Category Archives: প্রবন্ধ

এসলাম ও জাতীয়তাবাদ: একবাল আহমদের সাক্ষ্য

এয়ুরোপ মহাদেশে গত কয়েক শত বছরে যে রাষ্ট্রনীতি গড়িয়া উঠিয়াছে তাহাতে একপ্রকার স্থির হইয়াছে রাষ্ট্রের ক্ষেত্র হইতে ধর্মের ক্ষেত্র আলাদা থাকিবে। ইহার একপ্রস্ত কারণও আছে। খ্রিস্টান ধর্মমণ্ডলি বা গির্জার সহিত রাষ্ট্রের পুরাতন বিবাদের একপ্রকার মিমাংসা এই আকার ধারণ করিয়াছে। ধনতান্ত্রিক সভ্যতার গৌরব যখন মধ্যগগনে তখন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা প্রজাসাধারণের স্নেহধন্য রাষ্ট্রনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবিও ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। সেই প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আমরা দেখিলাম এই দাবিটিও উঠিয়াছে: রাষ্ট্র হইতে ধর্ম আলাদা করিতে হইবে। নহিলে প্রজাতন্ত্র নিরাপদ রাখা কঠিন হইবে।

কেহ কেহ বলেন এসলামধর্মের পরিমণ্ডলে এই দাবির কোন সার্থকতা নাই । তাহারা বলেন এসলামধর্মে তো রাষ্ট্রক্ষেত্র হইতে ধর্মক্ষেত্র আলাদা করিবার বিধান নাই। কারণ এসলামি রাষ্ট্র মানে খেলাফত। আর খেলাফত বা খলিফার শাসন মানে রাষ্ট্র আর ধর্মের একত্রীকরণ বৈ নহে। একবাল আহমেদ এই আপ্তবাক্যের সহিত একমত নহেন। তিনি বলিতেছেন এই আপ্তবাক্যটি সত্য ধরিয়া আগাইলে এসলাম জগতের প্রকৃত ইতিহাস বুঝা একপ্রকার অসাধ্যই হইয়া যায়। তিনি অবশ্য স্বীকার করেন যে এক অর্থে রাষ্ট্র আর ধর্ম একে অপরের আত্মীয়। কেননা রাষ্ট্র তো জাতীয় জীবনের সহিত বল বা ক্ষমতার নানাপ্রকার সম্বন্ধের অপর নাম মাত্র। অতয়েব রাষ্ট্র যেমন থাকিবে ধর্মও তেমন থাকিবেই। কেহ কাহাকেও উচ্ছেদ করিবে না। প্রশ্ন হইতেছে এই সম্বন্ধের আরও প্রকারভেদ আছে নাকি নাই। একবাল আহমেদ মনে করেন আছে, বিলকুল আছে। এই প্রকারভেদ স্বীকার করিলে মানিতে হইবে বহুদিন হইতেই এসলাম জগতে রাষ্ট্র হইতে ধর্ম আলাদা ক্ষেত্রে বিরাজ করিতেছে।

একবাল আহমেদ দেখাইয়াছেন এসলামের ইতিহাসে মোটা চৌদ্দশত বছরের মধ্যে অন্তত এগারশত বছর ধরিয়াই এসলামি দুনিয়ায় রাষ্ট্র হইতে ধর্ম প্রকৃত প্রস্তাবে আলাদা আকারে বসিয়া আছে। তিনি বলিতেছেন খলিফার শাসন বলিতে যাহা বুঝায় তাহা  তো বড়জোর তিনশত বছর টিকিয়াছিল্। এসায়ি ৬৩২ হইতে ৯৪৫ এই কিছু বেশি তিনশত বছর। এসায়ি ৯৪৫ সালের একদিন বুয়াহিদ বংশের রাজপুরুষ মুয়িজুদ্দৌলা আহমদ বাগদাদে বলপূর্বক প্রবেশ করিয়া আব্বাসিয়া খলিফার রাষ্ট্রক্ষমতা কাড়িয়া লইলেন। আর সেই দিনই খেলাফতের অবসান হইল। রাষ্ট্র হইতে ধর্ম আলাদা হইল। মানে ‘খলিফা’ পদের মধ্যে রাষ্ট্রক্ষমতা ও ধর্মক্ষমতার যে একত্র সমাবেশ হইয়াছিল সেই দ্বৈতক্ষমতার লোপ হইল। মানে এই দুই ক্ষমতা আলাদা আলাদা ক্ষেত্রযোগে ভাগ করা হইল। তাহার পরও অনেকদিন ‘খলিফা’ কথাটার চল ছিল। কিন্তু পুরানা সেই দ্বৈতক্ষমতা আর অক্ষুন্ন ছিল না। খলিফা ছিলেন নামমাত্র শাসক। আসল ক্ষমতার মালিকরা সুলতান, আমির, খান প্রভৃতি নানান নামে পরিচিত হইতেন।

বুয়াহিদ বংশ ১১০ বছর ধরিয়া এরাক ও পারস্যদেশের একাংশ (ফরস প্রদেশ) শাসন করে। এসায়ি ১০৫৫ সন নাগাদ তুর্কিজাতির (সেলজুক বংশধর) রাষ্ট্রবীর তুর্গিল তাহাদের পরাজিত করিলেন। দুইশত বছর পর ১২৫৮ এসায়িতে মোঙ্গলজাতির লোকেরা বাগদাদের খলিফাকে সপরিবার কোতল করিল। ইহার পর অনেকবার অনেক শাসকই খেলাফত পুনরুদ্ধার বা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি করিয়াছেন কিন্তু সত্যকার খেলাফত কোনদিনই আর কায়েম করা সম্ভব হয় নাই। সারা জাহানের মুসলমান জনসাধারণ আর কোনদিনই কাহাকেও সাকার খলিফা মানিতে পারে নাই। রাষ্ট্র এই কারণেই এসলাম জগতে রাষ্ট্রক্ষমতা ধর্মনিরপেক্ষ হইয়া যায় ।

একবাল আহমদ খেলাফতের আয়ু ধরিয়াছেন তিনশত বছর। কিন্তু এসলামধর্মের উলেমা বা শাস্ত্রজ্ঞানীরা এতটুকুও বা মানিতে প্রস্তুত নহেন। সুন্নি বা সংখ্যাগুরু শাস্ত্রজ্ঞানীরা বলেন এসায়ি ৬৫০ সালে যেদিন ওমাইয়া বংশ মুসলমান জগতের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করিল সেইদিনই খেলাফত শেষ হইয়া গেল। সুন্নিরা বলেন হজরত মোহাম্মদের (দঃ) এন্তেকালের পর তাঁহার যে চারিজন সাহাবি রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করিলেন একমাত্র তাঁহারাই সত্যপথবর্তী প্রতিনিধি বা সঠিক খলিফা। অন্যেরা কদাচ নহেন। শিয়া বা সংখ্যালঘিষ্ট ধারার জ্ঞানীগণ বলেন বৈধ খলিফা তো শুদ্ধমাত্র দুইজনই। তাঁহারা হজরত ওমর (র) আর হজরত ওসমানের (র) বৈধতা মানেন না।

যাহারা বলেন ৬৫০ সালের পর আর খেলাফত কায়েমমোকাম ছিল না তাহাদের যুক্তিটা কি? একবাল আহমেদ দেখাইতেছেন যুক্তি আছে তিনপ্রস্ত। একে তো পরের শাসকরা আগের খলিফাদের মতন পরহেজগার বা ধর্মমতি ছিলেন না। ব্যতিক্রমের মধ্যে ওমাইয়া শাসক ওমর এবনে আবদুল আজিজের (এসায়ি ৭১৭-৭২০) নাম করা যায়। দোসরা যুক্তি মুসলমান দুনিয়ার আইন-কানুন তখন হইতেই দুনিয়াদারিময় বা ধর্মনিরপেক্ষ হইয়া গিয়াছিল। আলেমগণের শেষ যুক্তি অনুসারে এসলামি দুনিয়াটা যেদিন হইতে অগণিত রাষ্ট্রে ভাগ হইয়া গিয়াছে খেলাফতও সেই দিনই কার্যত ফুরাইয়া গিয়াছে। এই অগণিত রাষ্ট্রের রূপও অজস্র: সুলতানের, আমিরের, খানের, শেখের, বাদশাহের, আর এখনকার দিনে রাষ্ট্রপতির রাষ্ট্র। সব ধরণের, রাজতন্ত্র প্রজাতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র। আলেমদের মধ্যে প্রায় সকলেই বলিবেন সারা দুনিয়ার মুসলিম ‘উম্মাহ’ বা মুসলমান জনগোষ্ঠী তো একটাই উম্মাহ। আর তাহাদের খলিফা বা এমামও তো একজনই। মুসলমান মাত্রই একই পয়গম্বরের উম্মাহ আর তাহারা সকলেই একই কোরানের আইনে শাসিত হইবেন। কিন্তু কোন আলেমই দ্বিমত করিবেন না যে ইতিহাস অন্য কথা বলে। এক মুসলমান দুনিয়ায় কত রাষ্ট্র! রাজতন্ত্র প্রজাতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র!

আজ একহাজার বছরেরও বেশি হইল রাষ্ট্রক্ষমতা ধর্ম হইতে আলাদা আছে। তাই বলিয়া এই সকল রাষ্ট্রকে অবৈধ বলিয়া কেহই বর্জন করেন নাই। করিলেও করিয়া সুফল পান নাই। এসলামধর্মের আদর্শ আর নথিবদ্ধ ইতিহাসের সাক্ষ্য ঠিক এক জায়গায় দাঁড়াইয়া নাই। এসলামি দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ আলেমগণ তো এই সত্য মানিয়াই লইয়াছেন । একবাল আহমদ কয়েকজনের নাম লইয়াছেন। তাহাদের মধ্যে আছেন আলমাওয়ার্দি (৯৪৭-১০৫৮), আলগাজ্জালি (১০৫৮-১১১১), আর আছেন এবনে জামায়া (১২৪১-১৩৩৩)। একবাল আহমেদ ইহারই নাম দিয়াছেন ঐতিহাসিক রফা । এই রফার পরও যে এসলামধর্মটা শেষ হইযা যায় নাই তাহ্ওা কম কথা নহে।

কিন্তু মনে রাখিতে হইবে মুসলমান সমাজের সংকটকালে বার বার দাবি উঠিয়াছে আবার খেলাফত কায়েম করিতে হইবে। রাষ্ট্র আর ধর্মকে এক করিতে হইবে। আজিকার দিনেও এই দাবি নতুন করিয়া উঠিতেছে। আজিকার সংকটটা কি? কম করিয়াও যদি বলি তো বলিতে হইবে এসায়ি আঠার শতকের পর হইতে তামাম মুসলমান জগত এয়ুরোপ আর তাহার বংশধর সাম্রাজ্যের পায়ের নিচে আসিয়াছে। মুসলমান জনগোষ্ঠীর কোন কোনটি আজ এয়ুরোপের বা তাহাদের মোসাহেবদের পদানত। একদিকে ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান হয় নাই। অন্যদিকে মিসর, লেবানন আর সিরিয়ার কিছুটাও এসরাইল দখল করিল। আফগানিস্তান আর এরাক পার হইয়া তাহারা লিবিয়ায় গেল আর এখন সিরিয়ার গলায় হাত ছুঁইয়াছে। ইরানের মাথায় খড়গ ঝুলিতেছে। তালিকা দীর্ঘ হইতেছে ।

এই সংকটের চাপে মুসলমান জগতে একদিকে যেমন নানাপ্রকার নিরবতা বিরাজ করিয়াছে তেমনি আবার আওয়াজও শুনা যাইতেছে নানান কিসিমের। কোন কোন মহল বলিতেছেন তাহারা খেলাফত উদ্ধার করিবেন। ইহার অর্থ কিন্তু গুরুতর। তাহারা শুদ্ধমাত্র রাষ্ট্র তাহারা জাতীয়তাবাদ (মানে জাতিকেন্দ্রিক রাষ্ট্র) মানিয়া লইবেন না। তাহারা বিদ্রোহ করিবেন। সমস্যার মধ্যে তাহারা সঙ্গী পাইতেছেন না। বিদ্রোহেও কাজ হইতেছে না। তুরস্কের শিক্ষায় তাহারা শিখিতে চাহেন নাই।

আরেক দল মুসলমান মনে করেন বিদ্যমান রাষ্ট্রের মধ্যে কিছু কাটছাঁট করিয়াই রফা করিতে হইবে। আবার গঠিতে হইবে। ইঁহারা জানেন খেলাফতের দাবিটা পুরণ করা কঠিন, মায় একপ্রকার অসম্ভব। তাই ইঁহারা জাতীয় রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে এসলামি আইন প্রতিষ্ঠায় মন দিবেন। এসলামি আইন করিতে হইলে যে জনমত সংগ্রহ করা দরকার তাহা পাইলেই হইত । সে আইন, সে দিল্লি হনুজ দূর আস্ত! তাহারা মানেন পাকিস্তানে সেনাপতি জিয়াও এসলামি শাসন কায়েম করিয়াছিলেন।

সর্বশেষ একদল মনে করেন রাষ্ট্রের তেল আর ধর্মের জল কদাচ এক হইবার জিনিশ নহে। তাহারা এসলামের কল্যাণ এই পথেরই কোন এক জায়গায় দেখিতে পাইয়াছেন। খোদ একবাল আহমেদকে এই পথের পথিক বলা যায়। আমাদের যুগের বেশির ভাগ মুসলমানও এই পথেই চলিয়াছেন।

একটা কথা ভুলিলে বিপদ। এসলামধর্ম বিশেষ ভুঁইফোড় পদার্থ নহে। ইহার ইতিহাস আছে। আর এসলাম একটা ধর্মমাত্রও নহে। এসলাম একপ্রস্ত সভ্যতা। এই সভ্যতা আরব্য সভ্যতা মাত্র নহে। ইহার মধ্যে আরবদেশ বা মধ্যপ্রাচ্য মাত্র নাই। আছে ইরান, তুরান, ভারত, বাংলা, চিন, ইন্দোচিন, আরও কত সভ্যতা! এয়ুরোপিয়া সভ্যতার নাহান এসলামেও বাম আছে, ডান আছে। আছে প্রগতিশীল। রক্ষণশীল আছে।

যাহারা এসলাম বলিতে ‘এক নেতা এক দেশ’ শ্লোগানের মতন একটা একাট্টা আওয়াজ মাত্র মনে করেন তাহারা এয়ুরোপের অসহিষ্ণু ফ্যাসিবাদের এসলামি সংস্করণ মাত্র চালু করিতে চাহেন। তাহারা ‘এসলামবাদী’ বলিয়া পরিচয় জাহির করেন। বিন্দুমাত্র ভিন্নমত পুষিলে বলেন, ‘তুমি অমুসলমান’। আসলে ইহারা ফ্যাসিবাদী। এই এসলামি ফ্যাসিবাদীরাই আজিকালি বলিতেছেন বাংলামুলুকের মানুষ দুইভাগে ভাগ হইয়া গিয়াছে। একদল আছেন ‘বাংগালি জাতীয়তাবাদী’ আর আছেন অন্যদল ‘মুসলমান’। এইভাবে তাহারা মুসলমান জগতে গৃহযুদ্ধ বাধাইবার জন্যও কাজ করিতেছেন। তাহারা ভুলিয়া গিয়াছেন রাষ্ট্রকে আলাদা রাখিয়াও এসলামধর্ম বাঁচিয়া আছে। আর জাতীয় রাষ্ট্রের মধ্যেও তাহার কবর হইবে না।

কথায় বলে না প্রত্যেক কারবালার পর এসলাম আবার জিন্দা হইয়া উঠে ।

৬ মার্চ ২০১৩

দোহাই

Eqbal Ahmed, ‘Islam and Politics,’ in M. Asghar Khan, ed., Islam, Politics and the State: The Pakistan Experience (London: Zed Press, 1985), pp.13-30.

 

৬ মার্চ ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ২৬

সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিষম পরিণাম

গতকাল (অর্থাৎ সোমবার) রাত্রে বেগম খালেদা জিয়ার একটি বিবৃতি প্রচার হইয়াছে। তিনি দাবি জানাইয়াছেন গত কয়েকদিনে — বিশেষ ২৮ ফেব্রুয়ারি হইতে শুরু করিয়া — দেশের স্থানে স্থানে হিন্দু জনগণের বাড়িঘর ও মন্দিরে মণ্ডপে যাহারা হামলা করিয়াছে তাহাদের খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে। তিনি স্বীকার করিয়াছেন, এই কয়দিনে ‘বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও উপাসনালয় হামলা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের বেশ কয়েকটি ঘটনার কথা’ তিনি জানিতে পারিয়াছেন। এই অপতৎপরতা কঠোর হাতে দমনের জন্য প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ডাক দিয়াছেন।

কে বা কাহারা এই সকল ঘটনা ঘটাইতেছে সে বিষয়ে তিনি কিছু বলিয়াছেন বলিয়া মনে হইল না। তিনি শুদ্ধমাত্র দোষ দিয়াছেন ‘গণবিচ্ছিন্ন’ শাসকদের। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করিবার চেষ্টা বিভিন্ন সময়ে গণবিচ্ছিন্ন শাসকরা করিয়া আসিয়াছেন — এ সত্যে কাহারও সন্দেহ নাই। তাহা হইলে তিনি কি বলিতে চাহিতেছেন এই মুুুহূর্তে হামলা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের অপকর্মগুলিও বর্তমান ‘গণবিচ্ছিন্ন’ শাসক অর্থাৎ শেখ হাসিনার সরকার করিয়াছেন? ঘটনা সত্য হইলে তিনি বলিবেন না কেন, একশত বার বলিবেন। বলা তাঁহার অধিকার মাত্র নহে, কর্তব্যও।

প্রশ্ন হইতেছে, আমরা কেন তাঁহার কথায় কান দিব? কেন তাঁহাকে বিশ্বাস করিব? হামলায় যাহারা ক্ষতিগ্রস্থ হইয়াছেন তাহারা কি বলিতেছেন তাহা কেন শুনিব না? বেগম জিয়ার সহিত তাহারও কি একমত হইবেন যে সরকারই এই হামলার পিছনে? আমাদের মনে হয় বেগম জিয়া কিছু একটা আড়াল করিতেছেন। যাহাকে তিনি আড়াল করিতেছেন সেই বস্তুর নামই ‘সাম্প্রদায়িক রাজনীতি’। রাজনীতিতে যাহারা সাম্প্রদয়িক পরিচয়টা বড় করিয়া তুলিতে চাহেন, যাহারা সংখ্যাগুরুত্বের বখরাটা কড়ায় গণ্ডায় আদায় করিবার লোভে তথাকথিত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিক অধিকার হরণ করিতে উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছেন তাহারাই যে এই হামলা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের পিছনে এই সত্যটাই কি বেগম জিয়া গোপন করিতে চাহিতেছেন? তাঁহার বিবৃতি পড়িয়া আমাদের ইহাই মনে হইয়াছে। কেন? বলিতেছি।

বেগম খালেদা জিয়া নিশ্চয় স্বীকার করিবেন সারাদেশে হিন্দুদের বাড়িঘর মন্দির মণ্ডপে যাহারাই হামলা করিয়া থাকুক না কেন, তাহাদের কারণে এদেশের সকল মুসলমানকে দোষ দেওয়া যাইবে না। কিন্তু যাহারা মুসলমান পরিচয়কে বড় করিয়া হিন্দুদের বাড়িতে হামলা চালায় তাহারাই ‘সাম্প্রদায়িক মুসলমান’। তাহারা কেন হিন্দুদের বাড়িতে হামলা করে? কারণ কি এই যে হিন্দুরা এই দেশে ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ কায়েম করিতে চাহেন? নহিলে কি চাহেন তাহারা? তাহারা চাহেন (অন্যান্য দ্রব্যের মধ্যে) ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’, তাহারা চাহেন ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’। এই তো তাহাদের অপরাধ?

‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ কথাটা অনেক অপব্যাখ্যা হইয়াছে। অপব্যবহারও কম হয় নাই। ‘জাতীয়তাবাদ’ কথাটারও ঢের অপপ্রয়োগ হইয়াছে। এখনো কম হইতেছে না। বাংলাদেশের ইতিহাসে একটা চিহ্ন আছে যাহা হইতে এই দুইটা কথার অর্থপ্রকার নির্ণয় করা সম্ভব। কিন্তু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কাণ্ডারীগণ তাহা করিতে চাহেন না। তাহারা বুঝিতেই চাহেন না এদেশে একাধিক ধর্মের মানুষ আছে। কিন্তু রাষ্ট্র আছে মাত্র একটি। তাই রাষ্ট্রের ক্ষেত্র হইবে ধর্মনিরপেক্ষ। সহজ কথা।

ভারতবর্ষের কমিউনিস্ট দলের প্রতিষ্ঠাকালের নেতা মুজফ্ফর আহ্মদ ১৯২৬ সালে লিখিয়াছেন, ‘একটি ধর্মের নিয়ম-কানুনের সহিত আর একটি ধর্মের নিয়ম-কানুনের প্রায়ই মিশ খায় না। অধিকাংশ স্থলে এ নিয়ম-কানুনগুলি পরস্পরবিরোধী হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ধর্ম জিনিসটা বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর পক্ষে ব্যক্তিগত সাধনার বস্তু হলে তা সহ্য করতে পারা যায়। কিন্তু তা না করে যখনি আমরা আমাদের ধর্মকে অপর ধর্মাবলম্বীর সহিত বোঝাপড়ার ব্যাপারে পরিণত করি তখনই ধর্ম সাধারণভাবে সমগ্র দেশের পক্ষে অসহ্য হয়ে উঠে।’

যে ধর্মের সংকীর্ণতা সে ধর্মের মধ্যে থাকিয়াই উদার হইতে পারে। আবার সংকীর্ণও হইতে পারে। কিন্তু দেশের নানান ধর্মাবলম্বী লোকের একটা সাধারণ মিলনক্ষেত্রও দরকার। এই রকম একটা মিলনক্ষেত্র এমনিতেই তৈয়ার হইয়াছে। দুনিয়াদারি বা অর্থনীতি বলিয়া তাহার পরিচয়। হিন্দু আর মুসলমানে একত্রে ব্যবসায় বাণিজ্য করিতে অসুবিধাটা কোথায়? কিংবা বৌদ্ধে আর খ্রিস্টানে? অর্থনৈতিক জীবন গড়িয়া ভরিয়া উঠিতে হইলে ইহার অন্যথাও নাই। অর্থনীতির মতন সমস্বার্থে যে যে ক্ষেত্রে মানুষ মিলিত হয় সে সে ক্ষেত্রের ন্যায় রাষ্ট্রীয় জীবনও আরেকটা ক্ষেত্র বৈকি।

একদা এয়ুরোপে অর্থনীতি ও রাষ্ট্র দুইটাকেই ‘সিবিল সোসাইটি’ বা ‘জাতীয় সমাজ’ বলিয়া ডাকিত। আজিকালি প্রথম ক্ষেত্রকে ‘জাতীয়‘ বলে আর দুই নম্বরকে বলে ‘রাষ্ট্রীয়’। এই দুইটার বাহিরের ক্ষেত্রে ধর্মের ক্ষেত্র থাকিবে। ব্যক্তি জীবন ও পরিবার যে ক্ষেত্রে সেখানে ধর্মক্ষেত্র অবস্থিত হইবে। মুজফ্ফর আহ্মদ দুঃখ করিয়া লিখিয়াছিলেন, আমাদের দেশে সেই ১৯২০ সালের পরও তেমন (ধর্মনিরপেক্ষ) রাষ্ট্রীয় জীবন গড়িয়া উঠে নাই। তাই ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্র হইয়া পড়িয়াছে।

কেন রাষ্ট্রীয় মিলনক্ষেত্র গড়িয়া উঠিল না? কেন সাম্প্রদায়িক গণ্ডিগুলি ভাঙ্গিয়া পড়িল না? মুজফ্ফর আহ্মদ এই প্রসঙ্গে লিখিলেন, ‘কিন্তু এমন একটা প্রচেষ্টা আজ পর্যন্ত করা হয়নি। কংগ্রেসের ভিতর দিয়ে এরূপ রাষ্ট্রীয় জীবন গড়ে উঠা উচিত ছিল বটে, কিন্তু তা হয়নি।’

কেন হয় নাই তাহা জানিতে তিনি দুইটা কথা যোগ করিলেন: ‘প্রথম কথা, কংগ্রেসের সহিত কখনো দেশের সর্বসাধারণের জীবনের যোগ সাধিত হয়নি। ভদ্র ও অভিজাত লোকেরাই কংগ্রেসের সর্বেসর্বা, জনসাধারণ তার কেউ নয়। দ্বিতীয়ত, মহাত্মা গান্ধী কংগ্রেসকে একটা ধর্মচর্চার ক্ষেত্র করে তুলেছিলেন।এই অসম জিনিসের একত্র সমাবেশ করার চেষ্টার অবশ্যম্ভাবী বিষময় ফল এখন দেশে ফলেছে।’

মুজাফ্ফর আহ্মদ যে ‘বিষময়’ ফলের কথা লিখিয়াছিলেন সেই ফল এখন পাকিয়াছে। শুদ্ধমাত্র পাকে নাই ফাটিয়াও গিয়াছে। পাকিস্তান হইয়াছে। আবার এদিক বাংলাদেশও হইয়াছে। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার বিষম পরিণতি আরো পরিণত হইয়াছে।

কবি ফরহাদ মজহারকে আমি এতদিন মোটামুটি ‘শিক্ষিত’ লোক বলিয়াই জানিতাম। কথাটা এমন ফলাও করিয়া বলিবার বিষয় হইত না। (পাছে কেহ অপরাধ লইবেন বলিয়া ভয়েই বলিতেছি আমি নিজে কিন্তু বড় শিক্ষিত ব্যক্তি নহি)। তিনি সম্প্রতি এক বক্তৃতায় দাবি তুলিয়াছেন রাজনীতির ক্ষেত্রেও (তাঁহার ভাষায় ‘রাজনৈতিকতা ও রাষ্ট্রের স্তরে’) এসলামকে স্বীকার করিতে হইবে। কেন করিতে হইবে? কারণ দেশের মানুষ ‘ধর্মপ্রাণ’। মানুষ মানে কি তাহা হইলে মাত্র মুসলমান? এই প্রশ্নের কোন উত্তর নাই।

মুজফ্ফর আহ্মদ যে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়াছিলেন (আজ হইতে মাত্র ৮৭ বছর পূর্বে) সরাসরি তাহার বিপরীত কোটিতে দাঁড়াইয়া কবি গাহিয়াছেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ’ আর ধর্ম তাহাদের ‘আত্ম-পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।’ ‘আত্ম-পরিচয়’ বলিতে কি বুঝাইতেছেন তিনি? পরের বাক্যেই তাহা পরিষ্কার হইয়াছে। এই পরিচয় তাঁহার মতে রাজনীতির ক্ষেত্রেও প্রসারিত হইবে। ফরহাদ মজহার বলিয়াছেন: ‘সমাজ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্র অতিক্রম করে ভাষা ও সংস্কৃতিকে যদি রাজনৈতিকতা ও রাষ্ট্রের স্তরে উন্নীত করে আপনি দাবি করেন, এই স্তরে —  অর্থাৎ আপনার রাজনৈতিক পরিচয়ে শুধু ‘বাঙালিত্বই’ স্বীকার করা হবে ইসলামকে স্বীকার করবেন না। তখন আপনি যেমন ভাষা ও সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক ঝাণ্ডা বানিয়ে সামনে দাঁড়ান, তখন আপনি চান বা না-চান, প্রতিপক্ষ হিসাবে ইসলামও তার ধর্মের ঝাণ্ডা নিয়ে সামনে দাঁড়ায়। দাঁড়াতে বাধ্য। দাঁড়াবার শর্ত তৈরি হয়ে যায়।’

‘শিক্ষিত’ লোক হইয়াও ফরহাদ মজহার সারা পৃথিবীকে কি করিয়া এহেন নির্বোধ ভাবিলেন ভাবিয়া অবাক হইতে হয়। একমুখে বলিতেছেন ‘বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ’ ‘অবশ্যই ভাষা ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে বাঙালি’; আবার একই নিঃশ্বাসে দাবি করিতেছেন ‘একই সঙ্গে ধর্মও তাদের সংস্কৃতির অংশ’ বা ‘ধর্ম তাদের আত্ম-পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান’। ইংরেজি জবানে এই ধরনের তর্ককেই বলে সোফিস্ট্রি, বাংলায় বলা যায় কুতর্ক। সমস্যাটা কোথায় ছিল আর সেটাকে কোথায় লইয়া আসিলেন?

‘ইসলাম’ যদি ঝাণ্ডা লইয়া দাঁড়ায়, হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম বা খ্রিস্টধর্ম কেন দাঁড়াইবে না?

সমস্যাটা ছিল একটা সাধারণ সূত্র পাওযার। কিভাবে সকল ধর্মাবলম্বী লোকের উপযোগী ‘একটা সাধারণ মিলনক্ষেত্র’ সৃষ্টি করা যায়? এই সাধারণ মিলনক্ষেত্রের নামই রাখা হইয়াছে রাষ্ট্রীয় জীবন। বাংলাদেগের ধর্মপ্রাণ মানুষের আত্ম-পরিচয় কি, শুদ্ধমাত্র মুসলমান? খ্রিস্টান কি বৌদ্ধ কি কম ধর্মপ্রাণ? কিংবা হিন্দু জনগণ কি ধর্মপ্রাণ শব্দটার অর্থ বোঝেন না? অহংকারটা কি এখানে সংখ্যার নহে?

আপনি যদি ক্ষমাহীন সাম্প্রদায়িক না হইয়া থাকেন তাহা হইলে কি করিয়া বলিতে পারেন ‘বাঙালি’কে এইভাবে দুইভাগে বিভক্ত করা সম্ভব। যাহার ‘একদিকে [থাকিবে] বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা আর অন্যদিকে ইসলাম ও ধর্মের মর্যাদা রক্ষার জন্য ধর্মপ্রাণ মানুষ’? বাঙালি জাতীয়তাবাদী হইলেই মানুষ কি অমুসলমান হইয়া যাইবে?

আপনার বাক্য যদি সত্য হয় তো কবুল করিতে হইবে ‘বাঙালি’ শব্দের অর্থও ‘অমুসলমান’ হইয়া গিয়াছে। আপনি লিখিয়াছেন, ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি বাংলাদেশের মানুষকে “বাঙালি” ও “মুসলমান” — এই দুই ভাগে ভাগ করে গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে দিয়েছে। মানুষের ধর্মানুভূতিকে আহত করা হয়েছে।’ আশ্চর্য আপনার সাম্প্রদায়িকতা। ইহার পরিণাম শুদ্ধমাত্র দাঙ্গা নহে, সত্য সত্য গৃহযুদ্ধ। মুসলমানে মুসলমানে।

মনে রাখিতে হইবে ‘বাঙালি’ শব্দটিও প্রাকৃতিক কিংবা স্বাভাবিক শব্দ নহে। শব্দটি ঐতিহাসিক। বাংলা ভাষায় কথাবার্তা যাহারা বলেন তাহারাই ‘বাঙালি’। এই রকম একটা ধারণা হইতে ইহার শুরু। কিন্তু ইহার একটা বিকাশও ঘটিয়াছে। একদা বাঙালি বলিতে কেবল বাংলাদেশের (বর্ণ) হিন্দুজাতি বুঝাইত। অন্তত ১৯৪৭ সালের পর বা তাহারও কিছু আগে হইতে বাংলাদেশের ‘ধর্মপ্রাণ’ মুসলমানরাও নিজেদের পরিচয়ের অংশ হিশাবে ‘বাঙালি’ কথাটা এস্তেমাল করিতে শুরু করিয়াছিল। ইতিহাসের যে সন্ধিক্ষণে এই আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান শুরু হইয়াছিল তাহার চাপে বাংলাদেশের হিন্দু ও মুসলমান আলাদা আলাদা রাষ্ট্রে ছড়াইয়া পড়ে। পূর্ব বাংলার ‘বাঙালি‘ একসময় পাকিস্তানের ‘ইসলামী’ রাষ্ট্রকে বলিয়া দিল ‘আস্সালামু আলাইকুম’। মুসলমান হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ছাড়াও বাংলাদেশের অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষও আছেন। তাহারা পাকিস্তান যুগের জাতীয় সংগ্রামে ধর্মীয় সংকীর্ণ গণ্ডি ছাড়াইয়া হইয়া উঠিয়াছিলেন ‘বাঙালি’। তাই ‘বাঙালি’ পরিচয়টা ছিল যতটা না ধর্মীয় বা নৃবর্গীয়, তাহার অধিক রাষ্ট্রীয়। ফরহাদ মজহার ইতিহাসে অন্ধ ব্যক্তি। এই অন্ধকার ঘোর কলির অন্ধকার।

বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইবার পর বিশেষ করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় এবং দেশের উত্তর আর উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে যে সকল জাতি নিজেদের অধিকারের জন্য লড়িয়াছেন তাহাদের লড়াই ন্যায়সংগত। তাহারা ধর্মে যেমন মুসলমান নহেন, বর্ণেও তেমনি বাঙালি নহেন। তাই রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে তাহাদের পরিচয় হইল ‘বাংলাদেশি’। তাহাদের কল্যাণেই ’বাঙালি’ বলিয়া কথিত সংখ্যাগুরু বর্ণটিও (জাতিও বলিতে পারেন) এতদিনে হইয়াছে বাংলাদেশ। কাগজে কলমে এই তো। বাংলাদেশের নাগরিক মাত্রই কি ১৯৭২ সন হইতে ‘বাংলাদেশি’ নহেন? আপনার পাসপোর্টে পরিচয় কি লেখা থাকে?

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ‘বাঙালি’ পরিচয়টা জন্মাইয়াছিল হিন্দু ও মুসলমানের — অমুসলমান ও মুসলমানের — স্ব স্ব সংকীর্ণ গণ্ডি ছাড়াইয়া উঠিয়া একটা বড় ‘জাতীয়’ বা ‘রাষ্ট্রীয়’  পরিমণ্ডল সৃৃষ্টি করিবার লক্ষ্যে। তাহার পরিণতিতেই এক পর্যায়ে ‘বাংলাদেশ’ নামক বর্তমান রাষ্ট্রটি জন্মলাভ করিয়াছে। এসলামের ঝাণ্ডা হাতে লইয়া কি নাঙ্গা তলোয়ার উঁচাইয়া আজ আপনার মতন যে  বা যাঁহারা লড়াইতে নামিয়াছেন তাঁহারা এই প্রজাতন্ত্রের গোড়ায় — ধর্মনিরপেক্ষতায় — আঘাত করিতেছেন। বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে হিন্দু জনসাধারণের গতরে গায়ে যাহারা হাত তুলিতেছে তাহারা প্রজাতন্ত্রের এই ধর্মনিরপেক্ষ গণ্ডিটির গলার ছুরি জোরে জোরে চালাইতেছেন। ভাবিতেছেন ইহাতেই ‘বাঙালি’ জাতীয়তাবাদ ধুলায় মিশিয়া যাইতেছে।  বড়ই আপসোসের কথা।

বেগম খালেদা জিয়া যাহাদের খুঁজিয়া বাহির করিবার আহ্বান জানাইয়াছেন তাহাদের এই আঘাতদাতাদের মধ্যেই পাওয়া যাইবে। এসলামের ঝাণ্ডা উড়াইয়াও এই হীন অপরাধ ঢাকা যাইবে না। সাম্প্রদায়িকতার পরিণাম বিষম।

মার্জার বলিয়া একটা প্রাণী কবিদের মধ্যে বড়ই প্রিয়। এই প্রাণীর অপর নাম বিড়াল। সে আপনার কাটা জিহ্বার রক্ত আপনি চাটিয়া সুখ পাইয়া থাকে। সাম্প্রদায়িকতাবাদীর আত্মপ্রসাদ সেই মার্জারের রক্তসুখের মতন। তাহাতে রক্তের পিপাসা মিটিবে কিন্তু জিহ্বাও খসিয়া পড়িবে।

৫ মার্চ ২০১৩

দোহাই

১. মুজফ্ফর আহমদ, ‘সাম্প্রদায়িকতার বিষম পরিণাম,’ নির্বাচিত প্রবন্ধ (কলকাতা: ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, ২০১১), পৃ: ৪৪-৪৮।
২. ফরহাদ মজহার, ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পরিণতি,’ চিন্তা, ২ মার্চ ২০১৩।

 

৫ মার্চ ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ২৫

গুজব না গজব: স্বাধীনতার সংকট

‘পরাধীন ভারতবর্ষে চাষীর লড়াই’ নামা সুবিখ্যাত ইতিহাসের লেখক রণজিৎ গুহ একদা লিখিয়াছিলেন, গুজব না ছড়াইয়া পৃথিবীর ইতিহাসে নিচুতলার মানুষ কোনদিন কোন বড় আকারের বিদ্রোহ ঘটাইতে পারে নাই। তিনি প্রাচীন রোম হইতে একালের এয়ুরোপ ও আফ্রিকা হইয়া পরাধীন ভারতের যুগ-পর্যন্ত ইতিহাস ঘাঁটিয়া দেখাইয়াছেন যে সকল দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে অক্ষর পরিচয় ব্যাপক হয় নাই সে সকল দেশে গুজবের প্রকোপ বেশি। বড় গুজব ছাড়া বড় বলাৎকারের ঘটনা ঘটানো একপ্রকার অসম্ভবই বলিতে হইবে।

গত শনিবার দিবাগত রাত্রে — মার্চের এক তারিখ পার হইবার রাতে — চট্টগ্রাম হইতে নদীয়া পর্যন্ত গুজব ছড়াইয়া পড়িয়াছিল মৌলবি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী চাঁদে দাঁড়াইয়া আছেন। ১৮৩২ সালের কোল বিদ্রোহে, ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহে, এমন কি খোদ ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামেও এই ধরনের বহু গুজব ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। ফরাশি বিপ্লবের আগের দশ বছরে ফরাসিদেশের গ্রামে গ্রামে চাষীদের লড়াইয়ে গুজব বড় ভূমিকা পালন করে। ১৮৩০ সালেও বিলাতের কৃষক বিদ্রোহে গুজব বড় ভূমিকায় অভিনয় করে।

সচরাচর গুজব প্রথম কে ছড়াইয়া দেয় তাহার কোন হদিশ পাওয়া যায় না। সাঈদীর গুজবের সহিত তুলনা করিলে একটা প্রভেদ চোখে পড়িবে।

এবারের গুজব ছড়াইয়া পরে গত শনিবার গভীর রাত্রে। পত্রিকায় লিখিয়াছে, শনিবার রাত বারোটার পর সাতকানিয়া উপজেলার বিভিন্ন মসজিদ হইতে সাঈদীকে চাঁদে দেখা যাইতেছে বলিয়া মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়। ঝিনাইদহের অনেক এলাকায়ও মাইকিং করা হয়।

গুজবের কারণেই বিপুল জনসাধারণ রাস্তায় নামিয়া আসিয়াছে। এই সত্যে সন্দেহ নাই। কিন্তু এই সত্যের তলায় আরও সত্য আছেন কিনা ভাবিয়া দেখিতে হইবে। গুজব — বিদ্বানেরা বলেন — হইতেছে সমাজ মনের ভাষা। সমাজে কি চলিতেছে তাহার খবর শহরের টেলিভিশন ধরিতে পারে না। গুজবই তাহার প্রমাণ। আমি জানি আলেম সমাজ বলিয়াছেন সাঈদীকে চাঁদে দেখা গিয়াছে এহেন কথার কোন ভিত্তি শরীয়তে নাই। যাহারা এহেন বক্তব্য প্রচার করিতেছেন তাহাদের ঈমান নষ্ট হইয়া যাইবে। সবই সত্য। তাহার পরও কথা থাকিয়া যায়।

কথা হইতেছে, বাংলাদেশ স্বাধীন প্রজাতন্ত্র আকারে গঠিত হইবার চল্লিশ বছর পরও দেশে এ ধরনের গুজবে কান দিবার মত এত মানুষ কিভাবে থাকিয়া গেল? আরও কথা আছে, গুজবে কান দিতে যাহারা তৈয়ার থাকে, তাহারা কেন তৈয়ার থাকিবেন ?

আমাদের রাষ্ট্র জনসাধারণ হইতে বেশ তফাতে বসবাস করিয়া থাকে। এই তফাত কতখানি তাহা পাঁচ দশ বৎসর পর পর যে নির্বাচন অনুষ্ঠানাদি হইয়া থাকে তাহাতে পুরাপুরি ধরা পড়ে না। গুজবে এই তফাতটা খানিক মাপা যায়। গুজবের বিষয়টা কি তাহাও দেখিতে হইবে। কিন্তু এক্ষণে আমি গুজবের ‘প্রকার’ নিয়া কথা বলিতেছি না। বলিতেছি ‘আকার’ নিয়া।

সকলেই জানে বাংলাদেশ এখনও চাষাভুষার দেশ। ভদ্রলোকের ভাষায় আমাদের সমাজ কৃষক সমাজ। এমনকি শহরে যে বিপুল ভাসমান জনসমাজ তাহাও কৃষক জনসমাজ। কি ভাষায় কি ভাবে। সমাজে প্রতিদিন নতুন নতুন কথা যোগ হইতেছে কিন্তু ভাষা বদলাইতে আরও সময় লাগে। আমরা দেখিয়া শুনিয়া মনে হইতেছে তাসের ঘরে বসিয়া আছি। কথাটা খুলিয়া বলা দরকার।

এমন এক সময় ছিল বাংলাদেশের মাটিতে জমিদারশ্রেণি রাজত্ব করিতেন। জমিদারদের মধ্যে হিন্দু ছিলেন, মুসলমানও ছিলেন। ইংরেজ জাতির অধীনে চলিয়া যাইবার পর এই ব্যবস্থায় পাকা হইল। কলিকাতা হইতে নিলামে জমিদারি কিনিয়া অনেকে নতুন জমিদারও হইলেন। দেশের বাদবাকি জনসাধারণের সকলকে জমিদাররা এক কথায় ‘প্রজা’ বা ‘চাষী’ বলিতেন। কিন্তু চাষীদের মধ্যেও নানান অর্থপ্রকার তৈয়ারি হইতেছিল। দেশ যখন ‘স্বাধীন’ হইল তখন অনেক ‘প্রজা’ জমির ‘মালিক’ হইলেন।

দেখা গেল চাষীর দেশে ধনী, মাঝারি ও ছোট চাষী ছাড়াও আরও মানুষ আছে। গ্রামে শতে পঞ্চাশ লোকের কোন জমি নাই। তাহারা খেতে-খামারে কাজ করে। মোট বহন করে, কাঠ কাটে। এই রকমই আমাদের গ্রামের সমাজ। কেহ এখন রিকশা চালাইতেছে, কেহ ধান ভাঙ্গার কলে খাটিতেছে। কৃষক সমাজের এই স্তরভেদ দেখিলেই বুঝা যাইবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মত ‘জাতীয়তাবাদী’ দল বড় ও মাঝারি চাষীর গায়ে ভর দিয়া দাঁড়াইয়া আছে। মানে তাহাদের নীতিতে এই বড় চাষীরাই জেতেন।

গ্রামে আরও মানুষ আছে। তাহারা শুদ্ধ ভোট দেয়। কখনও তাহাদের কাজ থাকে। কখনও কাজ নাই। বাংলাদেশের ‘জাতীয়’ রাজনৈতিক দলগুলি ইহাদের ভোট লইয়া দেশ চালায়। প্রমাণিত হয় জনপ্রিয়তা। এই জনপ্রিয়তার ভিত্তি কত যে ঠুনকা তাহা কেবল সংকটের সময় বুঝা যায়।

আজ যে সংকট দেখা যাইতেছে তাহাতে বুঝা যায় এদেশের শাসক মহাজনেরা দেশের খবর রাখেন না। তাই জনসাধারণ তাহাদের কানে গুজব দেয়। গুজব শব্দটির সহিত গজব শব্দটির মিল আছে। এই মিল হইতে পারে আপতিক। তাহার পরও বলিব, ইহা গজবই।

কেহ কেহ বলিতেছেন দেশের যে যে এলাকায় জামায়াত ও বিএনপির শক্তি বেশি সে সে এলাকায় পুলিশের সহিত সংঘর্ষ তীব্র হইয়াছে। দেখা যাইতেছে খালি দেশের উত্তরাঞ্চলেই এই সংঘর্ষ তীব্রতর হয় নাই, দক্ষিণ-পূর্বেও, দক্ষিণ-পশ্চিমেও। এক কথায় গ্রামঞ্চলে, মফস্বলে সংঘর্ষের মাত্রা বাড়িয়াছে। প্রাণহানির সংখ্যা বৃদ্ধি পাইয়াছে। সংঘর্ষের আরও কয়েকটি চেহারা চোখে না পড়িয়া যাইবে না। চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে জনতা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির একটা সাবস্টেশন পোড়াইয়া দিয়াছে। তাহাতে এলাকার সেচ কার্য পর্যন্ত বন্ধ হইতেছে। এখানে গ্রামাঞ্চলে শ্রেণি সংগ্রামের একটা হালকা ছায়া চোখে পড়ে।

বড় ভূমিকম্পের আগে যেমন ছোট ছোট কম্পন হয় এবারের সংকটের সহিত সেই ছোট ছোট কম্পনের তুলনা করা যায়। দুর্ভাগ্যের মধ্যে এবার এই চাষীদের মধ্যে গুজব ছড়াইয়াছে এমন একটি দল যাহারা দেশের জন্য ‘গজব’ বিশেষ। তাহারা মুসলমানকে লাগাইতেছে হিন্দুর বাড়িতে, হিন্দুর মন্দিরে হামলার কাজে। ১৯৭১ সালের মহাযুদ্ধের আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনী শত চেষ্টা করিলেও বাংলাদেশে একটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধাইতে পারে নাই। এতক্ষণে ইহারা পারিতেছে। কেন পারিবে?

গ্রামাঞ্চলে শ্রেণি বিভাজন আগেও ছিল। দেশ স্বাধীন হইবার পর এই বিভাজন কমে নাই। বরং বাড়িয়াছে। এতদিনে আর জমিদার নাই। আছে ধনী কৃষক ও মাঝারি কৃষক। আছে গরীব কৃষক ও কৃষি মজুর। আছে ভাসমান জনগোষ্ঠী। স্বাধীনতার রাজনৈতিক আদর্শ দেশকে এক জায়গায় আনিয়াছিল।

শুদ্ধ জামায়াতকে দোষ দিয়া পার পাওয়া যাইবে না। স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা ব্যবসায় যে একবস্তু নহে তাহা বুঝিতে হইবে। দেশ স্বাধীন হইয়াছিল সকলের জন্য। এখন যেন মনে হয় দেশটা স্বাধীন হইয়াছে শুদ্ধ ব্যবসায়ীদের জন্য। ইহার মূল্য দিতে হইবে না?

একটা জিনিশ চোখে পড়িবে। শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে যে সমৃদ্ধির জোয়ার দেখা দিয়াছে তাহাকে বলা হইতেছে বার্ষিক এত এত শতকরা হারে প্রবৃদ্ধি। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যেও নানা স্তর আছে। আজ সেই আলোচনার জায়গা নাই। শুদ্ধ তফাতটাই দেখিতে বলিতেছি।

গ্রামের চাষীদের মধ্যে যে ক্ষোভ তাহাকে পুঁজি করিয়াছে এমন একটি শ্রেণি যাহারা নিজেরাই শহরের নিম্নমধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্তের জোট হইতে তৈয়ার হইয়াছেন। তাহারা জনসাধারণকে এসলামের কলা দেখাইতেছেন। এই কলাই গুজব আকারে চাঁদে গিয়া দাড়াইয়াছে।

এই ধরনের নিয়তিকেই গ্রীক পুরাণে বলা হইত ট্রাজেডি। বাংলায় আমরা বলি নিয়তি। নিয়তি মানে মনে রাখিতে হইবে যাহার ‘য়তি’ অর্থাৎ ‘যতি’ নাই। যাহার পরিণতিতে যতি নাই বাংলায় তাহাকেই আমরা ‘নিয়তি’ বলিয়া থাকি।

৪ মার্চ ২০১৩

৪ মার্চ ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ২৪

ফরহাদ মজহারের মানবাধিকারধর্ম

ফরহাদ মজহার দেশের প্রথিতযশা কবি। আমিও তাঁহার কবিতার গুণমুগ্ধ পাঠককুলে বাস করি। তাঁহার ‘এবাদতনামা’ বাংলার সাহিত্যাকাশে ইহারই মধ্যে কালপুরুষ বা আদমসুরতের স্থান গ্রহণ করিয়াছে। বর্তমান সরকার কি তাহার আগের সরকার কেইই তাঁহার প্রতিভার উপযুক্ত সম্মান দেন নাই। উদাহারণস্বরূপ বলা যায়  তিনি কোনদিন বাংলা একাডেমী পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের সুযোগ পর্যন্ত পান নাই। তাঁহার লেখার আলোচনাও বিশেষভাবে চোখে পড়ে না। দেশের মধ্যবিত্তসমাজ তাঁহাকে একপ্রকার বর্জন করিয়াছেন বলিয়াই মনে হয়। হয়তো অন্যান্যের মধ্যে এই কারণেও তিনি এদেশের ডানপন্থী এসলামবাদীদের পত্রপত্রিকায় লিখিতে বাধ্য হইয়াছেন।

দৈনিক ‘আমার দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে সম্প্রতি তিনি নিজের পরিচয় দিয়াছেন ‘মানবাধিকার কর্মী’ আকারে। সেই নিবন্ধে তিনি ‘হত্যাযজ্ঞ’ বন্ধের আবেদন জানাইয়াছেন। আমরা তাঁহার আবেদনের সহিত সহমর্মিতা প্রকাশ করি। তবে শুদ্ধ একটা বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিতে চাহি। এই ‘হত্যাযজ্ঞ’ — যাহাকে ‘গণহত্যা’ বলিয়াছেন বেগম খালেদা জিয়া — শব্দটি তিনি কেন ব্যবহার করিয়াছেন? নিশ্চয়ই তিনি ‘গণহত্যা’ কথাটি ব্যবহার করা যুক্তিযুক্ত মনে করেন নাই। ইংরেজি ‘ম্যাসাকার’ কথাটির নিকটতম বাংলা বোধ হয় ‘হত্যাযজ্ঞ’ই হইবে — ‘গণহত্যা’ হইবে না। গণহত্যার ইংরেজি যদ্দূর জানি ‘জেনোসাইড’। অনেকে আবার ‘রেপ’ বা বলাৎকারও বলিয়া থাকেন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলিয়াছেন ২৮ ফেব্র“য়ারির (বা পরের) ঘটনাবলিকে ‘গণহত্যা’ বলিলে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশে যে নৃশংসতা দেখাইয়াছিল তাহাকে ছোট করা হয়। হয়তো সেইজন্যই ফরহাদ মজহার ‘গণহত্যা’ না বলিয়া ‘হত্যাযজ্ঞ’ বলাটা বাছিয়া লইয়াছেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের ‘অপারেশন সার্চলাইট’ বা ‘সন্ধানী আলো’ অভিযান শুরু করিবার যুক্তি আকারে পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশের বিক্ষোভকারীদের হাতে এক লাখ ‘অবাঙালি’ হত্যাযজ্ঞের দোহাই দিয়াছিলেন। ফরহাদ মজহার সেই ইতিহাস নিশ্চয় ভুলিয়া যান নাই।

ফরহাদ মজহার একটা বিষয়ে বলিতে গেলে কিছুই বলিলেন না দেখিয়া অবাক হইলাম। রাষ্ট্র যখন নাগরিক বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে তখন আমরা সঙ্গত কারণেই ব্যথিত হই। কিন্তু নাগরিক যখন অন্য নাগরিককে হত্যা করে তখন আমরা হই আতঙ্কিত। ফরহাদ মজহার আপন বইয়ের ফ্ল্যাপপাতায় নিজের পরিচয় দেন নোয়াখালি জেলার (বিশেষ মাইজদি কোর্টের) সন্তান হিশাবে। অথচ বৃহত্তর নোয়াখালি জেলার বেগমগঞ্জ হইতে ছাগলনাইয়া পর্যন্ত হিন্দু জনগোষ্ঠীর উপর যে ব্যাপক হামলা হইল তাহা কে করিয়াছে সে বিষয়ে কিছুই বলিলেন না। শুদ্ধমাত্র নোয়াখালি কেন, সারাদেশেই কেন এই হামলা? কারা এই হামলার পশ্চাতে? বাংলাদেশের হিন্দু জনসাধারণ কি ‘মানব’ নহেন। ‘মানবাধিকার কর্মী’ ফরহাদ মজহারের কাছে দেশ এই প্রশ্নে নীরবতা আশা করে না।

গত ডিসেম্বর মাসে কক্সবাজার জেলার রামুতে যখন বৌদ্ধমন্দিরে হামলা হয়, আগুন দেওয়া হয় মন্দিরে মন্দিরে তখন তিনি লিখিয়াছিলেন রামুর আগুনে বাংলাদেশ পুড়িয়া ছাই হইতে পারে। রামুতে কাহারা আগুন দিয়াছিলেন? আর আজ বাগেরহাট হইতে ছাগলনাইয়া পর্যন্ত হিন্দুবাড়ি ও মন্দিরে মণ্ডপে কাহারা ধ্বংসযজ্ঞ চালাইতেছে? হিন্দু কি তাসের প্যাকেটে ‘জোকার’ বিশেষ? কিংবা বৌদ্ধরা?

ফরহাদ মজহারকে একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হইবে। ভারতে যে বিজেপি দল তাহার একটা ‘হিন্দুত্ব’ মতবাদ আছে। বাংলাদেশের হিন্দুদের কি এমন কোন মতবাদ আছে? এদেশে তাহাদিগকে ‘সংখ্যালঘু’ বলা হয়, যেমন ভারতে মুসলমান জনগোষ্ঠীকে বলা হইয়া থাকে। বলা প্রয়োজন  ভারতে কোন মুসলমান এখন — এমনকি ভারতবর্ষের জামায়াতে ইসলামী দলও — ‘এসলামী রাষ্ট্র’ বা খেলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে না। তবুও কেন সেদেশে ১৯৯২-৯৩ সালের পর মুসলমানদের উপর চরম নির্যাতন নামিয়া আসিল? বাংলাদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর অন্যায় কাজটা কি? কোন দোষে তাহাদের বাড়ি, ব্যবসায় ও ধর্মশালায় এই আক্রমণ? ফরহাদ মজহার এখন কি বলিবেন? রামুর আগুনে বাংলাদেশ নিশ্চয়ই পুড়িতেছে। লক্ষ্মীপুরের আগুনে কি সে গা পোহাইবে?

জামায়াতে ইসলামী গতকাল — ২ মার্চ — বিবৃতিযোগে বলিয়াছেন এই কর্ম তাহাদের দল করে নাই। তো প্রশ্ন থাকিয়াই যাইবে, কে করিয়াছে? কে করিয়াছে?

আমরা সকল হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করি। এই নিন্দা ‘সামান্য’। কিন্তু যে হত্যাকাণ্ড অকারণে তাহার নিন্দা ‘বিশেষ’ করিয়া করিতে হইবে। যাঁহারা রাষ্ট্রক্ষমতায় বসিয়া আছেন তাঁহাদের দায়িত্ব সমানের অধিক। মানবাধিকার কর্মীদেরও দায়িত্ব আছে। ফরহাদ মজহার সেই দায়িত্ব স্বীকার করেন নাই। দেখিয়া আমরা চরম ব্যথিত। তিনি নিশ্চয়ই অস্বীকার করিবেন না দুর্বল জাতি ও জনগোষ্ঠীর উপর বিদ্বেষকে পুঁজি করিয়াই এয়ুরোপে ফ্যাসিবাদ নামক মতাদর্শ তাহার ব্যবসায় শুরু করিয়াছিল। সেই ব্যাপারে মুনাফা হইয়াছিল প্রবল জনগোষ্ঠীর ধর্মকে রাজনীতিক্ষেত্রে বিনিয়োগ করিয়া। এয়ুরোপে প্রবল ধর্মের নাম ছিল খ্রিস্ট বা নাসার ধর্ম।

খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও হিন্দু জনগোষ্ঠীর উপর আক্রমণ দেখিয়াই বুঝিতে হইবে বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদ কোন প্রকার অর্থ গ্রহণ করিয়াছে। গ্রামাঞ্চলের কৃষক ঢাকার এলিট শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে যে ন্যায়সঙ্গত ক্ষোভ পোষণ করে তাহার সুবর্ণসুুযোগ গ্রহণ করিতে ফ্যাসিবাদ পিছপা হইতেছে না। তাহারা এক্ষেত্রে এসলামধর্মের ঐতিহাসিক নামটি ব্যবহারের সুযোগ ষোল আনাই কাজে লাগাইতেছে।

ফরহাদ মজহার এই ফ্যাসিবাদকেই নিঃশর্ত সমর্থন জানাইয়াছেন। যদি বাড়তি প্রমাণের প্রয়োজন আছে মনে করেন পাঠিকা তাহা খুঁজিয়া পাইবেন তাঁহার আর একটি প্রস্তাবে। সেই প্রস্তাব অনুসারে বাংলাদেশের মধ্যমবিত্ত শ্রেণির অন্তরে একপ্রকার এসলামবিদ্বেষ লুকাইয়া আছে। এই প্রস্তাব লইয়া বারান্তরে।

মার্চ ৩, ২০১৩

৩ মার্চ ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ২৩

অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে

বিখ্যাত অভিধানকার হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় (১৮৬২-১৯৫৯) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গুণমুগ্ধ গুণী। শান্তিনিকেতনের শিক্ষক। একদা তিনি ‘রবীন্দ্রনাথের কবিতার চিত্র’ নামে এক নিবন্ধে তিনটি কবিতার আলোচনাও করিয়াছিলেন। একটি কবিতার নাম ‘শেষ শিক্ষা’। হরিচরণ মনে করেন এই কবিতার মূলসূত্র ‘অন্যায়’। আমরা আগাইয়া বলিব, ‘অন্যায় ও তাহার প্রতিকার’। একালের কবিরা রবীন্দ্রনাথের বড় সমজদার নহেন জানিয়াও আমরা তাহাদের বলিব পড়িতে দোষ কি!। কাহিনী বর্ণনায় রবীন্দ্রনাথের সিদ্ধিলাভ হইয়াছিল। ‘শেষ শিক্ষা’ নামক কবিতার নায়ক শিখজাতির দশম ও শেষ গুরু গোবিন্দসিংহ (১৬৭৫-১৭০৮)। তিনি বলা যায় মারাঠাজাতির অধিপতি শিবাজির যুগে জন্মাইয়াছিলেন। রবীন্দ্রনাথের কবিতার কাহিনী হরিচরণ যেভাবে সংক্ষেপ করিয়াছেন আমরা এখানে তাহার মাত্র সারগ্রহণ করিতেছি। ‘বীর গুরু’ নামা নিবন্ধে ঠাকুর নিজেও একবার কাহিনীটা গদ্যযোগে লিখিয়াছিলেন। বলিয়াছিলেন, ‘গোবিন্দের মৃত্যুঘটনা বড়ো শোচনীয়।’

শিখগুরু গোবিন্দ একদিন নিভৃতে আপনার জীবনকথা — ‘অখণ্ড ভারত অধিকারের সংকল্পিত বিষয়’ — ভাবিতেছিলেন। তাঁহার মনে হইতেছিল এই প্রৌঢ় বয়সে সে বিষয় ‘শতধাবিকীর্ণ, সংশয়াপন্ন সংকটসংকুল’। তিনি ভাবিতেছিলেন তবে কি ইহা ভ্রম? জীবন কি ব্যর্থ? এমন সময় এক পাঠান আসিয়া বলিল, ‘কাল দেশে যাইব, আপনি যে ঘোড়া কিনিয়াছেন তাহার দাম চাহি।’

গুরু গোবিন্দ বলিলেন, ‘শেখজি, সেলাম, দাম কাল পাইবে, আজ ভাই যাও।’ পাঠান জোর করিয়া বলিল, ‘আজই দাম চাহি।’ বলিয়াই জোর করিয়া হাত ধরিয়া গুরুকে চোর বলিয়া গালি দিল। তৎক্ষণাৎ অভিঘাতে পাঠানের মুণ্ডু স্কন্ধচ্যুত, ভূমি রক্তসিক্ত হইল। নিজের কাজ দেখিয়া গুরু বলিলেন, অসি আজ অনর্থক রক্তপাতে লক্ষচ্যুত হইল। এই পাপ দূর করিয়া যাইতে হইবে। জীবনের এই শেষ কাজ। রবীন্দ্রনাথ লিখিয়াছেন, ‘এই অন্যায় কার্য করিয়া তাহার অত্যন্ত অনুতাপ উপস্থিত হইল।’

পাঠানের একটি শিশুপুত্র ছিল। নাম মাহমুদ। রবীন্দ্রনাথের বানানে ‘মামুদ’। গোবিন্দ তাহাকে আনিয়া পুত্রবৎ প্রতিপালন করিতে লাগিলেন। ক্রমে যুবা হইলে তাহাকে তিনি শাস্ত্রবিদ্যা শিখাইলেন। সেও গুরুজিকে পিতার মত ভক্তি করিত, তাহার সঙ্গে থাকিত, মৃগয়ায় সঙ্গী হইত। একদিন গুরু বলিলেন, ‘মামুদ, অস্ত্র লও, আমার সঙ্গে আইস।’

বলিয়া গুরু ধীরে ধীরে বনে এক নদীতীরে উপস্থিত হইলেন। ইঙ্গিতে যুবা দাঁড়াইল। তখন আকাশ সন্ধ্যার তরল তিমিরে পরিব্যাপ্ত। গুরু বলিলেন, ‘এই স্থান খোড়।’ একটু খুঁড়িতেই একখণ্ড শিলা উঠিল। গুরু বলিলেন, ‘শিলায় এই যে লোহিত রাগ, তাহা তোমার পিতার রক্তধারা। ঋণ শোধ না করিয়া এইখানে তাহাকে কাটিয়াছিলাম। এক্ষণে প্রতিশোধ গ্রহণ কর।’ রবীন্দ্রনাথের গদ্যে, ‘আমি তোমার পিতাকে বধ করিয়াছি, তুমি যদি তাহার প্রতিশোধ না লও তবে তুমি কাপুরুষ ভীরু।’ অথবা পদ্যে:

রে পাঠান, পিতার সুপুত্র হও যদি
খোল তরবার, পিতৃঘাতকেরে বধি
উষ্ণরক্ত-উপহার করিবে তর্পণ
তৃষ্ণাতুর প্রেতাত্মার।

গুরুর উত্তেজনার কথায় রক্তনেত্র পাঠানবীর হুঙ্কার ছাড়িয়া পহিলা লাফ দিল। তাহার পরই গুরুর পায়ে পড়িল। কাঠের মূর্তির মত হইয়া গুরু স্থির দাঁড়াইয়া। মাহমুদ অস্ত্র ফেলিয়া দিল। বলিল:

হে গুরুদেব, লয়ে শয়তানে
খেলো না এ কলঙ্কের খেলা। ধর্ম জানে
ভুলেছিনু পিতৃরক্তপাত; একাধারে
পিতা গুরু বন্ধু বলে জেনেছি তোমারে
এত দিন। ছেয়ে যাক মনে সেই স্নেহ,
ঢাকা পড়ে হিংসা যাক মরে। প্রভো, দেহো
পদধূলি।”

এই কথা বলিয়াই যুবক ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিয়া বন হইতে বাহির হইয়া গেল। ফিরিয়া চাহিল না। ফিরিয়াও আসিল না। পাপের প্রায়শ্চিত্তের আয়োজন ব্যর্থ হইল। তাই, রবীন্দ্রনাথ লিখিতেছেন:

দুই বিন্দু জল

ভিজাইল গোবিন্দের নয়নযুগল।

পরদিন হইতে মাহমুদ দূরে দূরে থাকে। গুরুর সঙ্গে মৃগয়ায় যায় না। ডাকিলে নিভৃতে গুরুর সঙ্গে দেখা করে না। একদিন গুরু মাহমুদের সঙ্গে শতরঞ্চ খেলা আরম্ভ করিলেন। বার বার হারিয়া যুবা খেলায় মাতিয়াছে। রাত্রি ঝাঁ ঝাঁ করিতেছে, দৃকপাতও নাই , যুবা হেঁট হইয়া খেলিতেছে। তখন হঠাৎ গুরু শতরঞ্চের বল ছুঁড়িয়া যুবার শিরে আঘাত করিলেন। অট্টহাসিতে ফাটিয়া পড়িলেন। বলিলেন, ‘আমি তোমার পিতাকে বধ করিয়াছি, তুমি যদি তাহার প্রতিশোধ না লও তবে তুমি কাপুরুষ ভীরু।’

পিতৃঘাতকের সাথে খেলা করে আসি
এমন যে কাপুরুষ, জয় হবে তার?
অমনি বিদ্যুৎ হেন ছুরি খর ধার
খাপ হতে খুলি লয়ে গোবিন্দের বুকে
পাঠান বিধিয়া দিল। গুরু হাস্যমুখে
কহিলেন, ‘এতদিনে হল তোর বোধ
কী করিয়া অন্যায়ের লয় প্রতিশোধ।
শেষশিক্ষা দিয়া গেনু — আজ শেষবার
আশীর্বাদ করি তোরে হে পুত্র আমার’।।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কাহিনীটা পুরাপুরি বানাইয়া লেখেন নাই। ইহার পিছনের কিছু ঘটনা ইতিহাসের। কিছুটা তাঁহার আপন মনের। শিখজাতির সামরিক শক্তির প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলিয়া গুরু গোবিন্দসিংহের খ্যাতি। প্রথম জীবনে গোবিন্দজি ডাকাত ছিলেন। পাহাড়ি রাজা আর মোগল ওমরাহের বিরুদ্ধে লড়াই করিয়া বেড়াইতেন। এইসব সংঘাতের এক অধ্যায়ে তাঁহার দুই পুত্রকে মৃত্যুদণ্ড দিয়াছিলেন সরহিন্দের মোগল সুবাদার। এক পর্যায়ে তিনি মোগলদের অধীনে চাকরিও লইয়াছিলনে। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর শাহ আলম ওরফে বাহাদুর শাহ গোবিন্দকে পাঁচ হাজার অশ্বারোহীর অধিপতি (মনসবদার) করিয়া দেন। এসায়ি ১৭০৮ সালে দাক্ষিণাত্যের নন্দরে জনৈক আফগানের হাতে গুরু গোবিন্দসিংহ নিহত হইয়াছিলেন। এই সত্য ঘটনার উপর কল্পনার রঙ্গ দেখচি চড়াইয়া রবীন্দ্রনাথ পাক ঘণ্ট রাঁধিয়াছেন। সত্য প্রমাণ করিয়াছেন তাহারই প্রাণের বাণী:

অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে
তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।।

রবীন্দ্রনাথ লিখিয়াছেন, গোবিন্দের অনুচরেরা সেই পাঠানকে ধরিবার জন্য চারিদিক হইতে ছুটিয়া আসিল। গোবিন্দ তাহাদিগকে নিবারণ করিয়া বলিলেন, ‘আমি উহার কাছে অপরাধ করিয়াছিলাম। ও তাহার প্রতিশোধ দিয়াছে। আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিবার জন্য আমিই উহাকে এইরূপ পরামর্শ দিয়াছিলাম। উহাকে তোমরা ধরিয়ো না।’

আর একটু: ‘অনুচরেরা গোবিন্দের ক্ষতস্থান সেলাই করিয়া দিল। কিন্তু জীবনের প্রতি বিরক্ত হইয়া গোবিন্দ এক দৃঢ় ধনুক লইয়া সবলে নোওয়াইয়া ধরিলেন, সেই চেষ্টাতেই তাঁহার ক্ষতস্থানে সেলাই ছিঁড়িয়া গেল ও তাঁহার মৃত্যু হইল।’

দোহাই

১. হরিচরণ বন্দোপাধ্যায়, রবীন্দ্র-প্রসঙ্গ (কলকাতা: বিশ্বভারতী,১৪০৬)।
২. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ইতিহাস, পুলিন বিহারী সেন ও প্রবোধচন্দ্র সেন সংকলিত (কলিকাতা: বিশ্বভারতী, ১৩৯৫)।
৩. Vincent A Smith, The Oxford History of India, ed. Percival Spear, 3rd ed.  (Oxford: Clarendon Press,1961).

২ মার্চ ২০১৩

 

২ মার্চ ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ২২

গৃহযুদ্ধ না সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা?

২৮ ফেব্রুয়ারির ঘটনাবলিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণহত্যার সহিত তুলনা করিয়াছেন। মির্জা সাহেব বলিয়াছেন জামায়াতে ইসলামীর সহিত সরকারের পুলিশ বাহিনী (ও সরকারি দলের) এই সংঘর্ষ নৃশংসতায় ১৯৭১ সালের পাকিস্তানী হানাদারদের গণহত্যাকেও ছাড়াইয়া গিয়াছে। একটা জিনিশ কারও নজরে না পড়িয়া যায় নাই। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের তৃতীয রায় ঘোষণা উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামী আগেই হরতাল ডাকিয়াছিলেন ২৮ ফেব্রুয়ারি। ঐ দিন দুপুরের দিকে রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সারাদেশে হরতাল মারাত্মক রূপ ধারণ করে। পুলিশের সহিত জামায়াতের কর্মীবাহিনীর সংঘর্ষই এই দিনের একমাত্র বৈশিষ্ট্য নহে। দেখা যাইতেছে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করিয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি বা মন্দিরেও হামলা হইয়াছে।

কিছুদিন আগে হইতেই আশংকা করা হইতেছিল জামায়াত ও বিএনপি নেতাদের বিচারকে কেন্দ্র করিয়া দেশ একটা সংঘাতপর্বে প্রবেশ করিতেছে। জামায়াত নেতাদের কেহ কেহ প্রকাশ্যে গৃহযুদ্ধের হুমকিও দিয়াছিলেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে সেই ‘গৃহযুদ্ধ’ শুরু হইয়া গিয়াছে। গত কালিকার ঘটনাবলিতে যদি তাহা পরিষ্কার না হইয়া থাকে তো আমরা সামনের দুই কি এক সপ্তাহে আরো অনেক ঘটনা দেখিব। কেহ কেহ পরামর্শ দিতেছেন উভয়পক্ষকে সংযত হইতে হইবে। নহিলে জাতীয় নিরাপত্তা পর্যন্ত বিঘিœত হইবার সম্ভাবনা। কেহ কেহ বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ হইতে পারে বলিয়া ভয় দেখাইতেছেন। বলা বাহুল্য সেই ভয় মোটেও অলীক নহে। কেহ কেহ সামরিক শাসনের দিকেও অঙ্গুলি হেলাইতেছেন। এক কথায়, কিছুই আর অসম্ভব নহে।

আমাদের বক্তব্য সামান্য। অন্ধ হইলে কি প্রলয় বন্ধ থাকিবে? ‘জাতীয় ঐক্য’ আর গণতন্ত্রের প্রবক্তারা প্রকারান্তরে বলিতেছেন সংঘাত এড়াইতে হইলে যুদ্ধাপরাধের বিচারটা বন্ধ করিতে হইবে। কারণ ‘নিরপেক্ষ’ বিচার তো সম্ভব নহে। আরেক মহল বলিয়াছেন বিচারগুলি আন্তর্জাতিক মানের হইতেছে না। অতয়েব বিচারটা বন্ধ করিতে হইবে। কোন যুক্তি যখন কাজে আসিতেছে না তখন তৃতীয় যুক্তি পথে নামে। এই যুক্তির নাম শক্তি। তাই তাহারা শক্তির পরীক্ষায় নামিয়াছেন। এই পরীক্ষাকেই খুব সম্ভব ‘গৃহযুদ্ধ’ বলিয়া ঘোষণা করা হইয়াছিল। আপাতদৃষ্টে মনে হইতেছে গৃহযুদ্ধ শুরু হইয়াছে। হয়ত তাহার আরো চরম রূপ এখনো দেখা দেয় নাই। এই মুহূর্তে তাহা হইলে আমাদের কি করিবার আছে?

জামায়াতের শক্তি কিরকম তাহার একটা নমুনা দেখা গিয়াছে ২৮ ফেব্রুয়ারি। বিশেষ করিয়া মফস্বল শহরে ও গ্রামাঞ্চলে তাহারা যে প্রতিরোধের ক্ষমতা দেখাইয়াছেন তাহা বড় কম নহে। ১৯৭১ সালে তাহাদের এহেন শক্তি ছিল কি? গ্রামের কৃষকশ্রেণির মধ্যে তাহাদের ভীত বেশ বাড়িয়াছে এ কথা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। কিন্তু মনে রাখিতে হইবে কৃষকেরা কোন কোন সময় রক্ষণশীল এমনকি স্বাক্ষাৎ প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকায়ও নামিতে পারে।

১৭৮৯ হইতে ১৭৯৪ সাল পর্যন্ত ফরাশি বিপ্লবের যে পর্যায়টা প্রথম পর্যায় বলিয়া পরিচিত সেই পর্যায়ে ফরাশিদেশের পশ্চিমাংশের একটা প্রদেশে — নাম বঁদে (Vendee) প্রদেশ — কৃষকেরা তাহাদের পুরাতন বুর্বো (Bourbon) রাজবংশের পক্ষে বহুদিন ধরিয়া সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হইয়াছিল। ঐ বিদ্রোহ দমন করিবার জন্য ফরাশি বিপ্লবকে চরম মূল্য দিতে হইয়াছিল। কৃষকদের এ রাজতন্ত্রী প্রতিরোধ সংগ্রাম ফরাশি প্রজাতন্ত্রকে খানিক বিপদেই ফেলিয়াছিল। যাহার ফলে শেষ পর্যন্ত একনায়কতন্ত্রের উদ্ভব ঘটে। বিখ্যাত ঔপন্যাসিক বালজাক এই কৃষক অভ্যুত্থান লইয়া একটি চমৎকার উপন্যাস লিখিয়াছেন।

যাহারা এই বিচারকে থামাইতে চাহিতেছেন তাহারা একদিকে গৃহযুদ্ধের হুমকি দিতেছেন, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধাইতেও তৎপর হইতেছেন। চার পাঁচ মাস আগে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বৌদ্ধ মন্দিরে কাহারা হামলা করিয়াছিল এখনো কেন তাহা জানা যায় নাই জানি না। কিন্তু এতদিনে পরিষ্কার হইতছে সেই ঘটনার সহিতও যুদ্ধাপরাধের বিচার বিষয়টা জড়িত। হালে জোর করিয়া ধর্মের বিষয় বার বার আনা হইতেছে কি কারণে তাহা পরিষ্কার হওয়া দরকার।

গৃহযুদ্ধটা যদি নিবারণ করিবার মতন ঘটনা না হয় তখন আপনি কি করিবেন? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ১৮৬০-১৮৬৫ সালের যে সকল ঘটনাকে ‘গৃহযুদ্ধ’ বলা হইয়া থাকে তাহার কারণ ও ফলাফল লইয়া একটা আলোচনা হওয়া দরকার। মার্কিনদেশের গৃহযুদ্ধের বিষয় ছিল সে দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যগুলিতে দাসশ্রমের যে প্রথা চালু ছিল সেই দাসপ্রথা। সকলেই আজ জানেন ১৭৮৭ সালে গৃহীত মার্কিনদেশের গঠনতন্ত্রে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করা হয় নাই। এমনকি চারি বৎসর পর ১৭৯১ সালে যে মৌলিক অধিকারের সনদ (বিল অব রাইটস) সেই সংবিধানে যোগ করা হয় তাহাতেও দাসপ্রথা সম্বন্ধে কিছু বলা হয় নাই। কিন্তু সেই দাসশ্রম ও মজুরিশ্রমের মধ্যে কোনটা রাষ্ট্র অনুমোদন করিবে তাহার মীমাংসাও হয় নাই। হইয়াছিল ১৮৬৫ সালে। গৃহযুদ্ধের সফল সমাপ্তি ও দাসমালিকের পরাজয়ের পর।

সকলেই জানেন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম গঠিত হইয়াছিল মাত্র ১৩টি অঙ্গরাষ্ট্র (বা প্রদেশ) লইয়া। তাহাদের মধ্যে কোন কোনটা সেই সময় — মানে ১৭৭৬ হইতে ১৮৬৫ পর্যন্ত — দাসপ্রথার পৃষ্ঠপোষক, আর কোন কোনটা তাহার বিরোধী। অনেক রাষ্ট্রনেতাও সে দেশে প্রথমদিকে দাসমালিক ছিলেন। জর্জ ওয়াশিংটন, টমাস জেফারসন কেহই বাদ পড়িবেন না এই হিশাবে। দাসপ্রথার উচ্ছেদকে অনেকে তখন খোদ সম্পত্তিপ্রথার উচ্ছেদ বলিয়া প্রচার করিতেন। দাসপ্রথা যে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘বৈধ’ তাহা প্রমাণ করিবার জন্য শুদ্ধ ‘বাইবেল’ কেন, গ্রিক মনীষী আরস্ততালেসের লেখা পর্যন্ত হাজির করা হইত।

দাসপ্রথা বিলোপের আন্দোলনকে কেন্দ্র করিয়াই শেষ পর্যন্ত আমেরিকার গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধ ছিল উনিশ শতকের নৃশংসতম যুদ্ধ। সরকারি হিসাবে ৬ লক্ষ মানুষ তাহাতে মারা যায়। ইতিহাসের একটা অধ্যায়ের অবসান তাহাতে ঘটিয়াছিল বলিয়া আজ আমরা মনে করি। মহাত্মা কার্ল মার্কসও এই যুদ্ধে আব্রাহাম লিংকনকে সমর্থন দেন।

১৯৭১ সালের যে সংগ্রাম ও যুদ্ধের মধ্যস্থতায় বাংলাদেশের বর্তমান প্রজাতন্ত্রটি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে — মনে পড়িতেছে — সেই মুক্তিযুদ্ধকেও জামায়াতে ইসলামী ‘গৃহযুদ্ধ’ বলিয়া থাকেন। অতয়েব তাহারা তাহাদের নতুন যুদ্ধকেও যে ‘গৃহযুদ্ধ’ই বলিবেন তাহাতে বিস্ময়কর কি আছে?

১ মার্চ ২০১৩

 

১ মার্চ ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ২১

ধর্ম ও স্বাধীনতা: দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত

(গতকালের পর)

মানুষ ধর্ম পালন করে কেন? বাহিরের চোখে দেখিলে মনে হইবে ধর্ম মানে তো আচার আর অনুষ্ঠান। কে না জানে আচার আর অনুষ্ঠানে থাকে নিয়মের বাধ্যবাধকতা। আর বাধ্য হওয়া মানেই তো এক ধরনের অধীনতা। অথচ একটু ভিতর হইতে দেখিলে দেখিবেন মানুষ এমনকি অধীনতাও মানিয়া লয় শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা লাভ করিবার আশায়। ধর্মের আচার বিচারও এই নিয়মের ব্যতিক্রম নহে।

আলজিরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম হইতে উদাহরণ টানিয়া ফ্রানৎস ফানোঁ দেখাইয়াছেন স্বাধীনতার বাসনা সে দেশের জনসাধারণের মধ্যে অনেক বিষয়ে নতুন আচার ব্যবহারের জন্ম দিয়াছিল। শুদ্ধমাত্র নারীজাতির গায়ের পোশাকের কিংবা বেতারযন্ত্রের উদাহরণেই তিনি আবদ্ধ থাকেন নাই। আধুনিক এয়ুরোপ হইতে আনীত চিকিৎসাশাস্ত্র আর ওষুধপত্রের ক্ষেত্রেও এই সত্য আবিষ্কার করিয়াছেন ফানোঁ। আমরা এখানে ওষুধপত্র আর চিকিৎসাশাস্ত্রের কাহিনীটা কহিতেছি।

ফরাশিরা আলজিরিয়া দেশটা দখল করিবার পর সেখানে অন্যান্য কাজের মধ্যে আধুনিক চিকিৎসাসেবা, ফরাশি ডাক্তারবৈদ্য এবং সুন্দর সুন্দর হাসপাতাল আর ফার্মেসিও প্রবর্তন করেন। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসনকে অপছন্দ করিবার কারণে এইসব ভাল ভাল জিনিশও আলজিরিয়ার মুসলমান সমাজ প্রত্যাখ্যান করেন। তাহারা শুদ্ধ ফরাশি ডাক্তার নহে, এয়ুরোপিয়া চিকিৎসাশাস্ত্রে শিক্ষাপ্রাপ্ত দেশীয় ডাক্তারদের পর্যন্ত এড়াইয়া চলিতেন। ফরাশি ডাক্তারদের বিশ্বাস করা কঠিন ছিল। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাইত ডাক্তার আর পুলিশ-মিলিটারিতে ভেদটা সামান্যই। সকলেই পরদেশলোভে মত্ত ঔপনিবেশিক কর্মকর্তা বিশেষ। ডাক্তারও প্রয়োজনে লাঠিয়ালের ভূমিকা পালন করিত।

কিন্তু যখন সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রাম শুরু হইল, সব কিছুর মধ্যে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগিল। ফরাশিরা আলজিরিয়ার নাগরিকদের নিকট ওষুধপাতি বেচা বিক্রির ক্ষেত্রে প্রথমে রেশনিং আর খানিক পরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা শুরু করিল। বিশেষ করিয়া অ্যান্টিবায়োটিক আর অ্যান্টি-টিটেনাস সিরাপ (এটিএস) নিয়ন্ত্রণ করা শুরু হইল। আলজিরিয়ার অনেক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এটিএস প্রতিষেধকের অভাবে ধনুষ্টঙ্কার রোগে মৃত্যুবরণ করিতে বাধ্য হইলেন।

ফরাশিরা যে ওষুধকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিশাবে ব্যবহার করিতেছে তাহা আলজিরিয়া হাড়ে হাড়ে টের পাইল। এই সময় ফরাশি সরকার নির্দেশ দিয়াছিল কোন ফার্মেসি যেন জীবন রক্ষাকারী ওষুধ আলজিরিয়ার লোকের কাছে না বেচে। আর বেচিলেও যেন নাম ঠিকানাসহ রোগীর তাবৎ বৃত্তান্ত লিখিয়া রাখে। যে ফার্মেসি আপনাকে বলিল ওষুধটা স্টকে নাই কারণ আপনি আলজিরিয়ার মুসলমান সেই ফার্মেসিই দশ মিনিটের মধ্যে আরেকজনের হাতে সেই ওষুধটা তুলিয়া দিল, কারণ সে বেটা ফরাশি। এই সময় আলজিরিয়ার মুক্তিযোদ্ধারা ফরাশি ডাক্তারের অপেক্ষায় বসিয়া না থাকিয়া নিজেরাই নিজেদের চিকিৎসা দিতে শুরু করিয়াছিলেন। সেই সময় ধর্মপরায়ণ আলজিরিয়ার লোকজন চোরাবাজারে ফরাশি ওষুধ কিনিতে শুরু করে। জীবন রক্ষাকারী ওষুধ তো সংগ্রহ করিতেই হইবে।

আলজিরিয়ার ‘অশিক্ষিত’, ‘গোঁড়া’ মুসলমান মুক্তিযুদ্ধের দুর্মর দিনে এইভাবে আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রে ইমান আনিল। ব্যাপারটা বেশ মজার কারণ বহুদিন ধরিয়া চেষ্টা করিবার পরও ফরাশি ডাক্তাররা এই আলজিরিয়াবিদের ফরাশি ওষুধ গিলাইতে পারেন নাই। হাসপাতালে ডাক্তারের সহিত একদিন দেখা করিয়া পরের দিন তাহারা আর আসিতেন না — লাপাত্তা হইয়া যাইতেন।

এক পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ তীব্রতর হইল। মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজন অনুসারে বিপ্লবী আলজিরিয়া আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই সুফলগুলি বর্জন না করিয়া গ্রহণ করিতে শিখিল। ঘটনা দুইটা — মুক্তিযুদ্ধ ও ওষুধশাস্ত্র — একসঙ্গে হাজির হইল। বিপ্লব ও স্বাধীনতা মানুষের ধর্মে বা আচার ব্যবহারে বিপুল পরিবর্তন আনিতে পারে। কয়েকটা উদাহারণের সহায়তায় ফানোঁ ইহা দেখাইতেছেন।

একদা ফরাশি ঔপনিবেশিক সরকার আলজিরিয়ার গ্রামেগঞ্জে মহল্লায় মহল্লায় আধুনিক স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা চালু করিতে চাহিয়াছিলেন। মানুষ সেই সুপরামর্শ তখন গ্রহণ করে নাই। অথচ মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন বিপ্লবী সরকার বলিলেন এইসব পায়খানা স্বাস্থ্যের জন্য ভাল তখন লোকে দলে দলে এইগুলি বসাইতে শুরু করিল। মানুষের অন্ত্র হইতে আগত পরজীবী কীট যে রোগজীবাণু ছড়ায় সেই শিক্ষাটা মানুষ অতি দ্রুতবেগে গ্রহণ করিল।

মানুষ হাজামজা পুকুর সংস্কার করিল। শিশুর জন্মের পর যে অপতালমিয়া রোগের প্রকোপ দেখা দিত তাহার বিরুদ্ধে সংগ্রামে দ্রুত অগ্রগতি দেখা দিল। মায়েরা বাচ্চার যতেœ ত্র“টি করিতেন না। এখন সমস্যা শুদ্ধ আরিওমাইসিনের অভাবে সীমিত হইল। এখন লোকে সুস্থ থাকিতে ব্যগ্র হইল, ডাক্তার-নার্সের সুপরামর্শে বেশি বেশি করিয়া কান দিতে লাগিল। নার্সিংবিদ্যায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য বিদ্যালয় খোলা হইল। দেখা গেল কয়েকদিন শিক্ষা লইবার পর এমনকি নিরক্ষর চাষীরাও ধমনীর মধ্যে কেমন করিয়া ইনজেকশনের সূঁচ ফুঁড়াইতে হয় শিখিয়া লইল।

একই কায়দায় দেখা গেল একদা যাহারা ঝাড়ফুঁকে, ওঝায়বৈদ্যে বিশ্বাস রাখিতেন তাহারও ধীরে ধীরে এইসব ছাড়িয়া দিলেন। একদা জিন পরিতে বিশ্বাস করাকে এসলাম ধর্মের অঙ্গ মনে করা হইত। বিপ্লবের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এইসব মোল্লাকি চিকিৎসার কবর রচিত হইল। মুক্তিযুদ্ধ আলজিরিয়ায় এসলাম ধর্মেরও নতুন ব্যাখ্যা হাজির করিল।

ফানোঁ দুই দুইটা উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টা খোলাসা করিয়াছেন। যেসব সমাজে আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার বিশেষ বিকাশ ঘটিয়াছে সে সমাজেও কিছু কিছু শিক্ষা সর্বসাধারণের মধ্যে বিস্তারিত করা যায় নাই। বা গেলেও তাহা করা কঠিন প্রমাণিত হইয়াছে। কিন্তু আলজিরিয়ার সর্বস্তরের লোকজন এই শিক্ষা দ্রুত আত্মস্থ বা আমল করিয়াছেন। আর এসলাম মুক্তিযুদ্ধের পর নবজীবন লাভ করে — এই কথাটাও পুনরায় প্রমাণ লাভ করিল।

বিপ্লবের পক্ষের স্বদেশি ডাক্তারদের এখন আলজিরিয়া ‘আপন’ ডাক্তার বলিয়া গ্রহণ করিয়াছে। তাঁহাদের নির্দেশ এখন সকলে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। তখন একটা নিয়ম প্রচার করা হইয়াছিল এই রকম: কোন মুক্তিযোদ্ধা যদি তলপেটে আঘাত পাইয়া আশ্রয়কেন্দ্রে আসেন তবে তাঁহাকে কোনক্রমেই পানি খাইতে দেওয়া যাইবে না। এই নিয়মের কোন ব্যত্যয় যাহাতে না ঘটে সেই নির্দেশ খুব কড়া আকারে প্রচার করা হয়। বাড়ির প্রত্যেকটি ছেলে ও মেয়েকে এই নিয়মটি জানাইয়া দেওয়া হইল। দেখা গেল আহত মুক্তিযোদ্ধা ‘পানি’ ‘পানি’ করিয়া চিৎকার করিতেছেন কিন্তু তাঁহার ছেলেও তাঁহাকে পানি দিবে না। ছেলে বাবাকে বলিল, ‘আব্বা, এই বন্দুকটা হাতে লইয়া আপনি ইচ্ছা করিলে আমাকে গুলি করেন। তবুও আমি আপনাকে পানি দিতে পারিব না।’ ডাক্তার আসিয়া অপারেশন করিলে রোগীর বাঁচার সম্ভাবনা আছে। পানি দিলে সে সম্ভাবনা নষ্ট হইবে।

আরেক উদাহারণ। টাইফাস সংক্রমণের বেলায় রোগীকে কয়েকদিন কোন কঠিন খাবার দেওয়ার বিষয়ে নিষেধ ছিল। কোন পিঠাপুলি কিংবা মুরগীর মাংস দেওয়া একদম নিষেধ ছিল। আত্মীয়স্বজন যখন রোগীর বিছানার কাছে ভিড়িবার সুযোগ পায় তখন রোগীর অতি অনুরোধে তাহাকে এহেন খাবার আত্মীয়স্বজন দিতেও পারেন। তাই এই ধরনের রোগীর বেলা, বলা হইত পরিবারের লোকজন যেন তাহার দর্শনে না যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাহাড়ি অঞ্চলে দেখা গিয়াছে আলজিরিয়ার মুক্তিযোদ্ধার মায়েরাও ডাক্তারের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করিয়াছেন। বাচ্চাকে খাবার না দিয়া বসিয়া থাকিয়াছেন। কয়েক দিন। তাহার আশপাশেও ঘেঁষেন নাই।

ফানোঁ বলেন, ‘জাতির দেহে প্রাণের সঞ্চার হইলে, জাতি যদি এককাট্টা হইয়া চলিতে থাকে, তখন সকলই সম্ভবপর হয়।’

দোহাই

Frantz Fanon, A Dying Colonialism (London Penguin Books,1970).\

 

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ২০