Monthly Archives: April 2018

আদমবোমা: ২ । আত্মহত্যা না সত্যাগ্রহ?

iraqbombingad.jpg
ভয়াবহতার ধারণা আত্মঘাতী হামলা কমাতে পারে, এ আশায় ইরাকে সম্প্রচারের জন্য আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসে বিজ্ঞাপন বানানোর কাজ চলছে।

copy-of-alpa-2.jpg‘আদমবোমা’ নামক পুস্তিকায় তালাল আসাদ তিনটি প্রস্তাব প্রচার করিয়াছেন। প্রথম প্রস্তাবে তিনি দেখাইয়াছেন পশ্চিমা সাম্রাজ্য শাসকরা যে জিনিশকে “সন্ত্রাসবাদ” বলিয়া গালি দিতেছেন তাহার সহিত তাহারা যে বস্তুকে “যুদ্ধ” বলিয়া সালাম করেন তাহার ভেদ বিশেষ নাই। সাম্রাজ্য শাসকদের বিচারে আইনসম্মত হত্যাকাণ্ডকে যুদ্ধ বলা যায় আর আইন বহির্ভূত হত্যা ইত্যাদিরই অপর নাম ‘সন্ত্রাসবাদ’। পার্থক্যটা হত্যা ও অহত্যায় নয়। বরং হত্যা ও হত্যায়। এক হত্যার উদ্দেশ্য—তাঁহারা বলেন—জীবন দান। অন্য হত্যার উদ্দেশ্য নিছক অথবা জীবননাশ।

asad.jpg……
তালাল আসাদ
……..
কিন্তু—তালাল আসাদ দেখাইতেছেন—জীবন বা সভ্যতার সুন্দর প্রহরা দিবার উদ্দেশ্য যাঁহারা যুদ্ধ ঘোষণা করেন তাঁহারা তো তাঁহাদেরই পূর্বঘোষিত যুদ্ধের আইন—যেমন ‘জেনেভা কনভেনশন’—মানিয়া চলেন না। বলপ্রয়োগের যে সীমা আইনে বাঁধিয়া দেওয়া হইয়াছে—যেমন যুদ্ধবন্দি নির্যাতন না করা—তাহা মানিয়া চলেন না। প্রমাণ—গুয়ানতানামো উপসাগরের মার্কিন বন্দিশিবির, প্রমাণ ইরাক, প্রমাণ আফগানিস্তান, প্রমাণ ভিয়েতনাম, প্রমাণ আলজিরিয়া। তাহা হইলে ‘মানবাধিকার আইন’ কথাটি একটি কথার কথা বৈ নহে!

book_t-a.jpgঅথচ এই শক্তিমন্ত দেশের নায়ক ও সেনানায়কগণ সন্ত্রাসবাদের নিন্দা করিতেছেন। কিন্তু কোন মুখে? তাঁহারা বন্দিজনের পায়ুপথে বিদ্যুতবায়ু প্রবেশ করাইয়াও শান্তি পাইতেছেন না। বলিতেছেন সন্ত্রাসবাদ সভ্যতার অথবা মানবাধিকারের দুশমন। তালাল আসাদ চোখে আঙ্গুল ঢুকাইয়া কহিতেছেন—প্রকৃত প্রস্তাবে পশ্চিমা সভ্যতার যুক্তি হইল, সন্ত্রাসবাদ যাহারা আঁকড়াইয়া আছে তাঁহারা সভ্যতার বাহিরে বাস করিতেছে। কাজেই তাঁহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার সময় সভ্যতার আইনকানুন—যথা মানবাধিকার আইন—প্রয়োগের প্রয়োজন নাই।

১৯২৭ সালে মার্কিন সেনাবাহিনীর কাপ্তেন এলব্রিজ কোলাবি এক প্রসঙ্গে যাহা বলিয়াছিলেন—আসাদের মতে—তাহা আজও পাশ্চাত্য শাসক শ্রেণীসমূহের প্রকৃষ্ট আদর্শ আকারে জিয়াইয়া আছে। কোলবির কথায়:

“বন্যজাতি যুদ্ধের মূল কৌশল হিসাবে শুদ্ধ ধ্বংসসাধন ও বিলপ্তির পথই গ্রহণ করে—ঘটনার সার কথা ইহাই। যাহারা এই রকম নির্দয় পদ্ধতি বাছিয়া লয় তাহাদিগের মোকাবেলায় আমাদিগেরও নির্দয়ার পথ লইতে হইবে। অতিশয় মানবাধিকার মানবাধিকার করিয়া এই পথ হইতে সরিয়া দাঁড়ানো ঠিক হইবে না। কারণ আপনার শত্রুর সমক্ষে বেশি দয়া দেখাইতে গিয়া সেনাপতি হিসাবে আপনি তো আপনার আপন জাতির প্রতি নির্দয়তা প্রকাশ করিতেছেন মাত্র।” (আসাদ ২০০৬: ৩৪-৩৫)

পাশ্চাত্য শাসক শ্রেণীর নেতারা ‘মানবাধিকার আইন’ লঙ্ঘনের অভিযোগে অসভ্য (বা বন্য ও বর্বর) জাতির নিন্দা করেন। অদ্য তাঁহারা সভ্য জাতির দুশমন বলিয়া যাহাদের চিহ্ন দিয়াছেন তাহারা হইয়াছেন ‘সন্ত্রাসবাদী’। ইহাদেরও প্রধান দোষ ইহারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করিয়া নিরীহ মানুষ হত্যা করিতেছে। সুতরাং ইহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মানবাধিকার আইন মানিয়া চলিবার কোন বাধ্যবাধকতা থাকিতে পারে কি? মানবাধিকার রক্ষা করিবার স্বার্থে মানবাধিকার ভঙ্গ করা কোন অপরাধ নয়—পাশ্চাত্য যুক্তির নিহিতার্থ যদি ইহাই হয় তাহা হইলে তথাকথিত সন্ত্রাসবাদীরাও যে একই যুক্তির আশ্রয় লইবেন তাহাতে আপনার বিস্ময় কেন?

এই প্রশ্ন সম্বল করিয়া তালাল আসাদ দ্বিতীয় প্রস্তাব সায়ের করিয়াছেন। এই প্রস্তাবে তাঁহার বিচারের বিষয় তথাকথিত সন্ত্রাসবাদের অন্যতম প্রধান ঘটনা—খোদ আদমবোমা। কেহ কেহ ইহার নাম রাখিয়াছেন শহীদ (martyrdom) বোমা। (আসাদ ২০০৬: ৪৩)


আত্মঘাতী বা আদম বা শহীদ বোমার প্রকোপ দুনিয়ার নানাদেশে, নানা সময়ে দেখা গিয়াছে। তাহা সত্ত্বেও পশ্চিমা শাসক শ্রেণীর অন্তর্গত ধুরন্ধর ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় এই বোমা আবিষ্কারের কৃতিত ফিলিস্তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের দান করিতে গ্রীবা উঁচু করিয়া আছেন। ১৯৮৭ সালের পর ফিলিস্তিনের পামর জনসাধারণ এক প্রকার ঢেলাযুদ্ধ শুরু করিয়াছিলেন। এই ঢেলার অনুবাদ আমরা একদা করিয়াছিলাম ‘কংকর’ শব্দ দিয়া। আরবি জবানে এই যুদ্ধ ‘এন্তেফাদা’ বা গণজাগরণ অভিধা অর্জন করিয়াছিল। ইহার ফলাফল কী হইয়াছে তাহা সকলেই অবগত আছেন।

দোসরা এন্তেফাদা শুরু হইয়াছে ২০০০ সালের অক্টোবর মাস হইতে। প্রাচীন জেরুজালেম শহরের বনিয়াদি আল আকসা মসজিদের কর্তৃত্ব গ্রহণ করিবার অভিলাস চরিতার্থ করিতে ঐ মাসের একদিন এসরায়েল রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী জেনারেল আরিয়েল শ্যারন [Ariel Sharon] উস্কানিযোগে পবিত্র মসজিদে ঢুকিয়া পড়িলেন।

ফিলিস্তিন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতর বড় শরিক হামাস দল সেই উস্কানির স্পর্ধা আপনকার কাঁধে তুলিয়া লইল। ২০০১ সালের ১লা জানুয়ারি এই দলের প্রথম ‘শহীদ’ বোমাভিযান শুরু হইলে। ইহার পর অন্যান্য দুনিয়াবি
fathi-al-shikakai.jpg……..
ফতি শিকাকি
………
রাষ্ট্রনৈতিক দল এমনকি নির্দলীয় পামর পর্যন্ত বুকে-পিটে বোমা বাঁধিয়া এসরায়েল সীমান্তের চৌকি পার হইল। মনে রাখিতে হইবে ‘এসলামি জেহাদ’ নামা দলের স্থপতি ফতি শিকাকি (Fathi Shikaki) ১৯৮০ সালের কয়েক বৎসর পর এসরায়েলের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনা করিয়াছিলেন। পরাজয়ে না ডরাইয়া বীরেরা এখন বুকে বোমা বাঁধিয়া মরিতেছেন আর এসরায়েলি নাগরিক-অনাগরিক যাহাকে পাওয়া সম্ভব মারিতেছেন।

২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর আকাশযোগে খোদ যুক্তরাষ্ট্রে আদমবোমা ফাটিবার পর দুনিয়া জুড়িয়া নতুন হৈ চৈ উঠিয়াছে। উদাহরণ দিয়া বলিব মার্কিন দার্শনিক রিচার্ড রোর্টি (Richard Rorty) রটাইয়াছেন পাশ্চাত্য জগতের কোথাও যদি সন্ত্রাসবাদীরা ঐ রকম বড় হামলা আরো একবার করিতে পারে তো পশ্চিমে এতদিন ‘গণতন্ত্র’ বলিয়া যে সামাজিক আদর্শ প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছে তাহা শেষ হইয়া যাইবে। প্রমাণ, ইহার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র পামর সাধারণের গণতান্ত্রিক অধিকার কিছু পরিমাণ সংকোচনের শিকার হইয়াছে। সে দেশে তথাকথিত ‘দেশপ্রেম আইন’ (Patriot Act) পাশ হইয়াছে।
Richard Rorty
রিচার্ড রোর্টি (১৯৩১-২০০৭)

রিচার্ড রোর্টির উদ্বেগ শুদ্ধ তাঁহার একার হইলে কথা চলিত না। চলিতেছে কারণ ২০০১ সালের অনেক আগে হইতেই বিশেষজ্ঞ গবেষক ও প্রচারক মহলে বলা হইতেছে ‘সভ্যতার সংঘাত’ বা সভ্যতায় সভ্যতায় যুদ্ধ শুরু হইয়া গিয়াছে। তালাল আসাদ তদীয় ‘আদমবোমা’ প্রবন্ধের প্রথম প্রস্তাবে আমাদের দর্শন করাইয়াছেন প্রকৃত প্রস্তাবে প্রচারকগণ বলিতেছেন—পাশ্চাত্য সভ্যতার সহিত যাহারা কড়িবর্গাশুদ্ধ এক হইয়া মিশিতেছেন না তাহারা সভ্য হইয়া সারেন নাই। উনিশ শতকের পররাজ্যাভিলাষী বা ‘কলোনিয়াল’ যুদ্ধের আদলে তাঁহারা নতুন যুদ্ধ শুরু করিয়াছেন। এই যুদ্ধের মূল নৈতিক ভিত্তিও সেই পুরানা অজুহাতই: ‘সভ্যতা বিস্তারের স্বার্থে অসভ্যকে ধ্বংস করিতে হইবে’। আমরাও ‘পশ্চিমা সাম্রাজ্যের বর্ণপরিচয়’ প্রবন্ধে তাহার কিছু বয়ান পেশ করিয়াছি। (খান ২০০৭)

সকলেই বলিতেছেন আত্মঘাতী ওরফে আদমবোমা জিনিসটা সত্যই বড় ভয়াবহ জিনিশ। তালাল আসাদ সওয়াল করিলেন—কেন? কথাটার মধ্যে দুই সত্য লুকাইয়া আছে। এক নম্বরে, অনেকেই পাশ্চাত্য বিশেষজ্ঞাদের সুরে সুর মিলাইয়া বলিবেন, আদম বোমারুরা কেবল নিরীহ, বেসরকারি, যায় বেসামারিক লোক ধরিয়া মারিতেছে। ইহাই ভয়াবহতার গূঢ় কারণ। নিরীহ লোকহত্যা শুদ্ধ আত্মঘাতী বোমারুরাই করিতেছেন—ইহা কিন্তু সত্য নহে। এই কাজ অনেক দেশের সেনাবাহিনীও করিয়া থাকে। মহাযুদ্ধের সময় জার্মানিতে এই ঘটনা দেদার ঘটিয়াছে। জাপানের কথা না হয় বলিব না।

তাহা হইলে আত্মঘাতী অভিযান জিনিশটার বিশেষ গুণ কোনখানে? আখ্যান অনুসারে যদি বলি বলিতে হইবে যে অভিযানে শত্রুপক্ষের লোককে কি নিরীহ কি দোষী নির্বিচারে হত্যার নিমিত্ত আমি নিজেকে পর্যন্ত ধ্বংস করিয়া ফেলিতে রাজি হইয়াছি তাহাই আত্মঘাতী অভিযান বা ‘সুইসাইড অপারেশন’। তাহা হইলে আসল কথা আত্মহত্যা, নিরীহহত্যা নহে। কিন্তু ইহাতেও সমস্যা দেখিতেছি। দেশের মুক্তির জন্য, জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষার জন্য কত বীরই না আত্মোৎসর্গ করিয়াছেন, ইতিহাসে তাহার কতক কাহিনী লেখা হইয়াছে, কতক লেখাও হয় নাই। আমাদের দেশের ইতিহাসেও শ্রেষ্ঠ আত্মোৎসর্গকারী সৈনিকগণকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ অভিধা দেওয়া হইয়াছে। কই আমরা তো ইহাঁদের কখনও ভয়াবহ বলি নাই। বলিয়াছি কি? আর ব্যক্তিগত বা মনোগত গভীর গভীর অসুখের কারণে কত মানুষই না আত্মহত্যা করিয়া থাকেন। আমরা তাহাদিগের জন্য দুঃখ প্রকাশ করি, কেহ বা গালিও দিয়া থাকি। কিন্তু ভয়াবহ তো বলি না।

ধর্মীয় ধারায় ‘আত্মহত্যা মহাপাপ’ বলা হয় বটে তবে আমাদের দেশে ইংরেজ সরকার প্রবর্তিত দণ্ডবিধি অনুসারে আত্মহত্যার চেষ্টা করিয়া ব্যর্থ হইলে শুদ্ধ এক বছরের কারাভোগ করিবার বিধান (দ্রষ্টব্য ৩০৯ ধারা) রহিয়াছে অথচ অন্যহত্যার চেষ্টা করিয়া বিফল হইলে দণ্ড কম করিয়া হইলেও ১৪ বছর।

১৮ শতকের ইতালি দেশীয় মনীষী সেসার বেকারিয়া [Cesare Beccaria] বলিয়াছেন যাহারা পরিণত বয়সে দেশত্যাগ করিয়া বিদেশে চলিয়া যান তাহাদের পাপের তুলনায় আত্মহত্যা কোন পাপই নহে। কারণ—
Cesare Beccaria……..
সেসার বেকারিয়া, ১৭৩৮-১৭৯৪
……..
বেকারিয়ার ধারণা —হিজরতকারী সঙ্গে টাকা-পয়সা ধনদৌলত লইয়া যান আর তাহার নতুন দেশ যদি পুরানা দেশের প্রতিদ্বন্দ্বী হয় তো তিনি প্রকারান্তরে শত্রুদেশের সহায়তাই করেন। অথচ আত্মঘাতী শুদ্ধ নিজের কায়াটা ছাড়া কিছুই লইয়া যাইবেন না। [He who kills himself does a less injury to society than he who quits his country for ever; to the other leaves his property behind him, but this carries with him at least a part of his substance. Besides, as the strength of society consists in the number of citizens, he who quits one nation to reside in another, becomes a double loss.] (বেকারিয়া ১৯৯২: ৭৮)

কাজেই দেখা যাইতেছে আত্মঘাতী বোমার ভয়াবহতা ঠিক আত্মঘাতে নিহিত নাই । আর—আগেই তো দেখিলাম—ইহার কারণ নিরীহহত্যায়ও নিহিত নাই। তাহা হইলে এই ভয়াবহতার কারণ কোথায় ? অন্য কোথা, অন্য কোনখানে?

আত্মঘাতী বোমা ফাটিবার পর যে ধ্বংসযজ্ঞ হয়, যে প্রাণহানি ঘটে তাহা লইয়া বিশেষজ্ঞরা বিশেষ সময় ব্যয় করিবেন না। তাহারা জানিতে উৎসুক যে বা যাহারা বোমা ফাটাইল তাহার বা তাহাদের ব্রত বা মতলব [motif] কী। সকলেই জিজ্ঞাসা করেন সে কেন এই কাজ করিল? প্রশ্ন হইতেছে আত্মহত্যা—বিশেষ সফল আত্মহত্যা—শাস্তিযোগ্য অপরাধ নহে। আপনি তাহাকে কোথায় পাইবেন? অতয়েব প্রমাণ করা চাই—‘আত্মহত্যা যে করিয়াছে আত্মহত্যা সে করে নাই।’ কেহ তাহাকে দিয়া করাইয়াছে। অতয়েব তাহাদিগকে ধর, মার, কাট, পোড়াও। ইহাই বিশেষ এসরায়েল রাষ্ট্রে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার চিন্তাধারা ।

ইহাতে কিন্তু আসল প্রশ্নের উত্তর মিলিল না। আত্মঘাতী অভিযানে যাইবার ইচ্ছা যাহার মনে জাগিয়াছে তাহার মনে তাহা কখন ও কীভাবে জাগিল? এই প্রশ্নের উত্তর কোনদিনই পাওয়া যাইবে না—এমন কথা তালাল আসাদ বলেন নাই। তিনি মাত্র বলিতেছেন, উত্তর পাওয়াটা সহজকর্ম নহে। এই জায়গায় দুই ঘটনার স্রোত একটি ধারায় আসিয়া মিলিয়াছে। তাই কেহ কেহ প্রশ্ন করিয়াছেন—‘লোকটি কি মারিবার জন্য মরিয়াছে না কি মরিবার জন্য মরিয়াছে?’

জঁ বেশলে (Jean Baechler) নামক জনৈক ফরাশি পণ্ডিত বুফে (Buffet) নামক একজন আততায়ীর উদাহরণযোগে বলিয়াছেন কেহ কেহ মরিবার পথ প্রশস্ত করিবার জন্য পর ধরিয়া মারে। বুফে তাহার শেষ অভিলাষ হিসাবে ফরাসি রাষ্ট্রপতি সমীপে আর্জি পাঠাইয়াছিলেন। তিনি দাবি করিয়াছিলেন তাহাকে গিয়োতিন (Guillotine) নামক তলোয়ারের নিচে মরিবার সুযোগ দেওয়া হউক। তিনি বলিতেন, ‘আমি আত্মহত্যার সুযোগ চাহিব বলিয়া পরহত্যা করিয়া থাকি। ইহাই আমার নীতিধর্ম।’ [To kill in order to commit suicide, that’s my morality!] ইহা মরিবার ফন্দিস্বরূপ মারিবার চমৎকার দৃষ্টান্ত। (আসাদ ২০০৬: ৪০)

মঁসিয়ে বেশলে আবার অন্য দৃষ্টান্তও পেশ করিতে পিছপা হয়েন নাই। ২ নম্বর মহাযুদ্ধের জমানায় জাপানের আত্মঘাতী বৈমানিকগণ (বা কামিকাজি) ইহার উল্টা করিয়াছেন। তাহারা মরিবার জন্য মরিয়াছেন। জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় ইজ্জত তাহাদের কাছে নশ্বর জীবনের তুলনায় ঈশ্বরস্বরূপ বা অবিনশ্বর। আর বুফের মতন জাত অপরাধীরা দুই পয়সার বিষ না কিনিয়া খামোকা লোকক্ষয় করিয়াছেন। প্রভেদ এই নয় কি? এইখানেও আমাদের উত্তর মিলিল না। এইখানে শুদ্ধ জানিতে পারিলাম আত্মহত্যাকারীর উদ্দেশ্য নিজেকে শেষ করা। আর আত্মঘাতী বোমারুর উদ্দেশ্য অন্যকে শেষ করা—নিজেকে শেষ করা তাহার উপায় মাত্র। প্রশ্ন থাকিল: অন্যকে শেষ করিবার ব্রত লইলেন কেন তিনি? অন্যকে শেষ করার অন্য উপায় থাকিবার পরও যদি তিনি সেই পথে ধরিয়া থাকেন তবে বলিতে হইবে তিনি সত্য সত্যই কোন মতাদর্শের—যেমন ধর্মীয় জবানের—বন্দী হইয়াছেন।

তালাল আসাদ বলিয়াছেন—পাশ্চাত্য বিশেষজ্ঞরা ইহাই প্রমাণ করিতে তৎপর। কিন্তু তাঁহাদের যুক্তিপ্রমাণ ও সাক্ষ্যসাবুদ দেখিয়া আমরা আশ্বস্ত হইতে পারিতেছি না। তাঁহারা আসলে কিছু একটা লুকাইতে চাহিতেছেন। আত্মঘাতী বোমার জন্ম মানুষের আত্মহত্যা প্রবণতায় হয় নাই, পরহত্যালিপ্সাও এই বোমার জননী নহেন। এসলাম ধর্মের মূলসূত্র ধরিয়া যতই টানাটানি করিবেন না কেন ইহার ‘মুদা’ পাইবেন না। এসলাম জীবনের সাক্ষাৎ মৃত্যুকে মহীয়ান করিয়া তুলিয়াছে বলিয়া যে প্রচার বহাল আছে তাহা—তালাল আসাদ দাবি করিতেছেন—মোটেও সত্য নহে।

তাহা হইলে—সিদ্ধান্ত হইতেছে—আদমবোমার জন্ম খোদ ইতিহাসে। আত্মঘাতী বোমা হইতেছে অসহায়ের শেষ সহায়। ভাষাহীনের শেষ ভাষা মাত্র। এসলামের হৃদপিণ্ডে বোমা নাই—বোমা বাঁধা নিছক কোমরবন্ধে।

আত্মঘাতী বোমার প্রকৃত ঠিকানা ইতিহাস। কিন্তু বিশেষজ্ঞ গোয়েন্দা না শোনে ইতিহাসের কাহিনী। যেমন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইয়ন এলস্টার [Jon Elster] প্রচার করিতেছেন—আত্মঘাতী বোমা মারা Jon Elster……….
ইয়ন এলস্টার
……..
সাময়িক উত্তেজনার কাজ। তিনি কি করিয়া জানিলেন এই সত্য? তিনি আরেকজন বিশেষজ্ঞের কাছে শুনিয়াছেন। এই বিশেষজ্ঞের নাম আরিয়েল মেরারি [Ariel Merari]। মার্কিন সিনেটে সাক্ষ্য দিবার সময় তিনি জানাইয়াছেন, “আত্মঘাতী বোমা ফাটাইবার পূর্বক্ষনে বোমারতদের কেহ কেহ খুব উল্লাস বোধ করে আর চরম মুহূর্তে কেহ কেহ পায় পরম পুলক।” (আসাদ ২০০৬: ৪১)

সংগত কারণেই জিজ্ঞাসা করা চলে, মরিবার পূর্বসন্ধিক্ষণে বোমারু বেচারার মনে কি ছিল তাহা আপনি জানিলেন কোন পথে? আত্মঘাতীর মনের গভীর গভীর অসুখ সম্বন্ধে আগে হইতেই আপনি জানিতেন । তাহা ছাড়া নতুন খবর আর কি এখানে আছে? আত্মহত্যা মনের বিকার মাত্র এই পূর্বধারণা না থাকিলে
Ariel Merari…….
আরিয়েল মেরারি
…….
আত্মহত্যাকারীর মনের খবর পাইয়াছি পাইয়াছি বলিয়া চীৎকার করিলে তাহা কোন অর্থই বহন করিত না।

আত্মঘাতী বোমারু মনোবিকার—পণ্ডিতেরা কল্পনা করেন—দুই প্রকার। এক নম্বরে, মাথা খারাপ হইয়া গেলেই লোকে এহেন কাণ্ডে মাতে। সকলেই বলেন না এই কথা, তবে অনেকেই বলেন। দুই নম্বরে বলা হয়, সমাজ ও সভ্যতার সহিত খাপ খাওয়াইতে অসমর্থ হইয়া কিছু লোক আত্মঘাতী বোমার ঝুড়ি বাছিয়া লইতেছে। মনে রাখিবেন এইখানে সমাজ বলিতে বুঝিতে হইবে—পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সাম্রাজ্য।

বোমা বিশারদগণ একই মুখে দুই কথা বলিতে কদাচ কসুর করেন না। একমুখে তাঁহারা বলেন—বোমারু যোদ্ধাটি খুব হিমশীতল মাথায় বোমা ফাটাইল। ইহার অর্থ নিজের উপর উহার নিয়ন্ত্রণ ষোল আনা আছে। দোসরা মুখে তাঁহারা বলিবেন—অন্য লোকে, মানে মন্ত্রণাদাতারা তাহাকে শিখাইয়া পড়াইয়া এই গর্হিত কর্মে নামাইয়াছে। যোদ্ধাটি—ইহার মানে দাঁড়াইল—খুবই উনো বুদ্ধির লোক আর তাঁহার মন্ত্রণাদাতৃমণ্ডলী ভারি দুনো লোক। তাঁহারা সাংঘাতিক, ভয়াবহ রকমের নিদয়া, নিঠুর, পাঁজি।

তালাল আসাদ প্রমাদ গণিতেছেন ইহাঁদের। ব্যাখ্যা দিবার ছলে তাঁহার শুদ্ধ নতুন সমস্যা হাজির করিতেছেন। আমাদের জ্ঞানচক্ষু মুছিয়া আসিল বলিয়া, আসাদ বলিলেন, আত্মঘাতী বোমারু বোমাবাজিতে নিজের ইচ্ছায় নামুন আর পরের সাধ্যসাধনায়ই নামুন কিছুই যাইয়া আসিতেছে না। নামাটা কাজের শর্ত [Conditions] মাত্র, ব্রত বা মতলব [motives] নহে।

কেহ কেহ বলিতেছেন আত্মঘাতী বোমাবাজি নিছক মনের ভুলে করিবার মতন কাজ নহে। ইহার জন্ম মনের শুদ্ধে বটে। কী সেই শুদ্ধ? মহাপরাক্রমশালী, অজেয় অপার শত্রুর সমক্ষে পড়িয়া—তাহার দয়ামায়াহীন যাঁতাকলে পিষ্ট হইয়া যুগপৎ নিজ ও পরকে ধ্বংস করিবার পথ ছাড়া তাহার সামনে আর কোন সড়ক থাকে না। আবার কেহ কেহ বলেন এসলাম ধর্মীয় শিক্ষাদীক্ষাই সমস্ত নষ্টের গোড়ায়। মাথাধোলাই করিয়া আত্মঘাতী বানাইবার কারখানারই অপর নাম এসলাম—বলিতেছেন পাশ্চাত্য বিশেষজ্ঞগণ। ফিতার ভিতর অচিন ভাষায় রেকর্ড করা বিবৃতি শুনিয়া তাঁহারা নিশ্চিত হন আত্মঘাতীর মনের প্রকৃত সত্য ধরা পড়িয়াছে। অথচ তাঁহারা ভুলিতেছেন এই মুখস্থ ভাষা আচার মাত্র।

সত্য কি আসলে তাহাই? আসাদ বলিয়াছেন—বিশেষজ্ঞদের মতলব বিশেষ করিয়া বিচার না করিলে এইখানে ঠকিবার সম্ভাবনা প্রবল। বোমাব্রত ব্যক্তি ধর্মীয় শিক্ষার আলোকে জীবনের জায়গায় মৃত্যুকে বাছিয়া লইল। ইহাতে প্রমাণিত হইতেছে কী? হইতেছে যে ধর্ম এহেন শিক্ষা প্রচার করে সেই ধর্মের জীবনাদর্শ মৃত্যু, তাহার সংস্কৃতি মরণের মহোৎসব মাত্র। অথচ এই যুক্তির প্রণেতা ও প্রচারকগণ ভাবিয়া দেখেন নাই—আত্মঘাতী বোমার ব্রত বা লক্ষ্য মৃত্যু নয়, মৃত্যু এক প্রকার পরিণতি মাত্র। [But death here is an effect not a motive] (আসাদ ২০০৬: ৪২) ব্রতসন্ধানী পশ্চিমা পণ্ডিতসমাজ—আপাতত মনে হইতেছে এই সমালোচনায়—তেমন বিব্রত হইবেন না।

আত্মঘাতী বোমার ব্যাখ্যাস্বরূপ পশ্চিমা পণ্ডিতসমাজের অনেক ব্যাখ্যাই পূর্বসংস্কারের পরিমার্জনা বৈ নয়। লাভের মধ্যে, ধর্মপরায়ণতা (religious subjectivities) ও দুনিয়াবী গায়ের জোর বা রক্তপাত (political violence) সম্বন্ধে অনন্ত স্বাধীনতাবাদীগণ (liberals) কী চিন্তা করেন তাহার পরিচয় পাইলাম। বোমা বা এসলাম সম্পর্কে নতুন কিছু জানা হইল না।

পশ্চিমা সাম্রাজ্যের ধুরন্ধরগণ বলিতেছেন আত্মঘাতী বোমা এসলাম ধর্মীয় চিন্তাধারার ফসল। তালাল আসাদ এই ব্যাখ্যা সঠিক মনে করেন না। ধুরন্ধরগণ প্রমাণ করিতে চাহেন আত্মঘাতী বোমা বোমাবাজগণের ব্রতের (বা মোটিভেশনের) ফসল। ধর্মবিদ্যার খ্যাতনামা পণ্ডিত আইভান স্ট্রেনস্কি [Ivan Strenski] বলিতেছেন বোমা ফাটাইয়া আত্মহত্যা করিবার ব্রত এক ধরনের ধর্মীয় আত্মোৎসর্গ বা জান ‘কোরবানি’ বৈ নহে। গবেষক বেগম মে জায়ুসি লিখিয়াছেন এই জাতীয় আত্মোৎসর্গের আসল উদ্দেশ্য রাষ্ট্রনৈতিক নিপীড়ন ও অপমান হইতে মুক্তির প্রয়াস, তবে শেষ বিচারে ইহাও আত্মদানের মতন ধর্মীয় বিশ্বাস হইতেই জন্ম লইয়াছে।

আরেকজন বিশারদ, ফরাসিদেশের রাষ্ট্র-বৈজ্ঞানিক ব্রুনো এতিয়ন, একই পথে জানাইতেছেন আত্মঘাতী বোমা আরব জাতির অস্থিমজ্জায় প্রোথিত ‘মরণকামড়’ (বা ‘ডেথ উয়িশ’) বৈ নহে। এই তিন ব্যাখ্যার সামান্য দিক—তালাল নির্ণয় করিয়াছেন—আর কিছু নহে, এক ধরনের ব্রত বা মোটিভ। সেই ব্রত মৃত্যু। মৃত্যু কেন? কারণ এসলাম ধর্ম জীবনের সাক্ষাৎ মৃত্যুকে ঢের মহিমাযোগে দেখিয়া থাকে। এসলাম তাঁহাদের মতে এক জাতীয় ‘মরণ সভ্যতা’ (বা ‘কালচার অব ডেথ’)।

আইভান স্ট্রেনস্কি যাত্রা করিয়াছেন ফরাসি সমাজ-বৈজ্ঞানিক এমিল দুর্খাইমের আত্মহত্যাবিদ্যা হইতে। দুর্খাইমের অনুসারী বলিয়া পরিচিত একজন বৈজ্ঞানিক পণ্ডিতের নাম হাবোয়াকস [Halbwacks]। তিনি আত্মহত্যা [suicide] ও আত্মোৎসর্গের [sacrifice] মধ্যে ভেদ দেখিয়াছেন। এই ভেদ কি তাহা জানিবার প্রধান উপাদান সমাজ। সমাজ দুই জিনিশকে এক চোখে দেখে না। আত্মনিগ্রহ বা আত্মহত্যার সঙ্গে সমাজের অনুমোদন যখন যোগ করা হয় তখন তাহা আচারানুষ্ঠানযোগেই [ritual] করা হয়। শুদ্ধ কি তাহাই? আত্মোৎসর্গ মানে ‘পবিত্র করিয়া তোলা’। লাতিন শব্দ সাক্রিফিকিয়ুম [sacri-ficium] অর্থও ইহা বৈ নহে। (যাহা হইতে ইংরেজি বুলি ‘স্যাক্রিফাইস’ আসিয়াছে)। স্ট্রেনস্কি দেখাইতে চাহেন ফিলিস্তিনি ivan-strenski.jpg……..
আইভান স্ট্রেনস্কি
……….
মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মঘাতী বোমা ফিলিস্তিনি জাতি (বা উম্মা) সমীপে বোমারুর আত্মোৎসর্গ বা উপহার (আরবি ‘হাদিয়া’) মাত্র। আদমবোমা জেহাদি যোদ্ধার বিবেচনায় যুদ্ধের কৌশলও বটে। স্ট্রেনস্কি তাহা অস্বীকার করিতেছেন না। তারপরও তিনি যোগ করিতেছেন এই ঘটনার প্রকৃত বিচার করিতে হইলে ইহার ধর্মীয় ভিত্তিটুকু হিসাবে লইতেই হইবে। তাঁহার মতে আত্মোৎসর্গের সহিত রক্তপাতের সম্বন্ধ অঙ্গাঙ্গী। তাঁহার বিচারে ধর্ম মানেই আত্মনিগ্রহ বা আত্মোৎসর্গ। অতয়েব রক্তপাতে বিলম্ব কেন?

স্ট্রেনস্কির কহতব্য কতখানি যুক্তিসম্মত? তালাল আসাদ মনে করেন স্ট্রেনস্কি বৃথাই দুর্খাইমের নাম ভাঙ্গাইতেছেন। দুর্খাইম দেখাইয়াছিলেন আত্মহত্যা যদিও এই দুনিয়ার মধ্যে মনুষ্যসন্তানের সবচেয়ে বেশি আপন বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত তথাপি ইহার মধ্যে অপর বা সমাজ নানাভাবে জড়াইয়া থাকে।

তালাল আসাদ মনে করেন এমিল দুর্খাইম [Emile Durkheim] বাঁচিয়া থাকিলে আত্মঘাতী বোমার ঘটনাকে ‘পরার্থপর বা পরোপকারী আত্মহত্যা’ [altruistic suicide] বলিয়া গণিতেন। অথচ স্ট্রেনস্কি একহাতে এই ঘটনাকে কৌশলে ব্যক্তির ব্রত বলিয়া ধরিয়া রাখিয়াছেন, আবার অন্যহাতে ইহার সহিত আচার (বা রিচুয়াল) যোগ করিয়াছেন। এইভাবে ব্যক্তির সহিত, সমাজকে পাশ কাটাইয়া, ধর্ম যোগ করিয়াছেন তিনি । করিয়া প্রমাণ করিলেন (এসলাম) ধর্মই আত্মহত্যা বোমার জননী।

তালাল আসাদের দ্বিতীয় মন্তব্য অনুসারে এসলাম ধর্মে আত্মোৎসর্গ বলিয়া কিছু নাই। যাহা আছে তাহা হইল পশু জবাই [আরবি ‘জবিহা’] করা। ইহার যুক্তি: আল্লাহ আদেশ করিয়াছেন পশু হত্যা করিবে, যেন তোমার মানুষ হত্যা না করিতে হয়। ইহাই হজরত ইব্রাহিম শিখিয়াছিলেন। কোরবানির সময় ইহাই পালন করা হয়। আরেক ধরনের উৎসর্গ করা কোন বিপদ বা ফাঁড়ার
emile_durkheim.jpg………
এমিল দুর্খাইম
………..
হাত হইতে বাঁচিয়া উঠিলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ওয়াস্তে করা হয়। তেসরা ধরনের উৎসর্গ হয় কোন অতিশয় অন্যায় বা ভ্রান্তির হাত হইতে ফিরিয়া আসিবার পর খেসারত (বা ‘কাফফারা’) স্বরূপ। আত্মঘাতী বোমারুর কৃত্য ইহাদের কোনটার সহিতই মিলিতেছে না। তাই বাধ্য হইয়া স্ট্রেনস্কিকে নাস্তি, নাস্তি বলিতে হইবে।

তিন নম্বর কথা, স্ট্রেনস্কি আত্মোৎসর্গ কথাটি আরবি ‘কোরবান’ শব্দের তর্জমা আকারেই ব্যবহার করিয়াছেন। কিন্তু আরবিতে কোরবান মানে কখনো ‘হাদিয়া’ বা উপহার দাঁড়ায় না। অথচ তিনি দুই অর্থকে গুলাইয়া যে অপূর্ব খিচুড়ি করিয়াছেন তাহা আরবিভাষাভাষি খ্রিস্টান জাতির সম্পদ মাত্র। হজরত ঈসা—আল্লাহ তাঁহার নাম অনুমোদন করুন—নিজেকে ‘উপহার’ দিতে পারেন। তিনি পিতার কাছে ফিরিবার হকদার। অন্যের বিশেষ মুসলমানের সেই হক কই? কোরবান কথাটা পবিত্র কোরান গ্রন্থে যে তিন জায়গায় পাওয়া যাইতেছে (৩: ১৮৩, ৫: ২৭ এবং ৪৬: ২৮) তাহাদের কোনটাতেই স্ট্রেনস্কির ধারণার সমর্থন পাওয়া যাইবে না। (আসাদ ২০০৬: ৪৪)

এতক্ষণে আশা করি আইভান স্ট্রেনস্কির ব্রত কি তাহার পথ পরিস্কার হইয়াছে। তিনি দাবি করিতেছেন আত্মোৎসর্গের সিদ্ধান্ত যিনি লইতেছেন ইহা তাহার ব্রত মাত্র। এই ব্রত হইতে অপরাধ জন্ম লইতেছে। অনেকে যে বলিয়া থাকেন এসরায়েল রাষ্ট্রের পাশবিক দমন ও পীড়ন-নীতির কারণে আত্মঘাতী বোমার বিস্তার তাহা ঠিক কথা নহে—ইহাই স্ট্রেনস্কির দাবির নির্গলিতার্থ।

স্ট্রেনস্কি এই এক ঢিলে দুই পাখি বধ করিতে চাহিয়াছেন। তিনি একে তো প্রমাণ করিলেন এই বোমাপরাধ ধর্ম হইতে জাত। সুতরাং ইহাকে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ বলিয়া ডাকা যাইবে। দ্বিতীয় স্থানে প্রমাণিত হইল অপরাধের দায় খোদ বোমাবাজের। কাজেই এসরায়েল দেশের বিপদ কোথা হইতে আসিতেছে তাহাও সনাক্ত হইল। অতয়েব এই বিপদ হইতে ত্রাণ পাইতে হইলে যাহা যাহা করা দরকার (রক্তপাতের চৌহদ্দি আরো বাড়াইয়া লওয়া তাহার মধ্যে) তাহা তাহা করিবার অধিকার এসরায়েলের হাতে প্রকাশ্যে সংরক্ষিত রহিল।

মে জায়ুসি [May Jayyusi] নামী একজন গবেষকও এই একই ধারণা গ্রহণ করিয়াছেন। তিনিও ধরিয়া লইয়াছেন আত্মঘাতী বোমাবাজি এক প্রকার জান কোরবানির বিষয়। তিনিও বিশ্বাস করিতেছেন এসলামের সহিত ‘মরণ
may.jpg………
মে জায়ুসি
………
সভ্যতা ’ বা কালচার অব ডেথ’ কথাটি জোড়া লাগাইয়া দেওয়া যায়। তালাল আসাদ বলিতেছেন, ইহাতে আমরা যে সমস্যার সমাধান খুঁজিতেছি—অর্থাৎ আত্মঘাতী বোমার কারণ নির্ণয় করিতেছি—তাহার কোন রাহা কিন্তু হইতেছে না। ‘মরণ সভ্যতা’ শুদ্ধ এসলামের মৌরসী সম্পত্তি হইবে কেন? ‘অনন্ত স্বাধীন’ গণতান্ত্রিক সভ্যতাও কি গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার জন্য মরণকে তুচ্ছ করিবার শিক্ষা দেয় না? না দিলে ন্যায়যুদ্ধ কথাটি কি সোনার পাথরবাটি শোনাইত না?

জায়ুসিও দেখিয়াছেন জাতির ওয়াস্তে আত্মদানই ফিলিস্তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মঘাতী বোমা বুকে বাঁধিবার আসল উদ্দেশ্য। ইহাকে তিনিও এসলামি সভ্যতার শরিক বলিয়া ধরিয়া লইয়াছেন। তবে তাঁহার বিচারে এসলাম এই ঘটনার কারণ নহে। কারণ এসরায়েল রাষ্ট্রের দমননীতির মধ্যে খুঁজিতে হইবে। আত্মঘাতী বোমার উৎপত্তি, জায়ুসির বিচারে, অসলো [Oslo] চুক্তির পর। ফিলিস্তিনের জাতীয় মুক্তির সম্ভাবনা সুদূর পরাহত হইয়াছে এই চুক্তির কারণে। ফলে যে জাতীয় হতাশা গোটা জাতিকে গ্রাস করিয়াছে ইহাতে তাহারই প্রতিফলন ঘটিয়াছে।

জার্মান এয়াহুদি বংশোদ্ভূতা মার্কিন দার্শনিক ও রাষ্ট্র-বৈজ্ঞানিক খানম হানা আরেন্টের [Hanna Arendt] বরাত দিয়া বেগম জায়ুসি বলিয়াছেন এসরায়েলের নিপীড়ন ও অপমানজনক ব্যবহার হইতেই ফিলিস্তিনি জাতির সদস্যগণের মনে ন্যায়সংগত ক্রোধের সঞ্চার ঘটিয়াছে। এই ক্রোধেরই অপর নাম দাঁড়াইয়াছে আত্মঘাতী বোমা। কিন্তু সত্যের খাতিরে তিনিও কবুল করিলেন এখানে রক্তপাত বা ‘ভায়োলেন্স’ আসল কথা নহে, আসল কথা স্বাধীনতার স্পৃহা।

যখন আইনসঙ্গত রাজনীতির পথ বন্ধ করিয়া দেওয়া হয় তখন রাজনীতির পানি আপনার পথ করিয়া লয় রক্তপাতের পথে। হানা আরেন্ট বলিয়াছিলেন, দেশের রাষ্ট্রনীতিতে শরিক হইতে না পারিলে মানুষ মানুষই হইয়া উঠিতে পারিত না। রাষ্ট্রনীতি যাহার মাধ্যমে ব্যক্ত হয় না তাহাকে ‘ব্যক্তি’ বলা মানে ভাষার সর্বনাশ করা মাত্র। আর রোমক সাম্রাজ্যের পতনের আগে বা আরো বিশদ বলিতে ঈসা পয়গম্বরের আগের যুগে মানুষের অমর হইবার পথ শুদ্ধ রাষ্ট্রনীতির জমিতেই কাটা ছিল। খ্রিস্টধর্ম সেই পথ টানিয়া ধর্মের জগতে আনিয়াছে।

তাহা হইলে বলিতে হইবে, মে জায়ুসির বিচার আইভান স্ট্রেনস্কির জমি হইতে সরিয়া আসিয়াছে খানিকটা। তিনি ধর্মীয় আত্মোৎসর্গকে রাষ্টীয় স্বাধীনতা ও অমরতার বাসনার সহিত যোগ করিয়াছেন। ইহাতে ভুল বোঝাবুঝির একটুখানি ছুটি থাকিয়াই যাইতেছে। যেমন স্ট্রেনস্কি ‘শহিদ’ কথাটি শুদ্ধ ধর্মীয় আচার আকারে গ্রহণ করিবার উপদেশ দিতেছেন। কিন্তু ফিলিস্তিনের সংগ্রামে যাহারা এসরায়েলি সেনাবাহিনীর বা পুলিশের গুলিতে মারা যাইতেছে তাহাদের সকলকেই শহিদ বলা হয়; কেবল আত্মঘাতী যোদ্ধাদেরই শহিদ বলা হয় না। শহিদের মৃত্যু মানে ধরা হয় বিজয়, কোনক্রমেই আত্মোৎসর্গ বা পরাজয় নহে।

ফরাসি রাষ্ট্র-বৈজ্ঞানিক ব্রুনো এতিয়েন (Bruno Etienne) উত্তর আফ্রিকা বিশেষজ্ঞ। তিনি আলজিরিয়ার ইতিহাস ঘাঁটিয়া প্রমাণ করিয়াছেন আরব জগতে রক্তপাতের ঐতিহ্য অনেক লম্বা। তাঁহার বিশ্লেষণ পড়িয়া দেখিলে মনে হয় তিনি ফিলিস্তিনের আত্মঘাতী বোমাযুদ্ধ আর উত্তর আফ্রিকার ঐতিহ্য পরস্পরের আত্মীয় বলিয়া চিনিতে পারিয়াছেন। কিন্তু ইহাদের মধ্যে কাহার স্থান কারণস্বরূপ আর কাহার স্থান কার্যস্বরূপ তাহা বলিতে তিনি ব্যর্থ হইয়াছেন। (আসাদ ২০০৬: ৫১)

যুক্তির এই ধাতুদৌবর্ল্য হ্রাস করিবার মানসে এতিয়েন করিয়াছেন কী? তিনি আশ্রয় লইয়াছেন মহাত্মা ফ্রয়েডের। ফ্রয়েড বলিয়াছিলেন মানুষ সমাজের আদ্যাবস্থায় যে বড় অপরাধটি করিয়াছিল অর্থাৎ গোত্রপিতার জীবননাশ করিয়াছিল পশুহত্যা তাহারই পুনরাবৃত্তি বৈ নহে। আত্মহত্যা বা আত্মোৎসর্গ—পশুহত্যার মত—প্রকৃত প্রস্তাবে পিতৃহত্যারই পুনরাবৃত্তি। এই শেষোক্তস্থলে হননেচ্ছা শুদ্ধ ‘হাদিয়া’ বা উপহার আকারে হাজির থাকে। পার্থক্য শুদ্ধ এইটুকু।

এতিয়েন এই যুক্তির শরণ লইয়া বলিতেছেন এসরায়েল রাষ্ট্রের সর্বশক্তিমান নিপীড়নের মুখে আরব জাতির অসহায় পরাজয় আরবদের মনে আত্মধিক্কারের জন্ম দিয়াছে। এসরায়েলের তৈয়ারি বিশাল বিশাল দেওয়াল আর সীমান্তচৌকি সেই ধিক্কার পাকা করিয়াছে। এই সকল দ্রব্য অবজ্ঞা ও ঘৃণা উৎপাদন করিতেছে আর আত্মগ্লানিকে পরহত্যা বাসনায় রূপান্তরিত করিতেছে।

এতিয়েনের এই প্রস্তাব কতখানি যুক্তিসংগত? এই প্রশ্ন তালাল আসাদ তুলিয়াছেন। এতিয়েন প্রকৃত প্রস্তাবে ফ্রয়েডের ‘মরণ কামড়’ (বা ‘ডেথ উয়িশ’) কথাটি বুঝিতেই পারেন নাই। ফ্রয়েডের বিচারে ‘জীবনতৃষ্ণা’ ও ‘মরণ কামড়’ সমানে সমান, প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই সক্রিয় এই দুই বাসনা। অজ্ঞান হইতে তাহারা আসা যাওয়া করেন জ্ঞানের বা সংজ্ঞার জগতে। এতিয়েন সেখানে হাত দিয়া একটাকে প্রধান করিয়া তুলিয়াছেন। কিন্তু যুক্তি কোথায় এই হস্তক্ষেপের পশ্চাতে?

তাঁহার দাবি অনুসারে যখন রাষ্ট্রনৈতিক জীবনে শরিক হইবার সুযোগ বন্ধ হইয়া যায়—ফিলিস্তিনে তাহাই ঘটিয়াছে বৈ কি!— তখন মানুষের বাড়তি যে জীবনীশক্তি ছিল তাহা উপচাইয়া উপচাইয়া ‘মরণ কামড়’ আকারে প্রকাশ পায়। তাঁহার এই বক্তব্যের সহিত ফ্রয়েড প্রবর্তিত ‘মরণ কামড়’ ধারণার কোনই সংযোগ নাই। এই কল্পিত সংযোগ অনুমান করিয়া তিনি বলিয়াছেন রাজনৈতিক কল্পনায় টান পড়িয়াছে বলিয়াই ফিলিস্তিনী মুক্তিযোদ্ধারা আত্মঘাতী বোমার ভার বহন করিতেছেন। কিছুক্ষণ আগে আমরা দেখিলাম মে জায়ুসি ইহার বিপরীত অনুমানই সিদ্ধ মনে করিয়াছেন। জায়ুসি বলিয়াছেন—রাজনীতি যে অমরত্ব দেয় সেই অমরত্ব লাভের বাসনা বা অনন্ত জীবনতৃষ্ণাই আত্মঘাতী বোমার জননী। আর এখন এতিয়েনের মুখে শুনিতেছি মন্থরার বাণী—মানুষ মরিতে চাহে বলিয়াই আত্মঘাতী বোমার কারখানা বসায়!

এতিয়েনের এই ধারণার গোড়াও রহিয়াছে হানা আরেন্টের আরেকটি ভ্রান্ত-ধারণায়। আরেন্ট একা নহেন, সকল অনন্ত স্বাধীনতাবাদী বা লিবারেল দার্শনিকই মনে করেন রক্তপাত ও রাজনীতি ভাই ভাই ঠাঁই ঠাঁই। একের যেখানে সারা অন্যের সেখানে শুরু। রক্তপাত ও রাজনীতি যে একে অপরের গাত্র জড়াইয়া সর্বদা মাখামাখি করিতেছে ইহা তাঁহাদের শিখাইবে কে? আমার সে সাধ নাই। পশ্চিমা সাম্রাজ্যের ভিত্তি পশ্চিমা দেশের ইতিহাসে। সেই শিক্ষা সেখানেই আছে। সতের শতকের ইংরেজ দার্শনিক জন লকই দেখাইয়াছেন রক্তপাত বিহনে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘটে নাই। এখন যে কথা যোগ করা দরকার তাহাও এই : রক্তপাতের একচ্ছত্র অধিকার রাষ্ট্রের হাতে যতদিন থাকিবে না ততদিন রাষ্ট্রও নাই।

কাজেই ফিলিস্তিনি পামররা রাজনীতি না বুঝিয়া বোমাব্রত ধারণ করিয়াছে—ইহাকে শুদ্ধ ফিলিস্তিনি জাতির অপমান বলিলেই হইবে না। বলিতে হইবে ইহা ‘অনন্ত স্বাধীন’ বা লিবারেল চিন্তার ধাতুদৌর্বল্যও বটে।

কোন ব্যক্তিমানুষ কোন পথে নিজের জীবন শেষ করিতে চাহে তাহার কোন সরল ব্যবস্থাপত্র আর যিনিই লিখিয়াই থাকুন, মহাত্মা ফ্রয়েড লিখিয়া রাখেন নাই। এতিয়েন বলিতেছে আত্মঘাতী বোমারু দুশমনের মধ্যে নিজের ছায়া দেখিতে পাইয়াছে। তাই তাঁহাকে হত্যা করিয়া সে আসলে আপনাকেই শেষ করিল, ‘মরণ কামড়’ চরিতার্থ করিল। আপন পরের এই অভেদ যদি সত্য সত্য সত্যই হইত তবে আত্মহত্যা না করিয়া আর আর মানুষ সমর ঘোষণা করিতেছে কেন? যুদ্ধকে আত্মহত্যা বলা যায় রূপক অর্থে। তাই আন্তর্জাতিক আইনে যখন বলা হয় কোন কোন রাষ্ট্রের পরমাণুবোমা ব্যবহার করার অধিকার আছে তখন তাহাকে আত্মহত্যার অধিকার বলিয়াও গ্রহণ করা যায়।

আত্মহত্যার ইচ্ছা যদি অজ্ঞান হইতে আসিয়া থাকে তবুও সজ্ঞান মনের মধ্য দিয়াই তাহাকে পথ চলিতে হয়। যুদ্ধ ঘোষণার বেলায়ও ইহা সত্য। যুদ্ধ ঘোষণা ব্যক্তির ইচ্ছা ছাড়াইয়া জাতি বা রাষ্ট্রের বা নিদেনপক্ষে শ্রেণীর ইচ্ছা পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়া আসে। ইহাও আগ্রাসন বা ধ্বংসাভিলাষ বটে। কিন্তু লিবারেল দার্শনিকরা বলিতেছেন মানুষ যত সভ্য হইতেছে ততই যুদ্ধ কমিয়া আসিতেছে। মানুষের ইতিহাস এই বক্তব্য কিন্তু সমর্থন করিতেছে না। তালাল আসাদ বলিয়াছেন তথাকথিত অসভ্য জাতিগণের সাক্ষাৎ সভ্য জাতির যুদ্ধ করিবার ইচ্ছা অনেক বেশি। মানুষের সভ্যতার ইতিহাস তাহার যুদ্ধাভিলাষ দমনের ইতিহাস বলিয়া মনে হয় না। ‘প্রগতি’ শব্দের আর যে অর্থই থাকুক—এই অর্থ করা যাইতেছে না।

ফ্রয়েড বলিয়াছেন মানুষের মনে অপরাধবোধ জাগিলে পরহত্যাভিলাষ কিছু কমিয়া আসে। সভ্যতার প্রগতি বলিতে ফ্রয়েড এই অপরাধবোধের প্রগতিই বুঝিয়াছেন। কিন্তু তাহা আত্মহত্যার ঝোঁক বাড়ায় এমন কথা ফ্রয়েড বলিয়াছেন বলিয়া আমাদের জ্ঞানে নাই। তালাল আসাদ এক জায়গায় বলিয়াছেন যুদ্ধের সময় আত্মহত্যার সংখ্যা কমিয়া আসে—এই কথা সত্য হইলেও আমরা নিশ্চিত নহি এই কথা পৃথিবীর ইতিহাস হিসাবে সত্য। ফ্রয়েডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার জাক লাকাঁ কহিয়াছেন মানবজাতির ইতিহাসে প্রবর্তিত ‘প্রগতি’ কথাটি ভুয়া।

রবার্ট পেপে [Robert Pape] নামক একজন মার্কিন রাষ্ট-বৈজ্ঞানিক দাবি করিতেছেন—আত্মহত্যার বোমা আসলে যুদ্ধের কার্যকর কৌশল। প্রমাণ সকলেই এই পদ্ধতি ব্যবহার করে, শুদ্ধ ফিলিস্তিনিরা নহে। তিনি শ্রীলংকার দৃষ্টান্ত দিয়াছেন। ১৯৮০ হইতে ২০০১ সালের মধ্যে পৃথিবীতে একুনে ১৮৮টি আত্মঘাতী বোমা হামলার নিকাশ করিয়া তিনি দেখাইয়াছেন ইহাদের মধ্যে ৭৫টি ঘটনা একলা শ্রীলংকার তামিল মুক্তিযোদ্ধারাই ঘটাইয়াছেন।

পেপের গবেষণা দুই জায়গায় খতরনাক সিদ্ধান্ত টানিতেছে। আত্মঘাতী বোমা
pape_robert_print.jpg……
রবার্ট পেপে
……….
হামলা আসলেই কি তেমন কার্যকর পদ্ধতি? ফিলিস্তিনি সংগ্রামের ইতিহাস কি তাহা প্রমাণ করিতেছে? আত্মঘাতী বোমার প্রকোপবৃদ্ধির পর এসরায়েলের পক্ষে পশ্চিমা সাম্রাজ্যের জনমত আরও সবল হইতেছে বলিয়াই মনে হয়। ফিলিস্তিনি মুক্তিসংগ্রাম ১৯৬০ সালের দশক হইতে কত কৌশলেরই না আশ্রয় লইয়াছে! তাহা হইলে ফিলিস্তিনি সংগ্রামের আত্মঘাতী কৌশল ও তাহার পায়ের তলার এসলামি সভ্যতা লইয়া পশ্চিমা জ্ঞানজগতে এত শোরগোল পড়িয়াছে কেন? ইহার উত্তর কিছু পরিমাণে তালাল আসাদও লিখিয়াছেন তাঁহার তৃতীয় প্রস্তাবে। আমরাও যথাস্থানে—আদমবোমা: ৩ প্রবন্ধে—তাহা লিখিব।

এক্ষণে শুদ্ধ বলিব আত্মঘাতী বোমাকে বিশেষ ব্রতের ফসল হিসাবে দেখিবারই কুফল এই এসলামবধ কাব্য। ধর্মের (বিশেষ এসলামের) ব্রত হইতে আত্মঘাতের উদ্ভব বলিতে পারিলে অনেক লাভ আছে। ফলে একদিকে মনস্ততত্ত্ব, অন্যদিকে সভ্যতা এই দুই কুলই রাখা যাইতেছে। ‘মনস্তত্ব’ মানে অপরাধ নির্ণয়ের পরিচিত ফৌজদারি আদালতসম্মত পদ্ধতি—অপরাধীর মনে কী আছে তাহা জানা হইল। আর ‘সভ্যতা’ মানে আমরা ও তাহারা—সভ্য ও অসভ্যজাতি—যে এক নই তাহা স্পষ্ট হইল। সভ্যতা জীবনতৃষ্ণা নিবারণ করিতেছে আর ‘বর্বরতা’ (গতকল্য যাহা ‘বন্য’ ছিল) ‘মরণ কামড়’ খাইতেছে। আহা কী আনন্দ বিচার ও বিশ্লেষণে, কী অপূর্বমিলন মণি ও কাঞ্চনে!

তালাল আসাদের বিচার্য শেষ বিশেষজ্ঞের নাম রোক্সান এয়ুবেন (Roxanne Euben)। ইনিও দার্শনিক রাষ্ট্র-বৈজ্ঞানিক হানা আরেন্ট হইতে শুরু করিয়াছেন কিন্তু শেষ করিয়াছেন অন্য জায়গায়। মে জায়ুসির মতো ইনিও বলিবেন আত্মঘাতী বোমা ফিলিস্তিনের সংগ্রাম বা তাহার মুক্তিযুদ্ধের কৌশল ইহাতে সন্দেহ নাই। তবে এই কৌশলের গোড়া নিছক এসলাম ধর্মের বিশ্বাসে পোতা বলিয়া ইনি জাহির করেন নাই। ইহা কম কৃতিত্বের কথা নহে।

এয়ুবেন দাবি করিয়াছেন এসলামি পরিভাষায় যাহাকে ‘জেহাদ’ বলা হইয়াছে তাহার তাৎপর্য শুদ্ধ পরকালের দরজা খোলার চাবিতে খুঁজিলে চলিবে না। একই সঙ্গে ইহাকে দুনিয়াবি ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে অন্ধ রক্তলোলুপ হত্যার উৎসব হিসাবে দেখাও ঠিক হইবে না। তাহা হইলে ‘জেহাদ’ ঠিক কী বস্তু?

হানা আরেন্টের সন্ধ্যাভাষা (বা ডিসকোর্স) ব্যবহার করিয়া বেগম এয়ুবেন জাহির করিতেছেন জেহাদ এক জাতীয় রাজনীতি, যে রাজনীতির লক্ষ্য দুনিয়াবি জীবনের নশ্বরতা পার হইয়া অবিনশ্বর জীবনের স্বাদ পাওয়া। কিন্তু এই অবিনশ্বরতার পথ এই নশ্বর জীবনবেদের ভিতরেই প্রাপ্তব্য। সেই জীবনবেদ আর কী হইতে পারে? তাহার নাম এই দুনিয়ার ন্যায়ের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা [‘the founding or recreating a just community on earth’]। (আসাদ ২০০৬: ৫৬)

হানা আরেন্ট ও অন্যান্য লিবারেল দার্শনিক মনে করেন রাষ্ট্র ও রক্ত যেনবা তেল ও জলের মতন, একে অপরের সহিত মিশিতে পারে না। রাষ্ট্র মানে রক্তপাতের অবসান—আর সতত-সম্মতির শুরু। কিন্তু আরেন্টের এই ধারণার সহিত এয়ুবেন একমত নহেন। তিনি সঙ্গত কারণেই প্রস্তাব করিতেছেন
hanna_arendt.jpg…….
হানা আরেন্ট, ১৯০৬-১৯৭৫
………
রক্তপাত ছাড়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হইলেও হইতে পারে কিন্তু রক্তপাতের সম্ভাবনা বাদ দিলে রাষ্ট্র রাষ্ট্রই হইত না। (আসাদ ২০০৬: ৫৮) রক্তপাত জিনিশটা খারাপ কিন্তু এই খুনখারাপি বাদ দিলে রাষ্ট্রের মঙ্গল প্রতিষ্ঠিতও হয় না, ধারণও করা যায় না ।

কথার শেষ কিন্তু এখানেই হয় নাই। রক্তপাত শুদ্ধ একদিন করিয়াই রাষ্ট্র ক্ষান্ত দিলেই তাহা হইত। কিন্তু নিরব রক্তপাতই রাষ্ট্রের নিত্যদিনের কর্মসূচি। রক্তপাতের অধিকার একদিনও যদি স্থগিত থাকে তো কোন ‘অনন্ত স্বাধীন’ রাষ্ট্রই অনন্ত থাকিত না, তাহার অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া শুরু হইয়া যাইত। জাতীয় দণ্ডবিধি বা ‘পেনাল কোড’ অনুসারে দণ্ডদানক্ষমতা আর আন্তর্জাতিক আইন মোতাবেক যুদ্ধ ঘোষণার সার্বভৌম ক্ষমতাই এই নিত্য-রক্তপাত। কাজেই ‘অনন্ত স্বাধীন’ রাষ্ট্রের রক্তেই রক্তপাতের নেশা ঘুমাইয়া আছে বলিলে সত্যের উপকার ভিন্ন অপকার হইবে না।

ইহা যদি সত্য না হইত তবে দুনিয়ার সর্বাধিক শক্তিশালী রাষ্ট্র যে দুনিয়া দাবড়াইয়া দাবড়াইয়া জাতীয় নিরাপত্তা কায়েম করিতেছে তাহা কী করিয়া করিত? রক্তপাতের অধিকার স্বীকার না করিলে পশ্চিমা ধনতন্ত্র আজ যে বিশ্বসাম্রাজ্য কায়েম করিয়াছে তাহাও বিধিসম্মত হইত না। শুদ্ধ তাহাই নহে এই দুনিয়া ধ্বংস করিবার অর্থাৎ পরমাণু বোমা ফাটাইয়া চলিবার অধিকারও জাতিসংঘভুক্ত ‘আন্তর্জাতিক (ন্যায়) আদালত’ স্বীকার করিয়াছে। (আসাদ ২০০৬: ৬০)

পরমাণু বোমার অধিকারও যদি সত্যাগ্রহস্বরূপ হইয়া থাকে তবে আত্মঘাতী বোমা কেন আত্মহত্যার অপবাদ একলা একলা বহন করিবে? অনন্ত স্বাধীন রাষ্ট্র আজও তাহার উত্তর দিতে পারে নাই। আত্মহত্যার আগে পারিবে কিনা সন্দেহ করিবার কারণ আছে। ঢের আছে।

ঢাকা, ২৮/১২/২০০৭

দোহাই


১. Talal Asad, On Suicide Bombing (New York: Columbia University Press, 2006).
২. Cesare Beccaria, An Essay on Crimes and Punishments, tr. anonymous, 4th ed. 1775, reprint (Boston: Branden Publishing Co., 1992).
৩. সলিমুল্লাহ খান, ‘আদমবোমা: ১- পশ্চিমা সাম্রাজ্যের বর্ণপরিচয়’, http://arts.bdnews24.com/?p=256, ৮ নভেম্বর ২০০৭

 

বিডিনিউজ, আর্টস, ২৯ ডিসেম্বর ২০০৭

 

জেমস রেনেল ও তাঁহার রোজনামচা : ১৭৬৪-১৭৬৭ (তেসরা কিস্তি)

৩য় কিস্তির ভূমিকা

rennell………
জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০)
……….

জেমস রেনেল: আরোর আরো

মেজর জেমস রেনেল খ্রিস্টিয় ১৭৭৬ সালে সরকারি চাকুরি হইতে অবসর গ্রহণ করিলেন। ইহার শুদ্ধ কিছুদিন আগে ‘বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ার’ নামক পল্টনে মেজর পদে তাঁহার উন্নতি হইয়াছিল। তখন কলিকাতায় পূর্ব ভারত কোম্পানি নিয়োজিত গভর্নর জেনারেল পদে ওয়ারেন হেস্টিংস আসীন। জেমস রেনেলের নামে মাসিক ৫০/= টাকা পেনসন মঞ্জুর করিয়াছিলেন তিনি। এই কথা আমরা পহিলা কিস্তিতেই উল্লেখ করিয়াছি। ইহার পর দেশের ছেলে দেশেই ফিরিয়া গেলেন। দেশে ফিরিবার পর জেমস রেনেল লন্ডনেই বসবাস শুরু করেন। তাঁহার বাকি জীবন খুব একটা হ্রস্ব ছিল এমন কথা বলিব না। এই নাতিহ্রস্ব জীবন তিনি নানানদেশের ভূগোলবিদ্যা আর সাহিত্য চর্চা করিয়া কাটাইয়াছিলেন।

তাঁহার বড় কীর্তি বাঙ্গালাদেশের ভূচিত্রাবলী যাহাতে হিন্দুস্তানের ঐদিককার রণাঙ্গন আর বাণিজ্যাঙ্গনের মানচিত্র সন্নিবেশিত হইয়াছে বা Bengal Altas, containing Maps of the Theatre of War and Commerce on that side of Hindoostan প্রকাশিত হয় ১৭৭৯ সালে। ১৭৮১ সালে ইহার একটি দোসরা সংস্করণও ছাপা হয়। একই বৎসরে তিনি বিলাতের—রাজসভা বা Royal Society নামেই সমধিক পরিচিত—বিজ্ঞানসাধকমণ্ডলীর সদস্য বা ফেলো নির্বাচিত হইলেন।

ইহার পর তিনি ভারতবর্ষের একপ্রস্ত মোটামুটি নির্ভরযোগ্য মানচিত্র তৈয়ারে মনোনিবেশ করিলেন। সঙ্গে একটি প্রবন্ধ বা মেমোয়ারও জুড়িয়া দিলেন। (রেনেল ১৭৮৩) তাহাতে যোগ করিলেন কোন কল্পনা ও কোন কোন গ্রন্থকারের সহায়তা লইলেন তাহার বিবরণও। এশিয়াখণ্ডের পূর্বাঞ্চল জুড়িয়া বিশাল একখণ্ড ভূগোল বই লিখিবার মওকাও তিনি করিলেন আর গ্রিক ইতিহাসবেত্তার নামে ‘এরোদোতসের ভূগোল’ নাম দিয়া তদ্বিরচিত ২ খণ্ড বহিও বাহির হইল।

আফ্রিকা মহাদেশের ভূগোল লইয়াও তিনি মাতিয়াছিলেন। ১৭৯০ সাল নাগাদ লন্ডনস্থ আফ্রিকা সমিতির ডাকে তিনি ঐ মহাদেশের উত্তর অর্ধাংশের মানচিত্রও প্রকাশ করিলেন। সঙ্গে একপ্রস্ত প্রবন্ধও। ১৭৯১ সালে বিলাতের রাজসভা তাঁহাকে কোপলে পদক (Copley Medal) প্রদান করিয়া সম্মান জানাইলেন।

বাতাস ও সমুদ্রস্রোতের গতিবিধি লইয়া গবেষণায়ও তিনি এক পর্যায়ে আগ্রহ দেখাইলেন। ১৮১০ সালের পর তিনি তাঁহার সকল গবেষণা এক জায়গায় আনিয়া কিছু সার্বিক সিদ্ধান্ত বা ‘জেনারেল থিয়োরি’ প্রকাশ করিবারও কোশেশ করিলেন।

রেনেল সাহেব যে সময় জরিপকার্য সমাধা করিতেছিলেন সেই সময় মাপজোকের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি তত উন্নত বা নিখুঁত হয় নাই। তিনি একপ্রস্ত কম্পাস ও এক বাঁও শিকল ভরসা করিয়া জরিপাদি চালাইতেছিলেন। সবে—শুদ্ধ ১৭৬১ সালে—সময় পরিমাপক যন্ত্র বা ক্রোনোমিটারের দৌলতে অক্ষাংশ মাপিবার কৌশল বাহির হইয়াছে। রেনেল তাঁহার কাজ শুরু করিয়াছেন ততদিনে মাত্র ১ বৎসর হইয়াছে। তাহা সত্ত্বেও রেনেলের জরিপ কী করিয়া এত নিখুঁত হইল তাহা একশ/দেড়শ বছর পরের পণ্ডিতসাধারণের বিস্ময় উৎপাদন করিয়াছে। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে কর্নেল ল্যামটন প্রমুখের হাতে জরিপের আরো নিখুঁত পদ্ধতি বাহির হইয়া গেলেও ভারতবর্ষের ব্রিটিশ জরিপ বিভাগ রেনেলের কর্জ চিরকাল স্বীকার করিয়াছেন।

১৭৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রেনেল মুক্তিযোদ্ধা ফকির বাহিনীর হাতে মার খাইয়া ঘা শুকাইবার নিমিত্ত ঢাকায় চলিয়া আসেন। তাঁহার জীবনীকার বলিয়াছেন ইংরেজ অফিসারদের মধ্যে ঐ বছর মে মাসে যে বিদ্রোহ দেখা দিল তাহাতে তিনি শরিক হইবার সুযোগ পান নাই। সুস্থ থাকিলে তিনি অসন্তুষ্ট অফিসারদের সঙ্গে যে যোগ দিতেন তাহা তৎলিখিত এক পত্র মারফত জানা যায়।

তথাপি সেই যুগের ইংরেজ কর্তৃপক্ষ ওরফে কলিকাতার কৌন্সিল রেনেলের এতখানি তারিফ করিলেন কেন? রেনেলের রোজনামচা সাক্ষী তিনি রোজকার কাজ কতটা মনোযোগ সহকারে সারিতেন। আবহাওয়ার প্রতি প্রহরের পরিবর্তন তিনি লিখিয়া রাখিয়াছেন—তাঁহার জরিপ যুগের (১৭৬৪-১৭৬৭) আগা হইতে গোড়া পর্যন্ত কখনও ইহার ব্যতিক্রম দেখা যায় না।

রোজনামচার সম্পাদক লা টুশ সাহেব ১৯১০ সালে লিখিত ভূমিকায় বলিয়াছেন: ‘ভারত ইতিহাসের ঐ তুলনারহিত জমানায় যখন এয়ুরোপীয় লোকজন বল্গাহীন বিলাসিতায় সময় কাটাইতেন, তখন যে কর্ম হাতে লইয়াছেন সেই কাজে একাগ্রে চিত্তনিবেশ করিবার প্রতিভা তাঁহার ছিল বলিয়াই তিনি পরম নিষ্ঠা ও সততার সহিত নিজ কর্তব্যে অটল থাকিতেন। সন্দেহ নাই এই কারণেই কলিকাতার কৌন্সিল এহেন প্রশংসাবাক্যে তাঁহাকে অভিনন্দিত করিয়াছিলেন। ঐ যুগে তাঁহাদের কর্মচারী মহলে এহেন সদগুণের দেখা পাওয়া সহজ ছিল না।’

দোহাই

১. Major James Rennell, ‘Bengal Altas, Containing Maps of the Theatre of War and Commerce on that Side of Hindoostan, 1st ed., London 1779, 2nd ed., London 1781, reprinted by order of the Surveyor General of India.
২. Major James Rennell, Memoir of a Map of Hindoostan or the Mogul Empire, &c., London, 1783.
৩. Sir C. Markhan, Memoir of the Indian Surveys, 2nd ed. London, 1878.
৪. T. H. D. La Touche, ‘Introduction’, in The Journals of Major James Rennell, Calcutta, 1910.

~~~

আমিন জেমস রেনেল

বিরচিত

শুকনা মৌসুমে গঙ্গানদী হইতে কলিকাতা যাইবার নিকটতম পথ খুঁজিয়া পাইবার লক্ষ্যে জলঙ্গি নদীর মাথা হইতে ব্রহ্মপুত্র বা মেঘনা নদীর সঙ্গমস্থল পর্যন্ত গঙ্গার; লক্ষীপুর হইতে ঢাকা পর্যন্ত মেঘনা ও অন্যান্য নদীর; এবং দক্ষিণ তীরবর্তী নদীনালার জরিপকার্যের বিবরণী সংযুক্ত

রোজনামচা

সন ১৭৬৪-১৭৬৭

তজর্মা : সলিমুল্লাহ খান

(গত সংখ্যার পর)

বৈকালে পূর্বতীরে ভিড়িলাম, কারণ এইখান হইতে মোহনার মাথা পর্যন্ত ফিরতি জরিপ করিতে হইবে, কারণ যদি খালটিতে নৌ চলাচলের উপযোগী অবস্থা আছে বলিয়া প্রমাণ পাওয়া যায় তবে যে সমস্ত নৌকা নদীর ভাঁটিতে নামে তাহারা তো সহজেই এই পথ বাহিয়া আসিতে পারে।

বেলা ৪ ঘটিকার সময় উত্তর উত্তর-পশ্চিম দিক হইতে একটি ভারি দমকা হাওয়া বহিয়া গেল। সুদীর্ঘ মোহনাঞ্চল নৌকা-সাম্পান যাতায়াতের উপযোগী নহে বিধায় আমরা কুষ্টিয়া খালের ভেতরে আশ্রয় লইয়া সময় কাটাইতে বাধ্য হইলাম। সারা রাত ধরিয়া বিস্তর বাতাস আর বৃষ্টি।

৪ ও ৫ তারিখ আবহাওয়া ভাল গেল, বাতাস কখনো ভারি কখনো হালকা। এই দুই দিবস সুদীর্ঘ দক্ষিণ মোহনার পূর্বতীর জরিপ করিয়া কাটাইলাম আর বৈকালে কুষ্টিয়া খালে গমন করিলাম।

৬, ৭ ও ৮ তারিখ গভর্নরের কাছে পাঠাইব বলিয়া আদি জরিপ চিত্রাবলী ছোট আকারে আঁকিয়া, রোজনামচার নকল করিয়া কাটাইলাম। এই সময়টা জুড়িয়া প্রচুর বৃষ্টি হইল। বজরার ফুটাফাটা বন্ধ করিবার এবং রাডার সারাইবার নিমিত্ত কয়েকজন কাঠমিস্ত্রী নিযুক্ত করিলাম।

৯ তারিখে মাথা হইতে নিচের দিকে সোয়া এক মাইল পর্যন্ত খালের তত্ত্ব লইলাম, ঐ পর্যন্ত গিয়া দেখিলাম পানির গভীরতা একেবারেই নাই। আরো কড়াকড়ি পরিক্ষা করিয়া দেখিলাম কুপাদি (Cupadin) গ্রামের উল্টাদিকে পানি মাত্র ৪ কি ৫ হাত আর বিশ্বাসযোগ্য একজনের জবানিতে জানিতে পারিলাম এই বৃষ্টির মৌসুম শুরু হইবার পর পানি ৪ হাত পর্যন্ত বাড়িয়াছে। এই পরিস্থিতির কথা ছাড়িয়া বলিতে, কয়েকজন নৌকার মাঝি আমাকে বলিয়াছেন শুকনা মৌসুমে তাহারা এই জায়গাটা ডিঙ্গিযোগে পার হইয়াছেন আর এইখানে অনেক সময় ৯০ মণ বোঝাই নৌকা পার হইতে পারে মতন পানি থাকে না। ৩০০ মণের নৌকা যাইতে ২ হইতে ২ ৩/৪ হাত মতো পানির দরকার পড়ে।

১০ তারিখ সকালে গভর্নর সমীপে মানচিত্র আর রোজনামচাযোগে হরকরা (Hircar) পাঠাইলাম। রোজনামচায় কুষ্টিয়া খালের যাবতীয় পরিস্থিতি গভর্নর সাহেবকে অবহিত করিয়াছি। আজ সারাদিন ভাল আবহাওয়া। অপরাহ্নে কুষ্টিয়া খালের পূর্বদিক ধরিয়া জরিপ শুরু করিলাম। নদীর গতিমুখ এখন ৮ হইতে ৯ মাইল পর্যন্ত উত্তর-পূর্ব ও পূর্বমুখি।

১১ তারিখ সকালবেলা পূর্বদিক হইতে আনকোরা দমকা বাতাস, সঙ্গে কড়া বৃষ্টির ঝাট। দিনের মধ্যভাগে আবহাওয়া পরিষ্কার, সন্ধ্যাবেলা শান্ত আর বৃষ্টি বৃষ্টি। আগের মতোই জরিপে ব্যস্ত ছিলাম। ভরা বর্ষায় নদীর প্লাবন হইতে কুল ঠেকাইবার নিমিত্ত বিরাট একটা বাঁধ দেওয়া হইয়াছে। এই বাঁধটি ৫ মাইলের চেয়েও লম্বা; ইহা উচ্চতায় ১২ ফুট আর প্রস্থে ১৪ গজ। এখানে কোন কোন জায়গায় নদী মাত্র ১/৪ মাইল চওড়া।

১২ তারিখ পূর্বাহ্নে ঘন ঘন বাতাস ও বৃষ্টির দমকা ঝড়; দিনের বাদবাকি পরিষ্কার।

আজ পাবনা খালের মাথায় আসিলাম। ইহা বাহির হইয়াছে বড় নদীর [পদ্মা] উত্তর দিক হইতে আর ইহার অবস্থান কুষ্টিয়ার উত্তর-পূর্বে ও পূর্বে ৮ মাইল দূরে। এই খালটি আবার গঙ্গায় মিশিয়াছে রতনগঞ্জ (Rottingunge) গিয়া—ইহার কথা পরে হইবে।

খালের পূর্বে পাড়ে পাবনা গ্রাম, গ্রামটি বড় নদীর অতি ধারেকাছে। এই জায়গায় নৌকাসাম্পান মেরামত আর বানানো হয়।
এখান হইতে ৯ মাইল পর্যন্ত নদীর গতিমুখ দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে। পূর্ব দিকে একটি বাঁধ দেওয়া আছে, বাঁধের দৈর্ঘ্য কয়েক মাইল পর্যন্ত হইবে। বাঁধটা কয়েক জায়গায় ভাঙিয়া গিয়াছে। ইহা হইতে মনে হয় বাঁধ দেওয়ার পর হইতে নদীর বাড় পূর্বতীর ধরিয়া বেশ বাড়িয়াছে, কিন্তু বাঁধটা কতদিন আগে দেওয়া হইয়াছে তাহা জানিতে পারি নাই।

১২ তারিখ হইতে ১৭ তারিখ পর্যন্ত আগে যে মোহনার উল্লেখ করিয়াছি তাহার জরিপ করিয়া কাটাইলাম। দুই তীরের গ্রামাঞ্চলে উল্লেখ করিবার মতন তেমন কিছু নাই—কয়েকটি গ্রাম আছে আর আছে বিস্তর চাষের জমি—বিশেষ পশ্চিম তীরে অনেক জমি—সেই জমিতে ধান বোনে।

এই সময়টা আবহাওয়া খুবই ঝড়ঝাপটাময় ছিল, রোজই দক্ষিণপূর্ব কোণা হইতে ঝড়ো হাওয়া বহিতেছিল আর বৃষ্টিও বেশ হইল।

দক্ষিণ-পূর্ব মুখি দক্ষিণ মোহনার শেষ মাথায় আসিয়া নদী হঠাৎ উত্তর উত্তর-পূর্বমুখি মোড় লইয়াছে আর লইয়া পাঁচ মাইল পর্যন্ত এই পথে চলিতেছে। এই মোহনার পূর্ব তীর ধরিয়াও আর একটি বাঁধ দেওয়া আছে।

১৭ তারিখ আজুদিয়া (Oddygya) আসিলাম। ইহা এই মোহনার পূর্বতীরের গ্রাম বটে। এই পর্যন্ত আসিয়া নদীর খাড়ি দুই খাতে ভাগ হইয়াছে। সর্ব উত্তরের খাতটি শুদ্ধ রবিমৌসুমে নৌ চলাচলের যোগ্য থাকে। যে দ্বীপটি এই দুই খাতের বিচ্ছেদ কায়েম করিয়াছে তাহা দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩ ১/২ মাইল হইবে। আর ইহা দেখিতে অবিরাম। আর ইহা ভালোমতো আবাদমহলও বটে।

১৮ তারিখ আনকোরা হাওয়ার ঝাপটা সারাদিন আর নিরন্তর বৃষ্টি। ইহাতে আমরা বাধ্য হইয়া শুইয়া থাকিলাম।

১৯ তারিখ পরিষ্কার আবহাওয়া। নদীর দক্ষিণ খাত জরিপ করিয়া কাটাইলাম।

২০ তারিখ সারাদিন দক্ষিণামতো দিক হইতে আনকোরা হাওয়ার দাপাদাপি কিন্তু আবহাওয়া শুকনা। সকাল নাগাদ দক্ষিণ খাতের জরিপ সমাধান করিলাম আর হাবাসপুরের (Habbaspour) কাছাকাছি বড় নদীতে আসিলাম। এই স্থান হইতে নদী দক্ষিণমুখি পথ লইয়াছে।

২১ তারিখ সকাল পরিষ্কার কিন্তু বিকাল ঝঞ্ঝা ও বৃষ্টিময়। হাবাসপুর হইতে মোহনার শেষ মাথায় একটা বড় খালের মুখানি (inlet) চোখে পড়িল আর বিকাল ইহার মাথা পরখ করিলাম। ইহা সাধারণ হিসাবে চওড়ায় ২৫০ গজ আর গভীরতায় কোনখানেই ১৬ হাতের কম হইবে না। এই খালের ভাঁটি বরাবর ১ মাইলের মধ্যে মৌদাপুর (Maudapur) নামে এক বর্ধিষ্ণু গ্রাম আছে; গ্রামটি নদীর পশ্চিমতীরে। এই খালের ধারা দক্ষিণ-পূর্বমুখি আর লোকে বলিল ইহাতে সম্বৎসর নৌসাম্পান চলে, সুন্দরবন (Sunderbound) যাওয়ার পথ ইহার উপর দিয়াই।

২২ তারিখ বড় নদীতে আসিলাম কারণ পূর্বদিকে আরো কয়েক মাইল জরিপ করিতে হইবে আর খালের মুখ বরাবর মোহনার মোড় ঘুরিবার মুখে যে বড় দ্বীপটি আছে তাহা আঁকিতে হইবে: ইহা না করিলে নদীর মানচিত্র বড়ই বেখাপ্পা দেখাইবে, খালের মুখানি হইতে পূর্বদিকে ইহার স্রোতধারা কোন পথে আগাইয়াছে তাহার সঠিক ধারণা পাওয়া যাইবে না।

২২, ২৩ ও ২৪ তারিখের কিছুক্ষণ খালের পূর্বদিকে বড় নদীর ৩ মাইল এবং একইভাবে পূর্বতীর ধরিয়া সেই স্থান হইতে পিছন ফিরিয়া সুজানগর (Sujanagare) পর্যন্ত জরিপ করিলাম। ২৩ তারিখ বৈকালে উত্তর-পশ্চিম দিক হইতে আরো এক দফা কড়া ঝড়বৃষ্টি আসিল আর ২৪ তারিখ সকালবেলা আনকোরা দমকা হাওয়া বহিল, দিনের বাদবাকি পরিষ্কার আবহাওয়া। আজ সকালে খালের ভিতর ঢুকিলাম আর ভাঁটি বরাবর আরো এক মাইল জরিপ চালাইলাম। এই জায়গায় খাল বড়ই আকাবাঁকা। আমি ধরিয়া লইতেছি এই সময়টায় পানি ৫ হাত পর্যন্ত বাড়িয়া গিয়াছে, এখন খালের গভীরতা ১৩ হাতের কম নহে।

জুনের ২৪ তারিখ হইতে জুলাইর ৩ তারিখ পর্যন্ত আবহাওয়া চোখে পড়িবার মত পরিষ্কার। এই সময়ে শুদ্ধ কয়েক পশলা হালকা বৃষ্টি হইয়াছে আর বাতাস দক্ষিণপূর্ব দিক হইতে বহিয়াছে মৃদুমন্দ হিল্লোলে। এই সময়ের মধ্যে আমরা ৩০ মাইলেরও বেশি খালের সন্ধান পাইলাম। ইহার স্রোত সাধারণভাবে বলিতে দক্ষিণ-পূর্বমুখি, যদিও গত ২ দিন আমরা দেখিলাম ইহার পথ খুবই আকাবাঁকা, শেষ ৯ মাইলের মধ্যে ইহা ৭ বার মোহনা (Reaches) পরিবর্তন করিয়াছে আর এইটুকু সময়ের ভিতর নাক-বরাবর শুদ্ধ ২ ১/২ মাইল আগাইয়াছে। যে গ্রামদেশের মধ্য দিয়া আমরা চলিয়াছি তাহার চেহারা বহরূপী, কোথাও মাইলের পর মাইল ঘন জঙ্গল আর কখনও বা উন্মুক্ত গ্রামাঞ্চল, যদিও চাষাবাদ সাধারণভাবে বলিতে বিরল। খালপাড়ের ৯ মাইল মতো নিচে সোনাপাড়া (Sunapara) এলাকায় কয়েক বাগান সুপারি (Betal বা Areca) গাছ আর আরো ৭ ১/২ মাইল পর শ্রীরামপুরে একবাড়ি ছোট্ট মন্দির (Pagoda)। পাঁচ মোহনার সঙ্গমস্থলে গঠিত উপদ্বীপে ইহার স্থান। এই খাল কুমির আর কচ্ছপে ভর্তি—আমরা দুই জাতিরই দেখা পাইয়াছি অপর্যাপ্ত সংখ্যায়। কুমিরজাতি সাংঘাতিক লাজুক। কানে সামান্যতম শোর বাজিলেও উঁহারা ডুব মারেন।

গ্রামবাসীরা খালটির নাম রাখিয়াছেন চন্ননা (Chunnunah) আর আমরা শুনিয়াছি আরও চার মাইল ভাঁটিতে ইহা গিয়া পড়িয়াছে কুমার নদে (Comare Creek)। প্রস্তে এই খালটি সবখানেই সমান মাপের, প্রায় ২০০ গজ হইবে; গভীরতায় যথেষ্ট অসমান, কোথাও ৫০ হাত আর কোথাও বা ৬ হাত হইবে।

২৬ ও ২৯ জুন পাটনামুখি দুই বহর লবণের নৌকার সহিত মোলাকাত হইল। একটি সুন্দরবন ও খুলনা (Culna) হইয়া কলিকাতা হইতে আসিতেছে, আরেকটি আসিতেছে বরসিয়া নদ (Burrashee Creek) ধরিয়া জয়নগর (Jaynagore) হইতে। একটি নৌকার বোঝাই ৩৫০০ মণ (প্রায় ১২০ টন) আর পানিতে ইহার দাবা ৪ ১/২ হাত।

২৮ তারিখ পদ্মদহে (Podumdey) দেখিলাম কম্পাসের কাঁটা পূর্বমুখি ০º-৫৪´ পর্যন্ত নড়িয়াছে।

২৯ তারিখ ২ হরকরাযোগে গভর্নর সাহেবের পাঠানো এক প্রস্ত পত্র পাইলাম।

বিডিনিউজ, আর্টস, ২০ ডিসেম্বর ২০০৭

জেমস রেনেল ও তাঁহার রোজনামচা : ১৭৬৪-১৭৬৭ (দোসরা কিস্তি)

জেমস রেনেল বৃত্তান্ত : আরো

rennell………
জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০)
……….
জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০) বিষয়ে আরো তথ্য চাহিয়া যাঁহারা লিখিতে বলিয়াছেন তাঁহাদের – বিশেষ বিধান রিবেরু মহাশয়ের – শুকরিয়া আদায় করিয়া তাঁহার কথা দ্বিতীয় কিস্তি লিখিতেছি। এই কিস্তির উৎসও প্রথম কিস্তির অনুরূপ। নতুন খবর ইহাতে তেমন বিশেষ নাই। (লা টুশ ১৯১০; উয়িকিপিডিয়া ২০০৭)

জেমস রেনেলের জন্ম ১৭৪২ সালের ৩রা ডিসেম্বর ধরিয়া লইলে ১৭৬৪ সালের গোড়ার দিকে তাঁহার বয়স হইতেছে সবে ২১ বছর কয়েক মাস। সেই বয়সেই তিনি বঙ্গদেশে আসিলেন। বঙ্গে তখন সবে ইংরেজাধিকার কায়েম হইয়াছে বটে, মোকাম হয় নাই পুরাদস্তুর – এই কথা আমরা পহিলা কিস্তিযোগেই উল্লেখ করিয়াছি। ততদিনে তাঁহার নৌ-বাহিনীর চাকুরিসহ জাগতিক বা হাতেকলমে অভিজ্ঞতা লাভ হইয়া গিয়াছে ৮ বছর। তাঁহার বাবা জন রেনেলও নৌ-বাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা আমরা আমলে লই নাই।

১৭৫৬ সালে তিনি প্রথম মহাব্রিটেনের রাজার নৌবাহিনীর ব্রিলিয়ান্ট (Brilliant) নামা জাহাজে নাবিকের (midshipman) চাকরি লইয়াছিলেন। সেই জাহাজেই তাঁহার পরিচয় হইয়াছিল সমান পদে চাকরিরত টোপাম নামা অন্য এক নাবিকের সঙ্গে। এই টোপাম সাহেবই বলিয়া কহিয়া কলিকাতার উইলিয়াম নামা দুর্গে শিক্ষানবিশ প্রকৌশলী বা এঞ্জিনিয়ার পদে তাঁহার চাকরি জুটাইয়া দিয়াছিলেন।

অবশ্য ইহার আগের বৎসর অর্থাৎ ১৭৬৩ সালেই রেনেল স্বেচ্ছায় নৌবাহিনী না ছাড়িয়াই পূর্ব ভারত কোম্পানির চাকরি লইয়াছিলেন। চাকরি লইয়া তিনি ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জে গমন করেন। সেখানে তাঁহার কাজ ছিল জরিপ পরিচালনা। এই কাজ তিনি নৌবাহিনীতে থাকার সময়ই শিখিয়াছিলেন। সেই জায়গা হইতে মাদ্রাজে (এখনকার চেন্নাই) ফিরিয়া তিনি নৌবাহিনী হইতে ছাড়া পাইয়া গেলেন। সেই জায়গায় তাঁহাকে একটি সদাগরি জাহাজের কাপ্তেন নিয়োগ করা হইয়াছিল। দুর্ভাগ্যের মধ্যে, ১৭৬৩ সালের ২১ অক্টোবর তারিখে জাহাজটি হারিকেনে হারাইয়া যায়। ভাগ্যের মধ্যে, রেনেল সাহেব ঝড়ের রাতে জলে ছিলেন না, স্থলভাগে অবস্থিতি করিতেছিলেন। তাই বাঁচিয়া গেলেন। পরে নেপচুন নামা একটি আন্দাজমতো জাহাজের চাকরি তাঁহার হইয়াছিল। ইহার কাজের মধ্যেও কিছু জরিপ তিনি করিয়াছিলেন।

১৭৬৪ সালেই কলিকাতায় সেই সময়কার ইংরেজ গভর্নর বা দুর্গাধিপতি হেনরি ভ্যানশিটার্ট তাঁহাকে গঙ্গার বদ্বীপ এলাকা জরিপ করিবার নিমিত্ত আমিন নিয়োগ করেন। এই কাজ সফলতার সহিত সম্পাদন করিবার পুরষ্কার হিসাবেই – বোধ হয় – তাঁহার উচ্চতর পদ জোটে। ১৭৬৭ সালের মাহে জানুয়ারি নাগাদ মহা আমিন বা সার্ভেয়ার-জেনারেল পদে রেনেলের নিয়োগ চূড়ান্ত হয়। তাঁহার মাসোহারা ঠিক করা হইয়াছিল তিনশত টাকা। কালের বিচারে এই বেতন অতি উচ্চ ছিল। প্রমাণ: ১৭৬৪ সালে কলিকাতা কৌন্সিলের (Council) সদস্য ওয়ারেন হেস্টিংস মহাশয়ও নাকি ঐ একই পরিমাণ মাসোহারা তুলিতেন। জেমস রেনেলকে এই বড় পদটিতে নিয়োগ দেওয়ার কিছুদিন পর অতি বিখ্যাত লাটসাহেব রবার্ট ক্লাইব মহোদয়ের দ্বিতীয় দফা গভর্নরি শেষ হয়।

১৭৬৭ সালের ৮ জানুয়ারি তারিখে পূর্ব ভারত কোম্পানির সদর দপ্তর (Court of Directors) বরাবর লেখা কলিকাতা কৌন্সিলের এক চিঠি হইতে এই খবর পাওয়া যাইতেছে। ৩০ মার্চের চিঠিতে উল্লেখ করা হইয়াছে সম্প্রতি তিনি জরিপ অভিযান চালাইবার সময় গুরুতর আহত হইয়াছেন। ইহাতে তাঁহার স্বাস্থ্যহানিও ঘটিল গুরুতর। এই ঘটনার বিবরণ রেনেল নিজেও তাঁহার রোজনামচা লিপিতে আবদ্ধ রাখিয়াছেন।

এতদ্দেশীয় দেশের বিপ্লবী দেশীয় সৈনিকদের পরিচয় তিনি ‘সন্ন্যাসী’ নামই দিয়াছিলেন। সন্ন্যাসীরা সেইবার তাঁহাকে মারিয়া-কাটিয়া একশেষ করিবার সামান্যই বাকি রাখিয়াছিলেন। ইহা ১৭৬৬ ইংরেজির ২১ ফেব্র“য়ারি তারিখের ঘটনা। জায়গার নাম ধরলা। ইহা ভূটানপথে কুচবিহার সীমান্তের নিকটে বটে।

গঙ্গা হইতে বড় বড় জাহাজযোগে কেমন করিয়া কলিকাতায় আসা যায় তাহার সংক্ষিপ্ত পথ খুঁজিয়া বাহির করিতে রেনেল সাহেবকে পহিলা চাকুরিটা দেওয়া হইয়াছিল। পরে তাঁহাকে বলা হয় সুন্দরবন আর মেঘনার মধ্য দিয়া কলিকাতা আসিবার পথও বাহির করিতে। রেনেলের রোজনামচায় এই পহিলা অভিযানের বিবরণ ছাড়াও আরও তিন যাত্রার কাহিনী লেখা হইয়াছে।

শেষের তিন যাত্রায় তিনি উত্তর ও পূর্ব বাঙ্গালার অনেক জায়গার নদীপথিক জরিপ শেষ করিয়াছিলেন। ব্রহ্মপুত্র নদীর পথে গোয়ালপাড়া পর্যন্ত পৌঁছিবার পর অহম রাজ্যের সীমানায়ও তিনি ঢুকিয়াছিলেন বলিয়া উল্লেখ পাইতেছি। এই অভিযানের এক প্রহরে তিনি যখন কুচবিহার সীমান্তে তখনই দেশীয় বিপ্লবীদের হাতে পড়েন। মারটা জবর হইয়াছিল বলিয়াই মনে হয়।

সন্ন্যাসী ফকির বাহিনী তাঁহাদের দলকে ঘেরাও করিয়া ফেলে এবং তলোয়ার দিয়া কয়েকটা কোপও মারে তাঁহার গায়ে। শুদ্ধ ভাগ্যের জোরে তিনি এ যাত্রা প্রাণটা রক্ষা করিতে পারিয়াছিলেন। রোজনামচায় এই হামলার সবিস্তার বিবরণ পাওয়া যাইবে। তাহা ছাড়া ইংরেজি ভাষায় তাঁহার যে জীবনীগ্রন্থ অবলম্বন লা টুশ সাহেব তাঁহার ভূমিকা ফাঁদিয়াছেন সেই জীবনীগ্রন্থও ইহার বিস্তারিত তথ্যসম্বলিত বলিয়া জানাইতে কসুর করেন নাই তিনি । (মার্কাম ১৮৯৫: ৪৭)

রেনেলের রোজনামচার বিস্তার ১৭৬৭ সালের মার্চমাস পর্যন্ত পাওয়া যায়। তখনও তিনি গাঙ্গেয় বদ্বীপাঞ্চলের নদনদীজরিপ কাজ শেষ করিয়া সারেন নাই। সেই সময় তাহার প্রবলবেগে জ্বর আসিত। সেই রকমই এক জ্বরের প্রকোপে তিনি একদিন কাজ বন্ধ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন । ইহা জানাইতেছেন তাঁহার জীবনী লেখকরা।

যথা মার্কাম সাহেব লিখিত জীবনীগ্রন্থে ভারতবর্ষে রেনেলের বাদবাকি জীবনের কর্মতৎপরতার আরো বিবরণ রহিয়াছে। ১৭৭১ সালে আপনকার পুরানা দুশমন ফকির সন্ন্যাসীদের বিরুদ্ধে আবারও তাঁহাকে যুদ্ধে পাঠান হইয়াছিল। জীবনীকার কহিতেছেন এই যাত্রায় তাঁহার ফললাভ ষোল আনাই হইয়াছিল। তদুপরি – এক বৎসর পর – তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হইয়াছিলেন।

তাঁহার কনের নাম ছিল বেগম জেন থ্যাকারে। ইঁহার ভাইয়ের নাম উয়িলিয়াম ম্যাকপিচ থ্যাকারে। এই ভাইয়ের ঘরের নাতির নামও একই ছিল। তিনি আর কেহই নহেন, স্বয়ং পরকালের বিখ্যাত ইংরেজ ঔপন্যাসিক উয়িলিয়াম ম্যাকপিচ থ্যাকারে। রেনেলের ঢাকাস্থ বন্ধু কার্টিয়ার সাহেব যখন গভর্নর হইলেন সেই সময় এই থ্যাকারে সাহেবই তাঁহার সচিব নিযুক্ত হইলেন। অতয়েব দাঁড়াইল এই: রেনেল সাহেব আপনকার বন্ধুর সচিবের ভগিনির পাণি গ্রহণ করিলেন। করিয়া – যতদূর জানি – সুখিও হইলেন। সেই কাহিনী পরে হইবে।

অথ রেনেলনামা দ্বিতীয় কিস্তি সমাপ্ত। অদ্য ৩ ডিসেম্বর সন ২০০৭ খ্রিস্টাব্দ অথবা রেনেল মহাশয়ের ২৬৫ নম্বর জন্মদিনে।

দোহাই

১. James Rennell, The Journals of Major James Rennell, First Surveyor-General of India, Written for the information of the Governors of Bengal during his surveys of the Ganges and Brahmaputra rivers 1764 to 1767, edited by T. H. D. La Touche, Geological Survey of India (Calcutta; Asiatic Society, 1910).
২. Wikipedia, ‘James Rennell,’ (Wikipedia, 2007).
৩. Sir C. Markham, Major James Rennell and the Rise of Modern English Geography, (London: Cassell & Co., 1895).

~~~

আমিন জেমস রেনেল

বিরচিত

শুকনা মৌসুমে গঙ্গানদী হইতে কলিকাতা যাইবার নিকটতম পথ খুঁজিয়া পাইবার লক্ষ্যে জলঙ্গি নদীর মাথা হইতে ব্রহ্মপুত্র বা মেঘনা নদীর সঙ্গমস্থল পর্যন্ত গঙ্গার; লক্ষীপুর হইতে ঢাকা পর্যন্ত মেঘনা ও অন্যান্য নদীর; এবং দক্ষিণ তীরবর্তী নদীনালার জরিপকার্যের বিবরণী সংযুক্ত

রোজনামচা

সন ১৭৬৪-১৭৬৭

তজর্মা : সলিমুল্লাহ খান

(গত সংখ্যার পর)

২২ তারিখ আসকালদুপুরবেলা দক্ষিণ-পূর্ব দিক হইতে ভারি পরিচ্ছন্ন দমকা হাওয়া বহিতেছিল। ফলে আমরা বিকাল পর্যন্ত (পরিকল্পনা মোতাবেক) জরিপ কাজে আর আগাইতে পারি নাই। মাত্র তখন নাগাদই আমরা জলঙ্গি নদীর মাথা হইতে পূর্বদিক ধরিয়া জরিপকার্য শুরু করিলাম। গতকল্য আমরা ঐ নদীর মাথা আর উহার উজানে গঙ্গাতীরের জরিপ এক মাইল পর্যন্ত শেষ করিয়াছিলাম।

হাল মৌসুমে এই মহানদীর আবহাওয়া সচরাচর যে রকম হইয়া থাকে আজ বিকালবেলা তাহার কিছু নমুনা দেখিলাম। মানে সন্ধ্যার দিকে যখন আমরা কুমারের (Quemaieree) অদূরে নদী পার হইতেছিলাম তখন দক্ষিণ-পূর্ব দিক হইতে একটা দমকা হাওয়া আসিল। আসিয়া সমস্ত নৌকা-সাম্পান একঠেলায় জলঙ্গির বালুচরে তুলিয়া দিল। সারারাত সেখানে থাকিয়া ঝাপটা খাইল। দুই জন নাবিক বাতাসের ঝাপটায় উড়িয়া যায়। তবে ভাগ্যের দয়ায় সাঁতার দিয়া কুলে উঠিতে সক্ষম হয়।

২৩ তারিখ সকালটা চমৎকার। নদীর দক্ষিণতীর জরিপ করিয়া কাটাইলাম। [সংযুক্ত] ১ নং মানচিত্রে ইহার খুঁটিনাটি পাওয়া যাইবে। আজ মহেশকুড়াঁর (Mayescunda) নালা পরখ করিলাম। এই নালা জলঙ্গির ৫ মাইল খানিক দক্ষিণে দক্ষিণ-পূর্বে, আর ইহাই আমাদের হাতে পড়া এক নম্বর নালা বা ক্রিক (Creek)। দেখিলাম ইহার পানি প্রবেশদ্বারে মাত্র ২ হাত আর পোয়া মাইল মতো উজানে গেলে একেবারে শুকনা। এই তল্লাটে বিস্তর ধান আর কার্পাসতুলার চাষ হয়। এই জায়গা হইতে পূর্বমুখি কমপক্ষে ৮ মাইল পর্যন্ত নদীর গতিপথ প্রায় সোজাসুজি পূর্বদিকগামী, আর বিপজ্জনক বালিয়াড়িতে ভরা। নদীও তদুপরি অতিরিক্ত দ্রুতগতিতে বহিতেছে। জলঙ্গির ৮ মাইল পূর্বে দক্ষিণ-পূর্বে পঞ্চিফেরার (Paunchiferra) একটা খাল আসিয়া গঙ্গায় পড়িয়াছে। শুনিয়াছি এই খালটি সারদার (Surda) কাছে একই নদী হইতে বাহির হইয়াছে। আজ সন্ধ্যাবেলা আবহাওয়া দুর্যোগপূর্ণ হওয়ায় আমরা বীরসগঞ্জ বালিয়াড়ির একটা খালে নৌকা-সাম্পান ভিড়াইয়া রাখিয়াছিলাম।

২৪ তারিখ সারাদিন আবহাওয়া বেশ ভালো । গতকালের মতন আজও জরিপ চালাইয়াছি। হরিশংকর (Harisongkor) আর কালিগঞ্জ (Callygunge) গ্রাম পার হইলাম। এই স্থলে নদী দুই খাতে ভাগ হইয়া গিয়াছে। মধ্যস্থলের বালির দ্বীপটি লম্বায় পাঁচ মাইল। নদী এখন উত্তর-পূর্ব দিকে মোড় লইয়া বহিতেছে আর ইহার প্রস্থ কোথাও কোথাও বর্ষা মৌসুমে ২ ১/২ মাইল। এইখানটায় দেশগ্রাম দেখিতে চোখ জুড়ায়, বেশির ভাগই মাঠ-ময়দান আর গবাদি পশুর সংখ্যাও বেশ বটে। নদীতীর এখানে ৩০ ফুট উচুঁ, অবিরত ঝরিয়া পড়িতেছে বলিয়া নৌকা সাম্পানের বিপদ ঘটিতে পারে, তাই তীরের তেমন কাছে যাইতে মানা। আজ হাওয়া দিতেছে দক্ষিণদিক হইতে, আসিতেছে হালকা মৃদুমন্দ সমীরণ আকারে।

২৫ তারিখ দুপুরের আগে সাংঘাতিক গরম পড়িয়াছে, বিকালবেলা ঝড়-তুফানে কাটিল আর বৃষ্টিও নামিল ঢের। আজ গঙ্গা নদীর উত্তর মোহনার সীমা বরাবর অবস্থিত চকুলা (Chocula) নামক গ্রামে আসিলাম। এইখান হইতে নদী পূর্বে দক্ষিণ-পূর্বে ঘুরিয়া ৫ বা ৬ মাইল পর্যন্ত চলিয়াছে আর বালির এক বিশালাকার দ্বীপ উঠিয়া ইহার সবটুকু বরাবরই নদীকে দুইভাগে ভাগ করিয়া রাখিয়াছে। উত্তরদিকের খাতটাই সবচেয়ে বেশি গভীর এবং সবচেয়ে বেশি ভালো।

২৬ তারিখ সুন্দর আবহাওয়া। পূর্ব দক্ষিণ-পূর্ব মোহনা জরিপ করিতেছি।

২৭ তারিখ সুন্দর আবহাওয়া। পূর্ব দক্ষিণ-পূর্ব মোহনা শেষ করিলাম আর অন্য একটায় প্রবেশ করিলাম। ইহার দৌড় প্রায় ৫ ১/২ মাইল দক্ষিণমুখি। বর্ষা মৌসুমে ইহার ওসার (চওড়া) দেড় মাইলের বেশি হয় না আর এখন স্থানে স্থানে পোয়া মাইলের বেশি হইবে না। আমাদের আগমন সংবাদে গ্রামের লোকজন ঘরবাড়ি ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছে। তাই এইসব জায়গার নাম জানিয়া লইতে কিছুটা দেরি হইল। আজ সন্ধ্যায় মালাকোলা (Malacola) ও সেলাহ (Selah) গ্রামদ্বয়ের মাঝখানটায় (প্রায় ২ ১/২ মাইলের তফাতে) গুনিয়া দেখিলাম নৌকার সংখ্যা ৪০০ শতের কম হইবে না। সন্ধ্যা নাগাদ চুম্বক কাঁটার নড়াচড়া পূর্বমুখি ০´-৩৬º হইয়াছে।

২৮ তারিখ পূর্বাহ্ন সুন্দর, সন্ধ্যা আর্দ্র আর ঝড়বৃষ্টিভরা। গত ৩ দিন ধরিয়া বাতাস দক্ষিণ হইতে বহিতেছে। দক্ষিণ মোহনার জরিপ শেষ করিয়াছি আর দামাদুর (Damadure) গ্রামে আসিয়া পৌঁছিয়াছি, এই গ্রামটি ইহার শেষভাগে আছে। এই জায়গা হইতে নদী দ্রুত উত্তর-পূর্ব দিকে ঘুরিয়া গিয়াছে আর এই পথে ৯ মাইল চলিয়াছে। আজ রাত ভরিয়া বৃষ্টি হইল।

২৯ তারিখ পূর্বাহ্নে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। অপরাহ্ণে কম্পাসের নানান কোণ হইতে বেশ কয়েকবার দমকা হাওয়া বহিল আর বৃষ্টিও হইল বেশ। ফল দাড়াঁইল আজ আমাদের কাজ হইল সামান্যই। আজ রাত্রে অনেক বৃষ্টি।

৩০ তারিখ আবহাওয়া সহনীয়। উত্তর-পূর্ব মোহনার পাঁচ মাইল উপর হইতে বড় একটি দ্বীপের শুরু। ইহা পূর্বে ও দক্ষিণ-পূর্বে পাঁচ মাইল বিস্তৃত। ফলে স্থানে স্থানে নদীর ওসার ৩ ১/২ মাইল পর্যন্ত হইবে। সর্বদক্ষিণের খাত দিয়া সম্বৎসর নৌ-যানবাহন চলাচল করে না। শ্রীরামপুর (Serampour) ও গড়গড়ি (Gurgoree) গ্রাম ইহার শেষ সীমায়। এখানকার গ্রামাঞ্চলে চাষাবাদ ভালোমতই হইয়া থাকে আর ফসলের বেশির ভাগই ধান্য (Padda)। অদ্য গভর্নর মহোদয় সমীপে লিখিলাম, আমার কাজকর্মের বিবরাণাদি তাহাকে জানাইয়া দিয়াছি।

৩১ তারিখ সারাদিন দক্ষিণদিক হইতে একেবারে তাজা হাওয়ার ঝাপটা (Gales) বহিল। বড় দ্বীপটির দক্ষিণ-পূর্ব মাথা হইতে নদী প্রায় ৮ মাইল পর্যন্ত দক্ষিণে বহিয়া গিয়াছে। পশ্চিমদিকের তীর বেশির ভাগই জঙ্গলে ঢাকা। তবে পূর্বতীরে চাষাবাদ ভালোমতই হইতেছে আর এই তীরে ১০ কিম্বা ১১ টা গ্রাম বসিয়াছে। এই মোহনার (Reach) শেষ মাথায় কস্তি (Custee) গ্রাম ।

১লা ও ২রা জুন সুন্দর আবহাওয়া, দক্ষিণ দক্ষিণ-পূর্ব দিক হইতে তাজা হাওয়া বহিতেছে। এই দুই দিন দক্ষিণ মোহনার পশ্চিমতীর জরিপ করিয়া কাটাইলাম আর ২ তারিখ সন্ধ্যাবেলা কস্তি গ্রামে আসিলাম। গ্রামটি মোহনার মোড় হইতে বিপরীতদিকের পশ্চিম তীরে বটে।

৩ তারিখ সুন্দর সকাল। গ্রাম হইতে তিন পোয়ামাইলমতো ভাঁটায় নদী হইতে বাহির হইয়াছে কস্তি খাল। সেই খালের মাথায় আসিলাম। শুনিলাম এই খাল দিয়া সারা বৎসর নৌকা-সাম্পান চলে। আরও শুনিলাম ইহা হইতে রাঙ্গাফুলায় যাওয়া যায়। যদি তাহাই হয় তো বলিতে হইবে আমাদের অভিযান সাফল্যের সহিত সমাপ্ত হইল। খালটি ১৩০ হইতে ২০০ গজ পর্যন্ত চওড়া এবং ১/৪ মাইল উজানে যাওয়ার পর ৪০ হইতে ১০ হাত পর্যন্ত গভীর হয়।

 

বিডিনিউজ, আর্টস, ৬ ডিসেম্বর ২০০৭

তুজম্বর আলির কবিতা: জসীমউদ্‌দীনের ১৯৭১

১৯৭১ সালের ছায়া বাংলাদেশের সাহিত্যে কতদূর পর্যন্ত পড়িয়াছে তাহার সঠিক পরিমাপ এখনো পর্যন্ত করা সম্ভব হয় নাই। তবে একটা জায়গায়—বিশেষ কবিতায়—এই ছায়া না পড়িয়া যায় নাই। উদাহরণস্বরূপ কবি জসীমউদ্‌দীনের কথা পাড়া যায়। ১৯৭১ সালেও বাঁচিয়া ছিলেন এই মহান কবি। সেই অভিজ্ঞতা সম্বল করিয়া তিনি ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ ‘ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে’ নামধেয় একটি ক্ষীণকায় কবিতা সংকলন ছাপাইয়াছিলেন। সংকলনের গোড়ায়—‘লেখকের কথা’ অংশে—জসীমউদ্‌দীন জানাইতেছিলেন, ‘তুজম্বর আলি ছদ্মনামে এই কবিতাগুলি রাশিয়া, আমেরিকা ও ভারতে পাঠান হইয়াছিল।’ (উদ্‌দীন ১৯৭২ : [ছয়])

কবি অধিক জানাইতেছিলেন, ‘আমার মেয়ে হাসনা এর কতকগুলি ইংরাজিতে অনুবাদ করিয়া অপর নামে নিউইয়র্কে বিদ্বান সমাজে বেনামিতে পাঠ করাইয়াছে। রাশিয়াতেও কবিতাগুলি সমাদৃত হইয়াছিল। সেখানেও কিছু কিছু লেখা রুশ ভাষায় অনূদিত হইয়াছে। ভারতে এই লেখাগুলি প্রকাশিত হইলে মুল্করাজ আনন্দ প্রমুখ বহু সাহিত্যক ও কাব্যরসিকের সশ্রদ্ধ দৃষ্টি আকর্ষণ করে।’ (‘লেখকের কথা’, “ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে,” কবিতাসংগ্রহ ২: ৩৮৬)

স্বীকার করিতে হইবে, আজও এই কবিতা সংকলনের খবর অনেকেই রাখেন না। যাঁহারা রাখেন তাঁহারাও রাখিতে মনে হয় খানিক বিব্রতই বোধ করেন। জসীমউদ্‌দীন—বিশারদ অধ্যাপক সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়কে এই দ্বিতীয়—বিব্রত—দলের দৃষ্টান্তস্বরূপ স্মরণ করা যায়। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত এই সংকলন প্রসঙ্গে তিনি লিখিয়াছিলেন, ‘… উদ্দেশ্যমূলকতার দায় বহন করতে হয়েছে বলে কোথাও কোথাও কবিতার প্রাণশক্তি কিছুটা পীড়িত হয়েছে, তা মানতেই হয়।’ (মুখোপাধ্যায় ২০০৪ : ১৪৪)

সবিনয় নিবেদন করিব, জসীমউদ্‌দীন -বিশারদের এই নালিশ সর্বাংশে সমর্থন করা যায় না। আমাদের প্রস্তাব, এই ধরনের রায় ঘোষণার আগে জসীমউদ্‌দীনের ‘কবিতার প্রাণশক্তি’টা কোথায় তাহা নির্দেশ করারও দরকার আছে। এই খণ্ড নিবন্ধে আমরা সেই কোশেসই করিতেছি।

১৯৭১ সালের প্রায় তিরিশ বছর আগে—মোতাবেক ১৯৪০ সালে—ভারতবিখ্যাত অধ্যাপক হুমায়ুন কবির দুঃখ প্রকাশ করিয়াছিলেন, কাজী নজরুল ইসলামের মতন জসীমউদ্‌দীনের সৃজনীপ্রতিভাও অল্পদিনেই নিঃশেষিত হইয়া গিয়াছিল। তিনি ধরিয়া লইয়াছিলেন, ‘মানস সংগঠনে’ নজরুল ইসলামের মতন জসীমউদ্‌দীনেরও কোন রূপান্তর ঘটে নাই। হুমায়ুন কবিরের মতে নজরুল ইসলামের কবিতায় যে বিপ্লবধর্ম তাহা পুরাতন ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন ঘটাইয়াছে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কল্পনা আর আবেগের নতুন নতুন রাজ্যজয়ে অগ্রসর হইতে পারে নাই।

আর—তাঁহার ধারণা— জসীমউদ্‌দীনের কাব্যসাধনায় সিদ্ধিটা আসিয়াছিল দেশের ‘গণমানসের অন্তর্নিহিত শক্তি’ হইতে। তবে কিনা তিনিও কল্পনা আর আবেগের নতুন নতুন রাজ্যজয়ে বিশেষ অগ্রসর হইতে পারেন নাই। পশ্চিমবঙ্গের কাজী নজরুল ইসলাম আর পূর্ববাংলার জসীমউদ্‌দীন—এই দুই বড় কবির কথা মনে করিয়া হুমায়ুন কবির আক্ষেপ করিয়াছিলেন, ‘আজ আত্মকেন্দ্রিক পুনরাবৃত্তির মধ্যেই তাঁদের সাধনা নিবদ্ধ।’ (কবির ১৩৬৫ : ৯১) স্মরণ করা যাইতে পারে হুমায়ুন কবির যখন তাঁহার বহুলপ্রশংসিত ‘বাঙলার কাব্য’ প্রবন্ধটি লিখিতেছিলেন তখনো নজরুল ইসলাম পুরাদস্তুর অসুস্থতার রাহুগ্রাসে পতিত হন নাই।

১৯৪০ সাল হইতে যে দশকের শুরু হয় সেই দশক নাগাদ বাঙ্গালি মুসলমান সমাজের অন্তর্গত কবি ও সাহিত্যসাধকেরা মোটের উপর তিন ভাগে ভাগ হইয়া গিয়াছিলেন। একভাগে ছিলেন সংরক্ষণশীল পক্ষ। সংরক্ষণশীলতার এই দিকপালদের প্রসঙ্গ ধরিয়া হুমায়ুন কবির সিদ্ধান্ত করিয়াছিলেন, ‘তার ঝোঁক অতীতের দিকে, তার ধর্ম্ম প্রচলিত ব্যবস্থার সংরক্ষণ। ইসলামের অন্তর্নিহিত সামাজিক সাম্যকেও তা ব্যাহত করে।’ (কবির ১৩৬৫ : ৯২)

এই পশ্চাৎমুখিতার কারণেই সেদিন বাংলার মুসলমান সমাজ একদিকে যেমন ‘অনিশ্চিত মতি’ অন্যদিকে তেমনি ‘গতিহীন’ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল।

দ্বিতীয় ভাগে ছিলেন প্রতিক্রিয়াশীলরা। এই মাঝি বা দলপতিরা স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড় বাহিয়া পুরাতন বন্দরে ফিরিয়া যাইতে চাহিতেন। আত্মনিবেদন বৃথা জানিয়াও ইঁহারা সমাজমানসের সমস্ত উদ্যম এক অলীক অসম্ভবের পায়ে উৎসর্গ করিয়াছিলেন।

সবশেষে ছিলেন আরেক দল। সংখ্যায় আর শক্তিতে ইঁহারা ছিলেন দুর্বলতম। তবে কিনা একই সঙ্গে ভবিষ্যতের সাধকও ছিলেন ইঁহারাই। সম্ভবত এই দলের কথা মনে রাখিয়াই হুমায়ুন কবির লিখিয়াছিলেন, ‘ভবিষ্যতের অভিযানে আশঙ্কা থাকতে পারে, কিন্তু সম্ভাবনা আরো বেশী, অথচ আজো বাঙালী মুসলমানের যৌবন সে দুঃসাহসিকতায় বিমুখ।’

এই তৃতীয় ভাগের উপরই যতদূর পারেন ইমান আনিয়াছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ হুমায়ুন কবির। তিনি লিখিয়াছিলেন, ‘সমস্ত পৃথিবীতে বর্ত্তমানে যে আলোড়ন, তারও নির্দ্দেশ ভবিষ্যতের দিকে। সেই প্রবাহ যদি বাঙালী মুসলমানকে নূতন সমাজসাধনার দিকে ঠেলে নিয়ে যায়, তবে মুসলমান সমাজ-সত্তার অন্তর্নিহিত ঐক্য ও উদ্যম দুর্ব্বার হয়ে উঠবে, বাঙলার কাব্যসাধনায়ও নূতন দিগন্ত দেখা দেবে।’

হুমায়ুন কবিরের এই আশা ও আশীর্বাদ সত্য হইতে না হইতে ১৯৭১ সাল আসিয়া গেল। বাংলার কাব্যসাধনায় নতুন দিগন্ত দেখা দিল শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ প্রভৃতি নবীন কবির জন্মের পর।

এই তিন ভাগের মাপে বিচার করিলে দেখা যায় জসীমউদ্‌দীনের কবিতা একই সাথে দুই ভাগ জুড়িয়া বিরাজ করিতেছিল। আকারের দিক হইতে দেখিলে তাঁহার কবিতাকে সংরক্ষণশীল ভাগে ফেলা যায়। এদিকে বাসনার বিচারে বিভাজন করেন তো তৃতীয় ভাগেও তাঁহাকে গ্রহণ করা চলে।

এই স্ববিরোধ আমলে লইয়াই হুমায়ুন কবির ১৯৪০ সালে লিখিতেছিলেন, ‘… সাম্প্রতিক বাঙালী মুসলমান কবিদের মধ্যে প্রায় সকলেই পশ্চাদমুখী এবং নতুনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও প্রাচীনপন্থী। সাহিত্যের আঙ্গিক নিয়ে নতুন পরীক্ষা করবার উদ্যম তাঁদের নেই, সমাজব্যবস্থার রূপান্তরে নতুন নতুন পরিস্থিতির উদ্ভাবনায়ও তাঁদের কল্পনা বিমুখ।’ (কবির ১৩৬৫: ৯১-৯২)

সংক্ষেপে বলিতে কি, ইহাই আমাদের নতুন নাচের ইতিকথা। ইতিকথার পরের কথাও একটা থাকে অবশ্য। যেমন কথায় বলে, মরা হাতির দাম লাখ টাকা। বাংলাদেশের কবিতার পুরাতন আঙ্গিকের চৌহদ্দির মধ্যেও জসীমউদ্‌দীনের প্রাণশক্তি পুরাপুরি নিঃশেষিত হইয়া যায় নাই। প্রমাণ ১৯৭১ সালের অভিজ্ঞতা লইয়া লেখা এই ক্ষীণকায়—সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়ের ভাষায় ‘জসীম উদ্দীনের ক্ষুদ্রতম’—কাব্যগ্রন্থেও মিলিতেছে।

এই গ্রন্থে ‘বঙ্গ-বন্ধু’ নামে একটি কবিতা আছে, নিচের তারিখ ১৬ মার্চ ১৯৭১। এই কবিতার মাথায় মন্তব্য ঠুকিতে বসিয়া সুনীলবাবু লিখিয়াছেন, ‘এক আশ্চর্য ব্যক্তিত্ব এই বঙ্গবন্ধু, যাঁর হুকুমে অচল হয়ে গিয়েছিল শাসকের সকল নিষ্পেষণ যন্ত্র, বাঙালী নরনারী হাসিমুখে বুকে বুলেট পেতে নিয়েছিল শোষক সেনাবাহিনীর।’ কথাটি মোটেও মিথ্যা নহে। খোদ জসীমউদ্‌দীনের রূপকটা পাওয়া যায় এই ভাষায়:

তোমার হুকুমে তুচ্ছ করিয়া শাসন ত্রাসন ভয়,
আমরা বাঙালী মৃত্যুর পথে চলেছি আনিতে জয়।
(‘বঙ্গ-বন্ধু’, “ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে”, কবিতাসংগ্রহ ২ : ৩৮৮)

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আরো একটি বিজয়ের কথা জসীমউদ্‌দীন আমাদের শুনাইয়াছেন। ইহা বিশারদ অধ্যাপকদের দৃষ্টিও এড়াইয়া গিয়াছে। যাহা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন করিতে চাহিয়াছিলেন কিন্তু পারেন নাই—কি আশ্চর্য—বঙ্গবন্ধু তাহা পারিয়াছেন। হিন্দু ও মুসলমানকে তিনি ‘প্রেম-বন্ধনে’ মিলাইয়াছেন। মহাত্মা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি জীবনদান করিয়াও যাহা পারেন নাই, তিনি সম্ভব করিয়াছেন তাহা। জসীমউদ্‌দীন লিখিতেছেন:

এই বাঙলায় শুনেছি আমরা সকল করিয়া ত্যাগ,
সন্ন্যাসী বেশে দেশ-বন্ধুর শান্ত-মধুর ডাক।
শুনেছি আমরা গান্ধীর বাণী—জীবন করিয়া দান,
মিলাতে পারেনি প্রেম-বন্ধনে হিন্দু-মুসলমান
তারা যা পারেনি তুমি তা করেছ, ধর্মে ধর্মে আর,
জাতিতে জাতিতে ভুলিয়াছে ভেদ সন্তান বাঙলার।
(‘বঙ্গ-বন্ধু’, “ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে”, কবিতাসংগ্রহ ২ : ৩৮৮)

১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ তারিখে লিখিত ‘কবির নিবেদন’। তাহার কয়েক পংক্তি এইরকম:

প্লাবনের চেয়ে—মারিভয় চেয়ে শতগুণ ভয়াবহ,
নরঘাতীদের লেলিয়ে দিতেছে ইয়াহিয়া অহরহ
প্রতিদিন এরা নরহত্যার যে কাহিনী এঁকে যায়,
তৈমুরলং নাদির যা দেখে শিহরিত লজ্জায়।
(‘কবির নিবেদন’, ‘ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে’, কবিতাসংগ্রহ ২ : ৩৯০)

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পোড়ামাটি নীতির একটি গূঢ় প্রতীক ধামরাই রথ আগুন দিয়া ছাই করার কাহিনী। পাকিস্তান রক্ষাকারী সেনাবাহিনীর কীর্তিস্তম্ভস্বরূপ এই ‘ধামরাই রথ’ ভস্মীভূত করিবার কাহিনীটিও লিখিয়া রাখিয়াছেন জসীমউদ্‌দীন । এই কবিতা হইতে অংশবিশেষ বাছিয়া লওয়া সহজ কর্ম নহে। আমরা ইহার শেষাংশ হইতে মাত্র তিনটি স্তবক উদ্ধার করিব।

বছরে দু-বার বসিত হেথায় রথ-যাত্রার মেলা,
কত যে দোকান পসারী আসিত কত সার্কাস খেলা।
কোথাও গাজীর গানের আসরে খোলের মধুর সুরে,
কত যে বাদশা বাদশাজাদীরা হেথায় যাইত ঘুরে।
শ্রোতাদের মনে জাগায়ে তুলিত কত মহিমার কথা,
কত আদর্শ নীতির ন্যায়ের গাথিয়া সুরের লতা।
পুতুলের মত ছেলেরা মেয়েরা পুতুল লইয়া হাতে,
খুশীর কুসুম ছড়ায়ে চলিত বাপ ভাইদের সাথে।
কোন্ যাদুকর গড়েছিল রথ তুচ্ছ কি কাঠ নিয়া,
কি মায়া তাহাতে মেখে দিয়েছিল নিজ হৃদি নিঙাড়িয়া।
তাহারি মাথায় বছর বছর কোটী কোটী লোক আসি,
রথের সামনে দোলায়ে যাইত প্রীতির প্রদীপ হাসি।
পাকিস্তানের রক্ষাকারীরা পরিয়া নীতির বেশ,
এই রথখানি আগুনে পোড়ায়ে করিল ভস্মশেষ।
শিল্পী হাতের মহা সান্ত¡না যুগের যুগের তরে,
একটি নিমেষে শেষ করে গেল এসে কোন বর্বরে!
(‘ধামরাই রথ’, ‘ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে’, কবিতাসংগ্রহ ২ : ৩৯৭)

কবিতার নিচে তারিখ লেখা আছে ‘ঢাকা, ১৬: মে, ১৯৭১’।

শুদ্ধমাত্র ‘ধামরাই রথ’ নহে—এইরকম গোটা ষোলটি (উৎসর্গপত্র সমেত মোট সতেরটি) কবিতা লইয়া জসীমউদ্‌দীনের ‘সেই ভয়াবহ দিনগুলিতে’। ২৭ মার্চ ১৯৭১ তারিখে রচিত ‘কবির নিবেদন’ নামক বিশেষ কবিতাটি মনে হয় ‘ধামরাই রথ’-নামারই সামান্য সংস্করণ।

পদ্মা মেঘনা যমুনা নদীর রূপালী রেখার মাঝে,
আঁকা ছিল ছবি সোনার বাঙলা নানা ফসলের সাজে।
রঙের রেখার বিচিত্র ছবি, দেখে না মিটিত আশ,
ঋতুরা তাহারে নব নব রূপে সাজাইত বার মাস।
যে বাঙলা আজি বক্ষে ধরিয়া দগ্ধ গ্রামের মালা,
রহিয়া রহিয়া শিহরিয়া উঠে উগারি আগুন জ্বালা।
দস্যু সেনারা মারণ-অস্ত্রে বধি ছেলেদের তার,
সোনার বাঙলা বিস্তৃত এক শ্মশান কবরাগার।
(‘কবির নিবেদন’, ‘ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে’, কবিতাসংগ্রহ ২ : ৩৮৯-৩৯০)

১৯৭১ সালে কবি জসীম উদ্দীনের বয়স প্রায় সত্তর ছুঁই ছুঁই। সৃষ্টিক্ষমতাও তাঁহার ততদিনে নিঃসন্দেহে কিছু কমিয়া আসিয়াছে। তবু ধন্য আশা কুহকিনী, দেশ স্বাধীন হইয়াছে আর কবি গাহিতেছেন ভরসার গান।

ঝড়ে যে বা ঘর ভাঙিয়া গিয়াছে আবার গড়িয়া নিব,
ঝড়ের আঁধারে যে দীপ নিভেছে আবার জ্বালায়ে দিব।
ধান কাউনের গমের আখরে মাঠেরে নক্সা করি,
হেলাব দোলাব প্রজাপতি পাখে সাঁঝ উষা রং ধরি।
(‘জাগায়ে তুলির আশা’, “ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে”, কবিতাসংগ্রহ ২ : ৪০৪)

এই সরল পংক্তিনিচয় পড়িবার কত আগেই না হুমায়ুন কবির লিখিয়াছিলেন, ‘আজ আত্মকেন্দ্রিক পুনরাবৃত্তির মধ্যেই তাঁদের সাধনা নিবদ্ধ!’ কাব্যসাধনার প্রকরণে ইহা সত্য হইলেও কাব্যের ‘নিরাকারে’ কোথায় যেন একটা দুর্মর নাদ আছে, যাহা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

১৯৭০ সালের ১৪ আগস্ট ছিল যুক্ত পাকিস্তানের শেষ স্বাধীনতা দিবস। এই দিনটি উপলক্ষে রচিত মুলতানের উর্দু কবি রিয়াজ আনোয়ারের ‘আজাদির দিনে’ নামক একটি কবিতা তর্জমার ছলে সেদিন জসীমউদ্‌দীন লিখিয়াছিলেন আপন মনেরই অপ্রকাশিত বেদনা। এই বেদনা পুনরাবৃত্তির অযোগ্য।

আজ আজাদির তেইশ বছর কিবা উন্নতি দেশে
নয়া সড়কের শত তন্তুতে আকাশের কোণ মেশে।
শোষণের আর শাসনের যেন পাতিয়া এই পথ-জাল
অন্তরীক্ষে আছে পাহারায় মহাশয় মহীপাল।
পানটুকু হতে চুনটি খসাবে এমন স্পর্ধা যার,
এই জালে তারে জড়ায়ে পেচায়ে করা হবে সুবিচার।

আজি আজাদির এ পুত দিবসে বার বার মনে হয়
এই সুন্দর শ্যাম মনোহরা এ দেশ আমার নয়।
(‘আজাদির দিনে’, “পদ্মানদীর দেশে”, কবিতাসংগ্রহ ২ : ৩০৫-৩০৬)

স্বাধীনতা সংগ্রামের মাহেন্দ্রক্ষণে সংগঠিত ‘লেখক শিবির’ নামের একটি সংগঠন বাংলা একাডেমির সহায়তাক্রমে ‘হে স্বদেশ’ নামে তিন খণ্ড সংকলন প্রকাশ করিয়াছিলেন ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। তাহাদের এক সংকলনে—কবিতা খণ্ডে— জসীমউদ্‌দীনের কবিতাও দেখা গিয়াছিল একটি। এই ‘একুশের গান’ কবিতাটি ঠিক কখন লেখা হইয়াছিল উল্লেখ করা নাই, তবে অন্তর্গত সাক্ষ্য হইতে অনুমান করি ইহার রচনাকাল ১৯৫২ সালের কাছাকাছি কোন এক সময়েই হইবে। কারণ তখন পাকিস্তানের অন্তঃপাতী পূর্ববঙ্গ প্রদেশের জনসংখ্যা চার কোটি বলিয়াই প্রসিদ্ধ ছিল। জসীমউদ্‌দীনও সত্যই লিখিয়াছিলেন: ‘চার কোটী ভাই রক্ত দিয়ে/ পূরাবে এর মনের আশা।’ আমি কবিতাটির দোহাই দিয়া এই নিবন্ধের উপসংহার করিতেছি। ইহার যে রূপক তাহাতেও জসীমউদ্‌দীনের শক্তি তাজাবোমার মতন বিস্ফোরিত হইতেছে। ‘একুশের গান’ কবিতাটিতে মোট বাইশটি পংক্তি। টুকরা-টাকরা উদ্ধার না করিয়া গোটা কবিতাটিই না হয় এখানে ছাপাইয়া দিই।

আমার এমন মধুর বাঙলা ভাষা
ভায়ের বোনের আদর মাখা
মায়ের বুকের ভালোবাসা।
এই ভাষা রামধনু চড়ে
সোনার স্বপন ছড়ায় ভবে
যুগ যুগান্ত পথটি ধরে
নিত্য তাদের যাওয়া আসা,
পূব বাঙলার নদীর থেকে
এনেছি এর সুর,
শস্য দোলা বাতাস দেছে
কথা সুমধুর,
বজ্র এরে দেছে আলো
ঝাঞ্ঝা এরে দোলদোলালো
পদ্মা হল সর্বনাশা।
বসনে এর রঙ মেখেছি
তাজা বুকের খুনে
বুলেটেরি ধূম্রজালে
ওড়না বিহার বুনে,
এ ভাষারি মান রাখিতে
হয় যদি বা জীবন দিতে
চার কোটী ভাই রক্ত দিয়ে
পূরাবে এর মনের আশা।
(জসীমউদ্দিন, হে স্বদেশ ১৯৭২ : ২৫)

বাংলা ভাষার শক্তি সম্বন্ধে জসীম উদ্দীনের রূপক—এক কথায় বলিতে—অতুলনীয়। কবির নির্বন্ধে বাংলা ভাষার সুরটা আসিয়াছে পূর্ব বাংলার নদী হইতে আর এই ভাষার স্বাদটা (‘সুমধুর’ তো স্বাদের কথাই) আসিয়াছে এই দেশের বাতাস হইতে। সে বাতাস শস্যকে দোলা দেয়।

অধিক মন্তব্য করিব না। শুদ্ধ লক্ষ্য করিতে বলিব ‘দেছে’ শব্দের ব্যবহারটি। এ রকম আরো খাঁটি বাংলা শব্দ ছড়াইয়া আছে জসীমউদ্‌দীনের চরণে চরণে। এহেন শব্দের মধ্যে পাইতেছি আরেকটি—‘এরে’। ভারি দুর্ধর্ষ এক রূপক গড়িয়া  উঠিয়াছে ‘ওড়না বিহার’ শব্দের নির্বন্ধে—‘বুলেটেরি ধূম্রজালে ওড়না বিহার বুনে’। এই বাক্যবন্ধটিকে ‘অসাধারণ’ বলিলে খুব কমই বলা হয়। এইরকম আরেকটি রূপক পাইয়াছিলাম ‘ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে’ নাম দেওয়া কবিতা সংকলনের ‘জাগায়ে তুলিব আশা’ কবিতায়।

শোন ক্ষুধাতুর ভাইরা বোনেরা, উড়োজাহাজের সেতু
রচিত হইয়া আসিছে আহার আজি মোদের হেতু।
(কবিতাসংগ্রহ ২/২০১৮ : ৪০৪)

স্বীকার করিব ‘উড়োজাহাজের সেতু’ রূপকটি রসের পরিচয়ে ‘ওড়না বিহার’ বা উড়ন্ত ধর্মাশ্রমকে ছাড়াইয়া যায় নাই। তারপরও তাহাকে কম সুন্দর বলা যায় কি?

সীমান্তের কাছাকাছি গুটিকতক গ্রামের কথা ছাড়িয়া দিলে বলিতে হইবে ১৯৭১ সালের ‘ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে’ গোটা বাংলাদেশই ছিল একটি বৃহৎ বন্দীশিবির। শামসুর রাহমান তখন ঢাকায় ছিলেন। তিনি ঢাকা হইতে কিছু কবিতা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে হাতে কলিকাতা পাঠাইয়াছিলেন। কবিতাগুলি ফরাশিদেশের কবি পল এলুয়ারের ধরনে লিখিত হইয়াছিল আর ‘মজলুম আদীব’ নামের আড়ালে ছাপা হইয়াছিল কলিকাতা নগরীর মশহুর সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায়। আর জসীমউদ্‌দীনের কবিতাগুলি একই সময়ে পাচার হইয়াছিল ‘তুজম্বর আলি’ ছদ্মনামে। শামসুর রাহমানের রূপক ছিল ‘বন্দী শিবির’ আর জসীমউদ্‌দীনের লক্ষণার মধ্যে প্রধান ‘গোরস্তান’, ‘শ্মশান’ কিংবা ‘কবরাগার’। আহা, ‘কবরাগার’ শব্দটি যেন খোদ সিগমুন্ড ফ্রয়েডের অভিধান হইতে উঠিয়া আসা! অজ্ঞানের দান। ‘কবর’ ও ‘কারাগার’ কি গাঢ় আলিঙ্গনেই না মিলিয়াছিল ১৯৭১ সালের অবরুদ্ধ বাংলাদেশে! কবরাগারে কবিতার প্রাণশক্তি কোথায় যে থাকে কে জানে! জসীমউদ্‌দীন লিখিয়াছিলেন:

গোরস্তান যে প্রসারিত হয়ে ঘিরেছে সকল দেশ,
শ্মশান চুল্লি বহ্নি উগারি নাচে উলঙ্গ বেশ।’
                (‘কি কহিব আর’, কবিতাসংগ্রহ ২ : ৩৯২)

কিংবা

সারা গাঁওখানি দগ্ধ শ্মশান, দমকা হাওয়ার ঘায়
দীর্ঘ নিশ্বাস আকাশে পাতালে ভস্মে উড়িয়া যায়।
(‘দগ্ধগ্রাম’, কবিতাসংগ্রহ ২ : ৩৯৫)

আর আগেই তো একবার উদ্ধার করিয়াছি:

দস্যু সেনারা মারণ-অস্ত্রে বধি ছেলেদের তার,
সোনার বাঙলা বিস্তৃত এক শ্মশান কবরাগার।
(‘কবির নিবেদন’, ‘ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে’, কবিতাসংগ্রহ ২ : ৩৮৯-৩৯০)

‘ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে’ জসীমউদ্‌দীন উৎসর্গ করিয়াছিলেন আপনকার পরিচিতজনের একজন অখ্যাত শহিদ মুক্তিযোদ্ধার নামে। ‘শহীদ সামাদ স্মরণে’ নামে প্রণীত উৎসর্গপত্রের কিছুটা পুনরাবৃত্তি করিয়া আমিও আজিকার নিবন্ধের তামাম শোধ করিব।

যাহাদের দুঃখে দিলে প্রাণদান, তাদের কাহিনীগুলি,
কিছু কুড়াইয়া দিলাম আজিকে তোমার হস্তে তুলি।
তোমার সঙ্গে আরো যারা গেছে তাদের স্মরণ পথে
ভাসালেম মোর মানসের ফুল আজিকে কালের স্রোতে।
(‘শহীদ সামাদ স্মরণে’, ‘ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে’, কবিতাসংগ্রহ ২ : ৩৮৪)

দোহাই

১. জসীমউদ্‌দীন, ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে (ঢাকা : নওরোজ কিতাবিস্তান, ১৯৭২); পুনর্মুদ্রণ : জসীমউদ্‌দীন, কবিতাসংগ্রহ : ২, পুলক চন্দ সম্পাদিত (কলিকাতা : দে’জ পাবলিশিং, ২০১৮), পৃ. ৩৮৩-৪০২।

২. জসীমউদ্‌দীন, ‘আজাদির দিনে,’ পদ্মানদীর দেশে, কবিতাসংগ্রহ : ২, ঐ, পৃ. ২৯৩-৩৩৩।

৩. হুমায়ুন কবির, বাঙলার কাব্য, ২য় সংস্করণ (কলিকাতা : চতুরঙ্গ, ১৩৬৫)।

৪. সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়, জসীমউদ্‌দীন : কবিমানস ও কাব্যসাধনা, পুনর্মুদ্রণ (ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ২০০৪)।

৫. বাংলাদেশ লেখক শিবির সম্পাদিত, হে স্বদেশ : কবিতা (ঢাকা : বাঙলা একাডেমী, ১৯৭২)।

 

এনটিভি অনলাইন, ৪ এপ্রিল ২০১৮