Category Archives: সাক্ষাৎকার

আমি ব্যাখ্যাকার: সলিমুল্লাহ খান

সমাজতাত্ত্বিক, লেখক ও শিক্ষাবিদ সলিমুল্লাহ খান ৬০ বছর পূরণ করছেন এ বছর। তিনি ১৯৫৮ সালের ১৮ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন কক্সবাজারে। ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সলিমুল্লাহ খানের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিধান রিবেরু। গত ২৮ জুলাই সলিমুল্লাহ খানের বাসায় এ সাক্ষাৎকার নেয়া হয়

বিধান রিবেরু : কবিতা লেখা বা অনুবাদ করলেও আপনি যেহেতু প্রচুর প্রবন্ধ লিখেছেন, তাই প্রশ্ন করছি, প্রবন্ধ লেখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা কী বলে আপনার মনে হয়। আর প্রবন্ধ লেখার জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নেন?
সলিমুল্লাহ খান : 
লেখক হবই সেভাবে তো শুরু করিনি, ঘটনাচক্রে পেছন ফিরে দেখি, আমি আর সে রকম কিছুই লিখিনি, শুধু প্রবন্ধ লিখেছি। তাতে বোঝা যাচ্ছে কি, আমি অন্য কিছু আর লিখতে পারি না। কবি সাখাওয়াত টিপু একটা ভালো প্রশ্ন তুলেছিলেন, যারা ব্যর্থ কবি তারাই ভালো গদ্যকার হয়, কিন্তু ব্যর্থ গদ্যকাররা কী হয়?

রিবেরু : অনেকেই বলেন, আপনার মুখ থেকেও বহুবার শুনেছি, অনেকে অনুযোগ করেন আপনার লেখা উদ্ধৃতিসর্বস্ব হয়। তবে সেখানে উদ্ধৃতিগুলো জাক্সটাপোজ হয়, এতে নতুন দৃশ্যপট তৈরি হয়। তাই কি?
সলিমুল্লাহ খান : 
এটা পুরনো কথা। সিনেমা শিল্পের কথা। আপনি ভালো জানেন, যেটাকে একাধারে মন্তাজ বলে। লেখক কী? লেখক একাধারে সম্পাদক, চলচ্চিত্রের মন্তাজ শব্দের অর্থ হচ্ছে সম্পাদনা। ফরাসিতে মন্তাজ মানে এডিটিং। চলচ্চিত্রকারের যে কাজ, একটি ছবির ওপর আরেকটি ছবি বসিয়ে নতুন অর্থ তৈরি করা, প্রবন্ধ লেখার মধ্যেও সেটা আছে। চলচ্চিত্র প্রবন্ধকে প্রভাবিত করবেই। এ প্রভাবে প্রধান নাট্যকার, আমি দেখলাম, ওয়াল্টার বেঞ্জামিন। ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের লেখার ভেতর আপনি কোথাও ‘আমি’ শব্দ খুঁজে পাবেন না, ‘আই’ নেই। ‘আমি’ হচ্ছে রোমান্টিকতার চিহ্ন, উনি বলেন। তার কোনো প্রবন্ধে ‘আমি’ পাবেন কিনা সন্দেহ, দু-একটা থাকলেও খুব গোপনে আছে। তার লেখা হলো মন্তাজের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আপনি যদি নিকটতম উদাহরণ খুঁজতে চান, আমি ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের কথাই বলব।
আরেকজনের কথা বলব জাক লাকাঁ, যার লেখার ধরন আমাকে প্রভাবিত করেছে। এর কারণ হচ্ছে, আপনার কথা যদি আপনার ঐতিহ্যের সহায়তায় বলতে পারেন, তাহলে সমস্যা কি? লাকাঁ বলছেন, আমি তো ফ্রয়েডের ব্যাখ্যাকার মাত্র। লোকে যখন আমাকে অনুবাদক বলে তখন আমার হাসি পায়। পৃথিবীতে অনুবাদ বলে কোনো কাজ নেই, সবই ব্যাখ্যা। আমি ব্যাখ্যাকার। আমি গদ্য লেখার সময় লক্ষ করি, আমার উদ্দিষ্ট কী? আমি কোন কথাটা পাঠকের কাছে নিতে চাই। আমাকে যদি বলা হয়, আপনি ২ মিনিটের মধ্যে লেখেন, তাহলে প্রথম কথাটা আমি আগে বলব। আমি সাধারণত লিনিয়ার ওয়েতে লিখি না। যেগুলো বিশ^বিদ্যালয়ে লেখা হয়, সেখানে একটি প্রস্তাবনা থাকে, তার একটি বিকাশ থাকে, প্রমাণ থাকে, তারপর সিদ্ধান্ত থাকে। আমি প্রথমেই আমার সিদ্ধান্তটা জানাই, এ কথাটি আমি বলতে চাই। তখন তার চারপাশে আমি ঘুরতে থাকি। সেভাবে লিখলে লেখাটা স্পাইরাল হয়, লিনিয়ার হয় না। এখন লেখার বহু ধরন আছে, আমি একটি ধরনের কথা বললাম।

রিবেরু : আপনার লেখালেখিসংক্রান্ত আরেকটি অভিযোগ শোনা যায়, হঠাৎ করেই সাধু ভাষায় লেখা শুরু করেছেন, আপনি উল্টোপথে হাঁটছেন, কারণ এখন তো কেউ আর ওই ভাষায় লেখেন না। আগে আপনি চলতি ভাষায় লিখেছেন। মুখের ভাষাও এসেছে লেখায়। সাধু ভাষায় লেখা নিয়ে আপনি কী বলবেন?
সলিমুল্লাহ খান :
 আমি পেছনে হাঁটছি বা সামনে হাঁটছি, এগুলো মেটাফোর। লেনিনের একটি উক্তি আছে না, এক কদম পেছনে যান, দুই কদম আগানোর জন্য। লক্ষ্যটা আগানোই, মেটাফরিক্যালি। আমাদের বাংলা ভাষার যে ক্ষমতা আছে, সেটা আমি দেখেছি। বর্তমানে যারা চলিত গদ্য লিখছেন, তাদের গদ্য কোনো গভীর চিন্তাভাবনা প্রকাশের উপযোগী আর নেই। এটা ছিল আমার প্রথম সমস্যা। আমি ২০০৩-০৪-০৫-এর দিকে চিন্তা করেছিলাম এ সমস্যা নিয়ে। আজ থেকে ১৫-১৬ বছর আগে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি সাধুতে লিখব। সাধুতে লেখার সমস্যা আছে, কিন্তু চলিত ভাষার সমস্যার মুখোমুখি হয়ে আমি সেখানে ফিরেছি। নদী যেমন মাঝেমধ্যে বাঁক পরিবর্তন করে, আপনারা এটাকে পিছ পরিবর্তন বলতে পারেন, আমি বাক পরিবর্তনই বলি। এ বাঁক পরিবর্তনকেই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন আধুনিকতার আরেক নাম। আমি মনে করি, আমাদের আধুনিক গদ্য হচ্ছে সাধু ভাষা। চলিত ভাষা হচ্ছে প্রাগৈতিহাসিক। মানুষ বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলত এ দেশে, এখনও পূর্ব বাংলার আঞ্চলিক ভাষায় সাধু টান আছে। জসীমউদ্দীনের গদ্য দেখেন, এটাকে পিছুটান বলা যাবে না। জসীমউদ্্দীন রবীন্দ্রনাথের পরে লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথও অর্ধেক সাধু ভাষাতেই লিখেছেন। ১৯১৪ সালে তিনি সাধু ভাষা ছেড়েছেন, তবে এর আগেও চলতি লিখেছেন, ‘য়ুরোপ-প্রবাসীর পত্র’ তো চলতি ভাষায় লেখা।
থিওরিটা হলো এই- সাধু ভাষার পর হলো চলিত ভাষা, এই যে পর্যায়ক্রম, যেটা আপনার প্রশ্নের মধ্যে নিহিত আছে, আগে আর পিছে, এটা কিন্তু সঠিক নয়, আমার মতে। বরং বাংলা ভাষায় বিভিন্ন রেজিস্টার আছে। গদ্যও আছে, পদ্যও আছে, কেউ কি বলবেন, পদ্য প্রাচীন, গদ্য আধুনিক? তো পদ্য লেখা মানে তো পেছনে ফিরে যাওয়া। কাজেই পদ্য লেখেন কেন? আমি এজন্য বলব, গদ্য-পদ্য যেমন পাশাপাশি থাকে, তেমনি সাধু ও চলিতও পাশাপাশি থাকে। এটাকে ইংরেজিতে রেজিস্টার বলে। বাংলায় আমরা অনুবাদ করে বলতে পারি, নানা রকমের খাতা খোলা আছে। আমরা সেরেস্তা কথাটা ফারসিতে ব্যবহার করি, ইংরেজিতে রেজিস্টার। অর্থাৎ আপনি এক খাতা থেকে আরেক খাতায় যাচ্ছেন। একসময় আমরা একটা বই শেষ করে আরেকটা বই পড়ি। আবার অনেক সময় পাশাপাশি দুইটা বই পড়ি। কিছুক্ষণ এ বই পড়ে ক্লান্ত হলাম, তারপর আরেকটি বই পড়লাম। তো সাধু আর চলিত দুটি ভাষা রীতি বাংলাদেশে অনেকদিন ধরেই স্বীকৃত। আমি মনে করি, এরা ঐতিহাসিক ক্রম নির্দেশ করে না। এটা বরং কাঠামোগত অবস্থান নির্ধারণ করে।
আমাদের ভাষার একটা সাধু রীতি আছে, একটা চলিত রীতি আছে। আপনি যেকোনো একটাতে সুইচ করতে পারেন। এখন বেশির ভাগ লোক চলিত রীতি ব্যবহার করে, এর কারণ কী? এখন বেশির ভাগ লোক তো সংবাদপত্র পড়ে। আমিও বক্তৃতা চলিত ভাষাতেই দিই, কিন্তু লেখার সময় সাধুতে লিখি। এটা আমাকে এক ধরনের স্বাধীনতা দেয়। অর্থাৎ আসল কথা হচ্ছে, আমার প্রকাশভঙ্গি ও বক্তব্য কোনটাতে বেশি সহজে করতে পারি, আমার মতে কোনটাতে বেশি ফল লাভ করতে পারি। এখন যেসব পাঠক আমাকে বলে, আপনি সাধু ভাষায় লেখেন কেন, তাতে আপনার বিক্রি কমে যায়, এটা এম্পেরিক্যালি সত্যি নয়। ধরেন, নীরদচন্দ্র চৌধুরী সাধু ভাষায় লেখেন, তাতে কি আপনি মনে করেন তার পাঠক একজনও কমেছে? তিনি চলিততে লিখলে যত পাঠক পেতেন, তার চেয়ে কি কমেছে? উনি ইংরেজিতেও লিখেছেন। এখন যদি বলেন, আপনি ইংরেজিতে লেখেন কেন? জবাব কি? সে বলবে, আমি ইংল্যান্ডের লোকজনকে পড়ানোর জন্য লিখি। আসলে কি সেজন্যই লেখেন? না, আমাদের সাহেবদের পড়ানোর জন্য তিনি লেখেন। সাদা বাঙালি সাহেবরা পড়বে। কালো সাহেব বাঙালিরা পড়বে।
তাহলে আমি আপনাকে তিনটা উদাহরণ দিলাম, আমি ইংরেজিতে লিখি, আমি সাধুতে লিখি, আমি চলিততেও লিখেছি, আমি পদ্যও লিখি। আমি এই চার ধরনের অপকর্ম করেছি। যেমন আমি প্লেটো অনুবাদ করেছি চলিত ভাষায়, সেটা ২০০৫-এ। ‘ফ্রয়েড পড়ার ভূমিকা’ আমি প্রথম সাধু ভাষায় লিখেছি। ভূমিকাটা, কিন্তু মূল লেখাটি চলিত ভাষায় লেখা। এর পর থেকে ধীরে ধীরে সাধু ভাষায় লিখতে শুরু করি। আমি হঠাৎ করে চলিত ভাষা ছেড়ে সাধু ভাষায় আসিনি। এখনও আমি মনে করি, সাধু ভাষার শক্তি চলিত ভাষার চেয়ে বেশি।

রিবেরু : অধ্যাপক রাজ্জাকের বক্তৃতার ওপর আপনি যে লেখাটা লিখেছিলেন সেটা চলিত ছিল, আবার সংস্কৃত শব্দের আধিক্যও ছিল। ১৯৮৩ সালে বেরিয়েছিল।
সলিমুল্লাহ খান : 
ওটা লিখেছি ১৯৮১ সালে, বের হয়েছে ১৯৮৩ সালে। তার আগেও প্রাক্সিস জার্নালে যে লেখা শুরু করেছি, সেখানে আমাদের গদ্যের মধ্যে দেখবেন কিছুটা সংস্কৃতবহতা আছে। তবে আমার লক্ষ্য ছিল সবসময় প্রাঞ্জল্য। প্রাঞ্জল্যের অভাব যেখানে হয়েছে, সেখানে আমার অক্ষমতা মাত্র। আমি তো গদ্য লেখা শুরু করেছি ১৯৭৬ সালেই। ১৯৭৬-এর আগে আমি কখনও গদ্য প্রকাশ করিনি। পদ্য প্রকাশ করেছি ১৯৭২ সাল থেকে। আমি প্রথম গদ্য লিখেছি পরীক্ষার খাতায় ছাড়া, ১৯৭৬ সালে, প্রকাশ হয়েছিল ১৯৭৭ সালে। মুহম্মদ নুরুল হুদা সম্পাদিত একটি পত্রিকা ছিল, আমি সেটা হারিয়ে ফেলেছি, পত্রিকার নাম ‘বিশ্বাস’, সেখানে আমার প্রথম একটি লেখা ছাপা হয়। তারপর আরেকটি পত্রিকা বেরিয়েছিল ‘স্বরূপের সন্ধানে’, সেখানেও আমার একটা গদ্য ছাপা হয়, ১৯৭৮-এ। ১৯৭৭-৭৮ সালে আমি প্রচুর গদ্য লিখেছি। হুদার ওখানে যা লিখেছিলাম, তা ছিল খুবই সংস্কৃতবহুল। কিন্তু লিখতে গিয়ে আমি যখন পরিচিত হলাম, বিশেষ করে কমরেড মোজাফফর আহমদের লেখা, প্রবন্ধ সংকলনের সাথে যখন পরিচিত হলাম, তখন দেখলাম, আরও প্রাঞ্জল ভালো বাংলা তো লেখা যায়! তারপর ধীরে ধীরে আমার উপলব্ধি হলো।

রিবেরু : আপনি বলেছিলেন জসীমউদ্‌দীনের লেখা পড়েও আপনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
সলিমুল্লাহ খান : 
এটা ২০০৩-এর পরে। আগে যখন লিখেছি, তখন কমরেড মোজাফফর আহমদকে আমার ভালো লেগেছে। যেমন একটি প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন কেন তিনি কমিউনিস্ট হয়েছিলেন, ওটার গদ্য বেশ প্রাঞ্জল, ওটা কিন্তু বেশি পরে দেখিনি। এই ১৯৮০/৮২তে দেখেছি। তার মানে একটা পরিবর্তন হয়েছে। আমার দ্রুত পরিবর্তন হয়েছে ১৯৭৬ থেকে ১৯৮১-এর মধ্যে, আমি লেখক হয়েছি।

রিবেরু : একটা সময় পর, ১৯৯০-এর গোড়ার দিকে, আপনার গদ্যের মধ্যে আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার বেশি দেখা গেছে।
সলিমুল্লাহ খান : 
আমি প্রথম থেকেই আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছি। বাংলা ভাষার প্রথম গদ্য ‘হুতুম পেঁচার নকশা’ বা ‘আলালের ঘরের দুলালে’ যে আরবি-ফারসি শব্দ আছে, আমি এর চেয়ে বেশি ব্যবহার করিনি। আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার আমি শিখেছি, বিশেষ করে নজরুল ইসলামের লেখা পড়ে। আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমি ডেফিনিটলি প্রভাবিত হয়েছি হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর দ্বারা। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যত আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছেন, সেটা পড়ে দেখলাম, আরে এটা তো বাংলা ভাষার মহাসম্পদ। প্রমথ চৌধুরীও ব্যবহার করেছেন, সেগুলো অল্প অল্প, পায়েসের মধ্যে কিশমিশের মতো। আরবি-ফারসি শব্দ একই কারণে ব্যবহার করি, যে কারণে নজরুল ইসলাম ব্যবহার করেছেন। এটা ভাষার প্রকাশভঙ্গিকে প্রসারিত করা। বাংলা ভাষার মজা হচ্ছে, এখানে সংস্কৃতও চলে, আরবি-ফারসিও চলে।

রিবেরু : আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহারের কারণে ২০১৩ সালের আগ পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে মানুষের এক ধরনের পারসেপশন ছিল। মৌলবাদের সঙ্গেও অনেকে আপনাকে গুলিয়ে ফেলতেন।
সলিমুল্লাহ খান : 
আপনি তো বলেছেনই ‘পারসেপশন’, এ শব্দটির অর্থ হচ্ছে, যেমন আমার কোনো একটি আইডিয়া আছে, হেগেল বলছেন, আইডিয়াই পারসেপশনের প্রকাশ। কিন্তু আইডিয়ার সাথে কনসেপ্টের পার্থক্য কী? অর্থাৎ আপনি একটা সাপ দেখে দড়ি মনে করতে পারেন, এটা আপনার পারসেপশন নয়, এটা আপনার আইডিয়া, কেননা সাপও লম্বা, দড়িও লম্বা। কামড় দিলে না বুঝবেন, এটা সাপ। কামড় খাওয়ার আগে তারা এটা বোঝেনি। ২০১৩কে আপনি কামড় মনে করতে পারেন। তারা বোঝেনি, এজন্য আমি আমার লেখার কোনো নিন্দা করব না। আমি আমার লেখায় কোনো গুণগত উত্তরণ দেখি না, তার মধ্যে ক্রমাগত উত্তরণ আছে, ধীরে ধীরে যেটা হয় আর কি। কাজেই যারা আমার লেখাকে মৌলবাদী বা ইসলামি মনে করেছে, সেটা তাদের সমস্যা, আমার সমস্যা নয়। আমি সবসময়ই ইসলামি, আমি সবসময়ই মৌলবাদী, যদি তখনও থাকি, এখনও আছি, আর এখনও না থাকলে তখনও নেই। এর মধ্যে কোনো গুণগত রূপান্তর হয়নি আমার লেখায়। এখন আমি বলি, আমাকে যদি মৌলবাদী বলেন, তাহলে নজরুল ইসলামকে কী বলবেন? অর্থাৎ আমি যত উর্দু-আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছি, এর চেয়ে কম বঙ্কিমচন্দ্র ব্যবহার করেননি, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলা ভাষার চরিত্র সম্পর্কে যাদের পরিচয় নেই, এটা তাদের অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। একটা উদাহরণ দিই, যেমন আমার একটি বইয়ের নাম ‘আদম বোমা’। ‘বোমা’ শব্দটা হচ্ছে ইংরেজি থেকে নেয়া, ‘বোম্ব’ থেকে আমরা বানিয়েছি। ‘আদম’ হলো আরবি ও হিব্রু শব্দ। ফার্স্ট ম্যান। আদম ব্যাপারি, আদম ব্যবসা, সে রকম দুটো মিলিয়ে আমি নাম রেখেছি ‘আদম বোমা’। আরেকটি বইয়ের নাম ‘স্বাধীনতা ব্যবসায়’, কাছাকাছি ধরেন, ‘আহমদ ছফা সঞ্জীবনী’, অথবা ‘সত্য সাদ্দাম হোসেন ও স্রাজেরদৌলা’। এখন আমার নতুন একটি বই বেরোবে ‘মর্সিয়া’, মর্সিয়া মানে শোককথা। ‘ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না’। মর্সিয়া মানে যারা মারা গেছে, তাদের জন্য আমি কাঁদছি। এখন বাংলা ভাষায় মর্সিয়ার চেয়ে ভালো শব্দ আর নেই। যেমন জার্মান ভাষায় ‘ট্রাউয়ারস্পিয়েল’, মর্সিয়া তো এটারই অনুবাদ। এটা মোর্নিং প্লে নয়, এটা মোর্নিং সং। কিন্তু মোর্নিং এটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। মোর্নিং অ্যান্ড ম্যালানকলিয়া, এটা দিয়ে লাকাঁ হেমলেটের ক্রাইসিস ব্যাখ্যা করেছেন। সমস্যা হলো, এটা জানতে হবে ম্যালানকোলিয়ায় ভোগা যাবে না। হেমলেট মোর্ন করতে পারছিলেন না, তাই ম্যালানকলিয়ায় ভুগছিলেন। তো মোর্নিং শব্দটি জার্মান ভাষায় ট্রাউয়ারস্পিয়েল, গ্রিক ভাষায় ট্র্যাজেডি। গ্রিক শব্দ ট্র্যাজেডি ইংরেজি ভাষায় চালু হয়েছে। এখন বাংলায় আমি জার্মান ট্রাউয়ারস্পিয়েল চালানোর চেষ্টা করছি, লোকে নিচ্ছে না। আমার আরেকটি বইয়ের নাম খুব মজার, সেটি হলো ‘আল্লাহর বাদশাহী’, এটা একটা খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বের বই। ইংরেজিতে আছে ‘কিংডম অব গড’, এখন গডকে আল্লাহ অনুবাদ করা যায় কিনা বা আল্লাহকে গড অনুবাদ করা যায় কিনা, সে সমস্যা তো আছেই। কিন্তু আমি করেছি। কিংডমের অনুবাদ করেছি বাদশাহী।

 

সাম্প্রতিক দেশকাল, বর্ষ ৫, সংখ্যা ২৮, ৩০ আগস্ট ২০১৮

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা প্রসঙ্গে সলিমুল্লাহ খান

২০১৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি উন্নয়ন, শিক্ষা ও মানবাধিকার বিষয়ক জার্মানিভিত্তিক সংস্থা নেটসের (NETZ) পক্ষ থেকে অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন আনাসতাসিয়া রাউ। সাক্ষাৎকারটির তর্জমা করেছেন বিধান রিবেরু।

আনাসতাসিয়া রাউ : শিক্ষা ও জ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য কী?

সলিমুল্লাহ খান : প্রায়ই লোকে শিক্ষা ও জ্ঞানকে এক করে দেখে। কোনো বিষয়ে ওপর জ্ঞান অর্জনের চেয়েও বেশি কিছু অর্জন করার নাম শিক্ষা। ইংরেজিতে একটি কথা আছে, নো হাউ (Know how)-এর অর্থ কীভাবে কার্য সম্পাদন হয়, সে সম্পর্কে জ্ঞান লাভ। কিন্তু আপনি যদি আরেকটু গভীরে গিয়ে ভাবেন, কোনো ঘটনার পেছনের কার্যকারণ যদি অনুসন্ধান করেন, বলা যেতে পারে ‘নো হোয়াই’ করেন, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা শিক্ষা বলতে আমাদের দেশে প্রচলিত ১৪ রকমের শিক্ষার মধ্যে কেবল স্কুল শিক্ষাই বুঝি। এর কারণ স্কুলের শিক্ষাকে ওভাবেই—শিক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে—দেখা হয় এ দেশে। কিন্তু এখানে বহুদিন ধরেই নানাবিধ শিক্ষাব্যবস্থা চালু রয়েছে, এমনকি স্কুলের বাইরেও। বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশের যে সমস্যা : এখানে কোন শিক্ষিত মানুষকে বিচার করা হয়। তিনি কয় বছর স্কুলে লেখাপড়া করেছেন, সেটা দিয়েই। পরে সেটাই হয়ে ওঠে আমাদের আজীবন সম্মাননা। আর এটা দিয়েই ‘পণ্য’ বা কমোডিটি হিসেবে আমাদের মূল্যটা কত, তা নির্ধারিত হয়। মানুষকে পণ্যে পরিণত করাটাই এখন শিক্ষার মাপকাঠি হয়ে উঠেছে। দুর্ভাগ্যবশত শিক্ষাকে আমরা যেভাবে বুঝি ও প্রয়োগ করি, সেটারই ফল এটা।

রাউ : বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় কোন জায়গায় সমস্যা আছে বলে আপনি মনে করেন?

খান : বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা তিনটি স্তরে বিভক্ত, অন্যান্য দেশের মতো এখানেও রয়েছে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চস্তরের শিক্ষা, তবে প্রাথমিক ও বুনিয়াদি শিক্ষা বলতে আমরা যা বুঝি সেটি একান্তই গোলমেলে। ১৯৪৮ সালে প্রণীত জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার বা ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটসের ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদে দেখা যায়, বুনিয়াদি শিক্ষাকে ‘প্রাথমিক ও মৌলিক’ শিক্ষা বলা হয়েছে আর জোর সুপারিশ করা হয়েছে যে এই পর্যন্ত শিক্ষাটা হতে হবে বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক। যা হোক, সেখানে ব্যাপ্তিকাল কত, তা কিন্তু উল্লেখ করা হয়নি।

প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনে স্কুলে কত বছর ব্যয়িত হওয়া জরুরি? আর সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা প্রাথমিকের জন্য কতটুকু সময়কে জরুরি বলে মনে করছে এখানে? ষাটের দশকে আমরা যখন স্কুলে যাচ্ছি, তখন পাঁচ বছর বরাদ্দ ছিল প্রাথমিকের জন্য। এরই মধ্যে অনেক জল গড়িয়েছে, প্রায় পঞ্চাশ বছর পর, প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ এখন আট বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আমার মতে, স্কুলের বুনিয়াদি শিক্ষা বা ‘প্রাথমিক ও মৌলিক’ স্তরের শিক্ষাটা হওয়া উচিত বারো বছর পর্যন্ত, অর্থাৎ দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিস্তৃত।

রাউ : কেন?

খান : কারণ ওটাই আসল বয়স যখন মানুষ জীবনে পরিপক্বতা লাভ করে ও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে। জাতিসংঘও ঘোষণা করেছে যে উচ্চশিক্ষার বিকল্পস্বরূপ ‘কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা’ সকলের জন্য উন্মুক্ত হতে হবে এবং সেখানে কোনো ভেদাভেদ থাকতে পারবে না। তবে দেখা যাচ্ছে, এসব শিক্ষাই তাঁরাই পাচ্ছেন, যাঁদের সামর্থ্য আছে। উচ্চতর শিক্ষা অর্জনের অধিকারে পরিষ্কার বলা আছে সামর্থ্য, অর্থাৎ অর্থই আগে, মেধা পরে—যদিও এখানে বাহ্যত আর কোনো বৈষম্য কাজ করে না। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশে উচ্চতর শিক্ষা সকলের জন্য সহজলভ্য নয়। এ তো মানবাধিকারের বড় ধরনের লঙ্ঘন। আর বেসরকারি সংস্থা দ্বারা পরিচালিত তথাকথিত অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাও এই বিদ্যমান বৈষম্যচর্চাকে আরো শক্তিশালী করছে। একটা অদ্ভুত শব্দ ব্যবহার করে, এঁরা এর নাম রেখেছেন ‘উপানুষ্ঠানিক’ শিক্ষা। ওপরে ওপরে এ দেরকে বেশ প্রগতিশীল বলেই মনে হয়।

রাউ : অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পর্কে আপনার সমালোচনা কী?

খান : প্রথমেই আমি বলব, এটি পক্ষপাতমূলক। ছাত্র বা ছাত্রীর দারিদ্র্যের বিবেচনায় শিক্ষাকে যে দরিদ্র করা যায় না, একথা এতে ভুলে থাকা হয়েছে। ১৯২৩ সালে ইতালিতে মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী শাসনকালে এক ধরনের শিক্ষানীতি চালু হয়েছিল, সেটি এখনো বিভিন্ন দেশে চলছে, বাংলাদেশেও সেই জিনিসই চলছে। মুসোলিনির শিক্ষামন্ত্রী জেন্তিলের নামানুসারে এই নীতির নাম দাঁড়িয়েছিল জেন্তিলে সংস্কার। এই ব্যবস্থার আগের শিক্ষাব্যবস্থায়—এটি চালু হয়েছিল ১৮৫৯ সালে—পাঁচ বছর সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাটিয়ে, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যেত, এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া যেত—একে আমরা শিক্ষায় মইয়ে চড়বার নীতি বলতে পারি!

এই পাঁচ বছরের শেষে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়ারও সুযোগ ছিল, ছাত্রছাত্রীরা বেরিয়ে সাধারণ কাজ করবে। কিন্তু তখন এটি ছিল শিক্ষাদীক্ষার পাট চুকিয়ে কর্মজীবনে—কঠোর পরিশ্রমের জীবনে ঢোকা। সমাজের গরিব লোকেরাই এই সুযোগ নিত, কারণ ওটা করতে তারা বাধ্য হতো। বাংলাদেশে আজও সেই একই জিনিস চলছে এবং বলা হচ্ছে হতদরিদ্র শিশুদের জন্য চার বছরের (এমনকি পাঁচও নয়) অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাই যথেষ্ট। এমনকি পাঠক্রম কখনো কখনো তিন বছরের মধ্যেই শেষ করা হচ্ছে।

দয়া করে আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি এই অতি গরিব পরিবারের বাচ্চারা যে শিক্ষা পাচ্ছে, আমি সেটার বিপক্ষে নই। বরং আমি সেই ব্যবস্থার পক্ষে যেখানে চার বা পাঁচ বছরের প্রাথমিক শিক্ষা নয়, অন্যদের মতো ওই গরিব পরিবারের বাচ্চারাও যেন সর্বাঙ্গীণ শিক্ষা—অন্তত মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষা—পায়, তারাও যেন মেধা থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যেতে পারে। বেসরকারি সংস্থাগুলো যে ভবিষ্যৎ নিয়ে লোকজনদের এত আশা দেয়, এটা কি ঠিক? এই বাচ্চাগুলো পরে নিজেদের জীবনধারণের জন্য যতটুকু দরকার, ততটুকুই তো করতে পারবে, এর বেশি কিছু নয়।

রাউ : বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় কোন জিনিসটার অবশ্যই পরিবর্তন হওয়া জরুরি বলে আপনি মনে করেন?

খান : সারা বাংলাদেশে এখন যা শেখানো হচ্ছে তা প্রকৃত বুনিয়াদি শিক্ষা নয়। এর কারণ সত্যিকার অর্থে শিক্ষা বলতে বোঝা উচিত ‘গণ্ডির বাইরে এসে বিশ্ব দেখা’—শিক্ষা শব্দের ব্যুৎপত্তিও তেমনটাই বলে। বাংলাদেশে লেখাপড়া করে অনেকেই বেরিয়ে আসছেন, তবে তাতে বিশ্বকে দেখা বা বোঝা হচ্ছে না। লোকে প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়ে হয় কারখানায় ঢুকছে বা আরো খারাপ কোন জায়গায়, শহুরে কোন বস্তিতে—তথাকথিত অনানুষ্ঠানিক খাতে বা ইনফরমাল সেক্টরে—ঢুকছে। এসব ডামাডোলে শিক্ষায় সচেতনতা সৃষ্টির উপাদানটাই আর থাকছে না। শিক্ষায় ঔচিত্য ও কর্তব্যবোধের মতো ক্রান্তিকালীন করণীয়টাই এখন আর হাতে নেই।

বরং বলা ভালো বর্তমানে বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা হলো গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান আহরণের ঠুনকো ব্যবস্থা। শুধু মুখস্থবিদ্যা, মুখস্থের মাধ্যমে শেখা। এটাই একজন মানুষকে দ্রব্য, বস্তু বা অবজেক্টে পরিণত করছে, রাষ্ট্রের নাগরিক বা সাবজেক্ট আর হতে পারছে না কেউ। তারা উৎপাদন পদ্ধতির সঙ্গে পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে জুতে যাচ্ছে। এটাই বাস্তবে পরিণত হচ্ছে। অথচ শিক্ষা তো আমাদের লক্ষ্যকে আরো সুদূরে, আরো উঁচুতে নিয়ে যাবে, নিজেদের আরো মানবিক মনুষ্যসদৃশ হতে শেখাবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও আসলে প্রচলিত ব্যবস্থায় থাকতে বাধ্য হচ্ছে, কারণ তাদেরও তো পাঠ্যসূচি অনুসরণ করতে হয়।

রাউ : গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান বলতে কী বোঝাতে চাচ্ছেন?

খান : এখানকার শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের মাত্র বিদেশি ভাষা শেখাতেই বেশি আগ্রহী, অথচ নিজের ভাষাটাই আমরা ভালো করে শিখিনি। বাচ্চাদের ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ে পাঠানোর হার বাড়ছে, সেখানে জাতীয় ভাষার পরিবর্তে সাধারণ নির্দেশনাও ইংরেজিতে দেওয়া হয়। এতে নিজস্ব ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। এতে যা হয়েছে তাতে অনেক শিশু এখন নিজেদের দেশের ভাষার চেয়ে—বাংলা ভাষার চেয়ে—ইংরেজিটাই ভালো বলছে। এতে সমাজে বিদ্যমান শ্রেণিবৈষম্য আরো বেড়ে যাচ্ছে। এসব দেখে মনে হয়, ওই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো পশ্চিমা দুনিয়ার সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদকেই বেশি করে ঊর্ধ্বে তুলে ধরছে, আর দমন করছে বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতিকে। এটা কি এক ধরনের নয়া উপনিবেশবাদ নয়?

রাউ : এমন প্রেক্ষাপটে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ঔপনিবেশিক অতীত কেমন ভূমিকা রাখছে?

খান : ঔপনিবেশিক শিক্ষা এখনো আমাদের বর্তমানে ভিড় করে আছে, ভার হয়ে আছে। দুইশ বছরের একটু কম সময় ধরে ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক শাসন এ দেশে বিরাজ করেছিল। এখনো বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে জোরালোভাবে প্রভাবিত করছে। শুধু গণ্ডায় গণ্ডায় ইংরেজি মাধ্যম স্কুলই এর একমাত্র অকাট্য প্রমাণ নয়। কেন্দ্রীয় পাঠক্রম দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে সাংস্কৃতিকভাবে একমুখী করার প্রতিশ্রুতি এখনো পুরোপুরি পালিত হয়নি। অন্যদিকে আদিবাসী সম্প্রদায় ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের থেকে জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের শিশুদের আলাদা করে ফেলার ঘটনাও বাংলাদেশে ঔপনিবেশিক অতীতের আরেক ফল। এতে দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং একই রকম বিশ্ববীক্ষার প্রচার হয়েছে।

বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও তাই, পশ্চিমের অনুকরণ করাই যেন একমাত্র রীতিতে পরিণত হয়েছে এবং এই নীতির কারণে অবস্থা এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে বাংলাদেশে খুব সহজে স্বতন্ত্র চিন্তাবিদ পাওয়া যায় না। সকলকে রবীন্দ্রনাথের মতো চিন্তাবিদ হতে হবে তা বলছি না। উনি ব্যতিক্রম বিশেষ। এটা হচ্ছে আধিপত্যশীল বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতার ফল। স্কুলে পড়ার কাল থেকেই যদি আমরা পণ্যমুখী হই, আত্মশক্তিসম্পন্ন মানুষ (self-acting subject) হওয়ার বদলে আত্মবিক্রয়ের উপায়সন্ধানী সওদাগর হই, তাহলে পশ্চিমকে অনুকরণের অভ্যাস থেকে মুক্ত হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

রাউ : এনজিও স্কুলগুলো কি এই উদ্বেগ আরো বাড়াচ্ছে নাকি শিক্ষা-সংক্রান্ত রাষ্ট্রের যে দায়িত্ব ছিল, সেটা কিছুটা লাঘব করছে?

খান : আমাদের দেশের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার দিকে তুলনামূলক দৃষ্টিতে তাকাতে হবে। কতজন শিশু স্কুলে যেতে পারছে, আর কতজন পারছে না? কতজন শিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে? সেই অনুপাতে এনজিও বা আসলে কতটুকু করতে পারে? বাংলাদেশে এ মুহূর্তে কমপক্ষে ১৪ ধরনের প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। এটা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী বললাম। আমরা যদি আরো মডেল স্কুলের পদ্ধতি আমলে নিতে পারতাম, তাহলে ওই সংখ্যাটা আরো বাড়ত। কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে ঐক্যবিধান বা ঐক্যসাধন করাই ছিল রাষ্ট্রের অঙ্গীকার। এতে করে সকলেই সমান সুযোগ পেত পড়ালেখা করার। অথচ আমরা বাস্তবে কিছু ছেলেমেয়েকে মাত্র চার বছরের শিক্ষা দিয়েই খুশি, কোনো কোনো এনজিও স্কুলে যেমনটা দেয়। অন্য সবার জন্য আট বছরের শিক্ষা দিই। এই দেওয়াই কি যথেষ্ট?

রাউ : এই অবস্থার পরিবর্তনের কি কোন পথ আছে?

খান : সব সময়ই একটি ওজর দেওয়া হয় যে সকলকে সমান সুযোগ দেওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই। কিন্তু সেই সামর্থ্য আমরা অর্জন করব না কেন? উদাহরণস্বরূপ ২০১৬ সালে শিক্ষায় আমাদের মোট জাতীয় উৎপাদনের দুই শতাংশের ঢের কম খরচ করা হয়েছিল। ২০১৩ সালেও সেটা প্রায় দুই শতাংশই ছিল। প্রসঙ্গত মনে পড়ছে, ২০০৬ সালে খরচ করা হয়েছিল ২ দশমিক ৫ শতাংশ।

বাংলাদেশে এখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কথা অনেক বড় গলায় বলা হচ্ছে, অথচ শিক্ষা যে তর্কাতীত জাতীয় সামগ্রী বা নিত্যপ্রয়োজনের বিষয় এবং এটাকে এগিয়ে নেয়া যে দরকার সেটাকেই পুরোপুরি অবহেলা করা হচ্ছে। বহু বছর আগে—১৯৬০ সালের দশকে—জাতিসংঘের সংস্থাগুলো লক্ষ্য স্থির করেছিল যে কোনো দেশের শিক্ষার জন্য ওই দেশের মোট জাতীয় আয়ের ন্যূনতম ৬ শতাংশ বরাদ্দ রাখতে হবে। বাংলাদেশ এই ন্যূনতম বরাদ্দ থেকেও আজও অনেক অনেক দূরে।

রাউ : শিক্ষার জন্য বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি আর এনজিওর কাছ থেকে সাহায্য নেওয়া বন্ধ করা, এটা কি বাস্তবানুগ হবে?

খান : এনজিও অনেকের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দিচ্ছে, যাদের শিক্ষা পাওয়ার অন্য কোন পথ খোলা নেই—এ কথা অসত্য নয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে তারা সহযোগী মাত্র। তবে এটাও ঠিক যে মাঝেমধ্যে তারা বৈষম্য বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখছেন। উদাহরণ হিসেবে বলছি, প্রকল্প এলাকা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তারা যে এলাকায় প্রকল্প গ্রহণ করেন, সে এলাকা তো এগিয়ে যাবেই। তুলনায় পাশের গ্রামটাকে নিষ্প্রভ দেখাবে, তাই না?

অবশ্যই ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যক্তিকে সহায়তা করা, একেবারে কিছু না হওয়ার চেয়ে অন্তত ভালো। তবে এর সঙ্গে আমাদের আরো যা দরকার তা হলো এনজিও, সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে পরিকল্পনা অনুযায়ী সমন্বয়সাধন। সরকারি কার্যক্রমের ভেতর এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ আরো বাড়াতে হবে, যাতে তারা বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায় এবং শিক্ষার ভূচিত্রটা যেন জোড়াতালি মারা গালিচার মতো না হয়।

রাউ : সাক্ষাৎকার দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

খান : ধন্যবাদ আপনারই প্রাপ্য।

 

এনটিভি, ২৮ আগস্ট ২০১৮

প্রাথমিক সংগ্রামগুলো এখনো শেষ হয়নি—সলিমুল্লাহ খান

বিধান রিবেরু: বাংলায় বালাইষাট বলে একটা শব্দ আছে। তো আপনার ষাট বছরে বালাই বা বিপদ-আপদ কম দেখেননি, সেসব পেরিয়ে এসে আজ আপনার কি মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের ভাগ্যে সামনে কী অপেক্ষা করছে?

সলিমুল্লাহ খান: আমাদের দেশ ঐতিহাসিক কারণে পৃথিবীর এক প্রান্তের দেশ। পৃথিবীর কেন্দ্র যেদিন থেকে ইউরোপ হয়েছে, সেদিন থেকেই আমরা প্রান্ত হয়ে গেছি, ইউরোপ একসময় প্রান্ত ছিল। ইউরোপের সবচেয়ে বড় যেসব ঘটনার কথা মনে পড়ে, আমি মনে করি—সেগুলোর মধ্যে ফরাসি বিপ্লব একটি। ফরাসি বিপ্লবের সাথে আমি বাংলাদেশের ১৯৭১ সনের ঘটনার তুলনা করি। মানে তার সাফল্য ও ব্যর্থতা দুদিক দিয়েই। ফরাসি বিপ্লব প্রথমে ছিল গণতান্ত্রিক বিপ্লব। মানে একচেটিয়া রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনগণের একটা ব্যাপক অংশের আত্মপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন, যেটা হেগেলের দর্শনে ‘মাস্টার অ্যান্ড স্লেভ’ বলা হয়। সেটার ঐতিহাসিক প্যারাডাইম বা মডেল হচ্ছে ফরাসি বিপ্লব। মাস্টার এবং স্লেভ অথবা প্রভূ এবং দাস তাদের সমন্ধ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে।

এখন ১৯৭১-কে যদি আমরা সেভাবে দেখি, ১৯৭১-এর সংগ্রামটি ফরাসি বিপ্লবের মতোই আশা আকাঙ্ক্ষা ধারণ করেছিল। এর মধ্যে একটা বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল মানুষের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠা। ফরাসিদের মধ্যেও সাম্য ছিল। ওরা বলত স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রী। আর আমরা চেয়েছি সাম্য, মানুষের মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচার। সেদিক থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ফরাসি বিপ্লবের মতোই ব্যর্থ। ব্যর্থ কেন তা বলি, আমরা দেশটা স্বাধীন করেছি, কিন্তু স্বাধীনতাটা করতে চেয়েছিলাম যেজন্য, দেশের জন্য, মানুষে মানুষে সাম্য থাকবে, সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না, শ্রেণি-শোষণ থাকবে না, নারী পুরুষের বৈষম্য থাকবে না, সবকিছুর বিরুদ্ধে যত প্রকার বৈষম্য আছে, সবকিছুর বিরুদ্ধে আমরা বলি সাম্য, ফরাসিতে বলে ইগালিতে বা ইকুয়ালিটি। আমাদের এখানে মানুষের মর্যাদা কলোনিয়াল আমলের আগেও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সেটাকে আমরা প্রতিষ্ঠা করার জন্য বহুবার লড়াই করেছি, সাম্য আসেনি। এটাই হচ্ছে বালাই। আমি এটা দেখেছি। ১৯৭১-এ আমার বয়স ১৩ বছরে পড়েছে মাত্র, আপনি যে বালাইষাট বললেন, এরপর আমাদের স্বাধীনতার ৪৭ বছর পার হয়ে গেছে।  এখানে আমাদের প্রাথমিক সংগ্রামগুলো এখনো শেষ হয়নি—মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা এবং সাম্য প্রতিষ্ঠা। বরং যা হয়েছে এখন, যেটাকে অর্থনৈতিক উন্নতি বলছি, সেটা এক অর্থে  অর্থনৈতিক সূচকে দেখলে অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু তাতে সমাজের যে মৌলিক আকাঙ্ক্ষা, যেটাকে আমরা বলব মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা—ফরাসি বিপ্লবের সময় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ছিল—সেটা বাস্তবায়িত  হয়নি। ইউরোপে যে ফরাসি বিপ্লব হয়েছিল এবং তার পরে ৪৭ বছর কী হয়েছিল, সেটা তুলনা করেই বলছি। কার্ল মার্কস যখন পিএইচডি করছিলেন, তখন ফরাসি বিপ্লবের ৪৭ বছর পার হয়েছে, বা আরেকটু বেশি।

রিবেরু: ফরাসি বিপ্লব বা পরে প্যারিস কমিউনের ব্যর্থতা নিয়ে মার্কস বিশ্লেষণ করেছেন, কিন্তু আমাদের ব্যর্থতা বিশ্লেষণ করার মতো তেমন কোনো লোক এখনো নেই।

খান: ফরাসি বিপ্লবের তারিখ যদি আমরা ধরি, ফরাসি বিপ্লব শুরু হয়েছিল ১৭৮৭ সালে। ৮৯-তে এর বিকাশ হয়েছিল।  নেপোলিয়ন ৯৯-তে ক্ষমতায় আসে, নেপোলিয়ন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে ১৮১৫-তে, এরপরে মার্কসের জন্ম। ফরাসি বিপ্লবের মাপে, শুধু বৈজ্ঞানিক মাপে বলছি না, মানসিক মাপে বিপ্লব ফরাসি ধনতন্ত্রের বিকাশ ঘটিয়েছে কিন্তু বিপ্লবের যে সুফল মানুষ চেয়েছিল—সাম্য—সেটা হয়নি। তো বাংলাদেশে কী হবে, তা আমি বলতে পারি না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যে আশা আকাঙ্ক্ষায় জাগ্রত করেছিল জনগণকে—সেটার মাত্র আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে। মানে বাংলাদেশ নামে একটি রাষ্ট্র হয়েছে, পতাকা হয়েছে, কিন্তু আমার কাছে খুব অবাক লাগে বিশ্বজনীন পরিস্থিতির কারণে, ফরাসি দেশে ফরাসি ভাষা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল, আমরা বাংলাভাষাকে জীবনের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। সবচেয়ে উচ্চস্তরে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। এটাই ১৯৭১-এর প্যারাডক্স। আপনার ষাটের বালাই বলতে আমার যেটা মনে হয়, সেটা হলো এটাই। আমাদের জীবনকালে যদি আমরা বাংলাভাষার প্রতিষ্ঠা দেখে যেতে পারি—তাহলে সেটা আমার কাছে শান্তি লাগবে।

রিবেরু: রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন নির্ভর করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর—আদালতে বাংলার ব্যবহার বা শিক্ষার মাধ্যম কী হবে ইত্যাদি। কিন্তু আমি যদি জনগণের দিকে তাকাই দেখি তাদেরও সঙ্কট আছে। রাস্তাঘাটে সাইনবোর্ড প্রায় সবই ইংরেজিতে লেখা। প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের নামই ইংরেজিতে। এমনকি বাচ্চাদের নামেও খুব একটা বাংলা দেখা যায় না। বাংলা নাম রাখা হলে বলা হয় এটা হিন্দুদের নাম। সাধারণ মানুষের ভেতরেই ভাষা নিয়ে এরকম একটা মানসিকতা কিন্তু আছে।

খান: এটা দুরকম। দুই জায়গা থেকে দেখতে হবে। ১৯৭১-এ আমরা যে রাষ্ট্রভাষা পেলাম, সেটার পেছনে যদি যাই, অন্তত ২৩ বছর আগের কথা। ১৯৪৭ সনে ব্রিটেনের শাসন থেকে ভারত আলাদা হচ্ছে, এটা একট সূচনা। এল নতুন রাষ্ট্র। তখন একটা প্রশ্ন উঠল, নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে? সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ভাষা কী হবে? আমরা যেহেতু পাকিস্তানের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলাম, যুক্তিসঙ্গত কারণেই বাংলাই হওয়ার কথা ছিল রাষ্ট্রভাষা। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের যুক্তি দিয়েও যদি আসে, তাহলেও বাংলাভাষার বিরুদ্ধে যায় না। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান বাংলাভাষায় কথা বলে। তখন কথা হলো, সারা ভারতবর্ষের মধ্যে মুসলমানদের মধ্যে লিঙ্গুয়াফ্রাঙ্কা হচ্ছে উর্দু, এই যুক্তি দিয়ে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, পাকিস্তান হওয়ার আগেই, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা তাই উর্দুই হবে। তখন আমাদের এখান থেকে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রস্তাব করেছিলেন যে এটা সঠিক নয়, বাংলাই হবে বাঙালির রাষ্ট্রভাষা। এই হলো একটা পর্ব। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ নিয়ে তর্কের কোনো কথা ছিল না।

বাংলায় নামকরণের বিষয়টির আগে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহার। আমরা শব্দ ইংরেজি থেকেও ধার করি, আবার আরবি থেকেও শব্দ ধার করি, কিন্তু সেটা বাংলা হরফে লিখতে হবে। সমস্যা হচ্ছে এটাই। কাজেই মানুষের ছেলেমেয়েদের নাম বাংলায় হবে, না আরবিতে হবে সেটা আলাদা তর্ক। যে নামই বাবা-মা দিন না কেন, সেই নামটা বাংলায় লেখা হবে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম বাংলায় লেখা হবে। আমি নিজ অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, পাকিস্তান আমলে ২১ ফেব্রুয়ারির সময়  আমরা ব্যবসায়ীদের বাধ্য করতাম সাইনবোর্ড বাংলায় লিখতে। তখন যে জাতীয়তাবোধ থেকে এটা হয়েছিল, সেটা বাংলাদেশ থেকে উবে গেল কেন? এর কারণটা যদি বলি, তো বলতে হয়—মাছের মাথা থেকে পচন শুরু হয়। আমাদের উচ্চশ্রেণির মনে যে অভিজ্ঞতা, তাদের মনে যে আকাঙ্ক্ষা, এখন সেটা বাংলা ছাড়িয়ে উর্দুর দিকে যাচ্ছে না, আরবির দিকেও যাচ্ছে না, ইংরেজির দিকে যাচ্ছে।  এটা মনে রাখা দরকার। এর পক্ষে একটা যুক্তি যে ইংরেজি আগে থেকেই ঔপনিবেশিক ভাষা ছিল। আবার দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ক্ষমতার যে নতুন বিন্যাস হয় পৃথিবীতে, সেখানে ইংরেজিই প্রধান ভাষা হয়েছে। সেটাই হচ্ছে প্রধান কারণ।

আমার বক্তব্য হলো বাংলাদেশে ইংরেজি শেখা বা বাংলা শেখা পরস্পর বিরোধী নয়। বাংলাকে জাতীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ইংরেজি শেখালে সেটার বিরোধিতা কেউ করবে না। কিন্তু বাংলাকে স্থানচ্যুত করে ইংরেজি করাটা বিপদজনক। আর যে কথাটা আমি শেষে বলেছিলাম মুসলমানদের ক্ষেত্রে—তারা মনে করে আরবি ভাষায় নাম না দিলে সে নামটা যথেষ্ট ধর্মসম্মত হচ্ছে না। সেটা ধর্মীয় রীতি। যেমন যারা খ্রিষ্টান ধর্মে জন্মগ্রহণ করেছে—তারাও তাদের নামের একটা অংশ ইংরেজিতে দেয়।

রিবেরু: সেইন্টের নাম দেয়।

খান: হ্যাঁ সেটা দেয়।… বাংলাদেশে আমার অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, আমি পাকিস্তান আমলেও বেড়ে উঠেছি, এখনও বেড়ে উঠছি, এই দুয়ের মাঝে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে যে, যারা বাংলাদেশে ক্ষমতা পেয়েছেন—তারা সোজা কথায় তাদের শ্রেণিস্বার্থে ইংরেজি ব্যবহার করাকে বেশি দরকার মনে করছে। সেজন্য তারা তাদের বাচ্চাদের স্কুল, কলেজ সবজায়গাতে ইংরেজি ব্যবহার করছে। এটা আমার কাছে বিস্ময়কর। যদি আমি খুব বেশি সেন্টিমেনটালি বলি, এটা আমার কাছে বিশ্বাসঘাতকতা মনে হয়।

রিবেরু: কেউ যদি চায়ও তার সন্তানকে ভালো বাংলা মিডিয়ামে পড়াবে সে সুযোগও খুব কম। কারণ পরিকাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে—সবগুলো ভালো স্কুলই এখন ইংরেজি মাধ্যমে পড়াচ্ছে।

খান: পাকিস্তান আমলে একটা লক্ষ্য ছিল, আন্দোলন ছিল, জাতীয় শত্রু ছিল, যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারতেন। এখন মজার বিষয় হয়েছে কী, এখন কোনো শত্রু নেই। আপনি কার বিরুদ্ধে লড়বেন? অর্থাত্ এখন ইংরেজির পক্ষে ওকালতি করছেন, তিন বছরের বাচ্চাকে কিন্ডার গার্টেন, প্লে ওয়ান, প্লে টুতে ইংরেজিতে পড়াচ্ছেন, তারা তো চামড়ায় বাঙালি, ওইজন্য তার বিরুদ্ধে আপনি আন্দোলন করতে পারবেন না। এটা কিন্তু একটা শ্রেণি সংঘাতের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

আবার যারা এখানে পেটি বুর্জোয়া মধ্যবিত্ত আছে, তারাও গোপনে গোপনে উচ্চ শ্রেণিকে অনুকরণ করাকে শ্রেয় মনে করে। এটা একটা বিশেষ পরিস্থিতি, যাকে ট্র্যাজিক পরিস্থিতি বলা যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে নতুন ট্র্যাজেডিতে আমরা পড়েছি, সেটা হচ্ছে—বাংলাভাষা শুধু এখানে নয়, পশ্চিমবঙ্গেও চলে যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে হিন্দির আগ্রাসন আছে, এখানেও উর্দুর আগ্রাসন ছিল। আমরা মনে করেছিলাম একটা সীমান্ত থাকলে আমরা বোধহয় হিন্দির আগ্রাসন থেকে বাঁচতে পারব, সেটাও আমরা পারছি না। ফলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ হলো—যেহেতু আমি অল্প লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকি, বাংলাভাষায় দুচার লাইন লেখার চেষ্টা করে থাকি, আমার কাছে এটা বিশেষভাবে বেদনাদায়ক হয়ে বাজে যে—বাংলাদেশে বাংলাভাষা তার সমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

রিবেরু: এটার জন্য কি শুধু শাসকগোষ্ঠী, এলিট গোষ্ঠী, নাকি গোটা  জাতি দায়ী?

খান: আমি এখানে একটু নির্দয় হয়ে বলব, মানে পেছনে ফিরে তাকাতে হবে আর কি, কার্ল মার্কস এবং ফ্রেডেরিক এঙ্গেলস কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারে যে বাক্যটা জগদ্বিখ্যাত করে গেছেন—আজ পর্যন্ত যত সমাজ দেখা গেছে তাদের সকলের ইতিহাস হচ্ছে শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস। তার মানেটা কী? তার নির্গলিত অর্থ হচ্ছে—সমাজে যে পরিবর্তন হয়, তার নেতৃত্ব থাকে একটা না একটা শ্রেণিতে। গোটা জাতিকে ধরলে আমরা এক ইঞ্চিও আগাতে পারব না। কাউকে গালি দেওয়ার জন্য নয়, বিশ্লেষণের খাতিরে বলব, এই সমাজের কর্ণধার যে শ্রেণি, তা শুধু রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী নয়, কর্নধার শ্রেণি বলে একটা কিছু আছে, যাকে আমরা সিভিল সোসাইটি বলি, সেই গোটা শ্রেণি ইংরেজিমুখি হয়েছে। গোটা শ্রেণির শতকরা ১০০ জন না হোক, শতকরা ৯৯ জন ওই পথে গিয়েছে। এটাই সমাজকে নিয়ে গেছে ওই পথে। আমি এটাকে বলি—কান টানলে মাথা আসে। শাসক শ্রেণি যেদিকে যায়, সারাদেশ সেদিকে যাবে। আজকে বড়লোকেরা যা করে গ্রামের লোকেরা তা অনুসরণ করে। এখন এদের মধ্যে যে জাতীয় চেতনা দরকার—সেটা একেবারেই নেই। যে শ্রেণি নেতৃত্ব দিচ্ছে তাদের মধ্যে যদি জাতীয় চেতনা না আসে, তাহলে অন্যদের মধ্যেও আসবে না। এখন সত্যি কথা বলি, ৫২-তে ছাত্ররা প্রাণ দিয়েছে বাংলা ভাষার জন্যে, তখন বাঙালিদের মধ্যে উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা এখন শাসক শ্রেণিতে পরিণত হয়েছে। তারা যদি ওই আন্দোলন সমর্থন না করত, তাহলে গ্রামের কৃষকেরা একা একা আন্দোলন সফল হতে পারতেন না।
ইত্তেফাক, ১৭ আগস্ট ২০১৮

রাষ্ট্র এখন নিজেই বিচারের মুখোমুখি

[এই সাক্ষাৎকারটি সম্প্রতি দৈনিক বণিক বার্তার পক্ষ হইতে গ্রহণ করা হইয়াছিল। দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটির প্রথম কিস্তি আজ ছাপানো হইল  — সম্পাদক।]

বণিক বার্তা: একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে সৃষ্ট সংকটকে কিভাবে দেখছেন?

সলিমুল্লাহ খান: এখানে প্রেক্ষাপট দুটি। বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্র হিসেবে জন্ম নিয়েছে একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ২৩ বছর ধরে এখানে সংগ্রাম হয়েছে। সেটাকে আমরা বলি স্বাধীনতা বা স্বাধিকার আন্দোলন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে চূড়ান্ত মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। ১৯৭৭ সালে লেখা  বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা শীর্ষক প্রবন্ধে আহমদ ছফা লিখেছিলেন, বাংলাদেশে একটা মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, সেটা ভালো বা মন্দের জন্য হোক। হতে পারে এর ফল অন্যে আত্মসাৎ করেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। একে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। দুই, মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির পক্ষে একমত হয়েছিল। ঐতিহাসিক এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে বাকি ১ শতাংশ লোক বাংলাদেশে ছিল যারা পাকিস্তান রাষ্ট্র চেয়েছিল। তাতেও কোনো অপরাধ হতো না, যদি না তারা পাকিস্তানি বাহিনীকে গণহত্যায় সহায়তা করত। এটাও একটা ঘটনা।

দুর্ভাগ্য, গণহত্যায় অংশ নেয়া পাকিস্তানি সেনারা বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আগেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। এর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কারণ আছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করেছিল। তাদের বিচার করা যাবে না, এমন কোনো কথা চুক্তিতে ছিল না। তারা আত্মসমর্পণ করে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ডের কাছে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বন্দিরা প্রথমে ভারতে যায় এবং সেখান থেকে তাদের পাকিস্তানে পাঠানো হয়। স্বীকার করতে হবে, তাদের বিচার হয়নি।

কিন্তু বাংলাদেশের যেসব রাজনৈতিক দল মুসলীম লীগ, জামায়াতে ইসলামীসহ আরো ছোট ছোট দল পাকিস্তান আর্মিকে সহায়তা করেছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের অনেকে দেশ ছেড়ে চলে যান। মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী খুব কম লোকই নিহত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজাকার বা দালালদের গণহারে পিটুনি দেয়া হয়নি। হয়েছে বলে যে কথা প্রচারিত আছে তা সঠিক নয় ।

আরো কয়েকটি কথা বাজারে প্রচলিত আছে। যারা যুদ্ধ করেছিল তাদের মধ্যে যারা সবচেয়ে ভয়াবহ (যেমন আল বদরের কিছু লোক) তারা দেশ ছেড়ে চলে যায়। গোলাম আজমও দেশ ছেড়ে গিয়েছিলেন, পরে ফেরত এসেছেন। সংক্ষেপে বললে, জামায়াতে ইসলামীর অধিকাংশ লোক যারা পাকবাহিনীকে যুদ্ধে সহায়তা করেছেন, তারা বিচারের মুখোমুখী হননি। ফলে আমরা বলতে পারি প্রথম প্রেক্ষাপট — মুক্তিযুদ্ধ।

দ্বিতীয় প্রেক্ষাপট হলো বর্তমান মহাজোট সরকার তাদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে জিতেছিলেন। এটি পূরণ করতে বা অন্য কোনো কারণেই হোক তারা ট্রাইব্যুনাল তৈরি করেছেন। এর বিরুদ্ধে কিছু অপপ্রচার চলছে। আমি বলবো, যারা এসব করছে তারা জামায়াতের সমর্থক। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে তারা চিঠি লিখছেন, বলেছেন এ ট্রাইব্যুনাল বৈধ নয়।

আমরা মনে করি জামায়াতের দাবি অসার। বৈধ বলতে আমরা আইনের পরিভাষায় যা বুঝি এটাও সেরকম বৈধ ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের আন্তর্জাতিক মান বলে একটা কথা আমরা বাজারে শুনি। কিন্তু এটা তো বাংলাদেশি ট্রাইব্যুনাল। কথাটা হলো, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল; ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল ফর ক্রাইমস, তা নয়। ইন্টারন্যাশনাল শব্দটা এখানে ক্রাইমের বিশেষণ। এক দেশে যুদ্ধের সময় অন্য দেশের নাগরিক যে অপরাধ করেÑ এ জাতীয় অপরাধ আন্তর্জাতিক অপরাধ বলে, এ ট্রাইব্যুনাল তার বিচার করছে না। এ ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশি বিচারকদের  দ্বারা গঠিত। এর বিষয়বস্তু কিন্তু সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ নয়। ইন্টারন্যাশনাল শব্দটি একটি ভদ্রশব্দ। আর ওয়ার ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল জনবোধ্য শব্দ । আর আমরা মুখে মুখে জনবোধ্য কথাটাই বলি। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এ দেশে যে অপরাধ হয়েছিল তা বিচারের জন্য এ দেশের একটি বৈধ সরকার এটি গঠন করেছে।

এখন যে কোন ট্রাইব্যুনালেরই সমালোচনা করা যাবে। যাবে না কেন? নুরেমবার্গ, টোকিও ট্রাইব্যুনালেরও সমালোচনা করা যাবে। সমালোচনা এক কথা নাকচ বা নিকুচি করা সম্পূর্ণ আর। বাংলাদেশের  ট্রাইব্যুনালকে নাকচ করে দেয়ার জন্য একটা আন্দোলন শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে। এই হচ্ছে বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপট। এ ট্রাইব্যুনাল বৈধ, এটি রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনের উদ্যোগে গঠিত। আর এতে বাংলাদেশের জনসাধারণের সমর্থন আছে। যদি না থাকতো, তাহলে এ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকার নির্বাচনে জিততে পারতো না। বিচার প্রক্রিয়ায় ক্রুটি থাকলে তা সংশোধনে উচ্চ আদালতে আপিলের ব্যবস্থাও তো আছে।

বণিক বার্তা: এ প্রেক্ষাপটে হিন্দুদের ওপর আক্রমণ হলো কেন?

সলিমুল্লাহ খান: যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালকে নাকচ (বা বানচাল) এবং এর বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য যে প্রচারাভিযান শুরু হয়েছে সেটা শুধু কাগজে কলমে নয়, বাস্তবেও। যা ইস্যু নয় তাকে ইস্যু করছে । যা ইস্যু নয় সেটাকে ইস্যু না করলে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালকে চ্যালেঞ্জ করা যাচ্ছে না। অতএব ইস্যু বদলানোর জন্য তারা এটা করছে। উদাহরণস্বরূপ: এমন কোনো দেশ নেই যেখানে দুচারজন নাস্তিক নেই। সেটা ইহুদি, খ্রিষ্টান এমনকি হিন্দুদের মধ্যেও রয়েছে। শিবনারায়ণ রায়ের মতো লোক নিত্য বলে গেছেন, আমি নাস্তিক, আমি নাস্তিক। লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও হামেশা বলতেন, আমি নাস্তিক। কিন্তু শিবনারায়ণ রায় বা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিচার তো ভারত করেনি। মুসলিম সমাজেও এমন লোক থাকতে পারে।

কে নাস্তিক আর কে নয় এটা এখানে আন্দোলনের ইস্যু হয়ে গেল। ইসলামধর্মের প্রতিষ্ঠাতা হযরত মুহাম্মদ (সঃ) তাঁহাকে, তাঁহার পবিত্র নামের, নিন্দা করে এয়ুরোপে নিত্যদিন আন্দোলন চলছে। এর বিরুদ্ধে সারা বিশ্বের মুসলিম সমাজ বিক্ষুব্ধ। বাংলাদেশেও এধরনের কোনো কোনো তুচ্ছ লোক থাকতে পারে। তবে এখানকার ছাপা কোনো পত্রিকায় এ ধরনের কোনো কার্টুন ছাপানো যাবে না। এমন কোনো সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন করা যাবে না। এখন নতুন যে ইন্টারনেট মিডিয়া এসেছে, যার ব্যবহার সর্বস্তরের মানুষ ভালো করে জানেও না, তার সুযোগ নিয়ে আমেরিকানরা ইউটিউবে একটি খারাপ ছবি তুলে দিয়েছে। এজন্য আমেরিকাতেও সে লোকের বিচার হচ্ছে। বাংলাদেশেও কিছু কিছু লোক এমন করেছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, যুদ্ধাপরাধের বিচারে যখন ট্রাইব্যুনাল বসলো তখন কেন এ ইস্যুগুলোকে বড় করে সামনে আনা হচ্ছে। এটা অবশ্যই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। হয়তো এ বিচারকে দুর্বল করার জন্য কতগুলো লোক একে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। আরেক দল এসে সেটাকে বড় করে বলছে নিন্দাকারীদের বিচার করো। উদ্দেশ্য কি? মুসলমানদের ধর্মীয় ঐক্যের মূল জায়গাটি হলো নবী হযরত মুহম্মদ (সঃ)। সে জায়গায় আঘাতের উদ্দেশ্য পরিস্কার। আপনাকে পাল্টা জিজ্ঞাসা করবো, আঘাতটা এ মুহূর্তে কেন? এ আঘাত বা তার বিচারের উদ্দেশ্যই হলো যুদ্ধাপরাধের বিচার ইস্যুকে গৌণ ও সন্দেহপূর্ণ করে তোলা। হিন্দুদের ওপর আক্রমণের কারণ একই।

২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ প্রথমে করেছে ইকবাল হল আর জগন্নাথ হলে । বেশি করেছে। অন্য হলে যে আক্রমণ করেনি, সে কথা আমি বলছি না। ইকবাল হলে একজনও প্রাণে বাঁচেনি। সলিমুল্লাহ হলেও আক্রমণ হয়েছে। তবে জগন্নাথ হলকে তারা একেবারে ধুলিস্মাৎ করে দিয়েছে। এতেই বোঝা যায়, হিন্দুদের হিন্দু বলে পয়েন্ট আউট করা ১৯৪৮ সালের পর থেকে পাকিস্তান সরকারের বৈশিষ্ট্য ছিল। সেটারই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে এখন। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলো যে ধরনের অপরাধের কারণে সে ধরনের অপরাধই তো পুনরায় সংঘটিত হচ্ছে।

কয়েকদিন আগে বেগম খালেদা জিয়া একটি বিবৃতি দিলেন। খুব দুঃখ লাগলো, তিনি বললেন — আমরা খবর পেয়েছি সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ হচ্ছে। কিন্তু আক্রমণটা কারা করছে সে ব্যাপারে তিনি কোনো ইঙ্গিত দিলেন না। কবি ফরহাদ মজহারও বেগম জিয়ার মতো অভিযোগ করলেন দেশে গণহত্যা চলছে। আর তিনিও কোনোভাবেই উল্লেখ করলেন না সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের বিষয়টি। চ্যানেল আইয়ে প্রচারিত তৃতীয় মাত্রায়ও তাঁকে দেখলাম। কয়েকটি নিবন্ধও লিখেছেন তিনি। তিনি ক্রমশ ভোল পাল্টাতে পারেন। তিনি স্পষ্ট পারেন।

মজহার লিখেছেন, এ পরিস্থিতিতে নাগরিকদের দিক থেকে সব পক্ষের কাছে কিছু দাবি তোলা খুব জরুরি। যাতে কয়েকটি আশু ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়ে জাতীয় সম্মতি তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তাতে প্রথমেই থাকবে যে সব নাগরিকের বাড়িঘরে হামলা হয়েছে, জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে এবং উপাসনালয় ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অনেকে বাড়িঘর হারিয়ে সর্বহারা হয়ে পথে বসেছে, তাদের আর্থিক সহযোগিতা দেয়া। ২. যারা পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন তারা যে পক্ষেরই হোক তাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা। ৩. গণহত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানোর নীতিমালা গ্রহণ করা। ৪. পুলিশকে জাতিসংঘের বিধান মেনে চলতে বাধ্য করা। তিনি কিন্তু কোথাও একবারও হিন্দু সম্প্রদায়ের নাম নেননি। মাত্র লিখেছেন, ‘যে সব নাগরিকদের’। এমন ভান করছেন যেন সব নাগরিকের ওপর হামলা হয়েছে।

অথচ এবার সংঘবদ্ধ কমিউনিটি হিসেবে হিন্দুদের বাড়িতে সিস্টেমেটিক্যালি আক্রমণ হয়েছে । অনেক সময় হয়তো বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যেত মুসলমানদের বাড়িতেও আক্রমণ হয়েছে। এযাত্রা ব্যাপক আকারে হিন্দুদের মন্দিরে-বাড়িতে আক্রমণ হয়েছে। একই ঘটনা ঘটেছিল রামুতে। তখন বৌদ্ধরা কি অপরাধ করেছিল? আমি পরিস্কার দেখতে পাচ্ছি রামুর ঘটনা যারা ঘটিয়েছিল তারা ছিল অনেক বেশি কৌশলী। কিন্তু এবারেরটা পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে। এতে স্পষ্ট হয়ে গেল রামুর ঘটনাও কারা ঘটিয়েছিল। জামায়াতে ইসলামী ঘটিয়েছিল। ওখানে পবিত্র কোরআন শরিফ অবমাননাকে কেন্দ্র করে একজন বাঙ্গালি বৌদ্ধকে দায়ী করে ওই আক্রমণ চালানো হয়েছে। সেটা হয়েছিল পরীক্ষামূলক বা পাইলট প্রজেক্টের মতো। এখন তারা সারা দেশে এটি করল। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার নিয়ে যে সহিংসতা তৈরি হয়েছে সেটাকে বাদ দিয়ে রামুর ঘটনা কিছু বোঝা যাবে না।

ইন্টারনেটে নবী করিমের (সঃ) নামে অবমাননাকর প্রচার কেন? হিন্দুদের বাড়িতে কেন আক্রমণ হচ্ছে? একা একা কোনটাই বোঝা যাবে না। তিনটি ঘটনাকে এক জায়গায় দাঁড় করালে দেখা যাবে সবগুলোরি উদ্দেশ্য একটাই — যুদ্ধাপরাধের বিচারটা থামিয়ে দেয়া।

বণিক বার্তা: তাহলে তো মনে হয় সরকার যে প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে এর মধ্যে কোন ত্রুটি ছিল না। ত্রুটি না থাকলে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ কেন তৈরি হল?

সলিমুল্লাহ খানত্রুটি একশ থাকতে পারে, কিন্তু কোন মৌলিক ত্রুটি ছিল না। মহামতি লেনিন বলেছেন, যে কোন কাজ করে না সে কোন ভুলই করে না। কাজ করলে ভুল হবে। তবে মৌলিক ভুল করা চলবে না। আমি বলব, সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের যে আয়োজন করেছে তা ভুল নয়। বিচার প্রক্রিয়ায় ভুল আছে কিনা, সেটা বিশেষজ্ঞরা বলবেন। তবে ট্রাইব্যুনাল গঠনের ব্যাপারে আগেই বলেছি, এটা তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু সেখানে কাকে বিচারক নিয়োগ করা হবে, কাকে ক্রিমিনাল প্রসিকিউটর করা হবে প্রভৃতি বিষয়ে আমি বলতে পারব না।

বণিক বার্তা: এসব ক্ষেত্রে তো আঁতাতের অভিযোগ উঠেছে…

সলিমুল্লাহ খান: এগুলো রাজনৈতিক অভিযোগ। এসব তো থাকবেই। কোন দেশের বিচার ব্যবস্থা অরাজনৈতিক? জামায়াতের কোন উকিলকে দিয়ে আপনি ট্রাইব্যুনাল গঠন করবেন? তাহলে এখানে ভুল কোথায়? দেখতে হবে, যাদের নিয়োগ করা হয়েছে তাদের যোগ্যতা আছে কিনা। তাদের কেউ হয়তো আওয়ামী লীগের মধ্যে থাকতে পারে। এখানে আমি আপনার সঙ্গে উকিল হিসেবে কথা বলছি না। বলছি, যুদ্ধাপরাধের বিচার জনগণের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ কিনা। সরকার টেকনিকালি যোগ্যদের নিয়েছে কিনা সে ব্যাপারে অনেকের অভিযোগ আছে। ত্রুটি থাকতেই পারে। সে ব্যাপারে তো আমি জবাবদিহি করব না। আমি আইনমন্ত্রী বা অ্যাটর্নি জেনারেল নই। আমি দেশের একজন সাধারণ নাগরিক। আমি মনে করি, এ বিচার ১৯৭২ সালেই হওয়া উচিত ছিল। ১৯৭৫ সালের পর যুদ্ধাপরাধী হিসেবে যারা বন্দি ছিল, জেনারেল জিয়াউর রহমান তাদের মুক্ত করে দিয়েছেন। ঐ বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তিনি প্রায় ১০-১৫ হাজার লোকের মুক্তি দেন। এগুলো গোপন করে কার লাভ?

দেখছি, আমাদের কিছু তরুণ বুদ্ধিজীবীও গোপন করার অপরাধটুকু করছেন। তাঁরা নিরন্তর বলে চলেছেন শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব সব অপরাধীকে মাফ করে দিয়েছিলেন। আমি শেখ সাহেবের ভক্ত না হলেও মিথ্যা কথা তো বলতে পারি না। যারা জ্বালাও-পোড়াও, খুন, ধর্ষণের মত অপরাধ করেছে তাদের ছাড়া বাকিদের তিনি মাফ করে দিয়েছেন। এটা করে তিনি তো রাষ্ট্রনায়কসুলভ কাজই করেছেন। তার ত্র“টি থাকতে পারে। তবে যেটা তার ত্রুটি নয়, সেটাকে ত্রুটি হিসেবে তার ওপর চাপান কি কোন ভাল মানুষের কাজ? এটা কি ন্যায়বিচার হল? যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন বিলম্বে হলেও এটা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া আমাদের রাষ্ট্র এগুতে পারবে না।

বণিক বার্তা: সম্প্রতি রামুতে বা ২০০১ সালে সাতক্ষীরায় যে ঘটনা ঘটেছিল, সেগুলোর বিচার না হওয়ার জন্যই কি এবার তারা সাহস পেল?

সলিমুল্লাহ খান: যারা মনে করে এখানকার হিন্দু নাগরিকদের উপর আক্রমণ করলে রাজনৈতিক ফায়দা লোটা যাবে, তারা এটা করেছে। কাদের ফায়দা হয়েছে সেটাও সবাই জানে। ২০০১ সালে কার ফায়দা হয়েছিল? এখন হয়তো একই ফায়দার জন্য তারা এসব করছে। কিন্তু তারা একটি বিষয় ভুলে যাচ্ছেন, এটা ফৌজদারি অপরাধ শুধু নয়; এটা রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক অপরাধ। কারণ ধর্ম, ভাষা, নৃতত্ত্ব এসবের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের কোন গোষ্ঠীর উপর আক্রমণ দেশদ্রোহিতার শামিল। রাষ্ট্র এটাকে সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখলেও আমি মনে করি তা যথেষ্ট নয়। ১৯৯২ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার পর বোম্বে ও অন্যান্য জায়গায় যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল, সেটাকে আসলে দাঙ্গা বলা যায় না। তখন এক পক্ষ অপর পক্ষকে নিধন করেছে। একে দাঙ্গা বলা হবে কেন? এটাই প্রকৃতপক্ষে গণহত্যা। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় বেগম খালেদা জিয়া এবং ফরহাদ মজহারের মত লোকেরা এখন বলছেন গণহত্যার বিচার করতে হবে। এটা গণহত্যা শব্দটির নিকৃষ্ট ও বিকৃত ব্যবহার। আমি এসব মৃত্যু সমর্থন করি না। কিন্তু সাম্প্রতিক এসব মৃত্যুকে গণহত্যা বলাটা ঠিক হয়নি।

বণিক বার্তা: এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে উত্তরণের পথ কি? বিচার না ফাঁসি?

সলিমুল্লাহ খান: মনে করেন, আপনার দেশ শত্র“দের দ্বারা আক্রান্ত। ধরুন আপনার দেশকে চীন বা আমেরিকা এসে আক্রমণ করেছে। আপনিই বলেন, এর থেকে উত্তরণের পথ কি? আমেরিকা ইরাক আক্রমণ করেছে। তারা এর নাম দিয়েছে অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম। কিন্তু ইরাকের কয়জন লোক তার সঙ্গে সহযোগিতা করেছে? ইরাকের একটি অংশ সাদ্দাম হোসেনকে পছন্দ করত না। শিয়ারা করত না। কুর্দিরা করত না — তারা সুন্নি। ত্রিমুখী বিভক্তির কারণে কিছু লোক আমেরিকাকে সহযোগিতা করেছে। তারা জাতির অতি ক্ষুদ্রাংশ। যদি কোনদিন ইরাক স্বাধীন হয় তাহলে এ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। যে কোন কারণে হোক কোলাবরেশন করাটা যুদ্ধাপরাধ। কাউকে হত্যা করা ধর্ষণ করা মানবতাবিরোধী অপরাধ। এক্ষেত্রে স্বাধীন ইরাকের কর্তব্য কি হবে?

কোন যুদ্ধে যদি আপনার জেতার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে মাঝে মাঝে আপনি পশ্চাদপসরণ করতে পারেন। কিন্তু এমন কোন সম্ভাবনা যদি না থাকে, তাহলে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও লড়াই করতে হবে। বাংলাদেশকে বাইরে থেকে কেউ আক্রমণ করলে দেশপ্রেমিক হিসেবে আপনি যে পজিশন নিতেন, সে পজিশন নিতে হবে। প্রত্যেক নাগরিককে স্বেচ্ছায় মুক্তিযুদ্ধে যেতে হবে। আমি মনে করি বর্তমান সংকট সে রকম হয়নি। যদিও অনেকে গৃহযুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে।

বর্তমানে যারা বিচারাধীন আছেন, সরকারের দৃষ্টিতে তারা অভিযুক্ত। যতক্ষণ পর্যন্ত অপরাধ প্রমাণিত না হয়, ততক্ষণ তারা অপরাধী নন। এখন পর্যন্ত তিনজনের মামলার রায় হয়েছে। রায়ের ব্যাপারে আমরা মতপ্রকাশ করতেই পারি। এতে আদালত অবমাননা হয় না। আদালতের যে কোন রায় সম্পর্কে মন্তব্য করা যায়। ন্যায়বিচার না পাওয়ার কথাটি অভিযুক্ত, অপরাধী বা বিচারপ্রার্থী যে কোন পক্ষই বলতে পারে। কিন্তু এ ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে অপপ্রচার যারা চালাচ্ছেন তারা বলছেন ১৯৭১ সালের প্রকৃত অপরাধীদের বিচার না করে বিরোধীদলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বিচার করা হচ্ছে।

এ জাতীয় প্রচারণা যে মতলবে করা হচ্ছে সেই মতলবেই রামুতে বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা করা হয়েছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস একই মতলবে হিন্দু মন্দির কি ঘরবাড়িতে আক্রমণ করা হয়েছে।

বণিক বার্তা: রাষ্ট্র এক্ষেত্রে কি করতে পারে?

সলিমুল্লাহ খান: রাষ্ট্র নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে প্রতিশ্র“তিবদ্ধ। রাষ্ট্রকে নিরাপত্তা দিতে হবে। ব্যর্থ হলে সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। ধরে নিতে হবে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিপ্লব হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র এখন নিজেই বিচারের মুখোমুখি। এটা এখন পরীক্ষার বিষয়।

রাষ্ট্রের বাইরে জনগণেরও দায়িত্ব আছে। আমরা যাকে বলি সিবিল সোসাইটি বা জাতীয় সমাজ তাদেরও চেষ্টা করতে হবে। জনমত গঠনের কাজ আছে। ৯৯ শতাংশ জনগণকে যদি একমত করা যায়, তাহলে কোন সহিংসতা হবে না। মনে রাখা দরকার এখন যুদ্ধাপরাধীদেরও অনেক ক্ষমতা হয়েছে।

কেউ ব্যক্তিগতভাবে সহিংসতা করলে রাষ্ট্র কি করবে? চাঁপাইনবাবগঞ্জে কানসাট বিদ্যুৎকেন্দ্রে আগুন দেয়া হল। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের নিরাপত্তার জন্য ডাকাতের উপর গুলি না চালায়, তাহলে নাগরিকের জীবন রক্ষা করবে কি করে? সে ডাকাত ব্যক্তি হিসেবে বা দলবদ্ধ হয়েও আসতে পারে। সেটাকে তো দমন করতেই হবে। পুলিশকে নির্মমভাবে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে পুলিশ কি করবে? বলছি না পুলিশের প্রত্যেকটি কাজ সমর্থনযোগ্য। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণে বহু পুলিশকে এখন অপসারণ, ট্রান্সফার করা হচ্ছে। সেগুলো সঠিক না বেঠিক তা বলার ক্ষমতা আমার নেই। পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব হল, নাগরিক ও সমষ্টি হিসেবে রাষ্ট্রকে রক্ষা করা। সেটা করতে গিয়ে যে রাষ্ট্রকে আক্রমণ করে, সে স্বদেশি বা বিদেশি যেই হোক, পুলিশ তাকে মোকাবেলা করবেই।

বণিক বার্তা: মহিলা ও শিশুদেরও মটিভেশন করে নিয়ে আসা হচ্ছে আন্দোলনে…

সলিমুল্লাহ খান: বর্তমানে শাসকশ্রেণি (আওয়ামী লীগ বা বিএনপি বা জাতীয় পার্টি) গ্রামে ধনী কৃষকভিত্তিক ও শহরে মধ্যবিত্তভিত্তিক। তাদের একটা শ্রেণিচরিত্র আছে। আমি মার্কসের সেই বিশ্লেষণের দিকে যাচ্ছি না। সেটা যদি বলেন, বর্তমান সরকারের নীতিতে তো অনেক রকম গলদ আছে। প্রথম গলদ হল, ৪২ বছর পর বিচার করা। গ্রামে তারা কিছুটা গণবিচ্ছিন্ন হয়েছে। সেই বিচ্ছিন্নতার সুযোগ সমাজতান্ত্রিক সাম্যবাদী দলগুলোর নেয়ার কথা ছিল। তারা সেটা নিতে পারেনি।

দেখবেন, ফরাশি বিপ্লবের সময় এ রকম একটি কৃষক অভ্যুত্থান হয়। এক বছর ধরে লড়াই চলে এবং তাতে ২০ হাজার লোক নিহত হয়। ফরাশি বিপ্লব পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিপ্লবগুলোর একটি। এটিকে আমরা বুর্জোয়া বিপ্লব বলি। সেই বিপ্লবেও প্রতিক্রিয়াশীল কৃষকরা পুরোহিতদের নেতৃত্বে রাজতন্ত্রকে পুনরুদ্ধারে লড়াইয়ে নেমেছিল। সেখানকার ভঁদে প্রদেশে কৃষকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে নির্যাতনমূলক ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল। কারণ ফ্রান্স তখন চতুর্দিক থেকে আক্রান্ত। তখন দেশের মধ্যে যারা রাজতন্ত্রীদের পক্ষ হয়ে কাজ করেছিল, তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। তাতে অনেক নিরাপরাধ লোকেরও মৃত্যু হয়েছে। নেপোলিয়নের সঙ্গে যুদ্ধে প্রতিবিপ্লবীরা কয়েক লাখ লোককে হত্যা করেছে। সেটার কথা তো কেউ বলে না?

আমরা কথায় কথায় বলি এয়ুরোপে মৃত্যুদণ্ড রহিত হয়েছে, বাংলাদেশেও রহিত করা উচিত। আমি এয়ুরোপীয়দের জিজ্ঞাসা করি, আফগানিস্তান ও ইরাকে যেসব লোককে হত্যা করা হয়েছে তা কি পরোক্ষ মৃত্যুদণ্ড নয়? তারা রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে মৃত্যুদণ্ড না দিলেও তা রফতানি করেন। গিলোটিনে কেটে যেসব লোককে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে, তাদের ৯৯ শতাংশই ছিল বিপ্লব বিরোধী। বিপ্লব জিনিসটাই নির্মম প্রক্রিয়া। মাও সেতুং বলেছেন, বিপ্লব মানে ভোজসভা বা প্রবন্ধ রচনা নয়। বিপ্লব বলপ্রয়োগের ঘটনা, যার মধ্যস্থতায় এক শ্রেণি আরেক শ্রেণিকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করে।

১৯৭১ সালের ঘটনাও এক রকম বিপ্লব ছিল। আমাদের দুর্ভাগ্য, এর ফল আমরা পুরোপুরি ঘরে তুলতে পারিনি। তাই আহমদ ছফার সেই কথাটিই আমি স্মরণ করি। ১৯৭৭ সাল নাগাদ লেখা বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা নামক প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের কোন ভবিষ্যৎ নেই। কাজেই ভবিষ্যতে বাংলাদেশ কোন ধরনের রাষ্ট্র হিসেবে থাকবে তা নির্ভর করছে বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার উপর। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নিয়েও কেউ যদি তা করতে না পারে, তাহলে গণপ্রজাতন্ত্র আকারে বাংলাদেশ থাকবে কিনা সন্দেহ আছে।

(অনুলিখন: জহিরুল ইসলাম)

১৩ মার্চ ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ৩৩
১৪ মার্চ ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ৩৪
১৫ মার্চ ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ৩৫

ভালো সমালোচকদের আমি আমার খাঁটি শিক্ষক মনে করি

বাংলাদেশের শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতি-অঙ্গনের প্রথিতযশা ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছি আমরা পরস্পরের পক্ষ থেকে। কাজটি শুরু হয়েছে এ বছর পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে। এই ধারাবাহিকতায় প্রথম সাক্ষাৎকারটি মুদ্রিত হলো পরস্পরের ঈদসংখ্যায়।

সাক্ষাৎকার প্রদানে সম্মত হওয়ায় আমরা কৃতজ্ঞ বিশিষ্ট চিন্তক সলিমুল্লাহ খানের কাছে। একান্ত আলাপে তার মুখোমুখি হয়েছিলেন তরুণ লেখক কে এম রাকিব। তাকেও অশেষ ধন্যবাদ।

– সম্পাদক

কে এম রাকিব

আপনি নিজেও একজন কবি। আপনাদের সময় থেকে এই সময় পর্যন্ত বাংলা কবিতার ক্রমপরিবর্তনকে কিভাবে দেখেন?

সলিমুল্লাহ খান

এখনকার কবিতার সাথে আমার বেশি পরিচয় নাই। কাজেই প্রথমে এই দোষটা স্বীকার করা ভালো। কিন্তু মাঝেমধ্যে যা দেখি—যেমন [সোহেল হাসান] গালিবের কবিতা আমি দেখি—তাতে মনে হয় এখনকার কবিদের মধ্যেও অনেক নতুন প্রতিভাবান কবির আবির্ভাব হয়েছে । দুঃখের মধ্যে তাঁদের সাথে আমার পরিচয় নাই। তাই এখনকার কবিদের সম্পর্কে কিছু কথার মতো কথা বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে আমি যখন অনিয়মিতভাবেই দেখি, [কিছু অনিয়মিত কথা হয়তো বলা যায়]।
আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম সত্তরের দশকে। আমাদের সময়ে বা একটু আগে যাঁরা কবিতায় নামধাম করেছেন তাঁদের মধ্যে শীর্ষে ছিলেন [অন্যান্যের মধ্যে] নির্মলেন্দু গুণ আর আবুল হাসান। মানে এঁদের তখন ভরাযৌবন। আমরা তখন মাত্র ছাত্র।

কে এম রাকিব

শামসুর রাহমান কি ততদিনে কবিখ্যাতি পেয়েছিলেন?

সলিমুল্লাহ খান

শামসুর রাহমান তো আরও আগের দিনের মানুষ। তাঁর প্রথম কবিতা উনিশশো পঞ্চাশের দশকে—হতে পারে আরো আগেই—বেরিয়েছিল। শামসুর রাহমানের জন্ম ১৯২৯ সনে। তার মানে ভাষা-আন্দোলনের সময় তাঁর বয়স ২২-২৩ বছর।আর শামসুর রাহমান তখনই কবিতা প্রকাশ করা শুরু করেছেন।

কে এম রাকিব

আল মাহমুদ কি আরও পরে করেছেন নাকি সমসাময়িক?

সলিমুল্লাহ খান

যতটুকু খবর রাখি, বয়সে আল মাহমুদ শামসুর রাহমানের চেয়ে খানিক ছোটই হবেন। ধরেন, আল মাহমুদের জন্মআমি যদি ভুল না করে থাকি—ইংরেজি ১৯৩৬ সাল। সৈয়দ শামসুল হকের জন্মসালও তাই হবে হয়তো। কথাটাকে বাংলায় এইভাবে বললে আরো ভালো হয়, ইংরেজি ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর, ঢাকায় নতুন কবিতার আন্দোলন—তাকে সমাবেশও বলতে পারেন—শুরু হয়।
ঢাকা তখন একটা মফস্বল শহর। তার মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা, আপনি জানেন, ১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলন। ভাষা-আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ১৯৫৩ সালে ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ নামের একটা সংকলন বের করেন হাসান হাফিজুর রহমান। তিনিও তখন বয়সে বেশ তরুণ। ওখানে ছিলেন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর। আলাউদ্দিন আল আজাদ ওখানে ছিলেন কিনা মনে করতে পারছি না। থাকার কথা। তবে ঐ সংকলনে যাঁদের কবিতা তখন ছাপা হয়েছিল তাঁদের বয়স তখন ১৮ থেকে ২১ বছরের মধ্যে, অর্থাৎ ওঁদের বেশির ভাগই বয়সে তরুণ ছিলেন। শামসুর রাহমানও ছিলেন আশপাশেই। অর্থাৎ ওঁদের আমরা ‘পঞ্চাশের দশকের’ কবি বলে থাকি, বলতে পারি।
ষাটের দশকে ভিন্ন একদল কবি বেরিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ ইতি আদি। মানে কবিতার প্রথম প্রকাশের দিক থেকে বলছি। নির্মলেন্দু গুণের প্রথম কবিতার বই বেরিয়েছিল ১৯৭০ সালের শেষে। ঐ যে বিখ্যাত বই…

কে এম রাকিব

প্রেমাংশুর রক্ত চাই

সলিমুল্লাহ খান

হ্যাঁ। সেটা ১৯৭০ সালের শেষদিকে বেরিয়েছিল। ১৯৭১ সালের পর যে নতুন কবির দল বেরিয়েছেন তাঁদের মধ্যে নাম করেছিলেন [দাউদ হায়দার ইত্যাদি]। নাম মনে আছে এমন কবিদের মধ্যে আছেন আবুল হাসান। আরও অনেক কবি এসেছেন, সবার নাম বলার হয়তো প্রয়োজন নাই। আমরা এসেছি ১৯৭৫ সালের পরে, ঢাকায়। আমাদের সাথে উল্লেখযোগ্য কবি যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে মোহন রায়হান, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কথা মনে পড়ে। এঁদের বই ১৯৭৯ সালে বের হয়। এজন্যে এঁদের ‘সত্তর দশকের’ কবি বলি। আমার নিজের প্রথম কবিতার বই—এক আকাশের স্বপ্ন—বের হয় ১৯৮১ সালে ।

কে এম রাকিব

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের বক্তৃতার উপরে আপনার বইটা বের হয় কখন? কবিতার বইটা প্রকাশের আগে না পরে?

সলিমুল্লাহ খান

না, না। কবিতার বইটা ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বইমেলায় বের হয়। তখন বইমেলা ছোট আকারে হতো, বাংলা একাডেমিতে। আর রাজ্জাক সাহেব বক্তৃতাটা দিয়েছিলেন ১৯৮১ সালের মে মাসে। মানে আরও চার মাস পরে। তো সেই বক্তৃতার আমি রিভিউ লিখেছি। সেটি বের হয়েছে ১৯৮৩ সালে।

কে এম রাকিব

এই বইটাই সম্ভবত লেখক হিসেবে আপনাকে পরিচিতি দেয় প্রথম…

সলিমুল্লাহ খান

হ্যাঁ, কথাটা অসত্য নয়, আমার কবিতার বইটা দৃষ্টি আকর্ষণ করে নাই। এটাতে আমার কোনো লজ্জা নাই।

কে এম রাকিব

স্বাভাবিক…

সলিমুল্লাহ খান

হ্যাঁ, স্বাভাবিক। লোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে নাই, কিন্তু প্রত্যেক মানুষ নিজের সাধ্য অনুসারেই করে। তো, আমি গদ্যপদ্য দুটোই লেখা শুরু করেছি ঢাকায় এসে, বই প্রকাশের আগে আমার বহু গদ্যপদ্য, আলাদা পদ্য, আলাদা প্রবন্ধ বেরিয়েছে। রাজ্জাক সাহেবের বক্তৃতার পর আমি যে দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখি—আমাদের দেশে দীর্ঘ প্রবন্ধের চল তেমন নাই—সেটা আমাকে বই আকারেই প্রকাশ করতে হয়েছে। প্রথম প্রকাশের সময় পাতার সংখ্যা ছিল ১০৪ অর্থাৎ আজকালকার যা ঢিলাঢালা ছাপা তাতে দেড়শ পৃষ্ঠার মতো হবে। সেই বইটি, হ্যাঁ, দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। করার দুটো কারণ। [একটা কারণ সম্ভবত এই যে] তখন রাজনৈতিক প্রবন্ধের বিশেষ চল ছিল না। দ্বিতীয়ত, অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক কিছুই লিখতেন না সাধারণত, ঐটাই তাঁর প্রথম বই। সেটার সমালোচনা অন্যরা—বুদ্ধিমানরা—না করলেও আমি বোকা ছিলাম বলে করেছিলাম। সমালোচনার মধ্যে দুইটা ভাগ ছিল…।

কে এম রাকিব

এইটা কেন বলছেন? বুদ্ধিমানরা না করলেও…

সলিমুল্লাহ খান

আবদুর রাজ্জাকের মতো মহান জ্ঞানীর সমালোচনা করার মতো বিদ্যা তখন আমার ছিল না। কাজেই পাগলেরা অনেক সময় যেটা করে, শিশুরাও তেমনই করে। সে রকম আর কি। অর্থাৎ তাঁর সাথে আমার তুলনার প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু ঘটনাচক্রে সেটা সঠিক ছিল..। আমি ঐ ঘটনার পরে—আরও ৪০ বছরের মাথায় বলছি, সত্য বলতে ৩৫ বছর পরে আর কি—বলছি যে কোনো রকমের পাল্টা সমালোচনা কেউ বের করেনি, করতে পারেনি। তাঁর ভক্তের সংখ্যা তো বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশিই ছিল, নিতান্ত কম ছিল না। সেই সময় আমাকে পছন্দ করেন নাই অনেকেই…।

কে এম রাকিব

আপনার সেই লেখার আর্গুমেন্টকে কেউ রিফিউট করেছিল তখন?

সলিমুল্লাহ খান

না। কিন্তু মৌখিকভাবে অনেকেই রিফিউট করেছিল, যেমন সরদার ফজলুল করিম।

কে এম রাকিব

তার রিফিউটেশনের জায়গাটা কী ছিল?

সলিমুল্লাহ খান

সবাই। যেমন আহমদ ছফা এই জায়গা থেকে পছন্দ করেন নাই, তিনি বলেছিলেন, তুমি একজন প্রবীণ অধ্যাপকের বিরুদ্ধে লিখে নিজেকে অজনপ্রিয় করে তুললা।

কে এম রাকিব

এখানে তো নবীন-প্রবীণ কম্পিটিশনের ব্যাপার হওয়ার কথা না, আলাপটা…

সলিমুল্লাহ খান

হওয়ার কথা না, আমার যতটুকু মনে আছে [তার কথাই] বলছি আর কি। যা হোক। আমার দুই-একজন সমবয়সী বন্ধু পত্রিকায় সদয় রিভিউ-টিভিউ লিখে থাকতে পারে, সেগুলি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে নাই। এইটাই আর কি।

কে এম রাকিব

আমরা মনে হয় কবিতা নিয়া আলাপ থেকে দূরে সরে গেছি।

সলিমুল্লাহ খান

আমি বলছিলাম আমার প্রথম বই কবিতার বই… এটা বলার জন্যই। যা হোক, সেটা আমার প্রবন্ধের যে বই তার দুবছর আগে বের হয়। মাঝে মাঝে কবিতা লিখেছি বটে কিন্তু পরে কবিতার বই প্রকাশের আর অবকাশ হয় নাই। অনেক পরে ১৯৯৮ সালে আরেকটা বই বের করেছিলাম।

কে এম রাকিব

সেটা তো অনূদিত কবিতার বই।

সলিমুল্লাহ খান

হ্যাঁ, সেটা আবার মূল বই না। অনুবাদের বই।

কে এম রাকিব

আল্লার বাদশাহি?

সলিমুল্লাহ খান

হ্যা, নাম রেখেছিলাম ‘আল্লাহর বাদশাহি’। এবং যাঁর বই আমি অনুবাদ করেছি তিনি জার্মানির কবি হলেও জার্মান কবিরা তাঁকে অত বেশি চিনতেন না। কারণ, জার্মানদেশে আমরা যাকে বলি ‘মেইনস্ট্রিম’, তার বাইরে ছিলেন তিনি। তবে তিনি খুব উচ্চশিক্ষিতা মহিলা। তাঁর কাজের ক্ষেত্র ছিল [ধর্মতত্ত্ব, তবে] তিনি ছিলেন একটু, যাকে বলা হয় ‘বামঘেঁষা’…। জার্মানিতে তখন ডানপন্থা খুব প্রবল ছিল, পশ্চিম জার্মানিতেই তিনি [কায়েম-মোকাম ছিলেন]। বসবাস করতেন হামবুর্গে। তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় ভিয়েতনাম-যুদ্ধ-বিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন। খ্রিস্টধর্মের নিরিখে ল্যাতিন আমেরিকার পরিপ্রেক্ষিত থেকে বলছি—যাকে বলা হয় ‘লিবারেশন থিয়োলজি’, ঐ গ্রুপের লোক তিনি। ধার্মিক হলেও তিনি ছিলেন প্রগতিশীল এবং সমাজতান্ত্রিক [ভাবধারার পক্ষপাতী]।

কে এম রাকিব

ভাসানী বা এইরকম সমাজতান্ত্রিক ধারার কাছাকাছি বলতে পারি?

সলিমুল্লাহ খান

না, ভাসানী ছিলেন রাজনীতিবিদ। উনি ছিলেন কবি।

কে এম রাকিব

আদর্শের জায়গাটা বামপন্থা।

সলিমুল্লাহ খান

হ্যাঁ। মেইনস্ট্রিম [কোনো প্রকাশনা সংস্থা] থেকে তিনি তাঁর কবিতা বের করেন নাই। বই করেছেন কতগুলো অপ্রধান জায়গা থেকে। তাঁর সাথে আমার পরিচয় হয় মার্কিনদেশে থাকার সময়। তারপরে, এই পরিচয়সূত্রে, ১৯৯৫ সনের দিকে আমি তাঁর কবিতার সাথে পরিচিত হই। তাঁর বই অনুবাদ করতে আমার দুই-তিন বছর লেগেছে। তাঁর অনুমতি নিয়েই আমি ওই বইটা প্রকাশের ব্যবস্থা করি। তাঁর একটা ইন্টারভিউ আমি নিয়েছিলাম, সেটি এখানকার একটি পত্রিকায় বেরও হয়েছিল। [পত্রিকাটার নাম খুব সম্ভব “মানব জমিন”। ঐ পত্রিকায় রাজু আলাউদ্দিন তখন চাকরি করতেন। মনে হয় তিনিই ওই ইন্টারভিউটা ছেপেছিলেন। ইন্টারভিউটি হারিয়ে ফেলেছি। হারিয়ে আমার খুব একটা ভালো লাগছে না। বইটায় বেশ ভালো সাড়া পেয়েছিলাম। দেখা গেল রাজু আলাউদ্দিন, ফয়জুল লতিফ চৌধুরী, এবং আরও কয়েকজন—ঢাকার ৪-৫ জন কবি—সমালোচনা বা (আমি বলব) বেশ প্রশংসাই করেছিলেন। তখন বোঝা গেল কবি হিসাবে [আমি হয়তো পুরাপুরি] মারা যাই নাই। এই আর কি! তারপরে ঐ বইটার ২য় সংস্করণ বের হয়েছিল অনেক দিন পরে, ‘আল্লাহর বাদশাহি: ডরোথি জুল্লের নির্বাচিত কবিতা’ নামে।

কে এম রাকিব

প্রথমেও কি ‘আল্লার বাদশাহি’ নামে ছাপা হয়েছিল?

সলিমুল্লাহ খান

হ্যাঁ। আমি নাম বদল করিনি। ২য় সংস্করণটা প্রকাশনার দিক দিয়ে অনেক বেশি শোভন হয়েছিল। এইটাই আমার মনের মতো একটা বই হয়েছে। কবিতার সাথে সম্পর্ক আমার আপাতত এই দুই বইয়েই সীমাবদ্ধ। আরেকটা সম্পর্ক আছে কবিতার সাথে আমার। প্রত্যেকটা বইয়ের উৎসর্গপত্রে আমি কবিতা লিখেছি। সে রকম লিখতে লিখতে আমার অনেক কবিতা জমেছে। সেগুলো দিয়ে কোন কবিতার বই করি নাই। ভবিষ্যতে হয়তো কখনও করব। এই হচ্ছে কবিতার সাথে আমার সম্পর্ক। আমার প্রধান পেশা [বা ব্যবসায়] কবিতা নয়। তাই বলে কবিতা আমি ত্যাগ করেছি এমনও নয়।

কে এম রাকিব

এই সময়ে যারা কবিতা লিখছেন তাদের কবিতার সাথে কি যোগাযোগ…

সলিমুল্লাহ খান

পড়ি। অনেকের কবিতা পড়েছি। এই কিছুদিন আগে পর্যন্ত পড়তাম। [সুব্রত অগাস্টিন] গোমেজের কবিতার প্রশংসা করেছি। আমি যাঁদের পছন্দ করি তারা একটু ভিন্ন ঘরানার কবি। আর পছন্দ করি শুধু কবিতার কারণে নয়, আরও কারণে, অন্য কারণেও পছন্দ করি। আমার বিচারে [কবিতাকে তো] প্রথমত কবিতা হতে হবে, তারপরে অন্য বিষয় আসবে। যেমন, [মতিন বৈরাগী] আমার চেয়ে বয়সে হয়তো গোটা দশ বছরের বড় হবেন, কবি হিসেবে তিনি খুব ভালো নন, কিন্তু কবিতার সাথে পঞ্চাশ বছর লেগে আছেন, এটা একটা শ্রদ্ধেয় বিষয়। অন্তত একটি কবিতা ভালো লিখেছেন তিনি। আমি মনে করি জীবনে অন্তত একটি কবিতা যে ভালো লিখেছে সেও কবি। এমনকি নবি-পয়গম্বররাও চব্বিশ ঘণ্টা ওহি লাভ করেন না। মাঝে মাঝে তারা ওহি পান। যারা সাধারণত খারাপ কবিতা লেখেন, তাঁরাও মাঝেমধ্যে দুই-একটা ভালো কবিতা লেখেন। মতিন বৈরাগীর কবিতা—সত্যি বলতে কি—আমি প্রথমে পছন্দ করতাম না। কিন্তু [অনেকদিন পর] হঠাৎ ‘সক্রেটিস’ বলে তাঁর একটা কবিতা পড়লাম । এইটা আমার ভালো লাগল।

কে এম রাকিব

সক্রেটিস?

সলিমুল্লাহ খান

হ্যাঁ। এইটা আমার ভালো লাগল। আমি লিখেছিও। অনেক লম্বা কবিতাটা, প্রায় আট পৃষ্ঠা।

কে এম রাকিব

তাহলে তো দীর্ঘকবিতা।

সলিমুল্লাহ খান

এইটা নিয়ে আমি লিখেছি । যদি আপনি সত্যি কৌতূহলী হন তাহলে এটা পাবেন [আমার পরের বইয়ে], [অদূর ভবিষ্যতে] আমার একটা বই বেরোচ্ছে, আমি এখন ওটার সম্পাদনাকর্ম করছি। [বইটা শিগগির]—ধরেন এই বছর—বের হবে আশা করছি।

কে এম রাকিব

নামটা ঠিক হয়েছে?

সলিমুল্লাহ খান

এখন পর্যন্ত ঠিক আছে। [নাম মাসে মাসে] বদলে যায় কিনা! নাম তো সবসময়ই একটা প্রজেক্ট আকারে থাকে। এইটার নাম দিয়েছি ‘সাহেব বিবি গোলাম’। এটা হলো এখনকার কবি এবং লেখকদের যে সকল কাব্য বা গদ্য-বইয়ের সমালোচনা আমি করেছি সেগুলির একটা সংগ্রহ। প্রায় পঞ্চাশটির মতো লেখা নিয়ে [এই সংগ্রহশালা]।

কে এম রাকিব

বইটা করছে কারা?

সলিমুল্লাহ খান

প্রকাশক ঠিক হয় নাই। কিন্তু আমি আগে তো সম্পাদনা করে দেব। এখন পর্যন্ত সাতচল্লিশটা লেখা আছে। আরও লেখা নানা জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। আমি কারও বইয়ের প্রশংসাপত্র লিখে দিয়েছি, কারও ভূমিকা বা রিভিউ করেছি। সেগুলিই একত্রিত করলেও এরকম একটা বই হয়। তরুণ কবিসহ অনেকের সম্পর্কেই আমি লিখেছি। চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ সম্পর্কেও চারটা লেখা লিখেছি। বলে রাখা ভালো তারেক মাসুদও একসময় কবিতা বা ছড়া লিখতেন।

কে এম রাকিব

লেখাটা কি কবি তারেক মাসুদের উপরে না ফিল্মনির্মাতা তারেক মাসুদের উপরে?

সলিমুল্লাহ খান

চলচ্চিত্রনির্মাতা তারেক মাসুদকে নিয়েই মূলত, একটু স্মৃতিকথার ধরনে। তারেক মাসুদ ঢাকায় এসে প্রথম ছড়া লিখতেন। আমার ঘনিষ্ঠদের মধ্যে ছিলেন মোহন রায়হান আর, তারেক মাসুদ। আমার অন্যান্য বন্ধু যারা ছিলেন, [যেমন আওলাদ হোসেন তালুকদার, ইনি এখন ময়মনসিংহে আছেন], যেমন কামাল চৌধুরী [উঁচুদরের সরকারি চাকুরে, সম্প্রতি অবসর নিয়েছেন]… এঁদের সাথে এখন আর আমার যোগাযোগ নেই। মতামতের দিক থেকে আমরা অনেক ভিন্নমতের লোক, কিন্তু বড় মারামারি হয় নাই (হাসি)।

কে এম রাকিব

আজফার হোসেন, নুরুল কবির এরাও কি আপনার বন্ধুস্থানীয়?

সলিমুল্লাহ খান

আজফার হোসেন, নূরুল কবীর এঁরা বয়সে আমার চেয়ে সামান্য ছোট হবেন। আমারও তো বয়েস হয়ে গেছে—বৃদ্ধ হয়ে গেছি। হায়, আমার বয়স এখন ষাট। এঁরা ষাট ছুঁই ছুঁই। যা হোক, এই হচ্ছে কবিতার সাথে আমার সম্পর্ক। আমি এখনো কবিতা পড়ি। আমি অনেক বিদেশি কবিতার অনুবাদ করেছি, যেগুলো প্রকাশিত হয় নাই। যেমন ফিনল্যান্ডের একজন কবি, পেন্টি সারিকোস্কি [Pentti Saarikoski] তাঁর নাম। আমি ১৯৯১ সালে তাঁর কিছু কবিতার অনুবাদ করেছিলাম। এখনও একটা পাণ্ডুলিপি কোথাও আছে, হয়তো কোনোদিন বেরোবে।
আমি আরও একজন কবির কবিতা পছন্দ করি। তাঁর নাম কাদিয়া মলোদোভস্কি। ইনি পূর্ব ইয়োরোপের কবি। তারঁ মাতৃভাষা ইদ্দিশ, জার্মানির তথা পূর্ব এয়ুরোপের (আশকেনাজি) এয়াহুদি জাতির ভাষা। ওইসব ভাষা খুব একটা জানি না বিধায় ইংরেজি তর্জমা থেকে তর্জমা করি। তাই প্রকাশনার ক্ষেত্রে একধরনের সংকোচ কাজ করে আমার।
আমি সচরাচর মূল ভাষা দেখে তর্জমা সংশোধন করারও চেষ্টা করি। ওই যে ফিনিশ ভাষা জানতাম না, এইজন্যে ফিনিশ ভাষাও শেখার চেষ্টা করেছি কিছুদিন। খুব সফল হইনি। সম্প্রতি ইদ্দিশ শেখার চেষ্টা করছি। ইদ্দিশ জার্মান ভাষার একটা উপভাষা। লেখা হয় হিব্রু হরফে। তো আমি সম্প্রতি হিব্রু হরফ পড়াটা অল্প অল্প শিখছি। হিব্রু এখন ইসরাইলের ভাষা। কিন্তু হিব্রু যে হরফে লেখা হয় সে হরফে লেখা হলেও ইদ্দিশের ব্যাকরণটা কিন্তু জার্মান ভাষার ব্যাকরণের মতো। স্পোকেন জার্মানের মতো—এইটা বললেই বরং ভালো হয়।
যা হোক, আমি যে কবিকে চিনি কাদিয়া মলোদোভস্কি, ওঁর সাথে আমার কদাচ দেখা হয় নাই। ইনি মারা গেছেন ১৯৭৫ সালে। তাঁর কবিতার ইংরেজি তর্জমা আমি প্রথম পড়ি ১৯৯৮ সালে। ঘটনাচক্রে দুনিয়াতে যাঁরা আমার চোখে ভালো কবি অথচ ভালো বলে সাধুসমাজে খুব বেশি পরিচিত নন তাঁদের ভালো বলতে আমার সংকোচ হয় না। আমি যদি দেখি পড়ে আমার ভালো লাগছে, আমি সাহস করি অনুবাদ করার। এই আর কি। কবিতা সম্পর্কে আমার অতি অল্পই জানাশোনা।

কে এম রাকিব

একটা বহু পুরানো বিতর্ক আছে। শিল্পসাহিত্যে দুইটা ডমিন্যান্ট ধারা, যদিও সবসময় বিভাজনটা স্পষ্ট না, সেটা হচ্ছে একদল ‘আর্ট ফর আর্টস সেইক’-পন্থি, কথাটা সম্ভবত অস্কার ওয়াইল্ডের, যাকে সুধীন দত্ত বলেছেন ‘কলাকৈবল্যবাদ'[সেই ধারার]। আরেকটা ধারা আবার শিল্পকে সরাসরি রাজনীতির হাতিয়ার বানাতে চায়। অনেকের তো মনে হয় প্রপাগান্ডার মাধ্যম। এই দুই এক্সট্রিমের মাঝামাঝিও আছে। আপনার অবস্থান বা এই বস্তাপচা বিতর্কের বিষয়ে কিছু বলার আছে কিনা…।

সলিমুল্লাহ খান

আমাদের ছোটবেলা থেকেও এটা চালু ছিল। এইটাকে দুর্ভাগ্যজনক বলতে হয়। আমি বলছি। যেমন ধরেন চিকিৎসাশাস্ত্রকে চিকিৎসাশাস্ত্রই হতে হবে। অথচ অনেক ডাক্তার দেখা যায় যাঁরা পেশায় চিকিৎসা-ব্যবসায়ী, কোম্পানির ওষুধপত্র প্রমোট করেন, যাঁদের  কাছে পয়সা কামানোটাই বড় কর্তব্য মনে হয়। এরকম কবিদের মধ্যেও কেউ কেউ, দেখা যায়, বিজ্ঞাপন লেখেন। এই যে আপনারা চোখে দেখেন না—প্রপাগান্ডার কথা যে বলছেন—এই যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় থেকে শুরু করে যাঁদের আপনারা বড় কবি মনে করেন এঁরা সকলেই—বিজ্ঞাপন সংস্থায় একসময় না আরেক সময় কাজ করেছেন। এমনকি বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় বহুদিন বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করতেন। প্রচারণার কাজে সকলেই অংশগ্রহণ করে, কিন্তু সেই প্রচারণা যদি আপনার পছন্দ হয়, আপনি সেইটাকে প্রচারণা মনে করেন না, শিল্পটিল্পই মনে করেন। আর যাঁর প্রচারণা আপনার পছন্দ হয় না, তাঁর সম্পর্কে আপনি নানা কথা বলেন।

কে এম রাকিব

জর্জ অরওয়েলের একটা কথা আছে সম্ভবত, অল আর্ট ইজ প্রপাগান্ডা।

সলিমুল্লাহ খান

আর্ট তো প্রপাগান্ডা বটেই। তারপরও কথা হচ্ছে কি, আমি যে আর্ট পড়ি সেখানকার প্রপাগান্ডায় চোখ দেব না। এখন লোকে বোরডম কাটানোর জন্যে শিল্পে ধর্ষণ ব্যবহার করে, সেক্স ব্যবহার করে। এটা আপনার জানার কথা। কবিতার ক্ষেত্রে আমি বলছি কবিতাকে প্রথমে কবিতা হতে হবে। তো কবিতা হবে কিনা এটা বুঝবেন কি করে? আমি মনে করি কবিতা মানে কবিতার ইতিহাস। অনেকে বলেন কবিতার ইতিহাস নাই। আমি বলি আছে। কারণ কবিতা ‘শেষ পর্যন্ত’ মানুষ ভাষা দিয়েই লেখে, ‘শেষ পর্যন্ত’ কথাটা আমি জোর দিয়ে বললাম। কারণ নানা সময়ে নানা ধরনের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন হয় ভাষার ভিতর দিয়ে।
অ্যারিস্টটল বলেছিলেন মানুষ তার ‘আত্মা’ দিয়ে চিন্তা করে। এটা ভুয়া কথা। আপনি লিখতে পারেন। মানুষের ‘আত্মা’ বলে কিছু নাই। ‘আত্মা’ একটা মিথ,এই ধরেন অধুনা পরিত্যক্ত  ‘ইথার’ নামক কথাটার মতো। মানুষ কিন্তু চিন্তা করে ‘ভাষা’ দিয়ে। ভাষা বলতে বিজ্ঞাপনের যে ভাষা, আমি ঐ ভাষার কথা বলছি না। মানুষ যখন চিন্তা করে তখন সে নানাভাবে প্রকাশ করে। ভাষা ছাড়া কোনো ভাব প্রকাশ করা সম্ভবই নয়। তাই হয়তো বলা যায়, ভাষাই চিন্তার কারণ, ইচ্ছা হয় আাপনি বলতে পারেন ‘অপর কারণ’ ।
‘চিন্তা’ কথাটাকে আমি দুভাবে বলব, মানুষ ‘অঙ্ক’ কষে—এটাও তার চিন্তার একধরনের প্রকাশ। আবার মানুষ যখন ইংরেজিতে যাকে ‘প্যাশন’ বলে তার প্রকাশ ঘটায় তাও চিন্তা বৈকি! সে চিন্তার প্রকাশভঙ্গি অন্যরকম। কবিতার মধ্যেও একধরনের চিন্তার প্রকাশ হয়। কিন্তু এই চিন্তার প্রকাশভঙ্গি অন্যরকম। এর মধ্যে রূপক, লক্ষণা, উপমা, উৎপ্রেক্ষা এইসমস্ত জিনিশ থাকে। যদি বলেন আপনার চিন্তা পূর্ণ তো আপনার প্রকাশও পূর্ণ হবে। আমরা এখন কি করে বুঝব আপনি এখন কি চিন্তা করছেন? আপনি যা প্রকাশ করেন তা দেখেই তো বুঝব। এই যে বললাম সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের কবিতা ভালো, কারণ ভাষার উপর তার প্রচণ্ড দখল। বাংলা ভাষার ইতিহাসের সাথে তার পরিচয় অনেক বেশি গাঢ়। তাঁর ভাষা দেখেই বুঝি তাঁর চিন্তার ক্ষমতা আছে। সত্য ধরা পড়ে।
আরেকটা কথা হলো কি, প্রতিভা বলে একটা কথা তো আছেই। শেষ কথা এইটাই—প্রতিভা। একজনের প্রতিভা আরজন নকল করতে পারে না। ওতে তাঁর আপন মুদ্রাই অঙ্কিত হয়। যেমন আপনার হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির ছাপ আমার হাতের ছাপের সঙ্গে মিলবে না। গোমেজের যেহেতু ভাষার উপর দখল আছে, আমি উদাহরণ দিয়েই বলছি, সেই কারণে তাঁর কবিতার মধ্যে যে ছন্দের স্ফূর্তি পরিস্ফুট হয়, শব্দের সাথে শব্দের সংঘর্ষে যে দ্যুতির বিচ্ছুরণ ঘটে সেটা আপনা-আপনি আপনার হৃদয়ে আঘাত হানে। তাঁর সব কবিতার অর্থ যে আমি বুঝি তা নয়। কবিতা আমরা অর্থের জন্যে পড়ি না। সেটা বাংলায় যাকে বলে দোলা দিয়ে যায়।

কে এম রাকিব

কবির সিগনেচার থাকে…

সলিমুল্লাহ খান

ওটা কেউ কেউ অর্জন করে। কবিতা পড়লে আমরা সহজেই বুঝতে পারি কোনটা মাইকেলের, কোনটা রবীন্দ্রনাথের, কোনটা জীবনানন্দের বা নজরুলের। তরুণ কবিদের ঐ মুদ্রাটা অর্জন করতে কিছু সময় লাগে। আমি যাঁদের কথাই বলছি যেমন এই গোমেজেরই লেখা গদ্য যখন পড়ি, আমার মনে হয় যেন একটা শিশু লিখছে। যেমন ‘বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ’ ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর কিছু কিছু শিশুসুলভ ধারণা আছে।

কে এম রাকিব

যেমন? এটা কেন মনে হলো আপনার?

সলিমুল্লাহ খান

আমাদের এক বন্ধু ছিলেন আলম খোরশেদ নামে। তার একটা বইয়ের রিভিউ উনি ‘প্রথম আলো’ নামক এক পত্রিকায় লিখেছিলেন। সেটা পড়েই আমি বলছি। তাঁর কতগুলি অদ্ভুত ধারণা আছে, যেমন তিনি নিজে প্রচণ্ড শক্তির সঙ্গে আরবি-ফার্সি শব্দ ব্যবহার করেন কিন্তু আপনি যদি গোটা এক গণ্ডা আরবি-ফার্সি শব্দ ব্যবহার করেন তিনি বলবেন ‘সাম্প্রদায়িকতা’ করছেন। এগুলো হচ্ছে শিশুসুলভ কথা। অর্থাৎ ফার্সি শব্দ ব্যবহার করলে মুসলিম সাম্প্রদায়িক হয়, এইধরনের যে শিশুসুলভ চিন্তাটা ওঁর আছে। বাঙ্গালি বলতে, [ওঁর ধারণা যাঁরা মুসলমান নন, যদিও কথাটা মুখ ফুটে বলার সাহস তাঁর নাই, কিন্তু তাঁর আবহ-ইঙ্গিত দেখে তা পরিষ্কার ধরতে পারবেন]। ওঁর মধ্যেও একটা ইনফিরিয়রিটির বোধ কাজ করে, কারণ কি জানি না, হতে পারে তিনি জাতে বাঙ্গালি অথচ তালে দেশি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানে ধর্মবিচারে সংখ্যালঘু গোছের মনে করেন নিজেকে। এই জটিলতার আলামত আছে তাঁর গদ্যে। উদাহরণ যেহেতু আপনি চাইছেন তাই বলি। তার পুরস্কারপ্রাপ্তি উপলক্ষে এক সভায় আমাকে ডেকে নিয়ে যান অনিকেত শামীম। এই শাহবাগেই জাতীয় জাদুঘরের ভিতরের কোনো এক ছোটঘরের অনুষ্ঠানে ।

কে এম রাকিব

কবে এটা?

সলিমুল্লাহ খান

এই দুবছর আগে। আমার সালজ্ঞান তালজ্ঞান ঠিক নাই।  আমি বললাম গোমেজ হচ্ছেন—ওঁ যে রসিকতা বুঝতে পারেন না সেটাই বলছি আর কি এবং নির্দোষ রসিকতার মধ্যেও দোষের আক্রোশ দেখেন তার উদাহরণ দিচ্ছি মাত্র—বাংলা সাহিত্যের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ খ্রিস্টান কবি। সে যে খ্রিস্টান এটা অনেকেই জানে, অনেকেই জানেও না। আমিও রসিকতা করার জন্যে যখন বললাম মাইকেল মধুসূদনের পরে তিনি হচ্ছেন দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি খ্রিস্টান কবি—দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি কবি বললে কোন দোষই হতো না—তিনি প্রমাদ গুনলেন। যেহেতু রবীন্দ্রনাথ নজরুল প্রভৃতি বড় কবি মাঝখানে… এরকম আরো আছেন তাই আমি একটু রসিকতা করে বললাম, মাইকেল মধুসূদন দত্ত হলেন শ্রেষ্ঠ বাঙ্গলি খ্রিস্টান কবি, এক নম্বর কবি। আর সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ হলেন দুই নম্বর বড় কবি। আসলে আমার মনে কি ছিল কে জানে। হয়তো বলতে চেয়েছিলাম, এদেশে আরও খ্রিস্টান কবি নাই কেন, থাকা তো উচিত। সুখের মধ্যে, এতদিন পর যাক বাঁচা গেল, একটা  প্রতিভাবান খ্রিস্টান কবি পাওয়া গেল! তখন কিছুদিন পর শুনলাম তিনি আমাকে গালি দিলেন ‘মুসলমান সমালোচক’ বলে। অর্থাৎ রসিকতাটা মাঠে মারা গেল, [বলতে পারতাম বজ্রপাতে ‘শহিদ’ হলো]। আমি যে মুসলমান তা আমার অস্বীকার করার কোনো ইচ্ছা না থাকায় আর কথা বাড়াইনি।

কে এম রাকিব

আরেকটা ব্যাপারও হতে পারে, দুই নম্বর শব্দটার মধ্যে একটু নেগেটিভ কনোটেশন আছে, ওইটাতে হার্ট করছে কিনা?

সলিমুল্লাহ খান

কবি যেমন রসিকতা করবেন, গদ্যকারও কি তেমন রসিকতা করবেন না! আমাকে যে তিনি মুসলমান বলে সাথে সাথেই [শুনলাম ভিডিয়োযোগে] গালি দিলেন, তাতেই হার মানলাম। বোঝা গেল রসিকতাটা তিনি নিতেই পারেন নাই।

কে এম রাকিব

এখন যদি তিনি বলেন যে, আমিও আসলে খ্রিস্টান কবি বলার মতো ‘মুসলমান সমালোচক’ বলেছি রসিকতা করে?

সলিমুল্লাহ খান

আমি তো আলোচ্যসূচিতে না। আমি তাঁর আলোচক। আমার উপর যখন তিনি আলোচনা করবেন তখন [ধরা যাক দুমাস বা] দুবছর পর তিনি তা বললে কোনো সমস্যা ছিল না। নগদ যে তিনি বলে পাঠালেন অস্ট্রেলিয়া থেকে… ওই ইয়াতে… তার বন্ধুদের সাথে ফোনালাপে [কি ভিডিয়ো-আলাপে], এইটা আমি রিপোর্টযোগে শুনেছি। যা হোক, এটাই হচ্ছে ঘটনার ঘনঘটা। আমি তাঁর লেখাতেও দেখেছি, মাত্র একটা উদাহরণ দিয়েছি আপনাকে। কবি পরিচয়ে প্রথম শ্রেণির হয়েও চিন্তাবিদ প্রণয়ে উনি চতুর্থ শ্রেণির হতে পারেন। এইটা উদাহরণ দিয়ে বললাম। বললাম দুঃখের কথাই। আরও অনেক আছেন। যেমন ধরেন মাসুদ খান একদা ভালো কবিতা লিখতেন। কিন্তু দেখবেন কি, তাঁর চিন্তাভাবনাও অত্যন্ত নিম্নমানের। সামাজিক চিন্তার কথা বলছি, আর কিছু নয়।

কে এম রাকিব

তার গদ্যও কি… তার গদ্যের সাথে আপনি পরিচিত?

সলিমুল্লাহ খান

সব কথা আজ এক সাথে বলা যাবে না। তিনি যে চিন্তাভাবনা প্রকাশ করেছেন, তার আলোকে বলছি, ওসব আমার কাছে মনে হয় অতি নিম্নশ্রেণির, অপরিপাটি। কবি হিসাবে তিনি বেশ ভালো ছিলেন, কিন্তু গদ্য লেখাটা কোনোদিন ঠিক শেখেননি। গদ্য লেখা বলতে বলছি চিন্তা করা, প্রকাশ করাটা শেখেননি।

কে এম রাকিব

এই কথাগুলো কি আমরা রাখব ইন্টারভিউতে? বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে কিন্তু।

সলিমুল্লাহ খান

কেন রাখবেন না ! অফকোর্স! তা তো বটেই। বিতর্ক সৃষ্টি করার জন্যেই তো আপনি [সাক্ষাৎকার নিতে] আসছেন।

কে এম রাকিব

আচ্ছা।

সলিমুল্লাহ খান

আমি উদাহরণ দিয়ে বলছি। যাদেরকে আমি কবি হিসাবে ভালো মনে করি তাদের অনেকেই ভালো গদ্য লেখেন না। বাংলাদেশে সমালোচনা সাহিত্য বড় বিকশিত হয় নাই। কেন, আমি এই কথাটাই বলছি। পিঠ-চুলকানো চিন্তাভাবনাই এই দেশের প্রায় সমস্ত পত্রিকায় প্রকাশিত হয় । বাংলাদেশে সাহিত্য পত্রিকার নামে যতগুলি কাগজ বেরোচ্ছে অধিকাংশই এই টাইপের। অর্থাৎ আপনি যে প্রকাশনার তরফে এসেছেন সেই ‘পরস্পর’ অনলাইন পত্রিকার কথাই ধরুন না কেন, এই প্রকাশনাও ব্যতিক্রম নয়, হয়তো পরস্পর পত্রিকাও পরস্পর-গোষ্ঠীর লোকদেরই তোষামোদ করেন। এইরকম আর কি। তাঁরা যে প্রশংসাটা করেন,তা আবার এমন একটা ধোঁয়াশা ভাষায় করেন, কেন যে প্রশংসাটা করছেন আদৌ বোঝা যায় না।

কে এম রাকিব

আমি প্রচুর কবিতা পড়ি না, ভুলও হতে পারে, কিন্তু মনে হয় ওভার-অল বাংলা কবিতার চাইতে বাংলা কবিতার সমালোচনা পড়ে বোঝা কঠিন। ‘মহাকাল’, ‘গভীর জীবনবোধ’ ইত্যাদির ভিড়ে সমালোচনা সান্ধ্যভাষার মতো লাগে।

সলিমুল্লাহ খান

হ্যাঁ। [এই জাতীয় সান্ধ্যভাষার লেখার মধ্যে] সবচেয়ে ভালো হচ্ছে গালিবের লেখা। মজার কথা, গালিবের লেখা আমি কিছুই বুঝি না। গালিব আমার ভালো বন্ধু। আপনে কথাগুলি ছাপতেও পারেন। তিনি যে কোন কবিতা ভালো মনে করেন, ‘পরস্পর’ যখন বের করেন দেখি যে অনেক [কবির কবিতা ছাপেন, কারও তিরিশটি কবিতা ছাপেন, কারও বত্রিশপাটি দাঁতও দেখান], কিন্তু ঘুরেফিরে আমরা যে তিমিরে ডোবা সেই তিমিরেই ডুবে থাকি। অর্থাৎ গালিবের সবই আছে। চিন্তা করার ক্ষমতাটাই খালি আল্লা দেয় নাই। বুঝতে পেরেছেন? আমি কেন কবিদের সংসর্গ ত্যাগ করেছি তা বুঝানোর জন্যে আপনাকে এই ঘরের উদাহরণটা দিলাম। এঁরা সকলেই ভালো কবি বটেন। গোমেজ সম্ভবত আমাদের সময়ের সবচাইতে ভালো কবি। তাঁর সাথে আছেন সাখাওয়াত টিপু, খুব ভালো কবি। কিন্তু গোমেজ আর সাখাওয়াত টিপু হয়তো পরস্পর কথা বলেন না। শামসেত তাবরেজী আরেকজন ভালো কবি। আমি যতদূর পড়েছি, [হিজল জোবায়ের আরেকজন শক্তিমান কবি।] এঁদের [কবিতার] সাথে কি আপনি পরিচিত?

কে এম রাকিব

এঁদের কবিতা পড়েছি। কমবেশি সবারই।

সলিমুল্লাহ খান

আগেই বলেছি মাসুদ খান ভালো কবি। এমনকি সাজ্জাদ শরিফও খারাপ কবি নন। ব্রাত্য রাইসুও ভালো কবি। আমার কোনো বিরোধ নাই এঁদের, এই কবিদের সাথে। কিন্তু এঁরা যখন, ধরুন ব্রাত্য রাইসু যখন গদ্য লেখেন তখন মনে হয় যেন কোনো লেখাপড়া জানেন না। এখন বলে রাখি, লেখাপড়া জানা কবির জন্যে বাধ্যতামূলক নয়। তিনি যে লেখাপড়া জানেন না একথা তো সত্য, অস্বীকার করা যায় না। এটা ভালো কি মন্দ আমি জানি না। যখন তিনি বলেন কিনা ‘আমার লেখাপড়া জানার দরকারই নাই, আর লেখাপড়া জানলে কবিতা হয় না’, তখন আপনে কি করবেন, বলেন দেখি (হাসি)! অনেকে লেখাপড়া জানাটাকেই কবিতার শত্রু মনে করেন। এটা একধরনের কবিসুলভ অভিমান।

কে এম রাকিব

আবার কবিতার ক্ষেত্রে বা যে কোনো শিল্পসাহিত্যের ক্ষেত্রেই অনেক সময় দেখা যায় পণ্ডিতি-দেখানো, জ্ঞান বা উদ্ধৃতি-ভারাক্রান্ত [রচনা] ইত্যাদি আছে, কিন্তু মানের দিক দিয়ে তা নিম্নমানের। এমনও আবার প্রচুর আছে কিন্তু।

সলিমুল্লাহ খান

আসলে না জানলে তো আর কিচ্ছু করার নাই। কথা হচ্ছে কি, কার্ল মার্কস সাহেবের জন্মের দুই শত বছর পূর্ণ হচ্ছে এ বছর। তাঁর নাম স্মরণ করা অন্যায় হবে না কবিতার ক্ষেত্রেও। তিনিও অল্প বয়সে অল্পসল্প কবিতাপত্র লিখেছেন।

কে এম রাকিব

প্লেটোও লিখেছেন কবিতা, যিনি তাঁর আদর্শ স্টেটে কবিদের জায়গা দিতে চান নাই।

সলিমুল্লাহ খান

ওই যে মার্কস সাহেব এক জায়গায় বলেছিলেন, অজ্ঞানতা কাউকে সাহায্য করে না, কথাটা ফেলনা নয়। জ্ঞান লাভ করে আপনি কাজে লাগাতে পারেন, নাও লাগাতে পারেন। কিন্তু অজ্ঞানতা আজ পর্যন্ত কাউকে তো কোনো সাহায্য করেনি, ভাই। তো, আমাদের ব্রাত্য রাইসু এ সত্যের একটা করুণ উদাহরণ। আমি তাঁকে খুব পছন্দ করি, রীতিমতো স্নেহই করি বলতে পারেন। আমার ‘আল্লাহর বাদশাহি’ নামক (অনুবাদ) কবিতার বইটা প্রকাশে তাঁর অনেক সাহায্য ছিল। সে কথা ভোলার মতো নয়। আমার অনুপস্থিতিতে বইটা উনিই (আর বলা প্রয়োজন সাজ্জাদ শরিফ) প্রকাশক যোগাড় করে বের করেছিলেন। আমি যাঁদের কাছে যেখানে যে ঋণ করেছি তা স্বীকার করতে হবেই। আর করলে দোষটাই-বা কি? কিন্তু দুঃখের কথা, তিনি নিজে লেখাপড়া করেন না। মনে হয় এই না করাটাকেই তিনি একটা ধর্মে উন্নীত করতে চান। আমি বলি, আপনি লেখাপড়া করতে ইচ্ছা না করে তো করবেন না। কিন্তু যাঁরা লেখাপড়া করতে চায়, তাঁদের দোষ দিচ্ছেন কেন?

কে এম রাকিব

যারা লেখাপড়া করেন তারাও অনেকে আবার লেখাপড়া করাটাকে ধর্মে উন্নীত করতে চান, এই জায়গার বিরোধিতা থেকেও হয়তো হতে পারে। আমি জানি না, তার পজিশন বা বক্তব্য কী এ ব্যাপারে।

সলিমুল্লাহ খান

আমি ধর্মের বিরোধিতা করতে চাই না। আমি মনে করছি যে ধর্মচর্চা হিসাবে আমরা একমত যে ‘লাকুম দিনুকুম ওয়াল ইয়াদিন’ নীতিটা মাননীয়। তোমার ধর্ম তোমার, আমার ধর্ম আমার। এইটাই হচ্ছে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি।

কে এম রাকিব

এইটাকেই এডওয়ার্ড সায়িদ সম্ভবত সেকুলার দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ হিসাবে দেখেছেন।

সলিমুল্লাহ খান

হ্যাঁ, হ্যাঁ। যাই হোক, আমার কথা হচ্ছে কিনা কবিতা আমাদের দরকার। কিন্তু কবিতার বাইরেও যারা শিল্পের অন্যান্য ফর্ম চর্চা করেন তাদের দিকেও তো একটু মনোযোগ দিতে হবে। আমাদের দেশে কবিতা যত বিকশিত হয়েছে সাহিত্য সমালোচনা যেটা বলা হয় সেটা অত বিকশিত হয়নি। কারণ কি? ছোটবেলা থেকেই আমার সঙ্গীসাথিদের মধ্যে কবিরা আছেন। যাঁদের কথা বললাম এঁরা সকলেই একসময় আমার বন্ধু ছিলেন, এখনও আছেন বলেই আমি মনে করি।। আমি এখনও কাউকে শত্রু মনে করি না। কবিদের আমি পছন্দ করি, সকল দোষের পরেও দোষ সত্ত্বেও কবিরা নমস্য। তো আমার কথা হচ্ছে ওদের কাছ থেকে একটু দূরে দূরে থাকি। যেমন [সোহেল হাসান] গালিবকে আমি পছন্দ করি। কিন্তু সামনা-সামনি হলে বলি, গালিব আপনারা এগুলো কি করেন? না, তাতে তিনি তো আমার শত্রু হন না। তিনি বলেন যে আপনার কাজটা আপনি করেন, আমার কাজটা আমি করি। আমি গালিবকে ভাইয়ের মতোই মনে করি। কিন্তু গালিবের কবিতা আমি মাথার উপর নেব এমন তো নাও হতে পারে। আমি বলি আপনার কবিতা আমি বুঝি না। মানে আপনার পদ্য আমার প্রাণে আবেদন জাগায় না। কিন্তু জসীমউদ্‌দীনের কবিতা? জাগায়, আমি আনন্দ পাই। এই যে আমি ‘প্রাচীনপন্থি’ হয়ে গেলাম!

কে এম রাকিব

হা হা হা…

সলিমুল্লাহ খান

আচ্ছা, আপনি আহমদ ছফার কবিতা পড়েছেন?

কে এম রাকিব

পড়েছি। তবে খুব বেশি না। প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা আর কিছু বিচ্ছিন্ন কবিতা। ‘কবি ও সম্রাট’…

সলিমুল্লাহ খান

প্রবীণ বটের কাছে তো অনেক আগের লেখা। শেষ বয়সে তিনি ‘কবি ও সম্রাট’ নামে একটা কবিতা লিখেছিলেন। লেনিন ঘুমাবে এবার বইতে। এইটা একটু পড়েন আপনি। আমি ওটাকে একটা ভালো কবিতা মনে করি। মানে আমাকে বোঝার জন্যে আমি ভালো কবিতার একটা উদাহরণযোগে সংজ্ঞাই দিচ্ছি। আমি রবীন্দ্রনাথের কোনো কোনো কবিতাও পছন্দ করি। আমি একটু প্রাচীনপন্থি, এটা বলতে লজ্জা বোধ করি না।

কে এম রাকিব

আহমদ ছফা সঞ্জীবনী-তে ছফার কবিতা নিয়ে কিছু লিখেছেন।

সলিমুল্লাহ খান

সব কিছু লিখি নাই। ঐটা তো লিখেছিলাম ৭৭-৭৮ সালে। প্রবীণ বটের কাছে প্রার্থনা বের হবার পরপরই একটা রিভিউ লিখেছিলাম। আহমদ ছফার কবিতা নিয়ে আমি আর কোনো কিছু লিখি নাই। ভবিষ্যতে আল্লা চাহে তো লিখব। যা হোক, আমি প্রাচীন এবং আধুনিক কালের মধ্যে কোনো বিরোধ কল্পনা করি না। ইংরেজিতে বলে হিস্ট্রি ইজ এ কন্টিনিউয়াম। আমার ভেতরে অতীতও আছে, বর্তমানও আছে।

কে এম রাকিব

সমাজব্যবস্থা, সময়, প্রযুক্তি, মূল্যবোধ—এইগুলার তো পরিবর্তন হয়। সেই বদলের অভিঘাত শিল্পে-সাহিত্যেও লাগার কথা না?

সলিমুল্লাহ খান

আছে তো। পরিবর্তনের মধ্যে কিছু কিছু আমি প্রার্থনা করি, কিছু কিছু পরিবর্তনে আমি সহায়তা করি। কিছু কিছু পরিবর্তনের আমি বিরোধিতাও করি। একসময় ফাসিবাদ আসছিল। এইটাও তো পরিবর্তনই। ওটা আমি পছন্দ করি না। কমিউনিজম পছন্দ করি, এটা তো আমি লুকাই না কখনো।

কে এম রাকিব

এই যে এনালজিটা, কবিতার পরিবর্তন, ফ্যাসিবাদের সাথে মিলিয়ে এইটা…

সলিমুল্লাহ খান

কবিতার ক্ষেত্রেও সমস্ত ইনোভেশন আমার ভালো লাগবে এমন কোনো কথা নাই। আমার এইখানে পছন্দ-অপছন্দ আছে। যেটা আমি বুঝতে পারি না সেইটা আমি ভালো বলব কেন? এখন কেউ যদি বলে আপনি এখানে ‘রাজার নতুন জামা’ পরে বেরিয়েছেন, আপনি তো কিছু জানেন না এইটাই প্রমাণিত হলো। তথাস্তু। আমি যেটা জানি সেটার কথাই বলছি। যেটা জানি সেটা বলি, কবিতার মধ্যে আমি বোদলেয়ার পড়েছি, তাঁর উপর দুটা সেমিনারও করেছি। ফরাসিতেও কিছু কিছু পড়েছি। গদ্যকবিতাগুলোও পড়েছি। আমার পৃথিবীতে প্রিয় কবিদের মধ্যে একজন এই বোদলেয়ার। অন্য কবিদেরও আমি পছন্দ করি। সুতরাং আমার কবিতার রুচি সম্পর্কে আমার কিছুটা ধারণা আছে। যাদের কবিতার কথা বলছি, যেমন ব্রাত্য রাইসুর মধ্যে একটা ক্ষমতা ছিল। সেটা হচ্ছে তাঁর চমকপ্রদ কথা বলার ক্ষমতা, তিনি বলতে পারতেন চমৎকার। কিন্তু ওই যে চমক দেওয়ার মোহ… মৃদুল দাশগুপ্ত তাঁর সম্পর্কে মনে হয় সঠিক কথাই বলেছেন: এই চমক দিয়ে সারাজীবন চলা যায় না। উনি কিন্তু গত বিশ বছরে একইঞ্চিও বড় হননি। বনসাঁই বলে একটা কথা আছে না? রাইসু হচ্ছেন বনসাঁই। তাঁর নাম রাইসু বদলে কেউ যদি বনসাঁই দেন তাহলে চমৎকার একটা কাজ হয়। হি ডিড নট সিমপ্লি গ্রো।

কে এম রাকিব

বাংলা কবিতার মধ্যে আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি একটা…

সলিমুল্লাহ খান

ওইটাই তো। ভালো কবিতার বই। এরপরে কিন্তু আর কিছু লিখতে পারে নাই। হালিকের দিনওটাও আমি পড়েছি। আমাকে তাঁর বইয়ের রিভিউ লিখতে তিনি বলেছিলেন। দুঃখের মধ্যে, আমি রিভিউ লেখার কিছু খুঁজে পাই নাই। কারণ তিনি প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করেন। আমি যে সমস্ত শব্দ বা বাগ্বিধি পছন্দ করি না, সে যে সমস্ত ‘চ’ শব্দ ব্যবহার করেন, আমি ওটা রুচিবহির্ভূত বলেই মনে করি। আশা করি আমাকে ভুল বুঝবেন না, আমি রবীন্দ্রনাথ নই, আমি মোটেও রুচিবাগীশ নই। কিন্তু এখন একজন লোক, কোনো আধুনিক কবি যদি তাঁর আম্মাজানকেই বিয়ে করতে চান, তিনি করতে পারেন, আমি এটা অনুমোদন করব না।

কে এম রাকিব

এইরকম মাকে বিয়ে করা বা ইনসেস্ট—এরকম ব্যাপার কি আসলে তাঁর কবিতায় আছে?

সলিমুল্লাহ খান

ওঁর কবিতা সেরকমই। যখন বাংলা ভাষায় কেউ চ-শব্দ ব্যবহার করেন, তখন বুঝতে হবে তিনি তাই করছেন। অর্থাৎ তাঁর পাপটা হচ্ছে প্রকৃতির বিরুদ্ধে নয়, সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। সংস্কৃতির একটা আয়না আছে। প্রকৃতি থেকে সংস্কৃতিতে প্রমোশন পাওয়া যায়। তিনি সেটার বিরোধিতা করছেন।

কে এম রাকিব

এভাবেও তো কেউ বলতে পারে যে, এই যে শব্দের ভালোমন্দ, মার্জিত-অমার্জিত হওয়ার ব্যাপার—এগুলাও আসলে একধরনের শ্রেণিরুচির ব্যাপার, ডমিন্যান্ট বা ডমিনেটেড শ্রেণির মূল্যবোধগত ব্যাপার। অ্যাবসলিউট কিছু না।

সলিমুল্লাহ খান

আমার বক্তব্যটা আমি বলছি। আমি ওটাকে মনে করি সংস্কৃতির বিরোধিতা। আমি যেটিকে সংস্কৃতি মনে করি, এখন আমার এটাকে আপনারা সমালোচনা করেন, আমার তো আপত্তি নাই। আমি আমার কথাই বলছি। আমি অন্যের কথার দায়িত্ব নেব না। রাইসুর কবিতাতে যে সমস্ত ‘চ’ জাতীয় শব্দ আছে, আরও অনেক কবিরই আছে, আরও উদাহরণ আছে, রাইসু অপেক্ষাকৃত ভালো কবি বলেই তাঁর নামে আলোচনাটা হচ্ছে। এগুলোকে আমি আমার রুচির যে [ছোটমতো] গণ্ডি, তার বহির্ভূতই মনে করি। অর্থাৎ আমার যে কাব্যের আসর, তাতে তার স্থান হবে না। তাঁর আসরে তো আমি জায়গা খুঁজতেছি না, তাই না?

কে এম রাকিব

কবিতা নিয়ে তো আলাপ হলো। কবিতার বাইরে গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি এইসময়ের লেখকদের পড়া হয়?

সলিমুল্লাহ খান

পড়া হবে না কেন! আমি সাহিত্যের ব্যবসায় করি। ছোট ব্যবসায়ী যদিও (হাসি)। আমি লিখতে পারি না, এটা অবশ্য সত্য।

কে এম রাকিব

আপনার প্রকাশিত প্রায় সব লেখাই আমি পড়েছি যেহেতু, আপনার বেশির লেখাই শিল্পসাহিত্য নিয়ে, যদিও তাত্ত্বিক, চিন্তক বা বুদ্ধিজীবী হিসাবেই আপনি বেশি পরিচিত।

সলিমুল্লাহ খান

মানুষ তাত্ত্বিক হিসাবে, বুদ্ধিজীবী হিসাবে, জন্মগ্রহণ করে না। সে ঘটনাচক্রে এটা-ওটা হয়ে ওঠে। আমরা তো ঘটনাবলির, পরিবেশ-পরিস্থিতির সন্তান। যাঁরা খুব বীরপুরুষ তাঁরা পরিবেশ-পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করেন। আমরা যাঁরা ছোটপুরুষ কিংবা পুরুষই নই, নেহায়েতই জীব, কৃষ্ণের জীব, আমরা অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হই। অসুবিধা নাই, আমাকে গালি দিলেও আমি মাইন্ড করব না। আপনি গালি দিতে পারেন। আমার বক্তব্য হলো, আমি গল্প-কবিতা কিছুটা পড়েছি। সব পড়ি নাই। সবকিছু পড়া সম্ভব নয়।… আনন্দ না পেলে আমি পড়ি না। অনেক সময় চাকরি হিসেবে পড়ি যে, এইটা পড়ে আপনাকে একটা মত দিতে হবে। সেটা অন্য জিনিশ।  যেমন, ছোট বয়সে, সত্তরের দশকে আমি হাসান আজিজুল হকের গল্পের উপরে লিখেছি। নামহীন গোত্রহীন নামক তাঁর চতুর্থ বইটা যখন বের হয় স্বাধীনতার পরে—ঐটাতে মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি আছে—ওইটা আমি পড়েছিলাম। এখন আমি জানাই, ওই বইটা তাঁর যে লেখার স্বাভাবিক ক্ষমতা, ঐটা আছে বলে তিনি লিখতে পেরেছেন এবং আমাকে আকৃষ্ট করেছিল তাঁর গদ্যের ধারালো ভাবটা…

কে এম রাকিব

একটা নিরাবেগ নির্মোহ ভঙ্গি…

সলিমুল্লাহ খান

কাটা কাটা গদ্য আর কি। সেটা আমিও পছন্দ করি। করতাম তখন বেশি, এখনও করি। হাসান আজিজুল হকের লেখা এখনও পড়া যায়। অর্থাৎ আপনি ক্লান্ত বোধ করবেন না। এই যে গুণ তাঁর মধ্যে… উইট আছে, হিউমার আছে গদ্যে। কিন্তু জীবন ঘষে আগুন যখন বের হয় তখন আমি ওটা মনোযোগ দিয়ে পড়ার চেষ্টা করেছি, খুবই কঠিন ছিল। তারপরেও আমি বেশ কয়েক বার পড়ার চেষ্টা করেছি।

কে এম রাকিব

আগুনপাখি লিখলেন পরে, উপন্যাস।

সলিমুল্লাহ খান

ঐগুলি আমি আর পড়ি নাই। সোজা কথা, আমি প্রথম দুটো বই পড়েছি। আত্মজা ও একটি করবী গাছ, আরেকটা কি যেন নাম ভুলে গেছি, আর তৃতীয় জীবন ঘষে আগুন ইত্যাদি। হাসান আজিজুল হকের গল্প যে কোনো সংকলনে পাওয়া যায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি কিছুদিন চাকরি করেছিলাম। এখনো হাসান আজিজুল হকের সাথে আমার যোগাযোগ আছে, পরিচয় আছে। উদাহরণ দিয়ে বলছি, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প একটু পরে পড়েছি আমি। অন্যঘরে অন্যস্বরদুধেভাতে উৎপাত এগুলো পরে পড়েছি। অন্যঘরে অন্যস্বর-টাই একটু বেশি মনোযোগ দিয়ে পড়েছিলাম। মনে হলো উনি তো তাঁর গল্পে একজন যেমন “এই  মনোরম, মনোটোনাস শহরে…” [তিনিও অনেকটা তেমনই]।

কে এম রাকিব

‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’। ওটা তো একদম প্রথম দিকের ইলিয়াসের লেখা।

সলিমুল্লাহ খান

তিনি আসলে কবিই—‘বুর্জোয়া কবি’। কিন্তু মজা হলো কি…

কে এম রাকিব

কিন্তু নিরুদ্দেশ যাত্রার যে ইলিয়াস, ওখান থেকে ইলিয়াস কিন্তু পরবর্তীতে অনেক সরে গেছেন।

সলিমুল্লাহ খান

হ্যাঁ, ইলিয়াস অনেক পরিবর্তিত হয়েছেন। তার গদ্য আমি মোটামুটি পড়েছি। অনেক পরে শওকত আলীর গদ্যও পড়েছি। কারো সাথে কারো পুরোপুরি মেলে না, কিন্তু তারা সবাই এক যুগের। এমনকি আল মাহমুদও অনেক গল্প লিখেছেন। আমি বলছি, আমরা হলাম ওই যুগের লোক। আমি নির্মলেন্দু গুণের গদ্যও পড়েছি। আপন দলের মানুষ নামের একটা গল্পের বই ছিল তার। আহমদ ছফা, বশীর আল হেলাল এঁদের গল্পও আমি কিছুদিন পড়েছি। অন্তত একসময় পড়তাম। আমি এঁদের সবাইকে একযুগের লোকই মনে করি। অন্যদের কথা, বলা বাহুল্য, কায়েস আহমেদ পড়েছি, হুমায়ূন আহমেদ, সৈয়দ শামসুল হক পড়েছি …

কে এম রাকিব

হুমায়ূন আহমেদ কেমন লেগেছে?

সলিমুল্লাহ খান

ভালো, খুব ভালো। হুমায়ূন আহমেদের প্রথম দুটো বই—নন্দিত নরকে আর শঙ্খনীল কারাগার—একসময় পড়েছি। এর পরেও দুই-একটা একটু-আধেকটু পড়ে পড়ে দেখেছি।

কে এম রাকিব

আর টানে নাই?

সলিমুল্লাহ খান

নাহ্‌, আর টানেনি। ওই দুটি পড়ে বেশ ভালো লেগেছিল। তখন আমারও বয়স কম ছিল, ওনারও বয়স কম ছিল। পরবর্তীকালে উনি অনেক বড় হয়েছেন, আমি আর বড় হইতে পারি নাই। মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখাও দুই-একটা পড়েছি। কারণ তাঁদের সাথে আমার পরিচয় ছিল [আহমদ ছফার মধ্যস্থতায়]। হুমায়ূন আহমেদের সাথে আমার পরিচয়, বলা যায় একপ্রকার বন্ধুত্বই ছিল। এঁরা সকলেই ভালো লেখক।
কিন্তু আমি যাঁকে বড় লেখক মনে করি তার উদাহরণ একমাত্র আহমদ ছফা। রবীন্দ্রনাথের পরে সর্বশেষ বড় লেখক আহমদ ছফা। শুধু এই স্বাধীন বাংলায় না, ওই ভারতাধীন বাংলায় না, সব বাংলাতেই—গদ্যে, পদ্যে, গল্পে, কবিতায়, চিন্তায় সবচেয়ে বড় লেখক আহমদ ছফা। কবি হিসেবেও ছফা অনন্য। গালিবদের আমার পছন্দ হয় না কি জন্য জানেন? তাঁরা আহমদ ছফার কবিত্ব বোঝেন না। তাঁরা তো ইম্ম্যাচিউর, [ওঁরা পাকেন নাই]। আহমদ ছফার কবিতা বুঝতে যে বয়সের দরকার তা ওঁদের হয় নাই। গালিবের হয়নি, রাইসুর হয়নি, সাজ্জাদের হয়নি, গোমেজের হয়নি। তাহলে এদের অপ্রাপ্তবয়স্ক ছাড়া আমি আর কি বলতে পারি? লিটমাস টেস্ট বলে একটা বাক্য আছে…  আপনি এইটার পরীক্ষা দিবেন তো রঙটা বদলায় কিনা দেখতে পারবেন…।
আহমদ ছফার কবিতা যাদের ভালো লাগে না তাঁদের ভালো কবি বলার কোনো কারণ আমি দেখি না। আহমদ ছফা ফাউস্ট অনুবাদ করেছেন। এটাকে তাঁরা ভালো বলছেন গ্যেটের কারণে। যে লোক গ্যেটেকে এমন অনুবাদ করেন…[তিনি কি আর খারাপ কবি হতে পারেন! আমাদের এই ভদ্রমহোদয়দের ভাবখানা এইরকমই।] আমি বলি আহমদ ছফা গ্যেটেকে বিকৃতই করেছেন। বিকৃত করে শেষতক যা দাঁড়িয়ে গেছে তার নামই অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক দিয়েছিলেন ‘গ্যেটে প্লাস আহমদ ছফা’। আমার বিশ্বাস এই দেওয়াটা ঠিকই হয়েছে। এখানে শুধু এইটুকু বলি, বিকৃত করার জন্যও তো কবিত্বশক্তি লাগবে!

কে এম রাকিব

কবিতার অনুবাদ ভালো হতে গেলে তো মিনিমাম কবিত্ব থাকতে হয় অনুবাদকের।

সলিমুল্লাহ খান

যে লোক এত ক্ষমতার অধিকারী আমি তাঁকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ লেখক বলি না, বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখকদের একজন বলি, তাতে অসুবিধাটা কোথায়! বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের পর সেরা লেখক আহমদ ছফা। একদিকে এত চিন্তাশীল আরদিকে এত সৃষ্টিশীল… দুইটা এক জায়গায় করলে, যুক্ত করলে যা দাঁড়ায় তা হচ্ছেন আহমদ ছফা, আহমদ ছফা ছাড়া আজ বাংলামুলুকে [বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্র আর ভারতের অধিভুক্ত বাংলাপ্রদেশ জুড়ে] এমন কেউ আর নাই।

কে এম রাকিব

গদ্যের ক্ষেত্রে আপনি মনে করছেন আহমদ ছফাই… শীর্ষে।

সলিমুল্লাহ খান

শুধু গদ্যে না, পদ্যেও। আমি জানি আপনাদের জন্যে এ কথাটা গ্রহণ করা এবং ছাপানো—দুটাই চ্যালেঞ্জিং হবে। এটা মেনে নিতে কষ্ট হবে। তবে আমি সবিনয়ে এ সত্যই নিবেদন করি।

কে এম রাকিব

এই সময়ে যাঁরা লিখছেন তাঁদের মধ্যে কারও লেখা ভালো মনে হয়?

সলিমুল্লাহ খান

কারা লিখছেন, আপনি বলেন। আপনি তরুণ, আপনাদের কাছ থেকে শিখি…।

কে এম রাকিব

কত লেখকই তো লিখছেন। শাহাদুজ্জামান, মামুন হোসাইন, কাজল শাহনেওয়াজ, ওয়াসি আহমেদ, শাহীন আখতার, জাকির তালুকদার—কত নামই তো শোনা যায়।

সলিমুল্লাহ খান

এঁরা ভালো লেখক। এঁদের বিষয়ে আমি বেশি কিছু বলতে চাই না। যেমন শাহাদুজ্জামান, বয়সে আমার ছোট। [মানে ওঁকে আমি অনেকদিন থেকেই চিনি। আমি ওঁকে খুব পছন্দও করি। ওঁর বিষয়ে বিরূপ মন্তব্য করতে আমার কষ্ট হয়। আমার সম্পাদিত পত্রিকায় একদা (১৯৮৩-৮৪ সালে) ওঁর লেখা আদর করে যত্ন করে ছেপেছি।] এতদিনেও দেখছি উনি গদ্য লিখতেই শেখেননি। গদ্যে আর পদ্যে যে একটা তফাত আছে এটা ওঁকে এতদিনে কে শেখাবে! জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে একটা ফাতরা বই লিখেছেন তিনি। বইয়ের নাম ‘একজন কমলালেবু’। যাঁর ন্যূনতম আত্মসম্মান আছে তাঁর তো এ রকম বই লেখা উচিতই নয়। জীবনানন্দের উপর একটা মশকরার বই লিখেছেন তিনি। প্রথমে দর্শনে, ভুলের প্রকোপে, একবার পড়েছিলাম ‘একডজন কমলালেবু’। পরে দেখি, না, বইয়ের নাম ‘একজন কমলালেবু’।
পরীক্ষা করার জন্য ‘আট বছর আগের একদিন’ নামের কবিতাটা নিয়ে যে চ্যাপ্টারটা তিনি লিখেছেন, সেটা পড়ে দেখলাম, পড়ে যারপরনাই হতাশ হলাম। দেখি কি কবিতাটার ভিতরটাই তিনি বুঝতে পারেন নাই। [প্রসঙ্গক্রমে বলি, বুঝতে পারলাম আরও এক কারণে । আমি নিজেও ঐ কবিতা নিয়ে সম্প্রতি বাংলায় একটা সহজ প্রবন্ধ লিখেছি। বলা বাহুল্য নয় বাংলা লেখাটা আমার প্রায় দশ বছর আগের একপ্রস্ত ইংরেজি কঠিন প্রবন্ধের তর্জমা নয়।] দেখলাম ওইটা আমার তাহলে আর পড়ার দরকার নাই।

কে এম রাকিব

বইয়ের বেশিরভাগ লেখার যে বিষয়, তা আবদুল মান্নান সৈয়দের শুদ্ধতম কবি-তেই আছে। এর বাইরে বেশি কিছু নাই।

সলিমুল্লাহ খান

আবদুল মান্নান সৈয়দের কথা আমার বলা উচিত ছিল। তাঁর কবিতাও আমি পড়েছি। আবদুল মান্নান সৈয়দ কখনও প্রাপ্তবয়স্ক হন নাই। ঠগ বাছতে গেলে ভাই গা উজাড় হবে। সবার নাম নিয়ে বলা তো মুশকিল। আসাদ চৌধুরীকে আমি চিনতাম। আমি বলব না তিনি একজন মহাকবি। সবার তো মহাকবি হতে হবে না। তিনি একজন সৎ মানুষ। রফিক আজাদের কবিতা আমি অনেকটা পছন্দ করতাম। তাঁর কবিতায় একধরনের গদ্যপ্রবণতা আছে, কবিতাকে উনি ‘পদ্যপ্রবন্ধ’ই বলতেন। নির্মলেন্দু গুণ আর আবুল হাসানকেও আমার এখনও ভালো লাগে। আবুল হাসানকে নিয়েও আমি একটা নিবন্ধ লিখেছি।

কে এম রাকিব

‘আবুল হাসানের অজ্ঞান’

সলিমুল্লাহ খান

আমি অতি সামান্য লেখক। নিজের সম্পর্কে বেশি কথা বলা ঠিক নয়। আমি আপনাকে মাত্র দেখাচ্ছি বাংলা কবিতার সাথে আমার কি রকম [অতি সামান্য] পরিচয় আছে।

কে এম রাকিব

তাও তো বাংলাদেশের পরিচিত কবিসাহিত্যিকদের অনেককে নিয়েই লিখেছেন।

সলিমুল্লাহ খান

ফরহাদ মজহারের এবাদতনামা-র সমালোচনা কেউ করার আগে আমি লিখেছিলাম। বইটি প্রকাশ পাবার পরপর—১৯৯০-৯১ সালের কথা—তার খারাপ সমালোচনা করেছিলেন দুজন প্রথিতযশা লেখক—একজন রফিক আজাদ, অন্যজনের নাম পূরবী বসু, ইনি একজন গল্পকার। আমি তাঁদের দুজনের সমালোচনার জবাব দিয়েছিলাম। ‘ভোরের কাগজ’ পত্রিকায় আমার সেই সমালোচনার একটা সমালোচনা লিখেছিলেন অধ্যাপক আজফার হোসেন। আমি সেটার কোনো উত্তর দেই নাই। কারণ আক্ষরিক অর্থেই তাঁর যুক্তি ছিল অকাট্য, মানে কাটলে রোগী মারাই যাবেন। আমার লেখার সমালোচনা আপনিও করতে পারবেন। আর সবকিছুর জবাব আমাকেই দিতে হবে বা দিতেই হবে এমন কথা তো নাই। পাঠকসমাজ এটা বিচার করবেন। ভালো সমালোচকদের আমি আমার খাঁটি শিক্ষক মনে করি।

 

৫ জুন ২০১৮, পরস্পর

“বাংলা ভাষা বলে একটি বিশেষ ভাষা নেই, বাংলা বহু ভাষা।” সলিমুল্লাহ খানের সঙ্গে আলাপ

salim-khan.jpg

…….
সলিমুল্লাহ খান (জন্ম. ১৮ আগস্ট ১৯৫৮), ছবি. নাসির আলী মামুন
……

[জ্ঞান অর্জনের জন্য যাঁরা জাগতিক প্রাপ্তিকে তুচ্ছ ভেবে একরোখা দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন, বর্তমান সময়ে, সলিমুল্লাহ খান তাঁদের মধ্যে (তার প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার ফলাফলের মতই) প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়ার দাবি রাখেন নিঃসন্দেহে। তিনি আমেরিকাতে ছিলেন প্রায় চৌদ্দ বছর। এবং ইচ্ছা করলেই তিনি এখানে অনেকের মতো স্থায়ীভাবে থেকে যেতে পারতেন এবং প্রাচুর্যও কোনও না কোন ভাবে তাঁর কাছে ধরনা দিতো একথা নিশ্চিত বলতে পারি। কিন্তু, তিনি তা করেননি আর এখানেই অন্যদের থেকে তিনি আলাদা হয়ে যান। আর কিছু না হোক নিউইয়র্কে থাকাকালীন বই পড়ে তিনি তাঁর পড়াশুনা করার অতল পিপাসার কিছুটা হলেও মিটিয়েছেন বলেই আমার ধারণা। নিউইয়র্কে বাসা বদল করতে করতে শেষদিকে তিনি আমার প্রতিবেশী হয়ে ওঠেন। তিনি যেদিন পিএইচডি ডিগ্রীপ্রাপ্ত হন (এপ্রিল, ২০০০) সেদিনই আমাকে জানালেন আর মাত্র চারদিন পরই সুইডেন হয়ে দেশে ফিরছেন। তাঁর একটা ইন্টারভিউ নেওয়ার ইচ্ছা মনে মনে ছিল কিন্তু এমন তাড়াহুড়া করতে হবে তা কখনো ভাবিনি।

বলা দরকার, এই সাক্ষাৎকার যখন নেওয়া হয় তখন তিনি, এক আকাশের স্বপ্ন(কবিতা), আল্লাহর বাদশাহি (অনুবাদ কবিতা) এবং বাংলাদেশ: জাতীয় অবস্থার চালচিত্র—শুধুমাত্র এই তিনটি বইয়ের জনক ছিলেন। এবং আমাদের আলোচনাও, সঙ্গত কারণেই, এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এবং সেই থেকে সাক্ষাৎকারটি বাক্সবন্দি হয়ে আছে। আমি নিজে কখনো কোথাও ছাপানোর চেষ্টা করিনি। কারণ এটা এতদিন আমার কাছে আমাদের বন্ধুত্বের স্মৃতি হিসাবেই বিবেচ্য ছিল। কবিবন্ধু ব্রাত্য রাইসু এর আগে আমাকে দিয়ে কবি শহীদ কাদরীর একটা দীর্ঘ ইন্টারভিউ করিয়ে নিয়েছিলেন এবং প্রথম আলো পত্রিকায় ছেপেছিলেন। এবারও ব্রাত্য রাইসুর উৎসাহ এবং ইচ্ছায় পাঠকের সাথে বর্তমান সাক্ষাৎকারটির যোগাযোগ ঘটছে এ জন্য তাঁর সম্পাদনার উৎসুক মনকে অভিনন্দন জানাই। শামস আল মমীন। নিউইয়র্ক, ডিসেম্বর ১৪, ২০০৯।]

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: শামস আল মমীন

শামস আল মমীন: বহু বছর অপেক্ষার পর সম্প্রতি আপনার অনূদিত তৃতীয় বই আল্লাহর বাদশাহি বের হয়েছে। এদ্দিন পর বই প্রকাশের জন্য অনুবাদ বেছে নিলেন কেন?

সলিমুল্লাহ খান: আমি যখন প্রথম কবিতা লেখা শুরু করি তখনও আমি অনুবাদ করেছি কিন্তু প্রকাশের সুযোগ হয়নি। আমার প্রথম কবিতার বই এক আকাশের স্বপ্ন মৌলিক কবিতা দিয়ে ৬৪ পৃষ্ঠা হচ্ছিল না, পৃষ্ঠা পূরণের জন্য ৩/৪ টা অনুবাদ কবিতা বইতে দিয়েছিলাম।
—————————————————————-
আমি যদি গ্রিক ভাষা কিম্বা ইটালিয়ান ভাষা শিখতে পারি যেমন মধুসূদন শিখেছিলেন, তাহলে আমার উচিত ময়মনসিংহের ভাষা, বরিশালের ভাষা শেখা। কলকাতার ভাষা প্রতিষ্ঠিত ভাষা হয়ে গেছে বলে আর ময়মনসিংহের ভাষায় কোন মনযোগ দেওয়া যাবে না, প্রবণতা হিসাবে এটা হবে কবিদের জন্য ক্ষতিকর। কিছু কিছু আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে এমন প্রকাশভঙ্গি আছে যা তথাকথিত শুদ্ধ ভাষায় নেই।
—————————————————————-
শামস আল মমীন: অনুবাদের জন্য সবাই বেছে নেন বহু পরিচিত, বহু পঠিত কোন লেখককে। সে ক্ষেত্রে আপনি ডরোথি জুল্লের মতো বাংলাদেশে প্রায় অপরিচিত কবিকে বেছে নিলেন কেন?
allahar-badshahi.jpg…….
আল্লাহ্‌র বাদশাহি । সলিমুল্লাহ খান অনূদিত বাম গণতান্ত্রিক জার্মান কবি ডরোথি জুল্লের কবিতা । প্রচ্ছদ: ওবায়দুল্লাহ আল মামুনের ছবি অবলম্বনে সেলিম আহ্‌মেদ । প্রকাশক: সমাবেশ, শাহবাগ, ঢাকা । সেপ্টেম্বর ১৯৯৮ । ৮০ পৃষ্ঠা । ৮৫ টাকা ।
……..
সলিমুল্লাহ খান: উত্তর খুব সোজা। আমি কবির নাম দেখে কবিতা পড়ি না। কবিতা পড়ার পর কবির নাম দেখি। বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে তখন আমি কাজ করি, বইয়ের তাকে বই গোছানোই ছিল আমার কাজ। হঠাৎ দু’টা বই আমার চোখে পড়ে Revolutionary Passion এবং Of War and Love। গোটা কয়েক কবিতা পড়ে ভাল লাগলো। বই দু’টা বাসায় নিয়ে আসি। পড়ে খুবই ভাল লাগলো। ৮/১০ টা কবিতা অনুবাদও করে ফেলি। তখন মনে হলো, এঁর কবিতা যদি আরো জোগাড় করা যায় তাহলে তো একটা বই করা যায়। আমি কবির সাথে যোগাযোগ করি। দেখলাম, মানুষ হিসাবেও তিনি ভাল। এই হলো আল্লাহর বাদশাহি’র জন্মকথা।

শামস আল মমীন: ভবিষ্যতে অন্য কোন জার্মান কবির উপর কাজ করার ইচ্ছা আছে কি?


আল্লাহর বাদশাহি থেকে কিছু অনুবাদ কবিতা

নাদেজদা মান্দেলস্তামের লেখা পড়ে

কবির
নাম গোয়েন্দা বিভাগের খাতায় বহুদিন
টিকটিকিও পিছু
বন্ধুর অভাব নাই

একজন তিন তিনবার তুলে রেখে দিল
তাক নিশান লোকটার ফোন

আরজন একটু খোঁজ-খবর নিতে
পাঠাল বউকে
উনি নিজে শহরের বাইরে গেছেন

তিন নম্বর বনে গেল পুলিশের চর
আর খুব দরকার একটা বাসার

গাড়ি এলো অকে তুলে নিতে
সেদিন ঘটনাচক্রে ঘনিষ্ঠ তিন পড়শি
পড়েছে ঘুমিয়ে

বর্জন, গাদ্দারি, পরিত্যাগ এবং নিদ্রা
দোস্তালির পুরানা অধ্যায়
ঈসা রুহুল্লার প্রাণ–মনে রেখ–গিয়েছিল
এ রকমই দোস্তের ধান্দায়

তোর গল্প করতে পারি না

তোর গল্প করতে পারি না ঈসা
হাস্যকর শোনায়
তোকে পাওয়া ভার
তোর নামে তোলা বিশাল হর্ম্যরে গীর্জায়
পাড়ার কনে শুড়িখানায়
অরা ভাবে মাথাপাগলা তুই দেখতে মন্দ নস্

বলে মোর চালাক বন্ধুরা
অরে দিয়ে কিচ্ছু হবে না
বাসি
দরকার তোর অন্য পথ দেখা
গন্তব্য একই থাক
বলে মোর সরল বন্ধুরা
দরকার তোর তোলা ধৈর্যের
মোর হতাশার কথা
শুনলে শক্ররা খুশিতে
করতো যাজকী হৈ-হল্লা

তোর গল্প বলতে পারি না ঈসা
তোকে দিয়ে চলে না পেট, পুরান মাল
হবে না তোকে দিয়ে, তুই একলা
তুই এটাও তুই সেটাও, তুই নিলামে
হেন বিশপ নেই তোর পাছা মারে না

মোর হেই বেটার দশা
সারারাত গলা চেঁচিয়ে মাইকের লগে পাল্লা দেয়
পর্যটনকেন্দ্রের নলডুগি গর্দভ মিউঝাক বাজনা
ছাপিয়ে গলা ফাটায় বেটা
চালাতে যায় পরিসংখ্যার যুগে
মাতৃভাষায় মান্ধাতার আমলের কথা
বিপদের ফোন পেয়ে

কেবল মটকায় কর্ড, জড়ায় আঙুলে
তোর গল্প বলতে পারি না ঈসা
চালাকদের চেয়ে সরল বন্ধুদেরই
বিশ্বাস বেশি
চড়া দাম দিতে হয় ওদেরই সবসই

অদের সান্ত্বনায় আমার লাভ কী

দেশে দেশে ঘুরি আল্লাহর গুণ গাই

দেশে দেশে ঘুরি আল্লাহর গুণ গাই
তবে শুরু করি রাক্ষসের গুণ দিয়ে
সচরাচর
সমবেত সুধীদের কাছে আর্জি রাখি
অর খেদমত আর করবেন না
আপনেগোর মেহনত আর আপনেগোর বালবাচ্চা
আপনেগোর দুদিনের জান
আর অর পায়ে করবেন না কোরবানি

জীবন্ত আহার হবার ভয়হীন জীবনের কথা বলি
নরম গলায় স্মৃতির ভাষায়
ছুঁই হাত দিয়ে
পুরানা কালের কথা বড় বড়
সোভিয়েত ইউনিয়নের মেয়েদের ডাকি আপা
না খাওয়া মানুষের পেটে খানা পড়লে বলি শান্তি
ভিনদেশী রাক্ষসের কথা
বলি না কেন
তার গাই না সাফাই

দাওয়াতটাই
বড় কথা আল্লাহর গুণ গাই

আমাকে যখন ৫৭২ বার জিগান হলো
হিংসা সম্পর্কে আমার মতামত কী

প্রুশিয়ার রাজা নামে পরিচিত
গোবেচারা এক শহরের
মাসুম এক জেনারেল ইলেকট্টিক কারখানায়
পামাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র অভিহিত
নিরাপত্তার কিছু নিরীহ হাতিয়ার অকেজো করতে
আমার শান্তিবাদী বন্ধুরা যখন
একটা হিংসাত্মক অস্ত্র–পুরানা হাতুড়ি–
চালায়
তখন তারা হিংসার আশ্রয় নিল

এই দায়িত্বজ্ঞানবর্জিত আচরণ জায়েজ করার মতলবে
অরা ঈসা আলাইহেস সালামের আট শ বছর আগের
এক লোকের বক্তব্য তুলে ধরে
মনে হয় লোকটার মুরিদ অরা
লোকটার মাথায় ছিট
তলোয়ার পিটিয়ে লাঙলের ফলা বানাবে সে
বড় এক প্রাণের তরফে

আর ছোট ছোট প্রাণ
ফাঁকিবাজ কুঁড়ে, হতচ্ছাড়াদের স্বার্থে
অনেক বড়র আর সাংঘাতিক ছোটর–
ওদের ভাষায় লিল্লাহ ওদের ভাষায় গরিবের–এই
হিংসাত্মক জোট
মাঝখানে নিরপেক্ষ আমাদের নিরাপত্তার
সত্যিকার হুমকি বিশেষ

সীমান্তের অইপারে

সীমান্তের অইপারে
বুঝতেই পারছেন, বুঝলেন না
বাস করে এক রাক্ষস খুব বাজে
একদম অগণতান্ত্রিক
গরীব প্রজাসাধারণের
সহায়-সম্পত্তি কর-খাজনা খেয়ে
জীবন-জীবিকা বেলা-অবেলা গিলে
প্রাণ মন গবেষণা নাশ করে
বেটা দিন দিন মোটা হচ্ছে

ভুললে চলবে না
মুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার বাধা না থাকায়
বেটা বেপরোয়া বড় হচ্ছে
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক
আমাদের রাক্ষসের চেয়ে
বেটার কোমর এক ইঞ্চি ফোলা
ওজন প্রাণসমেত
আধপোয়া কম–তাতে কী
সীমান্তের নাকের ডগায়

আমাদের দিশি রাক্ষসের
এই শুকোবার ঝোঁক ঠেকাতে নিখুঁত
ব্যবস্থা চাই
এ বিনা উপায় নাই
এর পেশি ফুলিয়ে অর গলা গলা
করার বিকল্প নাই
আমাগোর

আল্লাহর বাদশাহি বা মহা ঐকমত্য

নতুন শহরে এসে টের পাই
বন্ধু নাই মোর বন্ধু নাই

মোর বন্ধু নাই গিয়া গলা ধরে কাঁদবার
সোডার বোতলও শুনি আজ চুপ হাতিয়ার
পরদুঃখে দুঃখী মানে ক্যান্সার বিমার
শুধু এইটুক মতের মিলনে
প্রাণ রাখা দায়
এই নিয়ে বড় জোর মরা ভালো যায়

মোর বন্ধু নাই জড়াজড়ি ভয়ে কাঁপবার
সব খাত ছাড়িয়ে আজ শান্তি-শৃঙ্খলার বরাদ্দ
একাশি সালেই বাড়ছে বাজেট
পুলিশের তিন ভাগের আরও এক ভাগ

শুধু ভয়ে
পাশের বাড়ির রুটিয়লার বউয়ের লগে মোর
রোজ মতে মিলে
লড়ে যাওয়া দায়
এই নিয়ে যেমন চলছে চলা ভাল যায়

সবচেয়ে বড় কথা মোর বন্ধু নাই এক স্বরে চাই বলবার
কেউ কেউ স্বপ্ন দেখে পিটোচ্ছে, কেউ দেখে পিটুনি খাবার
পড়ি এই ভদ্রমহিলাদের কথা
এর ভি চাইবার যারা তারা কি গায়েব
দূরে দেখবার
মতের মহামিলনের দিন
আজও বহুদূর
তলোয়ার এখনো হলো না লাঙলের ফলা
না হয়নি ট্যাংক এখনো ট্রাক্টর
কাজ নেই নিরাপত্তা খাতের টাকায়
আন্ধাদের নিজ চোখে না দেখাই রায়

বহুদিন আগের ওয়াদা
আল্লাহর বাদশাহি, মতের মহামিল
এদেশে আমাদের দিলে

নতুন শহরে এসে
মোর বন্ধু নাই ভরসা পাই ঈমান রাখার

[সলিমুল্লাহ খানের সৌজন্যে পুনর্মুদ্রিত। বি. স.]


সলিমুল্লাহ খান: আমি জুল্লে’র কবিতার অনুবাদ করি জার্মান ভাষার সাহিত্যের ছাত্র কিংবা জার্মান ভাষার মাস্টার হবো এই আশা করে নয়। জার্মান কবিদের নিয়ে কি কাজ করবো জানি না। আমি জার্মান ভাষা ভাল জানিও না যা এ কাজ করার জন্য পূর্বশর্ত। যদি ভাষাটা রপ্ত করতে পারি তাহলে ভবিষ্যতে করতেও পারি। জুল্লে’র কবিতা অনুবাদ করেছি এই জন্য যে তাঁর বিষয়বস্তু আমার ভাল লেগেছে। তাঁর সাথে (নিউইয়র্কে) আলাপ করে বুঝলাম আমার সাথে তার একটা আত্মীয়তা আছে। আমি ছোটবেলা থেকে ব্রেখটের ভক্ত। জুল্লেও ব্রেখটের কবিতা পড়ে কবিতা লিখতে অনুপ্রেরণা পান। এটা পড়ে মনে হলো, এই কবিকে আমার খালাতো বোন বলা যায়।

শামস আল মমীন: জুল্লেকে বেছে নেওয়ার আগে আপনার রাজনৈতিক বিশ্বাসের সহযাত্রী কবি হিসাবে তাঁকে বাংলাদেশে প্রমোট করার কথা কখনো মনে হয়েছে?

সলিমুল্লাহ খান: না। তাঁর শ’খানেক কবিতা থেকে আমি ৬০টি অনুবাদ করেছি। তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ যদি আমি তুলে ধরতে চাইতাম তাহলে তাঁর প্রবন্ধই অনুবাদ করতাম। যেমন নিকারাগুয়ায় মার্কিন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে, এলসালভাদরে নির্যাতনের বিরুদ্ধে তিনি বক্তৃতা দিয়েছেন। এবং বক্তৃতাগুলো তিনি চার্চে দিয়েছেন। এগুলোতে ধর্মের প্রভার থাকলেও আমার রাজনৈতিক বিশ্বাসের কাছাকাছি কথা আছে। কিন্তু আমি সেগুলো অনুবাদ করিনি। তাঁর কবিতার কাব্যমূল্য দেখেই আমি অনুবাদ করেছি। আমার মতে কবিতায় যদি মানুষের দরকারি কথাগুলো না বলা যায় তাহলে কবিতা লেখার দরকার কি? জুল্লে’র কবিতায় আমার প্রাণের কথাগুলি আছে। আমি যদি কবি হতে চাই, তাহলে কোন ধরনের কবি হতে চাই আমি তার নমুনা হিসাবে এটা পেশ করেছি। আপনি প্রথম প্রশ্নই করেছেন, আমি অনুবাদ বেছে নিলাম কেন। প্রত্যেক মানুষই দর্পনে নিজের মুখ দেখে। আমি জুল্লে’র ভেতরে হয়তো নিজের মুখই দেখেছি। কিন্তু সজ্ঞানে আমার কথা ডরোথির নামে চালিয়ে দেইনি। অজ্ঞানে হয়তো চলে গেছে। নাজিম হিকমতের কবিতা আমরা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের অনুবাদে পড়েছি। এঁরা দু’জনই কমুনিস্ট পার্টি করতেন। এক ধরনের সহমর্মিতা নিভৃতে কাজ করে বলতে পারেন।

শামস আল মমীন: ডরোথি জুল্লেকে অন্যান্য ইউরোপীয় কবিদের তুলনায় কোন দিক থেকে আপনার চোখে আলাদা মনে হয়েছে?

সলিমুল্লাহ খান: এটা একটা ভাল প্রশ্ন করেছেন। এলিয়ট, অডেন, ইয়েটস এঁদেরকে আমরা আধুনিক কবি বলি। ফরাসি ভাষায় বোদলেয়ার, মালার্ম, আরাগঁ। জার্মান ভাষায় রিলকে, স্টেফান। এঁদের সবার চেয়ে ভিন্ন কবি ব্রেখট। তাঁকেও আধুনিক কবি বলতে হবে। কিন্তু তিনি সব সময় কমুনিস্ট মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। পাবলো নেরুদাও কমুনিস্ট ছিলেন। কিন্তু প্রথম যৌবনে তিনি ছিলেন সুররিয়ালিস্ট। আরাগঁ এবং পল এলুয়ার প্রথম জীবনে সুররিয়ালিস্ট হলেও পরে কমুনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। কিন্তু ব্রেখট শুরু থেকেই আধুনিক এবং কমুনিস্ট। বই পড়ে যতটুকু জানি, ইউরোপের আধুনিক কবিদের মধ্যে দুটো প্রবণতা কাজ করে। যাঁরা সুররিয়ালিস্ট হিসেবে লেখা শুরু করেন তাঁদের কেউ কেউ কমুনিস্টদের প্রতি সমবেদনা সম্পন্ন আবার কেউ কেউ কমুনিস্টবিরোধী হয়ে ওঠেন।

আমি শুরু থেকেই কমুনিস্টদের প্রতি সমবেদনাসম্পন্ন। তবে আমি অ-কমুনিস্টদের কবিতা পড়েও আনন্দ পাই। যেমন রিলকে কমুনিস্ট ছিলেন না কিন্তু তাঁর কবিতা পড়ে মজা পাই। আবার নাজিম হিকমতের কবিতা পড়েও মজা পাই। কিন্তু মতাদর্শের দিক থেকে আমি নাজিম হিকমতের মতো কবিতা লিখতে পারি না। আমার কবিতা ব্রেখটের মতো। ব্রেখটের মতোই তাঁর ধারার পরবর্তী কবি ডরোথি জুল্লে। জুল্লে’র যে রাজনৈতিক বিশ্বাস সেটা আমার শ্রদ্ধেয় কিন্তু সে জন্য আমি তাঁর কবিতা অনুবাদ করি নাই। আধুনিক কবিতার দুর্বলতা, আধুনিক কবিতা জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ায় এবং যে কারণে, আমার মতে, আধুনিক কবিতা নিজেই আত্মহত্যা করেছে। এ থেকে রক্ষা পাওয়ার একটাই পথ আবার ন্যাশনাল-পপুলার ট্র্যাডিশানে ফিরে যাওয়া এবং সেভাবে কবিতা নিজেকে রিনিউ করবে। জুল্লে’র কবিতায় এই ন্যাশনাল-পপুলার ট্র্যাডিশানের ভঙ্গিটা আছে, সেটা আমি ব্রেখটের মধ্যেও দেখি। কবিতা শুধু রোমান্টিকতা নয়। কবিতা প্রশ্ন করে, জিজ্ঞাসা করে। ফরহাদ মজহারের একটা গানের উদ্ধৃতি দিয়ে বলি:

যে জীবন স্বপ্নের সে জীবন নয়
যে জীবন প্রশ্নের
অন্বেষণের
সে জীবন আজ আমি চাই।

জুল্লে’র কবিতায় আমি স্বপ্ন এবং অন্বেষণের একটা মিল পাই। জুল্লে এখানেই অন্যদের থেকে ভিন্ন।

শামস আল মমীন: আপনার কথায়, এই কিতাবে আপনি চাণ্ডালি ভাষা ব্যবহার করেছেন। এটা কি কবিতার মেজাজকে ধরে রাখার জন্য? নাকি আগে কেউ এই ভাষা ব্যবহার করে নাই বলেই চমক সৃষ্টির জন্য নতুন মাল বাজারে দিলেন?

সলিমুল্লাহ খান: সোজা কথা, ব্রাত্য রাইসুকে অনুসরণ অর্থাৎ স্টান্ট দিলাম কি না এই তো। শামসুর রাহমানের মতো—আপনি ভদ্রলোক—ওইটুকু বলছেন না। কবিতা ভাব দিয়ে লেখা হয় না, কবিতা লেখা হয় শব্দ দিয়ে। কবির মনের ভাবনাটা কি আমরা কোনদিন জানবো না কিন্তু ভাবটা ধরা পড়ে ভাষার মধ্য দিয়ে। এটাকে আমি বলি সিগনিফায়ার। ভাষার উপর যদি নিয়ন্ত্রণ না থাকে তাহলে কবি যতো কথাই বলুক না কেন তার শেকড় গজাবে না। এবং সচেতনভাবে আমি এই ভাষা যদি ব্যবহার করি তাতে দোষের কিছু দেখি না। আমি নিজস্ব একটা ভাষারীতি তৈরি করতে চাই। কিন্তু শুধু ভাষার জন্য ভাষা তৈরি করা যায় না। দেখতে হবে, কবিতার মেজাজকে ধরে রাখার জন্য এটার প্রয়োজন আছে কি না। আমি যেটাকে চাণ্ডালি ভাষা বলছি, আমি মনে করি, সেটা খাঁটি বাংলা ভাষা। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই চাণ্ডাল বংশের এবং বাংলা ভাষাটাই একটা চাণ্ডাল ভাষা। বাংলা ভাষার প্রকৃতি বলতে কিছু নেই। আসলে বাংলা হচ্ছে বিভিন্ন ভাষার মিশ্রণ এবং বাংলা ভাষার প্রকৃতি বলতে যদি কিছু থাকে সেটাই হচ্ছে চাণ্ডালি ভাষা। আমি কবিতা বাংলা ভাষায় লিখতে চাই।

s-khan-2.jpg…….
সলিমুল্লাহ খান, ছবি. খন্দকার তারেক, ওয়েস্ট চেস্টার, নিউইয়র্ক, ১৯৯৭
………
কলকাতার মধ্যবিত্ত কবিরা যে বাংলা ভাষার চালু করেছেন, বুদ্ধদেব শুরু থেকেই বলছি। এটাও একটা আঞ্চলিক ভাষা। কিন্তু রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক কারণে এটা তথাকথিত মান ভাষার মর্যাদা পেয়েছে। এটাও একটা সুন্দর ভাষা। এখান থেকে শেখার অনেক কিছু আছে। কিন্তু এই কারণে অন্যান্য অঞ্চলের ভাষার মধ্যে যে সাহিত্যগুণ আছে সেটাকে বাদ দিতে পারি না। এবং বাদ দেওয়ার প্রবণতা হবে আত্মহত্যামূলক। আমি যদি গ্রিক ভাষা কিম্বা ইটালিয়ান ভাষা শিখতে পারি যেমন মধুসূদন শিখেছিলেন, তাহলে আমার উচিত ময়মনসিংহের ভাষা, বরিশালের ভাষা শেখা। কলকাতার ভাষা প্রতিষ্ঠিত ভাষা হয়ে গেছে বলে আর ময়মনসিংহের ভাষায় কোন মনযোগ দেওয়া যাবে না, প্রবণতা হিসাবে এটা হবে কবিদের জন্য ক্ষতিকর। কিছু কিছু আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে এমন প্রকাশভঙ্গি আছে যা তথাকথিত শুদ্ধ ভাষায় নেই। কাজেই, এগুলো আনা উচিৎ।
—————————————————————-
আমি যেটাকে চাণ্ডালি ভাষা বলছি, আমি মনে করি, সেটা খাঁটি বাংলা ভাষা। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই চাণ্ডাল বংশের এবং বাংলা ভাষাটাই একটা চাণ্ডাল ভাষা। বাংলা ভাষার প্রকৃতি বলতে কিছু নেই। আসলে বাংলা হচ্ছে বিভিন্ন ভাষার মিশ্রণ এবং বাংলা ভাষার প্রকৃতি বলতে যদি কিছু থাকে সেটাই হচ্ছে চাণ্ডালি ভাষা। আমি কবিতা বাংলা ভাষায় লিখতে চাই।
—————————————————————-
শামস আল মমীন: আমেরিকায় সাদা কালো সবাই ইংরেজি বলে; এর মধ্যেও কালোদের কথায় এবং লেখায় কিন্তু ওদের নিজস্ব ভাষাভঙ্গি আছে যা স্ট্যান্ডার্ড ইংরেজি থেকে একেবারে ভিন্ন।

সলিমুল্লাহ খান: ওটা করলে ওরা মারা যেতো। যেমন ওরা যখন লেখে ‘Lowd’ (Lord), হয়তো এটা হুবহু মুখের কথা নয়। কিন্তু কালোদের যে সমস্যা, তাদের যে ঐতিহাসিক সংকট এটা উচ্চারণের মধ্য দিয়ে ধরা পড়ে। আপনি ঠিকই বলেছেন ইংরেজি তো একটা ভাষা নয়, বহু ভাষা। আমি শুধু মেসেজটাই দিতে চেয়েছিলাম, বাংলা ভাষা বলে একটি বিশেষ ভাষা নেই, বাংলা বহু ভাষা।

শামস আল মমীন: আপনার এই চাণ্ডালি ভাষার বদনাম করেছে অনেকেই। তারা ঠিক এটাকে গ্রহণ করতে পারছে না। তাদেরকে আপনি কি বলবেন?

সলিমুল্লাহ খান: বদনাম যারা করে তাদের নাম বলাই ভালো। আপনি ভদ্রলোক তাই নাম বলতে চান না। আমার নাম বলতে আপত্তি নাই। যেমন হুমায়ুন আজাদ। বাংলা ভাষার একজন কবি এবং পণ্ডিত। উনি ঢাকার আঞ্চলিক ভাষা ভালই জানেন কিন্তু সাহিত্যের মূল ন্যারেটিভে তিনি এই ভাষা ব্যবহার করবেন না। কিম্বা সাহিত্য সমালোচনা এই ভাষায় করবেন না। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সাথে আমার পরিচয় ছিল। তাঁকে বলতে শুনেছি, বাংলা ভাষার একটা স্ট্যান্ডার্ড থাকা উচিৎ। আমি মনে করি তাই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ভাষার চিরকালীন কোন স্ট্যান্ডার্ড নেই। যেমন ষোড়শ শতাব্দীতে যা স্ট্যান্ডার্ড ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীতে তা আর স্ট্যান্ডার্ড থাকে না। এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর স্ট্যান্ডার্ড কিন্তু আজ আর স্ট্যান্ডার্ড নেই। এবং এই প্রক্রিয়াতে থেমে থাকা বলে কোন ব্যাপার নেই। এটা নিরন্তর চলছে। সৃষ্টিশীল লেখকরা কিন্তু ভাষা পরিবর্তনের উপর প্রভাব ফেলতে পারে, এবং আমি সেই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছি মাত্র। আমি চাণ্ডালি ভাষা লিখে যদি ব্যর্থ হই আমি একজন নগণ্য কবি ব্যর্থ হলাম। কিন্তু যদি সফল হই কিম্বা অন্য কেউ এই পথ অনুসরন করে তাহলে বাংলা ভাষার গতি পরিবর্তনের একটা সম্ভাবনা আছে।

শামস আল মমীন: আধুনিক কবিতায় ‘মুই’, ‘মোর’, ‘অরা’ এসব শব্দের ব্যবহার ঘটা করে নিষিদ্ধ ঘোষণা দেওয়ার পরেও আপনি এসবের পুনর্ব্যবহার করলেন কেন?

সলিমুল্লাহ খান: সমস্যা না থাকলে কোন সমাধান আসে না। বাংলা কবিতায় আমি একটা সমস্যা অনুভব করেছি। কবিতায় ‘মুই’, ‘মোর’ লেখা যাবে না, অর্থাৎ যারা এই নিয়ম বেঁধে দিয়েছিলেন, আমি মনে করি তারা কাজটা খুব তড়িঘড়ি করে করেছিলেন। তারা মনে করেছিলেন ‘মুই’ ব্যবহার করা অনাধুনিক আর ‘আমি’ ব্যবহার করাটা আধুনিক। আমি এটা অস্বীকার করি না। কিন্তু দেখা যায়, কোন কোন ক্ষেত্রে ‘মুই’ ব্যবহার না করলে ভাষা তার ব্যঞ্জনা হারিয়ে ফেলে। বাংলা ভাষার প্রকাশ ক্ষমতাকে যদি আমরা বাড়াতে চাই তাহলে তার সমস্ত সম্ভাবনাকে তলিয়ে দেখতে হবে। আমার ধারণা ‘মুই’ বা ‘মোর’ ব্যবহারের সমস্ত সম্ভাবনা নিঃশেষিত হয়ে যায় নি। যেমন এক কবিতায় আমি লিখেছি:
নতুন শহরে এসে টের পাই
বন্ধু নাই মোর বন্ধু নাই ।

এখানে “বন্ধু নাই আমার বন্ধু নাই” বললে ঐ বোধ আসে না যা ‘মোর’ বললে আসে। গদ্যে কিন্তু আমি নিজেই ‘আমি’ লিখছি, পদ্যে আবার ‘মুই’ লিখছি। যারা বলে দিয়েছেন ‘মুই’ ‘মোর’ শব্দ ব্যবহার করা যাবে না। আমি মনে করি, তারা প্রিম্যাচিউর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

শামস আল মমীন: The artist should not fear being considered absurd as long as the artistic efforts are sincere. ই. ই. কামিংসের এই উক্তি আপনার মনে আছে কি?

সলিমুল্লাহ খান: না । এই উক্তি আমার জানা ছিলো না। তবে কামিংসের সাথে আমি একমত হতে পারি। যদিও লোলে ‘সিনসিয়ার’ এবং ‘অ্যাবসার্ড’-এর অর্থ নিয়ে দ্বিমত হবেন, তর্ক করবেন।

শামস আল মমীন: সমালোচক মুসতাফা সাঈদ আপনার অনুবাদে অশ্লীলতার অভিযোগ এনেছেন (যথা: ‘তোর গল্প করতে পারি না ঈসা… হেন বিশপ নেই তোর পাছা মারে না।’ পৃ. ১৫) তাঁর মতে এটা ঠিক কবির উক্তি নয়, এখানে আপনার অতিরঞ্জন আছে।

সলিমুল্লাহ খান: পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলা দরকার, বইয়ের ৬০টা কবিতার মধ্যে ৪০টা আমি ইংরেজি থেকে করেছি, বাকিগুলার মূল জার্মান আমি পড়েছি। তবে এই কবিতাটা আমি অনুবাদ করেছি ইংরেজি থেকে। লাইনগুলো এরকম, Every Bishop sleeps with you. আমি আঞ্চলিক শব্দে এর অনুবাদ করেছি। এর চেয়ে বেটার এক্সপ্রেশন থাকতেও পারে। কিন্তু আমি যা করেছি সেটাকে আমি অশ্লীল বলব না।

শামস আল মমীন: আমার ধারণা, কবিতায় অশ্লীল বলে কিছু নেই। শিল্পসম্মত প্রয়োগই হচ্ছে মূল কথা। মুসতাফা সাঈদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, তিনি বর্তমান বিশ্বের আধুনিক কবিতা যদি নিয়মিত পড়ার সুযোগ পেতেন তাহলে হয়তো এই অভিযোগ করতেন না। মার্কিন এক বিখ্যাত কবি Etheridge Knight-এর একটি বিখ্যাত কবিতার কিছু অংশ মুসতাফা সাঈদ ও পাঠকদের জন্য তুলে দিলাম।

fuck marx and mao fuck fidel……
fuck joseph fuck mary fuck god jesus …
fuck the whole muthafucking thing
all i want now is my woman back
so my soul can sing.

সলিমুল্লাহ খান: মুসতাফা সাহেব এখানে রক্ষণশীল একটা অবস্থান নিয়েছেন। আমাকে অবলম্বন করে উনি সমাজে তাঁর নিজস্ব মত প্রকাশের চেষ্টা করেছেন। প্রতিদিন আমরা মুড়ি-মুড়কির মতো অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করি, কিন্তু লেখার সময় আমাদের হাত সংকুচিত হয়ে আসে। আমি মনে করি না এই কবিতায় কোন অশ্লীলতা প্রকাশ পেয়েছে। এখানে প্রকাশ পেয়েছে এক ধরনের সামাজিক নিন্দা ও ধিক্কার।

শামস আল মমীন: ভূমিকায় আপনি বলছেন, আপনার ভাবনার উপর ওলন্দাজ স্পিনোজার মতো একরোখা দার্শনিক ফরহাদ মজহারের প্রভাব আছে। ফরহাদ মজহারকে মুসতাফা সায়ীদ বলেছেন “একজন উদ্বাস্তুচিত্ত মানুষ আর তার এবাদতনামা বাংলা কাব্যের ইতিহাসে এক অট্টহাসি।” আপনার গুরুনিন্দাকে আপনি কিভাবে গ্রহণ করেন।

সলিমুল্লাহ খান: ফরহাদ মজহারের সাথে আমি ১০১টা বিষয়ে একমত নই। কিন্তু গুরু বলে কাকে?—যে আলো দেয়। ফরহাদ যখন আমেরিকা থেকে ফেরত গেলেন তখন আপনার মতো (আমার বুকসেলফ দেখিয়ে) এরকম দুই সেলফ নতুন বই নিয়ে যান। ফরহাদের যে বিশাল পড়াশোনা সেদিন পর্যন্ত সেরকম পড়াশুনা করা আর কোন লোকের সাথে আমার দেখা হয় নাই। ফরহাদের কবিতা যখন পড়লাম, গান যখন শুনলাম তখন আমার মনে হলো, ঢাকায় আমার পরিচিত কবি-সাহিত্যিক সবার চেয়ে এই উদ্বাস্তুচিত্ত লোকটিই উজ্জ্বল। তাঁর এবাদতনামা যদি অট্টহাসি হয় তাহলে আমাদের সাহিত্যে এখন অট্টহাসিরই দরকার। ফরহাদের কবিতা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং এই মতে আমি পৌঁছেছি আজ থেকে ২৩ বছর আগে এবং ফরহাদ আমাকে হতাশ করেন নি।

আমি আগেই বলেছি বের্টল্ট ব্রেখট আমার প্রিয় কবি। বাংলা ভাষা যদি জার্মান ভাষার মতো হতো তাহলে ফরহাদ আজকে পৃথিবীতে বিখ্যাত হতো। ফরহাদ বাংলা ভাষার একজন শ্রেষ্ঠ কবি এতে কোন সন্দেহ নাই। বর্তমান ৫ জন সেরা কবির মধ্যে ফরহাদ একজন এবং ফরহাদ আমার শক্র হলেও এটা বলতে হবে। অথবা আমি কবিতা বুঝি না এটাও হতে পারে।

শামস আল মমীন: কেউ কেউ আপনার এই চাণ্ডালি ভাষা ব্যবহারের সুনাম করেছে প্রচুর। এদের বেশির ভাগই তরুণ কবি, সমালোচক। অথচ বয়স্ক লেখকরাই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার বেশি—কারণটা কি?

সলিমুল্লাহ খান: সেটা সঠিক করে বলা মুশকিল। যেসব তরুণদের পছন্দ হয়েছে তাদের অনেকের সাথে আমার পরিচয় চিঠিপত্রে। যেমন ব্রাত্য রাইসু। তাঁর কবিতার মধ্যেও এই প্রয়াসটা আছে। আমাদের মধ্যে আলাপ করে কিন্তু এটা হয়নি। তাতে বুঝতে পারছি সময়ের যখন একটা চাহিদা দেখা দেয় তখন বিভিন্ন দিক থেকে তার প্রতিধ্বনি হতে থাকে। এবং দেখলাম আমার মত করে অনেকেই চিন্তা করছে। আমি বলব না তারা আমার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। অথবা আমিও তাদের দ্বারা প্রভাবিত হইনি। একটা কমন তৃতীয় ঘটনা দ্বারা আমরা প্রভাবিত হয়েছি।

এটাকেই আমি বলি সমকালীন বাংলা কবিতা বা ভাষার সংকট। আধুনিক বাংলা বলে যে ভাষাটা চালু রয়েছে, হুমায়ুন আজাদ যে ভাষায় লেখেন আর কি। তিনি বুদ্ধদের বসুর শিষ্য। হুমায়ুন আজাদ প্রতিভাবান মানুষ। কিন্তু প্রতিভাবান মানুষের হাতে ভাষাটা যখন দুর্বল থাকে তখন আমি বুঝতে পারি এ ভাষার সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে। অর্থাৎ এটাই বাংলা ভাষার লিমিট। যেমন আবদুল মান্নান সৈয়দ নিঃশেষিত হয়ে গেলেন। শুদ্ধতম কবি যখন তিনি লিখেছিলেন তখন সুধীন দত্তকে অনুসরণ করার চেষ্টা করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত সুধীন দত্তের যে মেধা সেটা মান্নানের নেই। সুধীন দত্তীয় বাংলা গদ্য আবদুল মান্নানের হাতে প্রাণহীন হয়ে গেছে। যেমন আকাশে ওড়ার সময় পাখিকে সুন্দর লাগে। সেই পাখি মাটিতে পড়ে যখন ধড়ফড় করে তখন প্রাণের মধ্যে শুধু বেদনাই জাগে। আমি যদি সুধীন দত্তকে আকাশে ওড়া কবুতর মনে করি তাহলে মান্নান সেই মাটিতে পড়া ধড়ফড় করা কবুতর।

বাংলা ভাষার সংকট থেকেই আমি এই চাণ্ডালি ভাষার দিকে গিয়েছি এবং দেখি আমি একা নই। ব্রাত্য রাইসু এবং আরো অনেক তরুণ এটাকে পছন্দ করছে। এতে প্রাণে এই আশা জাগে যে আমি ভুল পথে নেই। আর বুড়ারা বুঝতে পারছেন না কারণ তাদের সত্য বোঝার অক্ষমতা এবং স্বার্থপরতা। যেমন ধরুন, শামসুর রাহমান ৬০/৭০ টা বই লিখেছেন। তাঁর পক্ষে নতুনদের অভিনন্দন জানানো সম্ভব শুধু মুখে, কাজে নয়।

শামস আল মমীন: আল্লাহর বাদশাহি প্রকাশের আগেই ঢাকায় লেখকদের মধ্যে আপনার চাণ্ডালি ভাষার কথা নিয়ে চাপা গুঞ্জন চলছিল। সলিমুল্লাহ খান নিউইয়ার্কে গিয়ে বাংলা ভুলে গেছেন। বাংলা ভাষায় যে পরিবর্তন এসেছে উনি তার খোঁজ-খবর রাখেন না। তাঁদেরকে কি কিছু বলার আছে আপনার?

সলিমুল্লাহ খান: তাঁদেরকে কিছু বলার নেই, তবে তাদের জন্য একটা গল্প আছে। মধুসূদন দত্ত নামে বাংলা ভাষার একজন কবি ছিলেন, কেউ কেউ বলেন। আমি তাঁকে দেখিনি, কিন্তু বিশ্বাস করি তিনি ছিলেন। মেঘনাদ বধ কাব্য লেখার আগে তিনি কিছু নাটক-কবিতা লিখেছেন। তখন যদি কেউ বলতেন পয়ার কি মধুসূদন ভুলে গেছেন কিম্বা অমিত্রাক্ষর লেখার আগে বাংলা ভাষায় যে পুঁথি লেখা হতো সেটা তিনি জানেন না কিম্বা ভুলে গেছেন—মধুসূদন যে জবাব দিতেন আমি সেই জবাবই দিবো। আমি নিজেকে মধুসূদনের সাথে আপাতত তুলনা করছি না। মধুসূদন বাংলা ভাষায় অমিত্রাক্ষর চালু করেছেন এবং আমরা তা গ্রহণও করেছি। আমি যে কাজটা করেছি তা না জানার জন্য যতটা নয় তার চেয়ে বেশি অসন্তুষ্টির জন্য। স্বীকার করি, গত ১৫ বছরে সবার লেখা আমার পড়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু এর আগে তো বাংলা ভাষায় কিছু লেখা হয়েছে। এবং সেগুলো কিছু আমি পড়েছি।

শামস আল মমীন: আপনার ভূমিকায় লিখেছেন “পশ্চিম থাইক্যা আসা পচা মালের ভিড়ে আমরা বিস্তর তাজা প্রাণ হারাইয়া ফালাইছি। অহন ফ্রয়েড-লাকাঁ পড়ে দেখি সব শেষ হয় নাই। লেজে প্রাণ আছে।” প্রাণটা কার লেজে দেখলেন একটু খোলোসা কইরা কন দেখি।

সলিমুল্লাহ খান: লালন ফকির আমাদের দেশে এখন খুব আলোচিত। দুই বাংলার যতগুলো কবিতার এন্থোলজি আছে এগুলোতে অনেকের কবিতা থাকলেও লালনের কবিতা কোথাও স্থান পায়নি। লালনকে কোথাও কবি বলে স্বীকার করা হয় না, কিন্তু তাঁর গানকে স্বীকার করছে। তাঁর গান তো কবিতাও বটে, কিন্তু আমরা তা স্বীকার করতে পারছি না, তার মানে লেজের প্রাণটা স্বীকার করছি না। লেজে প্রাণ বলতে আমি বোঝাচ্ছি—লালনের কবিতা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কিম্বা ইংরেজ শাসনের উপর নির্ভর করেনি, কিন্তু সেগুলো টিকে আছে। কি করে তিনি টিকে থাকলেন? প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ লোক তাঁর আখড়ায় আসে। এই মানুষগুলো যার টানে আসে এটাকেই আমি বলছি লেজে প্রাণ। কারণ ঐ লোকগুলো খেতে আসে না, ওর মধ্যে একটা এসথেটিক আছে। এবং ওটাকেই আমি বলব আসল সাহিত্য। আমাদের সমাজে আমরা যারা কবিতা লিখছি তারা কৃত্রিম একটা জগতে বাস করি। এটাকে আমি বলছি পশ্চিম থেকে আসা পচা মাল।

শামস আল মমীন: মুসতাফা সাহেব আরো বলছেন, আপনি টের পাইলেন কিন্তু লাকাঁ পড়ার আগে টের পাইলেন না কেন?

সলিমুল্লাহ খান: লাকাঁ একজন ফরাসি লেখকের নাম। লাকাঁর জায়গায় যদি লিখতাম শেক্সপিয়র তাহলে মোস্তফা সাব কি এই প্রশ্ন করতেন? ঘটনাটা হচ্ছে গত দু’শ বছর আমরা শুধু ইংরেজের গোলাম ছিলাম না। পুরা ইউরোপের গোলাম ছিলাম। জ্ঞানের ক্ষেত্রে ইউরোপ যা অবদান রেখেছে এগুলো বাদ দিয়ে আমরা ইউরোপের বিরুদ্ধে এমনকি নিজেদের মধ্যেও টিকতে পারব না। লাকাঁ একটা নাম মাত্র। আমি এখানে দুটো কাজ করেছি। প্রথমটা, লাকাঁর প্রতি আমার ভক্তি প্রকাশ। দুই, শুধু পশ্চিমের দর্পনেই আমি টের পেলাম নিজেকে।

শামস আল মমীন: মুসতাফা সাহেবের শেষ কথা, আপনার লেখার উদ্দেশ্যই যেন প্রতিপক্ষের ভ্রান্ত প্রয়াসকে আঘাত করা। চোখে আঙুল দিয়ে নয়, শুধু যেন কান ধরে ভুলটি দেখিয়ে দেওয়া এরকম একটা কিছু। আপনি যা লিখছেন সেগুলো কি প্রাণের তাগিদেই লিখছেন, নাকি সাঈদের কথাই সত্য।

সলিমুল্লাহ খান: আমার মনে হয় দু’টাই সত্য। এখানে প্রতিপক্ষটা কে? প্রতিপক্ষ হচ্ছে যে ধারণাকে আমি ভুল মনে করি। কোন ব্যক্তিকে আমি প্রতিপক্ষ মনে করি না। যদি ঘটনাচক্রে কোন ব্যক্তি ঐ ভুল মতকে ধারণ করে আমি তাকেও আক্রমণ করতে পিছপা হই না। উদাহরণ দেই, প্রফেসর রাজ্জাক আমার খুব প্রিয় মানুষ, কিন্তু তাঁর মতের একটা ভুল যখন আমি পেলাম আমি তাঁর সমালোচনা করতে পিছপা হইনি। কিন্তু আমি রাজ্জাকবিরোধী নই।

শামস আল মমীন: আপনি তো অনেকদিন থেকেই কবিতা লিখছেন। আপনার প্রথম বই এক আকাশের স্বপ্ন-র ভাষা এবং দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আজকের ভাষা এবং দৃষ্টিভঙ্গি আপনার কাছে কতটা ভিন্ন মনে হয়?

সলিমুল্লাহ খান: বেশ ভিন্ন মনে হয়। কখনো কখনো অনুতাপ করি কিছু কবিতার দুর্বল এক্সপ্রেশনের জন্য। ঐ বই সম্পর্কে আমার বিশেষ কোন দাবি নাই। তবে ৩/৪ টা ভালো কবিতা আছে বলে আমি মনে করি। আমার মৌলিক কাব্যবিশ্বাস বদলায় নি। তবে ভাষা বলদেছে। এটাকে আমি উন্নতির লক্ষণ বলেই মনে করি।

শামস আল মমীন: অক্টোবর ’৯৯-এ ভোরের কাগজে কবি নুরুল হুদা সত্তরের কবিতাকে রাজনীতির কবিতা উচ্চকণ্ঠের কবিতা বলে মত প্রকাশ করেন এবং ২৯ অক্টোবর সংখ্যায় সত্তরের ১২ জন কবি এর প্রতিবাদ জানান। আপনি ঐ সময়ের কবি হিসাবে কিভাবে এর মূল্যায়ন করেন?

সলিমুল্লাহ খান: আমি মনে করি নুরুল হুদার বক্তব্য সত্য। সত্তর দশকে যাঁরা কবি হিসাবে পরিচিত যেমন মোহন রায়হান, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ—এঁরা উচ্চকণ্ঠের কবি। আমি নিজেও কিছু উচ্চকণ্ঠের কবিতা লিখেছি, কিন্তু আমি উচ্চকণ্ঠের কবি নই। আমি ওঁদের চেয়ে ছোট, কিন্তু ভিন্ন ধরনের কবি। যদি মোহন-রুদ্রকে আমরা কবি হিসাবে স্বীকার করি তবে স্বীকার করতেই হয় ওরা উচ্চকণ্ঠের কবি। কিন্তু শিহাব সরকার, আবিদ আজাদ কিম্বা আবু করিম উচ্চকণ্ঠের কবি ছিলেন না। এ ক্ষেত্রে নুরুল হুদার বক্তব্য যেমন সত্য আবার সেই ১২ জন কবির প্রতিবাদও সত্য। তবে আমার ধারণা সত্তরের কবিতা দুর্বল। রুদ্র একজন ভালো কবি (ও আমার বন্ধু ছিল), ওর কিছু ভালো কবিতা আছে। সব বাদ দিয়েও আমি মোহন ও রুদ্রকে ভালো কবি বলে মনে করি। যদিও মোহন এখন ভালো কবিতা লিখতে পারছে না।

শামস আল মমীন: প্রথম আলো’র এক টেবিল বৈঠকে কবি সরকার আমিন তরুণ কবিদের কৃতিত্বকে এ ভাবে ব্যাখ্যা করছেন, প্রবীণ কবিদের নাকচ করার স্পর্ধা, তরুণদের হাতে কবিতা ছন্দের দাসত্ব থেকে মুক্তি পাচ্ছে, সম্পাদকীয় ভাষা থেকে কবিতা সরে এসেছে। তাঁর এই ব্যাখ্যা কবিতার জন্য কতটা সঠিক?

সলিমুল্লাহ খান: তরুণ কবিরা প্রবীণ কবিদের চিরকালই নাকচ করে। আমিন ভাবছন্দ বলতে কি বোঝাচ্ছেন ব্যাখ্যা না করলে তা আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। প্রচলিত ছন্দকে নাকচ করা যায় না, এগুলো এবজর্ভ করতে হয়। কোন প্রতিভাবান কবি যদি নতুন কিছু করে আমি তাকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত আছি।

শামস আল মমীন: একই বৈঠকে টোকন ঠাকুর বলছেন, কবিদের মধ্যে পার্থক্য এতই বেশি যে, কবিতা কোন পথে যাচ্ছে বুঝে উঠতে পারছি না। চঞ্চল আশরাফ বলছেন, কবিতা নিয়ে গত এক দশকে কথা যতো হয়েছে সে তুলনায় ফসল কম। উত্তরাধুনিকতার নামে কোন বিনির্মাণ হচ্ছে না বরং পুনর্নির্মাণ হচ্ছে। নতুনদের এই ভাবনাকে আপনি কি ভাবে দেখেন?

সলিমুল্লাহ খান: কবিতার গতি পরিবর্তন হচ্ছে এটা সঠিক। কিন্তু কোন দিকে হচ্ছে? এখনো আমার চোখে কোন কবি পড়েনি যিনি তিরিশের কবিতা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন। যাঁরা নিজেদের উত্তরাধুনিক বলে দাবি করছেন এদের মধ্যে একজন কবিকেও দেখি না যিনি জীবনানন্দের চেয়ে ভিন্ন ধরনের কবিতা লিখছেন। বিষ্ণু, সুধীন, অমিয় বুদ্ধদের কবিতায় একটু একটু রাজনৈতিক কথা বললেও এরা মূলত প্রতিক্রিয়াশীল কবি। আমি আক্ষরিক অর্থেই বলছি। এরা একটা বিশেষ সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে। মজার ব্যাপার, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় এরা এক ধরনের নিরাপত্তা অবলম্বন করেছেন। কিন্তু নজরুল পুরোপুরি রাজনীতিতে জড়িয়ে ছিলেন। সত্তরের কবিরা চেষ্টা করেছেন। উত্তরাধুনিক কবিদের প্রধান সংকট হচ্ছে এরা শিক্ষিত হয়ে ওঠেনি। কিন্তু এরা টের পেয়েছেন শিক্ষিত হওয়ার দরকার আছে। এরা অনেকেই ইংরেজি বই পড়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু পড়ে বোঝেন না। ইংরেজি বুঝতে হলে বিদ্যার দরকার। অনুবাদের সময় অনুবাদক সচেষ্ট থাকেন যাতে অনুবাদ ভুল না হয়। কিন্তু ভুল অনুবাদ হলে কবিতা বেটার হয়। আমাদের কবিতা বেশির ভাগই ভুল অনুবাদ হয় এবং সে কারণেই এগুলো মৌলিক। যেমন নুরুল হুদা বলেন, বাংলা কবিতার ইতিহাস হচ্ছে অনুবাদের ইতিহাস। হুদার মুখে শুনেছি, রফিক আজাদ ব্রিটিশ কাউন্সিলে গিয়ে পোয়েট্রি পত্রিকা থেকে কবিতা পড়ে সাথে সাথে একটা বাংলা কবিতা লিখতেন। শহীদ কাদরীও এ কাজ বিস্তর করেছেন। এই দুই কবির কবিতা যদি কেউ অনুসন্ধান করেন তাহলে বুঝতে পারবেন তাঁদের অর্ধেক কবিতা ইংরেজি কবিতা থেকে নেওয়া। কিন্তু আমরা এটাকে বলি ইন্সপায়ারড অনুবাদ, আক্ষরিক অনুবাদ নয়। কিন্তু প্রকৃত উত্তরাধুনিক কবি যেমন ফরহাদ মজহার ও সুব্রত গোমেজ এরা বুঝতে পেরেছেন আমাদের আবার ময়মনসিংহ গীতিকা পড়তে হবে এবং ট্রেডিশনাল উৎসগুলোতে ফিরে যাওয়া, এগুলোকে পুনর্বিবেচনা করা এবং পুণর্নির্মাণ করা। আমি ফরহাদ এবং সুব্রতের মধ্যে এই প্রতিভা দেখি।

শামস আল মমীন: বছর দুয়েক আগে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে উত্তরাধুনিক কবিতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। তিনি বলেন, এটা থিওরিতে যেমন প্রাকটিক্যালি এর তেমন ভিন্নরূপ আমার চোখে পড়ে না। আপনার মতামত কি?

সলিমুল্লাহ খান: ফরহাদ মজহারের এবাদতনামা আমার কাছে পোস্টমডার্ন কবিতার একটা উজ্জ্বল উদাহরণ। আমি মনে করি, তিরিশের আধুনিক কবিতার ধারাটি এখন প্রাণহীন হয়ে গেছে। আমাদের সবচে ভালো আধুনিক কবি সিকদার আমিনুল হক। ছন্দে তাঁর অপূর্ব দক্ষতা কিন্তু তাঁর মধ্যে নতুন কোন চিন্তা নাই। তিনি আত্মরতিপরায়ণ হয়ে উঠেছেন। মদ্যপান করা, নারীর বক্ষ উম্মোচন এগুলো তাঁর কবিতার বিষয় হয়ে উঠেছে। সেজন্যই বলছি, কবিতার এই ধারাটি মরে গেছে। ফরহাদ সেলফ কনশাসলি পোস্টমডান কবি। তাঁর এবাদতনামায় আধুনিক কবিতাকে পুরোপুরি রপ্ত করার পর তাকে প্রত্যাখ্যান এবং ট্র্যাডিশনাল কবিতা থেকে আহরণের চেষ্টা আছে। ভোরের কাগজ এবং প্রথম আলোতে যে নতুন কবিদের কবিতা পড়েছি তার উপর ভিত্তি করেই আমার এ মন্তব্য। এর মধ্যে যারা বই প্রকাশ করেছেন কিন্তু যাদের লেখা আমি পড়িনি তারা আমার মন্তব্যের মধ্যে পড়েন না।

শামস আল মমীন: পাঠক কবিতা থেকে সরে যাচ্ছে। কারণ বর্তমান বাংলা কবিতা তারা বোঝে না। কবি ফরিদ কবিরের ধারণা ছন্দ বুঝলে তারা কবিতার ভেতরে পৌঁছাতে পারবে। এই ধারণাকে মনে রেখে তিনি ভোরের কাগজে ছন্দ এবং তার পর্ব ভেঙে পাঠককে বোঝানোর চেষ্টায় দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন। প্রশ্ন, পাঠকের ছন্দ বোঝার দরকার আছে কি?

সলিমুল্লাহ খান: ছন্দজ্ঞান থাকা ভালো, কিন্তু ছন্দে পণ্ডিত হতে হবে এমন কোন কথা নেই।

শামস আল মমীন: কবিতার ভাষা দশকে দশকে বদলায়, মানুষের মুখের ভাষা এতো তাড়াতাড়ি বদলায় না। অর্থাৎ কবিতা এগুচ্ছে পাঠককে পেছনে ফেলে। এটাকে কি ভাবে ব্যালান্স করা যায়?

সলিমুল্লাহ খান: আধুনিক কবিদের একটা সংকট আছে। ইনডিভিজুয়ালের ভাষা যতো দ্রুত বদলায় সাধারণের ভাষা ততো দ্রুত বদলায় না। দু’জন ব্যক্তি যখন তাদের নিজ ভাষা তুলে ধরেন তখন মানুষ দ্বন্দ্বে পড়ে যায়। কোনটা সঠিক। ভাষায় যে দ্বিত্ব আছে এটা প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তার বহু তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। ভাষা কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। কিন্তু প্রত্যেক কবিই চায় তার নিজস্ব ভাষা তৈরি করতে। অনেকে বলেন, রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বাংলা ভাষা কল্পনা করা যায় না। এটা ভুয়া কথা। ভাষা বদলায় কবিও বদলায়। এটা ঠিক। কিন্তু এই দুইয়ের মাত্রা একটু আলাদা। একজন রবীন্দ্রনাথ আসা যাওয়ায় বাংলা ভাষার কিছু যায় আসে না। বাংলা ভাষা তার চেয়ে বড়।

শামস আল মমীন: শামসুর রহমান, শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ ছাড়া তিনজন কবির নাম বলেন যাঁদের লেখা টিকে যাবে।

সলিমুল্লাহ খান: ফরহাদ মজহার। আবুল হাসান এবং নির্মলেন্দু গুণের কিছু কবিতা টিকে যাবে, যদিও গুণ অনেক বাজে কবিতা লিখেছেন। যদি অনুমতি দেন, সিকদার আমিনুল হকের নামও উল্লেখ করতে চাই, যদিও তাঁর কবিতার দর্শন আমার পছন্দ নয়। যাদের আমি বুর্জোয়া কবি মনে করি সিকদার হচ্ছেন তাদের রাজা। কেউ যদি আমাকে বলে, কবি হওয়া বলতে কি বোঝায়? আমি বলবো, সিকদারের জীবন ফলো করো। চেষ্টা করে তিনি ভালো কবি হয়েছেন। কেউ কেউ আমাকে বলে তুমি তো ভালো ছাত্র, তোমাকে দিয়ে কবিতা হবে না। কথাটা আমি প্রায় বিশ্বাস করতে বসেছিলাম। আমাকে উদ্ধার করেছেন সিকদার। তার কাছ থেকে দুটো জিনিস আমি শিখেছি। ১. কবিতায় কি লিখতে নেই; ২. জন্মগত প্রতিভা বলে কিছু নেই।

শামস আল মমীন: আহমদ ছফা কবি হিসাবে কেমন?

সলিমুল্লাহ খান: মানুষের নানা রকম ফ্যান্টাসি থাকে। কবিতা লেখা ছিল তাঁর এক ধরনের ফ্যান্টাসি। আমি তাঁকে বহুবার জিজ্ঞেস করেছি, আপনি পাগলামি করেন কেন? তিনি বলেন, পাগলামি না করলে টিকতে পারতাম না। যেহেতু পাগলামি করে তিনি সব জায়গায় পাত্তা পেয়েছেন তাঁর ধারণা কবিতাতেও তিনি পাত্তা পাবেন। কবিতার জগৎ খুব নিষ্ঠুর। তাঁর প্রথম বই জল্লাদ সময়-এ বেশ কয়েকটা ভালো কবিতা আছে, কিন্তু কবিতার যে ভাষা, প্রকরণ, আধুনিকতা ওটা তিনি কোনদিন ধরতে পারেন নি।

শামস আল মমীন: আপনার লেখা এবং বক্তৃতায় দেখা যায় আপনি সব সময় ইন্টেলেকচুয়ালি টারবুলেন্স সৃষ্টি করেন যেটা অনেকেই মেনে নিতে পারেন না। যেমন “অমর্ত্য সেনের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি’র ভাষা প্রসঙ্গে: কি আনন্দ সন্তান ধারণে?” বক্তৃতায় লালন ফকিরকে রবীন্দ্রনাথের সমকক্ষ কিম্বা উপরে তুলে ধরেছেন (বক্তৃতা, বস্টন, ), বা রাজ্জাক সাহেবের উপর যে প্রবন্ধ লিখেছেন… ইত্যাদি।

সলিমুল্লাহ খান: ল্যাংস্টন হিউজেস-এর কবিতা থেকে উদ্বৃতি দিয়ে বলি: A women does the best she can. এর সাথে যোগ দিয়ে আমি বলি So does a man.
—————————————————————-
রবীন্দ্রনাথে ঈশ্বরের যে ধারণা আমরা পাই তার চেয়ে লালনের ধারণাটি দার্শনিক অর্থে অনেক বেশি গভীর। আমার বক্তব্য ছিল এই, এবং এখনো আমি এই বক্তব্যে অটল। লালনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের তুলনার কোনো সুযোগই নাই। পাশ্চাত্যের পণ্ডিতেরা যেমন এডওয়ার্ড সি. ডিমোক, জুনিয়র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আধুনিক বাঙলার শ্রেষ্ঠ বাউল উপাধি দিয়েছিলেন। এই উপাধি হাস্যকর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালন ফকিরের পায়ের কাছে বসারও যুগ্যি নন।
—————————————————————-
আমার কাজ হচ্ছে কমিউনিকেট করা। শামসুর রাহমান বলতে পারেন আপনি স্টান্ট দিয়ে কথা বলেন কেন? আমার কথা হচ্ছে, আমি সত্য বলছি কি না। লালন ফকিরকে নিয়ে কেউ যদি কখনও চিন্তা না করে তার পক্ষে আমার কথা বোঝা সম্ভব নয়। বস্টনে বক্তৃতার সময় আপনিও উপস্থিত ছিলেন। ঐ সময় ফরিদা পারভিনের গাওয়া লালন ফকিরের ‘পাবে সামান্যে কি তার দেখা/বেদে নাই যা রূপরেখা’ গানটি বাজিয়ে শোনাই এবং সেই গানের ব্যাখ্যা করি। রবীন্দ্রনাথে ঈশ্বরের যে ধারণা আমরা পাই তার চেয়ে লালনের ধারণাটি দার্শনিক অর্থে অনেক বেশি গভীর। আমার বক্তব্য ছিল এই, এবং এখনো আমি এই বক্তব্যে অটল। লালনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের তুলনার কোনো সুযোগই নাই। পাশ্চাত্যের পণ্ডিতেরা যেমন এডওয়ার্ড সি. ডিমোক, জুনিয়র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আধুনিক বাঙলার শ্রেষ্ঠ বাউল উপাধি দিয়েছিলেন। এই উপাধি হাস্যকর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালন ফকিরের পায়ের কাছে বসারও যুগ্যিও নন। আমার উদ্দেশ্য ইন্টেলেকচুয়াল সৃষ্টি করা নয়, বরং মানুষকে চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করা। মানুষ যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন পাছায় লাথি মেরে জাগিয়ে তুলতে হয়। আমার লেখাগুলো পাছায় লাথি মারার মতই হয়। আমি জানি, অমর্ত্য সেন আমার লেখার জবাব দেবেন না, কেউ যদি আমাকে বলেন, অমর্ত্য সেন সম্পর্কে তোমার মন্তব্য ঠিক নয় আমি তার জবাব দিতে রাজী আছি। কিন্তু এই প্রশ্নে কখনই একমত হবো না যে তাঁর সম্পর্কে লেখা যাবে না, যেহেতু তিনি অর্থনীতিবিদ, ভাষাবিদ নন।

শামস আল মমীন: আলবেনীয় কবি ইসমাইল কাদারে বর্তমানে ফ্রান্সে ১৯৫০ সনে মস্কোর গোর্কি ইনস্টিটিউটে সাহিত্য পড়তে যান। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “মস্কোয় আমি খুব দ্রুত অনুভব করলাম সাহিত্য সম্পর্কে আমার অধ্যাপকদের চেয়ে আমি অধিক অবগত।” ছাত্রজীবনে আপনার এরকম অভিজ্ঞতা কখনো হয়েছে।

সলিমুল্লাহ খান: তা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এক ইংরেজ লেখকের বই পড়াচ্ছেন। আমি বুঝতে পারছি তিনি বইটির মর্মকথা বুঝতে পারেন নি। আরেক শিক্ষক A text book of Jurisprudence (4th edition) বইটি অনুবাদ করে “ব্যবহার শাস্ত্রের বিজ্ঞান” শিরোনামে নিজের নামে বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশ করেন। আমি তখন দ্বিতীয় বর্ষ অনার্সের ছাত্র। সভ্যতা নামে এক পত্রিকায় বইটির রিভিউ লিখলাম। অর্থাৎ জালিয়াতিটা ধরিয়ে দিলাম। পত্রিকাটি যখন মাস্টারদের হাতে আসে তাঁরা তো মহা ক্ষ্যাপা। এই কারণে আমাকে অনার্সে ফাস্ট ক্লাস দেওয়া হয় নি। আরো আপত্তিকর ঘটনা হলো, বইটির ভূমিকা তিনি এমনভাবে লিখেছেন যে পড়ে মনে হবে এটা তাঁর বহু বছরের গবেষণার ফল। তাঁর শালা দুলাভাই তাকে নানা ভাবে সাহায্য করেছেন, তিনি তাও উল্লেখ করেন।

শামস আল মমীন: সৈয়দ জামালউদ্দিন আফগানি সম্পর্কে আপনি বলেছেন, “জামাল লেখাপড়া যতটা জানতেন ততটা লিখে যাননি এটাই আমাদের পোড়া কপাল।” আপনার বেলাতেও কি আমরা একই রকম দুঃখ করবো?

সলিমুল্লাহ খান: হজরত মোহাম্মদ, গৌতম বুদ্ধ, সক্রেটিস, লালন ফকির এঁরা কেউ নিজে কিছুই লিখে যান নি। তাঁদের কথা লিখেছেন অন্যরা। আমরা লেখার যুগের মানুষ। বলার মধ্যে আমার সব ইন্দ্রিয় যেভাবে ইনবলভড হয় লেখার সময় তা হয় না। প্রথমে আমি চিন্তা করি কথার মাধ্যমে তারপর মাথায় ঘুরতে থাকে সেটা কিছুদিন এবং একদিন লিখেও ফেলি। কিন্তু কেন জানি লেখা আমার জন্য কঠিন ব্যাপার।

শামস আল মমীন: আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্বন্ধে কিছু বলবেন ?

সলিমুল্লাহ খান: আমি সার্বক্ষণিক লেখক হতে চাই। আমি বুঝতে পেরেছি লেখা ছাড়া আমার পক্ষে আর কিছু করা সম্ভব নয়। কিন্তু লেখার উপর ঈমান আনতে পারছি না। কারণ লিখে ভাত জোগাড় করা মুশকিল। নিউইয়র্কে আসার আগেও আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতাম। জীবিকার প্রয়োজনে হয়তো মাস্টারিতে আমাকে আবার ফিরে যেতে হবে। আমি না চাইলেও হয়তো কেউ আমাকে টেনে নিয়ে ছাত্রদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিবে। আর আমি অনর্গল মিথ্যা কথা বলে যাব। ঘরে ফিরে আবার অনুতাপ করবো।

শামস আল মমীন: আমাদের প্রধান কবিদের কবিতা নিয়ে কিছু লিখবেন কি?

সলিমুল্লাহ খান: আমি মনে করি, আমরা যা চিন্তা ভাবনা করি তার সর্বোচ্চ ব্যবহার হওয়া উচিৎ। দর্শন ও সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ে আমাদের মৌলিক চিন্তা ভাবনাগুলো নিয়ে কিছু লিখতে চাই এবং সাহিত্যও আমার ভাবনার একটা অংশ। The Unconsciousness from Freud to Lacan এই শিরোনামে ফ্রয়েড আনকনশাস বলতে কি বুঝতেন ফ্রয়েডের অনুসারীরা কি বুঝেছেন এবং লাকাঁ কি করে সেই ধারণার পরিবর্তন করেছেন এই নিয়ে কয়েকটা প্রবন্ধ লিখতে চাই। আমি মনে করি দর্শনে বিশ্বব্যাপী আমাদের অবদান রাখার সময় এসেছে। কবিতা নিয়ে প্রবন্ধ আমার বোধ হয় আর লেখা হবে না। কারণ আমার চিন্তার দিগন্ত সরে যাচ্ছে।

নিউইয়র্ক, এপ্রিল ২০০০

 

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: শামস আল মমীন |

 

বিডিনিউজ, আর্টস, ১৮ আগস্ট ২০১০