Category Archives: প্রবন্ধ

আহমদ ছফার হুমায়ূননামা

[এই রচনাটি লিখিয়াছিলাম ইংরেজি ২০১২ সালের আগস্ট মাসের গোড়ায়। দুঃখের বিষয়, পাক্ষিক ‘অন্যদিন’ পত্রিকার সম্পাদক মহোদয় রচনাটি ছাপাইতে রাজি হন নাই। সত্যের মধ্যে লেখাটি তাঁহাদের উপরোধেই লেখা হইয়াছিল। সহকারী মোমেন সাহেবের মধ্যস্থতায় সম্পাদক মহাশয় জানাইয়াছিলেন, হুমায়ূন আহমেদ মাত্র পরলোকগমন করিয়াছেন, এই লেখাটি পরলোকগত লেখকের স্মৃতির সহিত যাহাকে বলে মানানসই হইবে না। সম্প্রতি আমার বাসার পুরানা আবর্জনা সাফ করিতে বসিয়া লেখাটি খুঁজিয়া পাইয়াছি। এতদিন পর পড়িয়া দেখিতেছি ইহার সকল বাক্যই বর্জনীয় হয় নাই। অন্তত আহমদ ছফা ব্যবসায়ী সমাজে ইহার একপ্রকার চাহিদা থাকিতে পারে—এই বিবেচনায় রচনাটি পুনশ্চ সম্পাদিত হইল। ইহার ভিতর দেখিতে দেখিতে ছয় বৎসর পার হইয়া গিয়াছে। যৎসামান্য মাত্র পরিমার্জনার পর লেখাটি আরেকবার হাজির করিতেছি।—ইতি ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮]

ঈদসংখ্যার অজুহাতে ‘অন্যদিন’ পত্রিকার মোমেন সাহেবকে কথা দিয়াছিলাম এই বছরও একপ্রস্ত লেখা তাহার হাতে তুলিয়া দিব। বিষয় ঠিক করিয়াছিলাম ‘মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’। অতি অল্পবয়সে দত্তজ কবির মুণ্ডুপাত করিয়া ঠাকুরবাড়ি হইতে প্রকাশিত ‘ভারতী’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মোট ছয় কিস্তিতে একপ্রস্ত ভয়াবহ নিবন্ধ প্রকাশ করিয়াছিলেন। প্রবন্ধটি একদা সহজে পাওয়া যাইত না। হালে এক বন্ধুর দয়ায় ‘ভারতী’ পত্রিকার আদি সংস্করণ হইতে ছাপ লওয়া এই অচলিত সংগ্রহটি হাতে পাইলাম। আর বিশ্বভারতী হইতে মুদ্রিত সংস্করণের সহিত তাহা মিলাইবার সুযোগও হইল। বলা যায় আমি এক প্রকার হালে পানি পাইলাম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অচলিত প্রবন্ধটির পর্যালোচনা লিখিব স্থির করিয়াও লেখাটা শেষ পর্যন্ত শেষ করিতে পারি নাই। ‘অন্যদিন’ পত্রিকার দেনাশোধ করিবার নিমিত্ত অগত্যা এই নিবন্ধ লিখিতেছি। মনে হইতেছে নিজে মরিয়া হইলেও হুমায়ূন আহমেদ আমাকে—এই ঈদসংখ্যা দায়গ্রস্ত অনাহারী লেখককে—বাঁচাইলেন, অন্তত এই যাত্রা প্রাণে বাঁচাইয়া গেলেন।

আহমদ ছফার এন্তেকাল উপলক্ষে হুমায়ূন আহমেদও একদা একপ্রস্ত স্মৃতিকথা প্রকাশ করিয়াছিলেন। আহমদ ছফার লেখা কোন উপন্যাস বা প্রবন্ধ কি অন্য রচনা লইয়া তিনি নিশ্চয় আরো কিছু লিখিবার অধিকার রাখিতেন। সে অধিকার তিনি আদায় করিয়াছেন কিনা তাহা কালে জানা যাইবে। আজিকার লেখায় আমি ঐদিকের কথা তুলিতে চাহিতেছি না। এইদিকে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস কিংবা গল্প লইয়া যাঁহারা বিশেষ প্রবন্ধ লিখিয়াছেন আজ পর্যন্ত তাঁহাদের সংখ্যাও ক্ষুদ্রই রহিয়াছে। সেখানে আহমদ ছফার নামও আমি এখন পর্যন্ত দেখি নাই। সান্ত্বনার মধ্যে, সাক্ষাত্কার নামধেয় কয়েকটি রচনায় মহাত্মা আহমদ ছফা হুমায়ূন আহমেদ প্রসঙ্গে যে সকল মন্তব্য করিয়াছিলেন তাহা হইতেও বিশেষ শিক্ষা করিবার জিনিশ আমি কয়েকটা খুঁজিয়া পাইয়াছি। স্থির করিয়াছি আজিকার লেখায় তাহার কিছু নমুনা তুলিয়া আনিব।

মহৎ মানুষেরও কখনও কখনও স্মৃতির বিভ্রম হয়। এক জায়গায় দেখিলাম মহাত্মা আহমদ ছফারও খুব সম্ভব একটা স্মৃতিবিভ্রম ঘটিয়াছিল। আহমদ ছফা এক জায়গায় লিখিয়াছেন, ‘সকলে যে মধুদার টাকা মেরে দিতেন এটা সত্যি নয়। কাউকে কাউকে আমি বিদেশ থেকে ফিরে এসেও মধুদার টাকা শোধ করতে দেখেছি। একজনের কথা আমার মনে আছে। তিনি এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবির। তিনি কলেজে আমার শিক্ষক ছিলেন। ফরেন সার্ভিসে আড়াই কি তিন বছর কাজ করার পর—আমি তাঁকে দেখেছি—দোকানে এসে মধুদার বাকি পাওনা পরিশোধ করতে।’ (ছফা ১৪০৪)

আহমদ ছফার বয়ানে উক্ত ‘এখন’—মানে ১৯৯৭ সালে—যিনি ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন—তিনি নিজেই সম্প্রতি ঢাকায় আমাকে জানাইয়াছেন—তিনি আহমদ ছফার শিক্ষক ছিলেন না—ছিলেন শিষ্যস্থানীয় বা বন্ধুতুল্য অনুজ মাত্র। বিভ্রমের একটা সম্ভাব্য কারণ এই যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তরে একদা একই নামের অপর একজন সিনিয়র কূটনীতিকও কর্মরত ছিলেন। ঐ ভদ্রলোক শুনিলাম সম্প্রতি প্রয়াত হইয়াছেন। তিনি ১৯৬০ দশকের গোড়ায় চট্টগ্রাম জেলার অন্তপাতী নাজিরহাট কলেজে শিক্ষক ছিলেন। আহমদ ছফা ছিলেন সেই কলেজেরও ছাত্র। আহমদ ছফার কলেজ শিক্ষক হুমায়ুন কবির সাহেব একসময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কোন এক শাখার পরিচালক পদে আসীন হইয়াছিলেন বলিয়া জানা যায়। এদিকে মধুদা তো ১৯৭১ সালের আগের কালের—অতীত দিনের—স্মৃতি বৈ নহেন।

আহমদ ছফা একাধারে হুমায়ূন আহমেদকে—মানে তাঁহার কোন কোন লেখা পদার্থ—পছন্দ করিতেন, আবার কখনো কখনো তাঁহার কঠিন সমালোচনাও করিতেন। আমাদের জিজ্ঞাসা করিতে হইবে—এই পছন্দ আর অভিযোগের গোড়ায় কি লুকাইয়া আছে? এখানে আমরা আহমদ ছফার পরিণত বয়সের একটি জবানবন্দী হইতে শুরু করিব। ১৯৯৪ সালের জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম হইতে বিমানযোগে ঢাকা আসিয়া দুইটি তরুণ আহমদ ছফার একটি সাক্ষাত্কার আদায় করেন। ১৯৯৫ সালের নভেম্বর নাগাদ নিজ হাতে সংশোধন করিয়া সাক্ষাত্কার রচনাটি তিনি আরেকবার লিখিয়াছিলেন। সেই সংশোধিত পাঠ হইতে আমি এখানে কিছু সারগ্রহণ করিতেছি। চট্টগ্রামীণ ঐ সাক্ষাত্কারপ্রার্থীর নাম ছিল মীজানুর রহমান। এক জায়গায় আসিয়া তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, “আমাদের এখানে আপনার প্রিয় লেখক কে কে আছেন?” উত্তরে আহমদ ছফা অনর্গল বেশ কয়েকজন লেখকের নাম বলিয়াছিলেন। তাঁহাদের মধ্যে প্রথমেই দেখি হুমায়ূন আহমেদের নাম—অন্তত তাঁহার লেখা একটি বহির নাম—জ্বলজ্বল করিতেছে। পুরা উত্তরটা তুলিয়া দিলে হয়ত আখেরে আমার রক্ষা হয়।

আহমদ ছফা বলিলেন: ‘এককভাবে প্রিয় লেখক কেউ নেই। বিশেষ লেখকের বিশেষ বই আমার ভাল লেগেছে। ভাল লাগা বইগুলো হল: হুমায়ূন আহমেদের “নন্দিত নরকে”, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের “চিলেকোঠার সেপাই,” হাসান আজিজুল হকের ছোটগল্পগুলো, শওকত আলীর “প্রদোষে প্রাকৃতজন,” শওকত ওসমানের “জননী,” শাহেদ আলীর কোন কোন ছোটগল্প, রাজিয়া খান আমিনের “বটতলার উপাখ্যান,” মঞ্জু সরকারের “তমস,” সেলিম আল দীনের নাটক “কেরামতমঙ্গল,” সত্যেন সেনের “সেয়ানা,” “আলবেরুনী” এ সকল বই। আমি সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর “লাল সালু” এবং তাঁর দুটি নাটককে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে থাকি। আবু ইসহাকের “সূর্য-দীঘল বাড়ী”, আলাউদ্দিন আল আজাদের কোন কোন গল্পের কথা অবশ্যই উল্লেখ করব। আমার পছন্দের তালিকায় আরো কিছু লেখকের বই আছে। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না।’ (ছফা ২০০৮: ৩৮০)

আরো দুই কি তিন জায়গায় আহমদ ছফা হুমায়ূন আহমেদের—বিশেষ তাঁহার ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসটির—তারিফ করিয়াছিলেন। সাজ্জাদ শরিফ ও ব্রাত্য রাইসুর সহিত একখণ্ড সাক্ষাত্কারের তারিখ জানুয়ারি ১৯৯৬। এই রচনায়ও তিনি প্রাণ খুলিয়া বলিয়াছিলেন, হুমায়ূন আহমেদের প্রথম লেখা ‘নন্দিত নরকে’ সেই সময়ের জন্য ‘রেয়ার’ [মানে দুর্লভ অর্থাৎ অসাধারণ] লেখা। হুমায়ূন আহমেদের নাম মুখে আনিবার আগে তিনি আর যে দুই দুইজন লেখকের বিশেষ গুণকীর্তন করিয়াছিলেন, তাঁহারা হইলেন যথাক্রমে শওকত ওসমান ও সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ। আহমদ ছফার জবানিতেই পড়িতেছি: ‘যুগলক্ষণ আছে, কিন্তু যুগলক্ষণ অতিক্রম করে টিকে থাকবে দুজন লোক খুব সম্ভবত—আগের শওকত ওসমান, তাঁর “জননী”—আর ওয়ালিউল্লাহ সাহেব। তাঁর উপন্যাসগুলোর চাইতে নাটকগুলো মিনিংফুল বেশি। এগুলো সমাজে ইয়ে পায়নি। তারপরে এই হুমায়ূন আহমেদের প্রথম লেখাটা, “নন্দিত নরকে” … সেই সময়ের জন্য রেয়ার লেখা।’ (ছফা ২০০৮: ৩৪৮)

হুমায়ূন আহমেদের অসাক্ষাৎ তারিফ উপলক্ষে আহমদ ছফা আরও বলিলেন, হুমায়ূন ‘একবিন্দুও সেক্স না লিখে শ্রেষ্ঠ বাজারসফল বই’ লিখেছেন। এই জায়গায় তিনি তাঁহার বিপরীত-কোটির লোক পরিচয়ে সৈয়দ শামসুল হকের—বিশেষ তাঁহার ‘বাজার সুন্দরী’ নামক একটি বইয়ের—কথা উঠাইয়াছিলেন। বলিয়াছিলেন: ‘বাজার সুন্দরী বলে একটা উপন্যাস আমি পড়েছি তাঁর। মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখা। কি এগুলো! কি করে এগুলো মানুষ লেখে! সেক্স দিলে লোকে বই কিনবে, সেটার জন্যই করছে, বাজারের জন্য করছে।’ (ছফা ২০০৮: ৩৪৯)

এইদিকে আবার হুমায়ূন আহমেদের নামে একটা অভিযোগের ফিরিস্তিও দাখেল করিয়াছেন আহমদ ছফা। এই অভিযোগের তালিকাটা তেমন হ্রস্বও নহে। সাক্ষাত্প্রার্থীর নাতিদীর্ঘ এক সওয়ালের জবাবে তিনি আপনকার পরিচিত উপপাদ্য পুনঃপ্রকাশ করিয়াছিলেন। প্রার্থী জিজ্ঞাসা করিতেছিলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদের এই জনপ্রিয়তার সাক্ষাৎ কারণ কি?’ উত্তরের জন্য আহমদ ছফা যেন তৈয়ার হইয়াই ছিলেন। তিনি বলিলেন: ‘হুমায়ূনের সঙ্গে আমার সম্পর্কের ইতিহাস যাঁরা জানেন, তাঁদের অনেকেই তাঁর এই উন্নতি বা অবনতির জন্য অংশত আমাকেই দায়ী করতে চান। তাঁর প্রথম বই যখন বেরিয়েছিল, আমিই সবচাইতে বেশি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছি। তখন আমার মনে হয়েছিল হয়ত হুমায়ূনের মধ্যে কালে কালে আমরা চেখভের মত একজন প্রতিভার সন্ধান পাব। তিনি তো সে পথে গেলেন না।’ (ছফা ২০০৮: ৩৫৩)

আহমদ ছফার মতে, হুমায়ূন আহমেদ গেলেন উন্নতির পথে নয়, অবনতির পথে। মানে গেলেন যে পথ চিন্তাহীনের—যে পথ অরাজকের—সেই পথে। আহমদ ছফার ভাষায়, ‘উপর্যুপরি সামরিক শাসন, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার পরাজয়, সব মিলিয়ে এখানে যে চিন্তাহীন অরাজক পরিস্থিতি— হুমায়ূন সেই সময়ের প্রোডাক্ট।’ তাহার পরও প্রশ্ন থাকে। থাকে জনপ্রিয়তার প্রশ্ন। আহমদ ছফা কবুল করিলেন হুমায়ূন আহমেদ কামেল লেখক। কামেল না হইলে পাঠকদের মধ্যে তিনি জায়গা পাইলেন কেমন করিয়া? জায়গা শব্দের স্থলে ‘স্থান’ শব্দটাও বাংলাদেশের ভাষায় ব্যবহার্য। তাহার সত্য ব্যবহার করিয়া আহমদ ছফা জিজ্ঞাসিলেন: ‘আমার প্রশ্ন—এটা কি স্থান? হুমায়ূনের পরবর্তী রচনা চানাচুরের মত। খেতে মজা লাগে কিন্তু পেট ভরে না এবং সারপদার্থও বিশেষ নেই।’

একটু আগেই তিনি ব্যাখ্যা করিতেছিলেন ‘সফলতা’ কাহাকে বলে। বলিতেছিলেন, ‘সফলতা একটা আপেক্ষিক ব্যাপার। জাতির মর্মমূল স্পর্শ করে যদি ব্যর্থও হই, তার একটা আলাদা মূল্য আছে। মামুলি সার্থকতার চাইতে মহৎ ব্যর্থতার মূল্য অনেক বেশি। হুমায়ূন আহমেদ [প্রভৃতি] এঁরা ওই অর্থে সফল লেখক যে লিখে তাঁরা টাকা কামিয়েছেন। টাকা কামানোটাই কি সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি?’ (ছফা ২০০৮: ৩৫৩)

হুমায়ূন আহমেদ সম্বন্ধে এই পর্যন্ত আহমদ ছফা যাহা যাহা বলিয়াছেন তাহার সার তিন কথায় গ্রহণ করা যায়। একে আছে তাঁহার জনপ্রিয়তা মানে তিনি ভাল গল্প লেখেন—দুই নম্বরে তিনি সেক্স বিক্রয় করেন নাই, মানে সেক্স ছাড়াও বিক্রয় করার মতন অন্য পদার্থ তাঁহার আছে—আর তিন নম্বরে বলা যায় তিনি মার্শাল ল ওরফে সামরিক শাসনের প্রোডাক্ট। ‘প্রোডাক্ট’ মানে কি? ফসল বা সম্পত্তি বা পণ্য। যদি তাই হয় তো একটা ব্যাখ্যা আমিও পেশ করিতে পারি। তিনি কি সামরিক শাসনের শরিক বা সামরিক সমাজের সমর্থক বা বেসামরিক পৃষ্ঠপোষক ছিলেন? তবে কি একথা সত্য যে, যে সকল সমাজে একনায়কতান্ত্রিক শাসন স্বাভাবিক হুমায়ূন আহমেদ সেই ধরনের সমাজ হইতে আসিয়াছেন কিংবা সেই ধরনের সমাজেই ফিরিয়া যাইবেন?

আহমদ ছফাকে যাহারাই সামান্য চিনিতেন বা জানিতেন তাহারাই জানেন, নিরুত্তর থাকিবার লোক ছিলেন না তিনি। সাজ্জাদ শরিফও বেশ শরিফ লোক। তাঁহার সেদিনের সওয়ালটাও যথেষ্ট আশরাফ সওয়াল ছিল। রাখিয়া-ঢাকিয়া পরাণে কাচুলি পরিয়া তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন হুমায়ূনের সহিত বিবাদটা আহমদ ছফার একান্ত ব্যক্তিগত মামলা কিনা। আহমদ ছফা সঙ্গে সঙ্গে জানাইয়া দিলেন এই মামলার একটি এজমালি কিংবা পাবলিক তরফও আছে। বলিলেন, ‘না, না, হুমায়ূনের বড় প্রবলেমটা হচ্ছে মার্শাল ল।’ মানে ইঁহারা মার্শাল লয়ের মধ্যে বাড়িয়া উঠিয়াছেন। এই জায়গায় ইমদাদুল হক মিলনের নামটাও আসিয়াছিল।

সাজ্জাদ শরিফের সঙ্গে ঐদিন তাঁহার সহকর্মী, তাঁহার পেশাত ভাই, ব্রাত্য রাইসুও হাজির-নাজির ছিলেন। রাইসু সাহেব পোঁছ করিলেন, ‘মার্শাল লয়ের মধ্যে’ কথাটা জানি কি অর্থ বহন করিতেছে? আপনকার স্বভাবধর্ম মতেই এ কথাটার জবাব দিয়াছিলেন আহমদ ছফা। বলিয়াছিলেন, ‘মার্শাল ল’র ভেতরেই একদম’ বাড়িয়া উঠিয়াছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। ছফার জবানবন্দী ছিল এই রকম, ‘লেখক হিশেবে সেভেন্টি—ফোরে তাঁর উপন্যাস বেরিয়েছে, সেভেন্টি—ফাইভ থেকে এদের গ্রোথ। মার্শাল ল’র মধ্যে আমাদের গ্রেটেস্ট সোশ্যাল ডিসকোর্স যেগুলো… একজন লেখককে সোশ্যাল ডিসকোর্সে অংশগ্রহণ করতে হয়।’ আহমদ ছফার মুখ হইতে কথাটা কাড়িয়া লইলেন ব্রাত্য রাইসু। ফোড়ন কাটিলেন: ‘ওনারা করেন নাই?’ ছফা বলিলেন, ‘হুমায়ূন করে নাই একদম।’ (ছফা ২০০৮: ৩৪৩)

এই জায়গায় আসিবার পর হঠাৎ ইমদাদুল হক মিলনের কথাটা উঠিল। আহমদ ছফা জানাইলেন, মিলন ভারতবর্ষের দক্ষিণপন্থী হিন্দু সাম্প্রদায়িক পত্রিকা ‘আনন্দবাজার’ যে ডিসকোর্স বাংলাদেশে রপ্তানি করিতেছে তাহার সহিত গলা মিলাইয়াছেন। এক্ষণে সাজ্জাদ শরিফ পর্যন্ত অগত্যা আপনকার শরিফ মুখোশটি সরাইয়া লইতে বাধ্য হইলেন। তাঁহার সহি বড় খোদ চরিত্রটি প্রকটিত করিলেন। অন্তরের অন্তস্থলে যে আদি ও আসল সত্য এতদিন লুকাইয়া ছিল সেই নিম্ন-মধ্যবিত্ত থলির সত্য বিড়ালের মত বাহির হইল। তিনি দাবি করিলেন, ‘কিন্তু নূরজাহানের ঘটনা তো সত্যি, ছফা ভাই।’ আহমদ ছফা মনে হইল এই দাবিটার সত্যকার জবাব আর দিতে পারিলেন না। সুতরাং নিম্ন-মধ্যবিত্তের জয় হইল। না, জয় হইল কই? তিনি মাত্র প্রসঙ্গান্তরে গমন করিলেন। বলিলেন, ‘তসলিমা কিন্তু আমাদের সোশ্যাল ডিসকোর্স থেকে জন্মেছে, ইন্ডিয়ানরা ব্যবহার করেছে তাঁকে। কিন্তু মিলন আমাদের ডিসকোর্স থেকে জন্মায়নি। আর হুমায়ূন ডিসকোর্সটা এভয়েড করেছে।’ এই প্রতিপাদ্যের প্রমাণ বাবদ আহমদ ছফা তসলিমা নাসরিনের দোহাই পাড়িয়াছিলেন। তিনি বলিয়াছিলেন, ‘তসলিমা একটা ইন্টারভিউতে বলেছিল, আমি হুমায়ূন আহমেদের মত লিখতে পারতাম, লিখি নাই।’ (ছফা ২০০৮: ৩৪৪)

আহমদ ছফা ঠিকই ধরিতে পারিয়াছিলেন, হুমায়ূন আহমেদ শেষের দিকে সোশ্যাল ডিসকোর্সে ঢুকিবার পথ—তক্কে তক্কে মোকামে যাইবার খানকা—খুঁজিতেছিলেন। দুর্ভাগ্যের মধ্যে সেই মোকাম পর্যন্ত পৌঁছিতে তিনি পারেন নাই। কেন পারেন নাই তাহার একটা নির্ণয়ও তিনি বাতলাইয়াছিলেন। চেষ্টা করিয়াও হুমায়ূন পারেন নাই। কারণটা হয়ত তাঁহার মনের মধ্যেই লুকাইয়া ছিল। আহমদ ছফা পদার্থটার নাম রাখিয়াছিলেন বড়ই কোমল: ‘মানসিক শুদ্ধতা’। বাহিরের রাস্তার লোক যাহা চায় তাহা লিখিব বলিয়া যাঁহারা পণ করেন তাঁহাদের মানসিক শুদ্ধতায় টান আছে। আমার প্রাণ যাহা চায় তাহা লিখিবার কোশেস করিব—এই পণ করিলে অশুদ্ধিদোষ খানিক কাটিয়া যায়। আহমদ ছফার গুরু অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক একবার বর্তমান লেখককে কহিয়াছিলেন, ‘চায়ের পেয়ালায় দুই ফোঁটা লেবুর রস টিপিয়া দিবেন, দোষটোষ কিছু থাকিলে এক্কেরে কাইট্টা যাইব।’ আহমদ ছফার ভাষা প্রাঞ্জল। তাঁহার ভাষা বুঝিবার আশায় জলাঞ্জলি দিতে হইবে না। তিনি পরিষ্কার লিখিয়াছেন, ‘আমাদের পরাজয়গুলো আমাদের অক্ষমতাগুলো কেউ যদি বলতে পারতেন খুব সরল ভাষায়, সেটা হত সবচাইতে গ্রেটনেসের ব্যাপার। এটা কেউ বলছে না।’ (ছফা ২০০৮: ৩৪৬)

আর কিছুদিন যদি বাঁচিয়া থাকিতেন তো আহমদ ছফা দেখিতেন হুমায়ূন আহমেদও সোশ্যাল ডিসকোর্সে প্রবেশের নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করিতেছিলেন। গোঁফ দেখিয়া যদি বিড়াল চিনা যায় তো বলিব সেই গোঁফওয়ালা বিড়ালটি সামরিক যুগে মোটেও ইঁদুর মারিবার মতন ছিল না। ২০০৭ হইতে ২০০৯ পর্যন্ত যে অলৌকিক সরকার তত্ত্বাবধানের নামে বাংলাদেশের আইনসঙ্গত ক্ষমতায় আসীন ছিলেন সেই সরকারকেও হুমায়ূন আহমেদ ‘স্বাগতম’ বলিয়াছিলেন। আহমদ ছফার আশার গুড়ে বালি পড়িতে দেরি যে হয় নাই তাহা আমরাও ঠাহর করিতেছিলাম। শেষ পর্যন্ত তিনি পত্রিকায় যে উপন্যাসটি ছাপাইতেছিলেন সেখানেও লোকে একই সমস্যা খুঁজিয়া পাইয়াছে। কথাটা আদালত পর্যন্ত উঠিয়াছিল—এ কথা সকলেই জানেন। বিশেষ কি লিখিব?

এই নিবন্ধ সংহার করিবার আগে আমাকে অবশ্য দুইটা আনকোরা কথাও যোগ করিতে হইতেছে। একনম্বরে মনে পড়িল, হুমায়ূন আহমেদের তুলনা দিতে গিয়া মহাত্মা আহমদ ছফা সবচেয়ে বড় যে লেখকের নাম খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন তাঁহার নাম আন্তন চেখভ (ওরফে শেখভ)। এইটা কিন্তু খুব বড় কথা নয়। প্রসঙ্গক্রমে আমার আরও একটি কথা মনে পড়িতেছে। ইতালির বিখ্যাত দার্শনিক ও রাজনৈতিক নেতা আন্তনিয়ো গ্রামসি তখন বেনিতো মুসোলিনির কারাগারে আটক। তাঁহার সন্তানেরা রুশদেশে—মামাবাড়িতে—বড় হইতেছে। ১৯৩৪ সালের দিকে তাঁহার দশবছর বয়সী পুত্র দেলিয়ো মস্কো হইতে কারারুদ্ধ বাবাকে লেখা একটি পত্রে চেখভের বিশেষ ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছিল। দেলিয়ো লিখিয়াছিল, তাহার স্কুলের মাস্টার মহাশয় বলিয়াছিলেন চেখভ পৃথিবীর সেরা লেখক বা এই জাতীয় কিছু একটা। জবাবে পুত্রকে কারারুদ্ধ বাবা লিখিয়াছিলেন, চেখভ বড় ভাল লেখক সন্দেহ নাই, কিন্তু পৃথিবীর সেরা লেখক তিনি নহেন। সে রকম একটি লেখক খোদ রুশিয়াতেও আছেন অবশ্য। তাঁহার নাম লিও তলস্তয়। (গ্রামসি ২০০৮: ৩৬০-৬১)

এই তুলনাটি সেদিন আহমদ ছফার সাক্ষাত্কারধাত্রীদের  খুব পছন্দ হইয়াছিল এমন মনে করিবার কোন কারণ নাই। একটুখানি পরে আহমদ ছফাকে সাজ্জাদ শরিফ মহাশয় জিজ্ঞাসিয়াছিলেন, ‘আপনার নিজের সাহিত্যিক ব্যর্থতাগুলো কি?’ উত্তরদাতা শেষ পর্যন্ত যাহা বলিয়াছিলেন তাহা প্রাতঃস্মরণীয়: ‘আমি যে সমস্ত লেখককে পড়েছি, পুজো করেছি তাঁদের ধারেকাছেও যেতে পারি নাই।’ এই সার্থকনামা লেখকদের মধ্যে তিনি এয়োহান গ্যেটে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর ফিয়োদর দস্তয়েভস্কির সহিত লিও তলস্তয়ের নামও করিয়াছিলেন।

আমার কেন জানি মনে হয়, হুমায়ূন আহমদের সমস্যা কি তাহা আহমদ ছফা ধরিতে পারিয়াছিলেন ঠিকই কিন্তু তাঁহার প্রকাশটা অপূর্ণ থাকিয়া গিয়াছে। হুমায়ূন আহমেদ যাঁহাদের জন্য লিখিতেন তাঁহাদের মাপেই তিনি গড়িয়া উঠিয়াছিলেন। তিনি যাঁহাদের জন্য লিখিতেন তাঁহারা কাঁহারা? যদি বলি সাজ্জাদ শরিফ কিংবা ব্রাত্য রাইসুর মত পাঠকদের জন্য তবে পরিচয়টা পূর্ণ হয় না। ইঁহারাও একটি দলের সভ্য। কি তাঁহাদের পরিচয়? তাঁহারা ‘বাঙ্গালি মুসলমান’ বা বাংলাদেশের ‘বাঙ্গালি’ বলিলেও কথাটা ফুরাইতেছে না। তাঁহারা আরও। তাঁহারা অধিক। তাঁহারা নিম্ন-মধ্যবিত্ত। ফরাশি আওয়াজে ‘লো পুতি বুর্জোয়া’। ইংরেজিতে বলে ‘মিডল ক্লাস’। আহমদ ছফা সেই শ্রেণি-বিশ্লেষণে প্রবেশই করেন নাই। কিন্তু আকলমন্দের জন্য যথেষ্ট ইশারা তিনি রাখিয়া গিয়াছেন। সান্ত্বনা এইটুকুই। (ছফা ২০০৮: ৩৪৯-৫০)

হুমায়ূন আহমেদের এন্তেকালের পর আজ অনেকে বলিতেছেন, তিনি শরত্চন্দ্রের মত জনপ্রিয় হইয়াছিলেন কিংবা জনপ্রিয়তায় তাঁহাকেও ছাড়াইয়া গিয়াছিলেন। কথাটা মিছা নয় তবে আরও একটা কথা আছে। শরত্চন্দ্র কি চরিত্রের বস্তু ছিলেন? আমার হাতে বিশেষ সময় নাই। হুমায়ূন আহমেদ সম্বন্ধে আজ আমি নতুন কোন কথা বলিব না। শুদ্ধ শরত্চন্দ্র সম্বন্ধে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় একদা যে উক্তি করিয়াছিলেন তাহার পুনরাবৃত্তি করিব মাত্র। শরত্চন্দ্র স্থলে কাটিয়া হুমায়ূন শব্দটা বসাইলে হয়ত কাজ হইবে। চট্টোপাধ্যায়ের জায়গায় আহমেদ বসাইলেও মন্দ হইবে না। ১৯৩০ দশকের শেষাশেষি ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কোথায়ও বা লিখিয়াছিলেন: ‘আমাদের সমাজ এখনও প্রধানত নিম্নবিত্তশালীর সমাজ—এই গঠন যদি আরো কিছুকাল থাকে কিংবা অমর হয় তবে শরত্চন্দ্র অমর হবেন। আর যদি বদলায় তবে দ্বীপসৃষ্টিতে প্রবালের মতনই তাঁর কীর্তি আত্মবলির সমতুল্য হলেও হবে কেবল ব্যবহারিক।’ (মুখোপাধ্যায় ১৩৯৬: ৫৮)

দোহাই

১. আহমদ ছফা, ‘মধুদার স্মৃতি,’ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী গয়রহ (সম্পাদিত), মধু দা: শহীদ মধুসূদন দে স্মারকগ্রন্থ (ঢাকা: মধু দা স্মৃতি সংসদ, ১৪০৪) এবং আহমদ ছফা, ‘মধুদার স্মৃতি,’ বাংলালিপি, ২য় বর্ষ ১ম সংখ্যা (জানুয়ারি-মার্চ ২০১৪/ পৌষ-ফাল্গুন ১৪২০), পৃ. ৩৪-৩৭।

২. আহমদ ছফা, আহমদ ছফা রচনাবলি, ৩য় খণ্ড, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮)।

৩. ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, ‘আমার দৃষ্টিতে শরত্চন্দ্র,’ শরত্-স্মৃতি, বিশ্বনাথ দে (সম্পাদিত) (কলিকাতা: সাহিত্যম্, পুনর্মুদ্রণ ১৩৯৬)।

৪. Antonio Gramsci, Letters from Prison, vol. II, trans. F. Rosengarten, (New York: Columbia University Press, 2008).

২ আগস্ট ২০১২

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বণিকবার্তা

চতুষ্কের কবি

মমতাজুর রহমান তরফদার (১৯২৮-১৯৯৭) বগুড়া জেলার মেঘগাছা গ্রামে ১৯২৮ সালের ১ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ব্রিটেনের নুফিল্ড ফাউন্ডেশন (১৯৭২-১৯৭৪), আমেরিকার ডারহামস্থ ডিউক ইউনিভার্সিটি (১৯৯৬) এবং ঢাকাস্থ বাংলা একাডেমি (১৯৯৭) ও বঙ্গীয় শিল্পকলা চর্চার আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের (১৯৯৭) ফেলোশিপ লাভ করেন। ১৯৭৭ সালে বাংলা একাডেমি তাঁকে সাহিত্য পদক প্রদান করে। হোসেন শাহের বাংলা ১৪৯৪-১৫৩৮ : সমাজ ও রাষ্ট্র পর্যালোচনা (১৯৬৫), বাংলা রোমান্টিক কাব্যের আওয়াধী-হিন্দী পটভূমি (১৯৭১) ও Trade, Technology and Society in Medieval Bengal (১৯৯৫) তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। সাহিত্য, ধর্ম ও বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ ছাড়াও সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদ, আর্থসামাজিক ইতিহাস ও ইতিহাস চর্চার সমস্যা নিয়ে একাধিক রচনা লিখেছেন তরফদার। কবিতাতেও তিনি ছিলেন সমান উজ্জ্বল। নিজে কবিতা লেখার পাশাপাশি বাংলা রোমান্টিক কাব্যের ঠিকুজিও অনুসন্ধান করেছেন তিনি।

আজ এই লেখকের ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বর্তমান লেখাটি প্রকাশ করা হলো।
– ফিচার সম্পাদক, এনটিভি

নার্সিসাস নই আমি; আত্মরতি শিখিনি জীবনে;
তবুও আমারই ছায়া ভেসে ওঠে আশ্চর্য দর্পণে।
—মমতাজুর রহমান তরফদার (১৯৭৬ : ১৪৩)

অধ্যাপক মমতাজুর রহমান তরফদার দেহত্যাগ করিয়াছিলেন ১৯৯৭ সালের ৩১ জুলাই। সেই দুঃখের দিনে কোন শোক প্রকাশ করিতে না পারিয়া আরো দুঃখ হইয়াছিল। তখন আমি উচ্চশিক্ষার ঘাস কাটিতে বিদেশে বসবাস করিতেছি। এই মৃত্যুর দেড় বছরের মাথায় অধ্যাপক আহমদ শরীফ আর আড়াই বছরের মধ্যে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকও ইহলোক ত্যাগ করেন। এই তিন অধ্যাপকের গুণ আমি যতদূর পারি গ্রহণ করিতে তৎপর ছিলাম। তিনের মধ্যে মাত্র আব্দুর রাজ্জাকের মর্সিয়াই আমি তখন তখন লিখিতে পারিয়াছিলাম। পাক্কা কুড়ি বছর পর আজ মমতাজুর রহমান তরফদারের কথা দুই কলম লিখিতে বসিয়াছি।

তরফদার সাহেব ভূ-বাংলাদেশে ইতিহাস লেখক পরিচয়ে বিশিষ্ট। বস্তুত তাঁহার সহিত তুলনা দিবার মতন ইতিহাস লেখক এদেশে বড় বেশি নাই। তাঁহার লেখা ‘হোসেন শাহের বাংলা ১৪৯৪-১৫৩৮ : সমাজ ও রাষ্ট্র পর্যালোচনা’ (১৯৬৫) আর ‘বাংলা রোমান্টিক কাব্যের আওয়াধী-হিন্দী পটভূমি’ (১৯৭১) বাংলাদেশের ইতিহাস সাহিত্যের দুইটি অমূল্য সম্পদ। একদা এক জায়গায় তিনি নিজেকে ‘কবিতা-লেখক’ উপাধিও দিয়াছিলেন। এই সত্যের সহিত সাক্ষাৎ-পরিচয় না থাকিলে অন্য অনেকের মত হয়ত আমিও বিশেষ অবগত থাকিতাম না।

১৯৭৬ সালে তরফদার সাহেব ‘চতুষ্ক’ নামক একটি কবিতা সংগ্রহ প্রকাশ করিয়াছিলেন নিজ খরচায়। সংগ্রহের মুখবন্ধ উপলক্ষে তিনি খবর দিয়াছিলেন কৈশোরে—মায় যৌবনের একটা পর্যায় পর্যন্ত—তিনি কবিতা ব্যবসায়ে শরিক ছিলেন। ১৯৭৬ সালের তথ্য অনুসারে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তাঁহার কিছু কবিতা সেকালের পত্রপত্রিকায় মুদ্রিতও হইয়াছিল। ‘তারপর’—তাঁহার ভাষায়—‘কবিতা-রচনায় বিরতি ঘটে বিশেষ কারণে।’ বিশেষ কি তিনি আর বিশদ করেন নাই।

অনেকদিন—মানে কুড়ি বছর—পর আবার কবিতাক্ষেত্রে ফিরিয়া আসিলেন তিনি। অনধিক দুই বছরে গোটা চারি কেতাব ভরাইবার মতন কবিতা লিখিয়াও ফেলিলেন। এ সত্যের নিশ্চয় কোন তাৎপর্য আছে। একটা তাৎপর্য কবির একান্ত বা দৈনন্দিন জীবনের সহিত জড়িত বিষয়—সেই তাৎপর্যানুসারে চরিতামৃত লেখকেরা নিশ্চয়ই পদাবলি লিখিবেন। আরেকটা তাৎপর্য অনেকান্ত—ইহার সত্য ইতিহাসের অন্তর্গত। আমি আজ সেদিকেই মন যোগ করিতে চাই।

আমাদের পরম সৌভাগ্য যে মমতাজুর রহমান তরফদার প্রতিটি কবিতার পাদদেশেই একটি করিয়া রচনার তারিখ উৎকীর্ণ করিয়াছিলেন। চোখের পলকেই দেখা যায় ‘চতুষ্কে’র সকল কবিতা ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি হইতে ১৯৭৬ সালের জুলাইয়ের মধ্যে রচিত। ততদিনে মেঘে মেঘে অনেক বেলা হইয়া গিয়াছে। এ সত্যে সন্দেহ ছিল না বলিয়াই তরফদার সাহেব লিখিতে পারিয়াছিলেন, ‘কবিতা-লেখক হিসেবে আমি উদীয়মান নই, উদিতও নই, বরং অস্তগামী।’

স্বভাবের বশেই প্রশ্ন উঠিবে—কবিতা কবির কীর্তি, পড়িলেই বুঝিতে পারি কিন্তু যিনি এই কবিতাগুলি রাখিয়া গিয়াছেন তিনি কোন কারণে এইগুলি লিখিবার জন্য ১৯৭৫-৭৬ সাল বাছিয়া লইয়াছিলেন? প্রশ্নের একটা অপ্রত্যক্ষ জওয়াবও তরফদার সাহেব দিয়াছিলেন এইভাবে : ‘ইতিহাসকে বারবার ব্যবহার করেছি অতীতের কঙ্কাল হিসেবে নয়, বর্তমান সমাজ-জীবনের প্রতীক এবং অনুষঙ্গ রূপে, কখনো বা বৃহত্তর জীবনের পটভূমি রূপে।’ এই সত্যের আভাস কবিতার মধ্যেও ঢের পাওয়া যায়। উদাহরণ দিতেছি একটা। ‘ব্লাড ব্যাংক’ নামা একটি কবিতার নিচের তারিখ ৩০ জুন ১৯৭৬। তাহার একাংশে পড়িতেছি এমন এক বৈপরীত্যের গল্প যাহা রূপকথার অঙ্গ নহে। ইহাকে বরং ‘ইতিকথার পরের কথা’ বলা যাইতে পারে।

এখানে মানুষ ইস্পাত বা অন্য কোনো কঠিন ধাতুতে গড়া।
তারা রুপোর টেবিলে ঝুঁকে পড়ে সোনার অক্ষরে নাম সই করে।
আসবাব-পত্র, ঘরদুয়ার, পথঘাট, গাছপালা মুক্তায় তৈরী।
মেয়েদের শাটিন আর বুতিক কঠিন পাথরের
আর তাতে রক্তময় মণির আলো ঠিকরে পড়ে।
হীরকের কাছ থেকে অমৃতের ফল ঝরে।
পানীয় এখানে তরল সোনা; এখানে রক্ত নেই।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৫৯)

একদিকে তিনি দেখিয়াছেন হাসপাতালে রক্ত নাই, ব্লাড ব্যাংকে রক্ত পাওয়া ভার, রক্তের অভাবে রোগী মারা গিয়াছে অথচ চারিদিকে রক্তের সমুদ্র। এই বৈপরীত্যে তিনি হতবাক।

হাজার হাজার গ্রাম মানচিত্রে শুয়ে আছে
সবুজে, নীলে, আরো বিচিত্র রঙের সম্ভারে।
ভরে ওঠে লাখ লাখ সিরিন্জ্ তরমুজের রসের মত রক্তে—
গোলাপী, লাল লাল রক্তে।

এখন শহরের ব্লাড ব্যাংক রক্তের সমুদ্র,
তাতে অণু-পরমাণুর তরঙ্গ ওঠে।
গ্রামে গ্রামে নেমে আসে সন্ধ্যা—নরম নরম সন্ধ্যা।
আকাশে তারাগুলো কাঁপছে।
খেতে, খামারে, আঙিনায়, বারান্দায়
পড়ে আছে লাখ লাখ লাশ।
নিসর্গ ডুবে গেছে স্তব্ধতার সমুদ্রে।

সাত নম্বর ক্যাবিন ফাঁকা।
সে মর্গে—বোধ হয় রক্তের সন্ধানে।

ফিকে চাঁদ দিগন্তে;
আকাশ তারায় তারায় ঝাঁঝরা—
ওটা ক্যান্সার রোগীর হৃৎপিণ্ড।

গ্রামের আকাশের তারাগুলো
লাশের উপর মৃদু মৃদু আলো ছড়ায়।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৫৯-৬০)

বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের তুলনা খুব কম আছে। এই শ্বাসরুদ্ধকর ক্রান্তিকাল এদেশের ইতিবৃত্তে বহুদিন অনতিক্রান্ত থাকিবে বলিয়াই মনে হয়। মমতাজুর রহমান তরফদার দেখিতেছি কবিতায় ফিরিয়া আসিতেছেন এই কালসংক্রান্তির—এই ১৯৭৫ সালের—গোড়ার দিকেই। তাঁহার ‘চতুষ্ক’ গ্রন্থের পহিলা কবিতার নিচে তারিখ ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫। এই দিনই তিনি দীর্ঘদিনের নীরবতা ভাঙ্গিলেন। তরফদারের প্রথম কবিতার নাম ‘অরণ্য’। এই সমাপতন একান্ত আকস্মিক মনে করার কোন হেতু দেখিতেছি না। চতুষ্কের শেষ কবিতা ‘বুকের আগুনে’। ইহার একটি পংক্তি : ‘আর কত বার আমরা নতুন ব্যাখ্যা দেব স্বাধীনতার’।

বাংলাদেশে একখণ্ড জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটা ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে। যাঁহারা দীর্ঘ সাধনার বলে এই ভিত্তিটি পরিচ্ছন্ন দৃষ্টিতে আবিষ্কার করিতেছিলেন ইতিহাস ব্যবসায়ী মমতাজুর রহমান তরফদার তাঁহাদের প্রথম সারিতে। দিল্লিতে সুলতানি শাসন প্রবর্তনের পরপরই বাংলাদেশেও স্বাধীন রাষ্ট্রের নতুন করিয়া গোড়াপত্তন হইয়াছিল। সেই গোড়াই পত্রেপুষ্পে ফলবান হইয়াছিল ইংরেজি পনের শতকের শেষ ও ষোল শতকের শুরুতে। এই সত্যে তরফদারের সন্দেহ ছিল না।

জনসাধারণের ইচ্ছাই রাষ্ট্রক্ষমতার ভিত্তি—এই সত্যের উপর দাঁড়াইয়াই বাংলাদেশের নতুন প্রজাতন্ত্র আপনার ঐতিহাসিক ন্যায্যতা অর্জন করিয়াছিল। ১৯৭১ সালের সশস্ত্র সংগ্রাম প্রকৃত প্রস্তাবে সেই ন্যায্যতার মূলেই জয়ী হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী জনগণের সেই ইচ্ছার সাময়িক বিয়োগ ঘটায়। তরফদারের ‘অরণ্য’ কবিতায় দেখিতেছি সেই আবহের রূপকই পুরাদস্তুর উপস্থিত।

আদিম অরণ্য এই স্বর্গ, মর্ত্য অথবা পাতালে;
ছিল না সূর্যের আলো এ অরণ্যে আমাদের কালে।
স্যাঁৎস্যাঁতে এই মাটি, কর্দমাক্ত পথ ও প্রান্তর
নিঃশব্দ আরণ্য নদী, শব্দহীন বনবনান্তর।
এখন বাতাস ভারি এবং রক্তের গন্ধ সহজাত যেন;
প্রকৃতি আর্দ্রতা ঝেড়ে কঙ্কালের শুভ্রতা বাড়ায়।
(তরফদার ১৯৭৬ : ৩)

এই জায়গায় প্রসঙ্গক্রমে মহান লেখক আহমদ ছফার কথাও উল্লেখ করিতে হয়। তিনি কবিতা লেখা শুরু করিয়াছিলেন ১৯৫০ সালের পরের কোন এক পর্যায়ে। ১৯৬৪ সালের পর তাঁহার কোন কোন কবিতা ঢাকা শহরের পত্রপত্রিকায় ছাপা হইতে শুরু করে। ১৯৬৬ সালের পর হইতে তিনি উপন্যাস-শুদ্ধ নানা প্রকার লেখা প্রকাশ করিতেছিলেন। কিন্তু যতদূর জানি ১৯৭৫ সালের আগে তিনিও নিজের লেখা কোন কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন নাই। অথচ ১৯৭৫ সনের প্রথম ভাগে আহমদ ছফা যেন বা বড় কোন তাড়ায় পড়িয়া পরপর দুইটি ছোট ছোট কবিতার বই—যথাক্রমে ‘জল্লাদ সময়’ ও ‘দুঃখের দিনের দোহা’—প্রকাশ করেন। ‘জল্লাদ সময়’ কবিতা সংকলনের নামকবিতায় আহমদ ছফা অন্যান্যের মধ্যে এই কথা-গুলিও লিখিয়াছিলেন :

সূর্যালোকে পিঠ দেয় আততায়ী লজ্জিত সময়
যা কিছু প্রকাশ্য তুমি বামহস্তে করছ গোপন
সমূহ ধ্বংসের বীজ গর্ভাশয়ে করেছ রোপণ
কিন্তু কিছু সত্য আছে কোনদিন লুকোবার নয়।
(ছফা ২০১০ : ২৪)

আহমদ ছফার আরেকটি কবিতার নাম ‘দুঃসময়’। এই কবিতাটি ‘দুঃখের দিনের দোহা’ নামক সংকলনের অংশ। এখানেও কবি যাহা লিখিয়াছিলেন তাহা দুর্দিনের বার্তা বৈ নয়।

নদীতে বইছে বেগে খরতর খরস্রোত
দুকূলে নামছে ধ্বস, অবিরত চলছে ভাঙন
ভাঙন ভাঙন শুধু চারদিকে ভাঙনের ক্ষণ।

বইছে কুটিল জল তটরেখা করে না শাসন
এই জলে পলি নেই, নেই কোন গর্ভের সঞ্চার
জাগবে না স্রোতোপথে চরের আদল।
(ছফা ২০১০ : ৫২)

আমার মনে হইয়াছে মমতাজুর রহমান তরফদারের কবিতা পড়িবার পূর্বাহ্নে ভূমিকাস্বরূপ এই কয়টি কথা না বলিলেই নয়। আমি আমার একান্ত অভিজ্ঞতা হইতেই জানি, আহমদ ছফার সহিত তরফদারের ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। তিনি যে আহমদ ছফার কবিতার সহিত পরিচয় রাখিবেন—তাহা মোটেও অস্বাভাবিক মনে হয় না।

বাংলাদেশে যাহাকে বলে অনগ্রসর—তদুপরি মুসলমান—কৃষক-সমাজ তাহার অনেক সদস্যের মত আমিও কয়েক বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্দুকে জীবনপাত্র বন্ধক রাখিবার সৌভাগ্য অর্জন করিয়াছিলাম। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হইবার সুবাদে হাতে গোনা কয়েকজন গুণীর দেখা পাইয়াছিলাম। এই গুণীদের মধ্যে অধ্যাপক মমতাজুর রহমান তরফদার। তাঁহার কাছে আমার অনেক ঋণ আজও অপরিশোধিত। এই ক্ষুদ্র নিবন্ধে আমি শুদ্ধ দুই-তিনটি ঋণের কথা স্বীকার করিব। তবে বলিয়া রাখিব তাহাতেই আমার কর্তব্যের তামাম হইবে না।

পরিচয়ের কিছুদিনের মধ্যেই তরফদার সাহেব একদিন আমাকে ‘বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষৎ’ নামক যে প্রতিষ্ঠানের সহিত তিনি নিখিল জড়াইয়া ছিলেন তাহার কোন এক শীতকালীন সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানাইয়াছিলেন। সনতারিখের বালাই আমার মনে বিশেষ থাকে না।  একটার নাম ‘বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষৎ’ আর একটার পরিচয় ‘বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি’—এই ক্রমে যে দুইটা পদার্থ ঢাকায় আছে তাহাও আমি অনেকদিন পর্যন্ত আমল করি নাই। এতদিনে শুনিতেছি ইহাদের মধ্যে সংঘর্ষও  আছে। তাহাতে আমার মাথাব্যথা নাই।

ঘটনাটি খুব সম্ভব ইংরেজি ১৯৭৭ সালের গোড়ার দিকের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের দোতলায় একটি সেমিনার ঘরে ইতিহাস পরিষদের ঐ অধিবেশন বসিয়াছিল। বিষয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। বিশেষ বলিতে ততদিনে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখিবার সময় হইয়াছে কিনা তাহাই ছিল বিবেচ্য। কেহ কেহ বলিতেছিলেন সময় হইয়াছে; এখনই ইতিহাস লেখা শুরু করিতে হয়। আর কেহ বা না লেখার পক্ষে যুক্তি দেখাইতেছিলেন। বলিতেছিলেন: না, না, এখনো সময় হয় নাই। এক্ষণে শুদ্ধ ইতিহাসের মালমশলা যোগাড় করিতে হইবে, পরিণাম ইতিহাস পরে দেখা যাইবে। মনে রাখিতে হইবে, তখনো বাংলাদেশে জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অর্ধযুগ পার হয় নাই।

অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন মমতাজুর রহমান তরফদার। প্রবন্ধ পড়িলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন শিক্ষক তাজুল ইসলাম হাশমী। হাশমী সাহেবের যুক্তি কি ছিল তাহা আমার এখন আর স্পষ্ট মনে পড়ে না। ইতিহাস পরিষদের নথিপত্র ঘাঁটিলে হয়ত কিছু প্রমাণ এখনো পাওয়া যাইবে।

মনে পড়িতেছে ভদ্রলোকের বাংলা উচ্চারণে একটু জড়তা ছিল। যতদূর জানি বাংলা তাঁহার মাতৃভাষা ছিল না কিন্তু তিনি দেখিলাম বাংলাতেই লিখিলেন। যাহা হৌক, আমাকে সেই অধিবেশনে হাজির করিয়াই তরফদার সাহেব আপন কর্তব্য সমাপন করেন নাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢের ছাত্র ও সমাগত অনেক শিক্ষকের সামনে আমাকে দাঁড় করাইয়া পর্যন্ত দিয়াছিলেন। বলিয়াছিলেন হাশমীর প্রবন্ধের উপর মন্তব্য যোগ করিতে হইবে। বুঝিতে পারি নাই তিনি কেন এই অযৌক্তিক (‘গর্হিত’ বলা হয়ত সম্পূর্ণ ঠিক হইবে না) কাজটি করিতে গেলেন। এখন মনে হইতেছে ‘কবিতা-লেখক’ ছিলেন বলিয়াই হয়ত তাঁহার দেওয়ানে ইহা সম্ভব হইয়াছিল।

স্কুলবেলার পাঠ্যপুস্তকে পড়া একটি গল্প সেদিনের বক্তৃতার মধ্যে চোলাই করিয়াছিলাম। যতদূর মনে পড়ে পুস্তকের নাম ‘পাক মেট্রিকুলেশন ট্রান্সলেশন’। উপসংহারে বলিয়াছিলাম, ইতিহাস না পড়িয়াই মরিতে হইতেছে জানিয়া এক রাজা বড় দুঃখ পাইয়াছিলেন। দুঃখ দূর করিবার মানসে তাঁহার অন্তিম মুহূর্তে ধীমান এক মন্ত্রী রাজার কানে কানে বলিতেছিলেন, ‘রাজা মহাশয়, ইতিহাস পড়িতে না পাইলেন তাহাতে দুঃখ করিবেন না। পৃথিবীর ইতিহাসের সারমর্ম তো আমার জানাই আছে; এখনই শুনাইয়া দিতেছি: মানুষ জন্মিয়াছে, দুঃখ পাইয়াছে আর মরিয়াছে—ইহাই পৃথিবীর ইতিহাসের সারমর্ম।’ রাজা তখনই আনন্দাশ্রু নির্গত করিতে করিতে চক্ষু মুদিয়াছিলেন। কোন কোন আকলমন্দের জন্য—শুনিয়াছিলাম—গল্পের ইশারাই যথেষ্ট প্রমাণিত হইয়াছিল।

সবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উঠানে পা দিয়াছি। সময়টা বেশ। প্রথম বছরটা শেষ করিয়াছি কি করি নাই। তাহার উপর আমি ‘ইতিহাস’ কিংবা ‘ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি’ কোন বিভাগের ছাত্র নহি। তরফদার সাহেবের সহিত আমার দেখা করাইয়া দিয়াছিলেন যিনি আব্দুর রাজ্জাক সাহেবের সহিত আমার মোলাকাতের কারণও ছিলেন সেই মহাত্মাই। নাম আহমদ ছফা। তখন মনে মনে সন্দেহ জাগিয়াছিল তরফদার সাহেব হয়ত আহমদ ছফার কথায় প্রভাবিত হইয়াছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয় হইতে বাহির হই বাহির হই এমন সময়ে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের একটা লিখিত বক্তৃতা বা প্রবন্ধ সমালোচনা করিয়া আমি একটি ছোট্ট বেজায় প্রবন্ধ লিখি। তাহাতে মহাত্মা আহমদ ছফা সত্য সত্যই বেজার হইয়াছিলেন। তিনি আমাকে একবার ডাকিয়া বলিয়াছিলেন, ‘তোমার জিহ্বার মধ্যে একটি ঘাতক হাঙ্গর। তাহার আশীর্বাদে জীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি জুটিবে না।’ গুরুজনের আশঙ্কা বৃথা যায় না। একবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি জুটিয়াও সেই অমৃতের ফল আমার হাত হইতে ছুটিয়া গিয়াছিল। চাকরির গোড়া শুকাইয়া গিয়াছিল।

আব্দুর রাজ্জাকের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর কোন মহাশয়ের সমালোচনা বিশেষ করি নাই। যদি কাঁহারও করিতে হইত তো আমি মমতাজুর রহমান তরফদার কিংবা তাঁহার গুরু আবু মহামেদ হবিবুল্লাহর কীর্তি লইয়াই তাহা করিতাম। মনোবল শেষ হইয়া গিয়াছিল। আর সাহস গিয়াছিল শুকাইয়া। সাহস বড়ই তরল পদার্থ। যে পাত্রে রাখেন তাহারই আকার ধারণ করে। আল্লাহতায়ালার পরম করুণায় অল্পেই—অপার বিলম্ব ঘটিবার আগেই—বুঝিয়াছিলাম অল্পবিদ্যা কত ভয়ংকর।

এক্ষণে বলিয়া রাখি, আমার চাকরি যাইবার পশ্চাতে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের কোন হাত ছিল না। তিনি বরাবরই আমার বরাভয় ছিলেন। এই জাতীয় ঘটনাকে গ্রিক পুরানে ‘ট্রাজেডি’ বলা হইত। একালে আমরা বলি ‘ট্রাউয়ারস্পিয়েল’।

এক্ষণে আমাকে আরেকটি ঋণের কথা বলিতে হয়। ১৯৮৬ সাল নাগাদ আমি উচ্চশিক্ষার নামে বিদেশ যাইবার একটা সুযোগের সদ্ব্যবহার করিতে বাধ্য হইয়াছিলাম। দেশে ফিরিবার পথে কিছু দেরি হইয়াছিল। কিছু মানে গোটা চৌদ্দ বছর। আগেই কহিয়াছি আমার ফিরিবার আগেই তরফদার সাহেব পরলোকগমন করিলেন ৩১ জুলাই ১৯৯৭। এক্ষণে আঁক কষিয়া দেখি আর একদিন পার হইলেই তাঁহার জন্মের দিন আর মৃত্যুর দিন এক দিবস হইত। জীবনের ৬৮ বছর যেদিন পূর্ণ করিলেন সেদিনই তাঁহার ইহবিয়োগ হইল। তাঁহার সহিত এ জীবনে আর দেখা হইবে না। আমি যে তাঁহার কবিতা লইয়া এই প্রবন্ধ লিখিতেছি তিনি কোনদিন জানিতে পারিবেন না।

১৯৮৫ সালের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্র’ নামে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান খাড়া করিলে তরফদার সাহেব উহার সভাপতি নিযুক্ত হইলেন। আমি ততদিনে বছর দুই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটাইয়া ঢাকায় ফিরিয়া আসিয়াছি। উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্রের প্রথমদিকের একটি সেমিনারের বিষয় ছিল ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন বিষয়ে কার্ল মার্কস যে সকল লেখা লিখিয়াছিলেন সে সকল লেখার পর্যালোচনা। তরফদার সাহেব সেই সেমিনারেও সরকারি খামে আমাকে কেন জানি নেমন্তন্ন করিয়াছিলেন।

প্রচার করা হইয়াছিল এই সেমিনারে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মো. মোফাখ্খারুল ইসলাম একটা মূল্যবান প্রবন্ধ পড়িবেন। তাঁহার লেখার পর্যালোচনা করিতে মোট দুইজন আলোচক সরকারি ডাক পাইয়াছিলেন। একজনের নাম আবু আহমদ আবদুল্লাহ। নিজের নামেই ইনি যথারীতি দেশবিখ্যাত। সেই সময় ‘বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান’ নামক এক আধা-সরকারি কেন্দ্রের অর্থনীতি ব্যবসায়ী পরিচয়ে ভূষিত তিনি। আরজন আমি। মাত্র নগণ্য প্রভাষক। তাহাও আবার ‘ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট’ নামক ইতিহাসে অব্যবসায়ী একটি গোমড়ামুখ শিক্ষাসত্রের।

এই অধিবেশনে আমি ঠিক কোন কোন বাক্য আওড়াইয়াছিলাম তাহা আমার এখন আর মনে নাই। শুদ্ধ এইটুকু মনে পড়িতেছে যে মোফাখ্খার সাহেব যাহা বলিয়াছিলেন তাহার অনেক কথাই আমার মনে ধরে নাই। সে যুগে আমি মার্কস ব্যবসায়ে নামিয়াছি খুব বেশিদিন হয় নাই। আর এদিকে মোফাখ্খার সাহেব পশ্চিম দেশীয় পণ্ডিতদের পায়ের চিহ্ন অনুসরণ করিয়া কার্ল মার্কসের মুণ্ডুপাত করিতেছিলেন। আর যায় কোথায়! ইহার ফল—বলা বাহুল্য—ভাল হয় নাই। আহমদ ছফার আবিষ্কৃত দুশমন হাঙ্গরটি তখনো আমার জিহ্বা ত্যাগ করে নাই।

এখন আমার তৃতীয় দফা ঋণ বা ঋণমালার কথা বলিব। মমতাজুর রহমান তরফদার তাঁহার নিজের লেখা দুই-তিনটা পুস্তক আমাকে উপহারস্বরূপ দিয়াছিলেন। একটির নাম ‘বাংলা রোমান্টিক কাব্যের আওয়াধী-হিন্দী পটভূমি’। দ্বিতীয়টির নাম ‘চতুষ্ক’। চতুষ্কের কথা এই নিবন্ধের গোড়াতেই একবার বলিয়াছি। এক্ষণে আরেকটু বিস্তার করিবার বাসনা হইতেছে।

তিনি খুব সম্ভব আশা করিয়াছিলেন অন্তত শেষের কেতাবটি লইয়া আমি দুই কথা মুসাবিদা করিব। এই কবিতাবলির ভূমিকাচ্ছলে তিনি যাহা লিখিয়াছিলেন তাহাতে যথেষ্ট ইশারা আছে যে লোকে ইহার সমালোচনা করেন। তাঁহার বিভাগের জনৈক সহকর্মী সমীপে প্রকাশ্যে এই বাসনা পেশও করিয়াছিলেন। তরফদার সাহেবের বাসনাটি ছিল এইরকম :

লিখেছিলাম নিতান্তই আত্মবিনোদনের জন্য। প্রফেসর আহমদ শরীফ, অধ্যাপক, কবি মুফাখ্খরুল ইসলাম এবং ডক্টর পারেশ ইসলাম মুস্তাফিজুর রহমানের তাগিদে কবিতাগুলো প্রকাশ করলাম। আমার বহু কবিতার জন্মলগ্নের সঙ্গে ডক্টর মুস্তাফিজুর রহমানের নিবিড় পরিচয় আছে। এখানে তাঁর নাম উল্লেখ করলেও আমার কবিতার সমালোচনার অধিকার তাঁর রইল। (তরফদার ১৯৭৬ : পাঁচ-ছয়)

‘আওয়াধী-হিন্দী পটভূমি’ বইটি ছাপা হইতে না হইতে ১৯৭১ সাল আসিয়া গিয়াছিল। ইহার গায়ে ছাপ মারা ছিল ১৯৭১ সালের। প্রকাশকাল জানুয়ারি ১৯৭১ আর প্রকাশক—পুস্তকে মুদ্রিত পাঠ অনুসারে—‘অধ্যক্ষ মুনীর চৌধুরী, বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’। মনে পড়িল সে যুগে বিভাগীয় প্রধান বাংলা প্রকরণে ‘অধ্যক্ষ’ পরিচয়ে চলিতেন।  তবে শব্দটা শেষ পর্যন্ত চলিল না কেন সে প্রশ্ন নিহিতই রহিল। আরো জানিলাম, ‘বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগ’ তখনো এক পাত্রেই রাখা হইত।

সঙ্গত কারণেই বইটির ভালমত বিলিবিতরণ হয় নাই। ১৯৭৭-৭৮ সালের কোন একদিন আমার হাতে একটি কপি তুলিয়া দিবার কালে তরফদার সাহেব বলিতেছিলেন, ‘১৯৭১ সালের বিপ্লবে আমার বইয়ের প্রায় সব কপি নষ্ট হইয়া গিয়াছিল। গোটা দশ কপি আমার নাগালে ছিল। একটা দিয়াছিলাম হুমায়ুন কবিরকে, ১৯৭২ সালে। সে বলিয়াছিল একটি আলোচনা লিখিবে। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই আততায়ীর গুলিতে মারা যায় হুমায়ুন।’

আমার কপিটি হস্তান্তরের সময়ও তিনি সেই পুরাতন কথাই বলিতেছিলেন, ‘এটাই আমার শেষ কপি।’ তখন থাকিতাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রাবাসে। সেই এজমালি কাড়াকাড়ি ছাত্রাবাসের মধ্যেও কপিটি আমি বহুদিন যক্ষের ধনের মত রক্ষা করিয়াছিলাম। কিন্তু শেষ রক্ষা করিতে পারি নাই। কথা রক্ষার প্রসঙ্গ উঠাইতেছি না। রক্ষার যোগ্যতা আমার তখন হয় নাই—সিদ্ধি আজও অধরাই রহিয়াছে।

পরে ‘আবদুর রহমানের সন্দেশ-রাস্ক’ নামে একটি আলাদা প্রবন্ধও তিনি প্রকাশ করেন। ইহাকে ‘আওয়াধী-হিন্দী পটভূমি’র পরিপূরক বলা যাইতে পারে। আওয়াধী-হিন্দী ও বাংলা কাব্যের তুলনায় সমালোচনা করিবার মানসে তরফদার সাহেব শুদ্ধ ‘আওয়াধী-হিন্দী’ ভাষাই শেখেন নাই, মনে হইতেছে বাংলা কবিতায়ও হাত মকশো করিতেছিলেন। শুদ্ধ কি তাহাই? তিনি দেখিতেছি ফরাশি ভাষাও অনেক দূর আত্মস্থ করিয়াছিলেন। মমতাজুর রহমান তরফদার ‘কবিতা-লেখক’ ছিলেন বলিয়াই হয়ত এই সাধনা তাঁহার দ্বিতীয় স্বভাব হইয়া উঠিয়াছিল।

পাঠিকা হয়ত লক্ষ্য করিবেন মমতাজুর রহমান তরফদার নিজেকে কদাচ ‘কবি’ বলেন নাই। বলিয়াছিলেন মাত্র ‘কবিতা-লেখক’। মনে পড়ে রাজা রামমোহন রায় তাঁহার জমানার কবিদের অন্তত একবেলা ‘কবিতাকার’ বলিয়া ডাকিয়াছিলেন। কোন এক কবি বলিয়াছিলেন, সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি। কথাটার সত্যাসত্য নির্ভর করে ‘কবি’ বলিতে আপনি কি বুঝাইতেছেন তাহার উপর। আমরা অন্য প্রকরণে বলিয়া থাকি মানুষ মাত্রেই কবি কেননা তাহার মধ্যে বাক্যের ঊষ হইয়াছে। আর কে না জানে ভাষার মধ্যে দুইটি নিয়ম যুগপদ ভাষাকে বাক্যের সমান করিয়াছে। ইহাদিগকে যথাক্রমে ‘রূপক’ ও ‘লক্ষণা’ বলিয়াই আমরা জানি।

এক্ষণে আমি তরফদার সাহেব আমাকে দুই নম্বরে যে বইটি দান করিয়াছিলেন তাহার কথা পাড়িতেছি। বইয়ের নাম ‘চতুষ্ক’। ইহা চারিটি বইয়ের একত্রিত নাম। বই চারিটি যথাক্রমে ‘প্রত্ন’, ‘অন্ধকার অভিজ্ঞতা: আলোক’, ‘আভা’ এবং ‘অনন্য সুরগুলো’ নামে রচিত। বহিচতুষ্টয়ের অন্তর্গত কবিতার সংখ্যা গোটা ছিয়ানব্বই। অতিরিক্ত সংযোজনা আকারে আরো সাতটি কবিতা পাওয়া যাইতেছে।

বই চারিটি তিনি চারিজন ইষ্টের নামে উৎসর্গ করিয়াছিলেন। একটি উৎসর্গ প্রসঙ্গে খানিক শোকের কাহিনীও বিবৃত করিয়াছিলেন তিনি। তরফদার লিখিয়াছেন :

শেষ কাব্য ‘অনন্য সুরগুলো’ বহু দিন আগে পাণ্ডুলিপিতে শিল্পী জয়নুল আবেদিনের প্রতি উৎসর্গ করেছিলাম। তখন উৎসর্গের অংশে একটি-মাত্র কবিতা-পংক্তি ছিল। তাঁর দাফন শেষ করে এসে দ্বিতীয় প্রুফে ২৮/৫/৭৬ তারিখে প্রথম লাইনটি যোগ করে দেই। শিল্পী বিদেশ থেকে ফিরে এলে তাঁর সঙ্গে এপ্রিল মাসে দেখা করি। তাঁর শোয়ার ঘরে একটি অসমাপ্ত চিত্রের সামনে বসে দু’জন আড়াই ঘণ্টা কথা বলি। তারপর ‘জয়নুল আবেদিনের অসমাপ্ত চিত্র’ শীর্ষক কবিতাটি লিখি। কবিতাটি অথবা উৎসর্গের ঘটনাটি শিল্পী জানতে পারলেন না। আমার কাছে তাঁর মৃত্যুর মতই এই ঘটনাটি শোকাবহ। (তরফদার ১৯৭৬ : পাঁচ)

এখানে আমরা উৎসর্গপত্রের সেই দুইটি পংক্তি নকল করিয়া দিতেছি।
এখন ডুবেছে সূর্য সমাপ্তির গোধূলি-হাওয়ায়;
সব রঙ, সব রেখা বিদ্যুতের শিখা হয়ে সমুদ্রের দিকে চলে যায়।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১১৫)

মমতাজুর রহমান তরফদার বগুড়া জেলার যে গ্রামে জন্মিয়াছিলেন তাহার নামেও আছে রূপক, আছে কবিতার গন্ধ। আর কি বাহারি সে নাম! ‘মেঘগাছা’! ‘গাছগুলো মেঘরঙ’ নামক একটি কবিতায় তরফদার মোটে একবার নয়, গোটা দুইবার জিজ্ঞাসা করিয়াছেন।

গাছগুলো মেঘরঙ—
এই নাম যারা দিয়েছিল গ্রামটিকে
তারা কি কবি ছিল?
(তরফদার ১৯৭৬ : ২২, ২৪)

‘একটি প্রার্থনা শুধু’ নামের আরেকটি কবিতাযোগে তিনিও ‘মেঘগাছা’ গ্রামের স্মৃতি পুনর্জাগ্রত করিয়াছিলেন। প্রার্থনা জানাইয়াছিলেন সেই গ্রামে সমাহিত হইবার।

একটি প্রার্থনা শুধু তোমাদের কাছে—
যদি নানা রঙ ঝরে অমৃতের গাছে
জল দিও বনেদী আলবালে।

যদি অন্ধকার নামে অমৃতের গাছে
নিতান্ত অকালে,
লাশটিকে রেখে দিও মর্গের সোপানে।
যদি ঠাঁই নাই-ই মেলে, তবে অন্য খানে—
যে গ্রামের গাছগুলো মেঘরঙ আর
যে গ্রামের বাতাসেও বসন্তবাহার
শুনেছি অনেক বার।…
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৫২)

মমতাজুর রহমান তরফদার কখনো কখনো দূর বিদেশে বসিয়াও এই মেঘগাছা নধর গ্রামের স্মৃতিকাতর হইয়াছিলেন। ‘ঋণ’ নামক একটি কবিতায় দেখি তাঁহার পুরানা সেই আকুতি ফিরিয়া আসিয়াছে। কোন এক দূরদেশে গিয়াছেন তিনি। ধরিয়া লইলাম বেড়াইতেই গিয়াছেন। সেখানে ‘প্রিমরোজ হিল গার্ডেনের। স্বাপ্নিক চূড়ায়’ দেখিতেছেন ‘জুনের নরম রোদ মায়ের স্তনের মত স্নিগ্ধ ও মসৃণ’—এমন সময় হঠাৎ তাঁহার মনে পড়িল ‘মেঘগাছা’ গ্রামের কথা।

চমকে-ওঠা হরিণের মন
আকস্মিক চলে গেল উত্তর বঙ্গের কোনো গ্রামে,
যে গ্রামের গাছগুলো মেঘের মতন,
যে গ্রামে এখন এক স্নিগ্ধ সন্ধ্যা নামে।
অনেক রক্তের ঋণ, অনেক অন্নের ঋণ
জমে আছে প্রিমরোজ হিলের মতন।
(তরফদার ১৯৭৬ : ৬৯-৭০)

গ্রামের সহিত এই বাঁধাপড়া কি বোঝাপড়া শুদ্ধমাত্র একটি গ্রামের ঘটনা? মোটেই নহে। ‘গাছের উক্তি : অনিকেত নই’ নামাঙ্কিত অন্য একটি কবিতায় গ্রাম ছড়াইয়া পড়িয়াছে ইতিহাস-প্রসিদ্ধ বড় বড় সব জনপদে। ফরাশি চিত্রশিল্পী এদুয়ার্দ মানের একপ্রস্ত আপ্তবাক্য উদ্ধার করিয়া তরফদার এই কবিতাটির বিসমিল্লাহ করিয়াছিলেন। মানের কথাটা তিনি ফরাশি জবানেই লিখিয়াছিলেন : ‘ইল ফোতেত দো সোঁ তঁ’ (Il faut être de son temps)—অর্থাৎ আপন যুগের মানুষ হওয়াটাই দায়। তরফদারের কবিতায় এই বাক্যটিই দেখিতেছি নতুন নিয়ম আকারে হাজির হইয়াছে। তিনি লিখিয়াছেন, ‘কেবলি আমার রক্তে বেজে ওঠে পুরাতন বীণা।’

আমার শিকড় বাঁধা বরেন্দ্রের রক্তিম মাটিতে
হাজার হাজার নিম্নগামী মূলের সম্ভারে।
কিন্তু এই সত্তা জাগে আকাশের সমুদ্রের গায়
রোদের বৃষ্টিতে আর রঙে রঙে নিসর্গের বিমুগ্ধ আমেজে,
ফুলে ফুলে, শাখা-প্রশাখায় অস্তিত্বের আকুল বিকাশে।
এখন আমার সত্তা ছায়া ফেলে সমুদ্র-আকাশে।

বারবার দুলে উঠি; ছায়া জাগে
অন্ধকার বঙ্গে, সমতটে, হরিকেলে,
কুয়াশার শালবন-বিহারের ধূসর প্রাকারে,
সুদূরের মহাস্থানে, করতোয়া নদীর কিনারে,
রক্তময় পাহাড়পুরের পথে, ভিক্ষুদের স্তূপের চূড়ায়,
সমুদ্রের কূলে-উপকূলে
সম্ভাবনাময় স্বপ্নে বারবার দুলে।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৪৮-৪৯)

শুদ্ধ এই কবিতায় কেন, তাঁহার প্রায় সকল কবিতায় এই একটু খোড়াখুড়ি করিতেই পৌঁছাইবেন—একটু আগাইতেই হোঁচট খাইবেন—এই ধরনের পংক্তিতে :

শুনেছি পাহাড়পুর, পৌণ্ড্রদেশ কিংবা ময়নামতী
পৃথিবীর ইতিহাসে রেখেছিল গভীর সঙ্গতি।
(তরফদার ১৯৭৬ : ৬১)

মমতাজুর রহমান তরফদারের তরফে পুরাতন ইতিহাস নেহায়েত নয়া জমানার প্রতীক মাত্র বনিবে না বা চাকরি মাত্র করিবে না, তাহার ঢের কাজ পড়িয়া রহিয়াছে। ‘কলরব তবু শোনা যায়’ শিরোনামের এক কবিতায় তাহাই দেখিতে পাইতেছি :

একটু দূরে খালটার নির্জন কিনারে
যখন হেমন্ত-সন্ধ্যা নেমে আসে বাবলার ঝাড়ে
কোনো এক নির্জন গুহায়
বারবার আজো শোনা যায়
অতীতের মৃদু কলরব;
নিসর্গ এখনো নয় গত-মহোৎসব।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৩২)

অতীত ও বর্তমানের যুগল রচনা করিতে বসিয়া তিনি কখনো কখনো চমকিয়া উঠিবার মতন সাকার পংক্তিও লিখিয়াছেন। ‘এই গ্রামে’ নামক একটি কবিতার একটি চিত্রকল্প পরখ করিলেই ধরা পড়িবে চিত্রকল্পের ক্ষমতা বলিতে কি বুঝায়। তরফদার লিখিতেছেন :

এই গ্রাম দ্বিখণ্ডিত শব।
এই রাস্তা তলোয়ার এ গ্রামের বুকের ভিতর।
থেমেছে অনেক আগে গ্রামিকার আদিম উৎসব।
আশেপাশে শূন্য খেত, তার পর অসংখ্য কবর।
প্রাচীন কঙ্কালগুলো এখন ঘুমায়
সময়ের বুকের ভিতর।

এখন ধর্ষিতা চাঁদ জেগে আছে রাতের গুহায়।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৫০; মোটা হরফ যোগ করা)

‘গ্রামিকা’ শব্দটি সামান্য শব্দ নহে। আমরা রোজকার কথাবার্তায় যেমন বলি পুস্তকের ছোট ‘পুস্তিকা’, পত্রের ছোট ‘পত্রিকা’, তেমনি গ্রামের ছোট ‘গ্রামিকা’। বাংলায় ‘ইকা’ প্রযুক্ত হয় ছোট অর্থাৎ তুচ্ছ অর্থে আবার এই শব্দের গর্ভাশয়ে নারী ও পুরুষের ভেদও বাসা বাঁধিতে পারে—যেমন শিক্ষকের স্ত্রীলিঙ্গ ‘শিক্ষিকা,’ লেখকের স্ত্রীলিঙ্গ ‘লেখিকা,’ কিংবা পাঠকের স্ত্রীলিঙ্গ ‘পাঠিকা’। তরফদার সাহেবের ‘গ্রামিকা’ কি গ্রামের ছোট না গ্রামের স্ত্রীলিঙ্গ? ভাবিয়া দেখিতে হইবে। হইতে পারে দুইটার অর্থ একই। তরফদার আরো অনেক জায়গায় এই ‘গ্রামিকা’ পদটি কাজে খাটাইয়াছেন।

কিন্তু সেই সুরগুলো এখনো অনাবিষ্কৃত, এখনো অজানা,
হয়ত সৃষ্টির লগ্নে গ্রামিকার বুকে দেয় হানা।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১১৮; মোটা হরফ যোগ করা)

এই পর্যন্ত আমরা মাত্র মমতাজুর রহমান তরফদারের কবিতার পদার্থ ধরিয়া আলোচনা করিলাম। এক্ষণে কবিতার পদ লইয়া দুই কথা বলিব। তাঁহার অধিক কবিতা অক্ষরবৃত্তের সরল পয়ারে রচিত। কোন কোন কবিতা মাত্রাবৃত্তের হালকা চালেও দুলিয়া উঠিয়াছে। ‘খুলো না চুলের গুচ্ছ’ নামের কবিতার কয়েক পংক্তি বাজাইয়া দেখা যাইতে পারে। অক্ষরবৃত্তের পয়ারে রচা এই পদ্যটিতে মাত্রাবৃত্তের চালও ইচ্ছা হয় খুঁজিয়া লওয়া যায়। এই নিবন্ধের শেষে নিদর্শনস্বরূপ এই কবিতাটির আগাগোড়া তুলিয়া লইব। তবে এখানে নগদ মূল্যে কয়েক পংক্তি আলাদা করিয়া দেখাইতে চাই।

মেলো না স্বপ্নের পাখা, খুলো না চুলের গুচ্ছ এখানে কুমারী;
কেন না আঁধারে কাঁপে মৃত্যুর উলঙ্গ তরবারি।
এখানে পাথর শুধু, মাটি নেই, নেই ত ঘাসের আলোছায়া;
নিরেট কুয়াশা ভরে জাগে শুধু পরিচিত, নগ্ন প্রেত কায়া।
বসে না গাছের ডালে রঙে রঙে পাখিদের ঝাঁক;
তরুণী হরিণীগুলি প্রাণহীন, বিস্ময়ে নির্বাক।
ঝরে না সূর্যের আলো সমুদ্রের রঙিন ফেনায়;
কাঁপে না নৌকার সারি মানবিক ছিন্ন নীলিমায়।
(তরফদার ১৯৭৬: ১৪১)

মাত্রাবৃত্তের চালেই মমতাজুর রহমান তরফদার অধিক সিদ্ধার্থ বলিয়া আমার ভ্রম হইয়াছে। উদাহরণের স্থলে বলিতে চাই, ‘জলের ধারে’ কিংবা ‘কালো মুখ’ নামক দুইটা কবিতায় একই ধরনের শক্তি ও সত্যের দেখা মিলিবে। পদ ও পদার্থের অভেদ বলিতে যাহা বুঝায়—বুনিয়াদি তত্ত্বজ্ঞানীরা যাহাকে বহুদিন ধরিয়া কলাসিদ্ধির পরাকাষ্ঠা জ্ঞান করিয়া আসিতেছেন—তাহার উদাহরণ এই সকল কবিতা।

মমতাজুর রহমান তরফদার কর্তৃক মাত্রাবৃত্তের চালে রচিত আরও একটি কবিতার কথা আমি পাড়িতে চাই যাহাতে পদ ও পদার্থের অভেদ প্রতিষ্ঠা পাইয়াছে। কবিতাটির নাম ‘জাগ্রত’। এই কবিতার শক্তি গোটা চারি পংক্তি মাত্র উদ্ধার করিয়া বোঝান যাইবে না। আমরা গোটা কবিতাটিই সংযোজন অংশে জুড়িয়া দিতেছি। এই ক্রমে আরো অনেক কবিতা উদ্ধার করা যাইতে পারিবে। আশংকা হয় তাহাতে না স্মৃতিকথার সীমানা লঙ্ঘন করা হয়।

‘জাগ্রত’ নামের পদ্যটি শুদ্ধমাত্র ছন্দোসিদ্ধির উদাহরণই নহে, বেহ্তর বাগ্বিধির অভাবে যাহাকে আমরা বলিতে পারি ‘কবিতা লেখকের রাজনীতি’ ইহাতে তাহাও অনাবৃত হইয়াছে। বর্তমান দুনিয়ার বিবর্তমান শ্রেণীসংগ্রামের একটি স্থিরচিত্রও এখানে পাওয়া গিয়াছে। ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি লিখিত এই কবিতায় সে যুগের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের পটভূমি পরিস্ফূট। দেখিতেছি এই কবিতার চারিসীমানায় হ্যানয়, সায়গন, সিনাই, তিমুর আর অ্যাঙ্গোলার মঞ্চের পেছনে লিসবন, মাদ্রিদ, লন্ডন, পারি, প্রাগ, ভিয়েনা আর ওয়াশিংটননামা সবুজ ঘারের পর্দাও ভাসিয়া উঠিতেছে।

একদা শ্রমিকশ্রেণির জাগরণ পূর্ব এয়ুরোপের ‘দুনিয়া কাঁপানো দশদিন’ ছাপাইয়া চিনদেশে জাতীয় মুক্তির পথও খুলিয়া দিয়াছিল। আজ সে যাত্রায় কোথাও ছেদ পড়িয়াছে কি? তরফদার লিখিয়াছেন—হয়ত পড়িয়াছে। তাহাতেই দমিবেন এমন পাত্র তিনি নন কিন্তু।

আপ্তবাণীর সমাহার মসিলেখা—
মার্কসের গোরে উইলোর শনশনি।
ভাল ভাল কথা বহু কাল আগে শেখা
—লেনিনের দেহ রঙিন প্রদর্শনী।

এখনো যাদের হৃদয় যায়নি মরে,
তারা ত কেবল শবের সংখ্যা গণে।
দূর ও নিকটে শকুনিরা ভিড় করে,
কেউ ঢাকে হিয়া রক্তের আবরণে।

জীবন এখন পণ্যের বিনিময়
আলোকের হ্রদে নামে কি অন্ধকার?
সত্য পুরুষ কোথায় দাঁড়িয়ে রয়?
তুলাদন্ডের কোথায় সাম্যভার?

ঢাকা-দিল্লীতে শরতের মেঘে মেঘে
সাত্যিক বুকে আলোক ত ঢাকবে না।
নীরব বজ্র এখন রয়েছে জেগে
বিবিধ প্রকার অন্ধকার যে চেনা

স্তব্ধ ভলগা যদি ভুলে যায় গান
হোয়াংহোর স্রোতত যদিও বা হয় ম্লান।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১১০-১১)

তরফদারের এই দৃষ্টি আদৌ আপতিক নয়। এই দৃষ্টি তাঁহার ব্রতেরই অংশবিশেষ। বিষাদে পরিপূর্ণ তাঁহার অনেক কবিতা কিন্তু এই বিষাদ কদাচ বিতৃষ্ণায় পরিণতি পায় নাই। মহান ফরাশি কবি শার্ল বোদলেয়রের সহিত এই জায়গায় একটা তুলনা কাটিলে মন্দ হয় না। ‘একটি চিত্র দেখে’ নামের কবিতাটির মধ্যে খানিক বোদলেয়ারের ছায়া পড়িয়াছে এই কল্পনা করা চলে।

রাত্রি বমন করেছে এক রাশ আলকাতরা
পৃথিবীর বুকের উপরে।
অন্ধকার ঝুলে আছে কুয়াশার আস্তরণে
শবের ব্যারিকেড; ওদের মিছিল এখনো এগোয়নি
নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৩৯)

আরেক কবিতায়—নাম ‘অন্য রূপ’—তরফদার সাহেব ‘বোদলেয়ারীয় বিতৃষ্ণার উৎস’ অনুসন্ধান করিতেছেন পারি নগরীর অন্তঃপাতী ধন ও দারিদ্রের বৈপরীত্যের মধ্যে। তিনি দেখিতেছেন ‘ওপেরা-থিয়েটারটাতে কোনো কমেড়ির অভিনয় চলছে’ আর ‘ইমারৎটা আলোয় আলোয় জ্বলছে।’ সম্পদ ও বিপদ, বৈভব ও নিঃস্বতা একই সত্যের দুই প্রান্ত বৈ নয়। একপ্রান্তে আছে সম্পদ। যুগপদ বিপদের ফলন না ঘটাইয়া সম্পদ আপন পদে স্থির হইতে পারে না। সম্পদ তবুও সত্য বৈ নয়।

রেপুবলিকের মত আরো বহু এলাকায়
আলোকে আলোকে, শেরী, শ্যাম্পেন এবং কোনইয়াকে
যে রূপ জেগে আছে, তা নিরেট সত্য।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৩১)

সমস্যার মধ্যে, ঘটনার আরো এক প্রান্ত আছে—সেই প্রান্তে আছে বিপদ। সম্পদের ‘আরো এক রূপ আছে’—সেই রূপ কিন্তু ‘মুলারুজ্বে,’ ‘ইফেল টাওয়ারের আশেপাশে,’ ‘লুকসেমবুর্গ বাগানে,’ ‘ল্যাটিন কোয়ার্টারে,’ কিংবা ‘কোনো চঞ্চল অথবা ঘুমন্ত স্টেশনেও’ দেখা যায় না। একই অঙ্গের কি সেই অপরূপ রূপ?

উৎসবের হয়ত অতি কাছেই
আলোয়, অন্ধকারে, জীবনে, মৃত্যুতে
নির্বেদে, আনন্দে
অতি প্রাচীন ব্যাধি দগ্দগ্ করে জ্বলছে
নতুন ক্ষতের পরিপূর্ণ যন্ত্রণা নিয়ে।’
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৩১)

‘অন্য রূপ’ কবিতার মাথায় মমতাজুর রহমান তরফদার বোদলেয়ারের ‘ঢাকনা’ নামক কবিতা হইতে দুইটি পংক্তি অলংকারস্বরূপ—না, ভুল বলিলাম, ইশতেহারস্বরূপ—স্থাপন করিয়াছিলেন।

Le Ciel ! Covuercle noir de la grande marmite
Où bout l’imperceptible et vaste Humanité.
(বোদলেয়র ১৯৭৫ : ১৪১)

আকাশ একটা আস্ত কৃষ্ণবর্ণ ঢাকনার মতন পৃথিবীকে চাপিয়া আছে, আর ইহার নিচে সীমাসরহদহীন অবয়বহীন মানবজাতি টগবগ সিদ্ধ হইতেছে—এই রূপকল্পের দেখা আমরা বোদলেয়রের ‘বিতৃষ্ণা’ নামের চার নম্বর কবিতাটিতেও একবার পাইয়াছিলাম। সেই কবিতায় শার্ল বোদলেয়র লিখিয়াছিলেন, যখন আকাশ ভারে আনত হইয়া ঢাকনার মতন নামিয়া আসে যন্ত্রণাকাতর দীর্ঘ বিতৃষ্ণায় বিদ্ধ মনুষ্যের মাথায় ইতি আদি।

Quand le ciel bas et lourd pèse comme un covuercle
Sur l’esprit gémissant en proie axu longs ennuis,
Et que de l’horizon embrassant tout le cercle
II nous verse un jour noir plus triste que les nuits;
(বোদলেয়র ১৯৭৫ : ৭৪)

শার্ল বোদলেয়ারের আরো ঢের ছাপ আছে তরফদারের কবিতায়। ফরাশি কবির Le Soleil বা ‘সূর্য’ কবিতাটির আলো বাঙালি কবিতা লেখকের ‘সূর্যের প্রণতি’ কবিতায় উজ্জ্বলতর হইয়াছে। আমরা এই নিবন্ধের পরিশিষ্টে দুই কবির কবিতাই পুরাপুরি তুলিয়া দিতেছি। এখানে আপাতত দুই কবির শেষ স্তবক দুইটি মাত্র পাশাপাশি পড়িতেছি। প্রথমে দেখি শার্ল বোদলেয়রের চারি পংক্তি:

Quand, ainsi qu’un poète, il descend dans les villes,
II ennoblit le sort des choses les plus viles,
Et s’introduit en roi, sans bruit et sans valets,
Dans tous les hôpitaxu et dans tous les palais.
(বোদলেয়র ১৯৭৫ : ৮৩)

[যখন এভাবে কবির মতন তিনি নামেন শহরে, অতি
তুচ্ছ পদার্থ যে তাহাকেও বানান মহান সন্ততি
নিরব নিঃসঙ্গ কোন রাজার মতন ধামাধরাহীন
আরোগ্য সদনে কি রাজপ্রসাদে কাটে নিরপেক্ষ দিন।]

তুলনীয় মমতাজুর রহমান তরফদারের ছয় পংক্তি:

একটি ধূসর হাত আজো ডাকে দুর্মর সঙ্কেতে;
কেননা আরেক বিশ্ব গড়ে ওঠে পলির ফসলে
যেখানে সবুজ, নীল, বহু রঙ নিরালম্ব জ্বলে।
প্রাচীন স্তূপের পাশে অনেকেই এসেছে সম্প্রতি—
সূর্যের বলয়ে বুঝি অনিবার্য মানবীয় গতি।

ইমারতে ভাঙা ঘরে, খেতে, মাঠে সূর্যের প্রণতি।
(তরফদার ১৯৭৬ : ১২৩)

মমতাজুর রহমান তরফদার আধুনিক বাংলা কবিতার যাহাকে বলে ‘মূলধারা’ তাঁহার মধ্যে প্রবেশ করিতে চাহেন নাই। তাহা সত্ত্বেও তিনি যে ভাষায় লিখিয়াছেন তাহা ১৯৩০ সালের পরের কবিদের ভাষাই। তিনি নতুন ভাষার সন্ধান করেন নাই। এখানেই তাঁহার কবিতা মার খাইয়াছে। কিন্তু তিনি মরেন নাই। তিনি নিজের জগতে যাহা চাহিয়াছেন তাহাতেও বাংলা কবিতার দিগন্ত আরো দূরে সরিয়া গিয়াছে। এই মহান ইতিহাস লেখকের ‘কবিতা-লেখক’ পরিচয়—হয়ত সম্পূর্ণ বিফলে যায় নাই।

দোহাই

১. আহমদ ছফা, আহমদ ছফার কবিতা, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত (ঢাকা : খান ব্রাদার্স, ২০১০)।

২. মমতাজুর রহমান তরফদার, চতুষ্ক (ঢাকা : মমতাজুর রহমান তরফদার, ১৯৭৬)।

৩. মমতাজুর রহমান তরফদার, বাংলা রোমান্টিক কাব্যের আওয়াধী-হিন্দী পটভূমি (ঢাকা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭১)।

৪. মো. মোফাখ্খারুল ইসলাম, ‘ভারত উপ-মহাদেশে ইংরেজ শাসন সম্পর্কে কার্ল মার্কস,’ সালাহউদ্দীন আহমদ গয়রহ সম্পাদিত, আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ স্মারকগ্রন্থ (ঢাকা : বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষৎ, ১৯৯১), পৃ. ৩২২-৪৭।

৫. Charles Baudelaire, Oevures complètes, tome 1, texte établi, présenté et annoté par Claude Pichois (Paris : Éditions Gallimard, 1975).

৬. Momtayur Rahman Tarafdar, Husain Shahi Bengal 1494-1538 A.D.: A Socio-Political Study (Dacca : Asiatic Society of Pakistan, 1965).

 

সংযোজন

কালো মুখ

হানা দেয় একটি কালো মুখ
শার্সিভাঙা জীর্ণ জানালায়।
কিছুতেই ভাঙে না কৌতুক,
বারবার সে যে ফিরে চায়।

জানে না সে অথবা সে জানে
ছুঁয়ে ছুঁয়ে মাটির পাহাড়
বুক ভরে কি বিশাল গানে।
ক্ষুদ্র দেহ বিশ্বের প্রাকার।

পথ আজো নভ-চারী নয়;
কিন্তু এ সরণী করে ভেদ
সুদূরের সূর্য জ্যোতির্ময়।
এই গানে পড়ে নাক ছেদ।

পরাজিত নোংরা কালো মুখ
জানালায় এখানে উন্মুখ।

১৯ জুন  ১৯৭৫
(তরফদার ১৯৭৬ : ৭৩)

 

জাগ্রত

আকাশের হ্রদে চাঁদ গলে গলে যায়
শরতের মেঘে ঈষৎ বজ্ররেখা।
লতাপাতাহীন অগণিত প্রশাখায়
নীরব অগ্নি এখন দিয়েছে দেখা।

বড় মহীরুহ সরবে গুটায় পাখা—
জেগে থাকে শুধু দিগন্তময় মরু।
রসকণাহীন ফুল, ফল, বহু শাখা—
সব গাছ মৃত; কোথায় কল্পতরু?

হ্যানয়-সায়গনে চলছে পলেস্তারা
ধ্বসে যাওয়া যত সুপ্রাচীন ইমারতে।
খামারেও ছিল শকুনির পাঁয়তারা—
সবুজ আলোক ভরবে কি মরকতে?

প্রতিশ্রুতির ফলকের গায়ে আলো—
বারবার এল বিমুখী প্রস্তাবনা।
ভোরের বাতাস পরিমেল ঝলসালো—
কালিক সিঁড়িতে কস্মিন সম্ভাবনা।

মুসার সিনায়ে এখন নতুন নবী—
চেয়ে দেখে শুধু খনিজ ফল্গুধারা।
নীলনদে ভাসে উটপক্ষীর ছবি—
মরুভূমি-রাতে জাগে তবু ধ্রুবতারা।

তিমোর-এ্যাঙ্গোলায় এখন অগ্নি উঠে;
লিসবন কাঁপে অভাবিত ভাবনায়।
কোন অলক্ষ্যে মাদ্রিদ এখন ছুটে—
পিরেনিজ বুঝি আলোকের সীমানায়।

লন্ডন, পারি, প্রাগ ও ভিয়েনা জাগে;
লক্ষ্মীপেচক এখন ওয়াশিংটনে।
শাম্পেন-শেরীতে বেয়ারের অনুরাগে
কর্নিয়া-আলো উদগত লিসবনে।

আপ্তবাণীর সমাহার মসিলেখা—
মার্কসের গোরে উইলোর শনশনি।
ভাল ভাল কথা বহু কাল আগে শেখা
—লেনিনের দেহ রঙিন প্রদর্শনী।

এখনো যাদের হৃদয় যায়নি মরে
তারা ত কেবল শবের সংখ্যা গণে।
দূর ও নিকটে শকুনিরা ভিড় করে;
কেউ ঢাকে হিয়া রক্তের আবরণে।

জীবন এখন পণ্যের বিনিময়—
আলোকের হ্রদে নামে কি অন্ধকার?
সত্য পুরুষ কোথায় দাঁড়িয়ে রয়?
তুলাদণ্ডের কোথায় সাম্যভার?

ঢাকা-দিল্লীতে শরতের মেঘে মেঘে
সাত্যিক বুকে আলোক ত ঢাকবে না।
নীরব বজ্র এখন রয়েছে জেগে;
বিবিধ প্রকার অন্ধকার যে চেনা—

স্তব্ধ ভলগা যদি ভুলে যায় গান,
হোয়াংহোর স্রোত যদিও বা হয় ম্লান।

১৯ আগস্ট  ১৯৭৫
(তরফদার ১৯৭৬ : ১০৯-১১)

 

জলের ধারে

জলের ধারে যদি বা তুমি গেলে,
আবার কেন মাটির ঘরে এলে?
ভালই ছিল পাহাড়ী মৃদু ঢেউ,
আঙুল তুলে রুখত নাক কেউ।
নদীর আলো তন্বী স্বচ্ছতা;
আকাশ বেয়ে সরু আলোক-লতা।

জীবন দিয়ে কে পায় জলধারা?
স্বপ্নসিঁড়ি কোথায় ধ্রুবতারা?
অন্ধকারে যদি বা স্রোত বয়,
তুমি ত জান সে ত আলোক নয়।
দিবসরাত অন্ধ হাতী জাগে,
সবুজ গাছে কেবল খাদ্য মাগে।
নরম দেহে যদিও বায়ু ভাসে,
ধরবে তাকে সে কোন অভিলাষে?

অন্ধকারে আংটি খুলে রাখা,
পথের ধারে ভ্রুণ রক্তমাখা।

আজকে ভোরে জানালা খুলে দাও।
আকাশ, আভা আবার ফিরে নাও।
ঘরের পাশে বাউলি-সিঁড়ি বেয়ে
শেওলা-ঢাকা জলের ধারে মেয়ে
আঙুল দিয়ে স্পর্শ করে দেখ।
আঁধারটুকু ঢেকেই তুমি রেখ।

১৪ জুন ১৯৭৫
(তরফদার ১৯৭৬ : ৬৮-৬৯)

সূর্যের প্রণতি

বারবার কলরব শোনা যায় রাস্তায় রাস্তায়
এবং শার্শিতে ভাসে স্বচ্ছ রোদে প্রাচীন পিপাসা।
মনে হয় বুঝি কোনো মানবিক সূর্যের উদয়ে
শস্যের বাগান আর প্রাণীদেহ পরিণতি পায়
বাঞ্ছিত আকারে আর পরিপূর্ণ জৈবিক সত্তায়।
শরীরে রৌদ্রের বৃষ্টি, প্রাণেরও প্রদেশে রোদ ঝরে;
কিন্তু আসে প্রাচীন বীজাণুগুলো দেহকোষ ভরে।
রোগের বিরাম নেই, প্রাণেরও যে নেই-ক সীমানা—
উত্তমর্ণ, অধমর্ণ একই বৃত্তে খুঁজেছে ঠিকানা।
স্বদেশে, বিদেশে আর অন্য গৃহে পূর্ণ প্রতিশ্রুতি;
তাই ত শরীরে-মনে আলোকের অবারিত গতি।

একটি ধূসর হাত আজো ডাকে দুর্মর সঙ্কেতে;
কেননা আরেক বিশ্ব গড়ে ওঠে পলির ফসলে
যেখানে সবুজ, নীল, বহু রঙ নিরালম্ব জলে।
প্রাচীন স্তূপের পাশে অনেকেই এসেছে সম্প্রতি—
সূর্যের বলয়ে বুঝি অনিবার্য মানবীয় গতি।

ইমারতে, ভাঙা ঘরে, খেতে, মাঠে সূর্যের প্রণতি।

২০ নবেম্বর  ১৯৭৫
(তরফদার ১৯৭৬ : ১২৩)

 

খুলো না চুলের গুচ্ছ

মেলো না স্বপ্নের পাখা, খুলো না চুলের গুচ্ছ এখানে কুমারি;
কেন না আঁধারে কাঁপে মৃত্যুর উলঙ্গ তরবারি।
এখানে পাথর শুধু, মাটি নেই, নেই ত ঘাসের আলোছায়া;
নিরেট কুয়াশা ভরে জাগে শুধু পরিচিত, নগ্ন প্রেত কায়া।
বসে না গাছের ডালে রঙে রঙে পাখিদের ঝাঁক;
তরুণী হরিণীগুলি প্রাণহীন, বিস্ময়ে নির্বাক।
ঝরে না সূর্যের আলো সমুদ্রের রঙিন ফেনায়;
কাঁপে না নৌকার সারি মানবিক ছিন্ন নীলিমায়।
নিঃশব্দ কান্নায় ভাঙে আদিগন্ত নিরেট পাথর;
তৃষিত আকাশতলে পৃথিবীও কাঁপে থর থর।
ধূসর আকাশে সূর্য জাগে বটে অনেক প্রহর;
মৃত্যুর চোখের মত তারকারা অনন্ত ভাস্বর।
গোধূলির সীমা থেকে যদিও বা স্নিগ্ধ রাত্রি আসে
অনন্ত কান্নার স্রোত ভেঙে পড়ে আকাশে-বাতাসে
আর ঝরে আলকাতরার মত ঘন পুরু অন্ধকার
যে আঁধারে বহু আলোবর্ষ গড়ে মৃত্যুর পাহাড়।

এই বার রাখ হাত আলোকের লৌকিক হাতলে
যেখানে পৃথিবী জাগে বীজকম্প্র ফসলে ফসলে
এবং রৌদ্রের ধারা ঝরে পড়ে স্নিগ্ধ নীলিমায়
অথবা সঙ্গীত গায় বহু পাখি সবুজ আভায়।
তুমি ত দেখেছ বহু বার
উন্মুক্ত গানের নদী, অবারিত আলোকের ধার।
পাহাড়ে পাহাড়ে কাঁপে আলোকিত বরফের ঝড়;
খেতে, মাঠে, গানে গানে আলোয় আলোয় অনন্ত নির্ঝর।

খুলো না চুলের গুচ্ছ পৌরাণিক নদীটির তীরে;
আলোর মতন হাত রাখ এই আলোর শরীরে।

১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬
(তরফদার ১৯৭৬ : ১৪১-৪২)

 

Le Soleil

Charles Baudelaire

 

Le long du vieux faubourg, où pendent aux masures
Les persiennes, abri des secrètes luxures,
Quand le soleil cruel frappe à traits redoublés
Sur la ville et les champs, sur les toits et les blés,
Je vais m’exercer seul à ma fantasque escrime,
Flairant dans tous les coins les hasards de la rime,
Trébuchant sur les mots comme sur les pavés
Heurtant parfois des vers depuis longtemps rêvés.

Ce père nourricier, ennemi des chloroses,
Eveille dans les champs les vers comme les roses;
II fait s’évaporer les soucis vers le ciel,
Et remplit les cerveaux et les ruches de miel.
C’est lui qui rajeunit les porteurs de béquilles
Et les rend gais et doux comme des jeunes filles,
Et commande aux moissons de croître et de mûrir
Dans le coeur immortel qui toujours veut fleurir!

Quand, ainsi qu’un poète, il descend dans les villes,
II ennoblit le sort des choses les plus viles,
Et s’introduit en roi, sans bruit et sans valets,
Dans tous les hôpitaux et dans tous les palais.

 (Charles Baudelaire 1975 : 83)

১৯৭১: কবি জসীম উদ্দীনের সাক্ষ্য

১৯৭১ সালের ছায়া বাংলাদেশের সাহিত্যে কতদূর পর্যন্ত পড়িয়াছে তাহা এখনও পর্যন্ত সঠিক পরিমাপ করা হয় নাই। উদাহরণস্বরূপ কবি জসীমউদ্দীনের কথা পাড়া যায়। এই মহান কবি ১৯৭১ সালেও বাঁচিয়া ছিলেন। সেই বাঁচিয়া থাকার অভিজ্ঞতা সম্বল করিয়া তিনি ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ একটি ক্ষীণকায় কবিতা সংকলনও ছাপাইয়াছিলেন।

স্বীকার করিতে হইবে, এই কবিতা সংকলনের খবর অনেকেই রাখেন না। যাঁহারা রাখেন তাঁহারাও রাখিতে বিব্রত বোধ করেন। জসীমউদ্দীন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়কে দ্বিতীয় দলের দৃষ্টান্তস্বরূপ স্মরণ করা যায়। তিনি ১৯৭২ সালে প্রকাশিত এই ক্ষুদ্র সংকলন প্রসঙ্গে লিখিয়াছেন, “বিশেষ উদ্দেশ্যমূলকতার দায় বহন করতে গিয়ে কবিতার প্রাণশক্তি এখানে যে দারুণভাবে পীড়িত হয়েছে তা না মেনে উপায় নেই।”


১৯৭১ সালের প্রায় তিরিশ বছর আগে–১৯৪০সালে–অধ্যাপক হুমায়ুন কবির দুঃখ করিয়াছিলেন নজরুল ইসলামের মতন জসীমউদ্দীনেরও সৃজনীপ্রতিভা অল্পদিনেই শেষ হইয়া গিয়াছিল। ইহার কারণ কি দেখাইতে গিয়া তিনি বলিয়াছিলেন, নজরুল ইসলামের মতন জসীমউদ্দীনেরও ‘মানস সংগঠনে’ কোন রূপান্তর হয় নাই। নজরুল ইসলামের কবিতায় যে বিপ্লবধর্ম তাহা পুরাতন ঐতিহ্যের পুরুজ্জীবন ঘটাইয়াছে কিন্তু কল্পনা ও আবেগের নতুন নতুন রাজ্য জয়ে অগ্রসর হতে পারে নাই। আর জসীমউদ্দীনের কাব্যসাধনায় সিদ্ধি আসিয়াছিল দেশের ‘গণমানসের অন্তর্নিহিত শক্তি’ হইতে। হুমায়ুন কবিরের মতে, তিনিও কল্পনা আর আবেগের নতুন নতুন রাজ্য জয়ে বিশেষ অগ্রসর হইতে পারেন নাই। দুই বড় কবির কথা মনে করিয়া হুমায়ুন কবির আক্ষেপ করিয়াছিলেন, “আজ আত্মকেন্দ্রিক পুনরাবৃত্তির মধ্যেই তাঁদের সাধনা নিবদ্ধ।”

১৯৪০ সালে যে দশক শুরু হইয়াছিল সেই দশক নাগাদ বাঙালি মুসলমান সমাজের অন্তর্গত কবি ও সাহিত্য সাধকেরা মোটের উপর তিন ভাগে ভাগ হইয়া গিয়াছিলেন। একভাগে ছিলেন সংরক্ষণশীলরা। ইহাদের সম্পর্কে হুমায়ুন কবির জানাইয়াছিলেন, “তার ঝোঁক অতীতের দিকে, তার ধর্ম প্রচলিত ব্যবস্থার সংরক্ষণ। ইসলামের অন্তর্নিহিত সামাজিক সাম্যকেও তা ব্যাহত করে।” ইহার ফলে বাংলার মুসলমান সমাজ যেমন ‘অনিশ্চিত মতি’ তেমনি ‘গতিহীন’ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল।

দ্বিতীয় ভাগে ছিলেন প্রতিক্রিয়াশীলরা। ইঁহারা স্রোতের বিরুদ্ধে পুরাতন বন্দরে ফিরিয়া যাইতে চাহিতেন। অসম্ভবের পায়ে আত্মনিবেদন বৃথা জানিয়াও ইঁহারা সমাজ মানসের সমস্ত উদ্যম সেই অসম্ভবের পায়ে উৎসর্গ করিয়াছিলেন।

সবশেষে ছিলেন আরেক দল ইঁহারা সংখ্যায় ও শক্তিতে দুর্বলতম। ইঁহারা ভবিষ্যতের সাধক। এই দলের কথা মনে রাখিয়াই হুমায়ুন কবির লিখিয়াছিলেন, “ভবিষ্যতের অভিযানে আশঙ্কা থাকতে পারে, কিন্তু সম্ভাবনা আরো বেশি, অথচ আজো বাঙালি মুসলমানের যৌবন সে দুঃসাহসিকতায় বিমুখ।”
jasimuddin.gif
হুমায়ুন কবির এই তৃতীয় ভাগের উপরই ঈমান আনিয়াছিলেন। তিনি লিখিয়াছিলেন, “সমস্ত পৃথিবীতে বর্তমানে যে আলোড়ন, তারও নির্দেশ ভবিষ্যতের দিকে। সেই প্রবাহ যদি বাঙালি মুসলমানকে নূতন সমাজসাধনার দিকে ঠেলে নিয়ে যায়, তবে মুসলমান সমাজসত্তার অন্তর্নিহিত ঐক্য ও উদ্যম দূর্বার হয়ে উঠবে, বাঙলার কাব্যসাধনায়ও নতুন দিগন্ত দেখা দিবে।” হুমায়ুন কবিরের এই আশা ও আশীর্বাদ সত্য হইয়াছিল ১৯৭১ সাল নাগাদ। বাংলার কাব্যসাধনায় নতুন দিগন্ত দেখা দিয়াছিল শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ প্রভৃতি কবির জন্মের পর।

জসীমউদ্দীনের কবিতা এই তিনভাগের মাপে বিচার করিলে দেখা যায় একই সাথে দুই ভাগ জুড়িয়া বিরাজ করিতেছিল। তাঁহার কবিতাকে আকারের দিক হইতে দেখিলে সংরক্ষণশীল ভাগে দেখা যায়। অথচ বাসনার বিচারে তাঁহাকে তৃতীয় ভাগে ফেলা যায়। এই স্ববিরোধ আমলে লইয়াই হুমায়ুন কবির ১৯৪০ সালে লিখিয়াছিলেন, “সাম্প্রতিক বাঙালি মুসলমান কবিদের মধ্যে প্রায় সকলেই পশ্চাদমুখী এবং নতুনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও প্রাচীনপন্থী। সাহিত্যের আঙ্গিক নিয়ে নতুন পরীক্ষা করবার উদ্যম তাদের নাই, সমাজ ব্যবস্থার রূপান্তরে নতুন নতুন পরিস্থিতির উদ্ভাবনায়ও তাঁদের কল্পনা বিমুখ।”

ইতিকথার পরেও একটা কথা থাকে। কথায় বলে, মরা হাতির দাম লাখ টাকা। বাংলাদেশের পুরাতন আঙ্গিকের চৌহদ্দির মধ্যেও জসীমউদ্দীনের প্রাণশক্তি পুরাপুরি নিঃশেষিত হইয়া যায় নাই। তাহার প্রমাণ ১৯৭১ সালের অভিজ্ঞতা লইয়া লেখা এই ক্ষীণকায়–সুনীলবাবুর ভাষায়‘জসীম উদ্ দীনের ক্ষুদ্রতম’–কাব্যগ্রন্থেও মিলিতেছে।

এই গ্রন্থে ‘বঙ্গ-বন্ধু’ নামে একটি কবিতা আছে। তাহার নিচে তারিখ দেওয়া আছে ১৬ মার্চ ১৯৭১। এই কবিতার উপর মন্তব্য করিতে বসিয়া সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায় লিখিয়াছেন, “এক আশ্চর্য ব্যক্তিত্ব এই বঙ্গবন্ধু, যাঁর হুকুমে অচল হয়ে গিয়েছিল শাসকের সকল নিষ্পেষণ যন্ত্র, বাঙালী নরনারী হাসিমুখে বুকে বুলেট পেতে নিয়েছিল শোষক সেনাবাহিনীর।” কথাটি মিথ্যা নহে। জসীমউদ্দীনের শ্লোকে:

তোমার হুকুমে তুচ্ছ করিয়া শাসন ত্রাসন ভয়,
আমরা বাঙালী মৃত্যুর পথে চলেছি আনিতে জয়।

জসীমউদ্দীন বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমানের আরও একটি জয়ের কথা বলিয়াছেন যাহা বিশারদ অধ্যাপকদের দৃষ্টি এড়াইয়া গিয়াছে। যাহা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন করিতে চাইয়াছিলেন কিন্তু পারেন নাই বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমান তাহা পারিয়াছেন। হিন্দু ও মুসলমানকে তিনি প্রেম-বন্ধনে মিলাইয়াছেন। যাহা মহাত্মা মোহনদাস গান্ধী জীবন দান করিয়াও পারেন নাই, তিনি তাহা সম্ভব করিয়াছেন। জসীমউদ্দীন লিখিয়াছেন:

এই বাঙলায় শুনেছি আমরা সকল করিয়া ত্যাগ,
সন্ন্যাসী বেশে দেশবন্ধুর শান্ত মধুর ডাক।
শুনেছি আমরা গান্ধীর বাণী জীবন করিয়া দান,
মিলাতে পারেনি প্রেম-বন্ধনে হিন্দু-মুসলমান
তারা যা পারেনি তুমি তা করেছ, ধর্মে ধর্মে আর,
জাতিতে জাতিতে ভুলিয়াছে ভেদ সন্তান বাঙলার।

১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ তারিখ দিয়া লিখিত একটি কবিতার নাম ‘কবির নিবেদন’। তাহার কয়েক পঙক্তি:

প্লাবনের চেয়ে–মারীভয় চেয়ে শতগুণ ভয়াবহ
নরঘাতীদের লেলিয়ে দিতেছে ইয়াহিয়া অহরহ
প্রতিদিন এরাঁ নরহত্যার যে কাহিনী এঁকে যায়
তৈমুর লং নাদির যা দেখে শিহরিত লজ্জায়।

পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পোড়ামাটি নীতির একটি প্রতীক ধামরাই রথে আগুন। জসীমউদ্দীন পাকিস্তানের রক্ষাকারী সেনাবাহিনীর কীর্তিস্তম্ভস্বরূপ এই ধামরাই রথ ভস্মীভূত করিবার কাহিনী লিখিয়া রাখিয়াছেন। এই কবিতা হইতে অংশবিশেষ বাছিয়া লওয়া সহজ কর্ম নহে।

বছরে দুবার বসিত হেথায় রথ-যাত্রার মেলা
কত যে দোকান পসারী আসিত কত সার্কাস খেলা।
কোথাও গাজীর গানের আসরে খোলের মধুর সুরে
কত যে বাদশা বাদশাজাদীরা হেথায় যাইত ঘুরে।
শ্রোতাদের মনে জাগায়ে তুলিত কত মহিমার কথা,
কত আদর্শ নীতির ন্যায়ের গাথিয়া সুরের লতা।

পুতুলের মত ছেলেরা মেয়েরা পুতুল লইয়া হাতে,
খুশীর কুসুম ছড়ায়ে চলিত বাপ ভাইদের সাথে।
কোন যাদুকর গড়েছিল রথ তুচ্ছ কি কাঠ নিয়া,
কি মায়া তাহাতে মেখে দিয়েছিল নিজ হৃদি নিঙাড়িয়া।

তাহারি মাথায় বছর বছর কোটি কোটি লোক আসি
রথের সামনে দোলায়ে যাইত প্রীতির প্রদীপ হাসি।
পাকিস্তানের রক্ষাকারীরা পরিয়া নীতির বেশ,
এই রথখানি আগুনে পোড়ায়ে করিল ভস্ম শেষ।
শিল্পী হাতের মহা সান্তুনা যুগের যুগের তরে
একটি নিমেষে শেষ করে গেল এসে কোন বর্বরে।

এই কবিতার নিচে তারিখ লেখা আছে ১৬ মে ১৯৭১।

১৯৭১ সালে জসীমউদ্দীনের বয়স প্রায় সত্তর বছর ছুঁই ছুঁই করিতেছে। তাঁহার সৃষ্টিক্ষমতাও ততদিনে নিঃসন্দেহে কমিয়া আসিতেছে। তবু ধন্য আশা কুহকিনী। দেশ স্বাধীন হইয়াছে। কবি গাহিতেছেন:

ঝড়ে যে ঘর ভাঙিয়া গিয়াছে আবার গড়িয়া নিব
ঝড়ের আধারে যে দীপ নিভেছে আবার জ্বালায়ে দিব।

এই ধরনের সরল পঙক্তি পড়িবার বহু আগেই হুমায়ুন কবির লিখিয়াছিলেন, “আজ আত্মকেন্দ্রিক পুনরাবৃত্তির মধ্যেই তাঁদের সাধনা নিবদ্ধ।” কাব্যসাধনার প্রকরণে ইহা সত্য হইলেও কাব্যের ‘নিরাকারে’ কোথায় যেন একটা দুর্মর নাদ আছে যাহা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ১৯৭০ সালের ১৪ আগস্ট ছিল পাকিস্তানের শেষ স্বাধীনতা দিবস। সেদিন জসীমউদ্দীন লিখিয়াছিলেন সেই অপ্রকাশের বেদনা।

আজি আজাদীর এ পুত দিবসে বার বার মনে হয়
এই সুন্দর শ্যাম মনোহরা এ দেশ আমার নয়।

এই বেদনা নিঃসন্দেহে পুনরাবৃত্তির অযোগ্য।

স্বাধীনতা সংগ্রামের মাহেন্দ্রক্ষণে সংগঠিত সংগ্রামী সংগঠন বাংলাদেশ লেখক শিবির ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘হে স্বদেশ’ নামে তিনটি সংকলন প্রকাশ করিয়াছিলেন। তাহাদের কবিতা সংকলনে জসীমউদ্দীনের একটি কবিতা দেখা যায়। নাম ‘একুশের গান’। কবিতাটি যখন লেখা হইয়াছিল উল্লেখ নাই। কবিতার অন্তর্গত সাক্ষ্য হইতে অনুমান করি ইহার রচনাকাল ১৯৫২ সালের কাছাকাছি কোন এক সময় হইবে। কারণ তখন পূর্ববঙ্গ প্রদেশের জনসংখ্যা চার কোটি বলিয়াই প্রসিদ্ধ ছিল।

আমি কবিতাটির দোহাই দিয়া শেষ করিতেছি। ইহার যে রূপকল্প তাহাতেও জসীমউদ্দীনের শক্তি তাজা বোমার মত বিস্ফোরিত হইয়াছে। ‘একুশের গান’ কবিতাটিতে মোট বাইশটি পঙক্তি দেখা যায়। টুকরা টুকরা উদ্ধার না করিয়া আমি গোটা কবিতাটি ছাপাইয়া দিতেছি।

আমার এমন মধুর বাঙলা ভাষা
ভায়ের বোনের আদর মাখা
মায়ের বুকের ভালোবাসা।

এই ভাষার রামধনু চড়ে
সোনার স্বপন ছড়ায় ভবে
যুগযুগান্ত পথটি ধরে
নিত্য তাদের যাওয়া আসা।

পূব বাংলার নদীর থেকে
এনেছি এর সুর
শস্যদোলা বাতাস দেছে
কথা সুমধুর।

বজ্র এরে গেছে আলো
ঝাঞ্ঝা এরে দোলদোলালো
পদ্মা হলো সর্বনাশা।

বসনে এর রঙ মেখেছি
তাজা বুকের খুনে
বুলেটেরি ধূম্রজালে
ওড়না বিহার বুনে।

এ ভাষারি মান রাখিতে
হয় যদি বা জীবন দিতে
চার কোটি ভাই রক্ত দিয়ে
পূরাবে এর মনের আশা।

অধিক মন্তব্য করিব না। শুধু লক্ষ্য করিব ‘দেছে’ শব্দের ব্যবহার। আরো শব্দের মধ্যে আছে ‘এরে’। সবচেয়ে দুর্ধর্ষ রুপকল্প ‘ওড়না বিহার’– ‘বুলেটের ধূম্রজালে ওড়না বিহার বুনে’। ইহাকে অসাধারণ বলিলে কমই বলা হয়। এই রকম আরেকটি শ্লোক পাইয়াছিলাম “ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে” কবিতা সংকলনের ‘জাগায়ে তুলিব আশা’ কবিতায়। জসীমউদ্দীন লিখিয়াছিলেন:

শোন ক্ষুধাতুর ভাইরা বোনেরা, উড়োজাহাজের সেতু
রচিত হইয়া আসিছে আহার আজি(কে) মোদের হেতু।

স্বীকার করিব রূপকল্প পরিচয়ে ‘উড়োজাহাজের সেতু’ ‘ওড়না বিহার’ বা উড়ন্ত ধর্মাশ্রমকে ছাড়াইয়া যায় নাই।

 

 

 

দোহাই

১। জসীমউদদীন, ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে (ঢাকা : নওরোজ কিতাবিস্তান, ১৯৭২)।
২। হুমায়ুন কবির, বাঙলার কাব্য, পুনর্মুদ্রণ (ঢাকা: বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ২০১২)।
৩। সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়, জসীমউদ্দীন , ৩য় সংস্করণ (ঢাকা: নওরোজ সাহিত্য সম্ভার, ১৯৮৮)।
৪। বাংলাদেশ লেখক শিবির সম্পাদিত , হে স্বদেশ : কবিতা (ঢাকা : বাঙলা একাডেমী, ১৯৭২)।

 

১৬ ডিসেম্বর ২০১৩, bdnews24.com, মতামত বিশ্লেষণ

রাষ্ট্রের হৃদরোগ

বর্তমান নিবন্ধটি মূলত ভূমিকা — লেখা হইয়াছে বিধান রিবেরু রচিত ও প্রকাশিতব্য ‘শাহবাগ: রাজনীতি ধর্ম চেতনা’ কিতাবের জন্য। ঐ ভূমিকাটি অত্র ‘রাষ্ট্রের হৃদরোগ’ শিরোনামে প্রকাশিত হইতেছে

গত দশ বছরে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে যে সকল তরুণ চিন্তাবিদের সহিত আমার পরিচয় ঘটিয়াছে তাঁহাদের মধ্যে বিধান রিবেরু সম্ভবত সবচেয়ে উজ্জ্বল। গায়ের রঙ্গের কথা বলিতেছি না। বলিতেছি তাঁহার চিন্তাশক্তির কথা। আপনার হাতে ধরা এই প্রবন্ধ সংকলনেও তাহার সামান্য প্রমাণ পাওয়া যাইবে বলিয়া আমার বিশ্বাস।

বর্তমানে যে প্রজাতন্ত্রে আমরা বসবাস করিতেছি তাহার প্রতিষ্ঠা হইয়াছিল ১৯৭১ সালে। প্রজাতন্ত্রের বয়স সেই হিশাবে আজ বিয়াল্লিশ বছর অতিক্রম করিতেছে। ক্ষুদ্র মানবশিশুর সহিত রাষ্ট্রের তুলনা করা কোনক্রমেই সঙ্গত নহে। হইলে এই রাষ্ট্রকেও এতদিনে প্রাপ্তবয়স্ক বলা যাইত। দুর্ভাগ্যের মধ্যে আমাদের এই রাষ্ট্র এখনো তাহার প্রাণের অর্থাৎ হৃদপিণ্ডের সংকট কাটাইয়া উঠিতে পারে নাই।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ যে সামাজিক ন্যায়বিচারের জাতীয় দাবিতে পরিচালিত হইয়াছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্যে তাহার একাংশ পূর্ণ হইয়াছে — এই সত্যে সন্দেহ নাই। কিন্তু দাবির আরেক অংশ অপূর্ণই থাকিয়া গিয়াছে। এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ফলে শ্রমিকশ্রেণির তথা সর্বজন সাধারণের মুক্তি ঘটে নাই। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ভোট দিতে পারেন। কিন্তু প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতিভা এমনই যে তাহাতে জনগণকে দেশশাসনের কঠোর কর্তব্য হইতে দূরে রাখাই নিয়ম হইয়া দাঁড়ায়। সর্বজনের মুক্তির শর্ত তাহার পরও এই প্রজাতন্ত্র — এ কথা ভুলিয়া যাওয়া ঠিক হইবে না। তবে ফ্যাসিতন্ত্রের নব্য প্রবর্তকরাই এই জাতীয় মনভোলানো প্রচারণা চালাইয়া থাকেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যাঁহারা গণহত্যা চালাইয়াছিলেন তাঁহারা ছাড়া পাইয়া গিয়াছেন। তাঁহাদের বিচার হয় নাই। আর যাঁহারা ঐ গণহত্যার সহযোগী ছিলেন তাঁহাদের কেহ কেহ মাত্র সুদীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে বিচারের মুখোমুখি হইয়াছেন। এই বিচার না হওয়া (বিচারে বিলম্ব ঘটার মানেও প্রবাদ বাক্য অনুসারে বিচার না হওয়া বটে) মানে বিপ্লব বেহাত হওয়া।

তাহার পরও বলিতে হইবে বিপ্লব মানে ঘটনা বিশেষ নহে। বিপ্লব মানে যাহা ভাসিতে থাকে। প্লব হইতে প্লাবন তাই বিপ্লব চলিতেই থাকে। সেই বিচারে বিচার করিতে হইলে বলিতে হইবে ১৯৭১ সালে যে বিপ্লব শুরু হইয়াছিল তাহারও পর আছে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসিত ও ব্রিটিশ প্রভাবিত ভারত ভাগ হইয়াছিল ধর্মভিত্তিক স¤প্রদায় পরিচয়কে বড় করিয়া। আর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ গঠন করা হইয়াছে সেই পরিচয়কে নাকচ করিয়া। ভারতবর্ষের জাতি সমস্যা বলিতে যাহা একদা বুঝাইত — ১৯৪৭ সাল যাহার সত্য সমাধান বাতলাইতে পারে নাই — ১৯৭১ সাল তাহার সত্যকার সমাধান কিভাবে হইতে পারে তাহা একপ্রকার দেখাইয়া দিয়াছে। বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের পথ সারা দক্ষিণ এশিয়া মহাদেশের ভবিষ্যৎ পথের রূপরেখা মাত্র।

এ সত্যে যাঁহাদের সন্দেহ তাঁহারা ১৯৭১ সালের মর্মকথা ধরিতে পারেন নাই। বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্র গঠনের এই তাৎপর্য আন্তর্জাতিক। দক্ষিণ এশিয়ার সকল নিপীড়িত জাতির মুক্তির রাজনৈতিক পথ দেখাইতে পারে বাংলাদেশ। আজ অনেকেই এই সত্য ভুলিতে বসিয়াছেন।

3.1বাংলাদেশে জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হইয়াছিল বিভিন্ন ধর্ম-স¤প্রদায়ের অন্তর্গত ঐক্য ও মিলিত সংগ্রামের মধ্যে। তাই যাঁহারা এই নতুন রাষ্ট্রের জন্ম ঠেকাইতে পারেন নাই তাঁহারা এখনো চেষ্টা করিতেছেন কি করিয়া ইহার সা¤প্রদায়িক ঐক্য বিনষ্ট করা যায়। এই চেষ্টা দুই দিক হইতেই হইতেছে। একদিকে আছেন তাঁহারা যাঁহারা এই দেশকে অভাগা পাকিস্তানের আদর্শে মুসলমান রাষ্ট্র বানাইতে চাহিতেছেন। আরদিকে আছেন ভারতে নতুন করিয়া প্রবল হওয়া হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকারীর দল। তাই বলিতেছিলাম বাংলাদেশের রাজনীতি এখনো এই মহাদেশের রাজনৈতিক হৃদরোগ হইতে মুক্ত হয় নাই। এই হৃদরোগ কথাটি আমি আন্তনিয়ো গ্রামসির লেখা হইতে ধার করিয়াছি। ইংরেজি অনুবাদে এই রোগের নাম ‘অর্গানিক ক্রাইসিস’। এই রোগে প্রাণ কিন্তু বিপন্ন হইতে পারে।

সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সূত্রপাত ব্রিটিশ জাতির শাসনকালে। এখনো তাহারই জের এই দেশে চলিতেছে। এই হৃদরোগ হইতে মুক্তি পাইতে হইলে আমাদের হৃদয়বান চিন্তাবিদ দরকার। শুদ্ধ একজন নহে। সর্বজনের মধ্যে এই চিন্তাবিদরা যতদিন দেখা না দিবেন ততদিন আমাদের হৃদরোগ নিরাময় হইবে না। রাষ্ট্রকে যদি কোন জীবদেহের সহিত তুলনা করা যাইত তবে আমি যাহাকে হৃদরোগ বলিতেছি তাহার অর্থ অনুধাবন সহজ হইত।

আমার বন্ধু বিধান রিবেরু আমাদের দেশ ও জাতির এই দীর্ঘস্থায়ী হৃদরোগের একটা বিশেষ আলামত বিশ্লেষণের সামান্য চেষ্টা করিয়াছেন। এই সংকলনে তাহার কিছু প্রমাণ আপনি পাইবেন। আমিও পাইয়াছি।

বিধান রিবেরু দেখাইয়াছেন ১৯৭১ সালে যাঁহারা যুদ্ধাপরাধ করিয়াছিলেন তাঁহাদের কেহ কেহ বিচারের সম্মুখীন হওয়ার পর দেশে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া হইয়াছে। যাঁহারা যুদ্ধাপরাধীদের যথার্থ বিচার চাহিয়াছেন তাঁহারা প্রথম দল। গত ৪২ বছর ধরিয়াই এই দাবি জাগরুক। এই দাবির সর্বশেষ চিহ্ন শাহবাগে সংগঠিত প্রতিবাদ। এই প্রতিবাদ স্বাভাবিক নিয়মেই ১৯৭১ সালের স্মৃতিতে স্মার্ত হইয়াছে।

আর এই বিচারকে ব্যাহত করিবার জন্য যাঁহারা ছলে বলে কৌশলে লড়াই করিতেছেন তাঁহারা দ্বিতীয় দল। এই দলের শেষ হাতিয়ার হইয়া দাঁড়াইয়াছে ধর্ম-সা¤প্রদায়িক প্রচারণা। ইঁহারা এসলাম রক্ষার আওয়াজ তুলিতেছেন। কিন্তু এই আওয়াজের আশু লক্ষ্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ব্যাহত করা বৈ নহে। বিধান রিবেরু বর্তমান সংকলনভুক্ত তাঁহার সকল লেখায় এই সত্যটি প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন।

আশা করি তিনি ভবিষ্যতে এই ধর্ম-সা¤প্রদায়িক রাজনীতির দূরবর্তী লক্ষ্য বিষয়েও মুখ খুলিবেন। শাহবাগে সমবেত প্রতিবাদ সমাবেশ হইতে বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের হৃদরোগ কোন জায়গায় তাহার আলামত স্পষ্ট — নতুন করিয়া স্পষ্ট — হইয়াছে। যুদ্ধাপরাধীরা আত্মরক্ষার হাতিয়ার হিশাবে পাল্টা হামলার কৌশল বাছাই করিয়াছেন। তাঁহারা প্রতিবাদকারী ও বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষকে ‘নাস্তিক’ বলিয়া আক্রমণ করিতেছেন। এই কৌশল নতুন নহে। বেগম জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে অন্যূন ২০ বছর আগে যে প্রতিবাদ আন্দোলন সংগঠিত হইয়াছিল তখনো এই কৌশল দেখা গিয়াছিল।

এইবারের নতুন দিক অনেক। তাহার শুদ্ধ একটির উপর বিধান এখানে মনোনিবেশ করিয়াছেন। কোন দিক এইটি? যুদ্ধাপরাধী মহলের সমর্থনে এইবার মুখোশ খুলিয়া আগাইয়া আসিয়াছেন সুপ্রসিদ্ধ কবি ও যশপ্রার্থী দার্শনিক ফরহাদ মজহার। বিধান একাধিক লেখায় এই নব্য ফ্যাসিবাদী প্রচারকের মুখোশ খুলিয়া দিয়াছেন।

সত্যের খাতিরে স্বীকার করিতে হইবে — বর্তমানে ফরহাদ মজহারের সমকক্ষ প্রচারক যুদ্ধাপরাধী মহলে দ্বিতীয়টি নাই। তিনি মহাত্মা আহমদ ছফার লেখা কিভাবে বিকৃত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করিতে পারেন তাহার একটি নমুনা এই সংকলনের ‘ঘুরিয়া দাঁড়াইব কোথায়’ প্রবন্ধে বিধান দেখাইয়াছেন। এই প্রবন্ধ লিখিয়া তিনি আমাদের ঋণী করিয়া রাখিলেন।

যাঁহারা কাম ক্রোধ লোভ মোহ মদ ও মাৎসর্য হইতে মুক্ত হইয়া এই সংকলনের রচনা পড়িবেন তাঁহারা দেখিবেন বিধান রিবেরু কিভাবে পদে পদে আমাদের নতুন যুগের সংগ্রামে নেতৃত্ব

দিবার যোগ্য হইয়া উঠিতেছেন। আমিও তাঁহার সংগ্রামে যোগ দিতে চাহি।

বিধানের বহিটা আমি যতদূর পারি আদ্যোপান্ত পড়িয়াছি। শুদ্ধ একটা জায়গায় আমার মনে হইল তিনি আরো একটু ভাবিলে ভাল করিতেন। ‘মদিনার সনদ’ প্রসঙ্গে তিনি লেবাননী বংশোদ্ভূত ইতিহাসবিদ ফিলিপ হিট্টির কথা উদ্ধৃত করিয়াছেন। হিট্টি বলিয়াছিলেন এই ‘মদিনার সনদ’ জিনিশটা এসলামি সাম্রাজ্যের ভিত্তিস্বরূপ হইয়াছিল। ইহা লইয়া তর্ক চলিতে পারে। মনে রাখিতে হইবে আড়াই হাজার বছর আগের রোম প্রজাতন্ত্র কয়েকশত বৎসর পর রোমান সাম্রাজ্যে পরিণত হইয়াছিল। তাই বলিয়া নিকোলো মেকিয়াবেলি ‘প্রজাতন্ত্র’ জিনিশটাকে খাট করিয়া দেখেন নাই। আমরাও বলিব প্রজাতন্ত্র বা জনসাধারণের কতৃত্বই গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাভূমি।

‘মদিনার সনদ’ একটা রূপকথা। কিন্তু ইহার মর্মকথা কি? সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। একাধিক ধর্মবিশ্বাসের মানুষ এক রাষ্ট্রে বসবাস করিতে পারেন কিনা তাহার নমুনা বলিয়া ইহাকে গ্রহণ করা যায়। বিধান প্রশ্ন তুলিয়াছেন এই রূপকথার তুলনীয় অন্য রূপকথা বিলাতের সনদ — ওরফে ‘ম্যাগনা কার্টা’ বা মহাসনদ — প্রসঙ্গ তোলা উচিত কিনা। মনে রাখিতে হইবে রূপকথা ভাষার মতন। তাহার বাসস্থান অজ্ঞানলোকে। ইহা পছন্দ বা অপছন্দের কথা নহে। গান্ধিজি রামরাজ্যের কথা তুলিয়াছিলেন। কিন্তু বর্তমান যুগের ভারত রামরাজ্য হইয়াছে কি?

বিধানের পরামর্শ আমরা গ্রহণ করি কি না করি তাহা বড় কথা নহে। তাঁহার প্রশ্নটা গুরুর প্রশ্ন, গুরুতর প্রশ্ন। আমরা এই প্রশ্ন কাঁথাচাপা দিতে পারিব না। ইহা জাগিয়া উঠিবেই।

তাঁহার প্রশ্ন আমার কাছে আরো এক কারণে তৎপর হইয়া উঠিয়াছে। বিধান বাংলাদেশের ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্ম স¤প্রদায়ের মধ্যে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। এই ঘটনাটিকে ছোট করিয়া ভাবিবার কোন উপায় নাই। বাংলাদেশের জাতীয় সমাজে তাঁহার প্রতিভা যতই উজ্জ্বল হইবে এই দেশের জন্ম ততই সফল বলিয়া অভিনন্দিত হইবে। তিনি এই বই বাংলায় লিখিয়াছেন। একদিন এই বইও ‘ঢাকার সনদ’ বলিয়া বিখ্যাত হইবে কিনা কে জানে!

এই সামান্য ভূমিকা লিখিবার সম্মান আমাকে দান করিয়া বিধান রিবেরু আপনকার হৃদয়ের ঔদার্যেরই প্রমাণ দিয়াছেন। আমি ক্যাথলিক বলিতে ‘ঔদার্যের অধিকারী’ বলিয়াই ভাবিয়া থাকি। এই বই পড়িতে হইলেও সেই ঔদার্য আমাদের পক্ষে অপরিহার্য।

গ্রন্থ পরিচিতি: বিধান রিবেরু, শাহবাগ: রাজনীতি ধর্ম চেতনা (ঢাকা: প্রকৃতি প্রকাশনী, প্রকাশিতব্য)

২৭ নবেম্বর ২০১৩, সর্বজন: নবপর্যায় ২৯

বৌদ্ধ মন্দিরে হামলার এক বছর: বিচার করতে হবে

রামুসহ কক্সবাজারের বিভিন্ন বৌদ্ধ উপাসনালয় ও বসতিতে সাম্প্রদায়িক হামলার এক বছর পূর্তি হইল ২৯ সেপ্টেম্বর। বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটিকে স্মরণ করিবার আয়োজন করে রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদ। স্মরণসভা পর্বে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখিয়াছিলেন সলিমুল্লাহ খান। অত্র তাহার বক্তব্যখানি সামান্য পরিমার্জনা করিয়া ছাপানো হইল

রামুতে সাম্প্রদায়িক হামলার বর্ষপূর্তি স্মরণে আয়োজিত অষ্টপরিষ্কার দান অনুষ্ঠানে ভক্তবৃন্দ ছবি: সর্বজন

রামুতে সাম্প্রদায়িক হামলার বর্ষপূর্তি স্মরণে আয়োজিত অষ্টপরিষ্কার দান অনুষ্ঠানে ভক্তবৃন্দ
ছবি: সর্বজন

আজকের স্মরণসভার সভাপতি, মঞ্চে উপবিষ্ট অতিথি এবং রামুর সর্বস্তরের বৌদ্ধ হিন্দু মুসলিম জনসাধারণ, আপনাদের শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করছি।

২৯ সেপ্টেম্বর যে ঘটনা ঘটেছিল সেখানে কারা আক্রমণ করেছিল আপনারা অনেকেই জানেন। আপনারা অনেকেই সাক্ষী আছেন। সরকারি তদন্ত কমিটি তাদের নাম খুঁজে পায় না। আপনারা জানেন যারা কোন কাজ — ভাঙ্গার কাজ — হাতে নেয়, আমাদের বাংলা ভাষায় তাদের বলে ক্রীড়নক। তারা খেলার হাতিয়ার। তাদের পিছনে পরিকল্পনাকারী থাকে। পরিকল্পনাকারীদের  পিছনে আরো বড় পরিকল্পনাকারী থাকে। আপনারা

দেখুন গত এক বছরে এদেশে কত ঘটনা ঘটেছে। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১২ সনে যখন রামুর বৌদ্ধমন্দিরে হামলা হয়, পরে উখিয়া টেকনাফে হামলা হয়, তখন আমরা মনে করেছিলাম এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এই ঘটনাগুলো যে বিছিন্ন নয় তা দেখাতে আমি বেশি দূরে যাব না। আমাদের এই দক্ষিণ এশিয়ায়, যাকে আমরা উপমহাদেশ বলি সেখানে, এই ধরনের ঘটনা প্রচুর হচ্ছে। আপনারা দেখেন ভারতে হচ্ছে কোথাও কোথাও , শ্রীলঙ্কায় হচ্ছে, বার্মাতেও কোথাও কোথাও হচ্ছে, পাকিস্তানে হচ্ছে, আফগানিস্তানে হয়েছে। আমি আর বেশি দূরে যাচ্ছি না।

মাঝে মাঝে আমাদের মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে এর পিছনের কারণটা কি। আমরা সকলেই মনে করি যে আমাদের দেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। তাহলে অসম্প্রীতি তৈরি করে কারা? সোজা কথায়, অসম্প্রীতি তৈরি করলে যাদের লাভ তারাই করে।

আমরা ১৯৭১ থেকে শুরু করি সবকিছুই। ৪২ বছর আগের ঘটনা। কিন্তু তার আগেও তো ইতিহাস ছিল। আমি পুরানা ইতিহাসে যাব না। ধরুন, ২০০ বছরের মত এদেশ ব্রিটিশের শাসনে ছিল। তখন বলা হয়েছিল এদেশে তো হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান এবং নানা ধর্মের মানুষ আছে। আবার বাঙ্গালি পাঞ্জাবি সিন্ধি গুজরাটি বিহারি নানা জাতির মানুষ আছে। আপনারা জানেন নানা অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য থাকে। পাকিস্তান আমলে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের বৈষম্য ছিল। তার পরিণতিতে আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি।

ব্রিটিশ আমলেও তেমন বৈষম্য ছিল। তখন মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছিল, ব্রিটিশরা যদি চলে যায়, এদেশ শাসন করবে কারা? তখন বড় বড় মনীষীরা বলেছিলেন এ সমস্যা সমাধানের সহজ কোন পথ নাই। সমাধান কি? এদেশের সব লোককে হয় হিন্দু হয়ে যেতে হবে না হয় সব লোককে মুসলমান হয়ে যেতে হবে। নাহলে এই সমস্যার কোন সমাধান নাই। এই কথা এমন সব বড় বড় লোক বলেছিলেন যাদের নাম আনলেও বিশ্বাস হবে না। আমি নাম নিচ্ছি না। কিন্তু আমরা জানি এটা কোন সমাধান নয়। এটা একটা অবাস্তব সমাধান। আমাদেরকে যার যার ধর্মে থাকতে হবে এবং আমাদেরকে একই দেশে বসবাস করতে হবে। তাহলে সমস্যার সমাধান কোথায়? আমরা তখন, ১৯৭১ সালে, বলেছিলাম ন্যায়, সাম্য, মানবিক মর্যাদা। এই দাবিতেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল।

কিন্তু আমি দেখি দেশে এখন কিছু কিছু বুদ্ধিজীবী বের হয়েছেন যারা বলেন ধর্মনিরপেক্ষতা কোথা থেকে আসল আমরা টের পাচ্ছি না। আমি তাদেরকে সবিনয়ে প্রশ্ন করতে চাই, যদি বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সমানাধিকার, ন্যায়, সাম্য প্রতিষ্ঠিত না হয় তাহলে মানবিক মর্যাদা থাকবে কোথায়? আর যদি বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সমান আচরণ করার দায়িত্ব রাষ্ট্র না নেয় — যাকে আমরা ধর্মনিরপেক্ষতা বলি — তাহলে মানবিক মর্যাদা, সাম্য এবং ন্যায় কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে? যারা বলছেন বাংলাদেশে সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং ন্যায় থাকবে কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা থাকবে না তারা আন্তরিক কথা বলছেন না। আমার ধারণা, এই কথা যারা বলছেন তারাই এই আক্রমণটা করেছেন। তার একটা দীর্ঘমেয়াদী কারণও আছে।

এদেশে চিরকাল শাসন করতে পারবে না এটা ব্রিটিশ বুঝতে পেরেছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর তারা নিজেরাই বলেছিলেন আমরা চলে যাব। তারা বাংলাদেশ থেকে চলে গেছেন। শ্রীলঙ্কা থেকে চলে গেছেন। তারা বার্মা থেকে চলে গেছেন। তারা পৃথিবীর প্রায় সব দেশ থেকে চলে গেছেন। ওটা চলে যাবার সময়। আমরা ওটার নাম দিয়েছি পরাধীনতার শেষকাল।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন সলিমুল্লাহ খান ছবি: সংগৃহীত

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন সলিমুল্লাহ খান
ছবি: সংগৃহীত

তাহলে স্বাধীনতার কালে আমরা কিভাবে দেশ চালাব? পাকিস্তান আমলের ২৩-২৪ বছরে আমরা বিশ্বাস করেছিলাম, ভারতবর্ষে যে আঞ্চলিক বৈষম্য হয়েছিল সেটার অবসান হবে। তখন মানুষকে প্রবঞ্চিত করে বলা হয়েছিল তোমার মধ্যে বহু পরিচয় আছে। তুমি পূর্বাঞ্চলের লোক, একই সাথে তুমি ভারতের, সেটাও তোমার পরিচয়। ঘটনাচক্রে যারা নির্যাতিত তাদের কোন না কোন ধর্মপরিচয় থাকে। তখন তাদের ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে একটা কলা — তোমরা মুসলমান। সেই জন্য পাকিস্তান হয়েছে। কিন্তু সেই মানুষেরাই কিছুদিন পর বুঝতে পেরেছে এই পাকিস্তান তাদের সমস্যার সমাধান করবে না। এখন বার্মার মধ্যে মুসলমানদের উপর অত্যাচার হয়। ধরে নিলাম। তো সেটা বলে রামুর বৌদ্ধদের উপর অত্যাচারের যুক্তি যারা দেখায় তারা মানবিক মর্যাদায়, সাম্যে, ন্যায়ে, ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করে না। এই আক্রমণ করেছে তারাই। এগুলো হচ্ছে লম্বা কথা। আমরা এখন নগদ কথায় আসি।

গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে আজকের এই ২৯ তারিখ পর্যন্ত এই এক বছরে কত ঘটনা ঘটেছে। আপনারা জানেন এই বছর ফেব্রুয়ারি মাসের ৫ তারিখে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের একটি রায় ঘোষিত হল। ঢাকার শাহবাগে তরুণরা সমাবেশ করে বলল যুদ্ধাপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি চাই। তখন কয়েক দিনের মধ্যে দেখা গেল — আমি লম্বা কাহিনীকে সংক্ষেপ করছি, আপনারা সকলেই জানেন — দেশের কত জায়গায় ৯৪-৯৫ জায়গায় হিন্দু মন্দিরে হামলা হল। আমি আমার সেই সমস্ত বৌদ্ধ বন্ধুরা যারা আগে বক্তৃতা দিয়েছেন তাঁদের বক্তব্যের সাথে সহমর্মিতা প্রকাশ করেই বলছি, আক্রমণ একলা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপর হয় নাই। পৃথিবীর নানা দেশে যেখানে যে দুর্বল — তথাকথিত সংখ্যালঘু — তার উপরেই হামলা হয়। এই বাংলাদেশে হয়েছে। ভারতে দেখেন মুসলমানদের উপর হচ্ছে। এগুলো করে কারা? দেখেন আমরা এখন ইন্টারনেটের যুগে এসছি। সেদিন দেখলাম একজন সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, কক্সবাজার জেলা পরিষদ এখন কম্পিউটার আউটসোর্সিং করছে। মানে কম্পিউটার বেশি শিখে আমরা এখন পয়সা কামাতে পারব। কিন্তু তার বিপদের দিকও আছে। বলে ঘুঘু দেখেছ ফাঁদ দেখনি? ফাঁদ হচ্ছে এই — রামুতে যা ঘটেছিল সেটাই। সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা — একজনের নামে অপবাদ দিয়ে আরেক জনকে দোষী করা। এটাকে ইংরেজিতে বলে ব্ল্যাক প্রপাগান্ডা। আমি কথাটা পছন্দ করি না। আমি বলব এটা হোয়াইট প্রপাগান্ডা। এটা সাদা মিথ্যা, নির্জলা মিথ্যাপ্রচার। কিন্তু পরিণতিতে যা হবার তা তো হয়ে গেছে। আপনারা সবাই দেখেছেন। আমরা সকলেই তার ভুক্তভোগী।

কিন্তু ৫ ফেব্রুয়ারির পর বুঝতে পারলাম তার পিছনে একটা সংঘবদ্ধ হাত আছে। এটা কোন বিছিন্ন ব্যক্তি, রামুর কয়েকজন ব্যক্তি করেছে বললে পুরাপুরি সত্য বলা হবে না। তাহলে দেশের পঁচানব্বইটা জায়গায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দিরের উপর, বাড়ির উপর কেমন করে হামলা হল? এটা কি করে সম্ভব? এমনকি রামুতেও আক্রমণ করার জন্য ট্রাকে ট্রাকে যে লোক এসেছে সেটা তথাকথিত লোকের মনের রাগ থেকে সম্ভব নয়। এটা দুইদিনের ঘটনা হতে পারে না।

এই জন্যই বলছি বৌদ্ধ মন্দির পুনরায় নির্মাণ করার জন্য আমরা সরকারকে ধন্যবাদ অবশ্যই দেব। এটা না দিলে অন্যায় হবে। আমাদের সুলতানা কামাল আপাও বলেছেন, সরকার যে এটা নির্মাণ করে দিয়েছে সেটার জন্য আপনারা তাকে সাধুবাদ জানাবেন। বৌদ্ধমন্দিরগুলোর পুনর্নির্মাণ করাটা সমস্যার স্বীকৃতি মাত্র, সমাধান নয়। এই ধরনের ঘটনা আর যেন না ঘটে সেটা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমে আমাদের প্রত্যেককে বুঝতে হবে ঘটনাটা কেন ঘটে। সে জন্য আমি বললাম ব্রিটিশ আমল থেকে  শুরু করে আমরা দেখেছি ঘটনাগুলি সবসময় ঘটে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের পিছনে কি থাকে? থাকে স্বার্থবুদ্ধি, বিশেষত অর্থনৈতিক স্বার্থ। ভবিষ্যতে এদেশে শাসন চালাবে কে? কে এদেশের উপর প্রতাপ করবে? যারা করতে চায় তারা নিজের শাসন ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক শোষণের ক্ষমতাকে অক্ষুণœ রাখার জন্য মানুষের মধ্যে ক্রমাগত ভীতির সঞ্চার করে। বলে এদেশ থেকে চলে যেতে হবে তোমাকে। আমি বলি, এটা কি তোমার বাপের সম্পত্তি? হ্যাঁ, রাজনীতি শুধু তোমাকে সেই বাপের সম্পত্তি করে দেয় অন্যকে তার বাপের সম্পত্তি থেকে উৎখাত করার জন্য। এজন্য তা যদি আমরা বুঝতে চাই তো আমাদের ঘটনার গভীরে যেতে হবে।

এখন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে দেশে একটা বিচার প্রক্রিয়া চলছে। এটাকে ‘নামে’ই  আমি বলব, কারণ বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে বিলম্বিত হচ্ছে বিলম্বিত হচ্ছে। একটা রায় ঘোষিত হল। প্রথম রায়ে একজনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল কারণ সে দেশে নাই, পালিয়ে গেছে। সেই একই ধরনের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর আরেকজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হল। তখন ছাত্রজনতা সহ দেশের সর্বস্তরের মানুষ শাহবাগে এসে বিক্ষোভ করল। তখন সেটাকে ঠেকানোর জন্য কি ধরনের মিথ্যা, সাদা প্রচারণার সুযোগ নেওয়া হল, আপনারা দেখেছেন। বলল কি শাহবাগে যারা সমবেত হয়েছে তারা সকলেই নাস্তিক। ভাগ্যিস বলে নাই শাহবাগে যারা সমবেত হয়েছে তারা সকলেই বৌদ্ধ। এখন নাস্তিকদের তো মন্দির নাই। ভাঙ্গবে কোনটা? তারা পারবে নাস্তিকদের ধরে ধরে হত্যা করতে। আমি সবিনয়ে নিবেদন করতে চাই, রামুর ঘটনা সেই ঘটনার অংশ। যেহেতু ঘটনাটা ৫ মাস আগে ঘটেছিল তাই আমরা প্রথমে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। এটা কেমন করে সম্ভব? আসলে এটা সম্ভব সেইভাবে যেভাবে অন্য ঘটনাগুলো ঘটেছে। অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার উদাহরণ তো ভারতে স্থাপন করা হয়েছে। নিশ্চয় সেখান থেকে এরা শিক্ষা নিয়েছে।

এজন্য বলছি এই অত্যাচারের কাহিনী কোন বিশেষ ধর্মের সাথে যুক্ত নয়। এসলাম ধর্মের কোথাও বলে না যে মন্দির ধ্বংস করতে হবে। এসলাম ধর্ম বৌদ্ধধর্মের চেয়ে বয়সে ১,০০০ বছরের ছোট ধর্ম। আমিও এসলামি সমাজে জন্মগ্রহণ করেছি। এসলাম ধর্মের বাণী আমি যেটুকু বুঝি তা হল আল্লাহর চোখে সকল মানুষ সমান। আর আমি কার্ল মার্কসের বই পড়ে কার্ল মার্কসের শিষ্য হয়েছি অতি অল্প বয়সে। সেখানে আবার কার্ল মার্কসের শিক্ষা বলতে আমি বুঝেছি, মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্যকে নির্মাণ করে, দেবতারা নির্মাণ করে না। এই দুইয়ের মধ্যে আমি কোন বিরোধ দেখি না। মানুষ নিজের ভাগ্যের নির্মাতা নিজেই। তার ভাগ্য ভাগ্যদেবীর উপর নির্ভর করে না। ভাগ্য তাকেই সহায়তা করে যে বীরদর্পে সাহসের সাথে এগিয়ে যায়। কাজেই যে ঘটনা ঘটেছে এখানে, যারা আক্রমণ করেছে, সেটাকে ঠেকাবার জন্য রামুতে অন্তত একজন হলেও তো মানুষ ছিল। একজন হলেও ঠেকাতে গিয়েছে। মানুষের মাথা তো ফেটেছে। এটাই আমাদের গৌরবের কথা।

এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগে, আমাদের জনগণের যদি চাপ না থাকত, সারা পৃথিবীতে দুর্নামে আমাদের নামে যদি রি রি পড়ে না যেত, তাহলে হয়তো বাংলাদেশ সরকারও এই মন্দিরগুলি নির্মাণ করে দিতেন না। বিশ্ব জনমতের চাপ আছে, দেশের জনমতের চাপ আছে। তাই সরকার যদি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে তাহলে তাকে কাজ করতে হবে। আমি সরকারকে ধন্যবাদ দেব। একই সাথে বলব এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধের জন্য কমপক্ষে দুইটা কাজ করা দরকার। এক হচ্ছে: এ কাজ যে বা যারা করেছে তাদেরকে ধরে ধরে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে। এটার কোন ক্ষমা নাই। যদি ৪২ বছর পরে ১৯৭১ সালে করা যুদ্ধাপরাধের বিচার হতে পারে তাহলে রামুর বৌদ্ধমন্দিরে হামলাকারী অপরাধীদের অনুসন্ধানে যদি ৪০ বছরও লাগে, তার বিচার করতে হবে। যদি এই বিচার না হয় তাহলে এই ধরনের আক্রমণকারীরা আবারও উৎসাহিত হবে। এই বিচার হবে তখনই যখন আমরা সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে — শুধু বৌদ্ধদের মধ্যে নয় — মুসলমানদের মধ্যে, হিন্দুদের মধ্যে, দেশের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে এই বিচারের দাবি জনপ্রিয় করতে পারব।

আপনাদের সন্তান, আমার বন্ধু ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়–য়া একটা অসাধারণ সমৃদ্ধ ভাল বই বের করেছেন। এটা হয়তো হাজার হাজার কপি ছাপা হয় নাই। আপনাদের যাদের সাধ্য আছে দেখবেন। তাতে দলিল অনেক আছে। সরকারি তদন্ত কমিটিতে যে সমস্ত কথা লোকে বলে নাই তার চেয়ে বেশি কথা এই বইতে বলা আছে। ‘রামু: সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সংকলন’ এই বইটা আপনারা নিশ্চয় দেখবেন। তাতে অনেক কাহিনী আছে।

আমি আজকে বক্তৃতা সংক্ষিপ্ত করব। আমি বলব যে বিচাররের দাবিটা আমরা তখনই প্রতিষ্ঠিত করতে পারব যখন জানব আক্রমণকারীদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কি। প্রকৃত উদ্দেশ্য আমি এইভাবে সংক্ষেপে বলি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটা তৈরি হওয়ার আগের ইতিহাস দেখেন। পাকিস্তান আমলে আমরা বিভ্রান্তিতে পড়েছিলাম যে মানুষে মানুষে বিভেদের মূল কারণ বুঝি ধর্ম। আমরা পাকিস্তানের অভিজ্ঞতায় প্রমাণ করেছি সেটা আসল কারণ ছিল না। আসল কারণ ছিল মানুষের উপর মানুষের শোষণকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য মানুষকে ধর্ম পরিচয় দিয়ে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা। সেজন্য ব্রিটিশ শাষিত ভারতবর্ষের একটা অংশ পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম করেছিল, আরেকটা অংশ ভারত রাষ্ট্র করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ আমরা গড়েছিলাম একটা মহান আদর্শ নিয়ে — ধর্ম পরিচয় দিয়ে আর কেউ কাউকে শোষণ করতে পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার তিন চার পাঁচ বছরের মধ্যেই আবারও সেই ধর্ম পরিচয় বড় করে তোলার যে রাজনীতি দেশে গড়ে উঠল সেটাই সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয়। পরিতাপের বিষয়।

ছবি: সর্বজন

ছবি: সর্বজন

এটা কি করে সম্ভব হল? মুক্তিযুদ্ধ আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এদেশে আর কোন দিন পাকিস্তানিরা শাসন করবে না। শুধু তাই নয়, এদেশে বাঙ্গালিরাও বাঙ্গালি কি অন্য জাতির লোকদের আর শোষণ করবে না — এটা কি মানুষের আশা ছিল না? অন্তত বেশির ভাগ মানুষের আশা তো তাই ছিল। সে আশা পূরণ হয়নি। যারা মানুষের উপর মানুষের অত্যাচার, মানুষের উপর মানুষের শোষণ এবং শাসনকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে চায় তাদের কোন না কোন ছুতা লাগবে। আমরা সকলেই শ্রমজীবী মানুষ। আমরা সকলেই কৃষক মানুষ। এই পরিচয় যদি বড় হয়ে ওঠে তাহলে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ ভেদটা বড় থাকে না। কিন্তু সেটা বাদ দিয়ে যদি আমি মানুষের মধ্যে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ভেদাভেদটাকে বড় করে রাখতে পারি তাহলে যারা বড় লোক হয়েছে নতুন করে, এদেশ হয়ে যাদের নতুন জমিনদারি হয়েছে, যারা নতুন শিল্পপতি হয়েছে তাদের সুবিধা হয়। তারা পুরানো আমলের পাকিস্তানি রাজনীতিকে আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।

সেজন্য আজকে তারা বলছে, দেশ আজ দুই ভাগে বিভক্ত। আমি বলব দেশ আজ দুই ভাগে বিভক্ত নয়। প্রত্যেক দেশেই কিছু চোর, কিছু ডাকাত, কিছু দুর্বৃত্ত থাকে। তাই কি আপনি বলবেন, দেশ আজ দুই ভাগে বিভক্ত? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন সাহেব — তিনি প্লেবয় টাইপের মানুষ — একবার বলেছিলেন পৃথিবীর মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত। যারা তাজমহল দেখেছে আর যারা তাজমহল দেখে নাই। পৃথিবীতে সব মানুষকে এভাবে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। আপনারা দেখছেন আমার সামনে দিলীপবাবু আছেন। বাংলাদেশে আপনারা কয়েক হাজার দিলীপ পাবেন। কেউ বলবে, বাংলাদেশের মানুষ আজ দুই ভাগে বিভক্ত। যাদের নাম দিলীপ আর যাদের নাম দিলীপ নয়। চাইলে তো এরকম ভাগাভাগি আপনি করতেই পারেন।

এদেশের মানুষ কেউ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, আর কেউ এসলামের পক্ষে এরকম দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে — এটা একটা মিথ্যা প্রচারণা। আমরা সকলেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। এ হিশাবে আমরা সকলেই বাংলাদেশের পক্ষে। কিন্তু ধর্ম হিশাবে আপনার এসলাম ধর্মের পক্ষে হয়েও বাংলাদেশের পক্ষে থাকা যায়, বৌদ্ধধর্মের পক্ষে হয়েও বাংলাদেশের পক্ষে থাকা যায়। এটাই তো ছিল বাংলাদেশের বাণী।

আজ সেটাকে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য তারা বলছে দেশ আজ দুই ভাগে বিভক্ত। কারণ আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার চেষ্টা করছি। কিন্তু যারা যুদ্ধাপরাধ করেছিল তারা কত জন? তারা সংখ্যালঘু ছিল। আজকে রামুতে ব্যাপক মানুষের সাক্ষ্য, সারাদেশে মানুষের প্রতিবাদের ¯্রােত দেখে বোঝা যায়, যারা এই অপরাধ করেছে তারাও স্বীকার করতে পারছে না যে আমরা এই অপরাধ করেছি। তাদের লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে। ছদ্মবেশে এর ছবির সাথে ওর ছবির সাথে নিজের ছবি ছাপিয়ে তাদেরকে প্রমাণ করতে হচ্ছে আসলে এটা আমি বা আমরা করি নাই। এখানেই তাদের পরাজয়। আজ এই জনসভায় আপনি তাকে আহ্বান করছেন না। অর্থাৎ জনগণের বিচারের একটা পদ্ধতি আছে। জনগণের সেই বিচারের পদ্ধতিকে অক্ষুণœ রাখুন।  আমাদের দেশ ঐক্যবদ্ধ থাকবে। দেশ দুই ভাগে বিভক্ত হবে না। আমরা সবাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আছি। আমরা সবাই বাংলাদেশের পক্ষে আছি। কিন্তু যার যার ধর্ম সে সে রাখতেই পারি।

এই বৌদ্ধমন্দির পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণ সেই উদার ঐতিহ্যের একটু হলেও দেখিয়েছে। জানি মনের দাগ অত সহজে যাবে না। নদী মরে গেলেও রেখ রেখে যায়। এই স্মৃতি বহুদিন থাকবে। কিন্তু এই স্মৃতি থেকে আমরা একটাই শিক্ষা নেব — এই ধরনের ঘটনা যেন আর একবার না ঘটে। এটার যেন আবৃত্তি না হয়। সেটা করতে হলে আমাদের — আমি আগেই বলেছিলাম — ৪০ বছর লাগলেও যেমন বিচার করতে হবে, এটা বুঝতে যদি আমাদের ৮০ বছরও লাগে এই বিচার অব্যাহত রাখতে হবে।

আমাদের দেখতে হবে কোন জিনিশটা মানুষকে দুই ভাগে ভাগ করে। আর কোন জিনিশটা সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। আসুন আমরা ঐক্যের পথেই হাঁটি। এই বিভক্তির পথে যারা মানুষকে ধাবিয়ে দেয় তাদেরকে আমরা পরাজিত করি। তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলি।

আমি আপনাদের আর বেশি সময় নেব না। ঢাকা থেকে মহান অতিথি যারা এসছেন তাদের কথা আপনারা শুনুন। আমার জন্মও আপনাদের কক্সবাজার জেলায়। আমার বাড়ি মহেশখালিতে। আমি চাঁটগাইয়াতেও বলতে পারতাম। কিন্তু আমি আমার অতিথি অভ্যাগত বন্ধুদের সৌহার্দ্যরে জন্য বাংলাতেই বললাম। তো অঁনারা বেয়াজ্ঞুনে ভালা থাইক্কন। আসসালামুলাইকুম। নমস্কার।

অনুলিখন: মুহাম্মদ তাসনিম আলম

 

২৩ নবেম্বর ২০১৩, সর্বজন: নবপর্যায় ২৮

ফরহাদ মজহারের বোমা অথবা রেটরিক প্রসঙ্গে

প্রবীণ কবি ও বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার সম্প্রতি একটি টকশোযোগে (একুশে টিভি, ২৮ অক্টোবর রাত) কিছু কথা বলিয়াছেন যাহাতে দেশের বুদ্ধিজীবী–বিশেষ সাংবাদিক–সমাজ আপত্তি জানাইয়াছেন। তিনি নিজেও প্রকারান্তরে স্বীকার করিয়াছেন যাহা তিনি বলিয়াছেন তাহা বলাটা উচিত কাজ হয় নাই। ব্যাখ্যা দিয়াছেন তিনি যাহা বলিয়াছিলেন তাহা নিছক কথার কথা বা রেটরিক। যাহা একজনের কাছে কথার কথা তাহা অন্যের গায়ে ঢিল আকারে পড়িতে পারে–এই সত্যটা উপকথা আকারেও সমাজে বিরাজ করে। তিনি পরোক্ষে হইলেও এই সত্য স্বীকার করিয়াছেন। তাহাতে তিনি সাধুবাদ পাইবেন।

গত ২রা নবেম্বর একটি দৈনিক পত্রিকাযোগে (দৈনিক যুগান্তর) তিনি আমার মতো এক নগণ্য ব্যক্তিকে আক্রমণ করিয়া বসিয়াছেন। অভিযোগ করিয়াছেন আমি তাঁহার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনিয়া তাঁহাকে হত্যা করিতে চাহিয়াছি। তিনি যে উষ্ণ হইয়াছেন তাহাতে আর সন্দেহ কি! আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলিয়া রাখিতেছি আমি তাঁহাকে হত্যা করিতে চাহি না, তাঁহাকে কেহ হত্যা করুক তাহাও চাহি না। প্রার্থনা করি তিনি চিরায়ুষ্মান হউন।

আমি অতীতে যেখানে প্রয়োজন তাঁহার সমালোচনা করিয়াছি। সমালোচনাই করিয়াছি, বোমা মারি নাই। কর্তৃত্বের বল কিম্বা গায়ের জোর ফলাই নাই। ওয়াকেবহাল সকলেই জানেন আমি যুক্তি প্রয়োগ করিয়াছি। আমার সমালোচনাকে তিনি নিছক ‘গালিগালাজ’ বলিতেছেন। আমার সমালোচনা ভুল হইতে পারে। কিন্তু আমি সমালোচনার হাতিয়ারকে কখনোই হাতিয়ারের সমালোচনা দিয়া দায় সারি নাই। ফরহাদ মজহার নিঃসন্দেহে আমার বক্তব্য পছন্দ করেন নাই। কিন্তু একই সাথে সেই বক্তব্যের আলোচনা করা তিনি প্রয়োজনও মনে করেন নাই। আমাকে তিনি হেয় করিয়াছেন।

একাত্তর টিভি আমাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন আগের দিন একুশে টিভির অনুষ্ঠানে ফরহাদ মজহার যাহা বলিয়াছেন তাহার বিষয়ে আমার বক্তব্য কি? আমি বলিয়াছিলাম ফরহাদ মজহার শিশুও নহেন, পাগলও নহেন সুতরাং তিনি যাহা বলিয়াছেন তাহার দায় তাঁহাকেই লইতে হইবে। গণতন্ত্রে বাক-স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার বলিয়া স্বীকৃতি পাইয়াছে। মনে রাখিতে হইবে এই স্বাধীনতা অবাধ বা অসীম নহে। আমার বাক-স্বাধীনতার সীমা অন্য নাগরিকের বাক-স্বাধীনতা হরণ করিবার সুবিধা পর্যন্ত প্রসারিত হইতে পারে না। একালের উদারনৈতিক বা স্বাধীনতা ব্যবসায়ী গণতন্ত্রের সংজ্ঞার মধ্যেই এই সীমার কথা বলা আছে। বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানের ৩৯(২) অনুচ্ছেদের দোহাই দিয়া আমি এই বক্তব্য সমর্থন করিয়াছিলাম।

কথাটা পরিষ্কার করিবার জন্য আরও দুই কথা বলিতে আমি বাধ্য হইয়াছিলাম। যাহাকে বলা হয় ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা’ তাহার কিন্তু কোন সীমা নাই। বাংলাদেশের হাল সংবিধানের ৩৯(১) অনুচ্ছেদ এই প্রস্তাবেরই প্রকাশ। বিপরীত বিচারে দেখা যায়, বাক স্বাধীনতা বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রভৃতি মৌলিক অধিকার নানান সীমার মধ্যে বাঁধা থাকে। এই প্রসঙ্গেই কথা ওঠে বাক-স্বাধীনতার অপব্যবহার বা সীমালঙ্ঘন শুদ্ধ অপর নাগরিকের বিরুদ্ধে কৃত অপরাধ এমন নহে। এই অপরাধ গোটা জাতি বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও সংঘটিত হইতে পারে। ফরহাদ মজহার গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে পটকা (বা ককটেল) মারা পর্যাপ্ত নহে মনে করেন। গণমাধ্যমে হামলা পরিচালনা পাবলিক অর্ডার বা রাষ্ট্রীয় শান্তিভঙ্গের শামিল। ইহার অর্থ রাষ্ট্রদ্রোহিতা বটে। দেশের প্রায় সকল মানুষই তাঁহার এই বক্তব্যের নিন্দা করিয়াছেন। বলিয়াছেন এই বক্তব্য বেপরোয়া, এই বক্তব্য দুর্ভাগ্যজনক। আমিও বলিয়াছি। কারণ অন্যায়কে অন্যায় বলিতেই হইবে। দুর্ভাগ্যের মধ্যে তিনি আমাকেই যাহাকে বলে ‘চিহ্নিত’ করিয়াছেন। হামলার ‘টার্গেট’ করিয়াছেন।

যুগান্তরে প্রকাশিত লেখায় ফরহাদ মজহার বলিতেছেন ‘গণমাধ্যমের সমালোচনা করলে সেটা কিভাবে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হয় সেই পা-িত্য বোঝার ক্ষমতা আমার নাই’। তিনি এখানে সত্য কথা বলেন নাই। গণমাধ্যমের সমালোচনা করিলে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হইবে কেন? কেহ তো সেই কথা বলে নাই। গণমাধ্যম বা গণমাধ্যম কর্মীর উপরে বোমা ছুঁড়িলে দুই ধরনের অন্যায় হয়। ইহাতে যাহাকে মারা হইতেছে তাহার বাঁচিবার অধিকার হরণ হয়। আর দুই নম্বরে ইহাতে ‘নৈরাজ্য’ সৃষ্টি হয়। সমালোচনার হাতিয়ারের জায়গায় ফরহাদ মজহার হাতিয়ারের সমালোচনা প্রয়োগ করিতে বলিয়াছেন। বোমা মারিতে উস্কানি দিয়াছেন। ইহাতেও যদি অপরাধ না হইয়া থাকে তবে আমার কোন বক্তব্য থাকিতে পারে না। তিনি আবারও কথার হেরফের করিতেছেন। মানুষ মাত্রেই ভুল করিতে পারে। তিনি ভুল স্বীকার করিলেই পারেন। ক্ষমা চাহিবার অধিকার তাঁহারও আছে।

কিন্তু একটা প্রশ্ন থাকিয়া যায়। ‘গণমাধ্যম’ কোন পদার্থ? তাহার মালিকানার প্রশ্নটি অবশ্যই অবান্তর নহে। কিন্তু আমরা কথা বলিতেছি গণমাধ্যমের কর্মী ও তাহাদের কর্তব্য লইয়া। যুদ্ধক্ষেত্রেও দূত, সাংবাদিক আর চিকিৎসক অবধ্য। যাহারা তাঁহাদিগকে বধ্য মনে করেন তাহারা সভ্যতার সামান্য নিয়ম লঙ্ঘন করেন। কবি ফরহাদ মজহার যদি সেই ধরণের কাজে উস্কানি না দিয়া থাকেন তবে তাঁহার কোন অপরাধই হয় নাই। কিন্তু কোটি দর্শক যাহা দেখিয়াছেন ও শুনিয়াছেন তাহাতে অপরোক্ষে প্রকাশ হইয়াছে তিনি কয়েকটি গণমাধ্যমকে পরিষ্কার ভাষায় ‘সন্ত্রাসী’ বলিয়াছেন। তাহার ভাষা ছিল বেপরোয়া, দায়িত্বজ্ঞানহীন। এখন তিনি বলিতেছেন, উহা ছিল কথার কথা, রেটরিক।

রেটরিক প্রয়োগের অধিকার তাঁহার যদি থাকে, অন্যের থাকিবে না কেন? তিনি লিখিয়াছেন ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার শাস্তি মৃত্যুদ-’। এই কথাও অর্ধসত্যের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কে না জানে পরাধীন যুগে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বিদেশি দখলদার রাষ্ট্র এক বৎসরের সশ্রম কারাদ- দিয়াছিল। অপরাধ ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’। বলা নিষ্প্রয়োজন রাষ্ট্রদ্রোহিতার শাস্তি নানা প্রকার হইতে পারে। মৃত্যুদ-ও অকল্পনীয় নহে। প্রশ্নটা হইতেছে জবাবদিহিতার। শাস্তির নয়। জবাব পাইবার অধিকার আছে আমাদের। কারণ তিনিই আমাদের হত্যা করিবার প্ররোচনা দিয়াছেন। আমরা দিই নাই। রাষ্ট্র বলিতে রাজনৈতিকভাবে সংঘবদ্ধ ‘জনগোষ্ঠী’– বা আজকালকার ভাষায় ‘জাতি’– বুঝায়। নিঃসন্দেহে এই পা-িত্য বুঝার ক্ষমতা তাঁহার আছে। আর যদি না থাকে তবে তিনি ক্ষমার যোগ্য। কেননা অবুঝ লোকের কোন অপরাধ নাই।

ফরহাদ মজহার যে বিদিশা হইয়াছেন–মানে দিশা হারাইয়াছেন–তাহার আরেক প্রমাণ দেখুন। তিনি আমাকে ‘রাজসাক্ষী’ বলিয়াছেন। ‘রাজসাক্ষী’ কাহাকে বলে? যাহারা একযোগে অপরাধ করে তাহাদের কেহ যদি সহযোগীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়া নিজের অপরাধের দ- মওকুফ করাইয়া লয় তাহাকেই লোকে ‘এপ্রুবার’ বা রাজসাক্ষী বলে। এমনই এতদিন জানিতাম। এখন তিনি শিক্ষা দিতেছেন ‘টেলিভিশন টকশোর বরাতে রাজসাক্ষী’ হওয়া যায়! নাকি তিনি প্রকারান্তরে আমাকেও ‘অপরাধী’ বলিতেছেন!

বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার আমার বাক্য ছাড়াইয়া গিয়াছেন। প্রায় বর্ণবাদী ভাষায় আমাকে আমার ‘মুখভঙ্গির মধ্যে’ আবিষ্কার করিয়াছেন তিনি। আমার সমালোচনাকে বিচার না বলিয়া তিনি রাজসাক্ষীর জবানবন্দী ঠাওরাইয়াছেন। বলিয়াছেন আমি তাঁহাকে ‘গালিগালাজ’ করিয়াছি, শাস্তি দিতে চাহিয়াছি। তাঁহার লেখায় সকলেই পড়িয়াছেন এই কথাগুলি: ‘টিভিতে তার মুখভঙ্গির মধ্যে আমাকে রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক যন্ত্রের দ্বারা শাস্তি দেয়ার জিঘাংসা দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। তার চোখে-মুখে যে হিংস্রতা ও প্রতিহিংসাপরায়ণতা ফুটে উঠেছে তাতে আমি অবাক না হয়ে পারিনি।’

এই কথাগুলি পড়িয়া আমার ধারণা হইয়াছে তিনি আমার বাক্য কানে শোনেন নাই, চোখ ও মুখের ভঙ্গি দেখিয়াছেন মাত্র। এহেন হিতাহিতজ্ঞানশূন্যতা কাহারও জন্য কল্যাণকর নহে।

কবি ফরহাদ মজহারকে আমি চিনি আজ কম করিয়া হইলেও ছত্রিশ বছর হইবে। তাঁহার মনীষা ও কবিত্বের তারিফ আমি করিয়াছি বহুবার। যেখানে প্রয়োজন সমালোচনা করিয়াছি। তিনি কোনদিন জওয়াব দেওয়ার দরকার বোধ করেন নাই। না দিবার অধিকার তাঁহার আছে। কিন্তু তাঁহার রাজনীতির সহিত–বিশেষ করিয়া বর্তমানে তিনি যে রাজনীতির দিকে আগাইতেছেন–তাহার সহিত আমার ভিন্নমত আছে। বিশেষ করিয়া গত ২০০৫ সালে তিনি যখন জে.এম.বি. নামক রাজনৈতিক আন্দোলনের সমর্থনে কিছু লেখা লিখিলেন তখন আমি তাঁহার সংস্রব পরিপূর্ণভাবে ত্যাগ করি। সম্প্রতি তিনি যুদ্ধাপরাধের বিচার লইয়া দেশে যে আন্দোলন চলিতেছে তাহার বিরোধিতা করিলে আমি নিরব থাকাটা আর সমীচীন মনে করি নাই।

এই লেখায় আর নতুন কথা তুলিতে চাহি না। যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে শাহবাগে সমবেত তরুণ-তরুণীদের দাবিকে নস্যাৎ করিয়া তিনি একাধিকবার বলিয়াছেন ইহারা ‘পাবলিক লিঞ্চিং’ চাহিতেছে। অথচ শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ অপরাধীদের বিচারের দাবি ছাড়া আর কোন দাবির মতো দাবিই তোলে নাই। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ফরহাদ মজহার এখন যে অবস্থান নিতেছেন তাহা–সংক্ষেপে বলিতে–বিস্ময়কর। যেন ফুলের শয্যায় বসিয়া দেশটা স্বাধীন হইয়াছে।

মুক্তিযুদ্ধের পর পর প্রকাশিত একটি কবিতার বইয়ের উৎসর্গপত্রে কবি ফরহাদ মজহার লিখিয়াছেলেন, ‘রাখিস মা এ দাসরে মনে/ কেউ কি এমন রক্ত ঢালে!’ আর যাঁহারা এই রক্তপাত করিয়াছিলেন আজ তাঁহাদেরই গাত্ররক্ষার জন্য তিনি ‘ইসলামের নৈতিক ও দার্শনিক আদর্শ’ আবিষ্কার করিতেছেন। এই দুঃখ রাখিবার পাত্র কোথায় পাই!

বাংলাদেশের ত্রিসীমানা হইতে দখলদার পাকিস্তানের শেষ সৈনিকটি যেদিন অপসারিত হইয়াছিল সে দিনই বাংলাদেশ স্বাধীন হইয়াছিল–একথা আমরা একদিন ভাবিয়াছিলাম। আজ স্বীকার করিয়া বলিতে হইবে–আমরা ভুল ভাবিয়াছিলাম। দেশকে সত্য সত্য স্বাধীন করিতে হইলে পাকিস্তানী যুগের বিভেদমূলক ‘কদর্য’ সাম্প্রদায়িক মানসিকতাও অপসারিত করিতে হইবে।

দেখা যাইতেছে দেশ স্বাধীন করার সংগ্রাম আজও শেষ হয় নাই। বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার এখন সাম্প্রদায়িক বিভেদের দার্শনিক আদর্শ প্রচার করিতেছেন। বোমা মারার নৈতিকতাকে তিনি ইসলামের নামে জাহির করিয়া খোদ ইসলামেরই অমর্যাদা করিতেছেন।

ঢাকা
৫ নভেম্বর ২০১৩

 

৫ নভেম্বর ২০১৩, bdnews24.com, মতামত বিশ্লেষণ

রাষ্ট্রচিন্তা: গণতন্ত্র ও ফ্যাসিতন্ত্র

রাষ্ট্রনায়কেরা কিভাবে দেশ শাসন করেন আর কিভাবে তাহাদের শাসন করা উচিত তাহা লইয়া আমি আলোচনা করিয়াছি। সামাজিক অবস্থা ও পদবিচার করিলে স্বীকার করিতে হইবে আমি নিচুপদের ও অধস্তন শ্রেণির লোক। তাই বলিয়া আমার প্রচেষ্টা আশা করি ধৃষ্টতা বলিয়া গণ্য হইবে না। কেননা দেশগ্রামের ছবি আঁকিতে হইলে যাহা করিতে হয় এখানেও তাহাই করিতে হইবে। যাঁহারা পাহাড়পর্বত আর মালভূমির নকশা আঁকেন তাঁহারা নিচু জায়গায় দাঁড়াইয়া থাকেন আর সমতল জমিনের নকশা আঁকিতে হইলে পাহাড়চূড়ায় উঠিয়া যান। একই কারণে সর্বসাধারণের স্বভাব চরিত্র কি বুঝিতে হইলে আপনাকে যাইতে হইবে রাষ্ট্রনায়কের জায়গায় আর রাষ্ট্রনায়কদের স্বভাবচরিত্র বুঝিতে হইলে আপনাকে হইতে হইবে সর্বসাধারণেরই একজন।

— নিকোলো মেকিয়াভেলি

লড়াইয়ের মাঝে এই ধরনের প্রস্তাবের মূল্য কম ধরিয়া লওয়া কিন্তু ভুল কাজ হইবে। এই সব প্রস্তাবের অনুবলে আমরা কতগুলি চিরাচরিত ধ্যানধারণার উচ্ছেদ ঘটাইতে পারি। এইসব ধ্যানধারণার মধ্যে আছে ঐশ্বরিক ক্ষমতা, অলৌকিক প্রতিভা, অক্ষয় কাব্য (‘চিরকেলে বাণী’, ‘কালাম’) এবং মরমিয়া ভাব (‘রাহসিকতা’) ইত্যাদি। এই সমস্ত ধ্যানধারণার বেপরোয়া ব্যবহার ইতিহাসের ঘটনাবলীকে এমনভাবে সাজায় যাহাতে ফ্যাসিতন্ত্রের পথ সুগম হয়। এই মুহূর্তে এই ধরনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ একপ্রকার অসম্ভব হইয়া দাঁড়াইয়াছে।

— বাল্টার বেনিয়ামিন

দিনকয়েক আগে আমি ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আহমদ ছফা’ নাম রাখিয়া একটি নাতিদীর্ঘ নিবন্ধ এই জায়গায় [বিডিনিউজ২৪ডটকম] প্রকাশ করিয়াছিলাম। কেহ কেহ সদয় হইয়া কয়েকটি প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করিয়াছেন। তাই আজ এই অতিরিক্ত নিবন্ধটি লিখিতে হইতেছে। কেহ বলিয়াছেন নিবন্ধটি পড়িয়া তিনি কিছুই বুঝিতে পারেন নাই। আর কেহ বা জানাইয়াছেন এই নিবন্ধে কোন নতুন কথা নাই। কেহ কেহ আহমদ ছফা বিষয়ের নিবন্ধে ফরহাদ মজহারের কবিতা আলোচনা করাটা পছন্দ করেন নাই। এই তিন প্রকারের প্রতিক্রিয়াতেই কিছু না কিছু সত্য আছে।

নিজের লেখার দুর্বলতা প্রথমেই স্বীকার করিতেছি। দ্বিতীয়ত নতুন কথা বলিবার জন্য আমি লিখিতেছি না। জানা কথাও মাঝেমধ্যে সর্বসাধারণের উদ্দেশে প্রচার করিতে হয়। এই জায়গায় আমি দীনহীন নবীন লেখক। তবে নতুন কথা বলার ক্ষমতা আমার বিশেষ নাই। তবু সম্পাদক মহাজনেরা আমাকে কেন জানি নিতান্ত অপত্য স্নেহ করেন বলিয়া তাহাদের প্রশ্রয় পাই। তিন নম্বর কথা আমার মূল বক্তব্য ছিল মহান লেখক আহমদ ছফাকে ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ’ বলা যায় কিনা এই প্রশ্নের সহিত জড়ানো। তিনি সমাজের কোন শ্রেণি হইতে আসিয়াছেন তাহা বড় কথা নহে। অথচ আমি যদি ভুল বুঝিয়া না থাকি ফরহাদ মজহার বলিয়াছেন আরশোলাতুল্য মানুষের ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ’ হইবার অধিকার নাই।

আমার সবিনয় নিবেদন এই যে আহমদ ছফা সেই অধিকার অর্জন করিয়াছিলেন নিজের সাধনায়। শুদ্ধ অধিকার কেন, আমি বলিব তিনি সিদ্ধিও লাভ করিয়াছিলেন। যাহারা অনুগ্রহ করিয়া আমার লেখাটি পাঠ করিয়া সাধুবাদ জানাইয়াছেন তাহাদের কর্জ না হয় শোধ নাই-বা করিলাম।

আজিকার লেখায় আমি অধিক যাইতে চাহিতেছি। আমার প্রস্তাব মহাত্মা আহমদ ছফা যে ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ’ ছিলেন সে সত্যে সন্দেহ রাখা চলে না। তিনি ছিলেন যাহাকে লোকে বলে নয়া গণতান্ত্রিক সেই ধরনের রাষ্ট্রচিন্তাবিদ। ‘নয়া গণতান্ত্রিক’ কথাটা আমি জানিয়া শুনিয়াই এস্তেমাল করিলাম। বর্তমান যুগে গণতন্ত্রের পরম শত্রু ফ্যাসিতন্ত্র। এই ফ্যাসিতন্ত্রবাদীরাও নিজেদের আজিকালি গণতান্ত্রিক বলিতে কসুর করেন না। আর দুনিয়া জুড়িয়া গণতন্ত্র কথাটা এতদিনে তো ধরতাই বুলি হইয়া দাঁড়াইয়াছে। চিনদেশের মহান নেতা মাও জেদং একসময় তাই ত্যক্তবিরক্ত হইয়া ‘নয়া গণতন্ত্র’ কথাটি চালু করিয়াছিলেন। ‘নয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তা’ কথাটি তাই মোটেও আনকোরা কথা নহে।

আমার একটি বক্তব্য ছিল যে আহমদ ছফার সাধনা বুঝিতে হইলে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের সাধনা আলোচনা করাটা অপ্রাসঙ্গিক নহে। আলাউদ্দিন খান যে ধরনের সামাজিক ভূমি হইতে গজাইয়াছিলেন আহমদ ছফাও কমবেশি একই ধরনের সামাজিক জমি হইতে উঠিয়াছিলেন। একজনের জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়া আর অন্যজনের বাড়ি গাছবাড়িয়া। এই মিলটা একান্তই আপতিক! একজনের সাধনা সঙ্গীতে, আরজনের চিন্তার বিষয় জাতি বা রাষ্ট্র– এইটাও ধরিলাম আপতিক। কিন্তু যাহা দুইজনের আকাশেই ধ্রুবতারার জ্যোতির মতন জ্বলিতেছে তাহার নাম ‘গণতন্ত্র’। আলাউদ্দিন খান ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের ধারায় ‘গণতান্ত্রিক মনীষা’ বা– মেকিয়াভেলির কথা ধার করিয়া বলিতে– ‘গণতান্ত্রিক বীরত্ব’ ছড়াইয়া দিয়াছিলেন।

এই সত্যটা আহমদ ছফা জানিতেন। যে বছর তিনি ‘সুরসম্রাটের মৃত্যুস্বপ্ন’ নামক অধ্যায়টি লিখিয়াছিলেন সেই বছরই– মোতাবেক ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৯৮– ‘আচার্য আলাউদ্দিন খান’ নাম রাখিয়া ক্ষীণকায় একটি নিবন্ধও পত্রস্থ করিয়াছিলেন। এই প্রবন্ধটির উল্লেখ না করিয়াই আমি আমার ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আহমদ ছফা’ নিবন্ধটি লিখিয়াছিলাম। কবুল করি ইহাতে আমার গোস্তাকি হইয়াছে। পাঠিকা আশা করি দয়া করিবেন।

আহমদ ছফা লিখিয়াছিলেন, ‘উস্তাদ আলাউদ্দিন খান নামটি পূর্ণতার সাক্ষাৎ প্রতীক।’ সেই পূর্ণতার তিনটি দিক তাঁহার নজরে আসিয়াছে। এক নম্বরে আলাউদ্দিন খান ছিলেন শিল্পী-সঙ্গীতশিল্পী। মহাত্মা ছফা লিখিয়াছেন:

‘আলাউদ্দিন খান সাহেব তাঁর দীর্ঘ জীবনের দুশ্চর তপস্যায় মিয়াঁ তানসেনের ঘরানার সঙ্গীতকে শুধু অধিগতই করেননি, অন্যান্য প্রচলিত ঘরানাগুলোর মর্মবস্তুর সঙ্গে সংশ্লেষ-বিশ্লেষ ঘটিয়ে সঙ্গীতের কান্তিকে অধিকতর উজ্জ্বল এবং ব্যঞ্জনার মধ্যে অধিক দিব্যতা সঞ্চার করে সুরকে এমন দুরধিগম্য উচ্চতায় স্থাপন [করেছেন], যেখানে সুর ব্যক্তিগত অর্জনের সঙ্কীর্ণ সীমারেখা অতিক্রম করে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ার একটা অমোঘ দাবি তুলে ধরল।’

আলাউদ্দিন খানের পূর্ণতার দ্বিতীয় দিক তাঁহার সাধকভাব। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন:

‘নিজে সিদ্ধিলাভ করা এক কথা, কিন্তু নিজের সিদ্ধিকে অন্যের মধ্যে সঞ্চারিত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। সঙ্গীতের ইতিহাসে অনেক অসাধারণ প্রতিভার সন্ধান পাওয়া যায়, যাঁরা সুন্দরের আগুনে নিজেদের নিঃশেষ করতে সক্ষম হয়েছিলেন, কিন্তু নিজের দাহিকাশক্তিকে অন্যের মধ্যে সঞ্চারিত করা তাঁদের সাধ্যসীমার মধ্যে ছিল না। সঙ্গীতে অপরকে দীক্ষিত, যোগ্য এবং পারঙ্গম করে তোলার জন্য বিশেষ চরিত্রশক্তির প্রয়োজন। প্রকৃতির দিক থেকে সাধক না হলে এই চরিত্রশক্তি অর্জন করা অসম্ভব।’

আলাউদ্দিন খানের এই চরিত্রশক্তি কোথা হইতে আসিয়াছিল তাহার একটি সূত্রও আহমদ ছফা উল্লেখ করিয়াছেন। আমরা তাহার আলোচনা করিব পরে। আপাতত এইটুকু বলিলেই চলিবে যে আলাউদ্দিন খানের মধ্যে শিল্পী আর সাধক যুগপৎ এক জায়গায় সমবেত হইয়াছিলেন।

এইখানেই কিন্তু তাঁহার কীর্তির শেষ নহে। আলাউদ্দিন খানের সর্বশেষ কীর্তির পরিচয় দিতে বসিয়া আহমদ ছফা ‘রীতিমত একটি বিপ্লব’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করিয়াছেন। আমরা সবিনয়ে বলিব এই বিপ্লবেরই অপর নাম ‘নয়া গণতন্ত্র’। তো ‘নয়া গণতন্ত্র’ কি বস্তু? ইহা বুঝাইয়া বলিতে হইলে আবারো একটু লম্বাচওড়া উদ্ধৃতি শুনাইতে হয়। আহমদ ছফা বেশ লিখিয়াছেন,

‘আলাউদ্দিন খান সাহেবের আচার্য-জীবনের অভিনবত্ব এইখানে যে, তিনি মাইহারে সর্বপ্রথম সর্বসাধারণের জন্য ধ্রুপদ সঙ্গীতের দুয়ার উন্মুক্ত করে দিলেন। ধ্রুপদ সঙ্গীত প্রসারের ইতিহাসে খান সাহেবের এই সাহসী পদক্ষেপ রীতিমত একটি বিপ্লব বললে অধিক বলা হবে না।’

এইখানে বিপ্লবটি কোথায় সমঝাইতে হইলে ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে হাতেখড়িটা অন্তত প্রয়োজন। আহমদ ছফা অতি সংক্ষেপে তাঁহার সার লিখিয়াছেন:

‘এ [যাবত] ধ্রুপদ সঙ্গীত রাজা-বাদশাহদের দরবারে চর্চিত হয়ে আসছিল। সামন্তপ্রভুদের মর্যাদার স্মারক হিসাবে ধ্রুপদ সঙ্গীত চিহ্নিত হয়ে আসছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই সঙ্গীতের চল একেবারে ছিল না বললেই চলে। এই সঙ্গীতের যাঁরা চর্চা করতেন, তাঁরা নিজেদের ঘরানার মধ্যেই সঙ্গীতচর্চা সীমাবদ্ধ করে রাখতেন। আপন পুত্রকন্যা এবং আত্মীয়স্বজনের বাইরে অন্য কোন সঙ্গীত শিক্ষার্থীকে সঙ্গীত শিক্ষা দিতেন না। অনেক সময় জীবিকার তাগিদে বাধ্য কিংবা তাঁদের পৃষ্ঠপোষক কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে বাইরের লোককে সঙ্গীত শিক্ষা দিলেও সঙ্গীতের বিশুদ্ধ অংশটি আপন ঘরানার লোকদের জন্য চোখের মণির মত সযত্নে গোপন করে রাখতেন। ফলে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বাইরে ধ্রুপদ সঙ্গীত কখনো বিস্তারিত এবং প্রসারিত হতে পারত না।’

ভারতবর্ষের ধ্রুপদী সঙ্গীত যে পরে সারা দুনিয়ায় ছড়াইয়া পড়িয়াছে তাহার পিছনে আলাউদ্দিন খান সাহেবের একক কৃতিত্বের কথা প্রায় সকলেই স্বীকার করিয়াছেন। কিন্তু আরও একটি কৃতিত্বের কাহিনী আহমদ ছফার বিচারে স্বীকৃতি পাইয়াছে। এই দিকটাকেই আমরা বলিয়াছি ‘নয়া গণতান্ত্রিক’। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন,

‘আলাউদ্দিন খান সাহেবের আচার্য জীবনের মহত্তম কীর্তি হল, সামন্ত সংস্কৃতির ভেতরে ওতপ্রোত নিমজ্জিত সঙ্গীতের এই সুন্দর ধারাটিতে কোনরকম নান্দনিক বিচ্যুতি না ঘটিয়ে আধুনিক গণতান্ত্রিক যুগের উপযোগী করে তার নতুন জন্ম সম্ভাবিত করেছিলেন [তিনি]।’

এই কীর্তিটির পিছনে আলাউদ্দিন খান সাহেবের সাধকধর্ম মোটেও সক্রিয় ছিল না এমন কথা বলা আমাদের লক্ষ্য নহে। তবে কিনা বলিব এই কীর্তি ছিল সচরাচর প্রচলিত সাধকধর্মের অধিক। আহমদ ছফা বলিয়াছেন,

‘সুপ্রাচীন ধ্রুপদ সঙ্গীতের একটি বিশেষ ধারাকে আলাউদ্দিন খান সাহেব যখন তাঁর শিষ্য-শিষ্যাদের শিখিয়ে পড়িয়ে লায়েক করে তাদের মাধ্যমে প্রচারিত করতে কৃতসঙ্কল্প হলেন, খান সাহেবকে [তখন] সম্পূর্ণ নতুন একটি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হল।’

এই চ্যালেঞ্জের অবসানও একদিনে হয় নাই। ‘সঙ্গীতের ক্ষেত্রে,’ আহমদ ছফা লিখিতেছেন,

‘বিশেষ একটি গোষ্ঠীর মনোভাব, একচেটিয়াপনার অবসান ঘটানোর জন্য খান সাহেবকে জীবনভর সংগ্রাম করে যেতে হয়েছে।’

আমি যখন ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আহমদ ছফা’ নিবন্ধটি লিখিতে বসিয়াছিলাম তখন– পাঠিকা বিশ্বাস নাও করিতে পারেন– এই আশ্চর্য প্রবন্ধটির কথা আমার মনেও ছিল না। শুধুমাত্র রাজু আলাউদ্দিনের সহিত সাক্ষাৎকার আর ‘সুরসম্রাটের মুত্যুস্বপ্ন’ পাঠ করিয়া আমি লিখিতে বসিয়াছিলাম। যাঁহারা ভালমন্দ প্রতিক্রিয়া পাঠাইয়াছেন তাঁহাদের ঋণ স্বীকারপূর্বক নিবেদন করিতেছি ‘আচার্য আলাউদ্দিন খান’ পাঠ করিয়া বুঝিলাম– নতুন করিয়া বুঝিলাম– দুইজনের মধ্যে মিলটা অনেকান্ত। দুইজনই পূর্ব বাংলার শ্যামল জমিনে জন্মাইয়াছেন– এহ বাহ্য! অন্তরের বাজনায়ও দুইজনের মিল পাওয়া যায়। দুইয়ের চিন্তায় নয়া গণতন্ত্র বা– আহমদ ছফার ভাষায়– ‘আধুনিক গণতন্ত্র’ হাজির।

আহমদ ছফা অকারণে লেখেন নাই, ‘এই আশ্চর্য মানুষটির জীবন এবং তাঁর সাধনার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে একটা পবিত্র আতঙ্কের স্রোত শিরদাঁড়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। মানুষের ইচ্ছাশক্তি মানুষকে কতদূরে নিয়ে যেতে পারে, এ মানুষটির জীবনই তার এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।’

আহমদ ছফার শেষ আশাটি পূর্ণ হয় নাই। তাঁহার আশা ছিল আলাউদ্দিন খানের জীবন উদ্যাপন করিয়া একটি উপন্যাস লিখিবেন। এই উপন্যাসটির কথা স্মরণ করিয়াই তিনি রাজু আলাউদ্দিনকে বলিয়াছিলেন,

‘আমি যদি গোটা জীবন ব্যয় করে একটা উপন্যাস লিখতে পারতাম…।’ আহা, যদি পারিতেন! তিনি বলিয়াছিলেন, ‘তাঁকে নিয়ে উপন্যাস লেখার প্রস্তুতি আমি নিয়ে ফেলেছি। এখন বসলে আমি ১৫ দিনের মধ্যে শেষ করতে পারি।’

এখন আর কি করিতে পারি আমরা! সেই উপন্যাস-দুগ্ধের স্বাদ একটি ক্ষুদ্রকায় নিবন্ধের ঘোলেই মিটাইতে হইবে। আহমদ ছফার নিবন্ধে পাঠ করিতে হইবে এই বাক্য:

বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার প্রত্যন্তবর্তী শিবপুর গ্রামের আলম নামে যে কিশোরটি সঙ্গীত-সুন্দরের আবেদনে ঘরবাড়ি ছেড়ে মা-বাবা, ভাইবোনের মায়া-মমতার বন্ধন ছিন্ন করে নিরুদ্দেশের পথে বেরিয়ে পড়েছিল, সেই তীর্থপথিকের যাত্রার শেষ প্রান্তটিতে আমরা দেখতে পাব এমন এক দিব্যপুরুষের আবির্ভাব যার সর্বাঙ্গে মাখানো রয়েছে আশ্চর্য বিভূতি এবং ললাটদেশ থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে সাফল্যের স্বর্ণরশ্মি।

আহমদ ছফার ‘আচার্য আলাউদ্দিন খান’ নিবন্ধটি তাঁহার জীবনের শেষ ইংরেজি বছর–অর্থাৎ ২০০১ সাল–নাগাদ প্রকাশিত একটি গ্রন্থে সংকলিত হয়। গ্রন্থটির নাম ‘উপলক্ষের লেখা’। সেই গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি একটি ব্যক্তিগত কৈফিয়তও দিয়াছিলেন। পাঠিকা অনুমতি করিবেন আশা করি। তাহা হইতে খানিক তুলিতেছি। এই গ্রন্থের বিষয়বস্তু প্রসঙ্গে আহমদ ছফা জানাইলেন:

‘আমাদের এই দেশে সকলে নিজের ঢাক ছাড়া অন্য কারোও ঢাক বাজায় না। ব্যক্তিজীবনের পূর্ণতা সম্পর্কে আমাদের এই দেশের মানুষের সঠিক ধারণার অভাবের কারণে অনেক সময় তারা মারমুখী হয়ে প্রচার করে– আমি ছাড়া জগতে আর কারও অস্তিত্ব নেই। অন্যান্যদের অস্তিত্ব মনে মনে হত্যা করে একমাত্র আমাকেই জীবিত মানুষ প্রতিপন্ন করার উদগ্র আকাক্ষা আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে একটা পুঁতিগন্ধময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।’

আহমদ ছফা প্রশ্ন করিতেছেন, ‘অন্যের অবস্থান যেখানে নেই সেখানে আমার অবস্থান কোথায়?’’ তিনি মনে করেন, ‘‘আমার অবস্থান তখুনি গৌরবান্বিত প্রমাণিত হয় যখন আমি অকপটে অন্যদের অস্তিত্বের স্বীকৃতি দিতে পারি। অন্যকে গৌরব দিতে গেলে নিজেকে কিছু পরিমাণে হলেও ছোট করতে হয়। নিজেকে ছোট করার ক্ষমতা যার জন্মায়নি তার মধ্যে মহত্ব সন্ধান করা বৃথা।’

আমি দীনহীন মানুষ। ছোট মুখে বড় কথা বলা মানায় না। আমাদের দেশে কেন দুনিয়ার কোন দেশেই তাহা বরদাস্ত করা হয় না। প্রেমে পড়িলে কখনো পঙ্গুরও গিরিলঙ্ঘনের দুঃসাহস হয়। আমারো হয়তো হইয়াছে তাহাই। অপেক্ষাকৃত কম বয়সে আহমদ ছফার সহিত পরিচয় না হইলে হয়তো এই দুঃসাহস আমার হইত না। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের মধ্যে আমার মনে হয় আহমদ ছফা কিছু পরিমাণে হইলেও নিজের চরিত খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন। পাওয়াটা দোষের নহে। কারণ আমরা সকলেই কিছুটা দোসর খুঁজিয়া পাই নিজ নিজ উত্তমর্ণের মধ্যে।

‘আলাউদ্দিন খান সাহেব,’ আহমদ ছফা লক্ষ করেন, ‘একটা বিশেষ বয়স পর্যন্ত তাঁর বড় ভাই ফকির আফতাবউদ্দিনের সাহচর্য লাভ করেছিলেন। ফকির আফতাবউদ্দিন সাহেব একজন বড় মাপের সঙ্গীতশিল্পী এবং স্বভাবের দিক দিয়ে ছিলেন সাধক। খুব সম্ভবত আলাউদ্দিন খান সাধকসুলভ প্রকৃতিটি তাঁর জ্যেষ্ঠভ্রাতার কাছ থেকে পেয়েছিলেন। একই ব্যক্তির মধ্যে সাধক এবং শিল্পীর সমন্বয় ঘটার কারণে প্রতিভাবান সঙ্গীতশিল্পীদের মধ্যে যে সব বদগুণের প্রকাশ ঘটতে দেখা যায় আলাউদ্দিন খানকে সেগুলো স্পর্শও করতে পারেনি।’

আহমদ ছফা যদি অকালে এন্তেকাল না করিতেন তো– আমার বিশ্বাস– একখণ্ড আত্মচরিতও লিখিয়া যাইতেন। আহা, তাহা আর হইবার নহে। এক্ষণে আমাদের তৃপ্ত থাকিতে হইবে তাঁহার চিঠিপত্র আর নানা ক্ষুদ্রবৃহৎ নিবন্ধের ফাঁকফোকরে আত্মগোপন করিয়া থাকা আত্মকথা লইয়া। ‘উপলক্ষের লেখা’ গ্রন্থটির মধ্যে এই রকম একপ্রস্ত আত্মচরিতের খসড়াও আছে। ইহার নাম ‘রোগশয্যায় বিরচিত’।

এই লেখায় তিনি জানাইতেছেন ততদিনে তাঁহার বয়স ৫৩ বছর হইয়াছে। তাই ধরিয়া লইতেছি ইহাও ১৯৯৮ সালের লেখা হইতে পারে। এই লেখার এক অংশে তিনি জানাইতেছেন, ‘এটা আমার আত্মজীবনী না, পারিবারিক কাহিনীর অংশও নয়। তবু এক বিশেষ প্রয়োজনে উদ্বুদ্ধ হয়ে এই কাহিনী আমাকে লিখতে হচ্ছে। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, ‘আমার পিতার নাম মরহুম হেদায়েত আলী ওরফে ধনমিয়া। তিনি নিতান্ত সাধারণ অবস্থা থেকে শ্রম, ধৈর্য, সাহস ও সততার বলে নিজেকে একজন ভূমিবান সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং একটি প্রাচীন পরিবারের সম্মান অনেকাংশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন।’

বাবার ঋণস্বীকার করিতে গিয়া আহমদ ছফা এক জায়গায় কহিতেছেন, ‘যদিও লেখাপড়া করার বিশেষ সুযোগ তাঁর ঘটেনি, তথাপি তিনি অত্যন্ত বিদ্যোৎসাহী মানুষ ছিলেন। তিনি নিজের জমিতে মসজিদ এবং মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। যতদিন বেঁচে ছিলেন একহাতে সেই প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যয়ভার বহন করেছেন। তিনি আমাদের অঞ্চলে তাঁর বন্ধুদের নিয়ে যে প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, আমি সে বিদ্যালয়ের তৃতীয় ব্যাচের ছাত্র।’

খানিকক্ষণ পরে আবার তিনি পিতৃপ্রসঙ্গে ফিরিয়া বলিলেন:

‘আমার পিতার কাছে আমি আরো একটা বিশেষ কারণে ঋণী। আমাদের এলাকায় কমিউনিস্ট পার্টির কর্মতৎপরতা শুরু হলে তিনি ঝুঁকি নিয়ে আমাকে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের সঙ্গে কাজ করতে উৎসাহিত করতেন। দূরে সভা হলে আমার হেঁটে যেতে কষ্ট হত। তখন বাস রিকশা ছিল না। তিনি অনেক সময় [আমাকে] ঘাড়ে করে সভাস্থানে পৌঁছে দিয়ে আসতেন। আমার দুই পাঁচ মিনিট বক্তৃতা শোনার জন্য তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতেন। সভা শেষ হলে সঙ্গে করে নিয়ে আসতেন। হাঁটতে অসুবিধে হলে ঘাড়ে করে তুলে নিতে হত।’

একটা কথা পরিষ্কার। আহমদ ছফার রাষ্ট্রচিন্তার গোড়ায় পিতাজির একটা ঋণ ছিলই। এই ঋণ কেহ শোধ করার জন্য করে না। আহমদ ছফা তাহা শোধ করিয়াছিলেন জেল খাটিয়া। তিনি লিখিয়াছেন, ‘এই সময়ে আমাদের পরিবারে আরো একটা বিপর্যয় ঘটে যায়। পুকুরের পেছনের ঘাটে পা ফসকে গিয়ে [তিনি] সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যান এবং পঙ্গু অবস্থাতেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। সেই সময়ে আমি জেলে ছিলাম।’

এইবার ভাইয়ের ঋণ প্রসঙ্গ। আহমদ ছফার একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সৎভাই ছিলেন। তিনি ছিলেন শারীরিক কারণে রাতকানা। রাতকানা হওয়াই, দুর্ভাগ্যের মধ্যে, উঁহার একমাত্র দোষ ছিল না। তিনি এমনিতেও ছিলেন একটি আমড়া কাঠের ঢেঁকি বিশেষ। আহমদ ছফার নিজের কথায় বলি, ‘আমার অপদার্থ ভাইটির অনেক দোষ ছিল। ব্যবসা করলে গুনাহগারি দিতেন, মামলা করলে হারতেন, কিন্তু একটা জায়গায় অন্তরের বিশ্বাস ধ্রুব-নক্ষত্রের মত স্থির ছিল।’

কি সেই বিশ্বাস? আহমদ ছফা বয়ান করিতেছেন, ‘কি কারণে জানিনে তিনি বিশ্বাস করতেন আমি একজন বাঘের মত মানুষ। আমি তার অবর্তমানে পরিবারের সম্মান রক্ষা করব, ছেলেমেয়েদের মানুষ করব। মজার কথা হল তিনি অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করতেন এসব অলৌকিক কাণ্ড ঘটাবার ক্ষমতা আমার আছে। আমার বোকাসোকা ভাইটির মৃত্যুকালীন বিশ্বাসের সম্মোহনী শক্তিতে আমি অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম।’ আহা! ভাই বলে একটা কথা বাংলা ভাষায়ও আছে। ফকির আফতাবউদ্দিন না হোন, তবুও ভাই তো!

‘ছোটবেলা থেকেই,‘ আহমদ ছফা আরো জানাইতেছেন, ‘আমি অল্পস্বল্প লেখালেখি করতাম। এইজন্য পাড়ার মানুষ আমাকে ঠাট্টা করত, ভ্যাঙ্গাত। আমার ভাইটি তাদের সঙ্গে মারামারি করত এবং অনেক সময় নিজে জখম হত।’

ভ্রাতৃচরিত্র বিশদ করিবার ছলে আহমদ ছফা নিজের জীবনসাধনার গোড়ায় হাত দিয়েছেন এইভাবে:

‘সন্ধ্যা অন্ধতার কারণে বেশিদূর লেখাপড়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তিনি পদ্মাবতী, শহীদে কারবালা, সয়ফুল মুল্লুক বদিউজ্জামানের নির্বাচিত অংশ মুখস্থ গান করে পড়তেন। আমাদের চট্টগ্রামের বিরাট একটা অংশ মনে করত ‘আলাওল’ শব্দের অর্থ কবি। কেউ কবিতা লিখতে চেষ্টা করলে লোকে ঠাট্টা করে বলত অমুকের ছাওয়াল আলাওল বনার চেষ্টা করছে। আমার বড় ভাই মনে করতেন আমি একজন সত্যিকারের আলাওল। যে সব লোক আলাওল হয়, তারা সামান্য নয়, একেকজন নবী-পয়গম্বরের মত মানুষ।’

আমরা জানি– আশা করি আহমদ ছফাও এখানে আমাদের দলভুক্ত– আমাদের যুগে আর কোন নবী বা পয়গম্বর জন্মাইবেন না। এসলাম ধর্মের প্রবর্তক শেষ নবী হজরত মোহাম্মদের পবিত্র নামের কাছে আমরা আর কিছু না হৌক অন্তত এই একটি কারণেই কৃতজ্ঞ থাকিতে পারি। তিনি জানাইয়াছেন তাঁহার পরে আর কোন নবী বা পয়গম্বর আসিবেন না।

মানবজাতির শৈশবদোষ কাটিয়া গিয়াছে। আলহামদুলিল্লাহ! আহমদ ছফার সাধনা বিফলে যায় নাই। তাঁহার ভ্রাতার মৃত্যুকালীন বিশ্বাসও ব্যর্থ হয় নাই। আমাদের দেশে আহমদ ছফার তুলনা দিবার মতন দ্বিতীয় কোন মানুষ আজও পাওয়া যাইতেছে না।

আমার ক্ষমতায় নাই আহমদ ছফার যোগ্য প্রাপ্য প্রশংসা লিখি। তাই গঙ্গাজলেই এই গঙ্গাপুজার আয়োজন। আহমদ ছফা স্বয়ং লিখিয়াছিলেন, ‘মানুষ পর্বতও নয়, সমুদ্রও নয়। তথাপি জন্ম এবং মৃত্যুর সীমানা দিয়ে ঢাকা কোন কোন মানুষের জীবনের সাধনা থেকে [এমন] অমৃতলহরী এমন উচ্ছ্বসিত ধারা উচ্ছ্রিত হতে থাকে, যার স্পর্শে জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভগ্নাংশগুলো অনন্ত সময়ের দোলায় দোলায়িত হয়। সে ধরনের মানুষদের সম্পর্কে মন্তব্য করায় অতিশয়োক্তি স্পষ্টতই প্রশ্রয় পেয়ে যায়।’

কিন্তু আমার জ্ঞান যতদূর যায় দেখিতে পাই আহমদ ছফা সম্পর্কে আজ পর্যন্ত কাহারও কোন উক্তিই অতিশয়োক্তি প্রমাণিত হয় নাই।

আমি বলিতেছিলাম আহমদ ছফার সকল চিন্তার, সকল শিল্পের, সকল সাধনার মূলে ছিল তাঁহার রাষ্ট্রচিন্তা। অবশ্য রাষ্ট্র বলিতে নিছক রাষ্ট্রযন্ত্র বুঝিলে চলিবে না, রাষ্ট্রের অন্তরও বুঝিতে হইবে। রাষ্ট্রের অন্তর কি বস্তু? এই প্রশ্নের উত্তর আহমদ ছফা দিয়াছেন– সর্বসাধারণই রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রাণ, তাহার অন্তর। ইহার সহিত আহমদ ছফার বর্ণিত আলাউদ্দিন খানের স্বপ্নের মিল আছে। আহমদ ছফা বিবরণটা এইভাবে লিখিয়াছেন:

‘অপরাধ বোধটুকু কাটিয়ে ওঠার জন্য খান সাহেব অপেক্ষাকৃত উচ্চকণ্ঠে মদিনা বেগমকে বললেন, শুন আজ খোয়াবে বড়দার লগে দেহা হইল। তাইনে আমারে কইলেন, আলম অহন তোমার আসল সঙ্গীত শিক্ষার সময় অইছে। আমি কইলাম, বড়দা একটু বুঝাইয়া কন। বড়দা হাতের সারেঙ্গিখানা ঘুরাইয়া এমন এক সুর বাজাইলেন, সে রকম সুর আমি কুনোদিন কোথাও শুনি নাই। শরীর মন একেবারে ঠাণ্ডা অইয়া জুড়াইয়া যায়। আমি কইলাম, বড়দা এইটা কোন রাগ বাজাইলেন। বড়দায় কইল, এই রাগের নাম নাই। সঙ্গীত তো মহাসাগর। যে মাঝি যতদূর নাও লইয়া গেছে, একস্থানে নাও লাগাইয়া থুইছে। তানসেনের সেই কথাটা একবার মনে কইর‌্যা দেখ, সঙ্গীত এমন অমৃত সাগর, কোন মানুষ সেই সমুদ্রে পাড়ি দিবে, কেমন কইর‌্যা, স্বয়ং দেবী সরস্বতী বুকের কাছে তানপুরাখান ধইরা রাখছেন। তাইনের ভয়, হাতে তানপুরাখান না থাকলে তাইনে রসের সমুদ্রে ভাইস্যা যাইবেন। খান সাহেব বললেন, বড়দা আসল কথা কইছেন। যেই জিনিসটা বাজাইলেন, আমারে শিখাইয়া দেন, একটু দাঁড়ান আমি যন্তরখানা নিয়া আসি। বড়দা কইলেন, আলম তামাম জীবন তো বস্তু বাজাইলি এইবার অন্তরখানা বাজা। আমি বললাম, বড়দা কেমনে অন্তর বাজাইতে অয়, শিখায়া দেন। বড়দা কইলেন, আচ্ছা।’

আহমদ ছফার এই উপলব্ধির সহিত আধুনিক অথবা নয়া গণতন্ত্রবাদের প্রথম গুরু পুরানা জমানার ইতালিদেশের রাষ্ট্রচিন্তাবিদ নিকোলো মেকিয়াভেলির বক্তব্যের মিলও আমি ষোল আনা খুঁজিয়া পাইতেছি। মেকিয়াভেলি দুইটা জিনিশের উপর সমান গুরুত্ব আরোপ করিতেন। এক নম্বরে থাকা চাই রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রনায়ক। দুই নম্বরে চাই সক্রিয় জাতীয় সমাজ বা সর্বসাধারণ। তাঁহার বিখ্যাত বইটির নাম ‘রাষ্ট্রনায়ক’ হইলেও সেই বইয়ের পাতায় পাতায় তিনি আহাজারি করিতেছেন ইতালির জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষা ও গৌরব– অর্থাৎ হারানো সম্মান– পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বজনসাধারণকে রাজনীতিতে টানিয়া আনিতে হইবে। রাষ্ট্রনায়কের নিকট দাবি জানাইতেছেন অভিজাত বা সামন্তপ্রভুদের উপর ভর না করিয়া জনসাধারণের উপর নির্ভর করিতে হইবে।

একথা মিথ্যা নহে যে বিংশ শতাব্দীর ইতালিতে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা আন্তনিয়ো গ্রামসি মেকিয়াভেলির লেখা পড়িয়া এই সত্য পুনরাবিষ্কার করিয়াছিলেন। মেকিয়াভেলিকে তিনি তাই ‘সময়ের আগে জন্মানো বিপ্লবী’ বা ‘ইঁচড়ে পাকা জাকোবাঁ’ উপাধি দিয়াছিলেন। গ্রামসির পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া কেহ যদি আহমদ ছফাকেও ‘সময়ের আগে জন্মানো নয়া গণতন্ত্রবাদী’ বলেন আপত্তি করা যাইবে না।

রাষ্ট্র কিংবা রাষ্ট্রনায়ক বলিতে কি বুঝায় তাহার সামান্য ইশারা আমরা ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আহমদ ছফা’ নিবন্ধে খানিক দিয়াছি। এখানে শুদ্ধ জনসাধারণ বলিতে আহমদ ছফা কি বুঝিতেন তাহার একটি মাত্র সাক্ষ্য হাজির করি। ১৯৭১ সালের গোড়ার দিকে যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করিল তখন এই দেশের হাজার হাজার নহে, লাখ লাখ মানুষ হয় অস্ত্র হাতে প্রতিরোধ সংগ্রামে জড়াইয়া পড়ে, নয় এক কাপড়ে দেশ ছাড়িয়া যায়। ইংরেজি ১৯৭২ সালের গোড়ায় প্রকাশিত একটি ছোটগল্পে আহমদ ছফা তাহার বিবরণ কিছু পরিমাণ হইলেও দিয়াছেন। গল্পটির নাম ‘পাথেয়’। গল্পটার শুরু এইভাবে।

‘মানুষের স্রোতটা এঁকেবেঁকে আলপথ ধরে, বোরো ক্ষেতের উপর দিয়ে, ঝোপঝাড়ের ভিতর দিয়ে, চৌদ্দপুরুষের বাস্তুভিটের মায়া কাটিয়ে শিকারিতাড়িত একপাল ভীতসন্ত্রস্ত পশুর মতো পালিয়ে আসছে। যতই সামনে যায় সংখ্যা বাড়ে। একটু জিরোয় মাঝেমধ্যে। জিরোয় না, আত্মীয়স্বজন, মাবাপ, ছেলেমেয়ে কে এলো, কে এলো না, কে জন্মের মতো গেলো ভাবতে চেষ্টা করে। গুলিগোলার আওয়াজ আর আত্মীয়স্বজনের টাটকা লাল রক্তের স্মৃতি আবার তাড়া করে। মানুষগুলো আবার হাঁটে–সোজা পথে নয়। বাঁকা চোরা ঘুপচি ঘাপচি জংলা পথ বেছে নেয়। প্রাণের মায়া বড়ো মায়া।

পাকিস্তানি বিমান হইতে বোমা ফেলা হইতেছে, গুলিবর্ষণ চলিতেছে। আর শরণার্থীর দল পথের মধ্যে দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া দেখিতেছে।

সত্যি সত্যি চারটি এরোপ্লেন দেখা গেলো। প্রথমে চারটি সাদা বিন্দুর মতো দেখাচ্ছিলো। নীচের দিকে নামলে সমস্ত গতরটা দেখা গেলো। বোঁ বোঁ চক্কর দিয়ে ঘুরছে। প্যাট প্যাট করে মেশিনগানের গুলি ফুটছে। একবার ওপরে উঠছে আবার শিকারি বাজের মতো ছোঁ মেরে নিচে নামছে। মাঝে মাঝে দ্রƒম দ্রƒম শব্দ হচ্ছে–ওগুলো বোমা। আতঙ্কিত মানুষগুলো আবার পা চালিয়ে দিল। আকাশ থেকে মৃত্যু ছুঁড়ে দিলো পাকিস্তানি সৈন্য। বেশি দূর যেতে হল না’।

এই মানুষগুলো কে? কে তাঁহারা? আহমদ ছফা লিখিতেছেন:

‘যে সমস্ত মানুষ জন্মের জন্য দায়ী নয়– অথবা রাজনীতির জন্য দায়ী নয়– অর্থাৎ যুগ যুগ ধরে মুসলমান এবং দেশের হালচাল নিয়ে মাথা ঘামায়নি, মাটি– নরম জলে ভেজা বাংলাদেশের মাটি– গাছের মতো আঁকড়ে ছিল তারাও আশপাশের গ্রামগুলো থেকে গরুবাছুর ধানচাল, কাঁথাবালিশ, হাতের কাছে যা পেয়েছে নিয়ে দলে দলে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বাসাভাঙ্গা পাখীর মত বেরিয়ে, বিল মাড়িয়ে রেলের লাইনের দিকে ছুটে আসছে।

আরেক জায়গায় পড়ি।

‘মানুষগুলো সামনে যাচ্ছে। দেশগেরামের স্মৃতিচিহ্ন অন্তর থেকে মুছে ফেলেছে, জন্মভূমির ছবি দৃষ্টি থেকে মুছে ফেলেছে। চারদিকে মৃত্যু জাল পেতেছে। তারই মধ্য দিয়ে তারা হাঁটছে। কান পাতলে শোনে কামানের গর্জন। চোখ মেললে আগুনের শিখা দাউ দাউ নাচে, আত্মীয় স্বজনের রক্ত লাল হয়ে জেগে থাকে। তবু প্রাণের দায়। মানুষগুলো হাঁটছে। চারদিক থেকে বৃত্তাকারে লোহার সাঁড়াশির মতো ভয়ঙ্কর মৃত্যু, করুণ পাইকারী মৃত্যু দ্রুত তাদের ঘিরে ফেলছে। তাই তারা যাচ্ছে, ভিটেমাটি ছেড়ে, দেশগেরাম ছেড়ে, মাতৃভূমির আঁচল ছেড়ে, নাড়িকাটা ভূমি ছেড়ে। জীবন ভারী সুন্দর। বড়ো মধুর এই বেঁচে থাকা। কোথায় জীবনের উপর মেলে দেয়া সে শান্ত সুন্দর ছায়া।’

আরো একটু। ‘দুঃখের কথা কয়ে লাভ নেই, কষ্টের কথা বয়ান করে লাভ নেই, চৌদ্দপুরুষের ভিটেমাটির জন্য চোখের জল ফেলে কি হবে। সব তো গেছে। এখন প্রাণ নিয়ে চলো। মানুষগুলো পা চালায়। কেউ কাউকে তাড়া দেয় না। কোথায় যাবে কোন পথ দিয়ে যাবে কারো কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। শুধু জানে বর্ডার পেরিয়ে আগরতলায় ঢুকতে হবে। তারপরে কি হবে, কি হবে তারপরে কেউ কিছু জানে না। সব অদৃষ্ট, অদৃষ্টের ফের।’

কেহ যদি বলেন আহমদ ছফা কোন কিসিমের রাষ্ট্রচিন্তাবিদ বুঝিতে পারিলাম না, তাহাকে বলিব, মিনতি করিয়া বলিব নিজের মুখেই ঝাল খাইয়া দেখিবেন। পরের কথায় কান দিবার পরিণতি সব সময় ভাল হয় না।

যাঁহারা মনে করেন ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ’ কি ‘তত্ত্ববিদ’ কি– খোদার কসম– ‘কবি’ হইতে হইলে মুখে ইংরেজি ভাষায় যাহাকে বলে সোনার চামচ ও রুপার চামচ লইয়া জন্মাইতে হইবে তাঁহারা অভিজাত শ্রেণির বা উচ্চবর্ণের মানুষ। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান সাহেবকে যে সমস্ত গোষ্ঠীর রক্ষণশীল মনোভাব বা একচেটিয়া ব্যবসায়ের অবসান ঘটাইবার জন্য জীবনভর সংগ্রাম করিতে হইয়াছিল ইঁহারাও দেশকালের ভেদটা তুচ্ছ করিলে সেই শ্রেণির বা গোষ্ঠীরই সদস্য।

যে সমস্ত সমাজে বর্ণবিভাজন, জাতিবিদ্বেষ কিংবা শ্রেণিভেদ অদ্যাবধি বিরাজমান সেই সকল সমাজে আমরা যতদূর জানি রাষ্ট্রক্ষমতা আজও অভিজাত শ্রেণি, পুণ্যবান পুরোহিত কিংবা উচ্চবর্ণের হাতে আছে। শুদ্ধ রাষ্ট্রক্ষমতায় নহে রাষ্ট্রচিন্তায়ও তাঁহারা একচেটিয়া অধিকার হাতছাড়া করিতে চাহেন না। আভিজাত্যের বড়াই কখনো ধনদৌলতের রূপান্তর বিশেষ। কখনো তাহা মেধা প্রতিভা ও মনীষার পাটাতনে দাঁড়ায়। আমাদের দেশেও এই নতুন আভিজাত্য দেখা দিয়াছে। কোথাও বা নবার্জিত ধনদৌলতের বড়াই আকারে, কোথাও মনীষা প্রতিভা ও মেধার বড়াই আকারে তাহার প্রকাশ দেখা যায়। আহমদ ছফার মতন সর্বসাধারণের সন্তানকে ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ’ বলিলে ইঁহাদের গাত্রদাহ হইবে–তাহাতে বিস্ময়ের কি! কাহিনীটা একটু জায়গা করিয়া বলিতে হইতেছে।

গত ২৮ জুলাই ২০১৩ তারিখ ছিল মহাত্মা আহমদ ছফার ত্রয়োদশ মৃত্যুদিবস। ঐ দিন আমি বহুল প্রচারিত একটি বাংলা দৈনিকে ‘আহমদ ছফার বাংলাদেশ’ নামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ
করি। পরের সপ্তাহে– মানে ৫ আগস্ট– আরেকটি প্রবন্ধ ছাপাই একই পত্রিকায়। নাম রাখি ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংকট: আওয়ামী লীগ পর্ব’। দুই লেখাতেই আমি ছফার রাষ্ট্রচিন্তার পরিচয় যতদূর সম্ভব তুলিয়া ধরি। ইহার পরদিন একটি অনলাইন পত্রিকায় এদেশের স্বনামধন্য কবি ও চিন্তাব্যবসায়ী ফরহাদ মজহার একটি কবিতায় লেখেন, ‘জানালায় উড়ে বসছে আরশোলা, সেও আজ রাষ্ট্রতত্ত্ববিদ’।

ফরহাদ মজহারের এই ব্যবহারে আমি অবাক হই নাই। তাহার পর আমি আরো দুই নিবন্ধ লিখিতে সমর্থ হই। ১৯ আগস্ট লিখি ‘বাংলাদেশের নিয়তি’, আর ২৯ আগস্ট ‘আহমদ ছফার রাষ্ট্রচিন্তা’। শেষমেশ লিখি ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আহমদ ছফা’। আরেকটু পর ‘নতুন জাতির জন্ম’। ইহাদের প্রথমটি ২ সেপ্টেম্বর অনলাইনে স্থান পায় আর শেষেরটি যায় ৮ সেপ্টেম্বর।

এই তালিকাটি দিয়াছি তাঁহাদের জন্যই যাঁহারা জানিতে চাহেন কেন আমি ফরহাদ মজহারের কবিতায় আক্রান্ত চরিত্র বা ব্যক্তির সহিত আহমদ ছফার মিল আবিষ্কার করিয়াছি। কবিতাকার বা কথাশিল্পীর সুবিধা এই যে তিনি আকারে ইঙ্গিতে আঘাত হানিতে পারেন। কিন্তু অন্ধ হইলে তো প্রলয় বন্ধ থাকিবে না। সালমান রুশদি নামক প্রখ্যাত উপন্যাস ব্যবসায়ী কি কাল্পনিক নাম ব্যবহার করিয়া দায়মুক্ত হইতে পারিয়াছেন?

ফরহাদ মজহারের কবিতাটি কেবল আহমদ ছফার উদ্দেশে রচিত তাহা আমার বক্তব্য নহে। এই কবিতার ইঙ্গিত যদি আমি ভুল না বুঝিয়া থাকি তবে তাহা এই যে সমাজের নিচুশ্রেণির বা নিচুতলার মানুষের পক্ষে রাষ্ট্রচিন্তা বেমানান। এই কবিতার এক জায়গায় তিনি যেমন কহিয়াছেন, ‘জানালায় উড়ে বসছে আরশোলা, সেও আজ রাষ্ট্রচিন্তাবিদ’, তেমনি আরেক জায়গায়– খানিক আগাইয়া– জিজ্ঞাসিয়াছেন ‘চামচিকা তত্ত্ববিদ?’ অনেক রূপান্তর, হরেক মেটাফর তিনি এস্তেমাল করিয়াছেন। মানুষ যাহাদিগকে ‘ইতর প্রাণী’ বলিয়া অবজ্ঞা করে তিনি তাহাদের স্থান দিয়াছেন ঘৃণার ভাষায়।

ঘৃণা মানুষকে কোথায় লইয়া যায় তাহার হিশাব করা মুশকিল। জার্মানদেশের পুরানা তত্ত্ববিদ হেগেল বলিতেন আথেনা ওরফে মিনার্বাদেবির পেঁচা কেবল সন্ধ্যারাতেই উড়াল দিয়া থাকে অর্থাৎ ইতিহাসের ঘটনা ঘটিয়া যাইবার পর মাত্র তাহার চৈতন্যোদয় হয়। গ্রিক পুরাণে অন্ধ পুরুষ তেইরেসিয়াস ত্রিকালদর্শী বটে। চামচিকা বা বাদুড়ও রাত্রেই কেবল দেখে। অথচ ফরহাদ মজহার বেমক্কা লিখিয়াছেন:

‘চামচিকা তত্ত্ববিদ? কী দোষে যে তারা দিনে কিছুই দেখে না
তবুও তাদের ধার্য অন্ধকারে উড়বার বিশিষ্ট সময়।’

আমাদের দেশের প্রধান ভাষা বাংলা। এই ভাষায় ‘কুত্তার বাচ্চা’ কথাটা একটা গালি আর ‘বাঘের বাচ্চা’ পদটি বাহবা বাহবা বলিবার পর বলা হয়। ফরহাদ মজহারও যে শ্রেণির চরিত্রদের পছন্দ করেন না তাহাদের স্থলে বলিয়াছেন ‘নেড়িকুত্তা’ আর যে চরিত্র তাঁহার আপনকার অহম বৈ নহে তাহাকে বলিয়াছেন ‘বাঘের বাচ্চা’। তিনি লিখিয়াছেন, ‘আমি শুধু লিখে যাব বাঘের বাচ্চার মতো জিহ্বা হ্রস্ব করে/ দুধে তৈরী দাঁত গুলো গুটিয়ে …’।

নিজেকে ‘বাঘের বাচ্চা’ আর অপরকে ‘নেড়িকুত্তা’ বলার মধ্যে শুদ্ধ পুরানা কথার পুনরাবৃত্তিই আছে বলিলে সব বলা হইবে না। এই অলঙ্কারের মধ্যে যে চিন্তার বৈভব প্রকাশ পাইতেছে তাহা কিছু পরিমাণে নতুন তো বটেই। অভিজাত শ্রেণি চিরকালই আভিজাত্যের বড়াই করিয়াছে। কিন্তু যে যুগে অভিজাত শ্রেণির রাষ্ট্রক্ষমতা নড়বড়ে, যেখানে তাহাকে নতুন শাসকশ্রেণির হাতে ক্ষমতার বিশেষ অঙ্গটি ছাড়িয়া দিতে হয় সে যুগে আসিয়াও যখন সে সেই পুরানা অভিজাত্যের গর্বই করে তখন তাহা বিশেষ ব্যঙ্গের রূপ গ্রহণ করে।

বুর্জোয়াশ্রেণির যুগে সামন্ত প্রভুর মতন ক্ষমতাবান হওয়ার ইচ্ছাকেই এয়ুরোপিয়া রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে ‘ফ্যাসিতন্ত্র’ বলা হইয়াছে। ইতালিতে মুসোলিনির দলের নাম আর জার্মানিতে হিটলারের দলের নাম ভিন্ন। কিন্তু তাহাদের অভিন্ন চিন্তাকেই আমরা এতদিনে ‘ফ্যাসিতন্ত্র’ বা ‘ফ্যাসিবাদ’ বলিয়া চিনিতেছি। কথাটা নিছক গালি নহে, একটা ছকের বিবরণ মাত্র। এতদিনে তাহা যদি গালির পর্যায়ে উন্নীত হইয়া থাকে তাহার জন্য আমরা দায়ী নহি।

ফরহাদ মজহারের আলোচ্য কবিতার ভাষা যে আপাদমস্তক ফ্যাসিতন্ত্রের বার্তা বহন করিতেছে তাহাতে কাহারও সংশয় থাকিলে অনুরোধ করিব শুদ্ধমাত্র শেষ অনুচ্ছেদটি পড়িবেন। তিনি এলান করিতেছেন:

‘অক্ষয় আমার কাব্য শহরের জঙ্গলে শেষ রাত্রে অক্ষয় আহ্বান
জানাবেন যিনি তাঁর পাগড়ি আলোকপ্রাপ্ত জোৎস্নার মুক্তায়
শিবানির স্বামী তিনি আল্লার মোয়াজ্জিন এ কালাম ভোরের আগেই
কোন রক্তপাত ছাড়া তাঁকেই দাখিল করব, ইনশাল্লাহ, তাঁরই উসিলায়।’

নিজের কবিতাকে অক্ষয় মনে করিতে যে কোন কবিই পারেন। তাহা লৌকিক। তাহাতে দোষের বিষয় নাই। কিন্তু তাহার সহিত যখন অলৌকিক মাজেজা বা ‘তন্ত্র’ আসিয়া যুক্ত হয় তখন ফ্যাসিতন্ত্র সরব হইয়া উঠে। কথাগুলি আমার রচিত নহে। বাল্টার বেনিয়ামিন নামক বিখ্যাত তত্ত্ববিদ কথাটা এইভাবে বলিয়াছিলেন। আমি জার্মান মূলের বাংলা ভাবানুবাদ দিতেছি।

বেনিয়ামিন বলিতেছেন সমাজের গোড়া বা উৎপাদন প্রণালিটা যত দ্রুত বদলায় আগা বা ধ্যানধারণার জগতটা তত দ্রুত বদলাইতে পারে না। ইংরেজি বিংশ শতাব্দীর চতুর্থ দশকে লিখিতে বসিয়া তিনি সময়ের ঢেউ গুনিতেছিলেন। তাঁহার গণনায় দেখা যায় ধ্যানধারণার জগৎ গোড়াকার ঘটনার অন্তত অর্ধশতাব্দী পিছনে পড়িয়া রহিয়াছে। কিন্তু বেনিয়ামিনের দাবি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের তত্ত্ববিদদের কয়েকটি বিষয়ের খবর আগাম রাখিতে হইবে। যেমন গণতন্ত্রের দাবি সর্বজনীন হওয়ায় শিল্পকলার ক্ষেত্রেও কয়েকটি প্রচলিত ধারণা প্রশ্নের মুখামুখি হইতেছে।

বেনিয়ামিন চারিটি প্রচলিত ধারণার কথা বলিয়াছেন। ইহাদের মধ্যে পড়িতেছে ‘ঐশ্বরিক ক্ষমতা’ ও ‘অলৌকিক প্রতিভা’ আর ‘অক্ষয় কাব্য’ বা ‘চিরকেলে বাণী’ ওরফে ‘কালাম’ এবং (চোখের মণির মত সযত্নে গোপন রাখা) ‘মরমি রহস্য’। বেনিয়ামিনের মতে এই চিরাচরিত ধ্যানধারণাগুলির বেপরোয়া ব্যবহার ইতিহাসের ঘটনাবলিকে এমনভাবে সাজায় যাহাতে ফ্যাসিতন্ত্রের পথ পরিষ্কার হইতে থাকে। ইহার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার গুরুত্ব কম করিয়া দেখার কোন উপায় নাই।

ফরহাদ মজহারের এই ঘোষণাপত্রের মধ্যে আমি এই পুরাতন, পরিত্যক্ত ধ্যানধারণার বেপরোয়া ব্যবহার দেখিয়া স্বভাবতই মুগ্ধ হই নাই। সত্য বলিতে ব্যথিতই হইয়াছি। তাঁহার কবিতা লিখিবার ক্ষমতা আছে– এ সত্যে সন্দেহ নাই। অতীতে তাঁহার কাব্যের যতদূর বুঝি প্রশংসা করিতে আমি কুণ্ঠিত হই নাই। দুঃখের মধ্যে তিনি কবিতায় ফ্যাসিতন্ত্রের এহেন বন্দনা করিবেন– অন্তত বাল্টার বেনিয়ামিন কথিত ফ্যাসিতন্ত্রের আলামত মোতাবেক ফ্যাসিতন্ত্রের এহেন নকিব হইয়া উঠিবেন– তাহা আগে ভাবিয়া দেখি নাই। আজ আমাকেও দেখিতে হইল। নিজের কাব্যকে তিনি শুদ্ধমাত্র ‘অক্ষয়’ বলিয়া ক্লান্ত হইলেন না, তাহাকে গূঢ় মরমি ভাষার আশ্রয়ে বলিলেন ‘কালাম’ বিশেষও। এই ধরনের হর্ষকাম বা বেপরোয়া ব্যবহারকেই বেনিয়ামিন ফ্যাসিতন্ত্রের পথপ্রদর্শক বলিয়া হুঁশিয়ার করিয়াছিলেন।

এই স্বাধীনতা ব্যবসায়ী বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক রক্তপাত হইয়াছে সন্দেহ নাই। ইতিহাস দেবতা হয়তো আরো রক্ত দাবি করিতেছেন। ফরহাদ মজহার আশ্বাস দিয়াছেন ‘রক্তপাত ছাড়াই’ তাঁহার ‘কালাম’ দাখিল করা হইবে। ইহা ঠাকুরঘরের কলা কিনা জানি না। কিন্তু একটি বিষয়ে আমাদের সন্দেহ নাই। ফরহাদ মজহারের কবিতা আর কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা এই প্রশ্নে মুখামুখি দাঁড়াইয়া আছে। নজরুল ইসলামের কবিতা যদি হয় ‘গণতন্ত্র’ পথের পথিক, ফরহাদ মজহারের কবিতা তাঁহার সমস্ত ‘কালাম’ লইয়া ফ্যাসিতন্ত্রের নিশানবরদার।

এই নিবন্ধ এতটা দীর্ঘ হইবে ভাবি নাই। তবু তামাম শুদ করিবার আগে কাজী নজরুল ইসলাম ওরফে ‘মহাবিদ্রোহী’ কবির ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতাটির একটি থোকা আবৃত্তি করিব।

‘বন্ধু গো আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে!
দেখিয়া শুনিয়া খেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে ॥
রক্ত ঝরাতে পারি না তো একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা।
বড় কথা বড় ভাব আসে নাকো মাথায়, বন্ধু, বড় দুঃখে!
অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছো সুখে!’

নজরুল ইসলাম যে অমর কাব্য লিখিতে পারেন নাই, হইতে পারে ফরহাদ মজহার সেই অমর কাব্যই লিখিতেছেন। ফরহাদ মজহারের বাণী চিরকালের বাণী। তাঁহার কবিতা অভিজাত শ্রেণির জোৎস্নার মুক্তায় আলোকপ্রাপ্ত পাগড়ির ন্যায় শোভা পাইবে। আর কাজী নজরুল ইসলামের নাম একদিন না একদিন লোকে ভুলিয়া যাইবে।

কে জানে আহমদ ছফার কি হইবে?

টিকা

১. ‘Né voglio sia reputata presunzione se uno uomo di basso ed infimo stato ardisce discorrere e regolare e’ governi de’ principi; perché, così come colore che disegnano e’ paesi si pongono bassi nel piano a considerare la natura dé monti e dé luoghi alti, e per considerare quella dé bassi si pongono alti sopra é monti, similmente, a conoscere bene la natura de’ populi, bisogna essere principe, e a conoscere bene quella de’ principi, bisogna essere populare.’

— Niccolo Machiavelli, Il Principe

২. ‘Darum wäre es falsch, den Kampfwert solcher Thesen zu unterschätzen. Sie setzen eine Anzahl überkommener Begriffe – wie Schöpfertum und Genialität, Ewigkeitswert und Geheimnis – beiseife – Begriffe, deren unkontrollierte (und augenblicklich schwer kontrollierbare) Anwendung zur Verarbeitung des Tatsachenmaterials in faschistischem Sinn führt.’

— Walter Benjamin, ‘Das Kunstwerk im Zeitalter seiner technischen Reproduzierbarkeit’

দোহাই

১. কাজী নজরুল ইসলাম, ‘আমার কৈফিয়ত’ [‘সর্বহারা’], নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ, খ- ২, পুনর্মুদ্রণ (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ২০১১), ১২৭-৩১।

২. সলিমুল্লাহ খান, ‘আহমদ ছফার বাংলাদেশ,’ বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৮ জুলাই ২০১৩।

৩. — ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংকট: আওয়ামী লীগ পর্ব,’ বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৫ আগস্ট ২০১৩।

৪. — ‘বাংলাদেশের নিয়তি,’ বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৯ আগস্ট ২০১৩।

৫. — ‘আহমদ ছফার রাষ্ট্রচিন্তা,’ বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৯ আগস্ট ২০১৩।

৬. — ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আহমদ ছফা,’ বিডিনিউজ২৪ডটকম, ২ সেপ্টেম্বর ২০১৩।

৭. — ‘নতুন জাতির জন্ম,’ বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩।

৮. আহমদ ছফা, ‘সুরসম্রাটের মৃত্যুস্বপ্ন,’ আহমদ ছফা রচনাবলি, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত, খ- ৮ (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮), ৪৪৯-৬১।

৯. — ‘আচার্য আলাউদ্দিন খান’ [‘উপলক্ষের লেখা’], আহমদ ছফা রচনাবলি, খ- ৪, ১১৫-১৭।

১০. — ‘রোগশয্যায় বিরচিত’ [‘উপলক্ষের লেখা’], আহমদ ছফা রচনাবলি, খ- ৪, ২১০-২৮।

১১. — ‘পাথেয়,’ বাঙলাদেশ লেখক শিবির সম্পাদিত, হে স্বদেশ: গল্প (ঢাকা: বাঙলা একাডেমী, ১৯৭২), ১৩৮-৪৮।

১২. — ‘আমি যদি পুরো জীবন ব্যয় করে একটা উপন্যাস লিখতে পারতাম,’ রাজু আলাউদ্দিন সম্পাদিত, আলাপচারিতা: রাজনীতি, সংস্কৃতি, সমাজ ও সাহিত্য বিষয়ক সাক্ষাৎকার (ঢাকা: পাঠক সমাবেশ, ২০১৩), ২১১-২৪।

১৩. ফরহাদ মজহার, ‘ইস্পাতের ঠোঁট,’ পরিবর্তনডটকম, ৬ আগস্ট ২০১৩।

১৪. Walter Benjamin, ‘Das Kunstwerk im Zeitalter seiner technischen Reproduzierbarkeit’ [The Work of Art in the Age of its Technological Reproducibility], in Illuminationen [Illuminations], Ausgewählte Schriften 1 (Frankfurt am Main: Suhrkamp, 1977), ss. 136-69.

১৫. Antonio Gramsci, Selections from the Prison Notebooks, trans. Q. Hoare and G. Nowell-Smith, reprint (London: Lawrance & Wishart, 1973).

১৬. Niccolo Machiavelli, ‘Il Principe’ [The Prince], in Tutte le Opere, ed. Mario Martelli (Firenze: Sansoni Editore, 1971), pp. 255-98.

 

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩, bdnews24.com, মতামত বিশ্লেষণ