Category Archives: তত্ত্বতালাশ

মানবাধিকার ও মৃত্যুদণ্ড

খবরে প্রকাশ বহুজাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’ সম্প্রতি বলিয়াছেন বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল আইনের সংশোধন করিয়া বিচারাধীন ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ডের দিকে ঠেলিয়া দিতে পারে। তাঁহারা বলিয়াছেন মৃত্যুদণ্ড অমানবিক ও নিষ্ঠুর সাজার রূপবিশেষ। তাঁহাদের মতে মৃত্যুদণ্ডের মতন সাজা মানবাধিকারের লঙ্ঘন। আর সেই কারণেই সরকারের উচিত মৃত্যুদণ্ডের সাজাটা উঠাইয়া দেওয়া।

এই সংস্থার বাংলাদেশ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আব্বাস ফাইয়াজের বক্তব্য উদ্ধার করিয়া বাংলাদেশের অগ্রণী দৈনিক ‘প্রথম আলো’ পত্রিকা লিখিয়াছেন, চল্লিশ বছরের বেশি সময় পর বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সংঘটিত ভয়ংকর সব অপরাধের বিচারের ঐতিহাসিক সুযোগের সৃষ্টি হইয়াছে। তিনি একদিকে কবুল করিয়া বলিয়াছেন এই সকল অপরাধের ন্যায়বিচার হইতে হইবে। সঙ্গে সঙ্গে এই দাবিও করিয়াছেন যে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মানবাধিকারের প্রতি অবশ্যই সম্মান জানাইতে হইবে। আব্বাস ফাইয়াজ মৃত্যুদণ্ডের মতন সাজাকে মানবাধিকারের লঙ্ঘন মনে করেন।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে মৃত্যুদণ্ডই যে সবচেয়ে বড় সে কথা না বলিলেও চলে। মৃত্যুদণ্ডের বিধান এখনো এইদেশের ফৌজদারি আইনে বলবৎ রহিয়াছে। তবে মৃত্যুদণ্ড যে দিতেই হইবে এমন কোন কথা নাই। ব্যতিক্রমের মধ্যে একটি বিধান আছে যাহাতে বলা হয় কোন যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া ব্যক্তি যদি আরেকবার খুনের অপরাধ করেন তবে তাঁহাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিকল্প নাই।

অ্যামনেস্টির বিশেষজ্ঞ মহাশয়েরা বলিতেছেন, তাঁহারা ন্যায়বিচার চাহেন তবে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন করেন না। সমস্যাটা ঠিক এই জায়গায়। আমরা জিজ্ঞাসা করিব যে ব্যক্তি বা সংস্থা বার বার খুন করিয়াছে তাহাকে কোন দণ্ড দিবেন? কোন দণ্ড দিলেই বা ন্যায়বিচার হইবে? বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যে সকল ভয়ংকর অপরাধ সংঘটিত হইয়াছে সে সকল অপরাধ পৌনঃপুনিক অপরাধ বৈ নহে। অতয়েব এইখানে প্রচলিত আইনে ন্যায়বিচার করিতে হইলেও অন্য দণ্ড দিবার পথ নাই।

মানবাধিকারের কথা যদি বলিতেই হয় তবে বলিতে হইবে মহাদেশ এয়ুরোপের ইতিহাস তো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইতিহাস বৈ নহে। মানবাধিকার লঙ্ঘন করিতে করিতে এয়ুরোপ আজিকালি নিজ বাসভূমে মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করিতে পারিয়াছে। কিন্তু কোন মূল্যে! একবার ভাবিয়া দেখিলে ভালো হয়। আফ্রিকায় আর এশিয়ায় এয়ুরোপ যেভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করিয়া মজা পাইতেছিল সে মজা একদিন নাৎসি জার্মানির নেতা হিটলার যখন খোদ এয়ুরোপখণ্ডেও মারিতে লাগিলেন তখনই না এয়ুরোপ প্রমাদ গুনিল। বুঝিল মানবাধিকার বলিয়া একটা জিনিশ তাহা হইলে আছে! অথচ এই অপরাধের কোনটা এয়ুরোপ তাহার অধীন দুনিয়ার দেশে দেশে করে নাই? করে নাই ভিয়েতনামে? আলজেরিয়ায়? আজ করিতেছে না এরাকে? আফগান মুলুকে?

আর কে না জানে সেই অমানবিক ও নিষ্ঠুর মৃত্যুদণ্ড এয়ুরোপের নতুন সংস্কার মার্কিনদেশে শতে পঞ্চাশ ভাগাধিক রাজ্যে এখনো তবিয়তে বহাল আছে। সারা দুনিয়ার পরাধীন দেশের পর আরেকটি পরাধীন দেশে মৃত্যুর পর মৃত্যু রপ্তানি করিয়া স্বাধীন এয়ুরোপ বিশ্ববাসীর প্রশংসা কুড়াইতেছে। আজিকার আফগানিস্তানে কিংবা এরাকে মৃত্যুর পর মৃত্যুর ফিরিস্তি কি খুব বেশি হ্রস্ব হইয়াছে?

সকল স্বাধীন দেশই হয়তো সমান স্বাধীন হয় না। বাংলাদেশও কি একদিন স্বাধীন এয়ুরোপের সমান স্বাধীন হইবে না? আমরা না হয় সেইদিনের অপেক্ষায় থাকিব! ইতিহাসের রসিকতাটা মাঝে মাঝে বড়ই বিরস হইয়া যায়।

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

 

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ১০

জাক লাকাঁ কথিত ‘অন্তর্জগতে যাহা না মিশিলে কোন সহজই জন্মায় না সেই পরকীয়া বা গঠনের কথা’

lacan-1932.jpg

১৯৩২ সালে জাক লাঁকা, বামে বসে থাকা জন

ভাষা, গঠনতন্ত্র ও সহজ মানুষ : লাঁকা পড়ার ভূমিকা

সলিমুল্লাহ খান

১৯৬৬ সালের অক্টোবর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্গত মেরিল্যান্ড রাজ্যের অন্তঃপাতী বল্টিমোর শহরে ফরাসি-মার্কিন বুদ্ধিজীবীদের এক বিশেষ সভা বসিয়াছিল। আমাদের এই আলোচনার বিষয়ের সহিত ঐ সভার আলোচ্য বিষয়ের বিশেষ মিল আছে। ফরাসিদেশের বুদ্ধিজীবী মহলে ততদিনে তত্ত্বজ্ঞানের প্রস্থানস্বরূপ ‘গঠনতন্ত্র’ [structuralism] নামক নতুন প্রস্তাব লইয়া আলোচনা জমিয়া উঠিয়াছে। আর মার্কিনদেশেও ইহার প্রভাব ছড়াইয়া গিয়াছে। তাই ১৯৬৬ সালের এই বল্টিমোর সভার বিষয় ঠিক হইয়াছিল ‘গঠনতন্ত্র’।

ঐ সভায় যাঁহারা হাজির হইয়াছিলেন তাঁহাদের মধ্যে ছিলেন রলাঁ বার্থ [Roland Barthes], জাক লাকাঁ [Jacques Lacan], জাক দেরিদা [Jacques Derrida], লুসিয়ঁ গোল্ডমান [Lucien Goldmann], জঁ-পল ভেরনা [Jean-Paul Vernant] এবং ত্রিস্তান তোদোরব [Tristan Todorov] প্রমুখ নামজাদা বিদ্বান ও বুদ্ধিজীবী। অন্য এক নামজাদা বুদ্ধিজীবী জঁ ইপ্পোলিত [Jean Hyppolite] ফরাসি তরফে এই সভা আঞ্জাম করিয়াছিলেন। বলা হয়তো নিষ্প্রয়োজন নয় এই জঁ ইপ্পোলিত জার্মান হেগেলের ফরাসি অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করিয়া বিশেষ নাম কুড়াইয়াছিলেন। তিনি চাহিলে জাক লাকাঁর বিশেষ বন্ধু ও জাক দেরিদার প্রধান শিক্ষক হিসাবেও পরিচিত হইতে পারিতেন। দুর্ভাগ্যবশত মহাত্মা ইপ্পোলিত ১৯৬৮ সালে–নিতান্ত অপরিণত বয়সে–এন্তেকাল করিয়া সকলকে শোকসাগরে ভাসাইলেন।

কারণ যাহাই হউক অনেক দেরি করিয়া ১৯৬৬ সালের ঐ সম্মেলনের কার্যবিবরণী প্রথম ছাপা হয় ১৯৭০ সাল নাগাদ। ইহার দুই বছর পর তাহার পুণর্মুদ্রণও হয়। পুনর্মুদ্রণের অজুহাতে বইয়ের নামেরও কিছু পরিবর্তন
roland_barthes.jpg…….
রলাঁ বার্থ (১৯১৫—১৯৮০)
………
ঘটান হয়। ১৯৭০ সালের সংস্কার অনুসারে বইয়ের আসল নাম রাখা হইয়াছিল ‘বিচারশাস্ত্রের ভাষা ও মনুষ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান : গঠনতন্ত্র বিসম্বাদ’। ১৯৭২ সালের সংস্কার অনুসারে উহার নাম পাল্টাইয়া রাখা হইল ‘গঠনতন্ত্র বিসম্বাদ: বিচারশাস্ত্রের ভাষা ও মনুষ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান’। ইহার মানে বড় নাম ছোট হইল, ছোট নাম বড় হইল। পাঠিকারা ইহাতেই বুঝিবেন জ্ঞানের জগতে ‘গঠন’ [structure] নামে নতুন কোন ঘটনা ঘটিয়াছে। ইহাতে প্রমাণ এয়ুরোপের মনে মনে ‘গঠনতন্ত্র’ বড় আকারের ফটিক হইয়া উঠিয়াছে। ১৯৬৬ সালে ঠিক ইহাই অনুমান করিয়াছিলেন মহাত্মা জাক লাকাঁ। তাঁহার বল্টিমোর বক্তৃতায় সেই কথার প্রমাণ আছে। লাকাঁ বলিয়াছেন–‘[গঠন] ধারণাটি কী তাহা লইয়া লোকে কিছু কিছু ভুল করিবেই, তালগোল পাকাইবে, অনুমানের পর অনুমাননির্ভর ব্যবহার করিতে থাকিবে আর আমার মনে হয় বেশিদিন না যাইতেই শব্দটি লইয়া একপ্রকার হুজুগের চল হইবে।’

এই বক্তৃতার তাৎপর্য পুরাপুরি বুঝিতে না পারিয়া স্বল্পশিক্ষিত সাংবাদিকরা মনে করিয়াছিলেন জাক লাকাঁ বড় কঠিন লোক। তাঁহার কথা বুঝিবার সাধ্য
hyppo.jpg…….
জঁ ইপ্পোলিত (১৯০৭–১৯৬৮)
……..
সাধারণের নাই। তাঁহারা আরো বলিয়াছিলেন, লাকাঁ সাহেব যেহেতু ইংরেজি ভাষাটি সঠিক আয়ত্ত করিয়া সারেন নাই, তাই তাঁহার বক্তৃতা দশজনের পক্ষে ভালোমতে হজম করাও সম্ভব হয় নাই। আমরা সেই বক্তৃতার অনুবাদ এখানে পেশ করিতেছি। আমাদের তর্জমার ত্রুটিসহ পাঠকগণ দেখিবেন এই বক্তৃতার বিরুদ্ধে যাহা রটিয়াছে তাহা পুরাপুরি সঠিক নয়। ইহা হয়তো বোঝা যায়। নহিলে বাংলায় অনুবাদ করিবার কথাই উঠিত না।

কেহ কেহ বলিয়াছিলেন বল্টিমোর সম্মিলনে মিলনকথা যাহা উঠিয়াছিল তাহা ভাষা ও মানুষের সম্বন্ধটা কী সেই জিজ্ঞাসা লইয়া। একদল জিজ্ঞাসিয়াছিল–মানুষ ভাষা তৈয়ার করিয়াছে নাকি ভাষাই মানুষ তৈরি করিয়াছে? কেহ কেহ দাবি করিয়াছিলেন ফরাসিদেশ হইতে প্রচারিত ‘গঠনতন্ত্র’ নামক প্রচারণা প্রমাণ করিয়াছে যে ‘মানুষ’ বলিয়া সামান্য কিছু নাই। তাই ‘সহজ মানুষ’ বলিয়া বিশেষ কিছু থাকিবে কি করিয়া? বিজ্ঞানের ইতিহাস ব্যবসায়ী মিশেল ফুকো সাহেবের নামে এই প্রচারণা কিছুদিন গাঢ় চলিয়াছিল। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করিতে হইতেছে উপরোক্ত ১৯৬৬ সম্মিলনে মিশেল ফুকো হাজির হয়েন নাই। তবে তর্কের খাতিরে স্বীকার করিতে দোষ নাই ঐ বছর ছাপা তদীয় ‘ভাষা ও বস্তু’ (লে মো এ লে শোজ) বইয়ে তিনিও ঐ রকমের ইশারাই করিয়াছিলেন ।

অথচ তিন বছরের মাথায় ছাপা ‘জ্ঞানগরিমার আদিকথা’ নামক পুস্তকে ফুকো ঘোষণা করিলেন ‘গঠনতন্ত্র’ তথা ‘মনুষ্য বলিয়া কিছু নাই’ কথাটি তাঁহার নহে। এহেন দাবি অলীক ও অসার। তিনি ১৯৬৬ সালের বইয়ে বলিয়াছিলেন ‘মানুষ’ অর্বাচীন এবং তাহার অন্তর্ধান অত্যাসন্ন। অথচ তিনি ১৯৬৯ সনের কেতাবে তিনিই ঘোষণা করিলেন–আমি কিন্তু কোথাও ‘গঠন’ কথাটি ব্যবহার করি নাই। (ফুকো ১৯৭২: ২০০-২০১) সুতরাং ‘গঠনতন্ত্র বিসম্বাদ’ [the structuralist controversy] কথাটি অলীক বুলি মাত্র। তবে শেষমেশ এই ফুকো কবুল করিলেন তিনি নিজেও মনুষ্য সাধকের সাধনার মূল্য খানিক কমাইয়া দেখিয়াছিলেন আর কিছু বাড়াইয়া দেখিয়াছিলেন এই গঠনে সেই গঠনে পাওয়া যুগপৎ মিলের মূল্য ।

কী ঘটিয়াছিল এই সময়? বিশেষ করিয়া বলিতে নৃবিজ্ঞানসাধক হজরত ক্লদ লেভি-স্ত্রোস [Claude Lévi-Strauss] যখন দেখাইয়াছিলেন ফ্রয়েডের
Claude Levi Strauss………
ক্লদ লেভি-স্ত্রোস (জন্ম. ১৯০৮)
……….
আবিষ্কৃত অজ্ঞানের গঠন আর মনুষ্যজাতির মধ্যকার পরিবার ও আত্মীয়তা-সম্পর্কের গঠন একই প্রকার গঠনেরই রকমফের মাত্র, প্রকৃত প্রস্তাবে গঠনতন্ত্র প্রস্তাব পেশ করা হইয়াছিল তখনই । ইহাতে জাক লাকাঁ আরও আহুতি দিলেন–বলিলেন অজ্ঞানের গঠন পরিষ্কার ভাষার মতন । গঠনতন্ত্র সত্য সত্যই গড়িয়া উঠিল।

ইহার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখাইলেন যাঁহারা তাঁহারা আগের শতকের দর্শনতত্ত্বজ্ঞানী নিৎসের [Friedrich Nietzsche] দোহাই পাড়িলেন। ফুকো একা নহেন, কিছু পরিমাণে জাক দেরিদা আর বহুল পরিমাণে জিল দল্যুজ [Gilles Deleuze] তাঁহার সঙ্গী হইলেন । ইঁহাদের মধ্যে কিছু প্রভেদ
Deleuze……..
জিল দল্যুজ (১৯২৫—১৯৯৫)
………
থাকিলেও মূল প্রশ্নে সকলেই একমত হইলেন। তাঁহারা ধরিয়া লইলেন ‘গঠনতন্ত্র’ মানে সহজ মানুষের অন্তর্ধান। তাই ফুকো ও দল্যুজ নিৎসের আশ্রয় লইলেন আর দেরিদা উটপাখির মত ভাষার বালিতে আমুণ্ডুপদনখর ডুবিলেন।

‘গঠনতন্ত্র’ কথাটি শুরু হইতেই এই ভুল বোঝাবুঝির উপর দাঁড়াইয়া আছে। অনেকেই মনে করিয়াছিলেন ‘গঠন’ (structure) থাকিলে ‘সহজ মানুষ’ (subject) থাকিতে পারে না। অথচ জাক লাকাঁ একেবারে বিসমিল্লাহ হইতেই বলিয়া আসিতেছিলেন এই ধারণাটি আদপেই সঠিক নহে। পক্ষান্তরে তিনি দাবি করিলেন, গঠন ও সহজ মানুষের সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গী। গঠনের পরই শুদ্ধ সহজ মানুষের আবির্ভাব ঘটে, পূর্বে বা বিহনে নহে।

স্বভাবতই প্রশ্ন উঠিয়াছিল: ‘সহজ মানুষ’ (subject) কী বস্তু? জাক লাঁকা বলিলেন–‘সহজ মানুষ’ কথাটার অর্থই হইতেছে ‘যাহা সহজ নহে’। কোন জিনিস ভাষার মধ্যে ধরিয়া রাখা সহজ নহে বলিয়া আমরা কি বলিতে পারি জিনিসটুকু নাই? সেই সময় শার্ল মোরাজে (Charles Morazé) নামক জনৈক ইতিহাস বিশারদ আওয়াজ তুলিয়াছিলেন ‘ঋণাত্মক একের বর্গমূল’ (the root of minus one) কথাটির অর্থ কী? গণিতশাস্ত্রে এই চিহ্নটিকে
Moraze………
শার্ল মোরাজে (১৯১৩–২০০৩)
……….
‘অযৌক্তিক’ [irrational] সংখ্যা বলা হইয়া থাকে। অথচ ইহা তো খোদ গণিতেই কাজ করে। জাক লাকাঁ ইহার বরাত দিয়া বলিলেন প্রাণীস্বরূপ মানুষ বা ‘জীব’ ও ‘সহজ’ মানুষের মধ্যকার পার্থক্যও অনুরূপ বটে। ‘সহজ মানুষ’ কথাটা যদি অযৌক্তিক মনে হয় তবে তাহা ভাষারই দোষ। কিন্তু তাই বলিয়া ইহা কাজ করে না বা ইহা নাই বলা যাইবে না।

জাক দেরিদা এক জায়গায় জাক লাকাঁর কাছে জানিতে চাহিলেন ইহাকে ‘সহজ মানুষ’ বা ‘অজ্ঞান’ বলিবার কারণ কী? ইহার উত্তরে লাকাঁ সভাস্থলে উপস্থিত বিদ্বানমণ্ডলীর কাছে একটি গল্প বলিয়াছিলেন।

একদিন হোটেলে একটি ঘটনা ঘটিয়াছিল। জাক লাকাঁর ঘরে একটি টেবিল এক জায়গা হইতে আরেক জায়গায় সরাইবার দরকার হইল। তিনি যাহাকে বলে বেলম্যান বা পিয়ন তাহাকে টেবিলটি সরাইতে বলিলেন। পিয়ন সাহেব
d_jaques_derrida.jpg…….
জাক দেরিদা (১৯৩০–২০০৪)
………
তাহাতে ক্ষেপিয়া গেলেন। বলিলেন, ‘মহাশয়, ইহা আমার কর্তব্য নহে। আপনি দরকার মনে করিলে কথাটা বলিবেন গৃহ-পরিচারক বা হাউস-কিপারকে। গৃহ-পরিচারকগণ আসিয়া কাজটা করিয়া গেলেন বটে, কিন্তু তাহারা মহাত্মা লাকাঁর কোন কথাই শুনিলেন না। তাঁহারা শুদ্ধ স্ব স্ব উপরিওয়ালার আদেশ অনুসারে কাজ সারিয়া চলিয়া গেলেন। ইহা হইতেই–লাকাঁ বলিলেন–তিনি ঠাহর করিলেন কাজ যাহা হইয়াছে তাহা (সহজ মানুষস্বরূপ) তাহার ইচ্ছায় হইয়াছে মনে করিলে তিনি ভুল করিবেন। কাজ হইয়াছে হোটেলের নিয়ম অনুসারে, খরিদ্দারস্বরূপ জাক লাকাঁর ইচ্ছায় নহে। মাঝখানকার খরিদ্দারবেশী জাক লাকাঁ নামক অস্থিরতাটুকুরই অপর নাম ‘সহজ মানুষ’। টেবিলটা বড় বেঢপ জায়গায় ছিল। এখন বেশ ঢপ জায়গায় চলিয়া আসিয়াছে। মাঝখানে সৃষ্ট শূন্যতাই এক্ষণে প্রমাণ করিতেছে ঐখানে কি একটা যেন ছিল। অধৈর্যপরায়ণতার বাহক এই স্থানটির নামই ‘সহজ মানুষ’। (রাবাতে ২০০২: ৪০ )

জাক লাকাঁর এই বক্তৃতার নাম দেখিয়াও অনেকেই ইহা পড়িতে চাহিবেন না মনে হয়। সে কি নাম রে বাবা! ‘অন্তর্জগতে যাহা না মিশিলে কোন সহজই জন্মায় না সেই পরকীয়া বা গঠনের কথা’ [‘Of Structure as an Inmixing of an Otherness Prerequisite to Any Subject Whatever’]। মহাত্মা লাকাঁ সেইদিনের বক্তৃতায়ই জানাইয়াছিলেন সমস্যাটি লইয়া তাহার কাজের বয়স ততদিনে ১৫ বৎসর হইবে। কাজেই তাঁহার সমস্ত কথা একদিনে বলা সম্ভব হইবে না।

সেদিনের বক্তৃতার আরও একটি কথা মনে রাখিবার মত যুৎসই হইয়াছিল। বক্তৃতার শেষভাগে এক জায়গায় তিনি বলিলেন: ‘অজ্ঞান কী বস্তু সংক্ষেপে তাহার সবচেয়ে সুন্দর ছবি এই সুবেহ সাদেকের বল্টিমোর শহর।’ কিছু একটা আছে বোঝা যাইতেছে কিন্তু সঠিক কী যে আছে বুঝিতেছি না । তাহা বুঝিতে হইলে খানিক কল্পনার শরণ লইতে হইবে।

মনে রাখিতে হইবে সেই ১৯৫৩ সন হইতেই লাকাঁ বলিয়া আসিতেছিলেন ‘অজ্ঞানের গঠন ভাষার মতন’। ১৯৬৬ সনে–এই বক্তৃতাতেই–তিনি জাহির করিলেন ঐ কথাটি কিছু পরিমাণ বাহুল্যদুষ্ট ছিল। এক্ষণে তাঁহার সহজ মত দাঁড়াইল: ‘অজ্ঞানের গঠন আছে বলিলেই চলিত কারণ গঠন মানেই তো ভাষা’।

লাকাঁর কথা যৎসামান্য উদ্ধার করিতেছি:
সত্য বলিতে ‘ভাষা আকারে’ কথাটি বাহুল্য বটে, কারণ ‘গঠিত’ বলিতে যাহা বুঝায় ‘ভাষা আকারে’ বলিতেও হুবহু তাহাই বুঝায়। গঠিত বলিতে বুঝায় আমাদের জবান, আমাদের অভিধান ইতি আদি। গঠিত অর্থ যাহা, ভাষা অর্থও অবিকল তাহাই।

মনে রাখিবার মতন মচমচে কথা এই বক্তৃতায় আরো এক প্রস্ত পাওয়া যাইতেছে। ‘চিহ্ন’ (sign) ও ‘পদ’ (signifier)-এর মধ্যে ভেদ আছে–এই প্রস্তাব প্রচারের লক্ষ্যে লাকাঁ জানাইলেন চিহ্ন মানে যাহা দিয়া সজ্ঞান এক প্রাণীর খবর অন্য প্রাণীকে দেওয়া চলে। কিন্তু ‘যাহা সহজ মানুষের হইয়া সহজ মানুষের সঙ্গে যায় না, যায় অন্য এক পদের সঙ্গে তাহাকেই পদ কহে’।

আরো এক জবর খবর–এইস্থলে তিনি বলিয়াছিলেন–আছে। ভাষার বা পদের জগতে যাহা আছে তাহাকে ‘বাসনা’ (desire) বলা হয়। বাসনার এক মানে যাহা বাস করে না–যাহা অস্থির, যাহা অধৈর্য। কিন্তু বাসনার তলে তলে আরো এক জিনিস বাস করে। তাহার নাম মজা (jouissance)। বাসা আর মজা
lucien-goldmann.jpg……..
লুসিয়ঁ গোল্ডমান (১৯১৩–১৯৭০)
……..
মারা ঠিক এক জিনিস নহে। ভাষা মানে বাসনার বিধি–আইন ও ঈশ্বর যে অর্থেই ইচ্ছা–ধরিয়া লইতে পারেন। ভাষাই বিধি। ভাষাই নিষেধ। নিষেধ বা সীমা আছে বলিয়াই প্রাণী (এখানে মানুষ) সেই নিষেধের বেড়া ভাঙ্গিয়া–বা আইল ডেঙ্গাইয়া–ঘাস খাইতে চায়। নিষেধ বা আইল না থাকিলে তো আইলডেঙ্গার দরকারই হইত না–মজাও হইত না। কাজেই বল্টিমোর শহরের বিজ্ঞাপনচিত্রে লেখা ‘এনজয় কোকা-কোলা’ বা ‘কোকা-কোলার মজা মার’ দেখিয়া লাকাঁ বলিলেন সকলেই সকলকে বলিতেছে ‘মজা মার’।

এই মজা মারিতে মারিতে বেশি মারিলে একসময় ব্যথা করিতে শুরু করে। অথচ এই ব্যথার সীমায় পৌঁছাইতে না পারিলে মজা যে সে মারিতেছে তাহার প্রমাণই হয় না। লোকে বলে মজাই জীবন, মজা না মারিলে এ জীবন লইয়া সে কী করিত? মজা জীবনের চাহিতেও বড়। জীবন তুচ্ছ। যে কেহই ত্যাগ করিতে পারেন। সকলেই যাহা সহজে পারেন না ভারতীয় শাস্ত্রে তাহারই অপর নাম ‘ভক্তি’।

পাঠিকা, খেয়াল করিয়াছেন ‘ভক্তি’ কথাটার তাৎপর্য? ‘ভক্তি’ কথাটার আগে
jean-pierre-vernant.jpg
জঁ-পল ভেরনা
………
‘বি’ উপসর্গ লাগাইলে কী হয়? ‘বিভক্তি’। বিভক্তি আসিয়াছেন ‘বিভাগ’ করিবার ক্রিয়া হইতে। তাহা নহে তো কী? তাহা হইলে ‘ভক্তি’ আসিয়াছেন ‘ভাগ হইতে’। প্রাণীমানুষ বা ‘জীব’ ভাগ হইলেই ‘সহজ মানুষ’ তৈয়ার হয়েন। এই ভাগকর্মটি করেন যে হাজাম বা নাপিত তাহারই অপর নাম ভাষা। ভাষাই ভাগ করেন। কাজেই ভাগ হইতে যাহার উৎপত্তি তিনিই বিভক্ত বা নিছক ‘ভক্ত’, তাহার পরায়ণতার নামই ভক্তি। খোদ ভক্তি ও মজার মধ্যে তাহা হইলে একটা না একটা যোগ আছে।

মজা মারিতে মারিতে বেশি মারিলে ভাগ বা ভক্তি আর থাকিবেন না। তখন মজার রাশ টানিয়া ধরিতে হইবেক। ভাষা ও মজার, পরকীয়া ও আপনকার এই যুগলবন্দিকেই আমরা এতদিনে ‘গঠন’ বলিয়া চিনিতে পারিলাম। আর জাক লাকাঁর কর্জ নগদ নগদ স্বীকার করিলাম। লাকাঁ কথিত সমাচার এইখানেই মূর্তি পাইল: আপনকার হৃদয় বা অন্তরের সহিত বাহির বা পরকে মিশাইলেই শুদ্ধ সেই ‘সহজ মানুষ’ দেখা দিবেন–অন্য হেতু অন্য কোথা, অন্য কোনখানে দিবেন না। কারণ তাহা যে দিবার নহে।

দোহাই

১. Michel Foucault, The Archeology of Knowledge [L’archéologie de savoir, Paris: Gallimard, 1969], trans. A. M. Sheridan Smith (New York: Pantheon, 1972); ইংরেজি এই সংস্করণে ১৯৭০ সালে কলেজ দো ফ্রঁসে ফুকোপ্রদত্ত বক্তৃতা L’ordre du discourse (Paris : Gallimard, 1971) এর অনুবাদ ‘The Discourse on Language’ অন্তর্ভূক্ত হইয়াছে।

২. Michel Foucault, The Order of Things [Les mots et les choses: une archéologie des sciences humaines, Paris: Gallimard, 1966], A. Sheridan, tr. (New York: Random House, 1970).

৩. Jacques Lacan, ‘Of Structure as an Inmixing of an Otherness Prerequisite to Any Subject Whatever’, in Richard Macksey and Eugerio Donato, eds., 1970, infra, pp.186-200.

৪. Richard Macksey and Eugenio Donato, eds., The Structuralist Controversy: The Languages of Criticism and the Sciences of Man(Baltimore: The Johns Hopkins University Press, 1972).

৫. Richard Macksey and Eugenio Donato, eds., The Languages of Criticism and the Sciences of Man: The Structuralist Controversy,(Baltimore: The Johns Hopkins University Press, 1970).

৬. Jean-Michel Rabaté, The Future of Theory (Oxford: Blackwell, 2002).

●●●

অন্তর্জগতে যাহা না মিশিলে কোন সহজই জন্মায় না সেই পরকীয়া বা গঠনের কথা

জাক লাকাঁ

তর্জমা: সলিমুল্লাহ খান

আমার ইংরেজি উচ্চারণ একদম বাজে। উচ্চারণদোষে আমার বক্তৃতা একদল ইংরেজিভাষী শ্রোতার কানে নিশ্চয়ই বড় মধুর শোনাইবে না। আর বক্তৃতাটা যদি আমি ইংরেজি জবানেই করি তো যাহাকে বলা যাইতে পারে আমার বার্তা তাহা যথাস্থানে না পৌঁছাইবার ঝুঁকিও থাকিয়াই যাইতেছে–আজ বিকালবেলা এই কয়টি কথা আমাকে বুঝাইবার আশায় এক ভদ্রলোক বেশ কিছু সময় ব্যয় করিয়াছেন। সত্য বলিতে বিষয়টি আমার বিবেকের ঘাড়েও ভারি বোঝা হইয়া রহিয়াছে। যদি অন্যথা করি তো তাহা হইবে আমি যে বস্তুকে আমার বার্তা মনে করিয়া থাকি তাহার শতে একশত ভাগ বিপরীত কর্ম। বার্তা বলিতে আমি যাহা বুঝি তাহা আপনাদের সমক্ষে খুলিয়াই বলিতেছি–বার্তা মানে আমার নিকট আর কিছু নয়, মাত্র ভাষার বার্তা। আজকাল যেখানেই যাই দেখি সকলেই বার্তা বার্তা করিতেছে–জীবদেহের অন্তরের হরমোনে বার্তা, বিমানপোতকে পথ দেখাইবার কিংবা উপগ্রহাদি হইতে সংকেত ধরিবার আলোকরশ্মিও বার্তা। এই ক্রমে আরো আরো আছে। ভাষার বার্তা কিন্তু সেই জিনিস নয়। ইহা ষোল আনাই ভিন্ন বস্তু। বার্তা–মানে আমরা যে বস্তুকে বার্তা নামে ডাকিতেছি তাহা–বিনা ব্যতিক্রমেই পরমের পাঠানো বার্তা। পরম বলিতে আমি বুঝাইতেছি ‘পরমের ঠিকানা বা অধিষ্ঠান’। আমরা সচরাচর যাহাকে ‘পর’ কিম্বা বা ‘অপর’ (other) বলিয়া থাকি, যাহা লিখিতে ছোট ছাদের ‘o’ অক্ষর ব্যবহার করা হয়, এই পরম অবশ্যই সেই পরম নয়, আর সেই কারণেই এক্ষণে ‘পরম’ (Other) বলিয়া যাহাকে ডাকিতেছি তাহা লিখিবার সময় প্রথম হরফ নাগাদ বড় ছাদের ‘O’ ব্যবহার করিয়াছি। এতদ্দেশে, এই বল্টিমোর শহরে, পরম মনে হইতেছে ইংরেজি জবানেই বাতচিত করিয়া থাকেন। আর ইহাই তো স্বভাবসম্মত। তাই আমি যদি এই বক্তৃতাটি ফরাসিযোগেই করিতাম তো তাহা হইত অন্যায় কাজ। অবশ্য উপরে যে ভদ্রলোকের দোহাই দিলাম তাহার কথাটিও ফেলিয়া দিবার মতো নহে। তিনি বলিয়াছিলেন ইংরেজি বোলটা আমার মুখে ঠিক সহজে আইসে না। অধিক কী, তাহা খানিক ভূতের মুখে রামনাম রামনাম শোনায়। আরো কথা আছে। আমি জানি অত্র সভায় এমনও অনেকে আছেন যাহারা শুদ্ধ ফরাসি ভাষাতেই বাতচিত করিতে পারেন, ইংরেজি এক লব্জও বুঝিতে পারেন না। আমি যদি ইংরেজিযোগে বলিতাম ইঁহাদিগের পক্ষে নিরাপদ হইত। তবে আমার হয়তো বাঞ্ছাই নাই যে ইঁহারা অতটি নিরাপদ থাকিবেন। অতএব ইহাদিগের মুখ চাহিয়া আমি একআধটু ফরাসিও কহিব।

jacques-lacan-1.jpg
জাক লাকাঁ (১৯০১–১৯৮১)

পহিলা দফায় আমি ‘গঠন’ বলিতে কী বুঝায় সেই সম্বন্ধে কিছু আগাম কথা বলিতেছি। ইহাই তো আমাদের অদ্যকার সভার বিষয়বস্তু। ধারণাটি কী তাহা লইয়া লোকে কিছু কিছু ভুল করিবেই, তালগোলও পাকাইবে, অনুমানের পর অনুমাননির্ভর ব্যবহার করিতে থাকিবে আর আমার মনে হয় বেশিদিন যাইতে না যাইতেই শব্দটি লইয়া এক প্রকার হুজুগেরও চল হইবে। আমার বেলা এই কথাটি কিন্তু খাটিবে না কেননা আমি শব্দটি এস্তেমাল করিয়া আসিতেছি অনেক দিন হইতেই–পড়াইবার ব্যবসায় আরম্ভ করিবার পর হইতেই। এই বিষয়ে আমার যাহা বলিবার তাহা জানেন অল্প লোক মাত্র। আরো বেশি লোকে জানিতেন যদি না আমি আমার বক্তৃতা সীমিত রাখিতাম মাত্র একদল বিশেষজ্ঞ শ্রোতা–মানে মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারীদের–সমক্ষে। বিষয়টি বড়ই কঠিন। বেয়াড়া রকমের কঠিন মনে হইতেছে। কারণ মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারীরা সত্য সত্যই আমি কিসের কথা বলিতেছিলাম তাহা কিছু কিছু জানেন আর মনোবিশ্লেষণবৃত্তিটি যিনিই গ্রহণ করিয়াছেন তিনিই জানেন এই জিনিসটির সহিত আঁটিয়া উঠা বিশেষ কঠিন কাজ বটে। ‘সহজ মানুষ’ (subject) বলিতে সত্যই যাহা বুঝায় তাহা লইয়া যাহাদের কারবার সেই মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারীদের কাছে ‘সহজ মানুষ’ জিনিসটা তেমন সহজ জিনিস নয়। আমি চাই না আমি যাহা বলিতেছি তাহা লইয়া কোন ভুল বোঝাবুঝি হউক, কোন ‘মেকোনাসঁস’ (méconaissance) হউক। ‘মেকোনাসঁস’ কথাটি ফরাসি। ইংরেজি ভাষায় ইহার সমান অর্থবহ আর কোন শব্দ নাই বলিয়াই আমি ফরাসি শব্দটিই ব্যবহার করিতে বাধ্য হইলাম। মেকোনাসঁসের অর্থই এমন যে ইহার শরণ লইতে না লইতেই ‘সহজ মানুষ’ আসিয়া যায়। অধিক, আমাকে ইহাও জানানো হইয়াছে যে এক মণ্ডলি ইংরেজিভাষী শ্রোতাসমক্ষে ‘সহজ মানুষ’ লইয়া কথা বলাটাও তেমন সহজ কাজ হইবে না। ‘মেকোনাসঁস’ বলিতে বুঝায় ‘ভুল বোঝা’, কিন্তু ইহাতে আমার (বা আপনার) সহজ ভাবকে ভুল বোঝা বা না বোঝা বোঝায় না। সমস্যাটা–প্রকৃত প্রস্তাবে–গঠন (structure) বলিতে আদপেই কী বোঝায় তাহার সঙ্গে জড়িত।

আমি মনোবিশ্লেষণশাস্ত্র পড়াইতে শুরু করিবার পর এক সময় আমার কয়েকজন শ্রোতা আমাকে ছাড়িয়া গিয়াছিলেন। ইহার কারণ ততদিনে অনেক দিন হইয়াছে আমি একটি সরল সত্যের পরিচয় লাভ করিয়াছি। সেই সত্য অনুসারে আমরা যদি ফ্রয়েডের যে কোন বই–বিশেষ অজ্ঞান সম্বন্ধে লেখা যে কোন বই–খুলিয়া দেখি তো শতে একশত ভাগ নিশ্চিত থাকিতে পারি যে একটা না একটা পাতা পাওয়া যাইবে যেখানে কোন না কোন শব্দ দেখিব–বই হইলেই স্বাভাবিকভাবে তাহা অজস্র শব্দে, ছাপানো শব্দে ঠাসা হইবে–যাহা নিছক শব্দ নয়। এমন শব্দ দেখিব যাহা শব্দরূপী বস্তু বৈ নয়। এই নিশ্চয়তা অবশ্য নিশ্চয়তাই, শুদ্ধ সম্ভাবনা নয়। আমরা এই সমস্ত শব্দেরই মধ্যবর্তিতায় অজ্ঞান কী করিয়া সামলাইতে হয় তাহার পথ ধরিবার চেষ্টা করি। শব্দের অর্থ কী তাহা লইয়া এই স্থলে কথা হইতেছে না, কথা হইতেছে শব্দের হাড়মাস, শব্দের স্বভাব-শরীর লইয়া। ফ্রয়েডের চিন্তাভাবনার বড়–য়া ভাগের কারবারই এই লইয়া, স্বপ্নের মধ্যে শব্দচমক (punning), কিংবা মুখ-ফস্কা কথা (lapsus), কিংবা ফরাসি ভাষায় যাহাকে বলে কালঁবু (calembour) বা চমৎকথা, কিম্বা ওমোনিমি (homonymie) বা নামসমতা তাহা লইয়া, কিংবা অধিক বলিতে কোন কোন শব্দ ভাঙ্গিয়া টুকরা টুকরা যে এক এক আলাহিদা অর্থ ধারণ করে তাহা লইয়া। শুদ্ধ শব্দই অজ্ঞানের মালমসলা–এই প্রস্তাব শতে একশত ভাগ প্রমাণসিদ্ধ হয় নাই। তবুও ইহা ভালমত টুকিয়া রাখিবার জিনিস। কারণ প্রমাণসিদ্ধ না হইলেও ইহার হইবার সম্ভাবনা বিলক্ষণ আছে (তদুপরি, যাহাই হউক, আমি কদাচ বলি নাই অজ্ঞান বলিতে মাত্র শব্দের মহফিল মাত্র বোঝায়। আমি শুদ্ধ বলিয়াছি অজ্ঞান বস্তুটা যে ‘গঠিত’ সেই সত্যে সন্দেহ নাই)। ইহার তুলনীয় কোন শব্দ ইংরেজি ভাষায় আছে বলিয়া আমার জানা নাই। কিন্তু থাকার দরকার আছে। কারণ আমরা কথা বলিতেছি ‘গঠন’ সম্বন্ধে আর অজ্ঞানের গঠন ভাষা আকারে। ইহাতে কী বুঝাইতেছে?

সত্য বলিতে ‘ভাষা আকারে’ কথাটি বাহুল্য বটে, কারণ ‘গঠিত’ বলিতে যাহা বুঝায় ‘ভাষা আকারে’ বলিতেও হুবহু তাহাই বুঝায়। গঠিত বলিতে বুঝায় আমাদের জবান, আমাদের অভিধান ইতি আদি। গঠিত অর্থ যাহা, ভাষা অর্থও অবিকল তাহাই। অধিক ইহাই সবটি নয়। ভাষা মানে কোন ভাষা? আমি নই আমার ছাত্ররা অনেক কষ্ট স্বীকার করিয়া এই সমস্যার ভিন্ন আরেকটি অর্থ খাড়া করাইবার কোশেশ করিয়াছিলেন। তাঁহারা চাহিয়াছিলেন সারাৎসার ভাষার মূলসূত্র খুঁজিয়া বাহির করিতে। তাহারা জানিতে চাহিয়াছিলেন কোন জিনিসকে ভাষা পদবাচ্য হইতে হইলে কমসে কম কোন কোন শর্ত পুরাইতে হইবে? হইতে পারে শুদ্ধ চারিটি পদাংক (signantes), চারিটি অর্থধারিণী অংকুর (elements) হইলে পর্যাপ্ত হয়। পরীক্ষাটি বেশ মজাদার। তবে ইহার গোড়ায় গলদ আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি ইহা দেওয়াল পটে লিখিয়া দেখাইব আশা রাখি। পারী শহরে আমার বক্তৃতাসভায় কয়েকজন তত্ত্বজ্ঞানীও আসিতেন। যাঁহারা আসিতেন তাঁহারা সংখ্যায় অনেক নহেন, তবে বেশ কয়েকজনই আসিতেন। ইহাঁদের কেহ কেহ পরে খুঁজিয়া বাহির করিয়াছিলেন যে সমস্যাটা ভাষার ‘ভিতরে আরেক ভাষার’ কিংবা ভাষার ‘বাহিরে অন্য ভাষার’ নয়। যথা পুরাকথা কিংবা কমাকথার সমস্যাও নয়, সমস্যা খোদ ভাষারই। সমস্যার ঠিকানা প্রস্থান করাইতে ইঁহারা যে কষ্টস্বীকার করিয়াছিলেন তাহা সত্য সত্যই অসামান্য কাজ। যেমন পুরাকথা লইয়া আলোচনার দরকার হইতেছে না কেননা পুরাকথাও যে ভাষার আকারে গঠিত তাহা একদম পরিষ্কার। আর আমি যখন ‘ভাষা আকারে’ কথাটা খাটাইলাম তখন আমি গণিতের ভাষা, কি সংকেতের ভাষা, চলচ্চিত্রভাষা ইত্যাদি অর্থে বিশেষ বিশেষ ভাষা বুঝাইতে খাটাই নাই। ভাষা ভাষাই আর ভাষা মাত্রেই এক জাতের: যথা ইংরেজি বা ফরাসি প্রভৃতি মূর্তিমান ভাষা। এইসব ভাষায় মনুষ্য কথা বলে। এই পর্যন্ত পৌঁছিয়া একটি কথা বলিতে হইবে: ‘ভাষাপারের ভাষা’ (metalanguage) বলিয়া কোন ভাষা নাই। কারণ ভাষাপারের ভাষা নামে অভিহিত সমস্ত ভাষার কথাই বলিতে হয় ভাষারই মধ্যবর্তিতায়। পটের গায়ে খালি খালি অক্ষর লিখিয়া কেহ গণিত শিখাইতে পারে না। দশজনে বুঝিতে পারিবে এমন কোন না কোন সামান্য ভাষায় কথা কহিবার দরকার করে, সদাসর্বদাই করে।

অজ্ঞান ভাষার আকারে গঠিত। ইহা নিছক এই কারণে নয় যে অজ্ঞানের মালমসলা তৈয়ার হইয়াছে আমরা ফরাসি জবানে যাহাকে বলি লঁগাজিয়ে (langagier) তাহা অর্থাৎ ভাষার মশলা দিয়া। অজ্ঞান আমাদের সমক্ষে যে সমস্যা তুলিতেছে তাহাই ভাষার স্বভাব সম্বন্ধে সবার চাইতে বেশি অভিমানিনী সমস্যার প্রান্ত ছুঁইয়া যায়: এই সমস্যারই নাম ‘সহজ মানুষ’। কোন বাক্যের বক্তা কিম্বা ব্যক্তিপরিচয়দাতা প্রতিনাম (personal pronoun) আর ‘সহজ মানুষ’ এক জিনিস, অমনি অমনি এই কথা বলা চলিবে না। ফরাসি জবানে ‘বক্তব্য’ (ennoncé) বলিতে হুবহু বাক্যই বুঝায়, তবে এমন বক্তব্যও ঢের রহিয়াছে যেখানে বক্তব্যটি ঠিক কে বকিতেছে তাহার কোন হদিশ নাই। যদি বলি ‘ইট রেইনস’ (বৃষ্টি হইতেছে) [it rains] তো যে সহজ মানুষ কথাটি বকিলেন তিনি এই বাক্যে শরিক হইলেন না। যাহাই হউক, এইখানে কোথাও না কোথাও একটা গোল বাঁধিয়াছে। ‘সহজ মানুষ’ আর ভাষাব্যবসায়ীরা যাহাকে বলেন ‘আড়কাঠি’ (shifter) এই দুইকে সব সময় এক ভাবা ঠিক হইবে না।

অজ্ঞানের স্বভাব হইতে যে সমস্যা দেখা দেয় তাহা–সংক্ষেপ করিয়া বলিলে–এই দাঁড়াইতেছে: কিছু না কিছু কখনো না কখনো ভাবিতেছে। ফ্রয়েড আমাদিগের উদ্দেশে কহিয়াছিলেন অজ্ঞান সম্বন্ধে সকল কথার বড় কথা এই: অজ্ঞান ভাবনাই বটে। অধিক জ্ঞানের এলাকায় যাহার প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হইয়াছে সেই ভাবনাই। এই নিষেধ একেক জায়গায় একেক রকম চেহারায় করা হইয়া থাকে, অর্থের কথা উঠাইলে বলিতে হইবে ইহার অর্থও নানান কিসিমের হইতে পারে। প্রধান অর্থটি সত্য সত্যই ‘বাধা’ বটে। এই বাধা হয় ডিঙ্গাইয়া যাইতে হইবে নচেৎ ফুঁড়িয়া পার হইতে হইবে। না হইলে হইবে না। কথাটির ভার আছে, কেননা আমি যদি এই বাধার কথা জোর দিয়া না বলি তো আমাদের জীবন একান্তই মসৃণ মনে হইয়া যাইত। আমরা ফরাসি ভাষায় ‘সা ভুজারঁজ’ (ça vous arrange–[বা আপনার ব্যবস্থা হইয়াছে]–জাতীয় কথা বলিয়া থাকি, কেননা নিচের তলায় বা মাটির নিচে কিছু না কিছু যদি ভাবিয়াই থাকে তো জীবনটা সহজ হইয়া যায়। ভাবনা জিনিসটা সদাসর্বদাই হাজির রহিয়াছে আর প্রাণধারী জীব স্বভাবের চাপে যাহা ভাবিতেছে তাহার সম্বন্ধে একটু হুঁশ হইল, জীবন চলিয়া যাইবে এক রকম। ঘটনা যদি তাহাই হইত তো ভাবনার ভারটা পড়িত প্রাণের উপরই, আর তাহাই হইত স্বাভাবিক, যেমন সাড়াই (instinct) হইত ভাবনা। ভাবনা যদি স্বভাবের ফসল হইত তো অজ্ঞান লইয়া কোনই গোল বাঁধিত না। দুঃখের মধ্যে, অজ্ঞানের সহিত ‘সাড়া’ কিম্বা ‘আদিজ্ঞান’ কিংবা মাটির নিচে বাধা ভাবনার কোনই সম্বন্ধ নাই। ইহা শব্দযোগে ভাবনা অথবা আমাদের জাগরিছুট বা চেতনরাজ্যহারা ভাবনা সম্বন্ধীয় ভাবনা বটে। জাগরি কথাটির ভার আছে। আমাদের চেতন অবস্থা লইয়া কোন দানব যদি খেলা করিত তবে তাহার সহিত এই অজ্ঞানের তুলনা চলিত। এই অপর মানুষটি সঠিক কে তাহা খুঁজিয়া লওয়াই এক্ষণে মূল সমস্যা। আর এই মানুষ অপর কেহ নহেন, ভাষা হইতে ভাবনা শুরু করিলে আমরা যে সহজ মানুষে আসিয়া পৌঁছিতাম এই মানুষ হুবহু সেই মানুষই।

আপনাদের সমক্ষে বক্তৃতা দিবার উদ্দেশ্য লইয়া এই যৎসামান্য কথা যখন সাজাইতেছিলাম তখন বেশ ভালোমতন ভোর হইয়াছে। জানালার ফাঁক গলাইয়া বল্টিমোর দেখিতেছি। প্রহরটি বড়ই মজার। তখনও ঠিক রোদ উঠিয়া সারে নাই। কিন্তু সময় যে বহিয়া যাইতেছে তাহা একটা নিয়নবাতির বিজ্ঞাপন এক ঠাঁই জ্বলিয়া আর ঠাঁই নিবিয়া আমাকে মিনিটে মিনিটে খবর দিতেছিল। রোজ যে রকম হয় তখনও রাস্তায় রাস্তায় সেই রকমই গাড়িঘোড়ার ভিড় ভারি হইয়াছে। দূরে গাছগাছালি কিছু কিছু চোখে পড়িতেছে। মনে মনে বলিয়া উঠিলাম এই কয়টি গাছের কথা ছাড়িয়া দিলে বলিতে হইবে আমি যাহা কিছু দেখিতে পাইতেছি সব কিছুই আমার ভাবনা যাহা ভাবিতেছে তাহার ফসল। এইখানে লোকজন ঠিক কী কাজে ব্যস্ত তাহা শতে একশত ভাগ পরিষ্কার বুঝা যাইতেছে না। তাহা যাহাই হউক, সহজ মানুষের পরিচয় দিবে বলিয়া লোকে যে দাজায়িন (Dasein) বা তথাবস্তু বলিয়া একটা কথা তুলিয়া থাকে তাহাই হাজির হইয়াছিল এই ক্ষণিকের অতিথি বা পলায়নপর সাক্ষীর মধ্যে। অজ্ঞান কী বস্তু সংক্ষেপে তাহার সবচেয়ে সুন্দর ছবি এই সুবেহ সাদেকের বল্টিমোর শহর।

‘সহজ মানুষ’ কোনখানে থাকেন? যে ‘অ-বশ’ বস্তু হারাইয়া গিয়াছে তাহার রূপেই সহজ মানুষকে পাওয়া যায়, এই সত্য আমল করিতেই হইবে। আরও খুটাইয়া বলিলে বলিতে হইবে ‘সহজ মানুষ’ দাঁড়াইয়া থাকেন এই হারানো অবশ বস্তুর ঘাড়ে ভর দিয়া। অনেক অনেক ক্ষেত্রে দেখিবেন ইহা এমন বিদকুটে বস্তু যাহার কথা আমরা কস্মিনকালেও ভাবি নাই। কোন কোন জায়গায় দেখা যায় ইহা ‘করা হইয়াছে এমন কোন ক্রিয়া’ মাত্র–দুনিয়ার তাবৎ মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারী এবং অনেক অনেক বিশ্লেষিত মানুষও ইহা আচ্ছামত ভাল করিয়াই জানেন। এই কারণেই অনেক মনোবিশ্লেষণবৃত্তিজীবী মনে করেন আমাদের পক্ষে সাধারণ মনোবিজ্ঞানে ফিরিয়া যাওয়াই শ্রেয় হইবে। নিউ ইয়র্ক মনোবিশ্লেষণ সমিতির সভাপতি আমাদিগকে বলিয়াছেন ইহাই কর্তব্য। কিন্তু আমি তো বস্তু বদলাইয়া ফেলিতে পারি না। আমি মনোবিশ্লেষণবৃত্তি করি। তবে কেহ যদি কোন মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক সমীপে হাজির হইতে চাহেন তাহা তাহার নিজ পছন্দের বিষয়। মনোবিজ্ঞানের কথাই যখন উঠিল তখন বলিতেছি, গঠনের সমস্যা কথাটা একলা আমিই ব্যবহার করিতেছি না। অনেক অনেক দিন গুজরান হইয়াছে চিন্তা ও গবেষণা, মায় আবিষ্কার-উদ্ভাবনা যাহাদের বৃত্তি আর যাহারা মন কী জিনিস এই প্রশ্ন লইয়া ব্যাপৃত তাহারাও বছরের পর বছর ধরিয়া বলিয়া আসিতেছেন যে গঠন জিনিসটার সবার চাহিতে ভারি এবং স্বভাবজাত গুণ হইতেছে ‘একভাব’ (unity)। ইহার কোন প্রমাণের ডাক পড়ে না। জীবের অখিলে (real) এই গুণ এমনিতে হাজির ধরিয়া দেখিলে স্বতন্ত্র প্রমাণ দিবার দরকারই পড়ে না। জীব যখন ষোলকলায় পূর্র্ণ তখন সে ‘একভাবুক’ এবং একভাবুক আকারেই তাহার কর্মকাণ্ড চলে। এই ‘একভাব’ ধারণাটি যখন মনের বেলায় খাটাইবার কথা উঠে তখনই সমস্যা গোলযোগে ভরিয়া যায়। কারণ মন আপন স্বরূপে ‘নিখিল’ নহে। কিন্তু আপনারা তো জানেনই বলা হইয়াছিল মন এক না হইলেও ‘মতলবগত একভাব’ আছে। এই ধ্যানধারণার ভিত্তিতেই তো যাহাকে বলা হয় কাণ্ডকারখানার আন্দোলন (phenomenological movement) তাহা সম্ভব হইয়াছিল।

একই কথা পদার্থবিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞানে চলিত তথাকথিত ‘অবয়বপন্থা’ (gestalt) মতবাদ সম্বন্ধেও খাটিত। আর খাটিত ‘সহজ স্বরূপ’ (bonne forme) নামক ধারণার ক্ষেত্রেও। এই ধারণার দৌলতে উদাহরণস্বরূপ এক ফোটা পানির সঙ্গে আরো জটিল ভাবনাচিন্তার সংযোগ ঘটাইয়া দেওয়া। অধিক, বড় বড় মনোবিজ্ঞানীর দল আর এমনকি মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারীরা পর্যন্ত ‘নিখিল ব্যক্তিত্ব’ প্রভৃতি ধারণায় ভরপুর। যাহাই হউক, ‘একতাসাধক একভাব’ সবসময়ই সামনে চলিয়া আসে। আমি কখনোই জিনিসটা কী বুঝিতে পারি নাই। কারণ আমি যদি মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারী হইয়া থাকি আমি তো মনুষ্যসন্তানও বটি আর মনুষ্যসন্তান হিসাবে আমি অভিজ্ঞতা হইতে শিখিয়াছি যে আমার আপন মানব জীবনের প্রধান গুণ একটাই আর তাহা হইল এই জীবন এমন এক জিনিস যাহাকে আমরা ফরাসি ভাষায় বলি বহিয়া যায় (á la dérive)। আমি তো নিশ্চিত এইখানে আপনারা যাঁহারা আছেন তাঁহাদের অভিজ্ঞতাও ইহাই। আর কেহ যদি ইহার সহিত একমত না হইয়া থাকেন আশা করি তিনি হাত উঠাইবেন। জীবন নদীর নাহান বহিয়া যায়, কখনো বা এই তীর স্পর্শ করিল কখনো বা করিল ওই তীর। কখনো এইখানটায় একটুখানি দাঁড়াইল কখনো ওইখানটায়, কিন্তু কেন করিল বা দাঁড়াইল তাহার মাথামুণ্ডুও বুঝিল না–কী ঘটিল তাহার মাথামুণ্ডু কিছু কেহই বুঝিল না। বিশ্লেষণের মূলসূত্র ইহাই। মানব জীবনের ‘একতাসাধক একভাব’ আমার নিকট চিরকালই কলঙ্কজনক মিছাকথা মাত্র মনে হইয়াছে।

এই সকল ব্যাপার কী জিনিস বুঝিয়া উঠিবার প্রয়োজন মিটাইতে হইলে আমরা আরো এক নীতির সাহায্য লইতে পারি। ঘটনা কী তাহা কদাচ অজ্ঞানের দিক হইতে আমরা যে বিচার করিয়া দেখিতে চাহি না তাহারও কারণ আছে। কারণ অজ্ঞান যাহা বলে তাহা শব্দের মধ্যবর্তিতায় ফুটাইয়াই বলিয়া থাকে। আর ইহাদের মূলনীতি কী তাহার সন্ধান হয়তো আমরা লইতে পারি।

আমার প্রস্তাব, আসুন তো ‘একভাব’ ধারণাটি আমরা অন্য আলোক ফেলিয়া দেখি। ‘একতাসাধক একভাব’ নয়, দেখি এক, দুই, তিন প্রভৃতি গণনাসম্ভব ‘একভাব’। পনের বছর ধরিয়া পড়াইবার পর আমি আমার ছাত্রছাত্রীদের বেশির বেশি পাঁচ পর্যন্ত গুণিয়া দেখিতে শিখাইয়াছি। এই পর্যন্ত গোনা বেশ কষ্টের কাজ (চার পর্যন্ত গোনা আর একটু সোজা)। আর তাঁহারাও ঐ পর্যন্তই শিখিয়াছেন। তবে আজ রাত্রে আমাকে আপনাদের অনুমতি লইয়া দুইয়ের মধ্যেই আটক থাকিতে হইবে। এক্ষণে আমরা পূর্ণসংখ্যার কথা কহিতেছি আর পূর্ণসংখ্যার কথা কহাটা বড় সহজ বিষয় নয়। আমার বিশ্বাস এই সভায় সমবেতদের অনেকেরই ইহা জানা জিনিস। দৃষ্টান্ত দিয়া বলিতে, শুদ্ধ দরকার কয়েকপ্রস্ত সেট (set) এবং এক প্রস্ত ’একের বিম্ব এক’ (one to one correspondence) গণিবার নীতি। যেমন ধরা যাউক, এই ঘরে যতটা পিঁড়ি আছে ঠিক ততজন মানুষ বসিয়া আছেন কথাটা সত্য। কিন্তু ‘পূর্ণসংখ্যা’ কিংবা যাহাকে বলি ‘স্বাভাবিক সংখ্যা’ তাহা হইতে হইলে পূর্বসংখ্যাযোগে গঠিত কোন সংগ্রহের ডাক পড়িবেই। বলা নিষ্প্রয়োজন ইহা একাংশে হইলেও ‘স্বাভাবিক’ (natural) তবে শুদ্ধ এই অর্থেই যে ইহা কী কারণে আছে তাহা আমাদের বুদ্ধির অগম্য। গণনা জিনিসটা ‘অভিজ্ঞতানির্ভর সত্য’ নয় আর শুদ্ধ অভিজ্ঞতাজাত তথ্য হইতে গণনাকর্মের সৃষ্টি হইয়াছে ইহা প্রমাণ করাও অসম্ভব। হিয়ুম (Hume) সেই চেষ্টা করিয়াছিলেন কিন্তু ফ্রেগে (Frege) নিখুঁত পদ্ধতিতে প্রমাণ করিয়াছেন এই চেষ্টা অপরিপক্কতারই প্রমাণস্বরূপ। পূর্ণসংখ্যা মাত্রই একেকটা স্বনির্ভর একক। সমস্যার আসল ভিত্তি এই সত্যেই পাওয়া যাইবে। আমরা যদি এই সংখ্যাকেই একক ধরিয়া লই তো বেশ মজাই হয়। ধরা যাউক পুরুষ আর নারী–পিরিতির সহিত যোগ হইল ‘একভাব’! কিন্তু কিছুক্ষণ যাইতেই সব শেষ। এই দুইজনের পর আর কেহ রহিল না। হয়তো একটা শিশু আসিল, কিন্তু ততক্ষণে আমরা অন্য স্তরে পৌঁছিয়া গেলাম। আর তিনের জন্ম দেওয়া সে তো এক স্বতন্ত্র অধ্যায়। আমরা যখন সংখ্যা বিষয়ে গণিতবিদের প্রস্তাবাদি পড়িয়া দেখিবার চেষ্টা করি তখন দেখিতে পাই সকল প্রস্তাবের গোড়ায় এক সূত্র: [নতুন সংখ্যা পাইতে হইলে] যে কোন পূর্ণসংখ্যার সহিত ১ সংখ্যাটি যোগ করিতে হইবে, ‘n+১’ বা [n+1]। সংখ্যার জন্ম কী উপায়ে হয় তাহার চাবি এই ‘যোগ এক’ কথার মধ্যেই আছে। আর আমি প্রস্তাব করিতেছি এই ‘যোগ করিয়া একভাব’ করিবার পদ্ধতি যাহার গুণে দুই তৈরি হয় তাহা বাদ দিয়া আমরা দুই সংখ্যাটির সংখ্যাস্বরূপ অখিল (real) জন্ম কীভাবে হয় দেখিব।

এই দুইকে যাহার এখনও জন্মই হয় নাই এমন পহিলা পূর্ণসংখ্যা হইতে হইবে খোদ দুইয়ের আবির্ভাবের আগেভাগেই। ইহা সম্ভব হইতেছে কারণ আমরা দেখিয়াছি পহিলা ‘এক’ সংখ্যার আবির্ভাব মানিয়া লইবার ওয়াস্তে এক্ষণে ‘দুই’ আসিয়া বসিয়াছে। ‘এক’ সংখ্যার জায়গায় ‘দুই’ বসাইলেন আর ফলস্বরূপ দেখিলেন ‘দুই’ সংখ্যার জায়গায় ‘তিন’ আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। এই স্থলে আমরা যাহা দেখিলাম তাহার নাম আমি রাখিয়াছি দাগ (mark)। তাহা হইলে আমরা দেখিব কিছু জিনিস থাকিল যাহাতে যাহাতে দাগ দেওয়া হইয়াছে আর কিছু জিনিস থাকিল যাহাতে দাগ দেওয়া হয় নাই। পহিলা যে দাগ দেওয়া হইল তাহা হইতে আমরা ঘটনার জন্ম দেখিলাম। হুবহু এই পথেই ফ্রেগে সংখ্যার জন্মকাহিনী ব্যাখ্যা করিয়াছেন। যে শ্রেণীতে কোন অংকুর (elements) নাই তাহাকেই পহিলা শ্রেণী কহে। এইভাবে শূন্যের জায়গায় ‘এক’ আসিল আর তাহার পর একের জায়গাটি কী করিয়া দোসরা জায়গা বনিয়া গেল তাহা সহজেই বুঝা যাইতেছে। এই ক্রমে ‘দুই’, ‘তিন’ ও অন্যান্য সংখ্যার জায়গা বদল হইল। আমাদের হিসাব অনুসারে এই দুইয়ের সমস্যাই সহজ মানুষ সমস্যার রূপ বটে। আর দুইয়ের জন্ম হইয়াছে একের সহিত এক যোগে, একের অভাব পূর্ণ করিয়া নয়, বরং একের জন্ম দিবার খাতিরে একের পুনরাবৃত্তি ঘটাইয়া। ইহা সত্য হইলে আমরা মনোবিশ্লেষণের অভিজ্ঞতা হইতে যে সত্য জানিতে পারিয়াছি তাহারই সমক্ষে হাজির হইলাম। ‘অজ্ঞান মানুষ’ এমনই চিজ যাহা নিজের আবর্তন ঘটাইবার দিকে ঝুঁকিয়াই থাকে, আর শুদ্ধ ‘এক’ আবর্তন হইলেই হইল, উহার জন্ম হইবে। যাহাই হউক একদফা আবর্তন দেখিতে হইলে আমাদের দেখা দরকার পহিলা ঘটনার পুনরাবর্তন ঘটাইতে দোসরা ঘটনার যে যে গুণ না থাকিলেই নহে তাহা কী কী। আমরা যদি তাড়াহুড়া করিয়া জবাব দিই তো বলিব দরকার দুই ঘটনার এক রকম হওয়া। যদি তাহাই হইত তবে দুইয়ের নিয়মটা হইত যমজেরই নিয়ম। যদি তাহাই সত্য হয় তো ত্রয়ীর কিংবা চতুরঙ্গের নিয়মই বা হইবে না কেন? আমাদের যুগে আমরা ছেলেমেয়েদের শিখাইতাম, ধরা যাউক মাইকের সহিত অভিধান যোগ করা চলিবে না। তবে এই শিক্ষাটা একেবারেই আজগুবি শিক্ষা। কারণ মানুষ যদি মাইকের সহিত অভিধান কিম্বা লুইস ক্যারলের ভাষ্য মোতাবেক বলিলে রাজার লগে বাধাকপি যোগ করিতে না পারিবে তো যোগ করিবার কিছুই তো থাকিবে না। যাহার দৌলতে এক বস্তুর সহিত অন্য বস্তুর প্রভেদটা হিসাবে না লইয়া যোগ সম্ভব হয় সেই অভিন্নতার বাস বস্তুতে নাই, আছে ঐ দাগে (বা মার্কায়)। এই দাগের কল্যাণেই প্রভেদটা যেন ঘষিয়া উঠাইয়া ফেলা হইয়াছে এমত অবস্থা হয়। পুনরাবর্তন হইবার সময় সহজ মানুষের, অজ্ঞান সহজ মানুষের ঘটে যাহা ঘটে ইহা তাহারই চাবিকাঠি। কারণ আমরা জানি ‘সহজ মানুষ’ নিদারুণ অর্থময় কিছু একটার পুনরাবর্তন করে। উদাহরণ দিয়া বলিতে, এই যে বস্তুকে আমরা কখনও কখনও বলি বিভীষিকা (‘ট্রমা’) কিম্বা ‘চরম পুলক’ সেই অদৃশ্য বস্তুর মধ্যে সহজ মানুষ হাজির থাকে। কী ঘটে সেই সংকটে? যদি ‘মাল’টা এই আকারে জগতে বিরাজ করে, এই একত্ববোধক লক্ষণটাই যদি হয় শেষ কথা, তাহা হইলে অভিন্নতার লক্ষণ এই জায়গায় বিলক্ষণ আছে। এক্ষণে আমার মধ্যে যে ‘মাল’টা খুঁজিয়া বেড়ান হইতেছে তাহা পাইতে হইলে পহিলা দাগটা ঘষিয়া উঠাইয়া ফেলাইতে হইবে। কেননা এই দাগটা আজ তো আজকেই ছিল ঘষামাজার ফলস্বরূপ। সকল ভেদ উঠাইয়া দেওয়ার নামই তো ছিল এইটা আর এই লক্ষণ না হইত তো পহিলা ‘মাল’ই হইয়া যাইত লাপাত্তা। আকারে যাহা অভিন্ন তাহার পুনরাবর্তনকেই যদি পুনরাবর্তনের সারকথা বলা হয় তো তেমন পুনরাবর্তন অসম্ভব, পুনরাবর্তনের রীতিহীনতার রহস্য এইখানেই। যাহাই হউক মানুষ এই পুনরাবর্তনেরই ফলস্বরূপ। কারণ ইহার ফলে সহজ মানুষের প্রথম ভিত্তিটাই হাওয়া হইয়া যাইতে, রদ হইতে বাধ্য হয়। ইহাই সেই কারণ যাহার বলে সহজ মানুষ মাত্রই–অবস্থানের গুণে–বিভক্ত ভাবস্বরূপ হাজির থাকে। আমি ক্ষান্তিহীন বলিব এই লক্ষণ অভিন্ন­তারই লক্ষণ। তবে ইহার ফলে যাহা নিশ্চিত হইতেছে তাহা শুদ্ধ অভিন্নতারই ভিন্নতা। ইহা হইতেছে অভিন্নতা কি ভিন্নতার ফল আকারে নয়, হইতেছে বরং ‘অভিন্নতারই ভিন্নতার’ মধ্যবর্তিতায়। ইহা বুঝিতে পারা সহজ। যথা ফরাসি ভাষায় আমরা বলিয়া থাকি ‘আমি আপনাদের নম্বর মারিলাম’ (Je vous numérotte)। আমি আপনাদের সবাইকে একটি একটি করিয়া নম্বর বাঁটিয়া দিলাম, আর ইহার ফলে একটা জিনিস নিশ্চিত হওয়া গেল আপনারা সকলেই আলাদা তবে শুদ্ধ নম্বরের বিচারে। অন্য কোন দিকবিচারে নয়।

যাহা ‘একই সঙ্গে’ এক কিংবা ‘দুখণ্ডে’ বটে এমন কোন কিছুর মধ্যে এই লক্ষণটা আছে তাহা প্রমাণ করিবার নিমিত্ত আমরা সহজ বুদ্ধির কাছে কোন প্রস্তাব তুলিয়া ধরিতে পারি? নিচের রেখাচিত্রাটির কথাই ভাবা যাক, সুপরিচিত একটি ছবির আদলে আমি ইহার নাম রাখিয়াছি উল্টা আট: [বঙ্গভাষায় উল্টা চার–অনু.]

8.jpg

দেখিতেই পাইতেছেন এইখানের রেখাটিকে একই সঙ্গে এক রেখা বা দুই রেখা উভয়ই গণ্য করা যাইতে পারে। যে আদ্যস্থলে, যে গিরায় সহজ মানুষ গঠিত হয় ইহাকে সেই অকুস্থলেরই অপরিহার্য লিপি বলিয়া ধরা যাইতে পারে। আমরা পহিলা পহিলা যতখানি ভাবিতে পারি ইহার হাত তাহা হইতে অনেক দূর বেশি যাইতে পারে, কারণ আমরা এই ধরণের লিপি খোদাই করার মতন উপরিতলের সন্ধানে বাহির হইয়া পড়িতে পারি। আমরা হয়তো বুঝিতে পারিব নিখিল অর্থে ব্যবহার করা পুরানা প্রতীক–মণ্ডল (the sphere)–দিয়া এখানে কাজ চলিবে না। কোন বৃষ (torus), কোন বোতল (Klein bottle), আড়াআড়ি কাটা উপরিতল (cross-cut surface) এইভাবে কাটিয়া দেখান যায়। এই বৈচিত্র্যের মূল্য আছে। কেননা ইহাতে মনে রোগ কিভাবে গঠিত হয় তাহার ব্যাখ্যা মিলিবে। এই গোড়াকার কাটাদাগের সাহায্যে যদি ‘সহজ মানুষ’ আকার পায়, তবে একই উপায়ে প্রমাণ করা যায় কোন বৃষ কাটিলে ‘স্নায়ুরোগগ্রস্ত সহজ মানুষে’র (neurotic subject) আর ‘আড়াআড়ি কাটা উপরিতল’ কাটিলে অন্য কোন মনোব্যাধির সহিত মিলিয়া যাইবে। আজ রাত্রে আপনাদের সমক্ষে আমি ইহার ব্যাখ্যা দিতেছি না, তবে এই দুরূহ বক্তৃতার সমাপ্তি টানিতে হইলে আমাকে নিচের সারসংক্ষেপটি পেশ করিতেই হইবে।

পূর্ণসংখ্যাধারার গোড়ার দিকটাই শুদ্ধ আমি হিসাবে লইলাম, কারণ ইহা ভাষা ও অখিলের মাঝখানকার বিন্দু বটে। ‘এক’ এবং ‘এক যোগ’ ব্যাখ্যাচ্ছলে আমি যে জাতের লক্ষণ কাজে লাগাইলাম ভাষাও সেই একই লক্ষণ যোগেই গঠিত হইয়াছে। পার্থক্যের মধ্যে ভাষার এই লক্ষণ আর একভাবাপন্ন লক্ষণ (unitary trait) ঠিক এক বস্তু নহে, কারণ আমাদের ভাষায় ভেদভিত্তিক অনেক লক্ষণের একত্র সমাবেশ আছে। কথাটা অন্যভাবে বলি তো বলা যায় ভাষা গড়া হইয়াছে এক দঙ্গল পদ–যেমন বা, তা, পা, ইতি আদি, ইতি আদি লইয়া। দঙ্গলটির সীমা আছে। সহজ মানুষের চলার পথ কাটিতে যাহা লাগে পদমাত্রই তাহা যোগাইতে পারে। আর পদে পদে সম্পর্কের বেলায় যাহা সামান্য সত্য পূর্ণসংখ্যার চলার পথ তাহারই বিশেষ রূপ মাত্র, এই কথা সত্য হওয়ার সম্ভাবনাই সমুদয় বটে। আমি যাহাকে পরম বলিতেছি তাহা গঠিত হইয়াছে এই পদাবলী দিয়াই। ইহা তাহার সংজ্ঞা বটে। ভাষার কারণে যে ভেদটা সম্ভব হইয়াছে তাহা এই: পদ মাত্রই বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিজের কাছ হইতে নিজে অভিন্ন নয় (পূর্ণ সংখ্যার একভাবাপন্ন লক্ষণ ইহার বিপরীত)। ইহার বিশেষ কারণও এই যে অনেক পদের একত্র সমাবেশই ভাষা। আর এই সমাবেশে কোন ‘পদ’ (signifier) নিজ ‘পদার্থের’ (signified) ‘পদ’ হইতে পারে আবার নাও হইতে পারে। এই সুপরিচিত সত্যটিই রাসেলের (Russel) ধাঁধার মূলসূত্র। যে সকল অংকুর (elements) নিজ নিজ দঙ্গলের অংশ নয় তাহাদিগকে শরিক করিয়া নতুন কোন দঙ্গল গঠন করিলে আমরা যে ধাঁধায় পড়িব তাহার পরিণতিতে আমরা জানি ‘কথার সহিত কথার বিরোধ’ (contradiction) তৈয়ার হয়। ইহার অর্থ, সহজ কথায়, শুদ্ধ বাক্যের নিখিলে এমন কিছু থাকতে পারিবে না যাহাতে সকল কিছু রহিয়াছে। আর যে ফাঁকের দৌলতে ‘সহজ মানুষ’ গঠিত হয় এইখানে আরো একবার তাহার দেখা মিলিতেছে। ‘সহজ মানুষ’ মানেই হইতেছে অখিলের মধ্যে খিল ঢুকাইয়া দেওয়া (introduction of a loss in reality)। অথচ ইহা হইতেই পারে না। কেননা সংজ্ঞার গুণেই অখিল বলিতে বুঝায় ‘যাহাতে খিল নাই’ (যাহা যতদূর সম্ভব ততদূরই ভরাট বটে)। খিলের ধারণাটি সম্ভব হইয়াছে সেই লক্ষণের গুণে যাহা আমাদের সৃষ্ট অক্ষরের দৌলতে এক প্রস্ত অভাবের নির্ধারিত স্থান। এই যেমন a1, a2, a3 প্রভৃতি বৈ নয়। আর ‘স্থান’ (space) মানে তো ফাঁকই। ‘সহজ মানুষ’ যখন অভাবের জায়গাটি দখল করেন, তখন শব্দের ভিতর খিল ঢুকিয়া যায়। আর ইহা সহজ মানুষের সংজ্ঞাও বটে।

xex-1.jpg

তবে ইহা যদি লিখিবার আবশ্যক করে তো ইহার সংজ্ঞা বাধিতে হইবে ভাষার মণ্ডলজোড়া বৃত্তের আওতায়। এই বৃত্তের নাম আমি রাখিয়াছি পরকীয়া (otherness)। এ জগতে যাহা কিছু ভাষাপদবাচ্য তাহার সবকিছুই এই পরকীয়ারই আলো আর সেই কারণেই সহজ মানুষ সবসময়ই এই পদাবলী বাদিনীর তলায় তলায় পলায়নপর চির অপসৃয়মান বস্তুস্বরূপ। কারণ পদের সংজ্ঞাই এমন: যাহা সহজ মানুষের হইয়া সহজ মানুষের সঙ্গে যায় না, যায় অন্য এক পদের সঙ্গে তাহাকেই পদ কহে। ফল এই দাঁড়ায় যে সহজ মানুষ উধাও হইয়া যায়। দুই প্রস্ত একভাবাপন্ন লক্ষণের ক্ষেত্রেও হুবহু একই ঘটনা ঘটে। আর এই সময় যাহাকে বলা হইতেছে অর্থ বা পদার্থ তাহার আবির্ভাব ঘটে দুই নম্বর পদটির আবডালে এবং ইহার পর এই ক্রম ধরিয়া আর আর পদ ও পদার্থের আবির্ভাব চলিতে থাকে।

হারাইয়া যাইতে যাইতেও ‘সহজ মানুষ’ কল্পনার ফানুস বলিয়া পরিচিত এই অত্যাশ্চর্য বস্তুর সাক্ষাত কোন না কোন উপায়ে লিপ্ত থাকিয়া আরও একবার নিজেকে খোঁজার জন্য আকুল হয়। ‘বিষয় বাসনা’ (desire) ইহারই অপর নাম। এই সাধনা জিগাইয়া রাখে সেই বস্তু যাহার নাম আমি রাখিয়াছি হারান সম্ভার (lost object)। ইহার নাম বিসমিল্লায়ই লইয়াছিলাম–ইহার নাম লইতেও ভয়ে কল্পনার হাত না সাধাইয়া যায়। আর ইহার জন্ম ও লালন-পালন এই স্থলেই ঘটে। আমার শব্দ তালিকায় ইহারই নাম হইয়াছে ছোট ছাদের a সম্ভার (object a)। ইহার কথা মনোবিশ্লেষণবৃত্তিধারী মাত্রই ভালো করিয়া জানিবেন। কেন না মনোবিশ্লেষণবিদ্যা আদ্যোপান্ত খাড়াও হইয়াছে এই নিদারুণ সম্ভারের কাঁধে ভর করিয়াই। আমাদের এই নিষেধাজ্ঞাধীন সহজ মানুষের সহিত এই a সম্ভারের সম্পর্ক-কাঠামো সবসময়ই ফানুসের তলায় থাকে আর এই ফানুস থাকে বাসনার তলায়। কেন না বাসনা আর কিছু নয়। শুদ্ধ যাহার নাম রাখিয়াছি সমস্ত অর্থের অনন্তনাম (metonymie, metonymy) ইহা তাহারই অপর নাম।

এই সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় মনোবিশ্লেষণবৃত্তির অখিলে গঠন বলিয়া কোন জিনিস বিরাজ করিতেছে তাহা আপনাদিগকে দেখাইবার চেষ্টা করিয়াছি। তবে ‘সাকার’ ও ‘আকার’ প্রভৃতি দিক সম্পর্কে আমি কিছুই বলি নাই। মনের জীবন যে জীবনের বা অভিজ্ঞতার জগত দিয়া পার হয় তাহার ভিতর আকারের বন্ধন কীভাবে ঢুকিয়া পড়ে তাহা বুঝিয়া লওয়ার কোন বিকল্প নাই। এই কথা না বলিলেও চলিত। কিন্তু আজ রাত্রে আমার এই ব্যাখ্যা দেওয়ার উপায় নাই। তবে পুরানা বলিয়া জ্ঞাত এই ‘সহজ মানুষ’ সম্বন্ধে সবার তুলনায় কম জানা অথচ সবার তুলনায় বেশি নিশ্চিত একটি সত্যকথা ভাবিয়া দেখিবেন। জীবিত প্রাণীর জীবনপর্বের ইহাই অর্থপূর্ণ দিক। এই অন্তহীন জিনিসটা জীবন ও মরণের সীমানার মধ্যে কিছু একটার স্বাদ পাইতে সক্ষম। বিষাদ ও হর্ষের মধ্যখানকার পুরা বর্ণালিটা জুড়িয়া থাকিতেও ইহা সক্ষম। ইহাকে আমরা ফরাসি জবানে বলিয়া থাকি ‘সহজানন্দ’ (sujet de jouissance)।

আজ বিকালবেলা এই জায়গায় আসিবার পথে ছোট্ট নিয়ন বাতির বিজ্ঞাপনে দেখিলাম লেখা রহিয়াছে, ‘এনজয় কোকো-কোলা’ [অর্থাৎ কোকা-কোলার মজা মার]। ইহা দেখিয়া মনে পড়িল, যতদূর জানি, ফরাসি ‘জুয়িসঁস’ (পুলক/আনন্দ) কিংবা ল্যাটিন ভাষার ‘ফ্রূয়র’ (fruor) শব্দে পদার্থের যে বিশাল ভার বহন করা হয় তাহার যথার্থ প্রকাশক্ষম পদ ইংরেজি ভাষায় পাওয়া যাইতেছে না। জুয়ির [Jouir] শব্দের অর্থ আমি অভিধান খুলিয়া দেখিয়াছি। দেখিয়াছি ইহার অর্থ দেওয়া হইয়াছে ‘টু পজেস, টু ইয়ুজ’ [অর্থাৎ দখলে লওয়ার, ভোগ-ব্যবহার করার] কিন্তু ইহার অর্থ আদৌ তাহা নয়। প্রাণধারী জীব যদি আদৌ ভাবিবার মতন কোন ভাব হইয়া থাকে, তো সব কিছু ছাড়াইয়া তাহার পরিচয় হইবে আনন্দের নন্দন [বা আনন্দের সহজ মানুষ]। তবে, দুঃখের মধ্যে, বেশিক্ষণ না যাইতেই দেখা যাইবে মনোবিশ্লেষণের যে বিধির নাম হইয়াছে আনন্দসূত্র (যাহা প্রকৃত প্রস্তাবে শুদ্ধ নিরানন্দসূত্র বৈ নয়) যাবত আনন্দের পথ আগলাইয়া দাঁড়াইয়াছে।

যদি এমত হয় যে মজা মারিতে মারিতে আমি একটু মাত্রা ছাড়াইয়া গেলাম, অমনি কথা শুরু হইয়া যায়, ফলে আমি আমার আনন্দ খানিক কমাইয়া আনি। জীবদেহ মনে হয় এমনভাবেই বানান হইয়াছে যাহা অতি মাত্রার আনন্দ এড়াইয়া যায়। আমাদের দেহের গঠন যদি এহেন মজার জিনিস না হইত তো আমরা সকলেই হয়তো ঝিনুকের মতন নিরব হইয়া থাকিতাম, এই গঠনই আমাদের আনন্দপক্ষের আমল ভাঙ্গিতে বাধ্য করে কিংবা আমাদিগকে শুদ্ধ এই আমলের উপর জোর করিবার আর ভাঙ্গিয়া ফেলিবার খোয়াব দেখাইয়া থাকে। পরমের সঙ্গে সম্বন্ধসূত্রে আবদ্ধ পদের মাপকাঠি বরাবর সহজের গঠন হইতে ইহার বিস্তার ঘটে আর এই গঠনের গোড়া পোতা থাকে ভাষায়। শুদ্ধ ইহার কারণেই বাসনার পূর্ণ বৈচিত্র্য পাখা মেলিবার অবকাশ পায়। ফলে আমরা এই জাতীয় নিষিদ্ধ আনন্দের (জুয়িসঁস) কাছাকাছি যাইবার, যাচাই করিবার সুযোগ পাই। ইহাই আমাদের জীবনের একমাত্র অর্থ যাহার একলা মূল্য আছে।

আলোচনা

আঙ্গুস ফ্লেচার 
ফ্রয়েড সত্য সত্য ছিলেন খুবই সরল মানুষ। তবে মানুষের নানান সমস্যার বিচিত্র সমাধান তিনি খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন। মানুষের জটিলতা ও সমস্যার ব্যাখ্যা প্রদানের খাতিরে তিনি কখনো কখনো মিথ ব্যবহার করিয়াছেন। যথা: নার্সিসাস মিথ। উনি দেখিলেন কিছু কিছু মনুষ্য আছেন যাহারা আয়নায় আপন মুখ দেখেন আর নিজেরা নিজেদের সঙ্গে প্রেম করেন। ব্যাপারটা এমনই সহজ। তিনি শব্দের উপরিতলে উপরিতলে ভাসিবার চেষ্টা করেন নাই। আপনি যাহা করিতেছেন তাহা মাকড়সার মতন: আপনি ভারি মিহি যে জালটা বানাইতেছেন তাহার সঙ্গে মানুষের কোন সত্য সম্পর্ক নাই। যেমন আপনি ‘মজা’র কথা বলিলেন। ফরাসি ভাষায় ‘জুয়ির’ (jouir) কথাটির এক অর্থ ‘চরম পুলক’–ইহা বলিবেন না কেন? আমার মনে হয় ইহাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে যাহা কিছু শুনিলাম সবই এহেন কায়াহীন কথা…। সমস্যাটা এখানে মনোবিশ্লেষণের নয়। মনোবিশ্লেষণের মূল্য এইখানে যে ইহা মনোবিশ্লেষণের গতি বিষয়ে প্রস্তাবনাস্বরূপ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হইয়াছে পরে, বিশেষ বলিতে বিলহেলম রাইখের কাজ। এতসব অতিপদার্থবিদ্যার (metaphysics) কোনই দরকার নাই। আপনার চিত্রলেখাটি (diagram) খুবই মজার হইয়াছে, তবে ইহার সহিত আমাদের কাজকর্মের, খাওয়া দাওয়া, রতি সহবাস ইতি আদির কোনই সংযোগ তো নাই।

হ্যারি উলফ
আমি জিজ্ঞাসা করিতে চাই এই গোড়ালি পাটিগণিত (fundamental arithmetic) আর এই স্থানবিদ্যাও (topology) এক জাতীয় মিথ কি না, নাকি মানস-জীবন ব্যাখ্যার খাতিরে এক প্রকার তুলনার প্রস্তাব মাত্র?

জাক লাকাঁ
কিসের সহিত তুলনা? ‘S’ বলিতে এমন কিছু বোঝায় যাহা হুবহু এই S আকারে লেখা চলে। আমি বলিতেছি এই ‘S’ যাহা দিয়া সহজ মানুষ বুঝান হইতেছে তাহা সাধিত ক্ষতি বুঝাইবার উপযোগী এক জাতীয় হাতিয়ার, কিন্তু ‘সহজ মানুষ’ হিসাবে আমি (এবং আমি নিজেও) যাহা হারাইয়াছি তাহা। অন্য কথায় বলিতে, একদিকে আছে এমন কিছু যাহার খচিত অর্থ আছে আর অন্যদিকে আছে আমার ব্যবহৃত কথার ধারা যাহা দিয়া আমি আপনি যেখানে আছেন সেখানে পোঁছাইতে চাইতেছি। এই দুইয়ের মধ্যে একটা ফাঁক (বা খিল) আছে। আপনাকে এখানে আরেকজন সহজ মানুষরূপে ধরি নাই, ধরিয়াছি আমার কথা শুনিয়া বুঝিতে পারিবেন এহেন মানুষ হিসাবে। উপমানটা কোনখানে? এই ক্ষতিটা হয় হইয়াছে কিম্বা হয় নাই। যদি হইয়া থাকে তবে তাহা বুঝাইতে হইবে একপ্রস্ত প্রতীক দিয়া। যাহাই হউক, প্রতীকায়ন না ঘটাইবা পর্যন্ত এই ক্ষতিটার অস্তিত্বই নাই। ইহা তো তুলনা নয়। প্রকৃত প্রস্তাবে ইহা অখিল জগতের কোন না কোন ভাগে, এই ধরনের বৃষে আছে। এই বৃষ আসলেই আছে আর স্নায়ুরোগীর গঠন হুবহু এইটাই। ইহা উপমান নহে। এমনকি ইহা কায়াহীনও নহে, কারণ কায়াহীন মানে তো অখিল জগত হইতে কিছ না কিছু বিয়োগ করাও বুঝাইতেছে। আমার মনে হয় ইহাই খোদ অখিল।

নর্মান হলান্ড
আমি লাকাঁ সাহেবের পক্ষ লইয়া বলিতে চাই। আমার মনে হয় ওঁ চাইছেন খুব ভালো একটা কিছু করিতে। আমি এই আলোচনা সভার আগেভাগেই তাঁহার প্রবন্ধ পড়িলাম। ইহার আগে আমি ওঁর কোন লেখা পড়ি নাই। মনে হইতেছে তিনি ফ্রয়েডের লেখা ‘বিজ্ঞানভিত্তিক মনোবিজ্ঞান প্রকল্প’ (Project for a Scientific Psychology) বরাবর ফিরিয়া গিয়াছেন। মনোবিজ্ঞান বিষয়ে ইহাই ফ্রয়েডের পহিলা লেখা। ইহাও খুব কায়াহীন ছিল এবং আপনি এখানে আপনি যাহা লিখিয়াছেন তাহার মতনই ছিল। অবশ্য আপনি বীজগণিতের সাহায্য লইতেছেন আর উনি নিউরনের আশ্রয় লইয়াছিলেন, এই রচনার প্রভাব ‘খাবনামা’, ‘ফ্লিস সমীপে চিঠিপত্র’সহ তাঁদের প্রথম বয়সের সমস্ত লেখায় সর্বত্র পরিব্যাপ্ত, যদিও সেই প্রভাব অনেক সময় কেবল উহ্য রহিয়াছে।

এন্টনি ওয়াইল্ডেন
আমি কিছু কথা যোগ করিতে চাহিয়াতেছি। আপনার বক্তৃতার গোড়ায় আপনি অস্বীকার বা অস্বীকৃতির [মেকোনাসঁসের] ব্যাখ্যা করিয়াছিলেন। আর আমরা ইহার এমন একপ্রস্ত চরম দৃষ্টান্ত হইতে শুরু করিয়াছি যে ইহা হইতে কী করিয়া বাহির হইব বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না। আপনি কিন্তু শুরু করিয়াছেন আপনার চিন্তার একেবারে মাথা হইতে (আপনার চিন্তার সবচেয়ে কঠিন জায়গা হইতে) আর ইহার গোড়াটা কী রকম ছিল তাহা খুঁজিয়া বাহির করা আমাদের পক্ষে সাংঘাতিক কঠিন। এই চিন্তা খুবই ধনশালী এবং খুবই গভীরে ইহার মূল। আমি আপনার লেখা কষ্ট করিয়া তর্জমা করিয়া থাকি, সেই অভিজ্ঞতা হইতে বলিতে পারি ফ্রয়েডের সহিত আপনি একফোঁটাও বেঈমানি করেন নাই। আজ রাত্রে এইখানে আমরা অনেক আবোল তাবোল বকিব সন্দেহ নাই–তবে এহেন বকাবকির আগে আমাদের উচিত আপনার লেখা ভালো করিয়া পড়িয়া দেখা। ইহার অন্যথা না করাই উচিত। তাহারা আগে আপনার লেখা পড়িয়া দেখুন, তারপর ফ্রয়েড পড়ুন সমবেত ভদ্রমহোদয়গণ সমীপে এই মিনতি করি।

রিচার্ড শেচনার
শূন্যতা সম্বন্ধে আপনার চিন্তার সহিত হুসার্ল (Husserl) এবং সার্ত্রের (Sartre) লেখার সম্পর্ক কী?

লাঁকা
আপনি যে শব্দটি ব্যবহার করিয়াছেন, সেই শূন্যতা সম্বন্ধে আমার মনে হয় না আমি বিশেষ কিছু বলিতে পারিব। হুসার্ল সম্পর্কেও পারিব না, সার্ত্র সম্পর্কেও না। সত্য সত্যই, আমার মনে হয় না আমি শূন্যতা সম্বন্ধে বিশেষ কিছু বলিয়াছি। গড়াইয়া যাওয়া এবং ধরিতে কঠিন হওয়া, কখনো কোথায়ও না থাকা (আমি যখন ঐখানে খুঁজি তখন উহা এইখানে; আর আমি যখন এইখানে) মানে শূন্যতা নয়। আমার বক্তৃতাসভার (Seminar) তালিকায় এই বৎসর আমি যে বস্তুর নাম রাখিয়াছি ‘উদ্ভট কল্পনার যুক্তি’ সেই বিষয়যোগের ঘোষণা দিব। মনে হইতেছে আমার চেষ্টার বেশির ভাগই নিয়োজিত হইবে নানান ধরনের খিল, নানান ধরনের খোয়া, নানান শূন্যতার সংজ্ঞা ঠিক করার পিছনে। এইগুলি একেকটা একেক জাতের, কোনই মিল নাই একটার সহিত অন্যটার। অনুপস্থিতির কথাই ধরুন না কেন? রাণীর অনুপস্থিতি, এই ধরণের অংকুরের সহিত কিছু একটা যোগ করিতে হয় কিন্তু রাণীর অনুপস্থিতি অস্বীকার করিতে হইলে…। আমার ধারণা নিছক শূন্যতা ধারণাটির অস্পষ্টতা এই প্রসঙ্গে কোন কাজে আসিবে না। আমার নিজেরই উধাও হইবার আগে আমাকে যাহা করিতে হইবে, সব কিছুতেই আমার দেরি হইয়া যায়। তবে করিবার মতন কাজটি আগাইয়া নেওয়াও কম কঠিনও নয়। এক ধাপে এক একটা করিয়া আগাইবার দরকার আছে। এখন আমি এই নানান ধরনের ‘অভাব’ (lack) লইয়া আলোচনা করিব।

[কট সাহেব ও ডা: লাঁকা দেওয়ালপটযোগে মোবিয়ুস ফিতার (Möbius strip) নানান বৈশিষ্ট্য লইয়া আলোচনা করিলেন]

ইয়ান কট
একটা মজার জিনিস আছে এইখানে। হয়তো ইহা আপতিক। এই সকল ব্রত (motifs) অন্যবস্তুবাদী (surrealist) ছবিতে দেখিতে পাই। ইহাদের মধ্যে কোন ধরনের সম্পর্ক আছে কি?

লাকাঁ
অন্যবস্তুবাদী ছবির সহিত মনে হয় কমসে কম আমার একটা আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে।

পুলে
এই অবশের খোঁয়ারি যাহার কারণে সহজের আবির্ভাব ঘটে আপনি কি ইহার সহিত সার্ত্রের চিন্তার অন্তর্গত নাস্তি [le neant] জিনিসটায় কোন প্রকার যোগ আছে মনে করেন? প্রুস্তের রচনার গোড়ার দিকে দেখা যায় ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগিয়া উঠিল, তাহার অবস্থার সহিত ইহার তুলনা দেওয়া কি যাইতে পারে? আমাদের মনে পড়ে স্বপ্ন দেখিতে লোকটি জাগিয়া উঠিল আর দেখিল কি যেন হারাইয়াছে। কি যেন নাই। বড় কথা সে নিজে নাই। ইহার সহিত কোন তুলনা কি চলে?

লাকাঁ
আমার ধারণা প্রুস্ত বহুবারই অজ্ঞানের কয়েকরকম অভিজ্ঞতার কাছাকাছি পোঁছেছিলেন। প্রুস্তের লেখায় এমন অনেক পৃষ্ঠাব্যাপী বা কাছাকাছি বিস্তৃত অংশ পাওয়া যায় যাহা সহজেই আলাদা (découper) করা যাইবে। আমার মনে হয় আপনার ধারণাই সঠিক। প্রুস্ত প্রায় কাছাকাছি চলে যান, তবে তিনি প্রস্তাব আকারে ইহার বিস্তার না ঘটাইয়া নিজের ব্যবসায়–মানে সাহিত্যে–ফিরিয়া আসেন। উদাহরণ লওয়া যাইতে পারে কুমারী ভঁতুইয়ের, বয়ানকার যে দৃষ্টিতে তাহাকে তাহার বন্ধু ও তাহার বাবার ছবি হাতে দেখেছেন তাহার কথা বলিতেছি। আমার মনে হয় না আর কোন সাহিত্যশিল্পী কখনো এহেন ছবি আঁকিয়াছেন। হইতে পারে ইহা হইয়াছে তাহার খোদ কর্মপরিকল্পনার সময় পুনরুদ্ধারের এই আলিশান কর্মকাণ্ডের স্বভাব অনুযায়ী। এই প্রকল্পই তাহাকে পথ দেখাইয়াছে, এমনকি জ্ঞান যতদূর পর্যন্ত যাইবার সাধ্য রাখে তাহার বাহিরেও দেখাইয়াছে।

সিগমুন্ড কখ (Koch)
আপনার বক্তৃতার একটা ধরন নিয়তই আমার দৃষ্টি এড়াইয়াছে। আপনি ইংরেজিতেই বলিয়াছেন, ইহা ছাড়া আমি ইহা হইবার অন্য কোন কারণ দেখিতেছি না। আপনি পূর্ণসংখ্যা ২ লইয়া অনেক ভারি কথা কহিয়াছেন, বিশেষ পূর্ণসংখ্যা ২ য়ের জন্ম লইয়া। আমার যতটুকু স্মরণ হয় আপনার বিশ্লেষণ হইতেছে এই যে আমরা এক নির্দেশক দাগ দিয়া শুরু করিলে দাগাংকিত খাড়াইয়া যায়, ফলে আমরা ২ এর মুখোমুখি হই বলিয়া ধরিয়া লওয়া যায়। দাগাংকিত আর দাগানংকিতর সহিত তুলনা দিবার জোড়া কোথায় পাইব? দাগাংকিত মানে কি জ্ঞানতন্ত্র আর দাগানংকিত মানে কি অজ্ঞানতন্ত্র? দাগাংকিতই কি সজ্ঞান মানুষ আর দাগানংকিতই কি অজ্ঞান মানুষ?

লাকাঁ
ফ্রেগের লেখা হইতে আমি শুদ্ধ হইতে ধার করিয়াছি যে শূন্য সংখ্যাটি যে শ্রেণীর বৈশিষ্ট্যবাচক সংখ্যা সেই শ্রেণীই হইতেছে ১ সংখ্যার ভিত্তি। মনোবিশ্লেষণসংশ্লিষ্ট প্রসঙ্গক্রমে আমি ২ সংখ্যাটি বাছিয়া লইয়াছি একটি কারণে, তাহা হইতেছে এই–‘এরোস’(eros) বা রতির রূপরেখা আঁকিতে গিয়া ফ্রয়েড ২ সংখ্যার উপর বেশ গুরুভার আরোপ করিয়াছেন। জীবনের পরিসরে যে শক্তি একতাসাধন করিয়া থাকে তাহার নামই রতিশক্তি, আর ইহাতে ভিত্তি করিয়া অনেকানেক মনোবিশ্লেষক যৌনাঙ্গের পরিপকৃত বলিয়া একটা কথা বাহির করিয়াছেন। ইহার ভিত্তিতে তাহারা দাবি করিয়াছেন যেমন ‘নিখুঁত বিবাহ’ বলিয়া কোন জিনিস সম্ভব। লক্ষ্য হিসাবে বিষয়টি রহস্যাবৃত আর সাংঘাতিক একগুঁয়েমির সহিত ইহার পক্ষে প্রচারণা চালানো হইয়া থাকে। যে শ্রোতামণ্ডলির সহিত ফ্রেগে উত্থাপিত সমস্যাটির পরিচয় ঘটে নাই শুদ্ধ তাহাদের কথা মাথায় লইয়া আমি, পহিলা দফায়, এই ২ সংখ্যাটি বাছিয়া লইয়াছি। ১ সংখ্যার মোকাবেলায় ০ সংখ্যা। এই পহিলা পরিচয় পর্বে, যে কর্তব্য সম্পাদন করিতে পারিতে ২ সংখ্যার মোকাবেলায় ১ সংখ্যাটিও সেই কর্তব্য করিতে পারিবে।
আপনার দুই নম্বর সওয়াল প্রসঙ্গে বলিতেছি।

lacan2.jpg
জাক লাকাঁ

যাহারা ফ্রয়েডের লেখার সহিত কোন প্রকার খুঁত ব্যতিরেকেই পরিচিত রহিয়াছেন তাঁহারা জানেন এমন অনেক খুঁটিনাটি বিষয় আমি স্বভাবগত নিয়মেই উহ্য করিতে বাধ্য হইয়াছিলাম। দাবাইয়া রাখা প্রসঙ্গে এই কথাটি একদমই ভুলিয়া থাকা চলিতে না যে ফ্রয়েড বলিয়াছেন দাবাইয়া রাখার রহস্য যাহার উপর দাঁড়াইয়া থাকে তাহাকে জার্মান ভাষায় বলে ‘উয়রফেরড্র্যাংগুঙ্গ’ (urverdrängung) বা আদ্যদমন। আমি আজ আমার প্রস্তাবের পুরাটাই এখানে সূত্রমাফিক পেশ করিতে পারি নাই, ইহা স্বভাবগত কারণেই ঘটিয়াছে। সূত্রবদ্ধ করা ফ্রয়েড ঘরানার ভাষায় যাহাকে ঘনায়ন (condensation) বলে তাহা বুঝাইতে হইলে রূপকের ওপর গোড়াতেই নির্ভর করিতে হয়, ইহা জানা না থাকিলে কিন্তু একদমই চলিতেছে না। [ডা. লাকাঁ কালো বোর্ডে ‘অক্ষরের নাছোড়বান্দামি’ (L’instance de la lettre) বিষয়ের সার দেখাইয়া তাঁহার মন্তব্য শেষ করিলেন।]

গোল্ডমান
সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে আমি যে উপায়ে কাজকারবার চালাইতেছি তাহার কারণে একটা জিনিস আমার দৃষ্টিতে লাগে। ইহা আর কিছুই নয়, গুরুত্বপূর্র্ণ, ইতিহাসভিত্তিক, দশজনীন ঘটনাধারা আর গুরত্বপূর্ণ রচনাকর্ম লইয়া বিচার-বিশ্লেষণ করিতে আমার বিশ্লেষণকর্মে আমি কদাচ অজ্ঞান ধারণাটির প্রয়োজন অনুভব করি না। তথাপি আমি এই ভেদটা দেখাইয়া বলিয়াছিলাম: অবশ্য আমার প্রয়োজন হয় জ্ঞানহীন ধারণার। অজ্ঞান অংকুর ইতি আদি তো আছেই; কী কী উপায়যোগে ব্যক্তি নিজের হিসাব পেশ করিতেছে আমি তো তাহা বুঝিতে পারি না–আর, আমি তো বলিয়াছি, ইহা মনোবিশ্লেষণের এলাকা যাহার সহিত আমি মিশিতে চাহি না। কিন্তু দুই ধরনের ঘটনা আছে যাহা, সব ধরনের সাক্ষ্যপ্রমাণ অনুসারেই, সামাজিক বলিয়া মনে হয় আর এই সব ঘটনা বুঝিতে হইলে আমাকে অজ্ঞান নয় জ্ঞানহীনের সাহায্য লইতে হয় আমার মনে হইতেছে আপনি বলিয়াছেন অজ্ঞান দশজনের ভাষা ইংরেজি ফরাসি প্রভৃতি যে সকল ভাষায় আমরা কহিয়া থাকি সেই রকম ভাষা।

লাকাঁ
আমি বলিয়াছি ভাষার, ইংরেজি বা ফরাসি ইতি আদির মতন।

গোল্ডমান
কিন্তু এই ভাষা হইতে স্বতন্ত্র? তাহা হইলে তো আমি হাসিব: আমার আর কোন প্রশ্ন রহিল না। সজ্ঞান আমরা যে ভাষায় কথা কহিয়া থাকি এই জিনিস তাহার সহিত যুক্ত।

লাকাঁ
জ্বি, হা।

গোল্ডমান
সঠিক আছে। আমি যদি আপনার কথা ঠিকমতো বুঝিয়া থাকি, দোসরা যে জিনিসটা আমার মনে দাগ কাটিয়াছে। সজ্ঞান মানে যে স্তরে অজ্ঞান ধারণাটির সাহায্য ছাড়াই আমার চলিয়া যায় সেই স্তরে কয়েকটা। প্রক্রিয়ার সহিত তুলনা দিবার মতন কিছু কিছু জিনিস পাওয়া যায়। পাসকাল, হেগেল, মার্ক্স ও সার্ত্র হইতে শুরু করিয়া বলিতে এমন কিছু জিনিস আমরা জানি যাহা অজ্ঞানের তোয়াক্কা করে না: প্রভেদের সঙ্গে এই ধ্রুবগুলি যোগ করিয়া মানুষ কী তাহার সংজ্ঞা দেওয়া চলে। পাসকাল বলিয়াছেন: ‘মানুষকে সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়াইয়া গিয়া কেহ’ (dépasse l’ homme) কিছু করে না। অজ্ঞানের দোহাই না দিয়াও বলা চলে, এই ফাঁকটুকুর সাহায্য ছাড়া ইতিহাস কিংবা গতিবিদ্যার সংজ্ঞা দেওয়া যায় না। সজ্ঞান মনের স্তরে আমি যে দোসরা ঘটনার দেখা পাই: সজ্ঞান মন যতখানি কর্মকাণ্ডের সহিত সংযুক্ত ততখানি বলিতে–কী জিনিস তাহা মনে তাহার অঙ্গীভূত ধ্রুব মানে অসাড় দ্রব্যের সাহায্য ছাড়া এবং এই ধ্রুবসকল সহিত প্রভেদের সংযোগ না ঘটাইয়া বলা যাইবে না। পূর্বনির্ধারিত ঘটনা একাধিক হইলে তৎক্ষণাৎই কর্মকাণ্ড শুরু করা যায় না। ধ্রুববস্তুর অঙ্গসংস্থানের সহিত কর্মের ঘনিষ্ট সংযোগ। ইহার কারণেই প্রভেদের মধ্যে বিশেষ বিন্যাস সম্ভব হয়। এই বিশেষ মানুষ জন্ম লইবার আগে হইতেই ভাষা জন্ম লইয়াই বসিয়া আছে–এই ভাষা (ইংরেজি, ফরাসি ইতি আদি) কি শুদ্ধ এর অতিশয়পনা সমস্যার সহিতই যুক্ত? এই সম্বল, ভাষা আর এই অসাড় দ্রব্য ছাড়া কোন সহজ মানুষ হইতে পারে না। আমার প্রশ্ন হইতেছে: এই সম্বলবাদ আর তাহার নানান হেরফের কি মাত্র এই অতিশয়পনা, এই অজ্ঞান আর বাসনারই আত্মীয়, নাকি ইহার সহিত কাজ নামে পরিচিত কোন কিছুর বাহিরে দুনিয়ার রূপান্তর এবং সমাজ জীবনেরও আত্মীয়তা আছে? আর আপনি যদি এইগুলির সহিতে আত্মীয়তার কথাও মানিয়া লয়েন তো একটি সমস্যা মাথাচাড়া দিয়া উঠে: যুক্তিটা কোথায়, বুঝিবার উপায়টা কই? মানুষ মানে কেবল সবটাকে এক করিবার আশা, আমি ইহা প্রত্যয় করি না। আমি সেইদিনও বলিয়াছি আমরা এখনও একটা মিশাল অবস্থার মুখামুখি হইতেছি। তবে মিশালটি বুঝিতে হইলে ইহার অংশ অংশ আলাদা করিতে হইবে, না করিলে চলিবে না।

লাকাঁ
আর আপনি কি মনে করেন এই স্রোতে আঁকড়াইয়া ধরিবার মতন ‘নোঙ্গর ঘাট’ যাহা পাওয়া যায় তাহার মধ্যে এই কাজও পড়িতেছে?

গোল্ডমান
আমি মনে করি সমস্ত হিসাব নিকাশ শেষেও বলিতে হইবে মনুষ্যজাতি কিছু ভারি কাজের মতো কাজ করিয়াছে।

লাকাঁ
আমার মনে হয় না ইতিহাসের বই খুব একটা নিয়মবাঁধা বই। এই বিখ্যাত ইতিহাস, যাহাতে কোন ঘটনা অতীত হইয়া গেলে সকলেই সবকিছু এত ভাল করিয়া পায়, তাহা এমন কোন বাগদেবী নহে যাহার ঘরে আমার আস্থা রাখিতে পারি। এমন এক জমানা ছিল যখন–এই যেমন বসুয়ে যে যুগে লিখিতেছেন সেই যুগে ক্লিও খুব বড় গুরুত্বের দাবিদার লোক ছিলেন। হয়তো আবার আগের মার্কসের যুগে। তবে ইতিহাসের ঘরে আমি শুদ্ধ বিস্ময় পাইতে চাই। এই মত বিশ্বাসের ব্যাখ্যা করিবার চেষ্টায় আমি সফল হই নাই, যদিও আমি প্রচণ্ড চেষ্টা করিয়াছি। আপনি যে সকল স্থানাংক দিয়া ব্যাখ্যা করিতেছেন আমি সেইগুলির সাহায্যে নয়, অন্য স্থানাংকের সাহায্যে ব্যাখ্যা করি। বিশেষ বলিতে, কাজের সমস্যাটিকে এই স্থলে আমি সম্মুখের সারিতে বসাইব না।

শার্ল মোরাজে
আজিকার আলোচনায় সংখ্যার জন্ম কী করিয়া হয় তাহার ব্যবহার দেখিয়া আমি প্রীত হইয়াছি। গোল্ডমান সাহেবের উত্তর দিতে গিয়া বলিব, আমি যখন ইতিহাস পড়ি তখন আমি ভরসা রাখি এই একই সংখ্যার জন্মের উপর, মনে করি ইহারাই সবচেয়ে নিরেট অখিল জগত। ইহার মুখামুখি অবস্থায় দাঁড়াইয়া আমি একটা প্রশ্ন করিতে চাহিতেছি, উদ্দেশ্য আমরা যাহা যাহা সত্য বলিয়া অনুমান করিয়া লইতেছি তাহা আসলেই এক না ভিন্ন তাহা পরখ করিয়া দেখা। আমার মনে হয় বক্তৃতার শুরুতে আপনি কহিয়াছেন যে আপনার কাছে সজ্ঞান মনের গঠন ভাষার মতন, আবার শেষদিকে আপনি কহিলেন, অজ্ঞান মন ভাষার আকারে গঠিত। আপনার এই দ্বিতীয় প্রস্তাবখানি যদি সঠিক হইয়া থাকে, তবে আমার বক্তব্যও তাহাই।

লাকাঁ
অজ্ঞান মনই ভাষার আকারে গঠিত–এই বক্তব্যের হেরফের আমি কখনই করি নাই।

রিচার্ড ম্যাকসি
এই অধিবেশন বাবদ যে পরিমাণ ভুলবোঝাবুঝি (méconnaissances) আমাদের ভাগ্যে বরাদ্দ ছিল, হইতে পারে তাহার সবটুকুই আমরা ইহার ভিতর খরচ করিয়া ফেলিয়াছি। তাহার পরও আপনি ফ্রেগে আর রাসেলের যে দোহাই দিলেন তাহার প্রভাব আপনার ভাববাদে (ontology) (বা নিদেনপক্ষে আপনার ভাবজগতে) কেমন পড়িয়াছে তাহা লইয়া আমার এখনও একটু ঘোর থাকিয়া গেল। উদাহরণ দিতেছি, আপনি গণিত হইতে যে উদাহরণ দিলেন তাহার একটা অর্থ হইতে পারে আপনি অখিল জগতবাদ প্রস্তাবের চরম ভাষ্যে বিশ্বাস করেন। আমার প্রশ্ন এইখানেই। সম্পূর্ণ বর্ণনা অসম্ভব হইলে অখিল জগৎ ধ্বসিয়া পড়িবে এই যুক্তি আমাকে বিচলিত করে না। কারণ গোয়ড়েল (Gödel) নিজেই বলিয়াছেন তিনি অখিল জগৎবাদে আস্থা রাখেন। তিনি মনে করেন এই উপপাদ্যের অর্থ আর কিছুই নয়, শুদ্ধ এই যে সম্বলবাদের প্রকাশক্ষমতার গোড়াতেই একটা সীমা আছে। আমি মনে করি যুক্তিওয়ালা প্রস্তাবটাই বরং গুরুতর প্রশ্নের সম্মুখীন হইয়াছে। ‘প্রিন্সিপিয়া’ গ্রন্থের লেখকগণ যদি কয়েকটি সেটের বিশেষ সেট বলিয়া স্বাভাবিক সংখ্যার সংখ্যা প্রচার করিয়া থাকেন তবে–প্রসারতত্ত্বে যে সকল ভাষাপারের ভাষাসংশ্লিষ্ট (metalanguage) গণ্ডগোল বাধে তাহার কথা ছাড়িয়াও বলা যায়–আমরা পাল্টা বলিতে পারি তাহাদের সিদ্ধান্তটা মনগড়া, কারণ সেটতত্ত্বে–মানে যে সেটতত্ত্ব প্রকারতত্ত্বের ভিতে দাঁড়াইয়া নাই–তাহাতে উদাহরণস্বরূপ যে সেটের একমাত্র সংখ্যা খিল সেট, ইতি আদি ক্রমে তাহাই ‘এক’ সংখ্যার সংজ্ঞা বলা যাইতে পারে যাহার বলে স্বাভাবিক সংখ্যার প্রচলিত ধর্ম অক্ষুণœ থাকে। সুতরাং আমরা সওয়াল করিতে পারি কোন সেটটিতে ‘এক’ সংখ্যা হয়? কয়েক মাস আগে পল বেনাসেরাফ (Paul Benacerraf) এই ধারার যুক্তিকে আরো টানিয়া নিয়াছিলেন। তিনি দাবি করিয়াছিলেন স্বাভাবিক সংখ্যার অনপনেয় ধর্ম আর কিছুই নয়, শুদ্ধ এই যে এই সংখ্যা পুনরাবৃত্তিভিত্তিক প্রগমন বটে। সুতরাং এই নিয়মতন্ত্রে না হয়, ঐ নিয়মতন্ত্র যাহাতে এই প্রগমন সম্ভব তাহাতেই কাজ চলিবে। এই নিয়মতন্ত্রের ধর্ম মিলিতেছে বিশেষ সংখ্যার দাগে নহে, বরং আত্মীয়পরম্পরাভক্ত, নিষ্কায়া গঠনে (অঙ্গীভূত অসাড় দ্রব্যে নয়)। অখিল জগতবাদী (realist) প্রস্তাবমাত্রই যাহা দাবি করেন সেই প্রস্তাব অর্থাৎ সংখ্যা ও ভাব বা অবশ দ্রব্য মাত্রই সমান (আর এক জাতীয় ধারণাপন্থী বা নামকাওয়াস্তে গঠনতন্ত্রের পক্ষে যুক্তি দেখায়) কথাটি এই হামলার মুখে পড়িতেছে।

লাকাঁ
এই মন্তব্য লইয়া কথা বাড়াইব না। শুদ্ধ বলিব এই: ধারণা এবং এমনকি সেটও বস্তু নহে। সংখ্যাতন্ত্রের (number system) গঠন নাই এহেন কথা আমি কদাচ বলি নাই।

তর্জমা: সেপ্টেম্বর ২০০৭–জানুয়ারি ২০০৮

বিডিনিউজ, আর্টস, ১২ জানুয়ারি ২০০৮

Abdul Karim’s discoveries – Origins of modernity in Bengali literature

‘As a man in a dream who fails to lay hands upon another whom he is pursuing—the one cannot escape nor the other overtake—even so neither could Achilles come up with Hector, nor Hector break away from Achilles.’

—Homer, The Iliad.

‘It is thus to an empty identity that they cling, those who take it to be something true, insisting that identity is not difference but that the two are different. They do not see that in saying, ‘Identity is different from difference,’ they have thereby already said that identity is something different.’

—Hegel, The Science of Logic.

‘On June 23, 1757,’ Sir Jadunath Sarkar, a former Vice-Chancellor of Calcutta University, once wrote, ‘the middle ages of India ended and her modern age began.’ That this indomitable truth should have been touted in 1948 and that also in a volume called ‘History of Bengal, Muslim Period: 1200-1757,’ perhaps adds a dimple to the grimace of history. ‘When Clive struck at the Nawab,’ our wise old historian noted, ‘Mughal civilization had become a spent bullet.’ ‘Today the historian, looking backward over the two centuries that have passed since then,’ as for his part claimed this bigot of a chronicler, ‘knows that it was the beginning, slow and unperceived, of a glorious dawn, the like of which the history of the world has not seen elsewhere.’

The literature produced since the conquest in 1757 has often been described as ‘modern’ literature. By ‘modern’ is obviously meant ‘European’. To wit: ‘The literary history of Bengal in the 19th century is really the history of the influence of European ideas on Bengali thought,’ wrote Sushil Kumar De, once of Dhaka University. ‘Taking 1800 A.D. to be roughly the date of commencement of the modern era of Bengali Literature,’ this literary historian also claims: ‘The problem of English education now decisively settled, the triumph of the West was fully proclaimed; and the literature as well as the society, in trying to adjust itself to this new order of things, began to take a distinctly new tone and colour.’ This view of our literature, which is still accorded ‘almost an axiomatic status,’ indicates at best ‘nothing but a failure of memory.’ I wish only to raise a point or may be two here.

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ (১৮৭১-১৯৫৩)

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ (১৮৭১-১৯৫৩)

I

Even a cursory review of early Bengali literature, for instance of the works rediscovered by Abdul Karim (1871?-1953) at the turn of the twentieth century, makes this inflexible ‘historical’ argument quite vulnerable. This is perhaps the burden of my slight endeavour here. Who is then this Abdul Karim, anyway? When Haraprasad Shastri (1853-1931) introduces him as ‘a Muhammadan gentleman in Chittagong’ no one is surprised, for in putting it that way Shastri is only furrowing a well-worn tradition, if in reverse. Muhamamedan gentlemen are not supposed to be reading and writing Bengali, or procure Bengali manuscripts, let alone produce them. And that too in far away Chittagong, a land forsaken by Indian gods!

‘The search for manuscripts of Bengali Literature,’ as a visibly moved Haraprasad Shastri put it in Calcutta Review in 1917, ‘is still going on unabated, the newspapers and magazines teem with descriptions of old manuscripts of old works brought to light and two names stand prominent in this department of literary activity: one is a Muhammadan gentlemen in Chittagong, Moulvi Abdul Karim, who has collected and described several thousands of Bengali manuscripts of works written both by Hindus and Muhammadans and his descriptions are always full and accurate and possess much literary and historical value.’ ‘The other gentleman,’ Haraprasad adds, ‘is Babu Siva Ratan Mitra who has made a large collection of manuscripts and described them but has not yet been able to publish much.’

On Abdul Karim, or rather on Chittagong, his site of being, Haraprasad Shastri throws up also a highly excitable comment: ‘Chittagong being an out-of-the–way place free from the vicissitudes of the richer and more favoured districts of Bengal have preserved many valuable relics of the past and among these the manuscripts of the works of Bengali Literature, and it is a matter of congratulation that these have fallen into the hands of such an earnest and enthusiastic worker like our friend Abdul Karim.’

Haraprasad Shastri, being his well-cultivated self, upheld his own cause only in the wake of the other two explorers: ‘While these earnest men were enthusiastically working in the plains with Bengali manuscripts, Bengali works, their history, their influence, their literary merit and so on, a Bengali Brahman, who for obvious reasons should be nameless here, was working patiently, quietly with the dusty heaps of palmleaf manuscripts in the Royal and private collections in the depth of the Himalayas, in the city of Kathmandu and in its neighborhood.’ It is in course of this not a slight endeavor that he discovered manuscripts of those now famous oldest extant Bengali texts, better known as Caryapadas in the annals of our literature.

Let’s get it then from the good old Brahman’s own mouth:  ‘But the delight of this Brahman knew no bound when he laid his hands, one fine morning, on a palmleaf manuscript in the early 12th century Bengali script, of a collection of Bengali songs with Sanskrit commentary attached. About the date of the script he had no doubt. It was Bengali on the face of it, much older Bengali handwriting than that given in Professor Bendall’s photo etching at the end of his catalogue of Buddhist manuscripts in the Cambridge University Library, and belonging to the year 1198.’

‘If so, he argued,’ goes on our good Brahman, ‘the script belongs to the early 12th century, the Sanskrit commentary must be [of] earlier [vintage] than that time. The collection of songs must precede the commentary, and the composition of the songs must precede the collection. The songs belong to 20 different authors, whose signatures are invariably attached to the last lines of their songs. The authors therefore must belong to the 10th century at least, and all these afforded food for his thought, reflection and study for several years.’ Besides the fifty songs, two collections of dohas, or dohakosas, were also discovered shortly afterwards.

These reflections on the songs and dohas led to a number of tentative judgments. First, their language was identified to be a form of old Bengali: ‘When the songs are Bengali of the 10th century, the dohas represent the archaic dialect of that period.’ Secondly, ‘the originality claimed by the Vaisnavas in inventing Kirtana [some ‘six hundred years later,’ as adds Shastri] does not hold good any longer,’ as those old Buddhist songs are in no way inferior to these later Vaishnava marvels.

Not least, the social standing of the Buddhist authors of the old differed not inconsiderably from that of the Vaisnava authors. In Haraprasad Shahstri’s own words:  ‘In those old days Brahmans were few in Bengal and their followers almost a negligible quantity. The little Aryan culture the people then had came filtered through Buddhism. But still the poets of the songs came from the highest society of the time. Their language was not boorish but elevated and dignified and they tried to make it as much Sanskritized as they could for even then Sanskrit was supposed to give dignity and add respectability.’ ‘The comparisons, ‘Haraprasad notes, ‘are drawn from natural objects such as [lotuses], mountains, rivers, etc., but what strikes one as peculiar is the oft-repeated simile with boats and their constituent parts, the oars, helms, ropes, pegs, and so on. Another fruitful source of comparison is the milking of cows. The authors seem to have been substantial boatmen, cowherds and men in a similar position.’

For some time this must have sounded seditious, or sacrilegious to Shastri’s compatriotic ears, whom he called ‘spiteful people’. ‘Spiteful people may magnify a printing mistake here and a clerical there into grave serious mistakes and inexcusable faults, but that is the storehouse of information to which everyone must turn in his need, he wrote at the time in turning to the Buddhist contribution to proto-Bengali and Bengali literature of our early modern ages.

II

I condescend to cite here the discoverer of the oldest known Bengali songs of the 10th century or thereabouts, in some detail, for two reasons. First, these remarks do suggest that origins of the Bengali language itself must be a modern incident and that the literature it spawns is also nothing if not modern. My second point is that these remarks of Haraprasad Shastri’s anticipates mutatis mutandis conclusions we might draw from the more than remarkable new discoveries made by Abdul Karim, better known as the Sahityavisarad, since 1893.

What’s new, then? Abdul Karim discovered that there existed also Muslim writers of quality in Bengali literature and, what’s more, their quantity also is far from negligible. In diction their works, for instance, those of the 17th century lauraetes Kazi Daulat (1600-1638) or Syed Alaol (1607-1680) are no less ‘elevated and dignified,’ i.e., Sanskritized in measure than Bharatchandra Ray’s (1712-1760)  or Madhusudan Datta’s (1824-1873) of later fame. Genealogically speaking, the Bengali Muslim writers drew on both pre-Islamic Indian and Indo-Islamic materials found in languages such as Arabic, Persian and Hindusthani. In terms of thematic apperception, they made forays into much terra incognita for Bengali literature. In their desire to relay to a Bengali reading public or rather auditors the culture of Islam by way of a standard Bengali, they gave pride of priority to the secular motifs. Apart from a few manuals drafted for religious purposes, the dominant motifs in all works of the time are secular.

Syed Sajjad Husain, English translator of the Descriptive Catalogue of Bengali Manuscripts by Abdul Karim, writes in his introduction: ‘Syed Sultan’s Nabi Bangsa [Genealogy of the Prophets], perhaps the most ambitious work of its kind in which the author’s aim is to give a biographical account of the prophets from Adam to Muhammad, was undoubtedly inspired by the desire to create for the Bengali Muslims a kind of a national religious epic. It was intended to be both historical and imaginative. In his descriptions of Satan in particular the author gave free rein to his imagination though the didactic purpose is never lost sight of.’ Sayed Sultan (1550?-1648?) is, per Muhammad Enamul Haq, ‘one of the oldest known poets of Bengal.’

To provide a second instance here let’s quote Sajjad Husain once more: ‘Similarly, Muhammad Khan [1580-1650], author of Maqtul Husain [The Slaying of Husain], and one of the disciples of Syed Sultan, took up the story of the conflict between Husain, grandson of Prophet Muhammad and Yazid, ruler of Damascus culminating in the former’s defeat and assassination at Karabala. The purpose clearly was not only to write history but to impress upon the Muslim the lessons of one of the greatest tragedies in the annals of Islam.’ I hope a third instance, in addition, should suffice for now. In Muhammad Hanifar Larai [Muhammad Hanifa’s Battles] ‘we meet a semi-historical person called Hanifa believed to be a son of Caliph Ali, who engaged in a series of adventures which are far from being historical,’ and ‘Fatemar Suratnama [In Praise of Fatima’s  Beauty] recreates the daughter of prophet Muhammad in the likeness of a Bengali beauty.’ The words inside inverted commas, let it be noted, are Syed Sajjad Husain’s.

This free rein of imagination, only to be expected in modern literature, has caused some consternation—nay concern—in late colonial Bengal’s learned circles. One hypothesis, advanced by Syed Sajjad Husain,  holds that it ‘appears to have been to create in Bengali for the Muslim readers something like an exact equivalent, built out of Muslim history, of the Hindu myths and legends which formed the stuff and substance of contemporary Bengali literature.’

Bengali Muslim authors, c. 15th-18th centuries found themselves confronted with two main modes of literary works, ‘as part of the general heritage of the Bengali language,’ as Sajjad Husain puts it. ‘One was a corpus of lyrical literature developed by the [Vaisnava] poets. The central figures in the [Vaisnava] cult were Krishna and Radha, and the literature which these poets produced wove beautiful fantasies around their passionate attachment to each other.’ In course of the development, Krishna and Radha got refined into symbols into which profound cosmic and spiritual meanings could be read.’ The manifest eroticism of Vaisnava lyric poetry is often explained away as a metaphor for ‘a deeper mysticism,’ with Krishna and Radha substituting for aspects of ‘the timeless and the temporal,’ of the transcendent and the subject. ‘The second type of literature that the Muslim poets confronted,’ Sajjad Husain observes, ‘was represented by the Mangala Kavyas, poems celebrating a pantheon of local deities.’

III

Syed Sajjad Husain, not unlike the hoi polloi of this minor profession, seems to have collapsed most works of Muslim writers into the category of puthi literature, of a literature of mere imitation, of Dobhashi puthi vintage 18th century, and what’s more, he seems to completely deny the genre any literary worth whatsoever. He, however, would grant them some negligible felicity in the ethnographic archive of the modern. To wit: ‘As the traditional culture of the villages disintegrates gradually under the impact of industrial and technological change, the puthi seems destined to die out as literary form sooner or later. Recognition of this truth need not however prejudice our appreciation of the puthi as a magnificent record of the workings of the popular mind in East Pakistan [what is now Bangladesh], as vast storehouse of legends and stories, as social document of incalculable value providing an index to the thoughts and beliefs of the people of East Pakistan.’

Unfortunately, Husain is not alone. He seemingly would find himself in good company. His not so strange bedfellows are certain Brahminical gentlemen from the West Bengal State of our great neighbor India (i.e., Bharat). Sometime ago Dipesh Chakrabarty, a Brahmanical gentleman as well as a world shattering historian in Chicago among other sites, made the remarkable discovery that the old Bengali literary historian and editor Dineshchandra Sen (1866-1939), a Baiddya of East Bengal, by the way, had been long fascinated with the folk-literature of Eastern Bengal on account of an affliction, of a species of parochial nationalism, or even better put, a pathology named ‘politics of identity.’ Our good friend Dipesh Chakrabarty gives it a pretty hoary sounding title: ‘Romantic Archives,’ that is to say a species of medieval relic, now fortunately adrift in the global ocean.

Gautam Bhadra, another distinguished historian and a Kayastha gentleman, in his ‘Abdul Karim Sahityavisarad Memorial Lecture’ delivered in Dhaka in 2003, i.e. on the savant’s 50th death anniversary, also applies the Chakrabarty thesis. He too finds Abdul Karim as a nationalist of sorts, a hysterical type that is. Bhadra translates ‘Politcs of Identity’ as ‘Atmasattar Rajniti’.

Does he pay any attention to Abdul Karim’s mumerous writings or for that matter to the arguments of the old Haraprasad Shastri? Apparently, and sadly I must say, not at all. He depends only on the catalogue, without reading into the texts at all. Thus in Bhadra’s view Abdul Karim appears to embody it all, the contradictions of all nationalism in Bangladesh. He stops just short of calling it ‘Muslim nationalism’. What is right or wrong with Abdul Karim? Bhadra finds it in Abdul Karim’s putative accent on Chittagong, where he just happened to find almost all of his manuscripts, as also on his valorization of Bangladesh as a privileged site where he found himself domiciled on partition in 1947 and, finally, in his fervor on the identity of Muslim poets, his co-religionists, as indicative, nay proof of his identity politics. It seems Syed Sajjad Husain is not dead, nor Sir Jadunath Sarkar either.

Time, if not space here, today hardly permits me to take up the issue further. But I chuckle. I will limit myself here to only flagging some of the holes in their cosmos. These gentlemen are yet to address the question of modernity in Bengali Literature. Syed Alaol, as everyone now knows, was by all evidence Abdul Karim’s most favourite star. There may be more reason than one for his appreciation of a savant of a poet like Alaol. It just happened that he also was a Muslim, a rather good Muslim well-embroiled in letters. Dusan Zbavitel, a European specialist in Bengali literature, has not long ago written: ‘It was not easy for a Muslim poet to be recognized by the Hindu-dominated Bengali society, in the subsequent era, but Alaol did win distinction and general recognition. His diction was flawless and his style was truly poetic. As a good narrator he was able to enlarge the thematic repertory of Bengali literature by attractive and widely read renderings of foreign sources and to invigorate the tendencies towards a definite secularization of Bengali poetry.’

If secularization indeed arrives how far could our modern age lag behind? This will take us back to square one: what is modernity anyway? ‘When the sun dipped into the Ganges behind the blood-red field of Plassey, on that fateful evening of June, did it symbolize the curtain dropping on the last scene of a tragic drama?’ Or, ‘Was that followed by ‘a night of eternal gloom for India,’ as the poet of Plassey imagined Mohan Lal foreboding from the ranks of the losers?’ This hoary cry coming from the wilderness once mastered, Tarzan-like, by Sir Jadunath Sarkar now seems to have found its resounding echo in the worldly voices of our new philosophers in global times, you know them, Dipesh Chakrabarty, Gautam Bhadra and their many readers who must remain nameless here for obvious reasons. One never knows who knows.

References:

  1. Gautam Bhadra, Nera Bottolai Jai Ko’bar?’ 2nd ed. (Kolkata: Chatim Books, 2011).
  2. Dipesh Chakrabarty, ‘Romantic Archives: Literature and Politics of Identity in Bengal,’ Critical Inquiry, no. 30 (Chicago: Spring 2004), pp. 654-82.
  3. Sushil Kumar De, Bengali Literature in the Nineteenth Century (1757-1857), 2nd ed. (Calcutta: Firma K. L. Mukhopadhyay, 1962).
  4. G. N. Devy, The G N Devy Reader (Himayatnagar, Hyderabad: Orient Blackswan, 2009).
  5. Munshi Abdul Karim and Ahmad Sharif, A Descriptive Catalogue of Bengali Manuscripts in Munshi Abdul Karim’s Collection, Syed Sajjad Husain, trans. (Dacca: Asiatic Society of Pakistan, 1960).
  6. Jadunath Sarkar, ed., History of Bengal, Muslim Period: 1200-1757, 3rd ed. (Dacca: University of Dacca, 1976).
  7. Haraprasad Shastri, ‘Bengali Buddhist Literature,’ in Haraprasad Shastri Racana-Samgraha, vol. II, Satyajit Chaudhuri et al., eds. (Calcutta: West Bengal State Book Board, 1981), pp. 840-859.
  8. Dusan Zbavitel, Bengali Literature (Weisbaden: Otto Harrassowitz, 1976).
  9. Slavoj Zizek, The Most Sublime Hysteric: Hegel with Lacan, Thomas Scott-Railton, trans. (Cambridge: Polity Press, 2014).

This piece was first published by The Daily Star on October 10, 2015

Copyright 2015 Salimullah Khan

Rule of torture, rites of terror and the mirror of fascism: A further tribute to Frantz Fanon

   

 

The tradition of the oppressed teaches us that the ‘state of emergency’ in which we live is not the exception but the rule. We must attain to a conception of history that accords with this insight. Then we will clearly see that it is our task to bring about a real state of emergency, and this will improve our position in the struggle against fascism. One reason fascism has a chance is that, in the name of progress, its opponents treat it as a historical norm.

–Walter Benjamin, ‘On the Concept of History,’ Selected Writings, vol. 4 (Cambridge, MA: Harvard University Press, 2006), p. 392.

Torture, as many would readily agree, is the most abhorrent form of ‘human rights violation’. I have often wondered why not call it a ‘crime’? Why do they all the time keep inventing neologisms like violation? I propose to argue here that torture (and institutional terror or, as more often known, ‘extra-judicial killing’) is also a crime like any other crime. The difference, if any, lies only in its being condoned often by civil society in surreptitious, nay in unperceived ways sometimes. Torture and institutional terror is ‘like a ritual art form’ and as I would like to argue here, with Michael Taussig, ‘that far from being spontaneous, sui generis, and an abandonment of what are often called “the values of civilization,” such rites have a deep history deriving power and meaning from those values.’[1]

It would also be interesting to research further how the crimes and terror attributed to the victims of torture and institutional terror more often than not mime the crimes perpetrated by agents of state and civil society themselves in the name of rule of law and good governance. This mimesis often gives expression to a priori synthetic conditions of fascist culture and projects back to civil society the terrorism and criminal foundations of its own social structure which it imputes to uncivil elements.

It cannot therefore be only a humanitarian concern to draft a broadside contra torture and institutional terror. I need hardly say that I am not concerned here to produce a politically neutral or objective essay. I believe I am writing, on the contrary, in the tradition of the oppressed, of all those who gave up more than their lives in the struggle against fascism, and those survivors of torture who in bringing us their testimony help us in our job of rehabilitating man against the assault of fascism.

I should also say for the record before I say it all that all whatsoever I know about torture is derived from the work of other writers, some cited and some remains unnamed. Tyranny and terror, appearing periodically in the form of forced disappearances, extra-judicial killings, and also unjust executions is only too ubiquitous a phenomenon to need introduction. Torture is there out in the world everywhere, it has always been.

So what can be done about it? The least we can is to break the silence, to talk and write about it. ‘Why do they torture us,’ if you ask the subject supposed to know you are more likely to get the answer, ‘because they don’t understand’. That is but only half the answer. They torture you because you don’t understand. Not the torturer but the tortured or the threatened are the ones who stand in need of understanding. This is essay addressed to them.

I should perhaps avoid also getting locked up in intricacies of certain ‘objective’ definitions of torture. I take torture, for the purposes of this essay, as frankly a fascist political form and do not treat it (in the name of progress or whatsoever) at all as a historical norm or an ordinary everyday experience of human civilization.  I know, however, not everyone would agree on this. Those who would not make common cause with fascism, Michel Foucault among them comes to mind, would not either take torture for what it really is or at any rate what it would mean were they themselves subjected to the abhorrent practice. One might as well ask, ‘What is fascism anyway?’

Fascism is also a culture of terror ‘based on and nourished by silence and myth in which the fanatical stress on the mysterious side of the mysterious flourishes by means of rumor and fantasy woven in a dense web of magical realism’. The torturer, the terrorist here needs the tortured among other things to objectify his imaginary in the discourse of the other. What is it that the torturer wants? In the official prose, all he wants is information, to make the victim work in accordance with master’s desire or for that matter in concert with the strategies of economic development laid out by the master class. ‘Yet equally, if not more, important,’ as Michael Taussig shows in his analysis of torture in Putumayo jungles of Peru, ‘is the need to control massive populations through the cultural elaboration of fear.’[2]

 

I           Torture in the mirror of fascism

For the purposes of this essay I invoke the work of Aime Cesaire who takes fascism as a species of colonialism that returns home to rule the roost.[3] Fascism as many will recognize came to power in certain nations of Europe in the 1920s and 1930s as a tyranny based on a fair extent of popular following and aspired to rule the world by terror. But it did not descend down from pure blue heaven. Before fascism at home there was fascism abroad, it was only named colonialism.

CesaireAime Cesaire puts its history in a capsule. Colonialism works, as Cesaire says, to de-civilize the colonizer, to brutalize him in the true sense of the word, to degrade him, to awaken him to buried instincts, to covetousness, violence, race hatred, and moral relativism. Cesaire shows that Europe proceeded towards savagery slowly but surely through the everyday practices of colonialism, namely violence, murder, rape and torture. Each time a head was cut off or an eye put out in Vietnam they accepted the fact in France, he pointed out. Each time a little girl was raped or a man tortured in Madagascar they accepted the fact in France. Thus civilization acquired another dead weight, a universal regression took place, a gangrene set in, and a center of infection began to spread.

That center eventually, at the end, became fascism, or savagery in the name of civilization. In Cesaire’s eloquent words, ‘at the end of all these treaties that have been violated, all these lies that have been propagated, all these punitive expeditions that have been tolerated, all these prisoners who have been tied up and interrogated, all these patriots who have been tortured, at the end of all the racial pride that has been encouraged, all the boastfulness that has been displayed a poison has been distilled into the veins of Europe,’ and the continent slowly but surely proceeded toward  savagery.

The European bourgeoisie begot colonialism, slavery and torture in other worlds, colonialism in turn begot fascism, murder and holocaust in Europe and yet European peoples were surprised and got indignant at fascism because Europe has so long been hiding the truth of fascism, its true paternity, from itself. One day Europe recognizes fascism as a true barbarism, nay the supreme barbarism, the crowning barbarism that sums up the daily barbarisms Europe perpetrated in its colonies. But the ruling classes of Europe still failed to admit, even after fascism’s last defeat, in good faith that ‘before they were its victims, they were its accomplices; that they tolerated that Nazism before it was inflicted on them, that they absolved it, shut their eyes to it, legitimized it, because until then, until then it had only been applied to non-European peoples; that they have cultivated that Nazism, that they are responsible for it, and that before engulfing the whole edifice of Western, Christian civilization in its reddened waters, it oozed, seeped, and trickled from every crack.’[4]

Steps taken by fascism, or German fascism in particular, serve in Aime Cesaire’s retrospective judgment, ‘to reveal to the very distinguished, very humanistic, very Christian bourgeois of the twentieth century that without his being aware of it, he has a Hitler inside him, that Hitler inhabits him, that Hitler is his demon.’ The European humanist, the Christian bourgeois that is, argues Cesaire, cannot really rail against fascism without being inconsistent. So what is it that the indignant European bourgeois doing when he is railing against that demon, that alter ego of theirs? ‘At bottom,’ Cesaire writes, ‘what he cannot forgive Hitler for is not the crime in itself, the crime against man, it is not the humiliation of man as such, it is the crime against the white man, and the fact that he applied to Europe colonialist procedures which until then had been exclusively reserved for the Arabs of Algeria, the ‘coolies’ of India, and the ‘niggers’ of Africa.[5]

Torture, in the words of the Convention against Torture and Other Cruel, Inhuman or Degrading Treatment or Punishment, adopted by the United Nations General Assembly on 10 December 1984, is purported to mean ‘any act by which severe pain or suffering, whether physical or mental, is intentionally inflicted on a person for such purposes as obtaining from him or a third person information or a confession, punishing him for an act he or a third person has committed or is suspected of having committed, or intimidating or coercing him or a third person, or for any reason based on discrimination of any kind, when such pain or suffering is inflicted by or at the instigation of or with the consent or acquiescence of a public official or other person acting in an official capacity.’ The Convention, however, compromises certain forms of violence, and excludes certain practices such as ‘pain or suffering arising only from, inherent in or incidental to lawful sanctions’ from the purview of torture.[6]

These limitations reflect rather difficult negotiations and liberal concessions to fascism. But the compromises, it must be recognized, are embedded also in cultural constructs, in the discourses of mythology and history that precursors so tenaciously built up. ‘And what is put into discourse through the artful storytelling of the colonists,’ as says Michael Taussig, ‘is the same as what they practiced on the bodies of the Indians.’[7]

Colonialism did not leave also the medical profession untainted. French medical professionals in Algeria, following the particularly edifying example of the medical corps in the concentration camps in Nazi Germany, also did not refrain from participating in tortures and other war crimes. Allow me to cite only a few instances from Franz Fanon. ‘When judicial inquiries into the cases of Algerians who had not died in the course of police questioning began,’ Fanon writes, ‘it would happen that the defense would ask for a medico-legal examination. This demand would sometimes be met. The European doctor assigned to examine the patient always concluded that there was no evidence to suggest that the accused had been tortured.’ ‘Not infrequently,’ also reports Fanon, ‘the European doctor in Algeria would deliver to the legal authority a certificate of natural death for an Algerian who had succumbed to torture or who, more simply, had been coldly executed. Similarly, it invariably happened that when the demand of the defense for an autopsy was granted, the results would be negative.’[8]

This is only collaboration at a remove, in a sense. The crime became explicit when it touched on the strictly technical level, where the European doctor actively collaborated with the colonial forces in ‘their most frightful and most degrading practices’. The European doctors in Algeria used the ‘truth serum’ with staggering frequency. ‘The principle of this drug,’ as Fanon writes, ‘is well known: a chemical substance having hypnotic properties is injected into a vein, which, when the operation is carried out slowly, produces a certain loss of control, a blunting of consciousness. As therapeutic measure used in medicine it is obviously a very dangerous technique, which may cause a serious impairment of personality. Many psychiatrists, considering the dangers greater than possible improvements, have long ago abandoned this technique for examining spheres of the unconscious.’[9]

The deleterious effects on men and women subjected to torture for days are legion, one of the important consequences being, in Fanon’s words, ‘a certain inability to distinguish the true from the false, and an almost obsessive fear of saying what should remain hidden.’ ‘We must always remember,’ as Fanon put it, ‘that there is hardly an Algerian who is not party to at least one secret of the Revolution. Months after this torture, the former prisoner hesitates to say his name, the town where he was born. Every question is first experienced as a repetition of the torturer-tortured relationship.’[10]

Professional morality, medical ethics, self-respect and respect for others, gives way to the most uncivilized, the most degrading, the most perverse kind of behavior under colonial conditions. In Algeria doctors attached to various torture centers ‘intervened after every session to put the tortured back into condition for new sessions’. ‘Under the circumstances,’ Fanon remarks, ‘the important thing is for the prisoner not to give the slip to the team in charge of the questioning: in other words, to remain alive.’ The doctor becomes an accomplice to the highest degree under these circumstances. ‘Everything—heart stimulants, massive doses of vitamin—is used before, during, and after sessions to keep the Algerian hovering between life and death. Ten times the doctor intervenes,’ as Fanon reminds us, ‘ten times he gives the prisoner back to the pack of torturers.’

FanonFanon, himself a French-trained professional psychiatrist, accused certain psychiatrists of flying to the aid of the police. ‘There are,’ he writes, ‘for instance, psychiatrists in Algiers, known to numerous prisoners, who have given electric shock treatments to the accused and have questioned them during the  waking phase, which is characterized by a certain confusion, a relaxation of resistance, a disappearance of the persons defenses. When these men are liberated because the doctor, despite this barbarous treatment, was able to obtain no information, what is brought to us is a personality in shreds. The work of rehabilitating the man is then extremely difficult.’ ‘This is only,’ remarks our author, ‘one of the numerous crimes of which French colonialism in Algeria has made itself guilty.’[11]

To crown it all Fanon recalls certain experience with French military doctors refusing treatment to an Algerian soldier wounded in combat, when called to his bedside. ‘The official pretext was that there was no longer a chance to save the wounded man. After the soldier had died, the doctor would admit that this solution had appeared to him preferable to a stay in prison where it would have been necessary to feed him while awaiting execution.’ ‘The Algerians of the region of Blida know,’ adds Fanon, ‘a certain hospital director who would kick the bleeding chests of the war wounded lying in the corridor of his establishment.’ [12]

Modern medical ethics, based on the ethical code laid out in the Hippocratic Oath and laid out by official organizations as well as professional associations, expresses commitment to the cause of a universal humanitarianism. Principles of medical ethics adopted by the United Nations General Assembly, on 18 December 1982, for instance, implicates all health personnel, particularly physicians, ‘in the protection of prisoners and detainees against torture and other cruel, inhuman or degrading treatment or punishment.’ ‘It is a gross contravention of medical ethics,’ as one of the six principles enjoins it, ‘to participate in torture or other cruel, inhuman or degrading treatment or punishment.’ It is prohibited, as another principle puts it, ‘to assist in the interrogation of prisoners or detainees in a manner that may adversely affect their physical or mental health,’ just as it is forbidden to certify the sickness of prisoners an detainees for any form of treatment or punishment that may adversely affect their physical or mental health.’[13] World Medical Association also adopted similar ethical principles. Of paramount importance on the subject of torture is the Tokyo Declaration adopted in 1975.

However, all this did not have the desired effect. If it did we would not have heard of Abu Gharaib or Guantanamo for that matter. Faced with the endemic nature of torture, terror and horror we, the condemned to the New World Order, are assailed with a new emergency or to call a spade a spade, a new fascism. Walter Benjamin’s observation has alas again attained to a new urgency: ‘The tradition of the oppressed teaches us that the “state of emergency” in which we live is not the exception but the rule.’ Not everyone, for instance, the French philosopher Michel Foucault would agree.

 

II          Torture as normal: Michel Foucault’s apologia

In his later work especially Discipline and Punish, Michel Foucault claims among other things that ‘torture’ give way to ‘discipline’ in modern society. By modern society, Foucault indicated mostly European societies since at least the French revolution of the eighteenth century. This flies in the face of all evidence even after the two world wars (or a long thirty years war if you will) of the twentieth century, especially in societies where the European mode of colonial governance prevails.[14] In an interesting defense of Foucault, Talal Asad argues that the French philosopher is not concerned with torture as such but with rather power or disciplinary power, which works with normalization of everyday behavior, as opposed to sovereign power which needs to exhibit itself publicly.[15]

One of my purposes in this essay is to re-examine the robustness or otherwise of the distinction introduced by Michel Foucault. I argue, following the work of Frantz Fanon, that the distinction between ‘sovereign power’ (which needs an expression) and ‘disciplinary power’ (which needs a means) tends to wither away as one confronts face to face a colonial formation. ‘Torture,’ Fanon claimed in 1957, ‘is an expression and a means of the occupant-occupied relationship.’[16]

Talal Asad has claimed also that Foucault’s thesis about disciplinary power is not subverted by evidence of surreptitious torture in the modern state. That torture is administered in secrecy (or one admits in quasi-secrecy) is proof that it is just policing, a governmental activity directed supposedly at defending some fundamental ‘interest of society’. ‘On the contrary,’ writes Asad, ‘precisely because torture carried out in secret is said to be intimately connected with the extraction of information, it is an aspect of policing.’[17]

To believe that torture is simple policing, or a mode of pure disciplinary power rests, I would here argue, on a fundamental misreading of the colonial (or semi-colonial for that matter) situation. Curiously, as Fanon noted it, neither the French police agents perpetrating torture in Algeria (in a sense ever since 1830), nor the Algerian people in the vanguard of their liberation war had little misgiving about the true nature of what was involved.

Recent evidence of the US torture in Afghanistan and in Iraqi theater of war serves to redeploy and recharge, and perhaps to supplement, certain lessons of earlier colonial wars. The necessity to legitimize torture, as Fanon noted, has always been considered by the French police to be ‘an outrage and a paradox’. To them maintenance of French domination in Algeria made torture absolutely necessary. The Algerian people too were not unaware of the fact that the colonialist structure rested on the necessity of torturing, raping and committing massacres.[18] As the case of Algeria preeminently points out the question of torture is a core problem of civilization or rather the civilizing mission, not of barbarism or even savagery for that matter; it is, as an observer remarked lately, ‘but one that concerns the very moral fabric of the democratic societies in which we live.’[19]

Torture in the world continues. That torture is practiced to a great and frequent extent is recognized by the United Nations and other large international bodies such as the Council of Europe, either directly or at a remove, in many a declaration, convention, covenant or other regulations introduced. As is well known the United Nations was created as World War II was about to end and as early as 1948 the General Assembly adopted the Universal Declaration of Human Rights. ‘No one shall be subjected,’ Article 5 of this Declaration reads, ‘to torture or to cruel, inhuman or degrading treatment or punishment.’ The intent was reiterated both in the Declaration on the Protection of all Persons from being subjected to Torture and any other Cruel, Inhuman or Degrading Treatment or Punishment adopted on 9 December 1975 and in the Convention against Torture and Other Cruel, Inhuman or Degrading Treatment or Punishment adopted by the General Assembly on 10 December 1984.

In his later work Foucault argues that the exercise of power and resistance to work in a disruptive rather than a dialectical relation to each other, suggesting that ‘points of resistance are present everywhere in the power network’. Foucault’s point is that resistance does not operate outside power, nor is it necessarily produced in opposition to it: ‘it is imbricated within it, the irregular term that consistently disturbs it, rebounds upon it, and which on occasions can be manipulated so as to rupture it altogether’: ‘Just as the network of power relations ends by a dense web that passes through apparatuses and institutions, without being exactly localized in them, so too the swarm of points of resistance traverses social stratification and individual unities. And it is doubtless the strategic codification of these points of resistance that makes a revolution possible, somewhat similar to the way in which the state relies on the institutional integration of power relationships.’[20]

As Foucault has once put it, he began his analysis ‘from a question posed in the present.’ It is in this way that Foucault returned to doing historical work that has political fallout through his notion of genealogy. Curiously few references to the question of torture in the French colony of Algeria is to be found in the works of Foucault or for that matter Jean-Francois Lyotard who wrote extensively on colonial Algeria.[21]

Foucault’s legacy is at best ambivalent. For him tyranny, which he often calls rather simplistically power, is heterogeneous as is resistance. His point is simply that ‘there is no single locus of great Refusal, no soul of revolt, source of all rebellions, or pure law of the revolutionary’.[22]  Foucault stresses the local or the specific resistance without assuming the global possibility of emancipation. What he misses is the asymmetry of the institutional integration of power relationships where a state or civil society exists and the absence of strategic codification of points of resistance marks the existence of the other.

III         Torture as pathological: Fanon on colonialism and mental disorders

Franz Fanon, in his last work, placed torture most succinctly in its proper historical basis, namely when the colonized person and the colonial system are violently brought together. Dehumanizing the colonized, argues Fanon, is of the essence of torture as a modality of political action. ‘It must in any case be remembered that,’ writes Fanon, ‘a colonized people is not simply a dominated people. Under the German occupation the French remained men; under the French occupation, the Germans remained men.’ But the Algerians, the veiled women were not men and women to the French; they together with the palm trees and the camels simply formed the landscape, the natural background to the human presence of the French.[23]

The colonial situation produces pathologies of various orders. In the calm period of successful colonization, that is when it is not contested by armed resistance, oppression directly produces a regular and important mental pathology. At that hour, ‘the sum total of harmful nervous stimuli overstep a certain threshold, the defensive attitudes of the natives give way and they then find themselves crowding mental hospitals.’

In times of national liberation wars, which are total wars for the colonized, the colonial theater of war becomes a veritable breeding-ground of mental disorders. Most of them, known as ‘reactionary psychoses’ in clinical psychiatry, are as a matter of fact produced by the oppressive regime, by ‘chiefly the bloodthirsty and pitiless atmosphere, the generalization of inhuman practices and the firm impression that people have of being caught up in a veritable Apocalypse.’ A colonial war, either in part or as a whole is, as Fanon notes, ‘singular even in the pathology it gives rise to’. Colonial psychoses induced by torture, to put it in brief, ‘upsets most profoundly the personality of the person who is tortured’.[24]

Fanon’s second observation also merits further comments. He vigorously confutes the claim that these ‘reactionary psychoses’ so-called are relatively harmless and rather exceptional phenomena. Fanon, on the contrary, holds that ‘the frequent malignancy of these pathological processes’ is rather the rule. ‘These are disorders which persist for months on end, making a mass attack against the ego, and practically always leaving as their sequel a weakness which is almost visible to the naked eye. According to all available evidence, the future of such patients is mortgaged.’[25]

The colonial war dehumanizes not only the colonized; the torturer also becomes a victim. In his chapter ‘Colonial Wars and Mental Disorders,’ in Wretched of the Earth, Fanon writes on the case of a twenty-eight year old European policeman who was sent to Fanon in Blida-Joinville by his superiors because he had behavior disturbances. ‘His trouble was that at night he heard screams which prevented him from sleeping.’ For a few weeks prior to coming to the psychiatrist the poor policeman, before going to bed, used to shut the shutters and stopped up all the windows, and that in the summer, to the complete despair of his wife who was stifled by the heat. ‘Moreover, he stuffed his ears with cotton-wool in order to make the screams seems less piercing.’ He, sometimes even in the middle of the night, used to turn on the wireless set or put on some music in order not to hear his nocturnal uproar. Sometime ago he was employed at the police headquarters, where he mostly came to deal with interrogations. Fanon quotes quite a bit of the patient’s testimony. ‘Interrogations,’ the policeman tells Fanon, never occurred without some ‘knocking about’. ‘The thing was that they never would own up to anything.’

‘Sometimes we almost wanted to tell them that if they had a bit of consideration for us they’d speak out without forcing us to spend hours tearing information word by word out of them. But you might as well talk to the wall. To all the questions we asked they’d only say ‘I don’t know.’ Even when we asked them what their name was. If we asked them where they lived, they would say ‘I don’t know’. So of course we had to go through with it. But they scream too much. At the beginning that made me laugh. But afterwards I was a bit shaken. Nowadays as soon as I hear someone shouting I can tell you exactly at what stage of the questioning we’ve got to.  The chap who’s had two blows of the fist and a belt of the baton behind his ear has a certain way of speaking, of shouting and of saying he’s innocent. After he has been left two hours strung up by the wrists he has another kind of voice. After the bath, still another. And so on. But above all it’s after the electricity that it becomes really too much. You’d say that the chap is going to die any minute. Of course there are some that don’t scream; those are the tough ones. But they think they are going to be killed right away. But we are not interested in killing them. What we want is information. When we’re dealing with those tough ones, the first thing we do is to make them squeal; and sooner or later we manage it. That’s already a victory. Afterwards we go on. Mind you, we would like to avoid that. But they don’t make things easy for us. Now I’ve come so as I hear their screams even when I’m at home.’ ‘Especially,’ added the policeman, ‘the screams of the ones who died at the police headquarters.’ He wanted to resign his job and save his soul.[26]

Another European torturer, a thirty-year old police inspector, also married and with three children, was intent on persevering with his job. He had lost his appetite and his sleep, as he told Fanon, was frequently disturbed by nightmares. What bothered him most was not the nightmares as such, but what he called ‘fits of madness’. He disliked being contradicted: ‘as soon as someone goes against me, says he, ‘I want to hit him.’ ‘Even outside my job, I feel I want to settle the fellows who get in my way, even for nothing at all.’

The police inspector dislikes noise. At home he wants to hit everybody all the time. In fact he does hit his children, even the twenty month old baby, with unaccustomed savagery. One evening he did beat up and tie down his wife who dared to criticize him for hitting his children too much. He wasn’t like that before, the inspector recounted. He said he very rarely punished his children and at any event rarely fought with his wife. The present phenomena, in his opinion, had appeared ‘since the troubles’. ‘The fact is,’ he said, ‘nowadays we have to work like troopers. Last week, for example, we operated like as if we belonged to the army. Those gentle men in the government say there’s no war in Algeria and that the arm of the law, that’s to say the police, ought to restore order. But there is a war going on in Algeria, and when they wake up to it it’ll be too late.’

‘The thing that kills me most is the torture,’ admits our troubled Inspector. ‘Sometimes,’ adds he, ‘I torture people for ten hours at a stretch…’ ‘What happens to you when you are torturing?’ Fanon asks him. ‘It’s very tiring,’ the Inspector chips in. ‘It’s true we take it in turns, but the question is to know to let the next chap have a go.. Each one thinks he is going to get the information at any minute and takes good care not to let the bird go to the next chap after he has softened him up up nicely, when of course the other chap would get the honor and glory of it. So sometimes we let them go; and sometimes we don’t.’

‘Sometimes,’ goes on the Inspector, ‘we even offer the chap money, money out of our own pockets, to try to get him to talk. Our problem is as follows: are you able to make this fellow talk? It’s a question of personal success. You see, you are competing with the others. In the end your fists are ruined. So you call in the Senegalese But they hit either too hard and destroy the creature or else they don’t hit hard enough and it’s no good. In fact you have to be intelligent to make a success of that sort of work. You have to know when to lay it on and when to lay it off. You have to have a flair for it.’

‘But the thing that worries him most is this affair with his wife. ‘It’s certain that there’s something wrong with me,’ he realizes. But he is far from seeing the real behind his troubles. ‘This man knew perfectly well, remarks Fanon, ‘that his disorders were directly caused by the kind of activity that went on inside the rooms where interrogations were carried out, even though he tried to throw the responsibility totally upon “present troubles”.’ Since he could not imagine a way out of the interrogation rooms he asked Fanon to help him to go on torturing Algerian freedom fighters without any pricking of conscience, without any behavior problems and with complete equanimity. ‘With these observations, writes Fanon, ‘we find ourselves in the presence of a coherent system which leaves nothing intact. The executioner who loves birds and enjoys the peace of listening to a symphony or a sonata is simply one stage in the process. Farther on in it we may well find a whole existence which enters into complete and absolute sadism.’[27]

Sadistic police agents who lost their sleep and the torturing soldiers who ‘run the risk of turning into fascists’ no doubt constituted a precise problem for the Algerians, and that was to get rid of them at the shortest possible time. The human legacy of torture, just one of France’s numerous crimes in Algeria, cast indeed a longer shadow. In ‘Colonial Wars and Mental Disorders’, Fanon presents his cases in four consecutive series. The two cases we chose above, examples of ‘reactionary psychosis,’ belong to series A. In series B certain cases in which the events giving rise to the illness is in the first place the atmosphere of total war were brought together. Fanon grouped together, in series C, those cases in which the disorders appeared after or during the tortures. Characteristic morbidities appeared depending on the methods of torture employed, independent of the evil effects upon the personality of the tortured. Fanon finally put together in a fourth series illnesses met with among Algerians who were interned in concentration camps. Illnesses of the ‘psycho-somatic’ type, as they used to be known, were not the only consequences of the colonial war.  Quite apart from the pathology of torture, the pathology of combat, violence and conflict were enough to produce these mental disorders, including certain forms of criminality. Under a colonial regime such as existed in Algeria, as Fanon finds it, the ideas put forward by colonialism not only influenced the European minority, but also the Algerians. ‘The Algerian’s criminality, his impulsivity and the violence of his murders,’ concludes Fanon, ‘are therefore not consequences of the organization of his nervous system, nor of a peculiar trait in his character, but a direct product of the colonial situation.’[28]

 

IV         Torture and civil society: the Putumayo Report

Michael Taussig’s analysis of colonialist torture in Putumayo region in South America yields remarkably similar conclusions as in Fanon’s treatment of Algeria. Taussig, in fact, goes a trifle further than Fanon in exploring the torturer in his fantasy, namely the culture of terror that sustain him. Taking up an early twentieth century official report on torture perpetrated on the Putumayo Indians by an Anglo-Peruvian rubber company Taussig shows that while condemning the torture, cruel, inhuman and degrading treatment of the Indian the narrative framework and explanations put forward in the report do miss the very culture of terror, the image of the Indian as cannibal and savage, that sustained the colonialist rationality of torture.

The British Consul Roger Casement’s report, written in 1910 and published by the House of Commons in 1913, was based on extensive field investigations on the middle reaches of the Putumayo and the Amazon basin. Its essence, in Taussig’s words, ‘lay in its detail of the terror and tortures together with Casement’s explanation of causes and his estimate of the toll in human life.’ ‘Putumayo rubber would be unprofitable,’ as Taussig writes, ‘were it not for the forced labor of local Indians, principally those called Huitotos. From the twelve years from 1900, the Putumayo output of some 4,000 tons of rubber cost thousands of Indians their lives. Deaths from torture, disease, and possibly flight had decreases the population of the area by around 30,000 during that time.’ [29] However, in 1909 a London magazine, Truth, published a series of articles by an unknown adventurer from the United States, Walter Hardenburg by name, on the Putumayo region depicting the brutality of the rubber company, which since 1907 has been a consortium of Peruvian and British interests in the region.

The articles chronicled the saga of the plantation workers of Putumayo region declaring that the peaceful Indians work night and day collecting rubber without the slightest remuneration. As Taussig restates, ‘[The Indians] are given nothing to eat or wear. Their crops, together with the women and children, are taken for the pleasure of the whites. They are inhumanly flogged until their bones are visible. Given no medical treatment, they are left to die after torture, eaten by the company’s dogs. They are castrated, and their ears, fingers, arms, and legs are cut off. They are tortured by means of fire, water, and crucifixion tied head-down. The whites cut them pieces with machetes and dash out the brains of small children by hurling them against trees and walls. The elderly are killed when they no longer can work. To amuse themselves, the company officials practice shooting, using Indians as targets, and on special occasions such as Easter Saturday—Saturday of Glory—shoot them down in groups, or, in preference, douse them in kerosene and set them on fire to enjoy their agony.’[30]

The British administration felt obliged to send Roger Casement to the Putumayo on account of the public outcry caused. Casement’s report confirmed, more or less, the stories depicted in the Truth articles. From the evidence gathered at the scene the Consul reported that the ‘great majority’ (perhaps up to 90 percent) of the more than 1,600 Indians he saw had been badly beaten. ‘Some of the worst affected were small boys and,’ as one reads in the resume, ‘deaths due to flogging were frequent, either under the lash, or more frequently, a few days later when the wounds became maggot infested.’ It continues: ‘Floggings occurred when an Indian brought in insufficient rubber and were most sadistic for those who dared to flee. Flogging was mixed with other tortures such as near drowning, “designed,” as Casement points out, “to just stop short of taking life while inspiring the acute mental fear and inflict much of the physical agony of death.” ‘[31]

‘Casement was informed,’ Taussig writes furthermore, ‘by a man who had himself often flogged Indians that he had seen mothers flogged because their little sons had not brought in enough rubber. While the boy stood terrified and crying at the sight, his mother would be beaten “just a few strokes” to make him a better worker.’ In addition, deliberate starvation was resorted to repeatedly, sometimes to frighten, more often to kill. Men and women were kept in stocks until they died of hunger. An eye witness reported that he had seen Indians in this situation ‘scraping up the dirt with their fingers and eating it.’ Another declared that he had seen them eating the maggots in their wounds.’ Thus the narrative goes on, apparently unending.

Yet these are the victims who were accused of savagery and cannibalism by their tormentors, the company employees and the civil society. One would ask why.  ‘Such men,’ Roger Casement remarked, ‘had lost all sight or sense of rubber-gathering—they were simply beasts of prey who lived upon the Indians and delighted in shedding their blood.’ Yet they were there to begin with ostensibly for making a profit. How can shedding blood be profitable? How did torture become their preference?

Moreover, the station managers from the areas where Casement got his most precise information were in debt (despite their handsome rates of commission), running their operations at a loss to the Company that in some sections ran to many thousands of pounds sterling. Asked by Casement if he did not know it to be wrong to torture Indians, one of the Barbados men replied that he was unable to refuse orders, ‘that a man might be a man down in Iquitos, but ‘you couldn’t be a man up there’. [32]

Casement argued that it was not rubber but labor that was scarce in Putumayo and that this scarcity provided the basic cause of the use of terror. Putumayo rubber was of the lowest quality, the remoteness of its source made its transport expensive relative to rubber from other zones, and wages for free labor were very high. Hence, he reasons, the company resorted to the use of forced labor under a debt-peonage system and used torture to maintain labor discipline. But, as Taussuig notes, this explanation does not sit in well with certain facts to be found in the Putumayo Report such as the slaughter of this precious labor on a vast scale beyond belief. The explanation ‘while not exactly wrong’ is in some way inadequate. Taussig raises two further points on the question of ‘scarcity’ of labor and the debt-peonage system which bound the Indian to the plantations. It was obvious, to begin with, that torture and institutionalized terror is not rational in the business sense of the term but was nevertheless resorted as one observes a ritual. Also torture was neither spontaneous, sui generis, nor constituted an abandonment of ‘the values of civilization’ so-called such. Such rites, Taussig contends, ‘have a deeper history deriving power and meaning from those values.’

The rites of terror and torture cannot be sense of unless one goes further. What claims attention is ‘the mimesis between the savagery attributed to the Indians by the colonists and the savagery perpetrated by the colonists in the name of what they call “civilization”.’ ‘The reciprocating yet distorted mimesis,’ argues Taussig, ‘has been and continues to be great importance in the construction of colonial culture—the colonial mirror that reflects back onto the colonists the barbarity in their own social relations, but as imputed to the savage or evil figures they wish to colonize.’ Lurid tales of Indian cannibalism and colonial folklore of savage Indians serve only to confirm the fact that civil society in fact was founded on savagery. To cite Taussig once more: ‘In their human or human like form, the wild Indians could all the better reflect back to the colonists the vast and baroque projections of human wildness that colonists needed to establish their reality as civilized (not to mention business like) people. And it was only because the wild Indians were human that they were able to serve as labor—and as subjects of torture. For it is not the victim as animal that gratifies the torturer, but the fact that the victim is human, thus enabling the torturer to become the savage.’ [33]

From all accounts of the Putumayo terror it appears that colonists and rubber company employees not only feared but themselves created through narration fearful and confusing images of savagery—images that bound colonial society together through the epistemic murk of the space of death. ‘The systems of tortures they devised to secure rubber,’ Taussig writes, ‘mirrored the horror of savagery they so feared, condemned—and fictionalized.’ ‘And what is put into discourse through artful storytelling of the colonists is the same as what they practiced on the bodies of the Indians.’[34]

More interestingly, well meaning reports such as those by Hardenburg or Casement too did not free themselves from the same sources that created such myths of Indian savagery. ‘Torture and terror in the Putumayo were motivated by the need for cheap labor. But labor per se—labor as a commodity—didn’t exist in the jungles of the Caraparana and Igaraparana affluents of the Putumayo. What exited was not a market for labor but a society and culture of human beings whom the colonists called Indians, irrationals, and savages, with their specific historical trajectory, form of life, and modes of exchange. In the blundering colonial attempt to forcibly dovetail the capitalist commodity structure to one or the other of the possibilities for rubber gathering offered by these modes of exchange, torture, as Casement alludes, took on a life of its own: ‘Just as the appetite comes in the eating so each crime led on to fresh crimes.’[35]

‘To this we should add that, step by step, terror and torture became the form of life for some fifteen years, an organized culture with its systematized rules, imagery, procedures, and meanings involved in spectacles and rituals that sustained the precarious solidarity of the rubber company employees as well as beating out through the body of the tortured some sort of canonical truth about civilization and business.’[36]

V          Conclusion

How do we go from here?  If you want to subvert this apocalyptic dialectic, we must begin by undermining or disrupting the foundations of fascism in the discourse of civil society itself. It needs to be understood, as a minimalist program would have it, that the fight against torture and institutionalized terror hardly makes sense unless one realizes that this is part of the struggle against fascism. It is the point on which our path diverges from the saddle point of Michel Foucault and converges on the one tread by Franz Fanon.

Fascism, as Walter Benjamin once famously said, founds politics on aesthetics. That’s true. Fascism sensationalizes, it builds on a folklore that forecloses, an otherness that imprisons mankind. The struggle against fascism, however, must found its aesthetic on a politics of openness. Its poetics will not close ‘with cataclysmic resolution of contradictions but with their disruptions.’

Possibilities of eliminating torture must be considered to exist. International law has created a myriad of conventions, covenants and treaties and the medical profession also has laid down extensive ethical rules. But what stands in the way of implementation is not the fact that ‘they’ don’t understand. In fact they understand only too well.

Likewise, paradoxical as it may sound, the truth of torture, rape, or collective murder it is not to be found in the body of these crimes as such. We must understand that they are sustained by a structure or if you like a culture of terror. The revolution of our times—and I am not using the word as an exorcism—must now turn on a new leaf. A new culture demands new tasks.

 


[1]   Michael Taussig, ‘Culture of Terror—Space of Death: Roger Casement’s Putumayo Report and the Explanation of Torture,’ in Nicholas B. Dirks, ed., Colonialism and Culture (Ann Arbor: University of Michigan Press, 1992), pp. 135-173, p. 164.

[2]   M. Taussig, ibid., p. 139.

[3]   Aime Cesaire, Discourse on colonialism, trans., Joan Pinkham, reprint (New York: Monthly Review Press, 2000).

[4]   A. Cesaire, ibid., p. 36; translation modified.

[5]   A. Cesaire, ibid., p. 36.

[6]   B. Sorensen, ‘Modern Ethics and International Law,’ in M. Basoglu, ed., Torture and its consequences: current treatment approaches, reprint (Cambridge: Cambridge University Press, 1993), 511-19, p. 512.

[7]   M. Taussig, ibid., pp. 164-65.

[8]    F. Fanon, A Dying Colonialism, trans., H. Chevalier, reprint (Boston: Grove Press, 1965), pp. 136-37.

[9]    F. Fanon, ibid., p. 137.

[10]  F. Fanon, ibid., p.138; see also F. Fanon, The Wretched of the Earth, trans., C. Farrington, reprint (London: Penguin Books, 1990), ch. 5, series A, case 4.

[11]   F. Fanon, A dying colonialism, pp. 138-39.

[12]  F. fanon, ibid., p. 139.

[13]  B. Sorensen, ‘Modern ethics and international law,’ in M. Basoglu, ed., Torture and its consequences: current treatment approaches (Cambridge: Cambridge University Press, 1993), pp. 516-17.

[14]   Michel Foucault, Discipline and Punish: The Birth of the Prison, trans., A. Sheridan, reprint (Harmondsworth, Middlesex: Penguin Books, 1986).

[15]  Talal Asad, ‘On Torture, or Cruel, Inhuman, and Degrading Treatment,’ in Arthur Kleinman et al., eds., Social Suffering, reprint (New Delhi: Oxford University Press, 2000), p. 288.

[16]  Frantz Fanon, ‘Algeria Face to Face with the French Torturers,’ Towards the African Revolution: Political Essays, trans., H. Chevalier, reprint (New York: Grove press, 1988), p. 66. ‘Torture in Algeria,’ alerted Fanon right ahead of this, ‘is not an accident, or an error, or a fault. Colonialism cannot be understood without the possibility of torturing, of violating, or of massacring.’

[17]  Talal Asad, ibid.

[18]  Franz Fanon, ibid., pp. 66, 72.

[19]  M. Basoglu, ed., Torture and its consequences: current treatment approaches, reprint (Cambridge: Cambridge    University Press 1993), p. 3.

[20]   Michel Foucault, The History of Sexuality: An Introduction, vol.1, trans., R. Hurley (London: Allan Lane, 1979), p. 96; cited in Robert J. C. Young, White Mythologies: Writing History and the West, 2nd ed., (London: Routledge, 2004), p. 124.

[21]   Jean-Francois Lyotard, Political Writings, trans., Bill Readings and K. Paul Geiman (London: UCL Press, 1993), p. 214.

[22]   Michel Foucault, The History of Sexuality: An Introduction, vol.1, ibid., pp. 95-96; cited in Robert J. C. Young, White Mythologies: Writing History and the West, ibid., p. 124.

[23]   F. Fanon, The Wretched of the Earth, trans., C. Farrington, reprint (London: Penguin Books, 1990), p. 201; emphasis in the original.

[24]   F. Fanon, ibid., p. 202.

[25]   F. Fanon, ibid., p. 203.

[26]   F. Fanon, Wretched of the Earth, pp. 213-14; Series A, Case 4.

[27]   F. Fanon, The Wretched of the Earth, p. 217.

[28]   F. Fanon, ibid., p. 250; translation modified.

[29]   M. Taussig,  ibid., p. 143.

[30]  M. Taussig, ibid., pp. 143-44, citing Walter Hardenburg, The Putumayo: The Devil’s Paradise. Travels in The Peruvian Amazon Region and an Account of the Atrocities Committed upon the Indians Therein (London: T. Fisher Unwin, 1912), p. 214.

[31]   M. Taussig, ibid., p. 145.

[32]   M. Taussig, ibid., pp. 146-47.

[33]   M. Taussig., ibid., p. 152.

[34]   M. Taussig, ibid., pp. 163-165.

[35]   M. Taussig, ibid., p. 164.

[36]   M. Taussig, ibid., p. 164.