গুন্টার গ্রাসের কবিতা: যে কথা না বললেই নয়

গুন্টার গ্রাসের এই কবিতা নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক চলছে জার্মানি ও ইসরায়েলে। কবিতাটি ‘ইসরায়েল রাষ্ট্র ও তার জনগণের প্রতি বিদ্বেষের আগুন উসকে দেওয়ার চেষ্টা’ হিসেবে উল্লেখ করে নোবেলজয়ী এই সাহিত্যিককে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি’ ঘোষণা করেছে ইসরায়েল। স্বদেশ জার্মানিতেও তুমুল সমালোচিত হয়েছেন গ্রাস। পরমাণু শক্তি অর্জন নিয়ে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর চলমান বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এ কবিতা নিয়ে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে ইসরায়েল-জার্মানি-ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে সারা দুনিয়াতেই। জার্মানির স্যুডডয়চে সাইটুং পত্রিকা গত পাঁচই এপ্রিল গ্রাসের কবিতাটি প্রকাশ করে। ‘ Was gesagt werden muss’ শিরোনামে জার্মান ভাষায় লেখা কবিতাটি ইতোমধ্যেই ইংরেজিসহ বেশ কয়েকটি ভাষায় অনুদিত হয়েছে।

grass-p.jpg
সলিমুল্লাহ খান কবিতাটি মূল ভাষা থেকে বাংলায় তর্জমা করেছেন।

 

 

যে কথা না বললেই নয়

এতদিন কেন চুপ মেরে আছি, কেন মুখ খুলিনি এত দীর্ঘ দিন
একটা খেলা চলছে–যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা
মহড়া চলছে প্রকাশ্যে দিবালোকে–
এ খেলার শেষে আমরা বেঁচে যাই তো হবো পাদটীকা।

খেলার নাম অতর্কিতে হামলার অধিকার
হামলাকারী– এখন জনৈক বাচালের ডাকে সমবেত–
ইরানের জনজাতি ধুলায় মিশিয়ে দেবে
কারণ তার সন্দেহ
তার ক্ষমতার বলয়সীমায় পরমাণু বোমা তাতাচ্ছে ইরান।

অথচ অনেক দিন হলো আর একটা দেশের হাতে পরমাণু শক্তি মজুত আছে
আর সে ক্ষমতা বাড়ছেও দিনে দিনে
তার উপর কারও কোন নিয়ন্ত্রণ নাই, কেননা তা পরিদর্শনের
আওতার বাইরে
সে দেশের নামটা মুখে আনতে কেন রাজি নই আমি?
সারা দুনিয়া খেলছে এই লুকোচুরি খেলা
আমিও মেরেছি চুপ এই লুকোচুরির তলায়
আমার তো মনে হয় এই নিশ্চুপ থাকার চেয়ে
বড় মিথ্যাচার বড় কেলেঙ্কারি আর কিছু নাই
এই মিথ্যার বিরুদ্ধে টু শব্দটি করো দেখি তুমি
দেখবে অভিশাপ ভয়াবহ খড়গ আসছে নেমে তোমার মাথায়
তুমি ‘এয়াহুদি বিদ্বেষী’।

আমার দেশ অপরাধী– কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে সে
বহু বহুবার– অপরাধ তার তুলনাবিহীন।
আর আজ ভাগ্যের ফেরে– হয়তো নিছক ব্যবসাজ্ঞানে
অথচ মুখে বলছে ক্ষতিপূরণ হিসাবে– ঘোষণা করেছে
ইসরায়েলকে আরো এক ডুবোজাহাজ বেচবে সে
দুনিয়া ধ্বংস করতে পারে এমন ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া যায়
জাহাজ থেকে, ছোড়া যাবে সে দেশপানে
যে দেশে প্রমাণ নাই পরমাণু বোমা আছে
শুদ্ধ আছে ভয় আর ভয়ই তো অকাট্য প্রমাণ।
তাই আমাকে বলতে হবে যে কথা না বললেই নয়।

তো এদ্দিন, আজতক, কেন চুপ মেরে আছি আমি?
আছি ভয়ে, ভয় জন্মদাগের
এ দাগ কোনদিন মুছবার নয়
এ দাগের ভয়ে এদ্দিন ইসরায়েলের মুখের উপরে
করতে পারিনি আমি সত্য উচ্চারণ
কারণ তার সনে বাঁধা আছি আমি চিরদিন
থাকতেও চাই বাঁধা হয়ে।

যে কথা বলতে পারিনি তো সে কথা বলছি কেন এখন?
এখন বয়স হয়েছে আমার, ফুরিয়ে এসেছে কলমের কালি
এমনিতেই ভাঙাচোরা বিশ্বশান্তি
আর সে বিশ্বশান্তির পথের কাঁটা
হয়ে দাঁড়াচ্ছে ইসরায়েল
এ কথা না বললেই নয়, বড্ড দেরি হয়ে গেছে
বলবার সুযোগ আর নাও থাকতে পারে আর।

আরও এক কারণে বলছি আজ
আমরা জার্মান জাতি, অপরাধভারে নত হয়ে আছি
সামনে আরো এক অপরাধ ঘটতে চলেছে
আর আমরাও হতে চলেছি তার ভাগদার সমান অপরাধী
যে অজুহাতে এতদিন পার পেয়ে গেছি
তাতে দালালি আর হবে না হালাল।

মাপ করবেন, আমি আর চুপ থাকতে পারলাম না আজ
কেননা পশ্চিমা দুনিয়ার ভণ্ডামি দেখতে দেখতে আমি হয়রান
আশা করছি আপনারাও–আরো অনেকেই
মুখে আঁটা কুলুপ খুলে নিরবতা অভিশাপ মুক্ত হবেন
দেখতে পাচ্ছেন এগিয়ে আসছে বিপদ
যে দেশের কারণে হাত জোড় করে সে দেশকে বলুন
বলপ্রয়োগ করবেন না
আর দাবি তুলুন
দুই দেশের সরকারকেই বলা হোক
ইসরায়েলি পরমাণু শক্তি
আর ইরানি পরমাণু ক্ষেত্র
দুইটাই থাক মহাজাতিক সংঘের অবাধ ও স্থায়ী নজরে।

কি ইসরায়েলি কি ফিলিস্তিনি সকলের–
আমাদের সকলের– মায় এই উন্মত্ত ভূখণ্ডের ঘরে ঘরে
যারা করি শত্রুর সঙ্গে করি গলাগলি বসবাস
তাদের সকলের বাঁচবার এ ছাড়া আর পথ নাই।
নাই শুদ্ধ তাদেরই নয়, আমাদের সকলের।

 

বিডিনিউজ, আর্টস, ১১ এপ্রিল ২০১২

জেমস রেনেল ও তাঁহার রোজনামচা : ১৭৬৪-১৭৬৭ (তেসরা কিস্তি)

৩য় কিস্তির ভূমিকা

rennell………
জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০)
……….

জেমস রেনেল: আরোর আরো

মেজর জেমস রেনেল খ্রিস্টিয় ১৭৭৬ সালে সরকারি চাকুরি হইতে অবসর গ্রহণ করিলেন। ইহার শুদ্ধ কিছুদিন আগে ‘বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ার’ নামক পল্টনে মেজর পদে তাঁহার উন্নতি হইয়াছিল। তখন কলিকাতায় পূর্ব ভারত কোম্পানি নিয়োজিত গভর্নর জেনারেল পদে ওয়ারেন হেস্টিংস আসীন। জেমস রেনেলের নামে মাসিক ৫০/= টাকা পেনসন মঞ্জুর করিয়াছিলেন তিনি। এই কথা আমরা পহিলা কিস্তিতেই উল্লেখ করিয়াছি। ইহার পর দেশের ছেলে দেশেই ফিরিয়া গেলেন। দেশে ফিরিবার পর জেমস রেনেল লন্ডনেই বসবাস শুরু করেন। তাঁহার বাকি জীবন খুব একটা হ্রস্ব ছিল এমন কথা বলিব না। এই নাতিহ্রস্ব জীবন তিনি নানানদেশের ভূগোলবিদ্যা আর সাহিত্য চর্চা করিয়া কাটাইয়াছিলেন।

তাঁহার বড় কীর্তি বাঙ্গালাদেশের ভূচিত্রাবলী যাহাতে হিন্দুস্তানের ঐদিককার রণাঙ্গন আর বাণিজ্যাঙ্গনের মানচিত্র সন্নিবেশিত হইয়াছে বা Bengal Altas, containing Maps of the Theatre of War and Commerce on that side of Hindoostan প্রকাশিত হয় ১৭৭৯ সালে। ১৭৮১ সালে ইহার একটি দোসরা সংস্করণও ছাপা হয়। একই বৎসরে তিনি বিলাতের—রাজসভা বা Royal Society নামেই সমধিক পরিচিত—বিজ্ঞানসাধকমণ্ডলীর সদস্য বা ফেলো নির্বাচিত হইলেন।

ইহার পর তিনি ভারতবর্ষের একপ্রস্ত মোটামুটি নির্ভরযোগ্য মানচিত্র তৈয়ারে মনোনিবেশ করিলেন। সঙ্গে একটি প্রবন্ধ বা মেমোয়ারও জুড়িয়া দিলেন। (রেনেল ১৭৮৩) তাহাতে যোগ করিলেন কোন কল্পনা ও কোন কোন গ্রন্থকারের সহায়তা লইলেন তাহার বিবরণও। এশিয়াখণ্ডের পূর্বাঞ্চল জুড়িয়া বিশাল একখণ্ড ভূগোল বই লিখিবার মওকাও তিনি করিলেন আর গ্রিক ইতিহাসবেত্তার নামে ‘এরোদোতসের ভূগোল’ নাম দিয়া তদ্বিরচিত ২ খণ্ড বহিও বাহির হইল।

আফ্রিকা মহাদেশের ভূগোল লইয়াও তিনি মাতিয়াছিলেন। ১৭৯০ সাল নাগাদ লন্ডনস্থ আফ্রিকা সমিতির ডাকে তিনি ঐ মহাদেশের উত্তর অর্ধাংশের মানচিত্রও প্রকাশ করিলেন। সঙ্গে একপ্রস্ত প্রবন্ধও। ১৭৯১ সালে বিলাতের রাজসভা তাঁহাকে কোপলে পদক (Copley Medal) প্রদান করিয়া সম্মান জানাইলেন।

বাতাস ও সমুদ্রস্রোতের গতিবিধি লইয়া গবেষণায়ও তিনি এক পর্যায়ে আগ্রহ দেখাইলেন। ১৮১০ সালের পর তিনি তাঁহার সকল গবেষণা এক জায়গায় আনিয়া কিছু সার্বিক সিদ্ধান্ত বা ‘জেনারেল থিয়োরি’ প্রকাশ করিবারও কোশেশ করিলেন।

রেনেল সাহেব যে সময় জরিপকার্য সমাধা করিতেছিলেন সেই সময় মাপজোকের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি তত উন্নত বা নিখুঁত হয় নাই। তিনি একপ্রস্ত কম্পাস ও এক বাঁও শিকল ভরসা করিয়া জরিপাদি চালাইতেছিলেন। সবে—শুদ্ধ ১৭৬১ সালে—সময় পরিমাপক যন্ত্র বা ক্রোনোমিটারের দৌলতে অক্ষাংশ মাপিবার কৌশল বাহির হইয়াছে। রেনেল তাঁহার কাজ শুরু করিয়াছেন ততদিনে মাত্র ১ বৎসর হইয়াছে। তাহা সত্ত্বেও রেনেলের জরিপ কী করিয়া এত নিখুঁত হইল তাহা একশ/দেড়শ বছর পরের পণ্ডিতসাধারণের বিস্ময় উৎপাদন করিয়াছে। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে কর্নেল ল্যামটন প্রমুখের হাতে জরিপের আরো নিখুঁত পদ্ধতি বাহির হইয়া গেলেও ভারতবর্ষের ব্রিটিশ জরিপ বিভাগ রেনেলের কর্জ চিরকাল স্বীকার করিয়াছেন।

১৭৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রেনেল মুক্তিযোদ্ধা ফকির বাহিনীর হাতে মার খাইয়া ঘা শুকাইবার নিমিত্ত ঢাকায় চলিয়া আসেন। তাঁহার জীবনীকার বলিয়াছেন ইংরেজ অফিসারদের মধ্যে ঐ বছর মে মাসে যে বিদ্রোহ দেখা দিল তাহাতে তিনি শরিক হইবার সুযোগ পান নাই। সুস্থ থাকিলে তিনি অসন্তুষ্ট অফিসারদের সঙ্গে যে যোগ দিতেন তাহা তৎলিখিত এক পত্র মারফত জানা যায়।

তথাপি সেই যুগের ইংরেজ কর্তৃপক্ষ ওরফে কলিকাতার কৌন্সিল রেনেলের এতখানি তারিফ করিলেন কেন? রেনেলের রোজনামচা সাক্ষী তিনি রোজকার কাজ কতটা মনোযোগ সহকারে সারিতেন। আবহাওয়ার প্রতি প্রহরের পরিবর্তন তিনি লিখিয়া রাখিয়াছেন—তাঁহার জরিপ যুগের (১৭৬৪-১৭৬৭) আগা হইতে গোড়া পর্যন্ত কখনও ইহার ব্যতিক্রম দেখা যায় না।

রোজনামচার সম্পাদক লা টুশ সাহেব ১৯১০ সালে লিখিত ভূমিকায় বলিয়াছেন: ‘ভারত ইতিহাসের ঐ তুলনারহিত জমানায় যখন এয়ুরোপীয় লোকজন বল্গাহীন বিলাসিতায় সময় কাটাইতেন, তখন যে কর্ম হাতে লইয়াছেন সেই কাজে একাগ্রে চিত্তনিবেশ করিবার প্রতিভা তাঁহার ছিল বলিয়াই তিনি পরম নিষ্ঠা ও সততার সহিত নিজ কর্তব্যে অটল থাকিতেন। সন্দেহ নাই এই কারণেই কলিকাতার কৌন্সিল এহেন প্রশংসাবাক্যে তাঁহাকে অভিনন্দিত করিয়াছিলেন। ঐ যুগে তাঁহাদের কর্মচারী মহলে এহেন সদগুণের দেখা পাওয়া সহজ ছিল না।’

দোহাই

১. Major James Rennell, ‘Bengal Altas, Containing Maps of the Theatre of War and Commerce on that Side of Hindoostan, 1st ed., London 1779, 2nd ed., London 1781, reprinted by order of the Surveyor General of India.
২. Major James Rennell, Memoir of a Map of Hindoostan or the Mogul Empire, &c., London, 1783.
৩. Sir C. Markhan, Memoir of the Indian Surveys, 2nd ed. London, 1878.
৪. T. H. D. La Touche, ‘Introduction’, in The Journals of Major James Rennell, Calcutta, 1910.

~~~

আমিন জেমস রেনেল

বিরচিত

শুকনা মৌসুমে গঙ্গানদী হইতে কলিকাতা যাইবার নিকটতম পথ খুঁজিয়া পাইবার লক্ষ্যে জলঙ্গি নদীর মাথা হইতে ব্রহ্মপুত্র বা মেঘনা নদীর সঙ্গমস্থল পর্যন্ত গঙ্গার; লক্ষীপুর হইতে ঢাকা পর্যন্ত মেঘনা ও অন্যান্য নদীর; এবং দক্ষিণ তীরবর্তী নদীনালার জরিপকার্যের বিবরণী সংযুক্ত

রোজনামচা

সন ১৭৬৪-১৭৬৭

তজর্মা : সলিমুল্লাহ খান

(গত সংখ্যার পর)

বৈকালে পূর্বতীরে ভিড়িলাম, কারণ এইখান হইতে মোহনার মাথা পর্যন্ত ফিরতি জরিপ করিতে হইবে, কারণ যদি খালটিতে নৌ চলাচলের উপযোগী অবস্থা আছে বলিয়া প্রমাণ পাওয়া যায় তবে যে সমস্ত নৌকা নদীর ভাঁটিতে নামে তাহারা তো সহজেই এই পথ বাহিয়া আসিতে পারে।

বেলা ৪ ঘটিকার সময় উত্তর উত্তর-পশ্চিম দিক হইতে একটি ভারি দমকা হাওয়া বহিয়া গেল। সুদীর্ঘ মোহনাঞ্চল নৌকা-সাম্পান যাতায়াতের উপযোগী নহে বিধায় আমরা কুষ্টিয়া খালের ভেতরে আশ্রয় লইয়া সময় কাটাইতে বাধ্য হইলাম। সারা রাত ধরিয়া বিস্তর বাতাস আর বৃষ্টি।

৪ ও ৫ তারিখ আবহাওয়া ভাল গেল, বাতাস কখনো ভারি কখনো হালকা। এই দুই দিবস সুদীর্ঘ দক্ষিণ মোহনার পূর্বতীর জরিপ করিয়া কাটাইলাম আর বৈকালে কুষ্টিয়া খালে গমন করিলাম।

৬, ৭ ও ৮ তারিখ গভর্নরের কাছে পাঠাইব বলিয়া আদি জরিপ চিত্রাবলী ছোট আকারে আঁকিয়া, রোজনামচার নকল করিয়া কাটাইলাম। এই সময়টা জুড়িয়া প্রচুর বৃষ্টি হইল। বজরার ফুটাফাটা বন্ধ করিবার এবং রাডার সারাইবার নিমিত্ত কয়েকজন কাঠমিস্ত্রী নিযুক্ত করিলাম।

৯ তারিখে মাথা হইতে নিচের দিকে সোয়া এক মাইল পর্যন্ত খালের তত্ত্ব লইলাম, ঐ পর্যন্ত গিয়া দেখিলাম পানির গভীরতা একেবারেই নাই। আরো কড়াকড়ি পরিক্ষা করিয়া দেখিলাম কুপাদি (Cupadin) গ্রামের উল্টাদিকে পানি মাত্র ৪ কি ৫ হাত আর বিশ্বাসযোগ্য একজনের জবানিতে জানিতে পারিলাম এই বৃষ্টির মৌসুম শুরু হইবার পর পানি ৪ হাত পর্যন্ত বাড়িয়াছে। এই পরিস্থিতির কথা ছাড়িয়া বলিতে, কয়েকজন নৌকার মাঝি আমাকে বলিয়াছেন শুকনা মৌসুমে তাহারা এই জায়গাটা ডিঙ্গিযোগে পার হইয়াছেন আর এইখানে অনেক সময় ৯০ মণ বোঝাই নৌকা পার হইতে পারে মতন পানি থাকে না। ৩০০ মণের নৌকা যাইতে ২ হইতে ২ ৩/৪ হাত মতো পানির দরকার পড়ে।

১০ তারিখ সকালে গভর্নর সমীপে মানচিত্র আর রোজনামচাযোগে হরকরা (Hircar) পাঠাইলাম। রোজনামচায় কুষ্টিয়া খালের যাবতীয় পরিস্থিতি গভর্নর সাহেবকে অবহিত করিয়াছি। আজ সারাদিন ভাল আবহাওয়া। অপরাহ্নে কুষ্টিয়া খালের পূর্বদিক ধরিয়া জরিপ শুরু করিলাম। নদীর গতিমুখ এখন ৮ হইতে ৯ মাইল পর্যন্ত উত্তর-পূর্ব ও পূর্বমুখি।

১১ তারিখ সকালবেলা পূর্বদিক হইতে আনকোরা দমকা বাতাস, সঙ্গে কড়া বৃষ্টির ঝাট। দিনের মধ্যভাগে আবহাওয়া পরিষ্কার, সন্ধ্যাবেলা শান্ত আর বৃষ্টি বৃষ্টি। আগের মতোই জরিপে ব্যস্ত ছিলাম। ভরা বর্ষায় নদীর প্লাবন হইতে কুল ঠেকাইবার নিমিত্ত বিরাট একটা বাঁধ দেওয়া হইয়াছে। এই বাঁধটি ৫ মাইলের চেয়েও লম্বা; ইহা উচ্চতায় ১২ ফুট আর প্রস্থে ১৪ গজ। এখানে কোন কোন জায়গায় নদী মাত্র ১/৪ মাইল চওড়া।

১২ তারিখ পূর্বাহ্নে ঘন ঘন বাতাস ও বৃষ্টির দমকা ঝড়; দিনের বাদবাকি পরিষ্কার।

আজ পাবনা খালের মাথায় আসিলাম। ইহা বাহির হইয়াছে বড় নদীর [পদ্মা] উত্তর দিক হইতে আর ইহার অবস্থান কুষ্টিয়ার উত্তর-পূর্বে ও পূর্বে ৮ মাইল দূরে। এই খালটি আবার গঙ্গায় মিশিয়াছে রতনগঞ্জ (Rottingunge) গিয়া—ইহার কথা পরে হইবে।

খালের পূর্বে পাড়ে পাবনা গ্রাম, গ্রামটি বড় নদীর অতি ধারেকাছে। এই জায়গায় নৌকাসাম্পান মেরামত আর বানানো হয়।
এখান হইতে ৯ মাইল পর্যন্ত নদীর গতিমুখ দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে। পূর্ব দিকে একটি বাঁধ দেওয়া আছে, বাঁধের দৈর্ঘ্য কয়েক মাইল পর্যন্ত হইবে। বাঁধটা কয়েক জায়গায় ভাঙিয়া গিয়াছে। ইহা হইতে মনে হয় বাঁধ দেওয়ার পর হইতে নদীর বাড় পূর্বতীর ধরিয়া বেশ বাড়িয়াছে, কিন্তু বাঁধটা কতদিন আগে দেওয়া হইয়াছে তাহা জানিতে পারি নাই।

১২ তারিখ হইতে ১৭ তারিখ পর্যন্ত আগে যে মোহনার উল্লেখ করিয়াছি তাহার জরিপ করিয়া কাটাইলাম। দুই তীরের গ্রামাঞ্চলে উল্লেখ করিবার মতন তেমন কিছু নাই—কয়েকটি গ্রাম আছে আর আছে বিস্তর চাষের জমি—বিশেষ পশ্চিম তীরে অনেক জমি—সেই জমিতে ধান বোনে।

এই সময়টা আবহাওয়া খুবই ঝড়ঝাপটাময় ছিল, রোজই দক্ষিণপূর্ব কোণা হইতে ঝড়ো হাওয়া বহিতেছিল আর বৃষ্টিও বেশ হইল।

দক্ষিণ-পূর্ব মুখি দক্ষিণ মোহনার শেষ মাথায় আসিয়া নদী হঠাৎ উত্তর উত্তর-পূর্বমুখি মোড় লইয়াছে আর লইয়া পাঁচ মাইল পর্যন্ত এই পথে চলিতেছে। এই মোহনার পূর্ব তীর ধরিয়াও আর একটি বাঁধ দেওয়া আছে।

১৭ তারিখ আজুদিয়া (Oddygya) আসিলাম। ইহা এই মোহনার পূর্বতীরের গ্রাম বটে। এই পর্যন্ত আসিয়া নদীর খাড়ি দুই খাতে ভাগ হইয়াছে। সর্ব উত্তরের খাতটি শুদ্ধ রবিমৌসুমে নৌ চলাচলের যোগ্য থাকে। যে দ্বীপটি এই দুই খাতের বিচ্ছেদ কায়েম করিয়াছে তাহা দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩ ১/২ মাইল হইবে। আর ইহা দেখিতে অবিরাম। আর ইহা ভালোমতো আবাদমহলও বটে।

১৮ তারিখ আনকোরা হাওয়ার ঝাপটা সারাদিন আর নিরন্তর বৃষ্টি। ইহাতে আমরা বাধ্য হইয়া শুইয়া থাকিলাম।

১৯ তারিখ পরিষ্কার আবহাওয়া। নদীর দক্ষিণ খাত জরিপ করিয়া কাটাইলাম।

২০ তারিখ সারাদিন দক্ষিণামতো দিক হইতে আনকোরা হাওয়ার দাপাদাপি কিন্তু আবহাওয়া শুকনা। সকাল নাগাদ দক্ষিণ খাতের জরিপ সমাধান করিলাম আর হাবাসপুরের (Habbaspour) কাছাকাছি বড় নদীতে আসিলাম। এই স্থান হইতে নদী দক্ষিণমুখি পথ লইয়াছে।

২১ তারিখ সকাল পরিষ্কার কিন্তু বিকাল ঝঞ্ঝা ও বৃষ্টিময়। হাবাসপুর হইতে মোহনার শেষ মাথায় একটা বড় খালের মুখানি (inlet) চোখে পড়িল আর বিকাল ইহার মাথা পরখ করিলাম। ইহা সাধারণ হিসাবে চওড়ায় ২৫০ গজ আর গভীরতায় কোনখানেই ১৬ হাতের কম হইবে না। এই খালের ভাঁটি বরাবর ১ মাইলের মধ্যে মৌদাপুর (Maudapur) নামে এক বর্ধিষ্ণু গ্রাম আছে; গ্রামটি নদীর পশ্চিমতীরে। এই খালের ধারা দক্ষিণ-পূর্বমুখি আর লোকে বলিল ইহাতে সম্বৎসর নৌসাম্পান চলে, সুন্দরবন (Sunderbound) যাওয়ার পথ ইহার উপর দিয়াই।

২২ তারিখ বড় নদীতে আসিলাম কারণ পূর্বদিকে আরো কয়েক মাইল জরিপ করিতে হইবে আর খালের মুখ বরাবর মোহনার মোড় ঘুরিবার মুখে যে বড় দ্বীপটি আছে তাহা আঁকিতে হইবে: ইহা না করিলে নদীর মানচিত্র বড়ই বেখাপ্পা দেখাইবে, খালের মুখানি হইতে পূর্বদিকে ইহার স্রোতধারা কোন পথে আগাইয়াছে তাহার সঠিক ধারণা পাওয়া যাইবে না।

২২, ২৩ ও ২৪ তারিখের কিছুক্ষণ খালের পূর্বদিকে বড় নদীর ৩ মাইল এবং একইভাবে পূর্বতীর ধরিয়া সেই স্থান হইতে পিছন ফিরিয়া সুজানগর (Sujanagare) পর্যন্ত জরিপ করিলাম। ২৩ তারিখ বৈকালে উত্তর-পশ্চিম দিক হইতে আরো এক দফা কড়া ঝড়বৃষ্টি আসিল আর ২৪ তারিখ সকালবেলা আনকোরা দমকা হাওয়া বহিল, দিনের বাদবাকি পরিষ্কার আবহাওয়া। আজ সকালে খালের ভিতর ঢুকিলাম আর ভাঁটি বরাবর আরো এক মাইল জরিপ চালাইলাম। এই জায়গায় খাল বড়ই আকাবাঁকা। আমি ধরিয়া লইতেছি এই সময়টায় পানি ৫ হাত পর্যন্ত বাড়িয়া গিয়াছে, এখন খালের গভীরতা ১৩ হাতের কম নহে।

জুনের ২৪ তারিখ হইতে জুলাইর ৩ তারিখ পর্যন্ত আবহাওয়া চোখে পড়িবার মত পরিষ্কার। এই সময়ে শুদ্ধ কয়েক পশলা হালকা বৃষ্টি হইয়াছে আর বাতাস দক্ষিণপূর্ব দিক হইতে বহিয়াছে মৃদুমন্দ হিল্লোলে। এই সময়ের মধ্যে আমরা ৩০ মাইলেরও বেশি খালের সন্ধান পাইলাম। ইহার স্রোত সাধারণভাবে বলিতে দক্ষিণ-পূর্বমুখি, যদিও গত ২ দিন আমরা দেখিলাম ইহার পথ খুবই আকাবাঁকা, শেষ ৯ মাইলের মধ্যে ইহা ৭ বার মোহনা (Reaches) পরিবর্তন করিয়াছে আর এইটুকু সময়ের ভিতর নাক-বরাবর শুদ্ধ ২ ১/২ মাইল আগাইয়াছে। যে গ্রামদেশের মধ্য দিয়া আমরা চলিয়াছি তাহার চেহারা বহরূপী, কোথাও মাইলের পর মাইল ঘন জঙ্গল আর কখনও বা উন্মুক্ত গ্রামাঞ্চল, যদিও চাষাবাদ সাধারণভাবে বলিতে বিরল। খালপাড়ের ৯ মাইল মতো নিচে সোনাপাড়া (Sunapara) এলাকায় কয়েক বাগান সুপারি (Betal বা Areca) গাছ আর আরো ৭ ১/২ মাইল পর শ্রীরামপুরে একবাড়ি ছোট্ট মন্দির (Pagoda)। পাঁচ মোহনার সঙ্গমস্থলে গঠিত উপদ্বীপে ইহার স্থান। এই খাল কুমির আর কচ্ছপে ভর্তি—আমরা দুই জাতিরই দেখা পাইয়াছি অপর্যাপ্ত সংখ্যায়। কুমিরজাতি সাংঘাতিক লাজুক। কানে সামান্যতম শোর বাজিলেও উঁহারা ডুব মারেন।

গ্রামবাসীরা খালটির নাম রাখিয়াছেন চন্ননা (Chunnunah) আর আমরা শুনিয়াছি আরও চার মাইল ভাঁটিতে ইহা গিয়া পড়িয়াছে কুমার নদে (Comare Creek)। প্রস্তে এই খালটি সবখানেই সমান মাপের, প্রায় ২০০ গজ হইবে; গভীরতায় যথেষ্ট অসমান, কোথাও ৫০ হাত আর কোথাও বা ৬ হাত হইবে।

২৬ ও ২৯ জুন পাটনামুখি দুই বহর লবণের নৌকার সহিত মোলাকাত হইল। একটি সুন্দরবন ও খুলনা (Culna) হইয়া কলিকাতা হইতে আসিতেছে, আরেকটি আসিতেছে বরসিয়া নদ (Burrashee Creek) ধরিয়া জয়নগর (Jaynagore) হইতে। একটি নৌকার বোঝাই ৩৫০০ মণ (প্রায় ১২০ টন) আর পানিতে ইহার দাবা ৪ ১/২ হাত।

২৮ তারিখ পদ্মদহে (Podumdey) দেখিলাম কম্পাসের কাঁটা পূর্বমুখি ০º-৫৪´ পর্যন্ত নড়িয়াছে।

২৯ তারিখ ২ হরকরাযোগে গভর্নর সাহেবের পাঠানো এক প্রস্ত পত্র পাইলাম।

বিডিনিউজ, আর্টস, ২০ ডিসেম্বর ২০০৭

জেমস রেনেল ও তাঁহার রোজনামচা : ১৭৬৪-১৭৬৭ (দোসরা কিস্তি)

জেমস রেনেল বৃত্তান্ত : আরো

rennell………
জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০)
……….
জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০) বিষয়ে আরো তথ্য চাহিয়া যাঁহারা লিখিতে বলিয়াছেন তাঁহাদের – বিশেষ বিধান রিবেরু মহাশয়ের – শুকরিয়া আদায় করিয়া তাঁহার কথা দ্বিতীয় কিস্তি লিখিতেছি। এই কিস্তির উৎসও প্রথম কিস্তির অনুরূপ। নতুন খবর ইহাতে তেমন বিশেষ নাই। (লা টুশ ১৯১০; উয়িকিপিডিয়া ২০০৭)

জেমস রেনেলের জন্ম ১৭৪২ সালের ৩রা ডিসেম্বর ধরিয়া লইলে ১৭৬৪ সালের গোড়ার দিকে তাঁহার বয়স হইতেছে সবে ২১ বছর কয়েক মাস। সেই বয়সেই তিনি বঙ্গদেশে আসিলেন। বঙ্গে তখন সবে ইংরেজাধিকার কায়েম হইয়াছে বটে, মোকাম হয় নাই পুরাদস্তুর – এই কথা আমরা পহিলা কিস্তিযোগেই উল্লেখ করিয়াছি। ততদিনে তাঁহার নৌ-বাহিনীর চাকুরিসহ জাগতিক বা হাতেকলমে অভিজ্ঞতা লাভ হইয়া গিয়াছে ৮ বছর। তাঁহার বাবা জন রেনেলও নৌ-বাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা আমরা আমলে লই নাই।

১৭৫৬ সালে তিনি প্রথম মহাব্রিটেনের রাজার নৌবাহিনীর ব্রিলিয়ান্ট (Brilliant) নামা জাহাজে নাবিকের (midshipman) চাকরি লইয়াছিলেন। সেই জাহাজেই তাঁহার পরিচয় হইয়াছিল সমান পদে চাকরিরত টোপাম নামা অন্য এক নাবিকের সঙ্গে। এই টোপাম সাহেবই বলিয়া কহিয়া কলিকাতার উইলিয়াম নামা দুর্গে শিক্ষানবিশ প্রকৌশলী বা এঞ্জিনিয়ার পদে তাঁহার চাকরি জুটাইয়া দিয়াছিলেন।

অবশ্য ইহার আগের বৎসর অর্থাৎ ১৭৬৩ সালেই রেনেল স্বেচ্ছায় নৌবাহিনী না ছাড়িয়াই পূর্ব ভারত কোম্পানির চাকরি লইয়াছিলেন। চাকরি লইয়া তিনি ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জে গমন করেন। সেখানে তাঁহার কাজ ছিল জরিপ পরিচালনা। এই কাজ তিনি নৌবাহিনীতে থাকার সময়ই শিখিয়াছিলেন। সেই জায়গা হইতে মাদ্রাজে (এখনকার চেন্নাই) ফিরিয়া তিনি নৌবাহিনী হইতে ছাড়া পাইয়া গেলেন। সেই জায়গায় তাঁহাকে একটি সদাগরি জাহাজের কাপ্তেন নিয়োগ করা হইয়াছিল। দুর্ভাগ্যের মধ্যে, ১৭৬৩ সালের ২১ অক্টোবর তারিখে জাহাজটি হারিকেনে হারাইয়া যায়। ভাগ্যের মধ্যে, রেনেল সাহেব ঝড়ের রাতে জলে ছিলেন না, স্থলভাগে অবস্থিতি করিতেছিলেন। তাই বাঁচিয়া গেলেন। পরে নেপচুন নামা একটি আন্দাজমতো জাহাজের চাকরি তাঁহার হইয়াছিল। ইহার কাজের মধ্যেও কিছু জরিপ তিনি করিয়াছিলেন।

১৭৬৪ সালেই কলিকাতায় সেই সময়কার ইংরেজ গভর্নর বা দুর্গাধিপতি হেনরি ভ্যানশিটার্ট তাঁহাকে গঙ্গার বদ্বীপ এলাকা জরিপ করিবার নিমিত্ত আমিন নিয়োগ করেন। এই কাজ সফলতার সহিত সম্পাদন করিবার পুরষ্কার হিসাবেই – বোধ হয় – তাঁহার উচ্চতর পদ জোটে। ১৭৬৭ সালের মাহে জানুয়ারি নাগাদ মহা আমিন বা সার্ভেয়ার-জেনারেল পদে রেনেলের নিয়োগ চূড়ান্ত হয়। তাঁহার মাসোহারা ঠিক করা হইয়াছিল তিনশত টাকা। কালের বিচারে এই বেতন অতি উচ্চ ছিল। প্রমাণ: ১৭৬৪ সালে কলিকাতা কৌন্সিলের (Council) সদস্য ওয়ারেন হেস্টিংস মহাশয়ও নাকি ঐ একই পরিমাণ মাসোহারা তুলিতেন। জেমস রেনেলকে এই বড় পদটিতে নিয়োগ দেওয়ার কিছুদিন পর অতি বিখ্যাত লাটসাহেব রবার্ট ক্লাইব মহোদয়ের দ্বিতীয় দফা গভর্নরি শেষ হয়।

১৭৬৭ সালের ৮ জানুয়ারি তারিখে পূর্ব ভারত কোম্পানির সদর দপ্তর (Court of Directors) বরাবর লেখা কলিকাতা কৌন্সিলের এক চিঠি হইতে এই খবর পাওয়া যাইতেছে। ৩০ মার্চের চিঠিতে উল্লেখ করা হইয়াছে সম্প্রতি তিনি জরিপ অভিযান চালাইবার সময় গুরুতর আহত হইয়াছেন। ইহাতে তাঁহার স্বাস্থ্যহানিও ঘটিল গুরুতর। এই ঘটনার বিবরণ রেনেল নিজেও তাঁহার রোজনামচা লিপিতে আবদ্ধ রাখিয়াছেন।

এতদ্দেশীয় দেশের বিপ্লবী দেশীয় সৈনিকদের পরিচয় তিনি ‘সন্ন্যাসী’ নামই দিয়াছিলেন। সন্ন্যাসীরা সেইবার তাঁহাকে মারিয়া-কাটিয়া একশেষ করিবার সামান্যই বাকি রাখিয়াছিলেন। ইহা ১৭৬৬ ইংরেজির ২১ ফেব্র“য়ারি তারিখের ঘটনা। জায়গার নাম ধরলা। ইহা ভূটানপথে কুচবিহার সীমান্তের নিকটে বটে।

গঙ্গা হইতে বড় বড় জাহাজযোগে কেমন করিয়া কলিকাতায় আসা যায় তাহার সংক্ষিপ্ত পথ খুঁজিয়া বাহির করিতে রেনেল সাহেবকে পহিলা চাকুরিটা দেওয়া হইয়াছিল। পরে তাঁহাকে বলা হয় সুন্দরবন আর মেঘনার মধ্য দিয়া কলিকাতা আসিবার পথও বাহির করিতে। রেনেলের রোজনামচায় এই পহিলা অভিযানের বিবরণ ছাড়াও আরও তিন যাত্রার কাহিনী লেখা হইয়াছে।

শেষের তিন যাত্রায় তিনি উত্তর ও পূর্ব বাঙ্গালার অনেক জায়গার নদীপথিক জরিপ শেষ করিয়াছিলেন। ব্রহ্মপুত্র নদীর পথে গোয়ালপাড়া পর্যন্ত পৌঁছিবার পর অহম রাজ্যের সীমানায়ও তিনি ঢুকিয়াছিলেন বলিয়া উল্লেখ পাইতেছি। এই অভিযানের এক প্রহরে তিনি যখন কুচবিহার সীমান্তে তখনই দেশীয় বিপ্লবীদের হাতে পড়েন। মারটা জবর হইয়াছিল বলিয়াই মনে হয়।

সন্ন্যাসী ফকির বাহিনী তাঁহাদের দলকে ঘেরাও করিয়া ফেলে এবং তলোয়ার দিয়া কয়েকটা কোপও মারে তাঁহার গায়ে। শুদ্ধ ভাগ্যের জোরে তিনি এ যাত্রা প্রাণটা রক্ষা করিতে পারিয়াছিলেন। রোজনামচায় এই হামলার সবিস্তার বিবরণ পাওয়া যাইবে। তাহা ছাড়া ইংরেজি ভাষায় তাঁহার যে জীবনীগ্রন্থ অবলম্বন লা টুশ সাহেব তাঁহার ভূমিকা ফাঁদিয়াছেন সেই জীবনীগ্রন্থও ইহার বিস্তারিত তথ্যসম্বলিত বলিয়া জানাইতে কসুর করেন নাই তিনি । (মার্কাম ১৮৯৫: ৪৭)

রেনেলের রোজনামচার বিস্তার ১৭৬৭ সালের মার্চমাস পর্যন্ত পাওয়া যায়। তখনও তিনি গাঙ্গেয় বদ্বীপাঞ্চলের নদনদীজরিপ কাজ শেষ করিয়া সারেন নাই। সেই সময় তাহার প্রবলবেগে জ্বর আসিত। সেই রকমই এক জ্বরের প্রকোপে তিনি একদিন কাজ বন্ধ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন । ইহা জানাইতেছেন তাঁহার জীবনী লেখকরা।

যথা মার্কাম সাহেব লিখিত জীবনীগ্রন্থে ভারতবর্ষে রেনেলের বাদবাকি জীবনের কর্মতৎপরতার আরো বিবরণ রহিয়াছে। ১৭৭১ সালে আপনকার পুরানা দুশমন ফকির সন্ন্যাসীদের বিরুদ্ধে আবারও তাঁহাকে যুদ্ধে পাঠান হইয়াছিল। জীবনীকার কহিতেছেন এই যাত্রায় তাঁহার ফললাভ ষোল আনাই হইয়াছিল। তদুপরি – এক বৎসর পর – তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হইয়াছিলেন।

তাঁহার কনের নাম ছিল বেগম জেন থ্যাকারে। ইঁহার ভাইয়ের নাম উয়িলিয়াম ম্যাকপিচ থ্যাকারে। এই ভাইয়ের ঘরের নাতির নামও একই ছিল। তিনি আর কেহই নহেন, স্বয়ং পরকালের বিখ্যাত ইংরেজ ঔপন্যাসিক উয়িলিয়াম ম্যাকপিচ থ্যাকারে। রেনেলের ঢাকাস্থ বন্ধু কার্টিয়ার সাহেব যখন গভর্নর হইলেন সেই সময় এই থ্যাকারে সাহেবই তাঁহার সচিব নিযুক্ত হইলেন। অতয়েব দাঁড়াইল এই: রেনেল সাহেব আপনকার বন্ধুর সচিবের ভগিনির পাণি গ্রহণ করিলেন। করিয়া – যতদূর জানি – সুখিও হইলেন। সেই কাহিনী পরে হইবে।

অথ রেনেলনামা দ্বিতীয় কিস্তি সমাপ্ত। অদ্য ৩ ডিসেম্বর সন ২০০৭ খ্রিস্টাব্দ অথবা রেনেল মহাশয়ের ২৬৫ নম্বর জন্মদিনে।

দোহাই

১. James Rennell, The Journals of Major James Rennell, First Surveyor-General of India, Written for the information of the Governors of Bengal during his surveys of the Ganges and Brahmaputra rivers 1764 to 1767, edited by T. H. D. La Touche, Geological Survey of India (Calcutta; Asiatic Society, 1910).
২. Wikipedia, ‘James Rennell,’ (Wikipedia, 2007).
৩. Sir C. Markham, Major James Rennell and the Rise of Modern English Geography, (London: Cassell & Co., 1895).

~~~

আমিন জেমস রেনেল

বিরচিত

শুকনা মৌসুমে গঙ্গানদী হইতে কলিকাতা যাইবার নিকটতম পথ খুঁজিয়া পাইবার লক্ষ্যে জলঙ্গি নদীর মাথা হইতে ব্রহ্মপুত্র বা মেঘনা নদীর সঙ্গমস্থল পর্যন্ত গঙ্গার; লক্ষীপুর হইতে ঢাকা পর্যন্ত মেঘনা ও অন্যান্য নদীর; এবং দক্ষিণ তীরবর্তী নদীনালার জরিপকার্যের বিবরণী সংযুক্ত

রোজনামচা

সন ১৭৬৪-১৭৬৭

তজর্মা : সলিমুল্লাহ খান

(গত সংখ্যার পর)

২২ তারিখ আসকালদুপুরবেলা দক্ষিণ-পূর্ব দিক হইতে ভারি পরিচ্ছন্ন দমকা হাওয়া বহিতেছিল। ফলে আমরা বিকাল পর্যন্ত (পরিকল্পনা মোতাবেক) জরিপ কাজে আর আগাইতে পারি নাই। মাত্র তখন নাগাদই আমরা জলঙ্গি নদীর মাথা হইতে পূর্বদিক ধরিয়া জরিপকার্য শুরু করিলাম। গতকল্য আমরা ঐ নদীর মাথা আর উহার উজানে গঙ্গাতীরের জরিপ এক মাইল পর্যন্ত শেষ করিয়াছিলাম।

হাল মৌসুমে এই মহানদীর আবহাওয়া সচরাচর যে রকম হইয়া থাকে আজ বিকালবেলা তাহার কিছু নমুনা দেখিলাম। মানে সন্ধ্যার দিকে যখন আমরা কুমারের (Quemaieree) অদূরে নদী পার হইতেছিলাম তখন দক্ষিণ-পূর্ব দিক হইতে একটা দমকা হাওয়া আসিল। আসিয়া সমস্ত নৌকা-সাম্পান একঠেলায় জলঙ্গির বালুচরে তুলিয়া দিল। সারারাত সেখানে থাকিয়া ঝাপটা খাইল। দুই জন নাবিক বাতাসের ঝাপটায় উড়িয়া যায়। তবে ভাগ্যের দয়ায় সাঁতার দিয়া কুলে উঠিতে সক্ষম হয়।

২৩ তারিখ সকালটা চমৎকার। নদীর দক্ষিণতীর জরিপ করিয়া কাটাইলাম। [সংযুক্ত] ১ নং মানচিত্রে ইহার খুঁটিনাটি পাওয়া যাইবে। আজ মহেশকুড়াঁর (Mayescunda) নালা পরখ করিলাম। এই নালা জলঙ্গির ৫ মাইল খানিক দক্ষিণে দক্ষিণ-পূর্বে, আর ইহাই আমাদের হাতে পড়া এক নম্বর নালা বা ক্রিক (Creek)। দেখিলাম ইহার পানি প্রবেশদ্বারে মাত্র ২ হাত আর পোয়া মাইল মতো উজানে গেলে একেবারে শুকনা। এই তল্লাটে বিস্তর ধান আর কার্পাসতুলার চাষ হয়। এই জায়গা হইতে পূর্বমুখি কমপক্ষে ৮ মাইল পর্যন্ত নদীর গতিপথ প্রায় সোজাসুজি পূর্বদিকগামী, আর বিপজ্জনক বালিয়াড়িতে ভরা। নদীও তদুপরি অতিরিক্ত দ্রুতগতিতে বহিতেছে। জলঙ্গির ৮ মাইল পূর্বে দক্ষিণ-পূর্বে পঞ্চিফেরার (Paunchiferra) একটা খাল আসিয়া গঙ্গায় পড়িয়াছে। শুনিয়াছি এই খালটি সারদার (Surda) কাছে একই নদী হইতে বাহির হইয়াছে। আজ সন্ধ্যাবেলা আবহাওয়া দুর্যোগপূর্ণ হওয়ায় আমরা বীরসগঞ্জ বালিয়াড়ির একটা খালে নৌকা-সাম্পান ভিড়াইয়া রাখিয়াছিলাম।

২৪ তারিখ সারাদিন আবহাওয়া বেশ ভালো । গতকালের মতন আজও জরিপ চালাইয়াছি। হরিশংকর (Harisongkor) আর কালিগঞ্জ (Callygunge) গ্রাম পার হইলাম। এই স্থলে নদী দুই খাতে ভাগ হইয়া গিয়াছে। মধ্যস্থলের বালির দ্বীপটি লম্বায় পাঁচ মাইল। নদী এখন উত্তর-পূর্ব দিকে মোড় লইয়া বহিতেছে আর ইহার প্রস্থ কোথাও কোথাও বর্ষা মৌসুমে ২ ১/২ মাইল। এইখানটায় দেশগ্রাম দেখিতে চোখ জুড়ায়, বেশির ভাগই মাঠ-ময়দান আর গবাদি পশুর সংখ্যাও বেশ বটে। নদীতীর এখানে ৩০ ফুট উচুঁ, অবিরত ঝরিয়া পড়িতেছে বলিয়া নৌকা সাম্পানের বিপদ ঘটিতে পারে, তাই তীরের তেমন কাছে যাইতে মানা। আজ হাওয়া দিতেছে দক্ষিণদিক হইতে, আসিতেছে হালকা মৃদুমন্দ সমীরণ আকারে।

২৫ তারিখ দুপুরের আগে সাংঘাতিক গরম পড়িয়াছে, বিকালবেলা ঝড়-তুফানে কাটিল আর বৃষ্টিও নামিল ঢের। আজ গঙ্গা নদীর উত্তর মোহনার সীমা বরাবর অবস্থিত চকুলা (Chocula) নামক গ্রামে আসিলাম। এইখান হইতে নদী পূর্বে দক্ষিণ-পূর্বে ঘুরিয়া ৫ বা ৬ মাইল পর্যন্ত চলিয়াছে আর বালির এক বিশালাকার দ্বীপ উঠিয়া ইহার সবটুকু বরাবরই নদীকে দুইভাগে ভাগ করিয়া রাখিয়াছে। উত্তরদিকের খাতটাই সবচেয়ে বেশি গভীর এবং সবচেয়ে বেশি ভালো।

২৬ তারিখ সুন্দর আবহাওয়া। পূর্ব দক্ষিণ-পূর্ব মোহনা জরিপ করিতেছি।

২৭ তারিখ সুন্দর আবহাওয়া। পূর্ব দক্ষিণ-পূর্ব মোহনা শেষ করিলাম আর অন্য একটায় প্রবেশ করিলাম। ইহার দৌড় প্রায় ৫ ১/২ মাইল দক্ষিণমুখি। বর্ষা মৌসুমে ইহার ওসার (চওড়া) দেড় মাইলের বেশি হয় না আর এখন স্থানে স্থানে পোয়া মাইলের বেশি হইবে না। আমাদের আগমন সংবাদে গ্রামের লোকজন ঘরবাড়ি ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছে। তাই এইসব জায়গার নাম জানিয়া লইতে কিছুটা দেরি হইল। আজ সন্ধ্যায় মালাকোলা (Malacola) ও সেলাহ (Selah) গ্রামদ্বয়ের মাঝখানটায় (প্রায় ২ ১/২ মাইলের তফাতে) গুনিয়া দেখিলাম নৌকার সংখ্যা ৪০০ শতের কম হইবে না। সন্ধ্যা নাগাদ চুম্বক কাঁটার নড়াচড়া পূর্বমুখি ০´-৩৬º হইয়াছে।

২৮ তারিখ পূর্বাহ্ন সুন্দর, সন্ধ্যা আর্দ্র আর ঝড়বৃষ্টিভরা। গত ৩ দিন ধরিয়া বাতাস দক্ষিণ হইতে বহিতেছে। দক্ষিণ মোহনার জরিপ শেষ করিয়াছি আর দামাদুর (Damadure) গ্রামে আসিয়া পৌঁছিয়াছি, এই গ্রামটি ইহার শেষভাগে আছে। এই জায়গা হইতে নদী দ্রুত উত্তর-পূর্ব দিকে ঘুরিয়া গিয়াছে আর এই পথে ৯ মাইল চলিয়াছে। আজ রাত ভরিয়া বৃষ্টি হইল।

২৯ তারিখ পূর্বাহ্নে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। অপরাহ্ণে কম্পাসের নানান কোণ হইতে বেশ কয়েকবার দমকা হাওয়া বহিল আর বৃষ্টিও হইল বেশ। ফল দাড়াঁইল আজ আমাদের কাজ হইল সামান্যই। আজ রাত্রে অনেক বৃষ্টি।

৩০ তারিখ আবহাওয়া সহনীয়। উত্তর-পূর্ব মোহনার পাঁচ মাইল উপর হইতে বড় একটি দ্বীপের শুরু। ইহা পূর্বে ও দক্ষিণ-পূর্বে পাঁচ মাইল বিস্তৃত। ফলে স্থানে স্থানে নদীর ওসার ৩ ১/২ মাইল পর্যন্ত হইবে। সর্বদক্ষিণের খাত দিয়া সম্বৎসর নৌ-যানবাহন চলাচল করে না। শ্রীরামপুর (Serampour) ও গড়গড়ি (Gurgoree) গ্রাম ইহার শেষ সীমায়। এখানকার গ্রামাঞ্চলে চাষাবাদ ভালোমতই হইয়া থাকে আর ফসলের বেশির ভাগই ধান্য (Padda)। অদ্য গভর্নর মহোদয় সমীপে লিখিলাম, আমার কাজকর্মের বিবরাণাদি তাহাকে জানাইয়া দিয়াছি।

৩১ তারিখ সারাদিন দক্ষিণদিক হইতে একেবারে তাজা হাওয়ার ঝাপটা (Gales) বহিল। বড় দ্বীপটির দক্ষিণ-পূর্ব মাথা হইতে নদী প্রায় ৮ মাইল পর্যন্ত দক্ষিণে বহিয়া গিয়াছে। পশ্চিমদিকের তীর বেশির ভাগই জঙ্গলে ঢাকা। তবে পূর্বতীরে চাষাবাদ ভালোমতই হইতেছে আর এই তীরে ১০ কিম্বা ১১ টা গ্রাম বসিয়াছে। এই মোহনার (Reach) শেষ মাথায় কস্তি (Custee) গ্রাম ।

১লা ও ২রা জুন সুন্দর আবহাওয়া, দক্ষিণ দক্ষিণ-পূর্ব দিক হইতে তাজা হাওয়া বহিতেছে। এই দুই দিন দক্ষিণ মোহনার পশ্চিমতীর জরিপ করিয়া কাটাইলাম আর ২ তারিখ সন্ধ্যাবেলা কস্তি গ্রামে আসিলাম। গ্রামটি মোহনার মোড় হইতে বিপরীতদিকের পশ্চিম তীরে বটে।

৩ তারিখ সুন্দর সকাল। গ্রাম হইতে তিন পোয়ামাইলমতো ভাঁটায় নদী হইতে বাহির হইয়াছে কস্তি খাল। সেই খালের মাথায় আসিলাম। শুনিলাম এই খাল দিয়া সারা বৎসর নৌকা-সাম্পান চলে। আরও শুনিলাম ইহা হইতে রাঙ্গাফুলায় যাওয়া যায়। যদি তাহাই হয় তো বলিতে হইবে আমাদের অভিযান সাফল্যের সহিত সমাপ্ত হইল। খালটি ১৩০ হইতে ২০০ গজ পর্যন্ত চওড়া এবং ১/৪ মাইল উজানে যাওয়ার পর ৪০ হইতে ১০ হাত পর্যন্ত গভীর হয়।

 

বিডিনিউজ, আর্টস, ৬ ডিসেম্বর ২০০৭

জেমস রেনেল ও তাঁহার রোজনামচা ১৭৬৪-৬৭ (পহেলা কিস্তি)

james_rennel.jpg
জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০)

খ্রিষ্টিয় ১৮শ শতাব্দীর মাঝামাঝি বঙ্গদেশে ইংরেজ অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যক্ষ ফল আজকের বাংলাদেশশুদ্ধ অখিল ভারতবর্ষের পরম দারিদ্র ও দুর্গতি। এই কথা মোটেও অতিশয় নয়। অখিল ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের অভিশাপ প্রায় দুই শত বৎসর বহন করিয়াও আমরা আজও
বুঝিতে পারিতেছি না এই উপনিবেশবাদ বা পরশাসন কী পরিমাণে আমাদের দেশের ক্ষতিসাধন করিয়াছিল।

আমাদিগের ইদানিন্তন শাসক ধনবান শ্রেণী ইহার কারণ জানিবার প্রয়াসও করে না। তাঁহারা পশ্চিমা সাম্রাজ্য শাসকদের সহিত গাঁটছড়া বাধিয়া এই দেশ চালাইতেছেন। ইংরেজ শাসনের পাপ এখন মার্কিন সাম্রাজ্যের তাপে চাপা পড়িতেছে।

দুইশত বর্ষব্যাপী ইংরেজি শাসনপাপের মধ্যে যে দুই চারিটি প্রায়শ্চিত্ত হইয়াছে মেজর জেমস রেনেলের রোজনামচা তাহাদের মধ্যে পড়ে বলিয়া বর্তমান লেখকের ধারণা। কথায় বলে শয়তানকেও তাঁহার প্রাপ্য দিতে হইবে। রেনেলের জরিপকর্ম বাবদ এই প্রাপ্য ইংরেজ ডাকাতদেরও দিতে হইবে।

জেমস রেনেল যে সময় বঙ্গদেশের নদনদী জরিপ কার্যে মন দেন তখন বাংলাদেশে ইংরেজি ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে কিন্তু ইংরেজ-দায়িত্ব প্রবর্তিত হয় নাই। দেশের অবস্থা তখন সম্পূর্ণ অরাজক। পূর্ব ভারত কোম্পানি খাজনা আদায় করিতেছে কিন্তু কোন শাসন ব্যবস্থাই প্রবর্তন করে নাই। কিছুদিন পর চালু হইবে দ্বৈত শাসন-ব্যবস্থা। এতদিন পর্যন্ত যাহা চলিতেছিল তাহা নামে নবাবের শাসন আর কাজে ইংরেজ কোম্পানির ক্ষমতা।

১৭৬৪ সনের ৬ মে তারিখে কলিকাতাস্থ দূর্গের অধিনায়ক বা গবর্নর হেনরি ভ্যানশিটার্ট কাপ্তেন জেমস রেনেলকে নদীয়া জেলার উত্তর সীমানাবর্তী জলঙ্গি নদীর মাথা হইতে পূর্বদিকে ঢাকা পর্যন্ত গঙ্গা ও পদ্মার দক্ষিণ তীর তথা অববাহিকাবর্তী নদীনালা জরিপের লক্ষ্যে জরিপকার বা আমিন নিযুক্ত করেন।

এই জরিপের অংশস্বরূপ গবর্নর মহোদয়ের নিযুক্ত গোয়েন্দা কর্মচারি জেমস রেনেল ১৭৬৪ সালের ৭ই মে তারিখ হইতে তাঁহার রোজনামচা বা দিনলিপি লিখিতে শুরু করেন। সেই দিনলিপি ১৯১০ সাল পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য ছাপা হয় নাই।

১৯১০ সালে কলিকাতাস্থ এশিয়াটিক সমিতি তৎকালীন ‘ভারতবর্ষের ভূতাত্ত্বিক জরীপ’ নামক সংস্থার সদস্য টি. এইচ. ডি. লা টুশ (T. H. D. La Touche) নামা এক ভদ্রলোকের সম্পাদনা বা মধ্যবর্তিতায় এই দিনলিপি প্রকাশ করে। আমরা সেখান হইতে এই তর্জমা প্রকাশ করিতেছি।

লা টুশ সাহেব জানাইতেছেন ১৭৬৪ সাল হইতে ১৯৬৭ সালের মধ্যে গঙ্গা ও ব্রহ্মপূত্র নদীর জরিপ চলার সময় পরাধীন বঙ্গদেশের শাসন অধিনায়ক বা গবর্নরদের গোয়েন্দা হিসাবে জেমস রেনেল এই বিবরণী লিখিয়াছিলেন। লা টুশ সম্পাদিত রেনেলের রোজনামচায় তিনটি বড় টুকরা আছে। প্রথম টুকরা ১৭৬৪ সালের মে হইতে ১৭৬৫ সনের মে পর্যন্ত বিস্তৃত। দ্বিতীয় টুকরার বিস্তার ১৭৬৫ সালের মে হইতে ১৭৬৬ সালের জানুয়ারি। আর তৃতীয় টুকরার প্রসার হইতেছে ১৭৬৬ সনের জানুয়ারি হইতে ১৭৬৭ সনে মার্চ অবধি।

এক্ষণে জেমসের পরিচয় খানিক দেওয়া যাইতে পারে। এই তথ্য আমরা পাইয়াছি খানিক লা টুশের লেখা পরিচয়পত্র হইতে আর খানিকটা ‘উয়িকিপিড়িয়া’ নামক একটি দাতব্য বিশ্বকোষ হইতে। আমাদের জ্ঞাতসারে জেমস রেনেল জন্মিয়াছিলেন ১৭৪২ সালের ৩ ডিসেম্বর আর প্রাণত্যাগ করিয়াছিলেন ১৮৩০ সালের ২৯ মার্চ। মানে তিনি প্রায় ৮৮ বছর আয়ু পাইয়াছিলেন। বিবরণ মোতাবেক মাত্র ১৪ বছর বয়সে মানে ১৭৫৬ সালে – তিনি নৌবাহিনীর চাকরি লইয়াছিলেন। ১৭৭৭ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ১৮৩০ সালে পরলোক গমনের পর হইতে লন্ডন শহরের ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবে নামক ধর্মস্থানে তিনি শুয়ে আছেন।

১৭৬৪ সালে যখন তাহাকে জরিপকাজের দায়িত্ব দেওয়া হয় তখন তাঁহার বয়স বড়জোর ২২ বছর। ১৭৬৭ সালে তাঁহাকে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মহা আমিন বা সার্ভেয়ার জেনারেল নিয়োগ করা হয়। ১৭৬৪ সাল হইতে ১৭৭৭ – সর্বমোট এই তের বছর – তিনি বঙ্গদেশের ব্রিটিশ জরীপকাজে নিযুক্ত ছিলেন।

রেনেলের বঙ্গীয় জরিপ ও মানচিত্র সম্পর্কে বিশেষ তারিফ শোনা যায়। মহা আমিনের প্রধান কার্যালয় বসিত পূর্ব বাংলার ঢাকা শহরে। বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইংরেজ বিরোধী সংগ্রাম তখনও চলিতেছিল। ইংরেজরা এই সংগ্রামকে ফকির বিদ্রোহ বলিয়া ডাকিতেন। ১৭৭৬ সালে ভূটানের সীমান্ত বরাবর একস্থানে একবার মুক্তিযোদ্ধা ফকির বাহিনীর আক্রমণে পড়িয়া রেনেল সাহেবও গুরুতর আহত হইয়াছিলেন।

এই আঘাত হইতে তিনি কখনও পুরাপুর সারিয়া উঠেন নাই। বলা যায় এই আঘাতের কারণেই অল্পবয়সে অবসর গ্রহণে বাধ্য হইয়াছিলেন তিনি । বলা হইয়াছিল ইহার পর হইতে তিনি আর বঙ্গদেশের “আবহাওয়ার প্রভাব” সহ্য করিতে পারিতেন না। ১৭৭৬ সালের ৫ এপ্রিল তাঁহার মেজর পদে উন্নতি হয়। খ্যাতনামা গভর্ণর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস তাঁহাকে বার্ষিক ৬০০ পাউন্ডের ভাতা মন্জুরি প্রদান করিয়াছিলেন।

জীবনের বাকি ৫৩ বছর তিনি লন্ডন শহরেই কাটাইয়াছিলেন। তখন ভারতে ব্রিটিশ শাসনে সহায়তা করিবার নিমিত্ত প্রতিষ্ঠিত “ইস্ট ইন্ডিয়া হাউস” নামক দপ্তরে কাজ করিতেন জেমস রেনেল। সেই যুগে তাঁহাকে এয়ুরোপের না হইলেও বিলাতের সেরা ভূগোল-বিশারদ বলিয়া গণনা করা হইত।

রেনেলের লেখার মধ্যে সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করার যোগ্য বিবেচিত হইয়াছে ১৭৭৯ সালে প্রকাশিত Bengal Atlas বা বঙ্গদেশের মানচিত্র । ১৭৮৩ সনে তিনি ‘ভারতবর্ষের খসড়া মানচিত্র’ প্রকাশ করেন। ১৮০০ সালে প্রকাশিত হয় Geographical System of Herodotus বা ‘এরোদোতসের ভূগোলজগত’। তাঁহার আরেকটি উল্লেখ্য বই Comparative Geography of Western Asia বা ‘এশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের তুলনাভিত্তিক ভূগোল’ ।

শেষ বয়সে জেমস রেনেল সমুদ্রস্রোত বিষয়ে গবেষণা করিয়া আপন খ্যাতির বৃদ্ধি সাধন করেন। তাঁহাকে ওসানোগ্রাফি বা মহাসমুদ্রবিদ্যার পিতা বলিয়াও ডাকিবার রীতি ইংরেজরা চালু করিয়াছিলেন। তাঁহার এন্তেকালান্তে মোতাবেক ১৮৩২ সালে তদীয় কন্যার সম্পাদনায় Curreats of the Aetlantic Ocean বা ‘অতলান্তিক মহাসমুদ্রের স্রোতধারা’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ১৭৮১ সালে তিনি ইংলন্ডের রাজকীয় সমিতির সদস্য মনোনীত হইয়াছিলেন।

দোহাই

১. James Rennell, The Journals of Major James Rennell, First Surveyor-General of India, Written for the information of the Governors of Bengal during his surveys of the Ganges and Brahmaputra rivers 1764 to 1767, edited by T. H. D. La Touche, Geological Survey of India (Calcutta; Asiatic Soceity, 1910).

~ ~ ~ ~ ~ ~

আমিন জেমস রেনেল

বিরচিত

শুকনা মৌসুমে গঙ্গানদী হইতে কলিকাতা যাইবার নিকটতম পথ খুঁজিয়া পাইবার লক্ষ্যে জলঙ্গি নদীর মাথা হইতে ব্রহ্মপুত্র বা মেঘনা নদীর সঙ্গমস্থল পর্যন্ত গঙ্গার; লক্ষীপুর হইতে ঢাকা পর্যন্ত মেঘনা ও অন্যান্য নদীর; এবং দক্ষিণ তীরবর্তী নদীনালার জরিপকার্যের বিবরণী সংযুক্ত

রোজনামচা

সন ১৭৬৪-১৭৬৭

তজর্মা : সলিমুল্লাহ খান

শুকনা মৌসুমে গঙ্গানদী হইতে কলিকাতা যাইবার ঘনিষ্টতম পথ আবিষ্কারের লক্ষ্যে পরিচালিত পহিলা অভিযাত্রার রোজনামচা।
উয়িলিয়াম দূর্গের শাসক মহাত্মা হেনরি ভানশিটার্ট মহোদয় প্রদত্ত আদেশের নকল।

~ ~ ~ ~ ~

উয়িলাম দূর্গ, ৬ মে ১৭৬৪

মহাশয়,
আপনাকে নিয়োগ দেওয়া হইতেছে সর্বপ্রথমে মহানদীর (গঙ্গার) যে অংশ জলঙ্গির পূর্বদিকে অবস্থিত তাহার জরিপকার্য সমাধা করিবার উদ্দেশ্যে; আর এই জরিপকার্যের বিশেষ উদ্দেশ্য পূরণ করিতে আপনাকে মহানদী হইতে খাড়ির খাল বা রাঙ্গাফুল পর্যন্ত হ্রস্বতম ও সর্বাধিক নিরাপদ পথটি খুঁজিয়া পাইতেই হইবে।

এই উদ্দেশ্যে আপনি মহানদীর দক্ষিণ ধার ধরিয়া চলিবেন আর দক্ষিণমুখি বাহির হইয়াছে এমন নদী বা নালার (Nulla) প্রত্যেকটি পরখ করিবেন, দেখিবেন এইসব নদী নালা দিয়া তিনশত মণ পর্যন্ত ভারবাহী নৌকা আসাযাওয়া করিতে পারে কিনা আর স্থানীয় লোকজন মারফত খবর লইবেন এইসব নদীনালা দিয়া সম্বৎসর যাতায়াত করা যায় কিনা; আর নদীতীরের চেহারা আর খাড়াই দেখিয়া এই বিষয়ের অবস্থা সম্বন্ধে আপনি নিজেই গ্রহণযোগ্য মতামত দিতে পারিবেন।

আপনি একটি রোজনামচা লিখিবেন যাহাতে আপনার কাজের বিবরণ খুঁটিনাটিশুদ্ধ লিপিবদ্ধ করিবেন, তাহাতে আপনি যে যে দেশগ্রামের পথঘাট পার হইতেছেন তাহা দেখিতে-টেখিতে কেমন আর তাহাতে কী কী ফসল ফলে তাহার কথাও লিখিবেন; তাহাতে কিন্তু দেশগ্রামের নামধামশুদ্ধ আর আর যাহা যাহা উল্লেখ করিবার যোগ্য তাহারও উল্লেখ করিবেন। নদী ও নালার যে খসড়া [চিত্র] আপনি প্রস্তুত করিবেন তাহার সঙ্গে এই রোজনামচার এক প্রস্থ নকলও আমাকে দিবেন।

নিবেদন ইতি
আপনারই একান্ত বাধ্য সেবক
বিনীত
হেনরি ভ্যানশিটার্ট।

~ ~ ~ ~ ~

সোমবার ৭ই মে। একটি ছোট বজরা, সঙ্গে লোকজন ও অন্যান্য জিনিশ বহন করিবার মতন ৫টি ছোট উয়িলক সমভিব্যহারে জলঙ্গির পথ ধরিয়া অগ্রসর হইব বলিয়া কলিকাতা হইতে যাত্রা করিলাম।

লোকজনের হিসাব নিচে লিখিতেছি:

সহকারী আমিন ১ জন
অন্যান্য এয়ুরোপীয় সাহেব ১ জন
লস্কর ১১ জন
মোটিয়া ১১ জন
অনুবাদক ১ জন
আমাকে শুদ্ধ ধরিয়া মোট ৩৯ জন

বেলা ৩ ঘটিকার সময় আমরা নতুন দূর্গ হইতে নৌকা ছাড়িলাম, তবে আজ রাত্রে জোয়ার অনুকূল না থাকায় আমাদের উজানে যাওয়া ব্যাহত হইয়াছে। তাই আমরা কলিকাতা পর্যন্ত আসিলাম। আজ সারাদিন আবহাওয়া চমৎকার।

৮ তারিখ রাত্রি ১ ঘটিকা। আওয়াজ পাইলাম বজরা ডুবিতেছে । আমার ঘুম ভাঙিল, দেখিলাম সত্য সত্যই ইহা ডুবিবার উপক্রম হইয়াছে, দুই তৃতীয়াংশ পানিতে ভরিয়া গিয়াছে। এই দুর্ঘটনার ফলে আমার নিত্য ব্যবহার্য জিনিশপত্রের বেশির ভাগই নষ্ট হইয়া গেল, আমার কাপড়চোপড়ের সিংহভাগেরও একই দশা ঘটিল। আজ কলিকাতায় কাটাইয়া ছিদ্রটা সারাইলাম। সাঁঝের বেলা নদীপথে উজানে যাত্রা করিলাম, আর রাত্রের মতো শ্রীরামপুরে আসিয়া নৌকা ভিড়াইলাম, আজ বিকালে উত্তর পশ্চিম দিক হইতে চোখা চোখা দমকা হাওয়া বহিতেছিল।

৯ তারিখ পরিষ্কার আবহাওয়া। সকাল আটটায় গিরিটির শোভা দেখিব বলিয়া বাহির হইলাম। চন্দননগরে বৃষ্টি হইল, আর দূর্গের ধ্বংসাবশেষ ও শহর দেখিব বলিয়া বাহির হইলাম। বৈকাল ৪ ঘটিকার সময় চিনসুরা অতিক্রম করিয়া রাত্রি নাগাদ বাঁশবাড়িয়া খালে প্রবেশ করিলাম। এই খালের পানি এক্ষণে ভরা জোয়ারে ৫ হাত গভীর হয়। কাপ্তেন পলিয়রের মানচিত্রে এই নদীর বিবরণ বেশ ফলাও করিয়া দেওয়া হইয়াছে বলিয়াই মনে হয়। রাত্রি পরিষ্কার। দক্ষিণ পশ্চিম দিক হইতে নবীন হাওয়া বাহিতেছে।

১০ তারিখ, আবহাওয়া রকমারি। বেতোয়ালেরা নালা অতিক্রম করিলাম। প্রস্থে বাঁশবাড়িয়া যতখানি চওড়া ইহাও মনে হইতেছে ততখানিই চওড়া। বিকাল ৪ ঘটিকায় যথন আমরা বেতোয়ালেরার মুখে অবস্থান করিতেছি, তখন দক্ষিণ দিক হইতে চোখা একটা দমকা হাওয়া দিল। বজরায় আর একটা ফুটা বাহির হইল। অদ্য দিবাগত রজনী বিরমপুরে কাটাইলাম।

১১ তারিখ আবহাওয়া দিনের বেশির ভাগ জুড়িয়াই ভালো, শুদ্ধ একবারই দক্ষিণ দিক হইতে সামান্য ঝড়ো হাওয়া দিয়াছিল। আজ (মধ্যাহ্নের) পূর্ব নাগাদ আম্বোয়া অতিক্রম করিলাম। জায়গাটা নদীর দক্ষিণ দিকে কুচোয়া হইতে খুলনা যাওয়ার রাস্তার মাঝামাঝি অবস্থিত। বাংলার পুরানা মানচিত্রাদির কোন কোনটিতে এই জায়গাটার উল্লেখ দেখিয়াছি বলিয়া অনুমান করিতেছি একদা ইহা বধির্ষ্ণু গ্রাম ছিল, না থাকিয়া পারে না। যাহাই হউক, বর্তমানে এই জায়গায় শুদ্ধ কয়েকটি পর্ণকুঠির বৈ কোন ঘরবাড়ি নই। আজ রাতে বেলডাঙ্গায় ঘুমাইলাম।

১২ তারিখ সারাদিন ভালো আবহাওয়া, সন্ধ্যা গাঢ়, ভয়াল। সকাল ৮টায় জলঙ্গি নদীতে ঢুকিলাম। কাসিমবাজার নদী যেখানে জলঙ্গির সহিত মিলিয়াছে সেখানে নদী মনে হইতেছে খুব সরু হইয়া গিয়াছে: আমার ধারণা বর্তমান মৌসুমে ইহা কিছুতেই চওড়ায় ৫০ গজের অধিক হইবে না। লোকের মুখে জানিতে পারিলাম এখন এই পথ দিয়া মাঝারি আকারের নৌকা চলাচল করিতে পারে।

সন্ধ্যায় হাউতনগরে একটা জায়গায় মাপজোক করিলাম আর দেখিলাম এখন (জলঙ্গী) নদীর চওড়াই ১৫০ গজ আর বর্ষায় ২৭০ গজ হয়। সেখানে নদী সবচেয়ে বেশি গভীর সেখানে গভীরতা ১৩ ফুট হয়। তীর দেখিয়া মনে হয় বৃষ্টি হইলে পানি আরও ১৩ ফুট উপরে উঠিবে।

১৩ তারিখ সারাদিন ভারি সুন্দর আবহাওয়া। দক্ষিনা হাওয়া। নদীর গভীরতা খুব কমিয়া গিয়াছে, আর এমন আকাবাঁকা হইয়াছে যে যদিও আমরা নদীপথে ২২ মাইল পার হইয়াছি তথাপি নাক বরাবর ১০ মাইলও আসিয়াছি কি না সন্দেহ। অদ্য রাত্রি তিগারি বা নেগারিনে কাটাইলাম। সূর্যাস্তের সময় (কম্পাসের) কাঁটার নড়াচড়া চওড়ায় বাড়িয়া পূর্বমুখি ৩˚-৩ʹ মতো হইয়াছে।

১৪ তারিখ পূর্বাহ্ন পরিষ্কার; বৈকালে পশ্চিম দিক হইতে বৃষ্টি, বজ্র ও বিদ্যুতসহ ভারি দমকা বাতাস হইল। আবহাওয়া খারাপ বলিয়া অদ্য দিবাভাগে আমরা শুদ্ধ ১৬ মাইল আগাইয়াছি। আজ রাতটা আমরা যেখানে কাটাইতেছি সেই নটিডাঙ্গায় নদী মাত্র ২ হাত গভীর।

১৫ তারিখ আবহাওয়া ভারি দমকা হাওয়াময়, আর বৃষ্টিও ভারি। ইহার কারণে, আর নদীর পানি অগভীর ও আকাবাকাঁ হইবার ফলেও, আমরা পথে পিছাইয়া থাকিতেছি। কোন কোন জায়গায় নদী এমনকি ৫ গজও চওড়া নয়। পাঁচদাদায় নদীর চওড়াইর আর গভীরতার মাপ লইলাম । আর একইভাবে নদীতীরের খাড়াইও মাপিলাম, চওড়াই এখন ২০০ গজ; গভীরতা কোথাও ৫ হাতের বেশি নয়। তীর বরাবর বৃষ্টির পর নদী আরো ২৬ ফুট উঠিবে। এই মাপ আর আগে (মানে ১২ তারিখে) হাউতনগরে যে মাপজোক লইয়াছিলাম তাহার জোরে মনে হইতেছে এই নদী বড় নদীর (গঙ্গা) কাছাকাছি স্থানে অনেক বেশি ফাপিয়া উঠে, দূরে গেলে কতখানি ফাপে না আর গোটা ৪১ মাইল দূরে গেলে এই পার্থক্য ১২ কি ১৩ ফুট পর্যন্ত হইয়া থাকে।

আজ সন্ধ্যা গাওঘাটিতে নোঙর করিলাম, সারাদিনে মাত্র ১০ মাইল পথ আগাইয়া আসিয়াছি। এই জায়গায় নদীবক্ষের মধ্যস্থলে ১৯ টি বড় বড় লবণভর্তি নৌকা ডুবিয়া গিয়াছে। আজ রাত্রে কিছু বৃষ্টি হইয়াছে।

১৬ তারিখ সকালবেলার আবহাওয়া সাফ আছে। বিকাল ও সন্ধ্যা ভেজা আর হাওয়া ঝোড়ো। আজ সকালবেলা বকসিপুরের খাড়ি পার হইতে আমাদের অনেক বেগ পাইতে হইয়াছে, উখানে এখন মাত্র ১ ১/২ হাত পানি। ইহাতে মনে হইতেছে এই জায়গায় শুকনা মৌসুমে নদী নিশ্চয়ই একেবারে শুকাইয়া যায়। কারণ আমরা শুনিয়াছি বৃষ্টি হইবার পর নদীর পানি ১ ১/২ হাত বাড়িয়াছে।

দুপুরে ভিখারিগঞ্জ (Vheckery-Gunge) পার হইলাম। এই জায়গায় ৯ কি ১০টা লবণের নৌকা ডুবিয়াছে। অদ্য দিনের বেলা মাত্র ১০ মাইল আগাইয়া রাত্রিতে জগিপুরে নৌকা ভিড়াইলাম। নদী এই জায়গায় ৪ হাত গভীর। আজ রাত্রে বেশ বৃষ্টি।

১৭ তারিখ আবহাওয়া পরিষ্কার। আজ দিনের বেলা ১১১/২ মাইল চলিলাম, কিন্তু নদী এমন আকাবাঁকা যে আমরা নাক বরাবর মাত্র ৬ মাইল গিয়াছি। এইস্থলে দেশগ্রাম খোলামেলা আর অতীব নয়নসুখকর। আজ রাতটা কাটাইলাম স্বস্তিয়াপুরের কাছে ছোট্ট একটি নালায়। চমৎকার রাত্রি।

১৮ তারিখ বেশির ভাগই চমৎকার আবহাওয়া, দখিনা হাওয়া। সকালবেলা আমার (বাজার) সরকারকে পাশের জলঙ্গি গ্রামে পাঠাইলাম, উদ্দেশ্য আমার আগমনের বিনিময়ে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সংগ্রহ করা। অদ্য দিবাভাগে মাত্র ১১ মাইল আগাইয়াছি, কারণ নদী এই স্থলে আগের তুলনায় প্রশস্থতর ও গভীরতর হইলেও কি হইবে, পানি অতি জোরে প্রবাহিত হইতেছে। আজ রাতটা কাটাইলাম জলঙ্গির ৬ মাইল ভাঁটিতে, ধুলমপুরের কাছে। আবহাওয়া পরিষ্কার।

১৯ তারিখ সারাদিন আবহাওয়া পরিস্কার, দক্ষিণ দিক হইতে তাজা বাতাসের দোলা থাকিয়া থাকিয়া হাওয়া দিতেছে। জলঙ্গির মাথা হইতে ৩ মাইল ভাঁটিতে দেখিলাম পানির গভীরতা এতই কম যে বজরার পানিভাসা থাকিতে হইল বড়ই কষ্টেসৃষ্টে। এই অবস্থা প্রায় পোয়া মাইল পর্যন্ত চলিল।

মধ্যাহ্ন হইবার আগেই আমরা মহা গঙ্গানদীতে আসিলাম আর দুপুর একটা নাগাদ জলঙ্গি আসিয়া পৌঁছিলাম।

আমি যে বজরায় চড়িয়া আসিয়াছি তাহা ছিল কলিকাতায় যে সকল বজরা পাওয়া যাইতেছিল তাহাদের মধ্যে সবার চেয়ে ছোট। তাই কলিকাতা ছাড়িবার আগে গভর্নর সাহেব আমাকে জানাইয়াছিলেন জলঙ্গি বরাবর আসিয়া আমার ব্যবহারের জন্য যতগুলি ‘উয়িলক’ আমার দরকার হইবে ঠিক ততগুলি ‘উয়িলক’সহ সুবিধাযুক্ত একটি বজরা আমার অপেক্ষায় থাকিবে, যেন যে মৌসুমে নদীর পানি বড়ই নিচে নামিয়া যায় সে মৌসুমেও জলঙ্গি নদী ধরিয়া যত রকমের অভিযান পরিচালনা সম্ভব তত অভিযান পরিচালনা করিবার কাজে এই সকল যান আমি ব্যবহার করিতে পারি।

কিন্তু জলঙ্গি পৌঁছিয়া দেখিলাম সেখানে কিছুই নাই, না বজরা না উয়িলক কিছুই নাই। সেখানকার লোকজন আমাকে বলিল যে কাপ্তেন উয়িডারবর্ণ (যিনি সম্প্রতি স্বেচ্ছাসেবকদের সহিত অভিযানে গিয়াছেন) হাতের কাছে যাহা পাওয়া যায় তাহা লইব বলিয়া সমস্ত নৌকা ধরিয়া লইয়া গিয়াছেন আর সেই নৌবহরের মধ্যে একটি বজরাও রহিয়াছে; কিন্তু সেই বজরাটিই আমার জন্য ধরা ছিল কিনা এখনও পর্যন্ত সঠিক সংবাদ যোগাড় করিতে পানি নাই। যে বজরায় চড়িয়া আমি আসিয়াছি তাহা আসন্ন বর্ষা মৌসুমে আমি যে কাজ করিতে আসিয়াছি সে কাজ সম্পন্ন করার উপযুক্ত মোটেও নহে; ইহাতে সন্দেহ নাই । বজরাটা ছোট আকারের ও ফুটায়ফাটায় ভরা এই দুই কারণেই।

দেখিলাম নষ্ট করিবার মতন কোন সময়ই আমার হাতে নাই। কারণ নদীর পানি দিনকে দিন বাড়িতেছে। তাই আমি আমার জরিপদলের ব্যবহারোপযোগী কিছু উৎকৃষ্ট উয়িলক সংগ্রহে ব্যস্ত হইয়া পড়ি, কিন্তু তেমন সফল হইতে পারি নাই। কারণ যে তিন দিন আমি ঐখানটায় ছিলাম সেই তিনদিনে আমি শুদ্ধ ২টি উয়িলক যোগাড় করিতে পারিলাম; এইগুলির একেকটি ২০০ মণ পর্যন্ত বোঝা লইতে পারে; তাহা ছাড়া আমি কলিকাতা হইতে আনা ৩টা উয়িলক সঙ্গে রাখিলাম আর ২টা কলিকাতায় ফেরত পাঠাইলাম।

২০ তারিখ সারাদিন আবহাওয়া ভাল ছিল; ২১ তারিখ পূর্বাহ্নও একই রকম কাটিল, তবে বিকালবেলা দক্ষিণপূর্ব দিক হইতে একটা তাজা ঝাপটা বহিয়া গেল, মাঝে মাঝে ভারি দমকা হাওয়া দিতেছিল। কিন্তু বৃষ্টি নামে নাই। আজ গভর্নর সাহেব বরাবর পত্র লিখিলাম, এই পর্যন্ত আমি যতদূর আসিয়াছি তাহার বিবরণী পাঠাইলাম, আর সঙ্গে জুড়িয়া দিলাম জলঙ্গী নদীর অংশবিশেষের নকল।

বিডিনিউজ, আর্টস, ২২ নভেম্বর ২০০৭

মিশেল ফুকোর বাতি জ্বালানি

foucault1.jpg

মিশেল ফুকো (১৯২৬-১৯৮৪)

~ মিশেল ফুকো বিষয়ে সলিমুল্লাহ খানের সেমিনার ~

মুখবন্ধ

নিচের প্রবন্ধটি বর্তমান লেখকের বলা একটি বক্তৃতার লিখিত ভাষ্য। ফিতার রেকর্ড থেকে অক্ষরে লিখে নেওয়ার মেহনতটুকু করেছেন আমার বন্ধু জামিল আহমদ। তিনি আমার কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করুন। এই বক্তৃতা কয় তারিখে দিয়েছিলাম রেকর্ডে তার নিদর্শন নাই। আমার ধারণা তারিখটা হয়ত মার্চ কি এপ্রিল মাসের কোন শুক্রবার হবে। যতদূর মনে পড়ে এই বক্তৃতামালা শেষ করেছিলাম মোট আট দিনে। বর্তমান লেখাটি দ্বিতীয় দিনের রেকর্ড থেকে তৈরি করা বলে মনে হয়। প্রথম দিনের বক্তৃতা যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে সঠিক রেকর্ড হয় নাই।

জানিয়ে রাখা যায় আমাদের বিজ্ঞাপিত সমাজের সামান্য নাম ছিল ‘জাক লাঁকা বিদ্যালয়’ আর ঐবারের বিশেষ বক্তৃতামালা প্রচারিত হয়েছিল ‘মিশেল ফুকো বোধিনী’ নামে। মিশেল ফুকো তাঁর দেশের অপর প্রভাবশালী তত্ত্বজ্ঞানী জাক লাকাঁর ঋণ বিশেষ স্বীকার করেন নাই। তবে লাকাঁর ঋণ তিনি দুই হাতেই নিয়েছেন।

তত্ত্বজ্ঞানী জাক দেরিদার সঙ্গে ফুকোর মতভেদ প্রকৃত প্রস্তাবে মহাত্মা লাঁকার শিক্ষার দুই দিক নিয়ে টানাটানির অধিক নয়। জাক লাকাঁ ভাষার বা পদের একাধিপত্য বলে যে উপপাদ্য প্রচার করেন, দেরিদা সেই বক্তব্যই নিজের বলে জাহির করেছিলেন। ‘লেখার বাহিরে কিছু নাহিরে’ বলে তিনি বেশ বাড়াবাড়ি করেছিলেন বৈ কি ।

মিশেল ফুকো আঁকড়ে ধরেন জাক লাকাঁর অপর একটি উপপাদ্য। এই উপপাদ্য অনুসারে মানুষের ইতিহাসে ভাষাই শেষ কথা নয়, শেষ কথা ‘সহজ মানুষ’ বা সাবজেক্ট। যে ইতিহাসে অর্থ তৈরি করে থাকে তাকেই সহজ মানুষ বলে। জীবনের শেষদিকে ফুকো প্রকারান্তরে সেই সত্য স্বীকার করেছিলেন। বাতি জ্বালানি বা এনলাইটেনমেন্ট বিষয়ে মহাত্মা ফুকোর বক্তব্যে সেই অঙ্গীকারের পুবাল হাওয়ার ছোঁওয়া পাওয়া যায়।

সকলেই জানেন মনীষী মিশেল ফুকো ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৮৪ (অর্থাৎ তাঁহার অকাল মৃত্যুর পূর্ব) পর্যন্ত ফরাসি দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যালয় কলেজ দহ ফঁসের অধ্যাপক ছিলেন। অনেকেই জানেন তিনি ঐ বিদ্যালয়ে যে অধ্যাপনার পদ অলংকৃত করতেন তার নাম ছিল ‘চিন্তাজগতের ইতিহাস’। ইতিহাস বিচারে প্রতিষ্ঠালব্ধ ফরাসি মনীষী ফেরনঁ ব্রদেল (Fernand Braudel) প্রস্তাবিত পদ্ধতির বিরুদ্ধাচরণ করেন তিনি। ব্রদেল যেখানে এক যুগের সহিত অন্য যুগের যোগধর্ম বা ‘কনটনুয়িটি’ আবিষ্কার করার দিকে মন সংযোগ করতেন সেখানে ফুকো যুগান্তর বা এক যুগের সহিত অন্য যুগের বিয়োগধর্ম অথবা ‘ডিস্কনটনুয়িটি’র জয় ঘোষণা করতে বিস্তর দিনক্ষণ ব্যয় করেছিলেন। (দান্তো ১৯৯৮: ১৮১-৮২)

এই দিক থেকে দেখলে ‘মানুষের অবসান’ বিষয়ে ফুকো প্রচারিত বিতর্কে বিয়োগধর্মই বড় মনে হয়েছিল। অথচ এনলাইটেনমেন্ট ওরফে ‘বাতিজ্বালানি’ বিষয়ে তাঁর কহতব্য কী হিসাব করলে বিপরীত সিদ্ধান্তই গ্রহণযোগ্য ঠেকে। হিয়ুম্যানিজমে নাস্তিক্যজনিত অনিকেত ফুকো শেষ পর্যন্ত এনলাইটেনমেন্টে আস্তিকতা অর্জন করেছিলেন।
(৯ নবেম্বর ২০০৭)

মূল বক্তৃতা

ফুকো এন্ড দি ইরানিয়ান রেভলুশন এই নামে একটা বই ইংরেজিতে বেরিয়েছে। এটা তাঁর লেখার কালেকশন। বইটা এখনও আমার হাতে আসে নাই। আপনারা অবশ্যই জানেন ঢাকায় গবেষণা করতে বড় অসুবিধা – সাহিত্যের, বইপত্রের অভাব। আপনি যদি এয়ুরোপীয় বিদ্যা নিয়ে আলোচনা করতে চান, আপনার এয়ুরোপীয় ভাষা জানতে হবে। আর ভাষা জানলেও চলবে না, এয়ুরোপীয় মালটা, মেটারিয়েলটা তো বাজারে বা লাইব্রেরিতে পেতে হবে। আমাদের এখানে এমন কোনো লাইব্রেরি নাই, যেখানে আপনি গোছানোভাবে এয়ুরোপীয় সাহিত্য পাবেন। তো আমরা নির্ভর করি সাধারণ ব্যক্তিগত যোগযোগের উপর।

এখন ‘ফুকো’র এই লেখাগুলো সম্পর্কে একটা বাড়তি কথা আছে।

ইরানের বিপ্লব সম্পর্কে উনি কিছুদিন উৎসাহ বোধ করেছিলেন। অবশ্য পরে সেই উৎসাহের আগুনে কিছু বালিও ঢেলে দেয়া হয়। ঢেলে দেন তিনি নিজেই। সেইজন্য আমরা এ বিষয়ে তাঁর লেখা সব আর সহজে পাই না। এগুলো ঠিক তাঁর বন্ধুরাও আর ছাপতে চান না। ঘটনাচক্রে এই লেখাগুলোর একটা ইংরেজি সংকলন বেরিয়েছে ফুকো এন্ড দি ইরানিয়ান রেভলুশননামে। আগেই বলেছি, সেটা আমি জোগাড় করতে পারি নাই। সৌভাগ্যের মধ্যে ফরাসিতে যে কয়টা লেখা বের হয়েছে সেগুলো আবার আলাদাভাবেও অনুবাদ হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়, আমি পড়েছি ওই কয়টাই ।

এসব লেখা ফুকোর তিনটা ইংরেজি বইয়ে পাওয়া যায়। তাঁর মৃত্যুর পরে এসেনশিয়াল রাইটিংস্ অব মিশেল ফুকো নামে প্রকাশিত হয়েছে এগুলো। এক ভলিয়ুমের নাম এথিক্স। দ্বিতীয়টার নাম এস্থেটিকস্। তিন নম্বরের নাম পাওয়ার। আমার হাতের এই বই [ফটোকপি দেখিয়ে] আমি কিছু কিছু এইসব থেকে তৈরি করেছি।

আমাদের এই সেমিনারের বিষয় মিশেল ফুকো। আমরা বাংলায় বলছি ‘মিশেল ফুকো বোধিনী’। ইংরেজিতে ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং মিশেল ফুকো’। তো এখন প্রশ্ন হবে, সবাই বলবে – ‘মিশেল ফুকো’তে আমাদের আগ্রহ কেন? উত্তর হতেই পারে যে মিশেল ফুকো সম্পর্কে যে কোনো লোক যখন আগ্রহী আমরা তখন আগ্রহী হবো না কেন? কিন্তু আমি বিশেষ বলছি ফুকো কখন বিখ্যাত হন।

ফুকোর বিখ্যাত থিসিসের কথা ছেড়ে বললে বলা যায়, তাঁর প্রথম বিখ্যাত বই ১৯৬৬ সনে প্রকাশ পায়। সেই বইয়ের নাম ইংরেজিতে দি অর্ডার অব থিংস। এইটা অনুবাদ। ১৯৭০ সনে হয়েছে। মূল নাম ছিলো ‘লে মো এ লে শোজ’ (Les mots et les choses) মানে ‘ওয়ার্ডস এন্ড থিংস’। এই বইয়েরই ইংরেজি নাম হয়েছে ‘দি অর্ডার অব থিংস’।

সাবটাইটেলটা লক্ষ্য করবেন: ‘এন আর্কিওলজি অব দি হিয়ুম্যান সায়েন্সেস’। ফ্রান্সে যেটাকে ‘হিয়ুম্যান সাইন্সেস’ বলে ইংরেজিতে তাকেই আমরা ‘হিয়ুম্যানিটিজ’ আকারে চিনি। সেখান থেকে তিন চারগুচ্ছ বেছে নিয়েছেন ফুকো। তাদের জন্মবৃত্তান্ত – মানে ইতিহাসই বলা যায় – আলোচনা করেছেন। তার মাধ্যমে তিনি সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছেছেন। যেটাকে আমরা পশ্চিমে হিয়ুম্যানিজম বলি সেটা সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য উল্লেখ করার মত। আমি ফুকোর থিসিসটা সংক্ষেপে আপনাদের বলছি। এতদিন যেমন আমরা মনে করতাম, হিয়ুম্যানিজম ও এনলাইটেনমেন্ট একই জিনিস। এই দুইটা বড় বড় শব্দ পশ্চিমা দর্শনে আছে, এই দুইটাকে আমরা প্রায় একই মনে করতাম। অথচ এই দুই জিনিস এক জিনিস নয়। দুইটাকে আলাদা করতে হবে।

১৯৬৬ সনে ফুকো বলেছিলেন ‘আমি হিয়ুম্যানিজম জিনিসটা পছন্দ করি না’। কারণ ‘হিয়ুম্যান’ কথাটাই অসার ও অর্বাচীন। হিয়ুম্যানিজমের সমালোচক হিসেবেই তিনি এই বইটা লেখেন। যদিও দেখবেন নাম আছে ‘হিয়ুম্যান সায়েন্সেস’, তথাপি খেয়াল রাখবেন ‘হিয়ুম্যান সায়েন্সেস’ যে অর্থে বলা হয় সেই অর্থে হিয়ুম্যানিজম বলাও চলে। যেমন ধরেন আগে স্কুল কলেজে যে বিষয়বস্তু পড়ানো হতো, যেমন গ্রামার বা বলা যাক আরবিতে যাকে বলে তফসির বা ইন্টারপ্রিটেশন, সেই ধরনের জিনিসকে ‘হিয়ুম্যান সায়েন্সেস’ এয়ুরোপখণ্ডে বলা হতো। এয়ুরোপে ওগুলোর নাম ছিল ‘হিয়ুম্যানিস্ট স্টাডিজ’। আমরা যে এখনো হিয়ুম্যানিটিজ গ্রুপ (মানবিক বিদ্যা) আর সায়েন্স গ্রুপ (বা বিজ্ঞান বিদ্যা) যোগে ম্যাট্রিক বা এসেসসি পাস করি ওইটা ওই জায়গা থেকেই এসেছে।

‘হিয়ুম্যানিজম’ কথাটা আস্তে আস্তে অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। একটা উদাহরণ দেখাতে পারি। যেমন আপনি গ্রামার পড়েন। কেন পড়েন? কারণ আপনি ভাষা বুঝতে চান। তা ভাষা পড়েন কেন? কারণ মানুষ ভাষায় কথা বলে। তাহলে, দি স্টাডি অব গ্রামার এন্ড দি স্টাডি অব ল্যাঙ্গুয়েজ ক্যান বি আল্টিমেটলি রেফারড টু ইয়োর ইন্টারেস্ট ইন হিয়ুম্যান বিয়িংস অর দি হিয়ুম্যানিটি এ্যাজ এ হোল। এই হচ্ছে বিষয়। শেষ বিচারে আপনি মানবে আস্থা রাখেন। আপনি মানবজাতিতে আগ্রহী, মানবজাতি কথা বলে সুতরাং কথা বলাটাই মানবজাতির চরিত্র। এই অর্থে আপনিও হিয়ুম্যানিস্ট। এখন আমরা বলি কি আপনি যদি ইতিহাস পড়েন, তো আপনি হিয়ুম্যানিটিজই পড়ছেন। নানাভাবে আমরা শব্দগুলির আকৃতি পরিবর্তন করে দিচ্ছি। হিয়ুম্যানিটি কথাটা লক্ষ্য করেন, এইটা থেকে হিয়ুম্যানিটিজম না হইয়া হইল ‘হিয়ুম্যানিজম’। একসময় একরকম বলা হতো, আস্তে আস্তে এর বদল ঘটলো। শব্দের ইতিহাস ট্রেস করলে, তার পায়ের চিহ্ন ধরে আগাইলে আপনি এটা বুঝতে পারবেন।

খুব সংক্ষেপে বলছি। ফুকো এপিয়ারড ইন ১৯৬৬ এ্যাজ এ ক্রিটিক অব হিয়ুম্যানিজম। লক্ষ্য করেন। এখন হিয়ুম্যানিজম মানেটা কী? আমি সেজন্য বলছি, তখন ফ্রান্সে যে বস্তুকে ‘সিয়ঁস উমেন’ বা ‘হিয়ুম্যান সায়েন্সেস’ বলা হতো সেটাই আমাদের বিদ্যার মানবিক শাখা। ওরা ফ্রেঞ্চে হিয়ুম্যান উচ্চারণ করে উমেন (humaine) আকারে।

এই যে উমেনের সমালোচনা ফুকো করলেন তার সুদ বাবদ ওঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। আনুমানিক বারো বছর পর ১৯৭৮ সন নাগাদ উনি ‘এনলাইটেনমেন্ট কী বস্তু?’ নামধারী প্রবন্ধটা লেখেন। এটা সেই ১৯৭৮ সালের প্রবন্ধ। আমি দেখাতে চাচ্ছি বারো বছরের মধ্যে কী পরিবর্তনটা হলো। পরিবর্তনটা হয়ে গেল। ফুকো বলছেন যে, ‘১৯৬৬ সনে কী যেন বলেছিলাম আমি, তার দ্বারা আমি চিরকাল বন্দি থাকবো কেন? আমি তো বন্দি থাকতে বাধ্য নই। আই হ্যাভ এ রাইট টু চেঞ্জ মাই ওপিনিয়ন। প্রত্যেকে নিজের মতামত বদলাতে পারে।’

কিন্তু আমাদের আগ্রহ হলো উনি কী, কোন যুুক্তি দেখিয়ে নিজের মতামত বদলালেন? অথবা তিনি যেটা বলছেন সেটা দিয়ে আমাদের প্রতারিত করছেন না তো? সত্যি বদলেছেন কি নিজের মতবাদ? তখন আরেকটা তাত্ত্বিক প্রশ্ন আসে, হোয়াট ইজ (হু ইজ নয়) দি রিয়েল মসিয়ঁ ফুকো? আসল ফুকো কোনটা? আমরা দেখব এটাও পরে অনেক লোকের মাথাব্যথার কারণ হবে।

আমি আবার বলি। ১৯৬৬ সনে ফুকো বলছেন, ‘আমি হিয়ুম্যানিস্ট নই, আই অ্যাম এ ক্রিটিক অব হিয়ুম্যানিজম এ্যাজ এন এপ্রোচ।’ আবার পরে বলছেন কি, ‘আই স্টিল রিমেন এ ক্রিটিক অব হিয়ুম্যানিজম। বাট নাউ লেট মি টেক আউট এনলাইটেনমেন্ট ফ্রম দ্যাট ডুয়ো – আওয়ার কাপল্। আগে হিয়ুম্যানিজম বলতে এনলাইটেনমেন্টকেও বোঝানো হতো। কমসে কম ফ্রান্সে বোঝান হতো। সেই জন্যই উনি বলছেন, আমার ক্রিটিসিজম ইজ স্টিল ভ্যালিড ইন সো ফার এজ হিয়ুম্যানিজম ইস কনসার্নড. … ..বাট আই অ্যাম নাউ এ ফলোয়ার অব দি এনলাইটেনমেন্ট ট্রেডিশন।’ কিন্তু আমরা ১৯৬৬ সনে মনে করেছিলাম, হি ইজ এ ক্রিটিক অব দি এনলাইটেনমেন্ট ট্রাডিশন টূও, হি ইজ এগেইন্স্ট দি এনলাইটেনমেন্ট।

আর ১৯৭৮ এর পর থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত (ওঁর মৃত্যু হয়েছে ১৯৮৪ সনে) এই সাত বছর উনি অনবরত একটি ভিন্ন মতবাদ প্রচার করেছেন: হোয়াট উই নিড টুডে ইজ এ নিউ এনলাইনটেনমেন্ট। এয়ুরোপের আজকে দরকার নয়া বাতি। অ্যামেরিকার আজকে দরকার নয়া বাতি। আজ সারা পৃথিবীর দরকার নয়া বাতি।

তাহলে ইনি নয়া ‘বাতি-জ্বালানি’ বা এনলাইটেনমেন্ট (Enlightenment) বলতে কী বোঝাচ্ছেন? আগের লোকেরা এনলাইটেনমেন্ট বলতে কী বোঝাত? তারপর তিনি পরিষ্কার উচ্চারণ করেছেন, আমি যাঁদের উত্তরাধিকারী তাঁদের মধ্যে – আমার পূর্বসূরীদের মধ্যে – ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল বটেন। এইটা মনে রাখা দরকার। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলে তাঁর সমসাময়িক দার্শনিক কে? হাবারমাস (Habermas)। মিশেল ফুকোর জন্ম ১৯২৬ সনে। হাবারমাসের ১৯২৯ সনে। মানে ফুকোর চেয়ে তিনি তিন বছরের ছোট। হাবারমাসের একটা বই আছে ‘দ্যা ফিলোসফিকাল ডিসকোর্স অব মডার্নিটি। ওতে একলা ফুকোর উপর আছে দুইটা অধ্যায় আর অন্যান্য দার্শনিকদের উপদেশ মিলিয়ে মোট বারোটা অধ্যায়। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বই। তাতে আপনি দেখতে পাবেন মিশেল ফুকো এবং হাবারমাসের মধ্যে কিছু মিল আছে আবার কিছু অমিলও আছে। আমার বক্তব্যের সারকথা এটাই।

মিশেল ফুকো যিনি ১৯৬৬ সনে হিয়ুম্যানিজমের সমালোচকরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন তিনি ১৯৭৮ সন নাগাদ নিজের মতবাদ খানিকটা বদলিয়ে নিলেন। আমরা এখন অনুসন্ধান করবো, আদৌ তিনি বদলিয়েছেন কিনা। এই আমার প্রস্তাব, এই আমার প্রতিপাদ্য। আমাদের শুদ্ধ দেখতে হবে ফুকোর উপপাদ্যটা কী? উনি কী প্রমাণ করতে চান? হিয়ুম্যানিজমকে উনি যদি বর্জনই করেন তো হিয়ুম্যানিজমের ত্রুটিটা কী? আর উনি যদি নতুন করে এনলাইটেনমেন্টেরই ভক্ত হলেন তবে এনলাইটেনমেন্টের কোন গুণটা আছে যে ফুকো কারণে-অকারণে হিয়ুম্যানিজম-এনলাইটেনমেন্টর বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটিয়ে একলা এনলাইটেনমেন্ট তত্ত্বের আঁচলটি আকঁড়ে ধরেন?


এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রথমে লক্ষ্য করবেন যাদের মধ্যে প্রথমে মিলন হয়েছিল, ফুকো প্রথমদিকে তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ দেখতে পেলেন। এখন আপনাদের মধ্যে কেউ যদি আবার দুইয়ের মধ্যে নতুন মিলন ঘটাতে পারেন, সেটা আপনাদের ব্যাপার।

তাহলে আমাদের আলাদাভাবে বলতে হবে হিয়ুম্যানিজম কী জিনিশ, আর এনলাইটেনমেন্টইবা কী বস্তু? তারপর আরেকটা কথা আছে। সেটাও এটার সাথে যুক্ত। আপনারা না বললেও আমি জানি, সেটার নাম ‘মডার্নিটি’, এদের সাথেই যুক্ত। আপনি তিন নম্বর হিসেবে বলতে পারেন। হিয়ুম্যানিজম, এনলাইটেনমেন্ট, মডার্নিটি। এই সব কথা এখনও এয়ুরোপে আলোচিত হয়।

এখন এয়ুরোপের নতুন দর্শনের যে অধ্যায়কে আমরা নাম দিচ্ছি ‘পোস্টমডার্নিজম’, তার প্রবক্তারা বলছেন ‘মডার্নিটি জিনিসটা একসময় জন্ম নিয়েছিল। এখন তার মৃত্যু হয়েছে।’ তারপরে আমরা আরেকটা মতবাদের জন্ম দিচ্ছি। এখন লক্ষ্য করেন এখানে একটা প্রভাবশালী শব্দ আছে ‘টাইম’। মডার্নিটি ইজ এ কনসেপ্ট রিলেটিব টু টাইম। ইট হ্যাজ বিন বর্ন অ্যান্ড ইট লিভড ফর এ হোয়াইল, সো ইট উইল ডাই সামটাইম অন। অর্থাৎ তাকে একটা অর্গানিজমের মত দেখতেছি। মডার্নিটি ইজ লাইক এ বডি, যার জন্ম আছে, বিকাশ আছে এবং মৃত্যু আছে।

কিন্তু মডার্নিটির আরেকটা ধারণাও আছে। এটার প্রবক্তা ‘বোদলেয়ার’। শার্ল বোদলেয়ার। ফরাসি কবি, যাঁর কবিতা আমরা অনেকেই ‘বুদ্ধদেব বসু’র বাংলা অনুবাদে পড়েছি। উনি বড় একজন চিত্র সমালোচকও ছিলেন। তাঁর অনেক চিত্র সমালোচনামূলক লেখা আছে। তার মধ্যে আমি দুইটা প্রবন্ধের রেফারেন্স রেখেছি এখানে, একটার নাম ‘দি পেইন্টার অব মডার্ন লাইফ’। আরো লেখা আছে। সেটার মধ্যে বোদলেয়ার মডার্নিটির সংজ্ঞা দিয়েছেন, ‘মডার্নিটি ডাজ নট রিলেট টু এনি টাইম, ইট ইজ এন এটিচুড’। অর্থাৎ প্রত্যেক যুগেই কিছু লোক আছে যারা মডার্ন আবার কিছু আনমডার্ন। এটা অনেকটা প্রগতি আর প্রতিক্রিয়ার মত। প্রত্যেক যুগেই কিছু ভালো মানুষ থাকে আবার কিছু মন্দ মানুষ থাকে। অর্থাৎ এমন নয় যে পৃথিবীতে মানুষ একসময় সবাই মন্দ ছিলো আর এখন আমরা সবাই ভালো, এমন নয়। মানে আগে সবাই ভালো ছিল আর এখন সবাই মন্দ হয়ে গেছি এরকম নয়। একটু যুগ ছিলো অন্ধকার যুগ আর এখন আলোকের যুগ, এটা ঠিক নাও হতে পারে। অর্থাৎ আলো অন্ধকার দিবালোক আর রাত্রির মত জড়াজড়ি করে থাকে। এই টাইপের একটি মতবাদ বোদলেয়ার বলেছেন। বোদলেয়ার বলেছেন, ‘আধুনিক জিনিসটা একটা মনোভাবের ব্যাপার, এটা সময়ের ব্যাপার নয়, কাজেই আধুনিকতার মৃত্যু হতে পারে না অথবা আধুনিকতা প্রাচীনকালে ছিলো না এটা বলা যাবে না।’

এই জন্যই বলছি প্রাচীন ভারতের মহাভারত কাব্য যদি আপনি পাঠ করেন, সেটাও আধুনিক মনে হবে। হোমারের কবিতাও আধুনিক মনে হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কথা মাঝে মাঝেই বলেছেন। বলেছেন এর মধ্যে একটু ভুলভাল মিশিয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন কি, ‘মাঝেমাঝে নদী যেমন বাঁক পরিবর্তন করে সাহিত্যও তাই করে। সেটাই আধুনিকতা।’ কারণ রবীন্দ্রনাথ একটু ইংরেজি পড়ে আন্দাজ করে বলেছিলেন। তাঁর তো ইনজেনুয়িটি আছে, নিজস্ব চিন্তাক্ষমতা আছে। আধুনিকতার সংজ্ঞা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটা প্রবন্ধ আছে। আপনারা দেখতে পারেন। ‘আধুনিক সাহিত্য’ নামে একটা ছোট সংকলন আছে, তাতেও দেখতে পারেন।

তা প্রশ্নটা হলো ‘আধুনিকতা কি স্থায়ী জিনিশ?’ নাকি এটা কালের দ্বারা সীমাবদ্ধ? এখন যাঁরা পোস্টমডার্নিজম বলছেন, তাহলে তাঁদের এই কথাটার অর্থ কী? একটা হতে পারে যে, আগে মানুষের মনোভাব দুই রকম ছিল। মানুষ ছিল আগে নারী ও পুরুষ । এখন আরেকটা জাতির জন্ম হয়েছে। ধরেন এর নাম হিজড়া। তাহলে দুই লিঙ্গের জায়গায় এখন তিন লিঙ্গ তৈরি করলাম। ভালোমন্দের সাথে মাঝামাঝি আপনি আরেকটা তৈরি করলেন, যারা ভালোও নয়, মন্দও নয়। এরকমই কি আধুনিকতা? নাকি, আধুনিকতা ক্রোনোলজিকাল। এই যে ক্রোনলজি, তা ক্রোনোস বা কালের দেবতার কথা। আমরা বর্ষ ভারতে বলি মা কালি, কালি আমাদের দেবীর নাম। অনেকের ধারণা যে ভদ্রমহিলার চেহারা কালো, তাই তাকে ‘কালি’ বলি আমরা। সেটা পপুলার। সুতরাং বলা যেতেই পারে। কিন্তু এটার মধ্যে আরেকটা কথা আছে, এ কথার অর্থ কালের করাল গ্রাস। কালি মানে ‘গডেস্ অব টাইম’। কাল সবকিছুকে গ্রাস করে। আমরা বলি না ‘তোমারে কালে খাইলো’? মাঝে মাঝে আমরা খারাপ কাল সম্পর্কে বলি আকাল। যথা: ‘আকালের সন্ধানে’।

সমস্যাটা এখানে: আধুনিকতাটা কি ক্রোনোস-এর ভিতরের না বাইরের? বোদলেয়ারের মতটাই আমি সংক্ষেপে বলছি। বোদলেয়ার যেহেতু বলছেন, ‘আধুনিকতা জিনিসটা সময়ের ব্যাপার নয়’ কাজেই আমিও বলবো, ‘পোস্টমডার্নিজম’ কথাটা কোনো অর্থই বহন করে না। ‘সিনস্ দেয়ার ইজ নো মৃত্যু হাউ ক্যান দেয়ার বি পোস্ট মর্টেম?’ যেহেতু মৃত্যু নাই তাহলে আবার মরণোত্তর ময়না তদন্ত হবে কী করে? জীবন্তের কি ময়না তদন্ত হয়? এটা বোদলেয়ারের বক্তব্য। আমি এস্তেমাল করলাম মাত্র।

ফুকো সাহেবও সেই বক্তব্যটাই গ্রহণ করেছেন। গ্রহণ করে ইমানুয়েল কান্টের যুক্তির গাছে ‘গ্রাফ্ট’ করেছেন। গ্রাফ্ট মানে কি? এই যে আম গাছে ‘কলম’ করেন আপনারা। গাছের উপর গাছ লাগিয়েছেন। তাহলে, নতুন একটা বাগান হয়েছে। সেই বাগানের নাম হয়েছে নতুন বাতি-জ্বালানি, নতুন এনলাইটেনমেন্ট। মডার্নিটি ইজ সামথিং ইটার্নাল, ইট হ্যাজ অলওয়েজ বিন। উনি বলছেন এনলাইটেনমেন্টের সংজ্ঞা এই: এনলাইটেনমেন্ট মানে এতদিন যেমন আমরা যা হিয়ুম্যানিজমের সাথে যুক্ত মনে করতাম সেইটা নয়।

একদা ঈশ্বর ছিলেন, এখন তিনি মারা গেছেন। এখন তাঁর জায়গায় প্রবেশ করেছে মানুষ। এটা এয়ুরোপীয় একজন বড় দার্শনিকের উক্তি। নাম নিৎসে। নিৎসের উক্তিটায় বলা হয়েছে কি না, ‘গড ইজ ডেড’। তার মানে ‘গড ওয়াজ ওয়ানস্ এলাইব’। এট লিস্ট। এই স্বীকৃতিটুকু তো আছে। আসুন এখন আমরা শুকরিয়া আদায় করি তিনি স্বীকার করছেন যে একসময় ঈশ্বর ছিলেন।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ‘হু হ্যাজ অকুপাইড দি ডেড গডস্ চেয়ার’? এটিকে ব্যঙ্গ করেছে কার্ল মার্ক্সের শত্রুপক্ষ, আমেরিকান মিডিয়া। যেমন টাইম ম্যাগাজিন ১৯৭৮-১৯৭৯ সালের দিকে একটা হেডলাইন করেছিলো, আমার মনে আছে। আমরা তখন ছাত্র। ওঁরা লিখেছিল, ‘গড ইজ ডেড, মার্ক্স ইজ ডেড এন্ড আই এম নট ফিলিং টুও ওয়েল মাইসেল্ফ’। ফরাসি দেশে আন্দ্রে গ্লুক্সমান বলে একজন দার্শনিক ছিলেন, ইনি কাজ করতেন সার্ত্রের সেক্রেটারি হিসেবে। উনি বলেন যে, ‘পৃথিবীতে এখন আস্তিকতার দিন শেষ হয়ে গেছে, এমনকি কম্যুনিজমের দিনও শেষ হয়ে গেছে, আর আমরা যারা তার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করি, সেই আমরাও বোধ হয় মারাই যাচ্ছি। তাহলে সামনের পৃথিবীতে কী আছে আমরা জানি না।’ কী এর নিহিতার্থ? তিনি মিশেল ফুকোর বন্ধু ছিলেন সেই সময়। অনেকটা ফুকোলশিয়ান (Foucaultian) বলা যেতে পারে। আমি ফুকোর উপর এটা আরোপ করবো না।


ফুকো একসময় বলতেন ‘আমি নিৎসের শিষ্য’। পরে দেখা গেলো কি উনি নিৎসের থেকে একটু গা মোচড় দিলেন। শেষ বয়সে উনিই প্রমাণ করলেন যে উনি কান্টেরও শিষ্য।

এখানে একটা কথা বলে রাখার দরকার আছে। আমরা যারা এয়ুরোপীয় দর্শনের ইতিহাস পড়তে চাই তাদের পক্ষে এই নামগুলো প্রথমে কতক ধূম্রজাল তৈরি করে। কান্টের লেখা আমরা সবটুকু পড়ি নাই। কাজেই আন্দাজ করে বলা যাবে না কান্ট কী জিনিস? সেটা ভারতীয় বিখ্যাত হাতির মত। কারো কাছে মনে হবে থামের মত, কারো কাছে কুলার মত, কারো কাছে ঢেঁকির মত। আমরা এখন দেখবো কান্টের কোন অংশটা কী? এইজন্য আমরা শুধু এইটুকু বলবো, এয়ুরোপে যে যুগটাকে এনলাইটেনমেন্ট বলা হয় সেটাকেই আমি খুব সংক্ষেপে বলছি আমাদের যুগ। অষ্টাদশ শতাব্দি বলে যে বড় শতাব্দি ওইটাই এনলাইটেনমেন্টের শতাব্দি। মনে হতে পারে, আমিও মানুষের চোখে একটু ধুলা দিতে পছন্দ করি। কিন্তু আসলে তা নয়। মনে হয় আমরা এখনও কান্টের যুগেই আছি। নচেৎ আমাদের বাতিজ্বালানি শেষ হয় না কেন?

এখন কান্ট সাহেবের প্রবন্ধটাও লেখা হয়েছে একই নামে। কান্ট লিখেছেন হিসেব করে দেখেন সেই ১৭৮৩ বা ১৭৮৪ সময় নাগাদ। এটা অষ্টাদশ শতাব্দির শেষ পর্যায়। তার মানে আমি এটা বলতে পারি, আমরা বলি কি, ‘দি ওউল অব মিনার্বা বিগিনস্ ইটস্ ফ্লাইট ওনলি আফটার ডার্ক।’ এটা হেগেলের বিখ্যাত উক্তি। মিনার্বা দেবির পেঁচাটি উড়াল শুরু করে সূর্য যখন অস্তাচলে বসে ঠিক তখন। অন্ধকার হয়ে আসছে যখন তখনই পেঁচা রাষ্ট্র হয়। দিনের বেলা পেঁচা বের হতে পারে না।
‘পেঁচা রাষ্ট্র করে দেয় পেলে কোন ছুতা,
জানো না সূর্যের সঙ্গে আমার শত্রুতা?’

কাজেই দিনের বেলা সে বের হতে পারে না। তাই উনি বলছেন, যখন কোনো ঘটনা ঘটতে থাকে, তখন দার্শনিকের পক্ষে তাকে বোঝা হয়ত সম্ভব হয় না। ঘটনা যখন শেষ হয়ে যায়, দার্শনিক তখনই তার সূত্র তৈরি করেন।

কান্টের ক্ষেত্রে সেটা সত্য মনে হচ্ছে। এনলাইটেনমেন্ট প্রায় শেষ পর্যায়ে যখন এসে পৌঁছেছে এয়ুরোপে তখনই কান্ট এই প্রবন্ধটা লিখে বলছেন, ‘এনলাইটেনমেন্ট’ বলতে আপনারা এতদিন যা মনে করতেন, এনলাইটেনমেন্ট তা নয়।’ ‘ইট ইজ সামথিং ডিফারেন্ট।’

তাহলে এনলাটেনমেন্ট বলতে আসলে এতদিন কী মনে করতেন এয়ুরোপের দার্শনিকরা? দুই একজনের নাম নেন। এনলাইটেনমেন্টের মধ্যে বড় দার্শনিক কারা? যেমন ভলতেয়ার। যাকে কখনো গুরু মানেন আমাদের বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী শিবনারায়ণ রায়। তাঁর সম্পাদিত জিজ্ঞাসা পত্রিকা ঢাকায় আসতো বলে আমরা কিছু পড়েছি। উনি এখনো মনে করেন যে আমাদের বাংলাদেশের বা ভারতের মতন তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলোর সমস্যা এনলাইটেনমেন্টের সমস্যা। আমরা এখনো যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক দিব্যদৃষ্টি লাভ করি নাই। শিবনারায়ণ রায়ের বক্তব্য অনুসারে এনলাইটেনমেন্টই আমাদের মত গরিব দেশের প্রধান সমস্যা।

তো এনলাইটেনমেন্ট মানেটা কী? আক্ষরিক অর্থে ধরেন আপনি সন্ধ্যাবেলা একটা বাতি জ্বালান। সেটাই এনলাইটেনমেন্ট। যেখানে আগুন নাই, সেখানে আগুন নিয়ে আলো করা। এখন আগুনের দুটা সমস্যা। ইট জেনারেটস বোথ লাইট এন্ড হিট। এখন আপনি যদি এমন একটা আগুন দেখেন হুয়িচ জেনারেটস মোর হিট দ্যান লাইট, তাহলে সেটা অগ্নিকাণ্ড ঘটায়। আমরা আগুন এনেছি আলো করার জন্যে, কিন্তু অধমদের দেশে ঘটে যায় অগ্নিকাণ্ড। আমরা মনে করি কি এনলাইটেনমেন্ট বলে একটা আদর্শ এয়ুরোপে তৈরি হয়েছে, সেটা আমরা আমদানি করেছি, ইচ্ছায় হোক আর বাধ্য হয়েই হোক। এইটা আমাদের দেশে আগুন জ্বালিয়েছে। আগুন আলোর জন্য না অগ্নিকাণ্ড ঘটানোর জন্য সেটাই বিচার্য বিষয়। শিবনারায়ণ রায় মনে করেন, আগুন জ্বালানোই আমাদের দায়িত্ব, তা অগ্নিকাণ্ড ঘটাবে না আলোক দান করবে সেটা পরের ব্যাপার।

এই ধরনের একটা এটিচুড আছে। এই এটিচুডের একটা উদাহরণ ‘গোলাম মুরশিদ’। তিনি আমাদের এখানে শিব রায়ের ছাত্র। উনি একটা বই লিখেছেন। নাম রিলাকটেন্ট দেবুতাঁত (Reluctant Debutante)। বাংলা মানে লিখেছেন ‘সংকোচের বিহ্বলতা’। এই নামে উনিই বাংলায় অনুবাদ করেছেন, নিজের বই নিজেই। সেখানে বলছেন, মেয়েরা যে প্রথম হাঁটি হাঁটি পা পা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন, আস্তে আস্তে পুরুষেরা মেয়েদের শিক্ষিত করলেন এইটাকে হলো এনলাইটেনমেন্ট। এনলাইটেনমেন্ট সম্পর্কে অনেক আলোচনা আছে। আমি এখানে একটাই বললাম।

আরেকটা হল, এনলাইটেনমেন্টের প্রধান শত্রুর নাম যে জিনিশ তাকে তাঁরা বলেন কুসংস্কার। প্রথমে সংস্কার এবং তার আগে কু লাগিয়ে দিলেন। তাঁরা মনে করেন ঝাড় ফুঁকে বিশ্বাস, পীর ফকিরে বিশ্বাস এগুলোই কুসংস্কার। এটা বলতে বলতে তাঁরা বলেন যে কোনো ধর্মে, মানে নীতিটীতিতে বিশ্বাস করাও কুসংস্কার। এনলাইটেনমেন্টের মূল মেসেজ এইটা।

এনলাইটেনমেন্ট ওয়াজ নোওন ইন এয়ুরোপ এজ এন্টি-রিলিজিয়ন। যেটা থেকে আজকের সেক্যুলারিজম কথাটা তৈরি হয়েছে। শিব রায় বলেন ‘আমরা নাস্তিক।’ এটা বলেন তাঁরা ঘরের মধ্যে। আর পাবলিককে বলেন কি ‘আমরা এনলাইটেন্ড পিপল।’ এখন এইটারই একটা কুৎসিত অনুবাদ করেছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ মহাশয়: ‘আলোকিত মানুষ’। এনলাইটেনড মানে আলোকিত। আলোকিত শব্দটা খেয়াল করছেন? যে লোকটা দাঁড়িয়ে আছে, যেমন আমি এখানে আছি। আর ওখানে বাতি জ্বলছে। আমি আলোকিত হলাম না? আলোটা বাইরে থেকে আসছে। কিন্তু কান্টের লেখা পড়লে আপনি দেখবেন, আমার ভেতর থেকে যদি আলো আসতো, আলো বের হতো তাহলে আমি তো আলোকিত হতাম না, হতাম আলোকদানকারী।

সে হতো ‘আলোকিত’ নয়, ‘আলোকক’। আলোকিত বা আলো মুরগি হবে কেন সে? সে হবে ‘আলোকক’ বা আলো মোরগ। উনি যেটা করছেন সেটা আলো মুরগি বলেই মনে হয়। আসলে এইটা কী? যদি আপনি মার্ক্সের ভাষায় দেখেন, এয়ুরোপের প্রবলেম এমনই। ধনিক শ্রেণী চেয়েছে, আমাদের গরিবরা, আমাদের কথামত চলবে। আমরা তাদের ভালো করে একটু খাওয়াবো পরাবো। তাদের ঠিক যে পরিমাণ বিদ্যা দরকার এ পরিমাণ দেব। যেমন ক্লাস ফাইভ। যেমন এখানে ব্রাক বলে, ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়লেই যথেষ্ট। সেই রকম আর কি ।

এই ধরনের মতবাদই এনলাইটেনমেন্টের মতবাদ হিসেবে তৃতীয় বিশ্বে আসছে। এয়ুরোপে কী ছিলো সে কথা আমরা মিশেল ফুকোকে বলতে দেব। আমাদের দেশে এর মানে হয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার, নারী শিক্ষা এবং ঠিক সেইটুকু শিক্ষা যেইটা শুধু দরকার। এইটার নাম হয়েছে ইনফর্মাল এডুকেশন। আর কী বাজে এর বাংলা তর্জমা, ‘উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা’! এইজন্য তাঁরা লাখ লাখ কোটি কোটি ডলার ব্যয় করছেন। কমনওয়েলথ্ এডুকেশন ফান্ড ইত্যাদি আবরণে হেন কাজ নাই তারা করছেন না। লোকগুলোকে ‘শিক্ষিত’ করতে হবে। শিক্ষার আলো বিলাতে হবে।

শিক্ষার সংজ্ঞা কী? সংজ্ঞাটা স্বচ্ছ বটে: যেটুকু করলে সে করে খেতে পারবে, পরতে পারবে। কান্ট সাহেবের সংজ্ঞাটা ঠিক সেইরকম নয়। আমি এই জন্যই বলছি, যখনই আমরা কোনো শব্দ পাব, শব্দটার গিভেন যে অর্থ বাজারে সেটাই আমাদের মাথায় প্রথমে লাফ দিয়ে আসবে। কিন্তু দেখবেন যে ওইটার বিরুদ্ধে লড়াই একটা করতে হবে আপনাকে। নইলে আপনি একজনের রক্ত আরেক জনের গায়ে দেবেন। উদোর পিণ্ডি দেবেন বুদোর ঘাড়ে ।

আমি প্রথমেই বলেছিলাম জানতে হবে পরিবর্তনটা কেন? তথাকথিত হিয়ুম্যানিজম বা মানবতাবাদের সমালোচক হিসেবে জন্মগ্রহণ করার পর মিশেল ফুকো হঠাৎ করে এনলাইটেনমেন্টের ভক্ত হয়ে উঠলেন কেন?

তাঁকে তো কিছু একটা করতে হবে। উনি বললেন, এনলাইনটেনমেন্ট কথাটাকেও আমি খৎনা বা ক্যাসট্রেট করাবো। দ্যা ওয়ার্ড ইটসেলফ্ হ্যাজ টু বি ক্যাসট্রেটেড। এর মধ্যে দুইটা অর্থ মিশে আছে। এনলাইটেনমেন্ট অর্থে এতদিন বলা হতো, আলোকিত করা। উনি বললেন, না তা নয়। বলছেন, এনলাইটেনমেন্ট অর্থ আলোকক তৈরি করা। যে লোক আলোর দ্বারা আলোকিত হয় না, যে নিজেই আলো দেয়, এমন লোককেই প্রকৃত প্রস্তাবে বলা হবে এনলাইটেনড ম্যান। উনি রেফারেন্স দিলেন কান্ট সাহেবের। কান্ট ভরসা ফুকো। খেলা জমলো।

এখানেই ফুকোর মূল বক্তব্য। এনলাইটেনমেন্ট মানে আগে বলা হতো হিয়ুম্যানিজম। হিয়ুম্যানিজমের ভেতর কী আছে। হিয়ুম্যানিজমের ভিতর আছে একটা গোঁয়ার গোবিন্দ, একটা এরোগেন্স। এরোগেন্সটা কী? ম্যান হ্যাজ রিপ্লেস্ড গড এজ দি সেন্টার অব হিয়ুম্যান অ্যাটেনশন। এইটাই বটে হিয়ুম্যানিজম। এটা আসছে কোথা থেকে ? কোপারনিকাস আর কেপলার থেকে। সৌরজগতের কেন্দ্র আর পৃথিবী নয়, সূর্য। এইটাও একটা মতবাদ। কেন্দ্র কী? এই কথাটার মধ্যেই মতান্ধতার নিশানা হাজিরনাজির আছে।

তারপর একদিন বোঝা গেল কিনা মানুষ ‘আশরাফুল মখলুকাত’ এই কথাটাও ঠিক নয়। মানুষ আর পাঁচটা প্রাণীর মতই আরেকটি প্রাণী বটে। এটা ডারুয়িন বললেন।

তারপর সবশেষে জানা গেল, মানুষ যুক্তিশীল এটাও ঠিক নয়। মানুষের মধ্যে যুক্তি ও অযুক্তির সমান প্রাধান্য এবং মানুষ যে অতিরিক্ত আত্মম্ভরিতার সঙ্গে বলেছে আমরা যুক্তিশীল, আসলে মানুষের ইতিহাস দেখলে তা সত্য মনে হয় না। এই দুনিয়ায় যত যুদ্ধবিগ্রহ এবং যত অন্যায় অবিচার সেইগুলিও যদি মানুষই করে থাকে তবে মানুষ একাধারে যুক্তিশীল এবং অন্যাধারে যুক্তিহীন দুটো কথাই সত্য এ কথা একসাথেই বলতে হয়। ফ্রয়েডের আবিষ্কার এ ছাড়া আর কী?

foucault001.jpg
মিশেল ফুকো

তবে হ্যাঁ, মানুষ কথা বলে । এই অর্থে যদি আপনি বলতে চান মানুষ যুক্তিশীল তবে ঠিক আছে। জাক লাকাঁ দেখাচ্ছেন এ সত্যে আত্মম্ভরিতার কিছু থাকছে না। কারণ মানুষ যতটা না ভাষার মনিব, তার চেয়ে ঢের বেশি তার গোলাম। মানে দাস। দাশ নয়; দাস।

তিনটা অংকুর আছে হিয়ুম্যানিজমের। একটা: ম্যান এজ দি সেন্টার বা কেন্দ্রাভিমানী মনু বা মনিশ্বর। লক্ষ্য করেন, এই আইডিয়াটা। মানুষ ঈশ্বরের জায়গা দখল করেছে। এই এরোগেন্সেরই নাম ছিলো হিয়ুম্যানিজম। কথাটার বাংলা দাঁড়ায় মনিশ্বরবাদ। এটা আমি বানালাম। আর ওই এরোগেন্স প্রচারক বা পয়গম্বর আন্দোলনের নাম এনলাইটেনমেন্ট। ইহার বাংলা হতে পারে বাতিশ্বরবাদ। তাতে বোঝায় কী? বোঝায় মানুষ নিরন্তর প্রগতিসাধন করছে। প্রগ্রেসকে আমরা বাংলায় বলেছি প্রগতি। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রগতি হয়েছে। আগে মানুষ বনেজঙ্গলে ছিল, তারপর মানুষ গ্রাম করেছে, এরপর শহর করেছে। এখন শহর থেকে মানুষ চাঁদে যাবে। ধরেন এইটাই প্রগতির ইতিহাস।

মানুষ জঙ্গলে ছিল। সেখানে মানুষ কী করতো? মানুষ সেখানে ছিল পেগান। তারা প্রকৃতি-পূজারি ছিল। তারপর একসময় তারা বুঝতে পেরেছে প্রকৃতিপূজা নয় কোন দেবির কি দেবতার পূজা করতে হবে। তারপর মানুষ ভাবল, না, না, গোষ্ঠী বা জাতি (ট্রাইব) পূজা এসবও ঠিক নয়। সমগ্র নিখিল জগতের এক প্রতিপালক আছেন তাঁর পূজা করতে হবে। এখন নয়া এনলাইটেনমেন্ট বলছে, আসলে নিখিল জগতের একমেবাদ্বিতীয়ম যে প্রতিপালক আছেন সে সত্যও মিথ্যার রকমফের বৈ নয়। এই প্রগতির ধারণা এইভাবে দেখা যাচ্ছে। তাহলে এই ধারণাগুলির ধারাকেই আমরা বলছি এনলাইটেনমেন্ট।

মানুষ এখন বুঝতে পারছে এই বিরূপ বিশ্বে সে নিয়ত একা। তার কোন প্রভু নাই। যে পরিমাণে সে নিজেই নিজের প্রভু সেই পরিমাণেই সে অসহায়। ফ্রিডম ইজ এ ডেঞ্জারাস থিং। ম্যান হ্যাজ টু নো হি ইজ ফ্রি এন্ড হি ইজ এলোন ইন দ্যা ইউনিভার্স। এই যে মনোভাব, এটাই এনলাটেনমেন্টের বক্তব্য হিসেবে জারি আছে।

তার সাথে যুক্ত হলো এটা ও সেটা। জোর ও জবরদস্তি। ধর্ষকাম ও বলপ্রয়োগ ছাড়া এনলাইটেনমেন্ট হয় না। আমি বললাম অসুবিধা কী, তুমি তোমার মনোভাব নিয়ে তোমার বাড়িতে থাক আর আমি আমার মনোভাব নিয়ে আমার বাড়িতে থাকি। কিন্তু তা তো নয়। বাতিওয়ালা বলে বসে: তোমাকে আমার মতবাদ গ্রহণ করতে হবে। নইলে আমি তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব।

এই যুদ্ধ নিয়ে এয়ুরোপ গেল আমেরিকায়। সে আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের বললো, তোমরা তোমাদের এই প্রাগৈতিহাসিক ধারণা নিয়ে থাকতে পারবে না। তোমাদের খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করতে হবে। শুধু গ্রহণ করলেই যথেষ্ট হবে না। তোমাদের বৈজ্ঞানিক ধর্ম গ্রহণ করতে হবে। সেক্যুলারিজম গ্রহণ করতে হবে এবং মাঝে মাঝে খ্রিস্টধর্ম এবং সেক্যুলারিজম এক হয়ে গেছে। এটার লম্বা ইতিহাস। তাঁরা একহাতে বাইবেল আরেক হাতে রাইফেল নিয়ে গেছে। জয় করেছে। জয় করে তাঁরা সেখানে সভ্যতা কায়েম করেছে। এটার নাম এনলাইটেনমেন্ট।

এনলাইটেনমেন্ট একটা দার্শনিক মতবাদ মাত্র নয়। এটা একটা রাজনৈতিক আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারপরে, সবশেষে বলা হচ্ছে কি এনলাইটেনমেন্টের ফলে আমরা যারা আমেরিকান-ইন্ডিয়ানদের মত সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাই নাই – চীন, আরব বা আফ্রিকা এই সমস্ত দেশের মানুষ – যারা এয়ুরোপের সংস্পর্শে এসেছে তারাও এয়ুরোপের মতবাদ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে। এখন আমরা আমাদের দেশে এমন সব মানুষ তৈরি করেছি যারা এয়ুরোপীয় মতবাদকে আমাদের ভাষায় প্রচার করেন এবং সেই প্রচার বাবদ তারা যেই যুক্তি দেন সেইটাই এনলাইটেনমেন্টের যুক্তি। মানুষকে আলোকিত হতে হলে এই কুসংস্কার সেই কুসংস্কার বাদ দিতে হবে। ইনফ্যাক্ট সমস্ত সংস্কার বাদ দিতে হবে।

এখন আমাদের সমালোচনা হবে: কুসংস্কার বাদ দেওয়া সম্ভব, কিন্তু সমস্ত সংস্কার বাদ দেওয়া কি সম্ভব? নাকি এনলাইটেনমেন্ট নিজেও একটা সংস্কার নয়? মিশেল ফুকো এই কথা জিজ্ঞেস করেছেন। উনি বলছেন, এনলাইটেনমেন্ট নিজেও একটি সংস্কার। তাহলে সেটা কী সংস্কার? সেটার আগে কি ‘ক’ু কথাটা ব্যবহার করা যায়? ধরুন, এনলাইটেনমেন্টও আরেকটি কুসংস্কার। এক কুসংস্কারের বদলে তবে আপনি আরেক কুসংস্কার আনছেন। তাই না? তার বিরুদ্ধে লড়াই করার দাওয়াটা কী আপনার? এই হচ্ছে জিজ্ঞাসা।

এনলাইটেনমেন্ট জিনিসটা ভালো কেন? উনি বললেন, এনলাইটেনমেন্ট এমন একটা মতবাদ যে নিজের খাওয়াইর ভিতরই নিজের দাওয়াই তৈরি করে নেয়। ওর বিষের মধ্যেই ওষুধ আছে। এনলাইটেনমেন্ট ইজ এ ডকট্রিন অব প্রগ্রেস অব ম্যানকাইন্ড। সামন্তবাদের পরে পুঁজিবাদ আর পুঁজিবাদের পরে সমাজতন্ত্র। এটাকে বলে গ্রান্ড ন্যারেটিভ অব প্রগ্রেস। অথবা কুসংস্কার থেকে সুসংস্কার।

কিন্তু তার ত্রুটিটাও এইখানে। এটা খোদ কার্ল মার্ক্সই বলেছেন। আজ পর্যন্ত যত ধর্ম এসেছে পৃথিবীতে সব ধর্মই বলেছে কি না আমি সত্য, আমার আগের সব ধর্মই মিথ্যা, সব ভুল। আমিই হইলাম শ্রেষ্ঠ ধর্ম, সঠিক ধর্ম। খ্রিস্টধর্মের মূল আর্গুমেন্টটা কী? আর্গুমেন্টটা এইমতো: আমরা এয়াহুদি জাতির সন্তান, কিন্তু বর্তমান এয়াহুদি যারা রাব্বাই আছেন, তারা ধর্মটাকে বিকৃত করেছেন। কাজেই ধর্মটাকে পুনরুদ্ধার করার জন্য আরেকজন নতুন নেতা এসে গেছেন। তিনি ‘হযরত ঈসা’। আমরা তাঁর অনুসারী। তিনি ভগবানের বা ভগওয়ালার পুত্র। সুতরাং আমাদেরটাই সঠিক ধর্ম। ইতোপূর্বে আগের ধর্ম যেহেতু বিকৃত হয়েছে তাই সেটা বাতিল। এটাই সর্বশেষ ধর্ম।

একই যুক্তিতে ইসলামের শর্তও এই: ইসলামই সর্বশেষ ধর্ম। ইসলাম এমবডিস দ্যা লেটেস্ট ট্রুথ, সর্বশেষ সত্য। আমার শেষ বহির ধর্ম, লাস্ট রিভিলড রিলিজিয়ন। আর কোন রিভিলড রিলিজিয়ন আসবে না। অর্থাৎ এই পর্যন্ত যেগুলো এসেছিল সব বাতিল। এখন ইসলামের পরে কে আসবে? ইসালামের পরে শুধু ইসলামই আসতে পারে। আর কিছু আসতে পারে না। হোয়াটয়েভার কামস মাস্ট বিন উয়িদিন ইসলাম। যদি এটা ইসলাম-বিরোধী হয় তাহলে এটা বাতিল অথবা ইসলামের ভিতরের হয় তাহলে এটা এর অংশ। আবার আরেকটা ইসলামের দরকার নাই। দি সেইম ইসলাম দেয়ারফোর কেন নট বি ইমপ্রুভড।

এখন মজার বিষয়, ধনতন্ত্রের ইতিহাসও একই যুক্তিতে এগিয়েছে। এটা কার্ল মার্ক্স বলছেন। উনি বলছেন যে একসময় পৃথিবীতে মানুষ বনেজঙ্গলে থাকতো, সেখান থেকে কিছু মানুষ কিছু মানুষকে দাস করেছে দাস প্রথা তৈরি করেছে। তারপর মানুষ সামন্ত—প্রথা – তৈরি করেছে। কিছু মানুষ কিছু মানুষের সার্ভেন্ট থাকবে। তারপর এখন আমরা তৈরি করছি ধনতন্ত্র। এই তন্ত্রে বলা হয়েছে কি সবাই স্বাধীন। কিছু লোক শ্রমিক, কিছু লোক পুঁজিপতি থাকবে। তার মধ্যে সকলে সমান। কিন্তু আবার সকলে সমান নয়। অদ্ভুত যুক্তি। যাঁর সম্পত্তি আছে সে, যার সম্পত্তি নাই তাকে নিজের কাজে খাটাতে পারে। তখন সে বলে যে, আপনিও একজন মজুরি শ্রমিক। তবে আপনি যদি ডাক্তার হন, তবে ইউ আর ওনলি এ হাইলি এফিশিয়েন্ট ডে ‘লেবার’। আপনার বেতনটা একটু বেশি, কিন্তু চরিত্র একই।

এই মতবাদটি অ্যাডাম স্মিথ প্রচার করলেন: ‘ধনতন্ত্রের পরে পৃথিবীতে আর কোন তন্ত্র নাই’। এটাই শেষ তন্ত্র, লাস্ট রিভিল্ড স্যোশাল সিস্টেম। ক্যাপিটালিজম ইজ দ্যা নিউ ইসলাম অব মডার্ন টাইমস। ধনতন্ত্রই আধুনিক জমানার শেষ এসলাম। এরপর আর কোন রিভিল্ড স্যোশাল সিস্টেম থাকতে পারে না।

এই যে মতবাদ, এনলাইটেনমেন্টও তাই। ভলতেয়ার ও দিদ্রো প্রভৃতি ফরাসি দার্শনিক বললেন, ‘আমরা যে সংস্কারে এসে উপনীত হয়েছি, সেটা পৃথিবীর শেষ সংস্কার’। মিশেল ফুকো বললেন, ‘এই কথা ঠিক নয়।’। এনলাইটেনমেন্ট জিনিসটাকে আমরা কেন বেছে নেবো, এটাও যদি আগের মতই হয়? উনি বলছেন, ‘আমি যদি এয়াহুদি ধর্ম ত্যাগ করি তাহলে আমি খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ করবো না কেন? আর খ্রিস্টধর্মই যদি ত্যাগ করতে পারি তবে ইসলাম ত্যাগ করবো না কেন? সুতরাং আখেরি যুক্তি, লাস্ট লজিক হচ্ছে কি আমি কোনো ধর্মেই থাকব না।

ওঁর বক্তব্য: আমি যদি সামন্তবাদ ত্যাগ করতে পারি, দাসপ্রথা ত্যাগ করতে পারি, ধনতন্ত্র ত্যাগ করতে পারি তাহলে আমি সমাজতন্ত্রে আসব না কেন? উনি আরও বলেন ‘অবশ্যই আসব, কিন্তু এত যখন ত্যাগ করলাম তাহলে সমাজতন্ত্রটা ত্যাগ করতে অসুবিধা কী?’ তাঁর প্রশ্ন, ‘আমি যাব কোথায়? আমার তো একটা লক্ষ্য দরকার’। এই হলো ক্রাইসিস এর পর্যায়।

এইখানে, এই যে আমি আপনাদের সামনে একটা গোলকধাঁধার মত অবস্থা উপস্থিত করলাম, এটাই হচ্ছে মিশেল ফুকোর সার বক্তব্য। উনি বলেছেন, ‘মানুষের কোন আলটিমেট তন্ত্র থাকতে পারে না। কোন আলটিমেট ধর্ম থাকতে পারে না’। তাহলে, আপনাকে প্রতিদিনই নিজের ধর্ম নিজে রচনা করতে হবে। প্রতিদিনই নিজের তন্ত্র নিজে রচনা করতে হবে।

এইটা বলে যদি তিনি পার পেতেন, তাহলে আমরা আর তাঁকে নিয়ে আলোচনা করতাম না। কিন্তু, তিনি কিছু সমস্যা রেখে গেছেন। সেইটাই আমাদের দেখতে হবে। এখন, ‘ক্রিটিক’ বলতে তিনি কি বোঝাচ্ছেন? উনি বলছেন, ‘এলাইটেনমেন্ট মতবাদ বটে, সে অন্যের সমালোচনা শুধু করে না, সে নিজেও নিজের সমালোচনা করে’। এটা সেফ রিফ্লেকসিভ। অর্থাৎ এনলাইটেনমেন্ট বলে দিতে পারে যে এটা আমার ত্রুটি। তিনি বলছেন, ‘আমার সেই এনলাইটেনমেন্ট চাই যে নিজেই নিজের ত্রুটি দেখাতে সক্ষম’। তো, সেটা কী করে সম্ভব?

তাই তিনি বললেন, আসুন আমরা কান্টের লেখাটা পড়ি। কান্ট যেহেতু খ্রিস্টধর্মের ভিতরে বড় হয়েছেন, সেহেতু তাঁর লেখাও খ্রিস্টিয় রেফারেন্সে ভর্তি। কান্টের রেফারেন্স হলো এই, ‘মানুষ যতদিন পর্যন্ত নাবালেগ থাকে, ততদিন পর্যন্ত তাকে বাইরের থেকে হাত ধরে ধরে নিয়ে যায় কেউ। মানুষ যখন সাবালেগ, প্রাপ্তবয়স্ক হবে তখন সে নিজে নিজেই চলতে পারে’। এয়ুরোপের পরিপ্রেক্ষিতে উনি নামটা না বললেও এটাই বোঝাচ্ছেন। খ্রিষ্টধর্মের ধর্মসভা, অরগানাইজেশন অব ক্রিশ্চিয়ান থিয়োলজি, যিশুর অনুসারির চার্চ।

আমরা চার্চ মানে দালানটা মনে করি, উনি দালানটা না বলে বলেছেন, দালানের ভেতরে যে মনোভাবটা থাকে সেটাই চার্চ। এসোসিয়েশন অব ক্রিশ্চিয়ানস। এটা অফিসিয়াল এসোসিয়েশন। সংক্ষেপে খ্রিস্টান-সমাজ। এটাই নিয়ম করেছে তুমি এটা করতে পারবা, সেইটা করতে পারবা না। এটা জায়েজ, ওইটা নাজায়েজ। ইতি আদি।

কান্টের বক্তব্য হলো, ‘যে মানুষ চার্চের হাতে আত্মসমর্পণ করেছে সে মানুষ বালেগ নয়। যে মানুষ নিজেই নিজের কর্তব্য নির্ধারণ করতে পারে, সেই বালেগ’। কাজেই উনি এনলাইটেনমেন্টের সংজ্ঞা দিলেন এভাবে, ‘মানুষ যখন সাবালেগ হয়, সেই যুগটাই এনলাইটেনমেন্টের যুগ। তো, সাবালেগ হবার লক্ষণ কী? সে যেমন পরের সমালোচনা করতে পারে, তেমন নিজেও নিজের সমালোচনা করতে প্রস্তুত বা সক্ষম। এই মানুষ আলোকিত নয়, আলোকক। কোন মানুষ আলোকক? যে নিজেই নিজের সমালোচনা করতে প্রস্তুত সেই মানুষই আলোকক, বাংলার গুণে বলা যাক আলোর মোরগ। আর সেই মানুষই হচ্ছে আলোর মুরগি যে শুদ্ধ পরের সমালোচনা করে, নিজের বিচার করতে সক্ষম নয়। অক্ষম কেবল বলে বেড়ায়, আমার বিচার তুমি কর।

এলাইনটেনমেন্ট বলতে আমাদের বুঝতে হবে আরো নানান জিনিশ, এনলাইটেনমেন্টর মধ্যে একটা পরোপকারের ভাব আছে। যেমন এয়ুরোপ থেকে এনলাইটেনমেন্টের জন্য রবার্ট ক্লাইব বা ক্রিস্টোফার কলম্বাস সমুদ্র পাড়ি দিয়েছেন। ক্রিস্টোফার কলম্বাস সদা বিশ্বাস করেছেন (অলওয়েজ বিলিভড দ্যাট) তিনি একজন মিশনারি, ধর্মপথিক, তীর্থযাত্রী বা হাজি। শুদ্ধ ঈশ্বরের গুণগান কীর্তনের জন্যই আমেরিকায় গিয়েছিলেন তিনি। হি অলওয়েজ থট দ্যাট হি ওয়াজ এ রিলিজিয়াস ম্যান এন্ড দ্যাট ওয়াজ হিজ মিশন।

মগর তিনি কিতা খরলেন ভগবানের আমেরিকাখণ্ডটায়? বাট হোয়াট হি ডিড ইন দি আমেরিকাস? এখন আমরা বুঝতে পারছি যে, যা করেছিলেন তার সরল পরিচয় প্রলয়, সেটা ডেভাস্টেশন। আফ্রিকা থেকে লোক ধরে দাস বানালেন তাঁরা, একরোখা কলম্বাসবাদীরা। দে ওয়ার ব্রিঙ্গিং স্ল্যাভস ফ্রম দি পপুলেশন।

তাহলে ওই আমেরিকানদের দোষটা ছিল কী? এক নম্বর দোষ তারা খ্রিষ্টান ছিলেন না। দুই নম্বরে তারা এয়ুরোপীয় ছিলেন না। এরকম দোষ আপনারা ধরতে পারেন। সেখান থেকে তারা যে ইন্ট্রিগ্রেটেড হয় নাই এজন্য তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে ফেলেছে। একটা-দুটা কাহিনী আমরা পড়ি। যেমন ‘পো-কা-হুন-টাস’। একটা আমেরিকান-ইন্ডিয়ান মেয়েকে এয়ুরোপে নিয়া আসলো। তারপর কী যেন, একটা চিড়িয়াখানার বাঘের মত সে তো শেষে মারাই গেলো।

আমি এজন্যই বলছি যে, এনলাইটেনমেন্ট বলতে চলন্ত ধারণা হলো, ‘দি ডিসকোর্স অব প্রগ্রেস, মডার্নিটি এন্ড হিয়ুম্যানিজম।’ মিশেল ফুকো বলছেন, ‘নো, এনলাইটেনমেন্ট কথাটির আরেকটি অর্থ করা যায়। এনলাইটেনমেন্ট মিনস্ দি পসিবিলিটি অব অটোক্রিটিক।’ অর্থাৎ, বিদ্যমান সবকিছুরই নিরন্তর সমালোচনা। এটা কার্ল মার্ক্সের বক্তব্য। এটা কি সম্ভব? আমি আপনাদের বোঝাতে চাচ্ছি, হোয়াট ইজ দ্যা প্রজেক্ট অব মিশেল ফুকো? আপনারা লেখাটা পড়ে দেখেন যে আমি যে সারমর্ম করলাম তার মধ্যে কী পরিমাণ বিকৃতি সাধন করলাম। আমি যা বলেছি তার মধ্যে ফুকোকে কী পরিমাণ মিস-রিপ্রেজেন্ট করেছি।

মিশেল ফুকোর কথা গ্রহণ করতে হলে উনি যেই সোর্সগুলোর নির্দেশনা দিয়েছেন তা দেখতে হবে। প্রথম সোর্স হল, ইমানুয়েল কান্টের লেখা। উনি কী বলছেন? পত্রিকায় একটা প্রশ্নের উত্তরে উনি এটা লিখেছিলেন। জার্মানির একটি পত্রিকা বার্লিনিশে মোনৎশ্রিফ্ট্, (Berlinische Monatschrift) বাংলায় করলে দাঁড়ায় ‘মাসিক বার্লিন পত্রিকা’। সেই পত্রিকা প্রশ্নে বলছে, ‘এনলাইটেনমেন্ট কী বস্তু? মাননীয় দার্শনিকগণ উত্তর দিন।’

প্রথম যিনি উত্তর দিলেন তাঁর নাম ‘মোজেজ মেন্ডেলসন’। ইনি জার্মানির সবচেয়ে মশহুর এয়াহুদি দার্শনিক তখন। ইয়াহুদি হিসেবেই তিনি পরিচিত। আর এমানুয়েল কান্ট মহোদয় খ্রিস্টান দার্শনিক। এই কান্টের উত্তরটা দ্বিতীয় উত্তর। সেখানে কান্ট বলছেন, ‘এনলাইটেনমেন্ট বলতে আমরা বুঝবো, মানবসন্তান যে পর্যন্ত নিজেই নিজেকে নাবালক করে রাখে, সেই অবস্থা থেকে তার মুক্তি।’ তাহলে নাবালক অবস্থা কী জিনিশ? এটা একটা কথার রূপ বা মেটাফোর। যে মানুষ বয়সে পঁয়ত্রিশ বছর হয়েছে কিন্তু এখনো পাঁচ বছরের বাচ্চার মত কথা বলে। অর্থাৎ আমরা এয়ুরোপের অনেকদূর অগ্রগতি করেছি কিন্তু কোনো কোনো জায়গায় এখনো শিশুর মত আছি। সেই শৈশব থেকে মানব জাতির বন্ধনদশা যখন ঘোচে তখনই এলাইটেনমেন্টের উৎপত্তি হয়। এটা একরকম ভোরবেলা। যখন আলো ফোটে। আমরা বেগম রোকেয়ার ভাষায় বলতে পারি এটা ‘সুব্হে সাদেক’। এখন সকাল হল। আলো ফুটল।

আরবিতে ‘সাদেক’-এর মধ্যে যে সত্যের একটি আভাস আছে, এইখানেও এরকম একটি আভাস দেখছেন উনি। দি এনলাইটেনমেন্ট মিন্স ইউর ইমার্জেন্স টু ট্রুথ। যদিও উনি বলছেন না বাংলায় আমরা এটার নাম দিয়েছি খুব বিশ্রি, ‘প্রথম আলো’। বাংলায় এনলাইটেনমেন্টের সবচেয়ে চালু অনুবাদ কোনটা জানেন? ‘প্রথম আলো’। দিস ইজ দ্যা টাইটেল অব এ বুক বাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এন্ড হুইচ আওয়ার ফ্রেন্ডস্ আর কপিয়িং হিয়ার। তার জন্মের মধ্যে এই ত্রুটিটা আছে আরকি। এটা নকলনবিশ নাম। ‘প্রথম আলো’ মানেই সুব্হে সাদেক। ‘প্রথম আলো’ মানেই এনলাইটেনমেন্ট। এইটাকেই জার্মানরা বলে ‘আউফক্লারুঙ্গ’। আউফ মানে আপ। ক্যারুঙ্গ মানে ক্লিয়ারিং। আক্ষরিক অর্থে। অর্থাৎ ময়লাটা মুছে ফেলুন।

এই এনলাইটেনমেন্ট আসছে খ্রিস্টধর্মের বিচার বা সমালোচনা হিসেবে। সব কথা বলা যাবে না এখানে। সময় সংক্ষিপ্ত, মোখ্তসর। সেখানে স্বৈরতন্ত্র ছিল। ধর্মতন্ত্র আর স্বৈরতন্ত্র সমার্থক। হোয়াট ওয়াজ জার্মানি এট দ্যাট টাইম? ইট ওয়াজ এ হলি রোমান এম্পায়ার। মানে পবিত্র রোম সাম্রাজ্য। ভলতেয়ার ভাঁড়সুলভ ভাষায় কয়েছেন ঐ সাম্রাজ্য না ছিল হলি, না রোমান, না এমনকি সাম্রাজ্য। তবে অবিচার ছিল, ভাগাভাগি ছিল ক্ষমতার। ওরা বলেছিল এখানে পরকালের দায়িত্ব পোপ সাহেবকে দিচ্ছি। আর ইহকালের দায়িত্ব আমরা সম্রাট সাহেবরা নিচ্ছি। কিন্তু আমাদের অথরিটি আসছে ফ্রম দ্যাট, মানে ঐখান থেকে। ধর্মই আমাদের সিদ্ধির মাপকাঠি।

তার ভেতরেই চাকরি করেন দার্শনিক ‘ইমানুয়েল কান্ট’। এর মধ্যে থেকে তিনি যেটুকু বলতে পারেন, বলছেন যে, ‘সমস্ত ব্যাপারে চার্চের মাতব্বরি মেনে নেওয়া আমাদের প্রগতির পক্ষে অসুবিধা।’ প্রশ্ন হল, কী সমালোচনা করা যাবে আর কী করা যাবে না? তখন সেন্সর চালু ছিল। নিয়ম বেঁধে দিয়েছে, এইটা সমালোচনা করতে পারবেন আর এইটা সমালোচনা করতে পারবেন না। কারণ কী? এটা সেন্সিবিলিটিতে আঘাত করবে। এইভাবে আসতে আসতে কান্টের মূল সিদ্ধান্ত হল: ‘আপন যুগের, আপন ধর্মের সমালোচনা আপনাকে করতে হবে। এনলাইটেনমেন্ট মাস্ট পারমিট ক্রিটিসিজম অব রিলিজিয়ন।’

কান্টের এই কথার সূত্র ধরেই মিশেল ফুকোও যোগ করলেন আপনকার এক ফোঁটা নবীন শিশির । উনি বললেন, ‘তাহলে ইস্! উই ক্যান ক্রিটিসাইজ এনলাটেনমেন্ট ইটসেল্ফ।’ দার্শনিক যুক্তি হিসেবে এমন মহা নতুন কিছু নয়। কিন্তু কোন জিনিসের মূল্য নির্ভর করে তার মৌলিক উত্তরের উপর শুধু নয়। তার সমসাময়িকতার উপরও। কোন সময়ে কোন জায়গায় কে কী বলছেন, সেটাই দরকারি হয়ে ওঠে।

মিশেল ফুকো বলছেন, ‘এখন এয়ুরোপে যে ধনতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছে তার আধ্যাত্মিক আদর্শ এনলাইটেনমেন্ট। এই এনলাইটেনমেন্টের মাধ্যমে আমরা হয়ত এই ধনতন্ত্রকে অতিক্রম করতে পারবো না, কাজেই আমাদের এইটার সমালোচনা করার মত একটা সূত্রও বের করতে হবে। নাম তিনি দিয়েছেন ‘ক্রিটিক’। ‘ক্রিটিক’ কথাটা এয়ুরোপে প্রথম প্রমিনেন্ট করেছেন ইমানুয়েল কান্ট। ‘ক্রিটিক’ মানে সমালোচক নয়, সমালোচনার ধর্ম। অনেকে এই ‘ক্রিটিক’-এর বাংলা অনুবাদ করেছেন ‘সম-আলোচনী’। ক্রিটিক মিনস্ এ ডিসকোর্স হুইচ কন্টেইনস ক্রিটিসিজম। কন্টেইন শব্দে যেমন ধারণ করা বোঝায়, আবার রোধ করাও বোঝায়। এ তলোয়ার দুধারি।

‘ডিসকোর্স’ কথাটার অর্থ আমরা পরিষ্কার বুঝি কিনা বোঝা দরকার। আমি নিজেও বুঝতাম না। আনটিল আই কেইম এক্রস দি রাইটিংস্ অব জাক লাকাঁ। জাক লাকাঁর মধ্যে ডিসকোর্স কথাটা কোন অর্থে আসছে? ডিসকোর্সের যদি আক্ষরিক অর্থ করেন, ইট ইজ এ কোর্স অব স্পিচ্। এখন এর একটা নতুন বাংলা আমি প্রস্তাব করেছি। আপনারা হয়ত এখনো শোনেন নাই। এই ডিসকোর্সের বাংলা ‘সন্ধ্যা’।

আপনারা সান্ধ্য আইনের কথা শুনেছেন, কিন্তু ‘সন্ধ্যাভাষা’র কথা হয়ত এখনো শোনেন নাই। একটা উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। সন্ধ্যাভাষা বলে কোনটাকে? চর্যাপদের ভাষা এক ধরনের সন্ধ্যাভাষা। আমরা যে অর্থ নিয়েছি এর তা কি জানেন? মধ্যযুগ বলে একটা জায়গা আছে। তার সঙ্গে আছে অমধ্যযুগ। দুইয়ের একটা সন্ধিস্থল থাকবেই।

কিন্তু চর্যাপদ কোন সময়ে লেখা? বাংলাদেশে যখন বৌদ্ধধর্মের প্রচার তুঙ্গে উঠেছে, এটা মূলত হযরত গৌতম বুদ্ধের অনেক পরে। তাঁর এক হাজার দেড় হাজার বছর পরে বঙ্গীয় তান্ত্রিক বৌদ্ধরা তাঁদের গান (প্রার্থনা সঙ্গীত) যে ভাষায় করছেন সেইগুলিকে আমরা সন্ধ্যাভাষার নমুনা বলি এখন। এখনও দাবি করি এসব বাংলা। হরপ্রসাদ দাবি করলেন এগুলো হাজার বছরের পুরানা বাংলা। কে জানে এগুলো কি বাংলা, না বাংলা নয়? হিন্দিওয়ালারা বলেন হিন্দি। উড়িয়ারা বলেন উড়িয়া। অহমিয়ারা বলেন অহমিয়া। আমরা বলি বাংলা। কিছু আসে যায় না। এসব ব্রজের ভাষার মত বা মিথিলার ভাষার মত।

এখন সন্ধ্যাভাষা কোন সমাজের বৈশিষ্ট্য? শহীদুল্লাহ সাহেবের থিওরি যদি সত্য হয় তবে, সপ্তম থেকে একাদশ-এর মধ্যে হয়েছে এটা। খ্রিস্টিয় শতাব্দী অনুসারে আজ থেকে চোদ্দশ তেরোশ বারোশ বছর আগে। আসলে কিন্তু আমরা ওই সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানিও না। আমি সেই অর্থে সন্ধ্যা ব্যবহার করি নাই। সন্ধ্যা মানে হেঁয়ালিও নয় ।

দিবা ও রাত্রির সন্ধিক্ষণ, সেইখান থেকে সন্ধ্যা কথাটা আসছে। সন্ধি মানে চুক্তি, যুদ্ধে যেমন সন্ধি হয়। সন্ধি মানে এক অর্থে মিলন। কিন্তু এই মিলন আবার এক অর্থে যুদ্ধচিহ্নিত। সন্ধ্যাভাষায় তাহলে কার সাথে কার চুক্তি?

ল্যাঙ্গুয়েজ ইজ এ ভেক্টর। রাশি বলি দুই ধরনের। স্কেলার রাশি আর ভেক্টর রাশি। ভেক্টর মানে যেখানে ডিরেকশন্ থাকে। আমি আপনার উদ্দেশে বলছি, আপনি আমার উদ্দেশে বলছেন। এই ভেক্টর যেখানেই থাকে সেখানেই সন্ধির উৎপত্তি হয়। ইট ইজ দি ভেক্টর অব সাবজেক্ট। হুইচ ট্রাইস টু মেক এ লিঙ্ক উইথ দ্যা ল্যাঙ্গুয়েজ। আমি যখন দাঁড়িয়ে এখানে বক্তৃতা দিচ্ছি আপনারা বলছেন সলিমুল্লাহ খান বক্তৃতা দিচ্ছেন। কিন্তু আমি যে বক্তৃতা দিচ্ছি সে আর আমার ‘আমি’ কিন্তু এক নয়। আমার একটা ‘সহ-জ’ আছে, যে আমার সঙ্গে জন্মেছে। বক্তৃতা আমি দিচ্ছি। কিন্তু আবার আমার সহজও দিচ্ছে। যুগপৎ। কখনও আমি দিচ্ছি। এ বক্তৃতা খালি। কখনও সে (সহজ) আর আমি দিচ্ছি। এটা ভরা।

আমরা ডিসকোর্স বলি সেই ভাষাকেই যে ভাষা ডিরেকশন বা দিক গ্রহণ করেছে। এইজন্য বলি মাস্টারস ডিসকোর্স, স্লেভস ডিসকোর্স, উমেনস ডিসকোর্স, ইতি আদি। স্পিচ, ল্যাঙ্গুয়েজ, ডিসকোর্স তিনেই এক জিনিস বুঝায়। কিন্তু আলাদা তারা। সবগুলিরই বাংলা করতে পারেন ‘ভাষা’। স্পিচ বলতে আমরা বলি ‘বাক্’। যথা মানুষ বাক্শক্তিসম্পন্ন প্রাণী। মানুষের স্পিচ পাওয়ার আছে। আবার বলছি কি মানুষ কী ভাষার মধ্যে বাস করে। ম্যান লিভস ইন ল্যাঙ্গুয়েজ। এখন নতুন কথা হিসেবে বলছি কী?

মানুষ যেভাবে কথা বলে সেটা কোনো না কোনো ডিসকোর্সে বিভক্ত। ইন্সটিটিউটের মধ্যে যেমন ডিপার্টমেন্ট থাকে, তেমনি ল্যাঙ্গুয়েজ ইজ ডিভাইডেড ইনটু ডিসকোর্সেস।

এখন ডিসকোর্সের নিকটতম তুলনা কী? সেন্টেনস্। আপনি একটা শব্দ দেন। কোন এক অর্থ বহন করবে। যদি শব্দটা কোন বাক্যের মধ্যে বলেন তবে আরেকটা অর্থ গ্রহণ করবে। যদি বাক্যটা কোন প্যারাগ্রাফ বা এসের অংশ হয় তবে আরেকটা অর্থ হবে। আপনার গোটা বক্তৃতাটাকে আমরা ডিসকোর্স বলি। এইজন্যই আমি বলছি, সন্ধ্যা কথাটা আমরা আনছি ওই জায়গায় থেকেই। সন্ধ্যা সন্ধির ভাষা বটে। সন্ধিটা কার সাথে? সহজের সঙ্গে ভাষার সন্ধি। ল্যাঙ্গুয়েজের মধ্যে আমি নিজেকে প্রকাশ করেও করি না। কিন্তু আমি ছুটতে থাকি ল্যাঙ্গুয়েজের পেছনে। এই ছোটার মধ্যেই আমি। আমার সহজ জন্মায় এই ছোটার টানে।

এই জন্য প্রভুদের ভাষা সন্ধ্যা নামে খ্যাত হয়। মানে আমরা যাঁদের বৌদ্ধধর্মগুরু বলি বা যাঁদের বলি সিদ্ধাচার্য তাঁদের ভাষার মধ্যে যে একটা আলো-আঁধারির ভাব আছে তা সন্ধ্যা নামে খ্যাতি পায়।

এখন আমি অনুবাদ করবো সহজ (Subject) ও সন্ধ্যা (Discourse)। ইংরেজিতে ‘সহজ’কে বলেছি সাবজেক্ট, আর ‘সন্ধ্যা’কে ডিসকোর্স। তাহলে সাবজেক্ট এন্ড ডিসকোর্স, তাদের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। এইজন্য আমি এটার নাম প্রস্তাব করেছি ‘সন্ধ্যাভাষা’। সন্ধির ভাষা। জানতে হবে, সন্ধির দুইপক্ষ কে কে। দি স্পিকার ইজ স্পিকিং টু সামবডি। প্রভু দাসের উদ্দেশে কিছু বলছেন। স্বামী স্ত্রীর উদ্দেশে, ছাত্র শিক্ষকের উদ্দেশে বলছে। জাক লাকাঁ তাঁর ডিসকোর্সে চারটা ডিসকোর্সের কথা বলেছেন। দি মাস্টারস ডিসকোর্স বা সেয়ানার সন্ধ্যা। এইক্রমে ইনভার্সিটি ডিসকোর্স। দি এনালিস্টস ডিসকোর্স এবং শেষ তক দি এনালিসেন্ডস বা হিস্টেরিক্স্ বা বোকাচোদার ডিসকোর্স। নামটা বসেছে সেয়ানের জায়গায় যে বসেছে তার নামে।

আমার শেষ মন্তব্য এনলাইটেনমেন্ট বোঝার সময় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: ‘হুজ ডিসকোর্স ইজ এনলাইটেনমেন্ট?’ কে বলছে? সেয়ানা কে এখানে?

আগে লোকে বলেছে, ঈশ্বর মানুষের কাছে যখন ওহি পাঠান তখন ঈশ্বর বলছেন বহুবচনে আমরা এটা করেছি, আমরা ওটা করেছি। ল্যাঙ্গুয়েজটা খেয়াল করবেন। এখন মানুষ যখন মানুষের উদ্দেশে বাণী পাঠায় এবং কোনো কোনো সময় ঈশ্বরের জায়গা নিজে দখল করে বলে কি, ‘আমি মানুষ, কিন্তু আমি সেয়ানা, তোমাকে ঈশ্বরের জায়গা থেকে আদেশ করছি’। সেইটা কিন্তু ওই ঈশ্বরের ডিসকোর্স গ্রহণ করে।

এই জন্য মিশেল ফুকোর নতুন কথা হল, ‘মানুষ কথাটা অর্বাচীন কথা। মানুষ শব্দটার বয়স এই মাত্র দুইশ বছর।’ আপনারা সকলেই তার প্রতিবাদ করতে পারেন। কারণ, মানুষ শব্দটা আমরা বহুদিন আগ থেকে – হযরত আদমের সময় থেকে দেখছি। আমরা সব ভাষায় দেখতেছি ‘ইনসান’ কথাটা, ‘হিয়ুম্যান’ শব্দটা আছে। কিন্তু মিশেল ফুকোর কথা অন্য। মানুষের অহমটা, অহংকারের হুংকারটা নতুন।

এই বিখ্যাত বইয়ের শেষ বাক্যে মিশেল ফুকো বলছেন, “সবকিছুর কেন্দ্রে বসা মানুষ’ কথাটা মানুষই লিখেছে। ওটা বেশি দিন টিকবে না। সমুদ্রতীরে, বালির তটে সামনের জোয়ারে সেটা মুছে যাবে।” সমুদ্রের কাছে গিয়ে লোকে মাটিতে বসে বালিতে নিজের নাম লেখে না? জোয়ার আসলে আবার মুছে যায়। তাহলে মানুষ শব্দটা মানুষ লিখেছে এইরকম, বালির তটে সামনের জোয়ারে সেটা মুছে যাবে। বাক্যটা খুব স্মরণীয়।

ফুকো ক্লাসিকাল আর মডার্ন এজ বলতে কী বোঝাচ্ছেন? ফুকোর কাছে নাইনটিনথ সেঞ্চুরি মানে আঠারো শ সন থেকেই মডার্ন যুগের শুরু। আর আগের যুগটাকে – মানে এর আগের দেড়শ বছরকে – তিনি বলেন ক্লাসিকাল বা বুনিয়াদী যুগ। মানে ১৬৫০ থেকে ১৮০০ পর্যন্ত এই সময়টাই ফুকোর অভিধানে ক্লাসিকাল যুগ আর ১৮০০ থেকে আজ পর্যন্ত বাকিটা মডার্ন যুগ।

এখানেই ফুকো বলেছেন, খেয়াল করবেন, ‘ওয়ান ক্যান সার্টেইনলি ওয়েজার (Wager – এর অর্থ বাজি ধরা, রেসের ঘোড়ার মানুষ যে বাজি ধরে, কোন ঘোড়া ফার্স্ট হবে? এইটা হল সেই বাজি ধরা) দ্যাট ম্যান উড বি ইরেজড লাইক এ ফেস ড্রন ইন স্যান্ড এট দি এজ অব দি সি।’ আপনি বাজি ধরতে পারেন, মানুষের দিন শেষ হয়ে গেছে। এই জন্য তিনি ফরাসিদেশে আবির্ভূত হয়েছিলেন এন্টি-হিয়ুম্যানিস্ট হিসেবে। ফ্রান্সে কয়েকজন দার্শনিককে এন্টি-হিয়ুম্যানিস্ট বলা হয়েছে সেই সময়। একজন ফুকো। আরজন লুই আলথুসার। আরেকজন জাক লাকাঁ।

foucault7.jpg
মিশেল ফুকো

এরা কেন মানববিরোধী? আমরা মানববিরোধী থেকে অনুবাদ করে বলেছি মানববিদ্বেষী। ম্যান উড বি ইরেজড লাইক এ ফেস ড্রন ইন স্যান্ড এট দি এজ অব দি সি। ক্লাসিকাল যুগের চিন্তা মানে দেকার্ত থেকে শুরু করে কান্ট পর্যন্ত সময়টা। তার ভেতরে এনলাইটেনমেন্টও আছে।

তার পরেই শুদ্ধ মানব বা ম্যান আইডিয়াটা চলেছে এয়ুরোপে। সেটাও এতদিনে ধ্বংসের মুখে এসেছে, চলে যাবে। এটাই ছিল তাঁর প্রজেক্ট। মিশেল ফুকোর প্রকল্প এন্টি-হিয়ুম্যানিজম। কিন্তু লোকটি কেন এনলাইটেনমেন্টে আবার ফিরে আসলেন? এটা বোঝার জন্য আপনারা যদি শুদ্ধ একটা ক্লু লাভ করতে চান আমি এটা বলেই শেষ করছি, ইরানের বিপ্লব সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য পড়ে দেখলেই তা পাবেন বলে।

মিশেল ফুকো কেন ইরানের বিপ্লবকে প্রথমে সমর্থন করেছিলেন এবং কেন পরে সমর্থন করতে পারেন নাই, কেন পরে তা প্রত্যাহার করলেন, সেই রহস্যের চাবিকাঠি সেখানে আছে বলে আমার বিশ্বাস। মিশেল ফুকো : পাঠ ও বিবেচনা নামের সংকলনে অন্তর্ভুক্ত একটা সামান্য প্রবন্ধে আমি এই বিষয়টা বলতে চেয়েছি। (খান ২০০৭/ক)

প্রশ্নোত্তর

(দুর্ভাগ্যবশতঃ প্রশ্নগুলো রেকর্ড হয় নাই। কাজেই এখানে প্রশ্নকর্তাদের বেনামিতে শুকরিয়া জানাচ্ছি।)

১ নং উত্তর
ডিসকোর্সের মধ্যে কোন জিনিসটা উপস্থিত? ডিসকোর্স মানে ল্যাঙ্গুয়েজ উইথ এ সাবজেক্ট। এখন সাবজেক্ট কথাটায় যদি আপনার অসুবিধা হয় তবে আপনি বলেন ‘এ স্পিকার’ কিন্তু এটা সত্য নয়। এটা তার প্রথম বৈশিষ্ট্য। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য: ডিসকোর্সের মধ্যে একজন বক্তা থাকে। বক্তা কোন দিকে যাচ্ছে সেই দিকে একটা তীর থাকে। কাজেই এটা একটা ভেক্টর। ইট ইজ এ ভেক্টর অব স্পিচ। আপনি কোর্স কথাটা খেয়াল করছেন? এককোর্সের ডিনার বলেন না? আরো বহু রকমের কথা আছে।

আপনারা একটা সুন্দর অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করেন না? যেটার নাম ‘ইন্টারকোর্স’? রতিক্রিয়ার চেয়ে কতই না সুন্দর পদটা! মিল আছে তো এখানেও। ডিসকোর্স আর ইন্টারকোর্স ইজ নট ফার ফ্রম ইচ আদার। ডিসকোর্স ইজ এ কাইন্ড অব ইন্টারকোর্স, বাই দ্যা ওয়ে। কথাও এক প্রকার সঙ্গম, সন্ধি। এটাই আমি ভদ্রভাবে বললাম, ইট ইজ এ ভেক্টর। ডিসকোর্স ইজ ইন্টারকোর্স। দেয়ার ক্যান্ট বি ওয়ান ডিসকোর্স অ্যালোন। এইটার অন্য আরেকটা নাম আছে। ‘ওনানীয়ি’ জার্মানিতে বলে। ইংরেজিতে বলে ওনানিজম। যেটার সহজ বাংলা হল স্বমেহন। আত্মমৈথুন। যেখানে ইয়ু আর দি লাভ অবজেক্ট অব ইয়োরসেল্ফ। আপনি নিজেই নিজেকে ভালোবাসেন। একা একা দাবা খেলা যায় হয়তো। বেশি একা কথা বললে অন্যে পাগল ভাববে।

আমার নতুন কথা হল, ডিসকোর্স ইজ এ ফ্যাক্ট বিটুইন সাবজেক্ট এণ্ড ল্যাঙ্গুয়েজ। ল্যাঙ্গুয়েজ কেন? কারণ ইট ইজ ফ্রম ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যালোন দ্যাট স্পিচ কাম্স্। লোকে যখন বলে আমি বলি।

আই থিংক দেয়ার ফোর আই অ্যাম। দেকার্তের প্রধান কুসংস্কার এই। মানে এয়ুরোপের লড়াইটা হচ্ছে এখানে, মানুষ মনে করে কি আমি আমার স্পিচের মালিক। এটা একটা ইলিয়ুশন। এই ইলিয়ুশনের উপরে এন্টায়ার এয়ুরোপীয় ফিলোসফি দাঁড়িয়ে আছে গত সাড়ে তিনশো বছর। এন্ড দিস ইজ দ্যা ফান্ডামেন্টাল ডিসকভারী অব দি লাস্ট ফিফটি ইয়ারস।

১৯৫০ এর পরে এয়ুরোপে যে দার্শনিক আন্দোলন হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবর: ম্যান ইজ নো লংগার মাস্টার অব হিজ ওউন হাউজ। মানুষ তার আপন বাড়ির প্রভু নয়। কথাটা ফ্রয়েডের। মিশেল ফুকো এ কথাটা পুরা তামিল করেন নাই। তিনি বলেন এনলাইটেনমেন্ট এলাউস সেল্ফক্রিটিক, অটোক্রিটিক।

ফুকো কিন্তু এই লেসন আত্মস্থই করতে পারেন নাই। সেটা আমি পরে [আরেক দিনের বক্তৃতায়] দেখাবো। অন্য কোন দিন দেখাবো। ইরানের বিপ্লবে তাঁর মনের যে দ্বিভঙ্গি ধরা পড়েছে, সেটা কিন্তু ফিলোসফির এই ত্রুটি থেকেই। এই দ্বিভঙ্গিটা আপনি জাক লাকাঁর মধ্যে দেখবেন না। অন্ধকার রাত্রে সব গাভি কালো দেখায়। সেজন্য আপনার মনে হতেই পারে জাক লাকাঁ যা মিশেল ফুকোও তা এখন। দুইজনেই ফরাসি ভদ্রলোকমাত্র। কিন্তু পরে যখন আপনারা আরো এগুতে রাজি হবেন আমি দেখাবো যে এই দুজনের মধ্যে প্রভূত পার্থক্য আছে। সেই পার্থক্য মেটেরিয়াল, রিয়েল, মানে অখিল পার্থক্য।

প্রথম কথা, মিশেল ফুকো হিয়ুম্যানিজমের সমালোচক কিন্তু তিনি এনলাইটেনমেন্টকে সংশোধন করে গ্রহণ করতে চান। জাঁক লাকাঁ দুইটাকেই বর্জন করতে চান। জাক লাকাঁ আধুনিক বিজ্ঞানকেই বর্জন করতে চান। তাহলে বিজ্ঞানের জায়গায় কী জিনিস আমি স্থাপন করবো? সেটাকেও কি আমি বিজ্ঞান বলবো? লাকাঁ বলেন সেটাকে বিজ্ঞান না বলাই ভালো। ওটাকে ডিসকোর্স বলবো।

আধুনিক বিজ্ঞানের সবচাইতে বড় ত্রুটি এই: সে নিজেই মনে করে মেটা-ডিসকোর্স। মানে মেটা-ল্যাঙ্গুয়েজ। তার কোনো ডিরেকশানলিটি নাই। সে স্বয়ম্ভু। সে প্রভুর মত। শ্রেণীস্বার্থ গোষ্ঠীস্বার্থ কোনো কিছুই তার জন্যে মেটার করে না। পয়েন্ট অব ভিউ জিনিসটাকে সে অস্বীকার করতে চায়।

আমরা অনেক সময় মনে করি কি মানুষ বাকশক্তিসম্পন্ন প্রাণী। মানুষ র‌্যাশনাল প্রাণী। এই কথাটার মধ্যে বিরাট আকারের একটা ফাঁকি আছে। যদি মানুষ বাকশক্তিসম্পন্ন না হতো তাহলে আমরা আর কোন কথা বলতাম না। কিন্তু মানুষ যে যুক্তিনিষ্ঠ, র‌্যাশনাল যে বলা হয়, এর অর্থ কী?

মানুষের সকল কর্মকাণ্ড মানুষ নিজে থেকে নিয়ন্ত্রণ করে না। সে যেন কোথা থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়। কার্ল মার্ক্স এক জায়গায়, মোতাবেক ‘কুয়াশা মাসের আঠার তারিখ’ নামক এক কেতাবের ফাতেহায়, বলছিলেন, ‘মানুষ ইতিহাস নির্মাণ করে বটে, তবে সে ইতিহাস যাচ্ছেতাই নয়। অতীত থেকে আসা পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে তাকে ইতিহাস নির্মাণ করতে হয়। তাকে কতগুলো অবস্থা ভাগ্য হিসেবে গ্রহণ করতে হয়। তারপরে গিভেন মেটেরিয়েল দিয়ে সে ইতিহাস নির্মাণ করতে পারলে পারে, না হলে পারে না।’ এটারই প্রতিধ্বনি আমরা পাবো আধুনিক কালে। মানুষের ভাষা প্রমাণ করে যে, মানুষ ভাষারই ক্রীড়নক, বেশ কিছু পরিমাণে। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়।

ফুকো যে মোটের ওপর অর্ধশিক্ষিত দার্শনিক তার প্রমাণ এই যে, তিনি এখানেই তাঁর বই শেষ করেছেন। জাক লাকাঁ কিন্তু ঐখানেই কথা শেষ করেন নাই। জাক লাকাঁ তাঁর চেয়ে অন্তত এক আনা ঢের শিক্ষিত। উনি বললেন, বাট রিমেম্বার মাই ফ্রেন্ড, ম্যান স্টিল স্পিকস। অ্যাণ্ড অ্যাটেম্পট্স্ টু এসকেপ ফ্রম দি আদার। কিন্তু পারে না। একপক্ষে কখনো সন্ধি হয় না। ভাষাই যদি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতো তাহলে সাবজেক্টিভিটির কোন মূল্য থাকতো না।

আমি সংক্ষেপে বলি, জাক দেরিদার যে ত্রুটি আমি একটা ছোট প্রবন্ধে দেখিয়েছি, ভবিষ্যতে ইনশাল্লাহ আরো দেখানোর ইচ্ছে আছে। জাক দেরিদা ইজ নট মাচ ডিফারেন্ট ফ্রম জর্জ বুশ। অনলি ডিফারেন্স ইজ; হি ইজ এ ফিলোসফার এন্ড দ্যাট ম্যান ইজ এ প্রেসিডেন্ট। একজন বৃত্ত আরেকজন দুর্বত্ত। (খান ২০০৭/খ)

এতদিন যাবৎ আমরা মিশেল ফুকো ও জাক দেরিদাকে কিছুটা ভক্তি দেখিয়েছিলাম। দে আর ক্রিটিকস্ অব এয়ুরোপিয়ান মেটাফিজিকস্, ক্রিটিকস অব এয়ুরোপিয়ান লিবারেলিজম। কিন্তু যখন অখিল আপন জায়গায় আসে, তখন ধরা যায় তাঁদের ভেক ভেকমাত্র।

২ নং উত্তর
মিশেল ফুকো পড়ার জন্য আপনাদের আমি এন্টিডোট হিসেবে দুইটা জিনিস তুলনা করতে বলি। এক: আপনারা মিশেল ফুকোর সমস্ত লেখার সাথে মিলিয়ে তাঁর প্রতিটি লেখা পড়েন। এটা একটা মাপকাঠি। তাঁর আট দশটা বই আছে, সবগুলো পড়তে হবে। এটা হল আমাদের লংটার্ম সিলেবাস। আর দুই: মিশেল ফুকোকে তাঁর আদার কন্টেমপোরারির সাথে তুলনা করে দেখতে হবে। এর মধ্যে আছেন দেরিদা এবং লাকাঁ। আরো অনেকে আছেন। আমি আপাতত মাত্র এই দুইজনেরই নাম নিচ্ছি।

আমি এই কথা বলবো যে, মিশেল ফুকো লিবারেল কি ইল্লিবারেল সেটার বাইরেও বড় কথা মিশেল ফুকো একজন ভালো লেখক এবং তাঁর কাছ থেকে শেখার অনেক কিছু আছে। বড় শিক্ষকেরা, বড় লেখকেরা যখন ভুলও করেন তখন তাঁরা অনেক ছোট ছোট চেরাগ রেখে যান। সেগুলো থেকে আমাদের শেখার আছে। আমি এইজন্য মনে করেছি মিশেল ফুকোকে আমাদের পাঠ্যসূচির প্রধান ক্যান্ডিডেট হিসেবে।

৩ নং উত্তর
আপনারা জানেন মিশেল ফুকো কম বয়সে দুইটা বড় বই লেখেন। একটা ‘পাগলামির ইতিহাস’। আরেকটা ‘হাসপাতালের ইতিহাস’। ‘ম্যাডনেস এন্ড সিভিলাইজেশন’এবং ‘বার্থ অব দি ক্লিনিক’। ‘অর্ডার অব থিংস’ তাঁর তৃতীয় বই। আর ওঁর চতুর্থ বই ‘আরকিওলজি অব নলেজ’। তৃতীয় আর চতুর্থ বই দুটা আসলে একই বইয়েরই দুই খণ্ডমাত্র।

এরপরে তিনি দুইটা বড় বই লেখেন। একটা ‘ডিসিপ্লিন এন্ড পানিশ’। এটা ‘জেলখানার ইতিহাস’। তারপর সর্বশেষ যেটাকে আমরা বলি ‘রতির ইতিহাস’। ‘হিস্ট্রি অব সেক্সচুয়ালিটি’। রতির ইতিহাস লিখার পর তিনি বিরতি দিলেন।

৪ নং উত্তর
লুই আলথুসার বলছেন, হিস্ট্রি ইজ এ প্রসেস উইদাউট এ সাবজেক্ট। দেয়ার ইজ নো সাবজেক্ট। এখন আমি এ বাক্য ফুকোতে এট্রিবিউট করছি না, তবে ইট ওয়াজ অলসো ফুকোস ভারচুয়াল পজিশন। অর্থাৎ হিস্ট্রি ইজ এ প্রসেস উইদাউট এ সাবজেক্ট। উনি সাবজেক্ট বলে কিছু স্বীকার করেন না। আমি বলছি লাকাঁ ফ্রম দি ভেরি বিগিনিং এডমিটেড দি এক্সিসটেন্স অব দি সাবজেক্ট। পার্থক্যের মধ্যে এই।

(এপ্রিল ২০০৭)


দোহাই

১. সলিমুল্লাহ খান, ‘ইরান ও ইসলাম: মিশেল ফুকো বোধিনী,’ পারভেজ হোসেন সম্পাদিত, মিশেল ফুকো: পাঠ ও বিবেচনা, ঢাকা: সংবেদ ২০০৭/ক।
২. সলিমুল্লাহ খান, সত্য সাদ্দাম হোসেন ও স্রাজেরদৌলা, ঢাকা: এশীয় শিল্প ও সংস্কৃতি সভা, ২০০৭/খ।
৩. Arthur C. Danto, ‘Interview’ in Ewa Domanskka, Encounters: Philosophy of History after Postmodernism, Charlottesville: University of Virginia Press, 1998.

বিডিনিউজ, আর্টস, ১৫ নভেম্বর ২০০৭

 

(স্বাধীনতা ব্যবসায় গ্রন্থে পরিমার্জিত পুনর্মুদ্রণ প্রকাশ পাইয়াছে)