Monthly Archives: July 2018

১৯৭১: কবি জসীম উদ্দীনের সাক্ষ্য

১৯৭১ সালের ছায়া বাংলাদেশের সাহিত্যে কতদূর পর্যন্ত পড়িয়াছে তাহা এখনও পর্যন্ত সঠিক পরিমাপ করা হয় নাই। উদাহরণস্বরূপ কবি জসীমউদ্দীনের কথা পাড়া যায়। এই মহান কবি ১৯৭১ সালেও বাঁচিয়া ছিলেন। সেই বাঁচিয়া থাকার অভিজ্ঞতা সম্বল করিয়া তিনি ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ একটি ক্ষীণকায় কবিতা সংকলনও ছাপাইয়াছিলেন।

স্বীকার করিতে হইবে, এই কবিতা সংকলনের খবর অনেকেই রাখেন না। যাঁহারা রাখেন তাঁহারাও রাখিতে বিব্রত বোধ করেন। জসীমউদ্দীন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়কে দ্বিতীয় দলের দৃষ্টান্তস্বরূপ স্মরণ করা যায়। তিনি ১৯৭২ সালে প্রকাশিত এই ক্ষুদ্র সংকলন প্রসঙ্গে লিখিয়াছেন, “বিশেষ উদ্দেশ্যমূলকতার দায় বহন করতে গিয়ে কবিতার প্রাণশক্তি এখানে যে দারুণভাবে পীড়িত হয়েছে তা না মেনে উপায় নেই।”


১৯৭১ সালের প্রায় তিরিশ বছর আগে–১৯৪০সালে–অধ্যাপক হুমায়ুন কবির দুঃখ করিয়াছিলেন নজরুল ইসলামের মতন জসীমউদ্দীনেরও সৃজনীপ্রতিভা অল্পদিনেই শেষ হইয়া গিয়াছিল। ইহার কারণ কি দেখাইতে গিয়া তিনি বলিয়াছিলেন, নজরুল ইসলামের মতন জসীমউদ্দীনেরও ‘মানস সংগঠনে’ কোন রূপান্তর হয় নাই। নজরুল ইসলামের কবিতায় যে বিপ্লবধর্ম তাহা পুরাতন ঐতিহ্যের পুরুজ্জীবন ঘটাইয়াছে কিন্তু কল্পনা ও আবেগের নতুন নতুন রাজ্য জয়ে অগ্রসর হতে পারে নাই। আর জসীমউদ্দীনের কাব্যসাধনায় সিদ্ধি আসিয়াছিল দেশের ‘গণমানসের অন্তর্নিহিত শক্তি’ হইতে। হুমায়ুন কবিরের মতে, তিনিও কল্পনা আর আবেগের নতুন নতুন রাজ্য জয়ে বিশেষ অগ্রসর হইতে পারেন নাই। দুই বড় কবির কথা মনে করিয়া হুমায়ুন কবির আক্ষেপ করিয়াছিলেন, “আজ আত্মকেন্দ্রিক পুনরাবৃত্তির মধ্যেই তাঁদের সাধনা নিবদ্ধ।”

১৯৪০ সালে যে দশক শুরু হইয়াছিল সেই দশক নাগাদ বাঙালি মুসলমান সমাজের অন্তর্গত কবি ও সাহিত্য সাধকেরা মোটের উপর তিন ভাগে ভাগ হইয়া গিয়াছিলেন। একভাগে ছিলেন সংরক্ষণশীলরা। ইহাদের সম্পর্কে হুমায়ুন কবির জানাইয়াছিলেন, “তার ঝোঁক অতীতের দিকে, তার ধর্ম প্রচলিত ব্যবস্থার সংরক্ষণ। ইসলামের অন্তর্নিহিত সামাজিক সাম্যকেও তা ব্যাহত করে।” ইহার ফলে বাংলার মুসলমান সমাজ যেমন ‘অনিশ্চিত মতি’ তেমনি ‘গতিহীন’ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল।

দ্বিতীয় ভাগে ছিলেন প্রতিক্রিয়াশীলরা। ইঁহারা স্রোতের বিরুদ্ধে পুরাতন বন্দরে ফিরিয়া যাইতে চাহিতেন। অসম্ভবের পায়ে আত্মনিবেদন বৃথা জানিয়াও ইঁহারা সমাজ মানসের সমস্ত উদ্যম সেই অসম্ভবের পায়ে উৎসর্গ করিয়াছিলেন।

সবশেষে ছিলেন আরেক দল ইঁহারা সংখ্যায় ও শক্তিতে দুর্বলতম। ইঁহারা ভবিষ্যতের সাধক। এই দলের কথা মনে রাখিয়াই হুমায়ুন কবির লিখিয়াছিলেন, “ভবিষ্যতের অভিযানে আশঙ্কা থাকতে পারে, কিন্তু সম্ভাবনা আরো বেশি, অথচ আজো বাঙালি মুসলমানের যৌবন সে দুঃসাহসিকতায় বিমুখ।”
jasimuddin.gif
হুমায়ুন কবির এই তৃতীয় ভাগের উপরই ঈমান আনিয়াছিলেন। তিনি লিখিয়াছিলেন, “সমস্ত পৃথিবীতে বর্তমানে যে আলোড়ন, তারও নির্দেশ ভবিষ্যতের দিকে। সেই প্রবাহ যদি বাঙালি মুসলমানকে নূতন সমাজসাধনার দিকে ঠেলে নিয়ে যায়, তবে মুসলমান সমাজসত্তার অন্তর্নিহিত ঐক্য ও উদ্যম দূর্বার হয়ে উঠবে, বাঙলার কাব্যসাধনায়ও নতুন দিগন্ত দেখা দিবে।” হুমায়ুন কবিরের এই আশা ও আশীর্বাদ সত্য হইয়াছিল ১৯৭১ সাল নাগাদ। বাংলার কাব্যসাধনায় নতুন দিগন্ত দেখা দিয়াছিল শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ প্রভৃতি কবির জন্মের পর।

জসীমউদ্দীনের কবিতা এই তিনভাগের মাপে বিচার করিলে দেখা যায় একই সাথে দুই ভাগ জুড়িয়া বিরাজ করিতেছিল। তাঁহার কবিতাকে আকারের দিক হইতে দেখিলে সংরক্ষণশীল ভাগে দেখা যায়। অথচ বাসনার বিচারে তাঁহাকে তৃতীয় ভাগে ফেলা যায়। এই স্ববিরোধ আমলে লইয়াই হুমায়ুন কবির ১৯৪০ সালে লিখিয়াছিলেন, “সাম্প্রতিক বাঙালি মুসলমান কবিদের মধ্যে প্রায় সকলেই পশ্চাদমুখী এবং নতুনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও প্রাচীনপন্থী। সাহিত্যের আঙ্গিক নিয়ে নতুন পরীক্ষা করবার উদ্যম তাদের নাই, সমাজ ব্যবস্থার রূপান্তরে নতুন নতুন পরিস্থিতির উদ্ভাবনায়ও তাঁদের কল্পনা বিমুখ।”

ইতিকথার পরেও একটা কথা থাকে। কথায় বলে, মরা হাতির দাম লাখ টাকা। বাংলাদেশের পুরাতন আঙ্গিকের চৌহদ্দির মধ্যেও জসীমউদ্দীনের প্রাণশক্তি পুরাপুরি নিঃশেষিত হইয়া যায় নাই। তাহার প্রমাণ ১৯৭১ সালের অভিজ্ঞতা লইয়া লেখা এই ক্ষীণকায়–সুনীলবাবুর ভাষায়‘জসীম উদ্ দীনের ক্ষুদ্রতম’–কাব্যগ্রন্থেও মিলিতেছে।

এই গ্রন্থে ‘বঙ্গ-বন্ধু’ নামে একটি কবিতা আছে। তাহার নিচে তারিখ দেওয়া আছে ১৬ মার্চ ১৯৭১। এই কবিতার উপর মন্তব্য করিতে বসিয়া সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায় লিখিয়াছেন, “এক আশ্চর্য ব্যক্তিত্ব এই বঙ্গবন্ধু, যাঁর হুকুমে অচল হয়ে গিয়েছিল শাসকের সকল নিষ্পেষণ যন্ত্র, বাঙালী নরনারী হাসিমুখে বুকে বুলেট পেতে নিয়েছিল শোষক সেনাবাহিনীর।” কথাটি মিথ্যা নহে। জসীমউদ্দীনের শ্লোকে:

তোমার হুকুমে তুচ্ছ করিয়া শাসন ত্রাসন ভয়,
আমরা বাঙালী মৃত্যুর পথে চলেছি আনিতে জয়।

জসীমউদ্দীন বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমানের আরও একটি জয়ের কথা বলিয়াছেন যাহা বিশারদ অধ্যাপকদের দৃষ্টি এড়াইয়া গিয়াছে। যাহা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন করিতে চাইয়াছিলেন কিন্তু পারেন নাই বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমান তাহা পারিয়াছেন। হিন্দু ও মুসলমানকে তিনি প্রেম-বন্ধনে মিলাইয়াছেন। যাহা মহাত্মা মোহনদাস গান্ধী জীবন দান করিয়াও পারেন নাই, তিনি তাহা সম্ভব করিয়াছেন। জসীমউদ্দীন লিখিয়াছেন:

এই বাঙলায় শুনেছি আমরা সকল করিয়া ত্যাগ,
সন্ন্যাসী বেশে দেশবন্ধুর শান্ত মধুর ডাক।
শুনেছি আমরা গান্ধীর বাণী জীবন করিয়া দান,
মিলাতে পারেনি প্রেম-বন্ধনে হিন্দু-মুসলমান
তারা যা পারেনি তুমি তা করেছ, ধর্মে ধর্মে আর,
জাতিতে জাতিতে ভুলিয়াছে ভেদ সন্তান বাঙলার।

১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ তারিখ দিয়া লিখিত একটি কবিতার নাম ‘কবির নিবেদন’। তাহার কয়েক পঙক্তি:

প্লাবনের চেয়ে–মারীভয় চেয়ে শতগুণ ভয়াবহ
নরঘাতীদের লেলিয়ে দিতেছে ইয়াহিয়া অহরহ
প্রতিদিন এরাঁ নরহত্যার যে কাহিনী এঁকে যায়
তৈমুর লং নাদির যা দেখে শিহরিত লজ্জায়।

পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পোড়ামাটি নীতির একটি প্রতীক ধামরাই রথে আগুন। জসীমউদ্দীন পাকিস্তানের রক্ষাকারী সেনাবাহিনীর কীর্তিস্তম্ভস্বরূপ এই ধামরাই রথ ভস্মীভূত করিবার কাহিনী লিখিয়া রাখিয়াছেন। এই কবিতা হইতে অংশবিশেষ বাছিয়া লওয়া সহজ কর্ম নহে।

বছরে দুবার বসিত হেথায় রথ-যাত্রার মেলা
কত যে দোকান পসারী আসিত কত সার্কাস খেলা।
কোথাও গাজীর গানের আসরে খোলের মধুর সুরে
কত যে বাদশা বাদশাজাদীরা হেথায় যাইত ঘুরে।
শ্রোতাদের মনে জাগায়ে তুলিত কত মহিমার কথা,
কত আদর্শ নীতির ন্যায়ের গাথিয়া সুরের লতা।

পুতুলের মত ছেলেরা মেয়েরা পুতুল লইয়া হাতে,
খুশীর কুসুম ছড়ায়ে চলিত বাপ ভাইদের সাথে।
কোন যাদুকর গড়েছিল রথ তুচ্ছ কি কাঠ নিয়া,
কি মায়া তাহাতে মেখে দিয়েছিল নিজ হৃদি নিঙাড়িয়া।

তাহারি মাথায় বছর বছর কোটি কোটি লোক আসি
রথের সামনে দোলায়ে যাইত প্রীতির প্রদীপ হাসি।
পাকিস্তানের রক্ষাকারীরা পরিয়া নীতির বেশ,
এই রথখানি আগুনে পোড়ায়ে করিল ভস্ম শেষ।
শিল্পী হাতের মহা সান্তুনা যুগের যুগের তরে
একটি নিমেষে শেষ করে গেল এসে কোন বর্বরে।

এই কবিতার নিচে তারিখ লেখা আছে ১৬ মে ১৯৭১।

১৯৭১ সালে জসীমউদ্দীনের বয়স প্রায় সত্তর বছর ছুঁই ছুঁই করিতেছে। তাঁহার সৃষ্টিক্ষমতাও ততদিনে নিঃসন্দেহে কমিয়া আসিতেছে। তবু ধন্য আশা কুহকিনী। দেশ স্বাধীন হইয়াছে। কবি গাহিতেছেন:

ঝড়ে যে ঘর ভাঙিয়া গিয়াছে আবার গড়িয়া নিব
ঝড়ের আধারে যে দীপ নিভেছে আবার জ্বালায়ে দিব।

এই ধরনের সরল পঙক্তি পড়িবার বহু আগেই হুমায়ুন কবির লিখিয়াছিলেন, “আজ আত্মকেন্দ্রিক পুনরাবৃত্তির মধ্যেই তাঁদের সাধনা নিবদ্ধ।” কাব্যসাধনার প্রকরণে ইহা সত্য হইলেও কাব্যের ‘নিরাকারে’ কোথায় যেন একটা দুর্মর নাদ আছে যাহা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ১৯৭০ সালের ১৪ আগস্ট ছিল পাকিস্তানের শেষ স্বাধীনতা দিবস। সেদিন জসীমউদ্দীন লিখিয়াছিলেন সেই অপ্রকাশের বেদনা।

আজি আজাদীর এ পুত দিবসে বার বার মনে হয়
এই সুন্দর শ্যাম মনোহরা এ দেশ আমার নয়।

এই বেদনা নিঃসন্দেহে পুনরাবৃত্তির অযোগ্য।

স্বাধীনতা সংগ্রামের মাহেন্দ্রক্ষণে সংগঠিত সংগ্রামী সংগঠন বাংলাদেশ লেখক শিবির ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘হে স্বদেশ’ নামে তিনটি সংকলন প্রকাশ করিয়াছিলেন। তাহাদের কবিতা সংকলনে জসীমউদ্দীনের একটি কবিতা দেখা যায়। নাম ‘একুশের গান’। কবিতাটি যখন লেখা হইয়াছিল উল্লেখ নাই। কবিতার অন্তর্গত সাক্ষ্য হইতে অনুমান করি ইহার রচনাকাল ১৯৫২ সালের কাছাকাছি কোন এক সময় হইবে। কারণ তখন পূর্ববঙ্গ প্রদেশের জনসংখ্যা চার কোটি বলিয়াই প্রসিদ্ধ ছিল।

আমি কবিতাটির দোহাই দিয়া শেষ করিতেছি। ইহার যে রূপকল্প তাহাতেও জসীমউদ্দীনের শক্তি তাজা বোমার মত বিস্ফোরিত হইয়াছে। ‘একুশের গান’ কবিতাটিতে মোট বাইশটি পঙক্তি দেখা যায়। টুকরা টুকরা উদ্ধার না করিয়া আমি গোটা কবিতাটি ছাপাইয়া দিতেছি।

আমার এমন মধুর বাঙলা ভাষা
ভায়ের বোনের আদর মাখা
মায়ের বুকের ভালোবাসা।

এই ভাষার রামধনু চড়ে
সোনার স্বপন ছড়ায় ভবে
যুগযুগান্ত পথটি ধরে
নিত্য তাদের যাওয়া আসা।

পূব বাংলার নদীর থেকে
এনেছি এর সুর
শস্যদোলা বাতাস দেছে
কথা সুমধুর।

বজ্র এরে গেছে আলো
ঝাঞ্ঝা এরে দোলদোলালো
পদ্মা হলো সর্বনাশা।

বসনে এর রঙ মেখেছি
তাজা বুকের খুনে
বুলেটেরি ধূম্রজালে
ওড়না বিহার বুনে।

এ ভাষারি মান রাখিতে
হয় যদি বা জীবন দিতে
চার কোটি ভাই রক্ত দিয়ে
পূরাবে এর মনের আশা।

অধিক মন্তব্য করিব না। শুধু লক্ষ্য করিব ‘দেছে’ শব্দের ব্যবহার। আরো শব্দের মধ্যে আছে ‘এরে’। সবচেয়ে দুর্ধর্ষ রুপকল্প ‘ওড়না বিহার’– ‘বুলেটের ধূম্রজালে ওড়না বিহার বুনে’। ইহাকে অসাধারণ বলিলে কমই বলা হয়। এই রকম আরেকটি শ্লোক পাইয়াছিলাম “ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে” কবিতা সংকলনের ‘জাগায়ে তুলিব আশা’ কবিতায়। জসীমউদ্দীন লিখিয়াছিলেন:

শোন ক্ষুধাতুর ভাইরা বোনেরা, উড়োজাহাজের সেতু
রচিত হইয়া আসিছে আহার আজি(কে) মোদের হেতু।

স্বীকার করিব রূপকল্প পরিচয়ে ‘উড়োজাহাজের সেতু’ ‘ওড়না বিহার’ বা উড়ন্ত ধর্মাশ্রমকে ছাড়াইয়া যায় নাই।

 

 

 

দোহাই

১। জসীমউদদীন, ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে (ঢাকা : নওরোজ কিতাবিস্তান, ১৯৭২)।
২। হুমায়ুন কবির, বাঙলার কাব্য, পুনর্মুদ্রণ (ঢাকা: বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ২০১২)।
৩। সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়, জসীমউদ্দীন , ৩য় সংস্করণ (ঢাকা: নওরোজ সাহিত্য সম্ভার, ১৯৮৮)।
৪। বাংলাদেশ লেখক শিবির সম্পাদিত , হে স্বদেশ : কবিতা (ঢাকা : বাঙলা একাডেমী, ১৯৭২)।

 

১৬ ডিসেম্বর ২০১৩, bdnews24.com, মতামত বিশ্লেষণ

রাষ্ট্রের হৃদরোগ

বর্তমান নিবন্ধটি মূলত ভূমিকা — লেখা হইয়াছে বিধান রিবেরু রচিত ও প্রকাশিতব্য ‘শাহবাগ: রাজনীতি ধর্ম চেতনা’ কিতাবের জন্য। ঐ ভূমিকাটি অত্র ‘রাষ্ট্রের হৃদরোগ’ শিরোনামে প্রকাশিত হইতেছে

গত দশ বছরে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে যে সকল তরুণ চিন্তাবিদের সহিত আমার পরিচয় ঘটিয়াছে তাঁহাদের মধ্যে বিধান রিবেরু সম্ভবত সবচেয়ে উজ্জ্বল। গায়ের রঙ্গের কথা বলিতেছি না। বলিতেছি তাঁহার চিন্তাশক্তির কথা। আপনার হাতে ধরা এই প্রবন্ধ সংকলনেও তাহার সামান্য প্রমাণ পাওয়া যাইবে বলিয়া আমার বিশ্বাস।

বর্তমানে যে প্রজাতন্ত্রে আমরা বসবাস করিতেছি তাহার প্রতিষ্ঠা হইয়াছিল ১৯৭১ সালে। প্রজাতন্ত্রের বয়স সেই হিশাবে আজ বিয়াল্লিশ বছর অতিক্রম করিতেছে। ক্ষুদ্র মানবশিশুর সহিত রাষ্ট্রের তুলনা করা কোনক্রমেই সঙ্গত নহে। হইলে এই রাষ্ট্রকেও এতদিনে প্রাপ্তবয়স্ক বলা যাইত। দুর্ভাগ্যের মধ্যে আমাদের এই রাষ্ট্র এখনো তাহার প্রাণের অর্থাৎ হৃদপিণ্ডের সংকট কাটাইয়া উঠিতে পারে নাই।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ যে সামাজিক ন্যায়বিচারের জাতীয় দাবিতে পরিচালিত হইয়াছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্যে তাহার একাংশ পূর্ণ হইয়াছে — এই সত্যে সন্দেহ নাই। কিন্তু দাবির আরেক অংশ অপূর্ণই থাকিয়া গিয়াছে। এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ফলে শ্রমিকশ্রেণির তথা সর্বজন সাধারণের মুক্তি ঘটে নাই। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ভোট দিতে পারেন। কিন্তু প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতিভা এমনই যে তাহাতে জনগণকে দেশশাসনের কঠোর কর্তব্য হইতে দূরে রাখাই নিয়ম হইয়া দাঁড়ায়। সর্বজনের মুক্তির শর্ত তাহার পরও এই প্রজাতন্ত্র — এ কথা ভুলিয়া যাওয়া ঠিক হইবে না। তবে ফ্যাসিতন্ত্রের নব্য প্রবর্তকরাই এই জাতীয় মনভোলানো প্রচারণা চালাইয়া থাকেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যাঁহারা গণহত্যা চালাইয়াছিলেন তাঁহারা ছাড়া পাইয়া গিয়াছেন। তাঁহাদের বিচার হয় নাই। আর যাঁহারা ঐ গণহত্যার সহযোগী ছিলেন তাঁহাদের কেহ কেহ মাত্র সুদীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে বিচারের মুখোমুখি হইয়াছেন। এই বিচার না হওয়া (বিচারে বিলম্ব ঘটার মানেও প্রবাদ বাক্য অনুসারে বিচার না হওয়া বটে) মানে বিপ্লব বেহাত হওয়া।

তাহার পরও বলিতে হইবে বিপ্লব মানে ঘটনা বিশেষ নহে। বিপ্লব মানে যাহা ভাসিতে থাকে। প্লব হইতে প্লাবন তাই বিপ্লব চলিতেই থাকে। সেই বিচারে বিচার করিতে হইলে বলিতে হইবে ১৯৭১ সালে যে বিপ্লব শুরু হইয়াছিল তাহারও পর আছে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসিত ও ব্রিটিশ প্রভাবিত ভারত ভাগ হইয়াছিল ধর্মভিত্তিক স¤প্রদায় পরিচয়কে বড় করিয়া। আর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ গঠন করা হইয়াছে সেই পরিচয়কে নাকচ করিয়া। ভারতবর্ষের জাতি সমস্যা বলিতে যাহা একদা বুঝাইত — ১৯৪৭ সাল যাহার সত্য সমাধান বাতলাইতে পারে নাই — ১৯৭১ সাল তাহার সত্যকার সমাধান কিভাবে হইতে পারে তাহা একপ্রকার দেখাইয়া দিয়াছে। বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের পথ সারা দক্ষিণ এশিয়া মহাদেশের ভবিষ্যৎ পথের রূপরেখা মাত্র।

এ সত্যে যাঁহাদের সন্দেহ তাঁহারা ১৯৭১ সালের মর্মকথা ধরিতে পারেন নাই। বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্র গঠনের এই তাৎপর্য আন্তর্জাতিক। দক্ষিণ এশিয়ার সকল নিপীড়িত জাতির মুক্তির রাজনৈতিক পথ দেখাইতে পারে বাংলাদেশ। আজ অনেকেই এই সত্য ভুলিতে বসিয়াছেন।

3.1বাংলাদেশে জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হইয়াছিল বিভিন্ন ধর্ম-স¤প্রদায়ের অন্তর্গত ঐক্য ও মিলিত সংগ্রামের মধ্যে। তাই যাঁহারা এই নতুন রাষ্ট্রের জন্ম ঠেকাইতে পারেন নাই তাঁহারা এখনো চেষ্টা করিতেছেন কি করিয়া ইহার সা¤প্রদায়িক ঐক্য বিনষ্ট করা যায়। এই চেষ্টা দুই দিক হইতেই হইতেছে। একদিকে আছেন তাঁহারা যাঁহারা এই দেশকে অভাগা পাকিস্তানের আদর্শে মুসলমান রাষ্ট্র বানাইতে চাহিতেছেন। আরদিকে আছেন ভারতে নতুন করিয়া প্রবল হওয়া হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকারীর দল। তাই বলিতেছিলাম বাংলাদেশের রাজনীতি এখনো এই মহাদেশের রাজনৈতিক হৃদরোগ হইতে মুক্ত হয় নাই। এই হৃদরোগ কথাটি আমি আন্তনিয়ো গ্রামসির লেখা হইতে ধার করিয়াছি। ইংরেজি অনুবাদে এই রোগের নাম ‘অর্গানিক ক্রাইসিস’। এই রোগে প্রাণ কিন্তু বিপন্ন হইতে পারে।

সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সূত্রপাত ব্রিটিশ জাতির শাসনকালে। এখনো তাহারই জের এই দেশে চলিতেছে। এই হৃদরোগ হইতে মুক্তি পাইতে হইলে আমাদের হৃদয়বান চিন্তাবিদ দরকার। শুদ্ধ একজন নহে। সর্বজনের মধ্যে এই চিন্তাবিদরা যতদিন দেখা না দিবেন ততদিন আমাদের হৃদরোগ নিরাময় হইবে না। রাষ্ট্রকে যদি কোন জীবদেহের সহিত তুলনা করা যাইত তবে আমি যাহাকে হৃদরোগ বলিতেছি তাহার অর্থ অনুধাবন সহজ হইত।

আমার বন্ধু বিধান রিবেরু আমাদের দেশ ও জাতির এই দীর্ঘস্থায়ী হৃদরোগের একটা বিশেষ আলামত বিশ্লেষণের সামান্য চেষ্টা করিয়াছেন। এই সংকলনে তাহার কিছু প্রমাণ আপনি পাইবেন। আমিও পাইয়াছি।

বিধান রিবেরু দেখাইয়াছেন ১৯৭১ সালে যাঁহারা যুদ্ধাপরাধ করিয়াছিলেন তাঁহাদের কেহ কেহ বিচারের সম্মুখীন হওয়ার পর দেশে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া হইয়াছে। যাঁহারা যুদ্ধাপরাধীদের যথার্থ বিচার চাহিয়াছেন তাঁহারা প্রথম দল। গত ৪২ বছর ধরিয়াই এই দাবি জাগরুক। এই দাবির সর্বশেষ চিহ্ন শাহবাগে সংগঠিত প্রতিবাদ। এই প্রতিবাদ স্বাভাবিক নিয়মেই ১৯৭১ সালের স্মৃতিতে স্মার্ত হইয়াছে।

আর এই বিচারকে ব্যাহত করিবার জন্য যাঁহারা ছলে বলে কৌশলে লড়াই করিতেছেন তাঁহারা দ্বিতীয় দল। এই দলের শেষ হাতিয়ার হইয়া দাঁড়াইয়াছে ধর্ম-সা¤প্রদায়িক প্রচারণা। ইঁহারা এসলাম রক্ষার আওয়াজ তুলিতেছেন। কিন্তু এই আওয়াজের আশু লক্ষ্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ব্যাহত করা বৈ নহে। বিধান রিবেরু বর্তমান সংকলনভুক্ত তাঁহার সকল লেখায় এই সত্যটি প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন।

আশা করি তিনি ভবিষ্যতে এই ধর্ম-সা¤প্রদায়িক রাজনীতির দূরবর্তী লক্ষ্য বিষয়েও মুখ খুলিবেন। শাহবাগে সমবেত প্রতিবাদ সমাবেশ হইতে বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের হৃদরোগ কোন জায়গায় তাহার আলামত স্পষ্ট — নতুন করিয়া স্পষ্ট — হইয়াছে। যুদ্ধাপরাধীরা আত্মরক্ষার হাতিয়ার হিশাবে পাল্টা হামলার কৌশল বাছাই করিয়াছেন। তাঁহারা প্রতিবাদকারী ও বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষকে ‘নাস্তিক’ বলিয়া আক্রমণ করিতেছেন। এই কৌশল নতুন নহে। বেগম জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে অন্যূন ২০ বছর আগে যে প্রতিবাদ আন্দোলন সংগঠিত হইয়াছিল তখনো এই কৌশল দেখা গিয়াছিল।

এইবারের নতুন দিক অনেক। তাহার শুদ্ধ একটির উপর বিধান এখানে মনোনিবেশ করিয়াছেন। কোন দিক এইটি? যুদ্ধাপরাধী মহলের সমর্থনে এইবার মুখোশ খুলিয়া আগাইয়া আসিয়াছেন সুপ্রসিদ্ধ কবি ও যশপ্রার্থী দার্শনিক ফরহাদ মজহার। বিধান একাধিক লেখায় এই নব্য ফ্যাসিবাদী প্রচারকের মুখোশ খুলিয়া দিয়াছেন।

সত্যের খাতিরে স্বীকার করিতে হইবে — বর্তমানে ফরহাদ মজহারের সমকক্ষ প্রচারক যুদ্ধাপরাধী মহলে দ্বিতীয়টি নাই। তিনি মহাত্মা আহমদ ছফার লেখা কিভাবে বিকৃত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করিতে পারেন তাহার একটি নমুনা এই সংকলনের ‘ঘুরিয়া দাঁড়াইব কোথায়’ প্রবন্ধে বিধান দেখাইয়াছেন। এই প্রবন্ধ লিখিয়া তিনি আমাদের ঋণী করিয়া রাখিলেন।

যাঁহারা কাম ক্রোধ লোভ মোহ মদ ও মাৎসর্য হইতে মুক্ত হইয়া এই সংকলনের রচনা পড়িবেন তাঁহারা দেখিবেন বিধান রিবেরু কিভাবে পদে পদে আমাদের নতুন যুগের সংগ্রামে নেতৃত্ব

দিবার যোগ্য হইয়া উঠিতেছেন। আমিও তাঁহার সংগ্রামে যোগ দিতে চাহি।

বিধানের বহিটা আমি যতদূর পারি আদ্যোপান্ত পড়িয়াছি। শুদ্ধ একটা জায়গায় আমার মনে হইল তিনি আরো একটু ভাবিলে ভাল করিতেন। ‘মদিনার সনদ’ প্রসঙ্গে তিনি লেবাননী বংশোদ্ভূত ইতিহাসবিদ ফিলিপ হিট্টির কথা উদ্ধৃত করিয়াছেন। হিট্টি বলিয়াছিলেন এই ‘মদিনার সনদ’ জিনিশটা এসলামি সাম্রাজ্যের ভিত্তিস্বরূপ হইয়াছিল। ইহা লইয়া তর্ক চলিতে পারে। মনে রাখিতে হইবে আড়াই হাজার বছর আগের রোম প্রজাতন্ত্র কয়েকশত বৎসর পর রোমান সাম্রাজ্যে পরিণত হইয়াছিল। তাই বলিয়া নিকোলো মেকিয়াবেলি ‘প্রজাতন্ত্র’ জিনিশটাকে খাট করিয়া দেখেন নাই। আমরাও বলিব প্রজাতন্ত্র বা জনসাধারণের কতৃত্বই গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাভূমি।

‘মদিনার সনদ’ একটা রূপকথা। কিন্তু ইহার মর্মকথা কি? সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। একাধিক ধর্মবিশ্বাসের মানুষ এক রাষ্ট্রে বসবাস করিতে পারেন কিনা তাহার নমুনা বলিয়া ইহাকে গ্রহণ করা যায়। বিধান প্রশ্ন তুলিয়াছেন এই রূপকথার তুলনীয় অন্য রূপকথা বিলাতের সনদ — ওরফে ‘ম্যাগনা কার্টা’ বা মহাসনদ — প্রসঙ্গ তোলা উচিত কিনা। মনে রাখিতে হইবে রূপকথা ভাষার মতন। তাহার বাসস্থান অজ্ঞানলোকে। ইহা পছন্দ বা অপছন্দের কথা নহে। গান্ধিজি রামরাজ্যের কথা তুলিয়াছিলেন। কিন্তু বর্তমান যুগের ভারত রামরাজ্য হইয়াছে কি?

বিধানের পরামর্শ আমরা গ্রহণ করি কি না করি তাহা বড় কথা নহে। তাঁহার প্রশ্নটা গুরুর প্রশ্ন, গুরুতর প্রশ্ন। আমরা এই প্রশ্ন কাঁথাচাপা দিতে পারিব না। ইহা জাগিয়া উঠিবেই।

তাঁহার প্রশ্ন আমার কাছে আরো এক কারণে তৎপর হইয়া উঠিয়াছে। বিধান বাংলাদেশের ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্ম স¤প্রদায়ের মধ্যে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। এই ঘটনাটিকে ছোট করিয়া ভাবিবার কোন উপায় নাই। বাংলাদেশের জাতীয় সমাজে তাঁহার প্রতিভা যতই উজ্জ্বল হইবে এই দেশের জন্ম ততই সফল বলিয়া অভিনন্দিত হইবে। তিনি এই বই বাংলায় লিখিয়াছেন। একদিন এই বইও ‘ঢাকার সনদ’ বলিয়া বিখ্যাত হইবে কিনা কে জানে!

এই সামান্য ভূমিকা লিখিবার সম্মান আমাকে দান করিয়া বিধান রিবেরু আপনকার হৃদয়ের ঔদার্যেরই প্রমাণ দিয়াছেন। আমি ক্যাথলিক বলিতে ‘ঔদার্যের অধিকারী’ বলিয়াই ভাবিয়া থাকি। এই বই পড়িতে হইলেও সেই ঔদার্য আমাদের পক্ষে অপরিহার্য।

গ্রন্থ পরিচিতি: বিধান রিবেরু, শাহবাগ: রাজনীতি ধর্ম চেতনা (ঢাকা: প্রকৃতি প্রকাশনী, প্রকাশিতব্য)

২৭ নবেম্বর ২০১৩, সর্বজন: নবপর্যায় ২৯

বৌদ্ধ মন্দিরে হামলার এক বছর: বিচার করতে হবে

রামুসহ কক্সবাজারের বিভিন্ন বৌদ্ধ উপাসনালয় ও বসতিতে সাম্প্রদায়িক হামলার এক বছর পূর্তি হইল ২৯ সেপ্টেম্বর। বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটিকে স্মরণ করিবার আয়োজন করে রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদ। স্মরণসভা পর্বে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখিয়াছিলেন সলিমুল্লাহ খান। অত্র তাহার বক্তব্যখানি সামান্য পরিমার্জনা করিয়া ছাপানো হইল

রামুতে সাম্প্রদায়িক হামলার বর্ষপূর্তি স্মরণে আয়োজিত অষ্টপরিষ্কার দান অনুষ্ঠানে ভক্তবৃন্দ ছবি: সর্বজন

রামুতে সাম্প্রদায়িক হামলার বর্ষপূর্তি স্মরণে আয়োজিত অষ্টপরিষ্কার দান অনুষ্ঠানে ভক্তবৃন্দ
ছবি: সর্বজন

আজকের স্মরণসভার সভাপতি, মঞ্চে উপবিষ্ট অতিথি এবং রামুর সর্বস্তরের বৌদ্ধ হিন্দু মুসলিম জনসাধারণ, আপনাদের শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করছি।

২৯ সেপ্টেম্বর যে ঘটনা ঘটেছিল সেখানে কারা আক্রমণ করেছিল আপনারা অনেকেই জানেন। আপনারা অনেকেই সাক্ষী আছেন। সরকারি তদন্ত কমিটি তাদের নাম খুঁজে পায় না। আপনারা জানেন যারা কোন কাজ — ভাঙ্গার কাজ — হাতে নেয়, আমাদের বাংলা ভাষায় তাদের বলে ক্রীড়নক। তারা খেলার হাতিয়ার। তাদের পিছনে পরিকল্পনাকারী থাকে। পরিকল্পনাকারীদের  পিছনে আরো বড় পরিকল্পনাকারী থাকে। আপনারা

দেখুন গত এক বছরে এদেশে কত ঘটনা ঘটেছে। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১২ সনে যখন রামুর বৌদ্ধমন্দিরে হামলা হয়, পরে উখিয়া টেকনাফে হামলা হয়, তখন আমরা মনে করেছিলাম এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এই ঘটনাগুলো যে বিছিন্ন নয় তা দেখাতে আমি বেশি দূরে যাব না। আমাদের এই দক্ষিণ এশিয়ায়, যাকে আমরা উপমহাদেশ বলি সেখানে, এই ধরনের ঘটনা প্রচুর হচ্ছে। আপনারা দেখেন ভারতে হচ্ছে কোথাও কোথাও , শ্রীলঙ্কায় হচ্ছে, বার্মাতেও কোথাও কোথাও হচ্ছে, পাকিস্তানে হচ্ছে, আফগানিস্তানে হয়েছে। আমি আর বেশি দূরে যাচ্ছি না।

মাঝে মাঝে আমাদের মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে এর পিছনের কারণটা কি। আমরা সকলেই মনে করি যে আমাদের দেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। তাহলে অসম্প্রীতি তৈরি করে কারা? সোজা কথায়, অসম্প্রীতি তৈরি করলে যাদের লাভ তারাই করে।

আমরা ১৯৭১ থেকে শুরু করি সবকিছুই। ৪২ বছর আগের ঘটনা। কিন্তু তার আগেও তো ইতিহাস ছিল। আমি পুরানা ইতিহাসে যাব না। ধরুন, ২০০ বছরের মত এদেশ ব্রিটিশের শাসনে ছিল। তখন বলা হয়েছিল এদেশে তো হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান এবং নানা ধর্মের মানুষ আছে। আবার বাঙ্গালি পাঞ্জাবি সিন্ধি গুজরাটি বিহারি নানা জাতির মানুষ আছে। আপনারা জানেন নানা অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য থাকে। পাকিস্তান আমলে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের বৈষম্য ছিল। তার পরিণতিতে আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি।

ব্রিটিশ আমলেও তেমন বৈষম্য ছিল। তখন মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছিল, ব্রিটিশরা যদি চলে যায়, এদেশ শাসন করবে কারা? তখন বড় বড় মনীষীরা বলেছিলেন এ সমস্যা সমাধানের সহজ কোন পথ নাই। সমাধান কি? এদেশের সব লোককে হয় হিন্দু হয়ে যেতে হবে না হয় সব লোককে মুসলমান হয়ে যেতে হবে। নাহলে এই সমস্যার কোন সমাধান নাই। এই কথা এমন সব বড় বড় লোক বলেছিলেন যাদের নাম আনলেও বিশ্বাস হবে না। আমি নাম নিচ্ছি না। কিন্তু আমরা জানি এটা কোন সমাধান নয়। এটা একটা অবাস্তব সমাধান। আমাদেরকে যার যার ধর্মে থাকতে হবে এবং আমাদেরকে একই দেশে বসবাস করতে হবে। তাহলে সমস্যার সমাধান কোথায়? আমরা তখন, ১৯৭১ সালে, বলেছিলাম ন্যায়, সাম্য, মানবিক মর্যাদা। এই দাবিতেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল।

কিন্তু আমি দেখি দেশে এখন কিছু কিছু বুদ্ধিজীবী বের হয়েছেন যারা বলেন ধর্মনিরপেক্ষতা কোথা থেকে আসল আমরা টের পাচ্ছি না। আমি তাদেরকে সবিনয়ে প্রশ্ন করতে চাই, যদি বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সমানাধিকার, ন্যায়, সাম্য প্রতিষ্ঠিত না হয় তাহলে মানবিক মর্যাদা থাকবে কোথায়? আর যদি বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সমান আচরণ করার দায়িত্ব রাষ্ট্র না নেয় — যাকে আমরা ধর্মনিরপেক্ষতা বলি — তাহলে মানবিক মর্যাদা, সাম্য এবং ন্যায় কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে? যারা বলছেন বাংলাদেশে সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং ন্যায় থাকবে কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা থাকবে না তারা আন্তরিক কথা বলছেন না। আমার ধারণা, এই কথা যারা বলছেন তারাই এই আক্রমণটা করেছেন। তার একটা দীর্ঘমেয়াদী কারণও আছে।

এদেশে চিরকাল শাসন করতে পারবে না এটা ব্রিটিশ বুঝতে পেরেছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর তারা নিজেরাই বলেছিলেন আমরা চলে যাব। তারা বাংলাদেশ থেকে চলে গেছেন। শ্রীলঙ্কা থেকে চলে গেছেন। তারা বার্মা থেকে চলে গেছেন। তারা পৃথিবীর প্রায় সব দেশ থেকে চলে গেছেন। ওটা চলে যাবার সময়। আমরা ওটার নাম দিয়েছি পরাধীনতার শেষকাল।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন সলিমুল্লাহ খান ছবি: সংগৃহীত

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন সলিমুল্লাহ খান
ছবি: সংগৃহীত

তাহলে স্বাধীনতার কালে আমরা কিভাবে দেশ চালাব? পাকিস্তান আমলের ২৩-২৪ বছরে আমরা বিশ্বাস করেছিলাম, ভারতবর্ষে যে আঞ্চলিক বৈষম্য হয়েছিল সেটার অবসান হবে। তখন মানুষকে প্রবঞ্চিত করে বলা হয়েছিল তোমার মধ্যে বহু পরিচয় আছে। তুমি পূর্বাঞ্চলের লোক, একই সাথে তুমি ভারতের, সেটাও তোমার পরিচয়। ঘটনাচক্রে যারা নির্যাতিত তাদের কোন না কোন ধর্মপরিচয় থাকে। তখন তাদের ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে একটা কলা — তোমরা মুসলমান। সেই জন্য পাকিস্তান হয়েছে। কিন্তু সেই মানুষেরাই কিছুদিন পর বুঝতে পেরেছে এই পাকিস্তান তাদের সমস্যার সমাধান করবে না। এখন বার্মার মধ্যে মুসলমানদের উপর অত্যাচার হয়। ধরে নিলাম। তো সেটা বলে রামুর বৌদ্ধদের উপর অত্যাচারের যুক্তি যারা দেখায় তারা মানবিক মর্যাদায়, সাম্যে, ন্যায়ে, ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করে না। এই আক্রমণ করেছে তারাই। এগুলো হচ্ছে লম্বা কথা। আমরা এখন নগদ কথায় আসি।

গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে আজকের এই ২৯ তারিখ পর্যন্ত এই এক বছরে কত ঘটনা ঘটেছে। আপনারা জানেন এই বছর ফেব্রুয়ারি মাসের ৫ তারিখে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের একটি রায় ঘোষিত হল। ঢাকার শাহবাগে তরুণরা সমাবেশ করে বলল যুদ্ধাপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি চাই। তখন কয়েক দিনের মধ্যে দেখা গেল — আমি লম্বা কাহিনীকে সংক্ষেপ করছি, আপনারা সকলেই জানেন — দেশের কত জায়গায় ৯৪-৯৫ জায়গায় হিন্দু মন্দিরে হামলা হল। আমি আমার সেই সমস্ত বৌদ্ধ বন্ধুরা যারা আগে বক্তৃতা দিয়েছেন তাঁদের বক্তব্যের সাথে সহমর্মিতা প্রকাশ করেই বলছি, আক্রমণ একলা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপর হয় নাই। পৃথিবীর নানা দেশে যেখানে যে দুর্বল — তথাকথিত সংখ্যালঘু — তার উপরেই হামলা হয়। এই বাংলাদেশে হয়েছে। ভারতে দেখেন মুসলমানদের উপর হচ্ছে। এগুলো করে কারা? দেখেন আমরা এখন ইন্টারনেটের যুগে এসছি। সেদিন দেখলাম একজন সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, কক্সবাজার জেলা পরিষদ এখন কম্পিউটার আউটসোর্সিং করছে। মানে কম্পিউটার বেশি শিখে আমরা এখন পয়সা কামাতে পারব। কিন্তু তার বিপদের দিকও আছে। বলে ঘুঘু দেখেছ ফাঁদ দেখনি? ফাঁদ হচ্ছে এই — রামুতে যা ঘটেছিল সেটাই। সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা — একজনের নামে অপবাদ দিয়ে আরেক জনকে দোষী করা। এটাকে ইংরেজিতে বলে ব্ল্যাক প্রপাগান্ডা। আমি কথাটা পছন্দ করি না। আমি বলব এটা হোয়াইট প্রপাগান্ডা। এটা সাদা মিথ্যা, নির্জলা মিথ্যাপ্রচার। কিন্তু পরিণতিতে যা হবার তা তো হয়ে গেছে। আপনারা সবাই দেখেছেন। আমরা সকলেই তার ভুক্তভোগী।

কিন্তু ৫ ফেব্রুয়ারির পর বুঝতে পারলাম তার পিছনে একটা সংঘবদ্ধ হাত আছে। এটা কোন বিছিন্ন ব্যক্তি, রামুর কয়েকজন ব্যক্তি করেছে বললে পুরাপুরি সত্য বলা হবে না। তাহলে দেশের পঁচানব্বইটা জায়গায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দিরের উপর, বাড়ির উপর কেমন করে হামলা হল? এটা কি করে সম্ভব? এমনকি রামুতেও আক্রমণ করার জন্য ট্রাকে ট্রাকে যে লোক এসেছে সেটা তথাকথিত লোকের মনের রাগ থেকে সম্ভব নয়। এটা দুইদিনের ঘটনা হতে পারে না।

এই জন্যই বলছি বৌদ্ধ মন্দির পুনরায় নির্মাণ করার জন্য আমরা সরকারকে ধন্যবাদ অবশ্যই দেব। এটা না দিলে অন্যায় হবে। আমাদের সুলতানা কামাল আপাও বলেছেন, সরকার যে এটা নির্মাণ করে দিয়েছে সেটার জন্য আপনারা তাকে সাধুবাদ জানাবেন। বৌদ্ধমন্দিরগুলোর পুনর্নির্মাণ করাটা সমস্যার স্বীকৃতি মাত্র, সমাধান নয়। এই ধরনের ঘটনা আর যেন না ঘটে সেটা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমে আমাদের প্রত্যেককে বুঝতে হবে ঘটনাটা কেন ঘটে। সে জন্য আমি বললাম ব্রিটিশ আমল থেকে  শুরু করে আমরা দেখেছি ঘটনাগুলি সবসময় ঘটে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের পিছনে কি থাকে? থাকে স্বার্থবুদ্ধি, বিশেষত অর্থনৈতিক স্বার্থ। ভবিষ্যতে এদেশে শাসন চালাবে কে? কে এদেশের উপর প্রতাপ করবে? যারা করতে চায় তারা নিজের শাসন ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক শোষণের ক্ষমতাকে অক্ষুণœ রাখার জন্য মানুষের মধ্যে ক্রমাগত ভীতির সঞ্চার করে। বলে এদেশ থেকে চলে যেতে হবে তোমাকে। আমি বলি, এটা কি তোমার বাপের সম্পত্তি? হ্যাঁ, রাজনীতি শুধু তোমাকে সেই বাপের সম্পত্তি করে দেয় অন্যকে তার বাপের সম্পত্তি থেকে উৎখাত করার জন্য। এজন্য তা যদি আমরা বুঝতে চাই তো আমাদের ঘটনার গভীরে যেতে হবে।

এখন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে দেশে একটা বিচার প্রক্রিয়া চলছে। এটাকে ‘নামে’ই  আমি বলব, কারণ বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে বিলম্বিত হচ্ছে বিলম্বিত হচ্ছে। একটা রায় ঘোষিত হল। প্রথম রায়ে একজনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল কারণ সে দেশে নাই, পালিয়ে গেছে। সেই একই ধরনের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর আরেকজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হল। তখন ছাত্রজনতা সহ দেশের সর্বস্তরের মানুষ শাহবাগে এসে বিক্ষোভ করল। তখন সেটাকে ঠেকানোর জন্য কি ধরনের মিথ্যা, সাদা প্রচারণার সুযোগ নেওয়া হল, আপনারা দেখেছেন। বলল কি শাহবাগে যারা সমবেত হয়েছে তারা সকলেই নাস্তিক। ভাগ্যিস বলে নাই শাহবাগে যারা সমবেত হয়েছে তারা সকলেই বৌদ্ধ। এখন নাস্তিকদের তো মন্দির নাই। ভাঙ্গবে কোনটা? তারা পারবে নাস্তিকদের ধরে ধরে হত্যা করতে। আমি সবিনয়ে নিবেদন করতে চাই, রামুর ঘটনা সেই ঘটনার অংশ। যেহেতু ঘটনাটা ৫ মাস আগে ঘটেছিল তাই আমরা প্রথমে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। এটা কেমন করে সম্ভব? আসলে এটা সম্ভব সেইভাবে যেভাবে অন্য ঘটনাগুলো ঘটেছে। অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার উদাহরণ তো ভারতে স্থাপন করা হয়েছে। নিশ্চয় সেখান থেকে এরা শিক্ষা নিয়েছে।

এজন্য বলছি এই অত্যাচারের কাহিনী কোন বিশেষ ধর্মের সাথে যুক্ত নয়। এসলাম ধর্মের কোথাও বলে না যে মন্দির ধ্বংস করতে হবে। এসলাম ধর্ম বৌদ্ধধর্মের চেয়ে বয়সে ১,০০০ বছরের ছোট ধর্ম। আমিও এসলামি সমাজে জন্মগ্রহণ করেছি। এসলাম ধর্মের বাণী আমি যেটুকু বুঝি তা হল আল্লাহর চোখে সকল মানুষ সমান। আর আমি কার্ল মার্কসের বই পড়ে কার্ল মার্কসের শিষ্য হয়েছি অতি অল্প বয়সে। সেখানে আবার কার্ল মার্কসের শিক্ষা বলতে আমি বুঝেছি, মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্যকে নির্মাণ করে, দেবতারা নির্মাণ করে না। এই দুইয়ের মধ্যে আমি কোন বিরোধ দেখি না। মানুষ নিজের ভাগ্যের নির্মাতা নিজেই। তার ভাগ্য ভাগ্যদেবীর উপর নির্ভর করে না। ভাগ্য তাকেই সহায়তা করে যে বীরদর্পে সাহসের সাথে এগিয়ে যায়। কাজেই যে ঘটনা ঘটেছে এখানে, যারা আক্রমণ করেছে, সেটাকে ঠেকাবার জন্য রামুতে অন্তত একজন হলেও তো মানুষ ছিল। একজন হলেও ঠেকাতে গিয়েছে। মানুষের মাথা তো ফেটেছে। এটাই আমাদের গৌরবের কথা।

এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগে, আমাদের জনগণের যদি চাপ না থাকত, সারা পৃথিবীতে দুর্নামে আমাদের নামে যদি রি রি পড়ে না যেত, তাহলে হয়তো বাংলাদেশ সরকারও এই মন্দিরগুলি নির্মাণ করে দিতেন না। বিশ্ব জনমতের চাপ আছে, দেশের জনমতের চাপ আছে। তাই সরকার যদি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে তাহলে তাকে কাজ করতে হবে। আমি সরকারকে ধন্যবাদ দেব। একই সাথে বলব এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধের জন্য কমপক্ষে দুইটা কাজ করা দরকার। এক হচ্ছে: এ কাজ যে বা যারা করেছে তাদেরকে ধরে ধরে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে। এটার কোন ক্ষমা নাই। যদি ৪২ বছর পরে ১৯৭১ সালে করা যুদ্ধাপরাধের বিচার হতে পারে তাহলে রামুর বৌদ্ধমন্দিরে হামলাকারী অপরাধীদের অনুসন্ধানে যদি ৪০ বছরও লাগে, তার বিচার করতে হবে। যদি এই বিচার না হয় তাহলে এই ধরনের আক্রমণকারীরা আবারও উৎসাহিত হবে। এই বিচার হবে তখনই যখন আমরা সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে — শুধু বৌদ্ধদের মধ্যে নয় — মুসলমানদের মধ্যে, হিন্দুদের মধ্যে, দেশের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে এই বিচারের দাবি জনপ্রিয় করতে পারব।

আপনাদের সন্তান, আমার বন্ধু ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়–য়া একটা অসাধারণ সমৃদ্ধ ভাল বই বের করেছেন। এটা হয়তো হাজার হাজার কপি ছাপা হয় নাই। আপনাদের যাদের সাধ্য আছে দেখবেন। তাতে দলিল অনেক আছে। সরকারি তদন্ত কমিটিতে যে সমস্ত কথা লোকে বলে নাই তার চেয়ে বেশি কথা এই বইতে বলা আছে। ‘রামু: সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সংকলন’ এই বইটা আপনারা নিশ্চয় দেখবেন। তাতে অনেক কাহিনী আছে।

আমি আজকে বক্তৃতা সংক্ষিপ্ত করব। আমি বলব যে বিচাররের দাবিটা আমরা তখনই প্রতিষ্ঠিত করতে পারব যখন জানব আক্রমণকারীদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কি। প্রকৃত উদ্দেশ্য আমি এইভাবে সংক্ষেপে বলি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটা তৈরি হওয়ার আগের ইতিহাস দেখেন। পাকিস্তান আমলে আমরা বিভ্রান্তিতে পড়েছিলাম যে মানুষে মানুষে বিভেদের মূল কারণ বুঝি ধর্ম। আমরা পাকিস্তানের অভিজ্ঞতায় প্রমাণ করেছি সেটা আসল কারণ ছিল না। আসল কারণ ছিল মানুষের উপর মানুষের শোষণকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য মানুষকে ধর্ম পরিচয় দিয়ে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা। সেজন্য ব্রিটিশ শাষিত ভারতবর্ষের একটা অংশ পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম করেছিল, আরেকটা অংশ ভারত রাষ্ট্র করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ আমরা গড়েছিলাম একটা মহান আদর্শ নিয়ে — ধর্ম পরিচয় দিয়ে আর কেউ কাউকে শোষণ করতে পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার তিন চার পাঁচ বছরের মধ্যেই আবারও সেই ধর্ম পরিচয় বড় করে তোলার যে রাজনীতি দেশে গড়ে উঠল সেটাই সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয়। পরিতাপের বিষয়।

ছবি: সর্বজন

ছবি: সর্বজন

এটা কি করে সম্ভব হল? মুক্তিযুদ্ধ আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এদেশে আর কোন দিন পাকিস্তানিরা শাসন করবে না। শুধু তাই নয়, এদেশে বাঙ্গালিরাও বাঙ্গালি কি অন্য জাতির লোকদের আর শোষণ করবে না — এটা কি মানুষের আশা ছিল না? অন্তত বেশির ভাগ মানুষের আশা তো তাই ছিল। সে আশা পূরণ হয়নি। যারা মানুষের উপর মানুষের অত্যাচার, মানুষের উপর মানুষের শোষণ এবং শাসনকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে চায় তাদের কোন না কোন ছুতা লাগবে। আমরা সকলেই শ্রমজীবী মানুষ। আমরা সকলেই কৃষক মানুষ। এই পরিচয় যদি বড় হয়ে ওঠে তাহলে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ ভেদটা বড় থাকে না। কিন্তু সেটা বাদ দিয়ে যদি আমি মানুষের মধ্যে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ভেদাভেদটাকে বড় করে রাখতে পারি তাহলে যারা বড় লোক হয়েছে নতুন করে, এদেশ হয়ে যাদের নতুন জমিনদারি হয়েছে, যারা নতুন শিল্পপতি হয়েছে তাদের সুবিধা হয়। তারা পুরানো আমলের পাকিস্তানি রাজনীতিকে আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।

সেজন্য আজকে তারা বলছে, দেশ আজ দুই ভাগে বিভক্ত। আমি বলব দেশ আজ দুই ভাগে বিভক্ত নয়। প্রত্যেক দেশেই কিছু চোর, কিছু ডাকাত, কিছু দুর্বৃত্ত থাকে। তাই কি আপনি বলবেন, দেশ আজ দুই ভাগে বিভক্ত? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন সাহেব — তিনি প্লেবয় টাইপের মানুষ — একবার বলেছিলেন পৃথিবীর মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত। যারা তাজমহল দেখেছে আর যারা তাজমহল দেখে নাই। পৃথিবীতে সব মানুষকে এভাবে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। আপনারা দেখছেন আমার সামনে দিলীপবাবু আছেন। বাংলাদেশে আপনারা কয়েক হাজার দিলীপ পাবেন। কেউ বলবে, বাংলাদেশের মানুষ আজ দুই ভাগে বিভক্ত। যাদের নাম দিলীপ আর যাদের নাম দিলীপ নয়। চাইলে তো এরকম ভাগাভাগি আপনি করতেই পারেন।

এদেশের মানুষ কেউ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, আর কেউ এসলামের পক্ষে এরকম দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে — এটা একটা মিথ্যা প্রচারণা। আমরা সকলেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। এ হিশাবে আমরা সকলেই বাংলাদেশের পক্ষে। কিন্তু ধর্ম হিশাবে আপনার এসলাম ধর্মের পক্ষে হয়েও বাংলাদেশের পক্ষে থাকা যায়, বৌদ্ধধর্মের পক্ষে হয়েও বাংলাদেশের পক্ষে থাকা যায়। এটাই তো ছিল বাংলাদেশের বাণী।

আজ সেটাকে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য তারা বলছে দেশ আজ দুই ভাগে বিভক্ত। কারণ আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার চেষ্টা করছি। কিন্তু যারা যুদ্ধাপরাধ করেছিল তারা কত জন? তারা সংখ্যালঘু ছিল। আজকে রামুতে ব্যাপক মানুষের সাক্ষ্য, সারাদেশে মানুষের প্রতিবাদের ¯্রােত দেখে বোঝা যায়, যারা এই অপরাধ করেছে তারাও স্বীকার করতে পারছে না যে আমরা এই অপরাধ করেছি। তাদের লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে। ছদ্মবেশে এর ছবির সাথে ওর ছবির সাথে নিজের ছবি ছাপিয়ে তাদেরকে প্রমাণ করতে হচ্ছে আসলে এটা আমি বা আমরা করি নাই। এখানেই তাদের পরাজয়। আজ এই জনসভায় আপনি তাকে আহ্বান করছেন না। অর্থাৎ জনগণের বিচারের একটা পদ্ধতি আছে। জনগণের সেই বিচারের পদ্ধতিকে অক্ষুণœ রাখুন।  আমাদের দেশ ঐক্যবদ্ধ থাকবে। দেশ দুই ভাগে বিভক্ত হবে না। আমরা সবাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আছি। আমরা সবাই বাংলাদেশের পক্ষে আছি। কিন্তু যার যার ধর্ম সে সে রাখতেই পারি।

এই বৌদ্ধমন্দির পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণ সেই উদার ঐতিহ্যের একটু হলেও দেখিয়েছে। জানি মনের দাগ অত সহজে যাবে না। নদী মরে গেলেও রেখ রেখে যায়। এই স্মৃতি বহুদিন থাকবে। কিন্তু এই স্মৃতি থেকে আমরা একটাই শিক্ষা নেব — এই ধরনের ঘটনা যেন আর একবার না ঘটে। এটার যেন আবৃত্তি না হয়। সেটা করতে হলে আমাদের — আমি আগেই বলেছিলাম — ৪০ বছর লাগলেও যেমন বিচার করতে হবে, এটা বুঝতে যদি আমাদের ৮০ বছরও লাগে এই বিচার অব্যাহত রাখতে হবে।

আমাদের দেখতে হবে কোন জিনিশটা মানুষকে দুই ভাগে ভাগ করে। আর কোন জিনিশটা সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। আসুন আমরা ঐক্যের পথেই হাঁটি। এই বিভক্তির পথে যারা মানুষকে ধাবিয়ে দেয় তাদেরকে আমরা পরাজিত করি। তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলি।

আমি আপনাদের আর বেশি সময় নেব না। ঢাকা থেকে মহান অতিথি যারা এসছেন তাদের কথা আপনারা শুনুন। আমার জন্মও আপনাদের কক্সবাজার জেলায়। আমার বাড়ি মহেশখালিতে। আমি চাঁটগাইয়াতেও বলতে পারতাম। কিন্তু আমি আমার অতিথি অভ্যাগত বন্ধুদের সৌহার্দ্যরে জন্য বাংলাতেই বললাম। তো অঁনারা বেয়াজ্ঞুনে ভালা থাইক্কন। আসসালামুলাইকুম। নমস্কার।

অনুলিখন: মুহাম্মদ তাসনিম আলম

 

২৩ নবেম্বর ২০১৩, সর্বজন: নবপর্যায় ২৮

ফরহাদ মজহারের বোমা অথবা রেটরিক প্রসঙ্গে

প্রবীণ কবি ও বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার সম্প্রতি একটি টকশোযোগে (একুশে টিভি, ২৮ অক্টোবর রাত) কিছু কথা বলিয়াছেন যাহাতে দেশের বুদ্ধিজীবী–বিশেষ সাংবাদিক–সমাজ আপত্তি জানাইয়াছেন। তিনি নিজেও প্রকারান্তরে স্বীকার করিয়াছেন যাহা তিনি বলিয়াছেন তাহা বলাটা উচিত কাজ হয় নাই। ব্যাখ্যা দিয়াছেন তিনি যাহা বলিয়াছিলেন তাহা নিছক কথার কথা বা রেটরিক। যাহা একজনের কাছে কথার কথা তাহা অন্যের গায়ে ঢিল আকারে পড়িতে পারে–এই সত্যটা উপকথা আকারেও সমাজে বিরাজ করে। তিনি পরোক্ষে হইলেও এই সত্য স্বীকার করিয়াছেন। তাহাতে তিনি সাধুবাদ পাইবেন।

গত ২রা নবেম্বর একটি দৈনিক পত্রিকাযোগে (দৈনিক যুগান্তর) তিনি আমার মতো এক নগণ্য ব্যক্তিকে আক্রমণ করিয়া বসিয়াছেন। অভিযোগ করিয়াছেন আমি তাঁহার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনিয়া তাঁহাকে হত্যা করিতে চাহিয়াছি। তিনি যে উষ্ণ হইয়াছেন তাহাতে আর সন্দেহ কি! আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলিয়া রাখিতেছি আমি তাঁহাকে হত্যা করিতে চাহি না, তাঁহাকে কেহ হত্যা করুক তাহাও চাহি না। প্রার্থনা করি তিনি চিরায়ুষ্মান হউন।

আমি অতীতে যেখানে প্রয়োজন তাঁহার সমালোচনা করিয়াছি। সমালোচনাই করিয়াছি, বোমা মারি নাই। কর্তৃত্বের বল কিম্বা গায়ের জোর ফলাই নাই। ওয়াকেবহাল সকলেই জানেন আমি যুক্তি প্রয়োগ করিয়াছি। আমার সমালোচনাকে তিনি নিছক ‘গালিগালাজ’ বলিতেছেন। আমার সমালোচনা ভুল হইতে পারে। কিন্তু আমি সমালোচনার হাতিয়ারকে কখনোই হাতিয়ারের সমালোচনা দিয়া দায় সারি নাই। ফরহাদ মজহার নিঃসন্দেহে আমার বক্তব্য পছন্দ করেন নাই। কিন্তু একই সাথে সেই বক্তব্যের আলোচনা করা তিনি প্রয়োজনও মনে করেন নাই। আমাকে তিনি হেয় করিয়াছেন।

একাত্তর টিভি আমাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন আগের দিন একুশে টিভির অনুষ্ঠানে ফরহাদ মজহার যাহা বলিয়াছেন তাহার বিষয়ে আমার বক্তব্য কি? আমি বলিয়াছিলাম ফরহাদ মজহার শিশুও নহেন, পাগলও নহেন সুতরাং তিনি যাহা বলিয়াছেন তাহার দায় তাঁহাকেই লইতে হইবে। গণতন্ত্রে বাক-স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার বলিয়া স্বীকৃতি পাইয়াছে। মনে রাখিতে হইবে এই স্বাধীনতা অবাধ বা অসীম নহে। আমার বাক-স্বাধীনতার সীমা অন্য নাগরিকের বাক-স্বাধীনতা হরণ করিবার সুবিধা পর্যন্ত প্রসারিত হইতে পারে না। একালের উদারনৈতিক বা স্বাধীনতা ব্যবসায়ী গণতন্ত্রের সংজ্ঞার মধ্যেই এই সীমার কথা বলা আছে। বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানের ৩৯(২) অনুচ্ছেদের দোহাই দিয়া আমি এই বক্তব্য সমর্থন করিয়াছিলাম।

কথাটা পরিষ্কার করিবার জন্য আরও দুই কথা বলিতে আমি বাধ্য হইয়াছিলাম। যাহাকে বলা হয় ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা’ তাহার কিন্তু কোন সীমা নাই। বাংলাদেশের হাল সংবিধানের ৩৯(১) অনুচ্ছেদ এই প্রস্তাবেরই প্রকাশ। বিপরীত বিচারে দেখা যায়, বাক স্বাধীনতা বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রভৃতি মৌলিক অধিকার নানান সীমার মধ্যে বাঁধা থাকে। এই প্রসঙ্গেই কথা ওঠে বাক-স্বাধীনতার অপব্যবহার বা সীমালঙ্ঘন শুদ্ধ অপর নাগরিকের বিরুদ্ধে কৃত অপরাধ এমন নহে। এই অপরাধ গোটা জাতি বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও সংঘটিত হইতে পারে। ফরহাদ মজহার গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে পটকা (বা ককটেল) মারা পর্যাপ্ত নহে মনে করেন। গণমাধ্যমে হামলা পরিচালনা পাবলিক অর্ডার বা রাষ্ট্রীয় শান্তিভঙ্গের শামিল। ইহার অর্থ রাষ্ট্রদ্রোহিতা বটে। দেশের প্রায় সকল মানুষই তাঁহার এই বক্তব্যের নিন্দা করিয়াছেন। বলিয়াছেন এই বক্তব্য বেপরোয়া, এই বক্তব্য দুর্ভাগ্যজনক। আমিও বলিয়াছি। কারণ অন্যায়কে অন্যায় বলিতেই হইবে। দুর্ভাগ্যের মধ্যে তিনি আমাকেই যাহাকে বলে ‘চিহ্নিত’ করিয়াছেন। হামলার ‘টার্গেট’ করিয়াছেন।

যুগান্তরে প্রকাশিত লেখায় ফরহাদ মজহার বলিতেছেন ‘গণমাধ্যমের সমালোচনা করলে সেটা কিভাবে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হয় সেই পা-িত্য বোঝার ক্ষমতা আমার নাই’। তিনি এখানে সত্য কথা বলেন নাই। গণমাধ্যমের সমালোচনা করিলে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হইবে কেন? কেহ তো সেই কথা বলে নাই। গণমাধ্যম বা গণমাধ্যম কর্মীর উপরে বোমা ছুঁড়িলে দুই ধরনের অন্যায় হয়। ইহাতে যাহাকে মারা হইতেছে তাহার বাঁচিবার অধিকার হরণ হয়। আর দুই নম্বরে ইহাতে ‘নৈরাজ্য’ সৃষ্টি হয়। সমালোচনার হাতিয়ারের জায়গায় ফরহাদ মজহার হাতিয়ারের সমালোচনা প্রয়োগ করিতে বলিয়াছেন। বোমা মারিতে উস্কানি দিয়াছেন। ইহাতেও যদি অপরাধ না হইয়া থাকে তবে আমার কোন বক্তব্য থাকিতে পারে না। তিনি আবারও কথার হেরফের করিতেছেন। মানুষ মাত্রেই ভুল করিতে পারে। তিনি ভুল স্বীকার করিলেই পারেন। ক্ষমা চাহিবার অধিকার তাঁহারও আছে।

কিন্তু একটা প্রশ্ন থাকিয়া যায়। ‘গণমাধ্যম’ কোন পদার্থ? তাহার মালিকানার প্রশ্নটি অবশ্যই অবান্তর নহে। কিন্তু আমরা কথা বলিতেছি গণমাধ্যমের কর্মী ও তাহাদের কর্তব্য লইয়া। যুদ্ধক্ষেত্রেও দূত, সাংবাদিক আর চিকিৎসক অবধ্য। যাহারা তাঁহাদিগকে বধ্য মনে করেন তাহারা সভ্যতার সামান্য নিয়ম লঙ্ঘন করেন। কবি ফরহাদ মজহার যদি সেই ধরণের কাজে উস্কানি না দিয়া থাকেন তবে তাঁহার কোন অপরাধই হয় নাই। কিন্তু কোটি দর্শক যাহা দেখিয়াছেন ও শুনিয়াছেন তাহাতে অপরোক্ষে প্রকাশ হইয়াছে তিনি কয়েকটি গণমাধ্যমকে পরিষ্কার ভাষায় ‘সন্ত্রাসী’ বলিয়াছেন। তাহার ভাষা ছিল বেপরোয়া, দায়িত্বজ্ঞানহীন। এখন তিনি বলিতেছেন, উহা ছিল কথার কথা, রেটরিক।

রেটরিক প্রয়োগের অধিকার তাঁহার যদি থাকে, অন্যের থাকিবে না কেন? তিনি লিখিয়াছেন ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার শাস্তি মৃত্যুদ-’। এই কথাও অর্ধসত্যের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কে না জানে পরাধীন যুগে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বিদেশি দখলদার রাষ্ট্র এক বৎসরের সশ্রম কারাদ- দিয়াছিল। অপরাধ ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’। বলা নিষ্প্রয়োজন রাষ্ট্রদ্রোহিতার শাস্তি নানা প্রকার হইতে পারে। মৃত্যুদ-ও অকল্পনীয় নহে। প্রশ্নটা হইতেছে জবাবদিহিতার। শাস্তির নয়। জবাব পাইবার অধিকার আছে আমাদের। কারণ তিনিই আমাদের হত্যা করিবার প্ররোচনা দিয়াছেন। আমরা দিই নাই। রাষ্ট্র বলিতে রাজনৈতিকভাবে সংঘবদ্ধ ‘জনগোষ্ঠী’– বা আজকালকার ভাষায় ‘জাতি’– বুঝায়। নিঃসন্দেহে এই পা-িত্য বুঝার ক্ষমতা তাঁহার আছে। আর যদি না থাকে তবে তিনি ক্ষমার যোগ্য। কেননা অবুঝ লোকের কোন অপরাধ নাই।

ফরহাদ মজহার যে বিদিশা হইয়াছেন–মানে দিশা হারাইয়াছেন–তাহার আরেক প্রমাণ দেখুন। তিনি আমাকে ‘রাজসাক্ষী’ বলিয়াছেন। ‘রাজসাক্ষী’ কাহাকে বলে? যাহারা একযোগে অপরাধ করে তাহাদের কেহ যদি সহযোগীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়া নিজের অপরাধের দ- মওকুফ করাইয়া লয় তাহাকেই লোকে ‘এপ্রুবার’ বা রাজসাক্ষী বলে। এমনই এতদিন জানিতাম। এখন তিনি শিক্ষা দিতেছেন ‘টেলিভিশন টকশোর বরাতে রাজসাক্ষী’ হওয়া যায়! নাকি তিনি প্রকারান্তরে আমাকেও ‘অপরাধী’ বলিতেছেন!

বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার আমার বাক্য ছাড়াইয়া গিয়াছেন। প্রায় বর্ণবাদী ভাষায় আমাকে আমার ‘মুখভঙ্গির মধ্যে’ আবিষ্কার করিয়াছেন তিনি। আমার সমালোচনাকে বিচার না বলিয়া তিনি রাজসাক্ষীর জবানবন্দী ঠাওরাইয়াছেন। বলিয়াছেন আমি তাঁহাকে ‘গালিগালাজ’ করিয়াছি, শাস্তি দিতে চাহিয়াছি। তাঁহার লেখায় সকলেই পড়িয়াছেন এই কথাগুলি: ‘টিভিতে তার মুখভঙ্গির মধ্যে আমাকে রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক যন্ত্রের দ্বারা শাস্তি দেয়ার জিঘাংসা দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। তার চোখে-মুখে যে হিংস্রতা ও প্রতিহিংসাপরায়ণতা ফুটে উঠেছে তাতে আমি অবাক না হয়ে পারিনি।’

এই কথাগুলি পড়িয়া আমার ধারণা হইয়াছে তিনি আমার বাক্য কানে শোনেন নাই, চোখ ও মুখের ভঙ্গি দেখিয়াছেন মাত্র। এহেন হিতাহিতজ্ঞানশূন্যতা কাহারও জন্য কল্যাণকর নহে।

কবি ফরহাদ মজহারকে আমি চিনি আজ কম করিয়া হইলেও ছত্রিশ বছর হইবে। তাঁহার মনীষা ও কবিত্বের তারিফ আমি করিয়াছি বহুবার। যেখানে প্রয়োজন সমালোচনা করিয়াছি। তিনি কোনদিন জওয়াব দেওয়ার দরকার বোধ করেন নাই। না দিবার অধিকার তাঁহার আছে। কিন্তু তাঁহার রাজনীতির সহিত–বিশেষ করিয়া বর্তমানে তিনি যে রাজনীতির দিকে আগাইতেছেন–তাহার সহিত আমার ভিন্নমত আছে। বিশেষ করিয়া গত ২০০৫ সালে তিনি যখন জে.এম.বি. নামক রাজনৈতিক আন্দোলনের সমর্থনে কিছু লেখা লিখিলেন তখন আমি তাঁহার সংস্রব পরিপূর্ণভাবে ত্যাগ করি। সম্প্রতি তিনি যুদ্ধাপরাধের বিচার লইয়া দেশে যে আন্দোলন চলিতেছে তাহার বিরোধিতা করিলে আমি নিরব থাকাটা আর সমীচীন মনে করি নাই।

এই লেখায় আর নতুন কথা তুলিতে চাহি না। যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে শাহবাগে সমবেত তরুণ-তরুণীদের দাবিকে নস্যাৎ করিয়া তিনি একাধিকবার বলিয়াছেন ইহারা ‘পাবলিক লিঞ্চিং’ চাহিতেছে। অথচ শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ অপরাধীদের বিচারের দাবি ছাড়া আর কোন দাবির মতো দাবিই তোলে নাই। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ফরহাদ মজহার এখন যে অবস্থান নিতেছেন তাহা–সংক্ষেপে বলিতে–বিস্ময়কর। যেন ফুলের শয্যায় বসিয়া দেশটা স্বাধীন হইয়াছে।

মুক্তিযুদ্ধের পর পর প্রকাশিত একটি কবিতার বইয়ের উৎসর্গপত্রে কবি ফরহাদ মজহার লিখিয়াছেলেন, ‘রাখিস মা এ দাসরে মনে/ কেউ কি এমন রক্ত ঢালে!’ আর যাঁহারা এই রক্তপাত করিয়াছিলেন আজ তাঁহাদেরই গাত্ররক্ষার জন্য তিনি ‘ইসলামের নৈতিক ও দার্শনিক আদর্শ’ আবিষ্কার করিতেছেন। এই দুঃখ রাখিবার পাত্র কোথায় পাই!

বাংলাদেশের ত্রিসীমানা হইতে দখলদার পাকিস্তানের শেষ সৈনিকটি যেদিন অপসারিত হইয়াছিল সে দিনই বাংলাদেশ স্বাধীন হইয়াছিল–একথা আমরা একদিন ভাবিয়াছিলাম। আজ স্বীকার করিয়া বলিতে হইবে–আমরা ভুল ভাবিয়াছিলাম। দেশকে সত্য সত্য স্বাধীন করিতে হইলে পাকিস্তানী যুগের বিভেদমূলক ‘কদর্য’ সাম্প্রদায়িক মানসিকতাও অপসারিত করিতে হইবে।

দেখা যাইতেছে দেশ স্বাধীন করার সংগ্রাম আজও শেষ হয় নাই। বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার এখন সাম্প্রদায়িক বিভেদের দার্শনিক আদর্শ প্রচার করিতেছেন। বোমা মারার নৈতিকতাকে তিনি ইসলামের নামে জাহির করিয়া খোদ ইসলামেরই অমর্যাদা করিতেছেন।

ঢাকা
৫ নভেম্বর ২০১৩

 

৫ নভেম্বর ২০১৩, bdnews24.com, মতামত বিশ্লেষণ

রাষ্ট্রচিন্তা: গণতন্ত্র ও ফ্যাসিতন্ত্র

রাষ্ট্রনায়কেরা কিভাবে দেশ শাসন করেন আর কিভাবে তাহাদের শাসন করা উচিত তাহা লইয়া আমি আলোচনা করিয়াছি। সামাজিক অবস্থা ও পদবিচার করিলে স্বীকার করিতে হইবে আমি নিচুপদের ও অধস্তন শ্রেণির লোক। তাই বলিয়া আমার প্রচেষ্টা আশা করি ধৃষ্টতা বলিয়া গণ্য হইবে না। কেননা দেশগ্রামের ছবি আঁকিতে হইলে যাহা করিতে হয় এখানেও তাহাই করিতে হইবে। যাঁহারা পাহাড়পর্বত আর মালভূমির নকশা আঁকেন তাঁহারা নিচু জায়গায় দাঁড়াইয়া থাকেন আর সমতল জমিনের নকশা আঁকিতে হইলে পাহাড়চূড়ায় উঠিয়া যান। একই কারণে সর্বসাধারণের স্বভাব চরিত্র কি বুঝিতে হইলে আপনাকে যাইতে হইবে রাষ্ট্রনায়কের জায়গায় আর রাষ্ট্রনায়কদের স্বভাবচরিত্র বুঝিতে হইলে আপনাকে হইতে হইবে সর্বসাধারণেরই একজন।

— নিকোলো মেকিয়াভেলি

লড়াইয়ের মাঝে এই ধরনের প্রস্তাবের মূল্য কম ধরিয়া লওয়া কিন্তু ভুল কাজ হইবে। এই সব প্রস্তাবের অনুবলে আমরা কতগুলি চিরাচরিত ধ্যানধারণার উচ্ছেদ ঘটাইতে পারি। এইসব ধ্যানধারণার মধ্যে আছে ঐশ্বরিক ক্ষমতা, অলৌকিক প্রতিভা, অক্ষয় কাব্য (‘চিরকেলে বাণী’, ‘কালাম’) এবং মরমিয়া ভাব (‘রাহসিকতা’) ইত্যাদি। এই সমস্ত ধ্যানধারণার বেপরোয়া ব্যবহার ইতিহাসের ঘটনাবলীকে এমনভাবে সাজায় যাহাতে ফ্যাসিতন্ত্রের পথ সুগম হয়। এই মুহূর্তে এই ধরনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ একপ্রকার অসম্ভব হইয়া দাঁড়াইয়াছে।

— বাল্টার বেনিয়ামিন

দিনকয়েক আগে আমি ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আহমদ ছফা’ নাম রাখিয়া একটি নাতিদীর্ঘ নিবন্ধ এই জায়গায় [বিডিনিউজ২৪ডটকম] প্রকাশ করিয়াছিলাম। কেহ কেহ সদয় হইয়া কয়েকটি প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করিয়াছেন। তাই আজ এই অতিরিক্ত নিবন্ধটি লিখিতে হইতেছে। কেহ বলিয়াছেন নিবন্ধটি পড়িয়া তিনি কিছুই বুঝিতে পারেন নাই। আর কেহ বা জানাইয়াছেন এই নিবন্ধে কোন নতুন কথা নাই। কেহ কেহ আহমদ ছফা বিষয়ের নিবন্ধে ফরহাদ মজহারের কবিতা আলোচনা করাটা পছন্দ করেন নাই। এই তিন প্রকারের প্রতিক্রিয়াতেই কিছু না কিছু সত্য আছে।

নিজের লেখার দুর্বলতা প্রথমেই স্বীকার করিতেছি। দ্বিতীয়ত নতুন কথা বলিবার জন্য আমি লিখিতেছি না। জানা কথাও মাঝেমধ্যে সর্বসাধারণের উদ্দেশে প্রচার করিতে হয়। এই জায়গায় আমি দীনহীন নবীন লেখক। তবে নতুন কথা বলার ক্ষমতা আমার বিশেষ নাই। তবু সম্পাদক মহাজনেরা আমাকে কেন জানি নিতান্ত অপত্য স্নেহ করেন বলিয়া তাহাদের প্রশ্রয় পাই। তিন নম্বর কথা আমার মূল বক্তব্য ছিল মহান লেখক আহমদ ছফাকে ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ’ বলা যায় কিনা এই প্রশ্নের সহিত জড়ানো। তিনি সমাজের কোন শ্রেণি হইতে আসিয়াছেন তাহা বড় কথা নহে। অথচ আমি যদি ভুল বুঝিয়া না থাকি ফরহাদ মজহার বলিয়াছেন আরশোলাতুল্য মানুষের ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ’ হইবার অধিকার নাই।

আমার সবিনয় নিবেদন এই যে আহমদ ছফা সেই অধিকার অর্জন করিয়াছিলেন নিজের সাধনায়। শুদ্ধ অধিকার কেন, আমি বলিব তিনি সিদ্ধিও লাভ করিয়াছিলেন। যাহারা অনুগ্রহ করিয়া আমার লেখাটি পাঠ করিয়া সাধুবাদ জানাইয়াছেন তাহাদের কর্জ না হয় শোধ নাই-বা করিলাম।

আজিকার লেখায় আমি অধিক যাইতে চাহিতেছি। আমার প্রস্তাব মহাত্মা আহমদ ছফা যে ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ’ ছিলেন সে সত্যে সন্দেহ রাখা চলে না। তিনি ছিলেন যাহাকে লোকে বলে নয়া গণতান্ত্রিক সেই ধরনের রাষ্ট্রচিন্তাবিদ। ‘নয়া গণতান্ত্রিক’ কথাটা আমি জানিয়া শুনিয়াই এস্তেমাল করিলাম। বর্তমান যুগে গণতন্ত্রের পরম শত্রু ফ্যাসিতন্ত্র। এই ফ্যাসিতন্ত্রবাদীরাও নিজেদের আজিকালি গণতান্ত্রিক বলিতে কসুর করেন না। আর দুনিয়া জুড়িয়া গণতন্ত্র কথাটা এতদিনে তো ধরতাই বুলি হইয়া দাঁড়াইয়াছে। চিনদেশের মহান নেতা মাও জেদং একসময় তাই ত্যক্তবিরক্ত হইয়া ‘নয়া গণতন্ত্র’ কথাটি চালু করিয়াছিলেন। ‘নয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তা’ কথাটি তাই মোটেও আনকোরা কথা নহে।

আমার একটি বক্তব্য ছিল যে আহমদ ছফার সাধনা বুঝিতে হইলে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের সাধনা আলোচনা করাটা অপ্রাসঙ্গিক নহে। আলাউদ্দিন খান যে ধরনের সামাজিক ভূমি হইতে গজাইয়াছিলেন আহমদ ছফাও কমবেশি একই ধরনের সামাজিক জমি হইতে উঠিয়াছিলেন। একজনের জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়া আর অন্যজনের বাড়ি গাছবাড়িয়া। এই মিলটা একান্তই আপতিক! একজনের সাধনা সঙ্গীতে, আরজনের চিন্তার বিষয় জাতি বা রাষ্ট্র– এইটাও ধরিলাম আপতিক। কিন্তু যাহা দুইজনের আকাশেই ধ্রুবতারার জ্যোতির মতন জ্বলিতেছে তাহার নাম ‘গণতন্ত্র’। আলাউদ্দিন খান ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের ধারায় ‘গণতান্ত্রিক মনীষা’ বা– মেকিয়াভেলির কথা ধার করিয়া বলিতে– ‘গণতান্ত্রিক বীরত্ব’ ছড়াইয়া দিয়াছিলেন।

এই সত্যটা আহমদ ছফা জানিতেন। যে বছর তিনি ‘সুরসম্রাটের মৃত্যুস্বপ্ন’ নামক অধ্যায়টি লিখিয়াছিলেন সেই বছরই– মোতাবেক ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৯৮– ‘আচার্য আলাউদ্দিন খান’ নাম রাখিয়া ক্ষীণকায় একটি নিবন্ধও পত্রস্থ করিয়াছিলেন। এই প্রবন্ধটির উল্লেখ না করিয়াই আমি আমার ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আহমদ ছফা’ নিবন্ধটি লিখিয়াছিলাম। কবুল করি ইহাতে আমার গোস্তাকি হইয়াছে। পাঠিকা আশা করি দয়া করিবেন।

আহমদ ছফা লিখিয়াছিলেন, ‘উস্তাদ আলাউদ্দিন খান নামটি পূর্ণতার সাক্ষাৎ প্রতীক।’ সেই পূর্ণতার তিনটি দিক তাঁহার নজরে আসিয়াছে। এক নম্বরে আলাউদ্দিন খান ছিলেন শিল্পী-সঙ্গীতশিল্পী। মহাত্মা ছফা লিখিয়াছেন:

‘আলাউদ্দিন খান সাহেব তাঁর দীর্ঘ জীবনের দুশ্চর তপস্যায় মিয়াঁ তানসেনের ঘরানার সঙ্গীতকে শুধু অধিগতই করেননি, অন্যান্য প্রচলিত ঘরানাগুলোর মর্মবস্তুর সঙ্গে সংশ্লেষ-বিশ্লেষ ঘটিয়ে সঙ্গীতের কান্তিকে অধিকতর উজ্জ্বল এবং ব্যঞ্জনার মধ্যে অধিক দিব্যতা সঞ্চার করে সুরকে এমন দুরধিগম্য উচ্চতায় স্থাপন [করেছেন], যেখানে সুর ব্যক্তিগত অর্জনের সঙ্কীর্ণ সীমারেখা অতিক্রম করে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ার একটা অমোঘ দাবি তুলে ধরল।’

আলাউদ্দিন খানের পূর্ণতার দ্বিতীয় দিক তাঁহার সাধকভাব। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন:

‘নিজে সিদ্ধিলাভ করা এক কথা, কিন্তু নিজের সিদ্ধিকে অন্যের মধ্যে সঞ্চারিত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। সঙ্গীতের ইতিহাসে অনেক অসাধারণ প্রতিভার সন্ধান পাওয়া যায়, যাঁরা সুন্দরের আগুনে নিজেদের নিঃশেষ করতে সক্ষম হয়েছিলেন, কিন্তু নিজের দাহিকাশক্তিকে অন্যের মধ্যে সঞ্চারিত করা তাঁদের সাধ্যসীমার মধ্যে ছিল না। সঙ্গীতে অপরকে দীক্ষিত, যোগ্য এবং পারঙ্গম করে তোলার জন্য বিশেষ চরিত্রশক্তির প্রয়োজন। প্রকৃতির দিক থেকে সাধক না হলে এই চরিত্রশক্তি অর্জন করা অসম্ভব।’

আলাউদ্দিন খানের এই চরিত্রশক্তি কোথা হইতে আসিয়াছিল তাহার একটি সূত্রও আহমদ ছফা উল্লেখ করিয়াছেন। আমরা তাহার আলোচনা করিব পরে। আপাতত এইটুকু বলিলেই চলিবে যে আলাউদ্দিন খানের মধ্যে শিল্পী আর সাধক যুগপৎ এক জায়গায় সমবেত হইয়াছিলেন।

এইখানেই কিন্তু তাঁহার কীর্তির শেষ নহে। আলাউদ্দিন খানের সর্বশেষ কীর্তির পরিচয় দিতে বসিয়া আহমদ ছফা ‘রীতিমত একটি বিপ্লব’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করিয়াছেন। আমরা সবিনয়ে বলিব এই বিপ্লবেরই অপর নাম ‘নয়া গণতন্ত্র’। তো ‘নয়া গণতন্ত্র’ কি বস্তু? ইহা বুঝাইয়া বলিতে হইলে আবারো একটু লম্বাচওড়া উদ্ধৃতি শুনাইতে হয়। আহমদ ছফা বেশ লিখিয়াছেন,

‘আলাউদ্দিন খান সাহেবের আচার্য-জীবনের অভিনবত্ব এইখানে যে, তিনি মাইহারে সর্বপ্রথম সর্বসাধারণের জন্য ধ্রুপদ সঙ্গীতের দুয়ার উন্মুক্ত করে দিলেন। ধ্রুপদ সঙ্গীত প্রসারের ইতিহাসে খান সাহেবের এই সাহসী পদক্ষেপ রীতিমত একটি বিপ্লব বললে অধিক বলা হবে না।’

এইখানে বিপ্লবটি কোথায় সমঝাইতে হইলে ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে হাতেখড়িটা অন্তত প্রয়োজন। আহমদ ছফা অতি সংক্ষেপে তাঁহার সার লিখিয়াছেন:

‘এ [যাবত] ধ্রুপদ সঙ্গীত রাজা-বাদশাহদের দরবারে চর্চিত হয়ে আসছিল। সামন্তপ্রভুদের মর্যাদার স্মারক হিসাবে ধ্রুপদ সঙ্গীত চিহ্নিত হয়ে আসছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই সঙ্গীতের চল একেবারে ছিল না বললেই চলে। এই সঙ্গীতের যাঁরা চর্চা করতেন, তাঁরা নিজেদের ঘরানার মধ্যেই সঙ্গীতচর্চা সীমাবদ্ধ করে রাখতেন। আপন পুত্রকন্যা এবং আত্মীয়স্বজনের বাইরে অন্য কোন সঙ্গীত শিক্ষার্থীকে সঙ্গীত শিক্ষা দিতেন না। অনেক সময় জীবিকার তাগিদে বাধ্য কিংবা তাঁদের পৃষ্ঠপোষক কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে বাইরের লোককে সঙ্গীত শিক্ষা দিলেও সঙ্গীতের বিশুদ্ধ অংশটি আপন ঘরানার লোকদের জন্য চোখের মণির মত সযত্নে গোপন করে রাখতেন। ফলে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বাইরে ধ্রুপদ সঙ্গীত কখনো বিস্তারিত এবং প্রসারিত হতে পারত না।’

ভারতবর্ষের ধ্রুপদী সঙ্গীত যে পরে সারা দুনিয়ায় ছড়াইয়া পড়িয়াছে তাহার পিছনে আলাউদ্দিন খান সাহেবের একক কৃতিত্বের কথা প্রায় সকলেই স্বীকার করিয়াছেন। কিন্তু আরও একটি কৃতিত্বের কাহিনী আহমদ ছফার বিচারে স্বীকৃতি পাইয়াছে। এই দিকটাকেই আমরা বলিয়াছি ‘নয়া গণতান্ত্রিক’। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন,

‘আলাউদ্দিন খান সাহেবের আচার্য জীবনের মহত্তম কীর্তি হল, সামন্ত সংস্কৃতির ভেতরে ওতপ্রোত নিমজ্জিত সঙ্গীতের এই সুন্দর ধারাটিতে কোনরকম নান্দনিক বিচ্যুতি না ঘটিয়ে আধুনিক গণতান্ত্রিক যুগের উপযোগী করে তার নতুন জন্ম সম্ভাবিত করেছিলেন [তিনি]।’

এই কীর্তিটির পিছনে আলাউদ্দিন খান সাহেবের সাধকধর্ম মোটেও সক্রিয় ছিল না এমন কথা বলা আমাদের লক্ষ্য নহে। তবে কিনা বলিব এই কীর্তি ছিল সচরাচর প্রচলিত সাধকধর্মের অধিক। আহমদ ছফা বলিয়াছেন,

‘সুপ্রাচীন ধ্রুপদ সঙ্গীতের একটি বিশেষ ধারাকে আলাউদ্দিন খান সাহেব যখন তাঁর শিষ্য-শিষ্যাদের শিখিয়ে পড়িয়ে লায়েক করে তাদের মাধ্যমে প্রচারিত করতে কৃতসঙ্কল্প হলেন, খান সাহেবকে [তখন] সম্পূর্ণ নতুন একটি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হল।’

এই চ্যালেঞ্জের অবসানও একদিনে হয় নাই। ‘সঙ্গীতের ক্ষেত্রে,’ আহমদ ছফা লিখিতেছেন,

‘বিশেষ একটি গোষ্ঠীর মনোভাব, একচেটিয়াপনার অবসান ঘটানোর জন্য খান সাহেবকে জীবনভর সংগ্রাম করে যেতে হয়েছে।’

আমি যখন ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আহমদ ছফা’ নিবন্ধটি লিখিতে বসিয়াছিলাম তখন– পাঠিকা বিশ্বাস নাও করিতে পারেন– এই আশ্চর্য প্রবন্ধটির কথা আমার মনেও ছিল না। শুধুমাত্র রাজু আলাউদ্দিনের সহিত সাক্ষাৎকার আর ‘সুরসম্রাটের মুত্যুস্বপ্ন’ পাঠ করিয়া আমি লিখিতে বসিয়াছিলাম। যাঁহারা ভালমন্দ প্রতিক্রিয়া পাঠাইয়াছেন তাঁহাদের ঋণ স্বীকারপূর্বক নিবেদন করিতেছি ‘আচার্য আলাউদ্দিন খান’ পাঠ করিয়া বুঝিলাম– নতুন করিয়া বুঝিলাম– দুইজনের মধ্যে মিলটা অনেকান্ত। দুইজনই পূর্ব বাংলার শ্যামল জমিনে জন্মাইয়াছেন– এহ বাহ্য! অন্তরের বাজনায়ও দুইজনের মিল পাওয়া যায়। দুইয়ের চিন্তায় নয়া গণতন্ত্র বা– আহমদ ছফার ভাষায়– ‘আধুনিক গণতন্ত্র’ হাজির।

আহমদ ছফা অকারণে লেখেন নাই, ‘এই আশ্চর্য মানুষটির জীবন এবং তাঁর সাধনার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে একটা পবিত্র আতঙ্কের স্রোত শিরদাঁড়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। মানুষের ইচ্ছাশক্তি মানুষকে কতদূরে নিয়ে যেতে পারে, এ মানুষটির জীবনই তার এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।’

আহমদ ছফার শেষ আশাটি পূর্ণ হয় নাই। তাঁহার আশা ছিল আলাউদ্দিন খানের জীবন উদ্যাপন করিয়া একটি উপন্যাস লিখিবেন। এই উপন্যাসটির কথা স্মরণ করিয়াই তিনি রাজু আলাউদ্দিনকে বলিয়াছিলেন,

‘আমি যদি গোটা জীবন ব্যয় করে একটা উপন্যাস লিখতে পারতাম…।’ আহা, যদি পারিতেন! তিনি বলিয়াছিলেন, ‘তাঁকে নিয়ে উপন্যাস লেখার প্রস্তুতি আমি নিয়ে ফেলেছি। এখন বসলে আমি ১৫ দিনের মধ্যে শেষ করতে পারি।’

এখন আর কি করিতে পারি আমরা! সেই উপন্যাস-দুগ্ধের স্বাদ একটি ক্ষুদ্রকায় নিবন্ধের ঘোলেই মিটাইতে হইবে। আহমদ ছফার নিবন্ধে পাঠ করিতে হইবে এই বাক্য:

বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার প্রত্যন্তবর্তী শিবপুর গ্রামের আলম নামে যে কিশোরটি সঙ্গীত-সুন্দরের আবেদনে ঘরবাড়ি ছেড়ে মা-বাবা, ভাইবোনের মায়া-মমতার বন্ধন ছিন্ন করে নিরুদ্দেশের পথে বেরিয়ে পড়েছিল, সেই তীর্থপথিকের যাত্রার শেষ প্রান্তটিতে আমরা দেখতে পাব এমন এক দিব্যপুরুষের আবির্ভাব যার সর্বাঙ্গে মাখানো রয়েছে আশ্চর্য বিভূতি এবং ললাটদেশ থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে সাফল্যের স্বর্ণরশ্মি।

আহমদ ছফার ‘আচার্য আলাউদ্দিন খান’ নিবন্ধটি তাঁহার জীবনের শেষ ইংরেজি বছর–অর্থাৎ ২০০১ সাল–নাগাদ প্রকাশিত একটি গ্রন্থে সংকলিত হয়। গ্রন্থটির নাম ‘উপলক্ষের লেখা’। সেই গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি একটি ব্যক্তিগত কৈফিয়তও দিয়াছিলেন। পাঠিকা অনুমতি করিবেন আশা করি। তাহা হইতে খানিক তুলিতেছি। এই গ্রন্থের বিষয়বস্তু প্রসঙ্গে আহমদ ছফা জানাইলেন:

‘আমাদের এই দেশে সকলে নিজের ঢাক ছাড়া অন্য কারোও ঢাক বাজায় না। ব্যক্তিজীবনের পূর্ণতা সম্পর্কে আমাদের এই দেশের মানুষের সঠিক ধারণার অভাবের কারণে অনেক সময় তারা মারমুখী হয়ে প্রচার করে– আমি ছাড়া জগতে আর কারও অস্তিত্ব নেই। অন্যান্যদের অস্তিত্ব মনে মনে হত্যা করে একমাত্র আমাকেই জীবিত মানুষ প্রতিপন্ন করার উদগ্র আকাক্ষা আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে একটা পুঁতিগন্ধময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।’

আহমদ ছফা প্রশ্ন করিতেছেন, ‘অন্যের অবস্থান যেখানে নেই সেখানে আমার অবস্থান কোথায়?’’ তিনি মনে করেন, ‘‘আমার অবস্থান তখুনি গৌরবান্বিত প্রমাণিত হয় যখন আমি অকপটে অন্যদের অস্তিত্বের স্বীকৃতি দিতে পারি। অন্যকে গৌরব দিতে গেলে নিজেকে কিছু পরিমাণে হলেও ছোট করতে হয়। নিজেকে ছোট করার ক্ষমতা যার জন্মায়নি তার মধ্যে মহত্ব সন্ধান করা বৃথা।’

আমি দীনহীন মানুষ। ছোট মুখে বড় কথা বলা মানায় না। আমাদের দেশে কেন দুনিয়ার কোন দেশেই তাহা বরদাস্ত করা হয় না। প্রেমে পড়িলে কখনো পঙ্গুরও গিরিলঙ্ঘনের দুঃসাহস হয়। আমারো হয়তো হইয়াছে তাহাই। অপেক্ষাকৃত কম বয়সে আহমদ ছফার সহিত পরিচয় না হইলে হয়তো এই দুঃসাহস আমার হইত না। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের মধ্যে আমার মনে হয় আহমদ ছফা কিছু পরিমাণে হইলেও নিজের চরিত খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন। পাওয়াটা দোষের নহে। কারণ আমরা সকলেই কিছুটা দোসর খুঁজিয়া পাই নিজ নিজ উত্তমর্ণের মধ্যে।

‘আলাউদ্দিন খান সাহেব,’ আহমদ ছফা লক্ষ করেন, ‘একটা বিশেষ বয়স পর্যন্ত তাঁর বড় ভাই ফকির আফতাবউদ্দিনের সাহচর্য লাভ করেছিলেন। ফকির আফতাবউদ্দিন সাহেব একজন বড় মাপের সঙ্গীতশিল্পী এবং স্বভাবের দিক দিয়ে ছিলেন সাধক। খুব সম্ভবত আলাউদ্দিন খান সাধকসুলভ প্রকৃতিটি তাঁর জ্যেষ্ঠভ্রাতার কাছ থেকে পেয়েছিলেন। একই ব্যক্তির মধ্যে সাধক এবং শিল্পীর সমন্বয় ঘটার কারণে প্রতিভাবান সঙ্গীতশিল্পীদের মধ্যে যে সব বদগুণের প্রকাশ ঘটতে দেখা যায় আলাউদ্দিন খানকে সেগুলো স্পর্শও করতে পারেনি।’

আহমদ ছফা যদি অকালে এন্তেকাল না করিতেন তো– আমার বিশ্বাস– একখণ্ড আত্মচরিতও লিখিয়া যাইতেন। আহা, তাহা আর হইবার নহে। এক্ষণে আমাদের তৃপ্ত থাকিতে হইবে তাঁহার চিঠিপত্র আর নানা ক্ষুদ্রবৃহৎ নিবন্ধের ফাঁকফোকরে আত্মগোপন করিয়া থাকা আত্মকথা লইয়া। ‘উপলক্ষের লেখা’ গ্রন্থটির মধ্যে এই রকম একপ্রস্ত আত্মচরিতের খসড়াও আছে। ইহার নাম ‘রোগশয্যায় বিরচিত’।

এই লেখায় তিনি জানাইতেছেন ততদিনে তাঁহার বয়স ৫৩ বছর হইয়াছে। তাই ধরিয়া লইতেছি ইহাও ১৯৯৮ সালের লেখা হইতে পারে। এই লেখার এক অংশে তিনি জানাইতেছেন, ‘এটা আমার আত্মজীবনী না, পারিবারিক কাহিনীর অংশও নয়। তবু এক বিশেষ প্রয়োজনে উদ্বুদ্ধ হয়ে এই কাহিনী আমাকে লিখতে হচ্ছে। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, ‘আমার পিতার নাম মরহুম হেদায়েত আলী ওরফে ধনমিয়া। তিনি নিতান্ত সাধারণ অবস্থা থেকে শ্রম, ধৈর্য, সাহস ও সততার বলে নিজেকে একজন ভূমিবান সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং একটি প্রাচীন পরিবারের সম্মান অনেকাংশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন।’

বাবার ঋণস্বীকার করিতে গিয়া আহমদ ছফা এক জায়গায় কহিতেছেন, ‘যদিও লেখাপড়া করার বিশেষ সুযোগ তাঁর ঘটেনি, তথাপি তিনি অত্যন্ত বিদ্যোৎসাহী মানুষ ছিলেন। তিনি নিজের জমিতে মসজিদ এবং মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। যতদিন বেঁচে ছিলেন একহাতে সেই প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যয়ভার বহন করেছেন। তিনি আমাদের অঞ্চলে তাঁর বন্ধুদের নিয়ে যে প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, আমি সে বিদ্যালয়ের তৃতীয় ব্যাচের ছাত্র।’

খানিকক্ষণ পরে আবার তিনি পিতৃপ্রসঙ্গে ফিরিয়া বলিলেন:

‘আমার পিতার কাছে আমি আরো একটা বিশেষ কারণে ঋণী। আমাদের এলাকায় কমিউনিস্ট পার্টির কর্মতৎপরতা শুরু হলে তিনি ঝুঁকি নিয়ে আমাকে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের সঙ্গে কাজ করতে উৎসাহিত করতেন। দূরে সভা হলে আমার হেঁটে যেতে কষ্ট হত। তখন বাস রিকশা ছিল না। তিনি অনেক সময় [আমাকে] ঘাড়ে করে সভাস্থানে পৌঁছে দিয়ে আসতেন। আমার দুই পাঁচ মিনিট বক্তৃতা শোনার জন্য তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতেন। সভা শেষ হলে সঙ্গে করে নিয়ে আসতেন। হাঁটতে অসুবিধে হলে ঘাড়ে করে তুলে নিতে হত।’

একটা কথা পরিষ্কার। আহমদ ছফার রাষ্ট্রচিন্তার গোড়ায় পিতাজির একটা ঋণ ছিলই। এই ঋণ কেহ শোধ করার জন্য করে না। আহমদ ছফা তাহা শোধ করিয়াছিলেন জেল খাটিয়া। তিনি লিখিয়াছেন, ‘এই সময়ে আমাদের পরিবারে আরো একটা বিপর্যয় ঘটে যায়। পুকুরের পেছনের ঘাটে পা ফসকে গিয়ে [তিনি] সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যান এবং পঙ্গু অবস্থাতেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। সেই সময়ে আমি জেলে ছিলাম।’

এইবার ভাইয়ের ঋণ প্রসঙ্গ। আহমদ ছফার একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সৎভাই ছিলেন। তিনি ছিলেন শারীরিক কারণে রাতকানা। রাতকানা হওয়াই, দুর্ভাগ্যের মধ্যে, উঁহার একমাত্র দোষ ছিল না। তিনি এমনিতেও ছিলেন একটি আমড়া কাঠের ঢেঁকি বিশেষ। আহমদ ছফার নিজের কথায় বলি, ‘আমার অপদার্থ ভাইটির অনেক দোষ ছিল। ব্যবসা করলে গুনাহগারি দিতেন, মামলা করলে হারতেন, কিন্তু একটা জায়গায় অন্তরের বিশ্বাস ধ্রুব-নক্ষত্রের মত স্থির ছিল।’

কি সেই বিশ্বাস? আহমদ ছফা বয়ান করিতেছেন, ‘কি কারণে জানিনে তিনি বিশ্বাস করতেন আমি একজন বাঘের মত মানুষ। আমি তার অবর্তমানে পরিবারের সম্মান রক্ষা করব, ছেলেমেয়েদের মানুষ করব। মজার কথা হল তিনি অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করতেন এসব অলৌকিক কাণ্ড ঘটাবার ক্ষমতা আমার আছে। আমার বোকাসোকা ভাইটির মৃত্যুকালীন বিশ্বাসের সম্মোহনী শক্তিতে আমি অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম।’ আহা! ভাই বলে একটা কথা বাংলা ভাষায়ও আছে। ফকির আফতাবউদ্দিন না হোন, তবুও ভাই তো!

‘ছোটবেলা থেকেই,‘ আহমদ ছফা আরো জানাইতেছেন, ‘আমি অল্পস্বল্প লেখালেখি করতাম। এইজন্য পাড়ার মানুষ আমাকে ঠাট্টা করত, ভ্যাঙ্গাত। আমার ভাইটি তাদের সঙ্গে মারামারি করত এবং অনেক সময় নিজে জখম হত।’

ভ্রাতৃচরিত্র বিশদ করিবার ছলে আহমদ ছফা নিজের জীবনসাধনার গোড়ায় হাত দিয়েছেন এইভাবে:

‘সন্ধ্যা অন্ধতার কারণে বেশিদূর লেখাপড়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তিনি পদ্মাবতী, শহীদে কারবালা, সয়ফুল মুল্লুক বদিউজ্জামানের নির্বাচিত অংশ মুখস্থ গান করে পড়তেন। আমাদের চট্টগ্রামের বিরাট একটা অংশ মনে করত ‘আলাওল’ শব্দের অর্থ কবি। কেউ কবিতা লিখতে চেষ্টা করলে লোকে ঠাট্টা করে বলত অমুকের ছাওয়াল আলাওল বনার চেষ্টা করছে। আমার বড় ভাই মনে করতেন আমি একজন সত্যিকারের আলাওল। যে সব লোক আলাওল হয়, তারা সামান্য নয়, একেকজন নবী-পয়গম্বরের মত মানুষ।’

আমরা জানি– আশা করি আহমদ ছফাও এখানে আমাদের দলভুক্ত– আমাদের যুগে আর কোন নবী বা পয়গম্বর জন্মাইবেন না। এসলাম ধর্মের প্রবর্তক শেষ নবী হজরত মোহাম্মদের পবিত্র নামের কাছে আমরা আর কিছু না হৌক অন্তত এই একটি কারণেই কৃতজ্ঞ থাকিতে পারি। তিনি জানাইয়াছেন তাঁহার পরে আর কোন নবী বা পয়গম্বর আসিবেন না।

মানবজাতির শৈশবদোষ কাটিয়া গিয়াছে। আলহামদুলিল্লাহ! আহমদ ছফার সাধনা বিফলে যায় নাই। তাঁহার ভ্রাতার মৃত্যুকালীন বিশ্বাসও ব্যর্থ হয় নাই। আমাদের দেশে আহমদ ছফার তুলনা দিবার মতন দ্বিতীয় কোন মানুষ আজও পাওয়া যাইতেছে না।

আমার ক্ষমতায় নাই আহমদ ছফার যোগ্য প্রাপ্য প্রশংসা লিখি। তাই গঙ্গাজলেই এই গঙ্গাপুজার আয়োজন। আহমদ ছফা স্বয়ং লিখিয়াছিলেন, ‘মানুষ পর্বতও নয়, সমুদ্রও নয়। তথাপি জন্ম এবং মৃত্যুর সীমানা দিয়ে ঢাকা কোন কোন মানুষের জীবনের সাধনা থেকে [এমন] অমৃতলহরী এমন উচ্ছ্বসিত ধারা উচ্ছ্রিত হতে থাকে, যার স্পর্শে জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভগ্নাংশগুলো অনন্ত সময়ের দোলায় দোলায়িত হয়। সে ধরনের মানুষদের সম্পর্কে মন্তব্য করায় অতিশয়োক্তি স্পষ্টতই প্রশ্রয় পেয়ে যায়।’

কিন্তু আমার জ্ঞান যতদূর যায় দেখিতে পাই আহমদ ছফা সম্পর্কে আজ পর্যন্ত কাহারও কোন উক্তিই অতিশয়োক্তি প্রমাণিত হয় নাই।

আমি বলিতেছিলাম আহমদ ছফার সকল চিন্তার, সকল শিল্পের, সকল সাধনার মূলে ছিল তাঁহার রাষ্ট্রচিন্তা। অবশ্য রাষ্ট্র বলিতে নিছক রাষ্ট্রযন্ত্র বুঝিলে চলিবে না, রাষ্ট্রের অন্তরও বুঝিতে হইবে। রাষ্ট্রের অন্তর কি বস্তু? এই প্রশ্নের উত্তর আহমদ ছফা দিয়াছেন– সর্বসাধারণই রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রাণ, তাহার অন্তর। ইহার সহিত আহমদ ছফার বর্ণিত আলাউদ্দিন খানের স্বপ্নের মিল আছে। আহমদ ছফা বিবরণটা এইভাবে লিখিয়াছেন:

‘অপরাধ বোধটুকু কাটিয়ে ওঠার জন্য খান সাহেব অপেক্ষাকৃত উচ্চকণ্ঠে মদিনা বেগমকে বললেন, শুন আজ খোয়াবে বড়দার লগে দেহা হইল। তাইনে আমারে কইলেন, আলম অহন তোমার আসল সঙ্গীত শিক্ষার সময় অইছে। আমি কইলাম, বড়দা একটু বুঝাইয়া কন। বড়দা হাতের সারেঙ্গিখানা ঘুরাইয়া এমন এক সুর বাজাইলেন, সে রকম সুর আমি কুনোদিন কোথাও শুনি নাই। শরীর মন একেবারে ঠাণ্ডা অইয়া জুড়াইয়া যায়। আমি কইলাম, বড়দা এইটা কোন রাগ বাজাইলেন। বড়দায় কইল, এই রাগের নাম নাই। সঙ্গীত তো মহাসাগর। যে মাঝি যতদূর নাও লইয়া গেছে, একস্থানে নাও লাগাইয়া থুইছে। তানসেনের সেই কথাটা একবার মনে কইর‌্যা দেখ, সঙ্গীত এমন অমৃত সাগর, কোন মানুষ সেই সমুদ্রে পাড়ি দিবে, কেমন কইর‌্যা, স্বয়ং দেবী সরস্বতী বুকের কাছে তানপুরাখান ধইরা রাখছেন। তাইনের ভয়, হাতে তানপুরাখান না থাকলে তাইনে রসের সমুদ্রে ভাইস্যা যাইবেন। খান সাহেব বললেন, বড়দা আসল কথা কইছেন। যেই জিনিসটা বাজাইলেন, আমারে শিখাইয়া দেন, একটু দাঁড়ান আমি যন্তরখানা নিয়া আসি। বড়দা কইলেন, আলম তামাম জীবন তো বস্তু বাজাইলি এইবার অন্তরখানা বাজা। আমি বললাম, বড়দা কেমনে অন্তর বাজাইতে অয়, শিখায়া দেন। বড়দা কইলেন, আচ্ছা।’

আহমদ ছফার এই উপলব্ধির সহিত আধুনিক অথবা নয়া গণতন্ত্রবাদের প্রথম গুরু পুরানা জমানার ইতালিদেশের রাষ্ট্রচিন্তাবিদ নিকোলো মেকিয়াভেলির বক্তব্যের মিলও আমি ষোল আনা খুঁজিয়া পাইতেছি। মেকিয়াভেলি দুইটা জিনিশের উপর সমান গুরুত্ব আরোপ করিতেন। এক নম্বরে থাকা চাই রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রনায়ক। দুই নম্বরে চাই সক্রিয় জাতীয় সমাজ বা সর্বসাধারণ। তাঁহার বিখ্যাত বইটির নাম ‘রাষ্ট্রনায়ক’ হইলেও সেই বইয়ের পাতায় পাতায় তিনি আহাজারি করিতেছেন ইতালির জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষা ও গৌরব– অর্থাৎ হারানো সম্মান– পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বজনসাধারণকে রাজনীতিতে টানিয়া আনিতে হইবে। রাষ্ট্রনায়কের নিকট দাবি জানাইতেছেন অভিজাত বা সামন্তপ্রভুদের উপর ভর না করিয়া জনসাধারণের উপর নির্ভর করিতে হইবে।

একথা মিথ্যা নহে যে বিংশ শতাব্দীর ইতালিতে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা আন্তনিয়ো গ্রামসি মেকিয়াভেলির লেখা পড়িয়া এই সত্য পুনরাবিষ্কার করিয়াছিলেন। মেকিয়াভেলিকে তিনি তাই ‘সময়ের আগে জন্মানো বিপ্লবী’ বা ‘ইঁচড়ে পাকা জাকোবাঁ’ উপাধি দিয়াছিলেন। গ্রামসির পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া কেহ যদি আহমদ ছফাকেও ‘সময়ের আগে জন্মানো নয়া গণতন্ত্রবাদী’ বলেন আপত্তি করা যাইবে না।

রাষ্ট্র কিংবা রাষ্ট্রনায়ক বলিতে কি বুঝায় তাহার সামান্য ইশারা আমরা ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আহমদ ছফা’ নিবন্ধে খানিক দিয়াছি। এখানে শুদ্ধ জনসাধারণ বলিতে আহমদ ছফা কি বুঝিতেন তাহার একটি মাত্র সাক্ষ্য হাজির করি। ১৯৭১ সালের গোড়ার দিকে যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করিল তখন এই দেশের হাজার হাজার নহে, লাখ লাখ মানুষ হয় অস্ত্র হাতে প্রতিরোধ সংগ্রামে জড়াইয়া পড়ে, নয় এক কাপড়ে দেশ ছাড়িয়া যায়। ইংরেজি ১৯৭২ সালের গোড়ায় প্রকাশিত একটি ছোটগল্পে আহমদ ছফা তাহার বিবরণ কিছু পরিমাণ হইলেও দিয়াছেন। গল্পটির নাম ‘পাথেয়’। গল্পটার শুরু এইভাবে।

‘মানুষের স্রোতটা এঁকেবেঁকে আলপথ ধরে, বোরো ক্ষেতের উপর দিয়ে, ঝোপঝাড়ের ভিতর দিয়ে, চৌদ্দপুরুষের বাস্তুভিটের মায়া কাটিয়ে শিকারিতাড়িত একপাল ভীতসন্ত্রস্ত পশুর মতো পালিয়ে আসছে। যতই সামনে যায় সংখ্যা বাড়ে। একটু জিরোয় মাঝেমধ্যে। জিরোয় না, আত্মীয়স্বজন, মাবাপ, ছেলেমেয়ে কে এলো, কে এলো না, কে জন্মের মতো গেলো ভাবতে চেষ্টা করে। গুলিগোলার আওয়াজ আর আত্মীয়স্বজনের টাটকা লাল রক্তের স্মৃতি আবার তাড়া করে। মানুষগুলো আবার হাঁটে–সোজা পথে নয়। বাঁকা চোরা ঘুপচি ঘাপচি জংলা পথ বেছে নেয়। প্রাণের মায়া বড়ো মায়া।

পাকিস্তানি বিমান হইতে বোমা ফেলা হইতেছে, গুলিবর্ষণ চলিতেছে। আর শরণার্থীর দল পথের মধ্যে দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া দেখিতেছে।

সত্যি সত্যি চারটি এরোপ্লেন দেখা গেলো। প্রথমে চারটি সাদা বিন্দুর মতো দেখাচ্ছিলো। নীচের দিকে নামলে সমস্ত গতরটা দেখা গেলো। বোঁ বোঁ চক্কর দিয়ে ঘুরছে। প্যাট প্যাট করে মেশিনগানের গুলি ফুটছে। একবার ওপরে উঠছে আবার শিকারি বাজের মতো ছোঁ মেরে নিচে নামছে। মাঝে মাঝে দ্রƒম দ্রƒম শব্দ হচ্ছে–ওগুলো বোমা। আতঙ্কিত মানুষগুলো আবার পা চালিয়ে দিল। আকাশ থেকে মৃত্যু ছুঁড়ে দিলো পাকিস্তানি সৈন্য। বেশি দূর যেতে হল না’।

এই মানুষগুলো কে? কে তাঁহারা? আহমদ ছফা লিখিতেছেন:

‘যে সমস্ত মানুষ জন্মের জন্য দায়ী নয়– অথবা রাজনীতির জন্য দায়ী নয়– অর্থাৎ যুগ যুগ ধরে মুসলমান এবং দেশের হালচাল নিয়ে মাথা ঘামায়নি, মাটি– নরম জলে ভেজা বাংলাদেশের মাটি– গাছের মতো আঁকড়ে ছিল তারাও আশপাশের গ্রামগুলো থেকে গরুবাছুর ধানচাল, কাঁথাবালিশ, হাতের কাছে যা পেয়েছে নিয়ে দলে দলে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বাসাভাঙ্গা পাখীর মত বেরিয়ে, বিল মাড়িয়ে রেলের লাইনের দিকে ছুটে আসছে।

আরেক জায়গায় পড়ি।

‘মানুষগুলো সামনে যাচ্ছে। দেশগেরামের স্মৃতিচিহ্ন অন্তর থেকে মুছে ফেলেছে, জন্মভূমির ছবি দৃষ্টি থেকে মুছে ফেলেছে। চারদিকে মৃত্যু জাল পেতেছে। তারই মধ্য দিয়ে তারা হাঁটছে। কান পাতলে শোনে কামানের গর্জন। চোখ মেললে আগুনের শিখা দাউ দাউ নাচে, আত্মীয় স্বজনের রক্ত লাল হয়ে জেগে থাকে। তবু প্রাণের দায়। মানুষগুলো হাঁটছে। চারদিক থেকে বৃত্তাকারে লোহার সাঁড়াশির মতো ভয়ঙ্কর মৃত্যু, করুণ পাইকারী মৃত্যু দ্রুত তাদের ঘিরে ফেলছে। তাই তারা যাচ্ছে, ভিটেমাটি ছেড়ে, দেশগেরাম ছেড়ে, মাতৃভূমির আঁচল ছেড়ে, নাড়িকাটা ভূমি ছেড়ে। জীবন ভারী সুন্দর। বড়ো মধুর এই বেঁচে থাকা। কোথায় জীবনের উপর মেলে দেয়া সে শান্ত সুন্দর ছায়া।’

আরো একটু। ‘দুঃখের কথা কয়ে লাভ নেই, কষ্টের কথা বয়ান করে লাভ নেই, চৌদ্দপুরুষের ভিটেমাটির জন্য চোখের জল ফেলে কি হবে। সব তো গেছে। এখন প্রাণ নিয়ে চলো। মানুষগুলো পা চালায়। কেউ কাউকে তাড়া দেয় না। কোথায় যাবে কোন পথ দিয়ে যাবে কারো কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। শুধু জানে বর্ডার পেরিয়ে আগরতলায় ঢুকতে হবে। তারপরে কি হবে, কি হবে তারপরে কেউ কিছু জানে না। সব অদৃষ্ট, অদৃষ্টের ফের।’

কেহ যদি বলেন আহমদ ছফা কোন কিসিমের রাষ্ট্রচিন্তাবিদ বুঝিতে পারিলাম না, তাহাকে বলিব, মিনতি করিয়া বলিব নিজের মুখেই ঝাল খাইয়া দেখিবেন। পরের কথায় কান দিবার পরিণতি সব সময় ভাল হয় না।

যাঁহারা মনে করেন ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ’ কি ‘তত্ত্ববিদ’ কি– খোদার কসম– ‘কবি’ হইতে হইলে মুখে ইংরেজি ভাষায় যাহাকে বলে সোনার চামচ ও রুপার চামচ লইয়া জন্মাইতে হইবে তাঁহারা অভিজাত শ্রেণির বা উচ্চবর্ণের মানুষ। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান সাহেবকে যে সমস্ত গোষ্ঠীর রক্ষণশীল মনোভাব বা একচেটিয়া ব্যবসায়ের অবসান ঘটাইবার জন্য জীবনভর সংগ্রাম করিতে হইয়াছিল ইঁহারাও দেশকালের ভেদটা তুচ্ছ করিলে সেই শ্রেণির বা গোষ্ঠীরই সদস্য।

যে সমস্ত সমাজে বর্ণবিভাজন, জাতিবিদ্বেষ কিংবা শ্রেণিভেদ অদ্যাবধি বিরাজমান সেই সকল সমাজে আমরা যতদূর জানি রাষ্ট্রক্ষমতা আজও অভিজাত শ্রেণি, পুণ্যবান পুরোহিত কিংবা উচ্চবর্ণের হাতে আছে। শুদ্ধ রাষ্ট্রক্ষমতায় নহে রাষ্ট্রচিন্তায়ও তাঁহারা একচেটিয়া অধিকার হাতছাড়া করিতে চাহেন না। আভিজাত্যের বড়াই কখনো ধনদৌলতের রূপান্তর বিশেষ। কখনো তাহা মেধা প্রতিভা ও মনীষার পাটাতনে দাঁড়ায়। আমাদের দেশেও এই নতুন আভিজাত্য দেখা দিয়াছে। কোথাও বা নবার্জিত ধনদৌলতের বড়াই আকারে, কোথাও মনীষা প্রতিভা ও মেধার বড়াই আকারে তাহার প্রকাশ দেখা যায়। আহমদ ছফার মতন সর্বসাধারণের সন্তানকে ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ’ বলিলে ইঁহাদের গাত্রদাহ হইবে–তাহাতে বিস্ময়ের কি! কাহিনীটা একটু জায়গা করিয়া বলিতে হইতেছে।

গত ২৮ জুলাই ২০১৩ তারিখ ছিল মহাত্মা আহমদ ছফার ত্রয়োদশ মৃত্যুদিবস। ঐ দিন আমি বহুল প্রচারিত একটি বাংলা দৈনিকে ‘আহমদ ছফার বাংলাদেশ’ নামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ
করি। পরের সপ্তাহে– মানে ৫ আগস্ট– আরেকটি প্রবন্ধ ছাপাই একই পত্রিকায়। নাম রাখি ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংকট: আওয়ামী লীগ পর্ব’। দুই লেখাতেই আমি ছফার রাষ্ট্রচিন্তার পরিচয় যতদূর সম্ভব তুলিয়া ধরি। ইহার পরদিন একটি অনলাইন পত্রিকায় এদেশের স্বনামধন্য কবি ও চিন্তাব্যবসায়ী ফরহাদ মজহার একটি কবিতায় লেখেন, ‘জানালায় উড়ে বসছে আরশোলা, সেও আজ রাষ্ট্রতত্ত্ববিদ’।

ফরহাদ মজহারের এই ব্যবহারে আমি অবাক হই নাই। তাহার পর আমি আরো দুই নিবন্ধ লিখিতে সমর্থ হই। ১৯ আগস্ট লিখি ‘বাংলাদেশের নিয়তি’, আর ২৯ আগস্ট ‘আহমদ ছফার রাষ্ট্রচিন্তা’। শেষমেশ লিখি ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আহমদ ছফা’। আরেকটু পর ‘নতুন জাতির জন্ম’। ইহাদের প্রথমটি ২ সেপ্টেম্বর অনলাইনে স্থান পায় আর শেষেরটি যায় ৮ সেপ্টেম্বর।

এই তালিকাটি দিয়াছি তাঁহাদের জন্যই যাঁহারা জানিতে চাহেন কেন আমি ফরহাদ মজহারের কবিতায় আক্রান্ত চরিত্র বা ব্যক্তির সহিত আহমদ ছফার মিল আবিষ্কার করিয়াছি। কবিতাকার বা কথাশিল্পীর সুবিধা এই যে তিনি আকারে ইঙ্গিতে আঘাত হানিতে পারেন। কিন্তু অন্ধ হইলে তো প্রলয় বন্ধ থাকিবে না। সালমান রুশদি নামক প্রখ্যাত উপন্যাস ব্যবসায়ী কি কাল্পনিক নাম ব্যবহার করিয়া দায়মুক্ত হইতে পারিয়াছেন?

ফরহাদ মজহারের কবিতাটি কেবল আহমদ ছফার উদ্দেশে রচিত তাহা আমার বক্তব্য নহে। এই কবিতার ইঙ্গিত যদি আমি ভুল না বুঝিয়া থাকি তবে তাহা এই যে সমাজের নিচুশ্রেণির বা নিচুতলার মানুষের পক্ষে রাষ্ট্রচিন্তা বেমানান। এই কবিতার এক জায়গায় তিনি যেমন কহিয়াছেন, ‘জানালায় উড়ে বসছে আরশোলা, সেও আজ রাষ্ট্রচিন্তাবিদ’, তেমনি আরেক জায়গায়– খানিক আগাইয়া– জিজ্ঞাসিয়াছেন ‘চামচিকা তত্ত্ববিদ?’ অনেক রূপান্তর, হরেক মেটাফর তিনি এস্তেমাল করিয়াছেন। মানুষ যাহাদিগকে ‘ইতর প্রাণী’ বলিয়া অবজ্ঞা করে তিনি তাহাদের স্থান দিয়াছেন ঘৃণার ভাষায়।

ঘৃণা মানুষকে কোথায় লইয়া যায় তাহার হিশাব করা মুশকিল। জার্মানদেশের পুরানা তত্ত্ববিদ হেগেল বলিতেন আথেনা ওরফে মিনার্বাদেবির পেঁচা কেবল সন্ধ্যারাতেই উড়াল দিয়া থাকে অর্থাৎ ইতিহাসের ঘটনা ঘটিয়া যাইবার পর মাত্র তাহার চৈতন্যোদয় হয়। গ্রিক পুরাণে অন্ধ পুরুষ তেইরেসিয়াস ত্রিকালদর্শী বটে। চামচিকা বা বাদুড়ও রাত্রেই কেবল দেখে। অথচ ফরহাদ মজহার বেমক্কা লিখিয়াছেন:

‘চামচিকা তত্ত্ববিদ? কী দোষে যে তারা দিনে কিছুই দেখে না
তবুও তাদের ধার্য অন্ধকারে উড়বার বিশিষ্ট সময়।’

আমাদের দেশের প্রধান ভাষা বাংলা। এই ভাষায় ‘কুত্তার বাচ্চা’ কথাটা একটা গালি আর ‘বাঘের বাচ্চা’ পদটি বাহবা বাহবা বলিবার পর বলা হয়। ফরহাদ মজহারও যে শ্রেণির চরিত্রদের পছন্দ করেন না তাহাদের স্থলে বলিয়াছেন ‘নেড়িকুত্তা’ আর যে চরিত্র তাঁহার আপনকার অহম বৈ নহে তাহাকে বলিয়াছেন ‘বাঘের বাচ্চা’। তিনি লিখিয়াছেন, ‘আমি শুধু লিখে যাব বাঘের বাচ্চার মতো জিহ্বা হ্রস্ব করে/ দুধে তৈরী দাঁত গুলো গুটিয়ে …’।

নিজেকে ‘বাঘের বাচ্চা’ আর অপরকে ‘নেড়িকুত্তা’ বলার মধ্যে শুদ্ধ পুরানা কথার পুনরাবৃত্তিই আছে বলিলে সব বলা হইবে না। এই অলঙ্কারের মধ্যে যে চিন্তার বৈভব প্রকাশ পাইতেছে তাহা কিছু পরিমাণে নতুন তো বটেই। অভিজাত শ্রেণি চিরকালই আভিজাত্যের বড়াই করিয়াছে। কিন্তু যে যুগে অভিজাত শ্রেণির রাষ্ট্রক্ষমতা নড়বড়ে, যেখানে তাহাকে নতুন শাসকশ্রেণির হাতে ক্ষমতার বিশেষ অঙ্গটি ছাড়িয়া দিতে হয় সে যুগে আসিয়াও যখন সে সেই পুরানা অভিজাত্যের গর্বই করে তখন তাহা বিশেষ ব্যঙ্গের রূপ গ্রহণ করে।

বুর্জোয়াশ্রেণির যুগে সামন্ত প্রভুর মতন ক্ষমতাবান হওয়ার ইচ্ছাকেই এয়ুরোপিয়া রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে ‘ফ্যাসিতন্ত্র’ বলা হইয়াছে। ইতালিতে মুসোলিনির দলের নাম আর জার্মানিতে হিটলারের দলের নাম ভিন্ন। কিন্তু তাহাদের অভিন্ন চিন্তাকেই আমরা এতদিনে ‘ফ্যাসিতন্ত্র’ বা ‘ফ্যাসিবাদ’ বলিয়া চিনিতেছি। কথাটা নিছক গালি নহে, একটা ছকের বিবরণ মাত্র। এতদিনে তাহা যদি গালির পর্যায়ে উন্নীত হইয়া থাকে তাহার জন্য আমরা দায়ী নহি।

ফরহাদ মজহারের আলোচ্য কবিতার ভাষা যে আপাদমস্তক ফ্যাসিতন্ত্রের বার্তা বহন করিতেছে তাহাতে কাহারও সংশয় থাকিলে অনুরোধ করিব শুদ্ধমাত্র শেষ অনুচ্ছেদটি পড়িবেন। তিনি এলান করিতেছেন:

‘অক্ষয় আমার কাব্য শহরের জঙ্গলে শেষ রাত্রে অক্ষয় আহ্বান
জানাবেন যিনি তাঁর পাগড়ি আলোকপ্রাপ্ত জোৎস্নার মুক্তায়
শিবানির স্বামী তিনি আল্লার মোয়াজ্জিন এ কালাম ভোরের আগেই
কোন রক্তপাত ছাড়া তাঁকেই দাখিল করব, ইনশাল্লাহ, তাঁরই উসিলায়।’

নিজের কবিতাকে অক্ষয় মনে করিতে যে কোন কবিই পারেন। তাহা লৌকিক। তাহাতে দোষের বিষয় নাই। কিন্তু তাহার সহিত যখন অলৌকিক মাজেজা বা ‘তন্ত্র’ আসিয়া যুক্ত হয় তখন ফ্যাসিতন্ত্র সরব হইয়া উঠে। কথাগুলি আমার রচিত নহে। বাল্টার বেনিয়ামিন নামক বিখ্যাত তত্ত্ববিদ কথাটা এইভাবে বলিয়াছিলেন। আমি জার্মান মূলের বাংলা ভাবানুবাদ দিতেছি।

বেনিয়ামিন বলিতেছেন সমাজের গোড়া বা উৎপাদন প্রণালিটা যত দ্রুত বদলায় আগা বা ধ্যানধারণার জগতটা তত দ্রুত বদলাইতে পারে না। ইংরেজি বিংশ শতাব্দীর চতুর্থ দশকে লিখিতে বসিয়া তিনি সময়ের ঢেউ গুনিতেছিলেন। তাঁহার গণনায় দেখা যায় ধ্যানধারণার জগৎ গোড়াকার ঘটনার অন্তত অর্ধশতাব্দী পিছনে পড়িয়া রহিয়াছে। কিন্তু বেনিয়ামিনের দাবি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের তত্ত্ববিদদের কয়েকটি বিষয়ের খবর আগাম রাখিতে হইবে। যেমন গণতন্ত্রের দাবি সর্বজনীন হওয়ায় শিল্পকলার ক্ষেত্রেও কয়েকটি প্রচলিত ধারণা প্রশ্নের মুখামুখি হইতেছে।

বেনিয়ামিন চারিটি প্রচলিত ধারণার কথা বলিয়াছেন। ইহাদের মধ্যে পড়িতেছে ‘ঐশ্বরিক ক্ষমতা’ ও ‘অলৌকিক প্রতিভা’ আর ‘অক্ষয় কাব্য’ বা ‘চিরকেলে বাণী’ ওরফে ‘কালাম’ এবং (চোখের মণির মত সযত্নে গোপন রাখা) ‘মরমি রহস্য’। বেনিয়ামিনের মতে এই চিরাচরিত ধ্যানধারণাগুলির বেপরোয়া ব্যবহার ইতিহাসের ঘটনাবলিকে এমনভাবে সাজায় যাহাতে ফ্যাসিতন্ত্রের পথ পরিষ্কার হইতে থাকে। ইহার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার গুরুত্ব কম করিয়া দেখার কোন উপায় নাই।

ফরহাদ মজহারের এই ঘোষণাপত্রের মধ্যে আমি এই পুরাতন, পরিত্যক্ত ধ্যানধারণার বেপরোয়া ব্যবহার দেখিয়া স্বভাবতই মুগ্ধ হই নাই। সত্য বলিতে ব্যথিতই হইয়াছি। তাঁহার কবিতা লিখিবার ক্ষমতা আছে– এ সত্যে সন্দেহ নাই। অতীতে তাঁহার কাব্যের যতদূর বুঝি প্রশংসা করিতে আমি কুণ্ঠিত হই নাই। দুঃখের মধ্যে তিনি কবিতায় ফ্যাসিতন্ত্রের এহেন বন্দনা করিবেন– অন্তত বাল্টার বেনিয়ামিন কথিত ফ্যাসিতন্ত্রের আলামত মোতাবেক ফ্যাসিতন্ত্রের এহেন নকিব হইয়া উঠিবেন– তাহা আগে ভাবিয়া দেখি নাই। আজ আমাকেও দেখিতে হইল। নিজের কাব্যকে তিনি শুদ্ধমাত্র ‘অক্ষয়’ বলিয়া ক্লান্ত হইলেন না, তাহাকে গূঢ় মরমি ভাষার আশ্রয়ে বলিলেন ‘কালাম’ বিশেষও। এই ধরনের হর্ষকাম বা বেপরোয়া ব্যবহারকেই বেনিয়ামিন ফ্যাসিতন্ত্রের পথপ্রদর্শক বলিয়া হুঁশিয়ার করিয়াছিলেন।

এই স্বাধীনতা ব্যবসায়ী বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক রক্তপাত হইয়াছে সন্দেহ নাই। ইতিহাস দেবতা হয়তো আরো রক্ত দাবি করিতেছেন। ফরহাদ মজহার আশ্বাস দিয়াছেন ‘রক্তপাত ছাড়াই’ তাঁহার ‘কালাম’ দাখিল করা হইবে। ইহা ঠাকুরঘরের কলা কিনা জানি না। কিন্তু একটি বিষয়ে আমাদের সন্দেহ নাই। ফরহাদ মজহারের কবিতা আর কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা এই প্রশ্নে মুখামুখি দাঁড়াইয়া আছে। নজরুল ইসলামের কবিতা যদি হয় ‘গণতন্ত্র’ পথের পথিক, ফরহাদ মজহারের কবিতা তাঁহার সমস্ত ‘কালাম’ লইয়া ফ্যাসিতন্ত্রের নিশানবরদার।

এই নিবন্ধ এতটা দীর্ঘ হইবে ভাবি নাই। তবু তামাম শুদ করিবার আগে কাজী নজরুল ইসলাম ওরফে ‘মহাবিদ্রোহী’ কবির ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতাটির একটি থোকা আবৃত্তি করিব।

‘বন্ধু গো আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে!
দেখিয়া শুনিয়া খেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে ॥
রক্ত ঝরাতে পারি না তো একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা।
বড় কথা বড় ভাব আসে নাকো মাথায়, বন্ধু, বড় দুঃখে!
অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছো সুখে!’

নজরুল ইসলাম যে অমর কাব্য লিখিতে পারেন নাই, হইতে পারে ফরহাদ মজহার সেই অমর কাব্যই লিখিতেছেন। ফরহাদ মজহারের বাণী চিরকালের বাণী। তাঁহার কবিতা অভিজাত শ্রেণির জোৎস্নার মুক্তায় আলোকপ্রাপ্ত পাগড়ির ন্যায় শোভা পাইবে। আর কাজী নজরুল ইসলামের নাম একদিন না একদিন লোকে ভুলিয়া যাইবে।

কে জানে আহমদ ছফার কি হইবে?

টিকা

১. ‘Né voglio sia reputata presunzione se uno uomo di basso ed infimo stato ardisce discorrere e regolare e’ governi de’ principi; perché, così come colore che disegnano e’ paesi si pongono bassi nel piano a considerare la natura dé monti e dé luoghi alti, e per considerare quella dé bassi si pongono alti sopra é monti, similmente, a conoscere bene la natura de’ populi, bisogna essere principe, e a conoscere bene quella de’ principi, bisogna essere populare.’

— Niccolo Machiavelli, Il Principe

২. ‘Darum wäre es falsch, den Kampfwert solcher Thesen zu unterschätzen. Sie setzen eine Anzahl überkommener Begriffe – wie Schöpfertum und Genialität, Ewigkeitswert und Geheimnis – beiseife – Begriffe, deren unkontrollierte (und augenblicklich schwer kontrollierbare) Anwendung zur Verarbeitung des Tatsachenmaterials in faschistischem Sinn führt.’

— Walter Benjamin, ‘Das Kunstwerk im Zeitalter seiner technischen Reproduzierbarkeit’

দোহাই

১. কাজী নজরুল ইসলাম, ‘আমার কৈফিয়ত’ [‘সর্বহারা’], নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ, খ- ২, পুনর্মুদ্রণ (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ২০১১), ১২৭-৩১।

২. সলিমুল্লাহ খান, ‘আহমদ ছফার বাংলাদেশ,’ বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৮ জুলাই ২০১৩।

৩. — ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংকট: আওয়ামী লীগ পর্ব,’ বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৫ আগস্ট ২০১৩।

৪. — ‘বাংলাদেশের নিয়তি,’ বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৯ আগস্ট ২০১৩।

৫. — ‘আহমদ ছফার রাষ্ট্রচিন্তা,’ বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৯ আগস্ট ২০১৩।

৬. — ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আহমদ ছফা,’ বিডিনিউজ২৪ডটকম, ২ সেপ্টেম্বর ২০১৩।

৭. — ‘নতুন জাতির জন্ম,’ বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩।

৮. আহমদ ছফা, ‘সুরসম্রাটের মৃত্যুস্বপ্ন,’ আহমদ ছফা রচনাবলি, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত, খ- ৮ (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮), ৪৪৯-৬১।

৯. — ‘আচার্য আলাউদ্দিন খান’ [‘উপলক্ষের লেখা’], আহমদ ছফা রচনাবলি, খ- ৪, ১১৫-১৭।

১০. — ‘রোগশয্যায় বিরচিত’ [‘উপলক্ষের লেখা’], আহমদ ছফা রচনাবলি, খ- ৪, ২১০-২৮।

১১. — ‘পাথেয়,’ বাঙলাদেশ লেখক শিবির সম্পাদিত, হে স্বদেশ: গল্প (ঢাকা: বাঙলা একাডেমী, ১৯৭২), ১৩৮-৪৮।

১২. — ‘আমি যদি পুরো জীবন ব্যয় করে একটা উপন্যাস লিখতে পারতাম,’ রাজু আলাউদ্দিন সম্পাদিত, আলাপচারিতা: রাজনীতি, সংস্কৃতি, সমাজ ও সাহিত্য বিষয়ক সাক্ষাৎকার (ঢাকা: পাঠক সমাবেশ, ২০১৩), ২১১-২৪।

১৩. ফরহাদ মজহার, ‘ইস্পাতের ঠোঁট,’ পরিবর্তনডটকম, ৬ আগস্ট ২০১৩।

১৪. Walter Benjamin, ‘Das Kunstwerk im Zeitalter seiner technischen Reproduzierbarkeit’ [The Work of Art in the Age of its Technological Reproducibility], in Illuminationen [Illuminations], Ausgewählte Schriften 1 (Frankfurt am Main: Suhrkamp, 1977), ss. 136-69.

১৫. Antonio Gramsci, Selections from the Prison Notebooks, trans. Q. Hoare and G. Nowell-Smith, reprint (London: Lawrance & Wishart, 1973).

১৬. Niccolo Machiavelli, ‘Il Principe’ [The Prince], in Tutte le Opere, ed. Mario Martelli (Firenze: Sansoni Editore, 1971), pp. 255-98.

 

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩, bdnews24.com, মতামত বিশ্লেষণ

রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আহমদ ছফা

জীবনের উপসংহারভাগে পৌঁছিয়া মহাত্মা আহমদ ছফা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান সাহেবের উপর একটি উপন্যাস লেখায় হাত দিয়াছিলেন। দুর্ভাগ্যের মধ্যে, তিনি উপন্যাসটি শেষ করিয়া যাইতে পারেন নাই। তবে তাহার একটি অধ্যায় অন্তত তিনি শেষ করিয়াছিলেন।

শেষ করিয়াছিলেন শুদ্ধ লিখিয়াই নহে। ছাপাইয়াও। ‘সুরসম্রাটের মৃত্যুস্বপ্ন’ নাম রাখিয়া ‘রোববার’ নামক একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় তাহা ছাপাও হয়। ছাপা অংশটি পড়িয়া রাজু আলাউদ্দিন মন্তব্য করিয়াছিলেন, “সঙ্গীত সম্পর্কে খুব গভীর ধারণা না থাকলে ওটা লেখা সম্ভব নয়।’’

সেই খণ্ডাংশের একটি অংশ এই রকম। একটা স্বপ্ন দেখিয়া অসুস্থ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের নিদ্রাভঙ্গ হইল। তখন রাত তিনটা বাজিয়াছে। বড় অশক্ত শরীর তাঁহার, পাশ ফিরিতে কষ্ট হয়। তিনি স্বপ্ন দেখিয়াছেন তাঁহার বড় ভাই ফকির আফতাব উদ্দিন সাহেব স্বপ্নযোগে তাঁহাকে একটি আদেশ দিয়াছেন, “আলম, তামাম জিন্দেগি তোম যন্তর বাজায়া, আভি আপনা অন্তর বাজাও।’’

তখন তিনি আপনার অন্তর বাজানোর কোশেস করিতেছিলেন। সেই রাগ তাঁহার গুণবতী বিদুষী কন্যা অন্নপূর্ণারও অচেনা। আলাউদ্দিন খান আপনার অন্তর বাজাইতেছেন। আহমদ ছফা লিখিতেছেন, “আলাউদ্দিন খান সাহেব যন্ত্রের তারে টোকা দিচ্ছিলেন। আর প্রতি আওয়াজে আনন্দের স্ফুলিঙ্গ বেরিয়ে আসছিল। আর আগুন থেকে একটা আনন্দধারা নির্গত হয়ে চরাচর ভাসিয়ে দিয়ে এল। অন্নপূর্ণার হাসতে ইচ্ছে হল, কাঁদতে ইচ্ছে হল, নাচতে ইচ্ছে হল। তাঁর সমস্ত ইন্দ্রিয় সুরের বশীভূত হয়ে পড়েছে।”

সেই সময় সুরসম্রাটের সহধর্মিনী মদিনা বেগম বাটির বাহিরে দাঁড়াইয়া একটা অভিনব জিনিস প্রত্যক্ষ করিতেছিলেন। আহমদ ছফার বর্ণনা মোতাবেক, “আঙ্গিনায় গন্ধরাজ গাছের কলিগুলো তাঁর চোখের সামনে আপনা-আপনি ফুটে উঠতে থাকল। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে এসে বাড়ির চারপাশের গাছে চুপচাপ বসতে থাকল। মদিনা বেগম আরও লক্ষ্য করলেন, তাঁদের বাড়ির আঙ্গিনায় মরা শুকনো দুর্বাঘাসের চাপড় ঠেলে নতুন নতুন তাজা শীষ অলসভাবে উঁকি দিতে আরম্ভ করেছে। মদিনা বেগমের দুই চোখ পানিতে ভরে উঠল। তাঁর ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠল, ওই মানুষকে আর কেউ ধরে রাখতে পারবে না। ফকির আফতাব উদ্দিনের বেশ ধরে সঙ্গীত স্বয়ং তাকে নিয়ে যেতে এসেছে।”

আমার কেন যেন মনে হয় আলাউদ্দিন খানের নামে আহমদ ছফা আসলে নিজের মৃত্যুস্বপ্নটিই দেখিয়াছিলেন। না হইলে তিনি কেন, কী কারণে, প্রথম কিস্তিতেই মৃত্যুদৃশ্যের অধ্যায়টি প্রকাশ করিবেন? সাপ্তাহিক ‘রোববার’ কাগজে ছাপার সময় যে শীর্ষ টিকাটি ছাপা হইয়াছিল তাহাতেও আহমদ ছফা সেই ইঙ্গিতই দিয়াছিলেন বলিয়া মনে হইতেছে।

তিনি লিখিয়াছিলেন, “আমাকে সঙ্গীত সম্রাট আলাউদ্দিন খান সাহেবের ওপর একটি উপন্যাস লেখার জন্যে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র জনাব মোবারক হোসেন খান সাহেব একাধিকবার অনুরোধ করেছিলেন। তাঁর কথা আমি কানে তুলিনি। কারণ স্বপ্নেও আমি ভাবিনি খান সাহেবের উপর একটা উপন্যাস লেখার যোগ্যতা আমার কোনোদিন হবে। তারপর এক রাতে হঠাৎ করে মনে হল খান সাহেবের উপর আস্ত একটি উপন্যাস লেখার ক্ষমতা আমার নেই, সত্য। কিন্তু দুটি অধ্যায় লিখতে পারি। একটা হল তাঁর মৃত্যু এবং অন্য অধ্যায়টা হল খান সাহেবের নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি।”

ছবি : নাসির আলী মামুন
ছবি : নাসির আলী মামুন

‘রোববার’ কাগজে মৃত্যুদৃশ্যের অধ্যায়টি বাহির হইয়াছিল। আহমদ ছফা জানাইয়াছিলেন, ‘অনতিবিলম্বে নিরুদ্দেশ যাত্রার অধ্যায়টিও রচনা করার বাসনা রাখি। আয়ুতে যদি কুলোয়, হয়তো মাঝখানের অধ্যায়গুলো কোনোদিন শেষ করব।’

আহা, আয়ুতে কুলায় নাই।

আমি একটু লম্বাচওড়া উদ্ধৃতিই দিলাম। না দিলে যাহা বলিতেছি তাহা হয়তো বলা যাইবে না। রাজু আলাউদ্দিনের সহিত আলাপের মুহূর্তে তিনি একটু আলাদা কথাই অবশ্য বলিয়াছিলেন। জানাইয়াছিলেন, “তাঁকে নিয়ে উপন্যাস লেখার প্রস্তুতি আমি নিয়ে ফেলেছি। এখন বসলে আমি পনেরো দিনের মধ্যে শেষ করতে পারি।”

রাজু আলাউদ্দিন যেন-বা আপন নামের মহিমায় বলিলেন, “এত অল্প সময়ের মধ্যে এত গভীর লেখা আপনি কীভাবে শেষ করবেন?”

আহমদ ছফা এক্ষণে গোমর ফাঁস করিলেন। বলিলেন, “না, অল্প সময় নয়, এটা ভেতর ভেতর তৈরি, মাথার মধ্যে কাজ করছে হয়তো বারো বছর কি বিশ বছর আগে থেকে।”

রাজু আলাউদ্দিনের সঙ্গে এই আলাপটা ১৯৯৮ সালের ঘটনা। আহমদ ছফা ইহার তিন বছরের মাথায় নিজেও মৃত্যুর সাক্ষাৎ পাইলেন। আহা, আয়ু।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের জীবন উপজীব্য করিয়া উপন্যাস লেখার এই বাসনা কোথা হইতে জন্মাইয়াছিল আহমদ ছফার? ইহার সামান্য উত্তর তিনি নিজেই একটি যোগাইয়াছেন। রাজু আলাউদ্দিনকে উদ্দেশ্য করিয়া আহমদ ছফা বলিলেন, “এই লোকটাকে আমার কাছে খুব … এনিগম্যাটিক মনে হয়।”

‘এনিগম্যাটিক’ মানে কী, এই কথার উত্তরে তিনি আবার বয়ান করিতে লাগিলেন, “.. এই যে হঠাৎ করে একটি কৃষি ব্যাকগ্রাউন্ড (কৃষক সমাজ) থেকে ভারতের ক্লাসিক্যাল মিউজিকের একদম চূড়োয় ওঠা, সেটা আমার কাছে বিস্ময়কর ব্যাপার মনে হয়।”

আমার প্রশ্নের উত্তরও এইখানে (বিশেষ) পাইয়া গেলাম। প্রশ্নটা ছিল, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান যে ধরনের কৃষি ব্যাকগ্রাউন্ড হইতে উঠিয়াছেন, আহমদ ছফাও কি তাহার কম কিংবা অন্য কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড হইতে আসিয়াছেন?

বাকি রহিল সিদ্ধির প্রশ্ন। আলাউদ্দিন খান সাহেব ভারতবর্ষীয় সঙ্গীতের চূড়ায় উঠিয়াছিলেন। কিন্তু আহমদ ছফার জন্য আল্লাহতায়ালা কোন পর্বতের চূড়া নির্ধারণ করিলেন? আমার সবিনয় নিবেদন এই ছোট্ট প্রশ্নটিই। আলাউদ্দিন খান সাহেবের ভিতরে যে আগুন, সুরের আগুন, আহমদ ছফার ভাষায় বলিলে ‘অগ্নি, পবিত্র অগ্নি’ আমরা প্রত্যক্ষ করি তাহা ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

আহমদ ছফা নিছক বিনয়ের অবতার নহেন। তবু তিনি আপন জবানে বলিলেন, “আমি সেই ব্যাখ্যাটা করতে পারব, এই দাবি করাটা বেয়াদবি হবে।”

তারপরও তিনি যোগ করিতে কসুর করিলেন না, “আমি যদি গোটা জীবন ব্যয় করে একটা উপন্যাস লিখতে পারতাম, দ্যাট উডবি এ ওয়ান্ডারফুল থিং [তাহা হইত একটি আশ্চর্য জিনিস]।”

রাজু আলাউদ্দিন জিজ্ঞাসিলেন, তো, তাহা কি আলাউদ্দিন খাঁকে নিয়াই? উত্তরে আহমদ ছফা– বলাবাহুল্য– হ্যাঁ-ই বলিয়াছিলেন।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের কীর্তিতে আহমদ ছফা আপ্লুত হইয়াছিলেন শুদ্ধ সঙ্গীতের খাতে নহে। পূর্ব বাংলার শ্যামলিমায় তাঁহার জন্ম হইয়াছিল বলিয়াও। সঙ্গীতের মধ্যেও আহমদ ছফা সমাজ– বিশেষ বলিতে জাতীয় সমাজ– আবিষ্কার করিয়াছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া হইতে গাছবাড়িয়া কত আর দূরে? আমার বিশ্বাস, আহমদ ছফা সেই দূরত্বও মাপিয়াছিলেন।

আর জাতীয় সমাজের পরাকাষ্ঠা কে না জানে স্বয়ং রাষ্ট্র আকারে দেখা দেয়। জার্মান তত্ত্বচিন্তাবিদ গেয়র্গ হেগেলের দোহাই পাড়িয়া আহমদ ছফা প্রায়ই বলিতেন, কোনো জাতির সবচেয়ে বড় সৃষ্টিকর্ম হইতেছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রকে এই গুরুত্ব দিতেন বলিয়াই তিনি জীবনের পাকাভাগে আসিয়া বুঝিতে পারিলেন, বাংলার গত তিন হাজার বছরের ইতিহাসে শেখ মুজিবের তুলনা নাই। কারণ, “শেখকে আশ্রয় করে এ অঞ্চলের লোক একটি রাষ্ট্র পেয়েছে।”

আহমদ ছফা জাতীয় রাষ্ট্র স্থাপনকে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মনে করিতেন? তিনি বিশ্বাস করিতেন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়াই কোনো জাতি বিশ্ব ইতিহাসে প্রবেশ করার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। সেই জন্যই তিনি শেখ মুজিবের স্থান কোথায় তাহা লইয়া সংশয়ে ভোগেন নাই।

১৯৭৭ সালের দিকে লেখা একটি প্রবন্ধে তিনি লিখিয়াছিলেন, শেখ মুজিব ইতিহাসের স্রষ্টা নহেন, বরং ইতিহাসই তাঁহাকে সৃষ্টি করিয়াছে। সেই বিশ্বাস হইতে তিনি এক পাও নড়েন নাই। তিনি শেখকে ‘বড় মানুষ’ মনে করিলেও কখনও ‘অতিমানুষ’ ভাবেন নাই। ১৯৯১ সালের মাঝামাঝি দেওয়া একটি জবানবন্দীতে তিনি– সঙ্গত কারণেই– বলেন, “শেখকে আশ্রয় করে এ অঞ্চলের লোক একটি রাষ্ট্র পেয়েছে। এটা অস্বীকার করলে নিজের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা হবে। কিন্তু ‘বঙ্গবন্ধু’, ‘জাতির পিতা’ ইত্যাদি বলে অতিশয়োক্তি করতে বিরক্ত লাগে।”

রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করারও একটা ইতিহাস কিন্তু আছে। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিয়াছে, সন্দেহ নাই। কিন্তু ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার জন্যও বাংলাদেশ কম সংগ্রাম করে নাই। বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পিছনে শুদ্ধ ব্রিটিশ পরাধীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের দুইশত বৎসর কেন, তাহার আগেকার পাঁচ কী সাতশত বৎসরের হিন্দুস্তান বা দিল্লিবিরোধী জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াইও তো ভুলিয়া যাইবার ঘটনা নহে। কথাপ্রসঙ্গে ১৯৯২ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলিয়াছিলেন, “আমাদের রাজনীতির বয়স কত? ৩০ বছর? কিন্তু বাংলাদেশের সমাজের বয়স ১০০০ বছর।”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পো ধরিয়া আহমদ ছফাও বলিয়াছেন, রাষ্ট্র যদি সমাজের সবকিছুর উপরে খবরদারি করে তাহার ফল সচরাচর শুভ হয় না। সমাজকেই– মানে রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার পর যে নতুন সমাজ দানা বাঁধে সেই সমাজকে– জাতীয় সমাজকেই ভার দিতে হইবে রাষ্ট্র দেখাশোনার। স্বর্গ হইতে রাষ্ট্র গড়িয়া দিতে কেহ আসিবে না। লন্ডন, পিন্ডি, দিল্লি হইতেও কেহ আসিতে পারিবে না।

আহমদ ছফা বলিতেছেন, “আমাদের নিজেদের মধ্য থেকে একটা রেনেসাঁসের দরকার। এর আগেও এ কাজটি যে করা হয়নি তা নয়। এমনকি [মওলানা] আকরম খাঁ বা [তোফাজ্জল হোসেন] মানিক মিয়া সাহেবও তাঁদের লিমিটেড ক্যাপাসিটি, সীমিত সামর্থ্য থেকে এটা করেছেন। এটা করার জন্য যা দরকার তা হল মাটি ও মানুষের প্রতি আনুগত্য।”

শুদ্ধ রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠাই, দুর্ভাগ্যের মধ্যে, শেষ কথা নহে। মানুষকে উদ্ধুদ্ধ করিবার জন্য প্রচণ্ড মানসিক শক্তিও দরকার। এই মুহূর্তে যাহাকে খবরের কাগজ হইতে শুরু করিয়া ভাড়াটিয়া লেখিকা সকলেই বলেন বিশ্বযোগের ক্ষণ– সেই মুহূর্তে জাতীয় সমাজের দিশাহারা হইবার যোগাড়।

আহমদ ছফা বলিতেছিলেন, “আমাদের উচিত এ সময় একটি জাতীয় মানস তৈরি করা, যাতে করে পৃথিবীর তরঙ্গগুলো আমরা রিসিভ (গ্রহণ) করতে পারি।”

কিন্তু আরও দুর্ভাগ্যের কথা, আমাদের দুই প্রধান নেতা মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিব। আহমদ ছফার আক্ষেপ– আহা, এ দুজনের যদি আধুনিক শিক্ষার আলো থাকত! তিনি ব্যাখ্যা করিতেছেন এইভাবে: “মাওলানা সাহেব ছিলেন ট্রাডিশনাল লিডার (অর্থাৎ মান্দাতার আমলের মানে নেতারা যেমন হইয়া থাকেন তেমন নেতা) আর শেখ সাহেব ছিলেন একেবারে জননন্দিত ব্যক্তি।’’

জনপ্রিয়তাই শেষ কথা নহে, যোগ্যতাও একটি ঘটনা বিশেষ। আহমদ ছফা একটি প্রশ্নে অকপট: “রাজনৈতিক অঙ্গনে শেখ মুজিবের অবদান খুবই মূল্যবান। তিনি হাজার বছরের সবচাইতে মূল্যবান ব্যক্তি। কিন্তু একটা রাষ্ট্র চালানোর জন্য যে সব বিষয়ে আধুনিক শিক্ষা থাকা দরকার ছিল, আমলাতন্ত্র, শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এগুলো তাঁর দখলে ছিল না।”

আহমদ ছফার বাসনা, “এই অভাব কাটিয়ে উঠতে হবে। এখন যাঁরা আছেন তাদেরকে সবদিক দিয়ে আধুনিক করে গড়ে তুলতে হবে।”

এখন কাঁহারা এই কাজটি করিবেন?

আরেক সাক্ষাৎকারপ্রার্থী তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, “এত বিভিন্ন ধরনের কাজ করেন আপনি। আসলে কী হতে চেয়েছিলেন?”

জবাবে আহমদ ছফা বলিয়াছিলেন, “ইচ্ছে ছিল লেখক, ব্যবসায়ী বা রাজনীতিক হব। রাজনীতিক হওয়া সম্ভব না এটা বুঝেছি অল্পদিনেই। কারণ রাজনীতি করতে গেলে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। যে ধরনের কৌশল করতে হয় সে সবের যোগ্য আমি নই।”

ঠিকই বলিয়াছিলেন তিনি। ব্যবসায়ী হওয়ার মতো পরিষ্কার কপালও তাঁহার হয় নাই।

অগত্যা এই লেখক হওয়া ছাড়া আহমদ ছফার আর গতি ছিল না। অথচ তাহাতেও তাঁহার পুরাপুরি সাড়া ছিল না। একই প্রশ্নকর্তাকে তিনি আরেক উত্তরে বলিতেছিলেন, “কবি-লেখক-শিল্পী এগুলো তো মানুষ পরিচয়ের খণ্ডাংশ!”

পূর্ণাঙ্গ মানুষ হইয়া বাঁচার ইচ্ছা তাঁহার প্রচণ্ড ছিল। এমন দিনে তাঁহাকে কী বলা যায়? আমিও অনন্যোপায় হইয়া তাঁহাকে কিছুদিন ধরিয়া ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ’ বলিয়া আসিতেছি। ইহাতে তিনি কি সায় দিতেন? নিশ্চিত বলিতে পারি না। রাজনীতিক হইবার বাসনা তিনি যদি-বা ত্যাগও করিয়া থাকেন, পুরাপুরি বোধহয় করিতে পারেন নাই। রাষ্ট্রচিন্তার আড়ালে সেই দলিত বাসনাই কি উঁকি মারিতেছে না? আহমদ ছফা আসিয়াছিলেন আমাদের সমাজের সেই স্তর হইতে যাহাকে ১৯৭১ সালের পর হইতে ভারতবর্ষের চিন্তা-ব্যবসায়ীরা ‘দলিত’ নাম দিয়াছেন।

আমাদের দেশের এক প্রধান চিন্তা-ব্যবসায়ী (যিনি নিজের পরিচয় ‘বাঘের বাচ্চা’ বলিয়াই দিয়াছেন তিনি) রায় দিয়াছেন, ‘‘জানালায় উড়ে বসছে আরশোলা, সেও আজ রাষ্ট্রচিন্তাবিদ।’’

আমার কেবল জানিতে সাধ এই ‘আরশোলা’ পতঙ্গটির অপমান করিয়া তিনি কাঁহার নাম গোপন করিতেছেন? আহমদ ছফার না তো? একমাত্র আল্লাহ রব্বুল আলামিন মালুম।

আমরা কয়েকজন আহমদ ছফার ছাত্রও আজ প্রাণধারণ করি। আমরা তাঁহাকে মাঝেমধ্যে যেমন এই নিবন্ধেও ‘মহাত্মা’ বলিয়া শান্তি পাই। খুব কম লোককেই আমরা ‘মহাত্মা’ বলি। তাই ভাবিতেছি আহমদ ছফার ‘মহাত্মা’ উপাধিকে না শ্লেষ করিয়াই আমাদের দেশের চিন্তা-ব্যবসায়ী লিখিলেন:

“নেকড়ে মতো চোখ মহাত্মা ইঁদুর আমি তোমাকেও চিনি
খুঁদকুড়া খেয়েছিলে রাত্রিদিন আমারই ভাণ্ডার থেকে জানি
কতোবার ভেংচি কেটে লুকিয়ে গিয়েছ গর্তে কখনও ধরিনি।”

আমাদের প্রশ্ন, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান ও শেখ মুজিব, মাওলানা আকরম খান ও মাওলানা ভাসানী, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া– ইঁহারা সকলেই কি আরশোলা অথবা ইঁদুর পদবাচ্য প্রাণি? যদি না হইয়া থাকেন তাহা হইলে মহাত্মা আহমদ ছফার দোষটা কোথায়?

অনন্ত জলিল একজন চলচ্চিত্র ব্যবসায়ী। তাঁহার ‘নিঃস্বার্থ ভালোবাসা’ নামক সিনেমার একটা বিজ্ঞাপন শুনিলাম। অনন্ত নামটা ইংরেজি অক্ষরে লিখিতে পহেলা ‘এ’ অক্ষরটা লাগে। আর অ্যাকশন লিখিতেও ‘এ’ লাগে। অতএব অনন্ত জলিলের ছবিতে অ্যাকশন থাকিবেই।

আহমদ ছফার নাম লিখিতে বাংলায় ‘স্বরে আ’ লাগে। আর ‘আরশোলা’ লিখিতেও প্রথমে লাগে ‘আ’ অক্ষর।

চিন্তা-ব্যবসায়ীও কি এ কথাই ভাবিতেছেন?

ঢাকা, ৩১ আগস্ট, ২০১৩

দোহাই

১. আহমদ ছফা, ‘সুর সম্রাটের মৃত্যুস্বপ্ন’, আহমদ ছফা রচনাবলী, ৮ম খণ্ড (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮) পৃ. ৪৪৯ -৪৬১।

২. আহমদ ছফা, ‘আমি যদি পুরো জীবন ব্যয় করে একটা উপন্যাস লিখতে পারতাম’, রাজু আলাউদ্দিন, আলাপচারিতা, (রাজনীতি, সংস্কৃতি, সমাজ ও সাহিত্য বিষয়ক সাক্ষাৎকার ঢাকা : পাঠক সমাবেশ, ২০১৩), পৃ. ২১১-২২৪)।

৩. আহমদ ছফা, ‘আহমদ ছফা: প্রজ্ঞার আলো,’ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন রাজু আলাউদ্দিন ও জুলফিকার হায়দার, বাংলাবাজার পত্রিকা, ২৩ শ্রাবণ-১৩৯৯।

৪. আহমদ ছফা, ‘বাংলার গত তিন হাজার বছরের ইতিহাসে মুজিবের তুলনা নেই’- সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন মারুফ রায়হান, সাপ্তাহিক পূর্বাভাস, ২৬-২৯ জুলাই, ১৯৯১।

৫. ফরহাদ মজহার, ‘ইস্পাতের ঠোঁট’, ৬ আগস্ট ২০১৩, পরিবর্তনডটকম

 

 

২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, bdnews24.com, মতামত বিশ্লেষণ

অমৃত সমান: আহমদ ছফার তিন দফা সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে

প্রবীণ আহমদ ছফা সাধক সৈয়দ মনজুর মোরশেদ চট্টগ্রাম শহর হইতে বেশ দূরে রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় বসবাস করেন। একদা তিনি তাঁহার সযত্ন সংগ্রহ হইতে আহমদ ছফার ‘অলাতচক্র’ নামধেয় মহান উপন্যাসের প্রথম (পত্রিকা) সংস্করণ উদ্ধার করিয়া বাংলা সাহিত্যের অশেষ উপকার করিয়াছিলেন। কিছুদিন আগে তিনি আমাদের আরো ঋণী করিয়াছেন। তাঁহার সংগ্রহশালা হইতে আমরা মহাত্মা আহমদ ছফার দুইটি দুষ্প্রাপ্য সাক্ষাৎকার জাতীয় রচনা পাইয়া আরো অধমর্ণ হইয়াছি। ‘সর্বজন’ পত্রিকায় এই দুইটি রচনা প্রকাশ করিবার অনুমতি দিয়া তিনি আমাদের চিরানুগৃহীত করিয়াছেন। বলা বাহুল্য, এই দুই রচনা এখনো নয় খণ্ড ‘আহমদ ছফা রচনাবলি’র অন্তর্গত হয় নাই।

এই সাক্ষাৎকার দুইটির একটিতে তারিখ পাওয়া গিয়াছে ২৩ এপ্রিল ১৯৯৪। ইহা প্রকাশিত হইয়াছিল দৈনিক ‘আজকের কাগজ’ পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী ‘সুবর্ণরেখা’য়। প্রকাশের তারিখ পাওয়া যায় নাই, তবে আলোচনার তারিখ উল্লেখ করা হইয়াছে। পত্রিকার ফাইল ঘাঁটিলে এখন প্রকাশের তারিখও পাওয়া যাইবে। এই পত্রিকার সম্পাদকেরা জানাইয়াছেন রচনাটি তাঁহাদের ভাষায় ‘একটি অংশগ্রহণমূলক আলোচনার সংক্ষিপ্ত অনুসৃতি’; আর শিরোনামায় ব্যবহৃত ‘চাই সমান্তরাল সংস্কৃতি’ কথাটিও মনে হইতেছে সম্পাদক সাহেবানের দান। অবশ্য আহমদ ছফার বক্তব্য হইতে এই শিরোনাম চয়ন করা। অবশ্য ‘সমান্তরাল সংস্কৃতি’ বলিতে কি বুঝায় তাহা বড় পরিষ্কার হয় নাই। আহমদ ছফার জবানিতে বলা হইয়াছে — বলা বাহুল্য এই জবানিটা ১৯৯৪ সালের — ‘এখন সর্বাগ্রে প্রয়োজন সমান্তরাল সংস্কৃতির জোয়ার’।

আলোচনটি পুরাপুরি পড়িলে অনুমান করা যাইবে তখন দেশে সংস্কৃতির নামে যাহা চলিতেছিল আহমদ ছফা কেন তাহার অনুমোদক ছিলেন না। যাহা চলিতেছিল তাহাকে প্রতিরোধ করিতে হইবে। আর প্রতিরোধ হইতে জন্মাইবে নতুন সংস্কৃতি। এই ঘটনাকেই — যাহা সম্ভব অথচ যাহা এখনো ঘটে নাই — আহমদ ছফা বলিয়াছেন ‘সমান্তরাল সংস্কৃতি’; কথাটা বড় বেমানান হয় না। বুঝিতে কষ্ট হয় না তাঁহার বাসনাটা কোথায়। তিনি চাহিতেন এই স্থবিরতা গতিশীলতার দিকে ধাবিত হৌক।

একটা উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হইবে। আহমদ ছফা বলিতেন, ‘আমাদের তথাকথিত প্রগতিশীল লেখকেরা নতুন সমাজ নির্মাণের কথা বলেন। তারা ম্যান্ডেলার মুক্তি নিয়ে কবিতা লেখেন। রাজনীতিকরা ঢাকার রাজপথে ম্যান্ডেলার জন্য মিছিল করেন। অথচ ফারাক্কার মত এত জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আজ পর্যন্ত কোন লেখক একটি কথাও বলেন নি। একটি বাক্যও লেখেন নি।’ (ছফা [১৯৯৪]: ৫)

আরেকটি উদাহরণ আশা করি বাহুল্য বিবেচিত হইবে না। বাংলাদেশের ‘প্রগতিশীল’ শিল্পীদের হাড়িও তিনি হাটে ভাঙ্গিয়া দিয়াছেন। বলিয়াছেন, ‘নন্দলাল বসুর প্রথম পেইন্টিং যেটি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল তা একটি নামাজের দৃশ্য। মুসলমান কৃষকেরা ধান কাটার পর নামাজ পড়ছে। বাংলাদেশের যে কোন পেইন্টার বা চারুশিল্পী জানাযা, নামাজ এ সকল বিষয়ে কোন পেইন্টিং করতে নারাজ। এতে যে তারা প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে যাবেন!’ (ছফা [১৯৯৪]: ৫)

কবিতার ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি। যতদূর জানি আহমদ ছফার কোন ব্যক্তিগত শত্রু ছিল না। শুধুমাত্র স্পষ্ট কথা স্পষ্ট শব্দে বলার দোষে তিনি শাসক বুর্জোয়াশ্রেণির বিরাগ উপার্জন করিয়াছিলেন। একটি নমুনা হাজির করা যাইতে পারে। তখন কোন কোন মহল কবি শামসুর রাহমান ও তাঁহার মতন দুই চারিজন কবি ও লেখককে বাজারে বড় লেখক বলিয়া চালাইতেছিলেন। আহমদ ছফা কাট কাট ভাষায় বলিলেন, ‘শামসুর রাহমান যা নন, তাঁকে যদি তাই বানানো হয় তা হলে দেশের যেমন লাভ হবে না; শামসুর রাহমানেরও কোন লাভ হবে না।’ যোগ করিতে কসুর করিলেন না আহমদ ছফা,

আমার ধারণা শামসুর রাহমান এখন যে ধরনের গদ্য পদ্য লিখছেন পাকিস্তানের শেষপর্বে কবি গোলাম মোস্তাফার লেখার সংগে তার তুলনা করা যেতে পারে।

বর্তমানে শামসুর রাহমানের রচনায় কোন আবিষ্কার নেই, কোন বিস্ময়বোধ নেই। তাঁর কবিতার অভ্যাসের জের এবং গদ্য একাদশ দ্বাদশ শ্রেণীর বালক-বালিকাদের রচনার চাইতে একটুও উৎকৃষ্ট নয়। এ রকম একজন লোক নিয়ে কি করে বড় স্বপ্ন দেখেন, সাহিত্যিক উঁচু অবস্থান দাবি করেন, আমি তার হিসেব মেলাতে পারি না। (ছফা [১৯৯৪]: ৫)

হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন ও তসলিমা নাসরিন প্রমুখ লেখকদের তিনি অন্যশ্রেণিতে তালিকাভুক্ত করিয়াছিলেন। তাঁহার বিচারে ইঁহারা পাঠককুলের ‘জ্ঞান ও রুচি’ ধ্বংস করিতেছেন। আহমদ ছফার কথায়, ‘এ সকল লেখকদের আমি সৈয়দ মুজতবা আলীর “দেশে-বিদেশে”-র বাচ্চা সাকাও-র সাথে তুলনা করি।’ (ছফা [১৯৯৪]: ৫)

আহমদ ছফার মীমাংসা পরিষ্কার: ‘এভাবে জাতি বাঁচতে পারে না। সংস্কৃতির দূষণ থেকে এ জাতিকে উদ্ধার করা জরুরি।’ তিনি তাকাইয়া ছিলেন বাংলাদেশের তরুণদের দিকে। আর ভরসা রাখিয়াছিলেন, তাঁহার নিজস্ব মুদ্রায়, ‘বাঙালি জাতির প্রথম নিজস্ব স্বাধীন’ রাষ্ট্রের উপর। সেই রাষ্ট্র তাঁহার আশা পূরণ করে নাই।

সৈয়দ মনজুর মোরশেদ দ্বিতীয় যে লেখাটি সংগ্রহ করিয়াছেন তাহার প্রকাশস্থল ‘সচিত্র স্বদেশ’। এই পত্রিকাটি দীর্ঘায়ু হয় নাই। আমাদের হাতের সাক্ষাৎকার গোত্রের লেখাটির শিরোনান বেশ দীর্ঘ: ‘মুক্তিযুদ্ধের ওপর তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য বিশুদ্ধ বই আমি দেখিনি’। পত্রিকার কোন সংখ্যায় এই রচনা মুদ্রিত হইয়াছিল জানিতে পারি নাই। আমাদের হাতের এই একপাতায় শুদ্ধ মুদ্রিত আছে ‘সচিত্র স্বদেশ’, পৃষ্ঠা ৫৩। রচনার অন্তরীণ সাক্ষ্য অনুসারে সময়টা ১৯৮০ সালে যে দশক শুরু হইয়াছিল তাহার মাঝামাঝি।

আহমদ ছফা একবাক্যে বলিয়াছিলেন, ‘আমি আগেই বলেছি, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত অবস্থাকে ধারণ করে সত্যিকার সাহিত্য রচনা এখনো হয়নি। আমার ধারণা, ১৫ বছর সময় যথেষ্ট নয়।’ তাই অনুমান করি এই রচনাটি পত্রস্থ হইয়াছিল ইংরেজি ১৯৮৬ কিংবা ১৯৮৭ সালের দিকে। ১৯৭১ হইতে ১৫ বছর পর আর কি হইতে পারে!

এই স্বল্পায়তন রচনাটিতেও টের পাওয়া যায় কেন আহমদ ছফার কথা অমৃত সমান।

সৈয়দ শামসুল হকের ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নামক কাব্যনাট্যটি ততদিনে বাজারে বিরাজ করিতেছে। আহমদ ছফা বলিতেছেন, ‘এটি মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে লেখা। কাঠামো ও আঙ্গিকের দিক থেকে ঠিক আছে, কিন্তু প্রাণপ্রবাহের দিক থেকে সেটা ব্যর্থ। মনে হয়, এটি দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় ব্যক্তির অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে লেখা।’ (ছফা [১৯৮৬]: ৫৩)

এহ বিশেষ। এখন আহমদ ছফা সামান্যে প্রবেশ করিবেন। তিনি প্রথমেই অঙ্গীকার করিতেছেন, স্বাধীনতা সংগ্রাম আমাদের সাহিত্যকে প্রবলভাবে নাড়াইয়া দিয়াছে। সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে সম্ভাবনার দুয়ার খুলিয়া দিয়াছে। অথচ ১৫ বছরেও সেই সম্ভাবনা মূর্তি ধরিতে পারে নাই। আহমদ ছফার নালিশ: ‘মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে লেখা সাহিত্যে যুদ্ধের জীবন অনুপস্থিত।’

তিনি বিশদ করিতেছেন:

আসলে যুদ্ধের শুরু কিভাবে, কারা ভারতে গেলো, কিভাবে গেলো, শরণার্থী শিবিরে কারা কিভাবে ছিলো? কারা শরণার্থী শিবিরে ছিলো না, কারা থিয়েটার রোডে ছিলো কিংবা কারা ঘরে ফিরে এলো, কারা ফিরতে পারলো না — সে সব বিষয়ের দিকে দৃষ্টিপাত না করে একটা যুদ্ধ হয়ে গেছে মনে করে একটি কল্পনার নায়ক বানিয়ে, পাক বাহিনীকে কষে গালি দিলে, দুয়েক জন ধর্ষিতা বোনের চিত্র অংকন করলে একটি যুদ্ধের সাহিত্য রচনা করা যায় এ রকম একটা অপচেষ্টা আমাদেরকে পেয়ে বসেছে। এই প্রবণতা সাহিত্যক্ষেত্রে আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে জানি না। (ছফা [১৯৮৬]: ৫৩)

এতদিনে সে আশঙ্কা সত্য হইয়াছে।

আহমদ ছফার নিজের হাতের ‘অলাতচক্র’ ঠিক এই সময়েই রচিত হইয়াছে। নিজের লেখা সম্পর্কে এই জায়গায় তাঁহাকে বিশেষ বলিতে দেখি না। নিজের লেখা লইয়া বলিতে আহমদ ছফার যে বড় লাজুকভাব ছিল ঘটনা কিন্তু তেমনও নহে। এক তরুণ সাহিত্য ব্যবসায়ী একদা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, ‘বাংলাদেশে বর্তমানে কোন লেখকের কোন লেখা কি ভবিষ্যতে ক্লাসিক হিসেবে চিহ্নিত হবে বলে আপনি মনে করেন?’ আহমদ ছফার উত্তর ছিল সোজা: ‘একটা লেখা ক্লাসিক হিসেবে চিহ্নিত হবে বলে আমি মনে করি। সেটা হলো আমার লেখা “ওঙ্কার”।’ (ছফা ২০০৮: ৩৯৯)

সাক্ষাৎকার শিকারির নাম বিপ্লব রহমান। তিনি অতঃপর জিজ্ঞাসিলেন, ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের “চিলেকোঠার সেপাই”?’ আহমদ ছফা কহিলেন, ‘লেখাটা আমি পড়েছি। অসাধারণ গ্রন্থ। আমার একটা নালিশ আছে, এর ভাষাটা খুব নিরস।’ ইলিয়াস যথাসময়ে এই নালিশের শোধ তুলিয়াছিলেন। ‘অলাতচক্র’ উপন্যাসকে তিনি ক্রোধের কাছে আত্মসমর্পণ বলিয়া খাট করিয়াছিলেন।

১৯৯৩ সালের কথা। বিপ্লব রহমান জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন: ‘আপনার কাছে আমাদের শেষ প্রশ্ন, আপনি কেন লেখেন?’ আহমদ ছফা নিবেদন করিলেন: ‘আমি সাধারণত তিনটি কারণে লিখি। মানুষের কল্যাণ করার উদ্দেশ্য যদি থাকে, তখন লিখি। যদি আর্টিস্টিক কিছু সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য থাকে, তখন লিখি। আর যখন কোন কিছুর প্রতিবাদ করার ইচ্ছা থাকে, তখন লিখি।’ (ছফা ২০০৮: ৪০১)

বঙ্গের নবীন লেখকদিগের উদ্দেশে প্রথম দুইটি কথা বঙ্কিমচন্দ্রও নিবেদন করিয়াছিলেন। তিন নম্বর কথাটিই — ‘প্রতিবাদ করার ইচ্ছা থাকে, তখন লিখি’ — আহমদ ছফার এক ফোটা শিশির। বঙ্কিমচন্দ্রের শিব ও সুন্দরের সহিত আহমদ ছফা যোগধন একটিই। সেই যোগ প্রতিবাদ। সেই যোগ সত্যম্।

১৯৯৯ সালের মধ্যভাগে মহাত্মা আহমদ ছফা একদফা মার্কিন দেশে তশরিফ আনিয়াছিলেন। উপলক্ষ উত্তর আমেরিকা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন। ১৯৯৯ সালের সম্মেলনটি ছিল ঐ ঘরানার চতুর্থ মিলন। সম্মেলনটি আয়োজন করিয়া থাকেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ হইতে যাহারা মার্কিন মুলুক ও কানাডায় বসবাস করিতে গিয়াছেন তাহাদের পরিজন। বাংলাদেশের কোন কোন প্রবাসী নাগরিকও তাহাদিগকে সমর্থন করেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ শুদ্ধ পূর্ববাংলার ক্ষতি করে নাই পশ্চিমবঙ্গকেও নাজেহাল করিয়াছে। বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র আকারে দাঁড়াইবার পর পশ্চিমবঙ্গে একটা নতুন চিন্তার আকার দানা বাঁধিতেছে। আহমদ ছফার লেখা এই নতুন চিন্তাবিদদের আকৃষ্ট করিয়াছিল। তাই তাহারা তাঁহাকেও সেবার টেক্সাস রাজ্যের আরভিং শহরে ডাকিয়াছিলেন।

আমাদের সংগ্রহ করা এই তিন নম্বর সাক্ষাৎকারটি সেই যাত্রার ফসল। এই চয়নিকা ইন্টারনেট পত্রিকা ‘পরবাস’ সম্পাদকদের পছন্দের ফসল। ইহার পহিলা প্রকাশ ঘটে ‘পরবাস’ সাময়িকীর ৩য় বর্ষ ২য় সংখ্যায় — মানে ১৪০৬ বাংলা সালের (মোতাবেক ইংরেজি ১৯৯৯ সালের) শরৎ সংখ্যায়। এই সাক্ষাৎকারে প্রধানত স্থান পাইয়াছে আহমদ ছফার সহিত খ্যাতনামা পশ্চিমবঙ্গীয় গবেষক প্রবীণ সুধীর চক্রবর্তীর বাতচিত। আলোচনার গতিপথ বাংলাদেশের বর্তমান সাহিত্যক্ষেত্র হইতে বাংলাদেশের নিকট অতীত হইতে অদূর ভবিষ্যৎ পর্যন্ত গড়াইয়াছিল।

এই আলোচনার অল্প আয়তনের মধ্যেও আহমদ ছফার চিন্তার ব্যাপ্তি ও বেধ দুইটাই পড়িয়াছে। আগের দুই রচনায় যেমন দেখা গিয়াছিল এখানেও তেমন দেখা যাইতেছে। আহমদ ছফার কোন বাক্যই কপট নহে। তিনি এক পর্যায়ে বলিতেছিলেন, একসময় তাঁহার যুগের লেখকেরা যখন লেখায় আত্মনিয়োগ করিয়াছিলেন তখন লেখকদের সামনে একটা লক্ষ্য ছিল। আহমদ ছফার কথায়, ‘আমরা দেশকে স্বাধীন করব, তারও পরে দেশটাকে তৈরী করব।’ আর এখন? আহমদ ছফার মতে, ‘এখন তরুণদের সামনে কোন স্বপ্ন নেই।’ (ছফা ১৪০৬)

কিন্তু আহমদ ছফা অনেক দূরের সম্ভাবনাও দেখিতে পাইলেন। তিনি মনে করেন ইংরেজি বিংশ শতকে ‘বাঙ্গালির শ্রেষ্ঠ অর্জন’ হইতেছে ‘বাঙ্গালির একটা নিজস্ব জাতীয় রাষ্ট্র’। বলা প্রয়োজন, ‘পশ্চিম বাংলা এর বাইরে নয়’ কথাটিও তিনি যোগ করিতে ভোলেন নাই। (ছফা ১৪০৬)

ইতিহাস হাজির নাজির মানিয়া তিনি নির্দেশ করেন এখন উত্তর ভারতে যে রাজনৈতিক তৎপরতা দেখা যাইতেছে তাহা ভারতকে একত্রে, একসাথে রাখিতে নাও পারে। ভারতের ইতিহাস বার বারই সাক্ষ্য দেয় কেন্দ্র হইতে বেশি চাপ দেওয়ার ফলে দেশের নানা অংশ স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করিয়াছে। ভবিষ্যতে তাহার ব্যতিক্রম হইবে কেন? আহমদ ছফার মতে দক্ষিণ এশিয়া কিংবা ভারতবর্ষ উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র তৈয়ার হইবার তাৎপর্য অশেষ। সুধীর চক্রবর্তীর মত, ‘দুই বাংলা মিলেও যেতে পারে’ শুনিয়া আহমদ ছফা কবুল করিলেন, ‘আমার তাই বিশ্বাস।’ (ছফা: ১৪০৬)

আহমদ ছফা এই সাক্ষাৎকারটি সোনার চেয়ে দামি। ইহার এক জায়গায় তিনি বলিয়াছেন বাংলাদেশ না ভাঙ্গিলে হয়ত ভারতও ভাগ হইত না। তাহা হইলে প্রশ্ন উঠিবে বাংলা ভাগ করিল কে? আহমদ ছফা সহজ ভাষায় দায়ী করিয়াছেন একদিকে শাসক ব্রিটিশ জাতিকে, অন্যদিকে ভারতের অন্যান্য জাতি, বিশেষ পাঞ্জাবি ও মাড়োয়ারি জাতির ব্যবসায়ী শ্রেণিকে। আহমদ ছফার এই কথাগুলি হয়তো অকথিতপূর্ব নহে, কিন্তু এখনো এইসব কথার মধ্যে আবিষ্কার আছে, বিস্ময়বোধ আছে। যেমন তিনি এক জায়গায় বলিলেন, প্রথম হইতেই ব্রিটিশ সরকারের একপ্রস্ত ষড়যন্ত্র ছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে পর্যন্ত তিনি ষড়যন্ত্রের একটা সোপান ধরিয়া লইয়াছেন। অবশ্য ইতিহাসকে মাত্র ‘ষড়যন্ত্র’ শব্দে ঠিক কতটুকু হজম করা যাইবে বলা কঠিন।

কিন্তু আহমদ ছফার দ্বিতীয় কথা ১৯৪৭ সালের দেশভাগ বা দ্বিতীয় বঙ্গভঙ্গ যে বাঙ্গালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির ‘আত্মহত্যা’ বিশেষ তাহা এতদিনে অনেক ইতিহাস ব্যবসায়ীর নজরে পড়িতেছে। চিত্তরঞ্জন ওরফে সি. আর. দাশের বঙ্গীয় সমঝোতা বা বেঙ্গল প্যাক্ট যদি ভাঙ্গিয়া না যাইত তো বাংলাদেশ ভাগ হইত না। আহমদ ছফার এই বিশ্বাসও ইতর বস্তু নহে। এই প্যাক্ট ভাঙ্গার পিছনে যাহাদের হাত ছিল তাহা পরিষ্কার হইয়াছে আরো পরে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মধ্যে। এই যুদ্ধে বাংলার অর্থনীতি নষ্ট হইয়া গেল। শুদ্ধ যে অনুমান ৫০ লাখ লোক না খাইয়া মরিল তাহাই নহে, (আহমদ ২০০৬: ১৮২) আরো কথা আছে, ‘তারপর যা কিছু তৈরী হতে লাগল অবাঙ্গালিদের পয়সায়…।’ (ছফা ১৪০৬)

আহমদ ছফার শেষ কথাটি বেশ:

আমি সে সময়, ১৯৭১-এ যখন কলিকাতায় গেলাম, ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে আমি তখনকার পত্রপত্রিকা খুঁজলাম। সুভাষ বসু যখন কলিকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছে তখন পত্রিকাগুলো কি লিখছে… তা আমার খোঁজাখুঁজিতে যা পেলাম, বাঙালিদের পয়সা ছিল না রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর — সুভাষ বসু যে দেশ থেকে চলে গেল তার কারণ হচ্ছে পাঞ্জাবিরা, মাড়োয়ারিরা তাকে পয়সা দেয়নি আন্দোলন চালানোর জন্য, এ জন্য তাঁকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হল। বাংলার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনও মুখ থুবড়ে পড়ল। (ছফা ১৪০৬)

এই সাক্ষাৎকারের পর আহমদ ছফা আর বেশিদিন বাঁচিয়া থাকেন নাই। ২০০১ সালের ২৮ জুলাই — অনুমান দুই বছরের মাথায় — তিনি পরলোক লাভ করিলেন। সুখের বিষয়, তাঁহার অমৃত সমান কথা এখনো বাঁচিয়া আছে। এখানেও তাহার দুই চারিটি নিদর্শন ধরিয়া রাখি না কেন?

দোহাই

১.      আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পুনর্মুদ্রণ (ঢাকা: খোশরোজ কিতাব মহল, ২০০৬)।

২.      আহমদ ছফা, ‘আহমদ ছফা বললেন…,’ আহমদ ছফা রচনাবলি, ৩য় খণ্ড (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮), ৩০২-৪২৪।

৩.     ———- ‘সাক্ষাৎকার: আহমদ ছফা,’ পরবাস [ইন্টারনেট পত্রিকা], ৩য় বর্ষ ২য় সংখ্যা, শরৎ ১৪০৬ [১৯৯৯ ইংরেজি]।

৪.      ———- ‘চাই সমান্তরাল সংস্কৃতি,’ সুবর্ণরেখা, আজকের কাগজ [আনুমানিক প্রকাশকাল এপ্রিল ১৯৯৪]।

৫.      ———- ‘মুক্তিযুদ্ধের ওপর তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য বিশুদ্ধ বই আমি দেখিনি,’ সচিত্র স্বদেশ [আনুমানিক প্রকাশকাল ১৯৮৬]।

 

৩১ জুলাই ২০১৩, সর্বজন: নবপর্যায় ১৯