Category Archives: স্মরণ

তারেক মাসুদ: বিস্মৃতি ও স্মৃতি

What you and I hear are different.
You hear the sound
Of closing doors but I of doors that open.
[তুমি যাহা শোন আমিও তাহাই আজ
দরজা বাঁধার শব্দ পাচ্ছ, আমি খোলার আওয়াজ।]
—পারস্য কবিতা

এত অকালে তারেক মাসুদ মৃত্যুবরণ করিবেন, তাহা কোনদিন ভাবি নাই। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, খোদা করেন আর। এই মৃত্যুর মধ্য দিয়া তিনি দেশের তো বটেই, আমার মতন অভাজন ছাত্রেরও অনেক ক্ষতি করিয়া গিয়াছেন। তারেকের কাছে আমার অনেক ঋণ— এই ঋণ পরিশোধ করিবার কোন উপায়ও তিনি রাখিয়া যান নাই।

তারেকের অকালমৃত্যুর পর পরই আমি যে দুইটি ছোট নিবন্ধ লিখিয়াছিলাম তাহাদের একটির নাম রাখিয়াছিলাম ‘আমার বন্ধু তারেক মাসুদ’— অন্যটির অভিধা ছিল ‘আমার শিক্ষক তারেক মাসুদ’। প্রকৃত প্রস্তাবে তারেক প্রথমে আমার বন্ধু ছিলেন, তবে বন্ধুমাত্র ছিলেন না— তিনি ধীরে ধীরে আমার শিক্ষক হইয়া উঠিয়াছিলেন। শুদ্ধ চলচ্চিত্র ব্যবসায়ে নহে, চিরায়ত ভারতীয় সঙ্গীত ও শিল্পকলা বিষয়েও তিনি আমাকে নানাভাবে শিক্ষিত করিতে চাহিয়াছিলেন।

দুঃখের মধ্যে, আমাদের বন্ধুত্বের আয়ু সুদীর্ঘ হইতে পারে নাই। আমি শেষের দিকে বুঝিতে শুরু করিয়াছিলাম— কি করিয়া জানি— তাঁহার চিন্তার প্রগতি দ্রুততর হইয়া উঠিতেছে। তিনি নিরন্তর আমার শিক্ষক হইয়া উঠিতেছেন। আর আমি খেই হারাইয়া ফেলিতেছি। আজিকার লেখায় সেই বেদনার কাহিনী পুরাপুরি লিখিতে পারিব না। এই লেখা শুদ্ধ তাঁহার স্মৃতির প্রতি একজন পুরাতন ছাত্রের (যিনি কিছুদিন বন্ধুত্বের মর্যাদায়ও বৃত হইয়াছিলেন) ভক্তির নিদর্শনমাত্র।

১.

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করিয়াছিলাম ইংরেজি ১৯৭৬ সালে। একই বছরে তারেক মাসুদও আমাদের দেশের এই উচ্চতম বিদ্যালয়ে আসন লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে— সেই বছর বলিব না— সেই যুগে যাঁহারা পড়িতে আসিয়াছিলেন তাঁহাদের মধ্যে তারেক মাসুদকেই আমি শ্রেষ্ঠ বন্ধু জ্ঞান করিয়াছিলাম। কি বিদ্যায় কি বিনয়ে তারেকের সমকক্ষ আমার বন্ধুদের মধ্যে দ্বিতীয় আর কেহ ছিলেন না।

ঘটনাচক্রে আমাদের এই বন্ধুত্বের অনুঘটক ছিলেন আমার অপর বন্ধু কবি মোহন রায়হান। তবে কালক্রমে এই কাহিনীর প্রধান ঘটক হইয়া দাঁড়াইয়াছিলেন আমাদের— তারেক মাসুদ ও আমার— উভয়েরই শিক্ষক আহমদ ছফা। তারেকের সহিত দেখা হইবার কিছু আগেই আহমদ ছফার সাক্ষাত্ লাভের সৌভাগ্য আমার হয়। প্রথম সাক্ষাতের দিন তারেক মাসুদ বলিলেন, তিনিও আহমদ ছফার অনুরাগী। তখনই আমাদের পথ কুসুমাস্তীর্ণ হইতে শুরু করে। সেই কুসুমের মধ্যে একটা কাঁটাও বিন্ধিয়া ছিল। আহমদ ছফা— একদা ১৯৭০ সালের শেষে কিংবা ১৯৭১ সালের গোড়ায়— ‘স্বাধীন বাংলা লেখক সংগ্রাম শিবির’ নামক সংগঠন একটা দাঁড় করাইয়াছিলেন। ১৯৭২ সালে সেই সংগঠন নতুন নাম— বাংলাদেশ লেখক শিবির— লইয়া কায়েমমোকাম হয়। আহমদ ছফা শেষ পর্যন্ত ডাকাতের কবলে পড়িয়া সেই সংগঠন ছাড়িতে বাধ্য হইয়াছিলেন। ১৯৭৬ সালের পর যাঁহারা এই সংগঠন চালাইতেন আমরা দেখিয়াছি তারেক মাসুদও সেই ডাকাতদের সহিত যুক্ত হইয়াছিলেন। তবে আমরা তখনও ছাত্রমাত্র।

তারেক মাসুদ, তাঁহার সেকালের নিত্যদিনের বন্ধু পিয়াস করিম এবং আরও কয়েকজন মিলিয়া তখন ‘সিনেমা অ্যান্ড টেলিভিশন ওয়াচার্স অ্যাসোসিয়েশন’ বা সংক্ষেপে ‘ক্যাটোয়া’ নামে একটি সংগঠন গঠিয়াছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দৌলতে ঐ সংগঠনের সভাপতি পরিচয়ে নাম ছাপা হইত জনৈক অধ্যাপকের। কিন্তু সকল কাজের কাজি ছিলেন তারেক মাসুদ। বলা নিষ্প্রয়োজন নহে, আহমদ ছফা ঐ স্বনামধন্য অধ্যাপকের নাম শুনিলেই দুর্গাপূজার উপযুক্ত খড়গ হাতে লইতেন। আমরা এই অসুখের কিছুটা বুঝিতাম, কিছুটা অবুঝ থাকিতাম।

ইহার পর আসিল শেখ মোহাম্মদ (ওরফে এস.এম.) সুলতানের জমানা। আহমদ ছফা ততদিনে সুলতান অধ্যায়ে হাত দিয়াছেন, তখন তারেক মাসুদও এই মহান শিল্পীর কদর করিতে শিখিয়াছেন। এই মহান শিল্পীর জীবন ও শিল্প লইয়া তারেক মাসুদ ‘আদমসুরত’ ছবিটি যখন সৃষ্টি করিয়াছিলেন তখনও আমরা ভাল বন্ধু ছিলাম। এই ছবি দেখিয়া আমার চোখ খুলিয়া গিয়াছিল। এই ছবির নামের মধ্যেই তারেক মাসুদের প্রতিভা জ্বলজ্বল করিতেছিল। শুদ্ধ প্রতিভা কেন, সাহসও কম নহে। একশ্রেণির মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী তখন প্রচার করিতেন, ‘আদমসুরত’ নামের মধ্যেই সাম্প্রদায়িকতার পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়! অনেকদিন— মানে তারেকের এন্তেকালের— পরে জানিলাম, ঐ ছবির নির্মাণকাহিনী লইয়া তারেক আরেকটা ছবি বানাইয়াছিলেন। তাহাতে দেখিলাম আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেনের নাম পর্যন্ত আছে, অথচ আহমদ ছফার কথা তারেক মাসুদ একদম ভুলিয়া গিয়াছেন।

ইহার পর নিয়তি আমাদিগকে যার যার পথে লইয়া গেল। তারেক গেলেন সিনেমার পথে, আমি চলিলাম আর একটু সুদূরে— মার্কিন মুলুকে। ততদিনে আমাদের পরিচয়ের এক দশক পার হইয়া গিয়াছে। একদিন খোদ সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থলেই তারেক মাসুদের ভাবীকালের সহধর্মিণী শ্রীমতী ক্যাথারিন শাপিরের দেখা পাইলাম। জানিতে পারিলাম, তারেক মাসুদও মার্কিন মুলুকে হিজরত করিবেন। জানিতে আরও পারিলাম, ক্যাথরিনের বাবা একজন স্বনামধন্য দার্শনিক— জোনাথন শাপির— যাঁহার গদ্য আমিও পড়িয়াছি। চিদাত্মা কার্ল পপার কিংবা তাঁহার কড়া বিচারক পল ফেয়ারাবেন্দের নাম যাহারা একদা মুখে লইয়াছেন তাহারা এই নামটিও শুনিয়া থাকিবেন।

তারেক মাসুদ বয়সে আমার বছর দুইয়েকের বড় ছিলেন। বলাবাহুল্য, প্রজ্ঞায় আরো। তিনি বাল্যবয়সে পড়িয়াছিলেন আমাদের দেশে যাহাকে বলে ‘কওমি মাদ্রাসা’ সেই ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ফলে তিনি মাঝে মাঝে দুইচারি পঙিক্ত ফারসি কবিতা আমাদের শোনাইতেন। এই বিদ্যা তিনি পরেও কাজে লাগাইয়াছিলেন। আরো ভালো কথা, একালের ইরানি সিনেমায় যাঁহারা নবযুগ আনিয়াছিলেন তাঁহাদের পুরোভাগে আছেন সম্প্রতি পরলোকগত আব্বাস কিয়ারোস্তামি। তাঁহার সহিত তারেক নিশ্চয়ই ফারসিতে বাতচিত করিয়াছিলেন। কিয়ারোস্তামির জীবনকাহিনী লইয়া— ফারসি নহে— ফরাশি ভাষায় লেখা একটা বই তারেক একবার আমাকে পড়িতে দিতে চাহিয়াছিলেন। কিন্তু নিয়তির টানে সেই বই আমার আর হাতে আসে নাই। আমার ধারণা, আব্বাস কিয়ারোস্তামির গল্প বলার ধরনটাই তারেক মাসুদ ভালোবাসিয়াছিলেন। কিন্তু সত্যজিত রায়ের ছায়া হইতে ছাড়া পাওয়ার জন্য ঐ ভালোবাসা হয়তো পর্যাপ্ত ছিল না। অন্তত ‘মাটির ময়না’ পর্যন্ত আমলে লইলে আমার ধারণার গোড়ায় হাত দেওয়া যাইবে।

আমাদের মার্কিন প্রবাসের প্রথম দিকে তারেক মাসুদ ‘স্ট্রান্ড বুকস’ নামক একটা বড় বইয়ের দোকানে কাজ করিতেন। ঐ দোকানটা ছিল সম্ভবত নতুন ইয়র্ক শহরের সবচেয়ে বড় পুরানা বইয়ের আড়ত। সেখানে নতুন পুরাতন সকল বই টাকায় আধুলিমাত্র দিয়া কিনা যাইত। আর কর্মচারী হইলে আধুলির আধুলি অর্থাত্ টাকায় সিকি খরচ করিয়া কিনিবার সুবন্দোবস্তও ছিল। তারেক মাসুদ আমাকে সেই দোকান হইতে ফিলিস্তিনি মহাত্মা এডোয়ার্ড সায়িদের প্রসিদ্ধ পুস্তক ‘ওরিয়েন্টালিজম’ (বা প্রাচ্যব্যবসায়) কিনিয়া দিয়াছিলেন। একদিন জগতের সকল ঘটনারই হয়তো শেষ হয়। একসময় আমার মার্কিন প্রবাসও শেষ হইল। তারেক মাসুদ মার্কিন দেশকে পরমাত্মীয়ের— শ্বশুরের— দেশে পরিণত করিয়াছিলেন বলিয়া ওখান হইতে বইপত্রও আনিতে কি আনাইতে পারিতেন। তথাগত যে বইটি তিনি সর্বশেষ আমাকে পড়িতে দিয়াছিলেন তাঁহার নাম তর্জমা করিলে দাঁড়ায়— ‘আদি হিন্দুধর্মের উত্পত্তি ও বিকাশ’। আহা, তাঁহার সেই বই আমার অপরিশোধিত ঋণের বোঝাটি আজও ভারী করিতেছে!

সকলেই জানেন, তারেক মাসুদ আমাদের দেশের চলচ্চিত্রে অক্ষয় অবদান রাখিয়া গিয়াছেন। কিন্তু আমরা (যাঁহারা সামান্য হইলেও তাঁহার অল্পবিস্তর সঙ্গলাভের গৌরব অর্জন করিয়াছিলাম তাঁহারা) জানি তাঁহার দৃষ্টি ছিল উপরের দিকে। তিনি পড়াশোনা করিতেন সেই উপরের দিকে চাহিয়া। পূর্বগামীদের মধ্যে এই আকাশদৃষ্টির ক্ষেত্রে হয়তো একমাত্র আলমগীর কবিরের সহিতই তারেক মাসুদের তুলনা চলিবে— আর কাঁহারও বিশেষ নহে।

উপরের দিকে বেশিক্ষণ তাকাইয়া থাকিলে নশ্বর মানবদেহে (মানে মাটির ভাণ্ডে) যাহা ঘটে— অর্থাত্ ঘাড়ের ব্যথা— তারেক মাসুদের তাহা অবশ্য বিশেষ হয় নাই। তিনি আশেপাশেও তাকাইতেন। এই অভ্যাসের কারণেই তিনি নতুন ইয়র্কে বসবাস করিবার সময় দৈবক্রমে ১৯৭১ সালের কিছু দলিলচিত্রের সন্ধান পাইয়াছিলেন। সেই দলিলাদির সদ্ব্যবহার করিয়াই তিনি ‘মুক্তির গান’ ছবিটি বানাইয়াছিলেন— এই কথাটি সর্বজনবিদিত।

এই ছবি বানাইতে গিয়াও তাঁহাকে অনেক যুদ্ধ করিতে হইয়াছিল। ১৯৭১ সালের গৌরবময় সংগ্রামের কাহিনী একদা বাংলাদেশ ভুলিতে বসিয়াছিল। আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবন যাপন করিতেছি তখন দেখিতাম মধ্যবিত্তশ্রেণির ব্যবসায়ী ও বুদ্ধিজীবীরা পর্যন্ত ১৯৭১ সালকে ‘গণ্ডগোলের বছর’ বলিয়া উল্লেখ করিতেছেন। আবারও বলিতে হইবে, খুব সম্ভব একমাত্র আহমদ ছফা আর আলমগীর কবির ছিলেন এই নিয়মের ব্যতিক্রম। চলচ্চিত্র ব্যবসায় আর সাহিত্য ব্যবসায় দুই মহলেই ‘মধ্যবিত্ত’ বলিয়া পরিচিত বলিয়া শাসকশ্রেণিটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিস্মৃত হইতে চলিয়াছিল।

সাহিত্যের কথা যখন উঠিলই বলি, একমাত্র আহমদ ছফা ১৯৮৭-৮৮ সালে ‘একজন আলী কেনানের উত্থান-পতন’ নাম জারি করিয়া মুক্তিযুদ্ধের সহিত আমরা যে বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছি তাহা চোখে আঙ্গুল ঢুকাইয়া দেখাইয়া দিলেন। বইটির নাম আহমদ ছফা পরে ছাঁটিয়া ছোট করিয়াছিলেন— ‘আলী কেনান’। তাঁহার কিছু আগে— ১৯৮৫ নাগাদ— আহমদ ছফা ‘অলাতচক্র’ নামক একটি যুদ্ধপুরাণ লিখিয়াছিলেন। ঘটনাচক্রে দেখা গেল তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’ আর আহমদ ছফার ‘অলাতচক্র’ একই পুরাণের এইপিঠ আর ওইপিঠ। কিমাশ্চর্যম! আহমদ ছফার উপন্যাসের কুশীলব কিছু পরিমাণে ‘মুক্তির গান’ চলচ্চিত্রে উপস্থিত। অথচ উভয়ের মধ্যে কি যোজন যোজন দূরত্ব! আশা করি, দূর ভবিষ্যতে কেহ এই সত্য আরও বিশদ করিয়া উদঘাটন করিবেন। আমি এখানে শুদ্ধ যাহা কর্তব্য বিবেচনা করিয়াছি, তাহাই বলিলাম।

২.

আমি এসলাম ধর্মাবলম্বী একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করিয়াছি— এই সত্য তারেক মাসুদের বেলায়ও অনস্বীকার্য। ইহা লুকাইবার প্রয়োজন নাই। কথিত আছে, আমাদের পয়গম্বর হজরত মোহাম্মদ ফরমাইয়াছেন, পরলোকগত মনুষ্যের সুনামই শুদ্ধ করিতে হয়। আমিও এই সত্য শিরোধার্য করি। পার্থক্যের মধ্যে আছে শুধু সত্যের দাবি। আমরা যদি নিজেদের সত্য নিজেরাও না বলি, তাহা হইলে অন্যে বলিবে কেন? অন্যলোকে শুদ্ধ গুজব রটাইবে। আমাদের আত্মচিকিত্সারও দরকার আছে।

মানুষ তারেক মাসুদ, তাঁহার প্রজ্ঞা, তাঁহার সাধনা, তাঁহার সংগ্রাম চিরকালই আমার শ্রদ্ধার লক্ষ্য থাকিবে। কিন্তু তাঁহার রাজনৈতিক গতির সহিত আমি— একসময় দেখিলাম— আর তাল মিলাইতে পারিতেছি না। সেই কক্ষপথ হইতে কখন কিভাবে যে ঠিকরাইয়া পড়িলাম আজ আমারও তাহা মনে নাই। যখন সংজ্ঞা ফিরিল দেখিলাম, তারেক মাসুদ আর নাই। তাঁহার কীর্তি পড়িয়া আছে। মাঝখানে আহমদ ছফাও চলিয়া গেলেন। আহমদ ছফার স্মৃতির সহিত আমি তারেক মাসুদের স্মৃতি আর মিলাইতে পারি না। আহমদ ছফা যে শ্রেণিকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সহিত বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে অভিযুক্ত করিলেন, তাঁহার এককালীন ছাত্র তারেক মাসুদ সেই শ্রেণিকেই মুক্তিযুদ্ধের ত্রাতার আসনে বৈঠক দিলেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ কিভাবে বেহাত বিপ্লবের করুণ পরিণতি বরণ করিল তাহা এখানেই পরিষ্কার। তারেক মাসুদের সহিত আমার বিরহের শুরু এখানেই হইয়াছিল।

১৯৭১ সাল আমাদের ইতিহাসে একটি রজতরেখার ন্যায় পুরাতন ও নতুন যুগের সীমানির্দেশ করিতেছে। ১৯৭১ একদিকে আমাদের স্বপ্নভঙ্গ ও অন্যদিকে জাগরণের ইতিহাস। তারেক মাসুদও সেই ইতিহাসের সন্তান। আহমদ ছফাও। আমরা সকলেই। অথচ ১৯৭১ সালের লক্ষ্য কি ছিল? এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা একদিন একজনের কাছ হইতে আরজন আলাদা হইয়া গিয়াছিলাম। এই দেশে ১৯৭১ যে বিপ্লব আনিতে পারিত সেই বিপ্লব যে কারণেই হউক আসিতে পারে নাই। কেন পারে নাই? এই বিপ্লবের অন্যতর স্বপ্নদ্রষ্টা আহমদ ছফা অপরিণত বয়সে, প্রায় অজ্ঞাতবাসে, মৃত্যুবরণ করিলেন। অধিক প্রমাণের আর কি প্রয়োজন আছে! তারেক মাসুদ আহমদ ছফার পরিণতি এড়াইতে চাহিয়াছিলেন। পারিয়াছেন কিনা, আমি নিশ্চিত নই। আহমদ ছফা অনূদিত ‘ফাউস্ট’ তারেক না পড়িয়াছেন এমন নহে। এই সত্য উচ্চারণ করা আজ আমার পক্ষে যেমন পরম কর্তব্য, অন্যদিকে তেমনি চরম বেদনার।

আমার জ্ঞান নাই, কিন্তু বিশ্বাস করিতে ইচ্ছা করিতেছে তারেক মাসুদ আহমদ ছফাকে ভোলেন নাই। শুদ্ধমাত্র ছাইচাপা দিয়া রাখিয়াছিলেন। পায়ের তলায় নহে, বুকের তলায়। হয়তো সেই চাপাকান্নার আওয়াজই শোনা যাইতেছিল তাহার অনারব্ধ শেষ ছবি ‘কাগজের ফুল’ কাহিনীর অশ্রুত বয়ানে। আজ বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের দুই বয়ান বিরাজ করে। এক বয়ান মোতাবেক ১৯৭১ সাল ১৯৪৭ সালের ভুল সংশোধন করিয়াছে মাত্র। নতুন কিছুই করে নাই। আরেক বয়ানানুসারে, ১৯৭১ সালের বুকের মধ্যেই ১৯৪৭ সালের বাসনা লুকাইয়া আছে। কি ছিল সেই বাসনা?

আহমদ ছফা, শেখ মোহাম্মদ সুলতান— কিংবা তাঁহাদের দুইয়েরই গুরু আবদুর রাজ্জাক— এই শেষ বয়ানের মধ্যে নিজেদের ভাষা খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন। তারেক মাসুদ এই দুই নৌকায় পদযুগল ভাগ করিয়া রাখিয়াছিলেন। আজ যখনই তারেকের কথা ভাবি সেই পরাবাস্তব ছবি আমার চোখ ঝাপসা করিয়া দেয়। তারেক মাসুদের স্মৃতি যেখানে আমাকে একটা কোমল ব্যথার আঁচড় দিয়াছে তাহা ঠিক এইখানেই। দুঃখের মধ্যে, সেই স্মৃতি আজও অমর রহিয়াছে। তারেক মাসুদকে ভোলা অসম্ভব।

১৫ নবেম্বর ২০১৭

প্রকাশ: বণিক বার্তা২৪  নবেম্বর ২০১৭

১৯৭১ সালের স্মৃতি: কেন কোটি শরণার্থী?

 

© Raghu Rai / India Quarterly

© Raghu Rai / India Quarterly

১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারি—অর্থাৎ  পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায়—বাংলাদেশে পাকিস্তান বাহিনীর নয় মাসব্যাপী গণহত্যা ও নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞের বিবরণ সম্বলিত একটি বড় পুস্তিকা প্রকাশিত হইয়াছিল নয়াদিল্লি হইতে। প্রকাশ করিয়াছিলেন, ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স’ বা ‘ভারতীয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিষদ’ নামের একটি স্বশাসিত সংস্থা। বইয়ের সম্পাদক পরিচয়ে বিশেষ কাহারও নাম ছাপা হয় নাই। তাই আমরা ধরিয়া লইতে পারি সংস্থার সেক্রেটারি জেনারেল বা মহা সম্পাদক বলিয়া যাঁহার নাম মুদ্রিত তিনি—এস.এল. পপলাই মহোদয়—বইটি সম্পাদনা করিয়াছিলেন। অবশ্য সম্পাদকই শেষ কথা নহে। পুস্তিকাটির আরও একটি বিশেষত্ব আছে। ইহার মুখবন্ধ লিখিয়াছিলেন স্বনামধন্য ফরাশি সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ আঁদ্রে মালরো (১৯০১-১৯৭৬)। খোঁজখবর যতদূর লইতে পারি লইলাম, দেখিলাম বইটির খবর বেশি লোকের কানে পৌঁছায় নাই। মালরোর লেখা মুখবন্ধের কথাও তথৈবচ। এমনকি মাহমুদ শাহ কোরেশী ১৯৮৬ সালে আঁদ্রে মালরোর উপর যে বই ছাপাইয়াছিলেন তাহাতে মুক্তিযুদ্ধ আর যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ লইয়া অনেক কথা থাকিলেও এই মুখবন্ধটির কথা পাওয়া গেল না।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যায় মাতিয়া উঠিয়াছিল, তখন প্রতিবেশী ভারতের বুদ্ধিজীবীদের তরফে দিল্লি শহরে এক দফা আন্তর্জাতিক বুদ্ধিজীবী সম্মেলন ডাকা হয়। আঁদ্রে মালরোকেও দাওয়াত দেওয়া হয় সেই সম্মেলনে। মালরো সম্মেলনে অংশগ্রহণ করিতে রাজি না হইয়া পত্রযোগে পাল্টা একটা আস্ত বিবৃতি প্রকাশ করিয়াছিলেন। মালরোর বিবৃতি প্রকাশ পায় ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। সে বিবৃতিতে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেন। প্রথম বিবৃতির কিছু পরে আরেক বিবৃতিযোগে মালরো বলিয়াছিলেন, ‘ফাঁকা বুলি আওড়াবার অভ্যাস আমার নেই; তাই বাংলাদেশের পক্ষে যুদ্ধ করবার প্রস্তাব আমি দিয়েছি।’ (কোরেশী ১৯৮৬: ৯৩)

আঁদ্রে মালরো (১৯০১-১৯৭৬)

আঁদ্রে মালরো (১৯০১-১৯৭৬)

মালরোর এই প্রস্তাব বাংলাদেশের পক্ষে অমৃতস্বরূপ কাজ করিয়াছিল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মার্কিন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিকসনের কাছেও চিঠি লিখিয়াছিলেন। আহ্বান জানাইয়াছিলেন, পাকিস্তান যাহাতে গণহত্যা বন্ধ করে আমেরিকা তাহার ব্যবস্থা করুক। ১৯৭১ সালের শেষভাগে—৩ ডিসেম্বর তারিখে—ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হইবার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে জাঁ কে নামক একজন ফরাশি যুবক প্যারিসে একটি পাকিস্তানী বিমান হাইজ্যাক করিতে উদ্যোগী হইয়াছিলেন। পরে পুলিশ তাহাকে গ্রেপ্তার করিয়া বিচারে সোপর্দ করে। কে দাবি করিয়াছিলেন তিনি মালরোর লেখা পড়িয়া অনুপ্রাণিত হইয়াছিলেন। আদালতে কের সমর্থনে সাক্ষ্য দিতে গিয়াছিলেন আঁদ্রে মালরো। কেহ কেহ বলেন, খুব সম্ভব মালরোর সাক্ষ্যের কল্যাণেই জাঁ কে মাত্র পাঁচ বছরের দণ্ড লাভ করেন। (জহির ২০১৫ এবং কোরেশী ১৯৮৬: ৮৪)

সম্প্রতি বাংলাদেশের কয়েকজন নবীন লেখক পুস্তিকাটির বাংলা সংস্করণ প্রকাশে উদ্যোগী হইয়াছেন। তাই আমারও সৌভাগ্য ঘটিল বইটি আদ্যোপান্ত একবার পড়িয়া দেখার। মনে হইল, ১৯৭১ সালের ইতিহাস লইয়া যে সকল প্রশ্ন এখনও জীবন্ত আছে তাহার কোন কোনটির উত্তর এই বইতে পাওয়া যাইবে। সেই উত্তরে পৌঁছিবার আগে বইটির আরেক বিশেষত্বের কথাও বলিতে হয়। এই বইয়ে মোট ছাব্বিশ জন সাক্ষীর জবানবন্দী লিপিবদ্ধ করা হইয়াছিল। ছাব্বিশের মধ্যে উনিশজন বাংলাদেশের নাগরিক—যাঁহারা পাকিস্তানী নির্যাতনের শিকার অথবা প্রত্যক্ষ সাক্ষী। পরকালে বিখ্যাত ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ কিংবা চিত্রশিল্পী কামরুল হাসান কি সৈয়দ আবুল বারক আলভি তাঁহাদেরই কয়েকজন। সাক্ষীদের মধ্যে আর সাতজন ছিলেন বিভিন্ন পরিসরে সাহায্য করিতে আগাইয়া আসা খ্রিস্টান মিশনারি সমাজের কর্মী। দেখিতেছি তাঁহাদের মধ্যে দুনিয়াজোড়া খ্যাতনাম্নী মাদার তেরেসাও আছেন।

এই বইয়ের মূল সম্পদ এই ছাব্বিশটি জবানবন্দীর সংক্ষিপ্তসার। এইগুলি গ্রহণ করিয়াছিলেন তিনজন ভারতীয় সাংবাদিক—দুইজন পুরুষ ও একজন নারী—যথাক্রমে খগেন দে সরকার, সুধীন্দ্রনাথ চৌধুরী ও অমিতা মালিক। বাংলাদেশের পক্ষ হইতে তাঁহাদের সহায়তা করিয়াছিলেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের দুই সহকারী—[ব্যারিস্টার] আমিরুল ইসলাম ও [ব্যারিস্টার] মওদুদ আহমদ। জবানবন্দীগুলি গ্রহণ করা হইয়াছিল ১৯৭১ সালের একেবারে শেষের দিকে—নবেম্বর মাসের শেষ নাগাদ। বইটির ‘আবাঁ-প্রপো’ বা মুখবন্ধযোগে আঁদ্রে মালরো সাহেব দুইটি কথা বিশেষভাবে স্মরণ করিয়াছিলেন। বাংলাদেশ হইতে কত মানুষ ভারতে আশ্রয় প্রার্থনা করিয়াছিলেন? মালরোর মতে, ১৯৭১ সালের বাংলাদেশে গণহত্যার মতন মানবজাতি-বিরোধী অপরাধ যে ঘটিয়াছিল তাহার নগদ প্রমাণ এই সত্য হইতেই পাওয়া যায়। সত্য বলিতে কি—এই প্রমাণ দেখিয়াই তিনি এবং তাঁহার বন্ধুরা বাংলাদেশের পক্ষে লড়াই করিবার জন্য তৈরি হইয়াছিলেন।

নিজের সিদ্ধান্তের সপক্ষে যুক্তি দেখাইবার উদ্দেশ্যে মালরো তাঁহার জানা পুরানা একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করিতে কুণ্ঠিত হন নাই। ১৯৪০ সালে নাৎসি জার্মানির হাতে ফরাশিদেশের পরাজয় ও পতনের পর সে যুগের ফরাশি উপনিবেশ সিরিয়ায় উপস্থিত জনৈক ফরাশি সেনা কর্মকর্তা—পদবীতে মেজর পর্যায়ের—জেনারেল দা গলকে বলিয়াছিলেন, ‘ঘটনাটা আসলে কি ঘটিতেছে আমরা তো ভাল করিয়া জানি না। এখন কোন দিকে যে যাই!’ উত্তরে দা গল বলিয়াছিলেন, ‘জানি না কথাটা হয়তো মিথ্যা নয়, তবে কে যেন আমাকে বলিতেছে জার্মানরা তো প্যারিসে।’ এই উপকথার রেশ টানিয়া মালরো বলিয়াছিলেন, সারা দুনিয়া বেশ ভালোভাবেই জানিত এইবার এক কোটি হিন্দু শরণার্থী ভারতে গিয়া হাজির। এই জায়গায় মালরো অবশ্য অসাবধানতাজনিত একটি ভুল করিয়াছিলেন—এক কোটি শরণার্থীর সকলে নিশ্চয়ই হিন্দু ছিলেন না। আঁদ্রে মালরোর দ্বিতীয় যুক্তিটি ছিল অবশ্য একান্তই অকাট্য। এয়াহিয়া খান খাস করিয়া বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী বা এলিটও হত্যা করিতেছিলেন। এই হত্যাকাণ্ড ছিল জাতি ধর্ম নির্বিশেষে—কোন প্রকার বাছবিচার না করিয়াই। যাহারা ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলকে ভোট দিয়াছিলেন—কি মুসলমান কি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান—সকলকেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী হত্যা করিতেছিল। এ সত্যে পৃথিবীর সন্দেহ ছিল না।

১৯৭১ সালের যুদ্ধে—বিশেষত শেষভাগে—ভারতীয় সেনাবাহিনীকেও শরিক হইতে হইয়াছিল। তাহার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভিতরে যে গেরিলা যুদ্ধ চলিতেছিল তাহাতে—অর্থাৎ বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীতে—যাহারা নাম লিখাইয়াছিলেন তাহাদের মধ্যে কতজনই বা ধর্মে হিন্দু শ্রেণীভুক্ত ছিলেন! আর মুসলমান কতজন ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে? তাহাতেই বোঝা যায় বাংলাদেশের হিন্দু ও মুসলমান একযোগে লড়িয়াছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানী দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। মালরো লিখিয়াছেন, এ যুদ্ধ তো ধর্মে আর ধর্মে লাগে নাই। এ যুদ্ধ বাধিয়াছিল জাতিতে জাতিতে। আঁদ্রে মালরোর ভাষায়, এ যুদ্ধ ছিল ‘এসলামাবাদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঢাকার মুসলমানদের যুদ্ধ।’ এক অর্থে কথাটা ষোল আনা না হইলেও চৌদ্দ আনাই সত্য।

সকলেই জানেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা মানিয়া লইতে পাকিস্তান এবং আরব জাহানের প্রতিক্রিয়াশীল রাজতন্ত্রগুলি শেষ পর্যন্ত বাধ্য হইয়াছিল। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক মর্যাদা মানিয়া লইতে ইঁহারা আজও পারেন নাই। পাকিস্তান যদি সত্য সত্যই মনে করিত, বাংলাদেশ ছাড়া তাহাদের চলিবে না—পৃথিবীতে না হউক, অন্তত দক্ষিণ এশিয়ায় সে একঘরে হইয়া পড়িবে—তো বাংলাদেশের সহিত তাহার নেতারা যে ব্যবহার করিয়াছেন সেই ব্যবহার কদাচ করিতেন না। পরকালে অন্তত তাহারা শাস্তির মুখোমুখি হইতেন। না, পাকিস্তান আজও ১৯৭১ সালের দায়মোচন করিতে আগাইয়া আসে নাই। পাকিস্তানের এমন একযুগ গিয়াছে যখন তাহাকে শিশুরাষ্ট্র বলার রেওয়াজ ছিল। মনে হইতেছে, এখনও দেশটি প্রাপ্তবয়স্ক হয় নাই। এতদিনে তাহাদের দিনকাল ভালই যাইতেছে। ইহাতেই বুঝা যাইতেছে বাংলাদেশকে সেকালে তাহারা নিছক উপনিবেশই ভাবিয়াছিলেন। আগের দিনে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী, আমলাতন্ত্র ও এয়ুরোপিয়া বর্ণবাদীরা যে ধরণের আচরণ করিতেন তাহারাও সেই আচরণেরই পুনরাবৃত্তি করিয়াছিলেন মাত্র।

১৯৭১ সালের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে যে নির্দয় আচরণ করিয়াছিল তাহাকে এক মুসলমানের দেশে আরেক মুসলমানের আচরণ বলা যায় না—সে ছিল আফ্রিকা কি এশিয়ার তথাকথিত ‘অসভ্য’ বা ‘বর্বর’ দেশে সভ্য এয়ুরোপিয়া জাতির বর্ণবাদী, মানবতন্ত্রবিরোধী আচরণ বিশেষ। আঁদ্রে মালরো—আজ হইতে ৪৪ বছর আগে—লিখিয়াছিলেন, এই সত্যে যদি কাহারও সন্দেহ থাকে তাহারা এখানে একত্রিত ছাব্বিশ জন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ পড়িয়া দেখিতে পারেন।

aijaz-ahmad

এজাজ আহমদ

আঁদ্রে মালরোর বক্তব্যের তাৎপর্য বুঝিতে আরও সহায় হইবে যদি আমরা সেই সময়ের কোন কোন বামপন্থী বুদ্ধিজীবীর বক্তব্য স্মরণ করিতে পারি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যাভিযান শুরু হইবার দুই সপ্তাহের মাথায় চারিজন পাকিস্তানী বুদ্ধিজীবী—বিদেশে প্রবাসী অবস্থায়—পাকিস্তানী বর্বরতার নিন্দা করিয়া বিবৃতি প্রকাশ করিয়াছিলেন। এই বুদ্ধিজীবীদের একজন—এজাজ আহমদ—১৯৭১ সালের ১ নবেম্বর তারিখে লেখা এক নিবন্ধে স্বীকার করিয়াছিলেন যে বাংলাদেশ হইতে কোটির মতো শরণার্থী ভারতে পার হইয়াছেন। এই বর্বরতা শেষ না হইলে আরো কোটির মতো যে পার হইবে তাহার সম্ভাবনাও উড়াইয়া দেওয়া যায় না। তবে তিনি সঙ্গে একথা বলিতেও কসুর করেন নাই—শরণার্থীরা তো গরিব মানুষ! তাহাদের দেশত্যাগে পশ্চিম পাকিস্তানী সামরিক গোষ্ঠীর কিছু আসে যায় না। (আহমদ ১৯৭১: ১১, ১৪)

একটা জায়গায় আসিয়া তিনি বিপদেই পড়িয়া গিয়াছেন। তিনি বলিয়াছিলেন, এই কোটি শরণার্থীর নিজ দেশ ত্যাগ করিয়া ভারতে যাওয়ার ঘটনাকে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের যুদ্ধ ঘোষণার সামিল গণ্য করা যায়। তবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও পরকালের সাম্প্রদায়িক সংঘাত প্রভৃতি ঘটনা স্মরণে রাখিলে এই বিপুল সংখ্যক মানুষের দেশত্যাগকেও যুদ্ধ ঘোষণার মর্যাদা দেওয়া যাইবে কিনা তিনি সন্দিহান ছিলেন। এজাজ ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন, পাকিস্তানী সামরিক চক্র আর নতুন করিয়া ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামিবে না। (আহমদ ১৯৭১: ১৪)

এজাজ আহমদ তখন ছিলেন তরুণ বামপন্থী। পাকিস্তান ভাঙ্গিয়া যাওয়ায় তিনি সত্যই ব্যথা পাইয়াছিলেন। এই ব্যথায় তাঁহার চোখও কিছু ঝাপসা হইয়া গিয়াছিল। মালরোর পাশাপাশি তাঁহার বিশ্লেষণ পাঠ করিলে পরিষ্কার হয় মালরো কেন ভুয়োদর্শী আর এজাজ কেন রাতকানা। এজাজ আহমদ কিংবা তাঁহার বন্ধু একবাল আহমদ যাহা দেখিতে পান নাই তাহা মালরো দেখিয়াছিলেন বৈকি! এক কোটি শরণার্থী মালরোর কাছে নিছক একটা সংখ্যা ছিল না। এজাজ আহমদ ও তাঁহার বন্ধুদের লেখা এই এত বছর পর পড়িয়া আমার মনে সন্দেহ জাগিতেছে পাকিস্তান পথিকদের মধ্যে সবচেয়ে কম পাকিস্তান পথিক যিনি তিনিও কি তাহা হইলে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান পথিকের অধিক ছিলেন না?

 

দোহাই

১.     মাহমুদ শাহ কোরেশী, অঁদ্রে মালরো: শতাব্দীর কিংবদন্তী (ঢাকা: আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, ১৯৮৬)।

২.     [S.L. Poplai, ed.,] How Pakistan Violated Human Rights in Bangladesh: Some Testimonies (New Delhi: Indian Council of World Affairs, 1972).

৩.    Aijaz Ahmad, ‘Bangladesh: India’s Dilemma,’ Pakistan Forum, vol. 2, no. 2 (November 1971), pp. 11-15.

৪.     Quazi Sajjad Ali Zahir, ‘Salute to Jean Kay,’ in D.C. Katoch and Quazi Sajjad Ali Zahir, eds., Liberation: Bangladesh 1971 (New Delhi: Bloomsbury Publishing, 2015).


Copyright 2016 Salimullah Khan

বাজে জসীমউদ্দীন

jasim-uddinজসীমউদ্দীনের ‘সৃজনী প্রতিভা’ কেন অল্পদিনেই নিঃশেষ হইয়া গেল, তাহার এক অভিনব ব্যাখ্যা উপস্থিত করিয়াছিলেন ভারতের বিখ্যাত লেখক হুমায়ুন কবির। হুমায়ুন কবির এক ঢিলে দুই পাখি মারিতে চাহিয়াছিলেন। তাঁহার বিচারে দেশের গণমানসের অন্তর্নিহিত শক্তিকে কাজে রূপান্তরিত করিয়াছিলেন জসীমউদ্দীন। সেই রূপান্তর যতটুকু করিতে পারিয়াছিলেন তিনি, তাঁহার কাব্যসিদ্ধিও ঠিক ততখানিই।

কিন্তু কবির বলিয়াছিলেন, গণমানসের অনুবাদই প্রতিভাবানের একমাত্র ধর্ম নয়। তাঁহাকে সেই মানসের সংগঠনেও রূপান্তর ঘটাইতে হইবে। মানসের সংগঠনে সেই রূপান্তর হয় নাই বলিয়াই জসীমউদ্দীনের ‘সৃজনী প্রতিভা’ অল্পদিনেই শেষ হইয়া আসিল। গণমানসের অন্তর্নিহিত শক্তি তাঁহার ঘাড়ে চড়িয়াছে বটে, তবে ‘কল্পনা ও আবেগের নতুন নতুন রাজ্য’ জয়ে তিনি অগ্রসর হইতে পারেন নাই। আত্মকেন্দ্রিক পুনরাবৃত্তির মধ্যে তাঁহার সাধনার অগতি এই সত্যেরই পরিণতি। (কবির ২০০২: ৬১)

হুমায়ুন কবির যশস্বী বিচারক। তাঁহার কথা অনেকেই মানিয়া লইয়াছেন। (মুখোপাধ্যায় ২০০৪: ৫০-৫১)

সান্ত্বনার কথা, হুমায়ুন কবিরের ধারণা যদি সত্য হয়, তো জসীমউদ্দীন একা নহেন। একজন অন্তত সঙ্গী আছেন তাঁহার। তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। হুমায়ুন কবির লিখিয়াছেন, নজরুল ইসলামও নিপীড়িত জনমানসের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে রূপ দেওয়ার সাধনা করিয়াছিলেন। তাঁহার বিশ্বাস, নজরুল ইসলাম ‘পুরাতন পুঁথিসাহিত্যের আবহাওয়ায় লালিত’। আর বাংলার বিপুল মুসলমান কৃষকশ্রেণীর সহিত তাঁহার ‘সহজ আত্মীয়তা’ এই কারণেই। পুরাতন ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনের মধ্যেই—হুমায়ুন কবির দেখিয়াছেন— নজরুল ইসলামের ‘ভাষা ও ভঙ্গিতে বিধৃত বিপ্লবধর্ম’।

নজরুল ইসলাম ও জসীমউদ্দীন দুইজনকেই নির্দ্বিধায় তিনি বলিয়াছেন ‘পশ্চাদমুখী’। এখনকার ভাষায় আমরা হয়তো বলিব ‘প্রতিক্রিয়াশীল’। হুমায়ুন কবিরের প্রবন্ধটি বাহির হইয়াছিল বাংলা ১৩৪৯ সালে। ১৬ বৎসর পরে মুদ্রিত দ্বিতীয় সংস্করণেও তিনি এই মত বদলাইবার প্রয়োজন অনুভব করেন নাই।

হুমায়ুন কবিরের এই অভিমত অবশ্য আচানক কি সম্পূর্ণ আনকোরা ছিল না। নজরুল ইসলাম আর জসীমউদ্দীন দুই জনেরই প্রতিভা কেন অল্পদিনে নিঃশেষ হইয়া যাইবে তাহা খানিক ভবিষ্যদ্বাণী আকারে বলিয়াছিলেন কাজী আবদুল ওদুদও। ইংরেজি ১৯৩২ সালের ২৬ ডিসেম্বর কলিকাতায় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সম্মিলনের পঞ্চম অধিবেশনে তিনি জানাইয়াছিলেন, এই দুইজন মুসলমান সাহিত্যিক ‘ভাগ্যবান’, কেননা তাঁহারা বৃহত্তর দেশের—মানে দেশের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের—সমাদর লাভ করিয়াছেন।

একই কথাটি তিনি আরও সাজাইয়া-গুছাইয়া বলিলেন ইংরেজি ১৯৪৫ সালে। কাজী আবদুল ওদুদের লেখা সাধু বাংলায় তর্জমা করিয়া দিতেছি:

‘নজরুল ইসলাম একালের বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে প্রথম সাহিত্যিক যিনি বাংলার মুসলমান ও হিন্দু উভয়ের চিত্ত আন্দোলিত করিতে সক্ষম হইলেন। তাঁহার পূর্বে একালেও শক্তিশালী মুসলিম সাহিত্যিক যে বাংলায় না জন্মিয়াছেন তাহা নয়। মীর মোশাররফ হোসেন, কায়কোবাদ, এয়াকুব আলি চৌধুরী, লুৎফর রহমান, বেগম রোকেয়া, কাজী ইমদাদুল হক প্রভৃতির নাম একালের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্মরণীয় হইয়া থাকিবে। কিন্তু নজরুল ইসলামই হইতেছেন এযুগের প্রথম বাঙালি মুসলমান যিনি সমস্ত দেশের সম্ভ্রম ও সমাদর লাভ করিলেন। শুধু বাংলায় নয় ভারতেও তাঁহার যশ আজ ছড়াইয়া পড়িয়াছে। তাঁহার পরে সমস্ত দেশের সমাদর লাভ করিয়াছেন মুসলমান পল্লী-কবি জসীমউদ্দীন।’ (ওদুদ ১৯৮৩: ৭৬)

কাজী আবদুল ওদুদ সদা সত্যকথা বলিবেন, কদাচ মিথ্যা বলিবেন না। সেই ১৯৩২ সালেই তিনি জানাইয়াছিলেন, ‘এই দুই তরুণ শিল্পী’ ধন্য হইয়াছিলেন সে কালের ‘মুসলমান সমাজের অন্তরে’ তাহার সাহিত্যিক সার্থকতা সম্বন্ধে এক নব আশার সঞ্চার করিবার কারণে।

তাঁহারা যে অদূর ভবিষ্যতে আর ধন্য হইবেন না, অবাঞ্ছিত হইয়া যাইবেন তাহার ইঙ্গিতও তিনি করিতে কসুর করেন নাই। ওদুদ বলিতেছিলেন, ‘বাংলার মুসলমান সমাজে তখন সাহিত্যচর্চার যে অবস্থা, অর্থাৎ লেখক ও পাঠকের যে সমন্ধ’ তাহা শুদ্ধ অসন্তোষজনকই নয়, অনেকখানি আপত্তিকরও। ওদুদের কথার সরল তর্জমা করিতেছি: ‘পাঠক-সমাজের বিচার-শক্তি এখনো অত্যন্ত দুর্বল, সেই দুর্বলতার সুযোগ পুরাপুরি লইবার উদ্দেশ্যে আমাদের অনেক লেখককে অনেক সময়ে দেখিতে পাওয়া যায় অত্যন্ত অকিঞ্চিৎকর রচনায় হাত দিতে।’ (ওদুদ ১৯৮৩: ২৬৯)

 

হুমায়ুন কবির ও কাজী আবদুল ওদুদের কথার জওয়াব লিখিবার সময় নজরুল ইসলামের হয় নাই। জসিমউদ্দীনও সরাসরি জওয়াব লিখিয়াছিলেন কি না আমার তাহা জানিবার সুযোগ ঘটে নাই। তাঁহার অনেক লেখা—বিশেষ প্রবন্ধনিবন্ধ এখনও পত্রপত্রিকায় ছড়ানো। এই বিষয়ে জসীমউদ্দীনকে ভাগ্যবান বলিলে সত্যের অপলাপ হইতে পারে। তাঁহার পুত্র-কন্যারাও এই সম্বন্ধে সত্যকার দায়িত্বশীল বলিয়া গণ্য হইবেন না। রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা তুলিয়া লজ্জা পাইতে চাহি না।

পাকিস্তান আমলে কোন এক লেখায় সৈয়দ আলী আশরাফও একই নালিশের পুনরুক্তি করিলেন। ১৯৫১ নাগাদ মাটির কান্না বইটি পড়িয়া তিনিও বলিলেন জসীমউদ্দীন আর নতুন কিছু লিখিতে পারিতেছেন না। কবির বিদেশি তর্জমাকারিনী শ্রীমতি বার্বারা পেইন্টার জানাইয়াছেন জসীমউদ্দীন সেই নালিশ কবুল করেন নাই। তিনি বরং ঘৃণাভরে এই ব্যাখ্যা নাকচ করিয়াছিলেন। ( জসীমউদ্দীন ১৯৬৯: ২৬)

করাই স্বাভাবিক। তাহার কিছু প্রমাণ আমিও অন্য জায়গায় পাইতেছি। সওগাত পত্রিকায় পত্রস্থ এক লেখায় জসীমউদ্দীনের সাক্ষ্য পাওয়া যায়। তাঁহার দৃষ্টি আলাদা। জসীমউদ্দীন নিজেকে শুদ্ধ মুসলমানের কবি কিংবা গ্রামাঞ্চলের কবি পরিচয়ে আটক রাখিতে চাহেন নাই। তিনি যাহা করিতে চাহিয়াছেন তাহা ‘জনসাধারণের’ সাহিত্য।

পরাধীন যুগে যে বাংলা সাহিত্য গড়িয়া উঠিয়াছিল জসীমউদ্দীন সেই সাহিত্যের নাম দিয়াছেন ‘জমিদার ও ডেপুটি সাহিত্য’। তিনি লিখিয়াছেন, ‘এতদিন সাহিত্য ছিল দেশের বড়লোকদের হাতে। আমাদের বাঙলা-সাহিত্য এই সেদিনও জমিদার ও ডেপুটিদের হাতে ছিল।’ (জসীমউদ্দীন ২০০১খ: ৩১)

ইঁহাদের হাতে দেশের জনসাধারণের সাহিত্য গড়িয়া উঠিবার আশা করা বাতুলতা। কিন্তু তাহার পরও কথা থাকিয়া যায়। জসীমউদ্দীন তাহা আমল করিতে ভুল করেন নাই। তিনি বলিলেন, এই দেশের জনসাধারণ নিজেদের আনন্দ দিবার জন্য যে সাহিত্যের নীড়টি গড়িয়া তুলিয়াছিল, ইঁহারা ‘রুচি, নীতি এবং সমালোচনার কষাঘাতে’ তাহা ভাঙিয়া চুরমার করিয়া দিয়াছেন। এই অপরাধে ‘মহাকালের দরজায়’ ইঁহাদের জবাবদিহি করিতে হইবে।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস হইতে জসীমউদ্দীন কিছু সাক্ষ্যসহায় কুড়াইয়া আনিয়াছেন। স্বয়ং বাংলা ভাষার অবস্থিতিতেই প্রমাণ, এই সাহিত্য বড়লোকি সংস্কৃত সাহিত্য বর্জন করিয়াই নিজের পায়ে দাঁড়াইয়াছিল।

জসীমউদ্দীনের কথার সারমর্ম গ্রহণ করিলে এই দাঁড়াইতেছে। বাংলা সাহিত্য একদিন বিরাট সংস্কৃত সাহিত্যের সামনে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইয়াছিল। সেই কারণেই সেইদিন জয়যুক্ত হইয়াছিল জনসাধারণের রসপিপাসা। আমরা এখন যে পদার্থকে কখনও ‘জাতীয় সাহিত্য’ বলিয়া শ্লাঘা অনুভব করিতেছি তাহাই জসীমউদ্দীনের বুলিতে শুনাইত ‘জনসাধারণের সাহিত্য’।

তিনি লিখিয়াছেন, আমাদের দেশে ইংরেজের দখল কায়েম হইবার আগে পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য বলিতে আমরা ‘জনসাধারণের সাহিত্য’ বুঝিতাম। তিনি অবশ্য একথা কবুলও করিয়াছেন সংস্কৃত সাহিত্য হইতে কোন কোন কবি মণিমাণিক্য আহরণ করিয়াছিলেন, ‘কিন্তু মোটামুটি বাংলা সাহিত্য ছিল জনসাধারণের সাহিত্য।’ বাংলার মনসামঙ্গল, কবিকঙ্কণ চণ্ডী, অগণিত বৈষ্ণব কবিতা—এইগুলিকে জসীমউদ্দীন ‘গণ-সাহিত্যের পর্যায়ে’ ফেলিয়াছিলেন। (জসীমউদ্দীন ২০০১খ: ৩২)

তিনি দেখাইয়াছেন চৈতন্যের আন্দোলন আমাদের কোন ক্ষতি করে নাই। তাঁহারাও জনসাধারণের জন্য সাহিত্য রচনা করিয়াছিলেন। ‘কারণ, চৈতন্যের ধর্ম ছিল জনসাধারণের জন্য।’ কবিকঙ্কণ চণ্ডীর ‘দুর্গার কাঁচলী’ নির্মাণের সঙ্গে গাজীর গানের ‘শাড়ির বর্ণনা’, মনসামঙ্গলের বাইশ কাহন নৌকার বর্ণনার সঙ্গে গ্রাম্যগানের চৌদ্দ ডিঙ্গা মধুকোষের বর্ণনার তুলনা করিবার প্রস্তাবও তিনি পেশ করিয়াছেন। বংশীদাস, লোচনদাস, বলরামদাস, চণ্ডীদাস ও জ্ঞানদাসের পদাবলীর সহিত গ্রাম্যগানের যোগ তিনি আবিষ্কার করিয়াছেন।

হুমায়ুন কবিরের সহিত জসীমউদ্দীনের পার্থক্যের গোড়া আমরা এই জায়গাতেই দেখিতে পাইতেছি। হুমায়ুন কবির লিখিয়াছিলেন, বাংলার জীর্ণ পুরাতন সামন্ততন্ত্রের বোঁটা আলগা হইয়া আসিয়াছিল। এয়ুরোপের পহিলা ধাক্কা লাগিতেই তাহা পাকা ফলের মতন খসিয়া পড়িল। এয়ুরোপের বাড়ন্ত ধনতন্ত্র সেদিন বিপ্লবী শক্তি হিসাবেই বাংলায় আসিয়াছিল। আনিয়াছিল নতুন অর্থনৈতিক সংগঠনের সম্ভাবনা ও নতুন জগতের ভাবধারা। তাহার ফলে বাংলার কাব্যধারার বিপ্লবী রূপান্তর হইল। শুরু হইল বাংলার কাব্যের নবযুগ। তাঁহার উচ্ছ্বাসের সঙ্গে অনেকেই গা ভাসাইয়া দিবেন—বলিবেন এয়ুরোপের ছোঁয়ায় বাংলা কাব্যের পরিণতি হইয়াছে বিস্ময়কর। আজ বাংলার কাব্যসাহিত্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যের পর্যায়ে আসিয়া পৌঁছিয়াছে। (কবির ২০০২: ৩৩-৩৪)

জসীমউদ্দীনের দেখা একেবারেই আলাদা জায়গা হইতে। তিনি বলিলেন, ইংরেজ জাতির আগমনের পরে এয়ুরোপের ‘তীব্র মদিরা’ পান করিয়া আমরা ধীরে ধীরে সব খোয়াইলাম। খাঁটি এয়ুরোপের ভাবে বিভোর হইয়া সংস্কৃত অলংকার ও শব্দশাস্ত্রের পানপাত্র ভরিয়া মাইকেল যে কাব্যরস আমাদের পরিবেশন করিলেন তাঁহার সঙ্গে সঙ্গেই তাহা নিঃশেষ হইয়া গেল।

মাইকেল—জসীমউদ্দীন বলিতেছেন—অবশ্য বাংলা ভাষায় তাঁহার অসামান্য প্রতিভার জন্য বাঁচিয়া থাকিবেন। কিন্তু কাব্যের যে নতুন নাট্যমঞ্চ তিনি খুলিয়াছিলেন, যেখানে হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র প্রভৃতি দিকপাল আসর জমাইতে প্রয়াস পাইয়াছিলেন, তাহা অল্পদিনেই ভাঙ্গিয়া গেল। জসীমউদ্দীনের মতে, মাইকেলের কাব্যধারাটি যে বাংলাদেশে টিকিল না, তাহার কারণ বাংলার মাটির সঙ্গে তাঁহার কাব্যের ধারা শিকড় গাড়িতে পারে নাই।

গল্প বুনিবার যে ধারাটি মধুসূদন, হেমচন্দ্র ও নবীনচন্দ্র গ্রহণ করিলেন—জসীমউদ্দীন বলিতেছেন—তাহার সহিত বাংলার মাটির যোগ ছিল না। সেইজন্য বাংলার মাটিতে তাঁহারা শিকড় গাড়িতে পারেন নাই। গল্প বুননের যে ধারাটি চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল, রামায়ণ প্রভৃতি কাব্যে চলিতেছিল মধু হেম নবীনের ধারা তাহার সহিত কোন যোগ রাখে নাই।

এখন কি কর্তব্য? মনসামঙ্গলের, চণ্ডীমঙ্গলের বুননির উপর যদি কোন কবি মিল্টন ও হোমারের কাব্যধারার সংযোগ স্থাপন করিতে পারেন, তবেই তিনি বাংলায় অমর হইয়া থাকিবেন। জসীমউদ্দীন বলিলেন এ পদার্থ হয়তো অসম্ভব ঠেকিতে পারে। কিন্তু সাহিত্যের ইতিহাস তো ‘অসম্ভবকে সম্ভব করা’রই অপর নাম। এই জায়গায় জসীমউদ্দীন খোদ মধুসূদনকেই সাক্ষী মানিলেন। কে জানিত বাংলা পয়ারের পুরাতন পানপাত্রের মধ্যে ব্ল্যাংক ভার্স তথা খোয়া পদ্যের গতিবৈচিত্র্য ভরা যাইতে পারে?

ইংরেজ এদেশে আসিয়া আমাদের মধ্যে হিন্দু মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় সৃষ্টি করিলেন। কারণ সহজ। তাঁহাদের মধ্যেই ইংরেজ জাতি নিজেদের সমর্থক খুঁজিয়া পাইলেন। নতুন যে মধ্যবিত্ত হিন্দু দলটি নতুন শহরে আসিয়া আস্তানা তুলিলেন তাহাতে শহরের কোন বনিয়াদ ছিল না। তাহাতে ইংরেজের নগরে এয়ুরোপের পানপাত্র তাঁহারা পরিপূর্ণ মনে গ্রহণ করিলেন। শুদ্ধ কি তাহাই? নিজের দেশের গ্রাম্য জীবনের প্রাচীন ভাবধারার বনিয়াদও লাথি মারিয়া দূরে ছুঁড়িয়া ফেলিলেন তাঁহারা।

জসীমউদ্দীন সালিশ করিলেন। বলিলেন, বাংলা সাহিত্যের উৎসাহ দিবার ভার যতদিন মুসলমান রাজাদের হাতে ছিল, ততদিন তাহা জনসাধারণের সাহিত্য ছিল। ‘কারণ, আমাদের ধর্ম’, জসীমউদ্দীন বলিতেছেন, ‘জনসাধারণকে নিয়ে’। ইংরেজ আসিবার পরে বাংলাদেশ হইতে মুসলমানের প্রভাব নষ্ট হইয়া গেল। বাংলা সাহিত্য মুষ্টিমেয় কয়েকজন ভদ্রলোকের সাহিত্য হইয়া দাঁড়াইল। (জসীমউদ্দীন ২০০১খ: ৩৩-৩৪)

এদিকে হুমায়ুন কবিরের রায় ইহার ষোল আনাই বিপরীত। বাংলার ইতিহাস তিনি অন্য জায়গা হইতে পড়িয়াছেন। তাঁহার বিচারে নবাবী আমলে ফারসি সাহিত্যের প্রভাব বাংলাকে নানাভাবে আচ্ছন্ন করিয়াছে কিন্তু সে প্রভাব ছিল ভারতের আর দশ ভাষার উপরেও সমান কার্যকর। তাঁহার যুক্তি অনুসারে, অন্যান্য দেশজ ভাষার তুলনায় বিকাশের বিচারে বাংলার কাব্য সর্বশ্রেষ্ঠ। আর কোন ভারতীয় ভাষাতেই সাহিত্য সাধনা বোধ হয় এতখানি সিদ্ধিলাভ করে নাই। কিন্তু তিনি দাবি করিতেছেন ফারসির এই সর্বভারতীয় প্রভাবের ফলে ভারতের অন্যান্য ভাষার কাব্যের তুলনায় বাংলার কাব্যে কোন মূলগত পার্থক্য দেখা দেয় নাই। কবিরের ভাষায়, ‘সেদিনকার বাংলা কাব্যের উৎকর্ষ তাই গুণে এবং পরিমাণে—স্বভাবে নয়।’

কবির সিদ্ধান্ত করিয়াছেন উনিশ শতকের মাঝামাঝি হইতে বাংলার কাব্য বিকাশের যে নতুন ধারা শুরু হইল, তাহা আগাগোড়াই নতুন। ভারতের আর দশ ভাষা হইতে শুদ্ধ গুণে বা পরিমাণে নয়, গোত্রেও আলাদা হইয়া গেল বাংলার কাব্য। এই ঘটনার নাম তিনি রাখিয়াছেন বাংলার কাব্যের ‘বিস্ময়কর পরিণতি’। (কবির ২০০২: ৩৪)

জসীমউদ্দীন স্বভাবতই এই বিচারের সহিত একাত্ম হইবেন না। তিনি মনে করেন বাংলার নতুন কবিতার মধ্যেও দেশের ধারা কতক মিলিয়াছে। আর ইহাই রবীন্দ্রনাথকে মধুসূদন হইতে আলাদা করিবার কারণ। বাঙালি রবীন্দ্রনাথকে কতক গ্রহণ করিয়াছে, কারণ তাঁহার কবিতায় রহিয়াছে চারিশক্তির সমাহার—সংস্কৃত, বৈষ্ণব, বাংলার জাতীয় বা লোকজ এবং এয়ুরোপীয়। জসীমউদ্দীনের কথায়, ‘বিহারীলালের লিরিকের ধারাটি’ রবীন্দ্রনাথে আসিয়া টিকিয়া রহিল। (জসীমউদ্দীন ২০০১খ: ৩৩)

হুমায়ুন কবির ও কাজী আবদুল ওদুদের মতন অনেক মনীষী দাবি করিয়াছেন ‘পুরাতন ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন’ ছাড়া নজরুল ইসলাম ও জসীমউদ্দীন আর কিছুই করেন নাই। জসীমউদ্দীন বলিলেন কথাটি পুরাপুরি সত্য নয়। নজরুল ইসলাম তাঁহার রচনায় আরবি, পারসি বহু শব্দ প্রয়োগ করিয়াছেন একথা অসত্য নয়। কিন্তু একটা পার্থক্যের কথাও এখানে মনে রাখিতে হইবে। তিনি বাংলা সাহিত্যকে হিন্দু ও মুসলমান ভাগে ভাগ করিবার চেষ্টা করেন নাই।

জসীমউদ্দীন লিখিয়াছেন, নজরুল ইসলাম পুঁথি সাহিত্যের মানসপুত্র নহেন। তিনি তাঁহার অনেক লেখায় বরং পুঁথি সাহিত্যকে অবহেলা আর বিদ্রূপই করিয়াছেন। জসীমউদ্দীন কহিতেছেন, ‘তিনি যে কোনদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে এই পুঁথি সাহিত্য উপভোগ করিয়াছিলেন তাহারও প্রমাণ পাওয়া যায় না।’ তাঁহার রচনা হইতে খানিক তুলিয়া লইতেছি:

‘পুঁথি সাহিত্যের লেখকরা আরবী, পারসী শব্দের ধ্বনিতরঙ্গ না বুঝিয়াই এবড়োথেবড়োভাবে যেখানে ভাব প্রকাশের উপযুক্ত বাঙলা শব্দ খুঁজিয়া পান নাই সেখানে ইচ্ছামত আরবী পারসী শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন। নজরুল আরবী, পারসী শব্দের ধ্বনিতরঙ্গ বুঝিয়া কোন [কোন] রচনার মধ্যে মুসলমানী আবহাওয়া ফুটাইয়া তুলিতে এইসব শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন।’ (জসীমউদ্দীন ২০০১ক: ১০২-৩)

আমাকে লেখা এখানেই শেষ করিতে হইতেছে। শুদ্ধ একটি কথা যোগ করিয়া শেষ করিব। জসীমউদ্দীন নজরুল ইসলামকে ভর করিয়া পরোক্ষে নিজের সাফাইও গাহিয়াছেন। গাহিয়া মোটেও অন্যায় করেন নাই। তাঁহার নালিশের জবাব হুমায়ুন কবির কেন, কেহই দিতে পারিবে না। বাংলা ১৩৫০ সালে জসীমউদ্দীন লিখিয়াছিলেন, বাংলা সাহিত্য শুদ্ধমাত্র দেশের মধ্যবিত্ত সমাজের পকেটেই আবদ্ধ রহিল। দেশের জনসাধারণ আর ইহার অন্দর মহলে প্রবেশ করিতে পারিল না। আবদুল কাদিরকে লেখা পত্রের এক জায়গায় এই দুঃখই বিশদ করিতেছেন তিনি। আমি সাধু ভাষায় তাঁহার তর্জমা লিখিলাম:

‘আজ যত করিয়াই আমরা বঙ্কিমচন্দ্র, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের জন্য গৌরব বোধ করি না কেন, একথা ভাবিতে সত্যই বড় কষ্ট। আজ বঙ্গভাষার বংশীধ্বনিতে যমুনা উজান বহে না, শ্যামলী ধবলী গৃহে চলে না। বাংলার নবেল উপন্যাস শুধু কলিকাতাবাসী কয়েকজন মধ্যবিত্ত লোকের কথায় ভরা। দেশের জনসাধারণ তাহার ভিতরে নিজেদের খুঁজিয়া পায় না।’ (জসীমউদ্দীন ২০০১ক: ৩৪)

জসীমউদ্দীনের সিদ্ধান্ত আজ এই অভাজন আমাকেও নতুন করিয়া ভাবাইতেছে। কারণ আমি তাঁহার বাজে লিখিতেছি। তিনি বলিতেন, সাহিত্য যেমন বিশ্বের তেমনি তাহা ঘরেরও। বিশ্বসাহিত্যই বল আর সাম্প্রদায়িক সাহিত্যই বল, সব সাহিত্যই তৈরি হয় ঘরের প্রদীপ জ্বালাইবার জন্য। যে সাহিত্য ঘরে প্রদীপ জ্বালাইল না, সে সাহিত্য বিশ্বেও আলোকপাত করিতে পারিবে না। দেশের জনসাধারণের জন্যই এ সাহিত্য তৈরি হয়।

দোহাই

১. কাজী আবদুল ওদুদ, শাশ্বত বঙ্গ, ২য় মুদ্রণ (ঢাকা: ব্র্যাক প্রকাশনা, ১৯৮৩)।

২. জসীমউদ্দীন, জসীমউদ্দীনের প্রবন্ধসমূহ, ১ম খণ্ড, ২য় মুদ্রণ (ঢাকা: পলাশ প্রকাশনী, ২০০১ক)।

৩. জসীমউদ্দীন, জসীমউদ্দীনের প্রবন্ধসমূহ, ২য় খণ্ড, ১ম প্রকাশ (ঢাকা: পলাশ প্রকাশনী, ২০০১খ) ।

৪. হুমায়ুন কবির, বাঙলার কাব্য, ২য় সংস্করণ, পুনর্মুদ্রণ (ঢাকা: বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ২০০২)।

৫. সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়, জসীমউদ্দীন: কবি মানস ও কাব্য সাধনা, ২য় মুদ্রণ (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ২০০৪)।

৬. Jasim Uddin, Gipsy Wharf (Sojan Badiar Ghat), B. Painter and Y. Lovelock, trans. (London: George Allen and Unwin, 1969).

প্রথম প্রকাশঃ দৈনিক প্রথম আলো। ১৮ মার্চ ২০১১।

আমার বন্ধু তারেক মাসুদ

‘I have not purchased my freedom through writing.’

– Franz Kafka, 1922

‘লেখার বিনিময়ে আমি আমার স্বাধীনতা কিনিয়া রাখি নাই।’

–ফ্রান্স কাফকা, ১৯২২

তারেক মাসুদের এন্তেকালের পরদিন সকালে উঠিয়া ‘আমার শিক্ষক তারেক মাসুদ’ নাম দিয়া একটি লেখা লিখিয়াছিলাম। আজকের লেখাটির নাম সামান্য বদলাইয়া রাখিলাম ‘আমার বন্ধু তারেক মাসুদ’। যিনি শিক্ষক তিনিই বন্ধু। আমার শিক্ষকের কথা এক নিবন্ধে শেষ করিতে পারি নাই। এখানে কিছু উদ্বৃত্ত কথা বলিব। কথা আরও থাকিলে পরে বলিব। আর উপায় কি?

তারেক মাসুদ, সলিমুল্লাহ খান ও আলম খোরশেদ [tarequemasud.org থেকে নেওয়া]

তারেক মাসুদ, সলিমুল্লাহ খান ও আলম খোরশেদ [tarequemasud.org থেকে নেওয়া]

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দশকে পড়িতে আসিয়াছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আসিয়া যে কয়জন গুণীর দেখা পাইয়াছিলাম তাঁহাদের মধ্যে তারেক মাসুদ স্থান ছিলেন সমুখে, প্রথম সারিতে। তিনি বলিয়াছিলেন চলচ্চিত্র করিবেন। আর আমি শুরুতেই এক প্রকার ধরিয়া লইয়াছিলাম নাম করিবেন। তিনি আমাকে নিরাশ করেন নাই। তারেক মাসুদের সাধনা বিফলে যায় নাই। তিনি শুদ্ধ নামই করেন নাই, তাহার মানও হইয়াছে। শুদ্ধ পুরস্কারই পাইয়াছেন এমত নহে, সত্যকার মহত্ত্বও তিনি অর্জন করিয়াছেন। তাঁহার ছবি সমাদৃত হইয়াছে, আর্থিক অনটনের কঠোর কশাঘাতে তাহাকে শেষ পর্যন্ত জর্জরিত থাকিতে হয় নাই।

আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইয়াছি। কিছুদিন হয় দেশে একটা দুর্ভিক্ষ, বেশ কয়েকটা রক্তঝরা অভ্যুত্থান ঘটিয়া গিয়াছে। দেশ স্বাধীন হইবার পাঁচ-ছয় বৎসর পরের কথা। দেশের ভবিষ্যত লইয়া নানান জল্পনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সমুখে শরিফ মিয়ার ক্যান্টিন বলিয়া একটি পরম রমণীয় খাবারের দোকান ছিল সেই সময়। সেখানেই একদিন দেখা তারেক মাসুদের সঙ্গে। পরিচয়স্বরূপ জানিলাম তিনি একাধারে ইতিহাস বিভাগ আর অন্যদিকে লেখক শিবিরে দাখেল হইয়াছেন। তখন লেখক শিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় আরো ছিলেন পিয়াস করিম। মোহন রায়হান ঢাকা কলেজের ছাত্র। তাঁহার প্রথম কেতাব ‘জ্বলে উঠি সাহসী মানুষ’ পহিলা ছাপা হইয়াছিল বাঙলাদেশ লেখক শিবিরের পতাকাতলে।

আমি লেখক শিবিরের ছায়াতলে কখনও ভিড়িবার জায়গা পাই নাই। তারেক আর মোহনের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই আমার পরিচয় ঘটে মহাত্মা আহমদ ছফার সহিত। হয়ত সেই কারণেই। লেখক শিবিরের ইতিহাস আহমদ ছফার মুখে কিছু শুনিয়াছিলাম। তাহাতেই আমার উৎসাহে ভাটা পড়ে। ছফা জানাইয়াছিলেন তিনিও ছিলেন লেখক শিবিরের আদিকালীন উদ্যোক্তাদের দলে। আদিকাল মানে বাংলাদেশ স্বাধীন হইবার আগের কাল। ঐসময় যাঁহারা ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’ প্রতিষ্ঠাকর্মটিকে মোটেও সুনজরে দেখেন নাই–বরং প্রকারান্তরে প্রতিকুলতা করিয়াছিলেন, স্বাধীনদেশে তাঁহারাই শিবিরটি দখল করিয়া লইলেন আর প্রতিষ্ঠাতাদের দিলেন বাহির করিয়া। এরকম জীবিত অন্যায়ের খবর জানিয়াশুনিয়া কি করিয়া সেই শিবিরে যোগ দিই!

একটুখানি পিছনের কথা না বলিলে ভুল ধারণা হইতে পারে। দেশ স্বাধীন হইবার পর যাহারা সরকারি দল কিংবা খোদ সরকারেরই গরিব আত্মীয় শ্রেণীর বা দুই নম্বর দল করিতেন না তাহাদের আশ্রয়স্থল হয় লেখক শিবির নামা প্রতিষ্ঠানটি। ‘প্রতিষ্ঠান’ না বলিয়া ইহাকে ‘অনুষ্ঠান’ বলিলে অন্যায় হয় না। ১৯৭১ সালের গোড়ায় রক্তঝরা সংগ্রামের দিনে গঠিত হইয়াছিল ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’। তার আগে ১৯৬০ সালের যুগে পাকিস্তান সরকারের আজ্ঞাবহ মধ্যম শ্রেণীর লেখকরা ভিড়িয়াছিলেন পাকিস্তান লেখক সংঘ নামা সরকারি শিবিরে। অনেকের মনে আছে দেশ স্বাধীনের আগে এই দলের ছাত্র শাখাটির নাম ‘ইসলামী ছাত্র সংঘ’ ছিল। লেখক শিবিরের আগুনটুকু চুরি করিয়া স্বাধীন বাংলাদেশে ইহারা ‘ইসলামী ছাত্র শিবির’ নাম গ্রহণ করেন। আহমদ ছফা বলিতেন জামায়াত আমাদের নামটা ‘হাইজ্যাক’ করিয়াছে।

জানিতে পারিলাম নতুন লেখক শিবির হইতে আহমদ ছফা বিদায় হইয়াছেন। বদরুদ্দীন উমর সমুখে আসিয়াছেন। শিবিরের কয়েকজন কর্মকর্তা সেযুগে সরকারি কাগজ ‘বিচিত্রা’ ও ‘দৈনিক বাংলা’য় কাজ করিতেন। কেমন জানি তালগোল লাগিয়া গেল আমার মনে। এই মহাত্মারা আহমদ ছফার নামটি পর্যন্ত শুনিতে রাজি ছিলেন না। কালের প্রহারে ইঁহারা এতদিনে অনেক সরকারের সেবা করিয়া লইয়াছেন। বর্তমান সরকারও ব্যতিক্রম নহে। তারেক মাসুদকে এই দলের মধ্যে দেখিয়া আমার মনে একটি অঙ্কুশ বিন্ধিয়াই রহিল।

এই সময়ে কোথা হইতে জানি শেখ মোহাম্মদ ওরফে এস এম সুলতান ঢাকায় আবির্ভূত হইলেন। সুলতানকে ঢাকা শহরের মধ্যম শ্রেণীর চিত্রশিল্পীরা বড় সুনজরে দেখিতেন না। তাঁহাদের নজরকে উচিত শিক্ষা দিবার মহান উদ্দেশ্যে আহমদ ছফা সেই সময় ‘অভিনব উদ্ভাসন’ নামে একটি নীতিদীর্ঘ প্রবন্ধ রচিয়া ফেলিলেন। ১৯৭৭ ইংরেজি পার হইতেছে। আহমদ ছফার প্রবন্ধটি কতজনের মতামত বদলাইল তাহার কোন জরিপ হয় নাই। তবে অন্তত একজনের মতামত তাহাতে বদলাইয়াছিল জানি। তিনি তারেক মাসুদ। আহমদ ছফার লেখা পড়িয়া তিনি সুলতান আবিষ্কার করিলেন।

আর অনেক আগেই চলচ্চিত্রকে জীবনের ধ্রুবতারা ঘোষণা করিয়াছিলেন তারেক মাসুদ। সেখানে আসিয়া দাঁড়াইলেন ‘কালপুরুষ’ এস এম সুলতান। তাঁহার ছবি লইয়া চলন্ত ছবি বানাইবেন তিনি। নাম রাখিলেন কোমল শব্দে ‘আদমসুরত’। যাহারা এই ছবি দেখিবেন তাহারা এই আরবি-ফারসি নামটা খুব পছন্দ করিবেন ভাবিয়া নাম রাখেন নাই তিনি। উঠন্তি মুলো পত্তনেই চিনা গিয়াছিল। শুদ্ধ উচ্চাভিলাষ নহে, দৃঢ়চেতনাও তারেক মাসুদের আরেক নাম। ‘আদমসুরত’ তারেকের পহিলা সৃষ্টি। আমরা কথায় কথায় ‘আটপৌরে জীবন’ কথাটা বলিয়া থাকি। আটপৌরে কথাটার সংস্কৃত ‘অষ্টপ্রহর’ বা আট পাহারা। এস এম সুলতানের জীবনকে দিনের আট পাহারা আবর্তনের মধ্যে ধরিয়াছিলেন তারেক মাসুদ। সকাল দুপুর, সন্ধ্যা রাত্রি নিশীথ প্রভাত–এইভাবে তিনি একটি গানের মতো বাঁধিলেন শিল্পীর জীবনবৃত্ত–তাঁহার আট পাহারা।

এই ছবির মূল পদার্থ বাহির করিবার জন্য তারেক মাসুদ ও তাহার বন্ধু মিশুক মুনীর পাকিস্তানে গিয়াছিলেন। কারণ সুলতানের জীবনবৃত্তের এক চাপ সেখানেই থাকিয়া গিয়াছিল। করাচি লাহোর ঘুরিয়া তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর সেই ছবির ছবি তুলিয়া আসিলেন। তৈরি করিলেন শিল্পীর জীবনবৃত্ত। ঢাকার কূপমণ্ডুক মধ্যম শ্রেণীর খাইয়া পরিয়া এহেন ছবিতে হাত দেওয়া সহজ কাজ ছিল না। তারেক মাসুদ এই অসাধ্য সাধন করিলেন। কি করিয়া করিলেন আজও ভাবিয়া শেষ করি নাই।

লেখক শিবিরের সভ্য হইয়াও আহমদ ছফাকে অপাংক্তেয় ভাবেন নাই তারেক মাসুদ। এখানেই তাঁহার বিশেষত্ব। এখানেই তাঁহার মহত্ত্ব। লেখক শিবিরের নেতাদের সততা সম্পর্কে আমি ছিলাম সন্দিহান। তাঁহারাও আমাকে দেখিলে চুম্বন কি আলিঙ্গন করিতেন না। তারপরও তারেক এই অভাজন সম্পাদিত একটি পত্রিকার কমিটিতে নাম লিখাইতে কুণ্ঠা করেন নাই। এইখানে তারেক মাসুদের বুদ্ধিমত্তা। আসলে ইতিহাস শিবির ছফা প্রাক্সিস কোন কিছুই তারেককে বাঁধিতে পারে নাই। তাঁহার গন্তব্য ছিল অন্য কোথাও, অন্য কোনখানে ছিল তাঁহার ঘরদুয়ার। আমরা ছিলাম তাঁহার পান্থপথ–বলা যাইতে পারে নিতান্ত সরাইখানা।

তারেকের সহিত পরিচয়ের দুগ্ধ একটুখানি ঘন হইয়া আসিলে একদিন জানিতে পারিলাম তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসিয়াছেন মাদ্রাসার পথ পার হইয়া। কি করিয়া তিনি কৌমি মাদ্রাসায় ঢুকিয়াছিলেন আর কি করিয়াই বা ঐ খাঁচা হইতে ছাড়া পাইলেন তাঁহার বয়ান তদীয় কাহিনীচিত্র ‘মাটির ময়না’ যোগে কিছু পাওয়া যাইবে। যে কায়দায় তিনি কৌমি মাদ্রাসা ছাড়িয়াছিলেন একদিন সেই কায়দায় তিনি লেখক শিবিরের খাঁচা হইতেও বাহির হইয়া গেলেন। প্রশ্ন হইল, গেলেন কোন জায়গায়? সেই জায়গাটার পরিচয় এখনও লই নাই।

এই জায়গাটার নামই কি ‘স্বাধীনতা ব্যবসায়’? ইংরেজি মতে যাহাকে বলে ‘লিবরেল’ তাহার গোড়ায় আছে লিবর বা স্বাধীন কথাটা। সেই গোড়ার রসুন হইতেই তৈরি হইয়াছে ‘লিবাটির্’, ‘লিবারেলিজম’ প্রভৃতি অমুক পদের। তাই বলি লিবারেলিজম বা লিবরের ব্যবসায় মানে বাংলায় দাঁড়ায় ‘স্বাধীনতা ব্যবসায়’। তারেক মাসুদের সম্মানে সত্য বলা কর্তব্য। তাই প্রশ্ন করিতে হয় তিনিও কি শেষের দিকে স্বাধীনতা ব্যবসায়ের পথই ধরিয়াছিলেন?

আজ এ প্রশ্নের উত্তর পুরা করা চলিবে না। কেহ কেহ বলেন তারেক মাসুদ যৌবনের অপরাহ্নে খানিক দক্ষিণে ঝুঁকিয়াছিলেন। সূর্যদেব যখন মকরক্রান্তির কাছাকাছি তখনও আমরা বলি তিনি দক্ষিণে ঝুঁকিয়াছেন। যৌবনের আদৌভাগে তারেক মাসুদের স্বপ্ন ছিল শিল্পীর স্বাধীনতা। এস এম সুলতানের জীবনবৃত্ত বানাইয়া তাঁহার স্বপ্ন ভাঙ্গিল না। একটা জিনিশ স্থির হইল কাহারও চাকরি করিবেন না তিনি । ‘স্বাধীনতা’ হইল তাহার বীজমন্ত্র। চাকরি করিলে স্বাধীনতা রক্ষা করা যায় না। আর স্বাধীনতা রক্ষা করিলে জীবনটা তরল পদার্থের মতন হইয়া যাইবে, যে পাত্রে রাখিবেন জীবন তাহার আকার ধারণ করিবে, আপনি হইবেন দশের মজুর।

১৯৮০ সাল হইতে যে দশকের শুরু তাহাতে অনেক বন্যাপ্লাবন ঘটিয়া গেল। শুরু হইল ধনতন্ত্রের নতুন বিজয়। এ সময় জীবিকার ডাকে তারেক মাসুদকেও হাত পাতিতে হইল নানান কিসিমের সাম্রাজ্যবাদী কি ধনিকবাদী সংস্থার দক্ষিণা বিভাগে। একদা এ দেশে ব্রিটিশ ধনতন্ত্র আসন গাড়িয়াছিল শুদ্ধ কৃষক সমাজকে রক্ষা করিবার অজুহাতে। এক্ষণে তাহারা আসিলেন নারীজাতির মুক্তিমন্ত্র মূলধন করিয়া। এই যুগে তারেক মাসুদ ‘সোনার বেড়ী’ নামে একটি বিজ্ঞাপন ছবিও বানাইয়াছিলেন। সেই ছবি দেখিবার দুর্ভাগ্য আমার হইয়াছিল মার্কিন মুলুকে। শিল্পী ও লেখকের দারিদ্র আমাদের সম্পূর্ণ অজানা জিনিস নহে। তারপরও আমি জানিতাম তারেক মাসুদ তাঁহার লক্ষ্য ছাড়িবেন না। তিনি লড়াই করিবেন।

muktir gaan

১৯৮৯ সালের আগেপরে কোন এক সময় তারেক মাসুদের মার্কিন মুলুকযাত্রা। সেখানে তাঁহার সহিত আমার বন্ধুত্ব অভিমানের দ্বিতীয় যুগ। আমি গিয়া পহুঁছিয়াছিলাম দুই কি তিন বছর আগে। তখন একে একে গিয়া জুটিয়াছিলেন আলম খোরশেদ, নাসির আলী মামুন। আর মাহমুদ হক নামে আমাদের আরেক বন্ধু আগে হইতেই ওখানে। সারা দুনিয়া জুড়িয়া তখন পট পরিবর্তনের হাওয়া বহিতেছে। দেশের স্বৈরশাসন হটাইবার জন্য মধ্যম শ্রেণীর নেতারা মধ্যে মধ্যে বিদেশ সফর করিতেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ততদিনে ইতিহাসের বিষয় হইয়া উঠিয়াছে। এই সময়ই তারেক মাসুদ তাঁহার ‘মুক্তির গান’ ছবিটি খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ হইতে যে সকল শরণার্থী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে আশ্রয় লইয়াছিলেন এই ছবি তাহাদের লইয়া। চিত্রগুলি গ্রহণ করিয়াছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হইতে সদলবলে উপনীত সাংবাদিক লিয়র লেবিন। এই দলিলচিত্রমণ্ডলী বা ফুটেজ আনুমানিক বিশ বছর ধরিয়া কোন বাড়ির গুদামঘরে হাজিয়া মজিয়া যাইতেছিল। তারেক সাধনাবলে এই খনি আবিষ্কার করিলেন। এই আবিষ্কার তারেক মাসুদের সেরা কীর্তির মধ্যে। সম্পাদনা করিয়া যে ছবি তিনি দাঁড় করাইলেন তাহাকে সম্পূর্ণ নতুন ছবি বলিতে হইবে। ছবির শুরুতে তিনি জহির রায়হান নির্মিত ‘স্টপ জেনোসাইড’ ছবির অংশবিশেষ কাজে লাগাইলেন আর শেষে কিছু অংশে গেরিলাযুদ্ধের অভিনয় জুড়িয়া দিলেন।

যে গানের দলটি শিবিরে শিবিরে উদ্দীপনাময় গান গাহিয়া দেশত্যাগী শরণার্থীদের (আর কখনও কখনও দেশের ভিতরে আসিয়া মুক্তিযোদ্ধা সৈনিকদের) সাহস যোগাইতেন তাঁহাদের অনেকের সহিতই তারেক মাসুদ পরিচিত ছিলেন। এমনকি তাঁহার পরিবারের সদস্যরাও ইহার মধ্যে জীবনধারণ বা চলাফেরা করিতেছেন। ফলে এই ছবির মূল্য দুই রকমই হইল তারেকের নিকট।

জার্মান দার্শনিক বাল্টার বেনিয়ামিন ছবি ও চলচ্চিত্রের দুই মূল্যের দুই নাম রাখিয়াছিলেন। এক মূল্য ছবিকে আর দশ পদার্থ হইতে আলাদা করে ও সম্ভ্রম জাগায়, দূরের হাতছানি এমনকি পবিত্রতার আমদানি ঘটায়। মার্কস কথিত পণ্যের ব্যবহার মূল্যের নকশা ধরিয়া বেনিয়ামিন ইহার নাম রাখিয়াছিলেন ছবির ‘ধর্মমূল্য’। দ্বিতীয় ধরনের মূল্য ছবিকে জনসাধারণের মধ্যে ছড়াইয়া দিবার মধ্যে। যন্ত্রবিজ্ঞানের দৌলতে একই ছবির লক্ষ লিপির ব্যবস্থা ছবিকে ‘গণতান্ত্রিক’ করিয়াছে। তবে কথা আছে, এই গণতন্ত্র বাজারে টিকিবার গণতন্ত্র। কার্ল মার্কস এই মূল্যের নাম রাখিয়াছিলেন পণ্যের ‘বিনিময় মূল্য’ বা দাম। বেনিয়ামিন ইহার নাম দিলেন শিল্পের ‘প্রদর্শন মূল্য’।

চলচ্চিত্রের ধর্ম ও প্রদর্শন–দুই মূল্য মূলধন করিয়া তারেক মাসুদ ছবিটি শেষ করিলেন ১৯৯৫ সাল নাগাদ। ছবি লইয়া ঢাকায় ফিরিবার আগে তিনি মার্কিনদেশে বিশেষ করিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী জনসাধারণের মধ্যে ছবিটির একাধিক প্রদর্শনী করেন। আমি বন্ধুতাভিমানের সুযোগ লইয়া–চলচ্চিত্রকারের অনুমতিক্রমে–দুইটা জায়গায় পরিবর্তনের প্রস্তাব করিয়াছিলাম।

তারেক মাসুদ নিজেই একটা কথা ঘন ঘন রাষ্ট্র করিতেন। কথাটা ইংরেজিতেই বলিতেন–‘ডকুফিকশন’। ‘মুক্তির গান’ ছিল তারেকের নিজ বিচারেই এক প্রকার ডকুফিকশন বা খবরকল্প কাহিনী। ইহাতেই তারেক মাসুদের পথ আমরা পরিষ্কার দেখিতে পাইলাম। একটা প্রশ্নের উত্তর আমরা আজও পাই নাই। বাংলাদেশ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করিয়া স্বাধীন হইয়াছে কিন্তু দেশের সমাজ কাঠাম আমূল বদলাইয়া যায় নাই। দেশে গণতন্ত্র কায়েম হয় নাই। কেন? ইহার উত্তর সন্ধান করিতে করিতে সেই সময় নাগাদ আমাদের শিক্ষক আহমদ ছফা ‘অলাতচক্র’ নামক কাহিনীটি লিখিয়াছিলেন। তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’ ছবিটি যেন অলাতচক্রেরই অপর পিঠ আকারে হাজির হইল।

‘অলাতচক্রে’ আহমদ ছফা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নানান সামাজিক শ্রেণীর ভূমিকা লইয়া বিচারসভা বসাইয়াছিলেন। আর আমি দেখিলাম ‘মুক্তির গান’ বানান হইল এমন কায়দায় যেখানে বাংলাদেশের জনগণের নহে, ঘোষিত হইল মধ্যম শ্রেণীর জয়। এক হিসাবে তারেক মাসুদ সত্য কথাই বলিয়াছেন। তাহার ছবি তো খবর নহে, খবরকল্প কাহিনী। আমি করজোড়ে বলিলাম কল্পাংশটা খানিক ছাঁটিয়া বা বদলাইয়া দিন । কিম্বা আহমদ ছফা যে জায়গা হইতে যুদ্ধ ও রাজনীতিকে যুক্ত করিয়াছেন তাহার কিছু অংশও থাকুক।

আহমদ ছফার পদতলে একদিন তারেকও বসিয়াছিলেন। তিনি জানিতেন কত ধানে কত চাউল। আহমদ ছফার পথ ধরা তাহার পক্ষে সহজ ছিল না। এখন পিছনে ফিরিয়া তাকাইলে বুঝি ‘মুক্তির গান’ ছবিটি প্রাণ হইতে গ্রহণ করিতে কেন পারি নাই। দুঃখের মধ্যে, তারেক মাসুদের সহিত আমার সম্পর্কটা ক্রমশ শিথিল হইতে, নিছক ধর্মমূল্য লইতে, দূরান্বয়ী হইতে শুরু করিল। এই দূরত্ব পারস্পরিক। অস্বীকার করিতে পারি নাই তারেক মাসুদ আমার পাঁচপ্রাণের বন্ধু, কিন্তু ‘মুক্তির গান’ ছবিটিও আমার বন্ধুর ছবি বলিয়া স্বীকার করিতে পারিতেছিলাম না। এই দশা ঈর্ষা করিবার দশা নহে।

‘মুক্তির গান’ ছবির অপূর্ণ বাসনা পূরণ করিতে তারেক পরে ‘মুক্তির কথা’ বানাইয়াছিলেন। আমাকে সেই মর্মে জবাবদিহিও করিয়াছিলেন তিনি। সৌভাগ্য হয় নাই ছবিটি দেখিবার। কিন্তু তাঁহার মহত্তম কীর্তি এখনও সম্মুখে পড়িয়া আছে বলিয়া বিশ্বাস করিতেন তারেক মাসুদ। ‘মাটির ময়না’ ছবিটি দেখিবার সৌভাগ্য আমার হইয়াছিল।

matirঅনেক কথা মনে নাই। একটি কথা মনে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হইবার পর কোন এক সময় তারেক মাসুদ বলিয়াছিলেন তিনি তাহার মাদ্রাসা জীবনের স্মৃতি বা অভিজ্ঞতা সম্বল করিয়া একপ্রস্ত ছবি বানাইবেন। ‘মুক্তির গান’ তাঁহাকে সেই জায়গায় পৌঁছাইয়া দিল যেখানে পৌঁছিলে আর পিছনে তাকাইতে হয় না। ‘মাটির ময়না’ সেই অমৃতের পুত্র–তারেক মাসুদের স্বপ্ন পূরণ হইল। ভারতবর্ষের নামজাদা চিত্রবিশারদ বাবা গাস্তঁ রোবের্জ বলিয়া ফেলিলেন এই ছবি সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’র সমান। অনু আর তাহার বোনের চরিত্র, অপু আর তাহার বোনের আদল পাইয়াছে। বোনের মৃত্যু দুই সংসারেই আগুন লাগিয়াছে। এই মৃত্যুকে–বোনের মৃত্যুকে– নানাভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

এক জায়গায় আসিয়া তারেক সত্যজিৎকেও অতিক্রম করিলেন। সত্যজিৎ রায় ভারতবর্ষের গ্রামীণ দারিদ্র ও ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে ‘পথের পাঁচালী’ বানাইয়াছিলেন ১৯২০ সালের যুগে লেখা এক কাহিনীর পিঠে পা রাখিয়া। তারেকের ঘটনার পট ১৯৬০ সালের দশক। পূর্ব বাংলার কোন এক গ্রাম। বাংলাদেশের গ্রামীণ দারিদ্র ও শোষণ তারেকের চোখে এসলাম ধর্মের অন্তর্গত দুই ধারার বিরোধ আকারে হাজির হইল। জনৈক কলিকাতাফেরত ইংরেজি শিক্ষিত বাঙ্গালি মুসলমান ভদ্রলোক তাহার ছেলেকে মাদ্রাসায় পড়িতে পাঠাইলেন। তিনি নিজে কিন্তু মাদ্রাসায় পড়েন নাই। ইংরেজি শিক্ষা বর্জন করিবার চিন্তা হইতেই তিনি মাদ্রাসা শিক্ষা আঁকড়াইয়া ধরিলেন। যে শিশুকে মাদ্রাসায় পাঠান হইল তাহার চোখেই ছবির বয়ান গড়িয়া উঠিয়াছে।

এমন সময় আসিল ‘স্বাধীনতার অকাল বোধন’–বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম। জাতীয় পরিচয়ের মুক্তিযুদ্ধ। মাদ্রাসা হইতে অনুরও মুক্তি হইল। এই মুক্তি প্রতীকী বা আকার হিসাবেও পড়িতে হইবে। আমি অন্তত সেইভাবেই পড়িয়াছি। তারেক মাসুদের মধ্যে আমি সেই মহান চলচ্চিত্রকারের খোঁজ পাইয়াছিলাম যাহাকে প্রশ্ন করা যায়, যাহার কাছে আরও শেখা যায়। তিনি আমাকে এই জায়গায় আর পড়াইতে রাজি হইলেন না। আমারও দুঃখের আর অবধি রহিল না।

প্রশ্ন করিয়াছিলাম বাংলা মুলুুকে এসলাম ধর্মের যে রূপকে তারেক মাসুদ কাঠগড়ায় দাঁড় করাইয়াছেন তাহার বিকল্প কি? মনে হইয়াছিল শিশু অনু যে গ্রাম্যমেলায় যাইতে চাহে, যে মাটির ময়না সে কিনিয়া আনে, যে ময়না কিনে বাবার ভয়ে লুকাইয়া রাখে তার মধ্যে সেই বিকল্প তারেক দেখিয়াছেন। ইহাকে কেহ কেহ নতুন গড়িয়া উঠা–মানে ১৯৪৭ সালের পরে গড়িয়া উঠা ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ বলিতে চাহিয়াছেন।

আমার জিজ্ঞাসাটা ছিল অন্য জায়গায়। মাদ্রাসা শিক্ষাই আমাদের সমস্ত অনুন্নতির মূল এই পরামর্শ কতখানি সৎ পরামর্শ? ইহার অর্থ কি এই নহে যে ইংরেজি শিক্ষার মধ্যেই আমাদের মুক্তির গান শোনা যাইবে। পরাধীনতার যুগ শেষ হইয়াও কেন শেষ হইতেছে না বাংলাদেশে? তাহাতে সমস্ত দোষ মাদ্রাসা শিক্ষার–এ কথা বলিলে আমরা অর্ধসত্য বলিবার দোষে দুষ্ট হই। পরাধীনতার বলে বলীয়ান নতুন মধ্যম শ্রেণীর হেজিমনি ওরফে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এই অর্ধসত্য বেশ কাজে লাগিবে এ কথা মিথ্যা নহে। কিন্তু শিল্পীর কাজ কি কেবল শাসক শ্রেণীর উপকরণ মূল্য যোগাইয়া যাওয়া?

বাংলাদেশের সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ধর্মবিশ্বাসে মুসলমান। তাহাদের মানসগঠনে এসলাম ধর্মের আগমন ঘটিবার পূর্বে যে পদার্থ ছিল এসলাম ধর্মও তাহা বিশেষ বদলাইতে পারে নাই। এই কথা নতুন করিয়া প্রচার করিয়াছিলেন মহাত্মা আহমদ ছফা। সে কথায় ইংরেজি ১৯৭৬ কিংবা ১৯৭৭ সালে আমরা কান দিয়াছিলাম। যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বদিকের রমনা ময়দানে প্রাতভ্রমণের সময় আহমদ ছফা আবুল ফজলের সাক্ষাৎ পাইলেন তখন তাঁহার মনে এই প্রস্তাবের জন্ম। আহমদ ছফা সিদ্ধান্ত করিয়াছিলেন বাঙালি মুসলমান হইতেছেন আবুল ফজলের মতন। সারাজীবন ধরিয়া প্রচার করিলেন একের ঘরে আর শেষ জীবনে ধর্না দিলেন আরেক দুয়ারে।

তারেক মাসুদ তাঁহার বাবার মধ্যে সেই বাঙ্গালি মুসলমানের প্রতিকৃতি আবিষ্কার করিলেন। এক শ্রেণীর বাঙ্গালি মুসলমান বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে সন্দেহ করিয়াছে। অনেকে তাহাদের প্রতীক আকারে মাদ্রাসা শিক্ষাকে দায়ী করেন। কিন্তু ইতিহাসকে ইচ্ছামতো পায়ের বেড়ী পরান যায় না। ইতিহাস হইতে দেখা যাইবে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মাদ্রাসা ছাত্রদের একটা বড় ভূমিকা ছিল। কৌমি বা জাতীয় মাদ্রাসার ছাত্ররা ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে লড়িয়াছিলেন কিন্তু পাকিস্তান বানাইতে রাজি হয়েন নাই।

বাংলাদেশ স্বাধীন হইয়াছে কিন্তু দেশের সমাজ কাঠাম বদলাইয়া যায় নাই। দেশে গণতন্ত্র নামে যাহা চলিতেছে তাহাতে জনগণের শাসন কায়েম হয় নাই। ইহার দায় কতখানি মাদ্রাসা শিক্ষার? আর কতখানিই বা ইংরেজি শিক্ষার? যদি আমরা বলি এসলাম ধর্ম বা তাহার ব্যাখ্যাবিশেষই ইহার জন্য দায়ী তবে আমাদের জবাবদিহি আছে। কেহ কেহ বলেন, এসলাম ধর্ম পশ্চিম এশিয়া হইতে আমদানি করা দ্রব্যবিশেষ–ইহা দেশজ পদার্থ নহে। এই বিশেষণ বিপজ্জনক–সত্য বলিতে বর্ণবিদ্বেষী বা উগ্র জাতীয়তাবাদী।

মধ্যম শ্রেণীর একাংশ আজিকালি এই বিশেষণ অঙ্গীকার করিতেছেন। আমি তাহাদের সমজদার হইতে পারি নাই। আমার ভয় হইয়াছিল তারেক মাসুদের ছবি এই বর্ণবিদ্বেষী, বর্ণাশ্রমধর্ম ব্যবসায়ী মনোভাবকে উসকাইয়া দিতে পারে। বাংলাদেশে এই ব্যবসায় ‘মানব ব্যবসায়’ ওরফে ‘হিয়ুুম্যানিজম’ আকারে উপস্থিত আছে। বর্তমানে দেশ চলিতেছে এয়ুরোপিয়া এনলাইটেনমেন্ট বা চেরাগের আলো ধার করিয়া। তাহা তো দেশজ নহে বলিয়া নিন্দার ভাগ পায় নাই। বাংলাদেশের কৃষক– মজুর কৃষক ও গৃহস্থ কৃষক– যে ধর্মবিশ্বাস আঁকড়াইয়া ধরিয়াছে শুধু তাহার মধ্যে বিদেশী দ্রব্য আমদানির সাক্ষ্য খোঁজা সত্যসন্ধানীর কাজ হইতে পারে না। পল্লবগ্রাহী বাঙালি মুসলমান সমাজের কেহ কেহ এক সময় মুখে মার্কসবাদও গ্রহণ করিয়াছিল। ‘মাটির ময়না’ ছবির এক চরিত্র বলিয়াছেন মার্কসবাদ ও হোমিওপ্যাথি সমতুল্য–দুইটাই জার্মান পদার্থ।

সত্য ও ন্যায়বিচারের খাতিরে–আজ এই শোকের মধ্যেও–মনে রাখিতে হইবে অভিজ্ঞতাই শেষ কথা নহে। ‘মাটির ময়না’ প্রসঙ্গে তারেক মাসুদ বলিতেন, ‘এই ছবির গল্প আমার নিজ জীবনবৃত্তের একটা ছিলা বা বৃত্তচাপ’। আমি বলিতাম, ‘সূর্য পূর্বদিকে উঠিবে। কারণ ইহা আমাদের অভিজ্ঞতা। তো সূর্য এই পৃথিবী নামক গ্রহের চারিদিকে ঘুরিয়া মরিতেছে, ইহাও কি আমাদের অভিজ্ঞতার অন্তর্গত নহে?’ তো কেন আমরা অভিজ্ঞতার মধ্যে এককে গ্রহণ করি, আর অন্যকে বর্জন করি? তারেক মাসুদের সঙ্গে অনেক বিনিদ্র রজনী আমরা কাটাইয়াছি। এই তর্কের শেষ হয় নাই।

‘সূর্য পৃথিবীর চারিধারে ঘুরিতেছে’, কিংবা ‘মানুষ যুক্তিশীল প্রাণী’ ইত্যাদি অর্ধসত্য ভর করিয়া পঞ্জিকা লিখিয়াছে, সভ্যতা গঠিয়াছে মানুষ। এই ক্রমে বলিতে পারি বিশ্বাস ভুল হইলেও মানুষের কীর্তি থাকিয়া যাইতে পারে। তারেক মাসুদ আকর্ষণীয় চলচ্চিত্র বানাইয়াছিলেন। এই বানানোর কাজটি সহজ ছিল না। তাঁহার ছবিতে বাংলাদেশ চিত্ররূপময় হইয়া উঠিয়াছে। তিনি তাহাতে সৌন্দর্য ছাড়াইয়া পবিত্রতার মহিমাও ফুটাইয়া তুলিয়াছেন। তিনি এককথায় বলা যায় সার্থক হইয়াছেন। যে নৈপুণ্য যে দক্ষতা তিনি দেখাইয়াছেন তাহার স্বীকৃতি তিনি কিছু পরিমাণে হইলেও পাইয়াছেন। বাঁচিয়া থাকিলে তাঁহার কীর্তিতে আরও নতুন অধ্যায় যোগ হইত, দেশের মুখোজ্জ্বল হইত সন্দেহ নাই।

আমার সবিনয় জিজ্ঞাসা, এই সার্থকতার মধ্যে কি এক প্রকারের ব্যর্থতাও লুকাইয়া নাই? এমনও কি হইতে পারে যে তিনি যে সার্থকতার মধ্যে নিজেই চিত্ররূপময় হইয়া রহিলেন, তাঁহার স্বপ্নের স্বাধীনতা তাহাতেই অপূর্ণ রহিয়া গেল?

এখন আমাদের কি কর্তব্য? তিনি যে কীর্তি রাখিয়া গেলেন আমরা কি তাহার মধ্যে শুদ্ধ নিজেদের চেহারা দেখিব? নাকি ‘কলবের মধ্যে আয়না বানাইয়া’ তাহার পারদটা মুছিয়া দিব? তাঁহাকেও দেখিব?

তারেক মাসুদের এন্তেকাল হইয়াছে অকালে। এই এন্তেকাল মানিয়া লওয়া যায় না। তাঁহার অন্তিম যাত্রা হইল জীবনের মধ্যভাগে। এই ক্ষতির পূরণ নাই। তাঁহার বিদায় সমাবেশে যে জনসাধারণ আসিয়াছিলেন তাহারা ‘সর্বস্তরের’। এ কথা সংবাদপত্র হইতে জানিয়াছি। আমি নিজেও সেখানে হাজির ছিলাম। একটা জিনিশ অবশ্য সংবাদপত্রে খুঁজিয়া পাই নাই। শহীদ মিনারের পাদদেশে আমি তিন ঘণ্টার মতো দাঁড়াইয়া ছিলাম। অনেক মানুষ, ততোধিক ফুলের শ্রদ্ধা। এইসব মিছিলে আমি মাদ্রাসার ছাত্র বিশেষ কিন্তু দেখি নাই। কথাটা মনে পড়িল। তারেক মাসুদ চলচ্চিত্রের বিনিময়েও মাদ্রাসা ছাত্রদের স্বাধীন করিতে পারেন নাই।

এক সময়ে আমরা শুনিতাম কবিতা তিন নম্বর বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাইতে পারে। এখন অত শুনি না। চলচ্চিত্রও হয়তো বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাইতে পারিবে না। কিন্তু স্বপ্ন দেখা মানুষের সংশোধনের অতীত নিয়তি। শুধু একটা কথাই সত্য– মানুষ স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নটা এক অর্থে কিছুই নহে। স্বপ্নকে আমরা যতই দূরে ঠেলিয়া দিই ততই সে আমাদের কাছে টানে। অথচ এই স্বপ্নটাই–অজ্ঞানের এই স্বতস্ফূর্ত আত্মপ্রকাশটাই–আমার একমাত্র অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতার জোরেই হয়ত আমি তারেক মাসুদকে আত্মীয় ভাবিয়াছি।

প্রথম প্রকাশ: দৈনিক যুগান্তর, সাহিত্য সাময়িকী, ১৯ আগস্ট ২০১১।

আমার শিক্ষক তারেক মাসুদ

tareque

‘In breaking a statue one risks becoming a statue…’

–Jean Cocteau, ‘Le Sang d’un Poète’

“যাঁহারা মূর্তি ভাঙ্গিবার কাজে হাত দিয়া থাকেন, তাঁহারা নিজেরাই মূর্তি হইয়া উঠিবার ঝুঁকি লয়েন॥”

–জাঁ কক্‌তো, ‘জনৈক কবির খুন’

 

তারেক মাসুদ এন্তেকাল করিয়াছেন। একা করেন নাই, সঙ্গে করিয়াছেন আরো চারিজন। তিনজন সঙ্গী গুরুতর জখম হইয়াছেন, একজন সামান্য। ২৯ শ্রাবণ, শনিবার, বারবেলায় এই ঘটনা ঘটিয়াছে পুরানা ঢাকা জেলার ভিতরে, নতুন জেলা মানিকগঞ্জ সদরের অদূরে। যখন পহিলা খবরটি পাইলাম, তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একদল ছাত্রছাত্রীর সহিত বসিয়া আলাপ করিতেছিলাম। যখন শুনিলাম প্রথম অবিশ্বাস করিলাম, তারপর অবাক হইলাম। শেষ পর্যন্ত বুঝিলাম বিশ্বাস করিতে হইবে অবিশ্বাসকে, যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ করিতেই হইবে। অবাককে কথা বলিতে হইবে।

এই শেষের দিকে তারেক মাসুদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ বন্ধ হইয়া গিয়াছিল। মোবাইল ফোন কোম্পানির সংযোগ যেমন মধ্যে মধ্যে বন্ধ হইয়া থাকে তেমন অনেকখানি। কিন্তু তারেক মাসুদের কথা দিনে একবার ভাবি নাই এমন দিন আমার কমই গিয়াছে। এই অন্তরের দিনেও। তিনি আমার উত্তমর্ণ। নানা সুবাদে। একাধিক কারণে।

তারেক মাসুদ উচ্চাভিলাষী ছিলেন। তাঁহার সহিত পহিলা যেদিন দেখা হইল সেদিনই তাহা টের পাইয়াছিলাম। সদ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইয়াছি। ইহা ইংরেজি মতে ১৯৭৬ সালের কথা। তারেক মাসুদ ও পিয়াস করিম একযোগে দেখা দিয়াছিলেন। সে কালের শরিফ মিয়ার ক্যান্টিন নামে খ্যাত আশ্রয়কেন্দ্রের আশপাশে তাঁহারা ঘুরিতেছিলেন। তখন লেখক শিবির নামে একটি দল জীবিত ছিল। তাহার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতা হইয়াছিলেন তারেক মাসুদ।

তারেক মাসুদের সাথে আমার নতুন করিয়া পরিচয় করিয়া দিয়াছিলেন মোহন রায়হান। ১৯৭৮ সালে মোহন রায়হানের পহিলা বহি ‘জ্বলে উঠি সাহসী মানুষ’ প্রকাশ করিয়াছিলেন ‘বাঙলাদেশ লেখক শিবির’।

আমার ধারণা তাহাতে তারেক মাসুদের হাত ছিল। প্রথম দিকে তারেকের নাম সামান্য লম্বা ছিল–আবু তারেক মাসুদ। সেই নামে তিনি ছড়া লিখিতেন। সত্য বলিতে আমি তারেকের ছড়ার তুলনায় তাহার কথা বেশি শুনিতে চাহিতাম। তিনি বুদ্ধিমান ছিলেন, জোর করিয়া ছড়া শুনাইয়া তিনি কখনও আমাদিগকে লজ্জা দেন নাই। এই কাজটি আমিও কখনও কখনও করি নাই এমত নহে।

প্রথম পরিচয়েই তারেক আমাকে বলিয়াছিলেন তিনি চলচ্চিত্রকেই জীবনের ধ্রুবতারা করিয়াছেন। আমাদের বন্ধুদের বেশির ভাগই যে যাহার ধ্রুবতারা হারাইয়া ফেলিয়াছেন। তারেক হারাইতে পারেন নাই। তিনি ছিলেন সংকল্পে দৃঢ়। তিনি ইতিহাস বিভাগে পড়িতেন। এই পড়া তাহার চিন্তার পথে কোন ব্যাঘাত সৃষ্টি করিতে পারে নাই। তারেক আমাকে কথাটা নিজেই বলিয়াছিলেন, ‘ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক হওয়া আমার লক্ষ্য নহে।’

১৯৭৮ সালের শেষের দিকে আমি সিদ্ধান্ত লইয়াছিলাম একটি বিশেষ চরিত্রের পত্রিকা প্রকাশ করিব। আমি লেখক শিবিরের সদস্যপদ লাভ করিবার গৌরবে তারেকের শরিক হইতে পারি নাই। কিন্তু শিবিরের মধ্যে থাকিলেও ইতিহাস বিভাগের অধিক মর্যাদা তারেক মাসুদ শিবির জিনিসটাকে দিতে পারেন নাই। শিবিরের অন্য পাঁচটি সভ্য আমাকে যতখানি অনাত্মীয় ভাবিতেন তারেক মাসুদ ততখানি ভাবেন নাই। আমি যখন “প্রাক্সিস জর্নাল” কাগজটা বাহির করি তখন তারেক আমাকে আত্মীয় ধরিয়া লইলেন। তিনি আমাদের সম্পাদনা পরিষদে নিজের নামটি যুক্ত করিতে কুণ্ঠিত হয়েন নাই।

কয়েক বছর পর আমরা একটি পুস্তিকা বাহির করি। নাম ছিল ‘সমকালীন সাহিত্যের প্রবণতা ও শ্রেণীচরিত্র প্রসঙ্গে’ বা ইহার কাছাকাছি কিছু। এই পুস্তিকা মোটের উপর আমিই লিখিয়াছিলাম। আর আমার প্রধান সহায় হইয়াছিলেন তারেক মাসুদ। তিনি আমাকে জগতের যত নতুন খবর সবই জানাইতেন। বই আনিয়া দিতেন। সেই পুস্তিকায় প্রায় তিরিশ জনের স্বাক্ষর ছিল। আমার এবং তারেক মাসুদের নাম দুটিও বর্ণানুক্রম অনুসারে ছাপানো হইয়াছিল। আহা, পুস্তিকাটি এখন হারাইয়া কোথায় গিয়াছে জানি না! একটা কথা মনে আছে কবি অসীম সাহা নাম ছাপা না হওয়ায় পরে রবার স্ট্যাম্পযোগে যুক্ত হয়।

তারেক মাসুদের সঙ্গে আমার অনেক আলাপ হইত। সত্যের খাতিরে বলিতে হইবে চলচ্চিত্র বিষয়ে আমার আগ্রহ যাঁহারা শিক্ষকের মতন যত্ন করিয়া তৈয়ারি করিয়া দিয়াছেন তারেক মাসুদ তাঁহাদের মধ্যে একেবারে সামনের কাতারে। সত্য আরো বলিতে হইবে। আমার চরিত্রের মধ্যেই নিহিত আমার নিয়তি। শিক্ষকগণের সহিত দ্বিমত করাই আমার বিধিলিপি। শেষের দিকে আমি আর তাঁহার শিক্ষা হইতে উপকার লাভ করিতে সমর্থ ছিলাম না। হয়তো তাহাতে আমারই হয়রানি হইয়াছে।

১৯৮৬ সালে আমি মার্কিন মুলুকে চলিয়া যাই। তাহার বছর কয় পরে তারেকও সেই দেশে সাময়িক হিজরত করেন। আমি তখন জীবিকা সংগ্রহের প্রয়োজনে একটি বইপত্রের দোকানে চাকরি করি। একদিন সেই দোকানে ক্যাথারিন শাপির আসিয়া হাজির। তিনি জানাইলেন তারেক তাঁহার আত্মীয়। সংবাদটা আমার জানা হইয়াছিল তাহার কিছু আগে। তারপর একদিন দেখি সত্যসত্যই তারেক মাসুদ নতুন ইয়র্ক শহরে নাতিদীর্ঘ ছায়া ফেলিতেছেন। আমরা পাঁচ হইতে সাত বছর সেই শহরে একটানা বসবাস করিয়াছি।

শেষ পর্যন্ত তারেক মাসুদ ও ক্যাথারিন মাসুদ স্ট্যাটেন আয়ল্যান্ড নামা এক দ্বীপে বাসা লইলেন। বাসাটি ছিল কাঠের ঘর। আমরা বহুদিন সেই ঘরে ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলাম। কারণ আমি আসিতাম অনেক দূর হইতে। অধিক রাতে ফেরা সম্ভব হইত না। তারেকও তখন আমার মতন বইপত্রের দোকানে কাজ করিতেন। তাঁহার কর্মস্থল ছিল নতুন ইয়র্ক শহরের বাঁকাপথ ওরফে ব্রডওয়ে এবং ১২ রাস্তার সংযোগবিন্দুতে। এই দোকানটি পাঁচতলা। বিজ্ঞাপন অনুসারে তাহার বইপত্রের সকল তাক একটার পর একটা সাজাইলে দৈর্ঘ্য হইবে আট মাইল। নাম স্ট্রান্ড বুকস।

আমি কাজ করিতাম ৫ অ্যাভিনিউ ও ১৪ রাস্তার সংযোগস্থলে। আমার বিদ্যালয়ের বইয়ের দোকানটার নাম ছিল ‘এয়ুনিবার্সিটি প্রেস বুকস’। অনেক মধ্যাহ্নে আমরা একত্রে এয়ুনিয়ন স্কয়ার পার্কে (ব্রডওয়ে ও ১৪ রাস্তার সংযোগস্থল) বসিয়া দুপুরের খাবার খাইয়াছি। তারেক ভালো রান্নাও করিতেন। তাঁহার ‘স্যান্ডউয়িচ’ সঙ্গে থাকিত।

কাঠমিস্ত্রী হইলেও তারেক মাসুদ মন্দ করিতেন না। এই সময় তিনি সেই কাজও মাঝে মধ্যে করিতেন। নিজের বাসার ছোটখাট মেরামতির কাজ তিনি নিজেই করিয়া সারিতেন। কখনো কখনো ভাড়াও যাইতেন। এমনই এক যাত্রায়–তিনি আমাকে বলিয়াছিলেন–তিনি আবিষ্কার করিলেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু দলিলচিত্র।

ঘটনাটা শুদ্ধ কাক আসিবার পর তাল পড়িবার বিষয় নহে। ইহার পিছনে সাধনা ছিল। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের স্মৃতি হিসাবে এই দলিল অমূল্য রতন। মার্কিন চিত্রগ্রাহক লিয়ার লেবিনের সহিত পরিচয় ও উদ্ধারপর্ব এতদিনে কিংবদন্তি হইয়াছে। নতুন ইয়র্কে থাকিতেই তারেক মাসুদ ইহার প্রদর্শনী করিয়াছিলেন সেখানে। সেখান হইতে একটি পুস্তিকাও ছাপা হইয়াছিল। সেই পুস্তিকায় আর পাঁচ জনের সহিত আমিও দুই কথা লিখিয়াছিলাম।

matir moyna

এই যে শেষের দিকে আমার শিক্ষক বন্ধুর সহিত আমার যোগাযোগ স্থগিত হইয়া আসিল তাহার বীজ এখন দেখিতে পাইতেছি সেই সময়েই রোপা হইয়াছিল। আগেই বলিয়াছি তারেক মাসুদ ছিলেন একাধারে উচ্চাভিলাষী এবং দৃঢ়সংকল্প। এখন বুঝিতেছি তিনি নিজের প্রাণকেও তুচ্ছ করিতে পারিতেন ভক্তির জন্য। আমাদের সহিত তাহার বিচ্ছেদ প্রাণের সহিত প্রাণের বিচ্ছেদ বৈ নহে। তিনি নেতা, আমি বিনীত অনুসারী মাত্র এই ছেদে।

তিনি তবে ‘ভক্তি’ করিয়াছিলেন কাহাকে? তাঁহার ছবি যাহারা দেখিয়াছেন সে কথা তাহারাই ভাল বলিতে পারিবেন। বাংলাদেশের হৃদয়কে তিনি ভাষা দিতে চাহিয়াছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাস তিনি পড়িয়াছেন তাঁহার নিজের মতো করিয়া। তারেক মাসুদ যে জায়গায় জন্মিয়াছিলেন সেই ফরিদপুর অঞ্চলে ছিল পরাধীন যুগে কৃষক সংগ্রামের কেন্দ্রভূমি। বাংলাদেশের মুসলমান কৃষক–মজুর ও গৃহস্থ উভয় স্তরের কৃষকই–এসলাম ধর্মের সংস্কারকে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আদর্শ আকারে গ্রহণ করে। এই আন্দোলন বাংলাদেশে ‘ফরায়েজি’ নামে জাহির আছে।

এসলামের এই ভাষ্য তারেক মাসুদ গ্রহণ করেন নাই। এসলাম এ দেশে আসিবার আগে এ দেশে যে ধর্মাচার প্রতিষ্ঠা পাইয়াছিল তাহাকে সমূলে বিনাশ করা ছিল ফরায়েজি আন্দোলনের লক্ষ্য। তারেক মাসুদ এসলামকে লোকধর্ম হিসাবে দেখিতে চাহিয়াছিলেন। তাহার ‘মাটির ময়না’ ছবিতে এই বিশ্বাস এস্তেহার আকারে হাজির আছে।

‘মাটির ময়না’ ছবিটি বাংলাদেশে অনেকেই পছন্দ করিয়াছেন। অনেকে ইহার মধ্যে নতুন বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের নান্দীগান শুনিতে পাইয়াছেন। আমিও এই ছবিটি দেখিয়াছিলাম। আমার মনের কথাটি একদিন দুই স্তবক আকারে লিখিয়াও ফেলি। বলা বাহুল্য তিনি তাহা পছন্দ করেন নাই।

আমি কি লিখিয়াছিলাম তাহা এখন আমার মুখে আসিতেছে না। যাহাই লিখি না কেন, আমি এখনও বলিব ছবিটিতে যে ময়না মাটির নির্মিত, তাহাতে প্রাণের সঞ্চার করা কঠিন কাজ। সেই কাজে তিনি সফল হইয়াছেন কিনা তাহা বলিতে আরো সময় লাগিবে। তবে তিনি যে হাত দিয়াছিলেন তাহা আমাকে অবাক করে নাই।

বাংলাদেশে এসলামের সূচনা যে কারণেই হৌক, এসলাম প্রচারের কারণে বর্ণাশ্রম ধর্মের অবয়বে একটা বড় আঘাত নামিয়া আসে। দুঃখের মধ্যে, খোদ এসলামও এদেশে আসিয়া বর্ণাশ্রম ধর্মের আঘাতে খানিক পঙ্গু হইয়াছে। ১৯৪৭ সালের ইতিহাস বাদ দিয়া বর্তমানে বাংলাদেশের ইতিহাস সাধনা চলিতেছে। তারেক মাসুদের সাধনা তাহাকে পুরাপুরি মানিয়া লয় নাই।

বাংলাদেশে আমরা যে সাধনায় আজও সফল হই নাই–সেই মুক্তির সাধনায় তারেক মাসুদের নাম অক্ষয় অক্ষরে লিখিত থাকিবে। যে সাধনা প্রশ্ন জাগায় না, কেবল আবেগ উস্‌কাইয়া দেয় সে সাধনা ধর্মসাধনা মাত্র। আর যে সাধনা প্রশ্ন করে, ধর্মাচারের গোড়ার কথাও প্রকাশ করে তাহাকে বলে অর্থসাধনা।

আমার ভয় হয় তারেক মাসুদ কখনো ধর্মসাধনার পথে হাঁটিয়াছেন, আবার কখনো অর্থসাধনার খবর লইয়াছেন। আমার অপূর্ণ বুদ্ধিতে যতটুকু বুঝিয়াছি আমি ততটুকুই তাঁহার ধর্মসাধনার বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়াছি, কখনো অর্থসাধনার বিরুদ্ধে হাত তুলি নাই।

এখন তারেক মাসুদ আর সমুখে নাই। তাই এই কথাটি বিশেষ বলিবার আবশ্যক হইয়াছে। যৌবনের প্রারম্ভে–একটা কথা ভুলিয়া গিয়াছিলাম–আমরা দুইজনেই আহমদ ছফার পদতলে বসিয়া প্রজ্ঞা ভিক্ষা করিয়াছি। কিন্তু আমাদের পথ একসময় আলাদা হইয়া যায়।

তারপরও আজ আমি বলিব ঢাকা শহরে তারেক মাসুদ নাই বলিয়া এই শহরকে বসবাসের আরো অযোগ্য মনে হইতেছে।

প্রথম প্রকাশ: বিডিনিউজ, ১৫ আগস্ট ২০১১/ ৩০ শ্রাবণ ১৪১৮