলিম হলের ডাইনিং রুম। প্রধান আকর্ষণ কবি নজরুল ইসলাম।’ আবদুর রাজ্জাক আরো লিখিতেছেন, ‘গভীর আগ্রহ লইয়া গেলাম সাহিত্য-সমাজের সভায়। ভাগ্যের কথা_গিয়াছিলাম। গান গাহিয়া, কবিতা আবৃত্তি করিয়া, বক্তৃতা দিয়া কবি নজরুল মাতাইয়াছিলেন সবাইকে। তিনি একাই একশ। কি অভূতপুর্ব প্রাণশক্তি! মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করার কি অসামান্য ক্ষমতা! আমি অভিভূত হইয়া গেলাম।’ এই সভাতেই_আবদুর রাজ্জাক প্রসঙ্গক্রমে জানাইতেছেন_কাজী মোতাহার হোসেনের সহিতও তাঁহার পরিচয় ঘটে: ‘অল্প বয়স্ক একটি যুবক, মসৃণ করে কামানো গাল, পোশাক-আশাকের তত দিকে খেয়াল নাই। সেই সভাতে তাঁহাকে নিস্প্রভ দেখাইতেছিল।’

১৯৮৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোট্ট একটি বক্তৃতা দিয়াছিলেন। সেই বক্তৃতার কোন শিরোনাম ছিল না। পড়িয়া আমার মনে হইল ইহার শিরোনাম হইতে পারিত_’ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি’। এই বক্তৃতা ছাপা হইয়াছিল ছোট্ট একটি পুস্তিকাকারে। তাহাতে বক্তার নামটি ছিল মজার: আবদুর রাজ্জাক, এম. এ. (ঢাকা)। কমাশুদ্ধ ক্ষুদ্র এই তিনটি শব্দ হইতেই আন্দাজ করা চলে কোন ধাতুতে গড়া মানুষ তিনি।

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের চিন্তাধারা কোন ঘরানার তাহা বুঝিবার জন্যও ঐ বক্তৃতার অংশবিশেষ তুলিয়া ধরিতে হয়। তিনি লিখিতেছেন: ‘উনিশশ আটত্রিশ সনে কবি জসীমউদ্দীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। শিক্ষকতা করেন প্রায় পাঁচ বৎসর। সময়টা তাঁহার ভাল যায় নাই। বিশ্ববিদ্যালয় সম্ভবত সৃষ্টিশীল প্রতিভাবানদের পছন্দ করে না। আমি নিজে মনে করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত প্রতিভাবান মানুষের তালিকায় এই কবির নাম প্রথমে আসিবে_সঙ্গে আসিবে শিল্পী জয়নুল আবেদীনের নাম।’

এই পর্যন্ত পড়িয়া কেহ কেহ মনে একটা ছোটখাট চোট পাইতে পারেন। মনে হয় আবদুর রাজ্জাক তাহা আগেভাগে আন্দাজও করিয়াছিলেন। তাই আগের থোকেই তিনি লিখিয়া রাখিয়াছেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন প্রচুর পণ্ডিত ব্যক্তির সমাবেশ ঘটিয়াছিল। তাঁহারা ছিলেন নিজ নিজ বিষয়ে রথী-মহারথী।’ উপদেশ অপেক্ষা উদাহরণ ভাল বলিয়াই হয়ত তিনি যোগ করিয়াছিলেন, ‘তাঁহাদের কেহ কেহ অবশ্যি উনিশশ একত্রিশ সনের দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়িয়া গেলেন।” ইঁহাদের মধ্যে ছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত, ভূপতিমোহন (ওরফে বি.এম.) সেন, আবুল হুসেন। যাঁহারা থাকিলেন তাঁহাদের ‘ঔজ্জ্বল্যও কিছুমাত্র কম নয়’। যথা: এস.এন. বোস, জে.সি. ঘোষ, রমেশচন্দ্র (ওরফে আর.সি.) মজুমদার, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সুশীল কুমার (ওরফে এস.কে.) দে. আর হরিদাস ভট্টাচার্য। বিশেষ দ্রষ্টব্য: আবদুর রাজ্জাকের মন্তব্য: ইঁহারা “মেধা ও মনীষার আশ্চর্য সমন্বয়।”

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক আরো যোগ করিয়াছেন, ততদিনে ‘বিদগ্ধ তরুণ অধ্যাপকেরাও আসিতে শুরু করিয়াছেন। যেমন সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন, এ.কে. দাশগুপ্ত। সবচেয়ে বেশিসংখ্যক গুণী ব্যক্তির সমাবেশ ঘটিয়াছিল বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগে।’ এস.কে. দে_’যাঁহার সংস্কৃত ও বাংলা জ্ঞান ছিল প্রবাদের মতো’_ছিলেন প্রফেসর। ড. শহীদুল্লাহ্কে সামান্য লেকচারার পদ লইয়াই সন্তুষ্ট থাকিতে হইয়াছিল। যদিও সে সময়েই তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভাষাতত্ত্ববিদ। মোহিতলাল মজুমদার ও চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়_ইঁহাদের কাঁহারো এম. এ. ডিগ্রি ছিল না। ‘কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই দুই গুণী ব্যক্তিকে সাদরে শিক্ষক হিসেবে গ্রহণ করিল।’

এইটুকু ভূমিকা মাত্র। ওস্তাদের মার খাওয়ার জন্য শেষ রাত্র পর্যন্ত অপেক্ষা করিতে হইবে না। আর মাত্র দুইটি বাক্য পড়িতে হইবে_’কিন্তু মজার ব্যাপার_এইসব জ্ঞানীগুণী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ওপর খুব প্রভাব ফেলেন নাই বলিয়া মনে হয়। ফলস্বরূপ উনিশশ একুশ থেকে উনিশশ সাতচলি্লশ সনের মধ্যে মাত্র একজন বুদ্ধদেব বসু বাহির হইয়া আসিলেন।’ এই মারের চোট আরো ধারাল করিবার জন্য আবদুর রাজ্জাক জোর দিয়া যোগ করিয়াছেন, ‘উনিশশ একুশ থেকেই উনিশশ সাতচলি্লশ সন পর্যন্ত যেসব ছাত্রছাত্রী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি পাইয়াছে তাহাদের বিদ্যাবুদ্ধি এই উপমহাদেশের অন্য যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের চেয়ে কম ছিল না। বরং বেশিই ছিল।’

এই কীর্তির সমস্তটা কৃতিত্ব শিক্ষকদের দিতে তিনি রাজি নহেন। তিনি লিখিয়াছেন, ‘মনে করা যাইতে পারে রথী-মহারথী সব শিক্ষকদের কল্যাণেই ইহা সম্ভব হইয়াছে। কিন্তু আমার মনে হয় এর পেছনের প্রধান কারণটি হইতেছে ইহা ছিল ছোট্ট একটা বিশ্ববিদ্যালয়। শহর হইতে দূরে নিরিবিলি বিদ্যাপীঠ বিশেষ।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের কীর্তিতে শিক্ষকদের তুলনায় ছাত্রদের ভাগই বেশি। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের চোখে তাহার নতুন প্রমাণ পাওয়া গেল আরো পরে: ‘অথচ পরবর্তী সময়ে যখন শিক্ষক তালিকা আগের তুলনায় অনেক নিস্প্রভ তখন দেখা গেল অনেকেই বাহির হইয়া আসিতেছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই প্রকাশিত হল মুহম্মদ আবদুল হাই সাহেবের সম্পাদনায়_সেই বিখ্যাত ‘সাহিত্য পত্রিকা’।’

সে যুগের ছাত্ররা কেমন ছিলেন? আবদুর রাজ্জাকের মতে, অনার্সের ছাত্ররা পড়াশোনায় খুব মনোযোগী। তিনি লিখিয়াছেন, ‘বিভাগীয় শিক্ষকেরা প্রতিটি ছাত্রকেই খুব ভালোভাবে চিনিতেন। না চিনিয়া উপায় ছিল না। সে যুগে টিউটোরিয়াল ক্লাসগুলিকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হইত। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক গড়িয়া উঠিত টিউটোরিয়াল ক্লাসে। সে সম্পর্ক হইত দীর্ঘস্থায়ী।’ কিন্তু সকল মুদ্রারই অন্যপিঠ থাকে। যাহাকে বলে বিরহ তাহা প্রেমেরই অপর পিঠ।

আবদুর রাজ্জাক বিরহের কিছু বর্ণনা করিয়াছেন: ‘আগেই বলিয়াছি আমরা থাকিতাম বিশ্ববিদ্যালয় ভবনের দোতলায়। সিঁড়ি দিয়া উঠিলে বামদিকের পহিলা ঘরটিই ছিল আমার। হলঘরের মতন প্রকাণ্ড একটি কামরা। আমি ছাড়াও আরো অনেকে ছিল সেখানে। তাদের চোখে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার স্বপ্ন। আমরা যে অল্প কয়দিন সেখানে ছিলাম তাহার স্মৃতি খুব সুখকর ছিল না।’ দুঃখের একটি বয়ান এইরকম: ‘অনাথের মতন আমরা ঘুরিয়া বেড়াইতাম। আমাদের যে একটি অস্তিত্ব আছে, তাহাও যেন কেহ জানিত না। খাইতে যাইতাম ডাইনিং হলে। আমি কে? বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কিনা কেহ তাহা জিজ্ঞাসা করিত না। নিঃশব্দে খাইয়া চলিয়া আসিতাম।’

‘একদিনে কথা খুব মনে পড়ে। কি কারণে যেন দেরি হইয়াছে। দারুণ ক্ষুধার্ত। ডাইনিং হলে ঢুকিয়া দেখি সাধারণ খাবারের পাশে একটি আলাদা টেবিলে পোলাও, কোর্মা, কাবাব সুন্দর করে সাজানো। আমি খাইতে বসিয়া গেলাম। অবাক হইয়া দেখিতেছি আমার সঙ্গে আর কেহ বসিতেছে না। যখন খাইতে শুরু করিয়াছি তখন কয়েকজন সিনিয়র ছেলে আসিয়া আমাকে খুব যত্ন করিয়া খাবার-দাবার তুলিয়া দিতে লাগিল। উহা ছিল উহাদের একটা ব্যক্তিগত উৎসবের খানাপিনা। সম্ভবতঃ বোকা ছিলাম, ব্যাপারটা বুঝিতে পারি নাই। খাইয়া দাইয়া চলিয়া আসিয়াছি।’

এখন একটি সুখের ছবি। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ছাত্রসংখ্যা ছিল সাতশতের কাছাকাছি। ‘ছাত্রী ছিল মাত্র পাঁচজন।’ আবদুর রাজ্জাক মন্তব্য করিতেছেন, ‘উহা একটি বড় ঘটনা বটে। একসঙ্গে এত ছাত্রীর সমাবেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের গত দশ বৎসরের জীবনে কখনো ঘটে নাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে_প্রথম দশ বছরে_দুইটি মাত্র ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় হইতে ডিগ্রী লইয়াছিলেন। ইতিহাসে করুণাকণা গুপ্ত এবং অঙ্কে ফজিলাতুন্নেসা। আবদুর রাজ্জাকের মন্তব্য: ‘তাঁহারা দুইজন বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্রী। ইঁহারা সে যুগে পড়াশোনা শেষ করিয়া কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করিয়া নিজ নিজ যোগ্যতার যথাযথ ব্যবহার করিয়াছিলেন।’ তিনি উল্লেখ করিয়াছেন, ফজিলাতুন্নেসার বিলায়েত যাওয়া উপলক্ষে কবি নজরুল একটি কবিতা লিখিয়াছিলেন।

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো একটি কীর্তির কথা সজোরে বলিয়াছেন। এই কীর্তির নাম মাতৃভাষার স্বীকৃতি। তিনি লিখিয়াছেন, ‘সমগ্র উপমহাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় যা মাতৃভাষাকে যথাযথ মর্যাদা দিল।’ সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মৃদু ভাষায় ভর্ৎসনা করিতেও পিছুপা হইলেন না তিনি। লিখিলেন, ‘অবশ্য পরবর্তী সময়ে ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় আরেক ধাপ আগাইয়া যায়_উর্দুকে করে শিক্ষাদানের মাধ্যম। আমরা যাহা এখনো করিতে পারি নাই।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আরো ভর্ৎসনা করিয়াছেন তিনি। দেখাইয়াছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কোন শিক্ষকের মন তখন বুর্জোয়া স্তর পর্যন্ত উঠিতে পারে নাই। নিচের অংশটি পড়িয়া দেখিলে তাহা পরিস্কার হয়। আবদুর রাজ্জাক বলিতেছেন: ‘ছাত্রজীবনের প্রথম দিনগুলিতে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আমার পরিস্কার কোন ধারণা হয় নাই। সবই কেমন অস্পষ্ট ছাড়া ছাড়া।’ তিনি একদিনের ঘটনা বয়ান করিয়াছেন এইভাবে_হল প্রভোস্ট জনাব হাসান তখনো ডক্টরেট ডিগ্রী পান নাই, একদিন হলের নবাগত ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিলেন। ‘আমার কাছে বক্তৃতাটি খুবই সাদামাটা মনে হইল। তিনি সে বক্তৃতায় কি বলিয়াছিলেন আজ আর কিছুই মনে নাই। শুধু মনে আছে এক পর্যায়ে আমার দিকে আঙুল দেখাইয়া বলিলেন_এই ছেলেটি পর্যন্ত একদিন কিছু একটা হইয়া যাইতে পারে। আমার চোখেমুখে বুদ্ধি ঝকমক করিতেছিল বলিয়াই যে তিনি ইহা বলিলেন তাহা নহে। আমার গোবেচারা ভঙ্গিটি লইয়াই একটু রসিকতা করিলেন।’

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের আরেকটি শিক্ষা এই যে মাতৃভাষার মাধ্যম ছাড়া শিক্ষা-ব্যবস্থা কখনই পূর্ণ হইতে পারে না। বিশেষত আমাদের দেশে। তিনি বলিয়াছেন, ‘আমাদের দেশে সাধারণত ইংরেজী ভাষা শেখার জন্য চৌদ্দ, পনের, ষোল অথবা কুড়ি নিই। দুনিয়ার কোন দেশে বিদেশী ভাষা শেখার জন্য এবং এই রকম incompetent knowledge acquire (অযোগ্য জ্ঞান অর্জন) করার জন্য এত সময় দেওয়া হয় না। পনের বা বিশ বছর পরেও যে ইংরেজি আমাদের শেখা হয় যে সব দেশে [লোকে] ইংরেজিতে কথাবার্তা বলে সে সব দেশে গেলে বুঝা যায় যে এই শেখাটা কত অসম্পূর্ণ। এই অসম্পূর্ণ জ্ঞানের ভিত্তিতে শিক্ষক এবং ছাত্র মিলে যে অবস্থার সৃষ্টি করেন তাহা কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উল্লেখ করিবার মতন নহে। শুদ্ধ এই মাত্র কারণে আমি মনে করি যে বাংলা ভাষা ছাড়া_মাতৃভাষা ছাড়া_শিক্ষার বাহন আর কিছুই হইতে পারে না।’

১৯৮৫ সালের শেষের দিকে বাংলা একাডেমিতে দেওয়া আরেকটি বক্তৃতায় তিনি একই বিশ্বাসের পুনরাবৃত্তি করিয়াছিলেন, ‘প্রায় আড়াই হাজার তিন হাজার বছরের ইতিহাস এই উপমহাদেশের ভেতর কখনো দেশের ভাষা, জাতীয় ভাষা, জনগণের ভাষা কিংবা মাতৃভাষা যাহাই বলেন কখনো শিক্ষা বা সংস্কৃতির বাহন হিসেবে স্বীকৃত হয় নাই। বাংলাদেশেই এটা প্রথম। আমি মনে করি ইহাতে সামান্য একটু গর্ব করার অধিকার হয়।’

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক বিষয়ে কেহ কেহ_যেমন হুমায়ুন আহমেদ_’রহস্যময় মানুষ’ অভিধাটি প্রয়োগ করিয়াছেন। কি কারণে জানি না আমি ইহাতে আনন্দ পাই নাই। তবে স্বীকার করিতে হইবে তিনি সব বিষয়ে মুখ খুলিতেন না। যখন খুলিতেন নতুন কিছু বলিতেন। যেমন তিনি একদিন বলিয়াছিলেন, ‘আমরা সকলেই দুঃখ করি যে বিশ, পঁচিশ, ত্রিশ, চলি্লশ বছর যাবৎ ভাষা আন্দোলন, সংগ্রাম করার পরও বাংলা ভাষার বর্তমান অবস্থা আমাদের দেশে লজ্জাকর। আমি ঠিক একমত নই। এই যে অন্য ভাষায় লেখাপড়া শেখা, বিদ্যাচর্চা করা, এটা বাঙালির_বাংলাভাষীর বিশেষ দুর্ভাগ্য নহে। দুনিয়ার সব দেশেই আবহমান কাল সাধারণত একটা বিদেশি ভাষায় বিশেষ শ্রেণী শিক্ষালাভ করিয়াছেন, জ্ঞান অর্জন করিয়াছেন_কোন সময় গ্রিক, কোন সময় ল্যাটিন, কোন সময় সংস্কৃত, আরবী, ফারসি।’

এখন, তাঁহার মতে, অফিস আদালতে বাংলা চালু হইলে ভাল। না হইলে আত্মহত্যা করার কোন কারণ নাই। ভারতের উদাহরণ টানিয়া তিনি বলিয়াছেন ভারতে_শুদ্ধ বাংলার নহে, যে কোন দেশীয় ভাষার_মাতৃভাষার অবস্থা সংকটাপন্ন। ‘ইহার একটি মাত্র কারণ ইংরেজি ভাষার এই প্রকাশ এখন বিগ বিজনেস।’ ভারতে ৭০ কোটি লোকের বাজার রহিয়াছে_ইহা দুনিয়ার যে কোন মার্কেটের চেয়ে বড়।

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের কিছু কিছু কথার তাৎপর্য ধরিতে হইবে। তিনি শুদ্ধ ইশারা করিয়াছেন। যেমন_’সেই সময়ে হলে ভর্তি হইবার পদ্ধতি কি ছিল তাহা এখন ঠিক মনে পড়িতেছে না। শুদ্ধ মনে পড়িতেছে, নানান ধাপ ডিঙ্গাইয়া আমি এক সময় মুসলিম হলের বাসিন্দা হইয়া গেলাম। এই মুসলিম হলই পরবর্তী সময় হইল সলিমুল্লাহ মুসলিম হল। সেই নামও স্থায়ী হইল না, নতুন নাম হইল সলিমুল্লাহ্ হল। নামের বিবর্তনের পিছনে সব সময়ই একটি গল্প থাকিয়া থাকে। ঈশপের গল্পের মতন সেই গল্পে একটি নীতিকথাও থাকে। একদিন কেহ হয়ত নীতিকথাটি আপনাদের ব্যাখ্যা করিবে।’ এই কথা ১৯৮৫ সালের। পরে উচ্চ আদালত মুসলিম নাম আবার ফিরাইয়া আনিয়াছেন বলিয়া প্রকাশ।

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের গোচরে আছে: ‘যেই সময় জীবন ছিল ঢিলাঢালা, নিস্তরঙ্গ। রমনা ছিল সবুজ। নীলক্ষেত হইতে যেই লাল মাটির পথ মীরপুরের দিকে গিয়াছে তাহার দুই পাশেই ছিল ধানক্ষেত। আজ সেইখানে নিউ মার্কেট ও ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকা। এত দ্রুত এত ব্যাপক পরিবর্তন কি করিয়া হইল? এই পরিবর্তনের অন্তর্নিহিত অর্থটি কি? আদৌ কোন অন্তর্নিহিত অর্থ আছে কি? অন্য কেউ অন্য কোনদিন হয়ত এই প্রশ্নের উত্তর দিবার চেষ্টা করিবে। আমি করিব না।’

এই নিবন্ধ শেষ করিবার সময় হইয়াছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স একশ বছর হইতে বেশিদিন নাই। এই বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ব বাংলার সমাজ এবং ঢাকা শহর উভয় জগতের পরিবর্তনের অংশ এবং কিছু অংশে কারণও বটে। ১৯৩৭ সালের জানুয়ারি হইতে ১৯৪২ সালের জুন পর্যন্ত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য ছিলেন রমেশচন্দ্র মজুমদার। তাঁহার স্মৃতিকথা_জীবনের স্মৃতিদ্বীপে_ছাপা হইয়াছিল ১৯৭৮ সালে। আবদুর রাজ্জাক তখনও জীবিত ছিলেন। রমেশচন্দ্রের স্মৃতিকথায় কিছু কথা আছে যাহা আবদুর রাজ্জাক বলিতে রাজি হয়েন নাই।

রমেশচন্দ্র মজুমদার ১৯৭৮ সালে লিখিয়াছেন: ‘১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে বঙ্গভঙ্গ রহিত হয় বটে কিন্তু পূর্ব বাংলার বিক্ষুব্ধ মুসলমানদের মধ্যে একটি আন্দোলন চলতে থাকে। এই আন্দোলন বন্ধ করার উদ্দেশ্যে ইংরাজ সরকার এই বলে তাদের আশ্বাস দিলেন যে, পূর্ববঙ্গের ঢাকা শহরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। মুসলমানেরা এতে খুবই খুশি হলেন বটে, কিন্তু হিন্দুদের মনে অসন্তোষ দেখা দেয়। তাঁরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলেন। সাধারণতঃ যাঁরা রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে দূরে থাকতেন, তাঁরাও এবার এই প্রতিবাদ আন্দোলনে যোগ দিলেন। এঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলেন রাসবিহারী ঘোষ এবং গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁদের প্রধান যুক্তি হল এই যে, প্রশাসনক্ষেত্রে বঙ্গভঙ্গ রহিত হয়েছে বটে, কিন্তু তার বদলে এখন সাংস্কৃতিক বিভাগ করা হচ্ছে। ফলে, এতে আরো গুরুতর বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে। ক্রমেই এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করলে, বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জ হিন্দুদের এই বলে আশ্বাস দিলেন যে, তাদের এমন আশঙ্কার কোনো কারণ নেই। কারণ ঢাকায় যে বিশ্ববিদ্যালয় হবে তার ক্ষমতা এবং অধিকার ঢাকা শহরের দশ মাইল পরিধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এই সংকীর্ণ পরিধির বাইরে সমগ্র পূর্ব বাংলা পূর্বের মতোই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকবে।’

আরেকটু পরে রমেশচন্দ্র দুঃখ করিয়া লিখিতেছেন: ‘ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন যে হিন্দুরা ভাল চোখে দেখেননি এ কথা পূর্বেই বলেছি। কারণ হিন্দুদের বিশ্বাস ছিল বঙ্গবিভাগ রহিত করায় মুসলমানদের যে ক্ষতি হয়েছে অনেকটা তা পূরণ করার জন্যই এই নূতন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় বড় পদে হিন্দু শিক্ষকেরাই অধিষ্ঠিত ছিলেন তথাপি কোর্টের হিন্দু সভ্যরা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রীতির চোখে দেখেননি। বাইরে এই বিষয়ে যে আলোচনা হত কোর্টের সভায় হিন্দু সভ্যদের বক্তৃতায় তা প্রতিধ্বনিত হত। রমনার যেসব বড় বড় বাড়ি দখল করে আমরা শিক্ষকেরা বাস করছিলাম এটাতেই তাদের ঘোরতর আপত্তি ছিল। একবার তাঁদের একজনকে বলেছিলাম যে আমরা না এলে এ বাড়ি তো আপনাদের দিত না। সুতরাং হিংসা করেন কেন? কিন্তু বহুদিন পর্যন্ত এ মনোভাবের পরিবর্তন ঘটেনি।’ বলার দরকার আছে, এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সভাকে ‘সিনেট’ বলা হয় তখন তাহাকে ‘কোর্ট’ বলা হইত। এই কোর্ট মানে আদালত নহে।

রমেশচন্দ্রের আরেকটি টীকা: ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এই যে, এটি একটি আবাসিক (Residential) বিশ্ববিদ্যালয়। সমস্ত ছাত্রকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দশ মাইল চৌহদ্দির মধ্যে থাকতে হত। কারণ এর বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন অধিকার ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি তিনটি ছাত্রাবাস ছিল। পুরনো ঢাকা কলেজ ও জগন্নাথ কলেজের নামানুসারে দুটি ছাত্রাবাসের নাম হয়_ঢাকা হল (Dacca Hall) এবং জগন্নাথ হল  (Jagannath Hall)। জগন্নাথ হলে দু’শ এবং ঢাকা হলে প্রায় দেড়শ’ হিন্দু ছাত্রের থাকার ব্যবস্থা ছিল। তৃতীয় ছাত্রাবাস মুসলিম হলে প্রায় তিনশ’ ছাত্রের থাকার ব্যবস্থা ছিল। পুরনো ঢাকা কলেজের হোস্টেলে ‘ঢাকা হল’ হয়। আর দুটি হলের জন্য নতুন বাড়ি তৈরি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে-সব ছাত্র এই তিনটি ছাত্রাবাসে থাকত না, তাদের প্রত্যেককে হিন্দু হলে ঢাকা কিম্বা জগন্নাথ হলে, আর মুসলমান হলে মুসলিম হলের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে হত। ‘

রমেশচন্দ্র পুনশ্চ উবাচ: ‘প্রত্যেক হলে একটি বড় খাওয়ার ঘর ছিল। জগন্নাথ হলে দুটি পৃথক বাড়ি থাকায় প্রত্যেক বাড়িতে আলাদা খাওয়ার ঘর ছিল। নিয়ম ছিল যে, প্রত্যেক ছাত্রকেই এই ঘরে গিয়ে খেতে হবে। কিন্তু এ নিয়ে দুটি হিন্দু হলে প্রথমে কিছু গোলমাল আরম্ভ হয়। কয়েকটি নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ ছাত্র অন্য জাতির ছাত্রদের সঙ্গে এক পংক্তিতে খেতে রাজী হল না। জগন্নাথ হলে এই গোলমাল এড়াবার জন্য ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য ছাড়া অন্য সকল জাতির ছাত্রকে দুটি বাড়ির মধ্যে একটিতে জায়গা দেওয়া হত, যাতে নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ ছাত্রেরা অন্য বাড়িতে পৃথক ভাবে থাকতে পারে। কিন্তু ক্রমে এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অন্য জাতির ছাত্রেরা আন্দোলন শুরু করে এবং একবার সরস্বতী পূজার সময় এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। ঢাকা ও জগন্নাথ_দুটি হলেই খুব ধুমধামের সঙ্গে সরস্বতী পূজা হত। এই উপলক্ষে যাত্রা ও গীতবাদ্যের অনুষ্ঠানও হত। পূজায় গোঁড়া ছাত্রেরা আলাদা অঞ্জলি দিত। কিন্তু একবার অন্য ছাত্রেরা আপত্তি জানিয়ে বলল যে, তারা কাউকে পৃথক অঞ্জলি দিতে দেবে না; সকলকে একসঙ্গে অঞ্জলি দিতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে খাওয়ার ঘরের কথাও উঠল। তখন আমি ছিলাম জগন্নাথ হলের প্রোভোস্ট এবং ঢাকা হলের প্রোভোস্ট ছিলেন ড. (পরে স্যার) জ্ঞান ঘোষ। আমরা দু’জনে পরামর্শ করে আর কোন উপায় না দেখে ছাত্রদের ডেকে বললাম যে, তোমাদের কারুর কোন ধর্মবিশ্বাস বা সংস্কারে আমরা আঘাত দিতে চাই না। কিন্তু যেহেতু আমরা হলের প্রোভোস্ট এবং সকল ছাত্রই আমাদের তত্ত্বাবধানে আছে, এই অবস্থায় যদি সকল ছাত্র একসঙ্গে অঞ্জলি না দেয় তাহলে আমরাও প্রচলিত প্রথামত ছাত্রদের সঙ্গে একত্র হয়ে অঞ্জলি দেব না। কারণ একদল ছাত্রের সঙ্গে মিলে আমরা অঞ্জলি দেব, আর এক দল তাতে যোগ দেবে না_এটা খুবই বিসদৃশ দেখাবে। আর আমরা তোমাদের সরস্বতী পূজার কোন অনুষ্ঠানে বা ভোজে যোগ দেব না। কিছুক্ষণ এই নিয়ে খুব হৈ চৈ চলল। তারপর ছাত্ররা একসঙ্গে অঞ্জলি দিতে এবং খাওয়ার ঘরে একসঙ্গে বসে খেতে রাজী হল। তবে প্রথম কয়েক বছর চার পাঁচ জন খুব নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ ছাত্রের জন্য আমরা তাদের থাকবার ঘরে বসেই খাওয়ার ব্যবস্থা করি। পরে এ প্রথা উঠে যায়। ব্রাহ্মণ থেকে নমঃশূদ্র পর্যন্ত সকল জাতির ছাত্র একই ঘরে বসে খেত। এই একত্রে খাওয়ার ব্যাপারটি একটি খুব বড় রকমের সংস্কার বলে আমরা মনে করতাম। কারণ প্রসিদ্ধ বৈজ্ঞানিক ডঃ মেঘনাদ সাহা একবার ঢাকায় গিয়ে এই ব্যবস্থা দেখে বলেছিলেন যে, তিনি যখন ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলেন তখন তাঁকে কোন পাত্রে পানীয় জল দেওয়া হত না। কারণ অন্য ছাত্রেরা তাতে আপত্তি করত। পানীয় জল বন্ধ করা থেকে একেবারে একসঙ্গে বসে আহার করা_পনর কুড়ি বছরের মধ্যে এরকম একটি গুরুতর পরিবর্তন দেখে তিনি খুব আশ্চর্য হয়েছিলেন।’

কে বলে পরিবর্তন হয় নাই? ‘কিন্তু এই পরিবর্তনের অন্তর্নিহিত অর্থটি কি? আদৌ কোন অন্তর্নিহিত অর্থ আছে কি?’ শুদ্ধ ইহার সঙ্গে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের মুসলিম হলে খাওয়ার অভিজ্ঞতাটি স্মরণ করিলেও চলিবে।

২৭ নবেম্বর ২০১৪

২৮ নবেম্বর ২০১৪, সমকাল

অপরূপকথা মেঘমল্লার

আমার পরম সৌভাগ্য, সর্বসাধারণ দেখিতে পাইবার আগে আমি ‘মেঘমল্লার’ দেখার সুযোগ পাইয়াছি। এ পর্যন্ত দুইবার দেখিয়াছি। আশা করি ভবিষ্যতেও দেখিব। প্রথমেই ছবির রূপের কথা বলিতে হয়। এই ছবির রূপ এককথায় অপরূপ। ছবি দেখিবার পর আমার সঙ্গে যাঁহারা আলাপ করিয়াছেন তাঁহাদের এক একজন বলিতেছেন–বাংলা ছবিতে বহুদিন এমন বৃষ্টি হয় না। আমার এক মহান বন্ধু তবুও এই ছবি দেখিয়া চোখ ভিজান নাই। তিনি বৃষ্টির ফোটার খুঁত ধরিয়াছেন। দেখিয়াছেন প্রতিদিনই বৃষ্টির ফোটা একই জায়গায়–একই জানালায়–একই ধারায় ঝরিয়াছে। তিনি বলিয়াছেন–মানুষ এমন নিখুঁত ভাষায় কথা বলে! এ কেমন মফস্বল যেখানে কিষাণের পদপাত নেই!

border=1আমার ধারণা–এই খুঁত আরো খুঁত অনেকেই ধরিবেন। আমি এই মাননীয় মহোদয়কে বলিয়াছি–এই ছবিকে ‘উপকথা’ মনে করিবেন তো ভুল করিবেন। তো জানি, অনেকেই বলিবেন ‘মেঘমল্লার’ বাংলাদেশের–১৯৭১ সালের অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের–উপকথা। এমন বলায় হয়ত কোন ভুল নাই। উপকথা বা পরাকথা (ফ্যাবল বা প্যারাবল) আকারে ছবিটি দেখা যাইতেই পারে। এই ছবি মুক্তিযুদ্ধের ছবি ইহাই বা কে অস্বীকার করিবে!

শুদ্ধ মনে রাখিতে হইবে, ছবি দেখিবার পদার্থ মাত্র নহে। ছবি পড়িবার পদও বটে। জিল দোলুজের কেতাব পড়িয়া যাহাদের নজর ঘুরিয়া গিয়াছে তাহাদের বলিব সিনেমায় শুদ্ধ ছবি থাকে না, চোখও লাগিয়া থাকে। দোলুজের বদনজরে পড়িয়াছেন তো গিয়াছেন। উপকথা আর পুরাকথার ভেদ ভুলিয়াছেন। তো আপনি অপরূপকথার ভেদ ধরিতে পারিবেন না–ইহা তো জানা কথাই।


তারপরও আমি শাক্ত বিনয়ের সহিত নিবেদন করিব–‘মেঘমল্লার’ শেষবিচারে রূপকথা বিশেষ। রূপকথার প্রকৃত অর্থ–যতদূর বুঝি–পরের কথা। কথাটা একটু বুঝাইয়া বলিতে হইবে। গ্রিক ভাষায় ‘আগোরা’ মানে ‘হাটবাজার’। তাই ‘আলেগোরা’ মানে যাহা হাটবাজারে বলা যায় না। অর্থাৎ যাহা প্রকাশ্যে বলা যায় না। ইংরেজি ‘অ্যালেগরি’ মানে তাই গোপন কথা। আমি ধরিয়া লইয়াছি ভবিষ্যতের বা পরের কথাও তাই। যাহা এখনই বলা যায় না। উপকথা ও রূপকথার মধ্যে ভেদ আছে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পেও এই ভেদরেখা খানিক দেখা গিয়াছে। জাহিদুর রহিম অঞ্জন তাহাকে বেশ বড় করিয়া তুলিয়াছেন।

প্রথমেই প্রশ্ন উঠিবে–আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পটি বলিতেছে যে সে কে? সে দেখা যাইতেছে সর্বদ্রষ্টা। অর্থাৎ সে যেন গল্পের সব জায়গা সব পাত্র দেখিতে পাইতেছে আর বলিয়া যাইতেছে বলিয়া যাইতেছে। গল্পের যাহাকে বলা যায় নায়ক তাহার নাম নূরুল হুদা। নূরুল হুদা নামের একার্থ হয়–যে পথ দেখাইতেছে তাহার আলো। এই আলো নূরুল হুদা যেখানে যায় সেখানেই থাকে।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প বৃষ্টি দিয়া শুরু, নূরুল হুদা দিয়া শেষ। বৃষ্টি আর হুদার মধ্যখানে আছে রক্ষাকবচ অর্থাৎ বৃষ্টিরোধক–রেইনকোট। এই রেইনকোটও আবার পরস্ব। হোক সেই পর বড়ই আপন-বৌয়ের ছোটভাই। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের নজর এই পরম পূজনীয়া বা ফেটিশ দ্রব্যের মধ্যে স্থির হইয়া আছে। তাই গল্পের নাম ‘রেইনকোট’ হইয়াছে। মনে রাখিতে হইবে দ্রব্য মানে যাহা দ্রবীভূত হইতে পারে। ফেটিশ দ্রবীভূত হয় না। রেইনকোট ফেটিশের বিশেষ বটে। ইহা অদ্রব্য।
meghmollar-2.jpg

জাহিদুর রহিম অঞ্জনের চোখ আলাদা। অঞ্জন এই গল্পকে বাংলাদেশের আকাশ হইতে দেখিয়াছেন। মেঘমল্লারের প্রদর্শক তাহার দেখানোটা শুরু করিয়াছেন ‘স্মৃতি’ হইতে। ১৯৭১ স্মৃতিতে ভাসিয়া উঠিয়াছে বাসাবদলের গল্প আকারে। সমগ্র বাংলাদেশে বা আন্তজেলা সাধারণ পরিবহনে করিয়া বাসার খাটপালঙ্ক চেয়ারটেবিল আসবাবপত্র অন্য কোন বাসায় যাইতেছে। বোন, বোনের মেয়েকে লইয়া যাইতেছে লম্বাচুল দাঁড়িগোপে ঢাকা ভাই। কোথায় যাইতেছে তাঁহারা? ঢাকায়? ঠিক নাই। ইহাকেই তো বলে শহীদ পরিবার? শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবার? তাই না?

‘স্মৃতি’ শব্দের গোড়ায় আছে ‘স্মরা’। ইহার আদি অর্থ ভালবাসা। ইংরেজি ‘স্মার্ট’ কথাটির এখান হইতেই উৎপত্তি হইয়াছে। সংস্কৃতের মত বাংলায়ও আজিকালি ‘স্মার্ত’ কথাটা ব্যবহৃত হইতে দেখা যায়। অর্থে সামান্য ভেদ অবশ্য দাঁড়াইয়া গিয়াছে। বলিতেছিলাম কি, মেঘমল্লার এই জন্য একটা ভিন্ন গল্প হইয়া উঠিয়াছে। ইহাকে ঠিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পের ‘ছায়া অবলম্বনে’ বানানো ছবি বলা তাই কিছুটা মায়াবী কথা হইয়া যাইতেছে।

পার্থক্যের মধ্যে, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বলিয়াছেন নূরুল হুদা ও আসমা দম্পতির একটি পাঁচ বছরের ছেলে আর একটি আড়াই বছরের মেয়ে আছে। জাহিদুর রহিম অঞ্জন ছেলেটি খাইয়া ফেলিয়াছেন। মনে পড়ে, বৃষ্টির ঝমঝম বোল দিয়া এই গল্পের শুভ মহরৎ হইয়াছিল–‘ভোররাত থেকে বৃষ্টি। আহা! বৃষ্টির ঝমঝম বোল’। আর আখতারুজ্জামান ইলিয়াস গল্পটি ছাড়িয়া দিলেন পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর বন্দীনির্যাতন শিবিরে নির্যাতনকারী সৈন্যদের চাবুকের বাড়ি নূরুল হুদার পিঠে পড়িবার শব্দে।

ইলিয়াসের সর্বদ্রষ্টা কথক জানাইতেছেন–‘রেইনকোটটা এরা খুলে ফেলেছে, কোথায় রাখল কে জানে। কিন্তু তার ওম তার শরীরে এখনো লেগেই রয়েছে। বৃষ্টির মত চাবুকের বাড়ি পড়ে তার রেইনকোটের মত চামড়ায় আর সে অবিরাম বলেই চলে, মিসক্রিয়েন্টদের ঠিকানা তার জানা আছে’। অঞ্জন এখানে একটি ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি যোগ করিয়াছেন–তাহার সঙ্গে একটি পিস্তলের গুলির আর্তনাদও। নূরুল হুদার শাহাদতবরণের মধ্য দিয়া ছবির আখ্যান শেষ হইয়াছে।


আমার প্রস্তাব–মেঘমল্লার ছবিটি পরের কথা অর্থে অপরূপকথা বা অ্যালেগরি বিশেষ। ইহার মধ্যে বেশি ইতিহাস খুঁজিতে যাওয়া বাতুলতা মাত্র। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ইতিহাসের কুহক হইতে পুরাপুরি ছাড়া পাইয়াছেন বলিতে পারিলে আমিও ছাড়া পাইতাম। কিন্তু না, পারিতেছি না। পক্ষান্তরে জাহিদুর রহিম অঞ্জন ইতিহাস হইতে ছুটিয়া আসিয়াছেন অপরূপকথার ভিতরে। আর একটু বুঝাইয়া বলিব। মনে রাখিতে হইবে, অ্যালেগরি আর মিথ (বা পুরাকথা) ঠিক এক পদার্থ নহে।

মুক্তিযুদ্ধ তো মুক্তিযুদ্ধই ছিল। এখনও কি তাহা মুক্তিযুদ্ধ আছে! এখন মানে এই–ধরা যাক–গোটা চল্লিশ বছর পর। এখন হইতে দুই কি পাঁচ শত বছর পরও কি এই মুক্তিযুদ্ধ এই মুক্তিযুদ্ধই থাকিবে? এই এখন এখানে বসিয়া তখন সেখানে তাহা কেমন দেখাইবে? ভিন্ন কিছু হইবে না? বাসাবদলের অধিক কিছু? আমার ধারণা এই দুঃসংবাদ সবার আগে পাইয়াছেন বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের একমাত্র পুরুষ মুহম্মদ খসরু। তিনি কহিয়াছেন: ‘মেঘমল্লার’ ছবিটি দেখে এদেশের দর্শকবৃন্দ কিছুটা হোঁচট খেলে অবাক হব না।’

আমি তাঁহার সহিত দ্বিমত করিবার কোন পথ পাইতেছি না। হোঁচট তো খাইবেই। আছাড়ও খাইতে পারে। তবে কি কারণে? প্রশ্ন হইতেছে এইটাই। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত মুক্তিযুদ্ধ দেখে নাই। মুক্তিযুদ্ধ তাহাদের দেখিয়াছে। এই পরম সত্যটি বলিবার সাহস কাহার আছে? ছিল আহমদ ছফার। যে উপন্যাস পড়িলে মধ্যবিত্তকে জানিতে, বুঝিতে ও শুনিতে পারা যায় তাহাকে ‘অলাতচক্র’ বলে। আর যে ছবি দেখিলে মধ্যবিত্তকে জানিতে, বুঝিতে ও শুনিতে পারা যায় তাহাকেই কি ‘মেঘমল্লার’ বলে?

একবার ফিনল্যান্ড দেশের কোন এক কবির কবিতা তর্জমা করিয়াছিলাম। কবিতার নাম ছিল ‘বাড়ি বদলানো’। ঐ যুগে আমি কথাকথিত চলিত ভাষায় লিখিতাম।

………………………………………………………………

বাড়ি বদলানো ॥ পেন্টি সারিকস্কি

বড় পাখির দরকার বড় বাসার
ছোট পাখির ছোটতেই সারে
‘আহা, এমন সুন্দর বাড়ি বদলানোর’ হাওয়ায়
জ্বি, সত্য সত্যই জবাব দিলাম আমি, মুখ টিপে হাসলাম
আব্বা হাত বাড়িয়ে দিলেন, বললেন বিদায়
আম্মা বুকে জড়িয়ে ধরলেন, তারপর আমি চললাম
মালবাহী গাড়ি চলে গেল
যারা বাড়ি বদলানোর কাজ করে তাদের না
ঠকান সহজ দেখেন না
ওরা যেখানে আমার অপেক্ষায় বসে আছে আমি তো থাকি না সেখানে
আমার মালসামানা ওখানেই পড়ে থাকবে
আমার অপেক্ষায়
আর ওদের একটা না একটার বেশি সিগারেট ধরাতে হবে
আমার অপেক্ষায়
কিন্তু আমার টিকিটিও দেখতে পাবে না ওরা
কারণ আমি এত্তটুকুন, এত্তটুকুন একটা পাখির চেয়েও এত্তটুকুন

………………………………………………………………

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিবার সাহস হয় নাই নূরুল হুদার। ‘মেঘমল্লার’ ছবিতে দেখা যায় তিনিও শেষ মুহূর্তে সাহস করিয়া ‘জয় বাংলা’ বলিয়াছেন। মনে হইতে পারে, তাহাতেই তাহার প্রাণ গিয়াছে। ভাবিয়া দেখিলে দেখা যাইবে–তাহা না বলিলেও অধ্যাপক নূরুল হুদার প্রাণরক্ষা হইত কিনা সন্দেহ।

এই যে নূরুল হুদা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদ হইয়া উঠিলেন তাহাতে ব্যক্তির ইচ্ছা বা অনিচ্ছার আয়তন কতটুকু? আখতারুজ্জামান ইলিয়াস গল্পের নাম ‘রেইনকোট’ রাখিয়াছিলেন। জাহিদুর রহিম অঞ্জন ছবির নাম ‘রেইনকোট’ রাখেন নাই। মুহম্মদ খসরু বলিয়াছেন শুদ্ধমাত্র হলিউড আর ঋতুপর্ণ ঘোষ হইতে দূরে থাকিবার মানসে। আমার মনে হয়–আরও কারণ আছে।

এই কারণ আর কিছু নহে, রূপান্তর। নূরুল হুদা তাহার ইচ্ছা অনিচ্ছা ছাড়াইয়া গিয়াছেন–বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নায়ক হইয়া উঠিয়াছেন। অনেক দিন আগে রুশ কবি মিখাইল লের্মন্তব যাহাকে ‘আমাদের কালের নায়ক’ বলিয়াছিলেন তিনি–পেচোরিন–কোন বিশেষ ব্যক্তি নহেন–তিনি একটি কালের সমষ্টির ছবি। তাহাকে খোদ লেখকের জীবনদেবতা কিংবা তাঁহার আলালের ঘরের দুলাল বন্ধুবান্ধব ভাবাও ঠিক হইবে না। খোদ লের্মন্তব এই দাবি তুলিয়াছিলেন। আমার বিশ্বাস জাহিদুর রহিম অঞ্জন আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের আলনায় নিজের জামা ঝুলাইয়া ঘোষণা করিয়াছেন–দেখ, এই দেখ, উচ্চশিক্ষিত বাঙ্গালি মধ্যবিত্ত। নূরুল হুদার মতন আমরা সবাই নায়ক। অনুপস্থিত নায়ক। অপর শতকরা ৯৫ জন বাঙ্গালি মধ্যবিত্ত এই মতন। রামচন্দ্র।
meghmollar-3.jpg


আমার এই ব্যাজ অনুমানের পক্ষে আরও একটি ইশারা পেশ করিয়া এই নাতিদীর্ঘ প্রশস্তি শেষ করিব। গোপন করিব কেন? বলিয়া রাখা ভাল–জাহিদুর রহিম অঞ্জন কমপক্ষে বত্রিশ বছর ধরিয়া আমার বন্ধু। কিন্তু এই ব্যাপারে তাঁহার সহিত কোন চক্রান্ত কি আলাপ করি নাই। আপনারা দয়া করিবেন। আমার মতামতের জন্য তাঁহাকে দায়ী করিবেন না।

অঞ্জন যে চোখে আমাদের এই ছবি দেখাইয়াছেন–আগেই বলিয়াছি–তাহা পরের চোখ। কে জানে পরমের চোখও তাই কিনা! তিনি আমাদের চোখে কোন মায়াঞ্জন বুলাইয়া দেন নাই। তাঁহার ছবিতে মেঘ আছে, বৃষ্টিবাদলা আছে কিন্তু কান্না বিশেষ নাই। মায়া কিম্বা নোনা কোন কান্না নাই। বলিতে পারেন আছে বোবা কান্না। আসমা পরিশেষে শুদ্ধ বলে, ‘আমার যেতে ইচ্ছে করছে না রে! মিন্টু!’ আকাশে হেমন্তকালের শেষে যে মেঘ উড়িতে থাকে তাহাতে কখনও বৃষ্টি হয় না এমন নহে। কিন্তু মেঘ তারপরও মেঘলাই। ফরাশি শার্ল বোদলেয়রের বিখ্যাত ‘পর’ কবিতাটি অনেক বাঙ্গালি মধ্যবিত্তই পড়িয়াছেন। আরেকবার ‘স্মরা’ করিতে দোষ কোথায়?
………………………………………………………………

পর ॥ শার্ল বোদলেয়র

“কাকে তুই সবচেয়ে বেশি চাস, বেগানা বেটা, বল দেখি? তোর বাপ, তোর মা, তোর বোন না তোর ভাই?
— আমার বাবা নাই, মা নাই, বোন নাই, ভাই নাই।
— বন্ধুটন্ধু?
— কি কইলে? শব্দটার কি যে মানে আজও বুঝি নাই।
— তোর দেশ?
— জানি না অবস্থান তার কোন দ্রাঘিমায়!
— সুন্দরম?
— সানন্দে চাই তারে, সে তো দেবি থাকে অমরায়।
— সোনাদানা?
— নিকুচি করি যেমন আপনারা যার যার খোদায়!
— আহ! তো চাস কি তুই বেঘোর বিদেশি?
— আমি চাই মেঘ… ভেসে যায় মেঘ… ঐ যায়… ঐ যায়… কি দারুন মেঘ আর মেঘ…

………………………………………………………………

স্বীকার করিয়া বলিব ছবি পদার্থটা আমি বিশেষ দেখি না। অভিনয় জিনিশটাও ধরিতে পারি না। তবু বলিব শহীদুজ্জামান সেলিম আর অপর্ণার অভিনয় দেখিয়া আমিও বেমালুম অশ্রুহীন হইয়া গিয়াছি। বিশ্বাস করিতে কষ্ট হয় এই ছবি জাহিদুর রহিম অঞ্জনের যাহাকে বলে প্রথম ছবি! এক ছবি বানাইতেই উমর ৫০ হইয়া গিয়াছে। এই ছবি লইয়া অনেক দিন–আরও ৫০ বছর অন্তত–আমাদের কথা বলিতে হইবে। মুহম্মদ খসরু বলিয়াছেন, ‘মেঘমল্লার, বাংলাদেশের ছবির পালাবদল’। আহা, যদি বলিতেন–মেঘমল্লার বাংলা ছবির পালাবদল–তো আরো সত্য কথা বলিতেন।

১০ নবেম্বর ২০১৪

দোহাই 
১. আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, ‘রেইনকোট’, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচনাসমগ্র ১, পুনর্মুদ্রণ (ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স, ২০১২)।
২. মুহম্মদ খসরু, ‘মেঘমল্লার, বাংলাদেশের ছবির পালাবদল’, arts.bdnews24.com, ২১ অক্টোবর ২০১৪।
৩. Charles Baudlelaire, ‘L’étranger’, Oeuvres complètes I, Texte établi, présenté et annoté par Claude Pichois (Paris: Gallimard, 1975).
৪. Gilles Deleuze, Cinema I: The Movement-Image, trans. Hugh Tomlinson and Barbara Habberjam, reprint (Minneapolis: University of Minnesota Press, 1997).
৫. Gilles Deleuze, Cinema 2: The Time-Image, trans. Hugh Tomlinson and Barbara Habberjam, reprint (Minneapolis: University of Minnesota Press, 1997).
৬. Pentti Saarikoski, ‘Moving’, Poems: 1958-1980, trans. Anselm Hollo (West Branch, Iowa: The Toothpaste Press, 1983).

১০ নবেম্বর ২০১৪, বিডিনিউজ২৪.কম