Monthly Archives: March 2018

জেমস রেনেল ও তাঁহার রোজনামচা ১৭৬৪-৬৭ (পহেলা কিস্তি)

james_rennel.jpg
জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০)

খ্রিষ্টিয় ১৮শ শতাব্দীর মাঝামাঝি বঙ্গদেশে ইংরেজ অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যক্ষ ফল আজকের বাংলাদেশশুদ্ধ অখিল ভারতবর্ষের পরম দারিদ্র ও দুর্গতি। এই কথা মোটেও অতিশয় নয়। অখিল ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের অভিশাপ প্রায় দুই শত বৎসর বহন করিয়াও আমরা আজও
বুঝিতে পারিতেছি না এই উপনিবেশবাদ বা পরশাসন কী পরিমাণে আমাদের দেশের ক্ষতিসাধন করিয়াছিল।

আমাদিগের ইদানিন্তন শাসক ধনবান শ্রেণী ইহার কারণ জানিবার প্রয়াসও করে না। তাঁহারা পশ্চিমা সাম্রাজ্য শাসকদের সহিত গাঁটছড়া বাধিয়া এই দেশ চালাইতেছেন। ইংরেজ শাসনের পাপ এখন মার্কিন সাম্রাজ্যের তাপে চাপা পড়িতেছে।

দুইশত বর্ষব্যাপী ইংরেজি শাসনপাপের মধ্যে যে দুই চারিটি প্রায়শ্চিত্ত হইয়াছে মেজর জেমস রেনেলের রোজনামচা তাহাদের মধ্যে পড়ে বলিয়া বর্তমান লেখকের ধারণা। কথায় বলে শয়তানকেও তাঁহার প্রাপ্য দিতে হইবে। রেনেলের জরিপকর্ম বাবদ এই প্রাপ্য ইংরেজ ডাকাতদেরও দিতে হইবে।

জেমস রেনেল যে সময় বঙ্গদেশের নদনদী জরিপ কার্যে মন দেন তখন বাংলাদেশে ইংরেজি ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে কিন্তু ইংরেজ-দায়িত্ব প্রবর্তিত হয় নাই। দেশের অবস্থা তখন সম্পূর্ণ অরাজক। পূর্ব ভারত কোম্পানি খাজনা আদায় করিতেছে কিন্তু কোন শাসন ব্যবস্থাই প্রবর্তন করে নাই। কিছুদিন পর চালু হইবে দ্বৈত শাসন-ব্যবস্থা। এতদিন পর্যন্ত যাহা চলিতেছিল তাহা নামে নবাবের শাসন আর কাজে ইংরেজ কোম্পানির ক্ষমতা।

১৭৬৪ সনের ৬ মে তারিখে কলিকাতাস্থ দূর্গের অধিনায়ক বা গবর্নর হেনরি ভ্যানশিটার্ট কাপ্তেন জেমস রেনেলকে নদীয়া জেলার উত্তর সীমানাবর্তী জলঙ্গি নদীর মাথা হইতে পূর্বদিকে ঢাকা পর্যন্ত গঙ্গা ও পদ্মার দক্ষিণ তীর তথা অববাহিকাবর্তী নদীনালা জরিপের লক্ষ্যে জরিপকার বা আমিন নিযুক্ত করেন।

এই জরিপের অংশস্বরূপ গবর্নর মহোদয়ের নিযুক্ত গোয়েন্দা কর্মচারি জেমস রেনেল ১৭৬৪ সালের ৭ই মে তারিখ হইতে তাঁহার রোজনামচা বা দিনলিপি লিখিতে শুরু করেন। সেই দিনলিপি ১৯১০ সাল পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য ছাপা হয় নাই।

১৯১০ সালে কলিকাতাস্থ এশিয়াটিক সমিতি তৎকালীন ‘ভারতবর্ষের ভূতাত্ত্বিক জরীপ’ নামক সংস্থার সদস্য টি. এইচ. ডি. লা টুশ (T. H. D. La Touche) নামা এক ভদ্রলোকের সম্পাদনা বা মধ্যবর্তিতায় এই দিনলিপি প্রকাশ করে। আমরা সেখান হইতে এই তর্জমা প্রকাশ করিতেছি।

লা টুশ সাহেব জানাইতেছেন ১৭৬৪ সাল হইতে ১৯৬৭ সালের মধ্যে গঙ্গা ও ব্রহ্মপূত্র নদীর জরিপ চলার সময় পরাধীন বঙ্গদেশের শাসন অধিনায়ক বা গবর্নরদের গোয়েন্দা হিসাবে জেমস রেনেল এই বিবরণী লিখিয়াছিলেন। লা টুশ সম্পাদিত রেনেলের রোজনামচায় তিনটি বড় টুকরা আছে। প্রথম টুকরা ১৭৬৪ সালের মে হইতে ১৭৬৫ সনের মে পর্যন্ত বিস্তৃত। দ্বিতীয় টুকরার বিস্তার ১৭৬৫ সালের মে হইতে ১৭৬৬ সালের জানুয়ারি। আর তৃতীয় টুকরার প্রসার হইতেছে ১৭৬৬ সনের জানুয়ারি হইতে ১৭৬৭ সনে মার্চ অবধি।

এক্ষণে জেমসের পরিচয় খানিক দেওয়া যাইতে পারে। এই তথ্য আমরা পাইয়াছি খানিক লা টুশের লেখা পরিচয়পত্র হইতে আর খানিকটা ‘উয়িকিপিড়িয়া’ নামক একটি দাতব্য বিশ্বকোষ হইতে। আমাদের জ্ঞাতসারে জেমস রেনেল জন্মিয়াছিলেন ১৭৪২ সালের ৩ ডিসেম্বর আর প্রাণত্যাগ করিয়াছিলেন ১৮৩০ সালের ২৯ মার্চ। মানে তিনি প্রায় ৮৮ বছর আয়ু পাইয়াছিলেন। বিবরণ মোতাবেক মাত্র ১৪ বছর বয়সে মানে ১৭৫৬ সালে – তিনি নৌবাহিনীর চাকরি লইয়াছিলেন। ১৭৭৭ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ১৮৩০ সালে পরলোক গমনের পর হইতে লন্ডন শহরের ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবে নামক ধর্মস্থানে তিনি শুয়ে আছেন।

১৭৬৪ সালে যখন তাহাকে জরিপকাজের দায়িত্ব দেওয়া হয় তখন তাঁহার বয়স বড়জোর ২২ বছর। ১৭৬৭ সালে তাঁহাকে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মহা আমিন বা সার্ভেয়ার জেনারেল নিয়োগ করা হয়। ১৭৬৪ সাল হইতে ১৭৭৭ – সর্বমোট এই তের বছর – তিনি বঙ্গদেশের ব্রিটিশ জরীপকাজে নিযুক্ত ছিলেন।

রেনেলের বঙ্গীয় জরিপ ও মানচিত্র সম্পর্কে বিশেষ তারিফ শোনা যায়। মহা আমিনের প্রধান কার্যালয় বসিত পূর্ব বাংলার ঢাকা শহরে। বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইংরেজ বিরোধী সংগ্রাম তখনও চলিতেছিল। ইংরেজরা এই সংগ্রামকে ফকির বিদ্রোহ বলিয়া ডাকিতেন। ১৭৭৬ সালে ভূটানের সীমান্ত বরাবর একস্থানে একবার মুক্তিযোদ্ধা ফকির বাহিনীর আক্রমণে পড়িয়া রেনেল সাহেবও গুরুতর আহত হইয়াছিলেন।

এই আঘাত হইতে তিনি কখনও পুরাপুর সারিয়া উঠেন নাই। বলা যায় এই আঘাতের কারণেই অল্পবয়সে অবসর গ্রহণে বাধ্য হইয়াছিলেন তিনি । বলা হইয়াছিল ইহার পর হইতে তিনি আর বঙ্গদেশের “আবহাওয়ার প্রভাব” সহ্য করিতে পারিতেন না। ১৭৭৬ সালের ৫ এপ্রিল তাঁহার মেজর পদে উন্নতি হয়। খ্যাতনামা গভর্ণর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস তাঁহাকে বার্ষিক ৬০০ পাউন্ডের ভাতা মন্জুরি প্রদান করিয়াছিলেন।

জীবনের বাকি ৫৩ বছর তিনি লন্ডন শহরেই কাটাইয়াছিলেন। তখন ভারতে ব্রিটিশ শাসনে সহায়তা করিবার নিমিত্ত প্রতিষ্ঠিত “ইস্ট ইন্ডিয়া হাউস” নামক দপ্তরে কাজ করিতেন জেমস রেনেল। সেই যুগে তাঁহাকে এয়ুরোপের না হইলেও বিলাতের সেরা ভূগোল-বিশারদ বলিয়া গণনা করা হইত।

রেনেলের লেখার মধ্যে সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করার যোগ্য বিবেচিত হইয়াছে ১৭৭৯ সালে প্রকাশিত Bengal Atlas বা বঙ্গদেশের মানচিত্র । ১৭৮৩ সনে তিনি ‘ভারতবর্ষের খসড়া মানচিত্র’ প্রকাশ করেন। ১৮০০ সালে প্রকাশিত হয় Geographical System of Herodotus বা ‘এরোদোতসের ভূগোলজগত’। তাঁহার আরেকটি উল্লেখ্য বই Comparative Geography of Western Asia বা ‘এশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের তুলনাভিত্তিক ভূগোল’ ।

শেষ বয়সে জেমস রেনেল সমুদ্রস্রোত বিষয়ে গবেষণা করিয়া আপন খ্যাতির বৃদ্ধি সাধন করেন। তাঁহাকে ওসানোগ্রাফি বা মহাসমুদ্রবিদ্যার পিতা বলিয়াও ডাকিবার রীতি ইংরেজরা চালু করিয়াছিলেন। তাঁহার এন্তেকালান্তে মোতাবেক ১৮৩২ সালে তদীয় কন্যার সম্পাদনায় Curreats of the Aetlantic Ocean বা ‘অতলান্তিক মহাসমুদ্রের স্রোতধারা’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ১৭৮১ সালে তিনি ইংলন্ডের রাজকীয় সমিতির সদস্য মনোনীত হইয়াছিলেন।

দোহাই

১. James Rennell, The Journals of Major James Rennell, First Surveyor-General of India, Written for the information of the Governors of Bengal during his surveys of the Ganges and Brahmaputra rivers 1764 to 1767, edited by T. H. D. La Touche, Geological Survey of India (Calcutta; Asiatic Soceity, 1910).

~ ~ ~ ~ ~ ~

আমিন জেমস রেনেল

বিরচিত

শুকনা মৌসুমে গঙ্গানদী হইতে কলিকাতা যাইবার নিকটতম পথ খুঁজিয়া পাইবার লক্ষ্যে জলঙ্গি নদীর মাথা হইতে ব্রহ্মপুত্র বা মেঘনা নদীর সঙ্গমস্থল পর্যন্ত গঙ্গার; লক্ষীপুর হইতে ঢাকা পর্যন্ত মেঘনা ও অন্যান্য নদীর; এবং দক্ষিণ তীরবর্তী নদীনালার জরিপকার্যের বিবরণী সংযুক্ত

রোজনামচা

সন ১৭৬৪-১৭৬৭

তজর্মা : সলিমুল্লাহ খান

শুকনা মৌসুমে গঙ্গানদী হইতে কলিকাতা যাইবার ঘনিষ্টতম পথ আবিষ্কারের লক্ষ্যে পরিচালিত পহিলা অভিযাত্রার রোজনামচা।
উয়িলিয়াম দূর্গের শাসক মহাত্মা হেনরি ভানশিটার্ট মহোদয় প্রদত্ত আদেশের নকল।

~ ~ ~ ~ ~

উয়িলাম দূর্গ, ৬ মে ১৭৬৪

মহাশয়,
আপনাকে নিয়োগ দেওয়া হইতেছে সর্বপ্রথমে মহানদীর (গঙ্গার) যে অংশ জলঙ্গির পূর্বদিকে অবস্থিত তাহার জরিপকার্য সমাধা করিবার উদ্দেশ্যে; আর এই জরিপকার্যের বিশেষ উদ্দেশ্য পূরণ করিতে আপনাকে মহানদী হইতে খাড়ির খাল বা রাঙ্গাফুল পর্যন্ত হ্রস্বতম ও সর্বাধিক নিরাপদ পথটি খুঁজিয়া পাইতেই হইবে।

এই উদ্দেশ্যে আপনি মহানদীর দক্ষিণ ধার ধরিয়া চলিবেন আর দক্ষিণমুখি বাহির হইয়াছে এমন নদী বা নালার (Nulla) প্রত্যেকটি পরখ করিবেন, দেখিবেন এইসব নদী নালা দিয়া তিনশত মণ পর্যন্ত ভারবাহী নৌকা আসাযাওয়া করিতে পারে কিনা আর স্থানীয় লোকজন মারফত খবর লইবেন এইসব নদীনালা দিয়া সম্বৎসর যাতায়াত করা যায় কিনা; আর নদীতীরের চেহারা আর খাড়াই দেখিয়া এই বিষয়ের অবস্থা সম্বন্ধে আপনি নিজেই গ্রহণযোগ্য মতামত দিতে পারিবেন।

আপনি একটি রোজনামচা লিখিবেন যাহাতে আপনার কাজের বিবরণ খুঁটিনাটিশুদ্ধ লিপিবদ্ধ করিবেন, তাহাতে আপনি যে যে দেশগ্রামের পথঘাট পার হইতেছেন তাহা দেখিতে-টেখিতে কেমন আর তাহাতে কী কী ফসল ফলে তাহার কথাও লিখিবেন; তাহাতে কিন্তু দেশগ্রামের নামধামশুদ্ধ আর আর যাহা যাহা উল্লেখ করিবার যোগ্য তাহারও উল্লেখ করিবেন। নদী ও নালার যে খসড়া [চিত্র] আপনি প্রস্তুত করিবেন তাহার সঙ্গে এই রোজনামচার এক প্রস্থ নকলও আমাকে দিবেন।

নিবেদন ইতি
আপনারই একান্ত বাধ্য সেবক
বিনীত
হেনরি ভ্যানশিটার্ট।

~ ~ ~ ~ ~

সোমবার ৭ই মে। একটি ছোট বজরা, সঙ্গে লোকজন ও অন্যান্য জিনিশ বহন করিবার মতন ৫টি ছোট উয়িলক সমভিব্যহারে জলঙ্গির পথ ধরিয়া অগ্রসর হইব বলিয়া কলিকাতা হইতে যাত্রা করিলাম।

লোকজনের হিসাব নিচে লিখিতেছি:

সহকারী আমিন ১ জন
অন্যান্য এয়ুরোপীয় সাহেব ১ জন
লস্কর ১১ জন
মোটিয়া ১১ জন
অনুবাদক ১ জন
আমাকে শুদ্ধ ধরিয়া মোট ৩৯ জন

বেলা ৩ ঘটিকার সময় আমরা নতুন দূর্গ হইতে নৌকা ছাড়িলাম, তবে আজ রাত্রে জোয়ার অনুকূল না থাকায় আমাদের উজানে যাওয়া ব্যাহত হইয়াছে। তাই আমরা কলিকাতা পর্যন্ত আসিলাম। আজ সারাদিন আবহাওয়া চমৎকার।

৮ তারিখ রাত্রি ১ ঘটিকা। আওয়াজ পাইলাম বজরা ডুবিতেছে । আমার ঘুম ভাঙিল, দেখিলাম সত্য সত্যই ইহা ডুবিবার উপক্রম হইয়াছে, দুই তৃতীয়াংশ পানিতে ভরিয়া গিয়াছে। এই দুর্ঘটনার ফলে আমার নিত্য ব্যবহার্য জিনিশপত্রের বেশির ভাগই নষ্ট হইয়া গেল, আমার কাপড়চোপড়ের সিংহভাগেরও একই দশা ঘটিল। আজ কলিকাতায় কাটাইয়া ছিদ্রটা সারাইলাম। সাঁঝের বেলা নদীপথে উজানে যাত্রা করিলাম, আর রাত্রের মতো শ্রীরামপুরে আসিয়া নৌকা ভিড়াইলাম, আজ বিকালে উত্তর পশ্চিম দিক হইতে চোখা চোখা দমকা হাওয়া বহিতেছিল।

৯ তারিখ পরিষ্কার আবহাওয়া। সকাল আটটায় গিরিটির শোভা দেখিব বলিয়া বাহির হইলাম। চন্দননগরে বৃষ্টি হইল, আর দূর্গের ধ্বংসাবশেষ ও শহর দেখিব বলিয়া বাহির হইলাম। বৈকাল ৪ ঘটিকার সময় চিনসুরা অতিক্রম করিয়া রাত্রি নাগাদ বাঁশবাড়িয়া খালে প্রবেশ করিলাম। এই খালের পানি এক্ষণে ভরা জোয়ারে ৫ হাত গভীর হয়। কাপ্তেন পলিয়রের মানচিত্রে এই নদীর বিবরণ বেশ ফলাও করিয়া দেওয়া হইয়াছে বলিয়াই মনে হয়। রাত্রি পরিষ্কার। দক্ষিণ পশ্চিম দিক হইতে নবীন হাওয়া বাহিতেছে।

১০ তারিখ, আবহাওয়া রকমারি। বেতোয়ালেরা নালা অতিক্রম করিলাম। প্রস্থে বাঁশবাড়িয়া যতখানি চওড়া ইহাও মনে হইতেছে ততখানিই চওড়া। বিকাল ৪ ঘটিকায় যথন আমরা বেতোয়ালেরার মুখে অবস্থান করিতেছি, তখন দক্ষিণ দিক হইতে চোখা একটা দমকা হাওয়া দিল। বজরায় আর একটা ফুটা বাহির হইল। অদ্য দিবাগত রজনী বিরমপুরে কাটাইলাম।

১১ তারিখ আবহাওয়া দিনের বেশির ভাগ জুড়িয়াই ভালো, শুদ্ধ একবারই দক্ষিণ দিক হইতে সামান্য ঝড়ো হাওয়া দিয়াছিল। আজ (মধ্যাহ্নের) পূর্ব নাগাদ আম্বোয়া অতিক্রম করিলাম। জায়গাটা নদীর দক্ষিণ দিকে কুচোয়া হইতে খুলনা যাওয়ার রাস্তার মাঝামাঝি অবস্থিত। বাংলার পুরানা মানচিত্রাদির কোন কোনটিতে এই জায়গাটার উল্লেখ দেখিয়াছি বলিয়া অনুমান করিতেছি একদা ইহা বধির্ষ্ণু গ্রাম ছিল, না থাকিয়া পারে না। যাহাই হউক, বর্তমানে এই জায়গায় শুদ্ধ কয়েকটি পর্ণকুঠির বৈ কোন ঘরবাড়ি নই। আজ রাতে বেলডাঙ্গায় ঘুমাইলাম।

১২ তারিখ সারাদিন ভালো আবহাওয়া, সন্ধ্যা গাঢ়, ভয়াল। সকাল ৮টায় জলঙ্গি নদীতে ঢুকিলাম। কাসিমবাজার নদী যেখানে জলঙ্গির সহিত মিলিয়াছে সেখানে নদী মনে হইতেছে খুব সরু হইয়া গিয়াছে: আমার ধারণা বর্তমান মৌসুমে ইহা কিছুতেই চওড়ায় ৫০ গজের অধিক হইবে না। লোকের মুখে জানিতে পারিলাম এখন এই পথ দিয়া মাঝারি আকারের নৌকা চলাচল করিতে পারে।

সন্ধ্যায় হাউতনগরে একটা জায়গায় মাপজোক করিলাম আর দেখিলাম এখন (জলঙ্গী) নদীর চওড়াই ১৫০ গজ আর বর্ষায় ২৭০ গজ হয়। সেখানে নদী সবচেয়ে বেশি গভীর সেখানে গভীরতা ১৩ ফুট হয়। তীর দেখিয়া মনে হয় বৃষ্টি হইলে পানি আরও ১৩ ফুট উপরে উঠিবে।

১৩ তারিখ সারাদিন ভারি সুন্দর আবহাওয়া। দক্ষিনা হাওয়া। নদীর গভীরতা খুব কমিয়া গিয়াছে, আর এমন আকাবাঁকা হইয়াছে যে যদিও আমরা নদীপথে ২২ মাইল পার হইয়াছি তথাপি নাক বরাবর ১০ মাইলও আসিয়াছি কি না সন্দেহ। অদ্য রাত্রি তিগারি বা নেগারিনে কাটাইলাম। সূর্যাস্তের সময় (কম্পাসের) কাঁটার নড়াচড়া চওড়ায় বাড়িয়া পূর্বমুখি ৩˚-৩ʹ মতো হইয়াছে।

১৪ তারিখ পূর্বাহ্ন পরিষ্কার; বৈকালে পশ্চিম দিক হইতে বৃষ্টি, বজ্র ও বিদ্যুতসহ ভারি দমকা বাতাস হইল। আবহাওয়া খারাপ বলিয়া অদ্য দিবাভাগে আমরা শুদ্ধ ১৬ মাইল আগাইয়াছি। আজ রাতটা আমরা যেখানে কাটাইতেছি সেই নটিডাঙ্গায় নদী মাত্র ২ হাত গভীর।

১৫ তারিখ আবহাওয়া ভারি দমকা হাওয়াময়, আর বৃষ্টিও ভারি। ইহার কারণে, আর নদীর পানি অগভীর ও আকাবাকাঁ হইবার ফলেও, আমরা পথে পিছাইয়া থাকিতেছি। কোন কোন জায়গায় নদী এমনকি ৫ গজও চওড়া নয়। পাঁচদাদায় নদীর চওড়াইর আর গভীরতার মাপ লইলাম । আর একইভাবে নদীতীরের খাড়াইও মাপিলাম, চওড়াই এখন ২০০ গজ; গভীরতা কোথাও ৫ হাতের বেশি নয়। তীর বরাবর বৃষ্টির পর নদী আরো ২৬ ফুট উঠিবে। এই মাপ আর আগে (মানে ১২ তারিখে) হাউতনগরে যে মাপজোক লইয়াছিলাম তাহার জোরে মনে হইতেছে এই নদী বড় নদীর (গঙ্গা) কাছাকাছি স্থানে অনেক বেশি ফাপিয়া উঠে, দূরে গেলে কতখানি ফাপে না আর গোটা ৪১ মাইল দূরে গেলে এই পার্থক্য ১২ কি ১৩ ফুট পর্যন্ত হইয়া থাকে।

আজ সন্ধ্যা গাওঘাটিতে নোঙর করিলাম, সারাদিনে মাত্র ১০ মাইল পথ আগাইয়া আসিয়াছি। এই জায়গায় নদীবক্ষের মধ্যস্থলে ১৯ টি বড় বড় লবণভর্তি নৌকা ডুবিয়া গিয়াছে। আজ রাত্রে কিছু বৃষ্টি হইয়াছে।

১৬ তারিখ সকালবেলার আবহাওয়া সাফ আছে। বিকাল ও সন্ধ্যা ভেজা আর হাওয়া ঝোড়ো। আজ সকালবেলা বকসিপুরের খাড়ি পার হইতে আমাদের অনেক বেগ পাইতে হইয়াছে, উখানে এখন মাত্র ১ ১/২ হাত পানি। ইহাতে মনে হইতেছে এই জায়গায় শুকনা মৌসুমে নদী নিশ্চয়ই একেবারে শুকাইয়া যায়। কারণ আমরা শুনিয়াছি বৃষ্টি হইবার পর নদীর পানি ১ ১/২ হাত বাড়িয়াছে।

দুপুরে ভিখারিগঞ্জ (Vheckery-Gunge) পার হইলাম। এই জায়গায় ৯ কি ১০টা লবণের নৌকা ডুবিয়াছে। অদ্য দিনের বেলা মাত্র ১০ মাইল আগাইয়া রাত্রিতে জগিপুরে নৌকা ভিড়াইলাম। নদী এই জায়গায় ৪ হাত গভীর। আজ রাত্রে বেশ বৃষ্টি।

১৭ তারিখ আবহাওয়া পরিষ্কার। আজ দিনের বেলা ১১১/২ মাইল চলিলাম, কিন্তু নদী এমন আকাবাঁকা যে আমরা নাক বরাবর মাত্র ৬ মাইল গিয়াছি। এইস্থলে দেশগ্রাম খোলামেলা আর অতীব নয়নসুখকর। আজ রাতটা কাটাইলাম স্বস্তিয়াপুরের কাছে ছোট্ট একটি নালায়। চমৎকার রাত্রি।

১৮ তারিখ বেশির ভাগই চমৎকার আবহাওয়া, দখিনা হাওয়া। সকালবেলা আমার (বাজার) সরকারকে পাশের জলঙ্গি গ্রামে পাঠাইলাম, উদ্দেশ্য আমার আগমনের বিনিময়ে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সংগ্রহ করা। অদ্য দিবাভাগে মাত্র ১১ মাইল আগাইয়াছি, কারণ নদী এই স্থলে আগের তুলনায় প্রশস্থতর ও গভীরতর হইলেও কি হইবে, পানি অতি জোরে প্রবাহিত হইতেছে। আজ রাতটা কাটাইলাম জলঙ্গির ৬ মাইল ভাঁটিতে, ধুলমপুরের কাছে। আবহাওয়া পরিষ্কার।

১৯ তারিখ সারাদিন আবহাওয়া পরিস্কার, দক্ষিণ দিক হইতে তাজা বাতাসের দোলা থাকিয়া থাকিয়া হাওয়া দিতেছে। জলঙ্গির মাথা হইতে ৩ মাইল ভাঁটিতে দেখিলাম পানির গভীরতা এতই কম যে বজরার পানিভাসা থাকিতে হইল বড়ই কষ্টেসৃষ্টে। এই অবস্থা প্রায় পোয়া মাইল পর্যন্ত চলিল।

মধ্যাহ্ন হইবার আগেই আমরা মহা গঙ্গানদীতে আসিলাম আর দুপুর একটা নাগাদ জলঙ্গি আসিয়া পৌঁছিলাম।

আমি যে বজরায় চড়িয়া আসিয়াছি তাহা ছিল কলিকাতায় যে সকল বজরা পাওয়া যাইতেছিল তাহাদের মধ্যে সবার চেয়ে ছোট। তাই কলিকাতা ছাড়িবার আগে গভর্নর সাহেব আমাকে জানাইয়াছিলেন জলঙ্গি বরাবর আসিয়া আমার ব্যবহারের জন্য যতগুলি ‘উয়িলক’ আমার দরকার হইবে ঠিক ততগুলি ‘উয়িলক’সহ সুবিধাযুক্ত একটি বজরা আমার অপেক্ষায় থাকিবে, যেন যে মৌসুমে নদীর পানি বড়ই নিচে নামিয়া যায় সে মৌসুমেও জলঙ্গি নদী ধরিয়া যত রকমের অভিযান পরিচালনা সম্ভব তত অভিযান পরিচালনা করিবার কাজে এই সকল যান আমি ব্যবহার করিতে পারি।

কিন্তু জলঙ্গি পৌঁছিয়া দেখিলাম সেখানে কিছুই নাই, না বজরা না উয়িলক কিছুই নাই। সেখানকার লোকজন আমাকে বলিল যে কাপ্তেন উয়িডারবর্ণ (যিনি সম্প্রতি স্বেচ্ছাসেবকদের সহিত অভিযানে গিয়াছেন) হাতের কাছে যাহা পাওয়া যায় তাহা লইব বলিয়া সমস্ত নৌকা ধরিয়া লইয়া গিয়াছেন আর সেই নৌবহরের মধ্যে একটি বজরাও রহিয়াছে; কিন্তু সেই বজরাটিই আমার জন্য ধরা ছিল কিনা এখনও পর্যন্ত সঠিক সংবাদ যোগাড় করিতে পানি নাই। যে বজরায় চড়িয়া আমি আসিয়াছি তাহা আসন্ন বর্ষা মৌসুমে আমি যে কাজ করিতে আসিয়াছি সে কাজ সম্পন্ন করার উপযুক্ত মোটেও নহে; ইহাতে সন্দেহ নাই । বজরাটা ছোট আকারের ও ফুটায়ফাটায় ভরা এই দুই কারণেই।

দেখিলাম নষ্ট করিবার মতন কোন সময়ই আমার হাতে নাই। কারণ নদীর পানি দিনকে দিন বাড়িতেছে। তাই আমি আমার জরিপদলের ব্যবহারোপযোগী কিছু উৎকৃষ্ট উয়িলক সংগ্রহে ব্যস্ত হইয়া পড়ি, কিন্তু তেমন সফল হইতে পারি নাই। কারণ যে তিন দিন আমি ঐখানটায় ছিলাম সেই তিনদিনে আমি শুদ্ধ ২টি উয়িলক যোগাড় করিতে পারিলাম; এইগুলির একেকটি ২০০ মণ পর্যন্ত বোঝা লইতে পারে; তাহা ছাড়া আমি কলিকাতা হইতে আনা ৩টা উয়িলক সঙ্গে রাখিলাম আর ২টা কলিকাতায় ফেরত পাঠাইলাম।

২০ তারিখ সারাদিন আবহাওয়া ভাল ছিল; ২১ তারিখ পূর্বাহ্নও একই রকম কাটিল, তবে বিকালবেলা দক্ষিণপূর্ব দিক হইতে একটা তাজা ঝাপটা বহিয়া গেল, মাঝে মাঝে ভারি দমকা হাওয়া দিতেছিল। কিন্তু বৃষ্টি নামে নাই। আজ গভর্নর সাহেব বরাবর পত্র লিখিলাম, এই পর্যন্ত আমি যতদূর আসিয়াছি তাহার বিবরণী পাঠাইলাম, আর সঙ্গে জুড়িয়া দিলাম জলঙ্গী নদীর অংশবিশেষের নকল।

বিডিনিউজ, আর্টস, ২২ নভেম্বর ২০০৭

ভাষার নির্বন্ধ: পরাধীনতার ঐতিহ্য

অন্ত্যমিল আর গদ্যের মতন ভয়াল কলায়
মধ্যম আর অধমে তফাত থাকে না বজায়।
—ফরাশি প্রবাদ

আমাদের দেশে বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থা (কিংবা অব্যবস্থা) লইয়া অনেক বিতর্ক আছে কিন্তু ছেলেমেয়েদের কোন ভাষায় কি শিক্ষাটা দেওয়া হইতেছে তাহা লইয়া দৃশ্যত কোন বিচার নাই। এ দেশের উচ্চশ্রেণির ছেলেমেয়েরা একপ্রকার ব্যতিক্রমবিহীন অবস্থায় বিরাজ করে। তাঁহারা সকলেই ইংরেজি ভাষার মধ্যস্থতায় পড়াশুনা করিতেছে। দেখা যাইতেছে, তিরিশ কিংবা ততোধিক লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন করা যাইতে পারে, কিন্তু ইংরেজি ভাষার জায়গায় বাংলাকে (অর্থাৎ দেশের ভাষাকে) শিক্ষার বাহন করা যায় না। ইহার নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে।

পরাধীনতার যুগের গোড়া হইতেই আমরা দুইটা যুক্তি শুনিয়া আসিতেছি। এক যুক্তি অনুসারে পরাধীন দেশের ভাষা মোটেও উন্নত, বিকশিত নহে—অন্তত যে সকল দেশ আমাদের দেশটি দখল করিয়াছে সে সকল দেশের ভাষার তুলনায় এ দেশের ভাষা অনুন্নত, অবিকশিত। ইহাতে উচ্চশিক্ষা দেওয়া যায় না। এয়ুরোপ মহাদেশ হইতে আগত প্রত্যেকটি বিজয়ী জাতির প্রতিনিধিরা একই যুক্তি দেখাইয়াছেন। শুদ্ধ ইংরেজি বা ফরাশি নহে—ইন্দোনেশিয়ায় কি মালয়েশিয়ায় ওলন্দাজ জাতি আর অ্যাঙ্গোলা, মোজাম্বিক কি গিনি-বিসাউ দেশে পর্তুগিজ জাতি—সকলেই বলিয়াছেন, এয়ুরোপিয়া ভাষায় যুক্তি দিয়া কথা বলা যায়। এই ভাষাগুলিতে মানুষ বিমূর্ত বা আকার-ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় লেখাপড়া চালাইতে পারে—উত্তর-দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া কিংবা আফ্রিকার পরাজিত জাতিগুলির ভাষার সেই ক্ষমতা নাই।

কথাগুলি সত্য হইলেও হইতে পারে। কিন্তু তাহাতেই বিজয়ী জাতি কখনো সম্পূর্ণ তৃপ্তিলাভ করেন নাই। তাঁহারা আরও একটা যুক্তি দেখাইয়াছেন। এই দোসরা যুক্তি অনুসারে, বাংলার মত বড় বড় জাতীয় ভাষাগুলি নাগা কিংবা চাকমা জাতির ভাষার নাহান ছোট ছোট আঞ্চলিক ভাষা কিংবা ছোট ছোট জাতির মাতৃভাষার বড় ক্ষতি করিয়া থাকে। সুতরাং এই সকল আঞ্চলিক ভাষায় যাঁহারা কথাবার্তা বলিয়া থাকেন তাঁহাদের একমাত্র রক্ষাকবচ এয়ুরোপিয়া বিজয়ী জাতির কোন ভাষা গ্রহণ করা। যেমন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে হিন্দির কর্তৃত্ব হইতে বাঁচিবার জন্য নাগাজাতির রাজ্যে ইংরেজিকেই রাজ্যভাষার মর্যাদা দেওয়া হইয়াছে। ইহাতে একটা সমস্যার সমাধান হইলেও আরেকটি সমস্যার স্বাস্থ্য কিন্তু মোটাতাজা হইতেছে। ইংরেজি হিন্দি সারাইবে বুঝিলাম, কিন্তু ইংরেজি সারাইবে কে!

দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞতা হইতে দেখা যায়, সেখানে একদা বিজয়ী ওলন্দাজদের বংশধরগণ ‘আফ্রিকানস’ নামে যে ভাষাটির সৃষ্টি সম্ভব করিয়াছিলেন সেই ভাষাটি এক্ষণে আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজির সাক্ষাৎ পিছু হটিয়া যাইতেছে। শুদ্ধ আফ্রিকানস নহে, আফ্রিকার শত শত ছোট  জাতির ভাষাও একই পরিস্থিতির মুখে পড়িয়াছে। ইহার কোন প্রতিকার নাই। বাংলাদেশের বড়লোকেরাও—কেতাবি ভাষায় বলিতে উচ্চশ্রেণির লোকেরা—এখন বিনাবাক্যে ইংরেজির মধ্যস্থতায় তাঁহাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শিখাইতেছেন। বাংলা এখন তাঁহাদের চোখে ছোটলোকের—রিকশাওয়ালা বা পোশাক শ্রমিকের—ভাষা বিশেষ। ইহার কি কোন প্রতিকার আছে!

কখনও কখনও আরেকটি—খানিক দুর্বলতর—যুক্তির আওয়াজও আমাদের কানে আসে। এই যুক্তির নাম বাইলিঙ্গুয়ালিজম বা ‘দ্বিভাষা ব্যবসায়’। এই যুক্তির বাদীগণ বলেন, ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে দুই ভাষায় শিক্ষালাভ করিলে ক্ষতি কি! আট-দশটি ভাষা শিখিলেও কোন ক্ষতি নাই, বরং লাভই আছে তাহাতে। সমস্যা হইতেছে, কোন ভাষাটি শিক্ষার বাহন বা প্রচলিত কথায় ‘শিক্ষার মাধ্যম’ হইবে তাহাই। প্রশ্নটা যেখানে অগ্রাধিকারের সেখানে দোভাষী কিংবা ত্রিভাষী শিক্ষার কথাই উঠিতেছে না। আমাদের দেশে উচ্চশ্রেণির শিক্ষা ইংরেজিকেই অগ্রাধিকার দিয়াছে। কারণ তাঁহারা পেছনে অনেকদূর পর্যন্ত দেখিতে পাইতেছেন। পেছনেরটা আবার তাঁহাদের সামনেও দাঁড়ান। যেখানে সারা পৃথিবীতে ইংরেজিই একমাত্র কিংবা একনম্বর ভাষা সেখানে জাতীয় বা দেশীয় ভাষায় শিক্ষা দিয়া সময় নষ্ট করা কেন? ইঁহারা নিজেদের যুক্তিতে এতই স্থিরকাম যে আপনার সহিত কথাবার্তা বলিয়া সময় নষ্ট করিতেও নারাজ।

অল্প কিছুদিন হইল মনোবিশ্লেষণ নামক শাস্ত্র লইয়া একটু আধটু নাড়াচাড়া করিতেছি। দেখিলাম সেই শাস্ত্রের একজন মনীষী—ফরাশিদেশের লোক ইনি—নাম জাক লাকাঁ—কহিতেছেন, এই জাতীয় প্রশ্নে যাঁহাদের কোন প্রশ্ন থাকে না তাঁহারা বিকৃতকামী বিশেষ—ইংরেজিতে ইঁহাদের বলে পার্বার্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালেয়র অধ্যাপক শিশির ভট্টাচার্য্য বলিয়াছেন, ইঁহারা ‘কাগজে-কলমে’ স্বীকার করেন বটে বাংলা প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা, কিন্তু ‘কাজে-কর্মে’ ইংরেজিকেই রাষ্ট্রভাষার উপরে স্থান দেন—অর্থাৎ ইঁহাদের মুখে একটা ভাব, মনে একটা ভাব। জাক লাকাঁর প্রস্তাব অনুসারে, এই ভাবটাই ‘বিকৃতকাম’ নামক গঠনের লক্ষণ।

‘বিকৃতকাম’ কাহাকে বলে? উদাহরণস্বরূপ সমকামের কথা বলা যাইতে পারে। মনোবিশ্লেষণ শাস্ত্রের প্রবর্তক মহাত্মা সিগমুন্ড ফ্রয়েড বলিতেন সমকাম জিনিশটা বিকৃতকাম বিশেষ। ফ্রয়েডের অনুসারী জাক লাকাঁ পুনশ্চ কহিতেছেন, সমকাম জিনিশটা বিকৃতকাম অন্য কারণে। সমকাম ‘প্রকৃতির শাসন’ বিরোধী বলিয়াই বিকৃতকাম নহে। এমনকি সমাজের অনুশাসন পরিপন্থী বলিয়াও নহে। এই কামকে তিনি বিকৃতকাম বলিতেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কারণে। লাকাঁর মতে, প্রকৃতি হইতে সংস্কৃতিতে পৌঁছিবার যে পথ—যাহার ফ্রয়েডপ্রদত্ত নাম ‘ইদিপাসের বাসনা’—সে পথের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় বলিয়াই সমকাম বিকৃতকাম উপাধি পাইতেছে। দৃষ্টান্তের স্থলে তিনি দেখাইয়াছেন, প্রাচীন এয়ুনানে বা গ্রিসদেশে সমকাম সামাজিকভাবে স্বীকৃত ছিল—তারপরও তাহার ‘বিকৃতকাম’ অভিধা অসার্থক হয় নাই। সমকাম ‘ইদিপাসের বাসনা’কে অতিক্রম করিতে চাহে বলিয়াই বিকৃতকাম।

এই বিকৃতকামের আরও বিশ্লেষণ চলিতে পারে, কিন্তু এক্ষণে বলা যাইতে পারে ইহার কোন চিকিৎসা বা উপশম নাই। কেন নাই? প্রথম কারণ, বিকৃতকামী কখনও স্বীকার করেন না তাঁহার কামনা বিকৃত। নিজের যুক্তিতে তিনি এতই অটল এতই অবিচল যে তিনি কোন বিশ্লেষণের প্রয়োজনই অনুভব করেন না। তো তাহার হাত হইতে পরিত্রাণ খুঁজিতে হইবে অন্য প্রস্তাব অনুসারে। এই অন্য পথ বা অন্য প্রস্তাব কি তাহা আমি একটা উদাহরণের সহিত বুঝাইতে চাহিব।

পশ্চিম এশিয়া মহাদেশে এই মুহূর্তে যাহা ঘটিতেছে তাহার এক আদি ঘটনার নাম ইসরায়েল অথবা ফিলিস্তিন সমস্যা। ১৯৯০ সালের পর কোন এক সময়ে আন্তর্জাতিক মুরুব্বিদের মধ্যস্থতায় সেখানে ‘শান্তি প্রক্রিয়া’ শুরু হইয়াছিল। অনেক বিষয়ে দুই পক্ষ একমতও (কিংবা প্রায় একমত) হইয়াছিলেন। কয়েক দফা ঐকমত্যের পূর্বে ‘যুগান্তকারী’ প্রভৃতি বিশেষণও যুক্ত করা হইয়াছিল। যেমন ইসরায়েল কর্তৃক পিএলও বা ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার অস্তিত্ব স্বীকার করা আর ফিলিস্তিন কর্তৃক ইসরায়েল রাষ্ট্রকে কবুল করা। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ইসরায়েল জর্ডান নদীর পশ্চিম তীর আর গাজা উপকূলে যে সকল জায়গা দখল করিয়াছিল সেখানকার কিছু কিছু এলাকায় ‘ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ’ নামে সংস্থা প্রতিষ্ঠার এজাজত পর্যন্ত শান্তি প্রক্রিয়ার অংশস্বরূপ দেওয়া হইয়াছিল। ইজ্জাক রবিন আর এয়াসের আরাফাতের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয় ছিল এই শান্তি প্রক্রিয়ারই বহুলালোচিত বহুজাতিক স্বীকৃতি।

কিন্তু আজ কত বৎসর হইল? একশত বছরের চারিভাগের একভাগ তো বটেই। ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের ঘরে ফেরার (কিংবা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার) কোন ব্যবস্থা তো হয় নাই। বরং তাঁহারা যে তিমিরে ছিলেন অবস্থা সেই তিমিরেই ডুবিয়া রহিয়াছে। উদ্বাস্তুদের বাড়িঘর গুঁড়াইয়া দিয়া, তাঁহাদের জলপাই বাগান উচ্ছেদ করিয়া, তাঁহাদের জায়গাজমি কাড়িয়া লইয়া সেখানে ফি বছর ইসরায়েলিদের জন্য নতুন নতুন বসতির পত্তন করা হইতেছে। এয়াহুদি-নাসারা-মুসলমান তিন ধর্মজাতিরই পবিত্র তীর্থ জেরুজালেম শহর এখনও ইসরায়েলের হাতে। কোন বড় সমস্যার—একটারও—সমাধান হয় নাই। কেন হয় নাই? কারণ একটাই—গোটা দেশটা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দখলে আছে। একটা জাতির জনসাধারণ আরেকটা জাতির বন্দুকের নলের ডগায় বসিয়া আছে। এই মূল সত্যটার দিকে চোখ না দিয়া যত বিশ্লেষণই করা হউক না কেন কোন ফল হইবে না।

জো সাক্কো নামক একজন জাপানি শিল্পী ১৯৯১-৯২ সালে কিছুদিন ইসরায়েল কর্তৃক দখল করা পশ্চিম তীরে এবং গাজায় পরিভ্রমণ করিতেছিলেন। পরিভ্রমণ মানে মাস দুই সেখানে তিনি বসবাস করিয়াছিলেন। দেখিয়া শুনিয়া একদিন তিনি যাহা লিখিয়াছিলেন তাহাতে এই কথাগুলিও ছিল: ‘যতদিন না এই মূল ঘটনাকে—ইসরায়েলি দখলদারিকে—আন্তর্জাতিক আইনের এবং মূল মানবাধিকারের লঙ্ঘন বলিয়া বিচার করা হইতেছে ততদিন ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলি জাতির সদস্যরা একে অপরকে হত্যা করিতেই থাকিবে—হোক তাহা সীমিত পরিসরের খুনাখুনি কি দুনিয়া কাঁপান রক্তারক্তি—হোক তাহা আদমবোমার বেশে কি হেলিকপ্টারযোগে গোলাবর্ষণ কিংবা বোমারু জেটবিমানের মধ্যস্থতায় করা হত্যাকাণ্ড।’

আমার আজিকার এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধের উপসংহারও এই উদাহরণের অনুগামী। যতদিন পর্যন্ত না আমাদের দেশেও পরাধীনতার ঐতিহ্য অটুট থাকিবে ততদিন দেশে সর্বজনীন শিক্ষার প্রসার ঘটিবে না। বিদেশি ভাষা শিক্ষা আমাদের জীবন সংগ্রামের হাতিয়ার—এ সত্যে সন্দেহ নাই। কিন্তু বিদেশি ভাষার মধ্যস্থতায় শিক্ষা দিয়া আমাদের দেশে কোনদিনই সর্বজনীন কিংবা ‘উত্তম’ শিক্ষা প্রবর্তিত হইবে না। যাহা হইতেছে তাহা ‘মধ্যম’ শিক্ষা। ‘মধ্যম শিক্ষা’ বলিয়া কিছু নাই। ‘মধ্যম’ শিক্ষা মানেই শেষ বিচারে ‘অধম’ শিক্ষা।

শিক্ষার ‘মাধ্যম’ কথাটা যখনই আমার কানে আসে আমি তখনই শুনি শিক্ষার ‘মধ্যম’। মানে করি মধ্যম মানের শিক্ষা। তখনই আমার কানে আসে ‘উত্তম-মধ্যম’ কথাটাও। স্বাধীন দেশের শিক্ষার লক্ষ্য হইবে ‘উচ্চশিক্ষা’—মাত্র ‘উত্তম-মধ্যম’ শিক্ষা নহে। বর্তমানে এদেশে যাহা চলিতেছে তাহাকে উত্তম-মধ্যম অর্থাৎ মারধর শিক্ষার অধিক বলা যায় না। পরীক্ষা আর পরীক্ষা, শেষ পরীক্ষা আর ভর্তি পরীক্ষা! উত্তম-মধ্যম আর কাহাকে বলে!

‘মধ্যম’ শিক্ষা কখনও স্বাধীন দেশের শিক্ষার লক্ষ্য হইতে পারে না। কারণ কি জানেন? শিক্ষায় এবং সাহিত্যে মধ্যম বলিয়া কিছু থাকিতে চাহে না। শেষ পর্যন্ত তাহা অধম শিক্ষা বা অধম সাহিত্যে পরিণত হয়। এই একটি ক্ষেত্রে অন্তত শেষ পর্যন্ত মধ্যমে আর অধমে কোন তফাত থাকে না।

১২ মার্চ ২০১৮

এনটিভি অনলাইন, ১৩ মার্চ ২০১৮
বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৭ মার্চ, ২০১৮

মিশেল ফুকোর বাতি জ্বালানি

foucault1.jpg

মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪)

~ মিশেল ফুকো বিষয়ে সলিমুল্লাহ খানের সেমিনার ~

মুখবন্ধ

নিচের প্রবন্ধটি বর্তমান লেখকের বলা একটি বক্তৃতার লিখিত ভাষ্য। ফিতার রেকর্ড থেকে অক্ষরে লিখে নেওয়ার মেহনতটুকু করেছেন আমার বন্ধু জামিল আহমদ। তিনি আমার কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করুন। এই বক্তৃতা কয় তারিখে দিয়েছিলাম রেকর্ডে তার নিদর্শন নাই। আমার ধারণা তারিখটা হয়ত মার্চ কি এপ্রিল মাসের কোন শুক্রবার হবে। যতদূর মনে পড়ে এই বক্তৃতামালা শেষ করেছিলাম মোট আট দিনে। বর্তমান লেখাটি দ্বিতীয় দিনের রেকর্ড থেকে তৈরি করা বলে মনে হয়। প্রথম দিনের বক্তৃতা যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে সঠিক রেকর্ড হয় নাই।

জানিয়ে রাখা যায় আমাদের বিজ্ঞাপিত সমাজের সামান্য নাম ছিল ‘জাক লাঁকা বিদ্যালয়’ আর ঐবারের বিশেষ বক্তৃতামালা প্রচারিত হয়েছিল ‘মিশেল ফুকো বোধিনী’ নামে। মিশেল ফুকো তাঁর দেশের অপর প্রভাবশালী তত্ত্বজ্ঞানী জাক লাকাঁর ঋণ বিশেষ স্বীকার করেন নাই। তবে লাকাঁর ঋণ তিনি দুই হাতেই নিয়েছেন।

তত্ত্বজ্ঞানী জাক দেরিদার সঙ্গে ফুকোর মতভেদ প্রকৃত প্রস্তাবে মহাত্মা লাঁকার শিক্ষার দুই দিক নিয়ে টানাটানির অধিক নয়। জাক লাকাঁ ভাষার বা পদের একাধিপত্য বলে যে উপপাদ্য প্রচার করেন, দেরিদা সেই বক্তব্যই নিজের বলে জাহির করেছিলেন। ‘লেখার বাহিরে কিছু নাহিরে’ বলে তিনি বেশ বাড়াবাড়ি করেছিলেন বৈ কি ।

মিশেল ফুকো আঁকড়ে ধরেন জাক লাকাঁর অপর একটি উপপাদ্য। এই উপপাদ্য অনুসারে মানুষের ইতিহাসে ভাষাই শেষ কথা নয়, শেষ কথা ‘সহজ মানুষ’ বা সাবজেক্ট। যে ইতিহাসে অর্থ তৈরি করে থাকে তাকেই সহজ মানুষ বলে। জীবনের শেষদিকে ফুকো প্রকারান্তরে সেই সত্য স্বীকার করেছিলেন। বাতি জ্বালানি বা এনলাইটেনমেন্ট বিষয়ে মহাত্মা ফুকোর বক্তব্যে সেই অঙ্গীকারের পুবাল হাওয়ার ছোঁওয়া পাওয়া যায়।

সকলেই জানেন মনীষী মিশেল ফুকো ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৮৪ (অর্থাৎ তাঁহার অকাল মৃত্যুর পূর্ব) পর্যন্ত ফরাসি দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যালয় কলেজ দহ ফঁসের অধ্যাপক ছিলেন। অনেকেই জানেন তিনি ঐ বিদ্যালয়ে যে অধ্যাপনার পদ অলংকৃত করতেন তার নাম ছিল ‘চিন্তাজগতের ইতিহাস’। ইতিহাস বিচারে প্রতিষ্ঠালব্ধ ফরাসি মনীষী ফেরনঁ ব্রদেল (Fernand Braudel) প্রস্তাবিত পদ্ধতির বিরুদ্ধাচরণ করেন তিনি। ব্রদেল যেখানে এক যুগের সহিত অন্য যুগের যোগধর্ম বা ‘কনটনুয়িটি’ আবিষ্কার করার দিকে মন সংযোগ করতেন সেখানে ফুকো যুগান্তর বা এক যুগের সহিত অন্য যুগের বিয়োগধর্ম অথবা ‘ডিস্কনটনুয়িটি’র জয় ঘোষণা করতে বিস্তর দিনক্ষণ ব্যয় করেছিলেন। (দান্তো ১৯৯৮: ১৮১-৮২)

এই দিক থেকে দেখলে ‘মানুষের অবসান’ বিষয়ে ফুকো প্রচারিত বিতর্কে বিয়োগধর্মই বড় মনে হয়েছিল। অথচ এনলাইটেনমেন্ট ওরফে ‘বাতিজ্বালানি’ বিষয়ে তাঁর কহতব্য কী হিসাব করলে বিপরীত সিদ্ধান্তই গ্রহণযোগ্য ঠেকে। হিয়ুম্যানিজমে নাস্তিক্যজনিত অনিকেত ফুকো শেষ পর্যন্ত এনলাইটেনমেন্টে আস্তিকতা অর্জন করেছিলেন।
(৯ নবেম্বর ২০০৭)

মূল বক্তৃতা

ফুকো এন্ড দি ইরানিয়ান রেভলুশন এই নামে একটা বই ইংরেজিতে বেরিয়েছে। এটা তাঁর লেখার কালেকশন। বইটা এখনও আমার হাতে আসে নাই। আপনারা অবশ্যই জানেন ঢাকায় গবেষণা করতে বড় অসুবিধা – সাহিত্যের, বইপত্রের অভাব। আপনি যদি এয়ুরোপীয় বিদ্যা নিয়ে আলোচনা করতে চান, আপনার এয়ুরোপীয় ভাষা জানতে হবে। আর ভাষা জানলেও চলবে না, এয়ুরোপীয় মালটা, মেটারিয়েলটা তো বাজারে বা লাইব্রেরিতে পেতে হবে। আমাদের এখানে এমন কোনো লাইব্রেরি নাই, যেখানে আপনি গোছানোভাবে এয়ুরোপীয় সাহিত্য পাবেন। তো আমরা নির্ভর করি সাধারণ ব্যক্তিগত যোগযোগের উপর।

এখন ‘ফুকো’র এই লেখাগুলো সম্পর্কে একটা বাড়তি কথা আছে।

ইরানের বিপ্লব সম্পর্কে উনি কিছুদিন উৎসাহ বোধ করেছিলেন। অবশ্য পরে সেই উৎসাহের আগুনে কিছু বালিও ঢেলে দেয়া হয়। ঢেলে দেন তিনি নিজেই। সেইজন্য আমরা এ বিষয়ে তাঁর লেখা সব আর সহজে পাই না। এগুলো ঠিক তাঁর বন্ধুরাও আর ছাপতে চান না। ঘটনাচক্রে এই লেখাগুলোর একটা ইংরেজি সংকলন বেরিয়েছে ফুকো এন্ড দি ইরানিয়ান রেভলুশননামে। আগেই বলেছি, সেটা আমি জোগাড় করতে পারি নাই। সৌভাগ্যের মধ্যে ফরাসিতে যে কয়টা লেখা বের হয়েছে সেগুলো আবার আলাদাভাবেও অনুবাদ হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়, আমি পড়েছি ওই কয়টাই ।

এসব লেখা ফুকোর তিনটা ইংরেজি বইয়ে পাওয়া যায়। তাঁর মৃত্যুর পরে এসেনশিয়াল রাইটিংস্ অব মিশেল ফুকো নামে প্রকাশিত হয়েছে এগুলো। এক ভলিয়ুমের নাম এথিক্স। দ্বিতীয়টার নাম এস্থেটিকস্। তিন নম্বরের নাম পাওয়ার। আমার হাতের এই বই [ফটোকপি দেখিয়ে] আমি কিছু কিছু এইসব থেকে তৈরি করেছি।

আমাদের এই সেমিনারের বিষয় মিশেল ফুকো। আমরা বাংলায় বলছি ‘মিশেল ফুকো বোধিনী’। ইংরেজিতে ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিশেল ফুকো’। তো এখন প্রশ্ন হবে, সবাই বলবে – ‘মিশেল ফুকো’তে আমাদের আগ্রহ কেন? উত্তর হতেই পারে যে মিশেল ফুকো সম্পর্কে যে কোনো লোক যখন আগ্রহী আমরা তখন আগ্রহী হবো না কেন? কিন্তু আমি বিশেষ বলছি ফুকো কখন বিখ্যাত হন।

ফুকোর বিখ্যাত থিসিসের কথা ছেড়ে বললে বলা যায়, তাঁর প্রথম বিখ্যাত বই ১৯৬৬ সনে প্রকাশ পায়। সেই বইয়ের নাম ইংরেজিতে দি অর্ডার অব থিংস। এইটা অনুবাদ। ১৯৭০ সনে হয়েছে। মূল নাম ছিলো ‘লে মো এ লে শোজ’ (Les mots et les choses) মানে ‘ওয়ার্ডস এন্ড থিংস’। এই বইয়েরই ইংরেজি নাম হয়েছে ‘দি অর্ডার অব থিংস’।

সাবটাইটেলটা লক্ষ্য করবেন: ‘এন আর্কিওলজি অব দি হিয়ুম্যান সায়েন্সেস’। ফ্রান্সে যেটাকে ‘হিয়ুম্যান সাইন্সেস’ বলে ইংরেজিতে তাকেই আমরা ‘হিয়ুম্যানিটিজ’ আকারে চিনি। সেখান থেকে তিন চারগুচ্ছ বেছে নিয়েছেন ফুকো। তাদের জন্মবৃত্তান্ত – মানে ইতিহাসই বলা যায় – আলোচনা করেছেন। তার মাধ্যমে তিনি সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছেছেন। যেটাকে আমরা পশ্চিমে হিয়ুম্যানিজম বলি সেটা সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য উল্লেখ করার মত। আমি ফুকোর থিসিসটা সংক্ষেপে আপনাদের বলছি। এতদিন যেমন আমরা মনে করতাম, হিয়ুম্যানিজম ও এনলাইটেনমেন্ট একই জিনিস। এই দুইটা বড় বড় শব্দ পশ্চিমা দর্শনে আছে, এই দুইটাকে আমরা প্রায় একই মনে করতাম। অথচ এই দুই জিনিস এক জিনিস নয়। দুইটাকে আলাদা করতে হবে।

১৯৬৬ সনে ফুকো বলেছিলেন ‘আমি হিয়ুম্যানিজম জিনিসটা পছন্দ করি না’। কারণ ‘হিয়ুম্যান’ কথাটাই অসার ও অর্বাচীন। হিয়ুম্যানিজমের সমালোচক হিসেবেই তিনি এই বইটা লেখেন। যদিও দেখবেন নাম আছে ‘হিয়ুম্যান সায়েন্সেস’, তথাপি খেয়াল রাখবেন ‘হিয়ুম্যান সায়েন্সেস’ যে অর্থে বলা হয় সেই অর্থে হিয়ুম্যানিজম বলাও চলে। যেমন ধরেন আগে স্কুল কলেজে যে বিষয়বস্তু পড়ানো হতো, যেমন গ্রামার বা বলা যাক আরবিতে যাকে বলে তফসির বা ইন্টারপ্রিটেশন, সেই ধরনের জিনিসকে ‘হিয়ুম্যান সায়েন্সেস’ এয়ুরোপখণ্ডে বলা হতো। এয়ুরোপে ওগুলোর নাম ছিল ‘হিয়ুম্যানিস্ট স্টাডিজ’। আমরা যে এখনো হিয়ুম্যানিটিজ গ্রুপ (মানবিক বিদ্যা) আর সায়েন্স গ্রুপ (বা বিজ্ঞান বিদ্যা) যোগে ম্যাট্রিক বা এসেসসি পাস করি ওইটা ওই জায়গা থেকেই এসেছে।

‘হিয়ুম্যানিজম’ কথাটা আস্তে আস্তে অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। একটা উদাহরণ দেখাতে পারি। যেমন আপনি গ্রামার পড়েন। কেন পড়েন? কারণ আপনি ভাষা বুঝতে চান। তা ভাষা পড়েন কেন? কারণ মানুষ ভাষায় কথা বলে। তাহলে, দি স্টাডি অব গ্রামার এন্ড দি স্টাডি অব ল্যাঙ্গুয়েজ ক্যান বি আল্টিমেটলি রেফারড টু ইয়োর ইন্টারেস্ট ইন হিয়ুম্যান বিয়িংস অর দি হিয়ুম্যানিটি এ্যাজ এ হোল। এই হচ্ছে বিষয়। শেষ বিচারে আপনি মানবে আস্থা রাখেন। আপনি মানবজাতিতে আগ্রহী, মানবজাতি কথা বলে সুতরাং কথা বলাটাই মানবজাতির চরিত্র। এই অর্থে আপনিও হিয়ুম্যানিস্ট। এখন আমরা বলি কি আপনি যদি ইতিহাস পড়েন, তো আপনি হিয়ুম্যানিটিজই পড়ছেন। নানাভাবে আমরা শব্দগুলির আকৃতি পরিবর্তন করে দিচ্ছি। হিয়ুম্যানিটি কথাটা লক্ষ্য করেন, এইটা থেকে হিয়ুম্যানিটিজম না হইয়া হইল ‘হিয়ুম্যানিজম’। একসময় একরকম বলা হতো, আস্তে আস্তে এর বদল ঘটলো। শব্দের ইতিহাস ট্রেস করলে, তার পায়ের চিহ্ন ধরে আগাইলে আপনি এটা বুঝতে পারবেন।

খুব সংক্ষেপে বলছি। ফুকো এপিয়ারড ইন ১৯৬৬ এ্যাজ এ ক্রিটিক অব হিয়ুম্যানিজম। লক্ষ্য করেন। এখন হিয়ুম্যানিজম মানেটা কী? আমি সেজন্য বলছি, তখন ফ্রান্সে যে বস্তুকে ‘সিয়ঁস উমেন’ বা ‘হিয়ুম্যান সায়েন্সেস’ বলা হতো সেটাই আমাদের বিদ্যার মানবিক শাখা। ওরা ফ্রেঞ্চে হিয়ুম্যান উচ্চারণ করে উমেন (humaine) আকারে।

এই যে উমেনের সমালোচনা ফুকো করলেন তার সুদ বাবদ ওঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। আনুমানিক বারো বছর পর ১৯৭৮ সন নাগাদ উনি ‘এনলাইটেনমেন্ট কী বস্তু?’ নামধারী প্রবন্ধটা লেখেন। এটা সেই ১৯৭৮ সালের প্রবন্ধ। আমি দেখাতে চাচ্ছি বারো বছরের মধ্যে কী পরিবর্তনটা হলো। পরিবর্তনটা হয়ে গেল। ফুকো বলছেন যে, ‘১৯৬৬ সনে কী যেন বলেছিলাম আমি, তার দ্বারা আমি চিরকাল বন্দি থাকবো কেন? আমি তো বন্দি থাকতে বাধ্য নই। আই হ্যাভ এ রাইট টু চেঞ্জ মাই ওপিনিয়ন। প্রত্যেকে নিজের মতামত বদলাতে পারে।’

কিন্তু আমাদের আগ্রহ হলো উনি কী, কোন যুুক্তি দেখিয়ে নিজের মতামত বদলালেন? অথবা তিনি যেটা বলছেন সেটা দিয়ে আমাদের প্রতারিত করছেন না তো? সত্যি বদলেছেন কি নিজের মতবাদ? তখন আরেকটা তাত্ত্বিক প্রশ্ন আসে, হোয়াট ইজ (হু ইজ নয়) দি রিয়েল মসিয়ঁ ফুকো? আসল ফুকো কোনটা? আমরা দেখব এটাও পরে অনেক লোকের মাথাব্যথার কারণ হবে।

আমি আবার বলি। ১৯৬৬ সনে ফুকো বলছেন, ‘আমি হিয়ুম্যানিস্ট নই, আই অ্যাম এ ক্রিটিক অব হিয়ুম্যানিজম এ্যাজ এন এপ্রোচ।’ আবার পরে বলছেন কি, ‘আই স্টিল রিমেন এ ক্রিটিক অব হিয়ুম্যানিজম। বাট নাউ লেট মি টেক আউট এনলাইটেনমেন্ট ফ্রম দ্যাট ডুয়ো – আওয়ার কাপল্। আগে হিয়ুম্যানিজম বলতে এনলাইটেনমেন্টকেও বোঝানো হতো। কমসে কম ফ্রান্সে বোঝান হতো। সেই জন্যই উনি বলছেন, আমার ক্রিটিসিজম ইজ স্টিল ভ্যালিড ইন সো ফার এজ হিয়ুম্যানিজম ইস কনসার্নড. … ..বাট আই অ্যাম নাউ এ ফলোয়ার অব দি এনলাইটেনমেন্ট ট্রেডিশন।’ কিন্তু আমরা ১৯৬৬ সনে মনে করেছিলাম, হি ইজ এ ক্রিটিক অব দি এনলাইটেনমেন্ট ট্রাডিশন টূও, হি ইজ এগেইন্স্ট দি এনলাইটেনমেন্ট।

আর ১৯৭৮ এর পর থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত (ওঁর মৃত্যু হয়েছে ১৯৮৪ সনে) এই সাত বছর উনি অনবরত একটি ভিন্ন মতবাদ প্রচার করেছেন: হোয়াট উই নিড টুডে ইজ এ নিউ এনলাইনটেনমেন্ট। এয়ুরোপের আজকে দরকার নয়া বাতি। অ্যামেরিকার আজকে দরকার নয়া বাতি। আজ সারা পৃথিবীর দরকার নয়া বাতি।

তাহলে ইনি নয়া ‘বাতি-জ্বালানি’ বা এনলাইটেনমেন্ট (Enlightenment) বলতে কী বোঝাচ্ছেন? আগের লোকেরা এনলাইটেনমেন্ট বলতে কী বোঝাত? তারপর তিনি পরিষ্কার উচ্চারণ করেছেন, আমি যাঁদের উত্তরাধিকারী তাঁদের মধ্যে – আমার পূর্বসূরীদের মধ্যে – ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল বটেন। এইটা মনে রাখা দরকার। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলে তাঁর সমসাময়িক দার্শনিক কে? হাবারমাস (Habermas)। মিশেল ফুকোর জন্ম ১৯২৬ সনে। হাবারমাসের ১৯২৯ সনে। মানে ফুকোর চেয়ে তিনি তিন বছরের ছোট। হাবারমাসের একটা বই আছে ‘দ্যা ফিলোসফিকাল ডিসকোর্স অব মডার্নিটি। ওতে একলা ফুকোর উপর আছে দুইটা অধ্যায় আর অন্যান্য দার্শনিকদের উপদেশ মিলিয়ে মোট বারোটা অধ্যায়। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বই। তাতে আপনি দেখতে পাবেন মিশেল ফুকো এবং হাবারমাসের মধ্যে কিছু মিল আছে আবার কিছু অমিলও আছে। আমার বক্তব্যের সারকথা এটাই।

মিশেল ফুকো যিনি ১৯৬৬ সনে হিয়ুম্যানিজমের সমালোচকরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন তিনি ১৯৭৮ সন নাগাদ নিজের মতবাদ খানিকটা বদলিয়ে নিলেন। আমরা এখন অনুসন্ধান করবো, আদৌ তিনি বদলিয়েছেন কিনা। এই আমার প্রস্তাব, এই আমার প্রতিপাদ্য। আমাদের শুদ্ধ দেখতে হবে ফুকোর উপপাদ্যটা কী? উনি কী প্রমাণ করতে চান? হিয়ুম্যানিজমকে উনি যদি বর্জনই করেন তো হিয়ুম্যানিজমের ত্রুটিটা কী? আর উনি যদি নতুন করে এনলাইটেনমেন্টেরই ভক্ত হলেন তবে এনলাইটেনমেন্টের কোন গুণটা আছে যে ফুকো কারণে-অকারণে হিয়ুম্যানিজম-এনলাইটেনমেন্টর বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটিয়ে একলা এনলাইটেনমেন্ট তত্ত্বের আঁচলটি আকঁড়ে ধরেন?


এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রথমে লক্ষ্য করবেন যাদের মধ্যে প্রথমে মিলন হয়েছিল, ফুকো প্রথমদিকে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ দেখতে পেলেন। এখন আপনাদের মধ্যে কেউ যদি আবার দুইয়ের মধ্যে নতুন মিলন ঘটাতে পারেন, সেটা আপনাদের ব্যাপার।

তাহলে আমাদের আলাদাভাবে বলতে হবে হিয়ুম্যানিজম কী জিনিশ, আর এনলাইটেনমেন্টইবা কী বস্তু? তারপর আরেকটা কথা আছে। সেটাও এটার সাথে যুক্ত। আপনারা না বললেও আমি জানি, সেটার নাম ‘মডার্নিটি’, এদের সাথেই যুক্ত। আপনি তিন নম্বর হিসেবে বলতে পারেন। হিয়ুম্যানিজম, এনলাইটেনমেন্ট, মডার্নিটি। এই সব কথা এখনও এয়ুরোপে আলোচিত হয়।

এখন এয়ুরোপের নতুন দর্শনের যে অধ্যায়কে আমরা নাম দিচ্ছি ‘পোস্টমডার্নিজম’, তার প্রবক্তারা বলছেন ‘মডার্নিটি জিনিসটা একসময় জন্ম নিয়েছিল। এখন তার মৃত্যু হয়েছে।’ তারপরে আমরা আরেকটা মতবাদের জন্ম দিচ্ছি। এখন লক্ষ্য করেন এখানে একটা প্রভাবশালী শব্দ আছে ‘টাইম’। মডার্নিটি ইজ এ কনসেপ্ট রিলেটিব টু টাইম। ইট হ্যাজ বিন বর্ন অ্যান্ড ইট লিভড ফর এ হোয়াইল, সো ইট উইল ডাই সামটাইম অন। অর্থাৎ তাকে একটা অর্গানিজমের মত দেখতেছি। মডার্নিটি ইজ লাইক এ বডি, যার জন্ম আছে, বিকাশ আছে এবং মৃত্যু আছে।

কিন্তু মডার্নিটির আরেকটা ধারণাও আছে। এটার প্রবক্তা ‘বোদলেয়ার’। শার্ল বোদলেয়ার। ফরাসি কবি, যাঁর কবিতা আমরা অনেকেই ‘বুদ্ধদেব বসু’র বাংলা অনুবাদে পড়েছি। উনি বড় একজন চিত্র সমালোচকও ছিলেন। তাঁর অনেক চিত্র সমালোচনামূলক লেখা আছে। তার মধ্যে আমি দুইটা প্রবন্ধের রেফারেন্স রেখেছি এখানে, একটার নাম ‘দি পেইন্টার অব মডার্ন লাইফ’। আরো লেখা আছে। সেটার মধ্যে বোদলেয়ার মডার্নিটির সংজ্ঞা দিয়েছেন, ‘মডার্নিটি ডাজ নট রিলেট টু এনি টাইম, ইট ইজ এন এটিচুড’। অর্থাৎ প্রত্যেক যুগেই কিছু লোক আছে যারা মডার্ন আবার কিছু আনমডার্ন। এটা অনেকটা প্রগতি আর প্রতিক্রিয়ার মত। প্রত্যেক যুগেই কিছু ভালো মানুষ থাকে আবার কিছু মন্দ মানুষ থাকে। অর্থাৎ এমন নয় যে পৃথিবীতে মানুষ একসময় সবাই মন্দ ছিলো আর এখন আমরা সবাই ভালো, এমন নয়। মানে আগে সবাই ভালো ছিল আর এখন সবাই মন্দ হয়ে গেছি এরকম নয়। একটু যুগ ছিলো অন্ধকার যুগ আর এখন আলোকের যুগ, এটা ঠিক নাও হতে পারে। অর্থাৎ আলো অন্ধকার দিবালোক আর রাত্রির মত জড়াজড়ি করে থাকে। এই টাইপের একটি মতবাদ বোদলেয়ার বলেছেন। বোদলেয়ার বলেছেন, ‘আধুনিক জিনিসটা একটা মনোভাবের ব্যাপার, এটা সময়ের ব্যাপার নয়, কাজেই আধুনিকতার মৃত্যু হতে পারে না অথবা আধুনিকতা প্রাচীনকালে ছিলো না এটা বলা যাবে না।’

এই জন্যই বলছি প্রাচীন ভারতের মহাভারত কাব্য যদি আপনি পাঠ করেন, সেটাও আধুনিক মনে হবে। হোমারের কবিতাও আধুনিক মনে হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কথা মাঝে মাঝেই বলেছেন। বলেছেন এর মধ্যে একটু ভুলভাল মিশিয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন কি, ‘মাঝেমাঝে নদী যেমন বাঁক পরিবর্তন করে সাহিত্যও তাই করে। সেটাই আধুনিকতা।’ কারণ রবীন্দ্রনাথ একটু ইংরেজি পড়ে আন্দাজ করে বলেছিলেন। তাঁর তো ইনজেনুয়িটি আছে, নিজস্ব চিন্তাক্ষমতা আছে। আধুনিকতার সংজ্ঞা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটা প্রবন্ধ আছে। আপনারা দেখতে পারেন। ‘আধুনিক সাহিত্য’ নামে একটা ছোট সংকলন আছে, তাতেও দেখতে পারেন।

তা প্রশ্নটা হলো ‘আধুনিকতা কি স্থায়ী জিনিশ?’ নাকি এটা কালের দ্বারা সীমাবদ্ধ? এখন যাঁরা পোস্টমডার্নিজম বলছেন, তাহলে তাঁদের এই কথাটার অর্থ কী? একটা হতে পারে যে, আগে মানুষের মনোভাব দুই রকম ছিল। মানুষ ছিল আগে নারী ও পুরুষ । এখন আরেকটা জাতির জন্ম হয়েছে। ধরেন এর নাম হিজড়া। তাহলে দুই লিঙ্গের জায়গায় এখন তিন লিঙ্গ তৈরি করলাম। ভালোমন্দের সাথে মাঝামাঝি আপনি আরেকটা তৈরি করলেন, যারা ভালোও নয়, মন্দও নয়। এরকমই কি আধুনিকতা? নাকি, আধুনিকতা ক্রোনোলজিকাল। এই যে ক্রোনলজি, তা ক্রোনোস বা কালের দেবতার কথা। আমরা বর্ষ ভারতে বলি মা কালি, কালি আমাদের দেবীর নাম। অনেকের ধারণা যে ভদ্রমহিলার চেহারা কালো, তাই তাকে ‘কালি’ বলি আমরা। সেটা পপুলার। সুতরাং বলা যেতেই পারে। কিন্তু এটার মধ্যে আরেকটা কথা আছে, এ কথার অর্থ কালের করাল গ্রাস। কালি মানে ‘গডেস্ অব টাইম’। কাল সবকিছুকে গ্রাস করে। আমরা বলি না ‘তোমারে কালে খাইলো’? মাঝে মাঝে আমরা খারাপ কাল সম্পর্কে বলি আকাল। যথা: ‘আকালের সন্ধানে’।

সমস্যাটা এখানে: আধুনিকতাটা কি ক্রোনোস-এর ভিতরের না বাইরের? বোদলেয়ারের মতটাই আমি সংক্ষেপে বলছি। বোদলেয়ার যেহেতু বলছেন, ‘আধুনিকতা জিনিসটা সময়ের ব্যাপার নয়’ কাজেই আমিও বলবো, ‘পোস্টমডার্নিজম’ কথাটা কোনো অর্থই বহন করে না। ‘সিনস্ দেয়ার ইজ নো মৃত্যু হাউ ক্যান দেয়ার বি পোস্ট মর্টেম?’ যেহেতু মৃত্যু নাই তাহলে আবার মরণোত্তর ময়না তদন্ত হবে কী করে? জীবন্তের কি ময়না তদন্ত হয়? এটা বোদলেয়ারের বক্তব্য। আমি এস্তেমাল করলাম মাত্র।

ফুকো সাহেবও সেই বক্তব্যটাই গ্রহণ করেছেন। গ্রহণ করে ইমানুয়েল কান্টের যুক্তির গাছে ‘গ্রাফ্ট’ করেছেন। গ্রাফ্ট মানে কি? এই যে আম গাছে ‘কলম’ করেন আপনারা। গাছের উপর গাছ লাগিয়েছেন। তাহলে, নতুন একটা বাগান হয়েছে। সেই বাগানের নাম হয়েছে নতুন বাতি-জ্বালানি, নতুন এনলাইটেনমেন্ট। মডার্নিটি ইজ সামথিং ইটার্নাল, ইট হ্যাজ অলওয়েজ বিন। উনি বলছেন এনলাইটেনমেন্টের সংজ্ঞা এই: এনলাইটেনমেন্ট মানে এতদিন যেমন আমরা যা হিয়ুম্যানিজমের সাথে যুক্ত মনে করতাম সেইটা নয়।

একদা ঈশ্বর ছিলেন, এখন তিনি মারা গেছেন। এখন তাঁর জায়গায় প্রবেশ করেছে মানুষ। এটা এয়ুরোপীয় একজন বড় দার্শনিকের উক্তি। নাম নিৎসে। নিৎসের উক্তিটায় বলা হয়েছে কি না, ‘গড ইজ ডেড’। তার মানে ‘গড ওয়াজ ওয়ানস্ এলাইব’। এট লিস্ট। এই স্বীকৃতিটুকু তো আছে। আসুন এখন আমরা শুকরিয়া আদায় করি তিনি স্বীকার করছেন যে একসময় ঈশ্বর ছিলেন।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ‘হু হ্যাজ অকুপাইড দি ডেড গডস্ চেয়ার’? এটিকে ব্যঙ্গ করেছে কার্ল মার্ক্সের শত্রুপক্ষ, আমেরিকান মিডিয়া। যেমন টাইম ম্যাগাজিন ১৯৭৮-১৯৭৯ সালের দিকে একটা হেডলাইন করেছিলো, আমার মনে আছে। আমরা তখন ছাত্র। ওঁরা লিখেছিল, ‘গড ইজ ডেড, মার্ক্স ইজ ডেড এন্ড আই এম নট ফিলিং টুও ওয়েল মাইসেল্ফ’। ফরাসি দেশে আন্দ্রে গ্লুক্সমান বলে একজন দার্শনিক ছিলেন, ইনি কাজ করতেন সার্ত্রের সেক্রেটারি হিসেবে। উনি বলেন যে, ‘পৃথিবীতে এখন আস্তিকতার দিন শেষ হয়ে গেছে, এমনকি কম্যুনিজমের দিনও শেষ হয়ে গেছে, আর আমরা যারা তার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করি, সেই আমরাও বোধ হয় মারাই যাচ্ছি। তাহলে সামনের পৃথিবীতে কী আছে আমরা জানি না।’ কী এর নিহিতার্থ? তিনি মিশেল ফুকোর বন্ধু ছিলেন সেই সময়। অনেকটা ফুকোলশিয়ান (Foucaultian) বলা যেতে পারে। আমি ফুকোর উপর এটা আরোপ করবো না।


ফুকো একসময় বলতেন ‘আমি নিৎসের শিষ্য’। পরে দেখা গেলো কি উনি নিৎসের থেকে একটু গা মোচড় দিলেন। শেষ বয়সে উনিই প্রমাণ করলেন যে উনি কান্টেরও শিষ্য।

এখানে একটা কথা বলে রাখার দরকার আছে। আমরা যারা এয়ুরোপীয় দর্শনের ইতিহাস পড়তে চাই তাদের পক্ষে এই নামগুলো প্রথমে কতক ধূম্রজাল তৈরি করে। কান্টের লেখা আমরা সবটুকু পড়ি নাই। কাজেই আন্দাজ করে বলা যাবে না কান্ট কী জিনিস? সেটা ভারতীয় বিখ্যাত হাতির মত। কারো কাছে মনে হবে থামের মত, কারো কাছে কুলার মত, কারো কাছে ঢেঁকির মত। আমরা এখন দেখবো কান্টের কোন অংশটা কী? এইজন্য আমরা শুধু এইটুকু বলবো, এয়ুরোপে যে যুগটাকে এনলাইটেনমেন্ট বলা হয় সেটাকেই আমি খুব সংক্ষেপে বলছি আমাদের যুগ। অষ্টাদশ শতাব্দি বলে যে বড় শতাব্দি ওইটাই এনলাইটেনমেন্টের শতাব্দি। মনে হতে পারে, আমিও মানুষের চোখে একটু ধুলা দিতে পছন্দ করি। কিন্তু আসলে তা নয়। মনে হয় আমরা এখনও কান্টের যুগেই আছি। নচেৎ আমাদের বাতিজ্বালানি শেষ হয় না কেন?

এখন কান্ট সাহেবের প্রবন্ধটাও লেখা হয়েছে একই নামে। কান্ট লিখেছেন হিসেব করে দেখেন সেই ১৭৮৩ বা ১৭৮৪ সময় নাগাদ। এটা অষ্টাদশ শতাব্দির শেষ পর্যায়। তার মানে আমি এটা বলতে পারি, আমরা বলি কি, ‘দি ওউল অব মিনার্বা বিগিনস্ ইটস্ ফ্লাইট ওনলি আফটার ডার্ক।’ এটা হেগেলের বিখ্যাত উক্তি। মিনার্বা দেবির পেঁচাটি উড়াল শুরু করে সূর্য যখন অস্তাচলে বসে ঠিক তখন। অন্ধকার হয়ে আসছে যখন তখনই পেঁচা রাষ্ট্র হয়। দিনের বেলা পেঁচা বের হতে পারে না।
‘পেঁচা রাষ্ট্র করে দেয় পেলে কোন ছুতা,
জানো না সূর্যের সঙ্গে আমার শত্রুতা?’

কাজেই দিনের বেলা সে বের হতে পারে না। তাই উনি বলছেন, যখন কোনো ঘটনা ঘটতে থাকে, তখন দার্শনিকের পক্ষে তাকে বোঝা হয়ত সম্ভব হয় না। ঘটনা যখন শেষ হয়ে যায়, দার্শনিক তখনই তার সূত্র তৈরি করেন।

কান্টের ক্ষেত্রে সেটা সত্য মনে হচ্ছে। এনলাইটেনমেন্ট প্রায় শেষ পর্যায়ে যখন এসে পৌঁছেছে এয়ুরোপে তখনই কান্ট এই প্রবন্ধটা লিখে বলছেন, ‘এনলাইটেনমেন্ট’ বলতে আপনারা এতদিন যা মনে করতেন, এনলাইটেনমেন্ট তা নয়।’ ‘ইট ইজ সামথিং ডিফারেন্ট।’

তাহলে এনলাটেনমেন্ট বলতে আসলে এতদিন কী মনে করতেন এয়ুরোপের দার্শনিকরা? দুই একজনের নাম নেন। এনলাইটেনমেন্টের মধ্যে বড় দার্শনিক কারা? যেমন ভলতেয়ার। যাকে কখনো গুরু মানেন আমাদের বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী শিবনারায়ণ রায়। তাঁর সম্পাদিত জিজ্ঞাসা পত্রিকা ঢাকায় আসতো বলে আমরা কিছু পড়েছি। উনি এখনো মনে করেন যে আমাদের বাংলাদেশের বা ভারতের মতন তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোর সমস্যা এনলাইটেনমেন্টের সমস্যা। আমরা এখনো যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক দিব্যদৃষ্টি লাভ করি নাই। শিবনারায়ণ রায়ের বক্তব্য অনুসারে এনলাইটেনমেন্টই আমাদের মত গরিব দেশের প্রধান সমস্যা।

তো এনলাইটেনমেন্ট মানেটা কী? আক্ষরিক অর্থে ধরেন আপনি সন্ধ্যাবেলা একটা বাতি জ্বালান। সেটাই এনলাইটেনমেন্ট। যেখানে আগুন নাই, সেখানে আগুন নিয়ে আলো করা। এখন আগুনের দুটা সমস্যা। ইট জেনারেটস বোথ লাইট এন্ড হিট। এখন আপনি যদি এমন একটা আগুন দেখেন হুয়িচ জেনারেটস মোর হিট দ্যান লাইট, তাহলে সেটা অগ্নিকাণ্ড ঘটায়। আমরা আগুন এনেছি আলো করার জন্যে, কিন্তু অধমদের দেশে ঘটে যায় অগ্নিকাণ্ড। আমরা মনে করি কি এনলাইটেনমেন্ট বলে একটা আদর্শ এয়ুরোপে তৈরি হয়েছে, সেটা আমরা আমদানি করেছি, ইচ্ছায় হোক আর বাধ্য হয়েই হোক। এইটা আমাদের দেশে আগুন জ্বালিয়েছে। আগুন আলোর জন্য না অগ্নিকাণ্ড ঘটানোর জন্য সেটাই বিচার্য বিষয়। শিবনারায়ণ রায় মনে করেন, আগুন জ্বালানোই আমাদের দায়িত্ব, তা অগ্নিকাণ্ড ঘটাবে না আলোক দান করবে সেটা পরের ব্যাপার।

এই ধরনের একটা এটিচুড আছে। এই এটিচুডের একটা উদাহরণ ‘গোলাম মুরশিদ’। তিনি আমাদের এখানে শিব রায়ের ছাত্র। উনি একটা বই লিখেছেন। নাম রিলাকটেন্ট দেবুতাঁত (Reluctant Debutante)। বাংলা মানে লিখেছেন ‘সংকোচের বিহ্বলতা’। এই নামে উনিই বাংলায় অনুবাদ করেছেন, নিজের বই নিজেই। সেখানে বলছেন, মেয়েরা যে প্রথম হাঁটি হাঁটি পা পা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন, আস্তে আস্তে পুরুষেরা মেয়েদের শিক্ষিত করলেন এইটাকে হলো এনলাইটেনমেন্ট। এনলাইটেনমেন্ট সম্পর্কে অনেক আলোচনা আছে। আমি এখানে একটাই বললাম।

আরেকটা হল, এনলাইটেনমেন্টের প্রধান শত্রুর নাম যে জিনিশ তাকে তাঁরা বলেন কুসংস্কার। প্রথমে সংস্কার এবং তার আগে কু লাগিয়ে দিলেন। তাঁরা মনে করেন ঝাড় ফুঁকে বিশ্বাস, পীর ফকিরে বিশ্বাস এগুলোই কুসংস্কার। এটা বলতে বলতে তাঁরা বলেন যে কোনো ধর্মে, মানে নীতিটীতিতে বিশ্বাস করাও কুসংস্কার। এনলাইটেনমেন্টের মূল মেসেজ এইটা।

এনলাইটেনমেন্ট ওয়াজ নোওন ইন এয়ুরোপ এজ এন্টি-রিলিজিয়ন। যেটা থেকে আজকের সেক্যুলারিজম কথাটা তৈরি হয়েছে। শিব রায় বলেন ‘আমরা নাস্তিক।’ এটা বলেন তাঁরা ঘরের মধ্যে। আর পাবলিককে বলেন কি ‘আমরা এনলাইটেন্ড পিপল।’ এখন এইটারই একটা কুৎসিত অনুবাদ করেছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ মহাশয়: ‘আলোকিত মানুষ’। এনলাইটেনড মানে আলোকিত। আলোকিত শব্দটা খেয়াল করছেন? যে লোকটা দাঁড়িয়ে আছে, যেমন আমি এখানে আছি। আর ওখানে বাতি জ্বলছে। আমি আলোকিত হলাম না? আলোটা বাইরে থেকে আসছে। কিন্তু কান্টের লেখা পড়লে আপনি দেখবেন, আমার ভেতর থেকে যদি আলো আসতো, আলো বের হতো তাহলে আমি তো আলোকিত হতাম না, হতাম আলোকদানকারী।

সে হতো ‘আলোকিত’ নয়, ‘আলোকক’। আলোকিত বা আলো মুরগি হবে কেন সে? সে হবে ‘আলোকক’ বা আলো মোরগ। উনি যেটা করছেন সেটা আলো মুরগি বলেই মনে হয়। আসলে এইটা কী? যদি আপনি মার্ক্সের ভাষায় দেখেন, এয়ুরোপের প্রবলেম এমনই। ধনিক শ্রেণী চেয়েছে, আমাদের গরিবরা, আমাদের কথামত চলবে। আমরা তাদের ভালো করে একটু খাওয়াবো পরাবো। তাদের ঠিক যে পরিমাণ বিদ্যা দরকার এ পরিমাণ দেব। যেমন ক্লাস ফাইভ। যেমন এখানে ব্রাক বলে, ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়লেই যথেষ্ট। সেই রকম আর কি ।

এই ধরনের মতবাদই এনলাইটেনমেন্টের মতবাদ হিসেবে তৃতীয় বিশ্বে আসছে। এয়ুরোপে কী ছিলো সে কথা আমরা মিশেল ফুকোকে বলতে দেব। আমাদের দেশে এর মানে হয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার, নারী শিক্ষা এবং ঠিক সেইটুকু শিক্ষা যেইটা শুধু দরকার। এইটার নাম হয়েছে ইনফর্মাল এডুকেশন। আর কী বাজে এর বাংলা তর্জমা, ‘উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা’! এইজন্য তাঁরা লাখ লাখ কোটি কোটি ডলার ব্যয় করছেন। কমনওয়েলথ্ এডুকেশন ফান্ড ইত্যাদি আবরণে হেন কাজ নাই তারা করছেন না। লোকগুলোকে ‘শিক্ষিত’ করতে হবে। শিক্ষার আলো বিলাতে হবে।

শিক্ষার সংজ্ঞা কী? সংজ্ঞাটা স্বচ্ছ বটে: যেটুকু করলে সে করে খেতে পারবে, পরতে পারবে। কান্ট সাহেবের সংজ্ঞাটা ঠিক সেইরকম নয়। আমি এই জন্যই বলছি, যখনই আমরা কোনো শব্দ পাব, শব্দটার গিভেন যে অর্থ বাজারে সেটাই আমাদের মাথায় প্রথমে লাফ দিয়ে আসবে। কিন্তু দেখবেন যে ওইটার বিরুদ্ধে লড়াই একটা করতে হবে আপনাকে। নইলে আপনি একজনের রক্ত আরেক জনের গায়ে দেবেন। উদোর পিণ্ডি দেবেন বুদোর ঘাড়ে ।

আমি প্রথমেই বলেছিলাম জানতে হবে পরিবর্তনটা কেন? তথাকথিত হিয়ুম্যানিজম বা মানবতাবাদের সমালোচক হিসেবে জন্মগ্রহণ করার পর মিশেল ফুকো হঠাৎ করে এনলাইটেনমেন্টের ভক্ত হয়ে উঠলেন কেন?

তাঁকে তো কিছু একটা করতে হবে। উনি বললেন, এনলাইনটেনমেন্ট কথাটাকেও আমি খৎনা বা ক্যাসট্রেট করাবো। দ্যা ওয়ার্ড ইটসেলফ্ হ্যাজ টু বি ক্যাসট্রেটেড। এর মধ্যে দুইটা অর্থ মিশে আছে। এনলাইটেনমেন্ট অর্থে এতদিন বলা হতো, আলোকিত করা। উনি বললেন, না তা নয়। বলছেন, এনলাইটেনমেন্ট অর্থ আলোকক তৈরি করা। যে লোক আলোর দ্বারা আলোকিত হয় না, যে নিজেই আলো দেয়, এমন লোককেই প্রকৃত প্রস্তাবে বলা হবে এনলাইটেনড ম্যান। উনি রেফারেন্স দিলেন কান্ট সাহেবের। কান্ট ভরসা ফুকো। খেলা জমলো।

এখানেই ফুকোর মূল বক্তব্য। এনলাইটেনমেন্ট মানে আগে বলা হতো হিয়ুম্যানিজম। হিয়ুম্যানিজমের ভেতর কী আছে। হিয়ুম্যানিজমের ভিতর আছে একটা গোঁয়ার গোবিন্দ, একটা এরোগেন্স। এরোগেন্সটা কী? ম্যান হ্যাজ রিপ্লেস্ড গড এজ দি সেন্টার অব হিয়ুম্যান অ্যাটেনশন। এইটাই বটে হিয়ুম্যানিজম। এটা আসছে কোথা থেকে ? কোপারনিকাস আর কেপলার থেকে। সৌরজগতের কেন্দ্র আর পৃথিবী নয়, সূর্য। এইটাও একটা মতবাদ। কেন্দ্র কী? এই কথাটার মধ্যেই মতান্ধতার নিশানা হাজিরনাজির আছে।

তারপর একদিন বোঝা গেল কিনা মানুষ ‘আশরাফুল মখলুকাত’ এই কথাটাও ঠিক নয়। মানুষ আর পাঁচটা প্রাণীর মতই আরেকটি প্রাণী বটে। এটা ডারুয়িন বললেন।

তারপর সবশেষে জানা গেল, মানুষ যুক্তিশীল এটাও ঠিক নয়। মানুষের মধ্যে যুক্তি ও অযুক্তির সমান প্রাধান্য এবং মানুষ যে অতিরিক্ত আত্মম্ভরিতার সঙ্গে বলেছে আমরা যুক্তিশীল, আসলে মানুষের ইতিহাস দেখলে তা সত্য মনে হয় না। এই দুনিয়ায় যত যুদ্ধবিগ্রহ এবং যত অন্যায় অবিচার সেইগুলিও যদি মানুষই করে থাকে তবে মানুষ একাধারে যুক্তিশীল এবং অন্যাধারে যুক্তিহীন দুটো কথাই সত্য এ কথা একসাথেই বলতে হয়। ফ্রয়েডের আবিষ্কার এ ছাড়া আর কী?

foucault001.jpg
মিশেল ফুকো

তবে হ্যাঁ, মানুষ কথা বলে । এই অর্থে যদি আপনি বলতে চান মানুষ যুক্তিশীল তবে ঠিক আছে। জাক লাকাঁ দেখাচ্ছেন এ সত্যে আত্মম্ভরিতার কিছু থাকছে না। কারণ মানুষ যতটা না ভাষার মনিব, তার চেয়ে ঢের বেশি তার গোলাম। মানে দাস। দাশ নয়; দাস।

তিনটা অংকুর আছে হিয়ুম্যানিজমের। একটা: ম্যান এজ দি সেন্টার বা কেন্দ্রাভিমানী মনু বা মনিশ্বর। লক্ষ্য করেন, এই আইডিয়াটা। মানুষ ঈশ্বরের জায়গা দখল করেছে। এই এরোগেন্সেরই নাম ছিলো হিয়ুম্যানিজম। কথাটার বাংলা দাঁড়ায় মনিশ্বরবাদ। এটা আমি বানালাম। আর ওই এরোগেন্স প্রচারক বা পয়গম্বর আন্দোলনের নাম এনলাইটেনমেন্ট। ইহার বাংলা হতে পারে বাতিশ্বরবাদ। তাতে বোঝায় কী? বোঝায় মানুষ নিরন্তর প্রগতিসাধন করছে। প্রগ্রেসকে আমরা বাংলায় বলেছি প্রগতি। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রগতি হয়েছে। আগে মানুষ বনেজঙ্গলে ছিল, তারপর মানুষ গ্রাম করেছে, এরপর শহর করেছে। এখন শহর থেকে মানুষ চাঁদে যাবে। ধরেন এইটাই প্রগতির ইতিহাস।

মানুষ জঙ্গলে ছিল। সেখানে মানুষ কী করতো? মানুষ সেখানে ছিল পেগান। তারা প্রকৃতি-পূজারি ছিল। তারপর একসময় তারা বুঝতে পেরেছে প্রকৃতিপূজা নয় কোন দেবির কি দেবতার পূজা করতে হবে। তারপর মানুষ ভাবল, না, না, গোষ্ঠী বা জাতি (ট্রাইব) পূজা এসবও ঠিক নয়। সমগ্র নিখিল জগতের এক প্রতিপালক আছেন তাঁর পূজা করতে হবে। এখন নয়া এনলাইটেনমেন্ট বলছে, আসলে নিখিল জগতের একমেবাদ্বিতীয়ম যে প্রতিপালক আছেন সে সত্যও মিথ্যার রকমফের বৈ নয়। এই প্রগতির ধারণা এইভাবে দেখা যাচ্ছে। তাহলে এই ধারণাগুলির ধারাকেই আমরা বলছি এনলাইটেনমেন্ট।

মানুষ এখন বুঝতে পারছে এই বিরূপ বিশ্বে সে নিয়ত একা। তার কোন প্রভু নাই। যে পরিমাণে সে নিজেই নিজের প্রভু সেই পরিমাণেই সে অসহায়। ফ্রিডম ইজ এ ডেঞ্জারাস থিং। ম্যান হ্যাজ টু নো হি ইজ ফ্রি এন্ড হি ইজ এলোন ইন দ্যা ইউনিভার্স। এই যে মনোভাব, এটাই এনলাটেনমেন্টের বক্তব্য হিসেবে জারি আছে।

তার সাথে যুক্ত হলো এটা ও সেটা। জোর ও জবরদস্তি। ধর্ষকাম ও বলপ্রয়োগ ছাড়া এনলাইটেনমেন্ট হয় না। আমি বললাম অসুবিধা কী, তুমি তোমার মনোভাব নিয়ে তোমার বাড়িতে থাক আর আমি আমার মনোভাব নিয়ে আমার বাড়িতে থাকি। কিন্তু তা তো নয়। বাতিওয়ালা বলে বসে: তোমাকে আমার মতবাদ গ্রহণ করতে হবে। নইলে আমি তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব।

এই যুদ্ধ নিয়ে এয়ুরোপ গেল আমেরিকায়। সে আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের বললো, তোমরা তোমাদের এই প্রাগৈতিহাসিক ধারণা নিয়ে থাকতে পারবে না। তোমাদের খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করতে হবে। শুধু গ্রহণ করলেই যথেষ্ট হবে না। তোমাদের বৈজ্ঞানিক ধর্ম গ্রহণ করতে হবে। সেক্যুলারিজম গ্রহণ করতে হবে এবং মাঝে মাঝে খ্রিস্টধর্ম এবং সেক্যুলারিজম এক হয়ে গেছে। এটার লম্বা ইতিহাস। তাঁরা একহাতে বাইবেল আরেক হাতে রাইফেল নিয়ে গেছে। জয় করেছে। জয় করে তাঁরা সেখানে সভ্যতা কায়েম করেছে। এটার নাম এনলাইটেনমেন্ট।

এনলাইটেনমেন্ট একটা দার্শনিক মতবাদ মাত্র নয়। এটা একটা রাজনৈতিক আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারপরে, সবশেষে বলা হচ্ছে কি এনলাইটেনমেন্টের ফলে আমরা যারা আমেরিকান-ইন্ডিয়ানদের মত সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাই নাই – চীন, আরব বা আফ্রিকা এই সমস্ত দেশের মানুষ – যারা এয়ুরোপের সংস্পর্শে এসেছে তারাও এয়ুরোপের মতবাদ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে। এখন আমরা আমাদের দেশে এমন সব মানুষ তৈরি করেছি যারা এয়ুরোপীয় মতবাদকে আমাদের ভাষায় প্রচার করেন এবং সেই প্রচার বাবদ তারা যেই যুক্তি দেন সেইটাই এনলাইটেনমেন্টের যুক্তি। মানুষকে আলোকিত হতে হলে এই কুসংস্কার সেই কুসংস্কার বাদ দিতে হবে। ইনফ্যাক্ট সমস্ত সংস্কার বাদ দিতে হবে।

এখন আমাদের সমালোচনা হবে: কুসংস্কার বাদ দেওয়া সম্ভব, কিন্তু সমস্ত সংস্কার বাদ দেওয়া কি সম্ভব? নাকি এনলাইটেনমেন্ট নিজেও একটা সংস্কার নয়? মিশেল ফুকো এই কথা জিজ্ঞেস করেছেন। উনি বলছেন, এনলাইটেনমেন্ট নিজেও একটি সংস্কার। তাহলে সেটা কী সংস্কার? সেটার আগে কি ‘ক’ু কথাটা ব্যবহার করা যায়? ধরুন, এনলাইটেনমেন্টও আরেকটি কুসংস্কার। এক কুসংস্কারের বদলে তবে আপনি আরেক কুসংস্কার আনছেন। তাই না? তার বিরুদ্ধে লড়াই করার দাওয়াটা কী আপনার? এই হচ্ছে জিজ্ঞাসা।

এনলাইটেনমেন্ট জিনিসটা ভালো কেন? উনি বললেন, এনলাইটেনমেন্ট এমন একটা মতবাদ যে নিজের খাওয়াইর ভিতরই নিজের দাওয়াই তৈরি করে নেয়। ওর বিষের মধ্যেই ওষুধ আছে। এনলাইটেনমেন্ট ইজ এ ডকট্রিন অব প্রগ্রেস অব ম্যানকাইন্ড। সামন্তবাদের পরে পুঁজিবাদ আর পুঁজিবাদের পরে সমাজতন্ত্র। এটাকে বলে গ্রান্ড ন্যারেটিভ অব প্রগ্রেস। অথবা কুসংস্কার থেকে সুসংস্কার।

কিন্তু তার ত্রুটিটাও এইখানে। এটা খোদ কার্ল মার্ক্সই বলেছেন। আজ পর্যন্ত যত ধর্ম এসেছে পৃথিবীতে সব ধর্মই বলেছে কি না আমি সত্য, আমার আগের সব ধর্মই মিথ্যা, সব ভুল। আমিই হইলাম শ্রেষ্ঠ ধর্ম, সঠিক ধর্ম। খ্রিস্টধর্মের মূল আর্গুমেন্টটা কী? আর্গুমেন্টটা এইমতো: আমরা এয়াহুদি জাতির সন্তান, কিন্তু বর্তমান এয়াহুদি যারা রাব্বাই আছেন, তারা ধর্মটাকে বিকৃত করেছেন। কাজেই ধর্মটাকে পুনরুদ্ধার করার জন্য আরেকজন নতুন নেতা এসে গেছেন। তিনি ‘হযরত ঈসা’। আমরা তাঁর অনুসারী। তিনি ভগবানের বা ভগওয়ালার পুত্র। সুতরাং আমাদেরটাই সঠিক ধর্ম। ইতোপূর্বে আগের ধর্ম যেহেতু বিকৃত হয়েছে তাই সেটা বাতিল। এটাই সর্বশেষ ধর্ম।

একই যুক্তিতে ইসলামের শর্তও এই: ইসলামই সর্বশেষ ধর্ম। ইসলাম এমবডিস দ্যা লেটেস্ট ট্রুথ, সর্বশেষ সত্য। আমার শেষ বহির ধর্ম, লাস্ট রিভিলড রিলিজিয়ন। আর কোন রিভিলড রিলিজিয়ন আসবে না। অর্থাৎ এই পর্যন্ত যেগুলো এসেছিল সব বাতিল। এখন ইসলামের পরে কে আসবে? ইসালামের পরে শুধু ইসলামই আসতে পারে। আর কিছু আসতে পারে না। হোয়াটয়েভার কামস মাস্ট বিন উয়িদিন ইসলাম। যদি এটা ইসলাম-বিরোধী হয় তাহলে এটা বাতিল অথবা ইসলামের ভিতরের হয় তাহলে এটা এর অংশ। আবার আরেকটা ইসলামের দরকার নাই। দি সেইম ইসলাম দেয়ারফোর কেন নট বি ইমপ্রুভড।

এখন মজার বিষয়, ধনতন্ত্রের ইতিহাসও একই যুক্তিতে এগিয়েছে। এটা কার্ল মার্ক্স বলছেন। উনি বলছেন যে একসময় পৃথিবীতে মানুষ বনেজঙ্গলে থাকতো, সেখান থেকে কিছু মানুষ কিছু মানুষকে দাস করেছে দাস প্রথা তৈরি করেছে। তারপর মানুষ সামন্ত—প্রথা – তৈরি করেছে। কিছু মানুষ কিছু মানুষের সার্ভেন্ট থাকবে। তারপর এখন আমরা তৈরি করছি ধনতন্ত্র। এই তন্ত্রে বলা হয়েছে কি সবাই স্বাধীন। কিছু লোক শ্রমিক, কিছু লোক পুঁজিপতি থাকবে। তার মধ্যে সকলে সমান। কিন্তু আবার সকলে সমান নয়। অদ্ভুত যুক্তি। যাঁর সম্পত্তি আছে সে, যার সম্পত্তি নাই তাকে নিজের কাজে খাটাতে পারে। তখন সে বলে যে, আপনিও একজন মজুরি শ্রমিক। তবে আপনি যদি ডাক্তার হন, তবে ইউ আর ওনলি এ হাইলি এফিশিয়েন্ট ডে ‘লেবার’। আপনার বেতনটা একটু বেশি, কিন্তু চরিত্র একই।

এই মতবাদটি অ্যাডাম স্মিথ প্রচার করলেন: ‘ধনতন্ত্রের পরে পৃথিবীতে আর কোন তন্ত্র নাই’। এটাই শেষ তন্ত্র, লাস্ট রিভিল্ড স্যোশাল সিস্টেম। ক্যাপিটালিজম ইজ দ্যা নিউ ইসলাম অব মডার্ন টাইমস। ধনতন্ত্রই আধুনিক জমানার শেষ এসলাম। এরপর আর কোন রিভিল্ড স্যোশাল সিস্টেম থাকতে পারে না।

এই যে মতবাদ, এনলাইটেনমেন্টও তাই। ভলতেয়ার ও দিদ্রো প্রভৃতি ফরাসি দার্শনিক বললেন, ‘আমরা যে সংস্কারে এসে উপনীত হয়েছি, সেটা পৃথিবীর শেষ সংস্কার’। মিশেল ফুকো বললেন, ‘এই কথা ঠিক নয়।’। এনলাইটেনমেন্ট জিনিসটাকে আমরা কেন বেছে নেবো, এটাও যদি আগের মতই হয়? উনি বলছেন, ‘আমি যদি এয়াহুদি ধর্ম ত্যাগ করি তাহলে আমি খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ করবো না কেন? আর খ্রিস্টধর্মই যদি ত্যাগ করতে পারি তবে ইসলাম ত্যাগ করবো না কেন? সুতরাং আখেরি যুক্তি, লাস্ট লজিক হচ্ছে কি আমি কোনো ধর্মেই থাকব না।

ওঁর বক্তব্য: আমি যদি সামন্তবাদ ত্যাগ করতে পারি, দাসপ্রথা ত্যাগ করতে পারি, ধনতন্ত্র ত্যাগ করতে পারি তাহলে আমি সমাজতন্ত্রে আসব না কেন? উনি আরও বলেন ‘অবশ্যই আসব, কিন্তু এত যখন ত্যাগ করলাম তাহলে সমাজতন্ত্রটা ত্যাগ করতে অসুবিধা কী?’ তাঁর প্রশ্ন, ‘আমি যাব কোথায়? আমার তো একটা লক্ষ্য দরকার’। এই হলো ক্রাইসিস এর পর্যায়।

এইখানে, এই যে আমি আপনাদের সামনে একটা গোলকধাঁধার মত অবস্থা উপস্থিত করলাম, এটাই হচ্ছে মিশেল ফুকোর সার বক্তব্য। উনি বলেছেন, ‘মানুষের কোন আলটিমেট তন্ত্র থাকতে পারে না। কোন আলটিমেট ধর্ম থাকতে পারে না’। তাহলে, আপনাকে প্রতিদিনই নিজের ধর্ম নিজে রচনা করতে হবে। প্রতিদিনই নিজের তন্ত্র নিজে রচনা করতে হবে।

এইটা বলে যদি তিনি পার পেতেন, তাহলে আমরা আর তাঁকে নিয়ে আলোচনা করতাম না। কিন্তু, তিনি কিছু সমস্যা রেখে গেছেন। সেইটাই আমাদের দেখতে হবে। এখন, ‘ক্রিটিক’ বলতে তিনি কি বোঝাচ্ছেন? উনি বলছেন, ‘এলাইটেনমেন্ট মতবাদ বটে, সে অন্যের সমালোচনা শুধু করে না, সে নিজেও নিজের সমালোচনা করে’। এটা সেফ রিফ্লেকসিভ। অর্থাৎ এনলাইটেনমেন্ট বলে দিতে পারে যে এটা আমার ত্রুটি। তিনি বলছেন, ‘আমার সেই এনলাইটেনমেন্ট চাই যে নিজেই নিজের ত্রুটি দেখাতে সক্ষম’। তো, সেটা কী করে সম্ভব?

তাই তিনি বললেন, আসুন আমরা কান্টের লেখাটা পড়ি। কান্ট যেহেতু খ্রিস্টধর্মের ভিতরে বড় হয়েছেন, সেহেতু তাঁর লেখাও খ্রিস্টিয় রেফারেন্সে ভর্তি। কান্টের রেফারেন্স হলো এই, ‘মানুষ যতদিন পর্যন্ত নাবালেগ থাকে, ততদিন পর্যন্ত তাকে বাইরের থেকে হাত ধরে ধরে নিয়ে যায় কেউ। মানুষ যখন সাবালেগ, প্রাপ্তবয়স্ক হবে তখন সে নিজে নিজেই চলতে পারে’। এয়ুরোপের পরিপ্রেক্ষিতে উনি নামটা না বললেও এটাই বোঝাচ্ছেন। খ্রিষ্টধর্মের ধর্মসভা, অরগানাইজেশন অব ক্রিশ্চিয়ান থিয়োলজি, যিশুর অনুসারির চার্চ।

আমরা চার্চ মানে দালানটা মনে করি, উনি দালানটা না বলে বলেছেন, দালানের ভেতরে যে মনোভাবটা থাকে সেটাই চার্চ। এসোসিয়েশন অব ক্রিশ্চিয়ানস। এটা অফিসিয়াল এসোসিয়েশন। সংক্ষেপে খ্রিস্টান-সমাজ। এটাই নিয়ম করেছে তুমি এটা করতে পারবা, সেইটা করতে পারবা না। এটা জায়েজ, ওইটা নাজায়েজ। ইতি আদি।

কান্টের বক্তব্য হলো, ‘যে মানুষ চার্চের হাতে আত্মসমর্পণ করেছে সে মানুষ বালেগ নয়। যে মানুষ নিজেই নিজের কর্তব্য নির্ধারণ করতে পারে, সেই বালেগ’। কাজেই উনি এনলাইটেনমেন্টের সংজ্ঞা দিলেন এভাবে, ‘মানুষ যখন সাবালেগ হয়, সেই যুগটাই এনলাইটেনমেন্টের যুগ। তো, সাবালেগ হবার লক্ষণ কী? সে যেমন পরের সমালোচনা করতে পারে, তেমন নিজেও নিজের সমালোচনা করতে প্রস্তুত বা সক্ষম। এই মানুষ আলোকিত নয়, আলোকক। কোন মানুষ আলোকক? যে নিজেই নিজের সমালোচনা করতে প্রস্তুত সেই মানুষই আলোকক, বাংলার গুণে বলা যাক আলোর মোরগ। আর সেই মানুষই হচ্ছে আলোর মুরগি যে শুদ্ধ পরের সমালোচনা করে, নিজের বিচার করতে সক্ষম নয়। অক্ষম কেবল বলে বেড়ায়, আমার বিচার তুমি কর।

এলাইনটেনমেন্ট বলতে আমাদের বুঝতে হবে আরো নানান জিনিশ, এনলাইটেনমেন্টর মধ্যে একটা পরোপকারের ভাব আছে। যেমন এয়ুরোপ থেকে এনলাইটেনমেন্টের জন্য রবার্ট ক্লাইব বা ক্রিস্টোফার কলম্বাস সমুদ্র পাড়ি দিয়েছেন। ক্রিস্টোফার কলম্বাস সদা বিশ্বাস করেছেন (অলওয়েজ বিলিভড দ্যাট) তিনি একজন মিশনারি, ধর্মপথিক, তীর্থযাত্রী বা হাজি। শুদ্ধ ঈশ্বরের গুণগান কীর্তনের জন্যই আমেরিকায় গিয়েছিলেন তিনি। হি অলওয়েজ থট দ্যাট হি ওয়াজ এ রিলিজিয়াস ম্যান এন্ড দ্যাট ওয়াজ হিজ মিশন।

মগর তিনি কিতা খরলেন ভগবানের আমেরিকাখণ্ডটায়? বাট হোয়াট হি ডিড ইন দি আমেরিকাস? এখন আমরা বুঝতে পারছি যে, যা করেছিলেন তার সরল পরিচয় প্রলয়, সেটা ডেভাস্টেশন। আফ্রিকা থেকে লোক ধরে দাস বানালেন তাঁরা, একরোখা কলম্বাসবাদীরা। দে ওয়ার ব্রিঙ্গিং স্ল্যাভস ফ্রম দি পপুলেশন।

তাহলে ওই আমেরিকানদের দোষটা ছিল কী? এক নম্বর দোষ তারা খ্রিষ্টান ছিলেন না। দুই নম্বরে তারা এয়ুরোপীয় ছিলেন না। এরকম দোষ আপনারা ধরতে পারেন। সেখান থেকে তারা যে ইন্ট্রিগ্রেটেড হয় নাই এজন্য তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে ফেলেছে। একটা-দুটা কাহিনী আমরা পড়ি। যেমন ‘পো-কা-হুন-টাস’। একটা আমেরিকান-ইন্ডিয়ান মেয়েকে এয়ুরোপে নিয়া আসলো। তারপর কী যেন, একটা চিড়িয়াখানার বাঘের মত সে তো শেষে মারাই গেলো।

আমি এজন্যই বলছি যে, এনলাইটেনমেন্ট বলতে চলন্ত ধারণা হলো, ‘দি ডিসকোর্স অব প্রগ্রেস, মডার্নিটি এন্ড হিয়ুম্যানিজম।’ মিশেল ফুকো বলছেন, ‘নো, এনলাইটেনমেন্ট কথাটির আরেকটি অর্থ করা যায়। এনলাইটেনমেন্ট মিনস্ দি পসিবিলিটি অব অটোক্রিটিক।’ অর্থাৎ, বিদ্যমান সবকিছুরই নিরন্তর সমালোচনা। এটা কার্ল মার্ক্সের বক্তব্য। এটা কি সম্ভব? আমি আপনাদের বোঝাতে চাচ্ছি, হোয়াট ইজ দ্যা প্রজেক্ট অব মিশেল ফুকো? আপনারা লেখাটা পড়ে দেখেন যে আমি যে সারমর্ম করলাম তার মধ্যে কী পরিমাণ বিকৃতি সাধন করলাম। আমি যা বলেছি তার মধ্যে ফুকোকে কী পরিমাণ মিস-রিপ্রেজেন্ট করেছি।

মিশেল ফুকোর কথা গ্রহণ করতে হলে উনি যেই সোর্সগুলোর নির্দেশনা দিয়েছেন তা দেখতে হবে। প্রথম সোর্স হল, ইমানুয়েল কান্টের লেখা। উনি কী বলছেন? পত্রিকায় একটা প্রশ্নের উত্তরে উনি এটা লিখেছিলেন। জার্মানির একটি পত্রিকা বার্লিনিশে মোনৎশ্রিফ্ট্, (Berlinische Monatschrift) বাংলায় করলে দাঁড়ায় ‘মাসিক বার্লিন পত্রিকা’। সেই পত্রিকা প্রশ্নে বলছে, ‘এনলাইটেনমেন্ট কী বস্তু? মাননীয় দার্শনিকগণ উত্তর দিন।’

প্রথম যিনি উত্তর দিলেন তাঁর নাম ‘মোজেজ মেন্ডেলসন’। ইনি জার্মানির সবচেয়ে মশহুর এয়াহুদি দার্শনিক তখন। ইয়াহুদি হিসেবেই তিনি পরিচিত। আর এমানুয়েল কান্ট মহোদয় খ্রিস্টান দার্শনিক। এই কান্টের উত্তরটা দ্বিতীয় উত্তর। সেখানে কান্ট বলছেন, ‘এনলাইটেনমেন্ট বলতে আমরা বুঝবো, মানবসন্তান যে পর্যন্ত নিজেই নিজেকে নাবালক করে রাখে, সেই অবস্থা থেকে তার মুক্তি।’ তাহলে নাবালক অবস্থা কী জিনিশ? এটা একটা কথার রূপ বা মেটাফোর। যে মানুষ বয়সে পঁয়ত্রিশ বছর হয়েছে কিন্তু এখনো পাঁচ বছরের বাচ্চার মত কথা বলে। অর্থাৎ আমরা এয়ুরোপের অনেকদূর অগ্রগতি করেছি কিন্তু কোনো কোনো জায়গায় এখনো শিশুর মত আছি। সেই শৈশব থেকে মানব জাতির বন্ধনদশা যখন ঘোচে তখনই এলাইটেনমেন্টের উৎপত্তি হয়। এটা একরকম ভোরবেলা। যখন আলো ফোটে। আমরা বেগম রোকেয়ার ভাষায় বলতে পারি এটা ‘সুব্হে সাদেক’। এখন সকাল হল। আলো ফুটল।

আরবিতে ‘সাদেক’-এর মধ্যে যে সত্যের একটি আভাস আছে, এইখানেও এরকম একটি আভাস দেখছেন উনি। দি এনলাইটেনমেন্ট মিন্স ইউর ইমার্জেন্স টু ট্রুথ। যদিও উনি বলছেন না বাংলায় আমরা এটার নাম দিয়েছি খুব বিশ্রি, ‘প্রথম আলো’। বাংলায় এনলাইটেনমেন্টের সবচেয়ে চালু অনুবাদ কোনটা জানেন? ‘প্রথম আলো’। দিস ইজ দ্যা টাইটেল অব এ বুক বাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এন্ড হুইচ আওয়ার ফ্রেন্ডস্ আর কপিয়িং হিয়ার। তার জন্মের মধ্যে এই ত্রুটিটা আছে আরকি। এটা নকলনবিশ নাম। ‘প্রথম আলো’ মানেই সুব্হে সাদেক। ‘প্রথম আলো’ মানেই এনলাইটেনমেন্ট। এইটাকেই জার্মানরা বলে ‘আউফক্লারুঙ্গ’। আউফ মানে আপ। ক্যারুঙ্গ মানে ক্লিয়ারিং। আক্ষরিক অর্থে। অর্থাৎ ময়লাটা মুছে ফেলুন।

এই এনলাইটেনমেন্ট আসছে খ্রিস্টধর্মের বিচার বা সমালোচনা হিসেবে। সব কথা বলা যাবে না এখানে। সময় সংক্ষিপ্ত, মোখ্তসর। সেখানে স্বৈরতন্ত্র ছিল। ধর্মতন্ত্র আর স্বৈরতন্ত্র সমার্থক। হোয়াট ওয়াজ জার্মানি এট দ্যাট টাইম? ইট ওয়াজ এ হলি রোমান এম্পায়ার। মানে পবিত্র রোম সাম্রাজ্য। ভলতেয়ার ভাঁড়সুলভ ভাষায় কয়েছেন ঐ সাম্রাজ্য না ছিল হলি, না রোমান, না এমনকি সাম্রাজ্য। তবে অবিচার ছিল, ভাগাভাগি ছিল ক্ষমতার। ওরা বলেছিল এখানে পরকালের দায়িত্ব পোপ সাহেবকে দিচ্ছি। আর ইহকালের দায়িত্ব আমরা সম্রাট সাহেবরা নিচ্ছি। কিন্তু আমাদের অথরিটি আসছে ফ্রম দ্যাট, মানে ঐখান থেকে। ধর্মই আমাদের সিদ্ধির মাপকাঠি।

তার ভেতরেই চাকরি করেন দার্শনিক ‘ইমানুয়েল কান্ট’। এর মধ্যে থেকে তিনি যেটুকু বলতে পারেন, বলছেন যে, ‘সমস্ত ব্যাপারে চার্চের মাতব্বরি মেনে নেওয়া আমাদের প্রগতির পক্ষে অসুবিধা।’ প্রশ্ন হল, কী সমালোচনা করা যাবে আর কী করা যাবে না? তখন সেন্সর চালু ছিল। নিয়ম বেঁধে দিয়েছে, এইটা সমালোচনা করতে পারবেন আর এইটা সমালোচনা করতে পারবেন না। কারণ কী? এটা সেন্সিবিলিটিতে আঘাত করবে। এইভাবে আসতে আসতে কান্টের মূল সিদ্ধান্ত হল: ‘আপন যুগের, আপন ধর্মের সমালোচনা আপনাকে করতে হবে। এনলাইটেনমেন্ট মাস্ট পারমিট ক্রিটিসিজম অব রিলিজিয়ন।’

কান্টের এই কথার সূত্র ধরেই মিশেল ফুকোও যোগ করলেন আপনকার এক ফোঁটা নবীন শিশির । উনি বললেন, ‘তাহলে ইস্! উই ক্যান ক্রিটিসাইজ এনলাটেনমেন্ট ইটসেল্ফ।’ দার্শনিক যুক্তি হিসেবে এমন মহা নতুন কিছু নয়। কিন্তু কোন জিনিসের মূল্য নির্ভর করে তার মৌলিক উত্তরের উপর শুধু নয়। তার সমসাময়িকতার উপরও। কোন সময়ে কোন জায়গায় কে কী বলছেন, সেটাই দরকারি হয়ে ওঠে।

মিশেল ফুকো বলছেন, ‘এখন এয়ুরোপে যে ধনতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছে তার আধ্যাত্মিক আদর্শ এনলাইটেনমেন্ট। এই এনলাইটেনমেন্টের মাধ্যমে আমরা হয়ত এই ধনতন্ত্রকে অতিক্রম করতে পারবো না, কাজেই আমাদের এইটার সমালোচনা করার মত একটা সূত্রও বের করতে হবে। নাম তিনি দিয়েছেন ‘ক্রিটিক’। ‘ক্রিটিক’ কথাটা এয়ুরোপে প্রথম প্রমিনেন্ট করেছেন ইমানুয়েল কান্ট। ‘ক্রিটিক’ মানে সমালোচক নয়, সমালোচনার ধর্ম। অনেকে এই ‘ক্রিটিক’-এর বাংলা অনুবাদ করেছেন ‘সম-আলোচনী’। ক্রিটিক মিনস্ এ ডিসকোর্স হুইচ কন্টেইনস ক্রিটিসিজম। কন্টেইন শব্দে যেমন ধারণ করা বোঝায়, আবার রোধ করাও বোঝায়। এ তলোয়ার দুধারি।

‘ডিসকোর্স’ কথাটার অর্থ আমরা পরিষ্কার বুঝি কিনা বোঝা দরকার। আমি নিজেও বুঝতাম না। আনটিল আই কেইম এক্রস দি রাইটিংস্ অব জাক লাকাঁ। জাক লাকাঁর মধ্যে ডিসকোর্স কথাটা কোন অর্থে আসছে? ডিসকোর্সের যদি আক্ষরিক অর্থ করেন, ইট ইজ এ কোর্স অব স্পিচ্। এখন এর একটা নতুন বাংলা আমি প্রস্তাব করেছি। আপনারা হয়ত এখনো শোনেন নাই। এই ডিসকোর্সের বাংলা ‘সন্ধ্যা’।

আপনারা সান্ধ্য আইনের কথা শুনেছেন, কিন্তু ‘সন্ধ্যাভাষা’র কথা হয়ত এখনো শোনেন নাই। একটা উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। সন্ধ্যাভাষা বলে কোনটাকে? চর্যাপদের ভাষা এক ধরনের সন্ধ্যাভাষা। আমরা যে অর্থ নিয়েছি এর তা কি জানেন? মধ্যযুগ বলে একটা জায়গা আছে। তার সঙ্গে আছে অমধ্যযুগ। দুইয়ের একটা সন্ধিস্থল থাকবেই।

কিন্তু চর্যাপদ কোন সময়ে লেখা? বাংলাদেশে যখন বৌদ্ধধর্মের প্রচার তুঙ্গে উঠেছে, এটা মূলত হযরত গৌতম বুদ্ধের অনেক পরে। তাঁর এক হাজার দেড় হাজার বছর পরে বঙ্গীয় তান্ত্রিক বৌদ্ধরা তাঁদের গান (প্রার্থনা সঙ্গীত) যে ভাষায় করছেন সেইগুলিকে আমরা সন্ধ্যাভাষার নমুনা বলি এখন। এখনও দাবি করি এসব বাংলা। হরপ্রসাদ দাবি করলেন এগুলো হাজার বছরের পুরানা বাংলা। কে জানে এগুলো কি বাংলা, না বাংলা নয়? হিন্দিওয়ালারা বলেন হিন্দি। উড়িয়ারা বলেন উড়িয়া। অহমিয়ারা বলেন অহমিয়া। আমরা বলি বাংলা। কিছু আসে যায় না। এসব ব্রজের ভাষার মত বা মিথিলার ভাষার মত।

এখন সন্ধ্যাভাষা কোন সমাজের বৈশিষ্ট্য? শহীদুল্লাহ সাহেবের থিওরি যদি সত্য হয় তবে, সপ্তম থেকে একাদশ-এর মধ্যে হয়েছে এটা। খ্রিস্টিয় শতাব্দী অনুসারে আজ থেকে চোদ্দশ তেরোশ বারোশ বছর আগে। আসলে কিন্তু আমরা ওই সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানিও না। আমি সেই অর্থে সন্ধ্যা ব্যবহার করি নাই। সন্ধ্যা মানে হেঁয়ালিও নয় ।

দিবা ও রাত্রির সন্ধিক্ষণ, সেইখান থেকে সন্ধ্যা কথাটা আসছে। সন্ধি মানে চুক্তি, যুদ্ধে যেমন সন্ধি হয়। সন্ধি মানে এক অর্থে মিলন। কিন্তু এই মিলন আবার এক অর্থে যুদ্ধচিহ্নিত। সন্ধ্যাভাষায় তাহলে কার সাথে কার চুক্তি?

ল্যাঙ্গুয়েজ ইজ এ ভেক্টর। রাশি বলি দুই ধরনের। স্কেলার রাশি আর ভেক্টর রাশি। ভেক্টর মানে যেখানে ডিরেকশন্ থাকে। আমি আপনার উদ্দেশে বলছি, আপনি আমার উদ্দেশে বলছেন। এই ভেক্টর যেখানেই থাকে সেখানেই সন্ধির উৎপত্তি হয়। ইট ইজ দি ভেক্টর অব সাবজেক্ট। হুইচ ট্রাইস টু মেক এ লিঙ্ক উইথ দ্যা ল্যাঙ্গুয়েজ। আমি যখন দাঁড়িয়ে এখানে বক্তৃতা দিচ্ছি আপনারা বলছেন সলিমুল্লাহ খান বক্তৃতা দিচ্ছেন। কিন্তু আমি যে বক্তৃতা দিচ্ছি সে আর আমার ‘আমি’ কিন্তু এক নয়। আমার একটা ‘সহ-জ’ আছে, যে আমার সঙ্গে জন্মেছে। বক্তৃতা আমি দিচ্ছি। কিন্তু আবার আমার সহজও দিচ্ছে। যুগপৎ। কখনও আমি দিচ্ছি। এ বক্তৃতা খালি। কখনও সে (সহজ) আর আমি দিচ্ছি। এটা ভরা।

আমরা ডিসকোর্স বলি সেই ভাষাকেই যে ভাষা ডিরেকশন বা দিক গ্রহণ করেছে। এইজন্য বলি মাস্টারস ডিসকোর্স, স্লেভস ডিসকোর্স, উমেনস ডিসকোর্স, ইতি আদি। স্পিচ, ল্যাঙ্গুয়েজ, ডিসকোর্স তিনেই এক জিনিস বুঝায়। কিন্তু আলাদা তারা। সবগুলিরই বাংলা করতে পারেন ‘ভাষা’। স্পিচ বলতে আমরা বলি ‘বাক্’। যথা মানুষ বাক্শক্তিসম্পন্ন প্রাণী। মানুষের স্পিচ পাওয়ার আছে। আবার বলছি কি মানুষ কী ভাষার মধ্যে বাস করে। ম্যান লিভস ইন ল্যাঙ্গুয়েজ। এখন নতুন কথা হিসেবে বলছি কী?

মানুষ যেভাবে কথা বলে সেটা কোনো না কোনো ডিসকোর্সে বিভক্ত। ইন্সটিটিউটের মধ্যে যেমন ডিপার্টমেন্ট থাকে, তেমনি ল্যাঙ্গুয়েজ ইজ ডিভাইডেড ইনটু ডিসকোর্সেস।

এখন ডিসকোর্সের নিকটতম তুলনা কী? সেন্টেনস্। আপনি একটা শব্দ দেন। কোন এক অর্থ বহন করবে। যদি শব্দটা কোন বাক্যের মধ্যে বলেন তবে আরেকটা অর্থ গ্রহণ করবে। যদি বাক্যটা কোন প্যারাগ্রাফ বা এসের অংশ হয় তবে আরেকটা অর্থ হবে। আপনার গোটা বক্তৃতাটাকে আমরা ডিসকোর্স বলি। এইজন্যই আমি বলছি, সন্ধ্যা কথাটা আমরা আনছি ওই জায়গায় থেকেই। সন্ধ্যা সন্ধির ভাষা বটে। সন্ধিটা কার সাথে? সহজের সঙ্গে ভাষার সন্ধি। ল্যাঙ্গুয়েজের মধ্যে আমি নিজেকে প্রকাশ করেও করি না। কিন্তু আমি ছুটতে থাকি ল্যাঙ্গুয়েজের পেছনে। এই ছোটার মধ্যেই আমি। আমার সহজ জন্মায় এই ছোটার টানে।

এই জন্য প্রভুদের ভাষা সন্ধ্যা নামে খ্যাত হয়। মানে আমরা যাঁদের বৌদ্ধধর্মগুরু বলি বা যাঁদের বলি সিদ্ধাচার্য তাঁদের ভাষার মধ্যে যে একটা আলো-আঁধারির ভাব আছে তা সন্ধ্যা নামে খ্যাতি পায়।

এখন আমি অনুবাদ করবো সহজ (Subject) ও সন্ধ্যা (Discourse)। ইংরেজিতে ‘সহজ’কে বলেছি সাবজেক্ট, আর ‘সন্ধ্যা’কে ডিসকোর্স। তাহলে সাবজেক্ট এন্ড ডিসকোর্স, তাদের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। এইজন্য আমি এটার নাম প্রস্তাব করেছি ‘সন্ধ্যাভাষা’। সন্ধির ভাষা। জানতে হবে, সন্ধির দুইপক্ষ কে কে। দি স্পিকার ইজ স্পিকিং টু সামবডি। প্রভু দাসের উদ্দেশে কিছু বলছেন। স্বামী স্ত্রীর উদ্দেশে, ছাত্র শিক্ষকের উদ্দেশে বলছে। জাক লাকাঁ তাঁর ডিসকোর্সে চারটা ডিসকোর্সের কথা বলেছেন। দি মাস্টারস ডিসকোর্স বা সেয়ানার সন্ধ্যা। এইক্রমে ইনভার্সিটি ডিসকোর্স। দি এনালিস্টস ডিসকোর্স এবং শেষ তক দি এনালিসেন্ডস বা হিস্টেরিক্স্ বা বোকাচোদার ডিসকোর্স। নামটা বসেছে সেয়ানের জায়গায় যে বসেছে তার নামে।

আমার শেষ মন্তব্য এনলাইটেনমেন্ট বোঝার সময় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: ‘হুজ ডিসকোর্স ইজ এনলাইটেনমেন্ট?’ কে বলছে? সেয়ানা কে এখানে?

আগে লোকে বলেছে, ঈশ্বর মানুষের কাছে যখন ওহি পাঠান তখন ঈশ্বর বলছেন বহুবচনে আমরা এটা করেছি, আমরা ওটা করেছি। ল্যাঙ্গুয়েজটা খেয়াল করবেন। এখন মানুষ যখন মানুষের উদ্দেশে বাণী পাঠায় এবং কোনো কোনো সময় ঈশ্বরের জায়গা নিজে দখল করে বলে কি, ‘আমি মানুষ, কিন্তু আমি সেয়ানা, তোমাকে ঈশ্বরের জায়গা থেকে আদেশ করছি’। সেইটা কিন্তু ওই ঈশ্বরের ডিসকোর্স গ্রহণ করে।

এই জন্য মিশেল ফুকোর নতুন কথা হল, ‘মানুষ কথাটা অর্বাচীন কথা। মানুষ শব্দটার বয়স এই মাত্র দুইশ বছর।’ আপনারা সকলেই তার প্রতিবাদ করতে পারেন। কারণ, মানুষ শব্দটা আমরা বহুদিন আগ থেকে – হযরত আদমের সময় থেকে দেখছি। আমরা সব ভাষায় দেখতেছি ‘ইনসান’ কথাটা, ‘হিয়ুম্যান’ শব্দটা আছে। কিন্তু মিশেল ফুকোর কথা অন্য। মানুষের অহমটা, অহংকারের হুংকারটা নতুন।

এই বিখ্যাত বইয়ের শেষ বাক্যে মিশেল ফুকো বলছেন, “সবকিছুর কেন্দ্রে বসা মানুষ’ কথাটা মানুষই লিখেছে। ওটা বেশি দিন টিকবে না। সমুদ্রতীরে, বালির তটে সামনের জোয়ারে সেটা মুছে যাবে।” সমুদ্রের কাছে গিয়ে লোকে মাটিতে বসে বালিতে নিজের নাম লেখে না? জোয়ার আসলে আবার মুছে যায়। তাহলে মানুষ শব্দটা মানুষ লিখেছে এইরকম, বালির তটে সামনের জোয়ারে সেটা মুছে যাবে। বাক্যটা খুব স্মরণীয়।

ফুকো ক্লাসিকাল আর মডার্ন এজ বলতে কী বোঝাচ্ছেন? ফুকোর কাছে নাইনটিনথ সেঞ্চুরি মানে আঠারো শ সন থেকেই মডার্ন যুগের শুরু। আর আগের যুগটাকে – মানে এর আগের দেড়শ বছরকে – তিনি বলেন ক্লাসিকাল বা বুনিয়াদী যুগ। মানে ১৬৫০ থেকে ১৮০০ পর্যন্ত এই সময়টাই ফুকোর অভিধানে ক্লাসিকাল যুগ আর ১৮০০ থেকে আজ পর্যন্ত বাকিটা মডার্ন যুগ।

এখানেই ফুকো বলেছেন, খেয়াল করবেন, ‘ওয়ান ক্যান সার্টেইনলি ওয়েজার (Wager – এর অর্থ বাজি ধরা, রেসের ঘোড়ার মানুষ যে বাজি ধরে, কোন ঘোড়া ফার্স্ট হবে? এইটা হল সেই বাজি ধরা) দ্যাট ম্যান উড বি ইরেজড লাইক এ ফেস ড্রন ইন স্যান্ড এট দি এজ অব দি সি।’ আপনি বাজি ধরতে পারেন, মানুষের দিন শেষ হয়ে গেছে। এই জন্য তিনি ফরাসিদেশে আবির্ভূত হয়েছিলেন এন্টি-হিয়ুম্যানিস্ট হিসেবে। ফ্রান্সে কয়েকজন দার্শনিককে এন্টি-হিয়ুম্যানিস্ট বলা হয়েছে সেই সময়। একজন ফুকো। আরজন লুই আলথুসার। আরেকজন জাক লাকাঁ।

foucault7.jpg
মিশেল ফুকো

এরা কেন মানববিরোধী? আমরা মানববিরোধী থেকে অনুবাদ করে বলেছি মানববিদ্বেষী। ম্যান উড বি ইরেজড লাইক এ ফেস ড্রন ইন স্যান্ড এট দি এজ অব দি সি। ক্লাসিকাল যুগের চিন্তা মানে দেকার্ত থেকে শুরু করে কান্ট পর্যন্ত সময়টা। তার ভেতরে এনলাইটেনমেন্টও আছে।

তার পরেই শুদ্ধ মানব বা ম্যান আইডিয়াটা চলেছে এয়ুরোপে। সেটাও এতদিনে ধ্বংসের মুখে এসেছে, চলে যাবে। এটাই ছিল তাঁর প্রজেক্ট। মিশেল ফুকোর প্রকল্প এন্টি-হিয়ুম্যানিজম। কিন্তু লোকটি কেন এনলাইটেনমেন্টে আবার ফিরে আসলেন? এটা বোঝার জন্য আপনারা যদি শুদ্ধ একটা ক্লু লাভ করতে চান আমি এটা বলেই শেষ করছি, ইরানের বিপ্লব সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য পড়ে দেখলেই তা পাবেন বলে।

মিশেল ফুকো কেন ইরানের বিপ্লবকে প্রথমে সমর্থন করেছিলেন এবং কেন পরে সমর্থন করতে পারেন নাই, কেন পরে তা প্রত্যাহার করলেন, সেই রহস্যের চাবিকাঠি সেখানে আছে বলে আমার বিশ্বাস। মিশেল ফুকো : পাঠ ও বিবেচনা নামের সংকলনে অন্তর্ভুক্ত একটা সামান্য প্রবন্ধে আমি এই বিষয়টা বলতে চেয়েছি। (খান ২০০৭/ক)

প্রশ্নোত্তর

(দুর্ভাগ্যবশতঃ প্রশ্নগুলো রেকর্ড হয় নাই। কাজেই এখানে প্রশ্নকর্তাদের বেনামিতে শুকরিয়া জানাচ্ছি।)

১ নং উত্তর
ডিসকোর্সের মধ্যে কোন জিনিসটা উপস্থিত? ডিসকোর্স মানে ল্যাঙ্গুয়েজ উইথ এ সাবজেক্ট। এখন সাবজেক্ট কথাটায় যদি আপনার অসুবিধা হয় তবে আপনি বলেন ‘এ স্পিকার’ কিন্তু এটা সত্য নয়। এটা তার প্রথম বৈশিষ্ট্য। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য: ডিসকোর্সের মধ্যে একজন বক্তা থাকে। বক্তা কোন দিকে যাচ্ছে সেই দিকে একটা তীর থাকে। কাজেই এটা একটা ভেক্টর। ইট ইজ এ ভেক্টর অব স্পিচ। আপনি কোর্স কথাটা খেয়াল করছেন? এককোর্সের ডিনার বলেন না? আরো বহু রকমের কথা আছে।

আপনারা একটা সুন্দর অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করেন না? যেটার নাম ‘ইন্টারকোর্স’? রতিক্রিয়ার চেয়ে কতই না সুন্দর পদটা! মিল আছে তো এখানেও। ডিসকোর্স আর ইন্টারকোর্স ইজ নট ফার ফ্রম ইচ আদার। ডিসকোর্স ইজ এ কাইন্ড অব ইন্টারকোর্স, বাই দ্যা ওয়ে। কথাও এক প্রকার সঙ্গম, সন্ধি। এটাই আমি ভদ্রভাবে বললাম, ইট ইজ এ ভেক্টর। ডিসকোর্স ইজ ইন্টারকোর্স। দেয়ার ক্যান্ট বি ওয়ান ডিসকোর্স অ্যালোন। এইটার অন্য আরেকটা নাম আছে। ‘ওনানীয়ি’ জার্মানিতে বলে। ইংরেজিতে বলে ওনানিজম। যেটার সহজ বাংলা হল স্বমেহন। আত্মমৈথুন। যেখানে ইয়ু আর দি লাভ অবজেক্ট অব ইয়োরসেল্ফ। আপনি নিজেই নিজেকে ভালোবাসেন। একা একা দাবা খেলা যায় হয়তো। বেশি একা কথা বললে অন্যে পাগল ভাববে।

আমার নতুন কথা হল, ডিসকোর্স ইজ এ ফ্যাক্ট বিটুইন সাবজেক্ট এণ্ড ল্যাঙ্গুয়েজ। ল্যাঙ্গুয়েজ কেন? কারণ ইট ইজ ফ্রম ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যালোন দ্যাট স্পিচ কাম্স্। লোকে যখন বলে আমি বলি।

আই থিংক দেয়ার ফোর আই অ্যাম। দেকার্তের প্রধান কুসংস্কার এই। মানে এয়ুরোপের লড়াইটা হচ্ছে এখানে, মানুষ মনে করে কি আমি আমার স্পিচের মালিক। এটা একটা ইলিয়ুশন। এই ইলিয়ুশনের উপরে এন্টায়ার এয়ুরোপীয় ফিলোসফি দাঁড়িয়ে আছে গত সাড়ে তিনশো বছর। এন্ড দিস ইজ দ্যা ফান্ডামেন্টাল ডিসকভারী অব দি লাস্ট ফিফটি ইয়ারস।

১৯৫০ এর পরে এয়ুরোপে যে দার্শনিক আন্দোলন হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবর: ম্যান ইজ নো লংগার মাস্টার অব হিজ ওউন হাউজ। মানুষ তার আপন বাড়ির প্রভু নয়। কথাটা ফ্রয়েডের। মিশেল ফুকো এ কথাটা পুরা তামিল করেন নাই। তিনি বলেন এনলাইটেনমেন্ট এলাউস সেল্ফক্রিটিক, অটোক্রিটিক।

ফুকো কিন্তু এই লেসন আত্মস্থই করতে পারেন নাই। সেটা আমি পরে [আরেক দিনের বক্তৃতায়] দেখাবো। অন্য কোন দিন দেখাবো। ইরানের বিপ্লবে তাঁর মনের যে দ্বিভঙ্গি ধরা পড়েছে, সেটা কিন্তু ফিলোসফির এই ত্রুটি থেকেই। এই দ্বিভঙ্গিটা আপনি জাক লাকাঁর মধ্যে দেখবেন না। অন্ধকার রাত্রে সব গাভি কালো দেখায়। সেজন্য আপনার মনে হতেই পারে জাক লাকাঁ যা মিশেল ফুকোও তা এখন। দুইজনেই ফরাসি ভদ্রলোকমাত্র। কিন্তু পরে যখন আপনারা আরো এগুতে রাজি হবেন আমি দেখাবো যে এই দুজনের মধ্যে প্রভূত পার্থক্য আছে। সেই পার্থক্য মেটেরিয়াল, রিয়েল, মানে অখিল পার্থক্য।

প্রথম কথা, মিশেল ফুকো হিয়ুম্যানিজমের সমালোচক কিন্তু তিনি এনলাইটেনমেন্টকে সংশোধন করে গ্রহণ করতে চান। জাঁক লাকাঁ দুইটাকেই বর্জন করতে চান। জাক লাকাঁ আধুনিক বিজ্ঞানকেই বর্জন করতে চান। তাহলে বিজ্ঞানের জায়গায় কী জিনিস আমি স্থাপন করবো? সেটাকেও কি আমি বিজ্ঞান বলবো? লাকাঁ বলেন সেটাকে বিজ্ঞান না বলাই ভালো। ওটাকে ডিসকোর্স বলবো।

আধুনিক বিজ্ঞানের সবচাইতে বড় ত্রুটি এই: সে নিজেই মনে করে মেটা-ডিসকোর্স। মানে মেটা-ল্যাঙ্গুয়েজ। তার কোনো ডিরেকশানলিটি নাই। সে স্বয়ম্ভু। সে প্রভুর মত। শ্রেণীস্বার্থ গোষ্ঠীস্বার্থ কোনো কিছুই তার জন্যে মেটার করে না। পয়েন্ট অব ভিউ জিনিসটাকে সে অস্বীকার করতে চায়।

আমরা অনেক সময় মনে করি কি মানুষ বাকশক্তিসম্পন্ন প্রাণী। মানুষ র‌্যাশনাল প্রাণী। এই কথাটার মধ্যে বিরাট আকারের একটা ফাঁকি আছে। যদি মানুষ বাকশক্তিসম্পন্ন না হতো তাহলে আমরা আর কোন কথা বলতাম না। কিন্তু মানুষ যে যুক্তিনিষ্ঠ, র‌্যাশনাল যে বলা হয়, এর অর্থ কী?

মানুষের সকল কর্মকাণ্ড মানুষ নিজে থেকে নিয়ন্ত্রণ করে না। সে যেন কোথা থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। কার্ল মার্ক্স এক জায়গায়, মোতাবেক ‘কুয়াশা মাসের আঠার তারিখ’ নামক এক কেতাবের ফাতেহায়, বলছিলেন, ‘মানুষ ইতিহাস নির্মাণ করে বটে, তবে সে ইতিহাস যাচ্ছেতাই নয়। অতীত থেকে আসা পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে তাকে ইতিহাস নির্মাণ করতে হয়। তাকে কতগুলো অবস্থা ভাগ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হয়। তারপরে গিভেন মেটেরিয়েল দিয়ে সে ইতিহাস নির্মাণ করতে পারলে পারে, না হলে পারে না।’ এটারই প্রতিধ্বনি আমরা পাবো আধুনিক কালে। মানুষের ভাষা প্রমাণ করে যে, মানুষ ভাষারই ক্রীড়নক, বেশ কিছু পরিমাণে। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়।

ফুকো যে মোটের ওপর অর্ধশিক্ষিত দার্শনিক তার প্রমাণ এই যে, তিনি এখানেই তাঁর বই শেষ করেছেন। জাক লাকাঁ কিন্তু ঐখানেই কথা শেষ করেন নাই। জাক লাকাঁ তাঁর চেয়ে অন্তত এক আনা ঢের শিক্ষিত। উনি বললেন, বাট রিমেম্বার মাই ফ্রেন্ড, ম্যান স্টিল স্পিকস। অ্যাণ্ড অ্যাটেম্পট্স্ টু এসকেপ ফ্রম দি আদার। কিন্তু পারে না। একপক্ষে কখনো সন্ধি হয় না। ভাষাই যদি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতো তাহলে সাবজেক্টিভিটির কোন মূল্য থাকতো না।

আমি সংক্ষেপে বলি, জাক দেরিদার যে ত্রুটি আমি একটা ছোট প্রবন্ধে দেখিয়েছি, ভবিষ্যতে ইনশাল্লাহ আরো দেখানোর ইচ্ছে আছে। জাক দেরিদা ইজ নট মাচ ডিফারেন্ট ফ্রম জর্জ বুশ। অনলি ডিফারেন্স ইজ; হি ইজ এ ফিলোসফার এন্ড দ্যাট ম্যান ইজ এ প্রেসিডেন্ট। একজন বৃত্ত আরেকজন দুর্বত্ত। (খান ২০০৭/খ)

এতদিন যাবৎ আমরা মিশেল ফুকো ও জাক দেরিদাকে কিছুটা ভক্তি দেখিয়েছিলাম। দে আর ক্রিটিকস্ অব এয়ুরোপিয়ান মেটাফিজিকস্, ক্রিটিকস অব এয়ুরোপিয়ান লিবারেলিজম। কিন্তু যখন অখিল আপন জায়গায় আসে, তখন ধরা যায় তাঁদের ভেক ভেকমাত্র।

২ নং উত্তর
মিশেল ফুকো পড়ার জন্য আপনাদের আমি এন্টিডোট হিসেবে দুইটা জিনিস তুলনা করতে বলি। এক: আপনারা মিশেল ফুকোর সমস্ত লেখার সাথে মিলিয়ে তাঁর প্রতিটি লেখা পড়েন। এটা একটা মাপকাঠি। তাঁর আট দশটা বই আছে, সবগুলো পড়তে হবে। এটা হল আমাদের লংটার্ম সিলেবাস। আর দুই: মিশেল ফুকোকে তাঁর আদার কন্টেমপোরারির সাথে তুলনা করে দেখতে হবে। এর মধ্যে আছেন দেরিদা এবং লাকাঁ। আরো অনেকে আছেন। আমি আপাতত মাত্র এই দুইজনেরই নাম নিচ্ছি।

আমি এই কথা বলবো যে, মিশেল ফুকো লিবারেল কি ইল্লিবারেল সেটার বাইরেও বড় কথা মিশেল ফুকো একজন ভালো লেখক এবং তাঁর কাছ থেকে শেখার অনেক কিছু আছে। বড় শিক্ষকেরা, বড় লেখকেরা যখন ভুলও করেন তখন তাঁরা অনেক ছোট ছোট চেরাগ রেখে যান। সেগুলো থেকে আমাদের শেখার আছে। আমি এইজন্য মনে করেছি মিশেল ফুকোকে আমাদের পাঠ্যসূচির প্রধান ক্যান্ডিডেট হিসেবে।

৩ নং উত্তর
আপনারা জানেন মিশেল ফুকো কম বয়সে দুইটা বড় বই লেখেন। একটা ‘পাগলামির ইতিহাস’। আরেকটা ‘হাসপাতালের ইতিহাস’। ‘ম্যাডনেস এন্ড সিভিলাইজেশন’এবং ‘বার্থ অব দি ক্লিনিক’। ‘অর্ডার অব থিংস’ তাঁর তৃতীয় বই। আর ওঁর চতুর্থ বই ‘আরকিওলজি অব নলেজ’। তৃতীয় আর চতুর্থ বই দুটা আসলে একই বইয়েরই দুই খণ্ডমাত্র।

এরপরে তিনি দুইটা বড় বই লেখেন। একটা ‘ডিসিপ্লিন এন্ড পানিশ’। এটা ‘জেলখানার ইতিহাস’। তারপর সর্বশেষ যেটাকে আমরা বলি ‘রতির ইতিহাস’। ‘হিস্ট্রি অব সেক্সচুয়ালিটি’। রতির ইতিহাস লিখার পর তিনি বিরতি দিলেন।

৪ নং উত্তর
লুই আলথুসার বলছেন, হিস্ট্রি ইজ এ প্রসেস উইদাউট এ সাবজেক্ট। দেয়ার ইজ নো সাবজেক্ট। এখন আমি এ বাক্য ফুকোতে এট্রিবিউট করছি না, তবে ইট ওয়াজ অলসো ফুকোস ভারচুয়াল পজিশন। অর্থাৎ হিস্ট্রি ইজ এ প্রসেস উইদাউট এ সাবজেক্ট। উনি সাবজেক্ট বলে কিছু স্বীকার করেন না। আমি বলছি লাকাঁ ফ্রম দি ভেরি বিগিনিং এডমিটেড দি এক্সিসটেন্স অব দি সাবজেক্ট। পার্থক্যের মধ্যে এই।

(এপ্রিল ২০০৭)


দোহাই

১. সলিমুল্লাহ খান, ‘ইরান ও ইসলাম: মিশেল ফুকো বোধিনী,’ পারভেজ হোসেন সম্পাদিত, মিশেল ফুকো: পাঠ ও বিবেচনা, ঢাকা: সংবেদ ২০০৭/ক।
২. সলিমুল্লাহ খান, সত্য সাদ্দাম হোসেন ও স্রাজেরদৌলা, ঢাকা: এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভা, ২০০৭/খ।
৩. Arthur C. Danto, ‘Interview’ in Ewa Domanskka, Encounters: Philosophy of History after Postmodernism, Charlottesville: University of Virginia Press, 1998.

বিডিনিউজ, আর্টস, ১৫ নভেম্বর ২০০৭

 

(স্বাধীনতা ব্যবসায় গ্রন্থে পরিমার্জিত পুনর্মুদ্রণ প্রকাশ পাইয়াছে)

আদম বোমা (১) । পশ্চিমা সাম্রাজ্যের বর্ণপরিচয়

অস্মদ্দেশে সাধারণ্যে—উদাহরণ দিয়া বলিতেছি—এডোয়ার্ড সায়িদ যতখানি সুপরিচয় লাভ করিয়াছেন তালাল আসাদ মনে হয় ততখানি প্রচারধন্য নহেন। তিনি যে একেবারে ডুমুরের কুসুম তাহাও নহে। আমাদের এই বিদ্ধাবুদ্ধিধনদৌলতবিবর্জিত ব্যাপক দেশে যাঁহারা দুনিয়াদারির খবরসবর অল্পস্বল্প হইলেও রাখেন তাঁহাদের সাক্ষাৎ তালাল আসাদ আদৌ আনকোরা নাম নহেন। তিনি জন্মসূত্রে খানিকটা আরব। আর লেখাপড়া করিয়াছেন ইংলন্ডে।

talal-asad-2.jpg
তালাল আসাদ

অনেক অনেক দিন আগের কথা। ১৯৭০ দশকের গোড়ার দিকে তরুণ তালাল আসাদ সদলবলে ‘নরবিজ্ঞান ও পররাজ্যাভিযান’ নামধেয় এক চমৎকার বহি প্রকাশ করিয়া ইংরাজভূমি আর ইংরাজি প্রভাবাধীন জগতে ব্যাপক নাম কুড়াইয়াছিলেন। (আসাদ ১৯৯০) বর্তমান লেখক অন্তত তাঁহার নাম প্রথম মুখস্থ করিয়াছিলেন ঐ বইযোগেই। ১৯৮০ দশকের শেষ নাগাদ তালাল আসাদ মার্কিন মুলুকে হিজরত করেন। অদ্যাবধি সেইদেশেই তাঁহার বসবাস। যতদূর জানি নতুন ইয়র্কের একটি মধ্যমসারির বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি এখনো অধ্যাপনাকর্মে নিয়োজিত আছেন। সেইখানেই বর্তমান লেখকের সহিত তাঁহার আলাপ পরিচয় হইয়াছিল।

ইত্যবসরে তালাল আসাদের আরো দুইখানি প্রবন্ধ সংকলন—একটার নাম ‘ধর্মের কুলজি’, অন্যটা ‘দুনিয়াদারির রূপজগৎ’—বাজারে উঠিয়াছে। (আসাদ ১৯৯৩; আসাদ ২০০৩) এইগুলির কোনটাই গড়পড়তা অধ্যাপকের পুতিগন্ধমাখা চাকরিচৌকি বা জারিজুরি লেখা নহে। একটা উদাহরণ দিলেই বোঝা যাইবে তালাল আসাদ এমনকি নোম চমস্কি কিম্বা এডোয়ার্ড সায়িদের মতন লিবারেলও নহেন। ‘ধর্মের কুলজি’ গ্রন্থের এক প্রবন্ধে তিনি অতি দক্ষতার সহিত সালমান রুশদির ‘শয়তানি পদাবলি’র পিছনে ব্রিটিশ লিবারেল মহলের সমর্থন যে বহুল পরিমাণে ছদ্মবেশী এসলামবিরোধী জঙ্গিবাদের আর মধ্যযুগীয় ধর্মযোদ্ধা মানসিকতার ফসল ছিল তাহা তুলিয়া ধরিয়াছেন।

গত বছর (মানে ২০০৬ সালে) মার্কিন দেশের কালিফোর্নিয়া রাজ্যের অন্তর্গত আরবিং শহরের এক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তালাল আসাদ তিনদিনব্যাপী যে অতিথি বক্তৃতা (ওয়েলেক লাইব্রেরি বক্তৃতা) দিয়াছিলেন তাহা সদ্য এই বছর ছাপা হইয়াছে। এই নিবন্ধে সেই প্রবন্ধ সমালোচনা করিব বলিয়া মনস্থির করিয়াছি।


তালাল আসাদ তাঁহার বক্তৃতামালা শুরু করিয়াছেন ইংরাজি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তারিখের ঘটনা বা দুর্যোগ হইতে। সারা জাহানের মুসলমান জনগণও—বিশেষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত সংখ্যালঘু মুসলমান সমাজের— কপালে এই ঘটনা আরো বড় দুর্যোগ আকারে হাজির হইয়াছে। কারণ এই দুর্যোগকে একদিকে দেখা হইতেছে সন্ত্রাসবাদের দৃষ্টান্ত হিসাবে। অন্যদিকে ইহার সহিত মুসলমান সমাজ কোন না কোনভাবে—শুদ্ধ ব্যক্তি আকারে নহে, আগাপাশতলা সমাজ হিসাবেই—জড়িত বলিয়া দোষারোপ করা হইতেছে। অনেকেই বলিয়াছেন সন্ত্রাসবাদ জিনিশটা খোদ এসলাম ধর্মের অন্তরেই প্রোথিত রহিয়াছে। অর্থাৎ ইহা এসলামের স্বভাবের মধ্যেই পাওয়া যায়। সুতরাং সন্ত্রাসবাদের হাত হইতে রক্ষা পাইতে হইলে এই অশুদ্ধ এসলাম ধর্মকে শুদ্ধ করিতে হইবে। এই শুদ্ধি অভিযানের দায়িত্ব—পাশ্চাত্য জগতের পক্ষে—লইয়াছে বর্তমান দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ শক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অথবা তাহার তাঁবেদার মিত্রশক্তিপুঞ্জ দুনিয়ার যে এলাকাকে তাহারা পয়লা ‘মধ্যপ্রাচ্য’ নাম দিয়াছেন সেই এলাকায় কম করিয়া বলিলেও চারিটি যুদ্ধ শুরু করিয়াছেন—একটি আফগানিস্তানে, একটি এরাকে আর দুইটির মধ্যে ফিলিস্তিনের গাজা জেলায় ও লেবাননে একটি করিয়া। বলা হইয়াছে ঐ সকল দেশের জনসাধারণকে রক্ষা করাই এই সকল যুদ্ধের লক্ষ্য। কিন্তু তালাল আসাদ দেখাইতে চাহেন আসল লক্ষ্য তাহা নহে, ‘অন্য কিছ’ু। এই ‘অন্য কিছু’ অন্যকিছুই নহে, শুদ্ধ এসলাম ধর্মের শুদ্ধি বা সংস্কারকর্ম। এই লক্ষ্যেরও আবার লক্ষ্য আছে । আর তাহা হইতেছে পাশ্চাত্যের মনোমত প্রজাসমাজ ও প্রজারাষ্ট্র গড়িয়া তোলা। ইহার লক্ষ্য অন্য ধরনের অর্থাৎ অন্য বিশ্বাসের সমাজ ও মানুষকে আইন করিয়া নিষিদ্ধ করা।

এই ধরনের লক্ষ্য অর্জন করিতে এয়ুরোপ ও আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রকে ভাবের ঘরে কয়েক দফা চুরির আশ্রয় লইতে হইয়াছে। তালাল আসাদ তাহার কয়েকটি এক্ষণে পরিষ্কার দেখাইয়া দিতে পারিয়াছেন।

এয়ুরোপ ও মার্কিন দেশ এই সমস্ত যুদ্ধ শুরু করিয়াছে সন্ত্রাসবাদ দমন করিবার অজুহাতে। যদি তাহা সত্য হইয়া থাকে তবে তাহাদিগকে দেখাইতে হইবে যুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদের মধ্যে প্রভেদ আছে। শুদ্ধ প্রভেদ থাকিলেই চলিবে না, দেখাইতে হইবে ইহাদের ঘোষিত যুদ্ধ জিনিশটা ন্যায়সংগত হইলেও বিরোধিপক্ষের সন্ত্রাসবাদ ন্যায়সংগত নহে। ইহার তাৎপর্য সুতরাং এই যে যুদ্ধের অধিকার প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র ও শক্তির আছে। কিন্তু সন্ত্রাসের অধিকার বলিয়া কোন অধিকার কাহারও থাকিতে পারে না।

ইহাতে কিন্তু একটি সমস্যা হাজির হয়। যুদ্ধের অধিকার যাহারা রাখেন তাহাদিগের ঘাড়ে যুদ্ধকে যুদ্ধ হিসাবে পরিচালনা করার দায় পড়ে। তাহাদের যুদ্ধ যেন সন্ত্রাসবাদের সমতুল্য বা তাহার চেয়েও মন্দ বস্তু না হইয়া ওঠে তাহা দেখিতে হইবে। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে হইতেছে কি?

সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধবাদের প্রধান অভিযোগ সন্ত্রাসবাদীরা অকারণে, বিনাদোষে বা নির্বিচারে মানুষ হত্যা করিয়া থাকে। উদ্দেশ্য নিজেদের রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক লক্ষ্য হাসিল করা। নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ বা যুদ্ধবন্দি হত্যা—বর্তমান পাশ্চাত্য জগত সমর্থিত আইনের বিধান অনুসারেও—যুদ্ধাপরাধের অন্তর্ভুক্ত। এহেন অপরাধ সচরাচর সন্ত্রাসবাদীরাই ঘটাইয়া থাকে। তাই তাহারা নিন্দার্হ। কিন্তু তালাল আসাদ দেখাইতেছেন পাশ্চাত্যের যোদ্ধাবাহিনীও তো একই অপরাধ আকছার করিয়া বেড়াইতেছে। তাহা সত্য হইলে পরাশক্তিগণের যুক্তির তলায় মৃত্তিকাটা থাকিতেছে কোথায়? তাহারা নিন্দার পাত্র হইবেন না কেন?

পাশ্চাত্য জগতের পক্ষ হইতেও বলা হয় লেবাননে কি গাজায়, এরাকে কি আফগানিস্তানে নিরপরাধ লোক মারা যাইতেছে কথাটি মিথ্যা নহে। কিন্তু না মারিয়া উপায় নাই। শাদাদিল মানুষের এই অভিযানের লক্ষ্য বৃহত্তর। অসীম স্বাধীনতা আর অপরিসীম ন্যায়। সেই বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জন করিতে হইলে ‘কোল্যাটারেল ড্যামেজ’ বা আনুষঙ্গিক ক্ষয়ক্ষতি হিসাবে এইটুকু কসুর তো সহ্য করিতেই হইবে। তাহা হইলে প্রশ্ন উঠিতেছে: যুদ্ধাপরাধের সহিত আনুষঙ্গিক ক্ষয়ক্ষতির প্রভেদটা কোথায়?

এই প্রশ্নের উত্তরে পাশ্চাত্যের অভিজ্ঞ উকিল ও পণ্ডিতগণ বলিতেছেন—প্রভেদ আছে তবে তাহা উপায়ে নহে, উদ্দেশ্যে। অর্থাৎ তাঁহারা স্বীকার করিয়া লইতেছেন নির্বিকার হত্যা শুদ্ধ সন্ত্রাসবাদীরাই করে না, ন্যায়সংগত যুদ্ধের কারবারীরাও করেন। সুতরাং নির্বিচার হত্যা করে বলিয়াই সন্ত্রাসবাদীরা খারাপ—ইহা বলা যাইতেছে না। তাহা হইলে নির্বিচার হত্যা খারাপ হইল কেন? খারাপ হইবার কারণটা লুকাইয়া আছে হত্যাকারীদের উদ্দেশ্যের মধ্যেই। পাশ্চাত্য জগত যেহেতু পৃথিবীতে শান্তি ও ন্যায়ের রাজ্য কায়েম করিতে বদ্ধপরিকর—অর্থাৎ যেহেতু তাহাদের উদ্দেশ্য ভাল, তাই তাহারা নির্বিচারে হত্যা করিলেও অন্যায় হইতেছে না। বড় ন্যায় ছোট্ট (ও মাঝারি) ন্যায়কে শুদ্ধ কাছেই টানে না, মাঝে মাঝে দূরেও ঠেলিয়া দেয়।

সন্ত্রাসবাদীরা যেহেতু বড় ন্যায়ের নাগাল পায় নাই, সুতরাং তাহাদের নির্বিচার হত্যা—মায় আত্মহত্যা অবধি—অন্যায়জনক। তালাল আসাদ দেখাইতেছেন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে এই যুক্তি ধোপে টিকিবার যোগ্য নহে। টিকিলে পাশ্চাত্যের যুুক্তি পর্যন্ত বর্ণের কলুষযুক্ত বিবর্ণ হইবার আশংকা থাকিয়া যায়।


পাশ্চাত্য পণ্ডিতরা সন্ত্রাসবাদের সহিত ন্যায়যুদ্ধের পার্থক্য আরো এক জায়গায় প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। তাঁহারা বলিয়াছেন নির্বিচার হত্যা করিয়া সন্ত্রাসবাদী তো বিবেকের কামড় অনুভব করে না। অথচ ন্যায়যোদ্ধা তাহা করে। ন্যায়যোদ্ধা জানেন নিরীহ লোক হত্যা অন্যায়। কিন্তু তাহা না করিয়া উপায় থাকে না বলিয়াই তাহারা নির্বিচারে লোক মারিতে বাধ্য হন। বাধ্য হইলেও এই বাবদ তাঁহারা সত্য সত্য অনুতাপ বোধ করেন। তাঁহারা জানেন যাহা করিতে তাঁহারা বাধ্য হইয়াছেন, তাহা অন্যায়কর্ম। এহেন কর্ম শুদ্ধ অনন্যোপায় অবস্থায় করা যায়।

তালাল আসাদ প্রশ্ন উঠাইয়াছেন—অনন্যোপায় যে হইলাম তাহা নির্ণয় করিবে কে? উপায়ের তো কখনও শেষ নাই। কোন উপায় শেষ উপায় তাহা কে বলিবে? পররাজ্য দখল করিতে গিয়া যদি দেখি পানিতে বিষ মিশাইয়া দিলে সহজেই শত্র“ সংহার করা যাইবে—নইলে পররাজ্যটি দখল করার কোন উপায় থাকিতেছে না—তখন আমি তো অনন্যোপায় হইলাম। অতয়েব মাখ বিষ। পাশ্চাত্য ন্যায়ের যুক্তিতে দেখা যায় ইহাও সিদ্ধ ।

তালাল আসাদ বলিতেছেন যাহাদিগকে সন্ত্রাসবাদী বলা হইতেছে তাহাদের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগও তো ইহাই। তাঁহারা নিরস্ত্রদের আক্রমণ করেন যেন অস্ত্রধারী কর্তৃপক্ষ চাপে পড়িয়া নতি স্বীকার করে। আর ন্যায়যোদ্ধারাও যদি একই কাজই করেন তো প্রভেদটা থাকিতেছে কই! সন্ত্রাসবাদীরাও বলে অন্য উপায় থাকিলে তাহারা সন্ত্রাস করিতেন না। তাহাদের এই দাবির সমর্থন পাওয়া যায় জাতিসংঘের অন্যতম সংস্থা আন্তর্জাতিক আদালতের সিদ্ধান্তে। নিরুপায় হইলে বা অনন্যোপায় হইলে প্রত্যেক সার্বভৌম রাষ্ট্রের ‘পরমাণু বোমা’ ব্যবহার করিবার অধিকার আছে। এই কথা ঐ আদালতের সিদ্ধান্তে পাওয়া যায়। তালাল আসাদ তাহা উল্লেখ করিয়া বলিতেছেন: ইহা কি মনুষ্যজাতির আত্মহত্যা অধিকার স্বীকার করিবার সমতুল্য যুক্তি নহে? পরমাণু বোমার আবিষ্কার ও ব্যবহার মনুষ্যজাতির সম্মিলিত আত্মহত্যার পক্ষে যাত্রা বৈ কি!

তালাল বইআর একটি যুক্তিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ বিষয়ক আদালত কিন্তু সন্ত্রাসবাদকে (যাহা রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হয়) দণ্ডনীয় অপরাধ বলিতে রাজি হয় নাই। ভারত, তুরস্ক ও শ্রীলংকা প্রভৃতি বহুজাতিক রাষ্ট্রের দাবি ছিল যে সকল জাতীয় মুক্তি আন্দোলন সশস্ত্র আন্দোলন বা অন্য ভাষায় সন্ত্রাসকে কৌশল হিসাবে ব্যবহার করিতেছে তাহাদিগকে বলা হউক এই ধরনের সন্ত্রাস দণ্ডনীয় অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে। এই আবদার এখনও আইনের মর্যাদা পায় নাই। কারণ তথাকথিত সন্ত্রাসবাদ দাবি করিতেছে তাহারাও যুদ্ধই করিতেছেন। আমরা তো দেখিলামই প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের ন্যায়যোদ্ধারাও অনেক সময় একই রকম সন্ত্রাসবাদের আশ্রয় লইয়া থাকেন। নির্বিচারে বেসামরিক নাগরিক হত্যা করিবার পক্ষে তাহারা যুক্তি দেখান এহেন হত্যা না করিলে আরও মূল্যবান আরও অধিক প্রাণ নষ্ট হইত। তাহা হইলে সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা নির্ণয় করা কঠিন এই কথা মানিতে হয়।


তালাল আসাদের আরও একটি যুক্তি যুৎসই হইয়াছে। তিনি বলিতেছেন সন্ত্রাসবাদের কেচো খুড়িতে গিয়া সভ্যতার সাপ বাহির হইয়া আসিতেছে। ২০০১ সালের অনেক আগে হইতেই আধা ইংরেজ আধা মার্কিন প্রাচ্য বিশারদ বার্নার্ড লুইস প্রমুখ পণ্ডিত ‘সভ্যতার সহিত সভ্যতার সংঘর্ষ’ প্রভৃতি আওয়াজ তুলিয়াছিলেন। স্যার বিদিয়াধর সূরযপ্রসাদ নাইপলের মতো জনপ্রিয় লেখক আর সামুয়েল হান্টিংটন প্রমুখ প্রচারক তাহাই বাজারে ছাড়িয়া জোর লাভবান হইয়াছেন। আসাদ দেখাইতেছেন—‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ মানে ‘সভ্যতার সহিত সভ্যতার সংঘর্ষ’ নহে, ইহা প্রকৃত প্রস্তাবে অসভ্যতার বিরুদ্ধে সভ্যতার যুদ্ধ মাত্র। উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক যুদ্ধেও একই যুক্তিই দেখান হইত।

এসলাম ধর্মের অন্তরে সন্ত্রাসবাদ জন্মসূত্রে গৃহিত বলিয়া যাহা প্রচারিত হইয়াছে তাহার অর্থ এই যে এসলাম ধর্ম অন্তর্গত বিষাদেই সভ্যতার পরিপন্থী। সুতরাং নিজেকে আমূল সংস্কার না করিলে সভ্য জগতে তাহার জায়গা নাই। পাশ্চাত্যের এই নগ্ন প্রচারের অতি উৎসাহে আর আতিশয্যে আরো ভয়ানক প্রমাদ আছে। তালাল আসাদ প্রমাণ করিয়াছেন আত্মঘাতী বোমা বা আদমবোমা এসলাম ধর্মের অন্তরে প্রোথিত চিরস্থায়ী সত্য নহে। অর্থাৎ ইহাকে ঈমানের সহিত সমান মর্যাদা দেওয়া যাইবে না। ইহা শুদ্ধ ইতিহাসের বিশেষ পর্যায়ের বা পরাধীন মুসলমান সমাজের পরাধীনতার প্রকাশ মাত্র। অর্থাৎ পরাধীনতা দূর হইলে আদমবোমাও ফরাসি কি মার্কিনদেশে বীমা করিয়া প্রদর্শনীতে পাঠানো সম্ভব হইলেও হইতে পারে।

রবার্ট পেপ নামক জনৈক পশ্চিমা রাষ্ট্রপণ্ডিত গণিয়া দেখিয়াছেন ২০০১ সালের আগের ২২ বছরের মধ্যে—অর্থাৎ ১৯৮০ হইতে ২০০১ সালের ভিতর—তামাম দুনিয়ায় ১৮৮টি মতো সাধারণ আদম ওরফে আত্মঘাতী বোমা ফাটিয়াছে। নানান দেশের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীঘটিত আত্মঘাতী বোমার হিসাবটা ইহার মধ্যে ধরা হয় নাই। পেপ সাহেব দেখাইতেছেন এই দ্বাবিংশ বৎসর পর্বে গণিত ১৮৮টি আদমবোমার মধ্যে গোটা ৭৫টিই ফাটাইয়াছেন শ্রীলংকার ‘তামিল ব্যাঘ্রকুল’ ওরফে ‘তামিল টাইগার্স’ দল—ইঁহারা জাতে তামিল, তালে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আর ধর্মে হিন্দু বলিয়া প্রকাশ। (আসাদ ২০০৭: ৫৪) ইহাতে প্রমাণ এই বিষয়ে এসলাম ধর্মের কোন একচেটিয়া অধিকার নাই। পশ্চিমা পণ্ডিতগণ এই সত্য হজম করিবেন কী উপায়ে?

তালাল আসাদ প্রমাণ করিয়াছেন, আদমবোমা শুদ্ধ মুসলমানরাই ফাটায় না, অন্য ধর্মাবলম্বীরাও ফাটাইতে পারেন। আর এসলাম ধর্মও এমন কথা বলে নাই যে সকল যুগে সকল দেশে এই জাতীয় বোমা বানাইতে কি ফাটাইতে হইবেই। না বানাইলে বা না ফাটাইলে ধর্মই থাকিবে না এমন কথা সকল মুসলমানের ধর্মবিশ্বাসের অঙ্গও নয়। তবুও আজকাল এই এসলাম বিরোধী প্রচার যুদ্ধ জোরদার হইতেছে। কিন্তু কেন? তাহার কারণ খুঁজিতে হইবে ইতিহাসে।

তালাল আসাদ মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে যে অসম যুদ্ধ চলিতেছে তাহা কলাকৌশলে নবীন হইলেও চরিত্রে হুবহু আগেকার যুগের ঔপনিবেশিক বা পররাজ্যলোভী দখলদারী যুদ্ধেরই নতুন সংস্করণ। যদি তাহাই হয় তবে পশ্চিমের যুদ্ধ ‘সভ্যতার সহিত সভ্যতার যুদ্ধ’ নয়—অসভ্যতার সহিত সভ্যতার যুদ্ধ মাত্র। ইহারই অপর নাম বর্ণবাদ।

তালাল আসাদ রচিত ‘আদমবোমা’ পড়িলে সেই বর্ণপরিচয় গাঢ় হয়। তালাল দেখাইতেছেন পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ বর্ণবাদী বলিয়াই তাহারা পশ্চিমের সাথে যুদ্ধে পরাজিত সকল অপশ্চিমা জাতিকে ‘অসভ্য’ বা জংলি বলিয়া গালি দেয়। তাহারা বলেন অসভ্য জাতির যোদ্ধারা নিঠুর, দয়ামায়া কথাটি উহাদের অভিধানে নাই। তাই তাহাদের প্রতি দয়া দেখাইবার প্রশ্নই ওঠে না। আসাদ বলিয়াছেন পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যাধিপতিরা যেভাবে নানান যুদ্ধাপরাধ যেমন নির্বিচার হত্যা, বন্দি নির্যাতন ও এমনকি অসামরিক গণহত্যাকেও মানবদরদী কর্মের উদাহরণ বলিয়া চালাইয়া দিতেছেন তাহার তুল্য কোন যুক্তি তথাকথিত অসভ্য জাতিগোষ্ঠী কোনদিনও দেখাইতে পারে নাই। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ যে নিঃসন্দেহে সভ্য ইহাতে তাহাই প্রমাণিত হয়।

তাই তালাল আসাদ বলিতেছেন আসল প্রশ্ন অন্য জায়গায়। মানুষ আত্মহত্যার মতো ন্যক্কারজনক কাজ করে কেন? আসল প্রশ্ন ইহা নহে। আত্মহত্যার দৃশ্য দেখিয়া জ্যান্ত মানুষজন কী বলে, কী করে তাহাই আসল কথা।

ফিলিস্তিনের আত্মঘাতী বোমা পশ্চিমে যত আলোড়ন তোলে শ্রীলংকার বোমা তত তোলে না কেন? আপন ও পর এখানে সবল হইয়া আসে। তাহা ছাড়াও কথা আছে। খ্রিস্টধর্মের তত্ত্ব সন্ধান করিয়া আসাদ দেখাইয়াছেন আত্মত্যাগ, রক্তপাত ও হত্যাকাণ্ডের ধর্মবোধ মধ্যযুগের উত্তরাধিকার হিসাবেই এ যুগের ঘাড়ে চাপিয়া বসিয়াছে।

তালাল আসাদ বলিতে চাহেন বর্তমান দুনিয়ার সংঘর্ষ আদপেই সভ্যতার সহিত সভ্যতার সংঘাত নহে। কারণ পরস্পরের প্রভাবমুক্ত বিশুদ্ধ কোন সভ্যতাই নাই। সংঘাত কিছু যদি থাকিয়া থাকে তাহা প্রতিটি সভ্যতার ভিতরেই আছে। মুসলমান সমাজও এই সংঘাতমুক্ত নহে। এই সমাজেও আসাদ বলিতেছেন আধুনিক লিবারেল বনাম অন্ধবিশ্বাসীর সংঘাত আছে। তিনি না বলিলেও আমরা বুঝিতে পারি শাসক ও পীড়িতের সংঘর্ষ হইতে মুসলমান সমাজও নিস্তার পায় নাই।

তবে তালালের জোরটা পড়িয়াছে খোদ আধুনিক সভ্যতার ঝাণ্ডাধারীর উপর। তাঁহার বিচারে আধুনিক সভ্যতাও ‘সভ্যতা ও অসভ্যতার সংঘাত’ হইতে মুক্ত হয় নাই। আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার, তাহার গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার গোড়ায় ছিল তথাকথিত অসভ্য জাতির উচ্ছেদ অথবা পরাধীনাবস্থা। এই কথা একদা বলিয়াছিলেন জার্মান মনীষী ম্যাক্স ব্হেবার। তালাল আসাদ তাঁহার সহিত একমত হইয়াছেন।

আজ অবস্থার পরিবর্তন হইয়াছে। আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতার গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার গোড়ায় হাত পড়িয়াছে। আজ সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘দেশপ্রেমিক আইন’ পাশ হইয়াছে। অনেকেই মনে করেন ইহা সেই দেশের নাগরিক স্বাধীনতায় কিঞ্চিৎ বিয়োগ কিম্বা ভাগ বসাইয়াছে। আসাদও মনে করেন ইহা পশ্চিমের সমাজ যে অসুখে পড়িয়াছে তাহার সামান্য লক্ষণ বৈ নহে। আপন অন্দরের এই সংঘর্ষকে পশ্চিমা সমাজের রক্ষণভাগের খেলোয়াড়গণ ‘সভ্যতার সহিত সভ্যতার সংঘাত’ নাম দিয়াছেন। আজ তাহাদের সভ্যতা বাণিজ্য ও সমর বিশেষ হইয়াছে। সংকটের নিদান পাইবেন মনে করিয়া অদূরদর্শী নেতারা কাল্পনিক এসলামের বিরুদ্ধে অন্তহীন ক্রুসেড পরিচালনা করিতেছেন।

অতীতের ক্রুসেড যেমন হয় নাই এই ক্রুসেডও তেমন সফল হইবে না। তাহার আগেই সভ্যতার হৃদয় বিদারক কাণ্ড ঘটিবে। কারণ আজ পর্যন্ত যত মানব সমাজ দেখা গিয়াছে তাহাদের সকলের ইতিহাসই শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস।

দোহাই
১. Talal Asad, On Suicide Bombing, New York: Columbia University Prees, 2007.
২. ——, ed. Anthropology and the Colonial Encounter, 5th Printing Atlantic Highlands, NJ.: Humanities Press, 1990 [1973].
৩. ——, Genealogies of Religion: Discipline and Reasons of Power in Chistianity and Islam, Baltimore: The Johns Hopkins University Press, 1993.
৪. ——, Formations of the Secular: Christianity, Islam, Modernity, Stanford: Stanford University Press, 2003.

বিডিনিউজ, আর্টস, ৮ নভেম্বর ২০০৭

 

(আদমবোমা গ্রন্থে পরিমার্জিত পুনর্মুদ্রণ প্রকাশ পাইয়াছে)

মুক্তির গান

যে যুদ্ধ করেছিল সে মুক্তিযোদ্ধা
যে যুদ্ধ করে নাই সেও মুক্তিযোদ্ধা

ওসমানির কাগজ পেয়েছিল যে সে মুক্তিযোদ্ধা
যে সই দিয়েছিল নিজের কাগজে সেও মুক্তিযোদ্ধা

যে ভেবেছিল যুদ্ধ হবে দীর্ঘস্থায়ী সে মুক্তিযোদ্ধা
আমেরিকা এসে যাবে ধরে নিয়েছিল যে সেও মুক্তিযোদ্ধা

এক পাও উড়ে দেছে যার কামালপুরে সে মুক্তিযোদ্ধা
খঞ্জের গলায় কষেছে ফাঁসির রজ্জু যে সেও মুক্তিযোদ্ধা

নয় মাস দৈনিক লিখেছে পাকিস্তানে যে সে মুক্তিযোদ্ধা
রায়ের বাজার গড়ে লাশের পরে লাশ ফেলেছে যে সেও মুক্তিযোদ্ধা

শুনি বাংলাদেশ (ব্রিটিশ) তামাক কোম্পানি
সিঙ্গার সেলাইকল সত্যি শুনি বিশ্বব্যাংক সেও মুক্তিযোদ্ধা

একদিন নিশ্চয় শুনব জেনারেল এহিয়া
ছিল ছদ্মবেশে সেও মুক্তিযোদ্ধা

আমি আর বিস্মিত হব না

 

মার্চ ১৯৯৫

কংকরবোমা : ফ্রয়েড, এডোয়ার্ড সায়িদ ও এয়ুরোপের বিজাতি

ইংরেজি ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ খ্যাতনামা পণ্ডিত এডোয়ার্ড সায়িদ এন্তেকাল করিয়াছেন—এই কথা সকলেই জানেন। কিন্তু সকলেই জানেন কিনা আমি জানি না, তিনি ২০০১ সালে লন্ডনে ‘ফ্রয়েড ও এয়ুরোপের বিজাতি’ নামে একপ্রস্ত বক্তৃতা করিয়াছিলেন। ২০০৩ সাল নাগাদ তাঁহার সেই বক্তৃতা প্রকাশিত হইয়াছিল। এতদিনে পাতলা কাগজের মোড়কে আরও এক সংস্করণ বাহিরে আসিয়াছে। আমার সহৃদয় সুহৃদ আসাদুল (প্রকাশ শিশির) করিম লন্ডন হইতে আমার নিকট উপহারস্বরূপ একখণ্ড বহি পাঠাইয়াছেন। তাহাও এক বছরের কথা। বইপত্রের আলোচনা লিখিয়া আমি আংশিক জীবিকা নির্বাহ করিয়া থাকি। কিন্তু কে ছাপাইবে এই জাতীয় লেখা? বন্ধুবর ব্রাত্য রাইসু আমাকে সেই সুযোগ দিয়াছেন। ধন্যবাদ জানাইয়া তাহাকে বড় করিতে চাহি।

এই বক্তৃতায় এডোয়ার্ড সায়িদ বলিতে চাহিয়াছেন, মহাত্মা ফ্রয়েড এয়াহুদি বংশের সন্তান হইলেও নিজেকে এয়ুরোপকই মনে করিতেন। তবে এয়াহুদি পরিচয়ও তিনি কদাচ অস্বীকার করেন নাই। ১৯৩০ সালের পর এয়ুরোপ মহাদেশে এয়াহুদি বিরোধী আন্দোলন মাথাচাড়া দিয়া উঠিবার বহু আগেই এয়ুরোপ হইতে এয়াহুদিদের তাড়াইয়া দিয়া অন্য কোথাও উপনিবিষ্ট করিবার পরামর্শ দানা বাঁধিতেছিল। এয়াহুদি জাতির মধ্যে যাহারা ফিলিস্তিনে নতুন এয়াহুদি রাজ্য সংস্থাপনের কল্পনায় উত্তেজনা পাইয়াছিলেন তাহাদিগকে সচরাচর জায়নিস্ট বা ‘জায়নপথিক’ বলা হইয়া থাকে। শহর জেরুসালেমে এই নামের একটি পাহাড় আছে। জায়ন কথাটি তাহার নাম হইতেই আসিয়াছে।

টিওডর হার্তসল নামক এক বিশিষ্ট সাংবাদিক এই জায়ন বা এয়াহুদি রাজ্য আন্দোলনের নেতা বনিয়া গেলেন। তিনি দাবি উঠাইলেন প্রস্তাবিত অখিল এয়াহুদি রাজ্যটি ফিলিস্তিনেই বসাইতে হইবে। ইহার আগে, বিশেষ ১৯ শতকের শেষভাগে, দক্ষিণ আমেরিকার আর্হেন্তিনা কিম্বা আফ্রিকার কোন নির্দিষ্ট এলাকায় এই রাষ্ট্র গড়ার প্রস্তাবও উঠিয়াছিল।

আমরা জানি ১৯১৪ হইতে ১৯১৮ সালের যুদ্ধ শেষ হইবার আগে ফিলিস্তিন অঞ্চল তুরস্কের ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের তাঁবে ছিল। তখনই এয়ুরোপের এয়াহুদি নেতারা অল্প অল্প জায়গাজমি কিনিয়া ফিলিস্তিনে এয়াহুদি বসতিবিস্তারের সূচনা করেন। আমাদের কালের ইতিহাসবিজ্ঞরা প্রত্যক্ষ করিতেছেন এই নতুন অভিবাসন বা হিজরত প্রক্রিয়ার শুভ সূচনা ঘটে ১৮৭০ সালের পরের কোন এক সময়ে। ১৯১৪-১৮ সালের যুদ্ধ, যাহা সচরাচর প্রথম মহাযুদ্ধ নামে কথিত আছে, ঘটিবার পর তুরস্কের পরাজয়সূত্রে ফিলিস্তিন রাজ্যও ইংরেজ সাম্রাজ্যের অধীনে চলিয়া যায়। যুদ্ধ চলিবার সময়ই এয়ুরোপের এয়াহুদি নেতাগণের নেতা ধনকুবের মহাত্মা রথশিল্ড বরাবর ইংরেজ রাষ্ট্রনেতা বালফুর মহাশয় সেই বিখ্যাত ঘোষণা পাঠাইয়াছিলেন যাহাতে ওয়াদা দেওয়া হইয়াছিল ফিলিস্তিনে এয়াহুদি জাতির জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠায় ব্রিটিশ সরকার সহায় হইবেন। ১৯৪৮ সালের মধ্যে ঐ ওয়াদামাফিক সেই সহায়তাই করা হইল। ততদিনে ফিলিস্তিনে সংখ্যাগরিষ্ঠ না হইলে কি হইবে, এয়ুরোপ হইতে অপর্যাপ্ত জনসংখ্যা আমদানিপূর্বক শ্রেষ্ঠ শক্তি বনিল এয়াহুদি জাতি। এসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হইল।

আজ প্রায় ষাট বৎসর হইতে চলিল পশ্চিমের বলবান জাতিপুঞ্জের সর্বাত্মক সমর্থন ও সহযোগিতা পাইয়া এসরায়েল রাষ্ট্র বিরাজমান রহিয়াছে। এই রাষ্ট্র গঠিত হইয়াছে শুদ্ধ এয়াহুদি জাতির বাসভূমি আকারে। দুনিয়ার যে কোন দেশের এয়াহুদি ব্যক্তিকে সহজেই ইহার নাগরিক করা হইতেছে। অথচ এমন একদিন ছিল (ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের যুগে বা তাহার পর যে ব্রিটিশ যুগ কাটিল তাহাতেও) যখন ফিলিস্তিন দেশটিতে আরব মুসলমান, আরব এয়াহুদি ও আরব খ্রিস্টানগণ একসঙ্গেই বসবাস করিতেন। এখন সেই অবস্থা আর নাই।

মহাত্মা এডোয়ার্ড সায়িদ নিজেও খ্রিস্টান মাতাপিতার সন্তান। তিনি বিশ্বাস করিতেন বিশুদ্ধ এয়াহুদি রাষ্ট্র এসরায়েল সমস্যার কোন সমাধান করে নাই। বরং নতুন সমস্যার সৃষ্টি করিয়াছে। ‘ফিলিস্তিন সমস্যা’ বলিয়া যাহা পরিচিত তাহা সায়িদের বিচারে আদৌ ‘ফিলিস্তিন সমস্যা’ নয়, আসলে ইহা এসরায়েল সমস্যার অন্য নাম মাত্র। তাহা হইলে ইহার সমাধান কী? সমাধান স্বাধীন, ধর্মনিরপেক্ষ, বহুজাতীয় বা নিদেনপক্ষে (আরব ও এয়াহুদি এই দুই জাতি ধরিয়া বলিলে) একটি দ্বিজাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নিহিত। কিন্তু আজ প্রবল প্রতাপযুক্ত পশ্চিমা সাম্রাজ্যের সমর্থনধন্য জায়নপথিকগণ এই ধর্মের কাহিনি শুনিবেন কোন দুঃখে?

এই বিশ্বাসের সমর্থনে আমাদের হাতের ছোট্ট বহিটির মধ্যবর্তিতায় মনীষী এডোয়ার্ড সায়িদ একপ্রস্ত অতিরিক্ত যুক্তি দেখাইলেন। জীবনের শেষ বছরে মহাত্মা জিকমুন্ট ফ্রয়েড ‘হজরত মুসা ও একেশ্বরবাদ’ নাম দিয়া একটি নাতিবৃহৎ বহি বাহির করিয়াছিলেন। ঐ বহির প্রস্তাব অনুসারে হজরত মুসা এয়াহুদি জাতির বহুকীর্তিত একেশ্বর-বিশ্বাসের প্রবর্তক। এই একেশ্বরবাদ জিনিশটি সেকালের মিশরদেশ হইতে আনিয়া এয়াহুদি জাতির মধ্যে প্রবর্তন করিয়াছিলেন তিনিই। সঠিক বলিতে হইলে বলিতে হয় হজরত মুসা নিজে মোটেও এয়াহুদি ছিলেন না, ছিলেন ফেরায়ুনের দেশ মিশরের লোক। তিনি এয়াহুদি ছিলেন না অথচ এয়াহুদিদের প্রধান কীর্তি ঈশ্বরোপাসনায় এককেন্দ্রিকতার জারি করিয়াছিলেন তিনিই।

মহাত্মা ফ্রয়েড বলিয়াছেন, এই সত্য সত্য হইলে বলিতে হইবে এই দুনিয়ায় জাতিগত শুদ্ধতা বা রক্তের বিশুদ্ধতা বলিয়া কিছুই নাই। এয়াহুদি জাতির উপাস্য যে ঈশ্বর হিব্রূভাষায় যাহার নাম দাঁড়াইয়াছে ‘এয়াহবে’ তিনিও জন্মসূত্রে এয়াহুদি নহেন, আরব। আরব্য ঈশ্বর আর মিশরিয়া নবী এই হইতেছে, ফ্রয়েড দেখাইয়া দিতেছেন, এয়াহুদি জাতির ইতিকথা। ইহার সহিত সায়িদ যোগ করিলেন, এয়াহুদি জাতির একমাত্র আশা এই ইতিহাসেই। ইহা যদি সত্য হয় তো সওয়াল উঠিতেছে: বিশুদ্ধ এয়াহুদি জাতির লোক লইয়া এসরায়েল রাষ্ট্র গড়িবার গোড়ার মাটিটা থাকিতেছে কোথায়?

বর্তমানে কে না জানে ফিলিস্তিনদেশে মুসলমান-খ্রিস্টান নির্বিশেষে সকল জাতির শিশু ও কিশোর, যুবা ও বৃদ্ধ ছোট ছোট কংকর হাতে লড়াই করিতেছে বন্দুক, ট্যাংক ও যুদ্ধংদেহি উড়োজাহাজের সঙ্গে। এসরায়েল বসাইয়াছে পাথরের দেওয়াল। এয়াহুদি জাতি ও আরব জাতির বসতি আলাদা করিতে হইবে, ইহাই এই দেওয়াল রচনার ভিত। ফিলিস্তিনি কংকর এই দেওয়াল ভাঙিয়া মতিচুর বা মিহিদানা বানাইবার প্রস্তাব, কথাটি বলিয়াছেন এডোয়ার্ড সায়িদ নিজে নহেন, বরং খ্রিস্টোফার বোলাম নামক একজন এয়ুরোপক বুদ্ধিজীবী। ইনি এডোয়ার্ড সায়িদের বইয়ের ভূমিকা লিখিয়াছেন।

বইয়ের উপসংহার লিখিয়াছেন লন্ডনের খ্যাতনাম্নী অধ্যাপিকা জ্যাকুলিন রোজ। মহিয়সী রোজ নিজেও এয়াহুদি জাতির সন্ততি। কিন্তু তিনি এসরায়েল রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ (বা আপার্টাইড) নীতি অনুমোদন করেন না। তিনি দুঃখ করিয়া বলিয়াছেন, ভিয়েনার ‘ফ্রয়েড প্রতিষ্ঠান ও জাদুঘর’ কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত সায়িদের বক্তৃতা বাতিল করিয়া বড় মাপের ভুল করিয়াছেন। বলা প্রয়োজন, ইঁহারাই অধ্যাপক সায়িদকে এই বক্তৃতা দিতে ডাকিয়াছিলেন । কিন্তু তাঁহাদের অজুহাত ছিল খুবই খোঁড়া। মুখে তাঁহারা বলিয়াছিলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণেই’ এই বাতিল ঘোষণা।

কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে তাঁহারা খেপিয়াছিলেন এডোয়ার্ড সায়িদের হাতে ধরা একটি কংকর দেখিয়া। এই ঘটনার উল্লেখ করিয়া আমি শেষ করিব। ২০০১ সালের মে মাসে ভিয়েনায় অনুষ্ঠেয় এই বক্তৃতার দাওয়াত সায়িদকে দেওয়া হয় প্রায় এক বছর আগেভাগে, মোতাবেক ২০০০ ঈসায়ি সালের জুলাই মাসে। দুর্ভাগ্যবশত পরবছর অর্থাৎ ২০০১ সালে, দিনমান বলিতে ৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে, এই দাওয়াত বাতিল করা হয়। কারণ আগের বছরের একটি ঘটনা ও সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া সৃষ্ট প্রচারণা।

এডোয়ার্ড সায়িদ ২০০০ সালের জুন-জুলাই মাসে সপরিবারে লেবাননে বেড়াইতে গিয়াছেন । জুলাই মাসের ৩ তারিখ নাগাদ লেবানন রাজ্যের দক্ষিণ সীমানায় পৌঁছিলেন তিনি। সেখানে ‘খিয়াম’ নামক জায়গায় একটি কুখ্যাত এসরায়েলি বন্দিশালা ছিল। ঐ শালায় কয়েক হাজার রাজনৈতিক বন্দিকে হত্যা করা হয়, নির্যাতন করা হয় আরো অনেক মানুষকে। ২০০০ সালে সেই জায়গা হইতে যুদ্ধের কারণে ঐ বন্দিশালা উঠিয়া গিয়াছে। সায়িদ ও সঙ্গের জোয়ান মানুষজন শূন্যস্থান লক্ষ্য করিয়া সেই দিকে কয়েকটি কংকর ছুঁড়িয়া মারিলেন। সেই শূন্যস্থানে তখন কোন মানুষজনই ছিল না। না সমর-সম্বন্ধীয় না অন্য ব্যবসা-সম্বন্ধীয়। দুইদিন পর এসরায়েলের পত্রপত্রিকা ও দূরদর্শনে সেই ছবি প্রচারিত হইয়া পশ্চিমে ছড়াইল। সায়িদের পরিচয় দাঁড়াইল ‘প্রস্তর নিক্ষেপরত ফিলিস্তিনি সন্ত্রাসবাদী’। অবশ্য তাঁহাকে অনেক আগেই ‘সন্ত্রাসের অধ্যাপক’ পুরস্কার দিয়াছিল এসরায়েলি আর পশ্চিমা প্রচার।

ভিয়েনার ‘ফ্রয়েড প্রতিষ্ঠান ও জাদুঘর’ সেই কারণেই এই বক্তৃতা বিয়োজন করিলেন। ভিয়েনা হইতে খোদ ফ্রয়েডও একবার লন্ডনে সর্বশেষ নির্বাসিত হইয়াছিলেন। ১৯৩৯ সালে সেখানেই তিনি এন্তেকাল করেন। হয়তো সেই স্মৃতি জিয়াইয়া রাখিবার মানসেই লন্ডনের ফ্রয়েড জাদুঘর একই কায়দায় ভিয়েনায় বিয়োজিত ফ্রয়েড বক্তৃতার আয়োজন শেষমেশ করিলেন খোদ মহানগর লন্ডনেই।

ফ্রয়েড বিপ্লবী রাজনীতি করিতেন এই অপবাদ তাঁহার চরম শত্রুও দিবেন না। এডোয়ার্ড সায়িদও শক্তি প্রয়োগ করিয়া শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় তাহা মনে করিতেন না। তাঁহার বক্তৃতায় যে সত্য প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে তাহা যে কোন কংকরের সহিত প্রতিযোগিতায় পর্যন্ত জিতিয়া যাইবে। এমনকি কোন কোন বোমার সহিতও ইহার তুলনা চলিবে। তবে এই বোমা মনে হইতেছে আত্মঘাতী হইবে না।

ঢাকা, ২/১০/২০০৭

দোহাই
1. Edward W. Said, Freud and the Non-European, reprint (London: Verso, 2004).
2. Edward W. Said, From Oslo to Iraq and the Road Map: Essays (New York: Pantheon Books, 2004).

বিডিনিউজ, আর্টস, ১৮ অক্টোবর ২০০৭

 

(আদমবোমা গ্রন্থে পরিমার্জিত পুনর্মুদ্রণ প্রকাশ পাইয়াছে)

নজরুল ইসলাম : ফররুখ আহমদের আবেহায়াত

‘ভারতের পশ্চিমপ্রান্তে মহাকবি ইকবাল অবশ্য অনেক আগেই সন্ধান দিয়েছিলেন আবেহায়াতের। তাঁর দেশকালজয়ী প্রতিভার সঙ্গে নজরুলের তুলনা করতে যাওয়া বাতুলতা।’

           -ফররুখ আহমদ (১৯৯৬: ৩২৭)

বাংলাদেশের জাতীয় সমাজে ফররুখ আহমদ মোটের উপর দুই ধারণার শিকার। কেহ কেহ একদা ধরিয়া লইয়াছিলেন ফররুখ আহমদ নজরুল ইসলামের উত্তরাধিকারী, কাহারও কাহারও মতে এমনকি অনুসারীও। কেহবা আবার মনে করেন, কবিতায় তিনি খোদ নজরুল ইসলামকেও ছাড়াইয়া গিয়াছিলেন। আরেক দল আছেন, মনে করেন, তুলনা বৃথা, নজরুল ইসলাম আর ফররুখ আহমদ দুই ভিন্ন মেরুর দুই জল অচল কবি। এদিকে যতদূর দেখিতেছি নজরুল ইসলামকে লইয়া খোদ ফররুখ আহমদ কি ভাবিতেন খুব কম বিচারকই তাহার বিচার করিয়াছেন। এই নিবন্ধে আমরা নজরুল ইসলাম প্রসঙ্গে ফররুখ আহমদের বিবেচনা পর্যালোচনা করিব। আমরা দেখিব, ফররুখ আহমদ নজরুল  ইসলামের সাক্ষাৎ নিজেকে অনেক বড় কবি মনে করিতেন। তাঁহার দ্বিতীয় সংস্কারের নাম ‘মহাকবি’ ইকবাল। অহং তেমন ছোট ছিল না বিধায় ফররুখ আহমদ মাঝে মাঝে ইকবালকে সামনে দাঁড় করাইয়া—নজরুল ইসলামকে ছোট কল্পনা করিয়া—তিনি আনন্দ পাইতেন।

সৈয়দ আলী আহসান বয়সে ফররুখ আহমদের কিছু কনিষ্ঠ আর চিন্তাভাবনায় বেশ ঘনিষ্ঠ ছিলেন। নজরুল ইসলাম প্রসঙ্গে এই দুইজনের বিচার-বিবেচনা পাঠ করিলেও মনে হয় দুই বিচারক যেন এক সারিতে বসিয়া বিচারকার্য সারিতেছেন। ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’ নামক কেতাবে—১৯৫৬ সালের কথা—সৈয়দ আলী আহসান যাহা লিখিয়াছিলেন তাহার সহিত ফররুখ আহমদের বক্তব্য তুলনা করিলে আমি কি বলিতে চাহিতেছি তাহা পরিষ্কার হয়। সৈয়দ আলী আহসান লিখিয়াছিলেন :

নজরুল ইসলামের সর্বপ্রধান বিশিষ্টতা হচ্ছে তাঁর সাময়িকতা। সাময়িক ঘটনা, সাময়িক জীবন, অথবা কোন সাময়িক আবেগকে অবলম্বন করে এত প্রচুর কবিতা তাঁর মত আর কেউ লিখতে পারেনি। এদিক থেকে ইংরেজ কবি কিপলিঙ্গের সঙ্গে তাঁর মিল আছে। কিপলিঙ্গ সম্পর্কে টি.এস. এলিয়ট বলেছেন যে কিপলিঙ্গ কাব্যক্ষেত্রে সাংবাদিকতাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন এবং অধিকাংশ মুহূর্তেই শিল্পায়ত্ত কবিতা লিখবার চেষ্টা করেননি। অথচ তাঁর এ সমস্ত সাময়িক কবিতাও আপন সাময়িকতা নিয়েই অত্যন্ত সজীব ও প্রাণবন্ত। নজরুল ইসলাম সম্পর্কেও নির্বিবাদে একথা বলা চলে। তিনি একই সঙ্গে কবিতা লিখেছেন, প্রচারমূলক প্রবন্ধ লিখেছেন এবং সংবাদপত্র পরিচালনা করেছেন। প্রেমের কবিতা যখন লিখেছেন তখনও এই সাময়িকতা তাঁর কাব্যে বিদ্যমান। (হাই ও আহসান ১৯৫৬ : ৩২০)

আলী আহসান আরো লিখিতেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ প্রবর্তিত স্নিগ্ধ শান্ত কাব্যধারার সঙ্গে এর সমন্বয় নেই বরং অসৌজন্য আছে বলা যেতে পারে। এর কিছুটা স্বাজাত্য বরং আছে মাইকেল মধুসূদন দত্তের বৈপ্লবিক আবেগের সঙ্গে। তবে মাইকেলের সঙ্গে পার্থক্য এখানে যে মাইকেলের বাণী যেখানে সমস্ত জীবন মথিত করে উৎসারিত হয়েছে—নজরুল ইসলামের বাণী সেখানে অত্যন্ত অগভীর। এর একমাত্র কারণ এই যে নজরুল ইসলামের মধ্যে স্থৈর্যের অভাব ছিল। গভীরভাবে জীবনকে উপলব্ধি করবার মত অন্তর্দৃষ্টি তাঁর ছিল না কিন্তু জীবনকে মুহূর্তে সচকিত করার আবেগ তাঁর ছিল। (হাই ও আহসান ১৯৫৬ : ৩১৯-২০)

সৈয়দ আলী আহসানের এই বাক্যগুলি কি অর্থ বহন করিতেছে আমি নিশ্চিত হইতে পারিলাম না। শুদ্ধ এইটুকু বুঝিলাম, নজরুল ইসলামের কবিতা তাঁহার মনে ধরে নাই। অন্তর্দৃষ্টি আর আবেগের প্রতিতুলনা প্রভৃতি দেখিলে একপ্রকার সম্ভ্রম জাগে কিন্তু সত্য বলিতে আলী আহসানের এই জাতীয় বক্তব্যে বিভ্রম ছাড়া আমার মনে অন্য কিছু জন্মায় নাই। কারণ আমরা দেখিয়াছি তাঁহার ঢের আগে কাজী আবদুল ওদুদ, বুদ্ধদেব বসু আর খানিক পরে ফররুখ আহমদও অবিকল একই কথা বলিতেছিলেন। সৈয়দ আলী আহসানের এই ছারখার ব্যবহারের কিছু আগে কবি আবদুল কাদির তত্ত্ব করিয়াছিলেন, নজরুল ইসলাম চিরকালের না হউন, বহুকালের কবি বটেন। কাদিরের জবানিতে : ‘বাংলা সাহিত্যে নজরুল ইসলামের আবির্ভাব এক বিস্ময়কর ব্যাপার। নজরুলের আবির্ভাব না হলে একালের বাঙ্গালি মুসলমানের সাহিত্য-সাধনার দিকে সমগ্র দেশের কৌতুহলী দৃষ্টি আকৃষ্ট হত কিনা সন্দেহ। অতীতে আলাওল আর একালে নজরুল—বাংলা সাহিত্যের মুসলিম ধারায় এই দুই দিকপাল—কালের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করেও তাঁদের কাব্যকীর্তি বহুকাল অম্লান থাকবে।’ (কাদির ১৩৫৪ : ৩০৭)

ফররুখ আহমদের জীবন প্রভাতেই নামকরা এক নিবন্ধে আবদুল কাদির লিখিয়াছিলেন, ফররুখ আহমদের উপর কোন ‘আধুনিক’ কবির প্রভাব থাকিয়া থাকে তো তিনি নজরুল ইসলাম। কাদির সঙ্গে সঙ্গে ইহাও দেখাইয়াছিলেন যে নজরুল ইসলাম ও ফররুখ আহমদের মধ্যে পার্থক্য বিস্তর এবং সে পার্থক্য মৌলিক। কাদিরের ধারণা, উভয় কবিই মুসলমানের পুনরুজ্জীবন কামনা করেন আর উভয়েই রোমান্টিক। ‘তবে’—তাঁহার বাক্যেই বলিতেছি— ‘নজরুল জাতীয় গণতান্ত্রিক কবি, আর ফররুখ আহমদ ধর্মবাদী (পাকিস্তানবাদী?) সমাজতান্ত্রিক।’ (কাদির ১৩৫৪)

‘ধর্মবাদী সমাজতান্ত্রিক’ বলিতে কি বুঝায় তাহা আমরা পরে দেখিতেছি। আপাতত বলা যায় ফররুখ আহমদ প্রসঙ্গে আবদুল কাদির পরে—এমনকি কবির মৃত্যুর পরেও—নতুন লেখা লিখিয়াছেন, তবে আগের ধারণার রদবদল বিশেষ করেন নাই। ‘ধর্মবাদী’ বলিতে আবদুল কাদির কি বুঝাইয়াছেন তাহাও পরিষ্কার হয় নাই। আমরা ধরিয়া লইতে পারি, এখানে ধর্ম বলিতে এসলামধর্মই ধরা হইয়াছে। ভারতীয় মুসলমানদের একাংশের চোখে ১৯৪০ সালের পর কোন একসময় এসলাম বলিতে পাকিস্তান বুঝাইত।

ফররুখ আহমদ পাকিস্তানের কবি—এ সত্যে সন্দেহ না থাকিলেও ‘সমাজতান্ত্রিক’ কথাটির অর্থ লইয়া গোল আছে। বাংলা ১৩৫০ (ইংরেজি ১৯৪৩) সালে ফররুখ আহমদ পাকিস্তানের নামে কল্পনার পাখা উড়াইয়া দিয়াছিলেন এই ভাষায় :

হাজার বছর পার হয়ে ফের ডাক দিল তোরে পাকিস্তান।
চারদিকে যবে মৃত্যুর ঘের, উড়িল তখন লাল নিশান ॥
জনগণ যবে মরে ক্ষুধাতুর, বান বয়ে যায় লোহ অশ্রুর
ফেলে বেড়াজল চারদিকে বেড় বারুদে যখন কালো বিমান ॥
(ফররুখ ১৯৬৮ : ১৮১)

১৯৪৭ সাল আসিয়াছে। বাংলাদেশ ভাগ হইয়া গিয়াছে। প্রশ্ন উঠিয়াছে পূর্ববঙ্গের দেশভাষা কি হইবে। সেই সন্ধিক্ষণে ফররুখ আহমদ বাংলা ভাষার পক্ষে দাঁড়াইয়াছিলেন। বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নির্বাচিত করার পক্ষে দুইটা যুক্তির আশ্রয় লইয়াছিলেন তিনি, এক যুক্তির নাম গণতন্ত্র। তিনি লিখিয়াছিলেন, গণতান্ত্রিক বিচারে ‘সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া উচিত’, অথচ একটি প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণী তখন ‘অন্য একটি প্রাদেশিক ভাষাকে’ পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করিতে তৎপর। শ্রেণীটির নাম তিনি রাখিলেন ‘অসাধু প্রতারক’। ফররুখ আহমদের দ্বিতীয় যুক্তির নাম এসলাম। এই যুক্তি অনুসারে, ‘বাংলা ভাষার পরিবর্তে অন্য ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গ্রহণ করলে এই দেশে ইসলামী সংস্কৃতিকে হত্যা করা হবে।’ (ফররুখ ১৯৯৬ [খ] : ৩৩০)

হয়তো এই সুবাদেই আবদুল কাদির এই এসলামবাদী কবিকে ‘ধর্মবাদী সমাজতান্ত্রিক’ বলিয়া সম্মানিত করিয়াছিলেন। তিনি বিচার করিয়া দেখেন নাই ‘ধর্মবাদী সমাজতান্ত্রিক’ কথাটির মধ্যে কোন বিরোধের আভাস আছে কিনা। সমাজতন্ত্রকে জাতিবিশেষের সহিত—শ্রেষ্ঠ জাতির সহিত—জড়াইলে যে পদার্থ তৈরি হয় ইতিহাসে তাহাকেই ‘ফ্যাসিবাদ’ বলা হইয়াছে। পাকিস্তান আন্দোলনও শেষ পর্যন্ত তাহাতেই পর্যবসিত হইয়াছিল। ফররুখ আহমদ ভবিষ্যতের মুখে দাঁড়াইয়া অতীতের ভূত দেখিয়াছিলেন। আমরা আরো দেখিব ধর্মবাদী পাকিস্তানের প্রবক্তা ‘মহাকবি’ ইকবালও আদপে গণতন্ত্র জিনিশটার উপর আস্থা স্থাপন করিতেন না। জার্মান তত্ত্বজ্ঞানী ফ্রিদরিক নিৎশের তালিম লইয়া তিনি একপ্রকার অতিমানবের পথ চাহিয়াই বসিয়াছিলেন। ইকবালের এই মেজাজশরিফ ধার লইতে সংকোচ করেন নাই ফররুখ আহমদ।

কবি আবদুল কাদির ১৯৪৭ সালেও মনে করিতেছিলেন ফররুখ আহমদের নিকটতম প্রতিতুলনা বোধ করি নজরুল ইসলামই। তবে কাদিরের সহিত সকলেই একমত হইয়াছিলেন—এমন নহে। এমনকি তাঁহার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মুহম্মদ এনামুল হকও অবিলম্বে ভিন্ন ধারণা ব্যক্ত করিয়াছিলেন। নজরুল ইসলামের আদর্শ হইতে ফররুখ আহমদ যে অনেকখানি সরিয়া গিয়াছিলেন তাহা নির্দেশ করিয়া আবদুল কাদির ভুল করেন নাই। তাহা সত্ত্বেও এই ঘটনার কিছুদিন পরে লেখা ‘বাঙ্গালী মুসলিম মানসে তুর্কী বিপ্লবের প্রভাব’ নামক এক নিবন্ধে এনামুল হক ধরিয়া লইয়াছিলেন নজরুল ইসলামই ফররুখ আহমদের গুরু, ইংরেজিতে ‘মাস্টার’। কথাটা এনামুল হকের মুখ হইতেই শোনা যাইতে পারে :

‘মানবিকতায় নজরুল ইসলাম ছিলেন বিদ্রোহী, বিশ্বাসে মুসলমান, প্রকাশভঙ্গিতে প্রচলিত নিয়মবিরুদ্ধ, লিখনভঙ্গিতে সম্পূর্ণ নতুন এবং সর্বোপরি পৃথিবীর সর্বহারাদের প্রতি তাঁর ছিল অপরিসীম সহানুভূতি। অচিরেই আদর্শবাদী তরুণ সমাজ সে যুগের সাহিত্যের গতানুগতিক ভাবধারা পালটে দেওয়ার জন্যে নজরুল ইসলামের চতুষ্পার্শ্বে এসে জড় হলেন। এঁদের মধ্যে সন্ত্রাসবাদী কবি বেনজির আহমদ (জন্ম ১৯০৩), কবি মহিউদ্দিন (১৯০৬-১৯৬৭) প্রমুখ ব্যক্তির নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। এঁরা আদর্শের জন্যে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজের হাতে অকথ্য লাঞ্ছনা সহ্য করেছেন। ফররুখ আহমদ নামে অপর একজন কবি মুসলমান আদর্শবাদে বিশ্বাসী তাঁর গুরু নজরুল ইসলামের প্রতি এখনও সশ্রদ্ধ রয়েছেন।’ (এনামুল হক ১৯৯৪ : ৬৫৩; ১৯৯৫ : ৪৬৭)

আমরা যতদূর দেখিতে পাইয়াছি, নজরুল ইসলামকে ‘গুরু’ স্বীকার করিতে ফররুখ আহমদ অন্তত শেষ পর্যন্ত রাজি ছিলেন না। খানিক বিড়ম্বনায় পড়িলাম যখন দেখিলাম মুহম্মদ এনামুল হকও পদার্থটা যথার্থ এস্তেমাল করেন নাই। ফররুখ আহমদ কতবার বিজ্ঞাপন দিয়া বলিয়াছেন তিনি মোহাম্মদ ইকবালের ছাওয়াল। অন্য অনেকের মতো ইকবালের কবিতার তর্জমা তিনি করিয়াছিলেন। যতদূর জানি ফররুখের তর্জমা ইংরেজির দৌত্যে এ কাজটা সে যুগে অনেকেই করিতেছিলেন। মনে পড়িতেছে, তাঁহার মশহুর ‘সাত সাগরের মাঝি’ (১৯৪৪) উৎসর্গ করা হইয়াছিল ‘বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ তামদ্দুনিক রূপকার, দার্শনিক মহাকবি, আল্লামা ইকবালের অমর স্মৃতির উদ্দেশে’। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায়, নজরুল ইসলাম উর্দু ও ফারসি ভালই জানিতেন, কিন্তু তিনি কদাচ ইকবালের তর্জমা করেন নাই।

ফররুখ আহমদ সম্পর্কে দ্বিতীয় জনপ্রিয় ধারণাটির জন্ম আরেকটু পরকালে। এই কবির অকালমৃত্যুর পরপর ১৯৭৪ সালে আহমদ ছফা লিখিয়াছিলেন, ‘ফররুখ আহমদের অনেকগুলো সফল কবিতা রয়েছে। তাঁর কবিতা বাংলার কাব্য-সরস্বতীর কণ্ঠে ইন্দ্রমণির হারের মত দুলবে। কিন্তু আমি মনে করি তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি এই মৃত্যু।’ আহমদ ছফা আরো লিখিয়াছিলেন, ‘মৃত্যুকে তিনি একেবারে চোখাচোখি দেখেছেন এবং বরণ করেছেন। একটিবারের জন্যও কবির মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতে দেননি। একটিবারের জন্যও দীন অক্ষম কাঙ্গালের বেশে কারও দোরে হাত পাতেননি। কাব্যাদর্শ যাই হোক লিখেছেন তো কবিতা।’ (ছফা ১৯৭৪)

আহমদ ছফার কথার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় ফররুখ আহমদের প্রথম যৌবনের বন্ধু আবু রুশদের স্মৃতিকথায়ও। রুশদ লিখিয়াছেন, ‘মরবার সময় সে বিনা চিকিৎসায় এবং অর্ধাহারে তাঁর শেষের দিনগুলো কাটিয়েছিল। তাঁর অনেক অনুরাগী তাঁকে সাহায্য করতে চেয়েছিল, সে তা বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে। তাঁর আত্মসম্মানজ্ঞান ছিল খুব উঁচু ধরনের।’ (রুশদ ১৯৯৮ : ৬৫)

অনেকদিন পর—১৯৯৫ সালে মুদ্রিত—এক সাক্ষাৎকারে আহমদ ছফা আগের ধারণা খানিক পরিমার্জিত করিয়াছিলেন। তাঁহার নতুন ধারণা অনুসারে, ফররুখ আহমদের অহং ছিল অনেক বড়, অথচ সে অহং ‘সময় এবং সমাজের সঙ্গে’ বিকশিত হইতে পারে নাই। ছফা বলিয়াছিলেন : ‘একগুঁয়ে মানুষদের যা হয়ে থাকে ফররুখের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। একগুঁয়ে লোকেরা তাঁদের গোঁটাকেই বিশ্বাস বলে প্রমাণ করতে চায়। ইসলামী আদর্শের কারণে ফররুখ আহমদের এভাবে করুণ মৃত্যু হল, এটাও বলা যাবে না। ইসলামী বিশ্বাস মানুষকে আত্মহত্যার প্রেরণা দেয় না।’ (ছফা ২০০৯: ৬০)

নজরুল ইসলাম প্রসঙ্গে ফররুখ আহমদের দুইটা নিবন্ধ আমাদের হাতে পড়িয়াছে। তাহা ছাড়া খবরের কাগজে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারের মধ্যেও নজরুল ইসলামের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রথমে সাক্ষাৎকারের কথাটা পাড়ি। ১৯৬৮ সালের কথা, প্রশ্নকর্তা কবিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘এখনো কি আমাদের সমাজে প্রকাশনা একটা বড় সমস্যা?’ ফররুখ আহমদ উত্তর দিলেন, ‘বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম সমাজের এটা চিরন্তন সমস্যা। এই সমস্যার জন্যই ছোট একখানা বর্ণপরিচয় থেকে শুরু করে বিশ্বকোষ জাতীয় বিরাট গ্রন্থের ব্যাপারে আমাদের পরমুখাপেক্ষী থাকতে হয়েছে।’ প্রশ্নকর্তা জানিতে চাহিলেন, ‘আগেও কি এই সমস্যা ছিল?’ তখন উত্তর হইল, ‘আগেও ছিল। আপনারা বোধ হয় জানেন—যে নজরুল ইসলামকে নিয়ে আমরা এত উচ্ছ্বাস প্রকাশ করি সেই নজরুল ইসলামের প্রায় সব বই-ই প্রকাশ করেছিলেন অমুসলিম প্রকাশক। মাত্র দু’চারখানা বই প্রকাশ করেছিলেন কোন কোন মুসলিম প্রকাশক; তা’ও শেষ অবস্থায়।’ (ফররুখ ১৯৯৬ [ক] : ৪৩৮)

১৯৫৯ সালে আবদুল কাদির সম্পাদিত ‘নজরুল পরিচিতি’ গ্রন্থে ফররুখ আহমদের একটি নিবন্ধ (বেতার-কথিকা) জায়গা পায়। নিবন্ধের নাম ‘নজরুল সাহিত্যের পটভূমি’। দেখা যাইতেছে ফররুখ আহমদ এই জায়গায় নজরুল ইসলামকে মাত্র মুসলমান জাতির কবি ধরিয়া লইয়াছেন। তাহা ছাড়াও তিনি মনে করেন, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পাকিস্তান আন্দোলনের গোড়াপত্তন হইয়াছিল সেই খেলাফত আন্দোলনের যুগেই। সুতরাং তাঁহার কিছু কৃতিত্ব নজরুল ইসলাম দাবি করিতেই পারেন। ফররুখ আহমদ লিখিয়াছেন, ‘খিলাফত আন্দোলন কালে কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব একাধিক কারণে স্মরণীয়। আত্মবিস্মৃত জাতি বহুদিন পরে শুনল তার আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা। নতুন করে পেল সে তার ঐতিহ্যের পরিচয়।’ (ফররুখ ১৯৯৬ [খ] : ৩২৮)

নজরুল ইসলামের দোসরা কীর্তি—ফররুখ আহমদের মতে- বাংলা ভাষায় বহুদিন ধরিয়া অবদমিত একটি জগতের পুনরুজ্জীবন, অর্থাৎ আরবি ও ফারসি ঐতিহ্যের পুনঃপ্রবর্তন। ফররুখ আহমদ লিখিয়াছিলেন, ‘বহু শতাব্দী ধরে বাঙ্গালী মুসলমান আরবী-ফারসী মিশ্রিত যে বাংলা জবান গড়ে তুলেছিল, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ষড়যন্ত্র যে ভাষার কণ্ঠরোধ করেছিল, কাজী নজরুলের বলিষ্ঠ লেখনীতে তার নতুন প্রকাশ দেখে উল্লসিত হয়ে উঠলেন শিক্ষিত সমাজ। এমনকি জনসাধারণের মধ্যেও সাড়া পৌঁছতে দেরী হ’ল না। (ফররুখ [খ] : ৩২৮)

ফররুখ আহমদের বিচারে নজরুল ইসলাম উত্তরাধিকারসূত্রে এসলামের ‘মরমীবাদ ও সুফীবাদ’ হইতে উপকার পাইয়াছিলেন। উত্তরাধিকার হইতে প্রাপ্ত এই প্রাণশক্তির দিকেই দেশের দুর্গত জনসাধারণ ‘বিপুল বেগে’ আকৃষ্ট হইয়াছিল। নজরুল ইসলামের কবিতায় তাহারা একদিকে যেমন আশ্বাসের বাণী শুনিলেন, অন্যদিকে তেমন লাভ করিলেন নতুন চেতনাও। নজরুল ইসলামের মূল ফররুখ আহমদ দেখিয়াছেন এই নতুন চেতনায়। কবিচিত্তে জাগ্রত এই নতুন চেতনার গোড়ায় তিনি দেখিতে পাইয়াছেন ‘ইসলামের মানবতাবোধ, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার’। খেলাফত আন্দোলনের একটি অধ্যায়কে প্রাণবন্ত করিয়া তুলিয়াছিল নজরুল ইসলামের এই নবচেতনা। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের তাকিদও এই চেতনা হইতে আসিয়াছিল বলিয়া ফররুখ আহমদ মনে করেন।

এই পর্যন্ত বিচার করিলে দেখা যায়, ফররুখ দুই জায়গায় অস্ত্রোপচার করিয়াছেন। এক জায়গায় তিনি নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশের পুরাতন বা সমকালীন অমুসলমান ঐতিহ্য হইতে কাটিয়া আলাদা করিয়াছেন। তাঁহাকে সীমিত করিয়াছেন শুদ্ধ মুসলমান ঐতিহ্য বলিতে যাহা বুঝায় তাহার মধ্যে। ইহাতে ন্যায় কোথায়? এক্ষণে দেখা যাইতে পারে তাঁহার দ্বিতীয় উপচার কোন জায়গায় লাগানো হইয়াছিল। ফররুখ আহমদ লিখিয়াছেন, ‘বঙ্গভঙ্গ, খিলাফৎ, অসহযোগ ও সন্ত্রাসবাদের পটভূমিতে যে কবি-মানস গঠিত হয়েছিল, তার অশান্ত মনের প্রতিচ্ছায়া দেখেছি আমরা তাঁর রচনায়। বাংলা সাহিত্যের একটা বিশেষ অধ্যায়ে রয়ে গেছে তাঁর দ্বন্দ্ব-মুখর মনের ছাপ।’ (ফররুখ ১৯৯৬ [খ] : ৩২৯)

দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের দৌলতে ফররুখ আহমদ নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশের ইতিহাসে ফিরাইয়া আনিলেন তবে তাহাতে ‘অশান্ত’ আর ‘দ্বন্দ্ব-মুখর’ মনের ছাপ ছাড়া আর কিছু দেখিলেন না। আকেলমন্দের দরবারে এই ক্ষমাহীন মন্তব্য অন্যরোগের প্রকাশ বলিয়াও হাজির হইতে পারে। প্রমাণের জন্য অধিক দূর যাইতে হইবে না। ১৯৭৯ সালে—ফররুখ আহমদের এন্তেকালের বছর পাঁচ পরে—‘নজরুল-প্রসঙ্গ’ নামে তাঁহার একটি নাতিহ্রস্ব লেখা প্রথম প্রকাশিত হইল। ফররুখ আহমদের গোপনরোগ সেই লেখায় ধরা পড়িয়াছিল। এই লেখাতেই তিনি সর্বসমক্ষে অভিযোগ করিয়াছিলেন, ‘নজরুলের শক্তি যেমন বিস্ময়কর তাঁর কাব্যিক স্খলনও তেমনি বিস্ময়কর।’ (ফররুখ ১৯৯৬ [ক] : ৩২৭)

নজরুল ইসলামের দুইটা বড় বড় দোষ ধরিয়াছিলেন ফররুখ আহমদ। তাঁহার মতে, নজরুল ইসলামের প্রথম দোষটা অদম্য ভাবাবেগের। এই দোষ অবশ্য ফররুখ আহমদ একেলা আবিষ্কার করেন নাই। তাঁহার ঢের আগে কাজী আবদুল ওদুদ, বুদ্ধদেব বসু কিংবা সৈয়দ আলী আহসান সকলেই করিয়াছিলেন। কথাটা শুদ্ধ বানান করিয়া বলিয়াছেন ফররুখ আহমদ এই যাহা, ‘অদম্য ভাবাবেগের জন্য তাঁর অধিকাংশ কবিতাই নিখুঁতভাবে জমাট বাঁধতে পারেনি, শব্দচয়নের দিক দিয়েও তাঁর দুর্বলতা আছে যথেষ্ট।’ (ফররুখ ১৯৯৬ [ক] : ৩২৭)

দুর্ভাগ্যের মধ্যে, কোন উদাহরণ দেখাইবার অবকাশ পান নাই তিনি। সে যাহাই হোক, তাঁহার দ্বিতীয় অভিযোগটি আরেকটু বড় বটে : ‘অগভীর জীবনবোধ এবং দার্শনিক দৃষ্টিশক্তির অভাব তাঁর সবচাইতে বড় ত্রুটি। শুধু এই একটি কারণেই তিনি সর্বকালের কবি হতে পারেননি। নজরুল নিজেও তা বুঝতেন এবং সে কথা স্বীকার করে গেছেন।’ (ফররুখ ১৯৯৬ [ক] : ৩২৭)

সে কথা কোথায় স্বীকার করিলেন নজরুল, জানাইলে বড় ন্যায়কাজ হইত। ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতাযোগে নহে তো? যদি তাহা হয়তো সন্দেহের কারণ আছে, ফররুখ আহমদ ব্যাজস্তুতি নামক বাক্যালঙ্কার কি পদার্থ তাহা জানিতেন কিনা। তবে দেখিলাম, ফররুখ আহমদ এখানেই প্রাণ খুলিয়া ব্যাখ্যা করিতেছেন কি কারণে তিনি নজরুল ইসলামের উপর এতখানি ক্ষুব্ধ। বাঙ্গালি মুসলমানের আশা নজরুল ইসলাম পূরণ করেন নাই। তাই তাহাদের নামেই তিনি নালিশ রুজু করিতেছেন, ‘তারা [বাঙ্গালি মুসলমান] আরও চেয়েছিল নজরুলের কাছে, তারা তাদের নিজের দর্শন, জীবনবোধ ও ইতিহাসের অভিব্যক্তি চেয়েছিল কবি নজরুলের কবিতায়।’ (ফররুখ ১৯৯৬ [ক] : ৩২৭)

নজরুল ইসলামের কাছে বাঙ্গালি মুসলমান যে ‘দর্শন, জীবনবোধ ও ইতিহাসের অভিব্যক্তি’ চাহিয়াছিল তাহা কি পদার্থ ফররুখ আহমদ মোটেও পরিষ্কার করেন নাই। মাত্র একটু ঘুরাইয়া বলিয়াছেন, যে পদার্থের সন্ধান নজরুল ইসলাম দিতে পারেন নাই তাহার নাম ‘আবেহায়াত’। দৃষ্টান্তস্বরূপ : ‘ভারতের পশ্চিম প্রান্তে মহাকবি ইকবাল অবশ্য অনেক আগেই সন্ধান দিয়েছিলেন আবেহায়াতের। তাঁর দেশকালজয়ী প্রতিভার সঙ্গে নজরুলের তুলনা করতে যাওয়া বাতুলতা।’ (ফররুখ ১৯৯৬ [ক] : ৩২৭)

আমরা কিছু পরে দেখিব, কবি এই জায়গায় আসিয়া কিছুটা দিশাহারা হইয়াছেন। তিনি ইকবাল চিনিতে পারিয়াছেন কিনা সে কথা স্বতন্ত্র, তবে নজরুল ইসলাম কেন দেশজয়ী—এতদিনে আমরা বলিব ‘কালজয়ী’ও—তাহা ধরার চেষ্টা করেন নাই। তিনি স্বীকার করিয়াছেন, ‘পলাশী[র] যুদ্ধের পর নজরুল ইসলাম বাঙ্গালী মুসলমানের জাগরণের প্রথম কবি’। লিখিয়াছেন, ‘নজরুল ইসলামের উন্মত্ত উচ্ছ্বাসময় প্রাণ-প্রবাহ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বেগবান জলপ্রপাতের মত অকালবার্ধক্যের যুগসঞ্চিত জরদগব শিলাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল যাদুকরের মত—সমস্ত দেশ তাঁকে অভিবাদন জানাল।’ (ফররুখ ১৯৯৬ [ক] : ৩২৭)

হাবভাব দেখিয়া মনে হয়, তিনি যেন বলিতেছেন তাহাতে কি হইয়াছে? তিনি তো শেষ পর্যন্ত কাব্যের চরম উৎকর্ষে পৌঁছাতে পারিলেন না। তাহার আগেই ‘অবসর গ্রহণ’ করিতে বাধ্য হইলেন। বলাবাহুল্য, ফররুখ আহমদের হিংসা এখানেই সবচেয়ে বেশি বেয়াব্রু হইয়াছে। নজরুল ইসলামের কবিতায় বাঙ্গালি মুসলমান যাহা আশা করিয়াও পায় নাই প্রথম মহাযুদ্ধের শেষে যে সংস্কৃতি জাগিয়াও পরিণতিতে পৌঁছে নাই তাহা অবশ্য শেষ পর্যন্ত বৃথা যায় নাই। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের রণদামামার মধ্যে সেই হারানো স্বপ্নই সত্য হইল। ফররুখ আহমদ লিখিলেন, ‘পৃথিবীর চলমান স্রোতের সাথে অদ্ভুত সামঞ্জস্য রেখেছে বাঙ্গালী মুসলমান সমাজের প্রাণবন্ত মননের ধারাবাহিকতা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে যে সংস্কৃতি জেগে উঠল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মারণাস্ত্রের মধ্যে থেকে সে সংগ্রহ করল জীবনের নতুন পাথেয়।’ (ফররুখ ১৯৯৬ [ক]: ৬৩২৭)

এই নতুন পাথেয়ের মধ্যে ফররুখ আহমদের কবিতাও আছে! বৈকি! মুজিবর রহমান খাঁ নামে ফররুখ আহমদের এক ভক্ত ছিলেন। পেশায় সাংবাদিক এই ভদ্রলোক বলিতেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কবি ফররুখ আহমদ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কবি নজরুল ইসলামকে ছাড়াইয়া গিয়াছিলেন। ১৯৬০ সালের দশকে এই খয়ের খাঁ লিখিয়াছিলেন, ‘নজরুলের ভাষায় যে আকরিক ক্লেদ রয়েছে ফররুখ আহমদের ভাষায় তা নাই। ঘষামাজা করেছেন তিনি প্রচুর, এজন্যে ফররুখ আহমদের ভাষা নজরুলের ভাষা থেকে অনেকখানি সুসংহত ও পরিশোধিত।’ মুজীবর রহমান খাঁর এই বিশ্বাসের মধ্যে ফররুখ আহমদের কথার প্রতিধ্বনি পাওয়া যাইতেছে। ফররুখ আহমদ একদা বলিয়াছিলেন নজরুলের ‘স্খলন’, মুজিবর রহমান খাঁ তাহাতে আরেকটি কথা যোগ করিলেন—কথাটা দাঁড়াইল ‘স্খলন ও পতন’। ফররুখ আহমদ ধরিয়া লইয়াছিলেন নজরুল ইসলাম প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে যে সংস্কৃতি জাগিয়া উঠিয়াছিল তাহারই অপর নাম। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মারণাস্ত্রের মধ্য হইতে সংগ্রহ করা ‘জীবনের নতুন পাথেয়’ বলিতে শুদ্ধ নিজের নামটা বিনয়ের দায়ে বলিতে সংকোচ করিয়াছিলেন তিনি। মুজীবুর রহমান খাঁর সেই দায় নাই। তিনি লিখিয়াছেন, ‘ফররুখ আহমদের ব্যবহৃত ভাষায় আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার খুবই সুন্দর। নজরুলও আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহারে সুদক্ষ, তবে নজরুলের রচনায় পরিশীলিত পেলবতায় ও মাঝে মাঝে সৌকর্যের অভাব দেখা যায়। নজরুলের ভাষার মধ্যে বহুস্থানে আছে ধৈর্যহীন ও সংস্কারহীন স্খলন ও পতন। কিন্তু ফররুখ আহমদের কবিতা পাঠককে বলে দেয় যে ধৈর্যহীনতা ও অসংযমের দিন কেটে গিয়েছে এবং আমাদের জবানে এসেছে সংহতি ও সংযমের নিয়ম-কানুন।’ (খাঁ ২০০৪ : ৩১৫-১৬)

আবদুল মান্নান সৈয়দ জানাইয়াছেন, মুজীবর রহমান খাঁর যে লেখা হইতে আমরা এই উক্তি উদ্ধার করিয়াছি সে লেখা ফররুখ আহমদের ইচ্ছানুসারে ‘সাত সাগরের মাঝি’ গ্রন্থের তৃতীয় [অর্থাৎ মরণোত্তর প্রথম] সংস্করণে জুড়িয়া দেওয়া হইয়াছিল।’ (মান্নান ১৯৯৫ : ৫৫৩-৫৬৫; খাঁ ২০০৪ : ৩০৫-১৭)

মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহকে যদি বিশ্বাস করা যায় তো কবুল করিতে হয়, ফররুখ আহমদের আরবি ফারসি চৌদ্দ আনা পড়িয়া পাওয়া। দেখা যাইতেছে, ভাবাদর্শের শক্তি নিতান্ত কম নয়। মাহফুজউল্লাহ লিখিয়াছেন :

‘তাঁর কবিতায় আরবী-ফারসী শব্দের ব্যাপক ও নিপুণ ব্যবহার দেখে অনেকের ধারণা ফররুখ আহমদ বুঝি আরবী ও ফারসী ভাষা খুব ভাল জানতেন। কিন্তু ফররুখ আহমদের নিজের মুখে শুনেছি তিনি এ সব আহরণ করেছেন প্রধানত পুথি থেকে, প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল, নজরুল ইসলামের কবিতা, প্রমথ চৌধুরীর গদ্য এবং অন্যান্য রচনাবলী পাঠ করে। তাঁর স্মরণশক্তি ছিল অসাধারণ। কীটস্, শেলী, গ্যেটে, হুইটম্যান থেকে শুরু করে মাইকেল [মধুসূদন দত্ত], রবীন্দ্রনাথ [ঠাকুর], [কাজী] নজরুল [ইসলাম]—এমনকি পরবর্তী কবিদের রচনাও তিনি অবলীলায় মুখস্থ বলতে পারতেন।’ (মাহফুজউল্লাহ ১৯৭৮ : ১৮২)

প্রশ্ন হইতেছে, কখন এবং কিভাবে ফররুখ আহমদ এই পথ ধরিলেন? আরো বলিতে, কোন জায়গায় তিনি নজরুল ইসলামকেও ছাড়াইয়া উঠিলেন? সে যুগে ফররুখ আহমদ যে সাহিত্যিক গোষ্ঠীর অধীন ছিলেন তাঁহারা নিজেদের বলিতেন ‘আধুনিক’। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত এক স্মৃতিকথাযোগে আধাপুরুষ পরকালের লেখক রশীদ করীম লিখিয়াছেন : ‘আমাদের [কলিকাতার] ২০ কর্নেল বিশ্বাস রোডস্থ বাড়িতে সেকালে সাহিত্যের এক সরগরম আড্ডা ছিল। ফররুখ আহমদ, আবু রুশদ, শওকত ওসমান, আহসান হাবীব, আবুল হোসেন, গোলাম কুদ্দুস প্রমুখ উদীয়মান আধুনিক মুসলিম কবি ও কথা-সাহিত্যিক এখানে বসেই কি লিখবেন, আধুনিক কালে কি এবং কেমনতর ভাষায় লেখা উচিত তা নির্ণয় করতেন। এই কবি-সাহিত্যিকরা নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির সর্বপ্রথম অবতারণা করেন। তাঁরাই আধুনিকতার ভিত্তি স্থাপন করেন।’ রশীদ করীম জানাইতেছেন, ফররুখ আহমদ এই গোষ্ঠীর সেরা কবি বলিয়া গণ্য হইতেন। আর ফররুখ আহমদের খ্যাতি ছিল—অন্তত মুসলমানদের মধ্যে—সবার চেয়ে বেশি। রশীদ করীমের সাক্ষ্য অনুসারে, সৈয়দ আলী আহসান ১৯৪৪ কি ১৯৪৫ নাগাদ আকাশবাণীর কলকাতা কেন্দ্রে যোগ দিয়াছিলেন। যোগদানের কিছু পরে তিনি ফররুখ আহমদকে নিজের কবিতা পাঠের আর তাঁহার কবিতার আলোচনার আমন্ত্রণ জানাইলেন আবদুল কাদিরকে। শুঁড়ির সাক্ষী রশীদ করীমের ভাষায়, ‘এ নিয়ে বেশ হৈচৈ হয়েছিল।’ (করীম ১৯৯৯ : ৩২-৩৩)

বেতারে পঠিত সে কথিকায় আবদুল কাদির স্বীকার করিয়াছিলেন ‘বাংলার নবীন মুসলমান কবিদের মধ্যে ফররুখ আহমদ নিঃসন্দেহে সর্বশ্রেষ্ঠ।’ এই কথিকাই ‘সওগাত’ পত্রিকায় পরে ছাপা হয় ‘নবীন কবি ফররুখ আহমদ’ নামে। নিচে লেখা ছিল ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও-র সৌজন্যে’। আবদুল কাদিরের লেখার প্রভাবও কম ছিল না। অনেকদিন পরে মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ জানাইতেছেন, ‘বিভাগপূর্ব কালে কলকাতা বেতারে পঠিত এবং “সওগাত” পত্রিকায় প্রকাশিত কবি আবদুল কাদিরের “নবীন কবি ফররুখ আহমদ” শীর্ষক প্রবন্ধটি পড়ে আমি সে সময়ে বিশেষ মুগ্ধ হই।’ কাদিরের দোহাই পাড়িয়া মাহফুজউল্লাহ জানাইয়াছেন, ফররুখ আহমদই প্রথম নজরুল পরবর্তী মুসলমান কবি যাঁহাকে লইয়া কলিকাতা বেতারে একক আলোচনা প্রচারিত হয়। (কাদির ১৩৫৪: ৩০৭-৮; মাহফুজউল্লাহ ১৯৮১ : ২১৩)

ফররুখ আহমদের বন্ধুদের মধ্যে শওকত ওসমানও ছিলেন। তাঁহার স্মৃতির উপর যদি নির্ভর করিতে পারিতাম তো বিশ্বাস করিতাম, ফররুখ আহমদ ছিলেন পাকিস্তানের ‘একদম একগুয়ে জিদ্দী সমর্থক’। শওকত ওসমান লিখিয়াছেন :

কানমে বিডি মুহমে পান
লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান।

অর্থাৎ—‘কানে বিড়ি এবং মুখে পান গুঁজে লড়াই চালিয়ে পাকিস্তান নিয়ে নেব’—এই শ্লোগানটি তৈরি করিয়াছিলেন ফররুখ আহমদ। না বলিয়া না কহিয়া এইটার মালিকানা আত্মসাৎ করিতেছিলেন পত্রিকা মালিক ও লীগ নেতা মৌলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ। মালিকানার বিষয় লইয়া কলিকাতার আদালতে একটা মামলাও উঠিয়াছিল। দুঃখের মধ্যে, মামলা নিষ্পত্তির আগে বাদী-বিবাদী দুইজনেরই সোয়াদের পাকিস্তান কায়েম হয়। (ওসমান ২০০৭ : ২৯২)

খানিক কনিষ্ঠ আবদুল হক জানাইতেছেন তিনি ফররুখ আহমদকে ১৯৪৫ সাল হইতে জানিতেন। কলিকাতাতে তাঁহাদের পরিচয়। আবদুল হকের দাবি, একটা কথা ফররুখ আহমদের কাব্য বিচারকালে সব সময় মনে রাখিতে হইবে : ‘তিনি একান্তভাবে পাকিস্তান আন্দোলনের সৃষ্টি।’ তবে তিনি একথাও স্বীকার করিয়াছেন, ‘কিন্তু এ আন্দোলনের যাবতীয় তাৎপর্য সম্বন্ধে তিনি সচেতন ছিলেন একথা বলা কঠিন।’ আবদুল হকের ভাষ্যানুসারে: ‘পাকিস্তান আন্দোলন ছিল সাম্প্রদায়িক জাতীয়তার আবরণে বিশুদ্ধ রাজনৈতিক আন্দোলন, ধর্মীয় আন্দোলন নয়। এর মূল কথা ছিল প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং সেই সঙ্গে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধের সংঘাত।’ কিন্তু এ সম্বন্ধে ফররুখ আহমদের পরিষ্কার ধারণা ছিল না। হক অকপটে স্বীকার করিয়াছেন, ‘অনেকদিন আমারও ছিল না’। ফররুখ আহমদ বিশ্বাস করিতেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অর্থ আদর্শস্বরূপ ইসলামের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। তাঁহার এ বিশ্বাসের গোড়া এতই মোটা ছিল যে সেই গোড়া কাল নামক নিঠুর কাঠুরিয়ার কঠোর কুঠারও ছুঁইতে পারে নাই। এই প্রশ্নে আবদুল হকের ভাষ্য এই রকম : ‘তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ের তথ্য এখনও অপ্রকাশিত, কিন্তু যতদূর জানা গেছে, তিনি জীবনের শেষ মুহূর্ত অবধি আরও একটি রুঢ় বাস্তবকে স্বীকার করতে চাননি : তা হচ্ছে, পাকিস্তানী আমলের পঁচিশ বছরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা মিথ্যা হয়ে গিয়েছিল এবং এদেশ ক্রমে ক্রমে পাকিস্তানের উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল। সেই সঙ্গে জাতীয়তার ধারণাও বদলে গিয়েছিল।’ আবদুল হক বিষয়টা আরো প্রাঞ্জল করিয়াছেন : ‘অবিভক্ত ভারতের সাম্প্রদায়িক সংঘাতের মুখে বাঙ্গালি মুসলমান (এবং অবিভক্ত ভারতের অবশিষ্ট মুসলমান) নিজেদের মুসলিম জাতি (এবং পরে পাকিস্তানী জাতি) বলে বিশ্বাস করেছিল; কিন্তু পাকিস্তানী উপনিবেশবাদের শোষণে সেই বাঙ্গালি মুসলমানই বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছে এবং একটা নতুন জাতি, বাঙ্গালি জাতিতে পরিণত হয়েছে।’ (হক ২০০৪ : ৫৫)

হকের এই বিচারটাকে মোটেও নাহক বলা যাইবে না। ধরুন এই ঘটনাটার কথা, যুদ্ধশেষে একদিন—১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর তারিখে—সীমান্তের ওপারফেরত মুক্তিযোদ্ধাদের কাতার হইতে কয়েকজন অনুরাগী ও বেতারকেন্দ্রের সহকর্মী কবিকে দেখিতে তাঁহার বাসায় গিয়াছেন। ব্যক্তিগত কুশল বিনিময়ের ঘোরে কোন এক মেহমান ফররুখ আহমদকে আচমকা প্রশ্ন করিলেন : ‘দেশ স্বাধীন হয়েছে, আপনি খুশি হননি?’ ফররুখ আহমদ উত্তরে যাহা বলিয়াছিলেন তাহাতে বিশেষ শিক্ষার জিনিশ আছে। তিনি বলিয়াছিলেন : ‘আমার ব্যক্তিগত খুশি-অখুশিতে কি আসে যায়! আমি আগে যা ভাবতাম, এখনো তাই ভাবি। আমি মুসলমান, এ কথাটাই আমার কাছে বড়।’ (খোদা ২০০৪ : ২১৫)

১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিশ্বস্ত এক সহযোগীর নাম আখতার ফারুক। ইহার সাক্ষ্যটা বিশ্বাস করিতে হয়তো অনেকের আপত্তি থাকিবে না। ভদ্রলোক লিখিয়াছেন : ‘একাত্তরের সামরিক পদক্ষেপের পর মাঝে মাঝে আমরা [মানে ফররুখ আহমদ ও তিনি] মিলতাম। তিনি একদিকে পাঞ্জাবীদের মূর্খতাজনিত বাড়াবাড়ি ও অন্যদিকে ভারতের ষড়যন্ত্রমূলক কারসাজি দুটারই তীব্র সমালোচনা করতেন। বলতেন, এ শয়তানীর খেসারত দু’পক্ষকেই সুদে-আসলে দিতে হবে।’ (ফারুক ২০০৪ : ৭৬)

ফররুখ আহমদের ভবিষ্যদ্বাণী পুরাপুরি ভুল প্রমাণিত হয় নাই। এর আংশিক খেসারত ফররুখ আহমদেরও কিছু কিছু দিতে হইয়াছিল। আহমদ ছফা একবার—কথাটা ১৯৭৪ সালে—রাগে-দুঃখে অভিযোগ করিয়াছিলেন, ফররুখ আহমদকে প্রকারান্তরে খুনই করা হইয়াছিল। কিভাবে? তিনি লিখিয়াছিলেন, ‘আমাদের দেশের বর্তমান শাসকশ্রেণী পণ্ডিত বলে কথিত যে মনুষ্যত্বহীন কলমধারী গুণ্ডাদের কর্তার আসনে বসিয়েছে, তাঁরা স্বাধীনতার পর দীর্ঘকাল কবিকে বেকার থাকতে বাধ্য করেছেন। কবি দেখেছেন চিকিৎসার অভাবে আপন তনয়াকে চোখের সামনে মরে যেতে। আপন সন্তানদের স্কুল-কলেজ থেকে বেরিয়ে এসে হন্যে হয়ে একমুঠা ভাত যোগাড়ের জন্য পথেঘাটে ঘুরে বেড়াতে দেখেছেন। মরবার আগে উপবাস করার সৌভাগ্যও তাঁর যথেষ্ট হয়েছিল।’ (ছফা ১৯৭৪)

ফররুখ আহমদের পুরানা বন্ধু আবু রুশদ অবশ্য আহমদ ছফার এই কথায় পূর্ণ সায় দেন নাই। দ্বিমত করিয়াছিলেন তিনি : ‘দেশবিভাগের পর ফররুখ আমাদের অনেকের মতই পাকিস্তানের খাতায় নাম লিখিয়ে রেডিও পাকিস্তানে চাকরি নিয়েছিল। মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ-বিরোধী বাংলাদেশের জন্ম হওয়ার পরও সে রেডিওর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল।’ আত্মজীবনীর আরেক পাতায় আবু রুশদ প্রসঙ্গক্রমে লিখিয়াছেন, ‘বাংলাদেশ সরকার তাঁর প্রতি কোন অনুদার বা অন্যায় ব্যবহার করেনি। বরঞ্চ তাঁর বাংলাদেশ দর্শনে কোন আস্থা না থাকলেও স্বাধীনতার পরে তাঁকে চাকরিতে বহাল রাখা হয়েছিল এবং তাঁর জন্য সরকারীভাবে নির্ধারিত একটা ফ্ল্যাটও বরাদ্ধ ছিল। মুজিব আমলের পরে বাংলাদেশের দুটি সর্বোচ্চ সাহিত্যিক পুরস্কারও তাঁকে দেওয়া হয়েছিল।’ আবু রুশদ অধিক গিয়াছেন। প্রসঙ্গক্রমে তিনি আরেক জায়গায়ও স্মরণ করিয়াছিলেন, ফররুখ আহমদ পাকিস্তান যুগে আদমজী পুরস্কার, প্রেসিডেন্ট পদক ইত্যাদি পাইয়াছিলেন। লিখিয়াছেন, ‘কবি প্রতিভার মানদণ্ডে তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া অবশ্যই অসঙ্গত হয়নি (এই পুরস্কার বেশ কয়েকজন অযোগ্য ব্যক্তির হাতে পড়েছে) কিন্তু যেহেতু বাংলাদেশ ভাবাদর্শের প্রতি তাঁর কখনোই কোন প্রবল আনুগত্য ছিল না তাই তাঁকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া অনেক স্বাধীনতা সৈনিকের দৃষ্টিতে একটু বাড়াবাড়ি বলে মনে হয়েছিল।’ (রুশদ ১৯৯৮ : ৬৫-৬৬; রুশদ ২০০৪: ৫৮)

দোহাই

১.      মুহম্মদ এনামুল হক, ‘বাঙ্গালী মুসলিম মানসে তুর্কী বিপ্লবের প্রভাব,’ মুহম্মদ এনামুল হক রচনাবলী, ৩য় খণ্ড, মনসুর মুসা (সম্পাদিত) (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৪), ৬৪৩-৬৫৩।

২.      Muhammad Enamul Hoque, ‘Cultural Revolution under Ataturk: Its impact on East Pakistan and her literature,’ মুহম্মদ এনামুল হক রচনাবলী, ৪র্থ খণ্ড, মনসুর মুসা (সম্পাদিত), (ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ১৯৯৫), ৪৫৭-৬৬৮।

৩.      আহমদ ছফা, ‘এক সন্ধ্যার সংলাপ,’ আহমদ ছফার সাক্ষাৎকার সমগ্র (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৯), ৫৭-৮৭।

৪. ফররুখ আহমদ, ‘হাজার বছর পার হয়ে,’ পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম সাহিত্য, সরদার ফজলুল করিম (সম্পাদিত) (ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ১৯৬৮), ১৮১-২।

৫.      আবু রুশদ, আত্মজীবনী: ১৯১৯-১৯৮৮ (ঢাকা : এ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ১৯৮৮)।

৬.      ফররুখ আহমদ, ‘নজরুল-প্রসঙ্গ,’ ফররুখ আহমদ রচনাবলী, আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত, ২য় খণ্ড (ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ১৯৯৬ [ক]), ৩২৬-২৭।

৭.      ফররুখ আহমদ, ‘নজরুল সাহিত্যের পটভূমি,’ ফররুখ আহমদ রচনাবলী, আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত, ২য় খণ্ড (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৬ [খ]), ৩২৭-২৯।

৮.      আবদুল মান্নান সৈয়দ, ‘পরিশেষ,’ ফররুখ আহমদ রচনাবলী, ১ম খণ্ড (ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ১৯৯৫), ৫৩৯-৬০৫।

৯.      মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ, ‘ফররুখ আহমদ: কবি ও ব্যক্তি,’ সাহিত্য ও সাহিত্যিক (ঢাকা : মুক্তধারা, ১৯৭৮), ১৭০-১৮৬।

১০.     মুজীবুর রহমান খাঁ, ‘নারঙ্গী বনে কাঁপছে সবুজ পাতা,’ ফররুখ আহমদ : ব্যক্তি ও কবি, শাহাবুদ্দীন আহমদ সম্পাদিত, তৃতীয় সংস্করণ (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ২০০৪), ৩০৫-৩১৭।

১১.     মুহম্মদ আবদুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান, বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত : আধুনিক যুগ (ঢাকা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৫৬), ২৯৭-৩২৯।

১২.     আবদুল হক, ‘ফররুখ আহমদ,’ ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি, শাহাবুদ্দীন আহমদ সম্পাদিত, ৩য় সংস্করণ (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ২০০৪), ৪৯-৫৬।

১৩.     ফজল-এ-খোদা, ‘তাঁর তুলনা তিনি নিজেই,’ ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি, শাহাবুদ্দীন আহমদ সম্পাদিত, ৩য় সংস্করণ (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ২০০৪), ২১৪-২০।

১৪.     শওকত ওসমান, রাহনামা ২ : অন্য রূপান্তর ও ভুবন চত্বরে (ঢাকা : সময় প্রকাশ, ২০০৭)।

১৫.     আখতার ফারুক, ‘এক বিস্ময়কর মানুষ,’ ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি, শাহাবুদ্দীন আহমদ সম্পাদিত, ৩য় সংস্করণ (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ২০০৪), ৭৫-৭৬।

১৬.     আবদুল কাদির, ‘নবীন কবি ফররুখ আহমদ,’ সওগাত ২৯ : ৬ (বৈশাখ ১৩৫৪), ৩০৭-৩১০।

১৭.     রশীদ করীম, জীবন মরণ (ঢাকা : সাহিত্য প্রকাশ, ১৯৯৯)।

১৮.     আহমদ ছফা, ‘একজন সাহসী শক্তিমান কবি,’ গণকণ্ঠ, ১০ নভেম্বর ১৯৭৪।

১৯.     আবু রুশদ, আত্মজীবনী : ১৯১৯-১৯৮৮ (ঢাকা : এ্যাডর্ণ পাবলিকেশন, ১৯৯৮)।

২০.     আবু রুশদ, ‘আমার বন্ধু ফররুখ,’ ফররুখ আহমদ: ব্যক্তি ও কবি, শাহাবুদ্দীন আহমদ সম্পাদিত, ৩য় সংস্করণ (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ২০০৪), পৃ. ৫৭-৫৯।