Monthly Archives: May 2018

গুন্টার গ্রাসের কবিতা: যে কথা না বললেই নয়

গুন্টার গ্রাসের এই কবিতা নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক চলছে জার্মানি ও ইসরায়েলে। কবিতাটি ‘ইসরায়েল রাষ্ট্র ও তার জনগণের প্রতি বিদ্বেষের আগুন উসকে দেওয়ার চেষ্টা’ হিসেবে উল্লেখ করে নোবেলজয়ী এই সাহিত্যিককে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি’ ঘোষণা করেছে ইসরায়েল। স্বদেশ জার্মানিতেও তুমুল সমালোচিত হয়েছেন গ্রাস। পরমাণু শক্তি অর্জন নিয়ে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর চলমান বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এ কবিতা নিয়ে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে ইসরায়েল-জার্মানি-ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে সারা দুনিয়াতেই। জার্মানির স্যুডডয়চে সাইটুং পত্রিকা গত পাঁচই এপ্রিল গ্রাসের কবিতাটি প্রকাশ করে। ‘ Was gesagt werden muss’ শিরোনামে জার্মান ভাষায় লেখা কবিতাটি ইতোমধ্যেই ইংরেজিসহ বেশ কয়েকটি ভাষায় অনুদিত হয়েছে।

grass-p.jpg
সলিমুল্লাহ খান কবিতাটি মূল ভাষা থেকে বাংলায় তর্জমা করেছেন।

 

 

যে কথা না বললেই নয়

এতদিন কেন চুপ মেরে আছি, কেন মুখ খুলিনি এত দীর্ঘ দিন
একটা খেলা চলছে–যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা
মহড়া চলছে প্রকাশ্যে দিবালোকে–
এ খেলার শেষে আমরা বেঁচে যাই তো হবো পাদটীকা।

খেলার নাম অতর্কিতে হামলার অধিকার
হামলাকারী– এখন জনৈক বাচালের ডাকে সমবেত–
ইরানের জনজাতি ধুলায় মিশিয়ে দেবে
কারণ তার সন্দেহ
তার ক্ষমতার বলয়সীমায় পরমাণু বোমা তাতাচ্ছে ইরান।

অথচ অনেক দিন হলো আর একটা দেশের হাতে পরমাণু শক্তি মজুত আছে
আর সে ক্ষমতা বাড়ছেও দিনে দিনে
তার উপর কারও কোন নিয়ন্ত্রণ নাই, কেননা তা পরিদর্শনের
আওতার বাইরে
সে দেশের নামটা মুখে আনতে কেন রাজি নই আমি?
সারা দুনিয়া খেলছে এই লুকোচুরি খেলা
আমিও মেরেছি চুপ এই লুকোচুরির তলায়
আমার তো মনে হয় এই নিশ্চুপ থাকার চেয়ে
বড় মিথ্যাচার বড় কেলেঙ্কারি আর কিছু নাই
এই মিথ্যার বিরুদ্ধে টু শব্দটি করো দেখি তুমি
দেখবে অভিশাপ ভয়াবহ খড়গ আসছে নেমে তোমার মাথায়
তুমি ‘এয়াহুদি বিদ্বেষী’।

আমার দেশ অপরাধী– কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে সে
বহু বহুবার– অপরাধ তার তুলনাবিহীন।
আর আজ ভাগ্যের ফেরে– হয়তো নিছক ব্যবসাজ্ঞানে
অথচ মুখে বলছে ক্ষতিপূরণ হিসাবে– ঘোষণা করেছে
ইসরায়েলকে আরো এক ডুবোজাহাজ বেচবে সে
দুনিয়া ধ্বংস করতে পারে এমন ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া যায়
জাহাজ থেকে, ছোড়া যাবে সে দেশপানে
যে দেশে প্রমাণ নাই পরমাণু বোমা আছে
শুদ্ধ আছে ভয় আর ভয়ই তো অকাট্য প্রমাণ।
তাই আমাকে বলতে হবে যে কথা না বললেই নয়।

তো এদ্দিন, আজতক, কেন চুপ মেরে আছি আমি?
আছি ভয়ে, ভয় জন্মদাগের
এ দাগ কোনদিন মুছবার নয়
এ দাগের ভয়ে এদ্দিন ইসরায়েলের মুখের উপরে
করতে পারিনি আমি সত্য উচ্চারণ
কারণ তার সনে বাঁধা আছি আমি চিরদিন
থাকতেও চাই বাঁধা হয়ে।

যে কথা বলতে পারিনি তো সে কথা বলছি কেন এখন?
এখন বয়স হয়েছে আমার, ফুরিয়ে এসেছে কলমের কালি
এমনিতেই ভাঙাচোরা বিশ্বশান্তি
আর সে বিশ্বশান্তির পথের কাঁটা
হয়ে দাঁড়াচ্ছে ইসরায়েল
এ কথা না বললেই নয়, বড্ড দেরি হয়ে গেছে
বলবার সুযোগ আর নাও থাকতে পারে আর।

আরও এক কারণে বলছি আজ
আমরা জার্মান জাতি, অপরাধভারে নত হয়ে আছি
সামনে আরো এক অপরাধ ঘটতে চলেছে
আর আমরাও হতে চলেছি তার ভাগদার সমান অপরাধী
যে অজুহাতে এতদিন পার পেয়ে গেছি
তাতে দালালি আর হবে না হালাল।

মাপ করবেন, আমি আর চুপ থাকতে পারলাম না আজ
কেননা পশ্চিমা দুনিয়ার ভণ্ডামি দেখতে দেখতে আমি হয়রান
আশা করছি আপনারাও–আরো অনেকেই
মুখে আঁটা কুলুপ খুলে নিরবতা অভিশাপ মুক্ত হবেন
দেখতে পাচ্ছেন এগিয়ে আসছে বিপদ
যে দেশের কারণে হাত জোড় করে সে দেশকে বলুন
বলপ্রয়োগ করবেন না
আর দাবি তুলুন
দুই দেশের সরকারকেই বলা হোক
ইসরায়েলি পরমাণু শক্তি
আর ইরানি পরমাণু ক্ষেত্র
দুইটাই থাক মহাজাতিক সংঘের অবাধ ও স্থায়ী নজরে।

কি ইসরায়েলি কি ফিলিস্তিনি সকলের–
আমাদের সকলের– মায় এই উন্মত্ত ভূখণ্ডের ঘরে ঘরে
যারা করি শত্রুর সঙ্গে করি গলাগলি বসবাস
তাদের সকলের বাঁচবার এ ছাড়া আর পথ নাই।
নাই শুদ্ধ তাদেরই নয়, আমাদের সকলের।

 

বিডিনিউজ, আর্টস, ১১ এপ্রিল ২০১২

“বাংলা ভাষা বলে একটি বিশেষ ভাষা নেই, বাংলা বহু ভাষা।” সলিমুল্লাহ খানের সঙ্গে আলাপ

salim-khan.jpg

…….
সলিমুল্লাহ খান (জন্ম. ১৮ আগস্ট ১৯৫৮), ছবি. নাসির আলী মামুন
……

[জ্ঞান অর্জনের জন্য যাঁরা জাগতিক প্রাপ্তিকে তুচ্ছ ভেবে একরোখা দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন, বর্তমান সময়ে, সলিমুল্লাহ খান তাঁদের মধ্যে (তার প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার ফলাফলের মতই) প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়ার দাবি রাখেন নিঃসন্দেহে। তিনি আমেরিকাতে ছিলেন প্রায় চৌদ্দ বছর। এবং ইচ্ছা করলেই তিনি এখানে অনেকের মতো স্থায়ীভাবে থেকে যেতে পারতেন এবং প্রাচুর্যও কোনও না কোন ভাবে তাঁর কাছে ধরনা দিতো একথা নিশ্চিত বলতে পারি। কিন্তু, তিনি তা করেননি আর এখানেই অন্যদের থেকে তিনি আলাদা হয়ে যান। আর কিছু না হোক নিউইয়র্কে থাকাকালীন বই পড়ে তিনি তাঁর পড়াশুনা করার অতল পিপাসার কিছুটা হলেও মিটিয়েছেন বলেই আমার ধারণা। নিউইয়র্কে বাসা বদল করতে করতে শেষদিকে তিনি আমার প্রতিবেশী হয়ে ওঠেন। তিনি যেদিন পিএইচডি ডিগ্রীপ্রাপ্ত হন (এপ্রিল, ২০০০) সেদিনই আমাকে জানালেন আর মাত্র চারদিন পরই সুইডেন হয়ে দেশে ফিরছেন। তাঁর একটা ইন্টারভিউ নেওয়ার ইচ্ছা মনে মনে ছিল কিন্তু এমন তাড়াহুড়া করতে হবে তা কখনো ভাবিনি।

বলা দরকার, এই সাক্ষাৎকার যখন নেওয়া হয় তখন তিনি, এক আকাশের স্বপ্ন(কবিতা), আল্লাহর বাদশাহি (অনুবাদ কবিতা) এবং বাংলাদেশ: জাতীয় অবস্থার চালচিত্র—শুধুমাত্র এই তিনটি বইয়ের জনক ছিলেন। এবং আমাদের আলোচনাও, সঙ্গত কারণেই, এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এবং সেই থেকে সাক্ষাৎকারটি বাক্সবন্দি হয়ে আছে। আমি নিজে কখনো কোথাও ছাপানোর চেষ্টা করিনি। কারণ এটা এতদিন আমার কাছে আমাদের বন্ধুত্বের স্মৃতি হিসাবেই বিবেচ্য ছিল। কবিবন্ধু ব্রাত্য রাইসু এর আগে আমাকে দিয়ে কবি শহীদ কাদরীর একটা দীর্ঘ ইন্টারভিউ করিয়ে নিয়েছিলেন এবং প্রথম আলো পত্রিকায় ছেপেছিলেন। এবারও ব্রাত্য রাইসুর উৎসাহ এবং ইচ্ছায় পাঠকের সাথে বর্তমান সাক্ষাৎকারটির যোগাযোগ ঘটছে এ জন্য তাঁর সম্পাদনার উৎসুক মনকে অভিনন্দন জানাই। শামস আল মমীন। নিউইয়র্ক, ডিসেম্বর ১৪, ২০০৯।]

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: শামস আল মমীন

শামস আল মমীন: বহু বছর অপেক্ষার পর সম্প্রতি আপনার অনূদিত তৃতীয় বই আল্লাহর বাদশাহি বের হয়েছে। এদ্দিন পর বই প্রকাশের জন্য অনুবাদ বেছে নিলেন কেন?

সলিমুল্লাহ খান: আমি যখন প্রথম কবিতা লেখা শুরু করি তখনও আমি অনুবাদ করেছি কিন্তু প্রকাশের সুযোগ হয়নি। আমার প্রথম কবিতার বই এক আকাশের স্বপ্ন মৌলিক কবিতা দিয়ে ৬৪ পৃষ্ঠা হচ্ছিল না, পৃষ্ঠা পূরণের জন্য ৩/৪ টা অনুবাদ কবিতা বইতে দিয়েছিলাম।
—————————————————————-
আমি যদি গ্রিক ভাষা কিম্বা ইটালিয়ান ভাষা শিখতে পারি যেমন মধুসূদন শিখেছিলেন, তাহলে আমার উচিত ময়মনসিংহের ভাষা, বরিশালের ভাষা শেখা। কলকাতার ভাষা প্রতিষ্ঠিত ভাষা হয়ে গেছে বলে আর ময়মনসিংহের ভাষায় কোন মনযোগ দেওয়া যাবে না, প্রবণতা হিসাবে এটা হবে কবিদের জন্য ক্ষতিকর। কিছু কিছু আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে এমন প্রকাশভঙ্গি আছে যা তথাকথিত শুদ্ধ ভাষায় নেই।
—————————————————————-
শামস আল মমীন: অনুবাদের জন্য সবাই বেছে নেন বহু পরিচিত, বহু পঠিত কোন লেখককে। সে ক্ষেত্রে আপনি ডরোথি জুল্লের মতো বাংলাদেশে প্রায় অপরিচিত কবিকে বেছে নিলেন কেন?
allahar-badshahi.jpg…….
আল্লাহ্‌র বাদশাহি । সলিমুল্লাহ খান অনূদিত বাম গণতান্ত্রিক জার্মান কবি ডরোথি জুল্লের কবিতা । প্রচ্ছদ: ওবায়দুল্লাহ আল মামুনের ছবি অবলম্বনে সেলিম আহ্‌মেদ । প্রকাশক: সমাবেশ, শাহবাগ, ঢাকা । সেপ্টেম্বর ১৯৯৮ । ৮০ পৃষ্ঠা । ৮৫ টাকা ।
……..
সলিমুল্লাহ খান: উত্তর খুব সোজা। আমি কবির নাম দেখে কবিতা পড়ি না। কবিতা পড়ার পর কবির নাম দেখি। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে তখন আমি কাজ করি, বইয়ের তাকে বই গোছানোই ছিল আমার কাজ। হঠাৎ দু’টা বই আমার চোখে পড়ে Revolutionary Passion এবং Of War and Love। গোটা কয়েক কবিতা পড়ে ভাল লাগলো। বই দু’টা বাসায় নিয়ে আসি। পড়ে খুবই ভাল লাগলো। ৮/১০ টা কবিতা অনুবাদও করে ফেলি। তখন মনে হলো, এঁর কবিতা যদি আরো জোগাড় করা যায় তাহলে তো একটা বই করা যায়। আমি কবির সাথে যোগাযোগ করি। দেখলাম, মানুষ হিসাবেও তিনি ভাল। এই হলো আল্লাহর বাদশাহি’র জন্মকথা।

শামস আল মমীন: ভবিষ্যতে অন্য কোন জার্মান কবির উপর কাজ করার ইচ্ছা আছে কি?


আল্লাহর বাদশাহি থেকে কিছু অনুবাদ কবিতা

নাদেজদা মান্দেলস্তামের লেখা পড়ে

কবির
নাম গোয়েন্দা বিভাগের খাতায় বহুদিন
টিকটিকিও পিছু
বন্ধুর অভাব নাই

একজন তিন তিনবার তুলে রেখে দিল
তাক নিশান লোকটার ফোন

আরজন একটু খোঁজ-খবর নিতে
পাঠাল বউকে
উনি নিজে শহরের বাইরে গেছেন

তিন নম্বর বনে গেল পুলিশের চর
আর খুব দরকার একটা বাসার

গাড়ি এলো অকে তুলে নিতে
সেদিন ঘটনাচক্রে ঘনিষ্ঠ তিন পড়শি
পড়েছে ঘুমিয়ে

বর্জন, গাদ্দারি, পরিত্যাগ এবং নিদ্রা
দোস্তালির পুরানা অধ্যায়
ঈসা রুহুল্লার প্রাণ–মনে রেখ–গিয়েছিল
এ রকমই দোস্তের ধান্দায়

তোর গল্প করতে পারি না

তোর গল্প করতে পারি না ঈসা
হাস্যকর শোনায়
তোকে পাওয়া ভার
তোর নামে তোলা বিশাল হর্ম্যরে গীর্জায়
পাড়ার কনে শুড়িখানায়
অরা ভাবে মাথাপাগলা তুই দেখতে মন্দ নস্

বলে মোর চালাক বন্ধুরা
অরে দিয়ে কিচ্ছু হবে না
বাসি
দরকার তোর অন্য পথ দেখা
গন্তব্য একই থাক
বলে মোর সরল বন্ধুরা
দরকার তোর তোলা ধৈর্যের
মোর হতাশার কথা
শুনলে শক্ররা খুশিতে
করতো যাজকী হৈ-হল্লা

তোর গল্প বলতে পারি না ঈসা
তোকে দিয়ে চলে না পেট, পুরান মাল
হবে না তোকে দিয়ে, তুই একলা
তুই এটাও তুই সেটাও, তুই নিলামে
হেন বিশপ নেই তোর পাছা মারে না

মোর হেই বেটার দশা
সারারাত গলা চেঁচিয়ে মাইকের লগে পাল্লা দেয়
পর্যটনকেন্দ্রের নলডুগি গর্দভ মিউঝাক বাজনা
ছাপিয়ে গলা ফাটায় বেটা
চালাতে যায় পরিসংখ্যার যুগে
মাতৃভাষায় মান্ধাতার আমলের কথা
বিপদের ফোন পেয়ে

কেবল মটকায় কর্ড, জড়ায় আঙুলে
তোর গল্প বলতে পারি না ঈসা
চালাকদের চেয়ে সরল বন্ধুদেরই
বিশ্বাস বেশি
চড়া দাম দিতে হয় ওদেরই সবসই

অদের সান্ত্বনায় আমার লাভ কী

দেশে দেশে ঘুরি আল্লাহর গুণ গাই

দেশে দেশে ঘুরি আল্লাহর গুণ গাই
তবে শুরু করি রাক্ষসের গুণ দিয়ে
সচরাচর
সমবেত সুধীদের কাছে আর্জি রাখি
অর খেদমত আর করবেন না
আপনেগোর মেহনত আর আপনেগোর বালবাচ্চা
আপনেগোর দুদিনের জান
আর অর পায়ে করবেন না কোরবানি

জীবন্ত আহার হবার ভয়হীন জীবনের কথা বলি
নরম গলায় স্মৃতির ভাষায়
ছুঁই হাত দিয়ে
পুরানা কালের কথা বড় বড়
সোভিয়েত ইউনিয়নের মেয়েদের ডাকি আপা
না খাওয়া মানুষের পেটে খানা পড়লে বলি শান্তি
ভিনদেশী রাক্ষসের কথা
বলি না কেন
তার গাই না সাফাই

দাওয়াতটাই
বড় কথা আল্লাহর গুণ গাই

আমাকে যখন ৫৭২ বার জিগান হলো
হিংসা সম্পর্কে আমার মতামত কী

প্রুশিয়ার রাজা নামে পরিচিত
গোবেচারা এক শহরের
মাসুম এক জেনারেল ইলেকট্টিক কারখানায়
পামাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র অভিহিত
নিরাপত্তার কিছু নিরীহ হাতিয়ার অকেজো করতে
আমার শান্তিবাদী বন্ধুরা যখন
একটা হিংসাত্মক অস্ত্র–পুরানা হাতুড়ি–
চালায়
তখন তারা হিংসার আশ্রয় নিল

এই দায়িত্বজ্ঞানবর্জিত আচরণ জায়েজ করার মতলবে
অরা ঈসা আলাইহেস সালামের আট শ বছর আগের
এক লোকের বক্তব্য তুলে ধরে
মনে হয় লোকটার মুরিদ অরা
লোকটার মাথায় ছিট
তলোয়ার পিটিয়ে লাঙলের ফলা বানাবে সে
বড় এক প্রাণের তরফে

আর ছোট ছোট প্রাণ
ফাঁকিবাজ কুঁড়ে, হতচ্ছাড়াদের স্বার্থে
অনেক বড়র আর সাংঘাতিক ছোটর–
ওদের ভাষায় লিল্লাহ ওদের ভাষায় গরিবের–এই
হিংসাত্মক জোট
মাঝখানে নিরপেক্ষ আমাদের নিরাপত্তার
সত্যিকার হুমকি বিশেষ

সীমান্তের অইপারে

সীমান্তের অইপারে
বুঝতেই পারছেন, বুঝলেন না
বাস করে এক রাক্ষস খুব বাজে
একদম অগণতান্ত্রিক
গরীব প্রজাসাধারণের
সহায়-সম্পত্তি কর-খাজনা খেয়ে
জীবন-জীবিকা বেলা-অবেলা গিলে
প্রাণ মন গবেষণা নাশ করে
বেটা দিন দিন মোটা হচ্ছে

ভুললে চলবে না
মুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বাধা না থাকায়
বেটা বেপরোয়া বড় হচ্ছে
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক
আমাদের রাক্ষসের চেয়ে
বেটার কোমর এক ইঞ্চি ফোলা
ওজন প্রাণসমেত
আধপোয়া কম–তাতে কী
সীমান্তের নাকের ডগায়

আমাদের দিশি রাক্ষসের
এই শুকোবার ঝোঁক ঠেকাতে নিখুঁত
ব্যবস্থা চাই
এ বিনা উপায় নাই
এর পেশি ফুলিয়ে অর গলা গলা
করার বিকল্প নাই
আমাগোর

আল্লাহর বাদশাহি বা মহা ঐকমত্য

নতুন শহরে এসে টের পাই
বন্ধু নাই মোর বন্ধু নাই

মোর বন্ধু নাই গিয়া গলা ধরে কাঁদবার
সোডার বোতলও শুনি আজ চুপ হাতিয়ার
পরদুঃখে দুঃখী মানে ক্যান্সার বিমার
শুধু এইটুক মতের মিলনে
প্রাণ রাখা দায়
এই নিয়ে বড় জোর মরা ভালো যায়

মোর বন্ধু নাই জড়াজড়ি ভয়ে কাঁপবার
সব খাত ছাড়িয়ে আজ শান্তি-শৃঙ্খলার বরাদ্দ
একাশি সালেই বাড়ছে বাজেট
পুলিশের তিন ভাগের আরও এক ভাগ

শুধু ভয়ে
পাশের বাড়ির রুটিয়লার বউয়ের লগে মোর
রোজ মতে মিলে
লড়ে যাওয়া দায়
এই নিয়ে যেমন চলছে চলা ভাল যায়

সবচেয়ে বড় কথা মোর বন্ধু নাই এক স্বরে চাই বলবার
কেউ কেউ স্বপ্ন দেখে পিটোচ্ছে, কেউ দেখে পিটুনি খাবার
পড়ি এই ভদ্রমহিলাদের কথা
এর ভি চাইবার যারা তারা কি গায়েব
দূরে দেখবার
মতের মহামিলনের দিন
আজও বহুদূর
তলোয়ার এখনো হলো না লাঙলের ফলা
না হয়নি ট্যাংক এখনো ট্রাক্টর
কাজ নেই নিরাপত্তা খাতের টাকায়
আন্ধাদের নিজ চোখে না দেখাই রায়

বহুদিন আগের ওয়াদা
আল্লাহর বাদশাহি, মতের মহামিল
এদেশে আমাদের দিলে

নতুন শহরে এসে
মোর বন্ধু নাই ভরসা পাই ঈমান রাখার

[সলিমুল্লাহ খানের সৌজন্যে পুনর্মুদ্রিত। বি. স.]


সলিমুল্লাহ খান: আমি জুল্লে’র কবিতার অনুবাদ করি জার্মান ভাষার সাহিত্যের ছাত্র কিংবা জার্মান ভাষার মাস্টার হবো এই আশা করে নয়। জার্মান কবিদের নিয়ে কি কাজ করবো জানি না। আমি জার্মান ভাষা ভাল জানিও না যা এ কাজ করার জন্য পূর্বশর্ত। যদি ভাষাটা রপ্ত করতে পারি তাহলে ভবিষ্যতে করতেও পারি। জুল্লে’র কবিতা অনুবাদ করেছি এই জন্য যে তাঁর বিষয়বস্তু আমার ভাল লেগেছে। তাঁর সাথে (নিউইয়র্কে) আলাপ করে বুঝলাম আমার সাথে তার একটা আত্মীয়তা আছে। আমি ছোটবেলা থেকে ব্রেখটের ভক্ত। জুল্লেও ব্রেখটের কবিতা পড়ে কবিতা লিখতে অনুপ্রেরণা পান। এটা পড়ে মনে হলো, এই কবিকে আমার খালাতো বোন বলা যায়।

শামস আল মমীন: জুল্লেকে বেছে নেওয়ার আগে আপনার রাজনৈতিক বিশ্বাসের সহযাত্রী কবি হিসাবে তাঁকে বাংলাদেশে প্রমোট করার কথা কখনো মনে হয়েছে?

সলিমুল্লাহ খান: না। তাঁর শ’খানেক কবিতা থেকে আমি ৬০টি অনুবাদ করেছি। তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ যদি আমি তুলে ধরতে চাইতাম তাহলে তাঁর প্রবন্ধই অনুবাদ করতাম। যেমন নিকারাগুয়ায় মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে, এলসালভাদরে নির্যাতনের বিরুদ্ধে তিনি বক্তৃতা দিয়েছেন। এবং বক্তৃতাগুলো তিনি চার্চে দিয়েছেন। এগুলোতে ধর্মের প্রভার থাকলেও আমার রাজনৈতিক বিশ্বাসের কাছাকাছি কথা আছে। কিন্তু আমি সেগুলো অনুবাদ করিনি। তাঁর কবিতার কাব্যমূল্য দেখেই আমি অনুবাদ করেছি। আমার মতে কবিতায় যদি মানুষের দরকারি কথাগুলো না বলা যায় তাহলে কবিতা লেখার দরকার কি? জুল্লে’র কবিতায় আমার প্রাণের কথাগুলি আছে। আমি যদি কবি হতে চাই, তাহলে কোন ধরনের কবি হতে চাই আমি তার নমুনা হিসাবে এটা পেশ করেছি। আপনি প্রথম প্রশ্নই করেছেন, আমি অনুবাদ বেছে নিলাম কেন। প্রত্যেক মানুষই দর্পনে নিজের মুখ দেখে। আমি জুল্লে’র ভেতরে হয়তো নিজের মুখই দেখেছি। কিন্তু সজ্ঞানে আমার কথা ডরোথির নামে চালিয়ে দেইনি। অজ্ঞানে হয়তো চলে গেছে। নাজিম হিকমতের কবিতা আমরা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অনুবাদে পড়েছি। এঁরা দু’জনই কমুনিস্ট পার্টি করতেন। এক ধরনের সহমর্মিতা নিভৃতে কাজ করে বলতে পারেন।

শামস আল মমীন: ডরোথি জুল্লেকে অন্যান্য ইউরোপীয় কবিদের তুলনায় কোন দিক থেকে আপনার চোখে আলাদা মনে হয়েছে?

সলিমুল্লাহ খান: এটা একটা ভাল প্রশ্ন করেছেন। এলিয়ট, অডেন, ইয়েটস এঁদেরকে আমরা আধুনিক কবি বলি। ফরাসি ভাষায় বোদলেয়ার, মালার্ম, আরাগঁ। জার্মান ভাষায় রিলকে, স্টেফান। এঁদের সবার চেয়ে ভিন্ন কবি ব্রেখট। তাঁকেও আধুনিক কবি বলতে হবে। কিন্তু তিনি সব সময় কমুনিস্ট মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। পাবলো নেরুদাও কমুনিস্ট ছিলেন। কিন্তু প্রথম যৌবনে তিনি ছিলেন সুররিয়ালিস্ট। আরাগঁ এবং পল এলুয়ার প্রথম জীবনে সুররিয়ালিস্ট হলেও পরে কমুনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। কিন্তু ব্রেখট শুরু থেকেই আধুনিক এবং কমুনিস্ট। বই পড়ে যতটুকু জানি, ইউরোপের আধুনিক কবিদের মধ্যে দুটো প্রবণতা কাজ করে। যাঁরা সুররিয়ালিস্ট হিসেবে লেখা শুরু করেন তাঁদের কেউ কেউ কমুনিস্টদের প্রতি সমবেদনা সম্পন্ন আবার কেউ কেউ কমুনিস্টবিরোধী হয়ে ওঠেন।

আমি শুরু থেকেই কমুনিস্টদের প্রতি সমবেদনাসম্পন্ন। তবে আমি অ-কমুনিস্টদের কবিতা পড়েও আনন্দ পাই। যেমন রিলকে কমুনিস্ট ছিলেন না কিন্তু তাঁর কবিতা পড়ে মজা পাই। আবার নাজিম হিকমতের কবিতা পড়েও মজা পাই। কিন্তু মতাদর্শের দিক থেকে আমি নাজিম হিকমতের মতো কবিতা লিখতে পারি না। আমার কবিতা ব্রেখটের মতো। ব্রেখটের মতোই তাঁর ধারার পরবর্তী কবি ডরোথি জুল্লে। জুল্লে’র যে রাজনৈতিক বিশ্বাস সেটা আমার শ্রদ্ধেয় কিন্তু সে জন্য আমি তাঁর কবিতা অনুবাদ করি নাই। আধুনিক কবিতার দুর্বলতা, আধুনিক কবিতা জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ায় এবং যে কারণে, আমার মতে, আধুনিক কবিতা নিজেই আত্মহত্যা করেছে। এ থেকে রক্ষা পাওয়ার একটাই পথ আবার ন্যাশনাল-পপুলার ট্র্যাডিশানে ফিরে যাওয়া এবং সেভাবে কবিতা নিজেকে রিনিউ করবে। জুল্লে’র কবিতায় এই ন্যাশনাল-পপুলার ট্র্যাডিশানের ভঙ্গিটা আছে, সেটা আমি ব্রেখটের মধ্যেও দেখি। কবিতা শুধু রোমান্টিকতা নয়। কবিতা প্রশ্ন করে, জিজ্ঞাসা করে। ফরহাদ মজহারের একটা গানের উদ্ধৃতি দিয়ে বলি:

যে জীবন স্বপ্নের সে জীবন নয়
যে জীবন প্রশ্নের
অন্বেষণের
সে জীবন আজ আমি চাই।

জুল্লে’র কবিতায় আমি স্বপ্ন এবং অন্বেষণের একটা মিল পাই। জুল্লে এখানেই অন্যদের থেকে ভিন্ন।

শামস আল মমীন: আপনার কথায়, এই কিতাবে আপনি চাণ্ডালি ভাষা ব্যবহার করেছেন। এটা কি কবিতার মেজাজকে ধরে রাখার জন্য? নাকি আগে কেউ এই ভাষা ব্যবহার করে নাই বলেই চমক সৃষ্টির জন্য নতুন মাল বাজারে দিলেন?

সলিমুল্লাহ খান: সোজা কথা, ব্রাত্য রাইসুকে অনুসরণ অর্থাৎ স্টান্ট দিলাম কি না এই তো। শামসুর রাহমানের মতো—আপনি ভদ্রলোক—ওইটুকু বলছেন না। কবিতা ভাব দিয়ে লেখা হয় না, কবিতা লেখা হয় শব্দ দিয়ে। কবির মনের ভাবনাটা কি আমরা কোনদিন জানবো না কিন্তু ভাবটা ধরা পড়ে ভাষার মধ্য দিয়ে। এটাকে আমি বলি সিগনিফায়ার। ভাষার উপর যদি নিয়ন্ত্রণ না থাকে তাহলে কবি যতো কথাই বলুক না কেন তার শেকড় গজাবে না। এবং সচেতনভাবে আমি এই ভাষা যদি ব্যবহার করি তাতে দোষের কিছু দেখি না। আমি নিজস্ব একটা ভাষারীতি তৈরি করতে চাই। কিন্তু শুধু ভাষার জন্য ভাষা তৈরি করা যায় না। দেখতে হবে, কবিতার মেজাজকে ধরে রাখার জন্য এটার প্রয়োজন আছে কি না। আমি যেটাকে চাণ্ডালি ভাষা বলছি, আমি মনে করি, সেটা খাঁটি বাংলা ভাষা। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই চাণ্ডাল বংশের এবং বাংলা ভাষাটাই একটা চাণ্ডাল ভাষা। বাংলা ভাষার প্রকৃতি বলতে কিছু নেই। আসলে বাংলা হচ্ছে বিভিন্ন ভাষার মিশ্রণ এবং বাংলা ভাষার প্রকৃতি বলতে যদি কিছু থাকে সেটাই হচ্ছে চাণ্ডালি ভাষা। আমি কবিতা বাংলা ভাষায় লিখতে চাই।

s-khan-2.jpg…….
সলিমুল্লাহ খান, ছবি. খন্দকার তারেক, ওয়েস্ট চেস্টার, নিউইয়র্ক, ১৯৯৭
………
কলকাতার মধ্যবিত্ত কবিরা যে বাংলা ভাষার চালু করেছেন, বুদ্ধদেব শুরু থেকেই বলছি। এটাও একটা আঞ্চলিক ভাষা। কিন্তু রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক কারণে এটা তথাকথিত মান ভাষার মর্যাদা পেয়েছে। এটাও একটা সুন্দর ভাষা। এখান থেকে শেখার অনেক কিছু আছে। কিন্তু এই কারণে অন্যান্য অঞ্চলের ভাষার মধ্যে যে সাহিত্যগুণ আছে সেটাকে বাদ দিতে পারি না। এবং বাদ দেওয়ার প্রবণতা হবে আত্মহত্যামূলক। আমি যদি গ্রিক ভাষা কিম্বা ইটালিয়ান ভাষা শিখতে পারি যেমন মধুসূদন শিখেছিলেন, তাহলে আমার উচিত ময়মনসিংহের ভাষা, বরিশালের ভাষা শেখা। কলকাতার ভাষা প্রতিষ্ঠিত ভাষা হয়ে গেছে বলে আর ময়মনসিংহের ভাষায় কোন মনযোগ দেওয়া যাবে না, প্রবণতা হিসাবে এটা হবে কবিদের জন্য ক্ষতিকর। কিছু কিছু আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে এমন প্রকাশভঙ্গি আছে যা তথাকথিত শুদ্ধ ভাষায় নেই। কাজেই, এগুলো আনা উচিৎ।
—————————————————————-
আমি যেটাকে চাণ্ডালি ভাষা বলছি, আমি মনে করি, সেটা খাঁটি বাংলা ভাষা। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই চাণ্ডাল বংশের এবং বাংলা ভাষাটাই একটা চাণ্ডাল ভাষা। বাংলা ভাষার প্রকৃতি বলতে কিছু নেই। আসলে বাংলা হচ্ছে বিভিন্ন ভাষার মিশ্রণ এবং বাংলা ভাষার প্রকৃতি বলতে যদি কিছু থাকে সেটাই হচ্ছে চাণ্ডালি ভাষা। আমি কবিতা বাংলা ভাষায় লিখতে চাই।
—————————————————————-
শামস আল মমীন: আমেরিকায় সাদা কালো সবাই ইংরেজি বলে; এর মধ্যেও কালোদের কথায় এবং লেখায় কিন্তু ওদের নিজস্ব ভাষাভঙ্গি আছে যা স্ট্যান্ডার্ড ইংরেজি থেকে একেবারে ভিন্ন।

সলিমুল্লাহ খান: ওটা করলে ওরা মারা যেতো। যেমন ওরা যখন লেখে ‘Lowd’ (Lord), হয়তো এটা হুবহু মুখের কথা নয়। কিন্তু কালোদের যে সমস্যা, তাদের যে ঐতিহাসিক সংকট এটা উচ্চারণের মধ্য দিয়ে ধরা পড়ে। আপনি ঠিকই বলেছেন ইংরেজি তো একটা ভাষা নয়, বহু ভাষা। আমি শুধু মেসেজটাই দিতে চেয়েছিলাম, বাংলা ভাষা বলে একটি বিশেষ ভাষা নেই, বাংলা বহু ভাষা।

শামস আল মমীন: আপনার এই চাণ্ডালি ভাষার বদনাম করেছে অনেকেই। তারা ঠিক এটাকে গ্রহণ করতে পারছে না। তাদেরকে আপনি কি বলবেন?

সলিমুল্লাহ খান: বদনাম যারা করে তাদের নাম বলাই ভালো। আপনি ভদ্রলোক তাই নাম বলতে চান না। আমার নাম বলতে আপত্তি নাই। যেমন হুমায়ুন আজাদ। বাংলা ভাষার একজন কবি এবং পণ্ডিত। উনি ঢাকার আঞ্চলিক ভাষা ভালই জানেন কিন্তু সাহিত্যের মূল ন্যারেটিভে তিনি এই ভাষা ব্যবহার করবেন না। কিম্বা সাহিত্য সমালোচনা এই ভাষায় করবেন না। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সাথে আমার পরিচয় ছিল। তাঁকে বলতে শুনেছি, বাংলা ভাষার একটা স্ট্যান্ডার্ড থাকা উচিৎ। আমি মনে করি তাই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ভাষার চিরকালীন কোন স্ট্যান্ডার্ড নেই। যেমন ষোড়শ শতাব্দীতে যা স্ট্যান্ডার্ড ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীতে তা আর স্ট্যান্ডার্ড থাকে না। এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর স্ট্যান্ডার্ড কিন্তু আজ আর স্ট্যান্ডার্ড নেই। এবং এই প্রক্রিয়াতে থেমে থাকা বলে কোন ব্যাপার নেই। এটা নিরন্তর চলছে। সৃষ্টিশীল লেখকরা কিন্তু ভাষা পরিবর্তনের উপর প্রভাব ফেলতে পারে, এবং আমি সেই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছি মাত্র। আমি চাণ্ডালি ভাষা লিখে যদি ব্যর্থ হই আমি একজন নগণ্য কবি ব্যর্থ হলাম। কিন্তু যদি সফল হই কিম্বা অন্য কেউ এই পথ অনুসরন করে তাহলে বাংলা ভাষার গতি পরিবর্তনের একটা সম্ভাবনা আছে।

শামস আল মমীন: আধুনিক কবিতায় ‘মুই’, ‘মোর’, ‘অরা’ এসব শব্দের ব্যবহার ঘটা করে নিষিদ্ধ ঘোষণা দেওয়ার পরেও আপনি এসবের পুনর্ব্যবহার করলেন কেন?

সলিমুল্লাহ খান: সমস্যা না থাকলে কোন সমাধান আসে না। বাংলা কবিতায় আমি একটা সমস্যা অনুভব করেছি। কবিতায় ‘মুই’, ‘মোর’ লেখা যাবে না, অর্থাৎ যারা এই নিয়ম বেঁধে দিয়েছিলেন, আমি মনে করি তারা কাজটা খুব তড়িঘড়ি করে করেছিলেন। তারা মনে করেছিলেন ‘মুই’ ব্যবহার করা অনাধুনিক আর ‘আমি’ ব্যবহার করাটা আধুনিক। আমি এটা অস্বীকার করি না। কিন্তু দেখা যায়, কোন কোন ক্ষেত্রে ‘মুই’ ব্যবহার না করলে ভাষা তার ব্যঞ্জনা হারিয়ে ফেলে। বাংলা ভাষার প্রকাশ ক্ষমতাকে যদি আমরা বাড়াতে চাই তাহলে তার সমস্ত সম্ভাবনাকে তলিয়ে দেখতে হবে। আমার ধারণা ‘মুই’ বা ‘মোর’ ব্যবহারের সমস্ত সম্ভাবনা নিঃশেষিত হয়ে যায় নি। যেমন এক কবিতায় আমি লিখেছি:
নতুন শহরে এসে টের পাই
বন্ধু নাই মোর বন্ধু নাই ।

এখানে “বন্ধু নাই আমার বন্ধু নাই” বললে ঐ বোধ আসে না যা ‘মোর’ বললে আসে। গদ্যে কিন্তু আমি নিজেই ‘আমি’ লিখছি, পদ্যে আবার ‘মুই’ লিখছি। যারা বলে দিয়েছেন ‘মুই’ ‘মোর’ শব্দ ব্যবহার করা যাবে না। আমি মনে করি, তারা প্রিম্যাচিউর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

শামস আল মমীন: The artist should not fear being considered absurd as long as the artistic efforts are sincere. ই. ই. কামিংসের এই উক্তি আপনার মনে আছে কি?

সলিমুল্লাহ খান: না । এই উক্তি আমার জানা ছিলো না। তবে কামিংসের সাথে আমি একমত হতে পারি। যদিও লোলে ‘সিনসিয়ার’ এবং ‘অ্যাবসার্ড’-এর অর্থ নিয়ে দ্বিমত হবেন, তর্ক করবেন।

শামস আল মমীন: সমালোচক মুসতাফা সাঈদ আপনার অনুবাদে অশ্লীলতার অভিযোগ এনেছেন (যথা: ‘তোর গল্প করতে পারি না ঈসা… হেন বিশপ নেই তোর পাছা মারে না।’ পৃ. ১৫) তাঁর মতে এটা ঠিক কবির উক্তি নয়, এখানে আপনার অতিরঞ্জন আছে।

সলিমুল্লাহ খান: পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলা দরকার, বইয়ের ৬০টা কবিতার মধ্যে ৪০টা আমি ইংরেজি থেকে করেছি, বাকিগুলার মূল জার্মান আমি পড়েছি। তবে এই কবিতাটা আমি অনুবাদ করেছি ইংরেজি থেকে। লাইনগুলো এরকম, Every Bishop sleeps with you. আমি আঞ্চলিক শব্দে এর অনুবাদ করেছি। এর চেয়ে বেটার এক্সপ্রেশন থাকতেও পারে। কিন্তু আমি যা করেছি সেটাকে আমি অশ্লীল বলব না।

শামস আল মমীন: আমার ধারণা, কবিতায় অশ্লীল বলে কিছু নেই। শিল্পসম্মত প্রয়োগই হচ্ছে মূল কথা। মুসতাফা সাঈদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, তিনি বর্তমান বিশ্বের আধুনিক কবিতা যদি নিয়মিত পড়ার সুযোগ পেতেন তাহলে হয়তো এই অভিযোগ করতেন না। মার্কিন এক বিখ্যাত কবি Etheridge Knight-এর একটি বিখ্যাত কবিতার কিছু অংশ মুসতাফা সাঈদ ও পাঠকদের জন্য তুলে দিলাম।

fuck marx and mao fuck fidel……
fuck joseph fuck mary fuck god jesus …
fuck the whole muthafucking thing
all i want now is my woman back
so my soul can sing.

সলিমুল্লাহ খান: মুসতাফা সাহেব এখানে রক্ষণশীল একটা অবস্থান নিয়েছেন। আমাকে অবলম্বন করে উনি সমাজে তাঁর নিজস্ব মত প্রকাশের চেষ্টা করেছেন। প্রতিদিন আমরা মুড়ি-মুড়কির মতো অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করি, কিন্তু লেখার সময় আমাদের হাত সংকুচিত হয়ে আসে। আমি মনে করি না এই কবিতায় কোন অশ্লীলতা প্রকাশ পেয়েছে। এখানে প্রকাশ পেয়েছে এক ধরনের সামাজিক নিন্দা ও ধিক্কার।

শামস আল মমীন: ভূমিকায় আপনি বলছেন, আপনার ভাবনার উপর ওলন্দাজ স্পিনোজার মতো একরোখা দার্শনিক ফরহাদ মজহারের প্রভাব আছে। ফরহাদ মজহারকে মুসতাফা সায়ীদ বলেছেন “একজন উদ্বাস্তুচিত্ত মানুষ আর তার এবাদতনামা বাংলা কাব্যের ইতিহাসে এক অট্টহাসি।” আপনার গুরুনিন্দাকে আপনি কিভাবে গ্রহণ করেন।

সলিমুল্লাহ খান: ফরহাদ মজহারের সাথে আমি ১০১টা বিষয়ে একমত নই। কিন্তু গুরু বলে কাকে?—যে আলো দেয়। ফরহাদ যখন আমেরিকা থেকে ফেরত গেলেন তখন আপনার মতো (আমার বুকসেলফ দেখিয়ে) এরকম দুই সেলফ নতুন বই নিয়ে যান। ফরহাদের যে বিশাল পড়াশোনা সেদিন পর্যন্ত সেরকম পড়াশুনা করা আর কোন লোকের সাথে আমার দেখা হয় নাই। ফরহাদের কবিতা যখন পড়লাম, গান যখন শুনলাম তখন আমার মনে হলো, ঢাকায় আমার পরিচিত কবি-সাহিত্যিক সবার চেয়ে এই উদ্বাস্তুচিত্ত লোকটিই উজ্জ্বল। তাঁর এবাদতনামা যদি অট্টহাসি হয় তাহলে আমাদের সাহিত্যে এখন অট্টহাসিরই দরকার। ফরহাদের কবিতা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং এই মতে আমি পৌঁছেছি আজ থেকে ২৩ বছর আগে এবং ফরহাদ আমাকে হতাশ করেন নি।

আমি আগেই বলেছি বের্টল্ট ব্রেখট আমার প্রিয় কবি। বাংলা ভাষা যদি জার্মান ভাষার মতো হতো তাহলে ফরহাদ আজকে পৃথিবীতে বিখ্যাত হতো। ফরহাদ বাংলা ভাষার একজন শ্রেষ্ঠ কবি এতে কোন সন্দেহ নাই। বর্তমান ৫ জন সেরা কবির মধ্যে ফরহাদ একজন এবং ফরহাদ আমার শক্র হলেও এটা বলতে হবে। অথবা আমি কবিতা বুঝি না এটাও হতে পারে।

শামস আল মমীন: কেউ কেউ আপনার এই চাণ্ডালি ভাষা ব্যবহারের সুনাম করেছে প্রচুর। এদের বেশির ভাগই তরুণ কবি, সমালোচক। অথচ বয়স্ক লেখকরাই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার বেশি—কারণটা কি?

সলিমুল্লাহ খান: সেটা সঠিক করে বলা মুশকিল। যেসব তরুণদের পছন্দ হয়েছে তাদের অনেকের সাথে আমার পরিচয় চিঠিপত্রে। যেমন ব্রাত্য রাইসু। তাঁর কবিতার মধ্যেও এই প্রয়াসটা আছে। আমাদের মধ্যে আলাপ করে কিন্তু এটা হয়নি। তাতে বুঝতে পারছি সময়ের যখন একটা চাহিদা দেখা দেয় তখন বিভিন্ন দিক থেকে তার প্রতিধ্বনি হতে থাকে। এবং দেখলাম আমার মত করে অনেকেই চিন্তা করছে। আমি বলব না তারা আমার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। অথবা আমিও তাদের দ্বারা প্রভাবিত হইনি। একটা কমন তৃতীয় ঘটনা দ্বারা আমরা প্রভাবিত হয়েছি।

এটাকেই আমি বলি সমকালীন বাংলা কবিতা বা ভাষার সংকট। আধুনিক বাংলা বলে যে ভাষাটা চালু রয়েছে, হুমায়ুন আজাদ যে ভাষায় লেখেন আর কি। তিনি বুদ্ধদের বসুর শিষ্য। হুমায়ুন আজাদ প্রতিভাবান মানুষ। কিন্তু প্রতিভাবান মানুষের হাতে ভাষাটা যখন দুর্বল থাকে তখন আমি বুঝতে পারি এ ভাষার সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে। অর্থাৎ এটাই বাংলা ভাষার লিমিট। যেমন আবদুল মান্নান সৈয়দ নিঃশেষিত হয়ে গেলেন। শুদ্ধতম কবি যখন তিনি লিখেছিলেন তখন সুধীন দত্তকে অনুসরণ করার চেষ্টা করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত সুধীন দত্তের যে মেধা সেটা মান্নানের নেই। সুধীন দত্তীয় বাংলা গদ্য আবদুল মান্নানের হাতে প্রাণহীন হয়ে গেছে। যেমন আকাশে ওড়ার সময় পাখিকে সুন্দর লাগে। সেই পাখি মাটিতে পড়ে যখন ধড়ফড় করে তখন প্রাণের মধ্যে শুধু বেদনাই জাগে। আমি যদি সুধীন দত্তকে আকাশে ওড়া কবুতর মনে করি তাহলে মান্নান সেই মাটিতে পড়া ধড়ফড় করা কবুতর।

বাংলা ভাষার সংকট থেকেই আমি এই চাণ্ডালি ভাষার দিকে গিয়েছি এবং দেখি আমি একা নই। ব্রাত্য রাইসু এবং আরো অনেক তরুণ এটাকে পছন্দ করছে। এতে প্রাণে এই আশা জাগে যে আমি ভুল পথে নেই। আর বুড়ারা বুঝতে পারছেন না কারণ তাদের সত্য বোঝার অক্ষমতা এবং স্বার্থপরতা। যেমন ধরুন, শামসুর রাহমান ৬০/৭০ টা বই লিখেছেন। তাঁর পক্ষে নতুনদের অভিনন্দন জানানো সম্ভব শুধু মুখে, কাজে নয়।

শামস আল মমীন: আল্লাহর বাদশাহি প্রকাশের আগেই ঢাকায় লেখকদের মধ্যে আপনার চাণ্ডালি ভাষার কথা নিয়ে চাপা গুঞ্জন চলছিল। সলিমুল্লাহ খান নিউইয়ার্কে গিয়ে বাংলা ভুলে গেছেন। বাংলা ভাষায় যে পরিবর্তন এসেছে উনি তার খোঁজ-খবর রাখেন না। তাঁদেরকে কি কিছু বলার আছে আপনার?

সলিমুল্লাহ খান: তাঁদেরকে কিছু বলার নেই, তবে তাদের জন্য একটা গল্প আছে। মধুসূদন দত্ত নামে বাংলা ভাষার একজন কবি ছিলেন, কেউ কেউ বলেন। আমি তাঁকে দেখিনি, কিন্তু বিশ্বাস করি তিনি ছিলেন। মেঘনাদ বধ কাব্য লেখার আগে তিনি কিছু নাটক-কবিতা লিখেছেন। তখন যদি কেউ বলতেন পয়ার কি মধুসূদন ভুলে গেছেন কিম্বা অমিত্রাক্ষর লেখার আগে বাংলা ভাষায় যে পুঁথি লেখা হতো সেটা তিনি জানেন না কিম্বা ভুলে গেছেন—মধুসূদন যে জবাব দিতেন আমি সেই জবাবই দিবো। আমি নিজেকে মধুসূদনের সাথে আপাতত তুলনা করছি না। মধুসূদন বাংলা ভাষায় অমিত্রাক্ষর চালু করেছেন এবং আমরা তা গ্রহণও করেছি। আমি যে কাজটা করেছি তা না জানার জন্য যতটা নয় তার চেয়ে বেশি অসন্তুষ্টির জন্য। স্বীকার করি, গত ১৫ বছরে সবার লেখা আমার পড়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু এর আগে তো বাংলা ভাষায় কিছু লেখা হয়েছে। এবং সেগুলো কিছু আমি পড়েছি।

শামস আল মমীন: আপনার ভূমিকায় লিখেছেন “পশ্চিম থাইক্যা আসা পচা মালের ভিড়ে আমরা বিস্তর তাজা প্রাণ হারাইয়া ফালাইছি। অহন ফ্রয়েড-লাকাঁ পড়ে দেখি সব শেষ হয় নাই। লেজে প্রাণ আছে।” প্রাণটা কার লেজে দেখলেন একটু খোলোসা কইরা কন দেখি।

সলিমুল্লাহ খান: লালন ফকির আমাদের দেশে এখন খুব আলোচিত। দুই বাংলার যতগুলো কবিতার এন্থোলজি আছে এগুলোতে অনেকের কবিতা থাকলেও লালনের কবিতা কোথাও স্থান পায়নি। লালনকে কোথাও কবি বলে স্বীকার করা হয় না, কিন্তু তাঁর গানকে স্বীকার করছে। তাঁর গান তো কবিতাও বটে, কিন্তু আমরা তা স্বীকার করতে পারছি না, তার মানে লেজের প্রাণটা স্বীকার করছি না। লেজে প্রাণ বলতে আমি বোঝাচ্ছি—লালনের কবিতা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কিম্বা ইংরেজ শাসনের উপর নির্ভর করেনি, কিন্তু সেগুলো টিকে আছে। কি করে তিনি টিকে থাকলেন? প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ লোক তাঁর আখড়ায় আসে। এই মানুষগুলো যার টানে আসে এটাকেই আমি বলছি লেজে প্রাণ। কারণ ঐ লোকগুলো খেতে আসে না, ওর মধ্যে একটা এসথেটিক আছে। এবং ওটাকেই আমি বলব আসল সাহিত্য। আমাদের সমাজে আমরা যারা কবিতা লিখছি তারা কৃত্রিম একটা জগতে বাস করি। এটাকে আমি বলছি পশ্চিম থেকে আসা পচা মাল।

শামস আল মমীন: মুসতাফা সাহেব আরো বলছেন, আপনি টের পাইলেন কিন্তু লাকাঁ পড়ার আগে টের পাইলেন না কেন?

সলিমুল্লাহ খান: লাকাঁ একজন ফরাসি লেখকের নাম। লাকাঁর জায়গায় যদি লিখতাম শেক্সপিয়র তাহলে মোস্তফা সাব কি এই প্রশ্ন করতেন? ঘটনাটা হচ্ছে গত দু’শ বছর আমরা শুধু ইংরেজের গোলাম ছিলাম না। পুরা ইউরোপের গোলাম ছিলাম। জ্ঞানের ক্ষেত্রে ইউরোপ যা অবদান রেখেছে এগুলো বাদ দিয়ে আমরা ইউরোপের বিরুদ্ধে এমনকি নিজেদের মধ্যেও টিকতে পারব না। লাকাঁ একটা নাম মাত্র। আমি এখানে দুটো কাজ করেছি। প্রথমটা, লাকাঁর প্রতি আমার ভক্তি প্রকাশ। দুই, শুধু পশ্চিমের দর্পনেই আমি টের পেলাম নিজেকে।

শামস আল মমীন: মুসতাফা সাহেবের শেষ কথা, আপনার লেখার উদ্দেশ্যই যেন প্রতিপক্ষের ভ্রান্ত প্রয়াসকে আঘাত করা। চোখে আঙুল দিয়ে নয়, শুধু যেন কান ধরে ভুলটি দেখিয়ে দেওয়া এরকম একটা কিছু। আপনি যা লিখছেন সেগুলো কি প্রাণের তাগিদেই লিখছেন, নাকি সাঈদের কথাই সত্য।

সলিমুল্লাহ খান: আমার মনে হয় দু’টাই সত্য। এখানে প্রতিপক্ষটা কে? প্রতিপক্ষ হচ্ছে যে ধারণাকে আমি ভুল মনে করি। কোন ব্যক্তিকে আমি প্রতিপক্ষ মনে করি না। যদি ঘটনাচক্রে কোন ব্যক্তি ঐ ভুল মতকে ধারণ করে আমি তাকেও আক্রমণ করতে পিছপা হই না। উদাহরণ দেই, প্রফেসর রাজ্জাক আমার খুব প্রিয় মানুষ, কিন্তু তাঁর মতের একটা ভুল যখন আমি পেলাম আমি তাঁর সমালোচনা করতে পিছপা হইনি। কিন্তু আমি রাজ্জাকবিরোধী নই।

শামস আল মমীন: আপনি তো অনেকদিন থেকেই কবিতা লিখছেন। আপনার প্রথম বই এক আকাশের স্বপ্ন-র ভাষা এবং দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আজকের ভাষা এবং দৃষ্টিভঙ্গি আপনার কাছে কতটা ভিন্ন মনে হয়?

সলিমুল্লাহ খান: বেশ ভিন্ন মনে হয়। কখনো কখনো অনুতাপ করি কিছু কবিতার দুর্বল এক্সপ্রেশনের জন্য। ঐ বই সম্পর্কে আমার বিশেষ কোন দাবি নাই। তবে ৩/৪ টা ভালো কবিতা আছে বলে আমি মনে করি। আমার মৌলিক কাব্যবিশ্বাস বদলায় নি। তবে ভাষা বলদেছে। এটাকে আমি উন্নতির লক্ষণ বলেই মনে করি।

শামস আল মমীন: অক্টোবর ’৯৯-এ ভোরের কাগজে কবি নুরুল হুদা সত্তরের কবিতাকে রাজনীতির কবিতা উচ্চকণ্ঠের কবিতা বলে মত প্রকাশ করেন এবং ২৯ অক্টোবর সংখ্যায় সত্তরের ১২ জন কবি এর প্রতিবাদ জানান। আপনি ঐ সময়ের কবি হিসাবে কিভাবে এর মূল্যায়ন করেন?

সলিমুল্লাহ খান: আমি মনে করি নুরুল হুদার বক্তব্য সত্য। সত্তর দশকে যাঁরা কবি হিসাবে পরিচিত যেমন মোহন রায়হান, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ—এঁরা উচ্চকণ্ঠের কবি। আমি নিজেও কিছু উচ্চকণ্ঠের কবিতা লিখেছি, কিন্তু আমি উচ্চকণ্ঠের কবি নই। আমি ওঁদের চেয়ে ছোট, কিন্তু ভিন্ন ধরনের কবি। যদি মোহন-রুদ্রকে আমরা কবি হিসাবে স্বীকার করি তবে স্বীকার করতেই হয় ওরা উচ্চকণ্ঠের কবি। কিন্তু শিহাব সরকার, আবিদ আজাদ কিম্বা আবু করিম উচ্চকণ্ঠের কবি ছিলেন না। এ ক্ষেত্রে নুরুল হুদার বক্তব্য যেমন সত্য আবার সেই ১২ জন কবির প্রতিবাদও সত্য। তবে আমার ধারণা সত্তরের কবিতা দুর্বল। রুদ্র একজন ভালো কবি (ও আমার বন্ধু ছিল), ওর কিছু ভালো কবিতা আছে। সব বাদ দিয়েও আমি মোহন ও রুদ্রকে ভালো কবি বলে মনে করি। যদিও মোহন এখন ভালো কবিতা লিখতে পারছে না।

শামস আল মমীন: প্রথম আলো’র এক টেবিল বৈঠকে কবি সরকার আমিন তরুণ কবিদের কৃতিত্বকে এ ভাবে ব্যাখ্যা করছেন, প্রবীণ কবিদের নাকচ করার স্পর্ধা, তরুণদের হাতে কবিতা ছন্দের দাসত্ব থেকে মুক্তি পাচ্ছে, সম্পাদকীয় ভাষা থেকে কবিতা সরে এসেছে। তাঁর এই ব্যাখ্যা কবিতার জন্য কতটা সঠিক?

সলিমুল্লাহ খান: তরুণ কবিরা প্রবীণ কবিদের চিরকালই নাকচ করে। আমিন ভাবছন্দ বলতে কি বোঝাচ্ছেন ব্যাখ্যা না করলে তা আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। প্রচলিত ছন্দকে নাকচ করা যায় না, এগুলো এবজর্ভ করতে হয়। কোন প্রতিভাবান কবি যদি নতুন কিছু করে আমি তাকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত আছি।

শামস আল মমীন: একই বৈঠকে টোকন ঠাকুর বলছেন, কবিদের মধ্যে পার্থক্য এতই বেশি যে, কবিতা কোন পথে যাচ্ছে বুঝে উঠতে পারছি না। চঞ্চল আশরাফ বলছেন, কবিতা নিয়ে গত এক দশকে কথা যতো হয়েছে সে তুলনায় ফসল কম। উত্তরাধুনিকতার নামে কোন বিনির্মাণ হচ্ছে না বরং পুনর্নির্মাণ হচ্ছে। নতুনদের এই ভাবনাকে আপনি কি ভাবে দেখেন?

সলিমুল্লাহ খান: কবিতার গতি পরিবর্তন হচ্ছে এটা সঠিক। কিন্তু কোন দিকে হচ্ছে? এখনো আমার চোখে কোন কবি পড়েনি যিনি তিরিশের কবিতা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন। যাঁরা নিজেদের উত্তরাধুনিক বলে দাবি করছেন এদের মধ্যে একজন কবিকেও দেখি না যিনি জীবনানন্দের চেয়ে ভিন্ন ধরনের কবিতা লিখছেন। বিষ্ণু, সুধীন, অমিয় বুদ্ধদের কবিতায় একটু একটু রাজনৈতিক কথা বললেও এরা মূলত প্রতিক্রিয়াশীল কবি। আমি আক্ষরিক অর্থেই বলছি। এরা একটা বিশেষ সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে। মজার ব্যাপার, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় এরা এক ধরনের নিরাপত্তা অবলম্বন করেছেন। কিন্তু নজরুল পুরোপুরি রাজনীতিতে জড়িয়ে ছিলেন। সত্তরের কবিরা চেষ্টা করেছেন। উত্তরাধুনিক কবিদের প্রধান সংকট হচ্ছে এরা শিক্ষিত হয়ে ওঠেনি। কিন্তু এরা টের পেয়েছেন শিক্ষিত হওয়ার দরকার আছে। এরা অনেকেই ইংরেজি বই পড়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু পড়ে বোঝেন না। ইংরেজি বুঝতে হলে বিদ্যার দরকার। অনুবাদের সময় অনুবাদক সচেষ্ট থাকেন যাতে অনুবাদ ভুল না হয়। কিন্তু ভুল অনুবাদ হলে কবিতা বেটার হয়। আমাদের কবিতা বেশির ভাগই ভুল অনুবাদ হয় এবং সে কারণেই এগুলো মৌলিক। যেমন নুরুল হুদা বলেন, বাংলা কবিতার ইতিহাস হচ্ছে অনুবাদের ইতিহাস। হুদার মুখে শুনেছি, রফিক আজাদ ব্রিটিশ কাউন্সিলে গিয়ে পোয়েট্রি পত্রিকা থেকে কবিতা পড়ে সাথে সাথে একটা বাংলা কবিতা লিখতেন। শহীদ কাদরীও এ কাজ বিস্তর করেছেন। এই দুই কবির কবিতা যদি কেউ অনুসন্ধান করেন তাহলে বুঝতে পারবেন তাঁদের অর্ধেক কবিতা ইংরেজি কবিতা থেকে নেওয়া। কিন্তু আমরা এটাকে বলি ইন্সপায়ারড অনুবাদ, আক্ষরিক অনুবাদ নয়। কিন্তু প্রকৃত উত্তরাধুনিক কবি যেমন ফরহাদ মজহার ও সুব্রত গোমেজ এরা বুঝতে পেরেছেন আমাদের আবার ময়মনসিংহ গীতিকা পড়তে হবে এবং ট্রেডিশনাল উৎসগুলোতে ফিরে যাওয়া, এগুলোকে পুনর্বিবেচনা করা এবং পুণর্নির্মাণ করা। আমি ফরহাদ এবং সুব্রতের মধ্যে এই প্রতিভা দেখি।

শামস আল মমীন: বছর দুয়েক আগে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে উত্তরাধুনিক কবিতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। তিনি বলেন, এটা থিওরিতে যেমন প্রাকটিক্যালি এর তেমন ভিন্নরূপ আমার চোখে পড়ে না। আপনার মতামত কি?

সলিমুল্লাহ খান: ফরহাদ মজহারের এবাদতনামা আমার কাছে পোস্টমডার্ন কবিতার একটা উজ্জ্বল উদাহরণ। আমি মনে করি, তিরিশের আধুনিক কবিতার ধারাটি এখন প্রাণহীন হয়ে গেছে। আমাদের সবচে ভালো আধুনিক কবি সিকদার আমিনুল হক। ছন্দে তাঁর অপূর্ব দক্ষতা কিন্তু তাঁর মধ্যে নতুন কোন চিন্তা নাই। তিনি আত্মরতিপরায়ণ হয়ে উঠেছেন। মদ্যপান করা, নারীর বক্ষ উম্মোচন এগুলো তাঁর কবিতার বিষয় হয়ে উঠেছে। সেজন্যই বলছি, কবিতার এই ধারাটি মরে গেছে। ফরহাদ সেলফ কনশাসলি পোস্টমডান কবি। তাঁর এবাদতনামায় আধুনিক কবিতাকে পুরোপুরি রপ্ত করার পর তাকে প্রত্যাখ্যান এবং ট্র্যাডিশনাল কবিতা থেকে আহরণের চেষ্টা আছে। ভোরের কাগজ এবং প্রথম আলোতে যে নতুন কবিদের কবিতা পড়েছি তার উপর ভিত্তি করেই আমার এ মন্তব্য। এর মধ্যে যারা বই প্রকাশ করেছেন কিন্তু যাদের লেখা আমি পড়িনি তারা আমার মন্তব্যের মধ্যে পড়েন না।

শামস আল মমীন: পাঠক কবিতা থেকে সরে যাচ্ছে। কারণ বর্তমান বাংলা কবিতা তারা বোঝে না। কবি ফরিদ কবিরের ধারণা ছন্দ বুঝলে তারা কবিতার ভেতরে পৌঁছাতে পারবে। এই ধারণাকে মনে রেখে তিনি ভোরের কাগজে ছন্দ এবং তার পর্ব ভেঙে পাঠককে বোঝানোর চেষ্টায় দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন। প্রশ্ন, পাঠকের ছন্দ বোঝার দরকার আছে কি?

সলিমুল্লাহ খান: ছন্দজ্ঞান থাকা ভালো, কিন্তু ছন্দে পণ্ডিত হতে হবে এমন কোন কথা নেই।

শামস আল মমীন: কবিতার ভাষা দশকে দশকে বদলায়, মানুষের মুখের ভাষা এতো তাড়াতাড়ি বদলায় না। অর্থাৎ কবিতা এগুচ্ছে পাঠককে পেছনে ফেলে। এটাকে কি ভাবে ব্যালান্স করা যায়?

সলিমুল্লাহ খান: আধুনিক কবিদের একটা সংকট আছে। ইনডিভিজুয়ালের ভাষা যতো দ্রুত বদলায় সাধারণের ভাষা ততো দ্রুত বদলায় না। দু’জন ব্যক্তি যখন তাদের নিজ ভাষা তুলে ধরেন তখন মানুষ দ্বন্দ্বে পড়ে যায়। কোনটা সঠিক। ভাষায় যে দ্বিত্ব আছে এটা প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তার বহু তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। ভাষা কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। কিন্তু প্রত্যেক কবিই চায় তার নিজস্ব ভাষা তৈরি করতে। অনেকে বলেন, রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বাংলা ভাষা কল্পনা করা যায় না। এটা ভুয়া কথা। ভাষা বদলায় কবিও বদলায়। এটা ঠিক। কিন্তু এই দুইয়ের মাত্রা একটু আলাদা। একজন রবীন্দ্রনাথ আসা যাওয়ায় বাংলা ভাষার কিছু যায় আসে না। বাংলা ভাষা তার চেয়ে বড়।

শামস আল মমীন: শামসুর রহমান, শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ ছাড়া তিনজন কবির নাম বলেন যাঁদের লেখা টিকে যাবে।

সলিমুল্লাহ খান: ফরহাদ মজহার। আবুল হাসান এবং নির্মলেন্দু গুণের কিছু কবিতা টিকে যাবে, যদিও গুণ অনেক বাজে কবিতা লিখেছেন। যদি অনুমতি দেন, সিকদার আমিনুল হকের নামও উল্লেখ করতে চাই, যদিও তাঁর কবিতার দর্শন আমার পছন্দ নয়। যাদের আমি বুর্জোয়া কবি মনে করি সিকদার হচ্ছেন তাদের রাজা। কেউ যদি আমাকে বলে, কবি হওয়া বলতে কি বোঝায়? আমি বলবো, সিকদারের জীবন ফলো করো। চেষ্টা করে তিনি ভালো কবি হয়েছেন। কেউ কেউ আমাকে বলে তুমি তো ভালো ছাত্র, তোমাকে দিয়ে কবিতা হবে না। কথাটা আমি প্রায় বিশ্বাস করতে বসেছিলাম। আমাকে উদ্ধার করেছেন সিকদার। তার কাছ থেকে দুটো জিনিস আমি শিখেছি। ১. কবিতায় কি লিখতে নেই; ২. জন্মগত প্রতিভা বলে কিছু নেই।

শামস আল মমীন: আহমদ ছফা কবি হিসাবে কেমন?

সলিমুল্লাহ খান: মানুষের নানা রকম ফ্যান্টাসি থাকে। কবিতা লেখা ছিল তাঁর এক ধরনের ফ্যান্টাসি। আমি তাঁকে বহুবার জিজ্ঞেস করেছি, আপনি পাগলামি করেন কেন? তিনি বলেন, পাগলামি না করলে টিকতে পারতাম না। যেহেতু পাগলামি করে তিনি সব জায়গায় পাত্তা পেয়েছেন তাঁর ধারণা কবিতাতেও তিনি পাত্তা পাবেন। কবিতার জগৎ খুব নিষ্ঠুর। তাঁর প্রথম বই জল্লাদ সময়-এ বেশ কয়েকটা ভালো কবিতা আছে, কিন্তু কবিতার যে ভাষা, প্রকরণ, আধুনিকতা ওটা তিনি কোনদিন ধরতে পারেন নি।

শামস আল মমীন: আপনার লেখা এবং বক্তৃতায় দেখা যায় আপনি সব সময় ইন্টেলেকচুয়ালি টারবুলেন্স সৃষ্টি করেন যেটা অনেকেই মেনে নিতে পারেন না। যেমন “অমর্ত্য সেনের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি’র ভাষা প্রসঙ্গে: কি আনন্দ সন্তান ধারণে?” বক্তৃতায় লালন ফকিরকে রবীন্দ্রনাথের সমকক্ষ কিম্বা উপরে তুলে ধরেছেন (বক্তৃতা, বস্টন, ), বা রাজ্জাক সাহেবের উপর যে প্রবন্ধ লিখেছেন… ইত্যাদি।

সলিমুল্লাহ খান: ল্যাংস্টন হিউজেস-এর কবিতা থেকে উদ্বৃতি দিয়ে বলি: A women does the best she can. এর সাথে যোগ দিয়ে আমি বলি So does a man.
—————————————————————-
রবীন্দ্রনাথে ঈশ্বরের যে ধারণা আমরা পাই তার চেয়ে লালনের ধারণাটি দার্শনিক অর্থে অনেক বেশি গভীর। আমার বক্তব্য ছিল এই, এবং এখনো আমি এই বক্তব্যে অটল। লালনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের তুলনার কোনো সুযোগই নাই। পাশ্চাত্যের পণ্ডিতেরা যেমন এডওয়ার্ড সি. ডিমোক, জুনিয়র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আধুনিক বাঙলার শ্রেষ্ঠ বাউল উপাধি দিয়েছিলেন। এই উপাধি হাস্যকর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালন ফকিরের পায়ের কাছে বসারও যুগ্যি নন।
—————————————————————-
আমার কাজ হচ্ছে কমিউনিকেট করা। শামসুর রাহমান বলতে পারেন আপনি স্টান্ট দিয়ে কথা বলেন কেন? আমার কথা হচ্ছে, আমি সত্য বলছি কি না। লালন ফকিরকে নিয়ে কেউ যদি কখনও চিন্তা না করে তার পক্ষে আমার কথা বোঝা সম্ভব নয়। বস্টনে বক্তৃতার সময় আপনিও উপস্থিত ছিলেন। ঐ সময় ফরিদা পারভিনের গাওয়া লালন ফকিরের ‘পাবে সামান্যে কি তার দেখা/বেদে নাই যা রূপরেখা’ গানটি বাজিয়ে শোনাই এবং সেই গানের ব্যাখ্যা করি। রবীন্দ্রনাথে ঈশ্বরের যে ধারণা আমরা পাই তার চেয়ে লালনের ধারণাটি দার্শনিক অর্থে অনেক বেশি গভীর। আমার বক্তব্য ছিল এই, এবং এখনো আমি এই বক্তব্যে অটল। লালনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের তুলনার কোনো সুযোগই নাই। পাশ্চাত্যের পণ্ডিতেরা যেমন এডওয়ার্ড সি. ডিমোক, জুনিয়র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আধুনিক বাঙলার শ্রেষ্ঠ বাউল উপাধি দিয়েছিলেন। এই উপাধি হাস্যকর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালন ফকিরের পায়ের কাছে বসারও যুগ্যিও নন। আমার উদ্দেশ্য ইন্টেলেকচুয়াল সৃষ্টি করা নয়, বরং মানুষকে চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করা। মানুষ যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন পাছায় লাথি মেরে জাগিয়ে তুলতে হয়। আমার লেখাগুলো পাছায় লাথি মারার মতই হয়। আমি জানি, অমর্ত্য সেন আমার লেখার জবাব দেবেন না, কেউ যদি আমাকে বলেন, অমর্ত্য সেন সম্পর্কে তোমার মন্তব্য ঠিক নয় আমি তার জবাব দিতে রাজী আছি। কিন্তু এই প্রশ্নে কখনই একমত হবো না যে তাঁর সম্পর্কে লেখা যাবে না, যেহেতু তিনি অর্থনীতিবিদ, ভাষাবিদ নন।

শামস আল মমীন: আলবেনীয় কবি ইসমাইল কাদারে বর্তমানে ফ্রান্সে ১৯৫০ সনে মস্কোর গোর্কি ইনস্টিটিউটে সাহিত্য পড়তে যান। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “মস্কোয় আমি খুব দ্রুত অনুভব করলাম সাহিত্য সম্পর্কে আমার অধ্যাপকদের চেয়ে আমি অধিক অবগত।” ছাত্রজীবনে আপনার এরকম অভিজ্ঞতা কখনো হয়েছে।

সলিমুল্লাহ খান: তা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এক ইংরেজ লেখকের বই পড়াচ্ছেন। আমি বুঝতে পারছি তিনি বইটির মর্মকথা বুঝতে পারেন নি। আরেক শিক্ষক A text book of Jurisprudence (4th edition) বইটি অনুবাদ করে “ব্যবহার শাস্ত্রের বিজ্ঞান” শিরোনামে নিজের নামে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশ করেন। আমি তখন দ্বিতীয় বর্ষ অনার্সের ছাত্র। সভ্যতা নামে এক পত্রিকায় বইটির রিভিউ লিখলাম। অর্থাৎ জালিয়াতিটা ধরিয়ে দিলাম। পত্রিকাটি যখন মাস্টারদের হাতে আসে তাঁরা তো মহা ক্ষ্যাপা। এই কারণে আমাকে অনার্সে ফাস্ট ক্লাস দেওয়া হয় নি। আরো আপত্তিকর ঘটনা হলো, বইটির ভূমিকা তিনি এমনভাবে লিখেছেন যে পড়ে মনে হবে এটা তাঁর বহু বছরের গবেষণার ফল। তাঁর শালা দুলাভাই তাকে নানা ভাবে সাহায্য করেছেন, তিনি তাও উল্লেখ করেন।

শামস আল মমীন: সৈয়দ জামালউদ্দিন আফগানি সম্পর্কে আপনি বলেছেন, “জামাল লেখাপড়া যতটা জানতেন ততটা লিখে যাননি এটাই আমাদের পোড়া কপাল।” আপনার বেলাতেও কি আমরা একই রকম দুঃখ করবো?

সলিমুল্লাহ খান: হজরত মোহাম্মদ, গৌতম বুদ্ধ, সক্রেটিস, লালন ফকির এঁরা কেউ নিজে কিছুই লিখে যান নি। তাঁদের কথা লিখেছেন অন্যরা। আমরা লেখার যুগের মানুষ। বলার মধ্যে আমার সব ইন্দ্রিয় যেভাবে ইনবলভড হয় লেখার সময় তা হয় না। প্রথমে আমি চিন্তা করি কথার মাধ্যমে তারপর মাথায় ঘুরতে থাকে সেটা কিছুদিন এবং একদিন লিখেও ফেলি। কিন্তু কেন জানি লেখা আমার জন্য কঠিন ব্যাপার।

শামস আল মমীন: আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্বন্ধে কিছু বলবেন ?

সলিমুল্লাহ খান: আমি সার্বক্ষণিক লেখক হতে চাই। আমি বুঝতে পেরেছি লেখা ছাড়া আমার পক্ষে আর কিছু করা সম্ভব নয়। কিন্তু লেখার উপর ঈমান আনতে পারছি না। কারণ লিখে ভাত জোগাড় করা মুশকিল। নিউইয়র্কে আসার আগেও আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতাম। জীবিকার প্রয়োজনে হয়তো মাস্টারিতে আমাকে আবার ফিরে যেতে হবে। আমি না চাইলেও হয়তো কেউ আমাকে টেনে নিয়ে ছাত্রদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিবে। আর আমি অনর্গল মিথ্যা কথা বলে যাব। ঘরে ফিরে আবার অনুতাপ করবো।

শামস আল মমীন: আমাদের প্রধান কবিদের কবিতা নিয়ে কিছু লিখবেন কি?

সলিমুল্লাহ খান: আমি মনে করি, আমরা যা চিন্তা ভাবনা করি তার সর্বোচ্চ ব্যবহার হওয়া উচিৎ। দর্শন ও সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ে আমাদের মৌলিক চিন্তা ভাবনাগুলো নিয়ে কিছু লিখতে চাই এবং সাহিত্যও আমার ভাবনার একটা অংশ। The Unconsciousness from Freud to Lacan এই শিরোনামে ফ্রয়েড আনকনশাস বলতে কি বুঝতেন ফ্রয়েডের অনুসারীরা কি বুঝেছেন এবং লাকাঁ কি করে সেই ধারণার পরিবর্তন করেছেন এই নিয়ে কয়েকটা প্রবন্ধ লিখতে চাই। আমি মনে করি দর্শনে বিশ্বব্যাপী আমাদের অবদান রাখার সময় এসেছে। কবিতা নিয়ে প্রবন্ধ আমার বোধ হয় আর লেখা হবে না। কারণ আমার চিন্তার দিগন্ত সরে যাচ্ছে।

নিউইয়র্ক, এপ্রিল ২০০০

 

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: শামস আল মমীন |

 

বিডিনিউজ, আর্টস, ১৮ আগস্ট ২০১০

আদমবোমা (৩) । আদমবোমা না স্বাধীনতা-ব্যবসায়

আত্মঘাতী বোমা প্রসঙ্গে তালাল আসাদের বক্তব্য বিচার

talal-a-1.jpg
তালাল আসাদ, ২০০৮

নতুন ইয়র্ক নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিষয়ের অধ্যাপক তালাল আসাদ ২০০৬ ইংরেজি সনের মে মাসে কালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবিন নামক পরিসরে তিনটি বক্তৃতায় আত্মহত্যাকারী বোমা আক্রমণ বিষয়ে বিচার ও আলোচনা করিয়াছিলেন। পরের বৎসর নতুন ইয়র্কের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সেই বক্তৃতামালা লইয়া একখণ্ড ছোট মাপের বই ছাপাইয়াছেন। প্রকাশিত প্রথম দুই বক্তৃতায় তালাল আসাদ আলোচনা করিয়াছিলেন দুই প্রশ্নের: পশ্চিম জগতের নীতি-নির্ধারকরা ‘সন্ত্রাসবাদ’ বা ‘ত্রাসনীতি’ বলিতে কী বোঝেন আর তাঁহাদের বিচারে কোনো কোনো মানুষ কেনই বা ত্রাসনীতির চরম প্রকাশস্বরূপ আত্মহত্যার মতন বোমা ফাটায়।
—————————————————————–
কালো মানুষ কালো মানুষকে আদমবোমায় আঘাত করিলে—যেমনটি শ্রীলঙ্কায় তামিল ও সিংহলিদের যুদ্ধে হইতেছে কিংবা ঘটিতেছে এরাকি স্বাধীনতাকামীদের সহিত সেই দেশের মার্কিন সহযোগীদের সশস্ত্র সংঘাতে—পশ্চিম জগতের মানুষজন তেমন শিহরণ বোধ করে না। অথচ অন্য সময়—যখন কালো মানুষের দল এয়ুরোপের কোনো কোনো যোদ্ধা কিংবা এয়ুরোপীয় বংশের কাহাকেও হামলা করিলে—তাহারা ঢের বেশি শিহরিত হয়।
—————————————————————-
তালাল বইআমি ২০০৭ সনের শেষের দিকে এই দুইখানা বক্তৃতা লইয়া দুই আলোচনা করিয়াছিলাম। তাহার কিছু কিছু সমালোচনাও কেহ কেহ প্রকাশ করিয়াছিলেন। আমি নিজেও এই জাতীয় বোমা আক্রমণ সমর্থন করি কিনা প্রায় সকলেই এই আশঙ্কাজাত প্রশ্ন করিয়াছিলেন। ইহার উত্তর দেওয়া আমার মনে হইয়াছিল অনাবশ্যক। তালাল আসাদের লেখাতেই বরং ইহার উত্তর খোঁজা যাইতে পারে। জ্ঞানী সমালোচকদের জিজ্ঞাসার জওয়াব খোদ তালাল আসাদই উত্তম দিয়াছেন বলিয়া আমার মনে হইয়াছে। এক কথায়,প্রশ্নটা সমর্থনের বা বিরোধের নহে,উত্তরটাই অর্থের।

তালাল বলিয়াছেন তিনি নিজেও তাঁহাদেরই দলে যাঁহারা যুদ্ধে ব্যবহৃত সাধারণ বা গুচ্ছ (cluster) বা নিশ্ছিদ্র (carpet) প্রভৃতি বোমার তুলনায় আদমবোমায় বেশি শিহরণ বোধ করেন। শিহরণ বা ইংরেজি ‘হরর’ কথা দিয়া তিনি এমন কোনো প্রতিক্রিয়ার কথা বলিতেছেন যাহা ঠিক আতঙ্ক নহে। আর আতঙ্ক বলিতে ‘ভয়’ নামক যে অনুভূতির চরম প্রকাশ চিহ্নিত হয় সেই ভয়ও ঠিক নহে। সুতরাং সমর্থনের প্রশ্নই উঠিতেছে না।

পার্থক্যের মধ্যে, তালাল আসাদ আর দশ পশ্চিমা বিশেষজ্ঞ বা প্রাচ্য বিশারদের মতন নিতান্ত সমর্থন করি না বা নিন্দা করি বলিয়া তুষ্ট থাকিতে চাহেন না। পশ্চিমা পণ্ডিতদের এক বড় অংশই আত্মহত্যা বা আদমবোমার নিন্দা করিয়া বলেন এই বোমাবাজি কাজটি যাহারা করে তাহারা সভ্য নহেন,তাহারা ‘অসভ্য’ (বা বড়জোর ‘বর্বর’)। অর্থাৎ আদমবোমা ব্যাপারটি সভ্যতা ও বর্বরতার মধ্যকার সংঘর্ষ। শুনিতে ভালো লাগিবে না বিধায় মধ্যে মধ্যে তাঁহারা ‘সভ্যতার সহিত সভ্যতার সংঘাত’ বা এই জাতীয় কিছু কথা ব্যবহার করিয়া থাকেন। তালাল তাঁহাদের নিকুচি করেন।

পশ্চিমা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এক বড় অংশ একই সঙ্গে এই কথাও বলেন যে আত্মহত্যা বোমা কেবল বিশেষ এক সভ্যতার—যাহার নাম এক্ষণে এসলামি সভ্যতা—অন্তর্গত সত্য। তালাল আসাদ এই মতের পোষকতা করেন না। তিনি মনে করেন আদমবোমা কোনো ধর্ম বা সভ্যতাবিশেষের অন্তর্গত সত্য নহে, ইহার গোড়া দেখিতে হইবে বিশেষ ঐতিহাসিক পরিস্থিতির মধ্যে। যতদিন আমরা ইহা বুঝিতে না পারিব ততদিন আমরা ইহার হাত হইতে নিস্তার পাইব না।

ত্রাসনীতি ও আদমবোমার ত্রাসনীতি—এই দুই প্রশ্নের গোড়ায় একই পদ্ধতি কাজ করিতেছে। সকলেই প্রশ্ন করিতেছেন: বোমারুর ব্রত,মতলব বা প্রবর্তনাটি কী বস্তু। তাহারা কী কারণে বা কোন অকারণে এহেন গর্হিত কাজে পৃথিবী নোংরা করিতেছে? তালাল আসাদ তাঁহার তিন নম্বর বক্তৃতায় সেই প্রশ্ন সম্পর্কেই প্রশ্ন তুলিয়াছেন।

তিনি বলিতেছেন: প্রশ্ন কেবল বোমারুর মতলব সন্ধানের মধ্যে সীমিত রাখায় ফল হইতেছে না। প্রশ্ন করা উচিত আমাদের মধ্যে কেন এই শিহরণ জাগিতেছে? কেন আমরা যাঁহারা বোমার খবর শুনি বা ছবি দেখি তাঁহারা এমন করিয়া কাঁপিয়া উঠি? আসাদের ধারণা, এই প্রশ্নটিও যদি একই সঙ্গে না করা হয় তো ঘটনার পুরা ছবি ধরা পড়িবে না।

তালাল আসাদ দ্বিতীয় এয়ুরোপীয় যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ কিংবা বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সকল জায়গা হইতে উদাহরণ সমবায় করিয়া দেখাইতেছেন শিহরণ নামক প্রতিক্রিয়ার দুই পর্ব। প্রথম পর্ব যখন ঘটনা ঘটে তখনকার। ইহাতে সঙ্গে সঙ্গে যে প্রতিক্রিয়া হয় তাহাকে সচরাচর বলে অবাক কিংবা হতবাক হওয়া। পরে যখন সেই ঘটনার স্মরণ কিংবা বিবরণ দেওয়ার চেষ্টা হয় তখন ঘটে দ্বিতীয় পর্ব।

কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ এই শিহরণের কারণ খুঁজিয়াছেন ঘটনার আকস্মিকতার মধ্যে, বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতন বিস্ফোরণের মধ্যে। আবার কেহ কেহ ইহার কারণবীজ খুঁজিয়াছেন আক্রান্ত আর আক্রমণকারীর রক্তমাংস একসঙ্গে জড়াজড়ি করার ঘটনার মধ্যে। ১৭ শতকের ইংরেজ মহাকবি জন মিল্টনও এই জড়াজড়ি দেখিয়াছেন। কিন্তু তাঁহার শিহরণ হয় নাই। (মিল্টন ১৯৮২: ৮৪) এই শিহরণের উৎস বা শিকড় ব্রিটিশ পণ্ডিত জ্যাকুলিন রোজ (Jacqueline Rose) সন্ধান করিয়াছিলেন এই নৃশংস মিলনের ভিতর। প্রচলিত যুদ্ধের নৃশংসতা হইতে এই নৃশংসতার একপ্রস্ত পার্থক্য শ্রীমতি রোজ দেখিয়াছিলেন খোদ আক্রমণকারীর পরিকল্পিত মৃত্যুর মধ্যে। দুঃখের মধ্যে, তিনিও সেই তদন্ত সম্পূর্ণ করেন নাই। (রোজ ২০০৪; দেখুন, আসাদ ২০০৭: ৬৫-৬৭)


তালাল আসাদ মনে করেন জ্যাকুলিন রোজের পরিত্যক্ত প্রথম প্রশ্নের পথেই সত্যের সন্ধান পাওয়ার সম্ভাবনা অধিক। শ্রীমতি রোজের দ্বিতীয় প্রশ্ন সেই পুরাতন পথে ফিরিয়া যাওয়া মাত্র। নিজেকে বাঁচাইয়া শত্রু নিধন করিবার তুলনায় নিজের প্রাণ দিয়া শত্রু সংহার করা কেন নীতির বিচারে নিকৃষ্টতর গণ্য হইবে? ইহাই ছিল শ্রীমতি রোজের দ্বিতীয় প্রশ্ন। আসাদ দেখিতেছেন, ইহার মর্মকথাও অপরাপর পশ্চিমা বিশেষজ্ঞদের প্রশ্নের অন্যথা নহে: আত্মহত্যাকারীর নৈতিক অবস্থান, তাহার পাপ, তাহার অপরাধ, তাহার বর্বরতা বা অসভ্যতার পরিমাপ জানাই ইহার নিহিত উদ্দেশ্য।

অথচ প্রকৃত প্রস্তাবে ঘটনার সাক্ষী বা দর্শক যে তাহার মনের ভাব কোন অবস্থায় থাকে জানিবার বিষয় তাহাই। হিরোশিমা কি নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফুটিয়াছিল কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়া। আজও দুনিয়ার এই দেশে সেই দেশে মাটিতে পুঁতিয়া রাখা মাইন শত শত মানুষ, শিশু-যুবা-বৃদ্ধ নির্বিশেষে, পঙ্গু কিংবা হত্যা করিতেছে। তাহাতেও বিপুল শিহরণ ঘটে। কিন্তু তাহার তুলনায় আদমবোমার শিহরণ অধিক কেন?

আরো প্রশ্ন করিতে হয়। কালো মানুষ কালো মানুষকে আদমবোমায় আঘাত করিলে—যেমনটি শ্রীলঙ্কায় তামিল ও সিংহলিদের যুদ্ধে হইতেছে কিংবা ঘটিতেছে এরাকি স্বাধীনতাকামীদের সহিত সেই দেশের মার্কিন সহযোগীদের সশস্ত্র সংঘাতে—পশ্চিম জগতের মানুষজন তেমন শিহরণ বোধ করে না। অথচ অন্য সময়—যখন কালো মানুষের দল এয়ুরোপের কোনো কোনো যোদ্ধা কিংবা এয়ুরোপীয় বংশের কাহাকেও হামলা করিলে—তাহারা ঢের বেশি শিহরিত হয়।

কিন্তু কেন? পরদেশ দখল করিয়া শাসন ও শোষণ করিবার ইতিহাসেই ইহার গোপন কথা নিহিত আছে—তালাল আসাদের এই কথা সত্য। তবুও আসাদের প্রশ্নের সত্যটা সত্য কেন সেই রাহা এইখানে হইল না।

আদমবোমারু নিজেও মারা যায়। ইহাও সত্য কথা। মানুষের মৃত্যু মাত্রই মানুষের হৃদয়কে ব্যথিত করিবে। কিন্তু আদমবোমায় যে শিহরণ তাহার তুলনা সাধারণ মৃত্যু দিয়া হইতেছে না। উদ্বেগ ও রাগে, উৎকণ্ঠা ও ক্রোধে ইহার ব্যাখ্যা শেষ হইবে না। তাহা হইলে সন্ধান করিতে হইবে আত্মহত্যা করিয়া হত্যা করিলে আমরা যে একটু অধিক কাতর হইয়া পড়ি তাহারই বা কারণ কী? আদমবোমারুর সহিত এইখানে কি আমাদের অন্তরের কোথাও কোনো যোগসাজশ আছে?

এই প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করিয়া তালাল আসাদ দুই দফা প্রস্তাব হাজির করিয়াছেন। তাঁহার প্রথম প্রস্তাব: আদমবোমারুর সহিত আমাদের যোগাযোগ দুই জায়গায়। আমরা যাঁহারা আধুনিক এয়ুরোপের নানা রাষ্ট্রের নাগরিক অথবা যাঁহারা ভাষায়, সংস্কারে, আচারে এয়ুরোপীয় হইয়া উঠিয়াছি তাঁহারা অনেকেই নিজেদের বলি লিবারেল, সেকুলার কিংবা মডার্ন। এই লিবারেল মানে হইতে পারে স্বাধীনতাবাদীও। ‘উদারনৈতিক’ কথাটার তুলনায় ইহা বরং মূলের অধিক অনুগামী। বাংলায় আমি ইহারই তর্জমা প্রস্তাব করিলাম ‘স্বাধীনতা-ব্যবসায়ী’।

আমরা কি কথায় কথায় বলি না, যে কোনো মূল্যে আমরা আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করিব? যে কোনো মূল্যে গণতন্ত্র রক্ষার কথাও শোনা যায়, কেহ কেহ স্ব স্ব ধর্ম রক্ষার কথাও প্রচার করেন। যে কোনো মূল্যের কথা আসে কেন? আসে চরম মূল্য অর্থে। এই চরম মূল্যেরই অপর নাম জীবন। নিজের জীবন দান করিয়া দেশরক্ষার শপথ বর্তমান যুগের প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষই লইয়া থাকেন।

অর্থাৎ স্বাধীনতার মূল্য হিসাবে জীবন দেওয়া জীবনের অতি তুচ্ছ ব্যবহার, ইহাই আমরা নিত্য বলিতেছি। যুদ্ধে আমার জীবন দান এক প্রকার নিশ্চিত ব্যাপার। জাতির বা দেশের প্রয়োজনে (কেহ কেহ বলিবেন আদর্শের প্রয়োজনে) জীবন দিতে যিনি কার্পণ্য করেন না তাঁহাকেই আমরা শহিদ, বীর বা বীরশ্রেষ্ঠ প্রভৃতি উপাধিতে ভূষিত করি। তাই না!

আদর্শটা যাহাই হউক, তাহা সঙ্গত না বিসঙ্গত সেই তর্ক আপাতত স্থগিত রাখিয়াও বলা যায়, জীবনদানের বৈধতা আমাদের অগোচর নহে। আদমবোমারুর কাজে আমরা কি আমাদেরই ভিতরের পরিচয়টা প্রকাশিত হইতে দেখি না? আমাদের শিহরণের গোপন কারণ কি ইহাও হইতে পারে না? এই প্রশ্নেরই নাম আমি রাখিলাম: তালাল আসাদের প্রথম প্রস্তাব।

আধুনিক, ইহলৌকিক, স্বাধীনতা-ব্যবসায়ী নাগরিকের জন্য দেশ জাতি রাষ্ট্র আদর্শ প্রভৃতি রক্ষার্থে আত্মোৎসর্গ করা তুচ্ছ জিনিস। ইহা তিনি নিজে করিবেন স্বাভাবিক কারণেই। কিন্তু অন্যেও যদি একই কাজ করে, একই পথ ধরে তবে তাঁহার আতঙ্ক শিহরণে পরিণত হয়। যাহাকে তিনি স্বাভাবিক বলিয়া ধরিয়া লইয়াছিলেন, তাহাই অস্বাভাবিক বলিয়া প্রকাশ পায়। এই ধরা পড়িয়া যাওয়ার জন্যই কি তিনি শিহরিয়া উঠিতেছেন?

ধরা পড়িয়া যাওয়া ব্যাপারটির আর একটি অর্থও কিন্তু আছে। দেশ জাতি প্রভৃতির জন্য আত্মদানে আধুনিক মানুষ কসুর করে না। করিলে তাহার স্বাধীনতা কোথায় থাকে? অথচ একই সঙ্গে আধুনিক মানুষ দাবি করে: ধর্ম প্রভৃতি সংস্কার হইতেও তাহারা স্বাধীন। তাহাদের স্বাধীনতা পারলৌকিক নহে, ইহলৌকিক। যে কোন মূল্যে স্বাধীনতা রক্ষার শপথ করিবার পর তাহাদের এই দাবি যে বেশ অসার আত্মপ্রতারণা তাহাও ধরা পড়িয়া গেল। তলে তলে তাহাদের আবেগ আগের দিনের ধর্মীয় বা পৌরাণিক আবেগ হইতে মোটেও স্বাধীন কিংবা স্বতন্ত্র হয় নাই—এই সত্যে সন্দেহ থাকে না।

যাহাকে বলে আদমবোমা তাহা আধুনিক মানুষেরই নেমেসিস। আর আদমবোমারু সেই সত্যই প্রকাশ করিয়া দিয়াছে। সেই জন্যই কি আমরা—আধুনিক ইহলোকবাদী স্বাধীনতা-ব্যবসায়ীরা—শিহরিয়া উঠি?

আধুনিক স্বাধীনতা-ব্যবসায় ও পৌরাণিক ধর্ম-ব্যবসায় একসূত্রে গাথা এহেন দাবি তালাল আসাদ সরাসরি করেন নাই। তবে তিনি দাবি করেন আধুনিক স্বাধীনতা-ব্যবসায়ের গোড়ায় যে সকল স্রোতস্বিনী জলসিঞ্চন করিয়াছে—আজও করিতেছে—তাহার মধ্যে, বিশেষ পশ্চিম জগতে, এয়াহুদি-নাসারা ধর্ম-ব্যবসায়ের ধারাই অধিক কার্যকর। আদমবোমায় আমরা যেভাবে কাঁপিয়া উঠি তাহার অন্যতম সূত্র এয়াহুদি-নাসারা ধর্মধারায় পাওয়া যায় আর এই ধর্মধারায় তাহা অনুমোদন লাভ করিয়াছে স্ববিরোধী আকারে। ইহাই তালাল আসাদের দ্বিতীয় প্রস্তাব।

ফলে আমরা বলিতে পারি আদমবোমারুর পাপের মধ্যে এই পাপও আছে যে সে এয়াহুদি-নাসারা ধর্মের অনুসারীদের মনে করাইয়া দিতেছে তাহাদের ধর্মের ভিত্তিস্থলেও একই ঘটনা বর্তমান। রক্তমাংসের জড়াজড়ি নয়, আত্মায় আত্মায় এই জড়াজড়িই কি সেই নিহিত কারণ যাহার কথা বিস্মরণের গর্ভ হইতে স্মরণপথে উদিত হইলে স্বাধীনতা-ব্যবসায়ীর শিহরণ ঘটে?

আধুনিক স্বাধীনতা-ব্যবসায়ের ভিত্তিতে যে জীবনবিরোধী আত্মদানের নীতি নিত্য বর্তমান, প্রাচীন এয়াহুদি-নাসারাদি ধর্মেও সেই একই জীবনবিরোধী আত্মদান নীতির প্রাবল্য। আত্মহত্যাকারী বোমারু সম্ভবত সেই কথাই আমাদের মনে করাইয়া দিতেছে। যাঁহারা বলেন আত্মহত্যাকারী বোমাবাজ জঘন্য সন্ত্রাসবাদী আর স্বাধীনতার জন্য, গণতন্ত্রের জন্য যাঁহারা প্রাণ দিয়াছেন তাঁহারা ন্যায়যোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা তাঁহাদের প্রস্তাবের তলায় মাটি তাহা হইলে থাকে কোথায়?

তৃতীয় ওয়েলেক লাইব্রেরি বক্তৃতায় তালাল আসাদ প্রশ্নের মুখ এই দিকেই ঘুরাইয়াছেন। তিনি জিজ্ঞাসা করিতেছেন, মামলা ন্যায়নিষ্ঠ স্বাধীনতা সংগ্রামী বনাম জঘন্য সন্ত্রাসবাদীর মধ্যে নহে। সত্য ঘটনা বরং উল্টাই। আদমবোমা কথাটা নতুন শোনাইলেও শোনাইতে পারে, কিন্তু ঘটনাটা তো অনেক অনেক দিন আগে হইতে চলিয়া আসিতেছে। আদমবোমারুকে স্বাধীনতাকামী যোদ্ধা বলিতে অনেকেরই আপত্তি। তাই আসাদ পাল্টা জিজ্ঞাসা করিতেছেন: আধুনিক যুগের স্বাধীনতা-ব্যবসায়ী রাষ্ট্র ও ইহার মনীষীবর্গ কি অস্বীকার করিতে পারিবেন আদমবোমাবাজি তাঁহাদেরও বংশ-পরম্পরার অংশ বা উত্তরাধিকার নহে?

এই প্রশ্নের উত্তরে ‘না’ বলিবার সাধ্য যেহেতু কাহারও নাই, সঙ্গত কারণেই সিদ্ধান্ত হইবে সমস্যা খোদ স্বাধীনতা-ব্যবসায় অর্থাৎ লিবারেলিজমের মধ্যেই লুকাইয়া রহিয়াছে। স্বাধীনতা-ব্যবসায়ের অন্তর্দ্বন্দ্ব হইতে খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে ইহার সমাধান।

অন্তর্দ্বন্দ্ব বিরাজমান না থাকিলে স্বাধীনতার সহিত দাসপ্রথা, সার্বভৌমত্বের সহিত পররাজ্য-গ্রাসনীতি, ঔপনিবেশিক শাসন কেমন করিয়া সহাবস্থান করিতে পারে? এয়ুরোপে যে নরঘাতক নীতির জন্য জার্মানির আর্যব্যবসায়ী হিটলার মানবজাতির অভিসম্পাত আজি অবধি কুড়াইয়া যাইতেছে, সেই একই নীতির অধিক গিয়াও ফরাসি, ইংরেজ, ওলন্দাজ, পর্তুগিজ, মার্কিন ঔপনিবেশিক নীতি প্রভৃতি কী করিয়া বাহবা পাইতে পারে? কী করিয়া স্বাধীনতা-ব্যবসায়ের নামে হাততালি লইতে পারে?

স্বাধীনতা-ব্যবসায়ের একমুখে আছে স্বাধীনতার বুলি, কিন্তু তাহার পায়ের নিচে দাবানো সারা পৃথিবীর কোটি কোটি পরাধীন, অর্ধ-পরাধীন মানুষ। এয়ুরোপ যাহাদের নরাধম-জ্ঞানে দাসত্বের শৃঙ্খল পরাইয়াছিল আজও তো তাহারা পূর্ণ মুক্ত হয় নাই।

১৯৪৭ সনের ভারত বিভাজন ও পাকিস্তান সৃষ্টির পর হইতে আমরা যে যুগের সূচনা দেখিয়াছি সেই যুগকে বলে পরাধীনতাবসানের যুগ (age of decolonization)। কিন্তু তাহার এক বছরের মাথায় ফিলিস্তিনে নতুন করিয়া পরাধীনতার যুগ শুরু হইল কী করিয়া? (আহমদ ২০০৬/ক) স্বাধীনতা-ব্যবসায়ের অন্তর্দ্বন্দ্ব আছে। ইহা তাহার অকাট্য প্রমাণ।

তালাল আসাদের প্রস্তাব হইতে আমরা এই সব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিবার পথ পরিষ্কার করিতেছি। আমরা প্রাচীন ধর্ম হইতে আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্ব সর্বত্র দেখি একই কবিতা—আত্মহত্যা, অমীমাংসিত আত্মহত্যা। ইহা কি অধিকার, না কর্তব্য? এই প্রশ্নের মীমাংসা হয় নাই।


হজরত এব্রাহিমের বংশধর তিন ধর্মের প্রত্যেকটিতেই বলা হইয়াছে আত্মহত্যা পাপ বটে। মানুষকে জীবন দেওয়া হইয়াছে তাহা যাপন করিবার জন্য। জীবন যিনি দিয়াছেন লইবার সর্বস্বত্বও তিনিই সংরক্ষণ করিতেছেন। নিজ জীবনের উপর মনুষ্য-সন্তানের সার্বভৌমত্ব কোনো ধর্মই স্বীকার করিবে না। কিন্তু ঘোর অন্যায়ের প্রতিদানে মনুষ্যের জীবন লইবার হক সৃষ্টিকর্তার আছে। সেই সুবাদে তাঁহার প্রতিনিধিস্বরূপ ধর্মমণ্ডলি বা আধুনিক রাষ্ট্রও জীবন লইবার বা লঘু-গুরু শাস্তি দান করিবার হক রাখে। বর্তমান যুগের ভাষায় বলা যায় নাগরিকের জীবনের উপর রাষ্ট্রের হক আছে। দুঃখের মধ্যে, শুদ্ধ নাগরিকেরই হক নাই—থাকিতে পারে না।

সেই কারণেই হয়তো বা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি কোনো অবস্থায় যেন আত্মহত্যা না করিতে পারে তাহার বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়। যুদ্ধরত সৈনিকেরও আত্মহত্যার অধিকার নাই, কালব্যাধিগ্রস্ত মরণপথযাত্রীরও নাই সেই অধিকারভোগের অধিকার। আত্মহত্যা করিবার চেষ্টা করিয়া বিফলমনোরথ ব্যক্তির শাস্তি হইবে এক বৎসর কারাদণ্ড—বাংলাদেশে কার্যকর দণ্ডবিধিতে এহেন তথ্য পাওয়া যাইবে।

১৮৩৮ সনে প্রকাশিত ভারতে ব্রিটিশ দণ্ডবিধির এক আদি খসড়ায় (ব্রিটিশ) ভারতীয় ‘আইন কমিশন’ প্রস্তাব করিয়াছিলেন আত্মহত্যার সহায়তা করিলে ক্ষেত্রবিশেষে (১২ বছরের নিচের ব্যক্তি প্রভৃতির ক্ষেত্রে) মৃত্যুদণ্ড ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ২ বছর হইতে ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান করিতে হইবে। (ইন্ডিয়ান ল কমিশনার্স ২০০২: ধারা ৩০৬-৩০৭)

এক কথায় মৃত্যু অভিপ্রেত নহে, তবে কর্তৃপক্ষের আদেশে বা অনুমতিক্রমে কিংবা উৎসাহে মানুষের প্রাণ দেওয়া কর্তব্য।

ঐদিকে আদমবোমারু প্রভৃতি আত্মহত্যাকারী ধর্ম বা রাষ্ট্র যাহা অনুমোদন করে না সেই কাজ করিয়া নিজের স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া থাকে। হয়তো ইহাই তাহার আসল পাপ। কর্তৃত্বহীনের কর্তৃত্ব গ্রহণ মানিয়া লওয়া যায় না। একটুখানি আবেগ-নিরপেক্ষ হইয়া বিচার করিলেই ধরা পড়িবে সমস্যা প্রাণ বা মৃত্যু লইয়া যতটা নহে, তাহার অনেক বেশি সেই প্রাণদান বা মৃত্যুবরণের শর্ত বা পরিস্থিতি লইয়া। তাহা হইলে সেই শর্ত বা পরিস্থিতিই বা কেন আমাদের আলোচনার বিষয় হইবে না?

তালাল আসাদ এই নিয়মের অতিক্রম, ব্যতিক্রম বা ব্যভিচারও দেখাইয়াছেন এক জায়গায়। প্রাচীন গ্রিসের জগতে আত্মহত্যা পাপ বলিয়া গণ্য হইত না, আপন প্রাণ আপনি লওয়াকে এমনকি অপরাধও বলা চলিত না। পার্থক্যের মধ্যে, এই অধিকার সীমিত হইত শুদ্ধ উচ্চবাক বা এলিট শ্রেণীর ভিতর। দাসদিগকে আত্মহত্যার হক দেওয়া বুদ্ধির কাজ বিবেচিত হয় নাই।

পৃথিবীর মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত আত্মহত্যার ঘটনা মহাত্মা সক্রাতেসের বিষপানে মৃত্যুবরণ। সকলেই ইহার কথা জানিবেন কিন্তু ইহাকে আত্মহত্যা বলিয়া মানিবেন কিনা সন্দেহ। বলিবেন ইহা তো বিচারে প্রদত্ত দণ্ড। ইহার অন্যথা কী হইতে পারিত? জল্লাদের হাতে মৃত্যু।

জার্মান মনীষী নিৎসে বলিয়াছেন সক্রাতেসের এই আত্মহত্যা গর্হিতকর্ম। কেন? শুদ্ধ আত্মহত্যা বলিয়া নয়। হত্যা বা আত্মহত্যায় নিৎসের আপত্তি নাই। তাঁহার আপত্তি অন্যত্র, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করিয়া হার মানায়। বাহিরের শক্তির কাছে বিনাযুদ্ধে সূচ্যগ্র মেদিনী দেওয়ার পক্ষ তিনি লইবেনই না। এই নীতি উচ্চবাক বা এলিট নীতি হইতে পারে না। একই যুক্তিতে নিৎসে আলায়হেস সালাম হজরত ইসার বেহাত আত্মহত্যাও অনুমোদন করিবেন না। আত্মসমর্পণই নিৎসের মতে দোষের কাজ, আত্মহত্যা কিংবা মৃত্যু নহে।

অথচ হজরত ইসার ধর্ম যাঁহারা দুনিয়াজোড়া অনুসরণ করেন তাঁহারা এই ঘটনার অন্য ব্যাখ্যা দিতেছেন। তাঁহাদের বিশ্বাস পবিত্র। কারণ হজরত ইসা আর দশজনের মতন মানুষ নহেন। তিনি মাবুদের একমাত্র ঔরসজাত পুত্র অর্থাৎ পবিত্র। অথচ প্রকাশ্য নির্যাতনেই তাঁহার মৃত্যু হইয়াছে। সাধারণ মনুষ্য-সন্তানের মতন তাঁহারও রক্ত ঝরিয়াছে। আর দশ মানুষের রক্তের মতন তাঁহারও রক্ত লাল এবং বহমান ছিল।

হজরত ইসা আত্মহত্যা করিয়াছিলেন। যাহারা নাসারাধর্মের বেগানা তাহাদের নিকট ইহা বিশেষ নতুন কথা মনে হইতে পারে। কিন্তু নাসারামাত্রই জানেন অপ্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে হইলেও ইহা এক প্রকার আত্মহত্যাই ছিল। হজরত জানিতেন তাঁহাকে হত্যা করা হইবে। তিনি তাহা বন্ধ করিবার বা তাহা হইতে পলাইবার চেষ্টা করেন নাই। শুদ্ধ তাহাই নহে। হত্যাকারীদের তিনি সহায়তাও করিয়াছেন। সেই অর্থেই ইহাকে পরোক্ষ বা বেহাত আত্মহত্যা বলা সঙ্গত। নিৎসে ইহারও নিন্দা করেন একই কারণে।

স্বভাবতই প্রশ্ন উঠিতেছে: হজরত ইসা কেন আত্মহত্যায় লিপ্ত হইলেন? নিজেকে অকুতোভয় প্রমাণ করিবার জন্য? তাঁহার মতন মহাত্মা ব্যক্তির জন্য ইহা বাহ্যবস্তু মাত্র। প্রয়োজন ছিল না। নাসারা ধর্মতত্ত্ব অনুসারে মহাত্মা ইসার মৃত্যু মোটেও মৃত্যু নহে, স্বর্গলোকে মানে পিত্রালয়ে প্রত্যাবর্তনস্বরূপ। কিন্তু তাঁহারাও অস্বীকার করেন না তিনি মরিয়াছেন মানুষরূপেই—মানুষের হইয়া। মানবজাতির মুক্তির সোপানস্বরূপ তাঁহার মৃত্যুকে দেখাইয়া থাকেন নাসারা পুরাণলেখকগণ।

তাহা হইলে আমরা দেখিতেছি নাসারা পরম্পরায় মৃত্যুর অর্থ দুই। মানুষ পাপ করিয়াছে তাই মৃত্যু তাহার প্রাপ্যদণ্ড। লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। ইহাই প্রথম অর্থ। মৃত্যু পাপেরই ফল।

মৃত্যুর দ্বিতীয় অর্থ মহাত্মা ইসার মৃত্যুতে প্রাপ্তব্য। তাঁহার মৃত্যুতে আমরা আর সকলেই পাপ হইতে মুক্ত হইলাম। পাপে মৃত্যু নয়, মৃত্যুতেই পাপমুক্তি। মহাত্মা ইসা পবিত্র—শুদ্ধ এই ধারণার ভিত্তিতে আমরা আবিষ্কার করিতেছি তাঁহার মৃত্যু তাঁহার পাপের ফল নহে, অন্যের (অর্থাৎ মানবসমষ্টির) পাপের যুগপৎ ফল ও প্রায়শ্চিত্ত।

তালাল আসাদ দেখাইতেছেন বর্তমান যুগের ইহলৌকিক মানবতন্ত্রও (যাহাকে এয়ুরোপে নাসারাধর্মের উত্তরাধিকারী আদর্শ বলা যায়) এই স্ববিরোধ বুকে ধারণ করিয়া যাত্রা শুরু করিয়াছিল এবং এই দুই পায়েই খাড়া আছে। বিশেষ আদর্শ বা জীবনধারা টিকাইয়া রাখিতে হইলে নাগরিক-সৈনিককে প্রয়োজনে আপন জীবন উৎসর্গ করিতে হইবে—আধুনিক রাষ্ট্র এই দাবি ছাড়িলে দাঁড়াইবার জায়গাই পাইবে না। রাষ্ট্রের জন্য আত্মত্যাগ স্বরূপ মৃত্যু স্বাগত। ইহাকে স্বেচ্ছামৃত্যু বলা ছাড়া উপায় কী?

অথচ এয়ুরোপের যুক্তরাষ্ট্র (European Union) সহ অনেক আধুনিক রাষ্ট্র আজ দাবি করিতেছে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া আইনসঙ্গত কাজ হইতে পারে না। কারণ কোনো মানুষের পক্ষেই হাজারকরা এক হাজার ভাগ নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয় যাহাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হইতেছে সত্যি সত্যি তাহা তাহার প্রাপ্য কিনা। মানুষের ভুলচুক হওয়া স্বাভাবিক। দ্বিতীয় কথা, যদি কখনো প্রমাণিত হয় যাহাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হইয়াছে তাহা সঠিক হয় নাই, তখন মড়াকে আবার জিয়াইয়া তোলার কোনো পথই থাকে না।

যাহারা গোঁড়া নাসারা ধর্মাবলম্বী নহে, এমনকি কোনো ধর্মেরই তাঁবেদার নহে, যাহারা ইহলোকের বরপুত্র, মানবজাতির ঝাণ্ডাবহ, তাহারাও কবুল করিয়া থাকে নির্দয় মৃত্যুদণ্ডের তুলনায় মানুষকে অনুতাপ অনুশোচনার সুযোগ দেওয়াই বেহতর—মানুষ নীতিশিক্ষার মধ্যবর্তিতায় নিজ নিজ আত্মার শুদ্ধি ও শুচিসাধন করিতে পারে। এই বিশ্বাসের সহিত ধর্মধারাসূত্রে আগত মানবমুক্তির ধারণার আত্মীয়তা আবিষ্কার করিতে হইলে বেশি দূরকল্পনার আশ্রয়ও লইতে হয় না।

অসংখ্য সংস্কার-ব্যবসায়ী বলিয়াছেন মহাত্মা ইসার যন্ত্রণার সহিত একালের কোনো পাপী-তাপীর অনুতাপ তুলনীয় নহে বটে। কিন্তু কেহ যদি সত্য সত্য অনুতাপ করিয়া উৎকণ্ঠায় ভোগে তবে তাহা হইতে ধরিয়া লওয়া যায় সত্যি অনুশোচনা হইয়া গিয়াছে—উৎকণ্ঠাতেই শোচনা, উৎকণ্ঠাই শোচনা নহে।

মহাত্মা ইসার ক্রুশবিদ্ধ মৃত্যু স্বর্গেই পরিকল্পিত। তাহাতে মানবজাতির পাপের কারণে একজন নিরপরাধ, মাসুম মনুষ্যের মৃত্যুর ব্যবস্থা হইয়াছিল। এই নিষ্ঠুর মৃত্যুর বিনিময়ে মানবজাতি এমন এক ভয়াবহ উপহার পাইয়াছে যাহা ভাবিলেও শিহরণে হাত পা অবশ হয়। এই উপহার বা পুরস্কারের নাম অনন্ত জীবন। এই চরম পুরস্কারের পরম মূল্য সত্যি বড় নিষ্ঠুর, ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পিত এই শয়তানসুলভ হত্যাকাণ্ড।

মানবজাতিকে যে পরম মূল্য গুণিয়া দিতে হইল তাহা খোদ শয়তানকেও লজ্জা দিতেছে। মহাত্মা ইসার সহিত তাঁহার শিষ্য এয়াহুদা (Jahuda) সরাসরি বেইমানি করিলেন আর তিনি নিজেই তাহা সহযোগ করিলেন। পবিত্র ধর্মপুস্তকের নতুন নিয়মে তাহার বিবরণ পরিষ্কার। ‘যোহন লিখিত সুসমাচার’ বলিতেছেন:

এই কথা বলিয়া যীশু আত্মাতে উদ্বিগ্ন হইলেন, আর সাক্ষ্য দিয়া কহিলেন, সত্য, সত্য, আমি তোমাদিগকে বলিতেছি, তোমাদের মধ্যে এক জন আমাকে সমর্পণ করিবে। শিষ্যেরা এক জন অন্যের দিকে চাহিতে লাগিলেন, স্থির করিতে পারিলেন না, তিনি কাহার বিষয় বলিলেন। তখন যীশুর শিষ্যদের এক জন, যাঁহাকে যীশু প্রেম করিতেন, তিনি তাঁহার কোলে হেলান দিয়া বসিয়াছিলেন। তখন শিমোন পিতর তাঁহাকে ইঙ্গিত করিলেন ও কহিলেন, বল, উনি যাহার বিষয় বলিতেছেন, সে কে? তাহাতে তিনি সেইরূপ বসিয়া থাকাতে যীশুর বক্ষঃস্থলের দিকে পশ্চাতে হেলিয়া বলিলেন, প্রভু, সে কে? যীশু উত্তর করিলেন, যাহার জন্য আমি রুটীখণ্ড ডুবাইব ও যাহাকে দিব, সেই। পরে তিনি রুটীখণ্ড ডুবাইয়া লইয়া ইষ্করিয়োতীয় শিমোনের পুত্র যিহূদাকে দিলেন। আর সেই রুটীখণ্ডের পরেই শয়তান তাহার মধ্যে প্রবেশ করিল। তখন যীশু তাহাকে কহিলেন, যাহা করিতেছ, শীঘ্র কর। কিন্তু তিনি কি ভাবে তাহাকে এ কথা কহিলেন, যাঁহারা ভোজনে বসিয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে কেহ তাহা বুঝিলেন না; যিহূদার কাছে টাকার থলী থাকাতে কেহ কেহ মনে করিলেন, যীশু তাহাকে বলিলেন, পর্ব্বের নিমিত্ত যাহা যাহা আবশ্যক কিনিয়া আন, কিম্বা সে যেন দরিদ্রদিগকে কিছু দেয়। রুটীখণ্ড গ্রহণ করিয়া সে তৎক্ষণাৎ বাহিরে গেল; তখন রাত্রিকাল। (পবিত্র বাইবেল, ‘যোহন লিখিত সুসমাচার,’ ১৩: ২১-৩০)

এই বর্ণনায় যাহা চোখে পড়িবার মতন কথা তাহা এই: ‘আর সেই রুটীখণ্ডের পরেই শয়তান তাহার মধ্যে প্রবেশ করিল।’ এই মহান নাটকের অপরার্থ এই যে চরম দুষ্ট ও পরম অনিষ্ট এক হইয়াই মাত্র মানবজাতির হিতের ইষ্ট পথ খুলিতে পারিল।

মহাত্মা ইসাকে যে অতুলনীয় পীড়া দিয়া হত্যা করা হইল, নিষ্ঠুরতা শুদ্ধ তাহাই নহে। তাঁহার এই বেদনাদায়ক, উৎপীড়িত মৃত্যুতে যাহারা নির্বিকার থাকিতে পারে তাহাদের নির্বিকারত্ব-পাপে আরো নিষ্ঠুরতা বর্তমান। ক্রুশের কাঠে পেরেকে পিষিয়া মারায় যত নহে তাহার চেয়ে বেশি নিষ্ঠুরতা দেখিতেছি মনুষ্য জাতির নিষ্পৃহতায়। তাহাদের বেপরোয়া ভাবে।

মহাত্মা ইসা প্রাণ দিয়াছিলেন শুদ্ধ এয়াহুদি জাতিগোষ্ঠীর নিমিত্ত নহে, গোটা মানবজাতির জন্য। ইহাই ইসার সর্বজনীন ভাব। একই সঙ্গে ‘মানব’ পদবাচ্য সকলের জন্য এই প্রাণোপহার দিয়া তিনি ইহাও প্রমাণ করিলেন শুদ্ধ আত্মহত্যাকারী প্রাণদানের মধ্যেই মানবজাতির মুক্তি—তাহার ইষ্টলাভ—সম্ভব। এই প্রাণদান একাধারে নিষ্ঠুরতার, অন্যাধারে নির্বিকার উদাসীনতার চিহ্নও বহন করিতেছে। প্রাণে ধিক্কার জাগায় এমন প্রাণদানই প্রাণ দানের পূর্বশর্ত।

আধুনিক যুগের মানব-ব্যবসায়ী (humanist) সংস্কার অনুসারে সেই পুরাতন ধর্মীয় উন্মাদনা হইতে একালের মানবজাতি স্বাধীন হইয়াছে। কিন্তু তালাল আসাদ দেখাইতেছেন, এই দাবিও গুজব বৈ নহে। দয়ার্দ্র প্রাণের সলিলে চরম নিষ্ঠুরতার ‘রুটীখণ্ড’ আজও কম ডোবানো হইতেছে না। মনুষ্য-সন্তানকে পশুর মতন হত্যা করাকে একই সঙ্গে বলা হইতেছে জঘন্যতম শয়তানি এবং পরম মঙ্গল।

উদাহরণ হিসাবে আধুনিক রাষ্ট্রমণ্ডলির শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা পাড়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের দেশনায়কগণ এই জাতীয় কথা হরহামেশা বলিতেছেন, হজরত ইসার আত্মত্যাগের সহিত মার্কিন সেনাবাহিনীর হত ও আহতদের তুলনা নিতুই পাঠ করিতেছেন। যথা:

মানবজাতি যাহাতে করিয়া স্বর্গরাজ্য পাইতে পারে তাহার নিমিত্ত যিশুখ্রিস্ট আপন প্রাণ ক্রুশকাঠে উৎসর্গ করিয়াছিলেন। আর অদ্য রাত্রিবেলা আমরা পরম পবিত্রতার সহিত ঘোষণা করিব মানবজাতির মুক্তি অর্জনের জন্য, বিশ্ব জুড়িয়া মুক্তি ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করিবার খাতিরে পৃথিবীর যে কোনো জাতি পরম আত্মত্যাগ স্বীকারের যে চূড়ান্ত করিয়াছে আমরাও তাহাই করিতেছি। (গেম্বল: ২০০৩; দেখুন, আসাদ ২০০৭: ৮৭)

জাতির স্বার্থে আত্মোৎসর্গের গল্প একেবারে নতুন নহে। আত্মোৎসর্গের শেষ সর্গে মানবজাতি এখনো পৌঁছে নাই। সভ্যতা বিস্তারের (civilizing mission) বর্তমান পর্বে শুদ্ধ ‘মুক্তি ও স্বাধীনতা’র নাম চলিতেছে। কোথাও কোথাও ইহা নাম ধারণ করিয়াছে ‘গণতন্ত্র’। পার্থক্যের মধ্যে ইহাই।


তালাল আসাদের অনিবার্য প্রস্তাব অনুসারে নাসারাধর্মের এই ঐতিহ্য, এই উত্তরাধিকার আধুনিক মানব-ব্যবসায়ী রাষ্ট্রও পুরাপুরি গ্রহণ করিয়াছে।

আত্মোৎসর্গ, রক্তপাত এবং প্রাণদণ্ড—এইসব বস্তু একালের দুনিয়াদারি করা স্বাধীনতা-ব্যবসায়ীগণ মোটেও পছন্দ করেন না। এইগুলি, তাঁহারা মনে করেন, স্বাধীনতা-ব্যবসায়ের আগের যুগের নাসারাধর্মের বৈশিষ্ট্য মাত্র। অথচ দেখা যাইতেছে গর্হিত, পরিত্যাজ্য এই সমস্ত বস্তু অধুনাতম স্বাধীনতা-ব্যবসায়ীগণের জননপর্বেই পূর্ণমাত্রায় জড়াইয়া আছে। মাত্র ন্যায়যুদ্ধের কথা হইতেছে না, সর্বত্রই দেখা যায় পরম রক্তারক্তির সহিত গা জড়াইয়া আছে চরম কোমলতা।

প্রথম সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বযুদ্ধের কবি বলিয়া যেসব কবি সুবিদিত সেই কবিদের কবিতায়ও চরম স্নেহের প্রকাশ সম্ভব হইয়াছে কেবল তখনই যখন কোমল মনের সহিত ‘দরকার হয় হত্যা করিব’ ধরনের কঠোরতা যোগ হইয়াছে। ইঁহাদের মধ্যে আছেন রুপার্ট ব্রুক (Rupert Brooke), সিগফ্রিড সাসুন (Sigfried Sassoon), উইলফ্রেড ওয়েন (Wilfred Owen), রবার্ট গ্রেবস (Robert Graves) প্রমুখ। একালের বহুল পরিচিত রাষ্ট্রীয় প্রচারের—যে কোন মূল্যে দেশরক্ষার—প্রাঞ্জল অর্থ আর কিছু নয়: আত্মোৎসর্গ, রক্তপাত ও প্রাণদণ্ড।

দুঃখের মধ্যে নাসারাধর্মের মধ্যযুগ হইতে স্বাধীনতা-ধর্মের অনন্তযুগ পর্যন্ত একই স্ববিরোধ অমীমাংসেয় অবস্থায় পড়িয়া আছে। মীমাংসার কোনো সংকেত এখনো পর্যন্ত দেখা যাইতেছে না। স্ববিরোধের এক মাত্রায় জীবনের প্রতি মমতা দেখানো কর্তব্য, অন্য মাত্রায় যে কোনো মূল্যে (মানে হত্যা ও আত্মহত্যাসমেত) এই জীবন বিয়োগ করাও কর্তব্য। দুই কর্তব্যের দোলাচলে আধুনিক স্বাধীনতার-ব্যবসায় আজও আগাইয়া চলিয়াছে। ইহার প্রকাশ স্বভাবতই নানাবিধ হইয়াছে।


মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বেচাকেনার সাদা ও কালো বাজারের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছেন তালাল আসাদ। জীবন কখন শেষ হইল আর কখন হইল না, তাহাও কিন্তু জীবন-ধারণকারীর সিদ্ধান্ত নহে। আইনের অর্থাৎ রাষ্ট্রের এখতিয়ার আছে তাহা নির্ধারণ করার। চক্ষু, কিডনি প্রভৃতি অঙ্গ যাঁহারা দান করেন তাঁহারা কেহ কেহ জীবিতাবস্থায়ও তাহা করিয়া থাকেন। আবার এইসব জিনিস মরণোত্তর দান করিবার পথ একটা আছে। এইসব দান গ্রহণ করিবার মত যত সংস্থা রহিয়াছে তাহারা সকলেই ‘জীবনদান’ কথাটি ব্যবহার করিয়া থাকে। ইহাতে—বিশেষ পশ্চিম জগতের নাসারা ধর্মধারার প্রভাবাধীন সমাজে—হজরত ইসার ‘জীবনদান’ স্মরণপথে উদিত না হইয়া পারে কি? ইহার সহিত জীবিত মনুষ্যের অঙ্গদানের কী সম্বন্ধ? টাকা নামক বাহ্যবস্তুরই বা কী যোগাযোগ ইহার সঙ্গে? সেই প্রশ্ন না তুলিয়াই তাঁহারা আগাইয়া যাইতেছেন বীরদর্পে।

তালাল আসাদ আগের দুই বক্তৃতায় বলিয়াছিলেন এয়াহুদি-নাসারা সভ্যতার সহিত এসলামি সভ্যতার দ্বন্দ্ব বলিয়া যাঁহারা বর্তমান বিশ্বের প্রধান দ্বন্দ্বের পরিচয় জাহির করিতেছেন তাঁহারা ভুল করিতেছেন। কেহ কেহ বলিয়া থাকেন: আসল দ্বন্দ্ব সেখানে নহে, দ্বন্দ্ব খোদ এসলামেরই অন্দরমহলে। সেখানে দুই ধরনের মুসলমান আছে। এক দল আধুনিক ও স্বাধীনতা-ব্যবসায়ী, আর দল উন্মাদ। স্বাধীনতা-ব্যবসায়ী দলের সহিত উন্মাদনার বেপারি দলের সংঘাতই বর্তমান দুনিয়ার প্রকৃত সংঘাত।

talal-a-5.jpg
২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি বক্তৃতায় তালাল আসাদ

আসাদ কিন্তু এই রোগ নির্ণয়ের সহিতও ঐকমত্য পোষণ করিতেছেন না। তিনি মনে করেন বর্তমান যুগের নেতৃত্বে রহিয়াছে পশ্চিম জগৎ। তাঁহারাও অন্তর্দ্বন্দ্বমুক্ত নহেন। পরম মমতার সহিত চরম নিষ্ঠুরতার একটা বিবাদ তাঁহাদের মধ্যেও আছে। সেই বিবাদের রসায়নে স্বাধীনতা-ব্যবসায়ীর মন যখন দিশাহারা হয় তখন তাহার নাম দাঁড়ায় শিহরণ। এই দ্বন্দ্বের মালিকানা, এই শিহরণ প্রজননের শক্তি তালাল আসাদের মতে একান্তই পশ্চিম জাগতিক। ইহা আদৌ এজমালি নহে। চিনদেশে যুবকের দেহ শতখণ্ডে কাটিবার যে গল্প ফরাসি মনীষী জর্জ বাতায়ি (Georges Bataille) শোনাইয়াছেন তাহার সহিত এই শিহরণের যোগাযোগ সামান্য।

শিহরণ কথাটার অর্থ একেক জনের কাছে একেক রকম। তবে পশ্চিম জগতের মনীষীবৃন্দের পথ ধরিয়া আসাদ তাহার কুলজি নির্ণয় করিয়াছেন অনেকটা এইভাবে—অনেক দর্শক-শ্রোতার চোখ কানে তালা লাগে, তাহারা দেখে হঠাৎ কাণ্ড, নিমেষেই জীবন পরিণত হয় মৃত্যুতে, পরিচিত মানুষ হইয়া যায় অপরিচিত দ্রব্য, রক্ত ও মাংসের সমষ্টি।

ইহাতে যে অনুভূতি হয় তাহা কোনো কোনো মনীষীর মতে একাধারে বেদনার, দুঃসহ বেদনার, ও চরম আনন্দের। আনন্দ বা হর্ষটা ক্ষণস্থায়ী হইলেও আছে। লোমহর্ষক কথাটার মধ্যে এই ইঙ্গিত স্পষ্ট। কাজে কাজেই এক ধরনের অসহায় শিহরণ হয়। ইহার উৎস অজানা হইলেও গতি স্পষ্টই সামনের দিকে। এই ঘাতক বলপ্রযোজকের বিরুদ্ধে প্রাণ-মন-দেহ একযোগে ন্যায়সঙ্গত ক্রোধ পোষণ করিবে ইহাই স্বভাবধর্ম-সঙ্গত।

কিন্তু ঘাতক তো সঙ্গে সঙ্গে নিজের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ বা পরমপ্রাপ্য মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর করিল। তাহাতে তো ক্রোধের উপশম হইবার কথা। কিন্তু হয় না তো!

ইচ্ছা হয় অপরাধ ও শাস্তি যেন আলাদা থাকে। ঘাতক আদমবোমারু সেই ইচ্ছাপূরণের পথও বন্ধ করিয়া যায়। ধর্ম ও রাষ্ট্রের ইচ্ছানুযায়ী মৃত্যুদণ্ড বিধানের হকও সে লঙ্ঘন করিয়া চলিয়া যাইবার পথ পায়। ইহাতে রাষ্ট্রের প্রতিশোধ গ্রহণের যে শক্তি তাহাকেও একই ক্রিয়ার মধ্যবর্তিতায় অবশ বা পরাস্ত করা হইল বৈ কি!

একালের প্রতিশোধগ্রহণ ক্রিয়াটি প্রতিশোধ (revenge) শব্দে পরিচয় পায় নাই। দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের মুখ হইতে আমরা শুনিতে শুরু করিয়াছিলাম নতুন শব্দ ‘প্রতিদান’ (retribution)। অপরাধ যদি হয় মৃত্যু ঘটানোর ক্রিয়ায় তবে শাস্তি হইবে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের মধ্যবর্তিতায়। ইহাই শাস্ত্রসম্মত। দুইটাই প্রাকৃতিক ঘটনাস্বরূপ এক, কিন্তু সামাজিক ঘটনাস্বরূপ অন্য অন্য। হত্যা করা পশুসুলভ অপরাধ, অন্যায় আর মৃত্যুদণ্ড প্রদান ন্যায়সঙ্গত ও মনুষ্যসুলভ শাস্তি মাত্র।

ফরাসি এমিল দুর্খাইম বলিতেন শাস্তি মাত্রই প্রতিশোধের আবেগ হইতে জন্ম লইয়াছে, জনচিত্তে যে ক্রোধ জাগে তাহার নিরসন করিবার জন্যই সকল শাস্তি উপশমস্বরূপ দান করিবার কথা। যখন অপরাধ ও শাস্তির ক্রম নষ্ট হইবার উপক্রম ঘটে তখন প্রতিশোধ কথাটার কোনো অর্থই থাকে না।

আদমবোমারুর অন্যতর অপরাধ এইখানেই। প্রাণের বদলে প্রাণ, নাকের বদলে নাকের যে গণতান্ত্রিক নীতি সে তাহাই অকার্যকর করিয়া তোলে। এমনকি প্রাণের বদলে ক্ষমা করিবার যে সন্তুষ্টি তাহার সুযোগও থাকে না আদমবোমার ঘটনায়। ইহাও কি শিহরণের অন্যতম শিকড়?


তাহা হইলে কী দাঁড়াইল? তালাল আসাদ কয়েকটি কারণ এক জায়গায় করিয়া দেখাইয়াছেন আদমবোমার অভিজ্ঞতা আধুনিক ইহলৌকিক স্বাধীনতা-ব্যবসায়ী পশ্চিম জগতকে একাধিক জায়গায় হতাহত করিয়াছে। প্রথম জায়গায় অর্থাৎ রাষ্ট্রের এখতিয়ার বা আইনসঙ্গত ক্ষমতায় সে হাত দিয়াছে। তাই আদমবোমার শিহরণ হইয়াছে অনন্য। সমরক্ষেত্রে প্রাণদান বা প্রাণগ্রহণ লইয়া কোনো শিহরণ নাই—থাকিলে বড়জোর বেদনা আছে। কারণ এই দান ও গ্রহণ উভয় ক্রিয়াই বৈধ। বিধিসম্মতি বা ধর্মসঙ্গতি (legitimacy) এখানে একই কথার এপিঠ ওপিঠ বৈ নহে।

যতই বেদনাদায়ক, যতই ভয়ানক হউক যুদ্ধে মৃত্যুবরণই সঙ্গত, সুতরাং তাহা শিহরণমুক্ত। যুদ্ধ বৈধ কেন? বৈধ কারণ মানবের মাঝে আমাদের জীবনধারা,আমাদের ধর্মবিশ্বাস, আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা বাঁচাইতে হইলে মরিতে হইবে সুন্দর ভুবনে। জাতি ও রাষ্ট্রের বিধানের বাহিরে প্রাণ দেওয়া বা নেওয়া কোনোটাই প্রার্থনীয় বা সমর্থনীয় হইতে পারে না। গোড়ার কথা এই।

দুই নম্বর কথা, আদমবোমারু অপরাধ করিবার পর শাস্তি দেওয়ার কোনো জায়গাও রাখে না। এই জায়গায় সে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিশোধ কিংবা প্রতিদান লইবার ক্ষমতাই জব্দ করিয়া বসে। ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণের মধ্যে ব্যবধান রহিত করিয়া দেওয়াও আরেক দফা অপরাধ। অথচ এই ব্যবধান বজায় রাখার উপরই প্রতিষ্ঠা পাইয়াছে আধুনিক স্বাধীনতা-ব্যবসায়ের সকল পরিচয়কাণ্ড।

তিন নম্বর জায়গাটিও আমরা প্রসঙ্গক্রমে আলোচনায় আনিয়াছি। সকল মানুষই মরণশীল কিন্তু মানবজাতির জীবনকে আমরা অনন্ত বলিয়াই মানি। জানি আর না-ই জানি, অন্তত বিশ্বাস করি। মরজীবন ও অনন্ত জীবনের মধ্যে সমর একটা আছে। তাহাই রাষ্ট্রের মধ্যে মূর্ত হইতে চাহে। রাষ্ট্র অমর বলিয়া দাবি করিতে না পারিলে মরের জীবন দাবি কী করিয়া করিতে পারিত? তাই আমরা একদিকে সমস্ত জীবনই পবিত্র ও অবধ্য বলিয়া দাবি করি, আবার পরক্ষণেই জীবন দিবার আহ্বান জানাই। জানাই কী করিয়া? আইনের কোনো শর্ত লঙ্ঘন না করিয়া, কোনো অঙ্গকে টুস্কিটি পর্যন্ত না মারিয়া কী করিয়া জানাই? রাষ্ট্র অমর না হইলে আমরা কী করিয়া একই মুখে দুই কথা বলিতাম? ব্যক্তি স্বাধীন এবং সকলে আইনের অধীন এই দুই কথাই যুগপৎ সত্য। ইহা বলিতে কোনো কপটতা নাই—কিন্তু দুই কথা একই সঙ্গে সত্য হয় কী করিয়া?

talal-a-6.jpgস্বীকার করিতে দোষ নাই: এই বিবাদসমষ্টি বর্তমান আছে। শুদ্ধ আছে বলিলেই হইবে না। এই সকল বিবাদ লইয়াই স্বাধীনতা-ব্যবসায়ের রাষ্ট্র গড়িয়া উঠিয়াছে। এই রাষ্ট্র ও সমাজের সার্বভৌম ক্ষমতা বা রাজশক্তি যে সত্য ধারণ করে তাহার গোড়ায় আঘাত করিতেছে আদমবোমা। তাহার আঘাতে রাষ্ট্রের অস্থি-মজ্জা-কশেরুকা উড়িয়া যাইতেছে। আদমবোমায় যে জীবনদান ও গ্রহণের নাট্য চলে তাহার অর্থও অমীমাংসেয় হইয়া দাঁড়াইতেছে। এই ঘটনার প্রকাশ্য অনুষ্ঠান ও সমবায়-মৃত্যু ক্ষমার অযোগ্য প্রতিভাত হইতেছে। বৈধতা ও অবৈধতা, অপরাধ ও শাস্তি, জীবন ও রাষ্ট্রের ভেদরেখাটুকু মুছিয়া যাইতেছে। মুক্তির সম্ভাবনাও তিরোহিত হইতেছে।

পরিশেষে, তালাল আসাদ দেখাইতে চাহেন, আরো একপ্রস্ত পরিণামদারুণ ঘটনা ঘটে। ইহা বিশেষ করিয়া এয়াহুদি-নাসারা পরম্পরা হইতে আগত মানবগোষ্ঠীর জন্য দুর্বহ ভারস্বরূপ। হজরত ইসার প্রাণদানকে অনন্ত জীবনের মূল্য বলিয়া মানিয়া লইবার একটা যুক্তি আছে। অনন্ত মৃত্যুর মূল্য বলিয়া কোনো প্রাণদান মানিয়া লইবার তো কোনো সান্ত্বনা নাই—হোক না তাহা আদমবোমারুর প্রাণ।

আদমবোমাবাজকে আপনি যদি মানবেতর পশু বা ঐ রকম অশ্লীল কোনো গালিগালাজ দিয়া শান্তি পাইতে আগ্রহীও হইলেন হয়েন গিয়া। সে যাহাদিগকে মারিল তাহাদের মনুষ্যত্বের কী হইবে? তাহারা কেন মরিল? মানবজাতির পাপের জন্য? তাহা হইলে আমাদের প্রভু যিশুখ্রিস্টের নতুন নিয়ম কি বৃথা যাইবে? তিনি কি আমাদের সকলের পাপের জন্য প্রাণদান করেন নাই?

এয়াহুদি জাতিভুক্ত এয়ুরোপীয় মনীষী ফ্রানৎস কাফকা বলিয়াছেন জীবনের অর্থ স্রেফ মৃত্যু, মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই নহে। এই সত্য এয়াহুদি-নাসারাদি হজরত এব্রাহিমের ধর্মে কল্পনাও করা যায় কি? নিরপরাধের মৃত্যুর মধ্যবর্তিতায় আমরা সকল মৃতকে আবার প্রেমের বন্ধনে বাঁধিতে পারিব। এই বিশ্বাস যদি বজায় রাখিতে হয় তো কবুল করিতে হইবে, আত্মহত্যাকারী আদমবোমারুটিও সেই প্রেম পাইবার অধিকারী। তাহা কি সম্ভব?

ইহাও যদি সম্ভব হয় তো বলিতে হয় কী ঘাতক,কী শিকার, কী নিছক পথচারী সকলেই বোধ করি অপরাধী। সকলেই বোধ করি একই প্রতিকারহীন অপরাধ করিয়াছে।

তালাল আসাদ, সবশেষে, সিদ্ধান্ত করিয়াছেন আদমবোমার আসল ঘটনা কী মরায়, কী মারায়, কী মরিয়া মারায়—কোনোটাতেই পাইবেন না। দুনিয়াবি আধুনিক স্বাধীনতা-ব্যবসায়ীরা যাহা প্রাণপণে লুকাইতে চাহেন আদমবোমাবাজ তাহাই প্রকাশ করিয়া দেয়। শিহরণের ইহাই বোধ করি সবচেয়ে নিগূঢ় কারণ।

আদমবোমারুর অভিযান মনে হয় অনন্ত স্বাধীন। প্রতিষ্ঠান হইতে স্বাধীন থাকিয়া কোনো মানুষই নিজের অন্তস্তলের বিকাশ ঘটাইতে পারে না। আদমবোমারু সেই অসম্ভবের পায়েই আত্মনিবেদন করে। আধুনিক পৃথিবীর স্বাধীনতা-ব্যবসায়ের এই গোপন বিবাদ ক্ষণকালের জন্য বে-আবরু করিয়া মরিয়া যায় আদমবোমারু। তাহার এই অন্তহীন স্বাধীনতার অলীক আবদার প্রকৃত প্রস্তাবে একালের স্বাধীনতা-ব্যবসায়েরই অকথিত বিলাস। সেই অর্থে কি বলা যায় না আদমবোমাবাজিও বর্তমান পৃথিবীর মাপে এক প্রকার স্বাধীনতা-ব্যবসায়?

এই প্রশ্নেই শেষ হইয়াছে তালাল আসাদের শেষ বক্তৃতা। আমাদের মামলা ন্যায়যোদ্ধা বনাম দুষ্ট সন্ত্রাসীর মামলা নহে। তিনি প্রস্তাব করিতেছেন, ‘স্বাধীনতা-ব্যবসায়ী’ বনাম ‘স্বাধীনতা-ব্যবসায়ী’র মামলা হইলেই তাহা ভালো হইত।


তালাল আসাদের পরামর্শ কতখানি যুক্তিগ্রাহ্য তাহা বিচার করিতে আরেকটি মামলা আমাদের খানিক সহায় হইবে। পাঠিকা নিজেই বলিবেন। এই ঘটনার নায়ককে কি আমরা ‘স্বাধীনতা সংগ্রামী ন্যায়যোদ্ধা’ বলিব নাকি বলিব ‘জঘন্য বোমাবাজ সন্ত্রাসবাদী’?

ঘটনার সূত্রপাত পুরানা ফিলিস্তিন রাজ্যে। এসরায়েলের সন্তানগণ সদাপ্রভুর দৃষ্টিতে যাহা মন্দ তাহা আরো একবার করিলে সদাপ্রভু চল্লিশ বৎসর তাহাদিগকে ফিলিস্তিনি জাতির হাতে সমর্পণ করিলেন। সেই সময়ের কথা। তৎকালে দানীয় গোষ্ঠীর মধ্যে সরানিবাসী মানোহ নামে এক ব্যক্তি ছিলেন, তাঁহার স্ত্রী বন্ধ্যা হওয়াতে অনেক দিন তাঁহাদের কোনো সন্তান হয় নাই। পরে তাঁহাদের এক সন্তান হইলে তাঁহার নাম শিমশোন (ইঙ্গভাষায় স্যামসন) রাখা হয়।

শিমশোন সদাপ্রভুর দয়ায় জন্মিয়াছেন বলিয়া তাঁহার শক্তি অমিত হয়। তিনি ফিলিস্তিনিদের অনেক অনিষ্ট করেন। তাঁহার সর্বশেষ ফিলিস্তিনি প্রণয়িনীর নাম ছিল দলীলা। একদিন তিনি দলীলার অনুনয়ে হার মানিয়া তাহার কাছে নিজের অমিত শক্তির গোপন কথা প্রকাশ করিলেন। কহিলেন, ‘আমার মস্তকে কখনও ক্ষুর ওঠে নাই, কেননা মাতার [গর্ভ] হইতে আমি ঈশ্বরের উদ্দেশে নাসরীয় (উৎসর্গিত); ক্ষৌরি হইলে আমার বল আমাকে ছাড়িয়া যাইবে, এবং আমি দুর্বল হইয়া অন্য সকল লোকের সমান হইব।’

গোপন তত্ত্ব ফাঁস হইবার ফলস্বরূপ শিমশোন একদিন ধরা পড়িলেন। ফিলিস্তিনিরা তাঁহাকে ধরিয়া তাঁহার দুই চক্ষু উৎপাটন করিল, বন্দি অবস্থায় তাঁহার মাথায় চুল আবার গজাইল কিন্তু ইহার অর্থ ফিলিস্তিনিরা ধরিতে পারে নাই। একদিন তাহারা অন্ধ শিমশোনকে মজা করিবার জন্য তাহাদের মহাযজ্ঞানুষ্ঠানে লইয়া আসিল। তাঁহাকে কৌতুক করিতে ডাকিল। ধর্মপুস্তক লিখিতেছেন:
…তাহারা স্তম্ভ সকলের মধ্যে তাঁহাকে দাঁড় করাইয়াছিল। পরে যে বালক হস্ত দিয়া শিম্শোনকে ধরিয়াছিল, তিনি তাহাকে কহিলেন, আমাকে ছাড়িয়া দেও, যে দুই স্তম্ভের উপরে গৃহের ভার আছে, তাহা আমাকে স্পর্শ করিতে দেও; আমি উহাতে হেলান দিয়া দাঁড়াইব। পুরুষে ও স্ত্রীলোকে সেই গৃহ পরিপূর্ণ ছিল, আর পলেষ্টীয়দের [ফিলিস্তিনিদের] সমস্ত ভূপাল সেখানে ছিলেন, এবং ছাদের উপরে স্ত্রী পুরুষ প্রায় তিন সহস্র লোক শিম্শোনের কৌতুক দেখিতেছিল। তখন শিম্শোন সদাপ্রভুকে ডাকিয়া কহিলেন, হে প্রভু সদাপ্রভু, অনুগ্রহ করিয়া আমাকে স্মরণ করুন; হে ঈশ্বর, অনুগ্রহ করিয়া কেবল এই একটী বার আমাকে বলবান করুন, যেন আমি পলেষ্টীয়দিগকে আমার দুই চক্ষুর নিমিত্ত একেবারেই প্রতিশোধ দিতে পারি। পরে শিম্শোন, মধ্যস্থিত যে দুই স্তম্ভের উপরে গৃহের ভার ছিল, তাহা ধরিয়া তাহার একটীর উপরে দক্ষিণ বাহু দ্বারা, অন্যটীর উপরে বাম বাহু দ্বারা নির্ভর করিলেন। আর পলেষ্টীয়দের সহিত আমার প্রাণ যাউক, ইহা বলিয়া শিম্শোন আপনার সমস্ত বলে নত হইয়া পড়িলেন; তাহাতে ঐ গৃহ ভূপালগণের ও যত লোক ভিতরে ছিল, সমস্ত লোকের উপরে পড়িল; এইরূপে তিনি জীবনকালে যত লোক বধ করিয়াছিলেন, মরণকালে তদপেক্ষা অধিক লোককে বধ করিলেন। (পবিত্র বাইবেল, ‘বিচারকর্ত্তৃগণের বিবরণ,’ ১৬: ২৫-৩১; বাঁকা অক্ষর বর্তমান লেখকের)

কাকতালীয় মনে হইতেছে এই সংখ্যা—হতের সংখ্যা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তারিখে নব্য ইয়র্ক নগরীর বিশ্বব্যবসায় ভবনে নিহতের সংখ্যার কাছাকাছি। আসাদ কহিতেছেন হতাহতের সংখ্যাটাই আসল ঘটনা নহে, জীবিতরা এই ঘটনার কোন অর্থ করিতেছেন তাহাতেই পাওয়া যাইবে সত্য ঘটনা। শিমশোনের উদ্দেশ্য বা মতলব লইয়া ধর্মপুস্তক বেশি জায়গা খরচ করেন নাই। তাঁহারা লিখিয়াছেন শুদ্ধ এই কথা: ‘পরে, তাঁহার ভ্রাতৃগণ ও তাঁহার সমস্ত পিতৃকুল নামিয়া আসিয়া তাঁহাকে লইয়া সরা ও ইষ্টায়োলের মধ্য-স্থানে তাঁহার পিতা মানোহের কবরস্থানে তাঁহার কবর দিল। তিনি বিংশতি বৎসর ইস্রায়েলের বিচার করিয়াছিলেন।’ (পবিত্র বাইবেল, ‘বিচারকর্ত্তৃগণের বিবরণ,’ ১৬: ৩১)

হাল জমানার এসরায়েল রাষ্ট্রে শিমশোনের গল্প বিদ্যালয়ে পড়ানো হয়। সেখানে তাঁহাকে বলা হয় ‘দুর্ধর্ষ এয়াহুদি’। শুদ্ধ তাহাই নহে, ব্রিটিশ দখলভুক্ত ফিলিস্তিনে বলপূর্বক এয়ুরোপীয় কায়দায় প্রতিষ্ঠিত আধুনিক রাষ্ট্রের নামও রাখা হইয়াছে এসরায়েল। ফিলিস্তিনে এয়াহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাহিনীকে এই দুনিয়ায় এয়াহুদি জাতির মুক্তিলাভের রূপকল্পস্বরূপ প্রচার করিবার জন্যও এই শিমশোন গল্পটি বয়ান করা হইয়া থাকে। ১৯২৭ সনে জিয়েব ইয়াবোতিনস্কি (Ziev Jabotinsky) নামে পরিচিত জনৈক জায়নপন্থী নেতা এক আধুনিক উপন্যাস লিখিয়া এই কাহিনীর সমকালীন রূপও প্রচার করিয়াছিলেন।

হজরত ইসার অনুসারীদের মধ্যেও এই গল্পটা নানাভাবে প্রচলিত আছে। কেহ কেহ ইহাকে নৈতিক আত্মশুদ্ধির গল্প হিসাবে পড়িতেছেন। শিমশোন খানিক ইন্দ্রিয়কাতর ছিলেন তাহাতে সন্দেহ নাই। ধর্মপুস্তকেই তাহার বিবরণ পাই। তিনি মা-বাবার কথা অগ্রাহ্য করিয়া ফিলিস্তিনি জাতির মধ্যে মনোহরা কন্যা দেখিতে পাইতেন। সেই দোষেই তাঁহার বন্দিত্ব, দাসত্ব ও অন্ধত্ব।

কিন্তু আধুনিক বিপ্লবী খ্রিস্টান, ১৭ শতকের ইংরেজ কবি মিল্টনও তাঁহার শেষ বয়সে অন্ধাবস্থায় নিজেকে শিমশোন ভাবিয়াছিলেন এবং রাজতন্ত্রী বদমায়েশদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে শিমশোনের মতন জয়ী হইবার আশা ব্যক্ত করিয়াছিলেন। তিনি দেখিয়াছিলেন শিমশোনের কঠিন নৈতিক রূপ। বাংলাদেশের কবি মহাত্মা শামসুর রাহমানও এই রূপের অন্যথা দেখেন নাই। (রাহমান ২০০৯: ১০৫-০৭; দেখুন, সংবর্ধনা ৩) বিস্ময়ের কী আছে, এই নীতির পরাকাষ্ঠাকেই একালের এসরায়েল রাষ্ট্রের মুক্তির প্রতীক গণ্য করা হইতেছে।

কী বিচিত্র এই দুনিয়া! শিমশোনের আত্মদানের মধ্যবর্তিতায় এসরায়েল-সন্তানগণ ফিলিস্তিনিদের হাত হইতে মুক্ত হইয়াছিল। কিন্তু মুক্ত করিয়া তিনি তাহাদের আবার বন্দিও করিয়াছিলেন। ইহা জানিয়াও না জানিবার ভান করা ছাড়া এসরায়েল-সন্তানদের এখন অন্য উপায় কোথায়?

এই অসহায়তার কথা মধ্যে মধ্যে গোপনে প্রকাশিত হয়। যেমন এসরায়েল রাষ্ট্রের গোপন পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের নাম রাখা হইয়াছে ‘শিমশোন কৌশল’ (The Samson Option)। হাতের তালুর সমান সামান্য ভূ-ভাগে এই পথ গ্রহণের অর্থ মানে অকল্পনীয়ের জয়ধ্বনি করা—দুশমনের সঙ্গে সঙ্গে ‘আমারও প্রাণ যাউক’ বলিয়া ওঠা।

দুঃখের মধ্যে, বর্তমান এসরায়েল রাষ্ট্রে এই কৌশল আমল করিবার লোকও কম নাই। কথা সেই লোকদের লইয়া নহে। আমাদের কালের স্বাধীনতা-ব্যবসায়ীগণ যে বলেন: যে কোন মূল্যে আমাদের জীবনধারা বাঁচাইতে হইবে—শিমশোনের পথও কি সেই মূল্য তালিকারই অন্তর্গত নহে?

পাঠিকা বলিবেন, আমাদের সুন্দর স্বাধীনতা-ব্যবসায়ীও কি এই হিসাব মাফিক এক ধরনের আদমবোমারু নহেন?

……………
আদমবোমা, ফেব্রুয়ারি ২০০৯

দোহাই
১. পবিত্র বাইবেল, নূতন নিয়ম, যোহন লিখিত সুসমাচার (বাঙ্গালোর: ভারতের বাইবেল সোসাইটি, সনতারিখ নাই)।
২. পবিত্র বাইবেল, পুরাতন নিয়ম, বিচারকর্ত্তৃগণের বিবরণ (বাঙ্গালোর: ভারতের বাইবেল সোসাইটি, সনতারিখ নাই)।
৩. শামসুর রাহমান, শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা, ৮ম মুদ্রণ (ঢাকা: সাহিত্য প্রকাশ ২০০৯)।
৪. Eqbal Ahmad, The Selected Writings of Eqbal Ahmad, eds. C. Bengelsdorf et al. (New York: Columbia University Press, 2006/ka), pp. 298–317, 377–80.
৫. Talal Asad, On Suicide Bombing (New York: Columbia University Press, 2007).
৬. Richard Gamble, The War for Righteousness: Progressive Christianity, the Great War and the Rise of the Messianic Nation (Washiston, DC: ISI, 2003), p. 153.
৭. John Milton, Samson Agonistes, ed. F. T. Prince, 2nd imp. (Delhi: Oxford University Press, 1982).
৮. Jacqueline Rose; ‘Deadly Embrace,’ London Review of Books, vol. 26, no. 21 (4 November 2004).

দলিলপত্র 
৯. The Indian Law Commissioners, A penal code prepared by the Indian Law Commissioners, and published by command of the Governor General of India in Council (London: Pelham Richardson, Cornhill, 1838), reprint (Union, NJ: Lawbook Exchange, 2002).

প্রথম প্রকাশ: সলিমুল্লাহ খান, আদমবোমা, আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান সম্পাদিত, ইতিহাস কারখানা ২ (ঢাকা: আগামী প্রকাশনী এবং এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভা, ২০০৯)।

বিডিনিউজ, আর্টস, ১০ এপ্রিল ২০০৯

গুরুর চণ্ডাল ভাব অথবা অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক

এই যুগের বাঙ্গালা ভাষায় গুরু ও শিষ্যের সম্বন্ধ লইয়া পড়িবার মতন বহি বিশেষ লেখা হয় না। ইহাই নিয়ম। মহাত্মা আহমদ ছফা বিরচিত যদ্যপি আমার গুরু এই নিয়মের অতিক্রম।

joddopi.jpg…….
যদ্যপি আমার গুরু / আহমদ ছফা / প্রকাশক: মাওলা ব্রাদার্স, (প্রথম প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮;) তৃতীয় সংস্করণ মে ২০০০ /
১১০ পৃষ্ঠা / ৮০ টাকা / প্রচ্ছদ: কাইয়ুম চৌধুরী

……..
পত্রিকার পাতায় প্রথম প্রকাশের সময় ইহার শিরোনাম আরো চওড়া হইয়াছিল। নাম ছিল ‘যদ্যপি আমার গুরু প্রফেসর রাজ্জাক’। আহমদ ছফা শেষ পর্যন্ত কাটিয়া নাম ছোট করিয়াছেন বলিয়া ধন্যবাদ পাইতেছেন। যদিও এই বই অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের এক জাতীয় শিষ্য আহমদ ছফা লিখিত তবু ইহা গুরু-শিষ্য বিসম্বাদের অধিক হয় নাই। ইহাতে যে গুরুচিত্র পাইতেছি তাহাতে বলিতে গুরুতর লাভই হইয়াছে।
—————————————————————–
শুদ্ধ খাদ্য আর পাঠ্যই নহে, মানুষ চিনিবার আরেক পন্থা আছে। কে কাহার লগে চলাফেরা করেন তাহাও দেখিতে হইবে। রাজ্জাক সাহেবের বন্ধু ছিলেন কবি জসীমউদ্দীন, শিল্পী জয়নুল আবেদীন। বন্ধু তাঁহার আরো হইয়াছিল। দাবাড়ু নিয়াজ মোর্শেদও তাঁহার শিষ্য অথবা বন্ধু। এগুলি ভালো বন্ধু। কিন্তু প্রদীপের নিচেও অন্ধকার থাকে। রাজ্জাক সাহেবের বন্ধু নানা প্রকারের। তাঁহার সকল বন্ধু আহমদ ছফার পছন্দের হয় নাই। ছফা স্পষ্টাক্ষরে লিখিয়াছেন: মতলববাজ মানুষরাই বেশির ভাগ সময় রাজ্জাক সাহেবকে ঘিরিয়া থাকিতেন।
—————————————————————-
অধ্যাপক রাজ্জাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বনিয়াছিলেন ১৯৩৬ সালে। ১৯৯৯ সালে পরলোক যাইবার পূর্ব পর্যন্ত তিনি নগরী ঢাকাতেই থাকিতেন। তাঁহার সম্পর্কে আহমদ ছফা যাহা যাহা লিখিয়াছেন তাহা তাহা এই অধ্যাপক মহোদয়ের জীবনের শেষ কিছু কম ৩০ বছর ব্যাপিয়া—১৯৭০ হইতে ১৯৯৮ সালের মধ্যে—ঘটিয়াছে। এইখানে শেষ জীবনের আবদুর রাজ্জাককে পাওয়া গেলেও যাইতে পারে—এহেন সম্ভাবনা আছে।

আহমদ ছফা সাক্ষ্য দিতেছেন তিনি দীর্ঘ আটাইশ ঊনত্রিশ বছর ধরিয়া অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সান্নিধ্য পাইয়াছেন। তথাপি রাজ্জাক সাহেব একদিনের জন্যও তাঁহার নিকট পুরাতন হইয়া যান নাই। প্রতিবারই তাঁহার ব্যক্তিত্ব এবং জানাশোনার পরিধি ছাত্রের নিকট নতুন নতুন চমকের মতন মনে হইয়াছে। ইহাই আসল কথা। আহমদ ছফা জানাইতেছেন: প্রথম দিন তাঁহার সঙ্গে কথা বলিয়া যেভাবে বিস্মিত হইয়াছিলাম, এখনো—মানে বাংলা ১৪০৪ সনে (ইংরেজি ১৯৯৮)—একই ধরনের বিস্ময় তিনি আমাদের মধ্যে সৃষ্টি করিতেছেন।

বিস্ময় আসে কোথা হইতে? নবীনত্ব হইতে। ফরাসি চলচ্চিত্রকর রোবের ব্রেসোঁ (Robert Bresson) বলিতেন নবীনত্বই আসল। ইহা আদিসত্তাও নহে, সর্বশেষাবস্থাও নহে। আহমদ ছফা গুরু মারা নবীন বিশেষ শিষ্য। ইহাতে সন্দেহ নাই।


১৯৭০ সালের কথা।

কেহ কিংবা কাঁহারা জানি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তার যশোপ্রার্থী তরুণ আহমদ ছফাকে বলিয়াছিলেন অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের তত্ত্ব অবধান করিয়া উপাধি গ্রন্থ লিখিতে। বাংলা একাডেমী হইতে বৃত্তি পাইয়া তিনিও সরেনজর গবেষণা করিবার মানস করিলেন অধ্যাপক রাজ্জাকের অধীনে। রাজ্জাক সাহেব বলিলেন গবেষণা করিবেন ভালো কথা। কিন্তু আমার অধীনে করিতে পারিবেন না। কারণ থিসিস যাঁহাদের অধীনে করা যায় তাঁহাদের প্রয়োজন বিশেষ যোগ্যতার—তাঁহাদিগকে প্রফেসর বা রিডার (এখনকার দেশীয় ভাষায় অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর) হইতে হয়। রাজ্জাক সাহেব বলিলেন, ‘আমি ত মোটে লেকচারার।’ (ছফা ২০০৭: ১৭)

প্রশ্ন উঠিতে পারে, কোন লোক প্রায় ৩৪-৩৫ বছর পড়াইয়াও মোটে ‘লেকচারার’ কেন? ১৯৭২ সালে তাঁহাকে সরাসরি জাতীয় অধ্যাপক বানানো হইয়াছিল। ততদিনে তাঁহার গুণগ্রাহী ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তা হইয়াছেন। অন্যায়ের শেষ হইল। এই যে সারাজীবন পদোন্নতি না লইয়া থাকা ইহা কি কম চমক সৃষ্টি করিবার মতন ঘটনা? নিয়মের অতিক্রম বা ব্যভিচার বলিতে কী বুঝায় যাঁহারা জানিতে চাহেন তাঁহারা এই ঘটনা আমল করিতেই পারেন।

শিক্ষক হিসাবে অধ্যাপক রাজ্জাকের প্রথম উপদেশটা আকর্ষণীয়। আহমদ ছফার গবেষণার বিষয় কী জিজ্ঞাসা করিয়া অধ্যাপক রাজ্জাক জানিলেন বিষয়টি অতি বড়। ‘১৮০০ হইতে ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ এবং সাহিত্য সমাজ ও অর্থনীতি ক্ষেত্রে তাহার প্রভাব’—এই চওড়ালম্বা নাম শুনিয়া রাজ্জাক সাহেব কহিলেন, ‘এক্কেরে ত সাগরসেঁচার কাম। কার বুদ্ধিতে এই গন্ধমাদন মাথায় লইছেন?’ (ছফা ২০০৭ ১৮) এই সন্দেহ যথার্থ ছিল। আহমদ ছফা নিজেই জানাইয়াছেন তিনি কোনদিন এই থিসিস লিখিয়া সারিয়া উঠিতে পারেন নাই। (ছফা ২০০৭: ১৩) এই সত্য কথাটি আরো সত্য হইত যদি তিনি বলিতেন রাজ্জাক সাহেবের সাহায্য পাইয়াও পারেন নাই। অথচ ছফা বলিয়াছেন ইহার জন্য—না পারার জন্য—তিনি মহান আবদুর রাজ্জাককেই দায়ী মনে করেন।

আহমদ ছফা ‘দায়ী’ কথাটি নিছক নিন্দা করিবার ছলে বলেন নাই। ইহার একপাটি ছক তো আছেই। রাজ্জাক সাহেব তাঁহাকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানান বই পড়িতে বলিয়া এক প্রকার সাগরে ডুবাইয়া দিলেন। সেই সাগর সেঁচার শেষ হয় নাই বলিয়াই আহমদ ছফার উপাধির বইটি লেখা শেষ হয় নাই। ইহা কি নিন্দার না প্রশংসার কথা পাঠিকা বলিবেন। আমি বলি ইহাও নিয়মের ব্যভিচার বৈ নহে। অধ্যাপক রাজ্জাকের চমক আরো এক দফা দেখিলেন আহমদ ছফা।

উপাধি পাওয়ার জন্য লিখিলেন। অতয়েব ‘কাম’চর্চা হইল। এমনি এমনি—মানে ‘আকাম’স্বরূপ—পড়িলেন। তাহাতে কী হইল? উত্তরে ছফা বলিলেন আকাম হইবে কেন? ইহার নাম তো ‘নিষ্কাম’ জ্ঞানচর্চা। নিষ্কাম জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে, দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা নির্মাণে আর প্রচলিত জনমত উপেক্ষা করিয়া আপন বিশ্বাসের উপর স্থির থাকিবার ব্যাপারে আবদুর রাজ্জাক অদ্বিতীয় ছিলেন—ছফা লিখিয়াছেন।

আমরা অনেক সময় বলিয়া থাকি যেমন গুরু তেমন শিষ্য। কিন্তু ভাবিলে টের পাইতাম ইহার উল্টাটাও কম সত্য নহে: যেমন শিষ্য তেমন গুরুও বটে। আহমদ ছফার মতন শিষ্য না পাইলে রাজ্জাক সাহেবের গুরুজীবন চোদ্দ আনা আমাদের অজানাই থাকিত। স্থানে স্থানে আহমদ ছফার নিজ ‘মনো-উক্তি’ প্রকাশিত হইলেও আমরা দেখিতেছি তাঁহার গুরুভক্তি কোথাও শিথিল কবরী হয় নাই।

গ্রন্থনামেই তাঁহার প্রথম দৃঢ় প্রকাশ। আমার গুরু যদি শুঁড়ি বাড়িও যাইয়া থাকেন, তাহাতে ক্ষতিবৃদ্ধি নাই। তিনি গুরুই থাকেন। শাস্ত্রমতে ইহাই ভক্তি। ভাগ করিয়া দেওয়ার মতন মনোভাবই ভক্তি। আহমদ ছফা এই গুরুভক্তি প্রকাশ করিতে গিয়া কোথাও কোথাও গুরুকে চাঁড়াল করিয়া ছাড়িয়াছেন। তাঁহার বিবরণ এক স্থানে এই রকম: তখন অধ্যাপক সাহেব শহিদ মিনারের বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কোয়ার্টারের একটিতে নিচের তলায় থাকিতেন। ছফা প্রবেশ করিলেন। দেখিলেন ঘরটির পরিসর বিশেষ বড় নহে। চারিদিক বইপুস্তকে ঠাসা। ঘরটিতে একটিমাত্র খাট। না, খাট লিখা ঠিক হইবে না, চৌকি। সামনে একটি ছোট টেবিল। চৌকিটির আবার একটি পায়া নাই। সেই জায়গায় বইয়ের উপর বই রাখিয়া ফাঁকটুকু ভরাট করা হইয়াছে। চমৎকার ব্যবস্থা। পুরানা বইপত্রের আলাদা একটা গন্ধ আছে। ছফা সেই বইপত্রের জঞ্জালে হতবিহ্বল হইয়া দাঁড়াইয়া আছেন। এই ঘরে যে কোন মানুষ আছে তিনি প্রথমে খেয়ালই করেন নাই। হঠাৎ দেখিলেন চৌকির উপর একটা মানুষ ঘুমাইয়া আছেন। একখানা পাতলা কাঁথা সেই মানুষটার নাক অবধি টানিয়া দেওয়া। চোখ দুইখানি বোজা। মাথার চুল কাঁচা ও পাকা। অনুমানে ছফা বুঝিয়া লইলেন, ইনিই তাঁহার আরাধ্য অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক। (ছফা ২০০৭: ১৫-১৬)

অধ্যাপক রাজ্জাকের সদুপদেশমালার একাংশ ছফা সাহেব আমাদের জানাইতেছেন। অধ্যাপক বলিলেন, যখন কোন নতুন জায়গায় যাইবেন, দুইটা বিষয় পয়লা জানিবার চেষ্টা করিবেন। ওই জায়গার মানুষ কী খায়। আর পড়ালেখা কী করে। কী খায় দেখিবার লাগিয়া কাঁচাবাজারে যাইবেন আর বইয়ের দোকানে যাইবেন পড়াশোনা উনারা কী গোছের করেন তাহা জানিবার লাগিয়া। কী খায় কী পড়ে এই দুইটা জিনিস না জানিলে কোন জাতির কোন কিছু জানিতে পারা যায় না। (ছফা ২০০৭: ২১-২২)


অধ্যাপক রাজ্জাক কী খাইতেন তাহার বিবরণ ছফার বইতে পাইবেন। একটা দৃষ্টান্ত: একটা বড় চীনামাটির প্লেটে চৌকোনা সাইজের পুরু পরাটার স্তূপ। ভুনা গরুর মাংস। চিতই পিঠার সঙ্গে ভাজা ইলিশের টুকরা। ফালি ফালি করিয়া কাটা পনির। ডিম ভাজা। ভাজা রূপচান্দা শুঁটকি। একপাশে গরম করা গতরাতের বাসি ভাত। আরেকটা বাটিতে ছফা দেখিলেন খুদ ভাত। রাজ্জাক স্যার বাসি ভাতের প্লেট হইতে চামচ দিয়া ভাত তুলিয়া লইলেন। তারপর ভাতের সঙ্গে কিছু তাজা মুড়ি মাখাইয়া লইলেন। ছফা জানিতে পারিলেন, ঢাকা জিলার কেরানিগঞ্জ এলাকার মানুষজন ভাতের সঙ্গে মুড়ি মাখাইয়া তৃপ্তির সহিত ভোজন করিয়া থাকেন। ইহা শুদ্ধ প্রাতঃকালের খাদ্য। ছফা দেখিলেন মাত্র।

শুদ্ধ খাদ্য আর পাঠ্যই নহে, মানুষ চিনিবার আরেক পন্থা আছে। কে কাহার লগে চলাফেরা করেন তাহাও দেখিতে হইবে। রাজ্জাক সাহেবের বন্ধু ছিলেন কবি জসীমউদ্দীন, শিল্পী জয়নুল আবেদীন। বন্ধু তাঁহার আরো হইয়াছিল। দাবাড়ু নিয়াজ মোর্শেদও তাঁহার শিষ্য অথবা বন্ধু। এগুলি ভালো বন্ধু। কিন্তু প্রদীপের নিচেও অন্ধকার থাকে। রাজ্জাক সাহেবের বন্ধু নানা প্রকারের। তাঁহার সকল বন্ধু আহমদ ছফার পছন্দের হয় নাই। ছফা স্পষ্টাক্ষরে লিখিয়াছেন: মতলববাজ মানুষরাই বেশির ভাগ সময় রাজ্জাক সাহেবকে ঘিরিয়া থাকিতেন। উদাহরণের মধ্যে এককালীন উপাচার্য আবদুল মতিন চৌধুরী, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু মাহমুদ ও অধ্যাপক ওয়াহিদুল হকসহ অনেকেই। সর্বমহি কথা।

আহমদ ছফা রাজ্জাক সাহেবের সহিত প্রেম করিয়াছেন—নিজের প্রেমকে তিনি বলিয়াছেন নিষ্কাম। (ছফা ২০০৭: ২৮) আথেনস নগরীর তরুণদল দলে দলে যে অমৃতের টানে সক্রাতেসের ছাতার তলে ছুটিয়া যাইত, ছফা সাহেবও সেই রকম ‘নিষ্কাম টান’ খাইয়া রাজ্জাক সাহেবের ছাতার নিচে ছুটিয়া গিয়াছিলেন। বলিয়াছেন, তাঁহার ব্যক্তিত্বের এমন একটা সুন্দর সম্মোহন রহিয়াছে যাহার আকর্ষণ এড়ানো তাঁহার পক্ষে সম্ভব হয় নাই। তিনি মনে মনে রাজ্জাক সাহেবকে তাজমহল নামক একটি দালানের সহিত তুলনা করিলেন। বলিলেন তাজমহলকে সামনে হইতে, পিছন হইতে, ডাইন হইতে, বাম হইতে যেইদিক হইতেই দেখা হউক না কেন দর্শকের দৃষ্টিতে ক্লান্তি আসে না। আরো দেখার পিপাসা জাগে।

পরক্ষণেই ছফা ভাবিলেন এই তাজমহল সেই তাজমহল কিনা। তাঁহার ভাষায়: রাজ্জাক স্যার তাজমহল ঠিকই, তবে তাহাতে কোন দরজা জানালা নাই। থাকিলেও তাহাতে কোন ছিটকিনি নাই। এই দিকের হাওয়া ঢুকিয়া ওইদিক দিয়া চলিয়া যায়। ওইদিকের হাওয়া এইদিকে। এই রকম দীপ্তিমান মনীষাসম্পন্ন ব্যক্তি কেন এই অজস্র বামুন-পরিবেষ্টিত অবস্থায় সকলের মাপে নিজেকে ছোট করিতেছেন তাহার কারণ ছফা আবিষ্কার করিতে পারেন নাই। ছফা দাবি করিয়াছেন অনেক সময় লাগিয়াছে আবিষ্কার করিতে। কিন্তু আমরা সবিনয়ে বলিব তাহার দাবি অসারই থাকিয়া গিয়াছে। (ছফা ২০০৭: ২৯)

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক একটা থিসিস লিখিয়াছিলেন। ১৯৫০ সালে উহা শেষ না করিয়াই তিনি ইংরেজভূমি হইতে বঙ্গদেশে ফিরিয়া আসেন। অনেক পরে ১৯৮০ সালে তিনি তাঁহার ছাত্র মোজাফফর আহমেদ চৌধুরীর নামে একটা বক্তৃতা লিখিয়াছিলেন। ইহা ছাড়াও তাঁহার আরো ছোটখাট লেখা থাকিতে পারে। কিন্তু সেইগুলি আজি পর্যন্ত এক জায়গায় করা হয় নাই। তাই লোকে বলে তিনি বিশেষ লেখেন নাই। ছফা বলিয়াছেন ইহার কারণ দুই হইতে পারে। অনেক সময় উৎকৃষ্ট বীজ পাথরে পড়িয়া নষ্ট হয়। ছফা সাহেবের ধারণা রাজ্জাক সাহেবের বেলায় তাহাই ঘটিয়াছে। দেশ ও কাল তাঁহার সহায় হয় নাই। আরেকটা কারণ—রাজ্জাক সাহেবের মানসিক উন্নতি। সেই কালের বামনদের স্তরে তিনি নামিতে পারেন নাই। ছফা শুদ্ধ দুইটা উদাহরণ দিয়াছেন: রাজ্জাক সাহেব যৌবনে ট্রটস্কি নামা রুশীয় দার্শনিক রাজপুরুষের চিরস্থায়ী এনকেলাব (পারমান্টে রেভুলুশন) শীর্ষক বহিও তর্জমা করিয়াছিলেন। আর এদিকে বাংলাভাষায় লেখা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্বদেশি পুস্তিকা বাংলার ব্রত ইংরেজিতে লিখিয়াছিলেন।


অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিংবদন্তি। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন সারা বাংলাদেশের নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশে তাঁহার নাতিদীর্ঘ ছায়া পড়িয়াছে। ইহা ছফা জানেন। তিনি শুদ্ধ রাজনীতি বা অর্থনীতির বিষয়ই জানিতেন না, সাহিত্য, শিল্পকর্ম, সঙ্গীত ও অন্যান্য সূক্ষ্মকলা সম্বন্ধে তাঁহার জ্ঞান ও ভালোবাসা দুইটাই প্রবল ছিল।

রাজা রামমোহন রায় হইতে শুরু করিয়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত আধুনিক বাংলাদেশের নামজাদা বুদ্ধিজীবীদের বিষয়ে রাজ্জাক সাহেবের নানা বক্তব্যের সকলই চমকপ্রদ। রামমোহন রায়ের সকল কাজের মধ্যে বাংলা ভাষা চর্চাই প্রধান। ইহাই অধ্যাপক রাজ্জাকের মত। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে তিনি পুরুষসিংহ বলিতেন। সমাজনেতা হিসাবে রবীন্দ্রনাথকে বিদ্যাসাগরের চেয়ে ছোট মাপের লোক বলিয়াছেন তিনি। ইহা চলিত জনমতের সহিত মিলিবে না। আহমদ ছফাও মানিতে পারেন নাই।

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক সম্বন্ধে প্রচার আছে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের স্থপতিগণের মধ্যে পড়েন। কেহ কেহ বলেন আওয়ামী লীগ প্রণীত ছয়দফার মূল ধারণা তাঁহারই চিন্তার ফসল। এই সত্যের স্বীকৃতি পরোক্ষে পাওয়া যায় সারা পাকিস্তান যুগে তাঁহার পদোন্নতি না হওয়ার ঘটনায়। সবচেয়ে বড় কথা, পাওয়া যায় দেশ স্বাধীন হইবার পর তাঁহাকে মানবিক বিদ্যায় জাতীয় অধ্যাপক পদে বরণ করিবার সরকারি সিদ্ধান্তেও।

কিন্তু খটকা থাকিয়া যাইতেছে অন্য জায়গায়। একইভাবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও প্রাণ ঢালিয়াছিলেন তিনি। তিনি মোহাম্মদ আলি জিন্নাহর অনুরাগী ছিলেন। পাকিস্তান আন্দোলনকে তিনি শুদ্ধ সাম্প্রদায়িকতা বলিয়া তুচ্ছ করিতেন না। বলিতেন উহাও বাংলার মুসলমান সমাজের অধিকার প্রতিষ্ঠার ন্যায্য আন্দোলন ছিল। একইভাবে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু ছাড়া অন্য নামে ডাকিতেন না। আমি অদ্য কথা দুইটি বলিলাম তাঁহার দুই বইয়ের দোহাই দিয়া। একটি অপ্রকাশিত থিসিস, আমি উহা দেখিয়াছি। অন্যটি প্রকাশিত বক্তৃতা। আমি তাহার সমালোচনা এক সময় লিখিয়াছিলাম।

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের রাষ্ট্রচিন্তার সহিত আমি দ্বিমত করিতাম। সেই পার্থক্য এখনো বজায় রহিয়াছে। কিন্তু তাঁহার মহত্ত্ব আমিও স্বীকার করিয়াছি। আহমদ ছফার সহিত একমত হইয়া আমিও বলিব নিজের দেশ ও সমাজের প্রতি নিঃশর্ত অঙ্গীকারই তাঁহাকে আর দশজনের নিকট হইতে আলাদা করিয়াছে। আহমদ ছফা বলিয়াছেন, বাঙালি মুসলমান সমাজকে বুদ্ধির দিক হইতে সাবালক করিবার পিছনে তাঁহার ভূমিকা আর সকলের তুলনায় উপরে আছে।

তিনি একদিন মনে করিয়াছিলেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পাইলে বাংলার মুসলমান সমাজের উপকার হইবে। এখন পাকিস্তান গিয়াছে, বাংলাদেশ আজও টিকিয়া আছে। রাজ্জাক সাহেব এই দুই যুগ, দুই সময় পার করিয়াছেন কিন্তু এক সমাজই রহিয়া গিয়াছে। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে আহমদ ছফা বাঙালি মুসলমান সমাজের সবচেয়ে সুন্দর প্রতিনিধি বলিয়া রায় দিয়াছেন। এই সুন্দর শব্দটার ইংরেজি অনুবাদ দাঁড়ায় সেকুলার বা সোজা মানুষ। ধর্ম বলিতে এয়ুরোপে যে বাঁকা বাঁকা চাকা বোঝাইত সেকুলার বা দুনিয়াদারি তাহার তুলনায় সোজাসাপ্টা।

ঢাকায় যে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণী এখন রাজত্ব করিতেছেন জাতীয় পরিচয়ে তাঁহারা বাঙালি মুসলমান। সেকুলার বাঙালি মুসলমান কথাটা কাঁহারও পছন্দ না হইলে বলিতে পারেন চাঁড়াল মুসলমান। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক নিঃসন্দেহে এই মুসলমান ও বাঙালি চণ্ডালদের গুরু।

দোহাই
১. আহমদ ছফা, যদ্যপি আমার গুরু, ৪র্থ সংস্করণ (ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৭)।
২. সলিমুল্লাহ খান, বাংলাদেশ: জাতীয় অবস্থার চালচিত্র, [প্রথম প্রকাশ ১৯৮৩] তৃতীয় সংস্করণ (ঢাকা: বাঙলা, ২০০৩)।

বিডিনিউজ, আর্টস, ১৪ মার্চ ২০০৯

সাম্রাজ্যবাদের যুগে দুই বিশ্বের কবিতা

samson-destroys-the-temple.jpg
শিল্পী মার্ক শাগালের ছবিতে মন্দির ভাঙছে স্যামসন।


Hegemony entails the dominance of a given discourse even among those who are not its beneficiaries. It is the cultural arm of imperialism.
যে ভাবধারায় আপনার স্বার্থ নাই সেই ভাবধারার সম্মুখে আপনিও যখন নতি স্বীকার করেন তখন বলিতে হইবে সেই ভাবধারার আধিপত্য কায়েম হইয়াছে। সাম্রাজ্যবাদের সাংস্কৃতিক প্রকাশ এমনই।
—একবাল আহমদ (২০০৬/ক: ২৩১)

alpa_1.jpgজাতীয় কবিতা পরিষদের আমন্ত্রণ পাইয়া আমার মনে হইয়াছিল আরেকবার জন্মগ্রহণ করিবার আমন্ত্রণ পাইয়াছি। কিন্তু লিখিতে বসিয়া টের পাইলাম এই কাজ অতিশয় কঠিন—পাণিগ্রহণের চেয়ে কম কঠিন নহে। কথাটা খুলিয়া বলিব।

আর যে অপবাদই কবিদের দেওয়া যাউক না কেন তাঁহারা বড় সহনশীল এই অপবাদ কেহ দিতে পারিবেন না। কবিরা সমালোচনা ব্যবসায়ীদের কত সহ্য করিতে পারেন তাহা আমার জানা নাই। স্মরণ করুন খোদ জীবনানন্দ দাশের বাক্য। সমারূঢ় সমালোচককে তিনি বরং কবিতা লিখিয়া দেখিবার রূঢ় উপদেশই দিয়াছিলেন। কবিরা শুদ্ধ স্বজনের সমালোচনা শুনিতে প্রস্তুত, তাহার অধিক শুনিবেন না।
—————————————————————–
জেমিসনের মতে তৎকথিত ‘তৃতীয় বিশ্বের’ সাহিত্য ব্যক্তি মানুষের গল্প বলিতে একেবারেই অপারগ, একান্তই অক্ষম। ব্যক্তির কথা বলিতে বলিতে সে অজান্তে কেবল জাতির গল্পই বলিয়া বসে।… আমরা ফরাসি শার্ল বোদলেয়ার আর বঙ্গীয় শামসুর রাহমানের দৃষ্টান্তযোগে দেখাইলাম জেমিসনের বক্তব্য সত্য না-ও হইতে পারে।… এজাজ আহমদ লিখিয়াছেন, একই কারণে কোনো দেশের সাহিত্যকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিশ্বের বলিয়া আলাদা করাটা বর্ণবাদের অর্থাৎ পুরাতন উপনিবেশবাদের জের।… জেমিসন মার্কিন জাতীয়তাবাদীর মতন লিখিলেও লোকে ভাবে তিনি বুঝি মার্কস ব্যবসায়ীও বটেন। এজাজ আহমদ তাঁহার মুখোশ কিছু পরিমাণে আলগা করিয়া দিয়াছেন।
—————————————————————-
ইচ্ছায় হই আর অনিচ্ছায় হই, আমি সমালোচনার আদার বেপারি। একদা কবিযশোপ্রার্থীদের সঙ্গে কিছু সময় আমিও কবিতা-জাহাজের খবর লইয়াছিলাম। এই কথা স্বীকার করিতে দোষ নাই। সেই সুবাদে কিনা জানি না: কবিদের সমালোচনা করিবার খানিক অধিকার আমিও হয়তো অর্জন করিয়াছি।

তদুপরি শুনিয়াছি একালের আরবি প্রবাদে আরো একটা কথা চালু আছে। কুল্লু মান কানু আরাবুন ফি লোগাতিহিম, ওয়া সাকাফাতিহিম, ওয়া ওয়ালাইহিম ফা হুম আল-আরাব। অর্থাৎ যে তাহার বাক্যে, আচারে এবং বাসনায় আরব সে-ই আরব। (আহমদ ২০০৬/ক: ৩৭৭)

বাক্যে, আচারে এবং বাসনায় যে কবি সে-ই কবি। এই সংজ্ঞা গ্রহণ করিলে, আমি কবিদের সমালোচনা করিবার অধিকার খানিক অর্জন করিয়াছি কথাটা মনে হয় একেবারে ভিত্তিহীন নয়।


আফ্রিকা মহাদেশের অন্তঃপাতী গিনি বিসাউ ও সবুজ অন্তরীপ দ্বীপপুঞ্জ (Guinea Bissau and Cape Verde Islands) নামক দেশের নেতা মুক্তিসংগ্রামী ও তত্ত্বজ্ঞানী মহাত্মা আমিলকার কাব্রাল (Amilcar Cabral) তাঁহার দেশ স্বাধীন হইবার দুই বৎসর আগে—১৯৭৩ সনের ২০ জানুয়ারি
amilcar-2.jpg……..
আমিলকার কাব্রাল (১২/১০/১৯২৪ – ২০/১/১৯৭৩)
……..
তারিখে—সাম্রাজ্যবাদী পর্তুগিজ সরকারের লেলাইয়া দেওয়া গুপ্তঘাতকের হাতে নিহত হইয়াছিলেন। তাহারও কয়েক বৎসর পূর্বে—১৯৭০ সনে—এক বক্তৃতায়, উত্তর আমেরিকার কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বলিয়াছিলেন, সাম্রাজ্যবাদ জিনিসটা অনেক বিষাদসিন্ধুই রচনা করিয়াছে। এইসব সিন্ধুর মধ্যে বিষন্নতম সিন্ধুর নাম জার্মানির জাতীয় সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক (ওরফে নাৎসি) দল। (কাব্রাল ১৯৭৩: ৩৯)

অনেকেই হয়তো বলিবেন, ইহা এমন কী নতুন কথা হইল? কাব্রাল বলিয়াছিলেন: নাৎসিরা মরে নাই, সাম্রাজ্যবাদের মধ্যেই তাহারা বাঁচিয়া আছে। নতুন কথা সম্ভবত ইহাই।

কাব্রালের কয়েক বৎসর আগে—১৯৫০ সনের দশকে—ফরাসি দখলাধীন মার্তিনিক রাজ্যের নেতা, কবি ও মুক্তিসংগ্রামী এমে সেজার (Aimé Cesaire) এই কথাই অন্য কায়দায় বলিয়াছিলেন। নাৎসিনেতা হিটলারের পাপ মার্জনার অতীত—ইহা সকলেরই জানা আছে। তবে তাঁহার মতে, সকলের আরো জানা দরকার, ২০ শতকের সুশীল মানবদরদী ও অতি খ্রিস্টান এয়ুরোপীয় বুর্জোয়া ভদ্রলোকটির ভিতরেও একটা করিয়া হিটলার বাস করিতেছে।

* * *

cesaire.jpg……..
এমে সেজার (Aimé Cesaire, জন্ম. মার্তিনিক ২৬/৬/১৯১৩ – মৃত্যু. মার্তিনিক ১৭/৪/২০০৮)
…….
হিটলারকে বুর্জোয়া ভদ্রলোক ঘৃণা করেন কী কারণে, জানেন? হিটলার মানুষের অবমাননা করিয়াছে বলিয়া নহে। হিটলারকে খ্রিস্টান বুর্জোয়া দুনিয়া ঘৃণা করে মানুষের অবমাননাকে সে সাদা মানুষের সীমানা পর্যন্ত টানিয়া আনিয়াছে বলিয়া। হিটলারের আসল অপরাধ তাহা হইলে আর কিছুই নহে। এতদিন যাবৎ এয়ুরোপের খ্রিস্টান বুর্জোয়া জাতি আলজিরিয়ার আরব, হিন্দুস্তানের কুলি আর আফ্রিকার নিগ্রোদের জন্য যে দণ্ড, যে শাস্তি, যে মারধর একপাশে চিহ্ন দিয়া মওজুদ করিয়া রাখিয়াছিল সেই মারধরই আডলফ হিটলার খোদ এয়ুরোপ মহাদেশে টানিয়া আনে। (সেজার ২০০০: ৩৬)

এয়ুরোপের মহাযুদ্ধ বাধিয়াছিল—কে না জানে—পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশের উপর, বেশির ভাগ মানুষের উপর এয়ুরোপীয় নানান পরাশক্তির মালিকানা প্রতিষ্ঠার লড়াই আকারে। এই সর্বোয়ুরোপীয় যুদ্ধের প্রথম ভাগে—১৯১৮ সন নাগাদ—নব্য পরাশক্তি জার্মানি পরাজিত হয় বলিয়াই ইহার দ্বিতীয় ভাগে জার্মানির মানুষ হিটলারের নাৎসি দলকে ক্ষমতায় চড়ার সুযোগ দেয়। এই দ্বিতীয় ভাগের যুদ্ধে খোদ হিটলারের পরাজয় হইলেও সাম্রাজ্যবাদের পরাজয় হইয়াছে—এমন কথা বলার উপায় পাওয়া যায় নাই। উদাহরণ দিয়া বলিতেছি: যখন ব্রিটেন ভারত, পাকিস্তান, বর্মা, শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি ছাড়িয়া যাইতেছে, ঠিক তখনই স্বাধীনতার নাম দিয়া তাহারা ফিলিস্তিনে নতুন এয়ুরোপীয় উপনিবেশ—এসরায়েল রাষ্ট্র—বসাইতেছে।

অনেকখানি অভিনব কায়দায়, সন্দেহ নাই। তবু পরদেশদখল মানে পরদেশদখলই। আর উপনিবেশ মানে তো উপনিবেশই। (আহমদ ২০০৬/ক: ২৯৮-৩১৭)

ইহার কয়েক বৎসরের মধ্যেই শুরু হইল তথাকথিত ঠাণ্ডা যুদ্ধ। ১৯৫৫ সনের জোট নিরপেক্ষ বান্দুং মেলার সময় এয়ুরোপীয় সাংবাদিকরা ‘তৃতীয় বিশ্ব’ নামক নতুন একটা কথা চালু করিয়া দিলেন।

‘তৃতীয় বিশ্ব’ কথাটার মধ্যেও অভিনব এক লুকাচুরি লুকাইয়া ছিল। এতদিনে বিশ্ব যে প্রকৃত প্রস্তাবে স্বাধীন ও পরাধীন দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া গিয়াছে তাহার সত্যকথাটি এই অলঙ্কারের আড়ালে চাপা পড়িয়া গেল। ১৯৯১ সন নাগাদ সাবেক রুশ সাম্রাজ্য ভাঙ্গিয়া পড়িবার পর—এতদিনে—স্পষ্ট হইতেছে, ঠাণ্ডা যুদ্ধের যুগেও বিশ্ব তিন ভাগে নয়, মূলত দুই ভাগেই ভাগ করা ছিল। এতক্ষণে ইহারই ডাকনাম দাঁড়াইয়াছে: উত্তর ও দক্ষিণ।

পৃথিবীকে আমরা যাহার যেমন ইচ্ছা দুই কেন, দুইশ ভাগেও ভাগ করিতে পারি। আমি সেই ভাগাভাগিতে আগ্রহ পোষণ করি না। আমার আবেগ অন্যত্র। বেশি পিছনে নাই বা গেলাম, অন্তত খ্রিস্টানি পঞ্জিকার ১৮ শতক পর্যন্ত গেলেই দেখিতে পাই তখন হইতেই বিশ্ব এক হইয়া গিয়াছে। এই খবর আমার শ্রবণ-প্রতিবন্ধী দুই কানে পর্যন্ত আসিয়া পৌঁছাইয়াছে। নহিলে ১৯ শতকের গোড়ায় জার্মান মনীষী এয়োহান ফন গ্যেটেই (Johan von Goethe) বা কেন বিশ্বসাহিত্যের (Weltliteratur) ধুয়া তুলিতে যাইবেন? নানান দেশের নানান ভাষার ভেদ কাটিয়া বিশ্বসাহিত্য গড়িয়া উঠিয়াছে। ইহা টের পাইতে না পাইতেই ফের দেখিতেছি: শুদ্ধ অধীন প্রজার দেশে নহে, স্বাধীন রাজার দেশেও একই দুনিয়া আবার—নতুন করিয়া—দুই দুই ভাগে ভাগ হইতে চলিয়াছে।

আমার কথাটা বুঝাইবার প্রয়োজনে আর জায়গার অভাবে মাত্র দুই জন কবির দুইটা কবিতা খুলিয়া দেখাইতেছি। উদ্দেশ্য, সাম্রাজ্যবাদ জিনিসটা কী বস্তু আর ইহাকে কবিরাও বা কেমন করিয়া দেখেন তাহা নির্ণয় করা। অধিক করিতে পারিতাম তো দেখিতাম কবিরা যাহা দেখিতেছেন আমরা তাহা অনেক সময় দেখিতেই পাই না।

শুদ্ধ মনে রাখিবেন, সাম্রাজ্যবাদ কথাটা গালিও নহে, হেঁয়ালি তো কখনোই নহে। বিশেষ দেশের নীতিবিশেষও নহে। সাম্রাজ্যবাদকে ধর্মের সহিত তুলনা করা যাইতে পারে। প্রাচীন যুগে এক দেশের রাজা অন্য দেশ জয় করিলে তাঁহার ‘সাম্রাজ্য’ গড়া হইত। নয়া জমানায় এক দেশের হাতে আর দেশ ধরা পড়িলে লোকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ কথাটা যোগ করে। দুইয়ের মধ্যে প্রভেদ বিস্তর আছে। যাহা আছে তাহাও সামান্য কথা নহে। পরদেশদখল ব্যবসায়ের অন্দরমহলে এই অসামান্য পরিবর্তনটা ঘটিয়া গিয়াছে খ্রিস্টের ১৯ শতকে।

জনৈক কনরাড স্মিট (Conrad Schmidt) বরাবর ১৮৯০ সনের ২৭ অক্টোবর তারিখে লেখা এক পত্রযোগে জার্মান মহাত্মা ফ্রেডরিক এঙ্গেলস এই পরিবর্তনের কথাটাই খুলিয়া বলিয়াছিলেন। তাঁহার বয়ান অনুসারে, ১৮০০ সালের আগে এয়ুরোপের নানান পরদেশ-মালিক বা ঔপনিবেশিক শক্তি উপনিবেশ হইতে কি করিয়া সস্তায় মালামাল আমদানি করা যায় সেই ফিকির সন্ধান করিতেছিলেন। শিল্প-কারখানার বিপ্লব তাঁহাদের এই পথ হইতে সরাইয়া নতুন পথে ঠেলিয়া দিল। আনুমানিক ১৮০০ সালের পর তাঁহারা যাঁহার যাঁহার দেশের শিল্প-কারখানার পণ্যসম্ভার বিক্রয়ের স্বার্থে তাঁহার তাঁহার ঔপনিবেশিক বাজার রক্ষা করিতে উঠিয়া পড়িয়া লাগিলেন। (মার্কস ও এঙ্গেলস ১৯৭৫: ৩৯৭-৯৮; হাবিব ২০০৭: ৫৮-৫৯)

কার্ল মার্কস তাঁহার যৌবনের এক সাংবাদিক রচনায় এই অর্থে ১৮১৩ সালকেই সাম্রাজ্যবাদের সূচনাকাল বলিয়া ধরিয়া লইয়াছিলেন। কারণ ভারতবর্ষের সহিত ব্যবসায়-বাণিজ্যে ইংরেজ পূর্ব ভারত কোম্পানির একচেটিয়া অধিকার রহিত করিয়া ভারতের বাজারে ব্রিটেনের কারখানায় তৈরি সকল পণ্যের প্রবেশাধিকার অবাধ করিয়া দেওয়া হয়। সকলেই জানেন, এই ব্রিটিশ আইনের নাম ১৮১৩ সালের সনদ আইন।

ইহার ফলে ভারতবর্ষের জাতীয় শিল্প-কারখানা ধ্বংসের পথও খুলিয়া যায়। পুঁজি প্রথম খণ্ডে কার্ল মার্কস ব্রিটিশ আইনসভার দোহাইযোগে বলিয়াছিলেন ভারতীয় তাঁতির হাড্ডি জমিয়া হিন্দুস্তানের পথপ্রান্তর সাদা হইয়া গিয়াছে। এই সাম্রাজ্যবাদ-ধর্মেরই অপর নাম ২০ শতকের কোন কোন বিলিতি পণ্ডিত রাখিয়াছিলেন ‘স্বাধীন বাণিজ্যের সাম্রাজ্যবাদ’ (Imperialism of Free Trade)। অধীন দেশের পণ্য লুটিয়াই মাত্র এই সাম্রাজ্যবাদের সাধ মিটিল না। অধীন দেশের পণ্য তৈরির ক্ষমতাও সে লুটিয়া লইল। মহাত্মা আমিলকার কাব্রাল সাম্রাজ্যবাদ বলিতে পতিত দেশের পণ্য তৈরির ক্ষমতা নষ্ট করিতে সক্ষম এই শক্তিমত্তার কথাই নির্দেশ করিয়াছিলেন।

আমরা এই প্রবন্ধে সেই প্রস্তাবই আমল করিতেছি মাত্র।


খ্রিস্টান পঞ্জিকার ১৮৪৭-৪৮ সনে মহান ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ার (Charles Baudelaire) ‘হাবিল ও কাবিল’ (Abel et Caïn) নামে একটি ছোট্ট কবিতা লিখিয়াছিলেন। ইহা তাঁহার জগদ্বিখ্যাত আবিলের ফুল (Les Fleurs du mal) কাব্যগ্রন্থে পাওয়া যায়। বিখ্যাত বাংলা অনুবাদক বুদ্ধদেব বসু তাঁহার গ্রন্থে এই কবিতাটি গ্রহণ করেন নাই। (বোদলেয়ার ১৯৮৬: ২২৯-৩০; দেখুন, সংবর্ধনা ১, ২)

কবিতাটির স্বাদ অল্পস্বল্প লইতে হইলেও খ্রিস্টান ও এয়াহুদি পুরাণের গল্পটা কম বেশি স্মরণ করিতে হয়। তাই আমি পবিত্র ধর্মগ্রন্থ (প্রকাশ কিতাবুল মোকাদ্দস) হইতে ইহার কিছু অংশ হাজির করিতেছি:

পরে আদম আপন স্ত্রী হাওয়ার কাছে গমন করিলে তিনি গর্ভবতী হইয়া কাবিলকে প্রসব করিয়া বলিলেন, মাবুদের সহায়তায় আমি মানুষ প্রাপ্ত হইলাম। পরে তিনি হাবিল নামে তাহার সহোদরকে প্রসব করিলেন। হাবিল মেষপালক ছিল, ও কাবিল কৃষক ছিল। পরে কালানুক্রমে কাবিল নজরানারূপে মাবুদের উদ্দেশ্যে ভূমির ফল পেশ করিল। আর হাবিলও নিজের পালের প্রথমজাত কয়েকটি পশু ও তাহাদের চর্বি কুরবানী করিল। তখন মাবুদ হাবিলকে ও তাহার নজরানা কবুল করিলেন; কিন্তু কাবিলকে ও তাহার নজরানা কবুল করিলেন না; এই জন্য কাবিল অতিশয় ক্রুদ্ধ হইল, তাহার মুখ বিষণ্ন হইল। তাহাতে মাবুদ কাবিলকে বলিলেন, তুমি কেন রাগ করিয়াছ? তোমার মুখ কেন বিষণ্ন হইয়াছে? যদি সদাচরণ কর, তবে কি কবুল হইবে না? আর যদি সদাচরণ না কর, তবে গোনাহ্ দরজায় গুঁড়ি মারিয়া রহিয়াছে। তোমার প্রতি তাহার বাসনা থাকিবে, কিন্তু তোমাকে তাহার উপরে কর্তৃত্ব করিতে হইবে। আর কাবিল আপন ভাই হাবিলের সহিত আলাপ করিল, পরে তাহারা ক্ষেত্রে গেলে কাবিল আপন ভাই হাবিলের বিরুদ্ধে উঠিয়া তাহাকে কতল করিল। পরে মাবুদ কাবিলকে বলিলেন, তোমার ভাই হাবিল কোথায়? সে জওয়াব দিল, আমি জানি না; আমার ভাইএর হেফাজতকারী কি আমি? তিনি বলিলেন, তুমি কি করিয়াছ? তোমার ভাইয়ের রক্ত ভূমি হইতে আমার কাছে ক্রন্দন করিতেছে। আর এখন, যে ভূমি তোমার হাত হইতে তোমার ভাইয়ের রক্ত গ্রহণের জন্য আপন মুখ খুলিয়াছে, সেই ভূমিতে তুমি লানতী হইলে। ভূমিতে কৃষিকাজ করিলেও তাহা আপন শক্তি দিয়া তোমার খেদমত আর করিবে না; তুমি দুনিয়াতে পলাতক ও ভবঘুরে হইবে। তাহাতে কাবিল মাবুদকে বলিলেন, আমার অপরাধের ভার অসহ্য। দেখ, আজ তুমি ভূতল হইতে আমাকে তাড়াইয়া দিলে, আর তোমার দৃষ্টি হইতে আমি লুক্কায়িত হইব। আমি দুনিয়াতে পলাতক ও ভবঘুরে হইব, আর আমাকে যে পাইবে, সেই কতল করিবে। তাহাতে মাবুদ তাহাকে বলিলেন, এই জন্য কাবিলকে যে কতল করিবে, সে সাত গুণ প্রতিফল পাইবে। আর মাবুদ কাবিলের জন্য একটি চিহ্ন রাখিলেন, পাছে কেহ তাহাকে পাইলে কতল করে।পরে কাবিল মাবুদের খিদমত হইতে প্রস্থান করিয়া এদনের পূর্বদিকে নোদ দেশে বাস করিল। আর কাবিল আপন স্ত্রীর কাছে গমন করিলে সে গর্ভবতী হইয়া হনোককে প্রসব করিল। আর কাবিল একটি নগর পত্তন করিয়া আপন পুত্রের নামানুসারে তাহার নাম হনোক রাখিল। (কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই: ‘পয়দায়েশ,’ ৪: ১-১৭)

ভাইয়ের রক্তে ভাইয়ের হাত রাঙ্গাইবার কাহিনী হিসাবে আমরা সচরাচর এই গল্পের ব্যাখ্যা করিয়া থাকি। ইহাতে কিন্তু কয়েকটা জিজ্ঞাসার জবাব মিলিতেছে না। যেমন মাবুদ কী কারণে কাবিলের নজরানা গ্রহণ করিলেন
the-killing-of-abel.jpg
হাবিল ও কাবিল,শিল্পী: লরেনজো ঘিবার্তি (Lorenzo Ghiberti, জন্ম. ফ্লোরেন্স ১৩৭৮ – মৃত্যু. ফ্লোরেন্স ১৪৫৫)

না? আর আর দশ শাস্তির জায়গায় মাবুদ কেন তাঁহাকে শুদ্ধ পলাতক ও ভবঘুরে হইবার দণ্ড বিধান করিলেন? করিলেনই যদি তবে আবার তাঁহাকে নতুন নগর পত্তন করিবার তৌফিকই বা কেন দিলেন?

বিশেষ জ্ঞানীরা বলিতেছেন, এই পুরাণের সহিত আগের জমানার আরো একখানা পুরাণ মিশিয়া একাকার হইয়াছে। তাই আমাদের বোধের এই গণ্ডগোল। প্রথমে ছিল কাবিলের নগর-পত্তনের গল্প। সেখানে তিনি বীর বা নায়ক ছিলেন। পরে ভ্রাতৃহত্যার গল্পটা জোড়া দিয়া তাঁহাকে পবিত্র ভূমি হইতে তাড়াইয়া দেওয়ার ঘটনাকে বৈধতা দেওয়া হয়।

খেয়াল করিলে আরো দেখিবেন, কাবিল প্রথমে কৃষক ছিলেন। কিন্তু হিব্রু ভাষায় কাবিল শব্দের উচ্চারণ ‘কায়িন’ (Kayin), যাহার অর্থ কামার বা ইংরেজিতে যাহাকে বলে Smith, অর্থাৎ কারিকর। আর হাবিল শব্দের হিব্রু উচ্চারণ হেবেল বা এবেল (Hebel)। ইহার অর্থ ‘এক ঝাপটা বাতাস’। পেশায় তিনি মেষপালক, অর্থাৎ ভবঘুরে। এই ঘটনায় গৃহস্থ ভবঘুরে হইল আর ভবঘুরে হইল গৃহস্থ। এক কথায় বিপ্লব ঘটিল। (বেলৎস ১৯৮৩: ৫৬-৫৭, ৬৮-৭০; আসিমব ১৯৮১: ৩৩-৩৪; ইনসায়িট ১৯৮৮; জোনডেরবান ১৯৬৭)

ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ারকে যাঁহারা এতদিন নিছক রতিগ্রস্ত কবি কিংবা অমঙ্গলবোধের নবি ভাবিয়া তৃপ্তিলাভ করিতেছিলেন তাঁহারা বোধ হয় কল্পনাও করিতে পারেন নাই অন্যায় ও সাম্রাজ্যবাদকে তিনি কতখানি সমার্থক মনে করিতেন। উদাহরণ দিয়া বলিব, বুদ্ধদেব বসু কিংবা আবু সয়ীদ আইয়ুব যদি জার্মান মহাত্মা বাল্টার বেনিয়ামিনের (Walter Benjamin) লেখা দুই-চারি পাতা পড়িবার সুযোগও পাইতেন কি লঙ্কাকাণ্ডটাই না হইত! (বেনিয়ামিন ২০০৬/খ: ৯; বেনিয়ামিন ১৯৯৭: ২২) আমাদের আলোচ্য ‘হাবিল ও কাবিল’ কবিতায় একই বোদলেয়ারকে দেখিতেছি অনশনবন্দি দুনিয়ার বঞ্চিত লাঞ্ছিত সর্বহারার কবি আকারে।

এক্ষণে একটুখানি বিশদ করিতেছি।

এই যুগের সাম্রাজ্যবাদ যে বিষাদসিন্ধুর অপর নাম সেই বিষাদসিন্ধুর তীরে যাহারা ভবঘুরে, পলাতক অর্থাৎ যাহাদের উচ্ছেদ করা হইয়াছে তাহাদেরই নাম প্রলেতারিয়েত বা সর্বহারা। এই সর্বহারাকে কবিজনোচিত কায়দায় ‘শ্রেণী’ না বলিয়া বোদলেয়ার বলিয়াছেন ‘জাতি’।

baudelaire2.jpg……
শার্ল বোদলেয়ার (Charles Baudelaire; জন্ম. প্যারিস ৯/৪/১৮২১ – মৃত্যু. প্যারিস ৩১/৮/১৮৬৭)
……..
কার জাতি আর? খোদ কাবিলের জাতি। মাবুদ এই কাবিলের জাতির উপর এতখানি নাখোশ কেন? বোদলেয়ারের বিচারে এই বিরোধ ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধমাত্র নহে। এই বিবাদ বোদলেয়ার বলিবেন দুই শ্রেণীর বিবাদ, যদিও তাঁহার ব্যবহৃত শব্দটি ‘দুই জাতির বিবাদ’। এই প্রবন্ধে ইহাকেই আমি বলিয়াছি দুই বিশ্বের বিবাদ। শার্ল বোদলেয়ার লিখিয়াছেন:

হাবিলের জাত, ঘুমাও, পিয়ে যাও আর খাও
দিলখোশ মাবুদের মুখে মিঠা হাসি
কাবিলের জাত, দাও গড়াগড়ি দাও
পচা কাদায়, আর দাও নিজের গলায় ফাঁসি।
এই স্থলে দুই জোড়া মাত্র উদ্ধৃতি লিখিলাম। এই রকম ১৬ জোড়া কথা তিনি লিখিয়াছেন এই কবিতায়। এই যুগ সর্বহারার যুগ। যাহার নিজের গতর ছাড়া বেচিবার আর কিছুই নাই তাহাকেই সর্বহারা বলে। সেই সর্বহারাকেই বোদলেয়ার ‘কাবিলের জাত’ জ্ঞান করিয়াছেন।

পুরা কবিতাটি আমি এই রচনার শেষে, সংবর্ধনা অংশে, জুড়িয়া দিয়াছি। (দেখুন, সংবর্ধনা ২) এইখানে শুদ্ধ এইটুকু বলিয়া রাখি, শেষমেশ বোদলেয়ার তাঁহার রায় ঘোষণা করিলেন। বলিলেন: হাবিলের জাত, একদিন তোদের মৃতদেহ এই দুর্গন্ধময় মাটির সার হইবে। আর কাবিলের জাতের কর্তব্য তাহাতেই শেষ হইবে না। যেদিন কৃষকের কাঠের ঠেলা লাঙ্গল আসিয়া হাবিলের জাতির তলোয়ার গুড়াইয়া দিবে সেদিন তাঁহাদের লজ্জা লুকাইবার জায়গাও থাকিবে না। আর কাবিলের জাতিকে তিনি এই উপদেশ দিলেন: যাও, ঊর্ধ্বলোকে আরোহন কর, আর খোদ মাবুদকে ছুঁড়িয়া মার এই দুনিয়ায়! (বোদলেয়ার ১৯৮৬: ২২৯-৩০)


এক্ষণে আমার আলোচ্য দ্বিতীয় কবিতা। বাংলাদেশের শামসুর রাহমান তাঁহার দুঃসময়ে মুখোমুখি (১৯৭৩) বইয়ের একটা কবিতার নাম রাখিয়াছেন ‘স্যামসন’। ইহা তাঁহার শ্রেষ্ঠ কবিতার অষ্টম সংস্করণেও পাওয়া যাইতেছে। শামসুর রাহমান শুদ্ধ গ্রিক পুরাণের সেবাকবি—ইহা পুরাপুরি সত্য নহে। এয়াহুদি পুরাণেও তাঁহার অনাস্থা নাই। ‘স্যামসন’ কবিতা ইহারই প্রমাণ। তবে এই এয়াহুদি কাহিনীর পাঠ তিনি ১৭ শতকের ইংরেজ মনীষী ও বিপ্লবী জন মিল্টনের হাত হইতে লইয়াছেন বলিলে বেশি বলা হইবে না। (মিল্টন ১৯৮২; আসাদ ২০০৭: ৭৫)

এই রকম লওয়ায় তিনি কখনোই কাঁচা ছিলেন না। প্রমাণস্বরূপ তাঁহার অনূদিত ফরাসি কবি পল এলুয়ারের (Paul Eluard) বিখ্যাত ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতাটির কথা উল্লেখ করা যায়। কয়েক পঙ্‌ক্তি বাদ দিলে অনুবাদকর্মটাকে মোটামুটি বিশ্বস্তই বলা চলিত।

ইংলন্ডের ১৭ শতকিয়া গোঁড়া (Puritan) খ্রিস্টান বিপ্লবী কবি জন মিল্টন পবিত্র ধর্মগ্রন্থের বিশেষ পুরাতন নিয়মের বিধান কেমন করিয়া আপন করিয়া লইলেন তাহা লইয়া অনেক কথা হইয়াছে। শিমশোনকে এয়াহুদি জাতির মুক্তিদাতা বীরযোদ্ধা জ্ঞান করিয়াই তো কবি মিল্টন তাঁহার সহিত আপন আত্মা মিশাইয়াছেন। এয়ুরোপের সাহিত্যে ইহার ভাব অনেক দূর পর্যন্ত গড়াইয়াছে। ‘গাজায় চক্ষুহীন’ (Eyeless in Gaza) হৃতবল বীরের হইয়া আমাদের কবি শামসুর রাহমানও কম বিলাপ করেন নাই:

… এখন আমার কাজ
ঘানি ঠেলা শুধু ভার বওয়া শৃঙ্খলের। পদে পদে
কেবলি হোঁচট খাই দিন-রাত্রি, তোমরা অটল মসনদে।
(রাহমান ২০০৯: ১০৬; দেখুন, সংবর্ধনা ৩)
লন্ডনে রাজা ২ নং চার্লসের শাসনাধীন জন মিল্টন নিজেকে ‘গাজায় চক্ষুহীন দাসমণ্ডলে যাঁতাপেষা’ স্যামসনের নিকটাত্মীয় ভাবিবেন, ইহাই হয়তো স্বাভাবিক। কিন্তু স্যামসন যে আত্মহত্যা করিয়া বিজয় লাভ করিল সেই আত্মহত্যায় নির্বিকার থাকাও তাঁহার পক্ষে সম্ভব হইল। কেমন করিয়া সম্ভব হইল?

এই প্রশ্নের মুখে লা-জওয়াব জনৈক স্বাধীনতা-ব্যবসায়ী ইংরেজ পণ্ডিত এক পর্যায়ে বলিয়াই ফেলিলেন: ‘শেষ পর্যন্ত মিল্টন বুঝিতে পারিয়াছিলেন তিনি জিতিয়াছেন—এই সত্যে সন্দেহ নাই। কিন্তু এই জিত নীতিশক্তি আর বুদ্ধিশক্তিরই জিত। হারানো বেহেস্ত (Paradise Lost) মহাকাব্যের কবি পরিচয়ে তাঁহার ফিরতি প্রতিষ্ঠার ঘটনায় এই সত্যই কায়েম হইয়াছে।’ (প্রিন্স ১৯৮২: ১৩)

মিল্টনের ‘বিবাদী স্যামসন’ (Samson Agonistes) কবিতাটি কি গ্রিক ট্রাজেডি বা বিধির বিধানের সহিত তুলনীয়? উত্তরে ২০ শতকিয়া ইংরেজ মহাত্মা স্যার রিচার্ড জেব (Sir Richard Jebb) কহিয়াছিলেন: কদাচ নহে। স্যামসনের চরিত্র খারাপ ছিল মানে তাঁহার চরিত্রে নারীদোষ বিশেষ ছিল। এই কথা তাঁহার স্বজাতীয় এয়াহুদিরাই বলিতেন। তাই একবার তাঁহারা তাঁহাকে হাত পা বান্ধিয়া শত্রু ফিলিস্তিনিদের হাতে সঁপিয়াও দিয়াছিল।

ইহাকে লোভ-লালসার দোষও বলা চলিত। সাধারণ খ্রিস্টান লোকজন তাঁহার দুর্ভোগের সহিত সচরাচর এই চরিত্রদূষণকে কারণ বলিয়া যোগ করেন। আমরা তাহাতে কী করিয়া আপত্তি করিব? কিন্তু জন মিল্টন তো এই দিকটা উপেক্ষাই করিলেন। তা করুন। স্যামসনের করুণ মৃত্যুসংবাদ বহিয়া আনিবার পর দণ্ডায়মান সাংবাদিকের সমক্ষে কোরাস গ্রিক কায়দায় গাহিলেন:

Chorus
O dearly-bought revenge, yet glorious!
Living or dying thou hast fulfill’d
The work for which thou wast foretold
To Israel, and now ly’st victorious
Among thy slain self-kill’d,
Not willingly, but tangled in the fold
Of dire necessity, whose law in death conjoin’d
Thee with thy slaughter’d foes in number more
Than all thy life had slain before.
(Milton, 1982: p. 54, ll. 1660–68)
নিচে ইহার খসড়া বাংলা তর্জমা দিতেছি:

চড়াদামে কেনা প্রতিশোধ তুমি তবু গরীয়ান!
জীবিত কি মৃত করিয়াছ পালন
কর্তব্য তোমার, তোমার অপেক্ষায়
ছিল এসরায়েল এতদিন, আর এখন বিজয়ে শুয়ে আছ
আপন হাতের মৃতের সঙ্গী তুমি আত্মঘাতী
ইচ্ছায় কখনো হও নাই, নিদারুণ দরকারের ফাঁদে
পড়িয়াছ। ইহারই বিধানে জীবৎকালে যত না
করিয়াছ হত্যা তাহার অধিক করিলে
হত তুমি মরণের ক্ষণে
আর সেই শত্রুসঙ্গে তোমাকেও মাখিল এই বিধি।
কোরাসের গলার ঘরে এই স্বর কার স্বর? কে সে জন? জন মিল্টন না ঈশ্বর? একটু পরই আমরা দেখিব এই স্থির অবিনশ্বর স্বর আর কাহারো নহে, খোদ স্বাধীনতা-ব্যবসায়ীর স্বর ইহা। ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ তারিখে দুনিয়া আবারও শুনিল সেই স্থির স্বর। শামসুর রাহমান তাই আজও অমর।

বর্তমান যুগের এসরায়েল রাষ্ট্রে শিমশোন ওরফে স্যামসনকে দুর্ধর্ষ এয়াহুদির উদাহরণ বলিয়া পরিচয় দেওয়া হয়। একালের মধ্যপ্রাচ্য বা পশ্চিম এশিয়ার শ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তি এসরায়েলের পারমাণবিক অস্ত্রসম্ভারের নাম রাখা হইয়াছে ‘স্যামসন অপশন’ (The Samson Option) বা স্যামসন কৌশল। শামসুর রাহমান কোনোদিন এই কথা জানিতে পারিয়াছিলেন কিনা তাহা জানিতে আমার বড় সাধ জাগে। (আসাদ ২০০৭: ৭৬)

ইহার মানেও আর কিছুই নহে: ‘মারি অরি পারি যে কৌশলে।’ দুঃখের মধ্যে, নিজেকে মারিয়া হইলেও শত্রু নিধন করিবার কৌশলের পারমাণবিক সংস্করণের নামই এসরায়েল রাখিয়াছে স্যামসন কৌশল। হাতের চেটোর মতন ছোট্ট এক টুকরা ফিলিস্তিন নামক দেশে এই বোমা ফাটাইলে আপন শত্রুর সঙ্গে খোদ এসরায়েলও ধ্বংস হইবে। এই অকল্পনীয় বর্বরতার সভ্য নামই দাঁড়াইতেছে দি স্যামসন অপশন।

বলা হয়তো বাহুল্য, এই নাম বা এই চিন্তার জন্ম মোটেও ২০০১ সনের ১১ সেপ্টেম্বরের পরে নহে, খানিক আগেভাগেই বটে। ১১ সেপ্টেম্বরের আত্মঘাতী বোমারুদের আমরা যদি সঙ্গত কারণেই ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলিয়া থাকি তবে স্যামসনকে আমরা কোন উপাধি দান করিব?

আজিকালি এসরায়েল রাষ্ট্রের পাঠ্যাপাঠ্য সকল বইতে স্যামসনকে স্বাধীনতা সংগ্রামী কিংবা মুক্তিযোদ্ধা বলিয়াই প্রশংসা করিতে দেখা যায়। শুদ্ধ এসরায়েল কেন, খোদ বিপ্লবী ইংরেজ কবি অন্ধ জন মিল্টনও শেষ বয়সে নিজেকে স্যামসন ভাবিতেন। বন্দি স্যামসনের চক্ষুযুগল শত্রু ফিলিস্তিনিরা উপড়াইয়া লইয়াছিল। আর মিল্টনও অন্ধ হইয়া গেলেন। মিল্টনের পথ ধরিয়া শামসুর রাহমানও কি তাহাই করিলেন? তাঁহারও চক্ষু গেল গেল! ১৯৭৩ সন নাগাদ তিনিও প্রকাশ করিলেন বীরগাথা ‘স্যামসন’। ততদিনে বাংলাদেশ বিদেশি বন্দিশিবির হইতে স্বাধীন স্বদেশ হইয়া দাঁড়াইল। কবি গাহিলেন:

ক্ষমতামাতাল জঙ্গী হে প্রভুরা ভেবেছো তোমরা,
তোমাদের হোমরা-চোমরা
সভাসদ, চাটুকার সবাই অক্ষত থেকে যাবে চিরদিন?
মৃত এক গাধার চোয়ালে, মনে নেই ফিলিস্তিন,
দিয়েছি গুঁড়িয়ে কত বর্বরের খুলি? কত শক্তি
সঞ্চিত আমার দুটি বাহুতে, সেওতো আছে জানা। রক্তারক্তি
যতই কর না আজ, ত্রাসের বিস্তার
করুক যতই পাত্র-মিত্র তোমাদের, শেষে পাবে না নিস্তার।
(রাহমান ২০০৯: ১০৫-০৬)
স্যামসন শব্দটির হিব্রু মূল উচ্চারণ ‘শিমশোন’। অর্থ ‘সূর্যের সন্তান’ বা ইহার কাছাকাছি কিছু। এসরায়েলি পুরাণ অনুসারে ফিলিস্তিনের একাংশের সমুদ্রতীরে যখন প্রাচীন ফিলিস্তিনি জাতি বসবাস করিত তখনো এয়াহুদি জাতির মধ্যে রাজতন্ত্র তথা রাজার পদই চালু হয় নাই। তখন দেশনেতাদের কাজি (হিব্রু ভাষায় ‘সোফেতিম’) উপাধি দেওয়া হইত। আমাদের শিমশোন ওরফে স্যামসন ছিলেন কাজিগণের মধ্যে সর্বশেষ বা ১২ নম্বর। (আসিমব ১৯৮১: ১৪৮-৫৩; ইনসায়িট ১৯৮৮; জোনডেরবান ১৯৬৭)

জন মিল্টন কিংবা শামসুর রাহমান উভয়েই শিমশোনকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবেই দেখিয়াছেন। ১৭ শতকের ইংলন্ডে রাজতন্ত্রবিরোধী বিপ্লবের পরাস্ত অর্থাৎ বেহাত অবস্থায়, পুনরুদ্ধারপ্রাপ্ত রাজতন্ত্রের অধীনে—১৬৬৭ সনের পর কোনো এক সময়—মিল্টন তাঁহার ‘বিদ্রোহী স্যামসন’ লিখিয়াছিলেন। ইহা তাঁহার ফিরিয়া পাওয়া বেহেস্ত (Paradise Regained) কাব্যগ্রন্থের তপশিল আকারে প্রথম ছাপা হয়।

শামসুর রাহমানও তাঁহার ‘স্যামসন’ কবিতা লিখিয়া থাকিবেন ১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে বা সামান্য পরে। আমাদের দুই কবির এক চিন্তার মধ্যে একটা সমস্যা কিন্তু থাকিয়াই যাইতেছে। ইহার দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াই আমি আমার কর্তব্য পালনের চেষ্টা করিব।


শামসুর রাহমান যদি আজও বাঁচিয়া থাকিতেন তো জিজ্ঞাসা করিতাম: ২০০১ সনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ইয়র্ক শহরে বিমানযোগে হামলা করিয়া যাহারা ৩,০০০ মতন মনুষ্য মারিয়া ফেলিল আর সঙ্গে সঙ্গে নিজেরাও ছাই হইয়া গেল তাহাদিগকে আপনি কি স্বাধীনতা সংগ্রামী বা মুক্তিযোদ্ধা বলিতে রাজি হইবেন? উত্তর উনি কি দিতেন তাহা আপনারা নিঃসংশয়ে আন্দাজ করিতে পারেন।

সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞাসা করিতাম: শিমশোনকে তবে আপনি কোন যুক্তিতে মুক্তিযোদ্ধার সম্মান দিতেছেন? তিনিও তো আত্মঘাতী হামলায় একযোগে ৩,০০০ লোক মারিয়াছিলেন। মারেন নাই? অধিক, জীবনকালেও তিনি লোক মারিতেন। ইহা তাঁহার এক প্রকার পেশা ছিল বলিলে কি অত্যুক্তি হইবে? পবিত্র ধর্মগ্রন্থ নবিদের কিতাবেও কি একই কথা লেখা নাই? আছে: ‘তিনি জীবনকালে যত লোক হত্যা করিয়াছিলেন, মরণকালে তদপেক্ষা অধিক লোককে হত্যা করিলেন।’ (কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই: ‘কাজীগণের বিবরণ,’ ১৬: ৩০)

কথাটা মহাত্মা শামসুর রাহমানও আমল করিয়াছেন। ‘স্যামসন’ কবিতায় স্যামসনের স্বগতোক্তিযোগে আমরা তাই পড়িতে পাই:

আমার দুরন্ত কেশরাজি পুনরায় যাবে বেড়ে,
ঘাড়ের প্রান্তর বেয়ে নামবে দুর্দমনীয়, তেড়ে
আসা নেকড়ের মতো। তখন সুরম্য প্রাসাদের সব স্তম্ভ
ফেলবো উপড়ে, দেখো কদলী বৃক্ষের অনুরূপ। দম্ভ
চূর্ণ হবে তোমাদের, সুনিশ্চিত করবো লোপাট
সৈন্য আর দাস-দাসী অধ্যুষিত এই রাজ্যপাট।
(রাহমান ২০০৯: ১০৭)
শিমশোনের জীবনচরিত পবিত্র ধর্মগ্রন্থের বয়ান অনুযায়ী যাঁহারা পড়িবেন তাঁহারাই তাঁহাকে পুরাদস্তুর ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলিবেন। অথচ শামসুর রাহমান কোথাও ইহার আভাসমাত্র দিয়াছেন বলিয়া আমার মনে হইল না। ইহা কী করিয়া সম্ভব?

সম্ভব—কারণ আমরা যাহা পড়ি তাহা হয়তো পড়ি নেহায়েত শব্দের ঝঙ্কারে, শব্দেরই প্রেমে পড়িয়া। সত্য স্পর্শ করিয়া হাত ময়লা করিব কোন দুঃখে? অর্থ লইয়া মাথা ঘামাইতে যাইব কেন? এই গুণ শুদ্ধ শামসুর রাহমানের নহে, এই গুণ আমাদের সকলের—আমরা যাহারা কাবিলের জাত হইয়াও হাবিলের অভিনয় করিতেছি তাহাদের সকলের। আমাদের নাম তাই ইংরেজি বাক্যে ‘লিবারেল’। লিবারেলের বাংলা সচরাচর করা হয় ‘উদারনৈতিক’। আমি সবিনয়ে বলিব: ইহার অনুবাদ করিবেন ‘স্বাধীনতা-ব্যবসায়ী’। সেই ক্রমে লিবারেলিজম মানে দাঁড়াইবে ‘স্বাধীনতা-ব্যবসায়’।

s-rahman.jpg…….
শামসুর রাহমান (জন্ম. ঢাকা ২৪/১০/১৯২৯ – মৃত্যু. ঢাকা ১৭/৮/২০০৬); ছবি. হাসান বিপুল
……..
শামসুর রাহমানও কি তবে লিবারেল অর্থাৎ স্বাধীনতা-ব্যবসায়ী কবি? দুর্ভাগ্যের মধ্যে আমাকে হ্যাঁ উত্তরই দিতে হইতেছে। সাম্রাজ্যবাদের যুগে—আমাদের বড় দুর্ভাগ্য—এই জাতের কবিরাই প্রধান। তাই তাঁহাদের বাড়ি ঢাকায় হইলেও তাঁহারা প্রথম বিশ্বেরই কবি—তাঁহারা হাবিলের জাত।

শিমশোনের গল্পটা দিয়াই আমি আমার এই নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধের সংহার ঘটাইব। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ লিখিতেছেন:

আর শিমশোন তিম্নায় নামিয়া গেলেন, ও তিম্নায় ফিলিস্তিনীদের কন্যাদের মধ্যে একটি রমণীকে দেখিতে পাইলেন। পরে ফিরিয়া আসিয়া আপন পিতামাতাকে খবর দিয়া বলিলেন, আমি তিম্নায় ফিলিস্তিনীদের কন্যাদের একটি রমণীকে দেখিয়াছি; তোমরা তাহাকে আনিয়া আমার সহিত শাদী দাও। তখন তাঁহার পিতামাতা তাঁহাকে বলিলেন, তোমার জ্ঞাতিগণের মধ্যে ও আমার সমস্ত স্বজাতির মধ্যে কি কন্যা নাই যে, তুমি খত্নাবিহীন ফিলিস্তিনীদের কন্যা শাদী করিতে যাইতেছ? শিমশোন পিতাকে বলিলেন, তুমি আমার জন্য তাহাকেই আনাও, কেননা আমার দৃষ্টিতে সে মনোহরা। (কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই: ‘কাজীগণের বিবরণ,’ ১৪: ১-৩)
বিবাহ করিতে যাইবার পথে তিম্নার আঙ্গুর ক্ষেত্রে শিমশোন একটা যুবা সিংহ দেখিতে পাইলেন। মাবুদের রুহুর জোরে হাতে কিছু না থাকিলেও শিমশোন ছাগলের বাচ্চা ছিঁড়িবার মতন ঐ সিংহকে ছিঁড়িয়া ফেলিলেন। বিবাহের আসরে তিনি বাজি ধরিয়া একটি ধাঁধা বলিয়াছিলেন। ইহার সঠিক উত্তর শুদ্ধ তাঁহার স্ত্রী ছাড়া আর কেহ জানিতেন না। কিন্তু এই ধাঁধার উত্তর তাঁহার হবু স্ত্রীর মুখ হইতে গোপনে জানিয়া লইবার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিরা তাঁহাকে অপ্রস্তুত করিয়াছিল। ইহাতে তাঁহার হবু স্ত্রীও দোষী ছিলেন। তাই নিরুপায় শিমশোন হার স্বীকার করিয়া লইলেন। আর বিবাহ করিব না বলিয়া আসর হইতে উঠিয়া গেলেন।

ইহার পর ক্রুদ্ধ শিমশোন অস্কিলোন নামক জায়গায় গিয়া ৩০ জন লোককে অকারণে আঘাত করিয়া তাহাদের বস্ত্র খুলিয়া লইলেন আর সেই বস্ত্র দিয়া ধাঁধার বাজিতে হারিয়া যাওয়ার টাকা পরিশোধ করিলেন। তিনি বউ ফেলিয়া চলিয়া যাইবার পর আর আসিবেন না মনে করিয়া তাঁহার হবু বউকে অন্য একজনের সহিত বিবাহ দেওয়া হইল।

কিছুকাল পর গম কাটার সময় শিমশোন ফিরিয়া আসিলেন। আসিয়া স্ত্রীর সঙ্গ দাবি করিলেন। তাঁহাকে অনুরোধ করা হইল, তিনি যেন স্ত্রীর ছোট বোনকে বিবাহ করেন। তিনি রাজি হইলেন না। পাল্টা এতদিনে স্ত্রী পরস্ত্রী হইয়া গিয়াছে শুনিয়া এক মহাকাণ্ড করিলেন। ধর্মগ্রন্থ লিখিতেছেন:

পরে শিমশোন গিয়া তিন শত শৃগাল ধরিয়া মশাল লইয়া তাহাদের লেজে লেজে যোগ করিয়া দুই দুই লেজে এক একটি মশাল বাঁধিলেন। পরে সেই মশালে আগুন দিয়া ফিলিস্তিনীদের শস্যক্ষেত্রে ছাড়িয়া দিলেন; তাহাতে বাঁধা আটি, ক্ষেতের শস্য ও জলপাই গাছের বাগান সকলই পুড়িয়া গেল। (কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই: ‘কাজীগণের বিবরণ,’ ১৫: ৪-৫)
ততক্ষণে ক্রুদ্ধ ফিলিস্তিনিরা তাঁহার হতভাগিনী স্ত্রী ও স্ত্রীর পিতা মহাশয়কে আগুনে পুড়াইয়া মারিল। আর শিমশোন তাহাদিগকে আঘাত করিলেন। তখন তাঁহার স্বজাতি লোকেরা তাঁহাকে বাঁধিয়া ফিলিস্তিনিদের হাতে সমর্পণ করে। বাঁধন দুই গাছা নতুন দড়ি।

… তখন মাবুদের রূহ্ সবলে তাহার উপরে আসিলেন, আর তাঁহার দুই বাহুস্থিত দুই দড়ি আগুনে পোড়া শণের ন্যায় হইল, এবং তাঁহার দুই হাত হইতে বেড়ি খসিয়া পড়িল। পরে তিনি একটি গাধার চোয়ালের হাড় দেখিতে পাইয়া হাত বিস্তারপূর্বক তাহা লইয়া তাহা দ্বারা হাজার লোককে আঘাত করিলেন। আর শিমশোন বলিলেন, ‘গাধার চোয়ালের হাড় দ্বারা রাশির উপরে রাশি হইল, গাধার চোয়ালের হাড় দ্বারা হাজার জনকে হানিলাম।’ (কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই: ‘কাজীগণের বিবরণ,’ ১৫: ১৪-১৬)
শিমশোনের এই আবিল বীরত্বের বন্দনাই শুনি কবি শামসুর রাহমানের অনাবিল কণ্ঠে। আগেই উদ্ধার করিয়াছি কবির কথা:

মৃত এক গাধার চোয়ালে, মনে নেই ফিলিস্তিন,
দিয়েছি গুঁড়িয়ে কত বর্বরের খুলি? কত শক্তি
সঞ্চিত আমার দুটি বাহুতে, সেওতো আছে জানা। রক্তারক্তি
যতই কর না আজ,…
(রাহমান ২০০৯:১০৫-০৬)
পাঠিকা বিশ্বাস করিবেন কিনা জানি না, তবু বলিব: এই নিবন্ধে হাত দিবার আগে আমি কিন্তু কদাচ খেয়াল করি নাই শামসুর রাহমান নামটির অর্থও প্রকারান্তরে এই শিমশোন ওরফে স্যামসনই। ‘দয়াময়ের সূর্য’ আর ‘সূর্যের সন্তান’—কি এমন দূরত্ব! দূরত্বের মধ্যে ঐ এক মিল্টনই।

ইংলন্ডের পীড়িত অন্ধ কবির দৃষ্টিতে শিমশোন বীর হইবেন সন্দেহ নাই। ১৯৭১ সনের বাংলাদেশের একজন বাঙালি কবিও সেই দৃষ্টির চক্ষু ধার লইলেন কেন? ইহার পরীক্ষাই আমাদের প্রার্থনীয়।


খ্রিস্টানি পরম্পরায় কাজি শিমশোনকে কিছু পরিমাণে নৈতিক স্খলনের দোষে দোষী করিবার রেওয়াজও আছে। ইহা আমরা কিছু আগেই দেখিয়াছি। শেষ পর্যন্ত তিনি আত্মহত্যা করিয়া সেই পাপ হইতে মুক্ত হইলেন। দেশবাসী তাহাঁকে বীর মুক্তিযোদ্ধার, বীরশ্রেষ্ঠের সম্মান জানাইল। তাঁহার সন্ত্রাসবাদ লইয়া কেহ বেশি উচ্চবাচ্য করিল না।

আধুনিক ধনতন্ত্রের ধনী দোসর ‘স্বাধীনতা-ব্যবসায়’ ওরফে লিবারেলিজম। এই ব্যবসায়ের ব্যবসায়ীরাও সন্ত্রাসী শিমশোনকে মুক্তিসংগ্রামীর মর্যাদা দিতেছেন। ঘন ঘন—প্রায় বাতিকগ্রস্থের মতন—বেশ্যাগমনের সহিত স্বাধীনতা-ব্যবসায়ের সম্পর্ক একটা থাকিলেও থাকিতে পারে। সেই সম্পর্ক কী আমরা কিন্তু জানি না। তবে আত্মঘাতী বোমাবাজ ওরফে আদমবোমারুও যে শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা-ব্যবসায়েরই অন্তর্গত সেই সত্য আমরা এতদিনে অনুধাবন করিতে পারিতেছি। আরব নৃতত্ত্ব-বিজ্ঞানী মহাত্মা তালাল আসাদের একটি বক্তৃতায় তাহার আভাস পাওয়া যায়। (আসাদ ২০০৭: ৬৫-৯৬; দেখুন, প্রবন্ধ ৪)

শিমশোন অমিতবিক্রম বীর এই সত্যে আমার সন্দেহ নাই। সাক্ষী পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কহিতেছেন:

আর শিমশোন গাজাতে গিয়া সেখানে একটা বেশ্যাকে দেখিয়া তাহার কাছে গমন করিলেন। তাহাতে, শিমশোন এই স্থানে আসিয়াছে, এই কথা শুনিয়া গাজানিবাসীরা তাঁহাকে বেষ্টন করিয়া সমস্ত রাত্রি তাঁহার জন্য নগর দ্বারে লুকাইয়া থাকিল, সমস্ত রাত্রি চুপ করিয়া রহিল, বলিল, সকালে দিন হইলে আমরা তাঁহাকে কতল করিব। কিন্তু শিমশোন মাঝরাত পর্যন্ত শয়ন করিলেন, মাঝরাতে উঠিয়া তিনি নগর-দ্বারের শিকলশুদ্ধ দুই কবাট ও দুই বাজু ধরিয়া উপড়াইয়া ফেলিলেন এবং স্কন্ধে করিয়া হিব্রোণের সম্মুখস্থ পর্বত-শৃঙ্গে লইয়া গেলেন। (কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই: ‘কাজীগণের বিবরণ,’ ১৬: ১-৩)
শিমশোনের প্রেমের শেষ নাই। তবে এই প্রেমই শেষ পর্যন্ত তাঁহাকে শেষ করিল। তাঁহার সর্বশেষ প্রেমিকার নাম দলীলা। পণ্ডিতেরা কহিতেছেন শিমশোন মানে যেমন সূর্য (অর্থাৎ দিবা) তেমনি দলীলা (ওরফে লীলা ওরফে লায়লা) মানেও রাত্রি। (আসিমব ১৯৮১: ২৫১; ইনসায়িট ১৯৮৮; জোনডেরবান ১৯৬৭)

রাত্রির নিকট সূর্য যেমন দলীলার নিকট শিমশোনও তেমন। একদিন প্রেমিকা দলীলার পীড়াপীড়িতে তিনি ধরা দিলেন। তাঁহার অমিততেজের গোপন কথা ফাঁস হইয়া গেল। শ্রীমতি দলীলা নিজের হাঁটুর উপর তাঁহাকে ঘুম পাড়াইয়া লোক দিয়া তাঁহার সাত গুচ্ছ চুল কামাইয়া দিল। শিমশোন দুর্বল হইলেন।

তাই তিনি মনের সমস্ত কথা ভাঙ্গিয়া বলিলেন, তাহাকে বলিলেন, আমার মস্তকে কখনও ক্ষুর উঠে নাই, কেননা মাতার গর্ভ হইতে আমি আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে নাসরীয় [উৎসর্গিত]; চুল কামাইলে আমার বল আমাকে ছাড়িয়া যাইবে, এবং আমি দুর্বল হইয়া অন্য সকল লোকের সমান হইব। (কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই: ‘কাজীগণের বিবরণ,’ ১৬: ১৭)
তখন ফিলিস্তিনিরা তাঁহাকে ধরিয়া তাঁহার দুই চক্ষু উঠাইয়া ফেলিল, এবং তাঁহাকে গাজায় আনিয়া পিতলের দুইটি শিকলে বাঁধিল। তিনি কয়েদখানায় যাঁতা পেষণ করিতে লাগিলেন।

শামসুর রাহমান দেখি শিমশোনের দুঃখে তাঁহার চাইতেও বেশি কাতর। কয়েদখানার যাঁতা বন্দির প্রাণের চেয়ে কবির প্রাণকেই যেন বেশি পেষণ করিতেছে। কবি লিখিতেছেন:

আমাকে করেছো বন্দী, নিয়েছো উপড়ে চক্ষুদ্বয়।
এখন তো মেঘের অঢেল স্বাস্থ্য, রাঙা সূর্যোদয়
শিশুর অস্থির হামাগুড়ি, রক্তোৎপল যৌবন নারীর আর
হাওয়ায় স্পন্দিত ফুল পারি না দেখতে। বার বার
কী বিশাল দৃষ্টিহীনতায় দৃষ্টি খুঁজে মরি। সকাল সন্ধ্যার
ভেদ লুপ্ত; মসীলিপ্ত ভূগর্ভস্থ কারাকক্ষে চকিতে মন্দার
জেগে উঠলেও অলৌকিক শোভা তার থেকে যাবে নিস্তরঙ্গ
অন্তরালে। এমন-কি ইঁদুরও বান্ধব অন্তরঙ্গ
সাম্প্রতিক, এমন নিঃসঙ্গ আমি নিজ দোষে আজ
চক্ষুহীন, হৃতশক্তি; দুঃস্বপ্নপীড়িত। এখন আমার কাজ
ঘানি ঠেলা শুধু ভার বওয়া শৃঙ্খলের। পদে পদে
কেবলি হোঁচট খাই দিন-রাত্রি, তোমরা অটল মসনদে।
শত্রু-পরিবৃত হয়ে আছি, তোমাদের চাটুকার
উচ্ছিষ্ট-কুড়ানো সব আপনি-মোড়ল, দুস্থ ভাঁড়
সর্বদাই উপহাস করছে আমাকে। দেশবাসী
আমাকে বাসেতো ভালো আজো—যাদের অশেষ দুঃখে কাঁদি হাসি
আনন্দে? পিছনে ফেলে এসেছি কত যে রাঙা সুখের কোরক,
যেমন বালক তার মিষ্টান্নের সুদৃশ্য মোড়ক।
আমাকে করেছো অন্ধ, যেন আর নানা দুষ্কৃতি
তোমাদের কিছুতেই না পড়ে আমার চোখে। স্মৃতি
তাও কি পারবে মুছে দিতে? যা দেখেছি এতদিন—
পাইকারি হত্যা দিগি¦দিক রমণীদলন আর ক্ষান্তিহীন
রক্তাক্ত দস্যুতা তোমাদের, বিধ্বস্ত শহর, অগণিত
দগ্ধ গ্রাম, অসহায় মানুষ, তাড়িত, ক্লান্ত; ভীত
—এই কি যথেষ্ট নয়? পারবে কি এ-সব ভীষণ
দৃশ্যাবলি আমূল উপড়ে নিতে আমার দু-চোখের মতন?
দৃষ্টি নেই, কিন্তু আজো রক্তের সুতীব্র ঘ্রাণ পাই,
কানে আসে আর্তনাদ ঘন-ঘন, যতই সাফাই
তোমরা গাও না কেন, সব-কিছু বুঝি ঠিকই। ভেবেছো এখন
দারুণ অক্ষম আমি, উদ্যানের ঘাসের মতন
বিষম কদম-ছাঁটা চুল। হীনবল, শৃঙ্খলিত
আমি, তাই সর্বক্ষণ করছো দলিত।
(রাহমান ২০০৯: ১০৬-০৭)
তবে কোনো কথাই এই দুনিয়ায় শেষ কথা নহে। দিনের সূর্য রাতে অন্ধ হয়, তাহার চক্ষু উঠাইয়া ফেলে। সেই সূর্যই সকালবেলা আবার ফিরিয়া আসে। ধীর ধীরে তাহার আলোকরশ্মি তেজীয়ান হইতে থাকে। শিমশোনের চুলও গজাইল এবং গজাইলে তাঁহার হৃতশক্তিও আবার ফিরিয়া আসিল।

ইহা ‘ক্ষমতামাতাল জঙ্গী প্রভুরা’ আমল করেন নাই। ইহাতেই শিমশোন তাঁহার শেষ বীরত্ব (অথবা সন্ত্রাস) দেখাইবার সুযোগ পাইলেন। পরে কোনো একদিন ফিলিস্তিনি ভূপালেরা নিজেদের দেবতা দাগোনের উদ্দেশ্যে মহাযজ্ঞ ও আমোদ প্রমোদ করিতে একত্র হইলেন। তাঁহাদের অন্তঃকরণ প্রফুল্ল হইলে তাঁহারা বলিলেন: শিমশোনকে ডাক, সে আমাদের কাছে কৌতুক করুক।

… তাহাতে লোকেরা কয়েদখানা হইতে শিমশোনকে ডাকিয়া আনিল, আর তিনি তাহাদের সামনে কৌতুক করিতে লাগিলেন। তাহারা স্তম্ভ সকলের মধ্যে তাঁহাকে দাঁড় করাইয়াছিল। পরে যে বালক হাত দিয়া শিমশোনকে ধরিয়াছিল, তিনি তাহাকে বলিলেন, আমাকে ছাড়িয়া দাও, যে দুই খামের উপরে ঘরের ভর আছে, তাহা আমাকে স্পর্শ করিতে দাও; আমি উহাতে হেলান দিয়া দাঁড়াইব। পুরুষে ও স্ত্রীলোকে সেই ঘর পরিপূর্ণ ছিল, আর ফিলিস্তিনীদের সমস্ত ভূপাল সেখানে ছিলেন, এবং ছাদের উপরে স্ত্রী পুরুষ প্রায় তিন হাজার লোক শিম্শোনের কৌতুক দেখিতেছিল। (কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই: ‘কাজীগণের বিবরণ,’ ১৬: ২৫-২৭)
শিমশোন প্রতিশোধের জন্য প্রস্তুত হইলেন। ‘তখন শিমশোন মাবুদকে ডাকিয়া বলিলেন, হে খোদাবন্দ মাবুদ, মেহেরবানী করিয়া আমাকে স্মরণ করুন; হে আল্লাহ্, মেহেরবানী করিয়া কেবল এই একটি বার আমাকে বলবান করুন, যেন আমি ফিলিস্তিনীদিগকে আমার দুই চোখের জন্য একেবারেই প্রতিশোধ দিতে পারি।’ (কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই: ‘কাজীগণের বিবরণ,’ ১৬: ২৮)

পরে শিমশোন, মধ্যস্থিত যে দুই খামের উপরে ঘরের ভার ছিল, তাহা ধরিয়া তাহার একটির উপরে ডান বাহু দ্বারা, অন্যটির উপরে বাম বাহু দ্বারা নির্ভর করিলেন। আর ফিলিস্তিনীদের সহিত আমার প্রাণ যাক, ইহা বলিয়া শিমশোন নিজের সমস্ত বলে নত হইয়া পড়িলেন; তাহাতে ঐ ঘর ভূপালগণের ও যত লোক ভিতরে ছিল, সমস্ত লোকের উপরে পড়িল; এইরূপে তিনি জীবনকালে যত লোক হত্যা করিয়াছিলেন, মরণকালে তদপেক্ষা অধিক লোককে হত্যা করিলেন। (কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই: ‘কাজীগণের বিবরণ,’ ১৬: ২৯-৩০)
নির্জলা হত্যা করা কিংবা নিজে হত হইয়া অপরকে হত্যা করা কোনটাই শেষ কথা নহে। আমরা যাহারা এই গল্প পড়িলাম বা শুনিলাম তাহারা পড়িয়া শুনিয়া কী করিব শেষ কথা তাহাই। পবিত্র ধর্মগ্রন্থের লেখকও এই ঘটনায় আপনকার প্রীতি কিংবা সন্তোষ গোপন করিতে পারেন নাই। তাঁহার চোখও শিমশোনের ভাইবেরাদরের চোখই। তিনি জানাইতেছেন: ‘পরে তাঁহার ভাইয়েরা ও তাঁহার সমস্ত পিতৃকুল নামিয়া আসিয়া তাঁহাকে লইয়া সরা ও ইষ্টায়োলের মধ্যস্থানে তাঁহার পিতা মানোহের গোরস্তানে তাঁহাকে দাফন করিল। তিনি বিশ বৎসর ইস্রায়েলের আচার বিচার করিয়াছিলেন।’ (কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই: ‘কাজীগণের বিবরণ,’ ১৬: ২৮) ১৬: ৩১)


আমার এখনো বাকশক্তি গজায় নাই যে বলিব এই ঘটনার অর্থ ষোল আনা বুঝিয়াছি। শিমশোন জীবনকালে অনেক লোককে হত্যা করিয়াছিলেন, আর মরণকালেও তদপেক্ষা অধিক লোক হত্যা করিলেন। এই অধিক—মানে ৩,০০০—লোকের মধ্যে পুরুষ ও স্ত্রী উভয় জাতির লোকই ছিল। অথচ ইহাতে আমাদের স্বাধীনতা-ব্যবসায়ী কবিদের কেহই সামান্যতম কাঁপিয়া উঠিয়াছেন কি? না মিল্টন না রাহমান—কেহই ওঠেন নাই।

যদি না উঠিয়া থাকেন তবে অনুমান করিব: আত্মঘাতী হত্যাকাণ্ডে, পুরুষ-স্ত্রী নির্বিশেষ হত্যায়—তাঁহাদেরও অনুমোদন মিলিয়াছে বৈ কি! আত্মহত্যা মহাপাপ। কিন্তু স্বদেশ ও স্বজাতি (কেহ কেহ বলিবেন স্বধর্ম বা স্ব-আদর্শ) রক্ষা করিতে হইলে স্বপ্রাণ নিধনও শ্রেয়।

আলায়হেসসালাম হজরত ইসার জন্মের ১,০০০ বৎসর আগের এই মহাত্মা কাজি শিমশোনের আত্মহত্যার বিনিময়ে ফিলিস্তিনি মরিয়াছিলেন অন্যূন ৩,০০০। আর এই ঘটনার আনুমানিক ৩,০০০ বৎসর পর ২০/২২ জন আরব্য বোমাবাজের প্রাণের বিনিময়ে আবারও মার্কিন নারী-পুরুষ মিলিয়া লোক মরিল কিছু কম ৩,০০০। ফিলিস্তিনি বাড়ির বড় খাম ছিল দুইটা, বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের বড় খাম বা দালানও (Twin Tower) ছিল সেই দুইটাই। আশ্চর্য!

সংখ্যার এই মিল কেন? সত্য বলিতে কাহারও ইহার উত্তর জানা নাই। থাকিলে বলিবেন বলিয়াই আশা করি। ৪, ৭ কিংবা ১৩ প্রভৃতি সংখ্যা কেন অশুভ বলিয়া গণিত হয়? ইহার জবাব খুঁজিতে হইবে ৩, ৬, কিংবা ১২ সংখ্যার মধ্যেই। শিমশোন কেন ১২ নম্বর কাজি তাহা কেহ বলিবেন কি? এখানে ১২ মানে শেষ কাজি।

কিতাবুল মোকাদ্দস গ্রন্থের ‘পয়দায়েশ’ কিতাবে লেখা হইয়াছে, মাবুদ মোট ৬ দিনে এই দুনিয়া সৃষ্টি করিলেন। কেহ বলিবেন কি তিনি কেন ৫ কিংবা ৭ দিনে করিলেন না? আর ৭ দিনের দিন তিনি বিশ্রাম গ্রহণ করিলেন। ঠিক আছে। কেন ৬ দিনের দিন বা ৮ দিনের দিন করিলেন না?

৩৬৫ কিংবা ৩৬৬ দিনে বৎসর হয়। মাস হয় ২৮, ২৯ কিংবা ৩০ দিনে। ৩১ এমনকি কখনো কখনো ৩২ দিনেও হয়। কেহ বলিবেন কি সপ্তাহ কেন ৭ দিনে হয়? ফরাসি তত্ত্বজ্ঞানী জাক লাকাঁ বলিতেন, অজ্ঞান ৬ পর্যন্ত গুণিতে জানে। কে জানে ইহার কী অর্থ?

৩,০০০ সংখ্যা ৩,০০০ বৎসর পর আবারও ৩,০০০। একবার ৩,০০০ মুক্তিযোদ্ধার, আরবার ৩,০০০ সন্ত্রাসবাদীর। কারণ কী? ইহার উত্তর সাম্রাজ্যবাদের যুগে দুই বিশ্বের কবিতায় খুঁজিয়া কোথাও পাইলাম না।

এই দুঃখ রহিয়াই গেল।

***

বিখ্যাত মার্কিন সমালোচনা ব্যবসায়ী ফ্রেডরিক জেমিসন (Fredric Jameson) একদা দাবি করিয়াছিলেন বহুজাতীয় ধনতন্ত্রের জমানায় তৃতীয় বিশ্বের সাহিত্য প্রথম বিশ্বের সাহিত্য হইতে আলাদা প্রকৃতির মাল হইয়া গিয়াছে। তাঁহার মতে, জাতীয়তাবাদ জিনিসটা মোটেও ভালো মাল নহে তবে তৃতীয় বিশ্বের সাহিত্য এক প্রকার না আর প্রকারের জাতীয়তাবাদ ছাড়া চলিতেই পারে না। সুতরাং এই বহুনিন্দিত জাতীয়তাবাদ ব্যবসায়টাকে অবিমিশ্র মন্দ জিনিসও বলা যাইতেছে না।

জেমিসনের কথার মধ্যে সত্য দুই আনাও নাই—তাহা বলিতেছি না। তবে এই পর্যন্তই। আরো আগাইয়া তিনি বলিয়াছেন আসলে এই দুনিয়ায় প্রভু ও ভৃত্য ছাড়া আর কিছুই নাই। সুতরাং দুইয়ে মিলিয়া দুনিয়া একটাই। জেমিসনের এই কথা যদি সত্য হয় তো স্বীকার করিতে হইবে, তৃতীয় বিশ্ব বলিয়া কোনো আলাদা মাল নাই।

জার্মান মহাত্মা হেগেলের নাম ভাঙ্গাইয়া জেমিসন বলেন, প্রভু ছাড়া ভৃত্যের যেমন চলিবে না, তেমনি ভৃত্য ছাড়াও প্রভুর প্রভুত্ব কায়েম হইবে না। ইহাই সত্য। কিন্তু এক জায়গায় আসিয়া এই সত্য উল্টাইয়া পড়িতেছে। খোদ হেগেলই এই সত্যের আবিষ্কারক। তিনি বলিয়াছিলেন, এই দুনিয়া প্রভুর এবং ভৃত্যের বটে। কিন্তু শেষ বিচারে এই দুনিয়া শুদ্ধ ভৃত্যেরই। কারণ যে সব করে সে-ই সব জানে। ভৃত্য বা শ্রমিক সব করে তাই সে-ই সব জানে। অলস প্রভুর ভৃত্য ছাড়া চলিবে না। কিন্তু চলিতে ফিরিতে যে জ্ঞান না হইলেই নয় তাহার নাম অজ্ঞান। তাহা শুদ্ধ ভৃত্যের অধিকারে। কারণ সব রসুনের এক গোড়া। সেই গোড়ার নাম মানুষের শ্রম, শ্রমিকশ্রেণীর মেহনত। (জেমিসন ২০০১: ৩৩৫-৩৬)

জেমিসনের মতে তৎকথিত ‘তৃতীয় বিশ্বের’ সাহিত্য ব্যক্তি মানুষের গল্প বলিতে একেবারেই অপারগ, একান্তই অক্ষম। ব্যক্তির কথা বলিতে বলিতে সে অজান্তে কেবল জাতির গল্পই বলিয়া বসে। উদাহরণের ছলে তিনি চিনের মহান লেখক লু সুন (Lu Xun) আর সেনেগালের সেম্বেনে ওসমানের (Sembene Ousmane) কথা পাড়িয়াছেন। আমরা ফরাসি শার্ল বোদলেয়ার আর বঙ্গীয় শামসুর রাহমানের দৃষ্টান্তযোগে দেখাইলাম জেমিসনের বক্তব্য সত্য না-ও হইতে পারে। তাঁহার বিশ্ববিভাজন, ‘তিন দুনিয়া পৃথক্করণের তত্ত্ব’ বাসি হইয়াছে। ইহা অজ্ঞান হইলে আরো ভয়াবহ। বর্ণবাদের গাঢ় প্রলেপ তাহার গায়ে লাগিয়াছে।

পাক-ভারতীয় ধুরন্ধর এজাজ আহমদ (Aijaj Ahmad) লিখিয়াছেন, একই কারণে কোনো দেশের সাহিত্যকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিশ্বের বলিয়া আলাদা করাটা বর্ণবাদের অর্থাৎ পুরাতন উপনিবেশবাদের জের। জেমিসন মার্কিন জাতীয়তাবাদীর মতন লিখিলেও লোকে ভাবে তিনি বুঝি মার্কস ব্যবসায়ীও বটেন। এজাজ আহমদ তাঁহার মুখোশ কিছু পরিমাণে আলগা করিয়া দিয়াছেন। (আহমদ ১৯৯৫: ৯৫-১১২)

দুনিয়ার সকল দেশের ভাষাতেই দুই বিশ্বের সাহিত্য গড়িয়া উঠিতেছে। আমেন।


……………
জাতীয় কবিতা পরিষদের সেমিনারে পঠিত
‘জাতীয় কবিতা উৎসব,’ ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৯

cain-2.jpg
হাবিলের দেহ খুঁজে পেল আদম আর হাওয়া (১৮২৬), শিল্পী: উইলিয়াম ব্লেইক (William Blake; জন্ম. লন্ডন ২৮/১১/১৭৫৭ – মৃত্যু. লন্ডন ১২/৮/১৮২৭)

সংবর্ধনা ১

Abel et Caïn
Charles Baudelaire

I
Race d’Abel, dors, bois et mange;
Dieu te sourit complaisamment.
Race de Caïn, dans la fange
Rampe et meurs misérablement.
Race d’Abel, ton sacrifice
Flatte le nez du Séraphin!
Race de Caïn, ton supplice
Aura-t-il jamais une fin?
Race d’Abel, vois tes semailles
Et ton bétail venir à bien;
Race de Caïn, tes entrailles
Hurlent la faim comme un vieux chien.
Race d’Abel, chauffe ton ventre
À ton foyer patriarcal;
Race de Caïn, dans ton antre
Tremble de froid, pauvre chacal!
Race d’Abel, aime et pullule!
Ton or fait aussi des petits.
Race de Caïn, cœur qui brûle,
Prends garde à ces grands appétits.
Race d’Abel, tu croîs et broutes
Comme les punaises des bois!
Race de Caïn, sur les routes
Traîne ta famille aux abois.

II
Ah! race d’Abel, ta charogne
Engraissera le sol fumant!
Race de Caïn, ta besogne
N’est pas faite suffisamment;
Race d’Abel, voici ta honte:
Le fer est vaincu par l’épieu!
Race de Caïn, au ciel monte,
Et sur la terre jette Dieu!

……………
Les Fleurs du mal, 1857

সংবর্ধনা ২

হাবিল ও কাবিল
শার্ল বোদলেয়ার


হাবিলের জাত, ঘুমাও, পিয়ে যাও আর খাও
দিলখোশ মাবুদের মুখে মিঠা হাসি
কাবিলের জাত, দাও গড়াগড়ি দাও
পচা কাদায়, আর দাও নিজের গলায় ফাঁসি।
হাবিলের জাত, তোর লোবান আতরদান
নজরান সুড়সুড়ি দেয় ফেরেশতার নাকে!
কাবিলের জাত, তোর যাতনার অবসান
কখনো হবে না হাজার কাতর ডাকে?
হাবিলের জাত, তোর মাঠের ধান বাড়ে
মোটা তাজা হয় তোর গরু যত
কাবিলের জাত, তোর পেটের ভোক ঘাড়ে
খালি কঁকায় নেড়ি কুত্তার মত।
হাবিলের জাত, চোদ্দপুরুষের চুলা জ্বেলে
পোহা রে আগুন, গতর তাতা
কাবিলের জাত, মাটির তলায় গর্ত মেলে
কাঁপ তোরা, গায় দে খেকশিয়ালের কাঁথা!
হাবিলের জাত, প্রেমে মশগুল হ, বাড়া!
ঝাড়বংশ, বাড়া রে সোনাদানা।
কাবিলের জাত, হে প্রাণ পোড়া
প্রেম করতে তোর মানা।
হাবিলের জাত গাল ফোলা পেট খোলা
খেয়ে খেয়ে যেমন ফোলে ঘূণপোকা!
কাবিলের জাত, পথে পথে বস পথভোলা
সংসার তোর পথে বসা হে বোকা।


আহা, হাবিলের জাত, একদা তোর লাশ
করবে সবুজ পোড়া ছারখার জমিন!
কাবিলের জাত কাজ তোর নাগপাশ
আজও হয় নাই ছেঁড়া, জীবন কি সঙ্গিন
হাবিলের জাত, তোর লাজ ঢাকবে কে আজ
লোহা খান খান হবে যে চেলাকাঠে!
কাবিলের জাত, উঠ আসমানে আসমানবাজ
যা মাবুদরে ঠেলে ফেল এই দুনিয়ার মাঠে!

……………
অনুবাদ: সলিমুল্লাহ খান, জাতীয় কবিতা উৎসব; ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৯

সংবর্ধনা ৩

স্যামসন
শামসুর রাহমান

ক্ষমতামাতাল জঙ্গী হে প্রভুরা ভেবেছো তোমরা,
তোমাদের হোমরা-চোমরা
সভাসদ, চাটুকার সবাই অক্ষত থেকে যাবে চিরদিন?
মৃত এক গাধার চোয়ালে, মনে নেই ফিলিস্তিন,
দিয়েছি গুঁড়িয়ে কত বর্বরের খুলি? কত শক্তি
সঞ্চিত আমার দুটি বাহুতে, সেওতো আছে জানা। রক্তারক্তি
যতই কর না আজ, ত্রাসের বিস্তার
করুক যতই পাত্র-মিত্র তোমাদের, শেষে পাবে না নিস্তার।
আমাকে করেছো বন্দী, নিয়েছো উপড়ে চক্ষুদ্বয়।
এখন তো মেঘের অঢেল স্বাস্থ্য, রাঙা সূর্যোদয়
শিশুর অস্থির হামাগুড়ি, রক্তোৎপল যৌবন নারীর আর
হাওয়ায় স্পন্দিত ফুল পারি না দেখতে। বার বার
কী বিশাল দৃষ্টিহীনতায় দৃষ্টি খুঁজে মরি। সকাল সন্ধ্যার
ভেদ লুপ্ত; মসীলিপ্ত ভূগর্ভস্থ কারাকক্ষে চকিতে মন্দার
জেগে উঠলেও অলৌকিক শোভা তার থেকে যাবে নিস্তরঙ্গ
অন্তরালে। এমন-কি ইঁদুরও বান্ধব অন্তরঙ্গ
সাম্প্রতিক, এমন নিঃসঙ্গ আমি নিজ দোষে আজ
চক্ষুহীন, হৃতশক্তি; দুঃস্বপ্নপীড়িত। এখন আমার কাজ
ঘানি ঠেলা শুধু ভার বওয়া শৃঙ্খলের। পদে পদে
কেবলি হোঁচট খাই দিন-রাত্রি, তোমরা অটল মসনদে।
শত্র“-পরিবৃত হয়ে আছি, তোমাদের চাটুকার
উচ্ছিষ্ট-কুড়ানো সব আপনি-মোড়ল, দুস্থ ভাঁড়
সর্বদাই উপহাস করছে আমাকে। দেশবাসী
আমাকে বাসেতো ভালো আজো—যাদের অশেষ দুঃখে কাঁদি হাসি
আনন্দে? পিছনে ফেলে এসেছি কত যে রাঙা সুখের কোরক,
যেমন বালক তার মিষ্টান্নের সুদৃশ্য মোড়ক।
আমাকে করেছো অন্ধ, যেন আর নানা দুষ্কৃতি
তোমাদের কিছুতেই না পড়ে আমার চোখে। স্মৃতি
তাও কি পারবে মুছে দিতে? যা দেখেছি এতদিন—
পাইকারি হত্যা দিগ্বিদিক রমণীদলন আর ক্ষান্তিহীন
রক্তাক্ত দস্যুতা তোমাদের, বিধ্বস্ত শহর, অগণিত
দগ্ধ গ্রাম, অসহায় মানুষ, তাড়িত, ক্লান্ত; ভীত
—এই কি যথেষ্ট নয়? পারবে কি এ-সব ভীষণ
দৃশ্যাবলি আমূল উপড়ে নিতে আমার দু-চোখের মতন?
দৃষ্টি নেই, কিন্তু আজো রক্তের সুতীব্র ঘ্রাণ পাই,
কানে আসে আর্তনাদ ঘন-ঘন, যতই সাফাই
তোমরা গাও না কেন, সব-কিছু বুঝি ঠিকই। ভেবেছো এখন
দারুণ অক্ষম আমি, উদ্যানের ঘাসের মতন
বিষম কদম-ছাঁটা চুল। হীনবল, শৃঙ্খলিত
আমি, তাই সর্বক্ষণ করছো দলিত।
আমার দুরন্ত কেশরাজি পুনরায় যাবে বেড়ে,
ঘাড়ের প্রান্তর বেয়ে নামবে দুর্দমনীয়, তেড়ে
আসা নেকড়ের মতো। তখন সুরম্য প্রাসাদের সব স্তম্ভ
ফেলবো উপড়ে, দেখো কদলী বৃক্ষের অনুরূপ। দম্ভ
চূর্ণ হবে তোমাদের, সুনিশ্চিত করবো লোপাট
সৈন্য আর দাস-দাসী অধ্যুষিত এই রাজ্যপাট।

……………
দুঃসময়ে মুখোমুখি, ১৯৭৩

বোধিনী
১. গ্রিক Agonistes শব্দের তর্জমা বিবাদী কিংবা বিপথগামী দুইটাই হতে পারে। মহাকবি মিল্টন মনে হইতেছে প্রথম অর্থের দিকেই বেশি ঝুঁকিয়া ছিলাম।

২. কবিতাটির রচনাকাল ৫ অক্টোবর ১৯৭১। এই তথ্য জাতীয় কবিতা পরিষদ আয়োজিত জাতীয় কবিতা উৎসব ২০০৯ সেমিনারে জানাইয়াছিলেন প্রখ্যাত প্রকাশক (সাহিত্য প্রকাশের স্বত্বাধিকারী) মফিদুল হক। এই প্রসঙ্গে তাঁহার ঋণ স্বীকার করিতেছি।

দোহাই
১. শামসুর রাহমান, শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা, ৮ম মুদ্রণ (ঢাকা: সাহিত্য প্রকাশ ২০০৯)।

২. কিতাবুল মোকাদ্দস, বাংলা অনুবাদ (ঢাকা: মঞ্জিল-ই-কিতাবুল মোকাদ্দস, সনতারিখ নাই)।

৩. Aijaj Ahmad, ‘Jameson’s Rhetoric of Otherness and the “National Allegory”,’ in In Theory: Classes, Nations, Literatures, 2nd imp. (Delhi: Oxford University Press, 1995).

৪. Eqbal Ahmad, The Selected Writings of Eqbal Ahmad, eds. Carollee Bengelsdorf et al. (New York: Columbia University Press, 2006/ka).

৫. Talal Asad, On Suicide Bombing (New York: Columbia University Press, 2007).

৬. Issac Asimov, Asimov’s Guide to the Bible, 2 vols. in 1, (New York: Gramercy Books, 1981).

৭. Charles Baudelaire, Baudlaire: the complete verse, vol. I, trans. Francis Scarfe (London: Anvil Press Poetry, 1986).

৮. Walter Beltz, God and the Gods, trans. Peter Heinegg (Harmondsworth, UK: Penguin Books, 1983).

৯. Walter Benjamin, ‘The Paris of the Second Empire in Baudelaire,’ trans. Harry Zohn, in Selected Writings, vol. 4 (1938–1940), eds. Howard Eiland and Michael W. Jennings, reprint (Cambridge, MA: Harvard University Press, 2006/kha).

১০. Walter Benjamin, Charles Baudelaire: A Lyric Poet in the Era of High Capitalism, trans. Harry Zohn, reprint (London: Verso, 1997).

১১. Amilcar Cabral, Return to the Source: Selected Speeches of Amilcar Cabral, ed. Africa Information Service (New York: Monthly Review Press, 1973).

১২. Aimé Cesaire, Discourse on Colonialism, trans. Joan Pinkham, reprint (New York: Monthly Review Press, 2000).

১৩. Irfan Habib, ‘Understanding 1857,’ in ed. Sabyasachi Bhattacharya, Rethinking 1857 (Hyderabad, 2007), pp. 58–66.

১৪. Fredric Jameson, ‘Third-world Literature in the Era of Multinational Capitalism,’ in The Jameson Reader, eds. Michael Hardt and Kathi Weeks, reprint (Oxford: Blackwell Publishers, 2001).

১৫. Insight on the Scriptures, 2 vols. (New York: Watchtower Bible and Tract Society of New York, 1988).

১৬. Karl Marx and Frederik Engels, Selected Correspondence, 3rd revised ed. (Moscow: Progress Publishers, 1975).

১৭. John Milton, Samson Agonistes, ed. F. T. Prince, 2nd imp. (Delhi: Oxford University Press, 1982).

১৮. F. T. Prince, ‘Introduction,’ in John Milton, Samson Agonistes, ed. F. T. Prince, 2nd imp. (Delhi: Oxford University Press, 1982), pp. 7–17.

১৯. The Zondervan Pictorial Bible Dictionary, ed. Merill C. Tenney (Grand Rapids, Michigan: Regency Reference Library, 1967).

প্রথম প্রকাশ: জাতীয় কবিতা পরিষদ আয়োজিত জাতীয় কবিতা উৎসব ২০০৯ সেমিনারের মূল প্রবন্ধ হিসেবে লিখিত এবং এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভা কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত।

পরিমার্জিত সংস্করণ: সলিমুল্লাহ খান, আদমবোমা, আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান সম্পাদিত, ইতিহাস কারখানা ২ (ঢাকা: আগামী প্রকাশনী এবং এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভা, ২০০৯)।

 

বিডিনিউজ, আর্টস, ১০ জুলাই ২০০৯

 

কার্ল মার্কসের আবিষ্কার

এ বছর—এই ইংরেজি ২০১৮ সালে—কার্ল মার্কসের জন্মের দুইশ বছর পূর্ণ হইতেছে। তাঁহার বিষয়ে যত কথা বলা যায় ইহার মধ্যে তাহার প্রায় সবই বলা হইয়া গিয়াছে। এতদিন পর—এই এখন—নতুন আর কোন কথাটি বলা যায়? যেদিন মার্কস মারা গেলেন তাহার তিন দিনের মাথায়—মোতাবেক ১৭ মার্চ ১৮৮৩ সালে—লন্ডনের হাইগেট গোরস্তানে তাঁহার সমাধির পাশে দাঁড়াইয়া দীর্ঘদিনের বন্ধু ফ্রেডরিক এঙ্গেলস বলিয়াছিলেন, ‘যুগ যুগ ধরিয়া তাঁহার নাম কীর্তিত হইতে থাকিবে, আর কীর্তিত হইবে তাঁহার সাধনা।’

এঙ্গেলসের এই ভবিষ্যদ্বাণী বৃথা যায় নাই। আজ দুইশ বছর পরও আমরা তাঁহার নাম লইতেছি। সারা দুনিয়া লইতেছে। ফরাশি ইতিহাস ব্যবসায়ী ফেরনাঁ ব্রোদেল (১৯০২-১৯৮৫) মার্কসের মৃত্যুর প্রায় একশ বছর পর পরলোকগমন করিয়াছেন। ইঁহাকে আর যাহাই বলিবেন বলিতে পারেন, ভুলেও মার্কস-ব্যবসায়ী বলিতে পারিবেন না। আর ইঁহার মতেও উনিশ শতকিয়া এয়ুরোপ মহাদেশে শ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক মহাত্মাদের মধ্যে—বিশেষ যাঁহারা ১৭৬০ সাল হইতে ১৮২৫ সালের অবসরে জন্মিয়াছিলেন তাঁহাদের মধ্যে—কার্ল মার্কসের নামই সর্বাগ্রগণ্য। ইঁহাদের মধ্যে তিনি উল্লেখ করিয়াছেন অঁরি সাঁ সিমোঁ (১৭৬০), রবার্ট ওয়েন (১৭৭১), শার্ল ফুরিয়ে (১৭৭২), এতিয়েন কাবে (১৭৭৮), ওগুস্ত কোঁত (১৭৯৮), পিয়ের জোসেফ প্রুধোঁ (১৮০৯), ভিক্তর কঁসিদেরাঁ (১৮০৮) এবং লুই ব্লাঁ (১৮১১)। বয়সে ইঁহারা সকলেই কার্ল মার্কসের বড়। বন্ধনীমধ্যে উল্লেখ করা সালগুলি তাঁহাদের স্ব স্ব জন্মের বছর। কার্ল মার্কসের জন্ম ১৮১৮ সালে আর ফ্রেডরিক এঙ্গেলস ও ফার্দিনান্দ লাসালের জন্ম যথাক্রমে ১৮২০ ও ১৮২৫ সালে। ব্রোদেল উল্লেখ করিতে ভোলেন নাই যে শেষের এই তিনজন ছিলেন জাতিতে জার্মান। এয়ুরোপ মহাদেশে শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনকে ইঁহারাই সমাজের পেছনের সারি হইতে টানিয়া সামনের দিকে লইয়া আসিয়াছিলেন।

ব্রোদেল বলিয়াছেন, আপনকার সহকর্মীদের মধ্যে মার্কসের প্রতিদ্বন্দ্বী হইবার যোগ্যতা রাখিতেন একমাত্র ফার্দিনান্দ লাসাল। ১৮৬৪ সালে এক দ্বন্দ্বযুদ্ধে তিনি যদি হঠাৎ নিহত না হইতেন তো কার্ল মার্কসের নামাংকিত রাজনৈতিক আন্দোলনটির জয়জয়কার এখন যতটা নিশ্চিত হইয়াছে ততটা হইত কিনা বলা মুশকিল। তবে শেষ পর্যন্ত ইতিহাস ব্যবসায়ী ব্রোদেলও স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছেন, মার্কসের রাজনৈতিক সাফল্যের আসল রহস্য তাঁহার লেখা দাস কাপিটাল বা পুঁজি (১৮৬৭) গ্রন্থের বিশ্লেষণশক্তির যথার্থতায় নিহিত। কি সেই শক্তি? সমাধিপার্শ্বের বক্তৃতার এক জায়গায় ফ্রেডরিক এঙ্গেলস দাবি করিয়াছিলেন কার্ল মার্কস যাহা আবিষ্কার করিয়াছেন তাহা চার্লস ডারউয়িনের আবিষ্কারের সমতুল্য। তিনি বলিয়াছিলেন, ‘ডারউয়িন যেমন সপ্রাণ প্রকৃতিজগতের বিকাশের বিধি আবিষ্কার করিয়াছিলেন, মার্কসও তেমনি মানুষের ইতিহাস বিকাশের বিধি আবিষ্কার করিয়াছেন।’

মানবজাতির ইতিহাস বিকাশের বিধি বা নিয়ম বলিতে কি বুঝাইতেছে? এঙ্গেলস বলিয়াছেন, এই বিধি বা নিয়ম আর কিছু নহে—একটি সরল সত্য মাত্র। সত্যটি এই যে অন্য কোন কাজে হাত দিবার আগে মনুষ্যসন্তানকে খানাপিনা করিতে, মাথাগোঁজার একটা ঠাঁই খুঁজিতে আর পিন্ধনের মতো এক টুকরা কাপড়ের ব্যবস্থা করিতেই হয়। এটুকুর ব্যবস্থা হইলেই না তাহারা রাষ্ট্রনীতি, শিল্পকলা, ধর্মকর্ম ইত্যাদির পিছনে সময় দিতে পারে। এতদিন পর্যন্ত সাকার ভাবধারার বাড় অতি বেশি বাড়িবার কারণে এই সরল সত্যটা পায়ের তলায় চাপা পড়িয়া ছিল। তাই এই সত্যের প্রকৃষ্ট অর্থ দাঁড়াইতেছে এই রকম: কোন বিশেষ জাতি বিশেষ কোন যুগে প্রতিদিনকার জীবনযাপনের নগদ প্রয়োজনে যেটুকু উৎপাদনের ব্যবস্থা করিতে পারে অর্থাৎ যে পরিমাণ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করিতে পারে তাহার ভিত্তিতেই সেই জাতির পক্ষে রাষ্ট্র পদবাচ্য অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠান বা আইন-কানুনের গোড়াপত্তন করা কিংবা শিল্পকলা আর—এমনকি—ধর্মকর্ম সংক্রান্ত ভাবধারা প্রভৃতি গড়িয়া তোলা সম্ভব। এই ভিত্তির নিরিখেই মাত্র তাহার উপর গড়িয়া ওঠা ধ্যান-ধারণার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করিতে হইবে—এতদিন ধরিয়া যাহা চলিতেছিল—অর্থাৎ ধ্যান-ধারণার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক বিকাশের ব্যাখ্যা—সেই রকম উল্টাপাল্টা ব্যাখ্যা আর চলিবে না।

এঙ্গেলসের এই দাবি নিছক তাঁহার মনগড়া কথা নহে। মার্কস তাঁহার ‘পুঁজি’ গ্রন্থের প্রথম সংস্করণের মুখবন্ধযোগে একই কথাই লিখিয়াছিলেন—‘শেষ পর্যন্ত এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য একটাই—এ যুগের সমাজ ব্যবস্থা কোন অর্থনৈতিক বিধি বা নিয়ম অনুসারে বিকশিত হইতেছে তাহা আবিষ্কার করা।’

এঙ্গেলসের মতে, এই আবিষ্কারটাই কার্ল মার্কসের একমাত্র আবিষ্কার ছিল না। সমাধিপার্শ্বের বক্তৃতায় তিনি আরো যোগ করিতেছিলেন, বর্তমান যুগের পুঁজিভিত্তিক উৎপাদন প্রণালী আর সেই প্রণালী হইতে যে বুর্জোয়া শ্রেণি জন্মিয়াছে তাহারা যে বিশেষ বিধি বা নিয়ম অনুযায়ী চলিতেছেন সেই বিধিটিও মার্কসই আবিষ্কার করিয়াছেন। মার্কস আবিষ্কার করিয়াছেন যে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হইয়া শ্রমিক শ্রেণি যে পরিমাণ নতুন মূল্যের সৃষ্টি করে তাহার একাংশই মাত্র তাহারা মজুরি বাবদ পাইতেছেন, বাকি বা উদ্বৃত্ত অংশটুকু পুঁজির মালিকগণ ভোগ করিয়া থাকেন। ফ্রেডরিক এঙ্গেলস নির্দেশ করিয়াছেন, এই উদ্বৃত্তমূল্যের বিধি বা নিয়মটা কার্ল মার্কসের দুই নম্বর আবিষ্কার। এই আবিষ্কারকে এযুগের বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদগণ নতুন নামে ডাকিতেছেন। তাঁহারা ইহার নাম রাখিয়াছেন ‘পুঁজিগঠন’ বা ক্যাপিটাল ফর্মেশন।

এই আবিষ্কারের ফলে এতদিন যাবত যে সমস্যার সমাধান লইয়া একাধারে বুর্জোয়া অর্থনীতি ব্যবসায়ী এবং অন্যদিকে সমাজতন্ত্রবাদী সমালোচকগণ অন্ধকারে পথ হাতড়াইতেছিলেন তাহা অকস্মাৎ সহজবোধ্য হইয়া উঠিল। এই সমস্যার নাম এতদিন ছিল শ্রমিক সমস্যা। এক্ষণে উহার নতুন নাম দাঁড়াইল বুর্জোয়া সমস্যা—অর্থাৎ সমাজ হইতে কিভাবে বুর্জোয়া শ্রেণির শাসন উঠাইয়া দেওয়া যায়।

একটা জীবনের পক্ষে এই মাপের দুইটা আবিষ্কারই কি যথেষ্ট নয়? আর এহেন একটা আবিষ্কারের মতন আবিষ্কার যে মানুষটি করিতে পারেন তাহাকেই নির্দ্বিধায় সুখী মানুষ বলা যাইতে পারে। জ্ঞানের যে ক্ষেত্রেই মার্কস হাত দিয়াছিলেন সেখানেই—এমনকি গণিতশাস্ত্রেও—তিনি নিজস্ব একটা কিছু আবিষ্কার করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন। তাঁহার জ্ঞানানুসন্ধানের ক্ষেত্রও খুব একটা কম ছিল না—ছিল অনেকগুলি—আর কোন ক্ষেত্রেই নিছক ভাসাভাসা অনুসন্ধান করিয়া বা দায় সারিয়া তিনি কর্তব্যকর্ম সমাপন করেন নাই।

সেদিনের বক্তৃতায় এঙ্গেলস যে কোন কারণেই হউক আর একটি আবিষ্কারের কথা বলিতে ভুলিয়া গিয়াছিলেন। মার্কস নিজেই সেই আবিষ্কারের কথা বলিয়া গিয়াছিলেন—এঙ্গেলসেরও তাহাতে দ্বিমত ছিল না। জগদ্বিখ্যাত ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’ কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস দুইজনেরই কীর্তি—তবু এই ইশতেহারের মূল ধ্যান-ধারণার কৃতিত্ব এঙ্গেলসও একা কার্ল মার্কসকেই দিয়াছিলেন। এই প্রধান ধারণাটির নাম—সকলেই জানেন—‘শ্রেণি সংগ্রাম’। মার্কস বলিয়াছেন, শ্রেণি সংগ্রাম কথাটি বা তাহার অন্তর্গত অর্থটি তাঁহাদের নিজেদের মৌলিক আবিষ্কার নহে। তাঁহাদের এক যুগ আগে ফরাশিদেশের কয়েকজন ইতিহাস ব্যবসায়ী এই ধারণাটির উদগাতা। এই বুর্জোয়া ইতিহাস ব্যবসায়ীদের মধ্যে ওগুস্তিন থিয়েরি প্রমুখ কেহ কেহ ছিলেন সাঁ সিমোঁর শিষ্য।

মার্কস দাবি করিয়াছেন, শ্রেণি সংগ্রামের মধ্যস্থতায় পশ্চিম এয়ুরোপের ইংলন্ড, ফরাশি প্রভৃতি দেশে বুর্জোয়া শ্রেণি রাষ্ট্রক্ষমতা লাভ করিয়াছে। মার্কস দেখাইতে চাহিয়াছিলেন, বুর্জোয়া শ্রেণির ক্ষমতা যে পথে আসিয়াছে একদিন সেই পথেই তাহার বিনাশ ঘটিবে। অর্থাৎ শ্রেণি সংগ্রামেই তাহার অবসান হইবে। ইংলন্ড ও ফরাশি প্রভৃতি দেশের নতুন শাসক শ্রেণি—সংক্ষেপে যাহাদের নাম বুর্জোয়া শ্রেণি—একদিন শ্রমিক শ্রেণির হাতে পরাস্ত হইবেন। এই নতুন বিপ্লবী শ্রেণির লক্ষ্য হইতেছে সমাজ ব্যবস্থার দুষ্টক্ষতস্বরূপ যে শ্রেণি সংগ্রাম জারি রহিয়াছে তাহার অবসান ঘটানো। মার্কস নিবেদন করিয়াছিলেন একদিন শ্রমিক শ্রেণির রাজ কায়েম হইবে—এই ধারণাটিই তাঁহার নিজের পক্ষে শেষ আবিষ্কার। ইংরেজিতে এই ধারণার তর্জমা হইয়াছে—ডিক্টেটরশিপ অব দি প্রলেতারিয়েত বা শ্রমিক শ্রেণির একান্ত শাসন।

এঙ্গেলস তাঁহার ১৭ মার্চের বক্তৃতায় বলিতেছিলেন, সকল কথার গোড়ার কথা—মার্কস ছিলেন একজন বিপ্লব ব্যবসায়ী—প্রচলিত ভাষায় বলিতে ‘পেশাদার বিপ্লবী’। তাঁহার ধ্যানজ্ঞান ছিল একটাই—ছলে বলে কিংবা কৌশলে পুঁজিমালিক সমাজের উচ্ছেদসাধন আর সেই উচ্ছেদসাধনের কাজে তাহার সঙ্গে যে সকল রাষ্ট্র জাতীয় প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে এই ধরণের সমাজ গাড়িয়া বসিয়াছে তাহাদের উচ্ছেদসাধনে সর্বাত্মক শরিক হওয়াই তাঁহার জীবনের ধ্রুবতারা হইয়াছিল। তিনি শরিক হইতে চাহিয়াছিলেন বর্তমান যুগের প্রলেতারিয়েত বা সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণির মুক্তিসংগ্রামে। শ্রমিক শ্রেণি যে শ্রমিক শ্রেণি—বুর্জোয়া শ্রেণি যে তাহাদের শোষণ করিতেছে এই সত্য খোদ শ্রমিকদের মাথায় তিনিই প্রথম ভালোভাবে ঢুকাইয়াছিলেন। শ্রমিকদিগকে তিনি বলিয়া দিয়াছিলেন মুক্তিলাভ করিতে হইলে তাহাদের কি কি জিনিশের দরকার হইবে, বা কোন কোন শর্ত পূরণ করিতে হইবে। এককথায় লড়াই করার মেজাজটা তাঁহার অস্থিমজ্জায় গাঁথা ছিল।

এহেন মানুষের পক্ষে বুর্জোয়া শ্রেণির ঘৃণা না কুড়াইয়া বাঁচিয়া থাকা কি সম্ভব? মার্কস ছিলেন—এঙ্গেলস জানাইতেছেন—তাঁহার কালের সবচেয়ে বেশি ঘৃণাপ্রাপ্ত এবং সবচেয়ে বেশি কুৎসার শিকার ব্যক্তি। রাজতন্ত্রপন্থী আর প্রজাতন্ত্রপন্থী দুই ধরনের সরকারই তাঁহাকে স্ব স্ব দেশ হইতে বাহির করিয়া দিয়াছিলেন। তাঁহার বিরুদ্ধে অপবাদ রটনার দৌঁড়ে বুর্জোয়া শ্রেণির প্রতিনিধিরা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় নামিয়াছিলেন। এই একটি ক্ষেত্রে কে যে সংরক্ষণশীল দলের আর কে যে অতি-গণতন্ত্রী দলের সেই ভেদাভেদ করা যাইত না।

মার্কস আপন মনে আপনার কাজ করিয়া গিয়াছেন। একান্ত বাধ্য না হইলে তিনি এই সকল কুৎসার কোন জবাবও দিতেন না। উদাহরণস্বরূপ ‘পুঁজি’ প্রথম খণ্ডের মুখবন্ধ লিখিতে বসিয়া তিনি লিখিয়াছিলেন, যে কোন বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল যাহাদের বিরুদ্ধে যায় তাহারা যে সেই গবেষণার মুণ্ডুপাত করিবেন তাহাতে অবাক হইবার কিছু নাই। কিন্তু অর্থশাস্ত্রের বিষয়টা একটু আলাদা। যে সমস্ত বিষয় লইয়া অর্থশাস্ত্রের কারবার তাহাদের প্রকৃতিটা একটু আলাদা গোছের। এইসব বিষয় ব্যক্তিগত সম্পত্তির বা স্বার্থের সহিত জড়িত বিধায় অর্থশাস্ত্র গবেষকের বিরুদ্ধে গড়িয়া উঠা যুদ্ধক্ষেত্রের শত্রুব্যূহে দেখা যায় মানবজাতির বক্ষে পৃথিবীর যত চরম ধ্বংসাত্মক, পরম হীন আর অসুস্থ আবেগ আছে সবই এক জায়গায় আসিয়া সমবেত হইয়াছে। এদের নাম ব্যক্তিগত সম্পত্তির অসুর-অসুরি।

শত্রুতার প্রকৃতিটা কেমন তাহা দেখাইবার উদ্দেশ্যে মার্কস লিখিয়াছিলেন, ‘উদাহরণস্বরূপ বলা যাউক, আপনি যদি ইংরেজ জাতির সর্বজনস্বীকৃত চার্চ বা ধর্মসংঘের ৩৯টি বিধির মধ্যে ৩৮টি বিধি বাতিল করিবার দাবিও তোলেন তাহা তাহারা সহজে ক্ষমা করিতে রাজি হইবেন, তবে যদি তাহাদের আয়ের ৩৯ ভাগ হইতে ১ ভাগও কমাইতে চাহেন অত সহজে ক্ষমা করিতে রাজি হইবেন না। কারণ—মার্কস বলিতেছেন—আজিকালি সম্পত্তি প্রথার সমালোচনার সহিত তুলনা করিলে দেখিবেন নাস্তিকতাও লঘু অপরাধ বৈ নহে।

১৮৪৮ সালে কার্ল মার্কস যখন ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’ রচনা করিতেছিলেন তখনও এয়ুরোপ মহাদেশে শ্রমিক শ্রেণি পুরাপুরি গড়িয়া উঠে নাই। ফরাশি একাডেমি প্রণীত ফরাশি ভাষার অভিধানে ‘প্রলেতারিয়েত’ শব্দটি প্রথম ঢুকিবার অনুমতি পাইয়াছিল মাত্র ১৮২৮ সালে—মানে মার্কসের জন্মের মাত্র দশ বছর পর আর ইশতেহারের বিশ বছর আগে। বুর্জোয়া শ্রেণি খুব সহজে এই শব্দটি উচ্চারণ করিতে চাহেন নাই। তাহারা ইহার পরিবর্তে ‘জনতা’ শব্দটি ব্যবহার করিতে শুরু করেন। ইংরেজিতে একবচনে ‘ম্যাস’ আর বহুবচনে ‘ম্যাসেস’ শব্দের ব্যবহার ১৮৩০ সালের পর খুব বাড়িয়া যায়। নাপোলেয়ঁ বোনাপার্তের ভ্রাতুষ্পুত্র লুই নাপোলেয়ঁ বলিয়াছিলেন, ‘এখন বর্ণভেদ লোপ পাইয়াছে, আর জনতার শাসন কায়েম হইয়াছে।’

এঙ্গেলসের যে বক্তৃতা হইতে আজ আমরা এতগুলি কথা ধার করিয়াছি সেই বক্তৃতায় তিনি মার্কসের পরিচয় দিয়াছিলেন এইভাবে: মার্কসের মৃত্যুতে দুইটি শক্তির প্রচণ্ড ক্ষতির হইয়াছে—প্রথম শক্তির নাম এয়ুরোপ ও আমেরিকার প্রলেতারিয়েত বা শ্রমিক শ্রেণি। আর দ্বিতীয় যে শক্তির ক্ষতি হইয়াছে তাহার নাম ইতিহাস শাস্ত্র। সত্য সত্যই মার্কস প্রণীত বিজ্ঞানের নাম ইতিহাস শাস্ত্র। দুঃখের মধ্যে, বর্তমান কালের অনেক মার্কস ব্যবসায়ী এই সত্যটা আমলই করেন নাই।

দোহাই

১. Frederick Engels, ‘Speech at the Graveside of Karl Marx,’ in Progress Publishers, ed., Marx and Engels in the Eyes of Their Contemporaries, 3rd printing (Moscow: Progress Publishers, 1982), pp. 7-9.

২. Karl Marx, ‘Preface to the First Edition,’ Capital, vol. I, trans., Samuel Moore and Edward Aveling, ed., Frederick Engels (Moscow: Progress Publishers, 1977).

৩. Fernand Braudel, A History of Civilizations, trans. Richard Mayne (New York: Penguin Books, 1993).

 

বণিকবার্তা, ৪ মে ২০১৮
এনটিভি, ৬ মে ২০১৮

জাক লাকাঁ কথিত ‘অন্তর্জগতে যাহা না মিশিলে কোন সহজই জন্মায় না সেই পরকীয়া বা গঠনের কথা’

lacan-1932.jpg

১৯৩২ সালে জাক লাঁকা, বামে বসে থাকা জন

ভাষা, গঠনতন্ত্র ও সহজ মানুষ : লাঁকা পড়ার ভূমিকা

সলিমুল্লাহ খান

১৯৬৬ সালের অক্টোবর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্গত মেরিল্যান্ড রাজ্যের অন্তঃপাতী বল্টিমোর শহরে ফরাসি-মার্কিন বুদ্ধিজীবীদের এক বিশেষ সভা বসিয়াছিল। আমাদের এই আলোচনার বিষয়ের সহিত ঐ সভার আলোচ্য বিষয়ের বিশেষ মিল আছে। ফরাসিদেশের বুদ্ধিজীবী মহলে ততদিনে তত্ত্বজ্ঞানের প্রস্থানস্বরূপ ‘গঠনতন্ত্র’ [structuralism] নামক নতুন প্রস্তাব লইয়া আলোচনা জমিয়া উঠিয়াছে। আর মার্কিনদেশেও ইহার প্রভাব ছড়াইয়া গিয়াছে। তাই ১৯৬৬ সালের এই বল্টিমোর সভার বিষয় ঠিক হইয়াছিল ‘গঠনতন্ত্র’।

ঐ সভায় যাঁহারা হাজির হইয়াছিলেন তাঁহাদের মধ্যে ছিলেন রলাঁ বার্থ [Roland Barthes], জাক লাকাঁ [Jacques Lacan], জাক দেরিদা [Jacques Derrida], লুসিয়ঁ গোল্ডমান [Lucien Goldmann], জঁ-পল ভেরনা [Jean-Paul Vernant] এবং ত্রিস্তান তোদোরব [Tristan Todorov] প্রমুখ নামজাদা বিদ্বান ও বুদ্ধিজীবী। অন্য এক নামজাদা বুদ্ধিজীবী জঁ ইপ্পোলিত [Jean Hyppolite] ফরাসি তরফে এই সভা আঞ্জাম করিয়াছিলেন। বলা হয়তো নিষ্প্রয়োজন নয় এই জঁ ইপ্পোলিত জার্মান হেগেলের ফরাসি অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করিয়া বিশেষ নাম কুড়াইয়াছিলেন। তিনি চাহিলে জাক লাকাঁর বিশেষ বন্ধু ও জাক দেরিদার প্রধান শিক্ষক হিসাবেও পরিচিত হইতে পারিতেন। দুর্ভাগ্যবশত মহাত্মা ইপ্পোলিত ১৯৬৮ সালে–নিতান্ত অপরিণত বয়সে–এন্তেকাল করিয়া সকলকে শোকসাগরে ভাসাইলেন।

কারণ যাহাই হউক অনেক দেরি করিয়া ১৯৬৬ সালের ঐ সম্মেলনের কার্যবিবরণী প্রথম ছাপা হয় ১৯৭০ সাল নাগাদ। ইহার দুই বছর পর তাহার পুণর্মুদ্রণও হয়। পুনর্মুদ্রণের অজুহাতে বইয়ের নামেরও কিছু পরিবর্তন
roland_barthes.jpg…….
রলাঁ বার্থ (১৯১৫—১৯৮০)
………
ঘটান হয়। ১৯৭০ সালের সংস্কার অনুসারে বইয়ের আসল নাম রাখা হইয়াছিল ‘বিচারশাস্ত্রের ভাষা ও মনুষ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান : গঠনতন্ত্র বিসম্বাদ’। ১৯৭২ সালের সংস্কার অনুসারে উহার নাম পাল্টাইয়া রাখা হইল ‘গঠনতন্ত্র বিসম্বাদ: বিচারশাস্ত্রের ভাষা ও মনুষ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান’। ইহার মানে বড় নাম ছোট হইল, ছোট নাম বড় হইল। পাঠিকারা ইহাতেই বুঝিবেন জ্ঞানের জগতে ‘গঠন’ [structure] নামে নতুন কোন ঘটনা ঘটিয়াছে। ইহাতে প্রমাণ এয়ুরোপের মনে মনে ‘গঠনতন্ত্র’ বড় আকারের ফটিক হইয়া উঠিয়াছে। ১৯৬৬ সালে ঠিক ইহাই অনুমান করিয়াছিলেন মহাত্মা জাক লাকাঁ। তাঁহার বল্টিমোর বক্তৃতায় সেই কথার প্রমাণ আছে। লাকাঁ বলিয়াছেন–‘[গঠন] ধারণাটি কী তাহা লইয়া লোকে কিছু কিছু ভুল করিবেই, তালগোল পাকাইবে, অনুমানের পর অনুমাননির্ভর ব্যবহার করিতে থাকিবে আর আমার মনে হয় বেশিদিন না যাইতেই শব্দটি লইয়া একপ্রকার হুজুগের চল হইবে।’

এই বক্তৃতার তাৎপর্য পুরাপুরি বুঝিতে না পারিয়া স্বল্পশিক্ষিত সাংবাদিকরা মনে করিয়াছিলেন জাক লাকাঁ বড় কঠিন লোক। তাঁহার কথা বুঝিবার সাধ্য
hyppo.jpg…….
জঁ ইপ্পোলিত (১৯০৭–১৯৬৮)
……..
সাধারণের নাই। তাঁহারা আরো বলিয়াছিলেন, লাকাঁ সাহেব যেহেতু ইংরেজি ভাষাটি সঠিক আয়ত্ত করিয়া সারেন নাই, তাই তাঁহার বক্তৃতা দশজনের পক্ষে ভালোমতে হজম করাও সম্ভব হয় নাই। আমরা সেই বক্তৃতার অনুবাদ এখানে পেশ করিতেছি। আমাদের তর্জমার ত্রুটিসহ পাঠকগণ দেখিবেন এই বক্তৃতার বিরুদ্ধে যাহা রটিয়াছে তাহা পুরাপুরি সঠিক নয়। ইহা হয়তো বোঝা যায়। নহিলে বাংলায় অনুবাদ করিবার কথাই উঠিত না।

কেহ কেহ বলিয়াছিলেন বল্টিমোর সম্মিলনে মিলনকথা যাহা উঠিয়াছিল তাহা ভাষা ও মানুষের সম্বন্ধটা কী সেই জিজ্ঞাসা লইয়া। একদল জিজ্ঞাসিয়াছিল–মানুষ ভাষা তৈয়ার করিয়াছে নাকি ভাষাই মানুষ তৈরি করিয়াছে? কেহ কেহ দাবি করিয়াছিলেন ফরাসিদেশ হইতে প্রচারিত ‘গঠনতন্ত্র’ নামক প্রচারণা প্রমাণ করিয়াছে যে ‘মানুষ’ বলিয়া সামান্য কিছু নাই। তাই ‘সহজ মানুষ’ বলিয়া বিশেষ কিছু থাকিবে কি করিয়া? বিজ্ঞানের ইতিহাস ব্যবসায়ী মিশেল ফুকো সাহেবের নামে এই প্রচারণা কিছুদিন গাঢ় চলিয়াছিল। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করিতে হইতেছে উপরোক্ত ১৯৬৬ সম্মিলনে মিশেল ফুকো হাজির হয়েন নাই। তবে তর্কের খাতিরে স্বীকার করিতে দোষ নাই ঐ বছর ছাপা তদীয় ‘ভাষা ও বস্তু’ (লে মো এ লে শোজ) বইয়ে তিনিও ঐ রকমের ইশারাই করিয়াছিলেন ।

অথচ তিন বছরের মাথায় ছাপা ‘জ্ঞানগরিমার আদিকথা’ নামক পুস্তকে ফুকো ঘোষণা করিলেন ‘গঠনতন্ত্র’ তথা ‘মনুষ্য বলিয়া কিছু নাই’ কথাটি তাঁহার নহে। এহেন দাবি অলীক ও অসার। তিনি ১৯৬৬ সালের বইয়ে বলিয়াছিলেন ‘মানুষ’ অর্বাচীন এবং তাহার অন্তর্ধান অত্যাসন্ন। অথচ তিনি ১৯৬৯ সনের কেতাবে তিনিই ঘোষণা করিলেন–আমি কিন্তু কোথাও ‘গঠন’ কথাটি ব্যবহার করি নাই। (ফুকো ১৯৭২: ২০০-২০১) সুতরাং ‘গঠনতন্ত্র বিসম্বাদ’ [the structuralist controversy] কথাটি অলীক বুলি মাত্র। তবে শেষমেশ এই ফুকো কবুল করিলেন তিনি নিজেও মনুষ্য সাধকের সাধনার মূল্য খানিক কমাইয়া দেখিয়াছিলেন আর কিছু বাড়াইয়া দেখিয়াছিলেন এই গঠনে সেই গঠনে পাওয়া যুগপৎ মিলের মূল্য ।

কী ঘটিয়াছিল এই সময়? বিশেষ করিয়া বলিতে নৃবিজ্ঞানসাধক হজরত ক্লদ লেভি-স্ত্রোস [Claude Lévi-Strauss] যখন দেখাইয়াছিলেন ফ্রয়েডের
Claude Levi Strauss………
ক্লদ লেভি-স্ত্রোস (জন্ম. ১৯০৮)
……….
আবিষ্কৃত অজ্ঞানের গঠন আর মনুষ্যজাতির মধ্যকার পরিবার ও আত্মীয়তা-সম্পর্কের গঠন একই প্রকার গঠনেরই রকমফের মাত্র, প্রকৃত প্রস্তাবে গঠনতন্ত্র প্রস্তাব পেশ করা হইয়াছিল তখনই । ইহাতে জাক লাকাঁ আরও আহুতি দিলেন–বলিলেন অজ্ঞানের গঠন পরিষ্কার ভাষার মতন । গঠনতন্ত্র সত্য সত্যই গড়িয়া উঠিল।

ইহার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাইলেন যাঁহারা তাঁহারা আগের শতকের দর্শনতত্ত্বজ্ঞানী নিৎসের [Friedrich Nietzsche] দোহাই পাড়িলেন। ফুকো একা নহেন, কিছু পরিমাণে জাক দেরিদা আর বহুল পরিমাণে জিল দল্যুজ [Gilles Deleuze] তাঁহার সঙ্গী হইলেন । ইঁহাদের মধ্যে কিছু প্রভেদ
Deleuze……..
জিল দল্যুজ (১৯২৫—১৯৯৫)
………
থাকিলেও মূল প্রশ্নে সকলেই একমত হইলেন। তাঁহারা ধরিয়া লইলেন ‘গঠনতন্ত্র’ মানে সহজ মানুষের অন্তর্ধান। তাই ফুকো ও দল্যুজ নিৎসের আশ্রয় লইলেন আর দেরিদা উটপাখির মত ভাষার বালিতে আমুণ্ডুপদনখর ডুবিলেন।

‘গঠনতন্ত্র’ কথাটি শুরু হইতেই এই ভুল বোঝাবুঝির উপর দাঁড়াইয়া আছে। অনেকেই মনে করিয়াছিলেন ‘গঠন’ (structure) থাকিলে ‘সহজ মানুষ’ (subject) থাকিতে পারে না। অথচ জাক লাকাঁ একেবারে বিসমিল্লাহ হইতেই বলিয়া আসিতেছিলেন এই ধারণাটি আদপেই সঠিক নহে। পক্ষান্তরে তিনি দাবি করিলেন, গঠন ও সহজ মানুষের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গী। গঠনের পরই শুদ্ধ সহজ মানুষের আবির্ভাব ঘটে, পূর্বে বা বিহনে নহে।

স্বভাবতই প্রশ্ন উঠিয়াছিল: ‘সহজ মানুষ’ (subject) কী বস্তু? জাক লাঁকা বলিলেন–‘সহজ মানুষ’ কথাটার অর্থই হইতেছে ‘যাহা সহজ নহে’। কোন জিনিস ভাষার মধ্যে ধরিয়া রাখা সহজ নহে বলিয়া আমরা কি বলিতে পারি জিনিসটুকু নাই? সেই সময় শার্ল মোরাজে (Charles Morazé) নামক জনৈক ইতিহাস বিশারদ আওয়াজ তুলিয়াছিলেন ‘ঋণাত্মক একের বর্গমূল’ (the root of minus one) কথাটির অর্থ কী? গণিতশাস্ত্রে এই চিহ্নটিকে
Moraze………
শার্ল মোরাজে (১৯১৩–২০০৩)
……….
‘অযৌক্তিক’ [irrational] সংখ্যা বলা হইয়া থাকে। অথচ ইহা তো খোদ গণিতেই কাজ করে। জাক লাকাঁ ইহার বরাত দিয়া বলিলেন প্রাণীস্বরূপ মানুষ বা ‘জীব’ ও ‘সহজ’ মানুষের মধ্যকার পার্থক্যও অনুরূপ বটে। ‘সহজ মানুষ’ কথাটা যদি অযৌক্তিক মনে হয় তবে তাহা ভাষারই দোষ। কিন্তু তাই বলিয়া ইহা কাজ করে না বা ইহা নাই বলা যাইবে না।

জাক দেরিদা এক জায়গায় জাক লাকাঁর কাছে জানিতে চাহিলেন ইহাকে ‘সহজ মানুষ’ বা ‘অজ্ঞান’ বলিবার কারণ কী? ইহার উত্তরে লাকাঁ সভাস্থলে উপস্থিত বিদ্বানমণ্ডলীর কাছে একটি গল্প বলিয়াছিলেন।

একদিন হোটেলে একটি ঘটনা ঘটিয়াছিল। জাক লাকাঁর ঘরে একটি টেবিল এক জায়গা হইতে আরেক জায়গায় সরাইবার দরকার হইল। তিনি যাহাকে বলে বেলম্যান বা পিয়ন তাহাকে টেবিলটি সরাইতে বলিলেন। পিয়ন সাহেব
d_jaques_derrida.jpg…….
জাক দেরিদা (১৯৩০–২০০৪)
………
তাহাতে ক্ষেপিয়া গেলেন। বলিলেন, ‘মহাশয়, ইহা আমার কর্তব্য নহে। আপনি দরকার মনে করিলে কথাটা বলিবেন গৃহ-পরিচারক বা হাউস-কিপারকে। গৃহ-পরিচারকগণ আসিয়া কাজটা করিয়া গেলেন বটে, কিন্তু তাহারা মহাত্মা লাকাঁর কোন কথাই শুনিলেন না। তাঁহারা শুদ্ধ স্ব স্ব উপরিওয়ালার আদেশ অনুসারে কাজ সারিয়া চলিয়া গেলেন। ইহা হইতেই–লাকাঁ বলিলেন–তিনি ঠাহর করিলেন কাজ যাহা হইয়াছে তাহা (সহজ মানুষস্বরূপ) তাহার ইচ্ছায় হইয়াছে মনে করিলে তিনি ভুল করিবেন। কাজ হইয়াছে হোটেলের নিয়ম অনুসারে, খরিদ্দারস্বরূপ জাক লাকাঁর ইচ্ছায় নহে। মাঝখানকার খরিদ্দারবেশী জাক লাকাঁ নামক অস্থিরতাটুকুরই অপর নাম ‘সহজ মানুষ’। টেবিলটা বড় বেঢপ জায়গায় ছিল। এখন বেশ ঢপ জায়গায় চলিয়া আসিয়াছে। মাঝখানে সৃষ্ট শূন্যতাই এক্ষণে প্রমাণ করিতেছে ঐখানে কি একটা যেন ছিল। অধৈর্যপরায়ণতার বাহক এই স্থানটির নামই ‘সহজ মানুষ’। (রাবাতে ২০০২: ৪০ )

জাক লাকাঁর এই বক্তৃতার নাম দেখিয়াও অনেকেই ইহা পড়িতে চাহিবেন না মনে হয়। সে কি নাম রে বাবা! ‘অন্তর্জগতে যাহা না মিশিলে কোন সহজই জন্মায় না সেই পরকীয়া বা গঠনের কথা’ [‘Of Structure as an Inmixing of an Otherness Prerequisite to Any Subject Whatever’]। মহাত্মা লাকাঁ সেইদিনের বক্তৃতায়ই জানাইয়াছিলেন সমস্যাটি লইয়া তাহার কাজের বয়স ততদিনে ১৫ বৎসর হইবে। কাজেই তাঁহার সমস্ত কথা একদিনে বলা সম্ভব হইবে না।

সেদিনের বক্তৃতার আরও একটি কথা মনে রাখিবার মত যুৎসই হইয়াছিল। বক্তৃতার শেষভাগে এক জায়গায় তিনি বলিলেন: ‘অজ্ঞান কী বস্তু সংক্ষেপে তাহার সবচেয়ে সুন্দর ছবি এই সুবেহ সাদেকের বল্টিমোর শহর।’ কিছু একটা আছে বোঝা যাইতেছে কিন্তু সঠিক কী যে আছে বুঝিতেছি না । তাহা বুঝিতে হইলে খানিক কল্পনার শরণ লইতে হইবে।

মনে রাখিতে হইবে সেই ১৯৫৩ সন হইতেই লাকাঁ বলিয়া আসিতেছিলেন ‘অজ্ঞানের গঠন ভাষার মতন’। ১৯৬৬ সনে–এই বক্তৃতাতেই–তিনি জাহির করিলেন ঐ কথাটি কিছু পরিমাণ বাহুল্যদুষ্ট ছিল। এক্ষণে তাঁহার সহজ মত দাঁড়াইল: ‘অজ্ঞানের গঠন আছে বলিলেই চলিত কারণ গঠন মানেই তো ভাষা’।

লাকাঁর কথা যৎসামান্য উদ্ধার করিতেছি:
সত্য বলিতে ‘ভাষা আকারে’ কথাটি বাহুল্য বটে, কারণ ‘গঠিত’ বলিতে যাহা বুঝায় ‘ভাষা আকারে’ বলিতেও হুবহু তাহাই বুঝায়। গঠিত বলিতে বুঝায় আমাদের জবান, আমাদের অভিধান ইতি আদি। গঠিত অর্থ যাহা, ভাষা অর্থও অবিকল তাহাই।

মনে রাখিবার মতন মচমচে কথা এই বক্তৃতায় আরো এক প্রস্ত পাওয়া যাইতেছে। ‘চিহ্ন’ (sign) ও ‘পদ’ (signifier)-এর মধ্যে ভেদ আছে–এই প্রস্তাব প্রচারের লক্ষ্যে লাকাঁ জানাইলেন চিহ্ন মানে যাহা দিয়া সজ্ঞান এক প্রাণীর খবর অন্য প্রাণীকে দেওয়া চলে। কিন্তু ‘যাহা সহজ মানুষের হইয়া সহজ মানুষের সঙ্গে যায় না, যায় অন্য এক পদের সঙ্গে তাহাকেই পদ কহে’।

আরো এক জবর খবর–এইস্থলে তিনি বলিয়াছিলেন–আছে। ভাষার বা পদের জগতে যাহা আছে তাহাকে ‘বাসনা’ (desire) বলা হয়। বাসনার এক মানে যাহা বাস করে না–যাহা অস্থির, যাহা অধৈর্য। কিন্তু বাসনার তলে তলে আরো এক জিনিস বাস করে। তাহার নাম মজা (jouissance)। বাসা আর মজা
lucien-goldmann.jpg……..
লুসিয়ঁ গোল্ডমান (১৯১৩–১৯৭০)
……..
মারা ঠিক এক জিনিস নহে। ভাষা মানে বাসনার বিধি–আইন ও ঈশ্বর যে অর্থেই ইচ্ছা–ধরিয়া লইতে পারেন। ভাষাই বিধি। ভাষাই নিষেধ। নিষেধ বা সীমা আছে বলিয়াই প্রাণী (এখানে মানুষ) সেই নিষেধের বেড়া ভাঙ্গিয়া–বা আইল ডেঙ্গাইয়া–ঘাস খাইতে চায়। নিষেধ বা আইল না থাকিলে তো আইলডেঙ্গার দরকারই হইত না–মজাও হইত না। কাজেই বল্টিমোর শহরের বিজ্ঞাপনচিত্রে লেখা ‘এনজয় কোকা-কোলা’ বা ‘কোকা-কোলার মজা মার’ দেখিয়া লাকাঁ বলিলেন সকলেই সকলকে বলিতেছে ‘মজা মার’।

এই মজা মারিতে মারিতে বেশি মারিলে একসময় ব্যথা করিতে শুরু করে। অথচ এই ব্যথার সীমায় পৌঁছাইতে না পারিলে মজা যে সে মারিতেছে তাহার প্রমাণই হয় না। লোকে বলে মজাই জীবন, মজা না মারিলে এ জীবন লইয়া সে কী করিত? মজা জীবনের চাহিতেও বড়। জীবন তুচ্ছ। যে কেহই ত্যাগ করিতে পারেন। সকলেই যাহা সহজে পারেন না ভারতীয় শাস্ত্রে তাহারই অপর নাম ‘ভক্তি’।

পাঠিকা, খেয়াল করিয়াছেন ‘ভক্তি’ কথাটার তাৎপর্য? ‘ভক্তি’ কথাটার আগে
jean-pierre-vernant.jpg
জঁ-পল ভেরনা
………
‘বি’ উপসর্গ লাগাইলে কী হয়? ‘বিভক্তি’। বিভক্তি আসিয়াছেন ‘বিভাগ’ করিবার ক্রিয়া হইতে। তাহা নহে তো কী? তাহা হইলে ‘ভক্তি’ আসিয়াছেন ‘ভাগ হইতে’। প্রাণীমানুষ বা ‘জীব’ ভাগ হইলেই ‘সহজ মানুষ’ তৈয়ার হয়েন। এই ভাগকর্মটি করেন যে হাজাম বা নাপিত তাহারই অপর নাম ভাষা। ভাষাই ভাগ করেন। কাজেই ভাগ হইতে যাহার উৎপত্তি তিনিই বিভক্ত বা নিছক ‘ভক্ত’, তাহার পরায়ণতার নামই ভক্তি। খোদ ভক্তি ও মজার মধ্যে তাহা হইলে একটা না একটা যোগ আছে।

মজা মারিতে মারিতে বেশি মারিলে ভাগ বা ভক্তি আর থাকিবেন না। তখন মজার রাশ টানিয়া ধরিতে হইবেক। ভাষা ও মজার, পরকীয়া ও আপনকার এই যুগলবন্দিকেই আমরা এতদিনে ‘গঠন’ বলিয়া চিনিতে পারিলাম। আর জাক লাকাঁর কর্জ নগদ নগদ স্বীকার করিলাম। লাকাঁ কথিত সমাচার এইখানেই মূর্তি পাইল: আপনকার হৃদয় বা অন্তরের সহিত বাহির বা পরকে মিশাইলেই শুদ্ধ সেই ‘সহজ মানুষ’ দেখা দিবেন–অন্য হেতু অন্য কোথা, অন্য কোনখানে দিবেন না। কারণ তাহা যে দিবার নহে।

দোহাই

১. Michel Foucault, The Archeology of Knowledge [L’archéologie de savoir, Paris: Gallimard, 1969], trans. A. M. Sheridan Smith (New York: Pantheon, 1972); ইংরেজি এই সংস্করণে ১৯৭০ সালে কলেজ দো ফ্রঁসে ফুকোপ্রদত্ত বক্তৃতা L’ordre du discourse (Paris : Gallimard, 1971) এর অনুবাদ ‘The Discourse on Language’ অন্তর্ভূক্ত হইয়াছে।

২. Michel Foucault, The Order of Things [Les mots et les choses: une archéologie des sciences humaines, Paris: Gallimard, 1966], A. Sheridan, tr. (New York: Random House, 1970).

৩. Jacques Lacan, ‘Of Structure as an Inmixing of an Otherness Prerequisite to Any Subject Whatever’, in Richard Macksey and Eugerio Donato, eds., 1970, infra, pp.186-200.

৪. Richard Macksey and Eugenio Donato, eds., The Structuralist Controversy: The Languages of Criticism and the Sciences of Man(Baltimore: The Johns Hopkins University Press, 1972).

৫. Richard Macksey and Eugenio Donato, eds., The Languages of Criticism and the Sciences of Man: The Structuralist Controversy,(Baltimore: The Johns Hopkins University Press, 1970).

৬. Jean-Michel Rabaté, The Future of Theory (Oxford: Blackwell, 2002).

●●●

অন্তর্জগতে যাহা না মিশিলে কোন সহজই জন্মায় না সেই পরকীয়া বা গঠনের কথা

জাক লাকাঁ

তর্জমা: সলিমুল্লাহ খান

আমার ইংরেজি উচ্চারণ একদম বাজে। উচ্চারণদোষে আমার বক্তৃতা একদল ইংরেজিভাষী শ্রোতার কানে নিশ্চয়ই বড় মধুর শোনাইবে না। আর বক্তৃতাটা যদি আমি ইংরেজি জবানেই করি তো যাহাকে বলা যাইতে পারে আমার বার্তা তাহা যথাস্থানে না পৌঁছাইবার ঝুঁকিও থাকিয়াই যাইতেছে–আজ বিকালবেলা এই কয়টি কথা আমাকে বুঝাইবার আশায় এক ভদ্রলোক বেশ কিছু সময় ব্যয় করিয়াছেন। সত্য বলিতে বিষয়টি আমার বিবেকের ঘাড়েও ভারি বোঝা হইয়া রহিয়াছে। যদি অন্যথা করি তো তাহা হইবে আমি যে বস্তুকে আমার বার্তা মনে করিয়া থাকি তাহার শতে একশত ভাগ বিপরীত কর্ম। বার্তা বলিতে আমি যাহা বুঝি তাহা আপনাদের সমক্ষে খুলিয়াই বলিতেছি–বার্তা মানে আমার নিকট আর কিছু নয়, মাত্র ভাষার বার্তা। আজকাল যেখানেই যাই দেখি সকলেই বার্তা বার্তা করিতেছে–জীবদেহের অন্তরের হরমোনে বার্তা, বিমানপোতকে পথ দেখাইবার কিংবা উপগ্রহাদি হইতে সংকেত ধরিবার আলোকরশ্মিও বার্তা। এই ক্রমে আরো আরো আছে। ভাষার বার্তা কিন্তু সেই জিনিস নয়। ইহা ষোল আনাই ভিন্ন বস্তু। বার্তা–মানে আমরা যে বস্তুকে বার্তা নামে ডাকিতেছি তাহা–বিনা ব্যতিক্রমেই পরমের পাঠানো বার্তা। পরম বলিতে আমি বুঝাইতেছি ‘পরমের ঠিকানা বা অধিষ্ঠান’। আমরা সচরাচর যাহাকে ‘পর’ কিম্বা বা ‘অপর’ (other) বলিয়া থাকি, যাহা লিখিতে ছোট ছাদের ‘o’ অক্ষর ব্যবহার করা হয়, এই পরম অবশ্যই সেই পরম নয়, আর সেই কারণেই এক্ষণে ‘পরম’ (Other) বলিয়া যাহাকে ডাকিতেছি তাহা লিখিবার সময় প্রথম হরফ নাগাদ বড় ছাদের ‘O’ ব্যবহার করিয়াছি। এতদ্দেশে, এই বল্টিমোর শহরে, পরম মনে হইতেছে ইংরেজি জবানেই বাতচিত করিয়া থাকেন। আর ইহাই তো স্বভাবসম্মত। তাই আমি যদি এই বক্তৃতাটি ফরাসিযোগেই করিতাম তো তাহা হইত অন্যায় কাজ। অবশ্য উপরে যে ভদ্রলোকের দোহাই দিলাম তাহার কথাটিও ফেলিয়া দিবার মতো নহে। তিনি বলিয়াছিলেন ইংরেজি বোলটা আমার মুখে ঠিক সহজে আইসে না। অধিক কী, তাহা খানিক ভূতের মুখে রামনাম রামনাম শোনায়। আরো কথা আছে। আমি জানি অত্র সভায় এমনও অনেকে আছেন যাহারা শুদ্ধ ফরাসি ভাষাতেই বাতচিত করিতে পারেন, ইংরেজি এক লব্জও বুঝিতে পারেন না। আমি যদি ইংরেজিযোগে বলিতাম ইঁহাদিগের পক্ষে নিরাপদ হইত। তবে আমার হয়তো বাঞ্ছাই নাই যে ইঁহারা অতটি নিরাপদ থাকিবেন। অতএব ইহাদিগের মুখ চাহিয়া আমি একআধটু ফরাসিও কহিব।

jacques-lacan-1.jpg
জাক লাকাঁ (১৯০১–১৯৮১)

পহিলা দফায় আমি ‘গঠন’ বলিতে কী বুঝায় সেই সম্বন্ধে কিছু আগাম কথা বলিতেছি। ইহাই তো আমাদের অদ্যকার সভার বিষয়বস্তু। ধারণাটি কী তাহা লইয়া লোকে কিছু কিছু ভুল করিবেই, তালগোলও পাকাইবে, অনুমানের পর অনুমাননির্ভর ব্যবহার করিতে থাকিবে আর আমার মনে হয় বেশিদিন যাইতে না যাইতেই শব্দটি লইয়া এক প্রকার হুজুগেরও চল হইবে। আমার বেলা এই কথাটি কিন্তু খাটিবে না কেননা আমি শব্দটি এস্তেমাল করিয়া আসিতেছি অনেক দিন হইতেই–পড়াইবার ব্যবসায় আরম্ভ করিবার পর হইতেই। এই বিষয়ে আমার যাহা বলিবার তাহা জানেন অল্প লোক মাত্র। আরো বেশি লোকে জানিতেন যদি না আমি আমার বক্তৃতা সীমিত রাখিতাম মাত্র একদল বিশেষজ্ঞ শ্রোতা–মানে মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারীদের–সমক্ষে। বিষয়টি বড়ই কঠিন। বেয়াড়া রকমের কঠিন মনে হইতেছে। কারণ মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারীরা সত্য সত্যই আমি কিসের কথা বলিতেছিলাম তাহা কিছু কিছু জানেন আর মনোবিশ্লেষণবৃত্তিটি যিনিই গ্রহণ করিয়াছেন তিনিই জানেন এই জিনিসটির সহিত আঁটিয়া উঠা বিশেষ কঠিন কাজ বটে। ‘সহজ মানুষ’ (subject) বলিতে সত্যই যাহা বুঝায় তাহা লইয়া যাহাদের কারবার সেই মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারীদের কাছে ‘সহজ মানুষ’ জিনিসটা তেমন সহজ জিনিস নয়। আমি চাই না আমি যাহা বলিতেছি তাহা লইয়া কোন ভুল বোঝাবুঝি হউক, কোন ‘মেকোনাসঁস’ (méconaissance) হউক। ‘মেকোনাসঁস’ কথাটি ফরাসি। ইংরেজি ভাষায় ইহার সমান অর্থবহ আর কোন শব্দ নাই বলিয়াই আমি ফরাসি শব্দটিই ব্যবহার করিতে বাধ্য হইলাম। মেকোনাসঁসের অর্থই এমন যে ইহার শরণ লইতে না লইতেই ‘সহজ মানুষ’ আসিয়া যায়। অধিক, আমাকে ইহাও জানানো হইয়াছে যে এক মণ্ডলি ইংরেজিভাষী শ্রোতাসমক্ষে ‘সহজ মানুষ’ লইয়া কথা বলাটাও তেমন সহজ কাজ হইবে না। ‘মেকোনাসঁস’ বলিতে বুঝায় ‘ভুল বোঝা’, কিন্তু ইহাতে আমার (বা আপনার) সহজ ভাবকে ভুল বোঝা বা না বোঝা বোঝায় না। সমস্যাটা–প্রকৃত প্রস্তাবে–গঠন (structure) বলিতে আদপেই কী বোঝায় তাহার সঙ্গে জড়িত।

আমি মনোবিশ্লেষণশাস্ত্র পড়াইতে শুরু করিবার পর এক সময় আমার কয়েকজন শ্রোতা আমাকে ছাড়িয়া গিয়াছিলেন। ইহার কারণ ততদিনে অনেক দিন হইয়াছে আমি একটি সরল সত্যের পরিচয় লাভ করিয়াছি। সেই সত্য অনুসারে আমরা যদি ফ্রয়েডের যে কোন বই–বিশেষ অজ্ঞান সম্বন্ধে লেখা যে কোন বই–খুলিয়া দেখি তো শতে একশত ভাগ নিশ্চিত থাকিতে পারি যে একটা না একটা পাতা পাওয়া যাইবে যেখানে কোন না কোন শব্দ দেখিব–বই হইলেই স্বাভাবিকভাবে তাহা অজস্র শব্দে, ছাপানো শব্দে ঠাসা হইবে–যাহা নিছক শব্দ নয়। এমন শব্দ দেখিব যাহা শব্দরূপী বস্তু বৈ নয়। এই নিশ্চয়তা অবশ্য নিশ্চয়তাই, শুদ্ধ সম্ভাবনা নয়। আমরা এই সমস্ত শব্দেরই মধ্যবর্তিতায় অজ্ঞান কী করিয়া সামলাইতে হয় তাহার পথ ধরিবার চেষ্টা করি। শব্দের অর্থ কী তাহা লইয়া এই স্থলে কথা হইতেছে না, কথা হইতেছে শব্দের হাড়মাস, শব্দের স্বভাব-শরীর লইয়া। ফ্রয়েডের চিন্তাভাবনার বড়–য়া ভাগের কারবারই এই লইয়া, স্বপ্নের মধ্যে শব্দচমক (punning), কিংবা মুখ-ফস্কা কথা (lapsus), কিংবা ফরাসি ভাষায় যাহাকে বলে কালঁবু (calembour) বা চমৎকথা, কিম্বা ওমোনিমি (homonymie) বা নামসমতা তাহা লইয়া, কিংবা অধিক বলিতে কোন কোন শব্দ ভাঙ্গিয়া টুকরা টুকরা যে এক এক আলাহিদা অর্থ ধারণ করে তাহা লইয়া। শুদ্ধ শব্দই অজ্ঞানের মালমসলা–এই প্রস্তাব শতে একশত ভাগ প্রমাণসিদ্ধ হয় নাই। তবুও ইহা ভালমত টুকিয়া রাখিবার জিনিস। কারণ প্রমাণসিদ্ধ না হইলেও ইহার হইবার সম্ভাবনা বিলক্ষণ আছে (তদুপরি, যাহাই হউক, আমি কদাচ বলি নাই অজ্ঞান বলিতে মাত্র শব্দের মহফিল মাত্র বোঝায়। আমি শুদ্ধ বলিয়াছি অজ্ঞান বস্তুটা যে ‘গঠিত’ সেই সত্যে সন্দেহ নাই)। ইহার তুলনীয় কোন শব্দ ইংরেজি ভাষায় আছে বলিয়া আমার জানা নাই। কিন্তু থাকার দরকার আছে। কারণ আমরা কথা বলিতেছি ‘গঠন’ সম্বন্ধে আর অজ্ঞানের গঠন ভাষা আকারে। ইহাতে কী বুঝাইতেছে?

সত্য বলিতে ‘ভাষা আকারে’ কথাটি বাহুল্য বটে, কারণ ‘গঠিত’ বলিতে যাহা বুঝায় ‘ভাষা আকারে’ বলিতেও হুবহু তাহাই বুঝায়। গঠিত বলিতে বুঝায় আমাদের জবান, আমাদের অভিধান ইতি আদি। গঠিত অর্থ যাহা, ভাষা অর্থও অবিকল তাহাই। অধিক ইহাই সবটি নয়। ভাষা মানে কোন ভাষা? আমি নই আমার ছাত্ররা অনেক কষ্ট স্বীকার করিয়া এই সমস্যার ভিন্ন আরেকটি অর্থ খাড়া করাইবার কোশেশ করিয়াছিলেন। তাঁহারা চাহিয়াছিলেন সারাৎসার ভাষার মূলসূত্র খুঁজিয়া বাহির করিতে। তাহারা জানিতে চাহিয়াছিলেন কোন জিনিসকে ভাষা পদবাচ্য হইতে হইলে কমসে কম কোন কোন শর্ত পুরাইতে হইবে? হইতে পারে শুদ্ধ চারিটি পদাংক (signantes), চারিটি অর্থধারিণী অংকুর (elements) হইলে পর্যাপ্ত হয়। পরীক্ষাটি বেশ মজাদার। তবে ইহার গোড়ায় গলদ আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি ইহা দেওয়াল পটে লিখিয়া দেখাইব আশা রাখি। পারী শহরে আমার বক্তৃতাসভায় কয়েকজন তত্ত্বজ্ঞানীও আসিতেন। যাঁহারা আসিতেন তাঁহারা সংখ্যায় অনেক নহেন, তবে বেশ কয়েকজনই আসিতেন। ইহাঁদের কেহ কেহ পরে খুঁজিয়া বাহির করিয়াছিলেন যে সমস্যাটা ভাষার ‘ভিতরে আরেক ভাষার’ কিংবা ভাষার ‘বাহিরে অন্য ভাষার’ নয়। যথা পুরাকথা কিংবা কমাকথার সমস্যাও নয়, সমস্যা খোদ ভাষারই। সমস্যার ঠিকানা প্রস্থান করাইতে ইঁহারা যে কষ্টস্বীকার করিয়াছিলেন তাহা সত্য সত্যই অসামান্য কাজ। যেমন পুরাকথা লইয়া আলোচনার দরকার হইতেছে না কেননা পুরাকথাও যে ভাষার আকারে গঠিত তাহা একদম পরিষ্কার। আর আমি যখন ‘ভাষা আকারে’ কথাটা খাটাইলাম তখন আমি গণিতের ভাষা, কি সংকেতের ভাষা, চলচ্চিত্রভাষা ইত্যাদি অর্থে বিশেষ বিশেষ ভাষা বুঝাইতে খাটাই নাই। ভাষা ভাষাই আর ভাষা মাত্রেই এক জাতের: যথা ইংরেজি বা ফরাসি প্রভৃতি মূর্তিমান ভাষা। এইসব ভাষায় মনুষ্য কথা বলে। এই পর্যন্ত পৌঁছিয়া একটি কথা বলিতে হইবে: ‘ভাষাপারের ভাষা’ (metalanguage) বলিয়া কোন ভাষা নাই। কারণ ভাষাপারের ভাষা নামে অভিহিত সমস্ত ভাষার কথাই বলিতে হয় ভাষারই মধ্যবর্তিতায়। পটের গায়ে খালি খালি অক্ষর লিখিয়া কেহ গণিত শিখাইতে পারে না। দশজনে বুঝিতে পারিবে এমন কোন না কোন সামান্য ভাষায় কথা কহিবার দরকার করে, সদাসর্বদাই করে।

অজ্ঞান ভাষার আকারে গঠিত। ইহা নিছক এই কারণে নয় যে অজ্ঞানের মালমসলা তৈয়ার হইয়াছে আমরা ফরাসি জবানে যাহাকে বলি লঁগাজিয়ে (langagier) তাহা অর্থাৎ ভাষার মশলা দিয়া। অজ্ঞান আমাদের সমক্ষে যে সমস্যা তুলিতেছে তাহাই ভাষার স্বভাব সম্বন্ধে সবার চাইতে বেশি অভিমানিনী সমস্যার প্রান্ত ছুঁইয়া যায়: এই সমস্যারই নাম ‘সহজ মানুষ’। কোন বাক্যের বক্তা কিম্বা ব্যক্তিপরিচয়দাতা প্রতিনাম (personal pronoun) আর ‘সহজ মানুষ’ এক জিনিস, অমনি অমনি এই কথা বলা চলিবে না। ফরাসি জবানে ‘বক্তব্য’ (ennoncé) বলিতে হুবহু বাক্যই বুঝায়, তবে এমন বক্তব্যও ঢের রহিয়াছে যেখানে বক্তব্যটি ঠিক কে বকিতেছে তাহার কোন হদিশ নাই। যদি বলি ‘ইট রেইনস’ (বৃষ্টি হইতেছে) [it rains] তো যে সহজ মানুষ কথাটি বকিলেন তিনি এই বাক্যে শরিক হইলেন না। যাহাই হউক, এইখানে কোথাও না কোথাও একটা গোল বাঁধিয়াছে। ‘সহজ মানুষ’ আর ভাষাব্যবসায়ীরা যাহাকে বলেন ‘আড়কাঠি’ (shifter) এই দুইকে সব সময় এক ভাবা ঠিক হইবে না।

অজ্ঞানের স্বভাব হইতে যে সমস্যা দেখা দেয় তাহা–সংক্ষেপ করিয়া বলিলে–এই দাঁড়াইতেছে: কিছু না কিছু কখনো না কখনো ভাবিতেছে। ফ্রয়েড আমাদিগের উদ্দেশে কহিয়াছিলেন অজ্ঞান সম্বন্ধে সকল কথার বড় কথা এই: অজ্ঞান ভাবনাই বটে। অধিক জ্ঞানের এলাকায় যাহার প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হইয়াছে সেই ভাবনাই। এই নিষেধ একেক জায়গায় একেক রকম চেহারায় করা হইয়া থাকে, অর্থের কথা উঠাইলে বলিতে হইবে ইহার অর্থও নানান কিসিমের হইতে পারে। প্রধান অর্থটি সত্য সত্যই ‘বাধা’ বটে। এই বাধা হয় ডিঙ্গাইয়া যাইতে হইবে নচেৎ ফুঁড়িয়া পার হইতে হইবে। না হইলে হইবে না। কথাটির ভার আছে, কেননা আমি যদি এই বাধার কথা জোর দিয়া না বলি তো আমাদের জীবন একান্তই মসৃণ মনে হইয়া যাইত। আমরা ফরাসি ভাষায় ‘সা ভুজারঁজ’ (ça vous arrange–[বা আপনার ব্যবস্থা হইয়াছে]–জাতীয় কথা বলিয়া থাকি, কেননা নিচের তলায় বা মাটির নিচে কিছু না কিছু যদি ভাবিয়াই থাকে তো জীবনটা সহজ হইয়া যায়। ভাবনা জিনিসটা সদাসর্বদাই হাজির রহিয়াছে আর প্রাণধারী জীব স্বভাবের চাপে যাহা ভাবিতেছে তাহার সম্বন্ধে একটু হুঁশ হইল, জীবন চলিয়া যাইবে এক রকম। ঘটনা যদি তাহাই হইত তো ভাবনার ভারটা পড়িত প্রাণের উপরই, আর তাহাই হইত স্বাভাবিক, যেমন সাড়াই (instinct) হইত ভাবনা। ভাবনা যদি স্বভাবের ফসল হইত তো অজ্ঞান লইয়া কোনই গোল বাঁধিত না। দুঃখের মধ্যে, অজ্ঞানের সহিত ‘সাড়া’ কিম্বা ‘আদিজ্ঞান’ কিংবা মাটির নিচে বাধা ভাবনার কোনই সম্বন্ধ নাই। ইহা শব্দযোগে ভাবনা অথবা আমাদের জাগরিছুট বা চেতনরাজ্যহারা ভাবনা সম্বন্ধীয় ভাবনা বটে। জাগরি কথাটির ভার আছে। আমাদের চেতন অবস্থা লইয়া কোন দানব যদি খেলা করিত তবে তাহার সহিত এই অজ্ঞানের তুলনা চলিত। এই অপর মানুষটি সঠিক কে তাহা খুঁজিয়া লওয়াই এক্ষণে মূল সমস্যা। আর এই মানুষ অপর কেহ নহেন, ভাষা হইতে ভাবনা শুরু করিলে আমরা যে সহজ মানুষে আসিয়া পৌঁছিতাম এই মানুষ হুবহু সেই মানুষই।

আপনাদের সমক্ষে বক্তৃতা দিবার উদ্দেশ্য লইয়া এই যৎসামান্য কথা যখন সাজাইতেছিলাম তখন বেশ ভালোমতন ভোর হইয়াছে। জানালার ফাঁক গলাইয়া বল্টিমোর দেখিতেছি। প্রহরটি বড়ই মজার। তখনও ঠিক রোদ উঠিয়া সারে নাই। কিন্তু সময় যে বহিয়া যাইতেছে তাহা একটা নিয়নবাতির বিজ্ঞাপন এক ঠাঁই জ্বলিয়া আর ঠাঁই নিবিয়া আমাকে মিনিটে মিনিটে খবর দিতেছিল। রোজ যে রকম হয় তখনও রাস্তায় রাস্তায় সেই রকমই গাড়িঘোড়ার ভিড় ভারি হইয়াছে। দূরে গাছগাছালি কিছু কিছু চোখে পড়িতেছে। মনে মনে বলিয়া উঠিলাম এই কয়টি গাছের কথা ছাড়িয়া দিলে বলিতে হইবে আমি যাহা কিছু দেখিতে পাইতেছি সব কিছুই আমার ভাবনা যাহা ভাবিতেছে তাহার ফসল। এইখানে লোকজন ঠিক কী কাজে ব্যস্ত তাহা শতে একশত ভাগ পরিষ্কার বুঝা যাইতেছে না। তাহা যাহাই হউক, সহজ মানুষের পরিচয় দিবে বলিয়া লোকে যে দাজায়িন (Dasein) বা তথাবস্তু বলিয়া একটা কথা তুলিয়া থাকে তাহাই হাজির হইয়াছিল এই ক্ষণিকের অতিথি বা পলায়নপর সাক্ষীর মধ্যে। অজ্ঞান কী বস্তু সংক্ষেপে তাহার সবচেয়ে সুন্দর ছবি এই সুবেহ সাদেকের বল্টিমোর শহর।

‘সহজ মানুষ’ কোনখানে থাকেন? যে ‘অ-বশ’ বস্তু হারাইয়া গিয়াছে তাহার রূপেই সহজ মানুষকে পাওয়া যায়, এই সত্য আমল করিতেই হইবে। আরও খুটাইয়া বলিলে বলিতে হইবে ‘সহজ মানুষ’ দাঁড়াইয়া থাকেন এই হারানো অবশ বস্তুর ঘাড়ে ভর দিয়া। অনেক অনেক ক্ষেত্রে দেখিবেন ইহা এমন বিদকুটে বস্তু যাহার কথা আমরা কস্মিনকালেও ভাবি নাই। কোন কোন জায়গায় দেখা যায় ইহা ‘করা হইয়াছে এমন কোন ক্রিয়া’ মাত্র–দুনিয়ার তাবৎ মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারী এবং অনেক অনেক বিশ্লেষিত মানুষও ইহা আচ্ছামত ভাল করিয়াই জানেন। এই কারণেই অনেক মনোবিশ্লেষণবৃত্তিজীবী মনে করেন আমাদের পক্ষে সাধারণ মনোবিজ্ঞানে ফিরিয়া যাওয়াই শ্রেয় হইবে। নিউ ইয়র্ক মনোবিশ্লেষণ সমিতির সভাপতি আমাদিগকে বলিয়াছেন ইহাই কর্তব্য। কিন্তু আমি তো বস্তু বদলাইয়া ফেলিতে পারি না। আমি মনোবিশ্লেষণবৃত্তি করি। তবে কেহ যদি কোন মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক সমীপে হাজির হইতে চাহেন তাহা তাহার নিজ পছন্দের বিষয়। মনোবিজ্ঞানের কথাই যখন উঠিল তখন বলিতেছি, গঠনের সমস্যা কথাটা একলা আমিই ব্যবহার করিতেছি না। অনেক অনেক দিন গুজরান হইয়াছে চিন্তা ও গবেষণা, মায় আবিষ্কার-উদ্ভাবনা যাহাদের বৃত্তি আর যাহারা মন কী জিনিস এই প্রশ্ন লইয়া ব্যাপৃত তাহারাও বছরের পর বছর ধরিয়া বলিয়া আসিতেছেন যে গঠন জিনিসটার সবার চাহিতে ভারি এবং স্বভাবজাত গুণ হইতেছে ‘একভাব’ (unity)। ইহার কোন প্রমাণের ডাক পড়ে না। জীবের অখিলে (real) এই গুণ এমনিতে হাজির ধরিয়া দেখিলে স্বতন্ত্র প্রমাণ দিবার দরকারই পড়ে না। জীব যখন ষোলকলায় পূর্র্ণ তখন সে ‘একভাবুক’ এবং একভাবুক আকারেই তাহার কর্মকাণ্ড চলে। এই ‘একভাব’ ধারণাটি যখন মনের বেলায় খাটাইবার কথা উঠে তখনই সমস্যা গোলযোগে ভরিয়া যায়। কারণ মন আপন স্বরূপে ‘নিখিল’ নহে। কিন্তু আপনারা তো জানেনই বলা হইয়াছিল মন এক না হইলেও ‘মতলবগত একভাব’ আছে। এই ধ্যানধারণার ভিত্তিতেই তো যাহাকে বলা হয় কাণ্ডকারখানার আন্দোলন (phenomenological movement) তাহা সম্ভব হইয়াছিল।

একই কথা পদার্থবিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞানে চলিত তথাকথিত ‘অবয়বপন্থা’ (gestalt) মতবাদ সম্বন্ধেও খাটিত। আর খাটিত ‘সহজ স্বরূপ’ (bonne forme) নামক ধারণার ক্ষেত্রেও। এই ধারণার দৌলতে উদাহরণস্বরূপ এক ফোটা পানির সঙ্গে আরো জটিল ভাবনাচিন্তার সংযোগ ঘটাইয়া দেওয়া। অধিক, বড় বড় মনোবিজ্ঞানীর দল আর এমনকি মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারীরা পর্যন্ত ‘নিখিল ব্যক্তিত্ব’ প্রভৃতি ধারণায় ভরপুর। যাহাই হউক, ‘একতাসাধক একভাব’ সবসময়ই সামনে চলিয়া আসে। আমি কখনোই জিনিসটা কী বুঝিতে পারি নাই। কারণ আমি যদি মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারী হইয়া থাকি আমি তো মনুষ্যসন্তানও বটি আর মনুষ্যসন্তান হিসাবে আমি অভিজ্ঞতা হইতে শিখিয়াছি যে আমার আপন মানব জীবনের প্রধান গুণ একটাই আর তাহা হইল এই জীবন এমন এক জিনিস যাহাকে আমরা ফরাসি ভাষায় বলি বহিয়া যায় (á la dérive)। আমি তো নিশ্চিত এইখানে আপনারা যাঁহারা আছেন তাঁহাদের অভিজ্ঞতাও ইহাই। আর কেহ যদি ইহার সহিত একমত না হইয়া থাকেন আশা করি তিনি হাত উঠাইবেন। জীবন নদীর নাহান বহিয়া যায়, কখনো বা এই তীর স্পর্শ করিল কখনো বা করিল ওই তীর। কখনো এইখানটায় একটুখানি দাঁড়াইল কখনো ওইখানটায়, কিন্তু কেন করিল বা দাঁড়াইল তাহার মাথামুণ্ডুও বুঝিল না–কী ঘটিল তাহার মাথামুণ্ডু কিছু কেহই বুঝিল না। বিশ্লেষণের মূলসূত্র ইহাই। মানব জীবনের ‘একতাসাধক একভাব’ আমার নিকট চিরকালই কলঙ্কজনক মিছাকথা মাত্র মনে হইয়াছে।

এই সকল ব্যাপার কী জিনিস বুঝিয়া উঠিবার প্রয়োজন মিটাইতে হইলে আমরা আরো এক নীতির সাহায্য লইতে পারি। ঘটনা কী তাহা কদাচ অজ্ঞানের দিক হইতে আমরা যে বিচার করিয়া দেখিতে চাহি না তাহারও কারণ আছে। কারণ অজ্ঞান যাহা বলে তাহা শব্দের মধ্যবর্তিতায় ফুটাইয়াই বলিয়া থাকে। আর ইহাদের মূলনীতি কী তাহার সন্ধান হয়তো আমরা লইতে পারি।

আমার প্রস্তাব, আসুন তো ‘একভাব’ ধারণাটি আমরা অন্য আলোক ফেলিয়া দেখি। ‘একতাসাধক একভাব’ নয়, দেখি এক, দুই, তিন প্রভৃতি গণনাসম্ভব ‘একভাব’। পনের বছর ধরিয়া পড়াইবার পর আমি আমার ছাত্রছাত্রীদের বেশির বেশি পাঁচ পর্যন্ত গুণিয়া দেখিতে শিখাইয়াছি। এই পর্যন্ত গোনা বেশ কষ্টের কাজ (চার পর্যন্ত গোনা আর একটু সোজা)। আর তাঁহারাও ঐ পর্যন্তই শিখিয়াছেন। তবে আজ রাত্রে আমাকে আপনাদের অনুমতি লইয়া দুইয়ের মধ্যেই আটক থাকিতে হইবে। এক্ষণে আমরা পূর্ণসংখ্যার কথা কহিতেছি আর পূর্ণসংখ্যার কথা কহাটা বড় সহজ বিষয় নয়। আমার বিশ্বাস এই সভায় সমবেতদের অনেকেরই ইহা জানা জিনিস। দৃষ্টান্ত দিয়া বলিতে, শুদ্ধ দরকার কয়েকপ্রস্ত সেট (set) এবং এক প্রস্ত ’একের বিম্ব এক’ (one to one correspondence) গণিবার নীতি। যেমন ধরা যাউক, এই ঘরে যতটা পিঁড়ি আছে ঠিক ততজন মানুষ বসিয়া আছেন কথাটা সত্য। কিন্তু ‘পূর্ণসংখ্যা’ কিংবা যাহাকে বলি ‘স্বাভাবিক সংখ্যা’ তাহা হইতে হইলে পূর্বসংখ্যাযোগে গঠিত কোন সংগ্রহের ডাক পড়িবেই। বলা নিষ্প্রয়োজন ইহা একাংশে হইলেও ‘স্বাভাবিক’ (natural) তবে শুদ্ধ এই অর্থেই যে ইহা কী কারণে আছে তাহা আমাদের বুদ্ধির অগম্য। গণনা জিনিসটা ‘অভিজ্ঞতানির্ভর সত্য’ নয় আর শুদ্ধ অভিজ্ঞতাজাত তথ্য হইতে গণনাকর্মের সৃষ্টি হইয়াছে ইহা প্রমাণ করাও অসম্ভব। হিয়ুম (Hume) সেই চেষ্টা করিয়াছিলেন কিন্তু ফ্রেগে (Frege) নিখুঁত পদ্ধতিতে প্রমাণ করিয়াছেন এই চেষ্টা অপরিপক্কতারই প্রমাণস্বরূপ। পূর্ণসংখ্যা মাত্রই একেকটা স্বনির্ভর একক। সমস্যার আসল ভিত্তি এই সত্যেই পাওয়া যাইবে। আমরা যদি এই সংখ্যাকেই একক ধরিয়া লই তো বেশ মজাই হয়। ধরা যাউক পুরুষ আর নারী–পিরিতির সহিত যোগ হইল ‘একভাব’! কিন্তু কিছুক্ষণ যাইতেই সব শেষ। এই দুইজনের পর আর কেহ রহিল না। হয়তো একটা শিশু আসিল, কিন্তু ততক্ষণে আমরা অন্য স্তরে পৌঁছিয়া গেলাম। আর তিনের জন্ম দেওয়া সে তো এক স্বতন্ত্র অধ্যায়। আমরা যখন সংখ্যা বিষয়ে গণিতবিদের প্রস্তাবাদি পড়িয়া দেখিবার চেষ্টা করি তখন দেখিতে পাই সকল প্রস্তাবের গোড়ায় এক সূত্র: [নতুন সংখ্যা পাইতে হইলে] যে কোন পূর্ণসংখ্যার সহিত ১ সংখ্যাটি যোগ করিতে হইবে, ‘n+১’ বা [n+1]। সংখ্যার জন্ম কী উপায়ে হয় তাহার চাবি এই ‘যোগ এক’ কথার মধ্যেই আছে। আর আমি প্রস্তাব করিতেছি এই ‘যোগ করিয়া একভাব’ করিবার পদ্ধতি যাহার গুণে দুই তৈরি হয় তাহা বাদ দিয়া আমরা দুই সংখ্যাটির সংখ্যাস্বরূপ অখিল (real) জন্ম কীভাবে হয় দেখিব।

এই দুইকে যাহার এখনও জন্মই হয় নাই এমন পহিলা পূর্ণসংখ্যা হইতে হইবে খোদ দুইয়ের আবির্ভাবের আগেভাগেই। ইহা সম্ভব হইতেছে কারণ আমরা দেখিয়াছি পহিলা ‘এক’ সংখ্যার আবির্ভাব মানিয়া লইবার ওয়াস্তে এক্ষণে ‘দুই’ আসিয়া বসিয়াছে। ‘এক’ সংখ্যার জায়গায় ‘দুই’ বসাইলেন আর ফলস্বরূপ দেখিলেন ‘দুই’ সংখ্যার জায়গায় ‘তিন’ আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। এই স্থলে আমরা যাহা দেখিলাম তাহার নাম আমি রাখিয়াছি দাগ (mark)। তাহা হইলে আমরা দেখিব কিছু জিনিস থাকিল যাহাতে যাহাতে দাগ দেওয়া হইয়াছে আর কিছু জিনিস থাকিল যাহাতে দাগ দেওয়া হয় নাই। পহিলা যে দাগ দেওয়া হইল তাহা হইতে আমরা ঘটনার জন্ম দেখিলাম। হুবহু এই পথেই ফ্রেগে সংখ্যার জন্মকাহিনী ব্যাখ্যা করিয়াছেন। যে শ্রেণীতে কোন অংকুর (elements) নাই তাহাকেই পহিলা শ্রেণী কহে। এইভাবে শূন্যের জায়গায় ‘এক’ আসিল আর তাহার পর একের জায়গাটি কী করিয়া দোসরা জায়গা বনিয়া গেল তাহা সহজেই বুঝা যাইতেছে। এই ক্রমে ‘দুই’, ‘তিন’ ও অন্যান্য সংখ্যার জায়গা বদল হইল। আমাদের হিসাব অনুসারে এই দুইয়ের সমস্যাই সহজ মানুষ সমস্যার রূপ বটে। আর দুইয়ের জন্ম হইয়াছে একের সহিত এক যোগে, একের অভাব পূর্ণ করিয়া নয়, বরং একের জন্ম দিবার খাতিরে একের পুনরাবৃত্তি ঘটাইয়া। ইহা সত্য হইলে আমরা মনোবিশ্লেষণের অভিজ্ঞতা হইতে যে সত্য জানিতে পারিয়াছি তাহারই সমক্ষে হাজির হইলাম। ‘অজ্ঞান মানুষ’ এমনই চিজ যাহা নিজের আবর্তন ঘটাইবার দিকে ঝুঁকিয়াই থাকে, আর শুদ্ধ ‘এক’ আবর্তন হইলেই হইল, উহার জন্ম হইবে। যাহাই হউক একদফা আবর্তন দেখিতে হইলে আমাদের দেখা দরকার পহিলা ঘটনার পুনরাবর্তন ঘটাইতে দোসরা ঘটনার যে যে গুণ না থাকিলেই নহে তাহা কী কী। আমরা যদি তাড়াহুড়া করিয়া জবাব দিই তো বলিব দরকার দুই ঘটনার এক রকম হওয়া। যদি তাহাই হইত তবে দুইয়ের নিয়মটা হইত যমজেরই নিয়ম। যদি তাহাই সত্য হয় তো ত্রয়ীর কিংবা চতুরঙ্গের নিয়মই বা হইবে না কেন? আমাদের যুগে আমরা ছেলেমেয়েদের শিখাইতাম, ধরা যাউক মাইকের সহিত অভিধান যোগ করা চলিবে না। তবে এই শিক্ষাটা একেবারেই আজগুবি শিক্ষা। কারণ মানুষ যদি মাইকের সহিত অভিধান কিম্বা লুইস ক্যারলের ভাষ্য মোতাবেক বলিলে রাজার লগে বাধাকপি যোগ করিতে না পারিবে তো যোগ করিবার কিছুই তো থাকিবে না। যাহার দৌলতে এক বস্তুর সহিত অন্য বস্তুর প্রভেদটা হিসাবে না লইয়া যোগ সম্ভব হয় সেই অভিন্নতার বাস বস্তুতে নাই, আছে ঐ দাগে (বা মার্কায়)। এই দাগের কল্যাণেই প্রভেদটা যেন ঘষিয়া উঠাইয়া ফেলা হইয়াছে এমত অবস্থা হয়। পুনরাবর্তন হইবার সময় সহজ মানুষের, অজ্ঞান সহজ মানুষের ঘটে যাহা ঘটে ইহা তাহারই চাবিকাঠি। কারণ আমরা জানি ‘সহজ মানুষ’ নিদারুণ অর্থময় কিছু একটার পুনরাবর্তন করে। উদাহরণ দিয়া বলিতে, এই যে বস্তুকে আমরা কখনও কখনও বলি বিভীষিকা (‘ট্রমা’) কিম্বা ‘চরম পুলক’ সেই অদৃশ্য বস্তুর মধ্যে সহজ মানুষ হাজির থাকে। কী ঘটে সেই সংকটে? যদি ‘মাল’টা এই আকারে জগতে বিরাজ করে, এই একত্ববোধক লক্ষণটাই যদি হয় শেষ কথা, তাহা হইলে অভিন্নতার লক্ষণ এই জায়গায় বিলক্ষণ আছে। এক্ষণে আমার মধ্যে যে ‘মাল’টা খুঁজিয়া বেড়ান হইতেছে তাহা পাইতে হইলে পহিলা দাগটা ঘষিয়া উঠাইয়া ফেলাইতে হইবে। কেননা এই দাগটা আজ তো আজকেই ছিল ঘষামাজার ফলস্বরূপ। সকল ভেদ উঠাইয়া দেওয়ার নামই তো ছিল এইটা আর এই লক্ষণ না হইত তো পহিলা ‘মাল’ই হইয়া যাইত লাপাত্তা। আকারে যাহা অভিন্ন তাহার পুনরাবর্তনকেই যদি পুনরাবর্তনের সারকথা বলা হয় তো তেমন পুনরাবর্তন অসম্ভব, পুনরাবর্তনের রীতিহীনতার রহস্য এইখানেই। যাহাই হউক মানুষ এই পুনরাবর্তনেরই ফলস্বরূপ। কারণ ইহার ফলে সহজ মানুষের প্রথম ভিত্তিটাই হাওয়া হইয়া যাইতে, রদ হইতে বাধ্য হয়। ইহাই সেই কারণ যাহার বলে সহজ মানুষ মাত্রই–অবস্থানের গুণে–বিভক্ত ভাবস্বরূপ হাজির থাকে। আমি ক্ষান্তিহীন বলিব এই লক্ষণ অভিন্ন­তারই লক্ষণ। তবে ইহার ফলে যাহা নিশ্চিত হইতেছে তাহা শুদ্ধ অভিন্নতারই ভিন্নতা। ইহা হইতেছে অভিন্নতা কি ভিন্নতার ফল আকারে নয়, হইতেছে বরং ‘অভিন্নতারই ভিন্নতার’ মধ্যবর্তিতায়। ইহা বুঝিতে পারা সহজ। যথা ফরাসি ভাষায় আমরা বলিয়া থাকি ‘আমি আপনাদের নম্বর মারিলাম’ (Je vous numérotte)। আমি আপনাদের সবাইকে একটি একটি করিয়া নম্বর বাঁটিয়া দিলাম, আর ইহার ফলে একটা জিনিস নিশ্চিত হওয়া গেল আপনারা সকলেই আলাদা তবে শুদ্ধ নম্বরের বিচারে। অন্য কোন দিকবিচারে নয়।

যাহা ‘একই সঙ্গে’ এক কিংবা ‘দুখণ্ডে’ বটে এমন কোন কিছুর মধ্যে এই লক্ষণটা আছে তাহা প্রমাণ করিবার নিমিত্ত আমরা সহজ বুদ্ধির কাছে কোন প্রস্তাব তুলিয়া ধরিতে পারি? নিচের রেখাচিত্রাটির কথাই ভাবা যাক, সুপরিচিত একটি ছবির আদলে আমি ইহার নাম রাখিয়াছি উল্টা আট: [বঙ্গভাষায় উল্টা চার–অনু.]

8.jpg

দেখিতেই পাইতেছেন এইখানের রেখাটিকে একই সঙ্গে এক রেখা বা দুই রেখা উভয়ই গণ্য করা যাইতে পারে। যে আদ্যস্থলে, যে গিরায় সহজ মানুষ গঠিত হয় ইহাকে সেই অকুস্থলেরই অপরিহার্য লিপি বলিয়া ধরা যাইতে পারে। আমরা পহিলা পহিলা যতখানি ভাবিতে পারি ইহার হাত তাহা হইতে অনেক দূর বেশি যাইতে পারে, কারণ আমরা এই ধরণের লিপি খোদাই করার মতন উপরিতলের সন্ধানে বাহির হইয়া পড়িতে পারি। আমরা হয়তো বুঝিতে পারিব নিখিল অর্থে ব্যবহার করা পুরানা প্রতীক–মণ্ডল (the sphere)–দিয়া এখানে কাজ চলিবে না। কোন বৃষ (torus), কোন বোতল (Klein bottle), আড়াআড়ি কাটা উপরিতল (cross-cut surface) এইভাবে কাটিয়া দেখান যায়। এই বৈচিত্র্যের মূল্য আছে। কেননা ইহাতে মনে রোগ কিভাবে গঠিত হয় তাহার ব্যাখ্যা মিলিবে। এই গোড়াকার কাটাদাগের সাহায্যে যদি ‘সহজ মানুষ’ আকার পায়, তবে একই উপায়ে প্রমাণ করা যায় কোন বৃষ কাটিলে ‘স্নায়ুরোগগ্রস্ত সহজ মানুষে’র (neurotic subject) আর ‘আড়াআড়ি কাটা উপরিতল’ কাটিলে অন্য কোন মনোব্যাধির সহিত মিলিয়া যাইবে। আজ রাত্রে আপনাদের সমক্ষে আমি ইহার ব্যাখ্যা দিতেছি না, তবে এই দুরূহ বক্তৃতার সমাপ্তি টানিতে হইলে আমাকে নিচের সারসংক্ষেপটি পেশ করিতেই হইবে।

পূর্ণসংখ্যাধারার গোড়ার দিকটাই শুদ্ধ আমি হিসাবে লইলাম, কারণ ইহা ভাষা ও অখিলের মাঝখানকার বিন্দু বটে। ‘এক’ এবং ‘এক যোগ’ ব্যাখ্যাচ্ছলে আমি যে জাতের লক্ষণ কাজে লাগাইলাম ভাষাও সেই একই লক্ষণ যোগেই গঠিত হইয়াছে। পার্থক্যের মধ্যে ভাষার এই লক্ষণ আর একভাবাপন্ন লক্ষণ (unitary trait) ঠিক এক বস্তু নহে, কারণ আমাদের ভাষায় ভেদভিত্তিক অনেক লক্ষণের একত্র সমাবেশ আছে। কথাটা অন্যভাবে বলি তো বলা যায় ভাষা গড়া হইয়াছে এক দঙ্গল পদ–যেমন বা, তা, পা, ইতি আদি, ইতি আদি লইয়া। দঙ্গলটির সীমা আছে। সহজ মানুষের চলার পথ কাটিতে যাহা লাগে পদমাত্রই তাহা যোগাইতে পারে। আর পদে পদে সম্পর্কের বেলায় যাহা সামান্য সত্য পূর্ণসংখ্যার চলার পথ তাহারই বিশেষ রূপ মাত্র, এই কথা সত্য হওয়ার সম্ভাবনাই সমুদয় বটে। আমি যাহাকে পরম বলিতেছি তাহা গঠিত হইয়াছে এই পদাবলী দিয়াই। ইহা তাহার সংজ্ঞা বটে। ভাষার কারণে যে ভেদটা সম্ভব হইয়াছে তাহা এই: পদ মাত্রই বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিজের কাছ হইতে নিজে অভিন্ন নয় (পূর্ণ সংখ্যার একভাবাপন্ন লক্ষণ ইহার বিপরীত)। ইহার বিশেষ কারণও এই যে অনেক পদের একত্র সমাবেশই ভাষা। আর এই সমাবেশে কোন ‘পদ’ (signifier) নিজ ‘পদার্থের’ (signified) ‘পদ’ হইতে পারে আবার নাও হইতে পারে। এই সুপরিচিত সত্যটিই রাসেলের (Russel) ধাঁধার মূলসূত্র। যে সকল অংকুর (elements) নিজ নিজ দঙ্গলের অংশ নয় তাহাদিগকে শরিক করিয়া নতুন কোন দঙ্গল গঠন করিলে আমরা যে ধাঁধায় পড়িব তাহার পরিণতিতে আমরা জানি ‘কথার সহিত কথার বিরোধ’ (contradiction) তৈয়ার হয়। ইহার অর্থ, সহজ কথায়, শুদ্ধ বাক্যের নিখিলে এমন কিছু থাকতে পারিবে না যাহাতে সকল কিছু রহিয়াছে। আর যে ফাঁকের দৌলতে ‘সহজ মানুষ’ গঠিত হয় এইখানে আরো একবার তাহার দেখা মিলিতেছে। ‘সহজ মানুষ’ মানেই হইতেছে অখিলের মধ্যে খিল ঢুকাইয়া দেওয়া (introduction of a loss in reality)। অথচ ইহা হইতেই পারে না। কেননা সংজ্ঞার গুণেই অখিল বলিতে বুঝায় ‘যাহাতে খিল নাই’ (যাহা যতদূর সম্ভব ততদূরই ভরাট বটে)। খিলের ধারণাটি সম্ভব হইয়াছে সেই লক্ষণের গুণে যাহা আমাদের সৃষ্ট অক্ষরের দৌলতে এক প্রস্ত অভাবের নির্ধারিত স্থান। এই যেমন a1, a2, a3 প্রভৃতি বৈ নয়। আর ‘স্থান’ (space) মানে তো ফাঁকই। ‘সহজ মানুষ’ যখন অভাবের জায়গাটি দখল করেন, তখন শব্দের ভিতর খিল ঢুকিয়া যায়। আর ইহা সহজ মানুষের সংজ্ঞাও বটে।

xex-1.jpg

তবে ইহা যদি লিখিবার আবশ্যক করে তো ইহার সংজ্ঞা বাধিতে হইবে ভাষার মণ্ডলজোড়া বৃত্তের আওতায়। এই বৃত্তের নাম আমি রাখিয়াছি পরকীয়া (otherness)। এ জগতে যাহা কিছু ভাষাপদবাচ্য তাহার সবকিছুই এই পরকীয়ারই আলো আর সেই কারণেই সহজ মানুষ সবসময়ই এই পদাবলী বাদিনীর তলায় তলায় পলায়নপর চির অপসৃয়মান বস্তুস্বরূপ। কারণ পদের সংজ্ঞাই এমন: যাহা সহজ মানুষের হইয়া সহজ মানুষের সঙ্গে যায় না, যায় অন্য এক পদের সঙ্গে তাহাকেই পদ কহে। ফল এই দাঁড়ায় যে সহজ মানুষ উধাও হইয়া যায়। দুই প্রস্ত একভাবাপন্ন লক্ষণের ক্ষেত্রেও হুবহু একই ঘটনা ঘটে। আর এই সময় যাহাকে বলা হইতেছে অর্থ বা পদার্থ তাহার আবির্ভাব ঘটে দুই নম্বর পদটির আবডালে এবং ইহার পর এই ক্রম ধরিয়া আর আর পদ ও পদার্থের আবির্ভাব চলিতে থাকে।

হারাইয়া যাইতে যাইতেও ‘সহজ মানুষ’ কল্পনার ফানুস বলিয়া পরিচিত এই অত্যাশ্চর্য বস্তুর সাক্ষাত কোন না কোন উপায়ে লিপ্ত থাকিয়া আরও একবার নিজেকে খোঁজার জন্য আকুল হয়। ‘বিষয় বাসনা’ (desire) ইহারই অপর নাম। এই সাধনা জিগাইয়া রাখে সেই বস্তু যাহার নাম আমি রাখিয়াছি হারান সম্ভার (lost object)। ইহার নাম বিসমিল্লায়ই লইয়াছিলাম–ইহার নাম লইতেও ভয়ে কল্পনার হাত না সাধাইয়া যায়। আর ইহার জন্ম ও লালন-পালন এই স্থলেই ঘটে। আমার শব্দ তালিকায় ইহারই নাম হইয়াছে ছোট ছাদের a সম্ভার (object a)। ইহার কথা মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারী মাত্রই ভালো করিয়া জানিবেন। কেন না মনোবিশ্লেষণবিদ্যা আদ্যোপান্ত খাড়াও হইয়াছে এই নিদারুণ সম্ভারের কাঁধে ভর করিয়াই। আমাদের এই নিষেধাজ্ঞাধীন সহজ মানুষের সহিত এই a সম্ভারের সম্পর্ক-কাঠামো সবসময়ই ফানুসের তলায় থাকে আর এই ফানুস থাকে বাসনার তলায়। কেন না বাসনা আর কিছু নয়। শুদ্ধ যাহার নাম রাখিয়াছি সমস্ত অর্থের অনন্তনাম (metonymie, metonymy) ইহা তাহারই অপর নাম।

এই সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় মনোবিশ্লেষণবৃত্তির অখিলে গঠন বলিয়া কোন জিনিস বিরাজ করিতেছে তাহা আপনাদিগকে দেখাইবার চেষ্টা করিয়াছি। তবে ‘সাকার’ ও ‘আকার’ প্রভৃতি দিক সম্পর্কে আমি কিছুই বলি নাই। মনের জীবন যে জীবনের বা অভিজ্ঞতার জগত দিয়া পার হয় তাহার ভিতর আকারের বন্ধন কীভাবে ঢুকিয়া পড়ে তাহা বুঝিয়া লওয়ার কোন বিকল্প নাই। এই কথা না বলিলেও চলিত। কিন্তু আজ রাত্রে আমার এই ব্যাখ্যা দেওয়ার উপায় নাই। তবে পুরানা বলিয়া জ্ঞাত এই ‘সহজ মানুষ’ সম্বন্ধে সবার তুলনায় কম জানা অথচ সবার তুলনায় বেশি নিশ্চিত একটি সত্যকথা ভাবিয়া দেখিবেন। জীবিত প্রাণীর জীবনপর্বের ইহাই অর্থপূর্ণ দিক। এই অন্তহীন জিনিসটা জীবন ও মরণের সীমানার মধ্যে কিছু একটার স্বাদ পাইতে সক্ষম। বিষাদ ও হর্ষের মধ্যখানকার পুরা বর্ণালিটা জুড়িয়া থাকিতেও ইহা সক্ষম। ইহাকে আমরা ফরাসি জবানে বলিয়া থাকি ‘সহজানন্দ’ (sujet de jouissance)।

আজ বিকালবেলা এই জায়গায় আসিবার পথে ছোট্ট নিয়ন বাতির বিজ্ঞাপনে দেখিলাম লেখা রহিয়াছে, ‘এনজয় কোকো-কোলা’ [অর্থাৎ কোকা-কোলার মজা মার]। ইহা দেখিয়া মনে পড়িল, যতদূর জানি, ফরাসি ‘জুয়িসঁস’ (পুলক/আনন্দ) কিংবা ল্যাটিন ভাষার ‘ফ্রূয়র’ (fruor) শব্দে পদার্থের যে বিশাল ভার বহন করা হয় তাহার যথার্থ প্রকাশক্ষম পদ ইংরেজি ভাষায় পাওয়া যাইতেছে না। জুয়ির [Jouir] শব্দের অর্থ আমি অভিধান খুলিয়া দেখিয়াছি। দেখিয়াছি ইহার অর্থ দেওয়া হইয়াছে ‘টু পজেস, টু ইয়ুজ’ [অর্থাৎ দখলে লওয়ার, ভোগ-ব্যবহার করার] কিন্তু ইহার অর্থ আদৌ তাহা নয়। প্রাণধারী জীব যদি আদৌ ভাবিবার মতন কোন ভাব হইয়া থাকে, তো সব কিছু ছাড়াইয়া তাহার পরিচয় হইবে আনন্দের নন্দন [বা আনন্দের সহজ মানুষ]। তবে, দুঃখের মধ্যে, বেশিক্ষণ না যাইতেই দেখা যাইবে মনোবিশ্লেষণের যে বিধির নাম হইয়াছে আনন্দসূত্র (যাহা প্রকৃত প্রস্তাবে শুদ্ধ নিরানন্দসূত্র বৈ নয়) যাবত আনন্দের পথ আগলাইয়া দাঁড়াইয়াছে।

যদি এমত হয় যে মজা মারিতে মারিতে আমি একটু মাত্রা ছাড়াইয়া গেলাম, অমনি কথা শুরু হইয়া যায়, ফলে আমি আমার আনন্দ খানিক কমাইয়া আনি। জীবদেহ মনে হয় এমনভাবেই বানান হইয়াছে যাহা অতি মাত্রার আনন্দ এড়াইয়া যায়। আমাদের দেহের গঠন যদি এহেন মজার জিনিস না হইত তো আমরা সকলেই হয়তো ঝিনুকের মতন নিরব হইয়া থাকিতাম, এই গঠনই আমাদের আনন্দপক্ষের আমল ভাঙ্গিতে বাধ্য করে কিংবা আমাদিগকে শুদ্ধ এই আমলের উপর জোর করিবার আর ভাঙ্গিয়া ফেলিবার খোয়াব দেখাইয়া থাকে। পরমের সঙ্গে সম্বন্ধসূত্রে আবদ্ধ পদের মাপকাঠি বরাবর সহজের গঠন হইতে ইহার বিস্তার ঘটে আর এই গঠনের গোড়া পোতা থাকে ভাষায়। শুদ্ধ ইহার কারণেই বাসনার পূর্ণ বৈচিত্র্য পাখা মেলিবার অবকাশ পায়। ফলে আমরা এই জাতীয় নিষিদ্ধ আনন্দের (জুয়িসঁস) কাছাকাছি যাইবার, যাচাই করিবার সুযোগ পাই। ইহাই আমাদের জীবনের একমাত্র অর্থ যাহার একলা মূল্য আছে।

আলোচনা

আঙ্গুস ফ্লেচার 
ফ্রয়েড সত্য সত্য ছিলেন খুবই সরল মানুষ। তবে মানুষের নানান সমস্যার বিচিত্র সমাধান তিনি খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন। মানুষের জটিলতা ও সমস্যার ব্যাখ্যা প্রদানের খাতিরে তিনি কখনো কখনো মিথ ব্যবহার করিয়াছেন। যথা: নার্সিসাস মিথ। উনি দেখিলেন কিছু কিছু মনুষ্য আছেন যাহারা আয়নায় আপন মুখ দেখেন আর নিজেরা নিজেদের সঙ্গে প্রেম করেন। ব্যাপারটা এমনই সহজ। তিনি শব্দের উপরিতলে উপরিতলে ভাসিবার চেষ্টা করেন নাই। আপনি যাহা করিতেছেন তাহা মাকড়সার মতন: আপনি ভারি মিহি যে জালটা বানাইতেছেন তাহার সঙ্গে মানুষের কোন সত্য সম্পর্ক নাই। যেমন আপনি ‘মজা’র কথা বলিলেন। ফরাসি ভাষায় ‘জুয়ির’ (jouir) কথাটির এক অর্থ ‘চরম পুলক’–ইহা বলিবেন না কেন? আমার মনে হয় ইহাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে যাহা কিছু শুনিলাম সবই এহেন কায়াহীন কথা…। সমস্যাটা এখানে মনোবিশ্লেষণের নয়। মনোবিশ্লেষণের মূল্য এইখানে যে ইহা মনোবিশ্লেষণের গতি বিষয়ে প্রস্তাবনাস্বরূপ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হইয়াছে পরে, বিশেষ বলিতে বিলহেলম রাইখের কাজ। এতসব অতিপদার্থবিদ্যার (metaphysics) কোনই দরকার নাই। আপনার চিত্রলেখাটি (diagram) খুবই মজার হইয়াছে, তবে ইহার সহিত আমাদের কাজকর্মের, খাওয়া দাওয়া, রতি সহবাস ইতি আদির কোনই সংযোগ তো নাই।

হ্যারি উলফ
আমি জিজ্ঞাসা করিতে চাই এই গোড়ালি পাটিগণিত (fundamental arithmetic) আর এই স্থানবিদ্যাও (topology) এক জাতীয় মিথ কি না, নাকি মানস-জীবন ব্যাখ্যার খাতিরে এক প্রকার তুলনার প্রস্তাব মাত্র?

জাক লাকাঁ
কিসের সহিত তুলনা? ‘S’ বলিতে এমন কিছু বোঝায় যাহা হুবহু এই S আকারে লেখা চলে। আমি বলিতেছি এই ‘S’ যাহা দিয়া সহজ মানুষ বুঝান হইতেছে তাহা সাধিত ক্ষতি বুঝাইবার উপযোগী এক জাতীয় হাতিয়ার, কিন্তু ‘সহজ মানুষ’ হিসাবে আমি (এবং আমি নিজেও) যাহা হারাইয়াছি তাহা। অন্য কথায় বলিতে, একদিকে আছে এমন কিছু যাহার খচিত অর্থ আছে আর অন্যদিকে আছে আমার ব্যবহৃত কথার ধারা যাহা দিয়া আমি আপনি যেখানে আছেন সেখানে পোঁছাইতে চাইতেছি। এই দুইয়ের মধ্যে একটা ফাঁক (বা খিল) আছে। আপনাকে এখানে আরেকজন সহজ মানুষরূপে ধরি নাই, ধরিয়াছি আমার কথা শুনিয়া বুঝিতে পারিবেন এহেন মানুষ হিসাবে। উপমানটা কোনখানে? এই ক্ষতিটা হয় হইয়াছে কিম্বা হয় নাই। যদি হইয়া থাকে তবে তাহা বুঝাইতে হইবে একপ্রস্ত প্রতীক দিয়া। যাহাই হউক, প্রতীকায়ন না ঘটাইবা পর্যন্ত এই ক্ষতিটার অস্তিত্বই নাই। ইহা তো তুলনা নয়। প্রকৃত প্রস্তাবে ইহা অখিল জগতের কোন না কোন ভাগে, এই ধরনের বৃষে আছে। এই বৃষ আসলেই আছে আর স্নায়ুরোগীর গঠন হুবহু এইটাই। ইহা উপমান নহে। এমনকি ইহা কায়াহীনও নহে, কারণ কায়াহীন মানে তো অখিল জগত হইতে কিছ না কিছু বিয়োগ করাও বুঝাইতেছে। আমার মনে হয় ইহাই খোদ অখিল।

নর্মান হলান্ড
আমি লাকাঁ সাহেবের পক্ষ লইয়া বলিতে চাই। আমার মনে হয় ওঁ চাইছেন খুব ভালো একটা কিছু করিতে। আমি এই আলোচনা সভার আগেভাগেই তাঁহার প্রবন্ধ পড়িলাম। ইহার আগে আমি ওঁর কোন লেখা পড়ি নাই। মনে হইতেছে তিনি ফ্রয়েডের লেখা ‘বিজ্ঞানভিত্তিক মনোবিজ্ঞান প্রকল্প’ (Project for a Scientific Psychology) বরাবর ফিরিয়া গিয়াছেন। মনোবিজ্ঞান বিষয়ে ইহাই ফ্রয়েডের পহিলা লেখা। ইহাও খুব কায়াহীন ছিল এবং আপনি এখানে আপনি যাহা লিখিয়াছেন তাহার মতনই ছিল। অবশ্য আপনি বীজগণিতের সাহায্য লইতেছেন আর উনি নিউরনের আশ্রয় লইয়াছিলেন, এই রচনার প্রভাব ‘খাবনামা’, ‘ফ্লিস সমীপে চিঠিপত্র’সহ তাঁদের প্রথম বয়সের সমস্ত লেখায় সর্বত্র পরিব্যাপ্ত, যদিও সেই প্রভাব অনেক সময় কেবল উহ্য রহিয়াছে।

এন্টনি ওয়াইল্ডেন
আমি কিছু কথা যোগ করিতে চাহিয়াতেছি। আপনার বক্তৃতার গোড়ায় আপনি অস্বীকার বা অস্বীকৃতির [মেকোনাসঁসের] ব্যাখ্যা করিয়াছিলেন। আর আমরা ইহার এমন একপ্রস্ত চরম দৃষ্টান্ত হইতে শুরু করিয়াছি যে ইহা হইতে কী করিয়া বাহির হইব বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না। আপনি কিন্তু শুরু করিয়াছেন আপনার চিন্তার একেবারে মাথা হইতে (আপনার চিন্তার সবচেয়ে কঠিন জায়গা হইতে) আর ইহার গোড়াটা কী রকম ছিল তাহা খুঁজিয়া বাহির করা আমাদের পক্ষে সাংঘাতিক কঠিন। এই চিন্তা খুবই ধনশালী এবং খুবই গভীরে ইহার মূল। আমি আপনার লেখা কষ্ট করিয়া তর্জমা করিয়া থাকি, সেই অভিজ্ঞতা হইতে বলিতে পারি ফ্রয়েডের সহিত আপনি একফোঁটাও বেঈমানি করেন নাই। আজ রাত্রে এইখানে আমরা অনেক আবোল তাবোল বকিব সন্দেহ নাই–তবে এহেন বকাবকির আগে আমাদের উচিত আপনার লেখা ভালো করিয়া পড়িয়া দেখা। ইহার অন্যথা না করাই উচিত। তাহারা আগে আপনার লেখা পড়িয়া দেখুন, তারপর ফ্রয়েড পড়ুন সমবেত ভদ্রমহোদয়গণ সমীপে এই মিনতি করি।

রিচার্ড শেচনার
শূন্যতা সম্বন্ধে আপনার চিন্তার সহিত হুসার্ল (Husserl) এবং সার্ত্রের (Sartre) লেখার সম্পর্ক কী?

লাঁকা
আপনি যে শব্দটি ব্যবহার করিয়াছেন, সেই শূন্যতা সম্বন্ধে আমার মনে হয় না আমি বিশেষ কিছু বলিতে পারিব। হুসার্ল সম্পর্কেও পারিব না, সার্ত্র সম্পর্কেও না। সত্য সত্যই, আমার মনে হয় না আমি শূন্যতা সম্বন্ধে বিশেষ কিছু বলিয়াছি। গড়াইয়া যাওয়া এবং ধরিতে কঠিন হওয়া, কখনো কোথায়ও না থাকা (আমি যখন ঐখানে খুঁজি তখন উহা এইখানে; আর আমি যখন এইখানে) মানে শূন্যতা নয়। আমার বক্তৃতাসভার (Seminar) তালিকায় এই বৎসর আমি যে বস্তুর নাম রাখিয়াছি ‘উদ্ভট কল্পনার যুক্তি’ সেই বিষয়যোগের ঘোষণা দিব। মনে হইতেছে আমার চেষ্টার বেশির ভাগই নিয়োজিত হইবে নানান ধরনের খিল, নানান ধরনের খোয়া, নানান শূন্যতার সংজ্ঞা ঠিক করার পিছনে। এইগুলি একেকটা একেক জাতের, কোনই মিল নাই একটার সহিত অন্যটার। অনুপস্থিতির কথাই ধরুন না কেন? রাণীর অনুপস্থিতি, এই ধরণের অংকুরের সহিত কিছু একটা যোগ করিতে হয় কিন্তু রাণীর অনুপস্থিতি অস্বীকার করিতে হইলে…। আমার ধারণা নিছক শূন্যতা ধারণাটির অস্পষ্টতা এই প্রসঙ্গে কোন কাজে আসিবে না। আমার নিজেরই উধাও হইবার আগে আমাকে যাহা করিতে হইবে, সব কিছুতেই আমার দেরি হইয়া যায়। তবে করিবার মতন কাজটি আগাইয়া নেওয়াও কম কঠিনও নয়। এক ধাপে এক একটা করিয়া আগাইবার দরকার আছে। এখন আমি এই নানান ধরনের ‘অভাব’ (lack) লইয়া আলোচনা করিব।

[কট সাহেব ও ডা: লাঁকা দেওয়ালপটযোগে মোবিয়ুস ফিতার (Möbius strip) নানান বৈশিষ্ট্য লইয়া আলোচনা করিলেন]

ইয়ান কট
একটা মজার জিনিস আছে এইখানে। হয়তো ইহা আপতিক। এই সকল ব্রত (motifs) অন্যবস্তুবাদী (surrealist) ছবিতে দেখিতে পাই। ইহাদের মধ্যে কোন ধরনের সম্পর্ক আছে কি?

লাকাঁ
অন্যবস্তুবাদী ছবির সহিত মনে হয় কমসে কম আমার একটা আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে।

পুলে
এই অবশের খোঁয়ারি যাহার কারণে সহজের আবির্ভাব ঘটে আপনি কি ইহার সহিত সার্ত্রের চিন্তার অন্তর্গত নাস্তি [le neant] জিনিসটায় কোন প্রকার যোগ আছে মনে করেন? প্রুস্তের রচনার গোড়ার দিকে দেখা যায় ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগিয়া উঠিল, তাহার অবস্থার সহিত ইহার তুলনা দেওয়া কি যাইতে পারে? আমাদের মনে পড়ে স্বপ্ন দেখিতে লোকটি জাগিয়া উঠিল আর দেখিল কি যেন হারাইয়াছে। কি যেন নাই। বড় কথা সে নিজে নাই। ইহার সহিত কোন তুলনা কি চলে?

লাকাঁ
আমার ধারণা প্রুস্ত বহুবারই অজ্ঞানের কয়েকরকম অভিজ্ঞতার কাছাকাছি পোঁছেছিলেন। প্রুস্তের লেখায় এমন অনেক পৃষ্ঠাব্যাপী বা কাছাকাছি বিস্তৃত অংশ পাওয়া যায় যাহা সহজেই আলাদা (découper) করা যাইবে। আমার মনে হয় আপনার ধারণাই সঠিক। প্রুস্ত প্রায় কাছাকাছি চলে যান, তবে তিনি প্রস্তাব আকারে ইহার বিস্তার না ঘটাইয়া নিজের ব্যবসায়–মানে সাহিত্যে–ফিরিয়া আসেন। উদাহরণ লওয়া যাইতে পারে কুমারী ভঁতুইয়ের, বয়ানকার যে দৃষ্টিতে তাহাকে তাহার বন্ধু ও তাহার বাবার ছবি হাতে দেখেছেন তাহার কথা বলিতেছি। আমার মনে হয় না আর কোন সাহিত্যশিল্পী কখনো এহেন ছবি আঁকিয়াছেন। হইতে পারে ইহা হইয়াছে তাহার খোদ কর্মপরিকল্পনার সময় পুনরুদ্ধারের এই আলিশান কর্মকাণ্ডের স্বভাব অনুযায়ী। এই প্রকল্পই তাহাকে পথ দেখাইয়াছে, এমনকি জ্ঞান যতদূর পর্যন্ত যাইবার সাধ্য রাখে তাহার বাহিরেও দেখাইয়াছে।

সিগমুন্ড কখ (Koch)
আপনার বক্তৃতার একটা ধরন নিয়তই আমার দৃষ্টি এড়াইয়াছে। আপনি ইংরেজিতেই বলিয়াছেন, ইহা ছাড়া আমি ইহা হইবার অন্য কোন কারণ দেখিতেছি না। আপনি পূর্ণসংখ্যা ২ লইয়া অনেক ভারি কথা কহিয়াছেন, বিশেষ পূর্ণসংখ্যা ২ য়ের জন্ম লইয়া। আমার যতটুকু স্মরণ হয় আপনার বিশ্লেষণ হইতেছে এই যে আমরা এক নির্দেশক দাগ দিয়া শুরু করিলে দাগাংকিত খাড়াইয়া যায়, ফলে আমরা ২ এর মুখোমুখি হই বলিয়া ধরিয়া লওয়া যায়। দাগাংকিত আর দাগানংকিতর সহিত তুলনা দিবার জোড়া কোথায় পাইব? দাগাংকিত মানে কি জ্ঞানতন্ত্র আর দাগানংকিত মানে কি অজ্ঞানতন্ত্র? দাগাংকিতই কি সজ্ঞান মানুষ আর দাগানংকিতই কি অজ্ঞান মানুষ?

লাকাঁ
ফ্রেগের লেখা হইতে আমি শুদ্ধ হইতে ধার করিয়াছি যে শূন্য সংখ্যাটি যে শ্রেণীর বৈশিষ্ট্যবাচক সংখ্যা সেই শ্রেণীই হইতেছে ১ সংখ্যার ভিত্তি। মনোবিশ্লেষণসংশ্লিষ্ট প্রসঙ্গক্রমে আমি ২ সংখ্যাটি বাছিয়া লইয়াছি একটি কারণে, তাহা হইতেছে এই–‘এরোস’(eros) বা রতির রূপরেখা আঁকিতে গিয়া ফ্রয়েড ২ সংখ্যার উপর বেশ গুরুভার আরোপ করিয়াছেন। জীবনের পরিসরে যে শক্তি একতাসাধন করিয়া থাকে তাহার নামই রতিশক্তি, আর ইহাতে ভিত্তি করিয়া অনেকানেক মনোবিশ্লেষক যৌনাঙ্গের পরিপকৃত বলিয়া একটা কথা বাহির করিয়াছেন। ইহার ভিত্তিতে তাহারা দাবি করিয়াছেন যেমন ‘নিখুঁত বিবাহ’ বলিয়া কোন জিনিস সম্ভব। লক্ষ্য হিসাবে বিষয়টি রহস্যাবৃত আর সাংঘাতিক একগুঁয়েমির সহিত ইহার পক্ষে প্রচারণা চালানো হইয়া থাকে। যে শ্রোতামণ্ডলির সহিত ফ্রেগে উত্থাপিত সমস্যাটির পরিচয় ঘটে নাই শুদ্ধ তাহাদের কথা মাথায় লইয়া আমি, পহিলা দফায়, এই ২ সংখ্যাটি বাছিয়া লইয়াছি। ১ সংখ্যার মোকাবেলায় ০ সংখ্যা। এই পহিলা পরিচয় পর্বে, যে কর্তব্য সম্পাদন করিতে পারিতে ২ সংখ্যার মোকাবেলায় ১ সংখ্যাটিও সেই কর্তব্য করিতে পারিবে।
আপনার দুই নম্বর সওয়াল প্রসঙ্গে বলিতেছি।

lacan2.jpg
জাক লাকাঁ

যাহারা ফ্রয়েডের লেখার সহিত কোন প্রকার খুঁত ব্যতিরেকেই পরিচিত রহিয়াছেন তাঁহারা জানেন এমন অনেক খুঁটিনাটি বিষয় আমি স্বভাবগত নিয়মেই উহ্য করিতে বাধ্য হইয়াছিলাম। দাবাইয়া রাখা প্রসঙ্গে এই কথাটি একদমই ভুলিয়া থাকা চলিতে না যে ফ্রয়েড বলিয়াছেন দাবাইয়া রাখার রহস্য যাহার উপর দাঁড়াইয়া থাকে তাহাকে জার্মান ভাষায় বলে ‘উয়রফেরড্র্যাংগুঙ্গ’ (urverdrängung) বা আদ্যদমন। আমি আজ আমার প্রস্তাবের পুরাটাই এখানে সূত্রমাফিক পেশ করিতে পারি নাই, ইহা স্বভাবগত কারণেই ঘটিয়াছে। সূত্রবদ্ধ করা ফ্রয়েড ঘরানার ভাষায় যাহাকে ঘনায়ন (condensation) বলে তাহা বুঝাইতে হইলে রূপকের ওপর গোড়াতেই নির্ভর করিতে হয়, ইহা জানা না থাকিলে কিন্তু একদমই চলিতেছে না। [ডা. লাকাঁ কালো বোর্ডে ‘অক্ষরের নাছোড়বান্দামি’ (L’instance de la lettre) বিষয়ের সার দেখাইয়া তাঁহার মন্তব্য শেষ করিলেন।]

গোল্ডমান
সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে আমি যে উপায়ে কাজকারবার চালাইতেছি তাহার কারণে একটা জিনিস আমার দৃষ্টিতে লাগে। ইহা আর কিছুই নয়, গুরুত্বপূর্র্ণ, ইতিহাসভিত্তিক, দশজনীন ঘটনাধারা আর গুরত্বপূর্ণ রচনাকর্ম লইয়া বিচার-বিশ্লেষণ করিতে আমার বিশ্লেষণকর্মে আমি কদাচ অজ্ঞান ধারণাটির প্রয়োজন অনুভব করি না। তথাপি আমি এই ভেদটা দেখাইয়া বলিয়াছিলাম: অবশ্য আমার প্রয়োজন হয় জ্ঞানহীন ধারণার। অজ্ঞান অংকুর ইতি আদি তো আছেই; কী কী উপায়যোগে ব্যক্তি নিজের হিসাব পেশ করিতেছে আমি তো তাহা বুঝিতে পারি না–আর, আমি তো বলিয়াছি, ইহা মনোবিশ্লেষণের এলাকা যাহার সহিত আমি মিশিতে চাহি না। কিন্তু দুই ধরনের ঘটনা আছে যাহা, সব ধরনের সাক্ষ্যপ্রমাণ অনুসারেই, সামাজিক বলিয়া মনে হয় আর এই সব ঘটনা বুঝিতে হইলে আমাকে অজ্ঞান নয় জ্ঞানহীনের সাহায্য লইতে হয় আমার মনে হইতেছে আপনি বলিয়াছেন অজ্ঞান দশজনের ভাষা ইংরেজি ফরাসি প্রভৃতি যে সকল ভাষায় আমরা কহিয়া থাকি সেই রকম ভাষা।

লাকাঁ
আমি বলিয়াছি ভাষার, ইংরেজি বা ফরাসি ইতি আদির মতন।

গোল্ডমান
কিন্তু এই ভাষা হইতে স্বতন্ত্র? তাহা হইলে তো আমি হাসিব: আমার আর কোন প্রশ্ন রহিল না। সজ্ঞান আমরা যে ভাষায় কথা কহিয়া থাকি এই জিনিস তাহার সহিত যুক্ত।

লাকাঁ
জ্বি, হা।

গোল্ডমান
সঠিক আছে। আমি যদি আপনার কথা ঠিকমতো বুঝিয়া থাকি, দোসরা যে জিনিসটা আমার মনে দাগ কাটিয়াছে। সজ্ঞান মানে যে স্তরে অজ্ঞান ধারণাটির সাহায্য ছাড়াই আমার চলিয়া যায় সেই স্তরে কয়েকটা। প্রক্রিয়ার সহিত তুলনা দিবার মতন কিছু কিছু জিনিস পাওয়া যায়। পাসকাল, হেগেল, মার্ক্স ও সার্ত্র হইতে শুরু করিয়া বলিতে এমন কিছু জিনিস আমরা জানি যাহা অজ্ঞানের তোয়াক্কা করে না: প্রভেদের সঙ্গে এই ধ্রুবগুলি যোগ করিয়া মানুষ কী তাহার সংজ্ঞা দেওয়া চলে। পাসকাল বলিয়াছেন: ‘মানুষকে সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়াইয়া গিয়া কেহ’ (dépasse l’ homme) কিছু করে না। অজ্ঞানের দোহাই না দিয়াও বলা চলে, এই ফাঁকটুকুর সাহায্য ছাড়া ইতিহাস কিংবা গতিবিদ্যার সংজ্ঞা দেওয়া যায় না। সজ্ঞান মনের স্তরে আমি যে দোসরা ঘটনার দেখা পাই: সজ্ঞান মন যতখানি কর্মকাণ্ডের সহিত সংযুক্ত ততখানি বলিতে–কী জিনিস তাহা মনে তাহার অঙ্গীভূত ধ্রুব মানে অসাড় দ্রব্যের সাহায্য ছাড়া এবং এই ধ্রুবসকল সহিত প্রভেদের সংযোগ না ঘটাইয়া বলা যাইবে না। পূর্বনির্ধারিত ঘটনা একাধিক হইলে তৎক্ষণাৎই কর্মকাণ্ড শুরু করা যায় না। ধ্রুববস্তুর অঙ্গসংস্থানের সহিত কর্মের ঘনিষ্ট সংযোগ। ইহার কারণেই প্রভেদের মধ্যে বিশেষ বিন্যাস সম্ভব হয়। এই বিশেষ মানুষ জন্ম লইবার আগে হইতেই ভাষা জন্ম লইয়াই বসিয়া আছে–এই ভাষা (ইংরেজি, ফরাসি ইতি আদি) কি শুদ্ধ এর অতিশয়পনা সমস্যার সহিতই যুক্ত? এই সম্বল, ভাষা আর এই অসাড় দ্রব্য ছাড়া কোন সহজ মানুষ হইতে পারে না। আমার প্রশ্ন হইতেছে: এই সম্বলবাদ আর তাহার নানান হেরফের কি মাত্র এই অতিশয়পনা, এই অজ্ঞান আর বাসনারই আত্মীয়, নাকি ইহার সহিত কাজ নামে পরিচিত কোন কিছুর বাহিরে দুনিয়ার রূপান্তর এবং সমাজ জীবনেরও আত্মীয়তা আছে? আর আপনি যদি এইগুলির সহিতে আত্মীয়তার কথাও মানিয়া লয়েন তো একটি সমস্যা মাথাচাড়া দিয়া উঠে: যুক্তিটা কোথায়, বুঝিবার উপায়টা কই? মানুষ মানে কেবল সবটাকে এক করিবার আশা, আমি ইহা প্রত্যয় করি না। আমি সেইদিনও বলিয়াছি আমরা এখনও একটা মিশাল অবস্থার মুখামুখি হইতেছি। তবে মিশালটি বুঝিতে হইলে ইহার অংশ অংশ আলাদা করিতে হইবে, না করিলে চলিবে না।

লাকাঁ
আর আপনি কি মনে করেন এই স্রোতে আঁকড়াইয়া ধরিবার মতন ‘নোঙ্গর ঘাট’ যাহা পাওয়া যায় তাহার মধ্যে এই কাজও পড়িতেছে?

গোল্ডমান
আমি মনে করি সমস্ত হিসাব নিকাশ শেষেও বলিতে হইবে মনুষ্যজাতি কিছু ভারি কাজের মতো কাজ করিয়াছে।

লাকাঁ
আমার মনে হয় না ইতিহাসের বই খুব একটা নিয়মবাঁধা বই। এই বিখ্যাত ইতিহাস, যাহাতে কোন ঘটনা অতীত হইয়া গেলে সকলেই সবকিছু এত ভাল করিয়া পায়, তাহা এমন কোন বাগদেবী নহে যাহার ঘরে আমার আস্থা রাখিতে পারি। এমন এক জমানা ছিল যখন–এই যেমন বসুয়ে যে যুগে লিখিতেছেন সেই যুগে ক্লিও খুব বড় গুরুত্বের দাবিদার লোক ছিলেন। হয়তো আবার আগের মার্কসের যুগে। তবে ইতিহাসের ঘরে আমি শুদ্ধ বিস্ময় পাইতে চাই। এই মত বিশ্বাসের ব্যাখ্যা করিবার চেষ্টায় আমি সফল হই নাই, যদিও আমি প্রচণ্ড চেষ্টা করিয়াছি। আপনি যে সকল স্থানাংক দিয়া ব্যাখ্যা করিতেছেন আমি সেইগুলির সাহায্যে নয়, অন্য স্থানাংকের সাহায্যে ব্যাখ্যা করি। বিশেষ বলিতে, কাজের সমস্যাটিকে এই স্থলে আমি সম্মুখের সারিতে বসাইব না।

শার্ল মোরাজে
আজিকার আলোচনায় সংখ্যার জন্ম কী করিয়া হয় তাহার ব্যবহার দেখিয়া আমি প্রীত হইয়াছি। গোল্ডমান সাহেবের উত্তর দিতে গিয়া বলিব, আমি যখন ইতিহাস পড়ি তখন আমি ভরসা রাখি এই একই সংখ্যার জন্মের উপর, মনে করি ইহারাই সবচেয়ে নিরেট অখিল জগত। ইহার মুখামুখি অবস্থায় দাঁড়াইয়া আমি একটা প্রশ্ন করিতে চাহিতেছি, উদ্দেশ্য আমরা যাহা যাহা সত্য বলিয়া অনুমান করিয়া লইতেছি তাহা আসলেই এক না ভিন্ন তাহা পরখ করিয়া দেখা। আমার মনে হয় বক্তৃতার শুরুতে আপনি কহিয়াছেন যে আপনার কাছে সজ্ঞান মনের গঠন ভাষার মতন, আবার শেষদিকে আপনি কহিলেন, অজ্ঞান মন ভাষার আকারে গঠিত। আপনার এই দ্বিতীয় প্রস্তাবখানি যদি সঠিক হইয়া থাকে, তবে আমার বক্তব্যও তাহাই।

লাকাঁ
অজ্ঞান মনই ভাষার আকারে গঠিত–এই বক্তব্যের হেরফের আমি কখনই করি নাই।

রিচার্ড ম্যাকসি
এই অধিবেশন বাবদ যে পরিমাণ ভুলবোঝাবুঝি (méconnaissances) আমাদের ভাগ্যে বরাদ্দ ছিল, হইতে পারে তাহার সবটুকুই আমরা ইহার ভিতর খরচ করিয়া ফেলিয়াছি। তাহার পরও আপনি ফ্রেগে আর রাসেলের যে দোহাই দিলেন তাহার প্রভাব আপনার ভাববাদে (ontology) (বা নিদেনপক্ষে আপনার ভাবজগতে) কেমন পড়িয়াছে তাহা লইয়া আমার এখনও একটু ঘোর থাকিয়া গেল। উদাহরণ দিতেছি, আপনি গণিত হইতে যে উদাহরণ দিলেন তাহার একটা অর্থ হইতে পারে আপনি অখিল জগতবাদ প্রস্তাবের চরম ভাষ্যে বিশ্বাস করেন। আমার প্রশ্ন এইখানেই। সম্পূর্ণ বর্ণনা অসম্ভব হইলে অখিল জগৎ ধ্বসিয়া পড়িবে এই যুক্তি আমাকে বিচলিত করে না। কারণ গোয়ড়েল (Gödel) নিজেই বলিয়াছেন তিনি অখিল জগৎবাদে আস্থা রাখেন। তিনি মনে করেন এই উপপাদ্যের অর্থ আর কিছুই নয়, শুদ্ধ এই যে সম্বলবাদের প্রকাশক্ষমতার গোড়াতেই একটা সীমা আছে। আমি মনে করি যুক্তিওয়ালা প্রস্তাবটাই বরং গুরুতর প্রশ্নের সম্মুখীন হইয়াছে। ‘প্রিন্সিপিয়া’ গ্রন্থের লেখকগণ যদি কয়েকটি সেটের বিশেষ সেট বলিয়া স্বাভাবিক সংখ্যার সংখ্যা প্রচার করিয়া থাকেন তবে–প্রসারতত্ত্বে যে সকল ভাষাপারের ভাষাসংশ্লিষ্ট (metalanguage) গণ্ডগোল বাধে তাহার কথা ছাড়িয়াও বলা যায়–আমরা পাল্টা বলিতে পারি তাহাদের সিদ্ধান্তটা মনগড়া, কারণ সেটতত্ত্বে–মানে যে সেটতত্ত্ব প্রকারতত্ত্বের ভিতে দাঁড়াইয়া নাই–তাহাতে উদাহরণস্বরূপ যে সেটের একমাত্র সংখ্যা খিল সেট, ইতি আদি ক্রমে তাহাই ‘এক’ সংখ্যার সংজ্ঞা বলা যাইতে পারে যাহার বলে স্বাভাবিক সংখ্যার প্রচলিত ধর্ম অক্ষুণœ থাকে। সুতরাং আমরা সওয়াল করিতে পারি কোন সেটটিতে ‘এক’ সংখ্যা হয়? কয়েক মাস আগে পল বেনাসেরাফ (Paul Benacerraf) এই ধারার যুক্তিকে আরো টানিয়া নিয়াছিলেন। তিনি দাবি করিয়াছিলেন স্বাভাবিক সংখ্যার অনপনেয় ধর্ম আর কিছুই নয়, শুদ্ধ এই যে এই সংখ্যা পুনরাবৃত্তিভিত্তিক প্রগমন বটে। সুতরাং এই নিয়মতন্ত্রে না হয়, ঐ নিয়মতন্ত্র যাহাতে এই প্রগমন সম্ভব তাহাতেই কাজ চলিবে। এই নিয়মতন্ত্রের ধর্ম মিলিতেছে বিশেষ সংখ্যার দাগে নহে, বরং আত্মীয়পরম্পরাভক্ত, নিষ্কায়া গঠনে (অঙ্গীভূত অসাড় দ্রব্যে নয়)। অখিল জগতবাদী (realist) প্রস্তাবমাত্রই যাহা দাবি করেন সেই প্রস্তাব অর্থাৎ সংখ্যা ও ভাব বা অবশ দ্রব্য মাত্রই সমান (আর এক জাতীয় ধারণাপন্থী বা নামকাওয়াস্তে গঠনতন্ত্রের পক্ষে যুক্তি দেখায়) কথাটি এই হামলার মুখে পড়িতেছে।

লাকাঁ
এই মন্তব্য লইয়া কথা বাড়াইব না। শুদ্ধ বলিব এই: ধারণা এবং এমনকি সেটও বস্তু নহে। সংখ্যাতন্ত্রের (number system) গঠন নাই এহেন কথা আমি কদাচ বলি নাই।

তর্জমা: সেপ্টেম্বর ২০০৭–জানুয়ারি ২০০৮

বিডিনিউজ, আর্টস, ১২ জানুয়ারি ২০০৮