কাজির বিচার

সাহিত্যের ব্যবসায়ে নামিবার একেবারে গোড়াতেই যাঁহার সাহচর্য লাভ করিয়া কাজী নজরুল ইসলাম ‘বিশেষ লাভবান’ হইয়াছিলেন তাঁহার ভালো নাম মুজফ্ফর আহমদ । উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে লেখা কথা দুটি সুশীলকুমার গুপ্ত মহাশয়ের। তাঁহার বাক্য আরও দুই প্রস্ত উদ্ধার করিলে অন্যায় হইবে না। গুপ্ত মহাশয় প্রকাশ করিতেছেন:

‘মুজফ্ফর আহমদ শুধু একজন জনগণ-বন্ধু ও প্রসিদ্ধ শ্রমিক নেতাই নন, তাঁর মত সাহিত্যপ্রাণ ও দরদী বন্ধু সত্যই দুর্লভ। এ কথা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, মুজফ্ফর আহমদের বৈপ্লবিক আদর্শে অনেকাংশে প্রেরণা গ্রহণ করে নজরুল অগি্নবীণা হাতে বাংলা কাব্যের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে আবির্ভূত হয়েছিলেন জাতীয় চারণের বেশে।’ [গুপ্ত ১৩৮৪ :২৯]

আর স্বয়ং মুজফ্ফর আহমদই লিখিয়াছেন, ‘নজরুল ইসলাম নিছক কবি ও সাহিত্যিক ছিল না।’ অর্থাৎ তাঁহার একটি ছকও ছিল। কি সেই ছকটি? এতদিনে সে ছকের কথা সবাই জানিয়া গিয়াছেন সন্দেহ নাই। কিন্তু তাঁহার জীবন প্রভাতে কেন, মধ্যাহ্নেও সে কথা সকলে জানিতেন কিনা সন্দেহ। মুজফ্ফর আহমদ জানাইতেছেন, ‘সে যে রাজনীতিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন সৈনিকও ছিল এ কথা তার কোনো কোনো সাহিত্যিক বন্ধু বুঝতে চাইতেন না। তাঁদের মধ্যে কবি শ্রীমোহিতলাল মজুমদারও ছিলেন।’ [আহমদ ১৩৬৬:২৪]

NazrulArmyনজরুল ইসলামের কবি প্রতিভা সম্বন্ধে মুজফ্ফর আহমদের একটা প্রস্তাব আছে। সেই প্রস্তাবানুসারে ‘কবিরূপী নজরুল’ ও ‘স্বাধীনতার সৈনিক নজরুল’—এই দুই নজরুলের সমন্বয় যেখানে হইয়াছিল সেখানেই তাঁহার কবি প্রতিভা আশ্চর্যরূপে বিকশিত হইয়াছিল। ১৯২০ সালের মধ্যভাগে [প্রথম সংখ্যার প্রকাশ ১২ জুলাই তারিখে] মুজফ্ফর আহমদ আর কাজী নজরুল ইসলামের যুগ্ম সম্পাদনায় সান্ধ্য দৈনিক ‘নবযুগ’ প্রকাশিত হইতে শুরু করে। পত্রিকার আয়ু দীর্ঘ হয় নাই—এ কথা সত্য, কিন্তু তাঁহার ছাপ দীর্ঘদিন থাকিয়া গিয়াছে। কারণের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁহার অনন্তগামী প্রতিভা। ‘বাঙলা দেশে নজরুলের মতো ভাগ্যবান কবি’ মুজফ্ফর আহমদের ধারণা ‘বোধ হয় আর কেউ জন্মাননি।’ তিনি লিখিয়াছেন :

মাসিক পত্রে মাত্র কয়েকটি কবিতা ছাপা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নজরুলের কবি খ্যাতি দেশময় ছড়িয়ে পড়ল। সে এক রকম রাতারাতি বাঙলার খ্যাতিমান কবিদের সঙ্গে আসন পেয়ে গেল। রবীন্দ্রনাথ তখন জীবিত, তাঁর প্রতিভা দিকে দিকে বিকীর্ণ। নজরুলের কণ্ঠে তখন গীত হচ্ছিল রবীন্দ্র সঙ্গীত! প্রসিদ্ধ রবীন্দ্র সঙ্গীত গায়ক শ্রীহরিদাস চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে সে তখন পরিচিত হয়েছে এবং তাঁর সঙ্গে একত্রে গানও গাইছে। সে মুখে আবৃত্তি করছে রবীন্দ্রনাথের কবিতা। এমন কি রবীন্দ্র কবিতার প্যারোডি ক’রে সে ‘নবযুগ’-এর হেডিং পর্যন্ত দিচ্ছে। যেমন—
আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার
পরান সখা ফৈসুল হে আমার।
ফৈসুল [ওরফে ফয়সাল] ইরাকের রাজা ছিলেন। এই নজরুল, বাইশ বছরের যুবক হঠাৎ কিনা রচনা করল এমন সব কবিতা যে সব সম্পূর্ণরূপে রবীন্দ্র প্রভাবমুক্ত, যে সব সম্পূর্ণরূপে তার একান্ত নিজস্ব। তাই তো সে রাতারাতি কবি প্রসিদ্ধি লাভ করত পারল।’ [আহমদ ১৩৬৬: ২৪-২৫]

প্রশ্ন হইতেছে: কি যাদু বলে নজরুল ইসলাম রবীন্দ্র প্রভাবের বাহিরে দাঁড়াইয়া থাকিতে পারিলেন? ইহার একপ্রস্ত জবাব—আমরা আগেই ইশারা করিয়াছি—মুজফ্ফর আহমদ লিখিয়াছেন। পড়ি তাঁহার বাক্যে: ‘এই সাহিত্যিক বন্ধুদের [ইঁহাদের মধ্যে কবি মোহিতলাল মজুমদারও ছিলেন] এটা লক্ষ করা উচিত ছিল যে কেন ‘নবযুগ’-এ কাজ করার সময়ে নজরুলের কবি প্রতিভা এমন আশ্চর্যরূপে বিকশিত হয়েছিল। এখানে দুই নজরুলের সমন্বয় ঘটেছিল—কবিরূপী নজরুলের ও স্বাধীনতার সৈনিক নজরুলের। তাই নজরুল এই সময়ে কবিতার এমন বিচিত্র সৃষ্টি করতে পেরেছিল, যে সৃষ্টি তার অভিনবত্বে সমস্ত দেশকে চমকে দিল।’ [আহমদ ১৩৬৬:২৪]

নজরুল ইসলামকে যাঁহারা গোড়াতেই ভুল বুঝিয়াছিলেন তাঁহাদের আদর্শ বা নমুনা [যাহাই বলুন] ছিলেন মোহিতলাল মজুমদার। মোহিতলাল মজুমদারের সহিত নজরুল ইসলামের তুলনা করিয়াছেন মুজফ্ফর আহমদ। মোহিতলালের যে ছবি মুজফ্ফর আহমদ আঁকিয়াছেন তাহা খুটাইয়া দেখিলে তাঁহাকে বিলক্ষণ চেনা যায়। ‘মুখচেনা বুদ্ধিজীবী’ পরিচয়ে। ‘মুখচেনা বুদ্ধিজীবী’ কথাটা আমি এস্তেমাল করিতেছি ইতালীয় বুদ্ধিজীবী মহাত্মা আন্তনিয়ো গ্রামসির লেখা হইতে। ‘মুখচেনা’ শব্দের ইংরেজি তর্জমা ‘ট্র্যাডিশনাল’। মোহিতলালকে তাই ‘মুখচেনা বুদ্ধিজীবী’ বলিতে বিশেষ অন্যায় নাই। বিশেষত মুজফ্ফর আহমদ লিখিয়াছেন:

মোহিতলাল ছিলেন অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক লোক। তাঁর পরিচয়ের পরিধি ছিল অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। অল্পসংখ্যক সাহিত্যিক ও সাহিত্যরসিক লোকের সঙ্গেই তিনি শুধু মেলামেশা করতেন। তার বাইরে তাঁর পরিচয় ছিল তাঁর স্কুলের ছাত্র ও শিক্ষকদের সঙ্গে। তিনি ছিলেন হাইস্কুলের হেড মাস্টার। এক সময়ে তিনি বন্দোবস্ত বিভাগের কানুনগো ছিলেন। সেই সময়ে সাধারণ মানুষদের সঙ্গে তাঁর কিছু সংযোগ ঘ’টে থাকবে, তার পরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার আর কোনো সংযোগ ছিল না। তাঁর মধ্যে পসন্দ-অপসন্দের মনোভাব এত প্রবল ছিল যে, সাহিত্যিকদের মধ্যেও বেশীর ভাগ লোকের সঙ্গে তিনি মিশতে পারতেন না। [আহমদ ১৩৬৬: ৪৬]

আর নজরুল ইসলাম ছিলেন, মুজফ্ফর আহমদের বিচারে, ‘মোহিতলালের সম্পূর্ণ উল্টা’। আমরা সেই হিসাবে নজরুল ইসলামকে জনসাধারণের পরমাত্মীয় বা ‘আত্মার আত্মীয়’ বুদ্ধিজীবী বলিতে পারি। ‘আত্মার আত্মীয়’ কথাটা এখানে আমি আন্তনিয়ো গ্রামসি প্রবর্তিত ‘অর্গানিক’ শব্দের কাজ চালাইবার যোগ্য তর্জমারূপে গ্রহণ করিতেছি। মুজফ্ফর আহমদের সাক্ষ্যও আমার এই প্রস্তাবের পথ পরিষ্কার করিয়াছে। তিনি লিখিয়াই গিয়াছেন, ‘সকল স্তরের লোকের সঙ্গে তার মতো ব্যাপক পরিচয় কম লোকেরই ছিল। যাঁরা নজরুলের কবিতা বোঝেননি তাঁরা তার কবিতার সুর, ধ্বনি ও ছন্দ ঝঙ্কারে মুগ্ধ হয়েছেন। তাই হয়ে তাঁরা আরও বেশি তার কবিতা শুনতে চেয়েছেন; অশিক্ষিত সাধারণকেও নজরুল তার গানের দ্বারা আকর্ষণ করেছে। সে শুধু গায়ক ছিল না হাজার হাজার গানের সে রচয়িতাও। এই কারণে নজরুল সর্বস্তরের মানুষের—বহু মানুষের কবি হতে পেরেছেন। আর মোহিতলাল শুধু বিদগ্ধ সমাজের অর্থাৎ গণিতসংখ্যক মানুষের কবি। [আহমদ ১৩৬৬: ৪৭]

মুখচেনা বা গণিত বুদ্ধিজীবীর সহিত গণদেবতা বা পরমাত্মীয় বুদ্ধিজীবীর যে ভেদ মোহিতলালের সহিত নজরুলের ভেদও ছিল সেই গোছেরই। মুজফ্ফর আহমদই তাহা পরিষ্কার করিয়া বলিয়াছেন। আমরা পড়িতেছি: ‘নজরুল জনগণের প্রতিনিধি ছিল। মোহিতলাল তা ছিলেন না এবং চেষ্টা করলেও তাঁর স্বভাবের দোষে তিনি তা হতে পারতেন না। অত্যন্ত খোলাখুলিভাবে নজরুল ছিল দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন সৈনিক। এখানেও তার সঙ্গে মোহিতলালের বিরাট পার্থক্য ছিল। রুশিয়ার সর্বহারা বিপ্লবকে নজরুল মনে-প্রাণে সমর্থন করেছে, নানাভাবে সে-বিপ্লবের বন্দনা সে করেছে। এই ব্যাপারেও তার সঙ্গে মোহিতলালের মিল ছিল না।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৪৭]

‘মোহিতলাল মজুমদার নজরুল ইসলাম সম্বন্ধে স্নেহান্ধ ছিলেন। খুব ঘনিষ্ঠভাবে মিশেও তিনি নজরুলের স্বভাব কেন যে বোঝেননি তা ভেবে আজও আমি আশ্চর্য হয়ে যাই’—এই আক্ষেপও করিয়াছেন মুজফ্ফর আহমদ। [আহমদ ১৩৬৬: ৪৭-৪৮]

মোহিতলালের ভুলটা কোথায় তাহাও দেখাইয়া দিয়াছেন মহান মুজফ্ফর আহমদ। লিখিয়াছেন, ‘তিনি প্রাণপণে নজরুলকে নিজের আকৃতিতে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে থাকলেন। এই ভাবে গঠিত হওয়ার মানে আত্ম-বিলুপ্তি। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কোনও ব্যক্তি কি তা সহ্য করতে পারে?’ [আহমদ ১৩৬৬: ৪৯]

শুদ্ধ কি তাহাই? ‘মোহিতলাল নজরুলকে শেলি, কীট্স, বায়রন আর ব্রাউনিং পড়তে বলতেন তার ‘বুদ্ধির দীপায়নের জন্যে’। দূরে থেকে যাঁরা শুনবেন তাঁরা বলবেন ভালোই তো বলতেন মোহিতলাল। কিন্তু নজরুলের জন্যে বিদেশি কবিদের কাব্য চর্চার প্রয়োজন ছিল কি? সে ছিল আমাদের দেশের মাটির সন্তান। দেশের মাটি হতেই রস গ্রহণ করত সে। মাটির কাছাকাছি যে কবির বাণী শোনার জন্যে রবীন্দ্রনাথ কান পেতে ছিলেন নজরুল ছিল সেই কবি।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৪৯]

মোহিতলাল মজুমদারের কথা এতখানি জুড়িয়া বলিবার আরও একটা কারণ আমার মাথায় আছে। এই কারণের নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মুজফ্ফর আহমদ আক্ষেপ করিয়াছেন খুব ঘনিষ্ঠভাবে মিশিয়াও মোহিতলাল নজরুল ইসলামকে অথবা বলা যাউক তাঁহার স্বভাবকে বুঝিতে পারিলেন না। তাহা হইলে কে তাহাকে বুঝিতে পারিয়াছিলেন? মুজফ্ফর আহমদ উত্তরে বলিয়াছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ’। মুজফ্ফর আহমদ প্রাতঃস্মরণীয় মহাপুরুষ। আমরা সবিনয়ে নিবেদন করিব তাঁহার এই উত্তরটি কিন্তু অসত্য, বড় জোর অর্ধসত্য। তাঁহার আপনকার কথাই তাঁহার ধারণাকে অসত্য প্রমাণ করিতেছে।

মুজফ্ফর আহমদ লিখিয়াছেন, ‘কিন্তু রবীন্দ্রনাথ দূরে থেকেও নজরুলকে বুঝেছিলেন।’ প্রমাণ? তিনি নিবেদন করিতেছেন, ‘কবি রূপে প্রথম পরিচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নজরুল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করেছিল এবং তার স্নেহও সে পেয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ তাকে শান্তিনিকেতনে থাকার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, নজরুল ছেলেদের কিছু কিছু ড্রিল শেখাবে। আর দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিকটে গান শিখবে।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৪৮]

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নজরুলকে গান শিখাইতে চাহিয়াছিলেন। ইহাতে স্নেহের প্রমাণ অকাট্য। কিন্তু তাঁহার সব্যসাচী প্রতিভার মধ্যে শুদ্ধ ড্রিল শিখাইবার দক্ষতাই জ্যেষ্ঠকবির দৃষ্টি কাড়িয়াছিল ভাবিতে গা ছমছম করে। আজও করে। শান্তিনিকেতনে নজরুলকে কি একটি বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান যাইত না? ১৯৩৫ সালে কাজী আবদুল ওদুদকে কি নিজাম বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রণ করা হয় নাই? কথা বাড়াইলে আরও বাড়াইতে পারি। কিন্তু বাড়াইবার সময় আসে নাই।

Nazrul_at_Sitakunda_1929মুজফ্ফর আহমদ কহিতেছেন, ‘এই সময়েই রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁচার কথাটা বলেছিলেন। তিনি সম্ভবত নজরুলের কাব্য-সাধনা ও রাজনীতিক সংগ্রামে সমন্বয়ের চেষ্টা দেখে এই কথাটি ব’লে থাকবেন।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৪৮]

তলোয়ার দিয়া দাড়ি চাঁছিবার গল্পটি এতদিনে পুরাতন হইয়া গিয়াছে। তথাপি তাঁহার তাৎপর্য এখনও তাজাবতাজা রহিয়াছে বলিয়া ভ্রম হয়। কথাটি নানান জনে নানান ভাবে বয়ান করিয়াছেন। একটা বয়ান পাওয়া যাইতেছে সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়ের লেখায়। তাঁহার লেখার কিছু অংশ সুশীলকুমার গুপ্ত উদ্ধার করিয়াছেন। নিবেদন করি:

‘জোড়াসাঁকোর বাড়িতেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাবার সময় তেমন-তেমন বড়লোককেও সমীহ করে যেতে দেখেছি, অতি বাকপটুকেও ঢোক গিলে কথা বলতে শুনেছি। কিন্তু নজরুলের প্রথম ঠাকুরবাড়িতে আবির্ভাব সে যেন ঝড়ের মত। অনেকে বলত, তোর এসব দাপাদাপি চলবে না জোড়াসাঁকোর বাড়িতে, সাহসই হবে না তোর এমনিভাবে কথা কইতে। নজরুল প্রমাণ করে দিলে যে সে তা পারে। তাই একদিন সকালবেলা “দে গরুর গা ধুইয়ে” এই রব তুলতে তুলতে সে কবির ঘরে গিয়ে উঠল। কিন্তু তাকে জানতেন বলে কবি বিন্দুমাত্রও অসন্তুষ্ট হলেন না। শুনেছি অনেক কথাবার্তার পর কবি নাকি বলেছিলেন, “নজরুল, তুমি নাকি তরোয়াল দিয়ে আজকাল দাড়ি কামাচ্ছ—ক্ষুরই ও-কার্যের জন্যে প্রশস্ত—এ কথা পূর্বাচার্যগণ বলে গেছেন”।’ [গুপ্ত ১৩৮৪: ৩০; চট্টোপাধ্যায় ১৩৫১: ৩৮]

এ বিষয়ে মুজফ্ফর আহমদের ভাষ্য এই রকম: ‘রবীন্দ্রনাথ একবার নজরুলকে তলওয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁচার কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন তিনি সত্যই। কিন্তু কথাটা নানান জনে নানানভাবে লিখেছেন। সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরও এক জায়গায় কথাটা লিখেছেন। আমি নজরুলের মুখে যা [শুনেছিলেম] তা হচ্ছে এই যে, সাক্ষাতের প্রথম দিনেই রবীন্দ্রনাথ কথাটা নজরুলকে বলেছিলেন। তখনও তিনি ভাবেননি যে, নজরুল গভীরভাবে রাজনীতিক সংগ্রামে বিশ্বাসী। নজরুল কবি, কাব্যচর্চাই তার পেশা হওয়া উচিত। তার মানে রাজনীতিতে তার যাওয়া উচিত নয়—এইসব ভেবেই তিনি তলওয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁচার কথাটা বলেছিলেন। অন্তত নজরুল তাই বুঝেছিল। রবীন্দ্রনাথ শুধু ওই কথা বলেই চুপ করে যাননি। তিনি তার সঙ্গে একটি প্রস্তাবও দিয়েছিলেন; বলেছিলেন, নজরুল শান্তিনিকেতনে চলুক। সেখানে সে ছেলেদের কিছু কিছু ড্রিল শেখাবে আর গান শিখবে দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে।’ [আহমদ ১৯৭৩ :২৪০]

‘কিন্তু’, মুজফ্ফর আহমদ দাবি করিতেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ পরে নজরুলের ঝোঁক ধরতে পেরেছিলেন। তাই নজরুল যখন ‘ধূমকেতু’ বার করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদ ভিক্ষা করেছিল তখন রবীন্দ্রনাথ তাকে রাজনীতিক আশীর্বাদই করেছিলেন। তার আশীর্বাণীর সেই ক’টি ছত্র অনেকেরই মুখস্থ। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন:

কাজী নজরুল ইসলাম
কল্যাণীয়েষু,

আয় চলে আয়, রে ধূমকেতু,
আঁধারে বাঁধ অগি্নসেতু,
দুর্দিনের এই দুর্গশিরে
উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন!
অলক্ষণের তিলক রেখা
রাতের ভালে হোক না লেখা।
জাগিয়ে দে রে চমক মেরে’
আছে যারা অর্দ্ধচেতন!

শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

২৪ শে শ্রাবণ, ১৩২৯ [আহমদ ১৩৬৬: ৪৮]

‘ধূমকেতু’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা বাহির হইল ১৯২২ সালের ১২ আগস্ট তারিখে। [আহমদ ১৯৭৩: ২৪১] মুজফ্ফর আহমদ আরেক জায়গায়ও লিখিয়াছেন, “কিন্তু ‘ধূমকেতু’র জন্যে নজরুল যখন রবীন্দ্রনাথের নিকট হতে বাণী চাইল তখন তিনি তাকে বুঝে ফেলেছিলেন। তিনি বুঝে নিয়েছিলেন যে, সে নিজে যে-পথ বেছে নিয়েছে তাকে সেই পথে যেতে দিলেই সে বিকশিত হবে। তাই রবীন্দ্রনাথ যে-বাণী নজরুলকে পাঠিয়েছিলেন সেটা ছিল নজরুলের প্রতি তাঁর রাজনীতিক আশীর্বাদ।’ [আহমদ ১৯৭৩: ২৪০]

নজরুল ইসলামের ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতাটি ১৯২৬ কি ১৯২৭ সালে প্রকাশিত ‘সর্বহারা’ নামধেয় কাব্যগ্রন্থে পাওয়া যায়। সেই কবিতার সাক্ষ্য কিন্তু মুজফ্ফর আহমদের কথাটিকে সত্য প্রমাণ করে না।

‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতার গোড়ার দিকেই রবীন্দ্রনাথের কথা স্মরণ করিয়াছেন নজরুল ইসলাম। নজরুলের রাজনীতি ও জাতীয়তার সাধনা দুই বস্তুকেই যে বিচারের মুখোমুখি দাঁড়াইতে হইয়াছিল তাহার পুরানা পাথুরিয়া প্রমাণ পাওয়া যায় এই কবিতায়। যথা:

কবি-বন্ধুরা হতাশ হইয়া মোর লেখা প’ড়ে শ্বাস ফেলে!
বলে, কেজো ক্রমে হ’চ্ছে অকেজো পলিটিক্সের পাশ ঠেলে।
পড়ে না’ক বই, ব’য়ে গেছে ওটা।
কেহ বলে, বৌ-এ গিলিয়াছে গোটা।
কেহ বলে, মাটি হ’ল হয়ে মোটা জেলে ব’সে শুধু তাস খেলে!
কেহ বলে, তুই জেলে ছিলি ভালো ফের যেন তুই যাস জেলে!
গুরু ক’ন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা!
প্রতি শনিবারী চিঠিতে প্রেয়সী গালি দেন, ‘তুমি হাঁড়ি চাঁচা!’
আমি বলি, ‘প্রিয়ে, হাটে ভাঙি হাঁড়ি!’
অমনি বন্ধ চিঠি তাড়াতাড়ি।
সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে। হিন্দুরা ক’ন, ‘আড়ি চাচা!’
যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা!”

[ইসলাম ২০০৫: ৭১; ইসলাম ২০০৭: ২৩; ইসলাম ১৯৯৬ (১): ২৯২-২৯৩]

দেখা যাইতেছে তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছিবার কাজটা নজরুল ইসলাম চালাইয়া গেলেন, অন্তত বন্ধ করিলেন না। অথচ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজ গুণে তাঁহাকে বুঝিতে পারিয়া ‘রাজনীতিক আশীর্বাদ’ পাঠাইলেন। এখানেই প্রশ্ন তুলিবার একটুখানি অবসর আছে। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার রাজনীতিটা কি ছিল? খোদ মুজফ্ফর আহমদ এ ব্যাপারে কি বলেন?

মুজফ্ফর আহমদ নিজে কি ‘ধূমকেতু’র রাজনীতি সমর্থন করিতেন? এই প্রশ্নের উত্তরে আমাদের অবশ্যই বলিতে হইবে, ‘না’। এই ‘না’ উত্তরটি আরও বড় হইয়া বাজিবে যখন জানিব নজরুল ইসলাম একদা মুজফ্ফর আহমদের সহিত যুগ্ম সম্পাদকতা করিয়া ‘নবযুগ’ বাহির করিয়াছিলেন। আবার ১৯২৫ ও ১৯২৬ সাল নাগাদ প্রথমে ‘লাঙ্গল’ এবং পরে ‘গণবাণী’ বাহির করিয়াছিলেন তাঁহারা। গণ্ডগোলের মধ্যে ‘ধূমকেতু’। মুজফ্ফর আহমদের লেখা পড়িয়াই আমরা জানিয়াছি, “‘ধূমকেতু’তে জনগণের কথা একেবারেই বলা হতো না, এটা মোটেই ঠিক কথা নয়। তবে ‘ধূমকেতু’র মারফতে নজরুল মূলত তার আবেদন জানাচ্ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণীর শিক্ষিত তরুণদের বরাবরে। নিরুপদ্রব অসহযোগ আন্দোলনের খাতিরে বাংলার সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীরা তাঁদের কার্যকলাপ বন্ধ রেখেছিলেন। নজরুলের আবেদন আসলে পৌঁছে যাচ্ছিল তাঁদেরই নিকটে।” [আহমদ ১৯৭৩: ২৪১]

‘ধূমকেতু’ পত্রিকা বিষয়ে মুজফ্ফর আহমদের আরও কথা আছে। এই পত্রিকা, তাঁহার বিচারে, জনগণের নিকটে পৌঁছাইতে পারে নাই। মুজফ্ফর আহমদ জানাইতেছেন: “শিক্ষিত ভদ্রলোক শ্রেণীর ভিতরে তার প্রচার সীমাবদ্ধ ছিল। এখানেই ‘ধূমকেতু’ খুব বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীরাও এই শ্রেণীর লোক। কাজেই, নজরুলের আবেদনে তাঁরাই নূতন করে চেতনা লাভ করেছিলেন।” [আহমদ ১৯৭৩: ২৪১]

এই প্রস্তাবের সাফাই সাক্ষ্য দিবার ছলে মুজফ্ফর আহমদ আরও গাহিয়াছেন, ‘এটা আমার অনুমানের কথা নয়। শুধু যে তরুণেরা নজরুলের নিকট আসছিলেন তা নয়, সন্ত্রাসবাদী “দাদা”রাও [নেতারা] এসে তাকে আলিঙ্গন করে যাচ্ছিলেন। ১৯২৩-২৪ সালে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন আবার যে মাথা তুলল, তাতে নজরুলের অবদান ছিল। এ কথা বললে বোধ হয় অন্যায় করা হবে না। সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের দুটি বড় বিভাগের মধ্যে “যুগান্তর” বিভাগের সভ্যরা তো বলেছিলেন, “ধূমকেতু” তাঁদেরই কাগজ।’ [আহমদ ১৯৭৩: ২৪১-২৪২]

‘অনুশীলন’ দলের শ্রীঅতীন রায়চৌধুরীও ‘ধূমকেতু’কে অভিনন্দন জানাইয়াছিলেন। [আহমদ ১৩৬৬: ৮২] এককথায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশীর্বাদ—’জাগিয়ে দেরে চমক মেরে/ আছে যারা অর্দ্ধচেতন’—ফলিয়াছিল। তাহাতে নজরুলের লেখা পড়িয়া বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী যুবকেরা সত্যই চমকিয়া উঠিয়াছিলেন। [আহমদ ১৩৬৬: ৮৬] মুজফ্ফর আহমদ অকপট লিখিয়াছেন, ‘সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের প্রতি নজরুলের বড় আকর্ষণ ছিল।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৮২]

এক্ষণে প্রশ্ন হইতে পারে, কাজী নজরুল ইসলামের রাজনীতিটা কী বস্তু ছিল? ইহার উত্তর খানিক জোগাইয়াছেন মুজফ্ফর আহমদ। তিনি লিখিয়াছেন, ‘১৯২২ সালের ভদ্রশ্রেণীর মধ্যে যাঁরা রাজনীতি করতেন তাঁদের ধারণা ছিল যে, দেশের মুক্তি শুধু তারাই আনতে পারবেন, আর মজুর ও কৃষকেরা গড্ডলিকা প্রবাহের মতো তাঁদের অনুসরণ করবেন। যাঁরা রাজনীতি করতেন না তাঁরা তো মজুর-কৃষকের নাম শুনলেই নাক সিঁটকাতেন। আজ অবস্থায় বিপুল পরিবর্তন এসেছে। ভদ্রলোকেরা এখন মজুরে পরিণত হচ্ছেন। নজরুল ইসলামের চেতনায়ও পরিবর্তন এসেছিল। ১৯২২ সালের পরে মজুর, কৃষক ও জনগণকে বাদ দিয়ে নজরুলকে কল্পনা করাই যেত না।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৮৫]

নজরুল ইসলামের ‘ধূমকেতু’র সঙ্গে মুজফ্ফর আহমদের কোনো সাংগঠনিক যোগ ছিল না। ‘তার মানে’, মুজফ্ফর আহমদ লিখিতেছেন, ‘তার পরিচালনায় ও নীতিনির্ধারণে আমার কোনও হাত ছিল না।’ তবে তিনি হামিশা ‘ধূমকেতু’ অফিসে যাইতেন। অনেক সময় রাত্রে সেখানে বাসও করিতেন। তাহার পরও তিনি কবুল করিয়াছেন, ‘নজরুল যে শুধুই মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকদের নিকট তার আবেদন জানাচ্ছিল তার একটা উল্টো প্রতিক্রিয়া আমার ভিতরে হয়েছিল।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৮৩] সম্পাদকের নামেও গ্রেফতারি পরোয়ানা বাহির হইলে তখন মুজফ্ফর আহমদ নজরুল ইসলামকে রক্ষা করিতে আগাইয়া আসিলেন। পরোয়ানা জারি হইবার কয়েকদিন আগে হইতেই কয়দিন ধরিয়া কেবলই গুজব রটিতে লাগিল যে নজরুল ইসলামের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা বাহির হইবে। বন্ধুদের অনেকে বলিলেন নজরুল কিছুদিন সরিয়া থাকিলে ভালো হয়। মুজফ্ফর আহমদ লিখিয়াছেন, ‘আমি বললাম, “তুমি যদি সরেই থাকতে চাও তবে চেষ্টা করে দেখা যাক তোমায় মস্কো পাঠানো যায় কি না।” কমিউনিস্ট ইন্টরন্যাশনালে ভারতীয় ব্যাপারের যাঁরা চার্জে ছিলেন নজরুলের লেখার সংগ্রামশীলতা তাঁদের আকর্ষণ করেছিল। তাঁরাই জানিয়েছিলেন নজরুলকে একবার পাঠাতে পারলে মন্দ হয় না।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৮৬] নজরুল গা করিলেন না। গা ঢাকাও দিলেন না। কলিকাতা ছাড়িলেন, কিন্তু গেলেন কোথায়? মস্কো না, মাত্র কুমিল্লা।

শুধু এই কারণে নহে, আর আর পাঁচ কারণেও মুজফ্ফর আহমদ একটু চটিয়া ছিলেন। তাঁহার জবানীতেই শুনি সেই কাহিনী। তিনি লিখিতেছেন, ‘১৯২২ সালের নবেম্বর মাসে নজরুল আর আমি ঠিক করি যে, আমরা কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার কাজে এগিয়ে যাব। পড়াশুনা করব বলে সামান্য কিছু পুঁথিপুস্তকও কিনেছিলাম। এই ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে নজরুল তার ‘বিদ্রোহী’ লিখেছিল। কিন্তু ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নজরুল কুমিল্লায় চলে গিয়ে অনেক দিন সেখানে থাকল। সেই সময়ে চিঠিপত্রের ভিতর দিয়ে তার সঙ্গে আমার কিঞ্চিত চটাচটিও হয়ে গেল।’ [আহমদ ১৯৭৩: ২৪৮]

পরক্ষণেই মুজফ্ফর আহমদ লিখিতেছেন, ‘অবশ্য, এমন কোনো চটাচটি নয় যার জন্যে আমাদের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যাবে। কুমিল্লা গিয়ে নজরুল যে ‘প্রলয়োল্লাস’ লিখেছিল সেটা আমার দৃষ্টিতে ঠিকই ছিল। কিন্তু কলকাতায় ফিরে এসে ‘ধূমকেতু’তে লিখতে গিয়ে নিজের প্রচণ্ড আবেগের স্রোতে সে নিজেই ভেসে গেল। সে যে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার চেষ্টা করবে স্থির করেছিল তার সেই বিবেককে সে লাল পোশাক পরে, লাল কালিতে লিখে, এবং মাঝে মাঝে লাল নিশানের কথা বলে ঠিক রাখছিল।’ [আহমদ ১৯৭৩: ২৪৮]

এক্ষণে মুজফ্ফর আহমদ সিদ্ধান্ত টানিতেছেন। তাঁহার ধারণা, “কিন্তু নজরুল যদি গিরেফ্তার না হতো এবং তার ‘ধূমকেতু’ যদি চলতে থাকত তবে তার লেখা তাকে বদলাতে হতো। এই জাতীয় লেখা ক্রমাগত লেখা যায় না। ভিতরের আবেগ নিঃশেষ হয়ে আসে। তখন নজরুলকে জনগণের দিকেই ঝুঁকতে হতো।’ [আহমদ ১৯৭৩: ১৪৮]

মুজফ্ফর আহমদের এই অনুমান বা প্রার্থনা পুরাপুরি কল্পনার ফসল নহে আর মোহিতলাল মজুমদারের উপদেশও বৃথা যায় নাই। ‘পড়ে না’ক বই, বয়ে গেছে ওটা’—কথাটাও গোটা গোটা বেদবাক্য হয় নাই। শ্রমিকের ওপর লেখা ইংরেজ কবি শেলির কবিতা বা গানের ভাবানুবাদও নজরুল ইসলাম করিয়াছিলেন। ১৯২৭ সালের ৫ মে তারিখের ‘গণবাণী’ হইতে তাহার উদ্ধৃতি প্রকাশ করিয়াছেন মুজফ্ফর আহমদ। আমরাও তাহা এখানে আবার তুলিয়া দিতেছি।

ওরে ও শ্রমিক, সব মহিমার উত্তর-অধিকারী!
অলিখিত যত গল্প কাহিনী তোরা যে নায়ক তারি।।
শক্তিময়ী সে এক জননীর
স্নেহ সূত সব তোরা যে রে বীর।
পরস্পরের আশা যে রে তোরা,
মা’র সন্তাপহারী।।
নিদ্রোত্থিত কেশরীর মত
উঠ্ ঘুম ছাড়ি নব জাগ্রত!
আয় রে অজেয় আয় অগণিত দলে দলে মরুচারী।।
ঘুম ঘোরে ওরে যত শৃঙ্খল
দেহ মন বেঁধে করেছে বিকল,
ঝেড়ে ফেল সব, সমীরে যেমন ঝরায় শিশির বারি।
উহারা ক’জন? তোরা অগণন, সকল শক্তিধারী।।

[আহমদ ১৩৬৬: ৪৯]

নজরুল ইসলাম শ্রমিক শ্রেণীর আন্তর্জাতিক সঙ্গীতের যে বাংলা তর্জমা করিয়াছিলেন—জাগো অনশন-বন্দী, ওঠরে যত/ জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত!—তাহার তুলনা আজও নাই। আমাদের যুগের আরেক অমর গল্প-মহাত্মা ফ্রান্স ফানোঁ রচিত ‘লে দাম্নে দু লা তের’ [Les Damnés de la Terre] অনুবাদের শিরোনামায়ও নজরুলের অমর বাক্য ‘জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত’ নিয়োগ করা হইয়াছে। [ফানোঁ ১৯৮৮]

গত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের গোড়ার দিকে চীন দেশের নেতা জিয়াং জিয়েসি [Jiang Jieshi, ১৮৭৭-১৯৭৫] [তৎকালে ইঁহার নাম চিয়াং কাইশেক বলিয়া প্রচারিত হইত] ভারত সফরে আসিয়াছিলেন। তখন তাঁহার বন্দনার্থে একপ্রস্ত গান রচনার অনুরোধ গ্রামোফোন কোম্পানির তরফ হইতে করা হইল নজরুল ইসলামকে।

১৯৫৯ সালের স্মৃতিকথায় মুজফ্ফর আহমদ সে কথা স্মরণ করিয়া লিখিতেছেন, ‘আজ যে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে নজরুল হতবাক ও হৃত-সন্বিব্দৎ হয়েছে সে ব্যাধির আক্রমণ তখন তার শরীরে শুরু হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও নজরুল গান রচনা করেছিল।’ মুজফ্ফর আহমদের মন্তব্য: ‘এবং এই গানটি চিয়াং কাইশেকের বন্দনা নয়। যিনিই গানটি পড়বেন তিনি বুঝতে পারবেন যে তা আসলে চীন ও ভারতের নিপীড়িত মানুষের বন্দনা।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৭৪]

পুরো গানটি তুলিয়া দেওয়ার মতো। নজরুল রচনাবলীতেও এই গানটি সসম্মানে সংকলিত হইয়াছে। মুজফ্ফর আহমদ বলিয়াছেন, ‘এটি নজরুলের লেখা শেষতম গান কি-না তা বলা শক্ত, তবে তার শেষ লেখাগুলির মধ্যে এই গানটি যে অন্যতম তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৭৪]

চীন ও ভারতে মিলেছি আবার মোরা শত কোটি লোক।
চীন ভারতের জয় হোক! ঐক্যের জয় হোক! সাম্যের জয় হোক!
ধরার অর্ধ নর-নারী মোরা রহি এই দুই দেশে,
কেন আমাদের এত দুর্ভোগ নিত্য দৈন্য ক্লেশে,
সহিব না আর এই অবিচার, খুলিয়াছে আজি চোখ।।
চীন ভারতের জয় হোক! ঐক্যের জয় হোক! সাম্যের জয় হোক!

প্রাচীন চীনের প্রাচীর ও মহাভারতের হিমালয়
[আজ] এই কথা যেন কয়,
মোরা সভ্যতা শিখায়েছি পৃথিবীরে
ইহা কি সত্য নয়?
হইব সর্বজয়ী আমরাই সর্বহারার দল,
সুন্দর হবে, শান্তি লভিবে, নিপীড়িতা ধরাতল!
আমরা আনিব অভেদ ধর্ম নব বেদগাথা শ্লোক।।
চীন ভারতের জয় হোক! ঐক্যের জয় হোক! সাম্যের জয় হোক!

[আহমদ ১৩৬৬: ৭৪-৭৫; ইসলাম ১৯৯৬ [৩]: ৫৪৭-৫৪৮]

এই গানটির রচনাকাল, নজরুল রচনাবলী অনুসারে, ফেব্রুয়ারি ১৯৪২। শ্রীজগন্ময় মিত্র গ্রামোফোন কোম্পানির রেকর্ডে এই গানটি গাহিয়াছিলেন। [ইসলাম ১৯৯৬ (৩): ৫৪৮]

দোহাই

১. কাজী নজরুল ইসলাম, সঞ্চিতা, পুনর্মুদ্রণ [ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৫]।
২. কাজী নজরুল ইসলাম, সর্বহারা, পুনর্মুদ্রণ [ঢাকা: আগামী প্রকাশনী, ২০০৭]।
৩. কাজী নজরুল ইসলাম, নজরুল রচনাবলী, ১ম খণ্ড, আবদুল কাদির সম্পাদিত, সংশোধিত সংস্করণ, পুনর্মুদ্রণ [ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৬]।
৪. কাজী নজরুল ইসলাম, নজরুল রচনাবলী, ৩য় খণ্ড, আবদুল কাদির সম্পাদিত, সংশোধিত সংস্করণ, পুনর্মুদ্রণ [ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৬]।
৫. ফ্রাঞ্জ ফেনো, জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত, আমিনুল ইসলাম ভুঁইয়া অনূদিত [ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৮৮]।
৬. মুজফ্ফর আহমদ, কাজী নজরুল প্রসঙ্গে (স্মৃতিকথা), প্রথম সংস্করণ [কলিকাতা: বিংশ শতাব্দী প্রকাশনী, ১৩৬৬/১৯৫৯]।
৭. মুজফ্ফর আহমদ, কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা, পুনর্মুদ্রণ [ঢাকা : মুক্তধারা, ১৯৭৩]।
৮. সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়, ‘আমাদের নজরুল,’ কবিতা [কার্তিক-পৌষ, ১৩৫১]।
৯. সুশীলকুমার গুপ্ত, নজরুল-চরিতমানস, পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ [কলিকাতা: দে’জ পাবলিশিং, ১৩৮৪]।


প্রথম প্রকাশ: দৈনিক সমকাল

[দ্রষ্টব্য: মুজফ্ফর আহমদ নামের বানানে হ-এর নিচে হসন্ত হইবে। হসন্ত যোগে লিখিতে গেলে ছাপার সময় পরের অক্ষরের সহিত মিলিয়া যুক্তাক্ষরের রূপ গ্রহণ করিতেছে। এই অসুবিধা দূর করিতে এইখানে হসন্ত পরিহার করা হইয়াছে।–সম্পাদক]

Copyright 2012 Salimullah Khan

Spirit of liberation war

Translated by Tahmidal Zami

Recently a debate has cropped up over the finer points of the question what the spirit of liberation war really means. But I hope that no one would contest some very basic points. The most fundamental point would be ‘liberation’ or the right of any nation or people to self-determination as recognized by international law.

After the March 25 midnight, that is, in the early hours of March 26, Bangladesh practically declared independence. After two weeks, the provisional government was constituted. This very fact bears out that Bangladesh was not prepared – at least not completely – for proclamation of independence. This government known as Mujibnagar Government issued ‘the Proclamation of Independence’ on 10th day of April, 1971. Accepting this Proclamation of Independence as a document of evidence would resolve the debate over a few issues. The proclamation of 10th April was issued by and under the authority of Constituent Assembly of Bangladesh composed of representatives elected in the free elections held in Bangladesh from 7th December, 1970 to 17th January, 1971. The representatives were elected to the Pakistan National Assembly and East Pakistan Provincial Assembly.

I

The Proclamation of 10th April 1971 also offers an explanation of the reasons for which Bangladesh declared independence. According to this explanation, the representatives of Bangladesh did not proclaim independence spontaneously or unilaterally. They were compelled to proclaim independence, because ‘instead of fulfilling their promise and while still conferring with the representatives of the people of Bangladesh, Pakistan authorities declared an unjust and treacherous war.’

In the very Proclamation of 10th April it was stated that ‘Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, the undisputed leader of 75 million of people of Bangladesh, in due fulfilment of the legitimate right of self-determination of the people of Bangladesh, duly made a declaration of independence at Dacca on March 26, 1971, and urged the people of Bangladesh to defend the honour and integrity of Bangladesh.’ Unfortunately in the times that followed a few kicked off a controversy on the question of Proclamation of Independence. Has anyone so far challenged the authenticity of the Proclamation of 10th April? If not, the question follows: which particular points of the Proclamation are they challenging?

The question would arise: why was independence proclaimed in the night of 26th March? The Proclamation of 10th April provides an explanation of that as well. The Proclamation lays out the explanation in five points.

Firstly, ‘free elections were held in Bangladesh from 7th December, 1970 to 17th January, 1971, to elect representatives for the purpose of framing a Constitution [for Pakistan],’

Secondly, ‘at these elections the people of Bangladesh elected 167 out of 169 representatives belonging to the Awami League,’

Thirdly, ‘General Yahya Khan [the President of Pakistan] summoned the elected representatives of the people to meet on the 3rd March, 1971, for the purpose of framing a Constitution,’

Fourthly, ‘the Assembly so summoned was arbitrarily and illegally postponed for an indefinite period [by the Pakistani Authorities],’

And finally, ‘instead of fulfilling their promise and while still conferring with the representatives of the people of Bangladesh, [the] Pakistan authorities declared an unjust and treacherous war.’

স্বাধীনতার ঘোষণা স্বাধীনতার ঘোষণা

What has been said so far – that is, ‘an unjust and treacherous war’ prosecuted by Pakistan – was the necessary and sufficient reason behind Bangladesh’s proclamation of independence. Pakistani authorities did not stop at mere declaration of war. From the midnight of 25th March, they began ‘continuously committing numerous acts of genocide and unprecedented tortures, amongst others on the civilian and unarmed people of Bangladesh.’

It was owing to Pakistan’s imposition of the unjust war and committing acts of genocide and other forms of repression that Bangladesh declared independence and the representatives of the people of Bangladesh issued the Proclamation of Independence. Through this proclamation, they laid down the lawful basis of a just war. In looking back, it therefore can be said that in response to the war, genocide, and repression waged by Pakistani authorities, the people of Bangladesh began the war of liberation to establish their effective control over the territories of Bangladesh. In this war, the critical asset of the people was their ‘heroism, bravery and revolutionary fervour’.

II

What has been said so far, i.e. just war in the face of unjust war – is only half of the truth. The question would arise: what would be the vision of the state that would be established through the just war? The Proclamation of 10th April offers an answer also to this question. The Proclamation stated that the reason that held universal sway in establishing People’s Republic of Bangladesh was ‘to ensure for the people of Bangladesh equality, human dignity and social justice’.

The people of Bangladesh engaged in armed struggle to establish effective control over the territories of Bangladesh. The unconditional surrender of Pakistani authorities on 16th December, 1971 made that control definitive. The liberation war of Bangladesh achieved victory. The spirit that inspired all classes of people of Bangladesh from 26th March to 16th December, 1971 – which finds its expression in the Proclamation of 10th April – is precisely the spirit of liberation war.

After gaining the legitimate right of national self-determination, i.e. independence, we still have to draw up the balance sheet to see what we have achieved. Why was martial law clamped over the country within four years of independence? We must ask this question. Why those who were the elected representatives of the people’s assembly or National Parliament for the four years could not exercise their ‘heroism, bravery and revolutionary fervour’ to establish their control in resisting martial law? This is another question to ask.

Since then, 15 years passed under military rule in one form or another. Since 1990 – excluding two years – legitimate system of government has been reinstated. But has there been any salving of the people’s misery and suffering? Have ‘equality, human dignity and social justice’ been established? If not, who is responsible for the lapse? The spirit of the liberation war lies not in evading these questions, but in asking them.

Pakistan became ‘independent’ on the 14th August, 1947. A little over ten years inside independence, i.e. on 27th October, 1958, military rule was thrust upon the country for the first time. In late 1964, Dr. Muhammad Shahidullah, keeping the chain of events in mind, wrote: ‘What fruit have we plucked with our independence? We profess our gratitude to the United States and other allied nations with whose financial and other support we have made a certain degree of progress. That we have not been able to achieve complete success is chiefly due to the fact that those who were at the helm of government prior to the declaration of martial law on 27th October, 1958 were servants of the English. Even after independence, they could not quite rise above the servile mentality.’ Muhammad Shahidullah also added another sentence to this: ‘Then again those who were the elected representatives of the National or Provincial Assembly were – save a few exceptions – firm believers in the principles of nepotism and pocketism, which as understood in Bengali means, patronage of one’s own kin and filling of one’s own pockets.’

Dr Shahidullah identified corruption as the main driving factor that made military rule necessary in Pakistan. But he was also aware that mere change of ruler does not bring about change in the nation’s lot. Military rule in Pakistan did not change the lot of the people of that country. The reason behind this – according to Dr Shahidullah – was the ignorance of the people of Pakistan. It would not be amiss to quote further from his powerful words: ‘For a blind man, day or night makes no difference. For an ignoramus, liberty and bondage are all the same. What can we expect when only four to five percent of the population literate in truth? An ignoramus too counts no more than a minor. Kinsfolk of a minor face no trouble in deceiving him/her to fill their pockets at his/her expense. Same thing happened in this country.’

It has been 43 years since Bangladesh has achieved independence. Bangladesh has also seen her share of progress. But what has been the change to the fortune of people – who are the society’s base and to whom the supreme power of Bangladesh belongs? In these 43 years – setting other questions aside, let us at least ask this question – what percentage of the people has been truly educated?

III

We assert on a regular basis that three million people lost their lives in the liberation war of Bangladesh. Yet, in the ensuing 43 years we have not been able to prepare a complete list of the martyrs. How then would we ensure ‘equality, human dignity and social justice’? Ahmed Sofa, the great writer, raised this question in an article published on 12th December, 2000. As of today, I have not received an adequate response to this question yet. The question thus merits some elaboration.

Ahmed Sofa was born in the Patiya upazila of the Chittagong (south) district. The name of his village is Gachbaria. It has fallen under the newly constituted Chandanaish upazila. During the liberation war, he left the country and going via Agartala, took refuge in Calcutta. At the end of the war, he came back first to Dhaka, then to his village. What followed has been described in his article: ‘Since 1972, whenever I have visited my village, I tried to make the village people agree to one matter. I repeatedly solicited the local people – including the [Union Parishad] members, Chairmen, and Matabbars – on the issue: I tried to make them understand that around 100 people of our village lost their lives at the hand of the Pakistani Army, Razakars, and Al-Badrs. The Chittagong-Cox’s Bazar road [also known as Arakan road] passes across the heart of our village. I put forth the proposal that a billboard should be planted permanently at the side of the road carrying the names of the 100 people killed in the liberation war.’

‘I proposed,’ so went on Ahmed Sofa, ‘that another line should be written on the billboard. It was like this: Wayfarer, unbeknownst to you, the village which you happen to be passing by had one of its children lay down his/her life for the liberation of the land! I have been harping on this proposition ever since 1972. Initially people would try to give me an audience with due attention. But after three or four years when I would still bring it up, people would think that I was unnecessarily trying to embarrass them. I think, if I present the proposal once again today, people would reckon me to have gone totally mad.’

What, therefore, does ‘spirit of liberation war’ signify? Why, it was not only about Ahmed Sofa’s own village – the same situation prevails all over the country. He wrote: ‘In course of my work I have had to visit a good deal around 8 to 10 districts of North Bengal, central Bengal, and South Bengal. Wherever I went, I did ask people whether anything took place there during the liberation war. In many villages the inhabitants told me that, ‘Punjabis did not set their foot in our village at all.’ People in other villages said the Punjabis did come, burnt down houses, and killed many people. I would ask, do you happen to know the name and identity of those who were killed? The villagers would respond enthusiastically, ‘why shouldn’t we? Son of so-and-so, brother of so-and-so, grandson of so-and-so, etc., etc.’

Yet, why could not anyone prepare a comprehensive list of the martyrs of the liberation war? Thus deplored Ahmed Sofa: ‘I would then say: why do you not write down the names of the people killed in the liberation war at the wayside? When anybody would pass through your village, s/he would read it and this would (then) give rise to a sense of respect in the visitor’s mind for your village. The villagers would just look at me with their mouths agape, as if unable to make sense of what I was suggesting.’

At this point our great writer is showing what has happened to the ‘spirit of liberation war’. Ahmed Sofa wrote: ‘In the different places of Bangladesh that I visited, nowhere could I find the names of the martyrs of the liberation war to have been written down with care and respect. It would not really take too much of an effort to undertake such an enterprise. It would take only a little patriotism and a little respect for the people killed in the liberation war.’ Has it been too late to mend? Could we not set the matter right today? If we cannot, then we must admit that no such thing as the ‘spirit of the liberation war’ survives today.

March 10, 2014

References

  1. Professor Dr. Muhammad Shahidullah, ‘Swadhinata,’ Dainik Paygam [Bengali daily], Biplab Sankhya [Revolution Day issue], 20 October 1964, 9 Kartik 1371 BS.
  2. Ahmed Sofa, ‘Muktijuddher Chetona Kothay Jonmay?’ Khoborer Kagoj [Bengali weekly], Year 19, issue 50, 12 December 2000, 28 Agrahayan 1407 BS.
  3. ‘The Proclamation of Independence,’ Mujibnagar, Bangladesh, dated 10th day of April, 1971, Seventh Schedule [Article 150 (2)], Constitution of the People’s Republic of Bangladesh, reprint, October 2011.

 

[The original article in Bangla was published by Bdnews24.com on March 26, 2014]

The Bangla question in Bangladesh

The Negro of the Antilles will be proportionately whiter — that is, he will come closer to being a real human being — in direct ratio to his mastery of the French language. I am not unaware that this is one of man’s attitudes face to face with Being.

—Frantz Fanon, Black Skin, White Masks

In Black Skin, White Masks Frantz Fanon took the language question as a point of departure in his study of the colonial experience in the Caribbean islands. He had hardly had any time for undertaking a study of post-colonial societies. I, however, find his work quite relevant in exploring the language question in our own independent societies also known as post-colonial. I will cite only the question of Bangladesh here by way of an instance.

The Bangla language, as everyone admits, has served the cause of the nation state well that is Bangladesh today. When a Bengali statesman, AK Fazlul Huq, moved the famous Lahore Resolution of 1940, it became clear that the All India Muslim League was advancing the explicit demand for, not one, but two ‘Pakistans’ (the name was not yet there in the resolution though) one of which would be in Bengal. The resolution read, in part, as follows: ‘The areas in which the Muslims are numerically in majority, as in the north-western and eastern zones of India, should be grouped to constitute ‘Independent States’ in which the constituent states shall be autonomous and sovereign.’ The last years of British rule, if not throughout the entirety of its hold, which was marked by a good measure of alienation of the Bengali Muslims, impelled them towards the point of no return before absorption into one Pakistan.

'Ekusher Shahid' by Murtaja Baseer

‘Ekusher Shahid’ by Murtaja Baseer

Post-colonial experience in Pakistan, however, took a very quick turn towards consolidation of a new national orientation. As early as 1948, as is well known, grumblings of discontent were heard in the constituent assembly of Pakistan: ‘A feeling is growing among the Eastern Pakistanis that Eastern Pakistan is being neglected and treated merely as a “Colony” of Western Pakistan.’ Corresponding to growing the alienation of Bengali folks was growing the demand for Bengali as a national (that is, state) language. The police firings on a demonstration on February 21, 1952 proved the beginning of the end of Pakistan in the long run. The day used to be commemorated as Shahid Dibas, day of martyrs, until recently.

If there was one glaring colonial legacy in Pakistan, as in India, it was perhaps the continued role of English, the colonialist’s language, as lingua franca. But partly due to the struggle against Urdu, there was no time to even think about it. Neither Pakistan nor Islam proved sturdy enough to give Urdu, ethnic language of a minority, an immigrant minority for that matter, a pass. Imposition of Urdu was rightly interpreted as another attempt at colonising the ethnic Bengalis by the West Pakistani minority. The conflict bore a good deal of similarity with the choice of Hindi as ‘the official language’ of India. Articles 343-344, constitution of India, by the way, made English an ‘auxiliary official language’ and Hindi ‘the official language’.

Incidentally, as one recalls, the final draft of the constitution that Indian statesmen actually unveiled in 1949 was not in Hindi, but in English. So was the case in Pakistan. Bangladesh, despite the struggle and the war of liberation, only had to invent a fiction for the language of its constitutional drafts. The Bengali question in Bangladesh today looks more or less like the question of national language in certain African states. Some African states, for instance, Rwanda, Burundi, Botswana, Somalia, Lesotho, Tanzania and Central African Republic which are ethnically homogeneous, or almost so, have attempted to introduce African languages as their lingua franca. ‘Yet,’ as L Adele Jinadu put it a few years ago, ‘in all of them French or English is the principal medium of higher education or contact with the outside world.’

Why has not language been a critical issue in second post-colonial Bangladesh, somewhat not unlike in above mentioned African countries, whereas the issue was a life and death struggle in our first post-colonial period? In our first post-colonial days within Pakistan old leaders of the Bengali middle class became active early enough to take up the language question as part of the colonial malaise. AK Fazlul Haque’s newly founded Krishak Sramik Party, for one, in its 12-point programme of July 29, 1953 demanded for Bangla the state language status as much it demanded full regional autonomy for the state of East Bengal on the basis of the Lahore Resolution, 1940. And it is true the leadership of the national orientation passed on to new hands by the 1960s and the new leaders, the old Maulana Bhashani and the young Sheikh Mujib among them, found the broadest response from, in the words two Russian researchers, ‘radical Muslim intellectual, members of the national bourgeoisie, workers, and owners of small and middle size land-holdings.’

Whatever happened to the Bengali nationalism of the 1950s and 1960s? The Bengali upper crust and their retainers are now beholden to English without a murmur and in a purple face. They have agreed to rename it, the Shahid Dibas as ‘International Mother Language Day,’ didn’t they? Language is no more a critical issue to the Bangladeshi bourgeoisie, or is it? I am not sure if this phenomenon proves that Fanon’s thesis on language in colonialism has become irrelevant to the political situation in Bangladesh. It will be premature perhaps to conclude here, however. Let me say why.

Since Babington Macaulay’s famous Minute on Education, Vintage 1835, which asserted that ‘a single shelf of a good European library was worth the whole native literature of India and Arabia’ and especially since 1837, almost overnight, the official language of the East India Company’s administration changed from Persian to English. The so called ‘polytechnic Orientalism’ was indeed thrown out of the window and entered the Brown Sahib. They were in fact already there, only waiting in the wings. Had he been around, would not Fanon have argued that a crucial criterion used by the colonial powers in deciding which group of Africans to hand over power to was fluency in English or French? That Fanon looked upon the process of decolonisation in much of tropical Africa as ‘a conspiracy between a national bourgeoisie and a colonizing bourgeoisie to perpetuate colonial rule’ is a fact of course. Throwing a quiet look on the Bangladesh scene I am convinced Fanon was talking ‘no non-sense’.

The bourgeois will, I know, say that the English had no choice but to hand over power to them to whom they did. Fanon is exactly saying this: he claims that the co-option of the local bourgeoisie in a world-wide imperialist network is the goal of the new colonial combine. Its primary aim is nothing less than complete subjugation, not ‘civil and political’ only but ‘social, economic and cultural’. This was the sole purpose, according to Fanon, of the peaceful colonial education.

But there is more. Involved in the police firings on demonstrators on February 21, 1952 was the question of Bengali as a national language. Today it is too easy to reformulate the whole thing, singing the lullaby of the mother language(s)! To close the communications gap, if any, they are now taking the All English Kindergartens to all peripheries. Our country folks will no longer be suspicious of the townsman; they will themselves be the townsmen! ‘The latter,’ Fanon wrote, ‘dresses like a European; he speaks the European’s language, works with him, sometimes even lives in the same district…’

If the third point is, unfortunately, valid; that is to say if we in Bangladesh as in our fellow African nations are still caught in the subtle clutches of a ‘recharged and redeployed’ form of colonisation it is also true that the English language is a subtle form of cultural imperialism. One implication of this argument à la Fanon is that, not unlike a good many nations of post-colonial Africa, Bangladesh is not really a free nation.

References

Frantz Fanon, Black Skin, White Masks, translated by Charles Lam Markmann (New York: Grove Press, 1967).
L. Adele Jinadu, ‘Language and Politics: On the Cultural Basis of Colonialism (Langue et politique: sur les bases culturelles du colonialisme)’, Cahiers d’Édtudes Aficaines, Vol 16, Cahiers 63/64, pp 603–614.
Ramkrishna Mukherjee, ‘Social Background of Bangladesh,’ Economic and Political Weekly, Vol 7, No 5/7, Annual Number (February 1972), pp 265–274.
Indrajit Hazra, ‘Hiding Behind One-way Mirror,’ India International Centre Quarterly, Vol 33, No ¾, India 60 (Winter 2006-Spring 2007), pp 308–313.


This piece was first published by New Age on February 21, 2016

Copyright 2016 Salimullah Khan

১৯৭১ সালের স্মৃতি: কেন কোটি শরণার্থী?

 

© Raghu Rai / India Quarterly

© Raghu Rai / India Quarterly

১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারি—অর্থাৎ  পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায়—বাংলাদেশে পাকিস্তান বাহিনীর নয় মাসব্যাপী গণহত্যা ও নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞের বিবরণ সম্বলিত একটি বড় পুস্তিকা প্রকাশিত হইয়াছিল নয়াদিল্লি হইতে। প্রকাশ করিয়াছিলেন, ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স’ বা ‘ভারতীয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিষদ’ নামের একটি স্বশাসিত সংস্থা। বইয়ের সম্পাদক পরিচয়ে বিশেষ কাহারও নাম ছাপা হয় নাই। তাই আমরা ধরিয়া লইতে পারি সংস্থার সেক্রেটারি জেনারেল বা মহা সম্পাদক বলিয়া যাঁহার নাম মুদ্রিত তিনি—এস.এল. পপলাই মহোদয়—বইটি সম্পাদনা করিয়াছিলেন। অবশ্য সম্পাদকই শেষ কথা নহে। পুস্তিকাটির আরও একটি বিশেষত্ব আছে। ইহার মুখবন্ধ লিখিয়াছিলেন স্বনামধন্য ফরাশি সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ আঁদ্রে মালরো (১৯০১-১৯৭৬)। খোঁজখবর যতদূর লইতে পারি লইলাম, দেখিলাম বইটির খবর বেশি লোকের কানে পৌঁছায় নাই। মালরোর লেখা মুখবন্ধের কথাও তথৈবচ। এমনকি মাহমুদ শাহ কোরেশী ১৯৮৬ সালে আঁদ্রে মালরোর উপর যে বই ছাপাইয়াছিলেন তাহাতে মুক্তিযুদ্ধ আর যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ লইয়া অনেক কথা থাকিলেও এই মুখবন্ধটির কথা পাওয়া গেল না।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যায় মাতিয়া উঠিয়াছিল, তখন প্রতিবেশী ভারতের বুদ্ধিজীবীদের তরফে দিল্লি শহরে এক দফা আন্তর্জাতিক বুদ্ধিজীবী সম্মেলন ডাকা হয়। আঁদ্রে মালরোকেও দাওয়াত দেওয়া হয় সেই সম্মেলনে। মালরো সম্মেলনে অংশগ্রহণ করিতে রাজি না হইয়া পত্রযোগে পাল্টা একটা আস্ত বিবৃতি প্রকাশ করিয়াছিলেন। মালরোর বিবৃতি প্রকাশ পায় ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। সে বিবৃতিতে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেন। প্রথম বিবৃতির কিছু পরে আরেক বিবৃতিযোগে মালরো বলিয়াছিলেন, ‘ফাঁকা বুলি আওড়াবার অভ্যাস আমার নেই; তাই বাংলাদেশের পক্ষে যুদ্ধ করবার প্রস্তাব আমি দিয়েছি।’ (কোরেশী ১৯৮৬: ৯৩)

আঁদ্রে মালরো (১৯০১-১৯৭৬)

আঁদ্রে মালরো (১৯০১-১৯৭৬)

মালরোর এই প্রস্তাব বাংলাদেশের পক্ষে অমৃতস্বরূপ কাজ করিয়াছিল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মার্কিন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিকসনের কাছেও চিঠি লিখিয়াছিলেন। আহ্বান জানাইয়াছিলেন, পাকিস্তান যাহাতে গণহত্যা বন্ধ করে আমেরিকা তাহার ব্যবস্থা করুক। ১৯৭১ সালের শেষভাগে—৩ ডিসেম্বর তারিখে—ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হইবার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে জাঁ কে নামক একজন ফরাশি যুবক প্যারিসে একটি পাকিস্তানী বিমান হাইজ্যাক করিতে উদ্যোগী হইয়াছিলেন। পরে পুলিশ তাহাকে গ্রেপ্তার করিয়া বিচারে সোপর্দ করে। কে দাবি করিয়াছিলেন তিনি মালরোর লেখা পড়িয়া অনুপ্রাণিত হইয়াছিলেন। আদালতে কের সমর্থনে সাক্ষ্য দিতে গিয়াছিলেন আঁদ্রে মালরো। কেহ কেহ বলেন, খুব সম্ভব মালরোর সাক্ষ্যের কল্যাণেই জাঁ কে মাত্র পাঁচ বছরের দণ্ড লাভ করেন। (জহির ২০১৫ এবং কোরেশী ১৯৮৬: ৮৪)

সম্প্রতি বাংলাদেশের কয়েকজন নবীন লেখক পুস্তিকাটির বাংলা সংস্করণ প্রকাশে উদ্যোগী হইয়াছেন। তাই আমারও সৌভাগ্য ঘটিল বইটি আদ্যোপান্ত একবার পড়িয়া দেখার। মনে হইল, ১৯৭১ সালের ইতিহাস লইয়া যে সকল প্রশ্ন এখনও জীবন্ত আছে তাহার কোন কোনটির উত্তর এই বইতে পাওয়া যাইবে। সেই উত্তরে পৌঁছিবার আগে বইটির আরেক বিশেষত্বের কথাও বলিতে হয়। এই বইয়ে মোট ছাব্বিশ জন সাক্ষীর জবানবন্দী লিপিবদ্ধ করা হইয়াছিল। ছাব্বিশের মধ্যে উনিশজন বাংলাদেশের নাগরিক—যাঁহারা পাকিস্তানী নির্যাতনের শিকার অথবা প্রত্যক্ষ সাক্ষী। পরকালে বিখ্যাত ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ কিংবা চিত্রশিল্পী কামরুল হাসান কি সৈয়দ আবুল বারক আলভি তাঁহাদেরই কয়েকজন। সাক্ষীদের মধ্যে আর সাতজন ছিলেন বিভিন্ন পরিসরে সাহায্য করিতে আগাইয়া আসা খ্রিস্টান মিশনারি সমাজের কর্মী। দেখিতেছি তাঁহাদের মধ্যে দুনিয়াজোড়া খ্যাতনাম্নী মাদার তেরেসাও আছেন।

এই বইয়ের মূল সম্পদ এই ছাব্বিশটি জবানবন্দীর সংক্ষিপ্তসার। এইগুলি গ্রহণ করিয়াছিলেন তিনজন ভারতীয় সাংবাদিক—দুইজন পুরুষ ও একজন নারী—যথাক্রমে খগেন দে সরকার, সুধীন্দ্রনাথ চৌধুরী ও অমিতা মালিক। বাংলাদেশের পক্ষ হইতে তাঁহাদের সহায়তা করিয়াছিলেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের দুই সহকারী—[ব্যারিস্টার] আমিরুল ইসলাম ও [ব্যারিস্টার] মওদুদ আহমদ। জবানবন্দীগুলি গ্রহণ করা হইয়াছিল ১৯৭১ সালের একেবারে শেষের দিকে—নবেম্বর মাসের শেষ নাগাদ। বইটির ‘আবাঁ-প্রপো’ বা মুখবন্ধযোগে আঁদ্রে মালরো সাহেব দুইটি কথা বিশেষভাবে স্মরণ করিয়াছিলেন। বাংলাদেশ হইতে কত মানুষ ভারতে আশ্রয় প্রার্থনা করিয়াছিলেন? মালরোর মতে, ১৯৭১ সালের বাংলাদেশে গণহত্যার মতন মানবজাতি-বিরোধী অপরাধ যে ঘটিয়াছিল তাহার নগদ প্রমাণ এই সত্য হইতেই পাওয়া যায়। সত্য বলিতে কি—এই প্রমাণ দেখিয়াই তিনি এবং তাঁহার বন্ধুরা বাংলাদেশের পক্ষে লড়াই করিবার জন্য তৈরি হইয়াছিলেন।

নিজের সিদ্ধান্তের সপক্ষে যুক্তি দেখাইবার উদ্দেশ্যে মালরো তাঁহার জানা পুরানা একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করিতে কুণ্ঠিত হন নাই। ১৯৪০ সালে নাৎসি জার্মানির হাতে ফরাশিদেশের পরাজয় ও পতনের পর সে যুগের ফরাশি উপনিবেশ সিরিয়ায় উপস্থিত জনৈক ফরাশি সেনা কর্মকর্তা—পদবীতে মেজর পর্যায়ের—জেনারেল দা গলকে বলিয়াছিলেন, ‘ঘটনাটা আসলে কি ঘটিতেছে আমরা তো ভাল করিয়া জানি না। এখন কোন দিকে যে যাই!’ উত্তরে দা গল বলিয়াছিলেন, ‘জানি না কথাটা হয়তো মিথ্যা নয়, তবে কে যেন আমাকে বলিতেছে জার্মানরা তো প্যারিসে।’ এই উপকথার রেশ টানিয়া মালরো বলিয়াছিলেন, সারা দুনিয়া বেশ ভালোভাবেই জানিত এইবার এক কোটি হিন্দু শরণার্থী ভারতে গিয়া হাজির। এই জায়গায় মালরো অবশ্য অসাবধানতাজনিত একটি ভুল করিয়াছিলেন—এক কোটি শরণার্থীর সকলে নিশ্চয়ই হিন্দু ছিলেন না। আঁদ্রে মালরোর দ্বিতীয় যুক্তিটি ছিল অবশ্য একান্তই অকাট্য। এয়াহিয়া খান খাস করিয়া বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী বা এলিটও হত্যা করিতেছিলেন। এই হত্যাকাণ্ড ছিল জাতি ধর্ম নির্বিশেষে—কোন প্রকার বাছবিচার না করিয়াই। যাহারা ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলকে ভোট দিয়াছিলেন—কি মুসলমান কি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান—সকলকেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী হত্যা করিতেছিল। এ সত্যে পৃথিবীর সন্দেহ ছিল না।

১৯৭১ সালের যুদ্ধে—বিশেষত শেষভাগে—ভারতীয় সেনাবাহিনীকেও শরিক হইতে হইয়াছিল। তাহার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভিতরে যে গেরিলা যুদ্ধ চলিতেছিল তাহাতে—অর্থাৎ বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীতে—যাহারা নাম লিখাইয়াছিলেন তাহাদের মধ্যে কতজনই বা ধর্মে হিন্দু শ্রেণীভুক্ত ছিলেন! আর মুসলমান কতজন ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে? তাহাতেই বোঝা যায় বাংলাদেশের হিন্দু ও মুসলমান একযোগে লড়িয়াছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানী দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। মালরো লিখিয়াছেন, এ যুদ্ধ তো ধর্মে আর ধর্মে লাগে নাই। এ যুদ্ধ বাধিয়াছিল জাতিতে জাতিতে। আঁদ্রে মালরোর ভাষায়, এ যুদ্ধ ছিল ‘এসলামাবাদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঢাকার মুসলমানদের যুদ্ধ।’ এক অর্থে কথাটা ষোল আনা না হইলেও চৌদ্দ আনাই সত্য।

সকলেই জানেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা মানিয়া লইতে পাকিস্তান এবং আরব জাহানের প্রতিক্রিয়াশীল রাজতন্ত্রগুলি শেষ পর্যন্ত বাধ্য হইয়াছিল। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক মর্যাদা মানিয়া লইতে ইঁহারা আজও পারেন নাই। পাকিস্তান যদি সত্য সত্যই মনে করিত, বাংলাদেশ ছাড়া তাহাদের চলিবে না—পৃথিবীতে না হউক, অন্তত দক্ষিণ এশিয়ায় সে একঘরে হইয়া পড়িবে—তো বাংলাদেশের সহিত তাহার নেতারা যে ব্যবহার করিয়াছেন সেই ব্যবহার কদাচ করিতেন না। পরকালে অন্তত তাহারা শাস্তির মুখোমুখি হইতেন। না, পাকিস্তান আজও ১৯৭১ সালের দায়মোচন করিতে আগাইয়া আসে নাই। পাকিস্তানের এমন একযুগ গিয়াছে যখন তাহাকে শিশুরাষ্ট্র বলার রেওয়াজ ছিল। মনে হইতেছে, এখনও দেশটি প্রাপ্তবয়স্ক হয় নাই। এতদিনে তাহাদের দিনকাল ভালই যাইতেছে। ইহাতেই বুঝা যাইতেছে বাংলাদেশকে সেকালে তাহারা নিছক উপনিবেশই ভাবিয়াছিলেন। আগের দিনে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী, আমলাতন্ত্র ও এয়ুরোপিয়া বর্ণবাদীরা যে ধরণের আচরণ করিতেন তাহারাও সেই আচরণেরই পুনরাবৃত্তি করিয়াছিলেন মাত্র।

১৯৭১ সালের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে যে নির্দয় আচরণ করিয়াছিল তাহাকে এক মুসলমানের দেশে আরেক মুসলমানের আচরণ বলা যায় না—সে ছিল আফ্রিকা কি এশিয়ার তথাকথিত ‘অসভ্য’ বা ‘বর্বর’ দেশে সভ্য এয়ুরোপিয়া জাতির বর্ণবাদী, মানবতন্ত্রবিরোধী আচরণ বিশেষ। আঁদ্রে মালরো—আজ হইতে ৪৪ বছর আগে—লিখিয়াছিলেন, এই সত্যে যদি কাহারও সন্দেহ থাকে তাহারা এখানে একত্রিত ছাব্বিশ জন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ পড়িয়া দেখিতে পারেন।

aijaz-ahmad

এজাজ আহমদ

আঁদ্রে মালরোর বক্তব্যের তাৎপর্য বুঝিতে আরও সহায় হইবে যদি আমরা সেই সময়ের কোন কোন বামপন্থী বুদ্ধিজীবীর বক্তব্য স্মরণ করিতে পারি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যাভিযান শুরু হইবার দুই সপ্তাহের মাথায় চারিজন পাকিস্তানী বুদ্ধিজীবী—বিদেশে প্রবাসী অবস্থায়—পাকিস্তানী বর্বরতার নিন্দা করিয়া বিবৃতি প্রকাশ করিয়াছিলেন। এই বুদ্ধিজীবীদের একজন—এজাজ আহমদ—১৯৭১ সালের ১ নবেম্বর তারিখে লেখা এক নিবন্ধে স্বীকার করিয়াছিলেন যে বাংলাদেশ হইতে কোটির মতো শরণার্থী ভারতে পার হইয়াছেন। এই বর্বরতা শেষ না হইলে আরো কোটির মতো যে পার হইবে তাহার সম্ভাবনাও উড়াইয়া দেওয়া যায় না। তবে তিনি সঙ্গে একথা বলিতেও কসুর করেন নাই—শরণার্থীরা তো গরিব মানুষ! তাহাদের দেশত্যাগে পশ্চিম পাকিস্তানী সামরিক গোষ্ঠীর কিছু আসে যায় না। (আহমদ ১৯৭১: ১১, ১৪)

একটা জায়গায় আসিয়া তিনি বিপদেই পড়িয়া গিয়াছেন। তিনি বলিয়াছিলেন, এই কোটি শরণার্থীর নিজ দেশ ত্যাগ করিয়া ভারতে যাওয়ার ঘটনাকে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের যুদ্ধ ঘোষণার সামিল গণ্য করা যায়। তবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও পরকালের সাম্প্রদায়িক সংঘাত প্রভৃতি ঘটনা স্মরণে রাখিলে এই বিপুল সংখ্যক মানুষের দেশত্যাগকেও যুদ্ধ ঘোষণার মর্যাদা দেওয়া যাইবে কিনা তিনি সন্দিহান ছিলেন। এজাজ ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন, পাকিস্তানী সামরিক চক্র আর নতুন করিয়া ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামিবে না। (আহমদ ১৯৭১: ১৪)

এজাজ আহমদ তখন ছিলেন তরুণ বামপন্থী। পাকিস্তান ভাঙ্গিয়া যাওয়ায় তিনি সত্যই ব্যথা পাইয়াছিলেন। এই ব্যথায় তাঁহার চোখও কিছু ঝাপসা হইয়া গিয়াছিল। মালরোর পাশাপাশি তাঁহার বিশ্লেষণ পাঠ করিলে পরিষ্কার হয় মালরো কেন ভুয়োদর্শী আর এজাজ কেন রাতকানা। এজাজ আহমদ কিংবা তাঁহার বন্ধু একবাল আহমদ যাহা দেখিতে পান নাই তাহা মালরো দেখিয়াছিলেন বৈকি! এক কোটি শরণার্থী মালরোর কাছে নিছক একটা সংখ্যা ছিল না। এজাজ আহমদ ও তাঁহার বন্ধুদের লেখা এই এত বছর পর পড়িয়া আমার মনে সন্দেহ জাগিতেছে পাকিস্তান পথিকদের মধ্যে সবচেয়ে কম পাকিস্তান পথিক যিনি তিনিও কি তাহা হইলে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান পথিকের অধিক ছিলেন না?

 

দোহাই

১.     মাহমুদ শাহ কোরেশী, অঁদ্রে মালরো: শতাব্দীর কিংবদন্তী (ঢাকা: আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, ১৯৮৬)।

২.     [S.L. Poplai, ed.,] How Pakistan Violated Human Rights in Bangladesh: Some Testimonies (New Delhi: Indian Council of World Affairs, 1972).

৩.    Aijaz Ahmad, ‘Bangladesh: India’s Dilemma,’ Pakistan Forum, vol. 2, no. 2 (November 1971), pp. 11-15.

৪.     Quazi Sajjad Ali Zahir, ‘Salute to Jean Kay,’ in D.C. Katoch and Quazi Sajjad Ali Zahir, eds., Liberation: Bangladesh 1971 (New Delhi: Bloomsbury Publishing, 2015).


Copyright 2016 Salimullah Khan

আহমদ ছফার নজরুল

আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, নজরুলের কাছে বাঙালি মুসলমান সমাজের ঋণ শোধ করিবার মতন নহে। তিনি এই সমাজের ‘ভাষাহীন’ পরিচয় ঘুচাইলেন। তাহাদের ঘরের ভাষাকে সাহিত্যসমাজে প্রতিষ্ঠা দিলেন। সেই প্রতিষ্ঠা বাঙালি হিন্দুসমাজ স্বীকার করিয়া লইতে বাধ্য হইলেন। আর নজরুলের কাছে বাঙালি হিন্দুদেরও ঋণ আছে। তিনি বাংলাভাষা ও বাংলা সাহিত্যকে সাম্প্রদায়িকতার হাত হইতে উদ্ধার করিলেন। দেখাইলেন বাংলা হিন্দু ও মুসলমান দুই সমাজেরই ভাষা। বাংলাভাষার নতুন বিকাশ এই জায়গা হইতে নতুন করিয়া শুরু হইতে পারে। এই নতুন ধারার পথের কড়ি (বাঙালি জাতির নতুন সংজ্ঞা) নজরুল ইসলামের রচনা হইতে সংগ্রহ করিতে হইবে। এই কীর্তিরই অপর নাম নজরুল ইসলাম।


কাজী নজরুল ইসলামএই ঢাকা শহরে কিছু লোক আছেন যাহারা আমাকে—এই নিবন্ধের অধম লেখককে—সাম্প্রদায়িক এমনকি কখনও ‘মৌলবাদী’ বলিয়াও আনন্দ লাভ করেন। তাঁহাদের এই উপহারকে আমি কখনও বা বিধাতার আশীর্বাদ বলিয়া গ্রহণ করি। কারণটা খুলিয়া বলা দরকার।

যখন দেখি এই মনীষীরা আহমদ ছফার মতন মহাত্মা ব্যক্তিকেও একই ধরনের উপাধিরত্নে বিভূষিত করিতে কুণ্ঠিত হইতেছেন না তখন আমরা সামান্য মজুর লেখক মানুষ কেন মন খারাপ করিতে যাইব। আর কে না জানে এমনও দিন ছিল যখন বাংলাদেশের মুসলমান সমাজের কোন কোন অংশ মহাসমারোহে নজরুল ইসলামকে ‘কাফের’ ফতোয়া দিতে যেমন কসুর করেন নাই, তেমনি কিছু ‘নোংরা হিন্দু ও ব্রাহ্ম লেখক’ও ঈর্ষাপরায়ণ হইয়া তাঁহাকে ইতর ভাষায় গালিগালাজ করিতেন। খোদ নজরুলের কথায়—কয়েকজন গোঁড়া ‘হিন্দুসভা’ওয়ালা তাঁহার নামে মিথ্যা কুৎসাও রটনা করিতেন।

ইঁহাদের কথা মনে রাখিয়াই তো নজরুল ইসলাম বলিয়াছিলেন, ইহাদিগকে আঙ্গুল দিয়া গণনা করা যায়। ইঁহাদের আক্রোশ সম্পূর্ণ সম্প্রদায় বা ব্যক্তিগত। এতদিনে সকলেই জানেন ইঁহাদের মধ্যে অনেকেই বিখ্যাত লেখক—মোহিতলাল মজুমদার, সজনীকান্ত দাস বা নীরদচন্দ্র চৌধুরী প্রভৃতি। ইবরাহিম খাঁকে লেখা এক পত্রযোগে নজরুল ইসলাম পরিষ্কার করিলেন, মাত্র এই কয়েকজনের অবিচারের জন্য সমস্ত হিন্দু সমাজকে তিনি দোষ দিতেছেন না এবং দিবেনও না। তাহা ছাড়া নজরুল লিখিলেন, —আজকালকার সাম্প্রদায়িক মাতলামির দিনে’, —আমি যে মুসলমান’—ইহাই হইয়া পড়িয়াছে অনেক হিন্দুর কাছে অপরাধের সামিল, —আমি যত বেশি অসাম্প্রদায়িক হই না কেন।’

নজরুল ইসলাম এই কথা লিখিয়াছিলেন সত্য সত্যই বড় দুঃখে। প্রমাণ ইবরাহিম খাঁ সাহেবের লেখা ১৯২৫ সালের চিঠির উত্তর তিনি দিয়াছিলেন প্রায় তিন বছর পর, তাহার ভাষায় ‘১৯২৭ সালের আয়ু’ যখন ফুরাইয়া আসিয়াছে তখন। ততদিনে মানে ১৯২৭ সালের ডিসেম্বর কি ১৯২৮ সালের জানুয়ারিতে।

কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী এই মূঢ়তার অধ্যায় বেশিদিন স্থায়ী হয় নাই। হিন্দু সমাজের অগ্রণী মনীষীরা নজরুল ইসলামের শক্তি স্বীকার করিয়া লইয়াছিলেন। আর মুসলমান সমাজের মধ্যেও যাঁহাদের চোখ ফুটিয়াছিল তাঁহারাও নজরুল ইসলামের মধ্যে আপনাদের ঘরের মানুষ খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন।

এই উদাহরণটি আমি সবসময়ই মনে রাখি। যাহারা নজরুল ইসলামের মতন আত্মভোলা মানুষকেও সাম্প্রদায়িক বলিতে দ্বিধা করেন নাই, তাঁহাদের ভাবশিষ্যরা আহমদ ছফাকেই বা ছাড়িবেন কেন? এই চিঠিরই আরেক স্থলে নজরুল লিখিয়াছিলেন, মুসলমান সমাজ যে আমাকে ‘কাফের’ খেতাব দিয়াছে তাহা আমি মাথা পাতিয়া গ্রহণ করিয়াছি। ইহাকে আমি কোনদিন অবিচার বলিয়া অভিযোগের বিষয় করি নাই। কারণ আমার আগে ওমর খৈয়াম, শামসুদ্দিন হাফেজ কিংবা মনসুর আল হাল্লাজকেও লোকে ‘কাফের’ বলিয়াছিল। কাফের হইতে হইলে এই রকম বড় হইতে হয়। নজরুল তাই লজ্জা পাইয়াছিলেন। ‘কাফের’ আখ্যায় বিভূষিত হইবার মতন বড় তো তিনি হয়েন নাই!

আহমদ ছফা সম্বন্ধে বর্তমান বাংলা সাহিত্যের অভিভাবকরা যে শীতল ভাব দেখাইতেছেন তাহাতে আমার বারবার সেই ১৯২০ সালের যে দশক, তাহার কথাই মনে পড়িতেছে। আমার ধারণা মহাত্মা আহমদ ছফাও বিষয়টা জানিতেন।

আহমদ ছফা

আহমদ ছফা

যৌবনের প্রারম্ভে, ১৯৬৯ কি ১৯৭০ সালে, বিশ্ববিদ্যালয় কি বাংলা একাডেমীর বৃত্তি পাওয়ার আশায় আহমদ ছফা প্রথমে ইংরেজিতে একটি প্রবন্ধ (নাম ‘লিটারারি আইডিয়েল্স্ অব বেঙ্গল’) লেখেন। লেখাটি ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী সম্পাদিত বাংলা একাডেমীর ইংরেজি পত্রিকায় প্রথম ছাপা হয়। বাংলাদেশ কায়েম হইবার পর আহমদ ছফা সেই প্রবন্ধটির স্বাধীন তর্জমা করেন ‘বাংলার সাহিত্যাদর্শ’ নামে। ঐ প্রবন্ধে তিনি বাংলার সাহিত্যাদর্শ বলিতে চারিজন বড় লেখকের নাম উল্লেখ করেন। প্রথমে মাইকেল মধুসূদন দত্ত, দুই নম্বরে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, তৃতীয় স্থানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সবশেষে কাজী নজরুল ইসলামের নাম নিলেন তিনি।

‘বাংলার সাহিত্যাদর্শ’ প্রবন্ধের উপসংহারে আহমদ ছফা সিদ্ধান্ত করিয়াছিলেন, আমাদের সাহিত্যের এই পর্যন্ত যত আদর্শ দাঁড়াইয়াছে তাহাদের সর্বশেষ আদর্শ নির্মাতা কাজী নজরুল ইসলাম এবং শ্রেষ্ঠ কবিদের মধ্যে তিনিই সর্বশেষ। আহমদ ছফা লিখিলেন, কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মের ‘পূর্ণ মূল্যায়ন’ তখনও হয় নাই।

সেই অপূর্ণ মূল্যায়নের পাতা পূর্ণ তিনিও সেই দিন করেন নাই। তবে কিছু দিকচিহ্ন তিনি রাখিয়া গিয়াছিলেন সেখানেও। আহমদ ছফার লেখায় পড়ি, নজরুল ইসলামের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সাহিত্যে অনেক কয়টি পরিবর্তন ঘটিয়া যায়। এক নম্বরে তাহার আবির্ভাব মাত্রই বাংলা কবিতার যাহাকে বলে ‘ভরকেন্দ্র’ তাহার পালা বদলাইয়া গেল। কবিতা ‘গজদন্ত মিনার’ ছাড়িয়া রাজপথে নামিয়া আসিল। স্বরূপ প্রকাশ করিল সমাজশক্তির শরিক হিসাবে। সমাজের নির্যাতিত সাধারণ কবিতায় স্বীকৃতি পাইলেন। কাজী নজরুলের কবিতা তাহাদের ভাগ্যলিপি আকারে লেখা হইল।

বিশেষ মুসলমান সাধারণের অভিজ্ঞতা বাংলা সাহিত্যে যথাযথ যোগ্যতায় রূপ পাইল। আহমদ ছফার চোখেও স্পষ্ট হইল ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কিত পুরাণ ও রূপকথা, মুসলমান বাড়িতে ব্যবহার্য আরবি, ফারসি, উর্দু শব্দসম্ভার এন্তার ব্যবহৃত হইল তাঁহার লেখায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের দুই প্রধান সমাজ হিন্দু ও মুসলমানের অভিজ্ঞতা ও বাসনার আশ্চর্য সমন্বয় তিনি করিতে সমর্থ হইলেন। বাংলা গদ্যেও তিনি নতুন পাতা খুলিলেন। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, বাংলা গদ্যে যাঁহারা ‘আঞ্চলিক’ ভাষা ব্যবহার করিয়াছেন নজরুল তাঁহাদের পথিকৃৎমণ্ডলীর সদস্য।

এককথায়, মুসলমান কবি, হিন্দু-মুসলমান কবি ও মার্কসপন্থী—কবি যুগপৎ এই তিন খেতাব তাহার প্রাপ্য। আহমদ ছফার বিচারে এই তিন পরিচয়ই তিনি একসঙ্গে কাঁধে লইবার যোগ্য হইয়া উঠিলেন। আহমদ ছফার কথাটি অপূর্ব—এমন দাবি আমি করিতেছি না। শুধু বলিতেছি আহমদ ছফা এই বক্তব্য মানিয়া লইয়াছিলেন। আহমদ ছফার আগে অনেকেই বিশেষ করে আবুল কালাম শামসুদ্দিন ও মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী এই প্রস্তাবের কাছাকাছি কথা বলিয়া রাখিয়াছিলেন।

খুব অল্প কথায় আহমদ ছফা বলিতে পারিয়াছেন যে, জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসুর মতন পাশ্চাত্য ব্যবসায়ী কবিকেও একদিন রবীন্দ্রনাথের সর্বগ্রাসী প্রভাব হইতে বাহির হইয়া আসিবার তাগিদে ধরিয়াছিল। তখন নজরুল ইসলামই তাহাদের আশ্রয়স্থল ছিলেন।

অন্যদিকে সুকান্ত ভট্টাচার্য কিংবা সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রভৃতি কবি যাহারা ‘মার্কসবাদী’ বলিয়া খ্যাত হইয়াছেন তাহারাও নজরুল ইসলাম ছাড়া কল্পনীয় নহেন। আহমদ ছফার মতে এই বিপ্লবের কবিকুলও নজরুল ইসলামের ভাব ছাড়াইয়া যাইতে পারেন নাই।

নজরুল ইসলাম মুসলমান কবি কিন্তু মাত্র মুসলমানের বা শুদ্ধ এসলামী পুনর্জাগরণের কবি ছিলেন না। এখানেই তাঁহার সহিত ফররুখ আহমদ আর তালিম হোসেনের মতো কবিকুলের ব্যবধান। তাঁহারা যেখানে বন্দী, নজরুল ইসলাম সে জগতের মুক্তবিহঙ্গ।

জীবনের উপান্তে আসিয়া—প্রায় কুড়ি বছর পর আহমদ ছফা নজরুল ইসলাম সম্বন্ধে আর একটি বড় প্রবন্ধ লিখিয়াছিলেন। নাম ‘নজরুলের কাছে আমাদের ঋণ’। এই প্রবন্ধটিতে তিনি আরও কিছু কথা যোগ করিলেন। এইবার তিনি নজরুলের ভাষা হইতে যাত্রা করিলেন। বিশ বছর আগেও ছফা খেয়াল করিয়াছিলেন নজরুলের ভাষায়—গদ্য ও পদ্য উভয় আকারেই নতুন হাওয়ার দোলা। নতুন প্রবন্ধেও তিনি নজরুল ইসলামের কবিতার উৎকর্ষ বা অপকর্ষ নিরূপণের চেষ্টা করিলেন না। শুদ্ধ ভাষার প্রশ্নেই কথা বলিলেন।

আহমদ ছফার প্রস্তাবানুসারে, কলিকাতার উইলিয়াম দুর্গ হইতে যে বাংলা ভাষাটি গিরিগাত্রের সংকীর্ণ স্রোতস্বিনীর মতো বাড়িতে বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় পরিণতি মানিয়াছিল, ছফার রূপক মোতাবেক ‘ভরাযৌবনা প্রমত্তা পদ্মার আকার’ ধারণ করিয়াছিল, নজরুল ইসলাম সেই ভাষারই সাধক—এ সত্যে সন্দেহ নাই। কিন্তু নজরুল ইসলাম ভাষাকে যেমনটি পাইয়াছিলেন তেমনটি ছাড়িয়া দেন নাই। তিনি বাংলা ভাষার গতিপথে নতুন ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করিয়া দিলেন।

সকলেই জানেন, নজরুল ইসলাম বাংলাভাষায় বিস্তর আরবি-ফারসি শব্দ এস্তেমাল করিয়াছিলেন। সেই অপরাধে কেহ কেহ তাহাকে অপরাধীও করিয়াছিলেন। তাহার স্মৃতি ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায় আছে :

‘আমপারা’-পড়া হামবড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মে’রে!
হিন্দুরা ভাবে, পার্শী শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে!

আরবি, ফারসি শব্দের ব্যবহার বাংলা কবিতায় নজরুল ইসলামই প্রথম করেন নাই। তিনি জানিতেন, তাঁহার বহু আগে ভারতচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও সত্যেন্দ্রনাথ প্রভৃতি একই কাজ দেদার করিয়া গিয়াছেন।

তাহা হইলে, নজরুল ইসলামের নতুন নিশানটা কোথায় সে জওয়াব ‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ’ প্রবন্ধে পাওয়া যায়। কবি লিখিতেছেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ সুদ্ধ অনেক সাহিত্য সাধক ভুলিয়া গিয়াছেন যে, ‘বাংলার কাব্যলক্ষ্মীর ভক্ত অর্ধেক মুসলমান।’ তাহারা এই সকল সাহিত্যিকের নিকট শুদ্ধ টুপি আর আচকানই দাবি করিতেছেন না। চাহিতেছেন মাঝেমধ্যে বেহালার সঙ্গে সারেঙ্গীর সুরও শুনিতে। শুনিতে চাহিতেছেন ফুলবনের কোকিলের গানের বিরতিতে বাগিচায় বুলবুলির সুর।

আহমদ ছফা এই বেদনার মর্ম সঠিক ধরিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, মোহিতলাল মজুমদার কিংবা সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার ছিল নিছক নিরীক্ষার ধারা। অথচ ‘কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যে ক্রিয়াশীল একটা ঐতিহাসিক কর্তব্যবোধ।’ আহমদ ছফার বয়ান অনুসারে, নজরুল ইসলাম আপনকার কাব্যভাষা তৈয়ার করিবার জন্য দেশে তৎকালীন প্রচলিত ভাষারীতির ‘পাশাপাশি’ গৌণভাবে হইলেও, মুসলমান লিখিত পুঁথিসাহিত্যের ভাষাশৈলীটির দ্বারস্থ হইয়াছিলেন। তাহার সৃষ্টিশীলতার স্পর্শে পুঁথিসাহিত্যের ভাষার মধ্যে নতুন একটা ব্যঞ্জনার সৃষ্টি হইয়াছে।

অনেকে এই প্রশ্নে আহমদ ছফার সহিত একমত পোষণ করিবেন না। হুমায়ুন কবির পুঁথিসাহিত্যের কথা তুলিয়া নজরুল ইসলাম ও জসীমউদ্দীন উভয়কেই সামন্ত যুগের কবি বলিতে পিছপা হন নাই। হয়তো সেই বেদনা মনে রাখিয়াই একদিন জসীমউদ্দীন বলিয়াছিলেন, নজরুল ইসলামের মধ্যে পুঁথিসাহিত্যের কোন আছর ঘটে নাই। তিনি পুঁথিসাহিত্যের ‘মানসপুত্র’ নহেন। প্রকৃত সত্যের জন্য আমরা শুধু নজরুল ইসলামের জীবনীনির্ভর যুক্তির উপর দাঁড়াইব না। পুঁথির সহিত নজরুল ইসলামের পরিচয় তো ছিলই। কিন্তু তিনি নিছক পুঁথির লেখক হইতে চাহেন নাই। কিন্তু তাহার লেখা বাংলা আলাদা হইতেছে যে গুণে, তাহার মধ্যে পুঁথিসাহিত্যের একটা হিস্যা আছে। এই বক্তব্য আহমদ ছফার।

পলাশির যুদ্ধ পর্যন্ত সময়ে বাংলাভাষা যতদূর বাড়িয়া উঠিয়াছিল তাহাতেই আরবি-ফারসি বা যাবনী শব্দ বেশ মিশাল হইয়া যায়। যুদ্ধের পরও সেই ধারা বেশ কিছুদিন বহিয়া যাইতেছিল। ইংরেজ প্রশাসন ভাষার উপর হাত দিতেই—আঠার শতকের শেষ নাগাদ—বাংলাভাষার আরেকটা বাঁক তৈরী হইল। সরকারি মনীষীরা বাংলা হইতে যাবনী শব্দ তাড়াইবার কর্মসূচী সেলাই করিলেন। তাঁহাদের চেষ্টা সম্পূর্ণ সফল হয় নাই, কিন্তু তাহার ছাপ এখনও বাংলায় থাকিয়া গিয়াছে।

দুঃখের মধ্যে, ইংরেজ আমলে বাংলায় শিক্ষাদীক্ষার প্রসার সীমিত থাকায় এই ভাষা-সংস্কার কর্মসূচীও সর্বত্রগামী হয় নাই। কিন্তু বিচিত্রপথে গিয়াছে একথা স্বীকার করিতে দোষ নাই। মুসলমান সমাজের একাংশ যখন বাংলাভাষায় লিখিতে শুরু করিল তখন তাহাদের আশ্রয় হইল এই নতুন ভাষাই। ওদিকে মুসলমান কৃষক সমাজে এখনও পুরানা ভাষার—পুরানা রীতির জোয়ার।

মুসলমান লেখকরা—যেমন কায়কোবাদ বা মীর মশাররফ হোসেন—ইংরেজি যুগের বাংলা ভাষায় লিখিতে গিয়া কিছু সমস্যায় পড়িলেন। প্রতিবেশী হিন্দু সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য হইতে হইলে, তাহাদের উপহাসের পাত্র না হইতে চাহিলে, কিছু কিছু সীমানা মানিয়া চলিতে বাধ্য বোধ করিলেন। নহিলে আপন সমাজে, পরিবারে, সংসারে সচরাচর ব্যবহৃত আরবি-ফারসি শব্দ তাহাদের রচনায় যতটা সম্ভব পরিহারের চেষ্টা কেন?

ঠিক এই জায়গাতেই নজরুলের ভাষায় একটা বিপ্লব পদবাচ্য ঘটনা দেখা দিল। আহমদ ছফা আপন স্বভাবসিদ্ধ রীতিতে যাহা লিখিলেন তাহার বয়ান অনেকটা এই রকম: নজরুল ইসলাম মুসলমান সমাজের ঘরে-সংসারে ব্যবহৃত শব্দ-বাক্য ব্যবহার করিতে করিতে এমন একটা কাণ্ড বাধাইলেন যাহাতে বাংলাভাষার অভিধান সংকলকদের কাজ বাড়িয়া গেল। অভিধানের প্রতিটি নতুন সংস্করণে নতুন নতুন শব্দ যোজনার প্রয়োজন দেখা দিল। নজরুল ইসলামের এইটাই একমাত্র কৃতিত্ব নহে।

তিনি শুধু আরবি-ফারসি মিশাল বাংলা লেখেন নাই। তিনি বাংলাই লিখিয়াছেন যাহাতে আরবি-ফারসি শব্দ আর দশ শব্দের মতন বসিয়াছে। ইচ্ছা করিলে কোন ‘বিদেশি’ শব্দ ব্যবহার না করিয়া ‘বিশুদ্ধ’ সংস্কৃত প্রধান বাংলায়ও তিনি লিখিতে পারিতেন, তাহারও বিস্তর প্রমাণ তাহার গানে-কবিতায় পদ্যে-গদ্যে ছড়াইয়া।

নজরুল পুঁথিসাহিত্য লেখেন নাই। কিন্তু তিনি যাহা লিখিয়াছেন তাহাতে পুঁথিসাহিত্য বাদ যায় নাই। আহমদ ছফার কথায়, তিনি পুঁথির প্রাণের আগুন লইয়াছেন, জীর্ণ কংকাল বহিয়া বেড়ান নাই। তিনি পুঁথির শব্দ লইয়াছেন। কিন্তু তাহার বাক্য বমন করেন নাই। তাহার ভাষা-কাঠামো তিনি বদলাইয়া লইলেন।

পরিশেষে, আহমদ ছফার সিদ্ধান্ত, নজরুল ইসলাম নতুন যুগের প্রবর্তন করিলেন। এই প্রবর্তনার সারকথা কি? আমি ছফার প্রস্তাব পুনরায় তুলিতেছি: পুঁথি লেখকেরা যে ভাষারীতি গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহার উদ্দেশ্য বা ফলাফল দাঁড়াইয়াছিল বাঙালি মুসলমান স্বতন্ত্র—একথা প্রমাণ করা। আর নজরুল ইসলামের ভাষা ব্যবহার সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশে ঘটিয়াছে। তিনি চাহিলেন বাঙালি মুসলমান বাঙালি সমাজের অংশ—একথা প্রমাণ করিতে। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, নজরুলের কাছে বাঙালি মুসলমান সমাজের ঋণ শোধ করিবার মতন নহে। তিনি এই সমাজের ‘ভাষাহীন’ পরিচয় ঘুচাইলেন। তাহাদের ঘরের ভাষাকে সাহিত্যসমাজে প্রতিষ্ঠা দিলেন। সেই প্রতিষ্ঠা বাঙালি হিন্দুসমাজ স্বীকার করিয়া লইতে বাধ্য হইলেন। আর নজরুলের কাছে বাঙালি হিন্দুদেরও ঋণ আছে। তিনি বাংলাভাষা ও বাংলা সাহিত্যকে সাম্প্রদায়িকতার হাত হইতে উদ্ধার করিলেন। দেখাইলেন বাংলা হিন্দু ও মুসলমান দুই সমাজেরই ভাষা। বাংলাভাষার নতুন বিকাশ এই জায়গা হইতে নতুন করিয়া শুরু হইতে পারে। এই নতুন ধারার পথের কড়ি (বাঙালি জাতির নতুন সংজ্ঞা) নজরুল ইসলামের রচনা হইতে সংগ্রহ করিতে হইবে।

এই কীর্তিরই অপর নাম নজরুল ইসলাম।

কবি নজরুল ইসলাম ১৯৪২ সালের মাঝামাঝি জুলাই মাসে দুরারোগ্য রোগের আঘাতে বাকশক্তি হারাইয়াছিলেন। তাহার এক বছরের মাথায় ১৯৪৩ সালের জুন মাসের শেষ তারিখে আহমদ ছফা এই ধরাপৃষ্ঠে ভূমিষ্ঠ হইলেন। পরাধীন বাংলাদেশের মানে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম তখন এক উচ্চপর্যায়ে উঠিয়াছে। আহমদ ছফা প্রায়ই কহিতেন, যেদিন তাহার জন্ম হয় সেদিন সুভাষচন্দ্র বসু জাপান রেডিও হইতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম নতুন করিয়া ঘোষণা করিয়াছিলেন।

নজরুল ইসলামের জন্মের ৪৪ বছর পর আহমদ ছফার জন্ম নেহায়েত কাকতালীয় ঘটনা নাও হইতে পারে। আহমদ ছফার এন্তেকালের দশ বছরের মাথায় আমরাও হয়তো বলিতে পারিব—আমাদের সাহিত্যের সর্বশেষ আদর্শ আর সর্বশেষ বিচারক আহমদ ছফার সাহিত্যকর্মের মর্ম আমরা এখনও ধরিতে পারি নাই।


প্রথম প্রকাশ: দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার শুক্রবারের সাময়িকীতে ১ জুলাই ২০১১

Copyright 2011 Salimullah Khan