জেমস রেনেল ও তাঁহার রোজনামচা : ১৭৬৪-১৭৬৭ (তেসরা কিস্তি)

৩য় কিস্তির ভূমিকা

rennell………
জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০)
……….

জেমস রেনেল: আরোর আরো

মেজর জেমস রেনেল খ্রিস্টিয় ১৭৭৬ সালে সরকারি চাকুরি হইতে অবসর গ্রহণ করিলেন। ইহার শুদ্ধ কিছুদিন আগে ‘বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ার’ নামক পল্টনে মেজর পদে তাঁহার উন্নতি হইয়াছিল। তখন কলিকাতায় পূর্ব ভারত কোম্পানি নিয়োজিত গভর্নর জেনারেল পদে ওয়ারেন হেস্টিংস আসীন। জেমস রেনেলের নামে মাসিক ৫০/= টাকা পেনসন মঞ্জুর করিয়াছিলেন তিনি। এই কথা আমরা পহিলা কিস্তিতেই উল্লেখ করিয়াছি। ইহার পর দেশের ছেলে দেশেই ফিরিয়া গেলেন। দেশে ফিরিবার পর জেমস রেনেল লন্ডনেই বসবাস শুরু করেন। তাঁহার বাকি জীবন খুব একটা হ্রস্ব ছিল এমন কথা বলিব না। এই নাতিহ্রস্ব জীবন তিনি নানানদেশের ভূগোলবিদ্যা আর সাহিত্য চর্চা করিয়া কাটাইয়াছিলেন।

তাঁহার বড় কীর্তি বাঙ্গালাদেশের ভূচিত্রাবলী যাহাতে হিন্দুস্তানের ঐদিককার রণাঙ্গন আর বাণিজ্যাঙ্গনের মানচিত্র সন্নিবেশিত হইয়াছে বা Bengal Altas, containing Maps of the Theatre of War and Commerce on that side of Hindoostan প্রকাশিত হয় ১৭৭৯ সালে। ১৭৮১ সালে ইহার একটি দোসরা সংস্করণও ছাপা হয়। একই বৎসরে তিনি বিলাতের—রাজসভা বা Royal Society নামেই সমধিক পরিচিত—বিজ্ঞানসাধকমণ্ডলীর সদস্য বা ফেলো নির্বাচিত হইলেন।

ইহার পর তিনি ভারতবর্ষের একপ্রস্ত মোটামুটি নির্ভরযোগ্য মানচিত্র তৈয়ারে মনোনিবেশ করিলেন। সঙ্গে একটি প্রবন্ধ বা মেমোয়ারও জুড়িয়া দিলেন। (রেনেল ১৭৮৩) তাহাতে যোগ করিলেন কোন কল্পনা ও কোন কোন গ্রন্থকারের সহায়তা লইলেন তাহার বিবরণও। এশিয়াখণ্ডের পূর্বাঞ্চল জুড়িয়া বিশাল একখণ্ড ভূগোল বই লিখিবার মওকাও তিনি করিলেন আর গ্রিক ইতিহাসবেত্তার নামে ‘এরোদোতসের ভূগোল’ নাম দিয়া তদ্বিরচিত ২ খণ্ড বহিও বাহির হইল।

আফ্রিকা মহাদেশের ভূগোল লইয়াও তিনি মাতিয়াছিলেন। ১৭৯০ সাল নাগাদ লন্ডনস্থ আফ্রিকা সমিতির ডাকে তিনি ঐ মহাদেশের উত্তর অর্ধাংশের মানচিত্রও প্রকাশ করিলেন। সঙ্গে একপ্রস্ত প্রবন্ধও। ১৭৯১ সালে বিলাতের রাজসভা তাঁহাকে কোপলে পদক (Copley Medal) প্রদান করিয়া সম্মান জানাইলেন।

বাতাস ও সমুদ্রস্রোতের গতিবিধি লইয়া গবেষণায়ও তিনি এক পর্যায়ে আগ্রহ দেখাইলেন। ১৮১০ সালের পর তিনি তাঁহার সকল গবেষণা এক জায়গায় আনিয়া কিছু সার্বিক সিদ্ধান্ত বা ‘জেনারেল থিয়োরি’ প্রকাশ করিবারও কোশেশ করিলেন।

রেনেল সাহেব যে সময় জরিপকার্য সমাধা করিতেছিলেন সেই সময় মাপজোকের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি তত উন্নত বা নিখুঁত হয় নাই। তিনি একপ্রস্ত কম্পাস ও এক বাঁও শিকল ভরসা করিয়া জরিপাদি চালাইতেছিলেন। সবে—শুদ্ধ ১৭৬১ সালে—সময় পরিমাপক যন্ত্র বা ক্রোনোমিটারের দৌলতে অক্ষাংশ মাপিবার কৌশল বাহির হইয়াছে। রেনেল তাঁহার কাজ শুরু করিয়াছেন ততদিনে মাত্র ১ বৎসর হইয়াছে। তাহা সত্ত্বেও রেনেলের জরিপ কী করিয়া এত নিখুঁত হইল তাহা একশ/দেড়শ বছর পরের পণ্ডিতসাধারণের বিস্ময় উৎপাদন করিয়াছে। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে কর্নেল ল্যামটন প্রমুখের হাতে জরিপের আরো নিখুঁত পদ্ধতি বাহির হইয়া গেলেও ভারতবর্ষের ব্রিটিশ জরিপ বিভাগ রেনেলের কর্জ চিরকাল স্বীকার করিয়াছেন।

১৭৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রেনেল মুক্তিযোদ্ধা ফকির বাহিনীর হাতে মার খাইয়া ঘা শুকাইবার নিমিত্ত ঢাকায় চলিয়া আসেন। তাঁহার জীবনীকার বলিয়াছেন ইংরেজ অফিসারদের মধ্যে ঐ বছর মে মাসে যে বিদ্রোহ দেখা দিল তাহাতে তিনি শরিক হইবার সুযোগ পান নাই। সুস্থ থাকিলে তিনি অসন্তুষ্ট অফিসারদের সঙ্গে যে যোগ দিতেন তাহা তৎলিখিত এক পত্র মারফত জানা যায়।

তথাপি সেই যুগের ইংরেজ কর্তৃপক্ষ ওরফে কলিকাতার কৌন্সিল রেনেলের এতখানি তারিফ করিলেন কেন? রেনেলের রোজনামচা সাক্ষী তিনি রোজকার কাজ কতটা মনোযোগ সহকারে সারিতেন। আবহাওয়ার প্রতি প্রহরের পরিবর্তন তিনি লিখিয়া রাখিয়াছেন—তাঁহার জরিপ যুগের (১৭৬৪-১৭৬৭) আগা হইতে গোড়া পর্যন্ত কখনও ইহার ব্যতিক্রম দেখা যায় না।

রোজনামচার সম্পাদক লা টুশ সাহেব ১৯১০ সালে লিখিত ভূমিকায় বলিয়াছেন: ‘ভারত ইতিহাসের ঐ তুলনারহিত জমানায় যখন এয়ুরোপীয় লোকজন বল্গাহীন বিলাসিতায় সময় কাটাইতেন, তখন যে কর্ম হাতে লইয়াছেন সেই কাজে একাগ্রে চিত্তনিবেশ করিবার প্রতিভা তাঁহার ছিল বলিয়াই তিনি পরম নিষ্ঠা ও সততার সহিত নিজ কর্তব্যে অটল থাকিতেন। সন্দেহ নাই এই কারণেই কলিকাতার কৌন্সিল এহেন প্রশংসাবাক্যে তাঁহাকে অভিনন্দিত করিয়াছিলেন। ঐ যুগে তাঁহাদের কর্মচারী মহলে এহেন সদগুণের দেখা পাওয়া সহজ ছিল না।’

দোহাই

১. Major James Rennell, ‘Bengal Altas, Containing Maps of the Theatre of War and Commerce on that Side of Hindoostan, 1st ed., London 1779, 2nd ed., London 1781, reprinted by order of the Surveyor General of India.
২. Major James Rennell, Memoir of a Map of Hindoostan or the Mogul Empire, &c., London, 1783.
৩. Sir C. Markhan, Memoir of the Indian Surveys, 2nd ed. London, 1878.
৪. T. H. D. La Touche, ‘Introduction’, in The Journals of Major James Rennell, Calcutta, 1910.

~~~

আমিন জেমস রেনেল

বিরচিত

শুকনা মৌসুমে গঙ্গানদী হইতে কলিকাতা যাইবার নিকটতম পথ খুঁজিয়া পাইবার লক্ষ্যে জলঙ্গি নদীর মাথা হইতে ব্রহ্মপুত্র বা মেঘনা নদীর সঙ্গমস্থল পর্যন্ত গঙ্গার; লক্ষীপুর হইতে ঢাকা পর্যন্ত মেঘনা ও অন্যান্য নদীর; এবং দক্ষিণ তীরবর্তী নদীনালার জরিপকার্যের বিবরণী সংযুক্ত

রোজনামচা

সন ১৭৬৪-১৭৬৭

তজর্মা : সলিমুল্লাহ খান

(গত সংখ্যার পর)

বৈকালে পূর্বতীরে ভিড়িলাম, কারণ এইখান হইতে মোহনার মাথা পর্যন্ত ফিরতি জরিপ করিতে হইবে, কারণ যদি খালটিতে নৌ চলাচলের উপযোগী অবস্থা আছে বলিয়া প্রমাণ পাওয়া যায় তবে যে সমস্ত নৌকা নদীর ভাঁটিতে নামে তাহারা তো সহজেই এই পথ বাহিয়া আসিতে পারে।

বেলা ৪ ঘটিকার সময় উত্তর উত্তর-পশ্চিম দিক হইতে একটি ভারি দমকা হাওয়া বহিয়া গেল। সুদীর্ঘ মোহনাঞ্চল নৌকা-সাম্পান যাতায়াতের উপযোগী নহে বিধায় আমরা কুষ্টিয়া খালের ভেতরে আশ্রয় লইয়া সময় কাটাইতে বাধ্য হইলাম। সারা রাত ধরিয়া বিস্তর বাতাস আর বৃষ্টি।

৪ ও ৫ তারিখ আবহাওয়া ভাল গেল, বাতাস কখনো ভারি কখনো হালকা। এই দুই দিবস সুদীর্ঘ দক্ষিণ মোহনার পূর্বতীর জরিপ করিয়া কাটাইলাম আর বৈকালে কুষ্টিয়া খালে গমন করিলাম।

৬, ৭ ও ৮ তারিখ গভর্নরের কাছে পাঠাইব বলিয়া আদি জরিপ চিত্রাবলী ছোট আকারে আঁকিয়া, রোজনামচার নকল করিয়া কাটাইলাম। এই সময়টা জুড়িয়া প্রচুর বৃষ্টি হইল। বজরার ফুটাফাটা বন্ধ করিবার এবং রাডার সারাইবার নিমিত্ত কয়েকজন কাঠমিস্ত্রী নিযুক্ত করিলাম।

৯ তারিখে মাথা হইতে নিচের দিকে সোয়া এক মাইল পর্যন্ত খালের তত্ত্ব লইলাম, ঐ পর্যন্ত গিয়া দেখিলাম পানির গভীরতা একেবারেই নাই। আরো কড়াকড়ি পরিক্ষা করিয়া দেখিলাম কুপাদি (Cupadin) গ্রামের উল্টাদিকে পানি মাত্র ৪ কি ৫ হাত আর বিশ্বাসযোগ্য একজনের জবানিতে জানিতে পারিলাম এই বৃষ্টির মৌসুম শুরু হইবার পর পানি ৪ হাত পর্যন্ত বাড়িয়াছে। এই পরিস্থিতির কথা ছাড়িয়া বলিতে, কয়েকজন নৌকার মাঝি আমাকে বলিয়াছেন শুকনা মৌসুমে তাহারা এই জায়গাটা ডিঙ্গিযোগে পার হইয়াছেন আর এইখানে অনেক সময় ৯০ মণ বোঝাই নৌকা পার হইতে পারে মতন পানি থাকে না। ৩০০ মণের নৌকা যাইতে ২ হইতে ২ ৩/৪ হাত মতো পানির দরকার পড়ে।

১০ তারিখ সকালে গভর্নর সমীপে মানচিত্র আর রোজনামচাযোগে হরকরা (Hircar) পাঠাইলাম। রোজনামচায় কুষ্টিয়া খালের যাবতীয় পরিস্থিতি গভর্নর সাহেবকে অবহিত করিয়াছি। আজ সারাদিন ভাল আবহাওয়া। অপরাহ্নে কুষ্টিয়া খালের পূর্বদিক ধরিয়া জরিপ শুরু করিলাম। নদীর গতিমুখ এখন ৮ হইতে ৯ মাইল পর্যন্ত উত্তর-পূর্ব ও পূর্বমুখি।

১১ তারিখ সকালবেলা পূর্বদিক হইতে আনকোরা দমকা বাতাস, সঙ্গে কড়া বৃষ্টির ঝাট। দিনের মধ্যভাগে আবহাওয়া পরিষ্কার, সন্ধ্যাবেলা শান্ত আর বৃষ্টি বৃষ্টি। আগের মতোই জরিপে ব্যস্ত ছিলাম। ভরা বর্ষায় নদীর প্লাবন হইতে কুল ঠেকাইবার নিমিত্ত বিরাট একটা বাঁধ দেওয়া হইয়াছে। এই বাঁধটি ৫ মাইলের চেয়েও লম্বা; ইহা উচ্চতায় ১২ ফুট আর প্রস্থে ১৪ গজ। এখানে কোন কোন জায়গায় নদী মাত্র ১/৪ মাইল চওড়া।

১২ তারিখ পূর্বাহ্নে ঘন ঘন বাতাস ও বৃষ্টির দমকা ঝড়; দিনের বাদবাকি পরিষ্কার।

আজ পাবনা খালের মাথায় আসিলাম। ইহা বাহির হইয়াছে বড় নদীর [পদ্মা] উত্তর দিক হইতে আর ইহার অবস্থান কুষ্টিয়ার উত্তর-পূর্বে ও পূর্বে ৮ মাইল দূরে। এই খালটি আবার গঙ্গায় মিশিয়াছে রতনগঞ্জ (Rottingunge) গিয়া—ইহার কথা পরে হইবে।

খালের পূর্বে পাড়ে পাবনা গ্রাম, গ্রামটি বড় নদীর অতি ধারেকাছে। এই জায়গায় নৌকাসাম্পান মেরামত আর বানানো হয়।
এখান হইতে ৯ মাইল পর্যন্ত নদীর গতিমুখ দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে। পূর্ব দিকে একটি বাঁধ দেওয়া আছে, বাঁধের দৈর্ঘ্য কয়েক মাইল পর্যন্ত হইবে। বাঁধটা কয়েক জায়গায় ভাঙিয়া গিয়াছে। ইহা হইতে মনে হয় বাঁধ দেওয়ার পর হইতে নদীর বাড় পূর্বতীর ধরিয়া বেশ বাড়িয়াছে, কিন্তু বাঁধটা কতদিন আগে দেওয়া হইয়াছে তাহা জানিতে পারি নাই।

১২ তারিখ হইতে ১৭ তারিখ পর্যন্ত আগে যে মোহনার উল্লেখ করিয়াছি তাহার জরিপ করিয়া কাটাইলাম। দুই তীরের গ্রামাঞ্চলে উল্লেখ করিবার মতন তেমন কিছু নাই—কয়েকটি গ্রাম আছে আর আছে বিস্তর চাষের জমি—বিশেষ পশ্চিম তীরে অনেক জমি—সেই জমিতে ধান বোনে।

এই সময়টা আবহাওয়া খুবই ঝড়ঝাপটাময় ছিল, রোজই দক্ষিণপূর্ব কোণা হইতে ঝড়ো হাওয়া বহিতেছিল আর বৃষ্টিও বেশ হইল।

দক্ষিণ-পূর্ব মুখি দক্ষিণ মোহনার শেষ মাথায় আসিয়া নদী হঠাৎ উত্তর উত্তর-পূর্বমুখি মোড় লইয়াছে আর লইয়া পাঁচ মাইল পর্যন্ত এই পথে চলিতেছে। এই মোহনার পূর্ব তীর ধরিয়াও আর একটি বাঁধ দেওয়া আছে।

১৭ তারিখ আজুদিয়া (Oddygya) আসিলাম। ইহা এই মোহনার পূর্বতীরের গ্রাম বটে। এই পর্যন্ত আসিয়া নদীর খাড়ি দুই খাতে ভাগ হইয়াছে। সর্ব উত্তরের খাতটি শুদ্ধ রবিমৌসুমে নৌ চলাচলের যোগ্য থাকে। যে দ্বীপটি এই দুই খাতের বিচ্ছেদ কায়েম করিয়াছে তাহা দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩ ১/২ মাইল হইবে। আর ইহা দেখিতে অবিরাম। আর ইহা ভালোমতো আবাদমহলও বটে।

১৮ তারিখ আনকোরা হাওয়ার ঝাপটা সারাদিন আর নিরন্তর বৃষ্টি। ইহাতে আমরা বাধ্য হইয়া শুইয়া থাকিলাম।

১৯ তারিখ পরিষ্কার আবহাওয়া। নদীর দক্ষিণ খাত জরিপ করিয়া কাটাইলাম।

২০ তারিখ সারাদিন দক্ষিণামতো দিক হইতে আনকোরা হাওয়ার দাপাদাপি কিন্তু আবহাওয়া শুকনা। সকাল নাগাদ দক্ষিণ খাতের জরিপ সমাধান করিলাম আর হাবাসপুরের (Habbaspour) কাছাকাছি বড় নদীতে আসিলাম। এই স্থান হইতে নদী দক্ষিণমুখি পথ লইয়াছে।

২১ তারিখ সকাল পরিষ্কার কিন্তু বিকাল ঝঞ্ঝা ও বৃষ্টিময়। হাবাসপুর হইতে মোহনার শেষ মাথায় একটা বড় খালের মুখানি (inlet) চোখে পড়িল আর বিকাল ইহার মাথা পরখ করিলাম। ইহা সাধারণ হিসাবে চওড়ায় ২৫০ গজ আর গভীরতায় কোনখানেই ১৬ হাতের কম হইবে না। এই খালের ভাঁটি বরাবর ১ মাইলের মধ্যে মৌদাপুর (Maudapur) নামে এক বর্ধিষ্ণু গ্রাম আছে; গ্রামটি নদীর পশ্চিমতীরে। এই খালের ধারা দক্ষিণ-পূর্বমুখি আর লোকে বলিল ইহাতে সম্বৎসর নৌসাম্পান চলে, সুন্দরবন (Sunderbound) যাওয়ার পথ ইহার উপর দিয়াই।

২২ তারিখ বড় নদীতে আসিলাম কারণ পূর্বদিকে আরো কয়েক মাইল জরিপ করিতে হইবে আর খালের মুখ বরাবর মোহনার মোড় ঘুরিবার মুখে যে বড় দ্বীপটি আছে তাহা আঁকিতে হইবে: ইহা না করিলে নদীর মানচিত্র বড়ই বেখাপ্পা দেখাইবে, খালের মুখানি হইতে পূর্বদিকে ইহার স্রোতধারা কোন পথে আগাইয়াছে তাহার সঠিক ধারণা পাওয়া যাইবে না।

২২, ২৩ ও ২৪ তারিখের কিছুক্ষণ খালের পূর্বদিকে বড় নদীর ৩ মাইল এবং একইভাবে পূর্বতীর ধরিয়া সেই স্থান হইতে পিছন ফিরিয়া সুজানগর (Sujanagare) পর্যন্ত জরিপ করিলাম। ২৩ তারিখ বৈকালে উত্তর-পশ্চিম দিক হইতে আরো এক দফা কড়া ঝড়বৃষ্টি আসিল আর ২৪ তারিখ সকালবেলা আনকোরা দমকা হাওয়া বহিল, দিনের বাদবাকি পরিষ্কার আবহাওয়া। আজ সকালে খালের ভিতর ঢুকিলাম আর ভাঁটি বরাবর আরো এক মাইল জরিপ চালাইলাম। এই জায়গায় খাল বড়ই আকাবাঁকা। আমি ধরিয়া লইতেছি এই সময়টায় পানি ৫ হাত পর্যন্ত বাড়িয়া গিয়াছে, এখন খালের গভীরতা ১৩ হাতের কম নহে।

জুনের ২৪ তারিখ হইতে জুলাইর ৩ তারিখ পর্যন্ত আবহাওয়া চোখে পড়িবার মত পরিষ্কার। এই সময়ে শুদ্ধ কয়েক পশলা হালকা বৃষ্টি হইয়াছে আর বাতাস দক্ষিণপূর্ব দিক হইতে বহিয়াছে মৃদুমন্দ হিল্লোলে। এই সময়ের মধ্যে আমরা ৩০ মাইলেরও বেশি খালের সন্ধান পাইলাম। ইহার স্রোত সাধারণভাবে বলিতে দক্ষিণ-পূর্বমুখি, যদিও গত ২ দিন আমরা দেখিলাম ইহার পথ খুবই আকাবাঁকা, শেষ ৯ মাইলের মধ্যে ইহা ৭ বার মোহনা (Reaches) পরিবর্তন করিয়াছে আর এইটুকু সময়ের ভিতর নাক-বরাবর শুদ্ধ ২ ১/২ মাইল আগাইয়াছে। যে গ্রামদেশের মধ্য দিয়া আমরা চলিয়াছি তাহার চেহারা বহরূপী, কোথাও মাইলের পর মাইল ঘন জঙ্গল আর কখনও বা উন্মুক্ত গ্রামাঞ্চল, যদিও চাষাবাদ সাধারণভাবে বলিতে বিরল। খালপাড়ের ৯ মাইল মতো নিচে সোনাপাড়া (Sunapara) এলাকায় কয়েক বাগান সুপারি (Betal বা Areca) গাছ আর আরো ৭ ১/২ মাইল পর শ্রীরামপুরে একবাড়ি ছোট্ট মন্দির (Pagoda)। পাঁচ মোহনার সঙ্গমস্থলে গঠিত উপদ্বীপে ইহার স্থান। এই খাল কুমির আর কচ্ছপে ভর্তি—আমরা দুই জাতিরই দেখা পাইয়াছি অপর্যাপ্ত সংখ্যায়। কুমিরজাতি সাংঘাতিক লাজুক। কানে সামান্যতম শোর বাজিলেও উঁহারা ডুব মারেন।

গ্রামবাসীরা খালটির নাম রাখিয়াছেন চন্ননা (Chunnunah) আর আমরা শুনিয়াছি আরও চার মাইল ভাঁটিতে ইহা গিয়া পড়িয়াছে কুমার নদে (Comare Creek)। প্রস্তে এই খালটি সবখানেই সমান মাপের, প্রায় ২০০ গজ হইবে; গভীরতায় যথেষ্ট অসমান, কোথাও ৫০ হাত আর কোথাও বা ৬ হাত হইবে।

২৬ ও ২৯ জুন পাটনামুখি দুই বহর লবণের নৌকার সহিত মোলাকাত হইল। একটি সুন্দরবন ও খুলনা (Culna) হইয়া কলিকাতা হইতে আসিতেছে, আরেকটি আসিতেছে বরসিয়া নদ (Burrashee Creek) ধরিয়া জয়নগর (Jaynagore) হইতে। একটি নৌকার বোঝাই ৩৫০০ মণ (প্রায় ১২০ টন) আর পানিতে ইহার দাবা ৪ ১/২ হাত।

২৮ তারিখ পদ্মদহে (Podumdey) দেখিলাম কম্পাসের কাঁটা পূর্বমুখি ০º-৫৪´ পর্যন্ত নড়িয়াছে।

২৯ তারিখ ২ হরকরাযোগে গভর্নর সাহেবের পাঠানো এক প্রস্ত পত্র পাইলাম।

বিডিনিউজ, আর্টস, ২০ ডিসেম্বর ২০০৭

জেমস রেনেল ও তাঁহার রোজনামচা : ১৭৬৪-১৭৬৭ (দোসরা কিস্তি)

জেমস রেনেল বৃত্তান্ত : আরো

rennell………
জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০)
……….
জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০) বিষয়ে আরো তথ্য চাহিয়া যাঁহারা লিখিতে বলিয়াছেন তাঁহাদের – বিশেষ বিধান রিবেরু মহাশয়ের – শুকরিয়া আদায় করিয়া তাঁহার কথা দ্বিতীয় কিস্তি লিখিতেছি। এই কিস্তির উৎসও প্রথম কিস্তির অনুরূপ। নতুন খবর ইহাতে তেমন বিশেষ নাই। (লা টুশ ১৯১০; উয়িকিপিডিয়া ২০০৭)

জেমস রেনেলের জন্ম ১৭৪২ সালের ৩রা ডিসেম্বর ধরিয়া লইলে ১৭৬৪ সালের গোড়ার দিকে তাঁহার বয়স হইতেছে সবে ২১ বছর কয়েক মাস। সেই বয়সেই তিনি বঙ্গদেশে আসিলেন। বঙ্গে তখন সবে ইংরেজাধিকার কায়েম হইয়াছে বটে, মোকাম হয় নাই পুরাদস্তুর – এই কথা আমরা পহিলা কিস্তিযোগেই উল্লেখ করিয়াছি। ততদিনে তাঁহার নৌ-বাহিনীর চাকুরিসহ জাগতিক বা হাতেকলমে অভিজ্ঞতা লাভ হইয়া গিয়াছে ৮ বছর। তাঁহার বাবা জন রেনেলও নৌ-বাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা আমরা আমলে লই নাই।

১৭৫৬ সালে তিনি প্রথম মহাব্রিটেনের রাজার নৌবাহিনীর ব্রিলিয়ান্ট (Brilliant) নামা জাহাজে নাবিকের (midshipman) চাকরি লইয়াছিলেন। সেই জাহাজেই তাঁহার পরিচয় হইয়াছিল সমান পদে চাকরিরত টোপাম নামা অন্য এক নাবিকের সঙ্গে। এই টোপাম সাহেবই বলিয়া কহিয়া কলিকাতার উইলিয়াম নামা দুর্গে শিক্ষানবিশ প্রকৌশলী বা এঞ্জিনিয়ার পদে তাঁহার চাকরি জুটাইয়া দিয়াছিলেন।

অবশ্য ইহার আগের বৎসর অর্থাৎ ১৭৬৩ সালেই রেনেল স্বেচ্ছায় নৌবাহিনী না ছাড়িয়াই পূর্ব ভারত কোম্পানির চাকরি লইয়াছিলেন। চাকরি লইয়া তিনি ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জে গমন করেন। সেখানে তাঁহার কাজ ছিল জরিপ পরিচালনা। এই কাজ তিনি নৌবাহিনীতে থাকার সময়ই শিখিয়াছিলেন। সেই জায়গা হইতে মাদ্রাজে (এখনকার চেন্নাই) ফিরিয়া তিনি নৌবাহিনী হইতে ছাড়া পাইয়া গেলেন। সেই জায়গায় তাঁহাকে একটি সদাগরি জাহাজের কাপ্তেন নিয়োগ করা হইয়াছিল। দুর্ভাগ্যের মধ্যে, ১৭৬৩ সালের ২১ অক্টোবর তারিখে জাহাজটি হারিকেনে হারাইয়া যায়। ভাগ্যের মধ্যে, রেনেল সাহেব ঝড়ের রাতে জলে ছিলেন না, স্থলভাগে অবস্থিতি করিতেছিলেন। তাই বাঁচিয়া গেলেন। পরে নেপচুন নামা একটি আন্দাজমতো জাহাজের চাকরি তাঁহার হইয়াছিল। ইহার কাজের মধ্যেও কিছু জরিপ তিনি করিয়াছিলেন।

১৭৬৪ সালেই কলিকাতায় সেই সময়কার ইংরেজ গভর্নর বা দুর্গাধিপতি হেনরি ভ্যানশিটার্ট তাঁহাকে গঙ্গার বদ্বীপ এলাকা জরিপ করিবার নিমিত্ত আমিন নিয়োগ করেন। এই কাজ সফলতার সহিত সম্পাদন করিবার পুরষ্কার হিসাবেই – বোধ হয় – তাঁহার উচ্চতর পদ জোটে। ১৭৬৭ সালের মাহে জানুয়ারি নাগাদ মহা আমিন বা সার্ভেয়ার-জেনারেল পদে রেনেলের নিয়োগ চূড়ান্ত হয়। তাঁহার মাসোহারা ঠিক করা হইয়াছিল তিনশত টাকা। কালের বিচারে এই বেতন অতি উচ্চ ছিল। প্রমাণ: ১৭৬৪ সালে কলিকাতা কৌন্সিলের (Council) সদস্য ওয়ারেন হেস্টিংস মহাশয়ও নাকি ঐ একই পরিমাণ মাসোহারা তুলিতেন। জেমস রেনেলকে এই বড় পদটিতে নিয়োগ দেওয়ার কিছুদিন পর অতি বিখ্যাত লাটসাহেব রবার্ট ক্লাইব মহোদয়ের দ্বিতীয় দফা গভর্নরি শেষ হয়।

১৭৬৭ সালের ৮ জানুয়ারি তারিখে পূর্ব ভারত কোম্পানির সদর দপ্তর (Court of Directors) বরাবর লেখা কলিকাতা কৌন্সিলের এক চিঠি হইতে এই খবর পাওয়া যাইতেছে। ৩০ মার্চের চিঠিতে উল্লেখ করা হইয়াছে সম্প্রতি তিনি জরিপ অভিযান চালাইবার সময় গুরুতর আহত হইয়াছেন। ইহাতে তাঁহার স্বাস্থ্যহানিও ঘটিল গুরুতর। এই ঘটনার বিবরণ রেনেল নিজেও তাঁহার রোজনামচা লিপিতে আবদ্ধ রাখিয়াছেন।

এতদ্দেশীয় দেশের বিপ্লবী দেশীয় সৈনিকদের পরিচয় তিনি ‘সন্ন্যাসী’ নামই দিয়াছিলেন। সন্ন্যাসীরা সেইবার তাঁহাকে মারিয়া-কাটিয়া একশেষ করিবার সামান্যই বাকি রাখিয়াছিলেন। ইহা ১৭৬৬ ইংরেজির ২১ ফেব্র“য়ারি তারিখের ঘটনা। জায়গার নাম ধরলা। ইহা ভূটানপথে কুচবিহার সীমান্তের নিকটে বটে।

গঙ্গা হইতে বড় বড় জাহাজযোগে কেমন করিয়া কলিকাতায় আসা যায় তাহার সংক্ষিপ্ত পথ খুঁজিয়া বাহির করিতে রেনেল সাহেবকে পহিলা চাকুরিটা দেওয়া হইয়াছিল। পরে তাঁহাকে বলা হয় সুন্দরবন আর মেঘনার মধ্য দিয়া কলিকাতা আসিবার পথও বাহির করিতে। রেনেলের রোজনামচায় এই পহিলা অভিযানের বিবরণ ছাড়াও আরও তিন যাত্রার কাহিনী লেখা হইয়াছে।

শেষের তিন যাত্রায় তিনি উত্তর ও পূর্ব বাঙ্গালার অনেক জায়গার নদীপথিক জরিপ শেষ করিয়াছিলেন। ব্রহ্মপুত্র নদীর পথে গোয়ালপাড়া পর্যন্ত পৌঁছিবার পর অহম রাজ্যের সীমানায়ও তিনি ঢুকিয়াছিলেন বলিয়া উল্লেখ পাইতেছি। এই অভিযানের এক প্রহরে তিনি যখন কুচবিহার সীমান্তে তখনই দেশীয় বিপ্লবীদের হাতে পড়েন। মারটা জবর হইয়াছিল বলিয়াই মনে হয়।

সন্ন্যাসী ফকির বাহিনী তাঁহাদের দলকে ঘেরাও করিয়া ফেলে এবং তলোয়ার দিয়া কয়েকটা কোপও মারে তাঁহার গায়ে। শুদ্ধ ভাগ্যের জোরে তিনি এ যাত্রা প্রাণটা রক্ষা করিতে পারিয়াছিলেন। রোজনামচায় এই হামলার সবিস্তার বিবরণ পাওয়া যাইবে। তাহা ছাড়া ইংরেজি ভাষায় তাঁহার যে জীবনীগ্রন্থ অবলম্বন লা টুশ সাহেব তাঁহার ভূমিকা ফাঁদিয়াছেন সেই জীবনীগ্রন্থও ইহার বিস্তারিত তথ্যসম্বলিত বলিয়া জানাইতে কসুর করেন নাই তিনি । (মার্কাম ১৮৯৫: ৪৭)

রেনেলের রোজনামচার বিস্তার ১৭৬৭ সালের মার্চমাস পর্যন্ত পাওয়া যায়। তখনও তিনি গাঙ্গেয় বদ্বীপাঞ্চলের নদনদীজরিপ কাজ শেষ করিয়া সারেন নাই। সেই সময় তাহার প্রবলবেগে জ্বর আসিত। সেই রকমই এক জ্বরের প্রকোপে তিনি একদিন কাজ বন্ধ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন । ইহা জানাইতেছেন তাঁহার জীবনী লেখকরা।

যথা মার্কাম সাহেব লিখিত জীবনীগ্রন্থে ভারতবর্ষে রেনেলের বাদবাকি জীবনের কর্মতৎপরতার আরো বিবরণ রহিয়াছে। ১৭৭১ সালে আপনকার পুরানা দুশমন ফকির সন্ন্যাসীদের বিরুদ্ধে আবারও তাঁহাকে যুদ্ধে পাঠান হইয়াছিল। জীবনীকার কহিতেছেন এই যাত্রায় তাঁহার ফললাভ ষোল আনাই হইয়াছিল। তদুপরি – এক বৎসর পর – তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হইয়াছিলেন।

তাঁহার কনের নাম ছিল বেগম জেন থ্যাকারে। ইঁহার ভাইয়ের নাম উয়িলিয়াম ম্যাকপিচ থ্যাকারে। এই ভাইয়ের ঘরের নাতির নামও একই ছিল। তিনি আর কেহই নহেন, স্বয়ং পরকালের বিখ্যাত ইংরেজ ঔপন্যাসিক উয়িলিয়াম ম্যাকপিচ থ্যাকারে। রেনেলের ঢাকাস্থ বন্ধু কার্টিয়ার সাহেব যখন গভর্নর হইলেন সেই সময় এই থ্যাকারে সাহেবই তাঁহার সচিব নিযুক্ত হইলেন। অতয়েব দাঁড়াইল এই: রেনেল সাহেব আপনকার বন্ধুর সচিবের ভগিনির পাণি গ্রহণ করিলেন। করিয়া – যতদূর জানি – সুখিও হইলেন। সেই কাহিনী পরে হইবে।

অথ রেনেলনামা দ্বিতীয় কিস্তি সমাপ্ত। অদ্য ৩ ডিসেম্বর সন ২০০৭ খ্রিস্টাব্দ অথবা রেনেল মহাশয়ের ২৬৫ নম্বর জন্মদিনে।

দোহাই

১. James Rennell, The Journals of Major James Rennell, First Surveyor-General of India, Written for the information of the Governors of Bengal during his surveys of the Ganges and Brahmaputra rivers 1764 to 1767, edited by T. H. D. La Touche, Geological Survey of India (Calcutta; Asiatic Society, 1910).
২. Wikipedia, ‘James Rennell,’ (Wikipedia, 2007).
৩. Sir C. Markham, Major James Rennell and the Rise of Modern English Geography, (London: Cassell & Co., 1895).

~~~

আমিন জেমস রেনেল

বিরচিত

শুকনা মৌসুমে গঙ্গানদী হইতে কলিকাতা যাইবার নিকটতম পথ খুঁজিয়া পাইবার লক্ষ্যে জলঙ্গি নদীর মাথা হইতে ব্রহ্মপুত্র বা মেঘনা নদীর সঙ্গমস্থল পর্যন্ত গঙ্গার; লক্ষীপুর হইতে ঢাকা পর্যন্ত মেঘনা ও অন্যান্য নদীর; এবং দক্ষিণ তীরবর্তী নদীনালার জরিপকার্যের বিবরণী সংযুক্ত

রোজনামচা

সন ১৭৬৪-১৭৬৭

তজর্মা : সলিমুল্লাহ খান

(গত সংখ্যার পর)

২২ তারিখ আসকালদুপুরবেলা দক্ষিণ-পূর্ব দিক হইতে ভারি পরিচ্ছন্ন দমকা হাওয়া বহিতেছিল। ফলে আমরা বিকাল পর্যন্ত (পরিকল্পনা মোতাবেক) জরিপ কাজে আর আগাইতে পারি নাই। মাত্র তখন নাগাদই আমরা জলঙ্গি নদীর মাথা হইতে পূর্বদিক ধরিয়া জরিপকার্য শুরু করিলাম। গতকল্য আমরা ঐ নদীর মাথা আর উহার উজানে গঙ্গাতীরের জরিপ এক মাইল পর্যন্ত শেষ করিয়াছিলাম।

হাল মৌসুমে এই মহানদীর আবহাওয়া সচরাচর যে রকম হইয়া থাকে আজ বিকালবেলা তাহার কিছু নমুনা দেখিলাম। মানে সন্ধ্যার দিকে যখন আমরা কুমারের (Quemaieree) অদূরে নদী পার হইতেছিলাম তখন দক্ষিণ-পূর্ব দিক হইতে একটা দমকা হাওয়া আসিল। আসিয়া সমস্ত নৌকা-সাম্পান একঠেলায় জলঙ্গির বালুচরে তুলিয়া দিল। সারারাত সেখানে থাকিয়া ঝাপটা খাইল। দুই জন নাবিক বাতাসের ঝাপটায় উড়িয়া যায়। তবে ভাগ্যের দয়ায় সাঁতার দিয়া কুলে উঠিতে সক্ষম হয়।

২৩ তারিখ সকালটা চমৎকার। নদীর দক্ষিণতীর জরিপ করিয়া কাটাইলাম। [সংযুক্ত] ১ নং মানচিত্রে ইহার খুঁটিনাটি পাওয়া যাইবে। আজ মহেশকুড়াঁর (Mayescunda) নালা পরখ করিলাম। এই নালা জলঙ্গির ৫ মাইল খানিক দক্ষিণে দক্ষিণ-পূর্বে, আর ইহাই আমাদের হাতে পড়া এক নম্বর নালা বা ক্রিক (Creek)। দেখিলাম ইহার পানি প্রবেশদ্বারে মাত্র ২ হাত আর পোয়া মাইল মতো উজানে গেলে একেবারে শুকনা। এই তল্লাটে বিস্তর ধান আর কার্পাসতুলার চাষ হয়। এই জায়গা হইতে পূর্বমুখি কমপক্ষে ৮ মাইল পর্যন্ত নদীর গতিপথ প্রায় সোজাসুজি পূর্বদিকগামী, আর বিপজ্জনক বালিয়াড়িতে ভরা। নদীও তদুপরি অতিরিক্ত দ্রুতগতিতে বহিতেছে। জলঙ্গির ৮ মাইল পূর্বে দক্ষিণ-পূর্বে পঞ্চিফেরার (Paunchiferra) একটা খাল আসিয়া গঙ্গায় পড়িয়াছে। শুনিয়াছি এই খালটি সারদার (Surda) কাছে একই নদী হইতে বাহির হইয়াছে। আজ সন্ধ্যাবেলা আবহাওয়া দুর্যোগপূর্ণ হওয়ায় আমরা বীরসগঞ্জ বালিয়াড়ির একটা খালে নৌকা-সাম্পান ভিড়াইয়া রাখিয়াছিলাম।

২৪ তারিখ সারাদিন আবহাওয়া বেশ ভালো । গতকালের মতন আজও জরিপ চালাইয়াছি। হরিশংকর (Harisongkor) আর কালিগঞ্জ (Callygunge) গ্রাম পার হইলাম। এই স্থলে নদী দুই খাতে ভাগ হইয়া গিয়াছে। মধ্যস্থলের বালির দ্বীপটি লম্বায় পাঁচ মাইল। নদী এখন উত্তর-পূর্ব দিকে মোড় লইয়া বহিতেছে আর ইহার প্রস্থ কোথাও কোথাও বর্ষা মৌসুমে ২ ১/২ মাইল। এইখানটায় দেশগ্রাম দেখিতে চোখ জুড়ায়, বেশির ভাগই মাঠ-ময়দান আর গবাদি পশুর সংখ্যাও বেশ বটে। নদীতীর এখানে ৩০ ফুট উচুঁ, অবিরত ঝরিয়া পড়িতেছে বলিয়া নৌকা সাম্পানের বিপদ ঘটিতে পারে, তাই তীরের তেমন কাছে যাইতে মানা। আজ হাওয়া দিতেছে দক্ষিণদিক হইতে, আসিতেছে হালকা মৃদুমন্দ সমীরণ আকারে।

২৫ তারিখ দুপুরের আগে সাংঘাতিক গরম পড়িয়াছে, বিকালবেলা ঝড়-তুফানে কাটিল আর বৃষ্টিও নামিল ঢের। আজ গঙ্গা নদীর উত্তর মোহনার সীমা বরাবর অবস্থিত চকুলা (Chocula) নামক গ্রামে আসিলাম। এইখান হইতে নদী পূর্বে দক্ষিণ-পূর্বে ঘুরিয়া ৫ বা ৬ মাইল পর্যন্ত চলিয়াছে আর বালির এক বিশালাকার দ্বীপ উঠিয়া ইহার সবটুকু বরাবরই নদীকে দুইভাগে ভাগ করিয়া রাখিয়াছে। উত্তরদিকের খাতটাই সবচেয়ে বেশি গভীর এবং সবচেয়ে বেশি ভালো।

২৬ তারিখ সুন্দর আবহাওয়া। পূর্ব দক্ষিণ-পূর্ব মোহনা জরিপ করিতেছি।

২৭ তারিখ সুন্দর আবহাওয়া। পূর্ব দক্ষিণ-পূর্ব মোহনা শেষ করিলাম আর অন্য একটায় প্রবেশ করিলাম। ইহার দৌড় প্রায় ৫ ১/২ মাইল দক্ষিণমুখি। বর্ষা মৌসুমে ইহার ওসার (চওড়া) দেড় মাইলের বেশি হয় না আর এখন স্থানে স্থানে পোয়া মাইলের বেশি হইবে না। আমাদের আগমন সংবাদে গ্রামের লোকজন ঘরবাড়ি ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছে। তাই এইসব জায়গার নাম জানিয়া লইতে কিছুটা দেরি হইল। আজ সন্ধ্যায় মালাকোলা (Malacola) ও সেলাহ (Selah) গ্রামদ্বয়ের মাঝখানটায় (প্রায় ২ ১/২ মাইলের তফাতে) গুনিয়া দেখিলাম নৌকার সংখ্যা ৪০০ শতের কম হইবে না। সন্ধ্যা নাগাদ চুম্বক কাঁটার নড়াচড়া পূর্বমুখি ০´-৩৬º হইয়াছে।

২৮ তারিখ পূর্বাহ্ন সুন্দর, সন্ধ্যা আর্দ্র আর ঝড়বৃষ্টিভরা। গত ৩ দিন ধরিয়া বাতাস দক্ষিণ হইতে বহিতেছে। দক্ষিণ মোহনার জরিপ শেষ করিয়াছি আর দামাদুর (Damadure) গ্রামে আসিয়া পৌঁছিয়াছি, এই গ্রামটি ইহার শেষভাগে আছে। এই জায়গা হইতে নদী দ্রুত উত্তর-পূর্ব দিকে ঘুরিয়া গিয়াছে আর এই পথে ৯ মাইল চলিয়াছে। আজ রাত ভরিয়া বৃষ্টি হইল।

২৯ তারিখ পূর্বাহ্নে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। অপরাহ্ণে কম্পাসের নানান কোণ হইতে বেশ কয়েকবার দমকা হাওয়া বহিল আর বৃষ্টিও হইল বেশ। ফল দাড়াঁইল আজ আমাদের কাজ হইল সামান্যই। আজ রাত্রে অনেক বৃষ্টি।

৩০ তারিখ আবহাওয়া সহনীয়। উত্তর-পূর্ব মোহনার পাঁচ মাইল উপর হইতে বড় একটি দ্বীপের শুরু। ইহা পূর্বে ও দক্ষিণ-পূর্বে পাঁচ মাইল বিস্তৃত। ফলে স্থানে স্থানে নদীর ওসার ৩ ১/২ মাইল পর্যন্ত হইবে। সর্বদক্ষিণের খাত দিয়া সম্বৎসর নৌ-যানবাহন চলাচল করে না। শ্রীরামপুর (Serampour) ও গড়গড়ি (Gurgoree) গ্রাম ইহার শেষ সীমায়। এখানকার গ্রামাঞ্চলে চাষাবাদ ভালোমতই হইয়া থাকে আর ফসলের বেশির ভাগই ধান্য (Padda)। অদ্য গভর্নর মহোদয় সমীপে লিখিলাম, আমার কাজকর্মের বিবরাণাদি তাহাকে জানাইয়া দিয়াছি।

৩১ তারিখ সারাদিন দক্ষিণদিক হইতে একেবারে তাজা হাওয়ার ঝাপটা (Gales) বহিল। বড় দ্বীপটির দক্ষিণ-পূর্ব মাথা হইতে নদী প্রায় ৮ মাইল পর্যন্ত দক্ষিণে বহিয়া গিয়াছে। পশ্চিমদিকের তীর বেশির ভাগই জঙ্গলে ঢাকা। তবে পূর্বতীরে চাষাবাদ ভালোমতই হইতেছে আর এই তীরে ১০ কিম্বা ১১ টা গ্রাম বসিয়াছে। এই মোহনার (Reach) শেষ মাথায় কস্তি (Custee) গ্রাম ।

১লা ও ২রা জুন সুন্দর আবহাওয়া, দক্ষিণ দক্ষিণ-পূর্ব দিক হইতে তাজা হাওয়া বহিতেছে। এই দুই দিন দক্ষিণ মোহনার পশ্চিমতীর জরিপ করিয়া কাটাইলাম আর ২ তারিখ সন্ধ্যাবেলা কস্তি গ্রামে আসিলাম। গ্রামটি মোহনার মোড় হইতে বিপরীতদিকের পশ্চিম তীরে বটে।

৩ তারিখ সুন্দর সকাল। গ্রাম হইতে তিন পোয়ামাইলমতো ভাঁটায় নদী হইতে বাহির হইয়াছে কস্তি খাল। সেই খালের মাথায় আসিলাম। শুনিলাম এই খাল দিয়া সারা বৎসর নৌকা-সাম্পান চলে। আরও শুনিলাম ইহা হইতে রাঙ্গাফুলায় যাওয়া যায়। যদি তাহাই হয় তো বলিতে হইবে আমাদের অভিযান সাফল্যের সহিত সমাপ্ত হইল। খালটি ১৩০ হইতে ২০০ গজ পর্যন্ত চওড়া এবং ১/৪ মাইল উজানে যাওয়ার পর ৪০ হইতে ১০ হাত পর্যন্ত গভীর হয়।

 

বিডিনিউজ, আর্টস, ৬ ডিসেম্বর ২০০৭

জেমস রেনেল ও তাঁহার রোজনামচা ১৭৬৪-৬৭ (পহেলা কিস্তি)

james_rennel.jpg
জেমস রেনেল (১৭৪২-১৮৩০)

খ্রিষ্টিয় ১৮শ শতাব্দীর মাঝামাঝি বঙ্গদেশে ইংরেজ অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যক্ষ ফল আজকের বাংলাদেশশুদ্ধ অখিল ভারতবর্ষের পরম দারিদ্র ও দুর্গতি। এই কথা মোটেও অতিশয় নয়। অখিল ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসনের অভিশাপ প্রায় দুই শত বৎসর বহন করিয়াও আমরা আজও
বুঝিতে পারিতেছি না এই উপনিবেশবাদ বা পরশাসন কী পরিমাণে আমাদের দেশের ক্ষতিসাধন করিয়াছিল।

আমাদিগের ইদানিন্তন শাসক ধনবান শ্রেণী ইহার কারণ জানিবার প্রয়াসও করে না। তাঁহারা পশ্চিমা সাম্রাজ্য শাসকদের সহিত গাঁটছড়া বাধিয়া এই দেশ চালাইতেছেন। ইংরেজ শাসনের পাপ এখন মার্কিন সাম্রাজ্যের তাপে চাপা পড়িতেছে।

দুইশত বর্ষব্যাপী ইংরেজি শাসনপাপের মধ্যে যে দুই চারিটি প্রায়শ্চিত্ত হইয়াছে মেজর জেমস রেনেলের রোজনামচা তাহাদের মধ্যে পড়ে বলিয়া বর্তমান লেখকের ধারণা। কথায় বলে শয়তানকেও তাঁহার প্রাপ্য দিতে হইবে। রেনেলের জরিপকর্ম বাবদ এই প্রাপ্য ইংরেজ ডাকাতদেরও দিতে হইবে।

জেমস রেনেল যে সময় বঙ্গদেশের নদনদী জরিপ কার্যে মন দেন তখন বাংলাদেশে ইংরেজি ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে কিন্তু ইংরেজ-দায়িত্ব প্রবর্তিত হয় নাই। দেশের অবস্থা তখন সম্পূর্ণ অরাজক। পূর্ব ভারত কোম্পানি খাজনা আদায় করিতেছে কিন্তু কোন শাসন ব্যবস্থাই প্রবর্তন করে নাই। কিছুদিন পর চালু হইবে দ্বৈত শাসন-ব্যবস্থা। এতদিন পর্যন্ত যাহা চলিতেছিল তাহা নামে নবাবের শাসন আর কাজে ইংরেজ কোম্পানির ক্ষমতা।

১৭৬৪ সনের ৬ মে তারিখে কলিকাতাস্থ দূর্গের অধিনায়ক বা গবর্নর হেনরি ভ্যানশিটার্ট কাপ্তেন জেমস রেনেলকে নদীয়া জেলার উত্তর সীমানাবর্তী জলঙ্গি নদীর মাথা হইতে পূর্বদিকে ঢাকা পর্যন্ত গঙ্গা ও পদ্মার দক্ষিণ তীর তথা অববাহিকাবর্তী নদীনালা জরিপের লক্ষ্যে জরিপকার বা আমিন নিযুক্ত করেন।

এই জরিপের অংশস্বরূপ গবর্নর মহোদয়ের নিযুক্ত গোয়েন্দা কর্মচারি জেমস রেনেল ১৭৬৪ সালের ৭ই মে তারিখ হইতে তাঁহার রোজনামচা বা দিনলিপি লিখিতে শুরু করেন। সেই দিনলিপি ১৯১০ সাল পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য ছাপা হয় নাই।

১৯১০ সালে কলিকাতাস্থ এশিয়াটিক সমিতি তৎকালীন ‘ভারতবর্ষের ভূতাত্ত্বিক জরীপ’ নামক সংস্থার সদস্য টি. এইচ. ডি. লা টুশ (T. H. D. La Touche) নামা এক ভদ্রলোকের সম্পাদনা বা মধ্যবর্তিতায় এই দিনলিপি প্রকাশ করে। আমরা সেখান হইতে এই তর্জমা প্রকাশ করিতেছি।

লা টুশ সাহেব জানাইতেছেন ১৭৬৪ সাল হইতে ১৯৬৭ সালের মধ্যে গঙ্গা ও ব্রহ্মপূত্র নদীর জরিপ চলার সময় পরাধীন বঙ্গদেশের শাসন অধিনায়ক বা গবর্নরদের গোয়েন্দা হিসাবে জেমস রেনেল এই বিবরণী লিখিয়াছিলেন। লা টুশ সম্পাদিত রেনেলের রোজনামচায় তিনটি বড় টুকরা আছে। প্রথম টুকরা ১৭৬৪ সালের মে হইতে ১৭৬৫ সনের মে পর্যন্ত বিস্তৃত। দ্বিতীয় টুকরার বিস্তার ১৭৬৫ সালের মে হইতে ১৭৬৬ সালের জানুয়ারি। আর তৃতীয় টুকরার প্রসার হইতেছে ১৭৬৬ সনের জানুয়ারি হইতে ১৭৬৭ সনে মার্চ অবধি।

এক্ষণে জেমসের পরিচয় খানিক দেওয়া যাইতে পারে। এই তথ্য আমরা পাইয়াছি খানিক লা টুশের লেখা পরিচয়পত্র হইতে আর খানিকটা ‘উয়িকিপিড়িয়া’ নামক একটি দাতব্য বিশ্বকোষ হইতে। আমাদের জ্ঞাতসারে জেমস রেনেল জন্মিয়াছিলেন ১৭৪২ সালের ৩ ডিসেম্বর আর প্রাণত্যাগ করিয়াছিলেন ১৮৩০ সালের ২৯ মার্চ। মানে তিনি প্রায় ৮৮ বছর আয়ু পাইয়াছিলেন। বিবরণ মোতাবেক মাত্র ১৪ বছর বয়সে মানে ১৭৫৬ সালে – তিনি নৌবাহিনীর চাকরি লইয়াছিলেন। ১৭৭৭ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ১৮৩০ সালে পরলোক গমনের পর হইতে লন্ডন শহরের ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবে নামক ধর্মস্থানে তিনি শুয়ে আছেন।

১৭৬৪ সালে যখন তাহাকে জরিপকাজের দায়িত্ব দেওয়া হয় তখন তাঁহার বয়স বড়জোর ২২ বছর। ১৭৬৭ সালে তাঁহাকে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মহা আমিন বা সার্ভেয়ার জেনারেল নিয়োগ করা হয়। ১৭৬৪ সাল হইতে ১৭৭৭ – সর্বমোট এই তের বছর – তিনি বঙ্গদেশের ব্রিটিশ জরীপকাজে নিযুক্ত ছিলেন।

রেনেলের বঙ্গীয় জরিপ ও মানচিত্র সম্পর্কে বিশেষ তারিফ শোনা যায়। মহা আমিনের প্রধান কার্যালয় বসিত পূর্ব বাংলার ঢাকা শহরে। বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইংরেজ বিরোধী সংগ্রাম তখনও চলিতেছিল। ইংরেজরা এই সংগ্রামকে ফকির বিদ্রোহ বলিয়া ডাকিতেন। ১৭৭৬ সালে ভূটানের সীমান্ত বরাবর একস্থানে একবার মুক্তিযোদ্ধা ফকির বাহিনীর আক্রমণে পড়িয়া রেনেল সাহেবও গুরুতর আহত হইয়াছিলেন।

এই আঘাত হইতে তিনি কখনও পুরাপুর সারিয়া উঠেন নাই। বলা যায় এই আঘাতের কারণেই অল্পবয়সে অবসর গ্রহণে বাধ্য হইয়াছিলেন তিনি । বলা হইয়াছিল ইহার পর হইতে তিনি আর বঙ্গদেশের “আবহাওয়ার প্রভাব” সহ্য করিতে পারিতেন না। ১৭৭৬ সালের ৫ এপ্রিল তাঁহার মেজর পদে উন্নতি হয়। খ্যাতনামা গভর্ণর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস তাঁহাকে বার্ষিক ৬০০ পাউন্ডের ভাতা মন্জুরি প্রদান করিয়াছিলেন।

জীবনের বাকি ৫৩ বছর তিনি লন্ডন শহরেই কাটাইয়াছিলেন। তখন ভারতে ব্রিটিশ শাসনে সহায়তা করিবার নিমিত্ত প্রতিষ্ঠিত “ইস্ট ইন্ডিয়া হাউস” নামক দপ্তরে কাজ করিতেন জেমস রেনেল। সেই যুগে তাঁহাকে এয়ুরোপের না হইলেও বিলাতের সেরা ভূগোল-বিশারদ বলিয়া গণনা করা হইত।

রেনেলের লেখার মধ্যে সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করার যোগ্য বিবেচিত হইয়াছে ১৭৭৯ সালে প্রকাশিত Bengal Atlas বা বঙ্গদেশের মানচিত্র । ১৭৮৩ সনে তিনি ‘ভারতবর্ষের খসড়া মানচিত্র’ প্রকাশ করেন। ১৮০০ সালে প্রকাশিত হয় Geographical System of Herodotus বা ‘এরোদোতসের ভূগোলজগত’। তাঁহার আরেকটি উল্লেখ্য বই Comparative Geography of Western Asia বা ‘এশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের তুলনাভিত্তিক ভূগোল’ ।

শেষ বয়সে জেমস রেনেল সমুদ্রস্রোত বিষয়ে গবেষণা করিয়া আপন খ্যাতির বৃদ্ধি সাধন করেন। তাঁহাকে ওসানোগ্রাফি বা মহাসমুদ্রবিদ্যার পিতা বলিয়াও ডাকিবার রীতি ইংরেজরা চালু করিয়াছিলেন। তাঁহার এন্তেকালান্তে মোতাবেক ১৮৩২ সালে তদীয় কন্যার সম্পাদনায় Curreats of the Aetlantic Ocean বা ‘অতলান্তিক মহাসমুদ্রের স্রোতধারা’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ১৭৮১ সালে তিনি ইংলন্ডের রাজকীয় সমিতির সদস্য মনোনীত হইয়াছিলেন।

দোহাই

১. James Rennell, The Journals of Major James Rennell, First Surveyor-General of India, Written for the information of the Governors of Bengal during his surveys of the Ganges and Brahmaputra rivers 1764 to 1767, edited by T. H. D. La Touche, Geological Survey of India (Calcutta; Asiatic Soceity, 1910).

~ ~ ~ ~ ~ ~

আমিন জেমস রেনেল

বিরচিত

শুকনা মৌসুমে গঙ্গানদী হইতে কলিকাতা যাইবার নিকটতম পথ খুঁজিয়া পাইবার লক্ষ্যে জলঙ্গি নদীর মাথা হইতে ব্রহ্মপুত্র বা মেঘনা নদীর সঙ্গমস্থল পর্যন্ত গঙ্গার; লক্ষীপুর হইতে ঢাকা পর্যন্ত মেঘনা ও অন্যান্য নদীর; এবং দক্ষিণ তীরবর্তী নদীনালার জরিপকার্যের বিবরণী সংযুক্ত

রোজনামচা

সন ১৭৬৪-১৭৬৭

তজর্মা : সলিমুল্লাহ খান

শুকনা মৌসুমে গঙ্গানদী হইতে কলিকাতা যাইবার ঘনিষ্টতম পথ আবিষ্কারের লক্ষ্যে পরিচালিত পহিলা অভিযাত্রার রোজনামচা।
উয়িলিয়াম দূর্গের শাসক মহাত্মা হেনরি ভানশিটার্ট মহোদয় প্রদত্ত আদেশের নকল।

~ ~ ~ ~ ~

উয়িলাম দূর্গ, ৬ মে ১৭৬৪

মহাশয়,
আপনাকে নিয়োগ দেওয়া হইতেছে সর্বপ্রথমে মহানদীর (গঙ্গার) যে অংশ জলঙ্গির পূর্বদিকে অবস্থিত তাহার জরিপকার্য সমাধা করিবার উদ্দেশ্যে; আর এই জরিপকার্যের বিশেষ উদ্দেশ্য পূরণ করিতে আপনাকে মহানদী হইতে খাড়ির খাল বা রাঙ্গাফুল পর্যন্ত হ্রস্বতম ও সর্বাধিক নিরাপদ পথটি খুঁজিয়া পাইতেই হইবে।

এই উদ্দেশ্যে আপনি মহানদীর দক্ষিণ ধার ধরিয়া চলিবেন আর দক্ষিণমুখি বাহির হইয়াছে এমন নদী বা নালার (Nulla) প্রত্যেকটি পরখ করিবেন, দেখিবেন এইসব নদী নালা দিয়া তিনশত মণ পর্যন্ত ভারবাহী নৌকা আসাযাওয়া করিতে পারে কিনা আর স্থানীয় লোকজন মারফত খবর লইবেন এইসব নদীনালা দিয়া সম্বৎসর যাতায়াত করা যায় কিনা; আর নদীতীরের চেহারা আর খাড়াই দেখিয়া এই বিষয়ের অবস্থা সম্বন্ধে আপনি নিজেই গ্রহণযোগ্য মতামত দিতে পারিবেন।

আপনি একটি রোজনামচা লিখিবেন যাহাতে আপনার কাজের বিবরণ খুঁটিনাটিশুদ্ধ লিপিবদ্ধ করিবেন, তাহাতে আপনি যে যে দেশগ্রামের পথঘাট পার হইতেছেন তাহা দেখিতে-টেখিতে কেমন আর তাহাতে কী কী ফসল ফলে তাহার কথাও লিখিবেন; তাহাতে কিন্তু দেশগ্রামের নামধামশুদ্ধ আর আর যাহা যাহা উল্লেখ করিবার যোগ্য তাহারও উল্লেখ করিবেন। নদী ও নালার যে খসড়া [চিত্র] আপনি প্রস্তুত করিবেন তাহার সঙ্গে এই রোজনামচার এক প্রস্থ নকলও আমাকে দিবেন।

নিবেদন ইতি
আপনারই একান্ত বাধ্য সেবক
বিনীত
হেনরি ভ্যানশিটার্ট।

~ ~ ~ ~ ~

সোমবার ৭ই মে। একটি ছোট বজরা, সঙ্গে লোকজন ও অন্যান্য জিনিশ বহন করিবার মতন ৫টি ছোট উয়িলক সমভিব্যহারে জলঙ্গির পথ ধরিয়া অগ্রসর হইব বলিয়া কলিকাতা হইতে যাত্রা করিলাম।

লোকজনের হিসাব নিচে লিখিতেছি:

সহকারী আমিন ১ জন
অন্যান্য এয়ুরোপীয় সাহেব ১ জন
লস্কর ১১ জন
মোটিয়া ১১ জন
অনুবাদক ১ জন
আমাকে শুদ্ধ ধরিয়া মোট ৩৯ জন

বেলা ৩ ঘটিকার সময় আমরা নতুন দূর্গ হইতে নৌকা ছাড়িলাম, তবে আজ রাত্রে জোয়ার অনুকূল না থাকায় আমাদের উজানে যাওয়া ব্যাহত হইয়াছে। তাই আমরা কলিকাতা পর্যন্ত আসিলাম। আজ সারাদিন আবহাওয়া চমৎকার।

৮ তারিখ রাত্রি ১ ঘটিকা। আওয়াজ পাইলাম বজরা ডুবিতেছে । আমার ঘুম ভাঙিল, দেখিলাম সত্য সত্যই ইহা ডুবিবার উপক্রম হইয়াছে, দুই তৃতীয়াংশ পানিতে ভরিয়া গিয়াছে। এই দুর্ঘটনার ফলে আমার নিত্য ব্যবহার্য জিনিশপত্রের বেশির ভাগই নষ্ট হইয়া গেল, আমার কাপড়চোপড়ের সিংহভাগেরও একই দশা ঘটিল। আজ কলিকাতায় কাটাইয়া ছিদ্রটা সারাইলাম। সাঁঝের বেলা নদীপথে উজানে যাত্রা করিলাম, আর রাত্রের মতো শ্রীরামপুরে আসিয়া নৌকা ভিড়াইলাম, আজ বিকালে উত্তর পশ্চিম দিক হইতে চোখা চোখা দমকা হাওয়া বহিতেছিল।

৯ তারিখ পরিষ্কার আবহাওয়া। সকাল আটটায় গিরিটির শোভা দেখিব বলিয়া বাহির হইলাম। চন্দননগরে বৃষ্টি হইল, আর দূর্গের ধ্বংসাবশেষ ও শহর দেখিব বলিয়া বাহির হইলাম। বৈকাল ৪ ঘটিকার সময় চিনসুরা অতিক্রম করিয়া রাত্রি নাগাদ বাঁশবাড়িয়া খালে প্রবেশ করিলাম। এই খালের পানি এক্ষণে ভরা জোয়ারে ৫ হাত গভীর হয়। কাপ্তেন পলিয়রের মানচিত্রে এই নদীর বিবরণ বেশ ফলাও করিয়া দেওয়া হইয়াছে বলিয়াই মনে হয়। রাত্রি পরিষ্কার। দক্ষিণ পশ্চিম দিক হইতে নবীন হাওয়া বাহিতেছে।

১০ তারিখ, আবহাওয়া রকমারি। বেতোয়ালেরা নালা অতিক্রম করিলাম। প্রস্থে বাঁশবাড়িয়া যতখানি চওড়া ইহাও মনে হইতেছে ততখানিই চওড়া। বিকাল ৪ ঘটিকায় যথন আমরা বেতোয়ালেরার মুখে অবস্থান করিতেছি, তখন দক্ষিণ দিক হইতে চোখা একটা দমকা হাওয়া দিল। বজরায় আর একটা ফুটা বাহির হইল। অদ্য দিবাগত রজনী বিরমপুরে কাটাইলাম।

১১ তারিখ আবহাওয়া দিনের বেশির ভাগ জুড়িয়াই ভালো, শুদ্ধ একবারই দক্ষিণ দিক হইতে সামান্য ঝড়ো হাওয়া দিয়াছিল। আজ (মধ্যাহ্নের) পূর্ব নাগাদ আম্বোয়া অতিক্রম করিলাম। জায়গাটা নদীর দক্ষিণ দিকে কুচোয়া হইতে খুলনা যাওয়ার রাস্তার মাঝামাঝি অবস্থিত। বাংলার পুরানা মানচিত্রাদির কোন কোনটিতে এই জায়গাটার উল্লেখ দেখিয়াছি বলিয়া অনুমান করিতেছি একদা ইহা বধির্ষ্ণু গ্রাম ছিল, না থাকিয়া পারে না। যাহাই হউক, বর্তমানে এই জায়গায় শুদ্ধ কয়েকটি পর্ণকুঠির বৈ কোন ঘরবাড়ি নই। আজ রাতে বেলডাঙ্গায় ঘুমাইলাম।

১২ তারিখ সারাদিন ভালো আবহাওয়া, সন্ধ্যা গাঢ়, ভয়াল। সকাল ৮টায় জলঙ্গি নদীতে ঢুকিলাম। কাসিমবাজার নদী যেখানে জলঙ্গির সহিত মিলিয়াছে সেখানে নদী মনে হইতেছে খুব সরু হইয়া গিয়াছে: আমার ধারণা বর্তমান মৌসুমে ইহা কিছুতেই চওড়ায় ৫০ গজের অধিক হইবে না। লোকের মুখে জানিতে পারিলাম এখন এই পথ দিয়া মাঝারি আকারের নৌকা চলাচল করিতে পারে।

সন্ধ্যায় হাউতনগরে একটা জায়গায় মাপজোক করিলাম আর দেখিলাম এখন (জলঙ্গী) নদীর চওড়াই ১৫০ গজ আর বর্ষায় ২৭০ গজ হয়। সেখানে নদী সবচেয়ে বেশি গভীর সেখানে গভীরতা ১৩ ফুট হয়। তীর দেখিয়া মনে হয় বৃষ্টি হইলে পানি আরও ১৩ ফুট উপরে উঠিবে।

১৩ তারিখ সারাদিন ভারি সুন্দর আবহাওয়া। দক্ষিনা হাওয়া। নদীর গভীরতা খুব কমিয়া গিয়াছে, আর এমন আকাবাঁকা হইয়াছে যে যদিও আমরা নদীপথে ২২ মাইল পার হইয়াছি তথাপি নাক বরাবর ১০ মাইলও আসিয়াছি কি না সন্দেহ। অদ্য রাত্রি তিগারি বা নেগারিনে কাটাইলাম। সূর্যাস্তের সময় (কম্পাসের) কাঁটার নড়াচড়া চওড়ায় বাড়িয়া পূর্বমুখি ৩˚-৩ʹ মতো হইয়াছে।

১৪ তারিখ পূর্বাহ্ন পরিষ্কার; বৈকালে পশ্চিম দিক হইতে বৃষ্টি, বজ্র ও বিদ্যুতসহ ভারি দমকা বাতাস হইল। আবহাওয়া খারাপ বলিয়া অদ্য দিবাভাগে আমরা শুদ্ধ ১৬ মাইল আগাইয়াছি। আজ রাতটা আমরা যেখানে কাটাইতেছি সেই নটিডাঙ্গায় নদী মাত্র ২ হাত গভীর।

১৫ তারিখ আবহাওয়া ভারি দমকা হাওয়াময়, আর বৃষ্টিও ভারি। ইহার কারণে, আর নদীর পানি অগভীর ও আকাবাকাঁ হইবার ফলেও, আমরা পথে পিছাইয়া থাকিতেছি। কোন কোন জায়গায় নদী এমনকি ৫ গজও চওড়া নয়। পাঁচদাদায় নদীর চওড়াইর আর গভীরতার মাপ লইলাম । আর একইভাবে নদীতীরের খাড়াইও মাপিলাম, চওড়াই এখন ২০০ গজ; গভীরতা কোথাও ৫ হাতের বেশি নয়। তীর বরাবর বৃষ্টির পর নদী আরো ২৬ ফুট উঠিবে। এই মাপ আর আগে (মানে ১২ তারিখে) হাউতনগরে যে মাপজোক লইয়াছিলাম তাহার জোরে মনে হইতেছে এই নদী বড় নদীর (গঙ্গা) কাছাকাছি স্থানে অনেক বেশি ফাপিয়া উঠে, দূরে গেলে কতখানি ফাপে না আর গোটা ৪১ মাইল দূরে গেলে এই পার্থক্য ১২ কি ১৩ ফুট পর্যন্ত হইয়া থাকে।

আজ সন্ধ্যা গাওঘাটিতে নোঙর করিলাম, সারাদিনে মাত্র ১০ মাইল পথ আগাইয়া আসিয়াছি। এই জায়গায় নদীবক্ষের মধ্যস্থলে ১৯ টি বড় বড় লবণভর্তি নৌকা ডুবিয়া গিয়াছে। আজ রাত্রে কিছু বৃষ্টি হইয়াছে।

১৬ তারিখ সকালবেলার আবহাওয়া সাফ আছে। বিকাল ও সন্ধ্যা ভেজা আর হাওয়া ঝোড়ো। আজ সকালবেলা বকসিপুরের খাড়ি পার হইতে আমাদের অনেক বেগ পাইতে হইয়াছে, উখানে এখন মাত্র ১ ১/২ হাত পানি। ইহাতে মনে হইতেছে এই জায়গায় শুকনা মৌসুমে নদী নিশ্চয়ই একেবারে শুকাইয়া যায়। কারণ আমরা শুনিয়াছি বৃষ্টি হইবার পর নদীর পানি ১ ১/২ হাত বাড়িয়াছে।

দুপুরে ভিখারিগঞ্জ (Vheckery-Gunge) পার হইলাম। এই জায়গায় ৯ কি ১০টা লবণের নৌকা ডুবিয়াছে। অদ্য দিনের বেলা মাত্র ১০ মাইল আগাইয়া রাত্রিতে জগিপুরে নৌকা ভিড়াইলাম। নদী এই জায়গায় ৪ হাত গভীর। আজ রাত্রে বেশ বৃষ্টি।

১৭ তারিখ আবহাওয়া পরিষ্কার। আজ দিনের বেলা ১১১/২ মাইল চলিলাম, কিন্তু নদী এমন আকাবাঁকা যে আমরা নাক বরাবর মাত্র ৬ মাইল গিয়াছি। এইস্থলে দেশগ্রাম খোলামেলা আর অতীব নয়নসুখকর। আজ রাতটা কাটাইলাম স্বস্তিয়াপুরের কাছে ছোট্ট একটি নালায়। চমৎকার রাত্রি।

১৮ তারিখ বেশির ভাগই চমৎকার আবহাওয়া, দখিনা হাওয়া। সকালবেলা আমার (বাজার) সরকারকে পাশের জলঙ্গি গ্রামে পাঠাইলাম, উদ্দেশ্য আমার আগমনের বিনিময়ে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সংগ্রহ করা। অদ্য দিবাভাগে মাত্র ১১ মাইল আগাইয়াছি, কারণ নদী এই স্থলে আগের তুলনায় প্রশস্থতর ও গভীরতর হইলেও কি হইবে, পানি অতি জোরে প্রবাহিত হইতেছে। আজ রাতটা কাটাইলাম জলঙ্গির ৬ মাইল ভাঁটিতে, ধুলমপুরের কাছে। আবহাওয়া পরিষ্কার।

১৯ তারিখ সারাদিন আবহাওয়া পরিস্কার, দক্ষিণ দিক হইতে তাজা বাতাসের দোলা থাকিয়া থাকিয়া হাওয়া দিতেছে। জলঙ্গির মাথা হইতে ৩ মাইল ভাঁটিতে দেখিলাম পানির গভীরতা এতই কম যে বজরার পানিভাসা থাকিতে হইল বড়ই কষ্টেসৃষ্টে। এই অবস্থা প্রায় পোয়া মাইল পর্যন্ত চলিল।

মধ্যাহ্ন হইবার আগেই আমরা মহা গঙ্গানদীতে আসিলাম আর দুপুর একটা নাগাদ জলঙ্গি আসিয়া পৌঁছিলাম।

আমি যে বজরায় চড়িয়া আসিয়াছি তাহা ছিল কলিকাতায় যে সকল বজরা পাওয়া যাইতেছিল তাহাদের মধ্যে সবার চেয়ে ছোট। তাই কলিকাতা ছাড়িবার আগে গভর্নর সাহেব আমাকে জানাইয়াছিলেন জলঙ্গি বরাবর আসিয়া আমার ব্যবহারের জন্য যতগুলি ‘উয়িলক’ আমার দরকার হইবে ঠিক ততগুলি ‘উয়িলক’সহ সুবিধাযুক্ত একটি বজরা আমার অপেক্ষায় থাকিবে, যেন যে মৌসুমে নদীর পানি বড়ই নিচে নামিয়া যায় সে মৌসুমেও জলঙ্গি নদী ধরিয়া যত রকমের অভিযান পরিচালনা সম্ভব তত অভিযান পরিচালনা করিবার কাজে এই সকল যান আমি ব্যবহার করিতে পারি।

কিন্তু জলঙ্গি পৌঁছিয়া দেখিলাম সেখানে কিছুই নাই, না বজরা না উয়িলক কিছুই নাই। সেখানকার লোকজন আমাকে বলিল যে কাপ্তেন উয়িডারবর্ণ (যিনি সম্প্রতি স্বেচ্ছাসেবকদের সহিত অভিযানে গিয়াছেন) হাতের কাছে যাহা পাওয়া যায় তাহা লইব বলিয়া সমস্ত নৌকা ধরিয়া লইয়া গিয়াছেন আর সেই নৌবহরের মধ্যে একটি বজরাও রহিয়াছে; কিন্তু সেই বজরাটিই আমার জন্য ধরা ছিল কিনা এখনও পর্যন্ত সঠিক সংবাদ যোগাড় করিতে পানি নাই। যে বজরায় চড়িয়া আমি আসিয়াছি তাহা আসন্ন বর্ষা মৌসুমে আমি যে কাজ করিতে আসিয়াছি সে কাজ সম্পন্ন করার উপযুক্ত মোটেও নহে; ইহাতে সন্দেহ নাই । বজরাটা ছোট আকারের ও ফুটায়ফাটায় ভরা এই দুই কারণেই।

দেখিলাম নষ্ট করিবার মতন কোন সময়ই আমার হাতে নাই। কারণ নদীর পানি দিনকে দিন বাড়িতেছে। তাই আমি আমার জরিপদলের ব্যবহারোপযোগী কিছু উৎকৃষ্ট উয়িলক সংগ্রহে ব্যস্ত হইয়া পড়ি, কিন্তু তেমন সফল হইতে পারি নাই। কারণ যে তিন দিন আমি ঐখানটায় ছিলাম সেই তিনদিনে আমি শুদ্ধ ২টি উয়িলক যোগাড় করিতে পারিলাম; এইগুলির একেকটি ২০০ মণ পর্যন্ত বোঝা লইতে পারে; তাহা ছাড়া আমি কলিকাতা হইতে আনা ৩টা উয়িলক সঙ্গে রাখিলাম আর ২টা কলিকাতায় ফেরত পাঠাইলাম।

২০ তারিখ সারাদিন আবহাওয়া ভাল ছিল; ২১ তারিখ পূর্বাহ্নও একই রকম কাটিল, তবে বিকালবেলা দক্ষিণপূর্ব দিক হইতে একটা তাজা ঝাপটা বহিয়া গেল, মাঝে মাঝে ভারি দমকা হাওয়া দিতেছিল। কিন্তু বৃষ্টি নামে নাই। আজ গভর্নর সাহেব বরাবর পত্র লিখিলাম, এই পর্যন্ত আমি যতদূর আসিয়াছি তাহার বিবরণী পাঠাইলাম, আর সঙ্গে জুড়িয়া দিলাম জলঙ্গী নদীর অংশবিশেষের নকল।

বিডিনিউজ, আর্টস, ২২ নভেম্বর ২০০৭