Author Archives: Akm Atikuzzaman Russell

তারেক মাসুদ: বিস্মৃতি ও স্মৃতি

What you and I hear are different.
You hear the sound
Of closing doors but I of doors that open.
[তুমি যাহা শোন আমিও তাহাই আজ
দরজা বাঁধার শব্দ পাচ্ছ, আমি খোলার আওয়াজ।]
—পারস্য কবিতা

এত অকালে তারেক মাসুদ মৃত্যুবরণ করিবেন, তাহা কোনদিন ভাবি নাই। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, খোদা করেন আর। এই মৃত্যুর মধ্য দিয়া তিনি দেশের তো বটেই, আমার মতন অভাজন ছাত্রেরও অনেক ক্ষতি করিয়া গিয়াছেন। তারেকের কাছে আমার অনেক ঋণ— এই ঋণ পরিশোধ করিবার কোন উপায়ও তিনি রাখিয়া যান নাই।

তারেকের অকালমৃত্যুর পর পরই আমি যে দুইটি ছোট নিবন্ধ লিখিয়াছিলাম তাহাদের একটির নাম রাখিয়াছিলাম ‘আমার বন্ধু তারেক মাসুদ’— অন্যটির অভিধা ছিল ‘আমার শিক্ষক তারেক মাসুদ’। প্রকৃত প্রস্তাবে তারেক প্রথমে আমার বন্ধু ছিলেন, তবে বন্ধুমাত্র ছিলেন না— তিনি ধীরে ধীরে আমার শিক্ষক হইয়া উঠিয়াছিলেন। শুদ্ধ চলচ্চিত্র ব্যবসায়ে নহে, চিরায়ত ভারতীয় সঙ্গীত ও শিল্পকলা বিষয়েও তিনি আমাকে নানাভাবে শিক্ষিত করিতে চাহিয়াছিলেন।

দুঃখের মধ্যে, আমাদের বন্ধুত্বের আয়ু সুদীর্ঘ হইতে পারে নাই। আমি শেষের দিকে বুঝিতে শুরু করিয়াছিলাম— কি করিয়া জানি— তাঁহার চিন্তার প্রগতি দ্রুততর হইয়া উঠিতেছে। তিনি নিরন্তর আমার শিক্ষক হইয়া উঠিতেছেন। আর আমি খেই হারাইয়া ফেলিতেছি। আজিকার লেখায় সেই বেদনার কাহিনী পুরাপুরি লিখিতে পারিব না। এই লেখা শুদ্ধ তাঁহার স্মৃতির প্রতি একজন পুরাতন ছাত্রের (যিনি কিছুদিন বন্ধুত্বের মর্যাদায়ও বৃত হইয়াছিলেন) ভক্তির নিদর্শনমাত্র।

১.

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করিয়াছিলাম ইংরেজি ১৯৭৬ সালে। একই বছরে তারেক মাসুদও আমাদের দেশের এই উচ্চতম বিদ্যালয়ে আসন লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে— সেই বছর বলিব না— সেই যুগে যাঁহারা পড়িতে আসিয়াছিলেন তাঁহাদের মধ্যে তারেক মাসুদকেই আমি শ্রেষ্ঠ বন্ধু জ্ঞান করিয়াছিলাম। কি বিদ্যায় কি বিনয়ে তারেকের সমকক্ষ আমার বন্ধুদের মধ্যে দ্বিতীয় আর কেহ ছিলেন না।

ঘটনাচক্রে আমাদের এই বন্ধুত্বের অনুঘটক ছিলেন আমার অপর বন্ধু কবি মোহন রায়হান। তবে কালক্রমে এই কাহিনীর প্রধান ঘটক হইয়া দাঁড়াইয়াছিলেন আমাদের— তারেক মাসুদ ও আমার— উভয়েরই শিক্ষক আহমদ ছফা। তারেকের সহিত দেখা হইবার কিছু আগেই আহমদ ছফার সাক্ষাত্ লাভের সৌভাগ্য আমার হয়। প্রথম সাক্ষাতের দিন তারেক মাসুদ বলিলেন, তিনিও আহমদ ছফার অনুরাগী। তখনই আমাদের পথ কুসুমাস্তীর্ণ হইতে শুরু করে। সেই কুসুমের মধ্যে একটা কাঁটাও বিন্ধিয়া ছিল। আহমদ ছফা— একদা ১৯৭০ সালের শেষে কিংবা ১৯৭১ সালের গোড়ায়— ‘স্বাধীন বাংলা লেখক সংগ্রাম শিবির’ নামক সংগঠন একটা দাঁড় করাইয়াছিলেন। ১৯৭২ সালে সেই সংগঠন নতুন নাম— বাংলাদেশ লেখক শিবির— লইয়া কায়েমমোকাম হয়। আহমদ ছফা শেষ পর্যন্ত ডাকাতের কবলে পড়িয়া সেই সংগঠন ছাড়িতে বাধ্য হইয়াছিলেন। ১৯৭৬ সালের পর যাঁহারা এই সংগঠন চালাইতেন আমরা দেখিয়াছি তারেক মাসুদও সেই ডাকাতদের সহিত যুক্ত হইয়াছিলেন। তবে আমরা তখনও ছাত্রমাত্র।

তারেক মাসুদ, তাঁহার সেকালের নিত্যদিনের বন্ধু পিয়াস করিম এবং আরও কয়েকজন মিলিয়া তখন ‘সিনেমা অ্যান্ড টেলিভিশন ওয়াচার্স অ্যাসোসিয়েশন’ বা সংক্ষেপে ‘ক্যাটোয়া’ নামে একটি সংগঠন গঠিয়াছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দৌলতে ঐ সংগঠনের সভাপতি পরিচয়ে নাম ছাপা হইত জনৈক অধ্যাপকের। কিন্তু সকল কাজের কাজি ছিলেন তারেক মাসুদ। বলা নিষ্প্রয়োজন নহে, আহমদ ছফা ঐ স্বনামধন্য অধ্যাপকের নাম শুনিলেই দুর্গাপূজার উপযুক্ত খড়গ হাতে লইতেন। আমরা এই অসুখের কিছুটা বুঝিতাম, কিছুটা অবুঝ থাকিতাম।

ইহার পর আসিল শেখ মোহাম্মদ (ওরফে এস.এম.) সুলতানের জমানা। আহমদ ছফা ততদিনে সুলতান অধ্যায়ে হাত দিয়াছেন, তখন তারেক মাসুদও এই মহান শিল্পীর কদর করিতে শিখিয়াছেন। এই মহান শিল্পীর জীবন ও শিল্প লইয়া তারেক মাসুদ ‘আদমসুরত’ ছবিটি যখন সৃষ্টি করিয়াছিলেন তখনও আমরা ভাল বন্ধু ছিলাম। এই ছবি দেখিয়া আমার চোখ খুলিয়া গিয়াছিল। এই ছবির নামের মধ্যেই তারেক মাসুদের প্রতিভা জ্বলজ্বল করিতেছিল। শুদ্ধ প্রতিভা কেন, সাহসও কম নহে। একশ্রেণির মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী তখন প্রচার করিতেন, ‘আদমসুরত’ নামের মধ্যেই সাম্প্রদায়িকতার পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়! অনেকদিন— মানে তারেকের এন্তেকালের— পরে জানিলাম, ঐ ছবির নির্মাণকাহিনী লইয়া তারেক আরেকটা ছবি বানাইয়াছিলেন। তাহাতে দেখিলাম আলোকচিত্রী আনোয়ার হোসেনের নাম পর্যন্ত আছে, অথচ আহমদ ছফার কথা তারেক মাসুদ একদম ভুলিয়া গিয়াছেন।

ইহার পর নিয়তি আমাদিগকে যার যার পথে লইয়া গেল। তারেক গেলেন সিনেমার পথে, আমি চলিলাম আর একটু সুদূরে— মার্কিন মুলুকে। ততদিনে আমাদের পরিচয়ের এক দশক পার হইয়া গিয়াছে। একদিন খোদ সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থলেই তারেক মাসুদের ভাবীকালের সহধর্মিণী শ্রীমতী ক্যাথারিন শাপিরের দেখা পাইলাম। জানিতে পারিলাম, তারেক মাসুদও মার্কিন মুলুকে হিজরত করিবেন। জানিতে আরও পারিলাম, ক্যাথরিনের বাবা একজন স্বনামধন্য দার্শনিক— জোনাথন শাপির— যাঁহার গদ্য আমিও পড়িয়াছি। চিদাত্মা কার্ল পপার কিংবা তাঁহার কড়া বিচারক পল ফেয়ারাবেন্দের নাম যাহারা একদা মুখে লইয়াছেন তাহারা এই নামটিও শুনিয়া থাকিবেন।

তারেক মাসুদ বয়সে আমার বছর দুইয়েকের বড় ছিলেন। বলাবাহুল্য, প্রজ্ঞায় আরো। তিনি বাল্যবয়সে পড়িয়াছিলেন আমাদের দেশে যাহাকে বলে ‘কওমি মাদ্রাসা’ সেই ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ফলে তিনি মাঝে মাঝে দুইচারি পঙিক্ত ফারসি কবিতা আমাদের শোনাইতেন। এই বিদ্যা তিনি পরেও কাজে লাগাইয়াছিলেন। আরো ভালো কথা, একালের ইরানি সিনেমায় যাঁহারা নবযুগ আনিয়াছিলেন তাঁহাদের পুরোভাগে আছেন সম্প্রতি পরলোকগত আব্বাস কিয়ারোস্তামি। তাঁহার সহিত তারেক নিশ্চয়ই ফারসিতে বাতচিত করিয়াছিলেন। কিয়ারোস্তামির জীবনকাহিনী লইয়া— ফারসি নহে— ফরাশি ভাষায় লেখা একটা বই তারেক একবার আমাকে পড়িতে দিতে চাহিয়াছিলেন। কিন্তু নিয়তির টানে সেই বই আমার আর হাতে আসে নাই। আমার ধারণা, আব্বাস কিয়ারোস্তামির গল্প বলার ধরনটাই তারেক মাসুদ ভালোবাসিয়াছিলেন। কিন্তু সত্যজিত রায়ের ছায়া হইতে ছাড়া পাওয়ার জন্য ঐ ভালোবাসা হয়তো পর্যাপ্ত ছিল না। অন্তত ‘মাটির ময়না’ পর্যন্ত আমলে লইলে আমার ধারণার গোড়ায় হাত দেওয়া যাইবে।

আমাদের মার্কিন প্রবাসের প্রথম দিকে তারেক মাসুদ ‘স্ট্রান্ড বুকস’ নামক একটা বড় বইয়ের দোকানে কাজ করিতেন। ঐ দোকানটা ছিল সম্ভবত নতুন ইয়র্ক শহরের সবচেয়ে বড় পুরানা বইয়ের আড়ত। সেখানে নতুন পুরাতন সকল বই টাকায় আধুলিমাত্র দিয়া কিনা যাইত। আর কর্মচারী হইলে আধুলির আধুলি অর্থাত্ টাকায় সিকি খরচ করিয়া কিনিবার সুবন্দোবস্তও ছিল। তারেক মাসুদ আমাকে সেই দোকান হইতে ফিলিস্তিনি মহাত্মা এডোয়ার্ড সায়িদের প্রসিদ্ধ পুস্তক ‘ওরিয়েন্টালিজম’ (বা প্রাচ্যব্যবসায়) কিনিয়া দিয়াছিলেন। একদিন জগতের সকল ঘটনারই হয়তো শেষ হয়। একসময় আমার মার্কিন প্রবাসও শেষ হইল। তারেক মাসুদ মার্কিন দেশকে পরমাত্মীয়ের— শ্বশুরের— দেশে পরিণত করিয়াছিলেন বলিয়া ওখান হইতে বইপত্রও আনিতে কি আনাইতে পারিতেন। তথাগত যে বইটি তিনি সর্বশেষ আমাকে পড়িতে দিয়াছিলেন তাঁহার নাম তর্জমা করিলে দাঁড়ায়— ‘আদি হিন্দুধর্মের উত্পত্তি ও বিকাশ’। আহা, তাঁহার সেই বই আমার অপরিশোধিত ঋণের বোঝাটি আজও ভারী করিতেছে!

সকলেই জানেন, তারেক মাসুদ আমাদের দেশের চলচ্চিত্রে অক্ষয় অবদান রাখিয়া গিয়াছেন। কিন্তু আমরা (যাঁহারা সামান্য হইলেও তাঁহার অল্পবিস্তর সঙ্গলাভের গৌরব অর্জন করিয়াছিলাম তাঁহারা) জানি তাঁহার দৃষ্টি ছিল উপরের দিকে। তিনি পড়াশোনা করিতেন সেই উপরের দিকে চাহিয়া। পূর্বগামীদের মধ্যে এই আকাশদৃষ্টির ক্ষেত্রে হয়তো একমাত্র আলমগীর কবিরের সহিতই তারেক মাসুদের তুলনা চলিবে— আর কাঁহারও বিশেষ নহে।

উপরের দিকে বেশিক্ষণ তাকাইয়া থাকিলে নশ্বর মানবদেহে (মানে মাটির ভাণ্ডে) যাহা ঘটে— অর্থাত্ ঘাড়ের ব্যথা— তারেক মাসুদের তাহা অবশ্য বিশেষ হয় নাই। তিনি আশেপাশেও তাকাইতেন। এই অভ্যাসের কারণেই তিনি নতুন ইয়র্কে বসবাস করিবার সময় দৈবক্রমে ১৯৭১ সালের কিছু দলিলচিত্রের সন্ধান পাইয়াছিলেন। সেই দলিলাদির সদ্ব্যবহার করিয়াই তিনি ‘মুক্তির গান’ ছবিটি বানাইয়াছিলেন— এই কথাটি সর্বজনবিদিত।

এই ছবি বানাইতে গিয়াও তাঁহাকে অনেক যুদ্ধ করিতে হইয়াছিল। ১৯৭১ সালের গৌরবময় সংগ্রামের কাহিনী একদা বাংলাদেশ ভুলিতে বসিয়াছিল। আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবন যাপন করিতেছি তখন দেখিতাম মধ্যবিত্তশ্রেণির ব্যবসায়ী ও বুদ্ধিজীবীরা পর্যন্ত ১৯৭১ সালকে ‘গণ্ডগোলের বছর’ বলিয়া উল্লেখ করিতেছেন। আবারও বলিতে হইবে, খুব সম্ভব একমাত্র আহমদ ছফা আর আলমগীর কবির ছিলেন এই নিয়মের ব্যতিক্রম। চলচ্চিত্র ব্যবসায় আর সাহিত্য ব্যবসায় দুই মহলেই ‘মধ্যবিত্ত’ বলিয়া পরিচিত বলিয়া শাসকশ্রেণিটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিস্মৃত হইতে চলিয়াছিল।

সাহিত্যের কথা যখন উঠিলই বলি, একমাত্র আহমদ ছফা ১৯৮৭-৮৮ সালে ‘একজন আলী কেনানের উত্থান-পতন’ নাম জারি করিয়া মুক্তিযুদ্ধের সহিত আমরা যে বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছি তাহা চোখে আঙ্গুল ঢুকাইয়া দেখাইয়া দিলেন। বইটির নাম আহমদ ছফা পরে ছাঁটিয়া ছোট করিয়াছিলেন— ‘আলী কেনান’। তাঁহার কিছু আগে— ১৯৮৫ নাগাদ— আহমদ ছফা ‘অলাতচক্র’ নামক একটি যুদ্ধপুরাণ লিখিয়াছিলেন। ঘটনাচক্রে দেখা গেল তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’ আর আহমদ ছফার ‘অলাতচক্র’ একই পুরাণের এইপিঠ আর ওইপিঠ। কিমাশ্চর্যম! আহমদ ছফার উপন্যাসের কুশীলব কিছু পরিমাণে ‘মুক্তির গান’ চলচ্চিত্রে উপস্থিত। অথচ উভয়ের মধ্যে কি যোজন যোজন দূরত্ব! আশা করি, দূর ভবিষ্যতে কেহ এই সত্য আরও বিশদ করিয়া উদঘাটন করিবেন। আমি এখানে শুদ্ধ যাহা কর্তব্য বিবেচনা করিয়াছি, তাহাই বলিলাম।

২.

আমি এসলাম ধর্মাবলম্বী একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করিয়াছি— এই সত্য তারেক মাসুদের বেলায়ও অনস্বীকার্য। ইহা লুকাইবার প্রয়োজন নাই। কথিত আছে, আমাদের পয়গম্বর হজরত মোহাম্মদ ফরমাইয়াছেন, পরলোকগত মনুষ্যের সুনামই শুদ্ধ করিতে হয়। আমিও এই সত্য শিরোধার্য করি। পার্থক্যের মধ্যে আছে শুধু সত্যের দাবি। আমরা যদি নিজেদের সত্য নিজেরাও না বলি, তাহা হইলে অন্যে বলিবে কেন? অন্যলোকে শুদ্ধ গুজব রটাইবে। আমাদের আত্মচিকিত্সারও দরকার আছে।

মানুষ তারেক মাসুদ, তাঁহার প্রজ্ঞা, তাঁহার সাধনা, তাঁহার সংগ্রাম চিরকালই আমার শ্রদ্ধার লক্ষ্য থাকিবে। কিন্তু তাঁহার রাজনৈতিক গতির সহিত আমি— একসময় দেখিলাম— আর তাল মিলাইতে পারিতেছি না। সেই কক্ষপথ হইতে কখন কিভাবে যে ঠিকরাইয়া পড়িলাম আজ আমারও তাহা মনে নাই। যখন সংজ্ঞা ফিরিল দেখিলাম, তারেক মাসুদ আর নাই। তাঁহার কীর্তি পড়িয়া আছে। মাঝখানে আহমদ ছফাও চলিয়া গেলেন। আহমদ ছফার স্মৃতির সহিত আমি তারেক মাসুদের স্মৃতি আর মিলাইতে পারি না। আহমদ ছফা যে শ্রেণিকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সহিত বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে অভিযুক্ত করিলেন, তাঁহার এককালীন ছাত্র তারেক মাসুদ সেই শ্রেণিকেই মুক্তিযুদ্ধের ত্রাতার আসনে বৈঠক দিলেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ কিভাবে বেহাত বিপ্লবের করুণ পরিণতি বরণ করিল তাহা এখানেই পরিষ্কার। তারেক মাসুদের সহিত আমার বিরহের শুরু এখানেই হইয়াছিল।

১৯৭১ সাল আমাদের ইতিহাসে একটি রজতরেখার ন্যায় পুরাতন ও নতুন যুগের সীমানির্দেশ করিতেছে। ১৯৭১ একদিকে আমাদের স্বপ্নভঙ্গ ও অন্যদিকে জাগরণের ইতিহাস। তারেক মাসুদও সেই ইতিহাসের সন্তান। আহমদ ছফাও। আমরা সকলেই। অথচ ১৯৭১ সালের লক্ষ্য কি ছিল? এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা একদিন একজনের কাছ হইতে আরজন আলাদা হইয়া গিয়াছিলাম। এই দেশে ১৯৭১ যে বিপ্লব আনিতে পারিত সেই বিপ্লব যে কারণেই হউক আসিতে পারে নাই। কেন পারে নাই? এই বিপ্লবের অন্যতর স্বপ্নদ্রষ্টা আহমদ ছফা অপরিণত বয়সে, প্রায় অজ্ঞাতবাসে, মৃত্যুবরণ করিলেন। অধিক প্রমাণের আর কি প্রয়োজন আছে! তারেক মাসুদ আহমদ ছফার পরিণতি এড়াইতে চাহিয়াছিলেন। পারিয়াছেন কিনা, আমি নিশ্চিত নই। আহমদ ছফা অনূদিত ‘ফাউস্ট’ তারেক না পড়িয়াছেন এমন নহে। এই সত্য উচ্চারণ করা আজ আমার পক্ষে যেমন পরম কর্তব্য, অন্যদিকে তেমনি চরম বেদনার।

আমার জ্ঞান নাই, কিন্তু বিশ্বাস করিতে ইচ্ছা করিতেছে তারেক মাসুদ আহমদ ছফাকে ভোলেন নাই। শুদ্ধমাত্র ছাইচাপা দিয়া রাখিয়াছিলেন। পায়ের তলায় নহে, বুকের তলায়। হয়তো সেই চাপাকান্নার আওয়াজই শোনা যাইতেছিল তাহার অনারব্ধ শেষ ছবি ‘কাগজের ফুল’ কাহিনীর অশ্রুত বয়ানে। আজ বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের দুই বয়ান বিরাজ করে। এক বয়ান মোতাবেক ১৯৭১ সাল ১৯৪৭ সালের ভুল সংশোধন করিয়াছে মাত্র। নতুন কিছুই করে নাই। আরেক বয়ানানুসারে, ১৯৭১ সালের বুকের মধ্যেই ১৯৪৭ সালের বাসনা লুকাইয়া আছে। কি ছিল সেই বাসনা?

আহমদ ছফা, শেখ মোহাম্মদ সুলতান— কিংবা তাঁহাদের দুইয়েরই গুরু আবদুর রাজ্জাক— এই শেষ বয়ানের মধ্যে নিজেদের ভাষা খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন। তারেক মাসুদ এই দুই নৌকায় পদযুগল ভাগ করিয়া রাখিয়াছিলেন। আজ যখনই তারেকের কথা ভাবি সেই পরাবাস্তব ছবি আমার চোখ ঝাপসা করিয়া দেয়। তারেক মাসুদের স্মৃতি যেখানে আমাকে একটা কোমল ব্যথার আঁচড় দিয়াছে তাহা ঠিক এইখানেই। দুঃখের মধ্যে, সেই স্মৃতি আজও অমর রহিয়াছে। তারেক মাসুদকে ভোলা অসম্ভব।

১৫ নবেম্বর ২০১৭

প্রকাশ: বণিক বার্তা২৪  নবেম্বর ২০১৭

Bloodless genocide: The allegorical gaze of Ahmed Sofa

The Third World must start over a new history of man which takes account of not only the occasional prodigious theses maintained by Europe but also its crimes, the most heinous of which have been committed at the heart of very man, the pathological dismembering of his functions and the erosion of his unity, and in the context of the community, the fracture, the stratification and the bloody tensions fed by class, and finally, on the immense scale of humanity, the racial hatred, slavery, exploitation and above all, the bloodless genocide whereby one and a half billion men have been written off.

—Frantz Fanon (2004: 238)

Ahmed Sofa (1943-2001) was already a legend down and out in Dhaka, if not beyond, when he lay dying. He was not well for years before breathing his last. Ahmed Sofa’s true legend, however, did not begin with this death on July 28, 2001. As in most other cases of our literature, his legend too began with an encounter with poetry, that universal goddess. He however discovered his true calling before long in language as such, plunging in a mélange of prose and poetry alike, closing in on the heels of Bengali literature’s colonial greats, Michael Madhusudhan, Bankimchandra, Rabindranath, Nazrul Islam and a few others who matter.

Perhaps part of the reason Sofa was destined to translate Wolfgang Goethe’s Faust, part one, lay in this mélange of poetic ambitions in a prosaic neo-colonial world. But, for all that, he would not abandon that good old poetic craft. On this occasion of Ahmed Sofa’s sixteenth death anniversary I propose to provide a very short introduction to the reading of a narrative poem that he wrote in our apocalyptic mid-1970s.

In 1975, Sofa published two slim volumes, in quick succession of one another, namely Jallad Somoi (Time, the Hangman) and Dukkher Diner Doha (Dog Day Songs), the latter containing a longish narrative poem named Basteeujar (Evicting a Slum). He prided himself a good deal on account of this poem. For instance, however ill-matching his key to the master’s house might be, Ahmed Sofa once dared a transformation of this poem into a broken English prose, coming quite late in the day, though. The petite bourgeois milieu which he was placed to live in condescended to understand his worth rarely, if ever. I must note, however, that Faizul Latif Chowdhury, a good critic and a leading specialist on the acclaimed poet Jibanananda Das, has paid a no-nonsense tribute to this great poem of Ahmed Sofa’s. It seems like finally a wind is blowing. (Chowdhury 2017: 27)

 

The other or outside in the mothering machine

I should perhaps begin by introducing myself in connection with Ahmed Sofa, who I met for the first time in the summer of 1976. He was then registered as a graduate research student with Dhaka University and living in the northern premises of the University and I, as a fledgling freshman, was just admitted into one of the nearby dorms. At the time he was at work on his doctoral dissertation, under the supervision of the famed Professor Abdur Razzaq, on the growth of a middle class among the Muslims of Bengal (or more aptly, the Bengali Muslims). Ahmed Sofa was not like any other intellectual I knew at that time.

Ever since 1962, when he first moved inside Dhaka, Ahmed Sofa took no leave from the city except perhaps for twice or thrice only, once for a sly break to Brahmanbaria College from where he took his baccalaureate diploma and a second time over to perhaps the Indian states of Tripura and West Bengal as a political refugee in 1971. Ahmed Sofa and Dhaka, thereafter, even in death remained virtually in a deadlock. His remains were finally buried in a common man’s ground in Mirpur, in some sort of a slum for the dead, not far from the burial ground officially consecrated for the nation’s martyred intellectuals and other stalwarts. Thus, even in his death Ahmed Sofa lives outside in the nation’s ceremonial high ground.

Not long away and not far from the space he lived in then, where now stand some of the newer student dormitories of the Dhaka University, a squatter settlement or slum flourished, or so I was told on my first encounter by Ahmed Sofa. It was demolished and its inmates driven out by force one night early in 1975. It was a human disaster but accomplished at the beck of powers that were. Ahmed Sofa happened to be a rare man among our poets who, notwithstanding all its foretold futility, was enraged enough to register his bitter protest. No one else had the guts to raise a riot that day. Ahmed Sofa’s Basteeujar has been perhaps the only testimony of a time out of joints. Sofa mourned the loss, but no nostalgia took hold of him. His vision was tinged with a touch of both melancholia and utopia, as I would venture to say today.

Ahmad Sofa. Photo: Nasir Ali Mamun (Photoseum) 16 August 1998 Dhaka

As Ahmed Sofa put it once in his perhaps more youthful days, “Writing a poem is sort of a scandal; so I didn’t go for one for real long”. Perhaps true, founding a city, or better a civilisation, that is to say, the art of living together in towns has been a scandal too. In Gilgamesh, one of the oldest poems we know on earth, we read of how Enkidu, a wild man living  in peace with the fauna of the fields and forests, was enticed down from the mountains of south-eastern Anatolia to become a town-dweller in the Mesopotamian plain, by a pretty harlot. As the myth has it, “not unnaturally he fell for her and after seven days of her company he was no longer accepted by the animals he had lived with. He had become civilised.” “The myth,” according to Gwyn Williams, a concerned scholar, “suggests that towns are a female need, if not invention and that men would not naturally live, work and breed in towns unless trapped to this way of life by the beauty and requirements of woman.” (Williams 1967: 48)

For Ahmed Sofa, the name of the harlot is “cruel hunger”, the goddess of need, who entices the rural rabble crowding the city. “These rural folks, like ants in queue beyond a count, drawn to honey, crowd the city,” writes Ahmed Sofa. His imagery is no less traumatic: “Driven by a pitiless hunger like a man-eating tiger’s wrath, like the tyranny of a drought, or a savage flood dragging hillside weeds in its wake,” as Ahmed Sofa describes the rural exodus  to the sprawling city. It’s not much unlike what happens in the world of the classical economists or for that matter in Sir Arthur Lewis’s two-sector growth model that divided a neo-colonial economy (a so-called “labour-surplus economy”) into two linked sectors: a large traditional sector and a small industrial one. The traditional sector contains a large pool of low-productivity, surplus, labour upon which the industrial sector can draw. But unlike Lewis’s model there is no dynamic drive here; the labour-surplus economy would not grow over time, there being no industrialisation providing “the engine of growth”.

Lure of the town, in the imaginary of the folks, plays no small role, adds Ahmed Sofa. “These country folks,” in our poet’s own words, “looked at the city as if it is a fun-filled folk lore come true”. The city, in their imaginary is heaven itself; city air frees, or so they believe; it’s all illumination per se. In Ahmed Sofa’s poetic discourse the peasant turned migrant labourer in the city thinks much like this:

“Flood-light wreaths keep flooding city streets, playful fairies
Crowd around; how merry they keep round the clock,
Afternoons and evenings, adapting to the undulations of
The heart, music oozing out of lyrical movements, and pretty feet!
Steam, air, water and blitz of lightning up in heaven
Serve the town like devoted, ungrudging slaves;
Carts and autos speed along; hydrants jetting water out,
Fresh drafts swishing air out of air-machines,
Happiness itself hangs here like a bunch of grapes.”

(Sofa 2008: 532)

An iron rhino or the world turned upside down

Grapes would become sour soon enough, for sure. One fine evening, over mulled wine and cigars, powers that be decided that a whole habitat of hapless rural migrants would be bulldozed in one fell swoop. A rogue never runs out of excuses. Ahmed Sofa had just the misfortune of witnessing the unjust will of that power in action in Nilkhet slums. It was perhaps “Time, the hangman” who was taking over. The world turned upside down that day. It was only Ahmed Sofa who knew that things were more like signs of things to come.

You can define a majority of Dhaka’s denizens as “slum dwellers” right now too, the two city corporations boasting more than two thousand slums, thus vindicating Ahmed Sofa’s prognosis forty years down the line, if farther vindication be necessary.

Ahmed Sofa casts a calm, terrible, melancholy look at the scene of mourning. In the end he would end up in an allegory of defiance of the oppressed. All that tyranny needs is a bulldozer and the poet too knows that power comes out of a barrel of a gun. Is it just a narrative motif or is there more to it? Is it a narrative which has a place inside the allegory? Who knows? You are right perhaps. “Evicting a slum” is more than an occasional poem, vintage 1975, for all its oriental despotism. Ahmed Sofa is no doubt witnessing a Dhaka slum, like the couple of thousand others around, fallen prostrate like a dead body sprawling in the mud after three shots in George Orwell’s imperial parable. It was perhaps lying there like a non-uniformed peasant’s body under the boot of one in uniform.

Read as an allegory, “Evicting a slum” yields a tale of dispossession, of exile, and dispossession again. Looking back, our urban slums appear to be a reprieve, a purgatory of sorts. Doomsday cannot be too far, however. On the eve, “a muffled fear runs aground.” As Ahmed Sofa sees it, “a wild rumour jumped like a prairie-fire up and, it seemed, as if some good old hard rock burst asunder in a violent eruption.” In the end it is the other’s gaze that prevails: “It is as if the ground is sobbing and wailing, frozen so long, now letting its voice find life-giving songs”.

At the moment, writes Ahmed Sofa, “pounding hearts were heard beating loud not unlike some trumpets of war.” When the bulldozers, those “iron rhinoceros”, as Sofa calls them, “blind in rage and anger” finally moved in and began ploughing pretty deep in the ground, those tiny make-believe hovels of the poorest folks felt the crushing weight of power. The other’s gaze can hardly skip “skinny naked dirty curious kids bagging a chance to see black eye to black eye those death-dealing gun-barrels”. Our melancholy flâneur, not unlike Charles Baudelaire’s outsider, is in love with “the clouds … the clouds passing,… up there, … up there, … the marvellous clouds”.

Women folk muted like tamed birds
Stood not unlike a still-life painting not knowing
Right when tears in their eyes dried up;
“How could you evade destiny’s writ”, —the elderly murmured.
Young ones, faces downcast, bore with the agony,
It got so hard, felt like skinning a goat alive.
That slum-dog, man’s friend but no fool himself
Got to get barking loud, forgetting to bite the fresh bone in jaw.

(Sofa 2008: 535)

Our narrator meets a bird, shalik, ancient cliché for freedom in a cage, too grief-stricken to sing. A metonymy for home, shimul tree, casts a long shadow. A melancholy, in a word, has taken hold of the world. The poet as flâneur, not a revolutionary, sees “flowers dropping red petals as red tear-drops in anguish”! He sees:

Quilts and pillows bundled up, shutters and window blinds,
Household birds raised in cages, sundry kitchen utensils,
Tubs and bowls, mugs and lanterns, evening kerosene lamps,
Pigeons, stripes all over, flying high,
A disoriented milking goat-mother.
All of man’s friends living in agony for mankind.

(Sofa 2008: 532)

A call to arms

Ahmed Sofa ends on a utopian note, reiterating a call for arms. Slums, abode of the disinherited, refuge of the wretched of the earth in fact die hard; on the contrary they multiply as if in vengeance on the city. The pushing rural unemployment, crossed with the lure of urban slums, partly account for this. Man dreams but the mode disavows. “It’s impossible,” Ahmed Sofa intervened a full quarter century later, “to evict the slums”, reiterating what he had to disgorge in his 1975 poem. He found the slum-denizens murmuring: “we are not going to go back to the village, does a baby get back to the mother’s womb ever?” They promise, instead, a river of blood, a war on the proud and pitiless towns.

You can define a majority of Dhaka’s denizens as “slum dwellers” right now too, the two city corporations boasting more than two thousand slums, thus vindicating Ahmed Sofa’s prognosis forty years down the line, if farther vindication be necessary. Dhaka is overpopulated, at the same time they, the people of the city, are overpowered too. In Marxian parlance, “relative overpopulation” is that part of the labour force which exceeds the regulating needs of employment for capital in the given phase of accumulation. Within this one distinguishes a “floating”, a “latent” and a “stagnant” sector. To this three are now added new sectors every day, of the unemployed, the underemployed and the semi-employed who together form the unemployed mass of the reserve army of labour.

Ahmed Sofa, known in his lifetime as a firebrand, now appears to be no less memorable for his poems. I do not know yet how posterity is going to read him. But it is all apparent now. Sofa sometimes reminds me of the great French lyric poet Charles Baudelaire who in an apostrophe to his own poems had these to say: “Accursed being to whom from the lowest depths of the highest heavens, nothing but me responds; you who, like a shade that leaves no more than a fleeting trace, tread lightly with a serene gaze, those foolish mortals who called you bitter, statue with jet eyes, great angel with your brow made of bronze.” (Baudelaire 1975: 41)

References

1. Baudelaire, Charles. “Poem no. XXXIX [untitled]”. Oeuvres complètes, tome I, ed. Claude Pichois, Gallimard, 1975, pp. 40-41.
2. Chowdhury, Faizul L. “Jibanananda Daser dirghotom o aprokashito kabita: Someshwar Mustafir prithibe: bhumika”. Samakal: Eidsamkhya (Samakal: Eid special number), June 2017, pp. 25-28.
3. Fanon, Franz. The Wretched of the Earth. Translated by Richard Philcox, Grove Press, 2004.
4. Sofa, Ahmed. “Bastee ucched kora smabhob noi, Parts I and 2”. Ajker Kagoj, April 14, and 28, 2000.
5. Sofa, Ahmed. “Basteeujar”. Ahmed Sofa Rochonaboli. Edited by Nurul Anwar, vol. , Khan Brothers, 2008, pp. 531-536.
6. Sofa, Ahmed. “The Eviction of the Shanty Town Dwellers”. Ahmed Sofa Rochonaboli. Edited by Nurul Anwar, vol. , Khan Brothers, 2008, pp. 537-542.
7. Gwyn Williams, Turkey: A traveller’s guide and history. Faber and Faber, 1967.


The Daily Star
, July 31, 2017

আহমদ ছফার জিজ্ঞাসা: আব্বাজান, কি আমি পেয়েছি

আমার বড় ভাই মনে করতেন আমি একজন সত্যিকারের আলাওল। যেসব লোক আলাওল হয় তারা সামান্য নয়, একেকজন নবী-পয়গম্বরের মত মানুষ।—আহমদ ছফা

আমাদের দেশের আর পাঁচ সাহিত্যসেবীর মতন আহমদ ছফারও সাহিত্যসাধনায় একদিন হাতেখড়ি হইয়াছিল দুইচারি পংক্তি পদ্য লিখিয়া। ১৯৯৬ সালে এক সাক্ষাৎকারযোগে তিনি জানাইতেছিলেন, তদীয় প্রথম পদ্যের নাম দাঁড়াইয়াছিল ‘রামের পিতৃভক্তি’। এই পদ্যের দুই লাইন তিনি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত স্মরণ করিতেন।

যেইজন পিতামাতার প্রতি নাহি করে ভকতি
পরকালে হবে তার নরকে বসতি।

তাঁহার জীবনচরিতকার শামসুল আরেফীন অনুমান করিয়াছেন এই দুই চরণের রচনাকাল খুব সম্ভব ১৯৪৯ সাল নাগাদ। হইবেও বা, কেননা ততদিনে পাকিস্তানের পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ আর বাঁচিয়া নাই। জিন্নাহ সাহেবের মৃত্যুতে ব্যথা পাইয়া খানিক উপরের শ্রেণীর একটি ছাত্র—বিভূতিরঞ্জন নাথ—একটি কবিতায় লিখিয়াছিলেন: ‘বুক ভেসে যায় নেত্রনীরে, জিন্নাহর মরণে’। এই অপূর্ব কবিতারত্মের প্রেরণায়ই না সেদিন আহমদ ছফা লিখিয়াছিলেন ‘রামের পিতৃভক্তি’! আহমদ ছফা তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাত্র, তৃতীয় শ্রেণীতে। (ছফা ২০০৮: ৩০৭; আরেফীন ২০০৪: ১৩০)

আহমদ ছফার কবিতা-পুরাণও কিছু পরিমাণে ভারতীয় পুরাণের অনুগামী। এখানেও একটা পরোক্ষ শোকের ঘটনা আছে। একদিন পাকিস্তানের পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বিগত হইলেন। তাঁহার মৃত্যুতে শোকার্ত কিশোর বিভূতিরঞ্জন একটি আস্ত পদ্য লিখিয়া ফেলিল। পদ্যটি ছাপা হইলে পর আহমদ ছফার বিদ্যোৎসাহী বাবা সেই কিশোরকে দশ টাকা পুরষ্কার দিয়াছিলেন। তারপর আব্বাজান তাঁহাকে লইয়া লাগিলেন: ‘তুমি পার না কেন? আমি তোমার দুইটা মাস্টার রাখছি, একটা ইংরেজি-বাংলা পড়াবার জন্য। আরেকটা আরবি-ফারসি পড়াবার জন্য, তুমি পার না কেন?’

তখনও ছোট মানুষ আহমদ ছফা। পারিবেন কি করিয়া! তবু তিনি বাপের ইজ্জত রক্ষা করার জন্য বলিলেন, ‘আমিও লিখব।’ ছোট মানুষ তিনি। ‘পাকিস্তান,’ ‘জিন্নাহ’ প্রভৃতি অনেক বড় বড় জিনিশ—সামলাইতে পারেন না। অন্য কিছু পারেন। সাক্ষাৎকারে তিনি বলিতেছেন, ‘আমি তখন রামের গল্পটা শুনেছি। মনমোহন পণ্ডিতের মা, উনি ‘রামায়ণ’ পড়তেন, আমি শুনতাম। রামের গল্পটা আমার ভাল লেগেছিল। তখন একটা কবিতা লিখলাম—“রামের পিতৃভক্তি”।’ (ছফা ২০০৮ (ক): ৩০৭)

ঘটনার গোটা বছরপাঁচেক পরে—তিনি তখন অনুমান অষ্টম শ্রেণীতে—আহমদ ছফা মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাম সামনে রাখিয়া একটা কবিতা লিখিলেন। বলা বাহুল্য, কবিতাটি অমিত্রাক্ষর ছন্দে প্রণীত। ইহাকেই বলে প্রভাব। যিনি প্রভাব বিস্তার করিতে পারেন তিনি ‘পিতা’ নিঃসন্দেহে। কবিতার কয় চরণ আহমদ ছফা ১৯৯৬ সালেও স্মরণ করিয়াছিলেন।

হে বঙ্গকবিকুলশিরোমণি শ্রীমধুসূদন!
তোমার যাওয়ার পথে বায়ুসম বেগে
আমিও বাসনা করি যেতে, কিন্তু সদা ভয় জাগে
যদি যায় সঙ্কল্প টলিয়া পারিপার্শ্বিক পৃথিবীর চাপে,
যেমতি নদী এসে বাধা পায় শিলাময় পাহাড়ের স্তরে
যদি কোনমতে তারে বারেক টলাতে নারে
হয় প্রবাহিত ভূগর্ভের নিরপেক্ষ স্তরে।…
(ছফা ২০০৮ : ৩০৮)

আজিকালি আমরা যাহাকে বলি ‘উচ্চ মাধ্যমিক ছাড়পত্র’ আহমদ ছফা সেই স্তরের পরীক্ষা পাশ করিয়াছিলেন—যতদূর জানা যায়—১৯৬২ সাল নাগাদ। সেই বছরই তিনি চট্টগ্রাম ছাড়িয়া চলিয়া আসেন ঢাকা শহরে। শহরের পত্র-পত্রিকায় লেখা ছাপাইবার সুযোগ তৈরি হয় তাঁহার। মধ্যখানে ঘটে পিতৃবিয়োগ। এই বিয়োগ ঠিক কোন বছর ঘটিয়াছিল হলপ করিয়া বলার উপায় নাই। ঘটনাটি—আহমদ ছফার সর্বশেষ স্মৃতিকথা অনুসারে—১৯৫৭ সনের। ১৯৬৪ সালের গোড়ায় (জ্যৈষ্ঠ ১৩৭১) তাঁহার একটি কবিতা ছাপা হয় মোহাম্মদ আকরম খাঁর ‘মাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকায়। কবিতার নাম ‘জনকের কবরে’। আহমদ ছফা তখন একুশ-বাইশ বছরের নবীন। কবিতায় হাতযশ না থাকে তো কি হইয়াছে ততদিনে অনেকদিন ধরিয়া কবিতায় হস্তক্ষেপ করিতেছেন তিনি। এই কবিতায় পিতৃস্মৃতি বা পিতার প্রভাব যেভাবে ধরা পড়িয়াছে তাহা বিশেষ প্রণিধান করিবার জিনিশ।

‘রোগশয্যায় বিরচিত’ নামে—ঢের পরকালে রচিত—এক রচনায় আহমদ ছফা পিতা অবর্তমান হইবার প্রথম ফলাফল যেভাবে বিবৃত করিয়াছেন তাহাতে বিষয়সম্পত্তির বিষয়টিই বড় হইয়া উঠিয়াছিল: ‘আমার পিতার মৃত্যুর পর আমরা তাঁর রেখে যাওয়া ভূসম্পত্তির মালিক হয়ে পড়ি।’ বছরকয়েক পরে লেখা ‘জনকের কবরে’ দেখি, পিতার কবর জিয়ারতে দাঁড়াইয়া তিনি দেখিতে পাইতেছেন অন্য—সম্পূর্ণ ভিন্ন—দৃশ্য।

অধরে কথার ঢেউ, চিন্তা আর চাঞ্চল্যের শিখা
দিগন্তে ফেরারী হল, আধবোঁজা পৃথিবীর চোখ—
অচেনা বাঁধনে তার দিব্যরূপরেখা
বেঁধেছে আমারে আহা, স্বপ্নময় যেন দুই তীর
মাঝখানে বয়ে যায় জীবনের বেগবান নদী।
(ছফা ১৩৭১)

আনুমানিক দশ বছর পরে—১৯৬৭ সাল নাগাদ— আহমদ ছফা একদিন আপনার একমাত্র বৈমাত্রেয় ভাইটিকেও হারাইলেন—যেন নতুন করিয়া পিতৃহারা হইলেন তিনি। তাঁহার সাহিত্যসাধনার পশ্চাতে এই অনপনেয় ভাইটির যারপরনাই ভূমিকা। তিনি লিখিয়াছেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমি অল্পস্বল্প লেখালেখি করতাম। এইজন্য পাড়ার মানুষ আমাকে ঠাট্টা করত, ভ্যাঙ্গাত। আমার এই ভাইটি তাদের সঙ্গে মারামারি করত এবং অনেক সময় নিজে জখম হত। সন্ধ্যা অন্ধতার কারণে বেশিদূর লেখাপড়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তিনি “পদ্মাবতী,” “শহীদে কারবালা,” “সয়ফুল মুল্লুক বদিউজ্জামালের” নির্বাচিত অংশ মুখস্ত গান করে পড়তেন।’ (ছফা ২০০৮ : ২১৪)

নিজের ভাই সম্পর্কে—তবুও আহমদ ছফার বিশ্লেষণ অনেকখানি নির্মোহ। ভাইয়ের গুণগরিমা বিশদ করিতে একটু লিখিয়াছেন বটে তিনি : ‘আমার অপদার্থ ভাইটির অনেক দোষ ছিল। ব্যবসা করলে গুণাহগারি দিতেন, মামলা করলে হারতেন, কিন্তু একটা জায়গায় [তাঁহার] অন্তরের বিশ্বাস ধ্রুব-নক্ষত্রের মত স্থির ছিল। কি কারণে জানিনে তিনি বিশ্বাস করতেন আমি একজন বাঘের মত মানুষ। আমি তার অবর্তমানে পরিবারের সম্মান রক্ষা করব, ছেলেমেয়েদের মানুষ করব। মজার কথা হল, তিনি অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করতেন এসব অলৌকিক কাণ্ড ঘটাবার ক্ষমতা আমার আছে। আমার বোকাসোকা ভাইটির মৃত্যুকালীন বিশ্বাসের সম্মোহনী শক্তিতে আমি অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম।’

আহমদ ছফা জানাইতেছেন, বড় ভাইয়ের বিশ্বাস ছিল তাহার ছোট ভাই সত্যিকারের এক বড় মানুষ। কথাটা এখন ছোট ভাইয়ের জবানিতেই শুনি: ‘আমাদের চট্টগ্রামের বিরাট একটা অংশ মনে করত “আলাওল” শব্দের অর্থ কবি। কেউ কবিতা লিখতে চেষ্টা করলে লোকে ঠাট্টা করে বলত অমুকের ছাওয়াল আলাওল বনার চেষ্টা করছে। আমার বড় ভাই মনে করতেন আমি একজন সত্যিকারের আলাওল। যেসব লোক আলাওল হয় তারা সামান্য নয়, একেকজন নবী-পয়গম্বরের মত মানুষ।’ (ছফা ২০০৮: ২১৪)

এই পর্যন্ত দেখা যাইতেছে, পিতা আর জ্যেষ্ঠ সৎভ্রাতা দুইজনের ঋণ আহমদ ছফা স্বীকার করিয়াছেন। তাঁহার আলাওল বনার পেছনে—তাঁহার ভাষাসাধনায়—দুইজনেরই দান অসামান্য। তিনি যখন ‘জনকের কবরে’ লিখিতেছেন ভাইটি তখনও বর্তমান। কবিতায় দেখি, পিতার স্মৃতি তাঁহার কাছে ধরা পড়িয়াছে সম্পূর্ণ অন্যরূপে—তিনি পিতা আবিষ্কার করিয়াছেন ভাষার মধ্যে। পিতার ছবি ছাপাইয়া উঠিয়াছে তাঁহার ডাক—তাঁহার ভাষা। এখানে আহমদ ছফা নিজের ভাষায় দেখি জীবনানন্দ দাশের একটি পদ ধার করিয়াছেন। না করিয়া উপায় নাই। ভাষা কাহারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নহে। ‘বেতস লতার বনে’ নামক পদকল্পে জীবনানন্দ দাশের স্বত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে সত্য, কিন্তু ভাষায় কাহারও স্বত্ত্বে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কায়েম হয় নাই।

কথাটা হয়তো একটু অন্যভাবেও বলা যায়। মানুষের ইতিহাসে পিতার নিকটতম তুলনা ভাষা বটে। ভাষা কোথা হইতে ভাসিয়া আসে মানুষ তাহার কতটুকু জানে! একমাত্র এই ভাষার কারণেই না মানুষ তাহার পিতার পরিচয় জানিয়াছে। পিতা তো একদা অদৃষ্টই ছিলেন। এই দৃষ্ট হওয়ার, এই পরিচয়েরই অপর নাম ‘সভ্যতা’ নয় কি! এই সত্যই আহমদ ছফার দ্বিতীয় স্তবকে মূর্তিলাভ করিয়াছে।

যখন পেছনে চাই জনকের ডাক কানে বাজে
ভেসে আসে সঙ্গীতের সুরেলা ঝঙ্কার,
শিরায় রোমাঞ্চ জাগে, বেতস লতার বনে
ফিরে যাই, শিশু হই—মনে মনে বলি বারবার
অসম্ভব যতো কথা—পিতৃছবি আঁখিকোণে আঁকি।
(ছফা ১৩৭১)

মনে হয়, পিতার সহিত সন্তানের না লেখা চুক্তির একটা পরিচ্ছেদই আহমদ ছফা এখানে নতুন করিয়া লিখিতেছেন। পিতা মানে ভাষা। আর কে না জানে ভাষাই মানুষকে মানুষ করিয়াছে! এই ভাষাই মানুষের অমর কাহিনীর গোড়ার কথা। প্রাণীজগতে আর কোন প্রাণী আছে যাহার ভাষা মানুষের ভাষার মতন! কোন প্রাণীর ভাষা এহেন বাক্য ভর করিয়া চলে! এই অমর বাক্যের বলেই না মানুষ এক পর্যায় বা পুরুষ হইতে অন্য পর্যায় বা পুরুষে পার হইতে থাকে। তাহা হইলে স্বীকার না করিয়া উপায় কোথায়—মানুষের ভাষারই অপর নাম পিতা অথবা পুরুষ! আহমদ ছফা যাহা লিখিয়াছেন তাহাতে শিশুর ভাষা আর তাহার পিতার মধ্যে একটা অভেদের প্রতিষ্ঠা আছে নিঃসন্দেহে।

চলে যাই আরো আগে যখন ফুটেছে ঠোঁটে
আধো আধো বোল, জনকের চোখে চোখ রেখে
যখন কয়েছি কথা, প্রাণ খুলে কত অকপটে।
হাজারো জান্নাত আমি গড়িয়ে দিয়েছি কত
জীবনের যৌবনের স্রোতে—তারপর আমি গেছি
বন্ধুহীন বিয়াবানে প্রাণের পরশ পেতে
মেকীর বাজারে, আব্বাজান, কি আমি পেয়েছি?

যেখানে পিতা নাই—মানে ভাষা নাই—সেখানে কি আছে? সেখানে আর কিছু নাই। আছে মরীচিকা—আছে ‘মেকীর বাজার’। মেকির জগত মানে এখনও ছবির জগত—যে জগত এখনও শব্দের কিংবা বাক্যের ভাষা হয় নাই। কবরে শায়িত পিতাকে হাজির-নাজির জানিয়া আহমদ ছফা জিজ্ঞাসা করিতেছেন, ‘মেকীর বাজারে, আব্বাজান, কি আমি পেয়েছি?’ আমরা আগেই দেখিয়াছি, আহমদ ছফা যখন এই কবিতায় পৌঁছিতেছেন ততদিনে জীবনানন্দ দাশও তাঁহার নাগালে। কিন্তু তিনি সেখানেই থামেন নাই। আরো আগে—আরো পিছে—তাকাইয়াছেন। এই পর্যন্ত আসিয়া দেখিতেছি কাজী নজরুল ইসলামেও কিছু অধিকার পাইয়াছেন আহমদ ছফা।

উদাহরণস্বরূপ নবীন আহমদ ছফার কবিতা হইতে একটি শব্দ লইয়া পরীক্ষা করি। নজরুল ইসলাম ভারতবর্ষে অসহযোগ আর খেলাফত আন্দোলনের যুগে—সেই ১৯২১ সালেই—‘আনোয়ার’ নামে বিয়াবানে শোরগোল তুলিতেছিলেন।

আনোয়ার! আনোয়ার!
জনহীন এ বিয়াবানে মিছে পস্তানো আর!
আজো যারা বেঁচে আছে তারা খ্যাপা জানোয়ার!
(নজরুল ২০০৬: ৩৫)

এই কবিতাটির ঠাঁই—সকলেই জানেন—১৯২২ সালের ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যে, খেলাফত আন্দোলন বিগত আজ কতদিন! অথচ সেই যুগের এই কবিতাটিও—নজরুল ইসলামের আর আর কবিতার মতনই—আজও আপাদমস্তক অমলিন। বলা হয়তো নিষ্প্রয়োজন নহে, ‘বিয়াবান’ শব্দে মরুভূমি বুঝায়। ‘আনোয়ার’ কবিতায় নজরুল ইসলামের প্রয়োগটা দেখি—‘জনহীন এ বিয়াবানে’। আর আহমদ ছফার ‘জনকের কবরে’ কবিতায় তাহা হইয়াছে ‘বন্ধুহীন বিয়াবানে’। মধ্যখানে অবশ্য ফররুখ আহমদ শব্দটি লইয়া ঢের লাগিয়াছেন। ‘নৌফেল ও হাতেম’ নাট্যের এক জায়গায় বাদশাহ নৌফেলের বেগম তাঁহাকে আহ্বান জানাইতেছেন:

আমার মিনতি শোন, ফিরে এস, ফিরে এস তুমি
প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঠ,—এ ভুলের বিয়াবান থেকে।
(ফররুখ ১৯৯৫: ১৫৫)

আর ‘সিরাজাম মুনীরা’র ‘আলী হায়দর’ কবিতায়ও ফররুখ আহমদ ‘বিয়াবান’ ‘বিয়াবান’ চিৎকারে আকাশ-পৃথিবী তোলাপাড়া করিতেছেন:

তার তকবিরে বিয়াবান চিরে বাহিরিয়া আসে স্বর
তার তকবিরে কাঁপে অম্বর, ফাটে মরুপ্রান্তর
গর্জে খোদার সিংহ: আল্লা, আল্লাহু আকবর
নবীজীর পাশে এল আল্লার সেনা এল আলী হায়দর।

সে কী তূরন্ত দূরন্ত-গতি মরুতে ঝড়ের বেগে!
জড়পিণ্ড এ বিয়াবানে বুঝি আগুন উঠেছে জেগে
হাজার ঘোড়ার খুরের আঘাতে লক্ষ উল্কা জ্বলে
দিগ্‌কাওসের বাঁকা রেখা উড়ে চলে,
তীরের মতন বেগে স’রে যায় পদতলে মরুভূমি,
শহীদের খুনে মরণ তুফান জীবনের মৌসুমী
(ফররুখ ১৯৯৫: ৮৭-৮৮)

এক্ষণে ‘মুহূর্তের কবিতা’ হইতেও দুইটি দৃষ্টান্ত লইতে পারি :

‘কালের সুরাহি থেকে’ ঝরে যাওয়া কণিকা এসব
বিচ্ছিন্ন মুহূর্ত গড়ে কত শতাব্দীর খেলাঘর,
নৈঃশব্দ্যের বিয়াবানে করে কোটি কণ্ঠকে সরব,
ক্ষণিকের অবকাশে রেখে যায় রক্তিম স্বাক্ষর!
তারপর মিশে যায় কীটাণুর ক্ষীণ অবয়ব
কোনদিন, কোনখানে আর যার মেলে না খবর।
(ফররুখ ১৯৯৫: ১৭৭-৭৮)

এখানে কুতুব তারা জেগে আছে দৃষ্টি মেলে তার
আকাশের এক প্রান্তে। অরণ্যে, সমুদ্রে, বিয়াবানে
যারা চলে দিশা ভুলে মঞ্জিলের বিভ্রান্ত সন্ধানে
একাগ্র অন্তরে শুধু রোশ্নি চায় কুতুব তারার।
(ফররুখ ১৯৯৫: ২১৫)

প্রত্যয়ের সূর্যালোকে অবকাশ নাই সংশয়ের
শবে-বরাতের রাতে জ্বলে সে নিষ্কম্প শামাদানে,
কিম্বা চলে বিয়াবানে পরিপূর্ণ প্রজ্ঞার সন্ধানে,
মুসা কালীমের মত সহযাত্রী; বন্ধু খিজিরের
চলে অবিশ্রান্ত গতি জীবনের পূর্ণতার টানে;
স্পর্শে যার সুসম্পূর্ণ রূপ পায় গান মুহূর্তের॥
(ফররুখ ১৯৯৫: ২২৭)

‘হাতেম তা’য়ী’তেও দেখি এই অধিকার অপ্রতিহত গতিতে চলিয়াছে। নির্জন মহলে গতি যখন মন্থরতম, মুহূর্তকে যেখানে শতাব্দী মনে হয় সেখানে এক ভিনদেশী ভাবিতেছে—‘কেন বিয়াবানে এই আমীরানা ঠাট!’

‘হয়তো পানির গভীর অতলে সে আজদাহার বাসা,
হয়তো সেখানে সাপের রাজ্যপাট,
তবে কেন এই শানশওকত, অপরূপ বালাখানা;
কেন বিয়াবানে এই আমীরানা ঠাট!’
(ফররুখ ১৯৯৫ : ৪০৫)

একই নিয়মে মনে হয় ‘জান্নাত’ শব্দটিও আহমদ ছফা উত্তরাধিকারজ্ঞানেই ঐতিহ্য হইতে গ্রহণ করিয়াছেন। ‘মুহূর্তের কবিতা’র ‘কাসাসুল আম্বিয়া’ কবিতায় ফররুখ আহমদ লিখিয়াছিলেন:

কখনো জান্নাত ছেড়ে আসি নেমে কঠিন মাটিতে,
কখনো বা মনে হয় জিন্দেগানি নির্দয়, নির্মম,
অগ্নিকুণ্ডে জাগি আমি কখনো বা পুষ্পল হাসিতে,
কখনো বা পার হই অতলান্ত প্লাবন বিষম!
মানুষের উর্ধ্বগতি আঁকি মনে কল্পনা তুলিতে
(যে উচ্চতা জিব্রাইল করিতে পারেনি অতিক্রম।)
(ফররুখ ১৯৯৫: ২০৭)

কিংবা ‘হাতেম তা’য়ী’র ‘দুস্রা সওয়াল’ অধ্যায়ে ‘গোরস্তানের অভিজ্ঞতা’র অংশবিশেষে পড়িতে পাই ‘জান্নাতের নেয়ামত সুরভিত খাঞ্চায় সাজানো।’

… ঘন হলে রাত্রির আঁধার
দেখিল শহীদী রুহ্ এল সেই গোরস্তান ফুঁড়ে
এল সে বৃদ্ধের আত্মা রওশন, শাহানা লেবাসে
(চীরধারী নয় আর)! মধ্য রাত্রে এল মেওয়াজাত
জান্নাতের নেয়ামত সুরভিত খাঞ্চায় সাজানো
(’য়েমনী হাতেম তা’য়ী অংশ পেল যার), পেল বৃদ্ধ
শহীদী জামা’তে সেই আনন্দিত;—খাদ্যের সামানা।
(ফররুখ ১৯৯৫: ২৮৭)

ভাষা মানেই আকার। এই ভাষার মধ্যেই মনুষ্য আপনকার সত্য—তাহার যুক্তির পাঁচকাহন—রাষ্ট্র (বা সমাজ) আকারে লাভ করিয়াছে। মানুষের দেহ মর অর্থাৎ নশ্বর—এ সত্যে সন্দেহ নাই কিন্তু ভাষার মধ্যেই সে অমর হইয়াছে। আর কে না জানে অমরতারই অপর নাম ঈশ্বর! অধিক কি! ঈশ্বরের গুণকেই না ‘ঐশ্বর্য’ বলে—এ কথা কে না জানে। যে পিতার দেহ আছে সে পিতা নশ্বর—তাহাকে একদিন কবরে যাইতে হইবে। কিন্তু যে পিতা ঈশ্বর তিনি বাক্যের আকার ধারণ করিতে পারেন। তাঁহার মৃত্যু নাই। তাহার পুত্রস্বরূপ মনুষ্যের দুই আঁখিকোণ হইতে দুইফোঁটা পানি—‘দুইটি তরল মুক্তা’—কখনো বা টলিয়াও পড়িতে পারে। পিতার উদ্দেশে আহমদ ছফার এই ছিল শেষ নিবেদন।

তোমার কবরে আজ ধীরে ধীরে সন্তর্পণে এসে
সবুজ দুর্বার সাথে কিছুক্ষণ কথা কয়ে
সজল নিশ্বাসে পুনঃ ফিরে চলে যাই
দুইটি তরল মুক্তা এই দুই আঁখিকোণে লয়ে।
(আহমদ ছফা ১৩৭১)

অনেক অনেক দিন পরের কথা। রুশদেশের দ্বিতীয় বিপ্লব পরাজিত হইয়াছে। প্রশ্ন উঠিয়াছে এতদিনে এই বিপ্লবের পিতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনকেও নতুন করিয়া মাটির নিচে গোর দিতে হইবে। নতুন গোরখনকদের দাবি ১৯৯১ সনের পর তীব্র হইতে তীব্রতর হইয়া উঠিল। আহমদ ছফা ১৯৯৯ সালে সম্পূর্ণ নিজের যুক্তিতে লেনিনের জারি লিখিলেন একটা। ‘লেনিন ঘুমাবে এবার’। লিখিলেন, ‘লেনিন মানুষের ইতিহাসে মানুষের শিশু হতে চায়’। লেনিনের জীবন হইতে আহমদ ছফা বোধ করি মাত্র এই দুইটি তরল মুক্তাই পাইয়াছেন : ‘সর্বাঙ্গীন বিপ্লবের বোধিসত্ত্ব হয়ে লেনিন জন্মাতে চায় আরো একবার।’

লেনিন সঠিক জানে মানবিক সম্ভাবনার
অনন্যসম্ভবা বীজ শক্তির ভাণ্ডার তিনি,
মাটিই গন্তব্য তার। মাটির সে উর্বরতা আছে
নবজন্মে ঝলসে তোলা শুভ্রবুদ্ধ নবীন মানুষ।
(আহমদ ছফা ২০০০: ১০)

এই না হইলে আহমদ ছফা!

২১ জুন ২০১৭

দোহাই

১. আহমদ ছফা, ‘রোগশয্যায় বিরচিত,’ আহমদ ছফা রচনাবলি, ৪র্থ খণ্ড, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮), পৃ. ২১০-২১৪।
২. আহমদ ছফা, ‘এক সন্ধ্যার সংলাপ,’ আহমদ ছফা রচনাবলি, ৩য় খণ্ড, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮), পৃ. ৩৫১-৩৮১।
৩. আহমদ ছফা, ‘লেনিন ঘুমাবে এবার,’ আহমদ ছফার কবিতা (ঢাকা: শ্রীপ্রকাশ, ২০০০), পৃ. ৯-১১।
৪. আহমদ ছফা, ‘জনকের কবরে,’ মাসিক মোহাম্মদী, জ্যৈষ্ঠ ১৩৭১; সলিমুল্লাহ খান, ‘ইতিহাস কেন ইতিহাস নয়: দীনেশচন্দ্র সেনের বৃহৎ বঙ্গ অথবা নতুন মহাভারত প্রসঙ্গে,’ যুগান্তর, ঈদসংখ্যা, জুন ২০১৭ [সম্পূর্ণ উদ্ধৃত]।
৫. কাজী নজরুল ইসলাম, ‘আনোয়ার,’ নজরুল রচনাবলী, প্রথম খণ্ড, রফিকুল ইসলাম গয়রহ সম্পাদিত (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ২০০৬), পৃ. ৩৩-৩৬।
৬. ফররুখ আহমদ, ফররুখ আহমদ রচনাবলী, প্রথম খণ্ড, আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৫)।
৭. শামসুল আরেফীন, আহমদ ছফার অন্দরমহল (চট্টগ্রাম: বলাকা প্রকাশন, ২০০৪)।

প্রথম প্রকাশ: এনটিভি অনলাইন, ২৯ জুন ২০১৭।

আহমদ ছফার ঢাকা

‘সরকার প্রায় ত্রিশ বছর ধরে শহরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা—এসব অছিলায় ক্রমাগত বস্তি উচ্ছেদ করে যাচ্ছে। তারপরেও শহরে বস্তির সংখ্যা কমেনি বরং দিন দিন বাড়ছে।’—আহমদ ছফা

আমাদের দেশের লেখকদের মধ্যে আহমদ ছফার একটি বিশেষ স্থান আছে। সশরীরে জীবিত থাকিতেই তিনি একপ্রকারের কিংবদন্তীতে পরিণত হইয়াছিলেন। তিনি পরলোকে গিয়াছিলেন ইংরেজি ২০০১ সালের ২৮ জুলাই তারিখে। পরলোকগমনের পর—গত ষোল বছরে—তাঁহার চিন্তাধারা নতুন নতুন চিন্তার জন্ম দিয়া চলিয়াছে।

দেশের নতুন বুদ্ধিজীবীরা স্বীকার করিয়া বলিবেন, আহমদ ছফার সহিত তুলনা করা যায় এমন বুদ্ধিজীবী এ দেশে খুব কমই জন্মাইয়াছেন। অথচ এই দেশের আর পাঁচ লেখকের মতো তিনিও কবিতা দিয়াই শুরু করিয়াছিলেন। কিন্তু চিরদিন কবিতার মধ্যে পড়িয়া থাকা তাঁহার পক্ষে সম্ভব হয় নাই। ইংরেজি ২০০০ সনের গোড়ার দিকে প্রকাশিত ‘আহমদ ছফার কবিতা’ নামক একটি সংগ্রহ গ্রন্থের ভূমিকাচ্ছলে তিনি একপ্রস্ত কৈফিয়তও লিখিয়াছিলেন : ‘শুধু কবিতা নয়, যে সমস্ত রচনাকে সাহিত্য পদবাচ্য লেখা হিসেবে অনায়াসে চিহ্নিত করা সম্ভব, তার বাইরেও অনেক ধরনের লেখা আমার কলম থেকে জন্ম নিয়েছে। কখনো সামাজিক দায়িত্ববোধের তাগিদ, কখনো একটি নতুন বিষয়ের প্রতি অধিকার প্রসারিত করার প্রয়াস কিংবা কখনো ভেতরের তাপ-চাপের কারণে নতুন নতুন বিষয়ের ওপর আমাকে মনোনিবেশ করতে হয়েছে।’

বর্তমান নিবন্ধে আমিও মন দিতে চাই তাঁহার জীবনসায়াহ্নে মনোনিবেশ করা একটি বিষয়ের দিকে। পরলোকগমনের আগের বছর—মানে ইংরেজি ২০০০ সালের গোড়ার দিকে—আহমদ ছফা ‘বস্তি উচ্ছেদ সম্ভব নয়’ শিরোনাম দিয়া দুই কিস্তিতে একটি প্রবন্ধ অধুনালুপ্ত এক দৈনিকে পত্রস্থ করিয়াছিলেন। ঐ প্রবন্ধযোগে তিনি সরাসরি অভিযোগ করিয়াছিলেন, ‘বর্তমান সরকার [তখন দেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার] বস্তিবাসী মানুষের উপর শত্রুরাজ্যের মানুষের মত আচরণ করছে। এটা অন্যায়, এটা জুলুম।’ শুদ্ধমাত্র তাহাই নয়, তাঁহার এই অভিযোগে আরও একটি মাত্রা যোগ হইয়াছিল, ‘এই অন্যায় এবং জুলুমের বিরুদ্ধে এখানে কোন সংগঠিত রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রতিবাদ নেই। এটাই আমাদের রাজনীতির সবচাইতে বড় অপরাধ।’

এই নৈতিক প্রতিবাদ ছাড়াইয়া একটি বৈজ্ঞানিক বিচারও আহমদ ছফা হাজির করিয়াছিলেন। তিনি দেখাইয়াছিলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিটি সরকারের আমলেই পর্যায়ক্রমিকভাবে বস্তি উচ্ছেদের প্রক্রিয়া চলেছে। কিন্তু তারপরেও এ শহরে বস্তিবাসী মানুষের সংখ্যা কমেনি, বরং উত্তরোত্তর বেড়েছে।’ তিনি প্রশ্ন তুলিয়াছিলেন, কেন এই উচ্ছেদ, কি তাহার উদ্দেশ্য? আর সঙ্গে সঙ্গে লক্ষও করিয়াছিলেন, এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়াটি সফল হয় নাই। কি কারণে সফল হয় নাই তাহার একটা সহজ সূত্রও তিনি বাতলাইয়া দিয়াছিলেন : ‘কেন [বস্তির সংখ্যা] বাড়ছে আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা খুঁটিয়ে পর্যালোচনা করলে তার কারণগুলো জানা যাবে।’

তিনি ইঙ্গিত করিয়াছিলেন, ‘বস্তি-সমস্যা একা বাংলাদেশের সমস্যা নয়। তৃতীয় বিশ্বের যে সব দেশে দ্রুত নগরায়ন ঘটছে সে সব দেশে পাশাপাশি বস্তিও জন্ম নিচ্ছে। এটা একটা জবরদস্তি মূলক অর্থনেতিক ব্যবস্থার এপিঠ এবং ওপিঠ।’ অথচ বস্তি উচ্ছেদ করার সময় দেখানো হইয়াছিল অন্য কারণ। যে সকল কারণ দেখানো হইয়াছিল তাহাদের মধ্যে ছিল শহরের সৌন্দর্যহানির অজুহাত, ছিল শহরে দুষ্কৃতিকারীর সংখ্যাবৃদ্ধি ঠেকানো আর শহরে আইনশৃঙ্খলার ক্রমবর্ধমান অধঃপতন রোধ করা ইতি আদি। এক কথায় শহরকে ভদ্রলোকের বাসযোগ্য করার মহান ব্রত হইতেই এই সকল উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হইয়াছিল। কিন্তু আহমদ ছফা সাহস সঞ্চয় করিয়া বলিয়াছিলেন, ‘এগুলো আসল কারণ নয়’। তাঁহার বিচারে বস্তি উচ্ছেদের—বস্তিতে আগুন লাগাইয়া পুড়াইয়া ছারখার করিয়া দেওয়ার—আসল কারণ পাওয়া যাইবে অন্যত্র। তিনি লিখিয়াছিলেন, ‘বস্তিবাসীদের ছেড়ে দেয়া জমিজমা কারা অধিকার করছে, কাদের দখলে যাচ্ছে—সেটাই দেখার বিষয়।’

নবীন বয়সে আহমদ ছফা এক জায়গায়—খুব সম্ভব ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ নামক পুস্তিকার ভূমিকায়—লিখিয়াছিলেন, ‘সৎসাহসকে অনেকে জ্যাঠামি এবং হঠকারিতা বলে মনে করে থাকেন, কিন্তু আমি মনে করি সৎসাহস হলো অনেক দূরবর্তী সম্ভাবনা যথাযথভাবে দেখতে পারার ক্ষমতা।’ এই উক্তি ১৯৭২ সালের। আর ২০০০ সালে আসিয়াও সমান সৎসাহসের সহিত তিনি উচ্চারণ করিয়াছিলেন, ‘বস্তির মানুষের ঢাকা শহরে বসবাস করার অধিকার ন্যায়ত রয়েছে।’

ঢাকা শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণীভুক্ত বুদ্ধিজীবীরা হয়তো এই ধরনের উচ্চারণের পরিচয় বিশেষ রাখেন না। তাঁহাদের অনেকেই বলিয়া থাকেন, বস্তিগুলি উচ্ছেদ করাই ভালো, তাহাতেই দেশের মঙ্গল। তাহাতে শহরের চেহারা ভালো দেখায়, রোগবালাই কমিয়া যায়, দেশের ও দশের উন্নতি হয়। কিন্তু কেন এত উজাড়ের সঙ্গীত, এত উচ্ছেদের মহাকাব্য সত্ত্বেও বস্তির সংখ্যা কমে নাই, বরং দিনদিন বাড়িয়াছে সে প্রশ্নের জবাব তাহাদের ঝোলায় নাই। বস্তির জীবন এমন মানবেতর, এত নির্মম, এত কল্পনাতীত, আর অবর্ণনীয়—তবু বছরের পর পর মানুষ কেন দলে দলে বস্তির জীবন বাছিয়া লইতেছে—এই ভদ্রমহোদয়ের সে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিবার অবকাশ খুব অল্পই হয়।

আহমদ ছফার এই প্রশ্নেও একটি সাফ জবাব আছে। তিনি লিখিয়াছেন, ‘শহরগুলো যত প্রসারিত হচ্ছে, অট্টালিকার সংখ্যা যত বাড়ছে, রাস্তাঘাট যত চকচকে এবং সুন্দর হচ্ছে গ্রামাঞ্চলের নিঃস্বতা ও দরিদ্রতা যে পরিমাণে বাড়ছে।’ এই প্রক্রিয়া ইতিহাসের ফলাফল—এ সত্যে সন্দেহ নাই। কেহবা ভুলক্রমে ইহাকে প্রকৃতির অনিবার্য নিয়ম বা নিয়তি বলিয়াও প্রচার করিয়া থাকেন। এই প্রকৃতিরই অপর নাম সচরাচর দেয়া হয় অর্থনীতি। মার্কিনদেশের এক রাষ্ট্রপতি একদা নির্বাচনে পরাজিত হইয়া বলিয়াছিলেন ‘ইট্স দি ইকোনমি, স্টুপিড’—অর্থাৎ ‘এই গাধা, আসল কারণ অর্থনীতি, বুঝিলি না!’

আর ইহার সহিত যুক্ত হইয়াছে মানুষের লীলা, যাহার চলিত পরিভাষা ‘রাজনীতি’। গ্রাম হইতে মানুষের সন্তানদের দলে দলে শহরে আসিয়া ভিড় করিবার আরেক কারণ আমাদের এই রাজনীতি বা রাষ্ট্রনীতি। আহমদ ছফা লিখিতেছেন, ‘দরিদ্র-মানুষদের দেখিয়ে প্রতিবছর যে পরিমাণ টাকা আমরা—দান এবং ভিক্ষা ইত্যাদির আকারে—এনে থাকি তার সিংহভাগ এ শহরগুলোর চাহিদা মেটাতে ব্যয় হয়, গ্রামের জীবন-ব্যবস্থা অসহনীয় হয়ে দাঁড়ায়। কিছুসংখ্যক মানুষের পক্ষে গ্রামে জীবনযাপন একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনিবার্যভাবে তাদের শহরে আসতে হয়।’ যে কাজের আশায় তাহাদের শহরে আসা সে কাজ জোটে না তাহাদের। আর যে গ্রাম হইতে আসা সে গ্রামে ফিরিয়া যাইবারও পথ থাকে না। একদা আহমদ ছফা নিজেই লিখিয়াছিলেন, ‘শিশু কি কখনো যায় মাতৃজরায়নে?’

এই তো গেল জাতীয় অর্থনীতি ও শ্রেণীবিভক্ত রাজনীতির কথা। কিন্তু ন্যায়নীতি বলিয়া একটা কথাও তো আছে। এই প্রশ্নেও আহমদ ছফার যুক্তি অটল : ‘শহরে না এসে বাবা-পিতামহের ভিটিতে জীবন কাটাতে পারলে এ মানুষগুলো নিজেদের ভাগ্যবান মনে করত। কিন্তু সে ভাগ্য নিয়ে তাদের জন্ম হয়নি, তাদের শহরে আসতে হয়। শহরে আসার অধিকার তাদের আছে, তাদের দেখিয়ে যে অর্থ প্রতিবছর আসে তার বিরাট একটা অংশ শহর খেয়ে ফেলে—সুতরাং শহরে যে অর্থনৈতিক কর্মপ্রবাহ চলে তাতে তাদের একটা ন্যায্য হিস্সা রয়েছে। নৈতিক মানদণ্ডে বিচার করলে একথা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।’

যে কেহ জিজ্ঞাসা করিতে পারেন এই নৈতিক মানদণ্ড জিনিশটি ঠিক কি পদার্থ। এই জিজ্ঞাসারও একটা উত্তর আহমদ ছফা দিয়াছিলেন। তিনি স্মরণ করাইয়া দিয়াছিলেন, স্বাধীনতা লাভের তিরিশ বছরের মধ্যে ‘ঢাকা শহরের স্ফীতি একশ গুণকেও ছাড়িয়ে গেছে।’ এই প্রক্রিয়া নির্দোষ ছিল না। একটা প্রমাণের ইশারা আহমদ ছফা করিয়াছিলেন এইভাবের : ‘এরশাদ আমলের ভূমিরাজস্ব মন্ত্রী শেখ শহীদ সংসদে দাঁড়িয়ে একটি কথা কবুল করেছিলেন। সরকার যে সমস্ত জমি ইতিপূর্বে হুকুম দখল করে নিয়েছে শতকরা চুয়ান্ন ভাগ মানুষ সে সকল জমির কোন ক্ষতিপূরণ পায়নি। আর হুকুম দখল করার সময় সরকার জমির যে মূল্য ধার্য করেছিল তা আসল মূল্যের চাইতে অনেক কম। পরে যখন সরকার এই জমি প্লট ভাগ করে বিক্রি করে তখন জমির যা দাম হওয়া উচিত ছিল তার চাইতে অনেক কমদামে সে জমি সুবিধাভোগী মানুষদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে। অদ্যাবধি এ পদ্ধতি প্রয়োগ করে গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরা—এ সমস্ত এলাকায় বিশেষভাবে রাজনৈতিক অনুগ্রহপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্লট বণ্টন করা হয়ে থাকে।’

বস্তি সমস্যার গোড়ায় হাত না দিয়া যে সকল মনীষী শুদ্ধমাত্র বস্তি উজাড় বা উচ্ছেদ করার পরামর্শ দিয়া থাকেন আহমদ ছফা কখনোই তাঁহাদের পাতের লবণ খান নাই। তবে এই মনীষীরা মনে করিতেন তিনি তাঁহাদের বাড়া ভাতে ছাই দিতেছিলেন। তাঁহাদের ভ্রুকুটির মুখে দাঁড়াইয়া তিনি যতদূর পারেন সমস্যার গোড়ায় হাত দিয়াছিলেন। তাঁহার দৃষ্টিতে সমস্যার গোড়া আমাদের জাতীয় রাষ্ট্র-ব্যবস্থায়—বিশেষ বলিতে ভূমি-ব্যবস্থায় পোঁতা। তিনি অকপটে উচ্চারণ করিয়াছিলেন, ‘যে শহরে বিশ লাখ মানুষ বস্তিতে থাকে, দশ লাখ লোক রাস্তায় ঘুমায়, যেই শহরে হাতে গোনা দশ হাজার মানুষ আলিশান জমকালো অট্টালিকা তৈরি করে—তের ভাগ মানুষ হাতে আটাত্তর ভাগ জমি কব্জা করে নেয়—তার চাইতে বড় অন্যায় আর কিছু হতে পারে না। সরকারী এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার এই অন্যায় ব্যবস্থাটি তৈরি করা হয়েছে।’ তাঁহার দৃষ্টিতে এই অন্যায় ব্যবস্থার একটা রূপ এইরকম : ‘ঢাকা শহরে জমির পরিমাণ লোকসংখ্যার তুলনায় নিতান্তই স্বল্প। অথচ এখানে এক বিঘা, দুই বিঘা প্লটের উপর বাড়ি তৈরি করে জমির সদ্ব্যবহার রোধ করা হয়।’

সঙ্গত কারণেই তিনি সিদ্ধান্ত করিয়াছিলেন দেশের ভূমি-ব্যবস্থায় একটা বৈপ্লবিক সংস্কার ছাড়া সমস্যার সমাধান হইবে না। কিন্তু সে দিল্লি দূর অস্ত বলিয়া তিনি—বৈপ্লবিক সংস্কারের আশা-ভরসা একপাশে সরাইয়া—শুদ্ধমাত্র একটা মামুলি গণতান্ত্রিক সংস্কারের কথা উঠাইতে চাহিয়াছিলেন। বলিয়াছিলেন, ‘মামুলি গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রশ্ন উঠলেও ঢাকা শহরের ভূমি বণ্টন-ব্যবস্থার মধ্যে একটা চূড়ান্ত ভাঙ্গচুর হওয়া উচিত।’ আহমদ ছফার শেষ কথা ছিল এই : ‘বস্তির লোকদের উচ্ছেদ করে ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য করে তোলা কোনদিন সম্ভব হবে না। ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য ঢাকা শহরের ভূমি-বণ্টন-ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। যে তের শতাংশ মানুষের দখলে আটাত্তর শতাংশ জমি চলে গেছে তার মধ্যে যদি পরিবর্তন আনা সম্ভব না হয় ঢাকা শহর একটি নরককুণ্ডে পরিণত হতে বাধ্য হবে।’

আজিকালি কিছু কিছু বুদ্ধিজীবী বাহির হইয়াছেন যাঁহারা ভূরি প্রচার করিতেছেন একবিংশ শতাব্দীতে কার্ল মার্কস অপ্রাসঙ্গিক হইয়া গিয়াছেন। ইঁহারা আর আহমদ ছফাকেই বা পাত্তা দিবেন কেন। মাত্র একটা কথা মনে রাখিতে হইবে, কার্ল মার্কস ধনতন্ত্রের উৎপত্তি ও বিস্তার কিভাবে হয় তাহার নিয়মাবলি আবিষ্কার করিয়াছিলেন। সে আবিষ্কার রাতারাতি মিথ্যা হইয়া যায় নাই। আহমদ ছফার লেখা পড়িলেও সেই সত্যই নতুন করিয়া চোখের সামনে হাজির হয়।

২৭ জুলাই ২০১৭

দোহাই

১. আহমদ ছফা, ‘বস্তি উচ্ছেদ সম্ভব নয়’, আজকের কাগজ, ১৪ এপ্রিল ২০০০ এবং ২৮ এপ্রিল ২০০০।
২. আহমদ ছফা, আহমদ ছফার কবিতা (ঢাকা : শ্রীপ্রকাশ, ২০০০)।
৩. আহমদ ছফা, বুদ্ধি বৃত্তির নতুন বিন্যাস (ঢাকা : প্রকাশ ভবন, ১৩৭৯) ।

 

প্রথম প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০১৭, এনটিভি অনলাইন।

সলিমুল্লাহ খান বক্তৃতামালা ৪

সলিমুল্লাহ খান বক্তৃতামালা ৩

 

 

সলিমুল্লাহ খান বক্তৃতামালা ২

সলিমুল্লাহ খান বক্তৃতামালা ২