Author Archives: ahsan

কাজির বিচার

সাহিত্যের ব্যবসায়ে নামিবার একেবারে গোড়াতেই যাঁহার সাহচর্য লাভ করিয়া কাজী নজরুল ইসলাম ‘বিশেষ লাভবান’ হইয়াছিলেন তাঁহার ভালো নাম মুজফ্ফর আহমদ । উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে লেখা কথা দুটি সুশীলকুমার গুপ্ত মহাশয়ের। তাঁহার বাক্য আরও দুই প্রস্ত উদ্ধার করিলে অন্যায় হইবে না। গুপ্ত মহাশয় প্রকাশ করিতেছেন:

‘মুজফ্ফর আহমদ শুধু একজন জনগণ-বন্ধু ও প্রসিদ্ধ শ্রমিক নেতাই নন, তাঁর মত সাহিত্যপ্রাণ ও দরদী বন্ধু সত্যই দুর্লভ। এ কথা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, মুজফ্ফর আহমদের বৈপ্লবিক আদর্শে অনেকাংশে প্রেরণা গ্রহণ করে নজরুল অগি্নবীণা হাতে বাংলা কাব্যের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে আবির্ভূত হয়েছিলেন জাতীয় চারণের বেশে।’ [গুপ্ত ১৩৮৪ :২৯]

আর স্বয়ং মুজফ্ফর আহমদই লিখিয়াছেন, ‘নজরুল ইসলাম নিছক কবি ও সাহিত্যিক ছিল না।’ অর্থাৎ তাঁহার একটি ছকও ছিল। কি সেই ছকটি? এতদিনে সে ছকের কথা সবাই জানিয়া গিয়াছেন সন্দেহ নাই। কিন্তু তাঁহার জীবন প্রভাতে কেন, মধ্যাহ্নেও সে কথা সকলে জানিতেন কিনা সন্দেহ। মুজফ্ফর আহমদ জানাইতেছেন, ‘সে যে রাজনীতিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন সৈনিকও ছিল এ কথা তার কোনো কোনো সাহিত্যিক বন্ধু বুঝতে চাইতেন না। তাঁদের মধ্যে কবি শ্রীমোহিতলাল মজুমদারও ছিলেন।’ [আহমদ ১৩৬৬:২৪]

NazrulArmyনজরুল ইসলামের কবি প্রতিভা সম্বন্ধে মুজফ্ফর আহমদের একটা প্রস্তাব আছে। সেই প্রস্তাবানুসারে ‘কবিরূপী নজরুল’ ও ‘স্বাধীনতার সৈনিক নজরুল’—এই দুই নজরুলের সমন্বয় যেখানে হইয়াছিল সেখানেই তাঁহার কবি প্রতিভা আশ্চর্যরূপে বিকশিত হইয়াছিল। ১৯২০ সালের মধ্যভাগে [প্রথম সংখ্যার প্রকাশ ১২ জুলাই তারিখে] মুজফ্ফর আহমদ আর কাজী নজরুল ইসলামের যুগ্ম সম্পাদনায় সান্ধ্য দৈনিক ‘নবযুগ’ প্রকাশিত হইতে শুরু করে। পত্রিকার আয়ু দীর্ঘ হয় নাই—এ কথা সত্য, কিন্তু তাঁহার ছাপ দীর্ঘদিন থাকিয়া গিয়াছে। কারণের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁহার অনন্তগামী প্রতিভা। ‘বাঙলা দেশে নজরুলের মতো ভাগ্যবান কবি’ মুজফ্ফর আহমদের ধারণা ‘বোধ হয় আর কেউ জন্মাননি।’ তিনি লিখিয়াছেন :

মাসিক পত্রে মাত্র কয়েকটি কবিতা ছাপা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নজরুলের কবি খ্যাতি দেশময় ছড়িয়ে পড়ল। সে এক রকম রাতারাতি বাঙলার খ্যাতিমান কবিদের সঙ্গে আসন পেয়ে গেল। রবীন্দ্রনাথ তখন জীবিত, তাঁর প্রতিভা দিকে দিকে বিকীর্ণ। নজরুলের কণ্ঠে তখন গীত হচ্ছিল রবীন্দ্র সঙ্গীত! প্রসিদ্ধ রবীন্দ্র সঙ্গীত গায়ক শ্রীহরিদাস চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে সে তখন পরিচিত হয়েছে এবং তাঁর সঙ্গে একত্রে গানও গাইছে। সে মুখে আবৃত্তি করছে রবীন্দ্রনাথের কবিতা। এমন কি রবীন্দ্র কবিতার প্যারোডি ক’রে সে ‘নবযুগ’-এর হেডিং পর্যন্ত দিচ্ছে। যেমন—
আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার
পরান সখা ফৈসুল হে আমার।
ফৈসুল [ওরফে ফয়সাল] ইরাকের রাজা ছিলেন। এই নজরুল, বাইশ বছরের যুবক হঠাৎ কিনা রচনা করল এমন সব কবিতা যে সব সম্পূর্ণরূপে রবীন্দ্র প্রভাবমুক্ত, যে সব সম্পূর্ণরূপে তার একান্ত নিজস্ব। তাই তো সে রাতারাতি কবি প্রসিদ্ধি লাভ করত পারল।’ [আহমদ ১৩৬৬: ২৪-২৫]

প্রশ্ন হইতেছে: কি যাদু বলে নজরুল ইসলাম রবীন্দ্র প্রভাবের বাহিরে দাঁড়াইয়া থাকিতে পারিলেন? ইহার একপ্রস্ত জবাব—আমরা আগেই ইশারা করিয়াছি—মুজফ্ফর আহমদ লিখিয়াছেন। পড়ি তাঁহার বাক্যে: ‘এই সাহিত্যিক বন্ধুদের [ইঁহাদের মধ্যে কবি মোহিতলাল মজুমদারও ছিলেন] এটা লক্ষ করা উচিত ছিল যে কেন ‘নবযুগ’-এ কাজ করার সময়ে নজরুলের কবি প্রতিভা এমন আশ্চর্যরূপে বিকশিত হয়েছিল। এখানে দুই নজরুলের সমন্বয় ঘটেছিল—কবিরূপী নজরুলের ও স্বাধীনতার সৈনিক নজরুলের। তাই নজরুল এই সময়ে কবিতার এমন বিচিত্র সৃষ্টি করতে পেরেছিল, যে সৃষ্টি তার অভিনবত্বে সমস্ত দেশকে চমকে দিল।’ [আহমদ ১৩৬৬:২৪]

নজরুল ইসলামকে যাঁহারা গোড়াতেই ভুল বুঝিয়াছিলেন তাঁহাদের আদর্শ বা নমুনা [যাহাই বলুন] ছিলেন মোহিতলাল মজুমদার। মোহিতলাল মজুমদারের সহিত নজরুল ইসলামের তুলনা করিয়াছেন মুজফ্ফর আহমদ। মোহিতলালের যে ছবি মুজফ্ফর আহমদ আঁকিয়াছেন তাহা খুটাইয়া দেখিলে তাঁহাকে বিলক্ষণ চেনা যায়। ‘মুখচেনা বুদ্ধিজীবী’ পরিচয়ে। ‘মুখচেনা বুদ্ধিজীবী’ কথাটা আমি এস্তেমাল করিতেছি ইতালীয় বুদ্ধিজীবী মহাত্মা আন্তনিয়ো গ্রামসির লেখা হইতে। ‘মুখচেনা’ শব্দের ইংরেজি তর্জমা ‘ট্র্যাডিশনাল’। মোহিতলালকে তাই ‘মুখচেনা বুদ্ধিজীবী’ বলিতে বিশেষ অন্যায় নাই। বিশেষত মুজফ্ফর আহমদ লিখিয়াছেন:

মোহিতলাল ছিলেন অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক লোক। তাঁর পরিচয়ের পরিধি ছিল অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। অল্পসংখ্যক সাহিত্যিক ও সাহিত্যরসিক লোকের সঙ্গেই তিনি শুধু মেলামেশা করতেন। তার বাইরে তাঁর পরিচয় ছিল তাঁর স্কুলের ছাত্র ও শিক্ষকদের সঙ্গে। তিনি ছিলেন হাইস্কুলের হেড মাস্টার। এক সময়ে তিনি বন্দোবস্ত বিভাগের কানুনগো ছিলেন। সেই সময়ে সাধারণ মানুষদের সঙ্গে তাঁর কিছু সংযোগ ঘ’টে থাকবে, তার পরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার আর কোনো সংযোগ ছিল না। তাঁর মধ্যে পসন্দ-অপসন্দের মনোভাব এত প্রবল ছিল যে, সাহিত্যিকদের মধ্যেও বেশীর ভাগ লোকের সঙ্গে তিনি মিশতে পারতেন না। [আহমদ ১৩৬৬: ৪৬]

আর নজরুল ইসলাম ছিলেন, মুজফ্ফর আহমদের বিচারে, ‘মোহিতলালের সম্পূর্ণ উল্টা’। আমরা সেই হিসাবে নজরুল ইসলামকে জনসাধারণের পরমাত্মীয় বা ‘আত্মার আত্মীয়’ বুদ্ধিজীবী বলিতে পারি। ‘আত্মার আত্মীয়’ কথাটা এখানে আমি আন্তনিয়ো গ্রামসি প্রবর্তিত ‘অর্গানিক’ শব্দের কাজ চালাইবার যোগ্য তর্জমারূপে গ্রহণ করিতেছি। মুজফ্ফর আহমদের সাক্ষ্যও আমার এই প্রস্তাবের পথ পরিষ্কার করিয়াছে। তিনি লিখিয়াই গিয়াছেন, ‘সকল স্তরের লোকের সঙ্গে তার মতো ব্যাপক পরিচয় কম লোকেরই ছিল। যাঁরা নজরুলের কবিতা বোঝেননি তাঁরা তার কবিতার সুর, ধ্বনি ও ছন্দ ঝঙ্কারে মুগ্ধ হয়েছেন। তাই হয়ে তাঁরা আরও বেশি তার কবিতা শুনতে চেয়েছেন; অশিক্ষিত সাধারণকেও নজরুল তার গানের দ্বারা আকর্ষণ করেছে। সে শুধু গায়ক ছিল না হাজার হাজার গানের সে রচয়িতাও। এই কারণে নজরুল সর্বস্তরের মানুষের—বহু মানুষের কবি হতে পেরেছেন। আর মোহিতলাল শুধু বিদগ্ধ সমাজের অর্থাৎ গণিতসংখ্যক মানুষের কবি। [আহমদ ১৩৬৬: ৪৭]

মুখচেনা বা গণিত বুদ্ধিজীবীর সহিত গণদেবতা বা পরমাত্মীয় বুদ্ধিজীবীর যে ভেদ মোহিতলালের সহিত নজরুলের ভেদও ছিল সেই গোছেরই। মুজফ্ফর আহমদই তাহা পরিষ্কার করিয়া বলিয়াছেন। আমরা পড়িতেছি: ‘নজরুল জনগণের প্রতিনিধি ছিল। মোহিতলাল তা ছিলেন না এবং চেষ্টা করলেও তাঁর স্বভাবের দোষে তিনি তা হতে পারতেন না। অত্যন্ত খোলাখুলিভাবে নজরুল ছিল দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন সৈনিক। এখানেও তার সঙ্গে মোহিতলালের বিরাট পার্থক্য ছিল। রুশিয়ার সর্বহারা বিপ্লবকে নজরুল মনে-প্রাণে সমর্থন করেছে, নানাভাবে সে-বিপ্লবের বন্দনা সে করেছে। এই ব্যাপারেও তার সঙ্গে মোহিতলালের মিল ছিল না।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৪৭]

‘মোহিতলাল মজুমদার নজরুল ইসলাম সম্বন্ধে স্নেহান্ধ ছিলেন। খুব ঘনিষ্ঠভাবে মিশেও তিনি নজরুলের স্বভাব কেন যে বোঝেননি তা ভেবে আজও আমি আশ্চর্য হয়ে যাই’—এই আক্ষেপও করিয়াছেন মুজফ্ফর আহমদ। [আহমদ ১৩৬৬: ৪৭-৪৮]

মোহিতলালের ভুলটা কোথায় তাহাও দেখাইয়া দিয়াছেন মহান মুজফ্ফর আহমদ। লিখিয়াছেন, ‘তিনি প্রাণপণে নজরুলকে নিজের আকৃতিতে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে থাকলেন। এই ভাবে গঠিত হওয়ার মানে আত্ম-বিলুপ্তি। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কোনও ব্যক্তি কি তা সহ্য করতে পারে?’ [আহমদ ১৩৬৬: ৪৯]

শুদ্ধ কি তাহাই? ‘মোহিতলাল নজরুলকে শেলি, কীট্স, বায়রন আর ব্রাউনিং পড়তে বলতেন তার ‘বুদ্ধির দীপায়নের জন্যে’। দূরে থেকে যাঁরা শুনবেন তাঁরা বলবেন ভালোই তো বলতেন মোহিতলাল। কিন্তু নজরুলের জন্যে বিদেশি কবিদের কাব্য চর্চার প্রয়োজন ছিল কি? সে ছিল আমাদের দেশের মাটির সন্তান। দেশের মাটি হতেই রস গ্রহণ করত সে। মাটির কাছাকাছি যে কবির বাণী শোনার জন্যে রবীন্দ্রনাথ কান পেতে ছিলেন নজরুল ছিল সেই কবি।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৪৯]

মোহিতলাল মজুমদারের কথা এতখানি জুড়িয়া বলিবার আরও একটা কারণ আমার মাথায় আছে। এই কারণের নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মুজফ্ফর আহমদ আক্ষেপ করিয়াছেন খুব ঘনিষ্ঠভাবে মিশিয়াও মোহিতলাল নজরুল ইসলামকে অথবা বলা যাউক তাঁহার স্বভাবকে বুঝিতে পারিলেন না। তাহা হইলে কে তাহাকে বুঝিতে পারিয়াছিলেন? মুজফ্ফর আহমদ উত্তরে বলিয়াছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ’। মুজফ্ফর আহমদ প্রাতঃস্মরণীয় মহাপুরুষ। আমরা সবিনয়ে নিবেদন করিব তাঁহার এই উত্তরটি কিন্তু অসত্য, বড় জোর অর্ধসত্য। তাঁহার আপনকার কথাই তাঁহার ধারণাকে অসত্য প্রমাণ করিতেছে।

মুজফ্ফর আহমদ লিখিয়াছেন, ‘কিন্তু রবীন্দ্রনাথ দূরে থেকেও নজরুলকে বুঝেছিলেন।’ প্রমাণ? তিনি নিবেদন করিতেছেন, ‘কবি রূপে প্রথম পরিচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নজরুল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করেছিল এবং তার স্নেহও সে পেয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ তাকে শান্তিনিকেতনে থাকার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, নজরুল ছেলেদের কিছু কিছু ড্রিল শেখাবে। আর দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিকটে গান শিখবে।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৪৮]

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নজরুলকে গান শিখাইতে চাহিয়াছিলেন। ইহাতে স্নেহের প্রমাণ অকাট্য। কিন্তু তাঁহার সব্যসাচী প্রতিভার মধ্যে শুদ্ধ ড্রিল শিখাইবার দক্ষতাই জ্যেষ্ঠকবির দৃষ্টি কাড়িয়াছিল ভাবিতে গা ছমছম করে। আজও করে। শান্তিনিকেতনে নজরুলকে কি একটি বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান যাইত না? ১৯৩৫ সালে কাজী আবদুল ওদুদকে কি নিজাম বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রণ করা হয় নাই? কথা বাড়াইলে আরও বাড়াইতে পারি। কিন্তু বাড়াইবার সময় আসে নাই।

Nazrul_at_Sitakunda_1929মুজফ্ফর আহমদ কহিতেছেন, ‘এই সময়েই রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁচার কথাটা বলেছিলেন। তিনি সম্ভবত নজরুলের কাব্য-সাধনা ও রাজনীতিক সংগ্রামে সমন্বয়ের চেষ্টা দেখে এই কথাটি ব’লে থাকবেন।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৪৮]

তলোয়ার দিয়া দাড়ি চাঁছিবার গল্পটি এতদিনে পুরাতন হইয়া গিয়াছে। তথাপি তাঁহার তাৎপর্য এখনও তাজাবতাজা রহিয়াছে বলিয়া ভ্রম হয়। কথাটি নানান জনে নানান ভাবে বয়ান করিয়াছেন। একটা বয়ান পাওয়া যাইতেছে সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়ের লেখায়। তাঁহার লেখার কিছু অংশ সুশীলকুমার গুপ্ত উদ্ধার করিয়াছেন। নিবেদন করি:

‘জোড়াসাঁকোর বাড়িতেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাবার সময় তেমন-তেমন বড়লোককেও সমীহ করে যেতে দেখেছি, অতি বাকপটুকেও ঢোক গিলে কথা বলতে শুনেছি। কিন্তু নজরুলের প্রথম ঠাকুরবাড়িতে আবির্ভাব সে যেন ঝড়ের মত। অনেকে বলত, তোর এসব দাপাদাপি চলবে না জোড়াসাঁকোর বাড়িতে, সাহসই হবে না তোর এমনিভাবে কথা কইতে। নজরুল প্রমাণ করে দিলে যে সে তা পারে। তাই একদিন সকালবেলা “দে গরুর গা ধুইয়ে” এই রব তুলতে তুলতে সে কবির ঘরে গিয়ে উঠল। কিন্তু তাকে জানতেন বলে কবি বিন্দুমাত্রও অসন্তুষ্ট হলেন না। শুনেছি অনেক কথাবার্তার পর কবি নাকি বলেছিলেন, “নজরুল, তুমি নাকি তরোয়াল দিয়ে আজকাল দাড়ি কামাচ্ছ—ক্ষুরই ও-কার্যের জন্যে প্রশস্ত—এ কথা পূর্বাচার্যগণ বলে গেছেন”।’ [গুপ্ত ১৩৮৪: ৩০; চট্টোপাধ্যায় ১৩৫১: ৩৮]

এ বিষয়ে মুজফ্ফর আহমদের ভাষ্য এই রকম: ‘রবীন্দ্রনাথ একবার নজরুলকে তলওয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁচার কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন তিনি সত্যই। কিন্তু কথাটা নানান জনে নানানভাবে লিখেছেন। সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরও এক জায়গায় কথাটা লিখেছেন। আমি নজরুলের মুখে যা [শুনেছিলেম] তা হচ্ছে এই যে, সাক্ষাতের প্রথম দিনেই রবীন্দ্রনাথ কথাটা নজরুলকে বলেছিলেন। তখনও তিনি ভাবেননি যে, নজরুল গভীরভাবে রাজনীতিক সংগ্রামে বিশ্বাসী। নজরুল কবি, কাব্যচর্চাই তার পেশা হওয়া উচিত। তার মানে রাজনীতিতে তার যাওয়া উচিত নয়—এইসব ভেবেই তিনি তলওয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁচার কথাটা বলেছিলেন। অন্তত নজরুল তাই বুঝেছিল। রবীন্দ্রনাথ শুধু ওই কথা বলেই চুপ করে যাননি। তিনি তার সঙ্গে একটি প্রস্তাবও দিয়েছিলেন; বলেছিলেন, নজরুল শান্তিনিকেতনে চলুক। সেখানে সে ছেলেদের কিছু কিছু ড্রিল শেখাবে আর গান শিখবে দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে।’ [আহমদ ১৯৭৩ :২৪০]

‘কিন্তু’, মুজফ্ফর আহমদ দাবি করিতেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ পরে নজরুলের ঝোঁক ধরতে পেরেছিলেন। তাই নজরুল যখন ‘ধূমকেতু’ বার করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদ ভিক্ষা করেছিল তখন রবীন্দ্রনাথ তাকে রাজনীতিক আশীর্বাদই করেছিলেন। তার আশীর্বাণীর সেই ক’টি ছত্র অনেকেরই মুখস্থ। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন:

কাজী নজরুল ইসলাম
কল্যাণীয়েষু,

আয় চলে আয়, রে ধূমকেতু,
আঁধারে বাঁধ অগি্নসেতু,
দুর্দিনের এই দুর্গশিরে
উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন!
অলক্ষণের তিলক রেখা
রাতের ভালে হোক না লেখা।
জাগিয়ে দে রে চমক মেরে’
আছে যারা অর্দ্ধচেতন!

শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

২৪ শে শ্রাবণ, ১৩২৯ [আহমদ ১৩৬৬: ৪৮]

‘ধূমকেতু’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা বাহির হইল ১৯২২ সালের ১২ আগস্ট তারিখে। [আহমদ ১৯৭৩: ২৪১] মুজফ্ফর আহমদ আরেক জায়গায়ও লিখিয়াছেন, “কিন্তু ‘ধূমকেতু’র জন্যে নজরুল যখন রবীন্দ্রনাথের নিকট হতে বাণী চাইল তখন তিনি তাকে বুঝে ফেলেছিলেন। তিনি বুঝে নিয়েছিলেন যে, সে নিজে যে-পথ বেছে নিয়েছে তাকে সেই পথে যেতে দিলেই সে বিকশিত হবে। তাই রবীন্দ্রনাথ যে-বাণী নজরুলকে পাঠিয়েছিলেন সেটা ছিল নজরুলের প্রতি তাঁর রাজনীতিক আশীর্বাদ।’ [আহমদ ১৯৭৩: ২৪০]

নজরুল ইসলামের ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতাটি ১৯২৬ কি ১৯২৭ সালে প্রকাশিত ‘সর্বহারা’ নামধেয় কাব্যগ্রন্থে পাওয়া যায়। সেই কবিতার সাক্ষ্য কিন্তু মুজফ্ফর আহমদের কথাটিকে সত্য প্রমাণ করে না।

‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতার গোড়ার দিকেই রবীন্দ্রনাথের কথা স্মরণ করিয়াছেন নজরুল ইসলাম। নজরুলের রাজনীতি ও জাতীয়তার সাধনা দুই বস্তুকেই যে বিচারের মুখোমুখি দাঁড়াইতে হইয়াছিল তাহার পুরানা পাথুরিয়া প্রমাণ পাওয়া যায় এই কবিতায়। যথা:

কবি-বন্ধুরা হতাশ হইয়া মোর লেখা প’ড়ে শ্বাস ফেলে!
বলে, কেজো ক্রমে হ’চ্ছে অকেজো পলিটিক্সের পাশ ঠেলে।
পড়ে না’ক বই, ব’য়ে গেছে ওটা।
কেহ বলে, বৌ-এ গিলিয়াছে গোটা।
কেহ বলে, মাটি হ’ল হয়ে মোটা জেলে ব’সে শুধু তাস খেলে!
কেহ বলে, তুই জেলে ছিলি ভালো ফের যেন তুই যাস জেলে!
গুরু ক’ন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা!
প্রতি শনিবারী চিঠিতে প্রেয়সী গালি দেন, ‘তুমি হাঁড়ি চাঁচা!’
আমি বলি, ‘প্রিয়ে, হাটে ভাঙি হাঁড়ি!’
অমনি বন্ধ চিঠি তাড়াতাড়ি।
সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে। হিন্দুরা ক’ন, ‘আড়ি চাচা!’
যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা!”

[ইসলাম ২০০৫: ৭১; ইসলাম ২০০৭: ২৩; ইসলাম ১৯৯৬ (১): ২৯২-২৯৩]

দেখা যাইতেছে তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছিবার কাজটা নজরুল ইসলাম চালাইয়া গেলেন, অন্তত বন্ধ করিলেন না। অথচ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজ গুণে তাঁহাকে বুঝিতে পারিয়া ‘রাজনীতিক আশীর্বাদ’ পাঠাইলেন। এখানেই প্রশ্ন তুলিবার একটুখানি অবসর আছে। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার রাজনীতিটা কি ছিল? খোদ মুজফ্ফর আহমদ এ ব্যাপারে কি বলেন?

মুজফ্ফর আহমদ নিজে কি ‘ধূমকেতু’র রাজনীতি সমর্থন করিতেন? এই প্রশ্নের উত্তরে আমাদের অবশ্যই বলিতে হইবে, ‘না’। এই ‘না’ উত্তরটি আরও বড় হইয়া বাজিবে যখন জানিব নজরুল ইসলাম একদা মুজফ্ফর আহমদের সহিত যুগ্ম সম্পাদকতা করিয়া ‘নবযুগ’ বাহির করিয়াছিলেন। আবার ১৯২৫ ও ১৯২৬ সাল নাগাদ প্রথমে ‘লাঙ্গল’ এবং পরে ‘গণবাণী’ বাহির করিয়াছিলেন তাঁহারা। গণ্ডগোলের মধ্যে ‘ধূমকেতু’। মুজফ্ফর আহমদের লেখা পড়িয়াই আমরা জানিয়াছি, “‘ধূমকেতু’তে জনগণের কথা একেবারেই বলা হতো না, এটা মোটেই ঠিক কথা নয়। তবে ‘ধূমকেতু’র মারফতে নজরুল মূলত তার আবেদন জানাচ্ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণীর শিক্ষিত তরুণদের বরাবরে। নিরুপদ্রব অসহযোগ আন্দোলনের খাতিরে বাংলার সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীরা তাঁদের কার্যকলাপ বন্ধ রেখেছিলেন। নজরুলের আবেদন আসলে পৌঁছে যাচ্ছিল তাঁদেরই নিকটে।” [আহমদ ১৯৭৩: ২৪১]

‘ধূমকেতু’ পত্রিকা বিষয়ে মুজফ্ফর আহমদের আরও কথা আছে। এই পত্রিকা, তাঁহার বিচারে, জনগণের নিকটে পৌঁছাইতে পারে নাই। মুজফ্ফর আহমদ জানাইতেছেন: “শিক্ষিত ভদ্রলোক শ্রেণীর ভিতরে তার প্রচার সীমাবদ্ধ ছিল। এখানেই ‘ধূমকেতু’ খুব বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীরাও এই শ্রেণীর লোক। কাজেই, নজরুলের আবেদনে তাঁরাই নূতন করে চেতনা লাভ করেছিলেন।” [আহমদ ১৯৭৩: ২৪১]

এই প্রস্তাবের সাফাই সাক্ষ্য দিবার ছলে মুজফ্ফর আহমদ আরও গাহিয়াছেন, ‘এটা আমার অনুমানের কথা নয়। শুধু যে তরুণেরা নজরুলের নিকট আসছিলেন তা নয়, সন্ত্রাসবাদী “দাদা”রাও [নেতারা] এসে তাকে আলিঙ্গন করে যাচ্ছিলেন। ১৯২৩-২৪ সালে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন আবার যে মাথা তুলল, তাতে নজরুলের অবদান ছিল। এ কথা বললে বোধ হয় অন্যায় করা হবে না। সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের দুটি বড় বিভাগের মধ্যে “যুগান্তর” বিভাগের সভ্যরা তো বলেছিলেন, “ধূমকেতু” তাঁদেরই কাগজ।’ [আহমদ ১৯৭৩: ২৪১-২৪২]

‘অনুশীলন’ দলের শ্রীঅতীন রায়চৌধুরীও ‘ধূমকেতু’কে অভিনন্দন জানাইয়াছিলেন। [আহমদ ১৩৬৬: ৮২] এককথায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশীর্বাদ—’জাগিয়ে দেরে চমক মেরে/ আছে যারা অর্দ্ধচেতন’—ফলিয়াছিল। তাহাতে নজরুলের লেখা পড়িয়া বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী যুবকেরা সত্যই চমকিয়া উঠিয়াছিলেন। [আহমদ ১৩৬৬: ৮৬] মুজফ্ফর আহমদ অকপট লিখিয়াছেন, ‘সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের প্রতি নজরুলের বড় আকর্ষণ ছিল।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৮২]

এক্ষণে প্রশ্ন হইতে পারে, কাজী নজরুল ইসলামের রাজনীতিটা কী বস্তু ছিল? ইহার উত্তর খানিক জোগাইয়াছেন মুজফ্ফর আহমদ। তিনি লিখিয়াছেন, ‘১৯২২ সালের ভদ্রশ্রেণীর মধ্যে যাঁরা রাজনীতি করতেন তাঁদের ধারণা ছিল যে, দেশের মুক্তি শুধু তারাই আনতে পারবেন, আর মজুর ও কৃষকেরা গড্ডলিকা প্রবাহের মতো তাঁদের অনুসরণ করবেন। যাঁরা রাজনীতি করতেন না তাঁরা তো মজুর-কৃষকের নাম শুনলেই নাক সিঁটকাতেন। আজ অবস্থায় বিপুল পরিবর্তন এসেছে। ভদ্রলোকেরা এখন মজুরে পরিণত হচ্ছেন। নজরুল ইসলামের চেতনায়ও পরিবর্তন এসেছিল। ১৯২২ সালের পরে মজুর, কৃষক ও জনগণকে বাদ দিয়ে নজরুলকে কল্পনা করাই যেত না।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৮৫]

নজরুল ইসলামের ‘ধূমকেতু’র সঙ্গে মুজফ্ফর আহমদের কোনো সাংগঠনিক যোগ ছিল না। ‘তার মানে’, মুজফ্ফর আহমদ লিখিতেছেন, ‘তার পরিচালনায় ও নীতিনির্ধারণে আমার কোনও হাত ছিল না।’ তবে তিনি হামিশা ‘ধূমকেতু’ অফিসে যাইতেন। অনেক সময় রাত্রে সেখানে বাসও করিতেন। তাহার পরও তিনি কবুল করিয়াছেন, ‘নজরুল যে শুধুই মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকদের নিকট তার আবেদন জানাচ্ছিল তার একটা উল্টো প্রতিক্রিয়া আমার ভিতরে হয়েছিল।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৮৩] সম্পাদকের নামেও গ্রেফতারি পরোয়ানা বাহির হইলে তখন মুজফ্ফর আহমদ নজরুল ইসলামকে রক্ষা করিতে আগাইয়া আসিলেন। পরোয়ানা জারি হইবার কয়েকদিন আগে হইতেই কয়দিন ধরিয়া কেবলই গুজব রটিতে লাগিল যে নজরুল ইসলামের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা বাহির হইবে। বন্ধুদের অনেকে বলিলেন নজরুল কিছুদিন সরিয়া থাকিলে ভালো হয়। মুজফ্ফর আহমদ লিখিয়াছেন, ‘আমি বললাম, “তুমি যদি সরেই থাকতে চাও তবে চেষ্টা করে দেখা যাক তোমায় মস্কো পাঠানো যায় কি না।” কমিউনিস্ট ইন্টরন্যাশনালে ভারতীয় ব্যাপারের যাঁরা চার্জে ছিলেন নজরুলের লেখার সংগ্রামশীলতা তাঁদের আকর্ষণ করেছিল। তাঁরাই জানিয়েছিলেন নজরুলকে একবার পাঠাতে পারলে মন্দ হয় না।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৮৬] নজরুল গা করিলেন না। গা ঢাকাও দিলেন না। কলিকাতা ছাড়িলেন, কিন্তু গেলেন কোথায়? মস্কো না, মাত্র কুমিল্লা।

শুধু এই কারণে নহে, আর আর পাঁচ কারণেও মুজফ্ফর আহমদ একটু চটিয়া ছিলেন। তাঁহার জবানীতেই শুনি সেই কাহিনী। তিনি লিখিতেছেন, ‘১৯২২ সালের নবেম্বর মাসে নজরুল আর আমি ঠিক করি যে, আমরা কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার কাজে এগিয়ে যাব। পড়াশুনা করব বলে সামান্য কিছু পুঁথিপুস্তকও কিনেছিলাম। এই ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে নজরুল তার ‘বিদ্রোহী’ লিখেছিল। কিন্তু ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নজরুল কুমিল্লায় চলে গিয়ে অনেক দিন সেখানে থাকল। সেই সময়ে চিঠিপত্রের ভিতর দিয়ে তার সঙ্গে আমার কিঞ্চিত চটাচটিও হয়ে গেল।’ [আহমদ ১৯৭৩: ২৪৮]

পরক্ষণেই মুজফ্ফর আহমদ লিখিতেছেন, ‘অবশ্য, এমন কোনো চটাচটি নয় যার জন্যে আমাদের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যাবে। কুমিল্লা গিয়ে নজরুল যে ‘প্রলয়োল্লাস’ লিখেছিল সেটা আমার দৃষ্টিতে ঠিকই ছিল। কিন্তু কলকাতায় ফিরে এসে ‘ধূমকেতু’তে লিখতে গিয়ে নিজের প্রচণ্ড আবেগের স্রোতে সে নিজেই ভেসে গেল। সে যে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার চেষ্টা করবে স্থির করেছিল তার সেই বিবেককে সে লাল পোশাক পরে, লাল কালিতে লিখে, এবং মাঝে মাঝে লাল নিশানের কথা বলে ঠিক রাখছিল।’ [আহমদ ১৯৭৩: ২৪৮]

এক্ষণে মুজফ্ফর আহমদ সিদ্ধান্ত টানিতেছেন। তাঁহার ধারণা, “কিন্তু নজরুল যদি গিরেফ্তার না হতো এবং তার ‘ধূমকেতু’ যদি চলতে থাকত তবে তার লেখা তাকে বদলাতে হতো। এই জাতীয় লেখা ক্রমাগত লেখা যায় না। ভিতরের আবেগ নিঃশেষ হয়ে আসে। তখন নজরুলকে জনগণের দিকেই ঝুঁকতে হতো।’ [আহমদ ১৯৭৩: ১৪৮]

মুজফ্ফর আহমদের এই অনুমান বা প্রার্থনা পুরাপুরি কল্পনার ফসল নহে আর মোহিতলাল মজুমদারের উপদেশও বৃথা যায় নাই। ‘পড়ে না’ক বই, বয়ে গেছে ওটা’—কথাটাও গোটা গোটা বেদবাক্য হয় নাই। শ্রমিকের ওপর লেখা ইংরেজ কবি শেলির কবিতা বা গানের ভাবানুবাদও নজরুল ইসলাম করিয়াছিলেন। ১৯২৭ সালের ৫ মে তারিখের ‘গণবাণী’ হইতে তাহার উদ্ধৃতি প্রকাশ করিয়াছেন মুজফ্ফর আহমদ। আমরাও তাহা এখানে আবার তুলিয়া দিতেছি।

ওরে ও শ্রমিক, সব মহিমার উত্তর-অধিকারী!
অলিখিত যত গল্প কাহিনী তোরা যে নায়ক তারি।।
শক্তিময়ী সে এক জননীর
স্নেহ সূত সব তোরা যে রে বীর।
পরস্পরের আশা যে রে তোরা,
মা’র সন্তাপহারী।।
নিদ্রোত্থিত কেশরীর মত
উঠ্ ঘুম ছাড়ি নব জাগ্রত!
আয় রে অজেয় আয় অগণিত দলে দলে মরুচারী।।
ঘুম ঘোরে ওরে যত শৃঙ্খল
দেহ মন বেঁধে করেছে বিকল,
ঝেড়ে ফেল সব, সমীরে যেমন ঝরায় শিশির বারি।
উহারা ক’জন? তোরা অগণন, সকল শক্তিধারী।।

[আহমদ ১৩৬৬: ৪৯]

নজরুল ইসলাম শ্রমিক শ্রেণীর আন্তর্জাতিক সঙ্গীতের যে বাংলা তর্জমা করিয়াছিলেন—জাগো অনশন-বন্দী, ওঠরে যত/ জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত!—তাহার তুলনা আজও নাই। আমাদের যুগের আরেক অমর গল্প-মহাত্মা ফ্রান্স ফানোঁ রচিত ‘লে দাম্নে দু লা তের’ [Les Damnés de la Terre] অনুবাদের শিরোনামায়ও নজরুলের অমর বাক্য ‘জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত’ নিয়োগ করা হইয়াছে। [ফানোঁ ১৯৮৮]

গত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের গোড়ার দিকে চীন দেশের নেতা জিয়াং জিয়েসি [Jiang Jieshi, ১৮৭৭-১৯৭৫] [তৎকালে ইঁহার নাম চিয়াং কাইশেক বলিয়া প্রচারিত হইত] ভারত সফরে আসিয়াছিলেন। তখন তাঁহার বন্দনার্থে একপ্রস্ত গান রচনার অনুরোধ গ্রামোফোন কোম্পানির তরফ হইতে করা হইল নজরুল ইসলামকে।

১৯৫৯ সালের স্মৃতিকথায় মুজফ্ফর আহমদ সে কথা স্মরণ করিয়া লিখিতেছেন, ‘আজ যে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে নজরুল হতবাক ও হৃত-সন্বিব্দৎ হয়েছে সে ব্যাধির আক্রমণ তখন তার শরীরে শুরু হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও নজরুল গান রচনা করেছিল।’ মুজফ্ফর আহমদের মন্তব্য: ‘এবং এই গানটি চিয়াং কাইশেকের বন্দনা নয়। যিনিই গানটি পড়বেন তিনি বুঝতে পারবেন যে তা আসলে চীন ও ভারতের নিপীড়িত মানুষের বন্দনা।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৭৪]

পুরো গানটি তুলিয়া দেওয়ার মতো। নজরুল রচনাবলীতেও এই গানটি সসম্মানে সংকলিত হইয়াছে। মুজফ্ফর আহমদ বলিয়াছেন, ‘এটি নজরুলের লেখা শেষতম গান কি-না তা বলা শক্ত, তবে তার শেষ লেখাগুলির মধ্যে এই গানটি যে অন্যতম তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।’ [আহমদ ১৩৬৬: ৭৪]

চীন ও ভারতে মিলেছি আবার মোরা শত কোটি লোক।
চীন ভারতের জয় হোক! ঐক্যের জয় হোক! সাম্যের জয় হোক!
ধরার অর্ধ নর-নারী মোরা রহি এই দুই দেশে,
কেন আমাদের এত দুর্ভোগ নিত্য দৈন্য ক্লেশে,
সহিব না আর এই অবিচার, খুলিয়াছে আজি চোখ।।
চীন ভারতের জয় হোক! ঐক্যের জয় হোক! সাম্যের জয় হোক!

প্রাচীন চীনের প্রাচীর ও মহাভারতের হিমালয়
[আজ] এই কথা যেন কয়,
মোরা সভ্যতা শিখায়েছি পৃথিবীরে
ইহা কি সত্য নয়?
হইব সর্বজয়ী আমরাই সর্বহারার দল,
সুন্দর হবে, শান্তি লভিবে, নিপীড়িতা ধরাতল!
আমরা আনিব অভেদ ধর্ম নব বেদগাথা শ্লোক।।
চীন ভারতের জয় হোক! ঐক্যের জয় হোক! সাম্যের জয় হোক!

[আহমদ ১৩৬৬: ৭৪-৭৫; ইসলাম ১৯৯৬ [৩]: ৫৪৭-৫৪৮]

এই গানটির রচনাকাল, নজরুল রচনাবলী অনুসারে, ফেব্রুয়ারি ১৯৪২। শ্রীজগন্ময় মিত্র গ্রামোফোন কোম্পানির রেকর্ডে এই গানটি গাহিয়াছিলেন। [ইসলাম ১৯৯৬ (৩): ৫৪৮]

দোহাই

১. কাজী নজরুল ইসলাম, সঞ্চিতা, পুনর্মুদ্রণ [ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৫]।
২. কাজী নজরুল ইসলাম, সর্বহারা, পুনর্মুদ্রণ [ঢাকা: আগামী প্রকাশনী, ২০০৭]।
৩. কাজী নজরুল ইসলাম, নজরুল রচনাবলী, ১ম খণ্ড, আবদুল কাদির সম্পাদিত, সংশোধিত সংস্করণ, পুনর্মুদ্রণ [ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৬]।
৪. কাজী নজরুল ইসলাম, নজরুল রচনাবলী, ৩য় খণ্ড, আবদুল কাদির সম্পাদিত, সংশোধিত সংস্করণ, পুনর্মুদ্রণ [ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৬]।
৫. ফ্রাঞ্জ ফেনো, জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত, আমিনুল ইসলাম ভুঁইয়া অনূদিত [ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৮৮]।
৬. মুজফ্ফর আহমদ, কাজী নজরুল প্রসঙ্গে (স্মৃতিকথা), প্রথম সংস্করণ [কলিকাতা: বিংশ শতাব্দী প্রকাশনী, ১৩৬৬/১৯৫৯]।
৭. মুজফ্ফর আহমদ, কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা, পুনর্মুদ্রণ [ঢাকা : মুক্তধারা, ১৯৭৩]।
৮. সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায়, ‘আমাদের নজরুল,’ কবিতা [কার্তিক-পৌষ, ১৩৫১]।
৯. সুশীলকুমার গুপ্ত, নজরুল-চরিতমানস, পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ [কলিকাতা: দে’জ পাবলিশিং, ১৩৮৪]।


প্রথম প্রকাশ: দৈনিক সমকাল

[দ্রষ্টব্য: মুজফ্ফর আহমদ নামের বানানে হ-এর নিচে হসন্ত হইবে। হসন্ত যোগে লিখিতে গেলে ছাপার সময় পরের অক্ষরের সহিত মিলিয়া যুক্তাক্ষরের রূপ গ্রহণ করিতেছে। এই অসুবিধা দূর করিতে এইখানে হসন্ত পরিহার করা হইয়াছে।–সম্পাদক]

Copyright 2012 Salimullah Khan

Spirit of liberation war

Translated by Tahmidal Zami

Recently a debate has cropped up over the finer points of the question what the spirit of liberation war really means. But I hope that no one would contest some very basic points. The most fundamental point would be ‘liberation’ or the right of any nation or people to self-determination as recognized by international law.

After the March 25 midnight, that is, in the early hours of March 26, Bangladesh practically declared independence. After two weeks, the provisional government was constituted. This very fact bears out that Bangladesh was not prepared – at least not completely – for proclamation of independence. This government known as Mujibnagar Government issued ‘the Proclamation of Independence’ on 10th day of April, 1971. Accepting this Proclamation of Independence as a document of evidence would resolve the debate over a few issues. The proclamation of 10th April was issued by and under the authority of Constituent Assembly of Bangladesh composed of representatives elected in the free elections held in Bangladesh from 7th December, 1970 to 17th January, 1971. The representatives were elected to the Pakistan National Assembly and East Pakistan Provincial Assembly.

I

The Proclamation of 10th April 1971 also offers an explanation of the reasons for which Bangladesh declared independence. According to this explanation, the representatives of Bangladesh did not proclaim independence spontaneously or unilaterally. They were compelled to proclaim independence, because ‘instead of fulfilling their promise and while still conferring with the representatives of the people of Bangladesh, Pakistan authorities declared an unjust and treacherous war.’

In the very Proclamation of 10th April it was stated that ‘Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, the undisputed leader of 75 million of people of Bangladesh, in due fulfilment of the legitimate right of self-determination of the people of Bangladesh, duly made a declaration of independence at Dacca on March 26, 1971, and urged the people of Bangladesh to defend the honour and integrity of Bangladesh.’ Unfortunately in the times that followed a few kicked off a controversy on the question of Proclamation of Independence. Has anyone so far challenged the authenticity of the Proclamation of 10th April? If not, the question follows: which particular points of the Proclamation are they challenging?

The question would arise: why was independence proclaimed in the night of 26th March? The Proclamation of 10th April provides an explanation of that as well. The Proclamation lays out the explanation in five points.

Firstly, ‘free elections were held in Bangladesh from 7th December, 1970 to 17th January, 1971, to elect representatives for the purpose of framing a Constitution [for Pakistan],’

Secondly, ‘at these elections the people of Bangladesh elected 167 out of 169 representatives belonging to the Awami League,’

Thirdly, ‘General Yahya Khan [the President of Pakistan] summoned the elected representatives of the people to meet on the 3rd March, 1971, for the purpose of framing a Constitution,’

Fourthly, ‘the Assembly so summoned was arbitrarily and illegally postponed for an indefinite period [by the Pakistani Authorities],’

And finally, ‘instead of fulfilling their promise and while still conferring with the representatives of the people of Bangladesh, [the] Pakistan authorities declared an unjust and treacherous war.’

স্বাধীনতার ঘোষণা স্বাধীনতার ঘোষণা

What has been said so far – that is, ‘an unjust and treacherous war’ prosecuted by Pakistan – was the necessary and sufficient reason behind Bangladesh’s proclamation of independence. Pakistani authorities did not stop at mere declaration of war. From the midnight of 25th March, they began ‘continuously committing numerous acts of genocide and unprecedented tortures, amongst others on the civilian and unarmed people of Bangladesh.’

It was owing to Pakistan’s imposition of the unjust war and committing acts of genocide and other forms of repression that Bangladesh declared independence and the representatives of the people of Bangladesh issued the Proclamation of Independence. Through this proclamation, they laid down the lawful basis of a just war. In looking back, it therefore can be said that in response to the war, genocide, and repression waged by Pakistani authorities, the people of Bangladesh began the war of liberation to establish their effective control over the territories of Bangladesh. In this war, the critical asset of the people was their ‘heroism, bravery and revolutionary fervour’.

II

What has been said so far, i.e. just war in the face of unjust war – is only half of the truth. The question would arise: what would be the vision of the state that would be established through the just war? The Proclamation of 10th April offers an answer also to this question. The Proclamation stated that the reason that held universal sway in establishing People’s Republic of Bangladesh was ‘to ensure for the people of Bangladesh equality, human dignity and social justice’.

The people of Bangladesh engaged in armed struggle to establish effective control over the territories of Bangladesh. The unconditional surrender of Pakistani authorities on 16th December, 1971 made that control definitive. The liberation war of Bangladesh achieved victory. The spirit that inspired all classes of people of Bangladesh from 26th March to 16th December, 1971 – which finds its expression in the Proclamation of 10th April – is precisely the spirit of liberation war.

After gaining the legitimate right of national self-determination, i.e. independence, we still have to draw up the balance sheet to see what we have achieved. Why was martial law clamped over the country within four years of independence? We must ask this question. Why those who were the elected representatives of the people’s assembly or National Parliament for the four years could not exercise their ‘heroism, bravery and revolutionary fervour’ to establish their control in resisting martial law? This is another question to ask.

Since then, 15 years passed under military rule in one form or another. Since 1990 – excluding two years – legitimate system of government has been reinstated. But has there been any salving of the people’s misery and suffering? Have ‘equality, human dignity and social justice’ been established? If not, who is responsible for the lapse? The spirit of the liberation war lies not in evading these questions, but in asking them.

Pakistan became ‘independent’ on the 14th August, 1947. A little over ten years inside independence, i.e. on 27th October, 1958, military rule was thrust upon the country for the first time. In late 1964, Dr. Muhammad Shahidullah, keeping the chain of events in mind, wrote: ‘What fruit have we plucked with our independence? We profess our gratitude to the United States and other allied nations with whose financial and other support we have made a certain degree of progress. That we have not been able to achieve complete success is chiefly due to the fact that those who were at the helm of government prior to the declaration of martial law on 27th October, 1958 were servants of the English. Even after independence, they could not quite rise above the servile mentality.’ Muhammad Shahidullah also added another sentence to this: ‘Then again those who were the elected representatives of the National or Provincial Assembly were – save a few exceptions – firm believers in the principles of nepotism and pocketism, which as understood in Bengali means, patronage of one’s own kin and filling of one’s own pockets.’

Dr Shahidullah identified corruption as the main driving factor that made military rule necessary in Pakistan. But he was also aware that mere change of ruler does not bring about change in the nation’s lot. Military rule in Pakistan did not change the lot of the people of that country. The reason behind this – according to Dr Shahidullah – was the ignorance of the people of Pakistan. It would not be amiss to quote further from his powerful words: ‘For a blind man, day or night makes no difference. For an ignoramus, liberty and bondage are all the same. What can we expect when only four to five percent of the population literate in truth? An ignoramus too counts no more than a minor. Kinsfolk of a minor face no trouble in deceiving him/her to fill their pockets at his/her expense. Same thing happened in this country.’

It has been 43 years since Bangladesh has achieved independence. Bangladesh has also seen her share of progress. But what has been the change to the fortune of people – who are the society’s base and to whom the supreme power of Bangladesh belongs? In these 43 years – setting other questions aside, let us at least ask this question – what percentage of the people has been truly educated?

III

We assert on a regular basis that three million people lost their lives in the liberation war of Bangladesh. Yet, in the ensuing 43 years we have not been able to prepare a complete list of the martyrs. How then would we ensure ‘equality, human dignity and social justice’? Ahmed Sofa, the great writer, raised this question in an article published on 12th December, 2000. As of today, I have not received an adequate response to this question yet. The question thus merits some elaboration.

Ahmed Sofa was born in the Patiya upazila of the Chittagong (south) district. The name of his village is Gachbaria. It has fallen under the newly constituted Chandanaish upazila. During the liberation war, he left the country and going via Agartala, took refuge in Calcutta. At the end of the war, he came back first to Dhaka, then to his village. What followed has been described in his article: ‘Since 1972, whenever I have visited my village, I tried to make the village people agree to one matter. I repeatedly solicited the local people – including the [Union Parishad] members, Chairmen, and Matabbars – on the issue: I tried to make them understand that around 100 people of our village lost their lives at the hand of the Pakistani Army, Razakars, and Al-Badrs. The Chittagong-Cox’s Bazar road [also known as Arakan road] passes across the heart of our village. I put forth the proposal that a billboard should be planted permanently at the side of the road carrying the names of the 100 people killed in the liberation war.’

‘I proposed,’ so went on Ahmed Sofa, ‘that another line should be written on the billboard. It was like this: Wayfarer, unbeknownst to you, the village which you happen to be passing by had one of its children lay down his/her life for the liberation of the land! I have been harping on this proposition ever since 1972. Initially people would try to give me an audience with due attention. But after three or four years when I would still bring it up, people would think that I was unnecessarily trying to embarrass them. I think, if I present the proposal once again today, people would reckon me to have gone totally mad.’

What, therefore, does ‘spirit of liberation war’ signify? Why, it was not only about Ahmed Sofa’s own village – the same situation prevails all over the country. He wrote: ‘In course of my work I have had to visit a good deal around 8 to 10 districts of North Bengal, central Bengal, and South Bengal. Wherever I went, I did ask people whether anything took place there during the liberation war. In many villages the inhabitants told me that, ‘Punjabis did not set their foot in our village at all.’ People in other villages said the Punjabis did come, burnt down houses, and killed many people. I would ask, do you happen to know the name and identity of those who were killed? The villagers would respond enthusiastically, ‘why shouldn’t we? Son of so-and-so, brother of so-and-so, grandson of so-and-so, etc., etc.’

Yet, why could not anyone prepare a comprehensive list of the martyrs of the liberation war? Thus deplored Ahmed Sofa: ‘I would then say: why do you not write down the names of the people killed in the liberation war at the wayside? When anybody would pass through your village, s/he would read it and this would (then) give rise to a sense of respect in the visitor’s mind for your village. The villagers would just look at me with their mouths agape, as if unable to make sense of what I was suggesting.’

At this point our great writer is showing what has happened to the ‘spirit of liberation war’. Ahmed Sofa wrote: ‘In the different places of Bangladesh that I visited, nowhere could I find the names of the martyrs of the liberation war to have been written down with care and respect. It would not really take too much of an effort to undertake such an enterprise. It would take only a little patriotism and a little respect for the people killed in the liberation war.’ Has it been too late to mend? Could we not set the matter right today? If we cannot, then we must admit that no such thing as the ‘spirit of the liberation war’ survives today.

March 10, 2014

References

  1. Professor Dr. Muhammad Shahidullah, ‘Swadhinata,’ Dainik Paygam [Bengali daily], Biplab Sankhya [Revolution Day issue], 20 October 1964, 9 Kartik 1371 BS.
  2. Ahmed Sofa, ‘Muktijuddher Chetona Kothay Jonmay?’ Khoborer Kagoj [Bengali weekly], Year 19, issue 50, 12 December 2000, 28 Agrahayan 1407 BS.
  3. ‘The Proclamation of Independence,’ Mujibnagar, Bangladesh, dated 10th day of April, 1971, Seventh Schedule [Article 150 (2)], Constitution of the People’s Republic of Bangladesh, reprint, October 2011.

 

[The original article in Bangla was published by Bdnews24.com on March 26, 2014]

The Bangla question in Bangladesh

The Negro of the Antilles will be proportionately whiter — that is, he will come closer to being a real human being — in direct ratio to his mastery of the French language. I am not unaware that this is one of man’s attitudes face to face with Being.

—Frantz Fanon, Black Skin, White Masks

In Black Skin, White Masks Frantz Fanon took the language question as a point of departure in his study of the colonial experience in the Caribbean islands. He had hardly had any time for undertaking a study of post-colonial societies. I, however, find his work quite relevant in exploring the language question in our own independent societies also known as post-colonial. I will cite only the question of Bangladesh here by way of an instance.

The Bangla language, as everyone admits, has served the cause of the nation state well that is Bangladesh today. When a Bengali statesman, AK Fazlul Huq, moved the famous Lahore Resolution of 1940, it became clear that the All India Muslim League was advancing the explicit demand for, not one, but two ‘Pakistans’ (the name was not yet there in the resolution though) one of which would be in Bengal. The resolution read, in part, as follows: ‘The areas in which the Muslims are numerically in majority, as in the north-western and eastern zones of India, should be grouped to constitute ‘Independent States’ in which the constituent states shall be autonomous and sovereign.’ The last years of British rule, if not throughout the entirety of its hold, which was marked by a good measure of alienation of the Bengali Muslims, impelled them towards the point of no return before absorption into one Pakistan.

'Ekusher Shahid' by Murtaja Baseer

‘Ekusher Shahid’ by Murtaja Baseer

Post-colonial experience in Pakistan, however, took a very quick turn towards consolidation of a new national orientation. As early as 1948, as is well known, grumblings of discontent were heard in the constituent assembly of Pakistan: ‘A feeling is growing among the Eastern Pakistanis that Eastern Pakistan is being neglected and treated merely as a “Colony” of Western Pakistan.’ Corresponding to growing the alienation of Bengali folks was growing the demand for Bengali as a national (that is, state) language. The police firings on a demonstration on February 21, 1952 proved the beginning of the end of Pakistan in the long run. The day used to be commemorated as Shahid Dibas, day of martyrs, until recently.

If there was one glaring colonial legacy in Pakistan, as in India, it was perhaps the continued role of English, the colonialist’s language, as lingua franca. But partly due to the struggle against Urdu, there was no time to even think about it. Neither Pakistan nor Islam proved sturdy enough to give Urdu, ethnic language of a minority, an immigrant minority for that matter, a pass. Imposition of Urdu was rightly interpreted as another attempt at colonising the ethnic Bengalis by the West Pakistani minority. The conflict bore a good deal of similarity with the choice of Hindi as ‘the official language’ of India. Articles 343-344, constitution of India, by the way, made English an ‘auxiliary official language’ and Hindi ‘the official language’.

Incidentally, as one recalls, the final draft of the constitution that Indian statesmen actually unveiled in 1949 was not in Hindi, but in English. So was the case in Pakistan. Bangladesh, despite the struggle and the war of liberation, only had to invent a fiction for the language of its constitutional drafts. The Bengali question in Bangladesh today looks more or less like the question of national language in certain African states. Some African states, for instance, Rwanda, Burundi, Botswana, Somalia, Lesotho, Tanzania and Central African Republic which are ethnically homogeneous, or almost so, have attempted to introduce African languages as their lingua franca. ‘Yet,’ as L Adele Jinadu put it a few years ago, ‘in all of them French or English is the principal medium of higher education or contact with the outside world.’

Why has not language been a critical issue in second post-colonial Bangladesh, somewhat not unlike in above mentioned African countries, whereas the issue was a life and death struggle in our first post-colonial period? In our first post-colonial days within Pakistan old leaders of the Bengali middle class became active early enough to take up the language question as part of the colonial malaise. AK Fazlul Haque’s newly founded Krishak Sramik Party, for one, in its 12-point programme of July 29, 1953 demanded for Bangla the state language status as much it demanded full regional autonomy for the state of East Bengal on the basis of the Lahore Resolution, 1940. And it is true the leadership of the national orientation passed on to new hands by the 1960s and the new leaders, the old Maulana Bhashani and the young Sheikh Mujib among them, found the broadest response from, in the words two Russian researchers, ‘radical Muslim intellectual, members of the national bourgeoisie, workers, and owners of small and middle size land-holdings.’

Whatever happened to the Bengali nationalism of the 1950s and 1960s? The Bengali upper crust and their retainers are now beholden to English without a murmur and in a purple face. They have agreed to rename it, the Shahid Dibas as ‘International Mother Language Day,’ didn’t they? Language is no more a critical issue to the Bangladeshi bourgeoisie, or is it? I am not sure if this phenomenon proves that Fanon’s thesis on language in colonialism has become irrelevant to the political situation in Bangladesh. It will be premature perhaps to conclude here, however. Let me say why.

Since Babington Macaulay’s famous Minute on Education, Vintage 1835, which asserted that ‘a single shelf of a good European library was worth the whole native literature of India and Arabia’ and especially since 1837, almost overnight, the official language of the East India Company’s administration changed from Persian to English. The so called ‘polytechnic Orientalism’ was indeed thrown out of the window and entered the Brown Sahib. They were in fact already there, only waiting in the wings. Had he been around, would not Fanon have argued that a crucial criterion used by the colonial powers in deciding which group of Africans to hand over power to was fluency in English or French? That Fanon looked upon the process of decolonisation in much of tropical Africa as ‘a conspiracy between a national bourgeoisie and a colonizing bourgeoisie to perpetuate colonial rule’ is a fact of course. Throwing a quiet look on the Bangladesh scene I am convinced Fanon was talking ‘no non-sense’.

The bourgeois will, I know, say that the English had no choice but to hand over power to them to whom they did. Fanon is exactly saying this: he claims that the co-option of the local bourgeoisie in a world-wide imperialist network is the goal of the new colonial combine. Its primary aim is nothing less than complete subjugation, not ‘civil and political’ only but ‘social, economic and cultural’. This was the sole purpose, according to Fanon, of the peaceful colonial education.

But there is more. Involved in the police firings on demonstrators on February 21, 1952 was the question of Bengali as a national language. Today it is too easy to reformulate the whole thing, singing the lullaby of the mother language(s)! To close the communications gap, if any, they are now taking the All English Kindergartens to all peripheries. Our country folks will no longer be suspicious of the townsman; they will themselves be the townsmen! ‘The latter,’ Fanon wrote, ‘dresses like a European; he speaks the European’s language, works with him, sometimes even lives in the same district…’

If the third point is, unfortunately, valid; that is to say if we in Bangladesh as in our fellow African nations are still caught in the subtle clutches of a ‘recharged and redeployed’ form of colonisation it is also true that the English language is a subtle form of cultural imperialism. One implication of this argument à la Fanon is that, not unlike a good many nations of post-colonial Africa, Bangladesh is not really a free nation.

References

Frantz Fanon, Black Skin, White Masks, translated by Charles Lam Markmann (New York: Grove Press, 1967).
L. Adele Jinadu, ‘Language and Politics: On the Cultural Basis of Colonialism (Langue et politique: sur les bases culturelles du colonialisme)’, Cahiers d’Édtudes Aficaines, Vol 16, Cahiers 63/64, pp 603–614.
Ramkrishna Mukherjee, ‘Social Background of Bangladesh,’ Economic and Political Weekly, Vol 7, No 5/7, Annual Number (February 1972), pp 265–274.
Indrajit Hazra, ‘Hiding Behind One-way Mirror,’ India International Centre Quarterly, Vol 33, No ¾, India 60 (Winter 2006-Spring 2007), pp 308–313.


This piece was first published by New Age on February 21, 2016

Copyright 2016 Salimullah Khan

১৯৭১ সালের স্মৃতি: কেন কোটি শরণার্থী?

 

© Raghu Rai / India Quarterly

© Raghu Rai / India Quarterly

১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারি—অর্থাৎ  পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায়—বাংলাদেশে পাকিস্তান বাহিনীর নয় মাসব্যাপী গণহত্যা ও নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞের বিবরণ সম্বলিত একটি বড় পুস্তিকা প্রকাশিত হইয়াছিল নয়াদিল্লি হইতে। প্রকাশ করিয়াছিলেন, ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স’ বা ‘ভারতীয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিষদ’ নামের একটি স্বশাসিত সংস্থা। বইয়ের সম্পাদক পরিচয়ে বিশেষ কাহারও নাম ছাপা হয় নাই। তাই আমরা ধরিয়া লইতে পারি সংস্থার সেক্রেটারি জেনারেল বা মহা সম্পাদক বলিয়া যাঁহার নাম মুদ্রিত তিনি—এস.এল. পপলাই মহোদয়—বইটি সম্পাদনা করিয়াছিলেন। অবশ্য সম্পাদকই শেষ কথা নহে। পুস্তিকাটির আরও একটি বিশেষত্ব আছে। ইহার মুখবন্ধ লিখিয়াছিলেন স্বনামধন্য ফরাশি সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ আঁদ্রে মালরো (১৯০১-১৯৭৬)। খোঁজখবর যতদূর লইতে পারি লইলাম, দেখিলাম বইটির খবর বেশি লোকের কানে পৌঁছায় নাই। মালরোর লেখা মুখবন্ধের কথাও তথৈবচ। এমনকি মাহমুদ শাহ কোরেশী ১৯৮৬ সালে আঁদ্রে মালরোর উপর যে বই ছাপাইয়াছিলেন তাহাতে মুক্তিযুদ্ধ আর যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ লইয়া অনেক কথা থাকিলেও এই মুখবন্ধটির কথা পাওয়া গেল না।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যায় মাতিয়া উঠিয়াছিল, তখন প্রতিবেশী ভারতের বুদ্ধিজীবীদের তরফে দিল্লি শহরে এক দফা আন্তর্জাতিক বুদ্ধিজীবী সম্মেলন ডাকা হয়। আঁদ্রে মালরোকেও দাওয়াত দেওয়া হয় সেই সম্মেলনে। মালরো সম্মেলনে অংশগ্রহণ করিতে রাজি না হইয়া পত্রযোগে পাল্টা একটা আস্ত বিবৃতি প্রকাশ করিয়াছিলেন। মালরোর বিবৃতি প্রকাশ পায় ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। সে বিবৃতিতে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব করেন। প্রথম বিবৃতির কিছু পরে আরেক বিবৃতিযোগে মালরো বলিয়াছিলেন, ‘ফাঁকা বুলি আওড়াবার অভ্যাস আমার নেই; তাই বাংলাদেশের পক্ষে যুদ্ধ করবার প্রস্তাব আমি দিয়েছি।’ (কোরেশী ১৯৮৬: ৯৩)

আঁদ্রে মালরো (১৯০১-১৯৭৬)

আঁদ্রে মালরো (১৯০১-১৯৭৬)

মালরোর এই প্রস্তাব বাংলাদেশের পক্ষে অমৃতস্বরূপ কাজ করিয়াছিল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মার্কিন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিকসনের কাছেও চিঠি লিখিয়াছিলেন। আহ্বান জানাইয়াছিলেন, পাকিস্তান যাহাতে গণহত্যা বন্ধ করে আমেরিকা তাহার ব্যবস্থা করুক। ১৯৭১ সালের শেষভাগে—৩ ডিসেম্বর তারিখে—ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হইবার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে জাঁ কে নামক একজন ফরাশি যুবক প্যারিসে একটি পাকিস্তানী বিমান হাইজ্যাক করিতে উদ্যোগী হইয়াছিলেন। পরে পুলিশ তাহাকে গ্রেপ্তার করিয়া বিচারে সোপর্দ করে। কে দাবি করিয়াছিলেন তিনি মালরোর লেখা পড়িয়া অনুপ্রাণিত হইয়াছিলেন। আদালতে কের সমর্থনে সাক্ষ্য দিতে গিয়াছিলেন আঁদ্রে মালরো। কেহ কেহ বলেন, খুব সম্ভব মালরোর সাক্ষ্যের কল্যাণেই জাঁ কে মাত্র পাঁচ বছরের দণ্ড লাভ করেন। (জহির ২০১৫ এবং কোরেশী ১৯৮৬: ৮৪)

সম্প্রতি বাংলাদেশের কয়েকজন নবীন লেখক পুস্তিকাটির বাংলা সংস্করণ প্রকাশে উদ্যোগী হইয়াছেন। তাই আমারও সৌভাগ্য ঘটিল বইটি আদ্যোপান্ত একবার পড়িয়া দেখার। মনে হইল, ১৯৭১ সালের ইতিহাস লইয়া যে সকল প্রশ্ন এখনও জীবন্ত আছে তাহার কোন কোনটির উত্তর এই বইতে পাওয়া যাইবে। সেই উত্তরে পৌঁছিবার আগে বইটির আরেক বিশেষত্বের কথাও বলিতে হয়। এই বইয়ে মোট ছাব্বিশ জন সাক্ষীর জবানবন্দী লিপিবদ্ধ করা হইয়াছিল। ছাব্বিশের মধ্যে উনিশজন বাংলাদেশের নাগরিক—যাঁহারা পাকিস্তানী নির্যাতনের শিকার অথবা প্রত্যক্ষ সাক্ষী। পরকালে বিখ্যাত ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ কিংবা চিত্রশিল্পী কামরুল হাসান কি সৈয়দ আবুল বারক আলভি তাঁহাদেরই কয়েকজন। সাক্ষীদের মধ্যে আর সাতজন ছিলেন বিভিন্ন পরিসরে সাহায্য করিতে আগাইয়া আসা খ্রিস্টান মিশনারি সমাজের কর্মী। দেখিতেছি তাঁহাদের মধ্যে দুনিয়াজোড়া খ্যাতনাম্নী মাদার তেরেসাও আছেন।

এই বইয়ের মূল সম্পদ এই ছাব্বিশটি জবানবন্দীর সংক্ষিপ্তসার। এইগুলি গ্রহণ করিয়াছিলেন তিনজন ভারতীয় সাংবাদিক—দুইজন পুরুষ ও একজন নারী—যথাক্রমে খগেন দে সরকার, সুধীন্দ্রনাথ চৌধুরী ও অমিতা মালিক। বাংলাদেশের পক্ষ হইতে তাঁহাদের সহায়তা করিয়াছিলেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের দুই সহকারী—[ব্যারিস্টার] আমিরুল ইসলাম ও [ব্যারিস্টার] মওদুদ আহমদ। জবানবন্দীগুলি গ্রহণ করা হইয়াছিল ১৯৭১ সালের একেবারে শেষের দিকে—নবেম্বর মাসের শেষ নাগাদ। বইটির ‘আবাঁ-প্রপো’ বা মুখবন্ধযোগে আঁদ্রে মালরো সাহেব দুইটি কথা বিশেষভাবে স্মরণ করিয়াছিলেন। বাংলাদেশ হইতে কত মানুষ ভারতে আশ্রয় প্রার্থনা করিয়াছিলেন? মালরোর মতে, ১৯৭১ সালের বাংলাদেশে গণহত্যার মতন মানবজাতি-বিরোধী অপরাধ যে ঘটিয়াছিল তাহার নগদ প্রমাণ এই সত্য হইতেই পাওয়া যায়। সত্য বলিতে কি—এই প্রমাণ দেখিয়াই তিনি এবং তাঁহার বন্ধুরা বাংলাদেশের পক্ষে লড়াই করিবার জন্য তৈরি হইয়াছিলেন।

নিজের সিদ্ধান্তের সপক্ষে যুক্তি দেখাইবার উদ্দেশ্যে মালরো তাঁহার জানা পুরানা একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করিতে কুণ্ঠিত হন নাই। ১৯৪০ সালে নাৎসি জার্মানির হাতে ফরাশিদেশের পরাজয় ও পতনের পর সে যুগের ফরাশি উপনিবেশ সিরিয়ায় উপস্থিত জনৈক ফরাশি সেনা কর্মকর্তা—পদবীতে মেজর পর্যায়ের—জেনারেল দা গলকে বলিয়াছিলেন, ‘ঘটনাটা আসলে কি ঘটিতেছে আমরা তো ভাল করিয়া জানি না। এখন কোন দিকে যে যাই!’ উত্তরে দা গল বলিয়াছিলেন, ‘জানি না কথাটা হয়তো মিথ্যা নয়, তবে কে যেন আমাকে বলিতেছে জার্মানরা তো প্যারিসে।’ এই উপকথার রেশ টানিয়া মালরো বলিয়াছিলেন, সারা দুনিয়া বেশ ভালোভাবেই জানিত এইবার এক কোটি হিন্দু শরণার্থী ভারতে গিয়া হাজির। এই জায়গায় মালরো অবশ্য অসাবধানতাজনিত একটি ভুল করিয়াছিলেন—এক কোটি শরণার্থীর সকলে নিশ্চয়ই হিন্দু ছিলেন না। আঁদ্রে মালরোর দ্বিতীয় যুক্তিটি ছিল অবশ্য একান্তই অকাট্য। এয়াহিয়া খান খাস করিয়া বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী বা এলিটও হত্যা করিতেছিলেন। এই হত্যাকাণ্ড ছিল জাতি ধর্ম নির্বিশেষে—কোন প্রকার বাছবিচার না করিয়াই। যাহারা ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলকে ভোট দিয়াছিলেন—কি মুসলমান কি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান—সকলকেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী হত্যা করিতেছিল। এ সত্যে পৃথিবীর সন্দেহ ছিল না।

১৯৭১ সালের যুদ্ধে—বিশেষত শেষভাগে—ভারতীয় সেনাবাহিনীকেও শরিক হইতে হইয়াছিল। তাহার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভিতরে যে গেরিলা যুদ্ধ চলিতেছিল তাহাতে—অর্থাৎ বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীতে—যাহারা নাম লিখাইয়াছিলেন তাহাদের মধ্যে কতজনই বা ধর্মে হিন্দু শ্রেণীভুক্ত ছিলেন! আর মুসলমান কতজন ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে? তাহাতেই বোঝা যায় বাংলাদেশের হিন্দু ও মুসলমান একযোগে লড়িয়াছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানী দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। মালরো লিখিয়াছেন, এ যুদ্ধ তো ধর্মে আর ধর্মে লাগে নাই। এ যুদ্ধ বাধিয়াছিল জাতিতে জাতিতে। আঁদ্রে মালরোর ভাষায়, এ যুদ্ধ ছিল ‘এসলামাবাদের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঢাকার মুসলমানদের যুদ্ধ।’ এক অর্থে কথাটা ষোল আনা না হইলেও চৌদ্দ আনাই সত্য।

সকলেই জানেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা মানিয়া লইতে পাকিস্তান এবং আরব জাহানের প্রতিক্রিয়াশীল রাজতন্ত্রগুলি শেষ পর্যন্ত বাধ্য হইয়াছিল। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক মর্যাদা মানিয়া লইতে ইঁহারা আজও পারেন নাই। পাকিস্তান যদি সত্য সত্যই মনে করিত, বাংলাদেশ ছাড়া তাহাদের চলিবে না—পৃথিবীতে না হউক, অন্তত দক্ষিণ এশিয়ায় সে একঘরে হইয়া পড়িবে—তো বাংলাদেশের সহিত তাহার নেতারা যে ব্যবহার করিয়াছেন সেই ব্যবহার কদাচ করিতেন না। পরকালে অন্তত তাহারা শাস্তির মুখোমুখি হইতেন। না, পাকিস্তান আজও ১৯৭১ সালের দায়মোচন করিতে আগাইয়া আসে নাই। পাকিস্তানের এমন একযুগ গিয়াছে যখন তাহাকে শিশুরাষ্ট্র বলার রেওয়াজ ছিল। মনে হইতেছে, এখনও দেশটি প্রাপ্তবয়স্ক হয় নাই। এতদিনে তাহাদের দিনকাল ভালই যাইতেছে। ইহাতেই বুঝা যাইতেছে বাংলাদেশকে সেকালে তাহারা নিছক উপনিবেশই ভাবিয়াছিলেন। আগের দিনে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী, আমলাতন্ত্র ও এয়ুরোপিয়া বর্ণবাদীরা যে ধরণের আচরণ করিতেন তাহারাও সেই আচরণেরই পুনরাবৃত্তি করিয়াছিলেন মাত্র।

১৯৭১ সালের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে যে নির্দয় আচরণ করিয়াছিল তাহাকে এক মুসলমানের দেশে আরেক মুসলমানের আচরণ বলা যায় না—সে ছিল আফ্রিকা কি এশিয়ার তথাকথিত ‘অসভ্য’ বা ‘বর্বর’ দেশে সভ্য এয়ুরোপিয়া জাতির বর্ণবাদী, মানবতন্ত্রবিরোধী আচরণ বিশেষ। আঁদ্রে মালরো—আজ হইতে ৪৪ বছর আগে—লিখিয়াছিলেন, এই সত্যে যদি কাহারও সন্দেহ থাকে তাহারা এখানে একত্রিত ছাব্বিশ জন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ পড়িয়া দেখিতে পারেন।

aijaz-ahmad

এজাজ আহমদ

আঁদ্রে মালরোর বক্তব্যের তাৎপর্য বুঝিতে আরও সহায় হইবে যদি আমরা সেই সময়ের কোন কোন বামপন্থী বুদ্ধিজীবীর বক্তব্য স্মরণ করিতে পারি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যাভিযান শুরু হইবার দুই সপ্তাহের মাথায় চারিজন পাকিস্তানী বুদ্ধিজীবী—বিদেশে প্রবাসী অবস্থায়—পাকিস্তানী বর্বরতার নিন্দা করিয়া বিবৃতি প্রকাশ করিয়াছিলেন। এই বুদ্ধিজীবীদের একজন—এজাজ আহমদ—১৯৭১ সালের ১ নবেম্বর তারিখে লেখা এক নিবন্ধে স্বীকার করিয়াছিলেন যে বাংলাদেশ হইতে কোটির মতো শরণার্থী ভারতে পার হইয়াছেন। এই বর্বরতা শেষ না হইলে আরো কোটির মতো যে পার হইবে তাহার সম্ভাবনাও উড়াইয়া দেওয়া যায় না। তবে তিনি সঙ্গে একথা বলিতেও কসুর করেন নাই—শরণার্থীরা তো গরিব মানুষ! তাহাদের দেশত্যাগে পশ্চিম পাকিস্তানী সামরিক গোষ্ঠীর কিছু আসে যায় না। (আহমদ ১৯৭১: ১১, ১৪)

একটা জায়গায় আসিয়া তিনি বিপদেই পড়িয়া গিয়াছেন। তিনি বলিয়াছিলেন, এই কোটি শরণার্থীর নিজ দেশ ত্যাগ করিয়া ভারতে যাওয়ার ঘটনাকে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের যুদ্ধ ঘোষণার সামিল গণ্য করা যায়। তবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও পরকালের সাম্প্রদায়িক সংঘাত প্রভৃতি ঘটনা স্মরণে রাখিলে এই বিপুল সংখ্যক মানুষের দেশত্যাগকেও যুদ্ধ ঘোষণার মর্যাদা দেওয়া যাইবে কিনা তিনি সন্দিহান ছিলেন। এজাজ ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন, পাকিস্তানী সামরিক চক্র আর নতুন করিয়া ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামিবে না। (আহমদ ১৯৭১: ১৪)

এজাজ আহমদ তখন ছিলেন তরুণ বামপন্থী। পাকিস্তান ভাঙ্গিয়া যাওয়ায় তিনি সত্যই ব্যথা পাইয়াছিলেন। এই ব্যথায় তাঁহার চোখও কিছু ঝাপসা হইয়া গিয়াছিল। মালরোর পাশাপাশি তাঁহার বিশ্লেষণ পাঠ করিলে পরিষ্কার হয় মালরো কেন ভুয়োদর্শী আর এজাজ কেন রাতকানা। এজাজ আহমদ কিংবা তাঁহার বন্ধু একবাল আহমদ যাহা দেখিতে পান নাই তাহা মালরো দেখিয়াছিলেন বৈকি! এক কোটি শরণার্থী মালরোর কাছে নিছক একটা সংখ্যা ছিল না। এজাজ আহমদ ও তাঁহার বন্ধুদের লেখা এই এত বছর পর পড়িয়া আমার মনে সন্দেহ জাগিতেছে পাকিস্তান পথিকদের মধ্যে সবচেয়ে কম পাকিস্তান পথিক যিনি তিনিও কি তাহা হইলে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান পথিকের অধিক ছিলেন না?

 

দোহাই

১.     মাহমুদ শাহ কোরেশী, অঁদ্রে মালরো: শতাব্দীর কিংবদন্তী (ঢাকা: আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, ১৯৮৬)।

২.     [S.L. Poplai, ed.,] How Pakistan Violated Human Rights in Bangladesh: Some Testimonies (New Delhi: Indian Council of World Affairs, 1972).

৩.    Aijaz Ahmad, ‘Bangladesh: India’s Dilemma,’ Pakistan Forum, vol. 2, no. 2 (November 1971), pp. 11-15.

৪.     Quazi Sajjad Ali Zahir, ‘Salute to Jean Kay,’ in D.C. Katoch and Quazi Sajjad Ali Zahir, eds., Liberation: Bangladesh 1971 (New Delhi: Bloomsbury Publishing, 2015).


Copyright 2016 Salimullah Khan

আহমদ ছফার নজরুল

আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, নজরুলের কাছে বাঙালি মুসলমান সমাজের ঋণ শোধ করিবার মতন নহে। তিনি এই সমাজের ‘ভাষাহীন’ পরিচয় ঘুচাইলেন। তাহাদের ঘরের ভাষাকে সাহিত্যসমাজে প্রতিষ্ঠা দিলেন। সেই প্রতিষ্ঠা বাঙালি হিন্দুসমাজ স্বীকার করিয়া লইতে বাধ্য হইলেন। আর নজরুলের কাছে বাঙালি হিন্দুদেরও ঋণ আছে। তিনি বাংলাভাষা ও বাংলা সাহিত্যকে সাম্প্রদায়িকতার হাত হইতে উদ্ধার করিলেন। দেখাইলেন বাংলা হিন্দু ও মুসলমান দুই সমাজেরই ভাষা। বাংলাভাষার নতুন বিকাশ এই জায়গা হইতে নতুন করিয়া শুরু হইতে পারে। এই নতুন ধারার পথের কড়ি (বাঙালি জাতির নতুন সংজ্ঞা) নজরুল ইসলামের রচনা হইতে সংগ্রহ করিতে হইবে। এই কীর্তিরই অপর নাম নজরুল ইসলাম।


কাজী নজরুল ইসলামএই ঢাকা শহরে কিছু লোক আছেন যাহারা আমাকে—এই নিবন্ধের অধম লেখককে—সাম্প্রদায়িক এমনকি কখনও ‘মৌলবাদী’ বলিয়াও আনন্দ লাভ করেন। তাঁহাদের এই উপহারকে আমি কখনও বা বিধাতার আশীর্বাদ বলিয়া গ্রহণ করি। কারণটা খুলিয়া বলা দরকার।

যখন দেখি এই মনীষীরা আহমদ ছফার মতন মহাত্মা ব্যক্তিকেও একই ধরনের উপাধিরত্নে বিভূষিত করিতে কুণ্ঠিত হইতেছেন না তখন আমরা সামান্য মজুর লেখক মানুষ কেন মন খারাপ করিতে যাইব। আর কে না জানে এমনও দিন ছিল যখন বাংলাদেশের মুসলমান সমাজের কোন কোন অংশ মহাসমারোহে নজরুল ইসলামকে ‘কাফের’ ফতোয়া দিতে যেমন কসুর করেন নাই, তেমনি কিছু ‘নোংরা হিন্দু ও ব্রাহ্ম লেখক’ও ঈর্ষাপরায়ণ হইয়া তাঁহাকে ইতর ভাষায় গালিগালাজ করিতেন। খোদ নজরুলের কথায়—কয়েকজন গোঁড়া ‘হিন্দুসভা’ওয়ালা তাঁহার নামে মিথ্যা কুৎসাও রটনা করিতেন।

ইঁহাদের কথা মনে রাখিয়াই তো নজরুল ইসলাম বলিয়াছিলেন, ইহাদিগকে আঙ্গুল দিয়া গণনা করা যায়। ইঁহাদের আক্রোশ সম্পূর্ণ সম্প্রদায় বা ব্যক্তিগত। এতদিনে সকলেই জানেন ইঁহাদের মধ্যে অনেকেই বিখ্যাত লেখক—মোহিতলাল মজুমদার, সজনীকান্ত দাস বা নীরদচন্দ্র চৌধুরী প্রভৃতি। ইবরাহিম খাঁকে লেখা এক পত্রযোগে নজরুল ইসলাম পরিষ্কার করিলেন, মাত্র এই কয়েকজনের অবিচারের জন্য সমস্ত হিন্দু সমাজকে তিনি দোষ দিতেছেন না এবং দিবেনও না। তাহা ছাড়া নজরুল লিখিলেন, —আজকালকার সাম্প্রদায়িক মাতলামির দিনে’, —আমি যে মুসলমান’—ইহাই হইয়া পড়িয়াছে অনেক হিন্দুর কাছে অপরাধের সামিল, —আমি যত বেশি অসাম্প্রদায়িক হই না কেন।’

নজরুল ইসলাম এই কথা লিখিয়াছিলেন সত্য সত্যই বড় দুঃখে। প্রমাণ ইবরাহিম খাঁ সাহেবের লেখা ১৯২৫ সালের চিঠির উত্তর তিনি দিয়াছিলেন প্রায় তিন বছর পর, তাহার ভাষায় ‘১৯২৭ সালের আয়ু’ যখন ফুরাইয়া আসিয়াছে তখন। ততদিনে মানে ১৯২৭ সালের ডিসেম্বর কি ১৯২৮ সালের জানুয়ারিতে।

কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী এই মূঢ়তার অধ্যায় বেশিদিন স্থায়ী হয় নাই। হিন্দু সমাজের অগ্রণী মনীষীরা নজরুল ইসলামের শক্তি স্বীকার করিয়া লইয়াছিলেন। আর মুসলমান সমাজের মধ্যেও যাঁহাদের চোখ ফুটিয়াছিল তাঁহারাও নজরুল ইসলামের মধ্যে আপনাদের ঘরের মানুষ খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন।

এই উদাহরণটি আমি সবসময়ই মনে রাখি। যাহারা নজরুল ইসলামের মতন আত্মভোলা মানুষকেও সাম্প্রদায়িক বলিতে দ্বিধা করেন নাই, তাঁহাদের ভাবশিষ্যরা আহমদ ছফাকেই বা ছাড়িবেন কেন? এই চিঠিরই আরেক স্থলে নজরুল লিখিয়াছিলেন, মুসলমান সমাজ যে আমাকে ‘কাফের’ খেতাব দিয়াছে তাহা আমি মাথা পাতিয়া গ্রহণ করিয়াছি। ইহাকে আমি কোনদিন অবিচার বলিয়া অভিযোগের বিষয় করি নাই। কারণ আমার আগে ওমর খৈয়াম, শামসুদ্দিন হাফেজ কিংবা মনসুর আল হাল্লাজকেও লোকে ‘কাফের’ বলিয়াছিল। কাফের হইতে হইলে এই রকম বড় হইতে হয়। নজরুল তাই লজ্জা পাইয়াছিলেন। ‘কাফের’ আখ্যায় বিভূষিত হইবার মতন বড় তো তিনি হয়েন নাই!

আহমদ ছফা সম্বন্ধে বর্তমান বাংলা সাহিত্যের অভিভাবকরা যে শীতল ভাব দেখাইতেছেন তাহাতে আমার বারবার সেই ১৯২০ সালের যে দশক, তাহার কথাই মনে পড়িতেছে। আমার ধারণা মহাত্মা আহমদ ছফাও বিষয়টা জানিতেন।

আহমদ ছফা

আহমদ ছফা

যৌবনের প্রারম্ভে, ১৯৬৯ কি ১৯৭০ সালে, বিশ্ববিদ্যালয় কি বাংলা একাডেমীর বৃত্তি পাওয়ার আশায় আহমদ ছফা প্রথমে ইংরেজিতে একটি প্রবন্ধ (নাম ‘লিটারারি আইডিয়েল্স্ অব বেঙ্গল’) লেখেন। লেখাটি ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী সম্পাদিত বাংলা একাডেমীর ইংরেজি পত্রিকায় প্রথম ছাপা হয়। বাংলাদেশ কায়েম হইবার পর আহমদ ছফা সেই প্রবন্ধটির স্বাধীন তর্জমা করেন ‘বাংলার সাহিত্যাদর্শ’ নামে। ঐ প্রবন্ধে তিনি বাংলার সাহিত্যাদর্শ বলিতে চারিজন বড় লেখকের নাম উল্লেখ করেন। প্রথমে মাইকেল মধুসূদন দত্ত, দুই নম্বরে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, তৃতীয় স্থানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সবশেষে কাজী নজরুল ইসলামের নাম নিলেন তিনি।

‘বাংলার সাহিত্যাদর্শ’ প্রবন্ধের উপসংহারে আহমদ ছফা সিদ্ধান্ত করিয়াছিলেন, আমাদের সাহিত্যের এই পর্যন্ত যত আদর্শ দাঁড়াইয়াছে তাহাদের সর্বশেষ আদর্শ নির্মাতা কাজী নজরুল ইসলাম এবং শ্রেষ্ঠ কবিদের মধ্যে তিনিই সর্বশেষ। আহমদ ছফা লিখিলেন, কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যকর্মের ‘পূর্ণ মূল্যায়ন’ তখনও হয় নাই।

সেই অপূর্ণ মূল্যায়নের পাতা পূর্ণ তিনিও সেই দিন করেন নাই। তবে কিছু দিকচিহ্ন তিনি রাখিয়া গিয়াছিলেন সেখানেও। আহমদ ছফার লেখায় পড়ি, নজরুল ইসলামের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সাহিত্যে অনেক কয়টি পরিবর্তন ঘটিয়া যায়। এক নম্বরে তাহার আবির্ভাব মাত্রই বাংলা কবিতার যাহাকে বলে ‘ভরকেন্দ্র’ তাহার পালা বদলাইয়া গেল। কবিতা ‘গজদন্ত মিনার’ ছাড়িয়া রাজপথে নামিয়া আসিল। স্বরূপ প্রকাশ করিল সমাজশক্তির শরিক হিসাবে। সমাজের নির্যাতিত সাধারণ কবিতায় স্বীকৃতি পাইলেন। কাজী নজরুলের কবিতা তাহাদের ভাগ্যলিপি আকারে লেখা হইল।

বিশেষ মুসলমান সাধারণের অভিজ্ঞতা বাংলা সাহিত্যে যথাযথ যোগ্যতায় রূপ পাইল। আহমদ ছফার চোখেও স্পষ্ট হইল ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কিত পুরাণ ও রূপকথা, মুসলমান বাড়িতে ব্যবহার্য আরবি, ফারসি, উর্দু শব্দসম্ভার এন্তার ব্যবহৃত হইল তাঁহার লেখায়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের দুই প্রধান সমাজ হিন্দু ও মুসলমানের অভিজ্ঞতা ও বাসনার আশ্চর্য সমন্বয় তিনি করিতে সমর্থ হইলেন। বাংলা গদ্যেও তিনি নতুন পাতা খুলিলেন। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, বাংলা গদ্যে যাঁহারা ‘আঞ্চলিক’ ভাষা ব্যবহার করিয়াছেন নজরুল তাঁহাদের পথিকৃৎমণ্ডলীর সদস্য।

এককথায়, মুসলমান কবি, হিন্দু-মুসলমান কবি ও মার্কসপন্থী—কবি যুগপৎ এই তিন খেতাব তাহার প্রাপ্য। আহমদ ছফার বিচারে এই তিন পরিচয়ই তিনি একসঙ্গে কাঁধে লইবার যোগ্য হইয়া উঠিলেন। আহমদ ছফার কথাটি অপূর্ব—এমন দাবি আমি করিতেছি না। শুধু বলিতেছি আহমদ ছফা এই বক্তব্য মানিয়া লইয়াছিলেন। আহমদ ছফার আগে অনেকেই বিশেষ করে আবুল কালাম শামসুদ্দিন ও মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী এই প্রস্তাবের কাছাকাছি কথা বলিয়া রাখিয়াছিলেন।

খুব অল্প কথায় আহমদ ছফা বলিতে পারিয়াছেন যে, জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসুর মতন পাশ্চাত্য ব্যবসায়ী কবিকেও একদিন রবীন্দ্রনাথের সর্বগ্রাসী প্রভাব হইতে বাহির হইয়া আসিবার তাগিদে ধরিয়াছিল। তখন নজরুল ইসলামই তাহাদের আশ্রয়স্থল ছিলেন।

অন্যদিকে সুকান্ত ভট্টাচার্য কিংবা সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রভৃতি কবি যাহারা ‘মার্কসবাদী’ বলিয়া খ্যাত হইয়াছেন তাহারাও নজরুল ইসলাম ছাড়া কল্পনীয় নহেন। আহমদ ছফার মতে এই বিপ্লবের কবিকুলও নজরুল ইসলামের ভাব ছাড়াইয়া যাইতে পারেন নাই।

নজরুল ইসলাম মুসলমান কবি কিন্তু মাত্র মুসলমানের বা শুদ্ধ এসলামী পুনর্জাগরণের কবি ছিলেন না। এখানেই তাঁহার সহিত ফররুখ আহমদ আর তালিম হোসেনের মতো কবিকুলের ব্যবধান। তাঁহারা যেখানে বন্দী, নজরুল ইসলাম সে জগতের মুক্তবিহঙ্গ।

জীবনের উপান্তে আসিয়া—প্রায় কুড়ি বছর পর আহমদ ছফা নজরুল ইসলাম সম্বন্ধে আর একটি বড় প্রবন্ধ লিখিয়াছিলেন। নাম ‘নজরুলের কাছে আমাদের ঋণ’। এই প্রবন্ধটিতে তিনি আরও কিছু কথা যোগ করিলেন। এইবার তিনি নজরুলের ভাষা হইতে যাত্রা করিলেন। বিশ বছর আগেও ছফা খেয়াল করিয়াছিলেন নজরুলের ভাষায়—গদ্য ও পদ্য উভয় আকারেই নতুন হাওয়ার দোলা। নতুন প্রবন্ধেও তিনি নজরুল ইসলামের কবিতার উৎকর্ষ বা অপকর্ষ নিরূপণের চেষ্টা করিলেন না। শুদ্ধ ভাষার প্রশ্নেই কথা বলিলেন।

আহমদ ছফার প্রস্তাবানুসারে, কলিকাতার উইলিয়াম দুর্গ হইতে যে বাংলা ভাষাটি গিরিগাত্রের সংকীর্ণ স্রোতস্বিনীর মতো বাড়িতে বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় পরিণতি মানিয়াছিল, ছফার রূপক মোতাবেক ‘ভরাযৌবনা প্রমত্তা পদ্মার আকার’ ধারণ করিয়াছিল, নজরুল ইসলাম সেই ভাষারই সাধক—এ সত্যে সন্দেহ নাই। কিন্তু নজরুল ইসলাম ভাষাকে যেমনটি পাইয়াছিলেন তেমনটি ছাড়িয়া দেন নাই। তিনি বাংলা ভাষার গতিপথে নতুন ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করিয়া দিলেন।

সকলেই জানেন, নজরুল ইসলাম বাংলাভাষায় বিস্তর আরবি-ফারসি শব্দ এস্তেমাল করিয়াছিলেন। সেই অপরাধে কেহ কেহ তাহাকে অপরাধীও করিয়াছিলেন। তাহার স্মৃতি ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায় আছে :

‘আমপারা’-পড়া হামবড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মে’রে!
হিন্দুরা ভাবে, পার্শী শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে!

আরবি, ফারসি শব্দের ব্যবহার বাংলা কবিতায় নজরুল ইসলামই প্রথম করেন নাই। তিনি জানিতেন, তাঁহার বহু আগে ভারতচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও সত্যেন্দ্রনাথ প্রভৃতি একই কাজ দেদার করিয়া গিয়াছেন।

তাহা হইলে, নজরুল ইসলামের নতুন নিশানটা কোথায় সে জওয়াব ‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ’ প্রবন্ধে পাওয়া যায়। কবি লিখিতেছেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ সুদ্ধ অনেক সাহিত্য সাধক ভুলিয়া গিয়াছেন যে, ‘বাংলার কাব্যলক্ষ্মীর ভক্ত অর্ধেক মুসলমান।’ তাহারা এই সকল সাহিত্যিকের নিকট শুদ্ধ টুপি আর আচকানই দাবি করিতেছেন না। চাহিতেছেন মাঝেমধ্যে বেহালার সঙ্গে সারেঙ্গীর সুরও শুনিতে। শুনিতে চাহিতেছেন ফুলবনের কোকিলের গানের বিরতিতে বাগিচায় বুলবুলির সুর।

আহমদ ছফা এই বেদনার মর্ম সঠিক ধরিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, মোহিতলাল মজুমদার কিংবা সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার ছিল নিছক নিরীক্ষার ধারা। অথচ ‘কাজী নজরুল ইসলামের মধ্যে ক্রিয়াশীল একটা ঐতিহাসিক কর্তব্যবোধ।’ আহমদ ছফার বয়ান অনুসারে, নজরুল ইসলাম আপনকার কাব্যভাষা তৈয়ার করিবার জন্য দেশে তৎকালীন প্রচলিত ভাষারীতির ‘পাশাপাশি’ গৌণভাবে হইলেও, মুসলমান লিখিত পুঁথিসাহিত্যের ভাষাশৈলীটির দ্বারস্থ হইয়াছিলেন। তাহার সৃষ্টিশীলতার স্পর্শে পুঁথিসাহিত্যের ভাষার মধ্যে নতুন একটা ব্যঞ্জনার সৃষ্টি হইয়াছে।

অনেকে এই প্রশ্নে আহমদ ছফার সহিত একমত পোষণ করিবেন না। হুমায়ুন কবির পুঁথিসাহিত্যের কথা তুলিয়া নজরুল ইসলাম ও জসীমউদ্দীন উভয়কেই সামন্ত যুগের কবি বলিতে পিছপা হন নাই। হয়তো সেই বেদনা মনে রাখিয়াই একদিন জসীমউদ্দীন বলিয়াছিলেন, নজরুল ইসলামের মধ্যে পুঁথিসাহিত্যের কোন আছর ঘটে নাই। তিনি পুঁথিসাহিত্যের ‘মানসপুত্র’ নহেন। প্রকৃত সত্যের জন্য আমরা শুধু নজরুল ইসলামের জীবনীনির্ভর যুক্তির উপর দাঁড়াইব না। পুঁথির সহিত নজরুল ইসলামের পরিচয় তো ছিলই। কিন্তু তিনি নিছক পুঁথির লেখক হইতে চাহেন নাই। কিন্তু তাহার লেখা বাংলা আলাদা হইতেছে যে গুণে, তাহার মধ্যে পুঁথিসাহিত্যের একটা হিস্যা আছে। এই বক্তব্য আহমদ ছফার।

পলাশির যুদ্ধ পর্যন্ত সময়ে বাংলাভাষা যতদূর বাড়িয়া উঠিয়াছিল তাহাতেই আরবি-ফারসি বা যাবনী শব্দ বেশ মিশাল হইয়া যায়। যুদ্ধের পরও সেই ধারা বেশ কিছুদিন বহিয়া যাইতেছিল। ইংরেজ প্রশাসন ভাষার উপর হাত দিতেই—আঠার শতকের শেষ নাগাদ—বাংলাভাষার আরেকটা বাঁক তৈরী হইল। সরকারি মনীষীরা বাংলা হইতে যাবনী শব্দ তাড়াইবার কর্মসূচী সেলাই করিলেন। তাঁহাদের চেষ্টা সম্পূর্ণ সফল হয় নাই, কিন্তু তাহার ছাপ এখনও বাংলায় থাকিয়া গিয়াছে।

দুঃখের মধ্যে, ইংরেজ আমলে বাংলায় শিক্ষাদীক্ষার প্রসার সীমিত থাকায় এই ভাষা-সংস্কার কর্মসূচীও সর্বত্রগামী হয় নাই। কিন্তু বিচিত্রপথে গিয়াছে একথা স্বীকার করিতে দোষ নাই। মুসলমান সমাজের একাংশ যখন বাংলাভাষায় লিখিতে শুরু করিল তখন তাহাদের আশ্রয় হইল এই নতুন ভাষাই। ওদিকে মুসলমান কৃষক সমাজে এখনও পুরানা ভাষার—পুরানা রীতির জোয়ার।

মুসলমান লেখকরা—যেমন কায়কোবাদ বা মীর মশাররফ হোসেন—ইংরেজি যুগের বাংলা ভাষায় লিখিতে গিয়া কিছু সমস্যায় পড়িলেন। প্রতিবেশী হিন্দু সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য হইতে হইলে, তাহাদের উপহাসের পাত্র না হইতে চাহিলে, কিছু কিছু সীমানা মানিয়া চলিতে বাধ্য বোধ করিলেন। নহিলে আপন সমাজে, পরিবারে, সংসারে সচরাচর ব্যবহৃত আরবি-ফারসি শব্দ তাহাদের রচনায় যতটা সম্ভব পরিহারের চেষ্টা কেন?

ঠিক এই জায়গাতেই নজরুলের ভাষায় একটা বিপ্লব পদবাচ্য ঘটনা দেখা দিল। আহমদ ছফা আপন স্বভাবসিদ্ধ রীতিতে যাহা লিখিলেন তাহার বয়ান অনেকটা এই রকম: নজরুল ইসলাম মুসলমান সমাজের ঘরে-সংসারে ব্যবহৃত শব্দ-বাক্য ব্যবহার করিতে করিতে এমন একটা কাণ্ড বাধাইলেন যাহাতে বাংলাভাষার অভিধান সংকলকদের কাজ বাড়িয়া গেল। অভিধানের প্রতিটি নতুন সংস্করণে নতুন নতুন শব্দ যোজনার প্রয়োজন দেখা দিল। নজরুল ইসলামের এইটাই একমাত্র কৃতিত্ব নহে।

তিনি শুধু আরবি-ফারসি মিশাল বাংলা লেখেন নাই। তিনি বাংলাই লিখিয়াছেন যাহাতে আরবি-ফারসি শব্দ আর দশ শব্দের মতন বসিয়াছে। ইচ্ছা করিলে কোন ‘বিদেশি’ শব্দ ব্যবহার না করিয়া ‘বিশুদ্ধ’ সংস্কৃত প্রধান বাংলায়ও তিনি লিখিতে পারিতেন, তাহারও বিস্তর প্রমাণ তাহার গানে-কবিতায় পদ্যে-গদ্যে ছড়াইয়া।

নজরুল পুঁথিসাহিত্য লেখেন নাই। কিন্তু তিনি যাহা লিখিয়াছেন তাহাতে পুঁথিসাহিত্য বাদ যায় নাই। আহমদ ছফার কথায়, তিনি পুঁথির প্রাণের আগুন লইয়াছেন, জীর্ণ কংকাল বহিয়া বেড়ান নাই। তিনি পুঁথির শব্দ লইয়াছেন। কিন্তু তাহার বাক্য বমন করেন নাই। তাহার ভাষা-কাঠামো তিনি বদলাইয়া লইলেন।

পরিশেষে, আহমদ ছফার সিদ্ধান্ত, নজরুল ইসলাম নতুন যুগের প্রবর্তন করিলেন। এই প্রবর্তনার সারকথা কি? আমি ছফার প্রস্তাব পুনরায় তুলিতেছি: পুঁথি লেখকেরা যে ভাষারীতি গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহার উদ্দেশ্য বা ফলাফল দাঁড়াইয়াছিল বাঙালি মুসলমান স্বতন্ত্র—একথা প্রমাণ করা। আর নজরুল ইসলামের ভাষা ব্যবহার সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশে ঘটিয়াছে। তিনি চাহিলেন বাঙালি মুসলমান বাঙালি সমাজের অংশ—একথা প্রমাণ করিতে। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, নজরুলের কাছে বাঙালি মুসলমান সমাজের ঋণ শোধ করিবার মতন নহে। তিনি এই সমাজের ‘ভাষাহীন’ পরিচয় ঘুচাইলেন। তাহাদের ঘরের ভাষাকে সাহিত্যসমাজে প্রতিষ্ঠা দিলেন। সেই প্রতিষ্ঠা বাঙালি হিন্দুসমাজ স্বীকার করিয়া লইতে বাধ্য হইলেন। আর নজরুলের কাছে বাঙালি হিন্দুদেরও ঋণ আছে। তিনি বাংলাভাষা ও বাংলা সাহিত্যকে সাম্প্রদায়িকতার হাত হইতে উদ্ধার করিলেন। দেখাইলেন বাংলা হিন্দু ও মুসলমান দুই সমাজেরই ভাষা। বাংলাভাষার নতুন বিকাশ এই জায়গা হইতে নতুন করিয়া শুরু হইতে পারে। এই নতুন ধারার পথের কড়ি (বাঙালি জাতির নতুন সংজ্ঞা) নজরুল ইসলামের রচনা হইতে সংগ্রহ করিতে হইবে।

এই কীর্তিরই অপর নাম নজরুল ইসলাম।

কবি নজরুল ইসলাম ১৯৪২ সালের মাঝামাঝি জুলাই মাসে দুরারোগ্য রোগের আঘাতে বাকশক্তি হারাইয়াছিলেন। তাহার এক বছরের মাথায় ১৯৪৩ সালের জুন মাসের শেষ তারিখে আহমদ ছফা এই ধরাপৃষ্ঠে ভূমিষ্ঠ হইলেন। পরাধীন বাংলাদেশের মানে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম তখন এক উচ্চপর্যায়ে উঠিয়াছে। আহমদ ছফা প্রায়ই কহিতেন, যেদিন তাহার জন্ম হয় সেদিন সুভাষচন্দ্র বসু জাপান রেডিও হইতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম নতুন করিয়া ঘোষণা করিয়াছিলেন।

নজরুল ইসলামের জন্মের ৪৪ বছর পর আহমদ ছফার জন্ম নেহায়েত কাকতালীয় ঘটনা নাও হইতে পারে। আহমদ ছফার এন্তেকালের দশ বছরের মাথায় আমরাও হয়তো বলিতে পারিব—আমাদের সাহিত্যের সর্বশেষ আদর্শ আর সর্বশেষ বিচারক আহমদ ছফার সাহিত্যকর্মের মর্ম আমরা এখনও ধরিতে পারি নাই।


প্রথম প্রকাশ: দৈনিক যুগান্তর পত্রিকার শুক্রবারের সাময়িকীতে ১ জুলাই ২০১১

Copyright 2011 Salimullah Khan

নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক মত

kazi (2)

ইংরেজি ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত নজরুল রচনাবলী প্রথম খণ্ডের সম্পাদকীয় নিবেদনে আবদুল কাদির জানাইয়াছিলেন, নজরুল ইসলামের দেশাত্মবোধের [অর্থাৎ রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণার] স্বরূপ নির্ণয়ের চেষ্টা নানাজনে নানাভাবে করিয়াছেন। কিন্তু এ প্রশ্নে কোনো ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয় নাই।

আবদুল কাদির লিখিয়াছিলেন, “রাজনীতিক পরাধীনতা ও অর্থনৈতিক পরবশতা থেকে তিনি দেশ ও জাতির সর্বাঙ্গীণ মুক্তি চেয়েছিলেন; তার পথও তিনি নির্দেশ করেছিলেন। সেদিনে তার সেই পথকে কেউ ভেবেছেন সন্ত্রাসবাদ—কারণ তিনি ক্ষুদিরামের আত্মত্যাগের উদাহরণ দিয়ে তরুণদের অগ্নিমন্ত্রে আহ্বান করেছিলেন; কেউ ভেবেছেন [তাঁর সেই পথ] দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নিয়মতান্ত্রিকতা—কারণ তিনি ‘চিত্তনামা’ লিখেছিলেন; কেউ ভেবেছেন প্যান-ইসলামিজম্—কারণ তিনি আনোয়ার পাশার প্রশস্তি গেয়েছিলেন; আবার কেউ ভেবেছেন মহাত্মা গান্ধীর চরকা-তত্ত্ব—কারণ তিনি গান্ধীজীকে তাঁর রচিত ‘চরকার গান’ শুনিয়ে আনন্দ দিয়েছিলেন।” আবদুল কাদিরের ধারণা এই সকল ভাবনার কোনোটাই নজরুল ইসলামের রাষ্ট্রচিন্তা কী রকম তাহার সত্য পরিচয় প্রকাশ করিতে পারে নাই।

আবদুল কাদির দাবি করিয়াছেন, নজরুল ইসলাম অন্তত আপনকার সাহিত্য সাধনার প্রথম যুগে ছিলেন ‘কামাল-পন্থী’। আবদুল কাদিরের কথায়, ‘কামাল আতাতুর্কের সুশৃঙ্খল সংগ্রামের পথই তিনি ভেবেছিলেন স্বদেশের স্বাধীনতা উদ্ধারের জন্য সর্বাপেক্ষা সমীচীন পথ।’

প্রমাণস্বরূপ তিনি ১৯২২ সালের শেষদিকে প্রকাশিত ‘কামাল’ শিরোনামক প্রবন্ধ হইতে খানিক তুলিয়া ধরিয়াছিলেন। নজরুল ইসলাম লিখিয়াছিলেন, ‘এই তো সত্যিকারের মুসলিম। এই তো ইসলামের রক্তকেতন। দাড়ি রেখে গোশত খেয়ে নামাজ-রোজা করে যে খিলাফত উদ্ধার হবে না, দেশ উদ্ধার হবে না, তা সত্য মুসলমান কামাল বুঝেছিল, তা না হলে সে এতদিন আমাদের বাঙলার কাছা-খোলা মোল্লাদের মতন সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে কাছা না খুলে কাবার দিকে মুখ করে হর্দম ওঠ্বোস্ শুরু করে দিত। কিন্তু সে দেখলে যে বাবা, যত পেল্লাই দাড়িই রাখি আর ওঠ্বোস্ করি, যতই পেটে খিল ধরাই, ওতে আল্লার আরশ কেঁপে উঠবে না। আল্লার আরশ কাঁপাতে হলে হাইদরি হাঁক হাঁকা চাই, মারের চোটে স্রষ্টারও পিলে চমকিয়ে দেওয়া চাই। ওসব ধর্মের ভণ্ডামি দিয়ে ইসলামের উদ্ধার হবে না—ইসলামের বিশেষ তলোয়ার, দাড়িও নয়, নামাজ-রোজাও নয়।’

আবদুল কাদিরের সিদ্ধান্ত ছিল এই রকম—কামাল আতাতুর্কের ‘প্রবল দেশপ্রেম, মুক্ত বিচারবুদ্ধি ও উদার মানবিকতা’ নজরুল ইসলামের ‘প্রথম যুগের রচনায় প্রভূত প্রেরণা’ যোগাইয়াছিল।

পর্যায়ক্রমে প্রকাশিত নজরুল রচনাবলীর দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ খণ্ডের ‘নিবেদন’ উপলক্ষে আবদুল কাদির নজরুল ইসলামের সাহিত্য সাধনার বিবর্তন কোন পথে ঘটিয়াছিল তাহার একটা ভালো ইতিহাস—অন্তত বলা যায় ইতিহাসের রূপরেখা—লিখিয়াছিলেন। তাহার প্রস্তাব অনুসারে জানা যাইতেছে, ‘নজরুল তাঁর সাহিত্যজীবনের দ্বিতীয় যুগের সূচনায় যে মতবাদের প্রবক্তা হন, তা প্রত্যক্ষত: গণতান্ত্রিক সমাজবাদ [ডেমোক্রেটিক সোস্যালিজম্]। তার পরিচালিত ‘লাঙলে’ হয়েছিল তাঁরই কালোপযোগী কর্ষণা।’

প্রমাণাকারে আবদুল কাদির ‘লাঙল’ পত্রিকায় প্রকাশিত নজরুলের লেখা এক ইশতেহার হইতে কিছু অংশ উদ্ধার করেন। তাহাতে বলা হইয়াছিল: ‘নারী-পুরুষ নির্বিশেষে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ভারতের পূর্ণ-স্বাধীনতা-সূচক স্বরাজ্য লাভই এই [শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ সম্প্রদায়] দলের উদ্দেশ্য।’

এই সম্প্রদায় বা দলের ‘উদ্দেশ্য’ ও ‘চরম দাবী’ বিবৃত করিয়া নজরুল ইসলাম আরও লিখিয়াছিলেন, ‘আধুনিক কল-কারখানা, খনি, রেলওয়ে, টেলিগ্রাফ, ট্রামওয়ে, স্টীমার প্রভৃতি সাধারণের হিতকরী জিনিস, লাভের জন্য ব্যবহৃত না হইয়া, দেশের উপকারের জন্য ব্যবহৃত হইবে এবং এতদসংক্রান্ত কর্মীগণের তত্ত্বাবধানে জাতীয় সম্পত্তিরূপে পরিচালিত হইবে।’ নজরুল ইসলাম আরও যোগ করিলেন, ‘ভূমির চরম স্বত্ব আত্ম-অভাব-পূরণ-ক্ষম স্বায়ত্তশাসন-বিশিষ্ট পল্লী-তন্ত্রের উপর বর্তিবে—এই পল্লী-তন্ত্র ভদ্র-শূদ্র সকল শ্রেণীর শ্রমজীবীর হাতে থাকিবে।’ এই ধ্যান-ধারণাকেই আবদুল কাদির ‘ডেমোক্রেটিক সোস্যালিজম’ নাম দিয়াছিলেন। আবার এই যুগের রাজনৈতিক চিন্তাদর্শকে, মানে নজরুলের দ্বিতীয় যুগকে, ধীমান আবদুল কাদির আরও এক নাম দিয়েছেন। সেই নাম: ‘দেশের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা ও সমাজতান্ত্রিক মানবিকতা’ ওরফে সোস্যালিস্টিক হিয়ুমেনিজম।

১৯২০ সাল হইতে নজরুল ইসলামের নতুন জীবনের সূত্রপাত ধরিলে বলিতে হয় গোটা ছয় বছরের মাথায় এই জীবনের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব শেষ হইয়া যায়। দেশের গণআন্দোলন ক্রমশ সংকীর্ণ খাতে বইতে শুরু করে ১৯২৬ সালের গোড়া হইতেই। আবদুল কাদির মনে করেন, ‘সেদিন কবি যে প্রবল আবেগ নিয়ে দেশের গণআন্দোলনের পুরোধারী চারণ হয়েছিলেন, তাতে ভাটা পড়ল দুটি কারণে।’

“প্রথম কারণ: ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ২রা এপ্রিল শুক্রবার থেকে কলকাতায় রাজরাজেশ্বরী মিছিল উপলক্ষে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের সূত্রপাত। দ্বিতীয় কারণ: ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ২২শে মে কৃষ্ণনগরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে কংগ্রেসকর্মী সংঘের সদস্যদের উদ্যোগে ‘হিন্দু-মুসলিম প্যাক্ট’ নাকচ করে প্রস্তাব গ্রহণ।” আবদুল কাদির বিলাপ করিলেন, “নজরুল কৃষ্ণনগর সম্মেলনের উদ্বোধন করেছিলেন ‘কাণ্ডারি হুঁশিয়ার’ গেয়ে কিন্তু কাণ্ডারিদের কানে তার আবেদন পৌঁছাল না!”

ইহার পর নজরুল ইসলাম ধীরে ধীরে সঙ্গীত সাধনার দিকে বেশি বেশি করিয়া ঝুঁকিতে লাগিলেন। আবদুল কাদিরের যুগবিভাগ অনুসরণ করিলে বলিতে হয় সঙ্গীত সাধনাই নজরুল ইসলামের তৃতীয় যুগের প্রধান ঝোঁক। এই ক্রমে তিনি কবি-জীবনের চতুর্থ বা শেষ যুগে ঢুকিয়া গেলেন। এই যুগে আবদুল কাদির মনে করেন, ‘ধর্মতত্ত্বাশ্রয়ী কবিতা’ ও ‘মরমীয়া গান’ ‘এক বিশেষ স্থান ও মহিমা লাভ’ করিয়াছে। পাছে লোকে কিছু বলে মনে করিয়া আবদুল কাদির বন্ধনীযোগে জানাইয়াছেন ‘ধর্মতত্ত্বাশ্রয়ী কবিতা’ বলিতে ইংরেজি শব্দবন্ধে ‘মেটাফিজিক্যাল পোয়েট্রি’ আর ‘মরমী গান’ বুঝিতে ‘মিস্টিক্যাল সংগ্স্’ আমলে লইতে হইবে। তথাস্তু!

সম্পাদকের সিদ্ধান্ত : ‘নজরুল সাহিত্যের চতুর্থ স্তরে এই অন্তর্জ্যোতিদীপ্ত আধ্যাত্মিকতাই পেয়েছে প্রাধান্য অথবা বৈশিষ্ট্য।’ মজার বিষয় তথাকথিত আধ্যাত্মিকতার এই যুগেও কিন্তু নজরুল ইসলাম তাহার প্রথম ও দ্বিতীয় এই যুগের দেশপ্রেম কিংবা গণতান্ত্রিক সমাজবদ্ধ বা মানবিকতা বিসর্জন দিলেন না। এই যুগে তিনি প্রচলিত ধর্মের ও ধর্মীয় সংস্কারের নানান রূপ ও রীতির আশ্রয় লইয়াছেন, ধর্মীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য হইতে উপমা, রূপক ও চিত্রকল্প আহরণ করিয়াছেন। এই জায়গায় দেখিতে হইবে নজরুল ইসলামের এই আধ্যাত্মিক যুগেও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কালিমা তাহাকে কখনও স্পর্শ করিয়াছিল কি-না। আমাদের ধারণা করে নাই। সেই প্রসঙ্গে অন্য জায়গায় লিখিব।

কাজী আবদুল ওদুদের মতোন স্বাধীনতা ব্যবসায়ী-মনীষীও নজরুল ইসলামকে প্রতীক পূজারি বলিতে কসুর করেন নাই। তবে তিনি প্রতীক প্রীতির প্রকারভেদ নির্ণয় করিয়া নজরুল ইসলামকে কিছুটা বাঁচাইয়াও দিয়াছেন। বলিয়াছেন, নজরুলের প্রতীক প্রীতি খানিকটা এয়ুরোপিয়া রেনেসাঁসের প্রতীক প্রীতির মতোই। পাঞ্জাবের কবি ইকবাল যে ধরনের প্রতীক প্রীতির সমঝদার ছিলেন, সেই রকম রিফরমেশনধর্মী নহে।

আবদুল ওদুদের সমস্যা হইতেছে একটি জিনিসের ব্যাখ্যা দেওয়া। নজরুল ইসলাম বাঙালি মুসলমানের প্রিয় হইয়াছেন তাঁহার ইসলামী কবিতা ও ইসলামী গান দিয়া। তাঁহার প্রভাবে সেই সমাজে নবউদ্দীপনা আসিয়াছে, এই কথাও সকলেই মানিয়া লইয়াছেন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি হিন্দু দেবদেবীর মহিমার গানও গাহিয়াছেন। এই সমস্যার উত্তর কোথায়?

আবদুল ওদুদের দাবি, হিন্দু দেবদেবীর মহিমা গান করিয়া নজরুল ইসলাম বাঙালি মুসলমানকে স্বদেশ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হইবার ডাক দিয়াছেন মাত্র। তাহাদিগকে হিন্দু হইয়া যাইতে বলেন নাই। আবদুল ওদুদের কথা একটুখানি তুলিয়া লইতেছি ‘বাংলার মুসলমান বাংলার হিন্দু থেকে পৃথক, এই আত্মচেতনা মুসলমানকে দিয়াছে আত্মরক্ষার সামান্য শক্তি, অর্থাৎ নিজেকে কোনো রকমে বজায় রাখবার শক্তি; কিন্তু মাত্র আত্মচেতনা ব্যাধি; আত্মচেতনার সঙ্গে যুক্ত হওয়া চাই আত্মবিসর্জনের ক্ষমতা। প্রতীক প্রীতির ভিতর দিয়ে নজরুল ইসলামকে ইঙ্গিত দিয়েছেন এই লোভনীয় আত্মবিসর্জনের দিকে, অর্থাৎ দূর-অতীতের স্মৃতি ও পরিবেষ্টনের মাধুর্য উভয়ের শক্তিতে সঞ্জীবিত হতে, অন্য কথায়, স্বদেশ-চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে।’

কাজী আবদুল ওদুদের এই লেখা ১৯৪৩ সালের। ততদিনে নজরুল ইসলামের মানসজীবনের এক প্রকার অবসান হইয়াছে। এই বিষয়ে নজরুল ইসলামের বক্তব্য জানিবার সুযোগ আর হইবে না। কিন্তু এই প্রস্তাবের একটা খসড়া প্রকাশ হইয়াছিল যখন নজরুল ইসলাম সবাক ছিলেন তখনও। প্রস্তাবক ছিলেন আবদুল ওদুদের প্রীতিভাজন ছাত্র খোদ আবদুল কাদির। আবদুল ওদুদের কোনো উল্লেখ না করিয়াই আবদুল কাদির তাহার শিক্ষকের অন্তত বারো বছর আগে এই প্রস্তাবটি জাহির করিয়াছিলেন। বাকি অংশ তাঁহার জবানিতেই শুনিব।

আবদুল কাদির ১৯৭৭ সালে জানাইয়াছেন তিনি ১৩৩৮ সালের শ্রাবণ-আশ্বিন সংখ্যায় ‘জয়তী’ পত্রিকার সম্পাদকীয় স্তম্ভে লিখিয়াছিলেন: “নজরুল ইসলাম বাঙলার মুসলিম রিনেসাঁসের প্রথম হুঙ্কারই শুধু নহেন, কাব্যচর্চায় ইসলামের নিয়ম-কঠোরতা উপেক্ষা করিয়া ‘নিও-প্যাগানিজমের’ সাহায্য গ্রহণ ব্যাপারেও তিনি অগ্রণী।” নজরুল রচনাবলী, চতুর্থ খণ্ডের ভূমিকা অর্থাৎ ‘সম্পাদকের নিবেদন’ প্রসঙ্গে আবদুল কাদির ১৯৭৭ সালে একটি ঘটনার উল্লেখ করিয়াছেন। ঘটনার বয়ান অনুসারে আবদুল কাদিরের সেই লেখাটি পড়িয়া নজরুল ইসলাম স্বয়ং “দৃঢ়স্বরে মন্তব্য করেন যে, তাঁর কবিতায় ও গানে বাহ্যত ‘নিও-প্যাগানিজম’ বলে যা আমাদের কাছে প্রতিভাত হচ্ছে তা প্রকৃতপক্ষে ‘সুডো-প্যাগানিজম’।” এই জায়গায় একটা কথা বলিয়া রাখিব: আবদুল কাদির তাঁহার লেখায় ইংরেজি শব্দগুলি রুমি হরফে লিখিয়াছিলেন, আমি সেইগুলি আমাদের দেশনাগরি লিপিতে তর্জমা করিয়া লইয়াছি।

এই নিবন্ধ শুরু করিয়াছিলাম বুদ্ধিমান আবদুল কাদিরের বুদ্ধি তর্পণ করিয়া। ইহার সমাপ্তিও তাহার জবানিতে হইবে। তিনিও নজরুল ইসলামের সহিত একমত হইয়াছিলেন। বলিয়াছিলেন: ‘নজরুলের কোনো কোনো রচনায় বৈষ্ণবীয় লীলাবাদ ও শৈবসুলভ শক্তি-আরাধনা দেখে যাঁরা তাঁকে স্থূলকথায় প্রতীক-পূজারী বলতে চান, তাঁদের কাছে কবির বক্তব্য যে, তিনি কখনই প্যাগান বা নিও-প্যাগান নন, তিনি কখনও কখনও কাব্য বিষয়ের অনুসরণে ও অন্তরের অনুুপ্রাণিত ভাব প্রকাশের প্রয়োজনে পরেছেন সুডো-প্যাগানের [নকল প্যাগানের] সাময়িক কবি-বেশ।’

দোহাই

১. নজরুল ইসলাম, ‘কামাল’, নজরুল রচনাবলী, ৭ম খণ্ড [ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ২০০৮], পৃ.-১৯-২০।
২. কাজী আবদুল ওদুদ, ‘প্রতীক প্রীতি’, শাশ্বত বঙ্গ পুনর্মুদ্রণ [ঢাকা :ব্র্যাক প্রকাশনা, ১৯৮৩], পৃ. ৯১-৯৩।
৩. আবদুল কাদির, নজরুল-প্রতিভার স্বরূপ, শাহাবুদ্দীন আহমদ [সম্পাদিত], [ঢাকা : নজরুল ইনস্টিটিউট, ১৯৮৯]।

প্রথম প্রকাশ: দৈনিক সমকাল

Copyright 2013 Salimullah Khan

Abdul Karim’s discoveries – Origins of modernity in Bengali literature

‘As a man in a dream who fails to lay hands upon another whom he is pursuing—the one cannot escape nor the other overtake—even so neither could Achilles come up with Hector, nor Hector break away from Achilles.’

—Homer, The Iliad.

‘It is thus to an empty identity that they cling, those who take it to be something true, insisting that identity is not difference but that the two are different. They do not see that in saying, ‘Identity is different from difference,’ they have thereby already said that identity is something different.’

—Hegel, The Science of Logic.

‘On June 23, 1757,’ Sir Jadunath Sarkar, a former Vice-Chancellor of Calcutta University, once wrote, ‘the middle ages of India ended and her modern age began.’ That this indomitable truth should have been touted in 1948 and that also in a volume called ‘History of Bengal, Muslim Period: 1200-1757,’ perhaps adds a dimple to the grimace of history. ‘When Clive struck at the Nawab,’ our wise old historian noted, ‘Mughal civilization had become a spent bullet.’ ‘Today the historian, looking backward over the two centuries that have passed since then,’ as for his part claimed this bigot of a chronicler, ‘knows that it was the beginning, slow and unperceived, of a glorious dawn, the like of which the history of the world has not seen elsewhere.’

The literature produced since the conquest in 1757 has often been described as ‘modern’ literature. By ‘modern’ is obviously meant ‘European’. To wit: ‘The literary history of Bengal in the 19th century is really the history of the influence of European ideas on Bengali thought,’ wrote Sushil Kumar De, once of Dhaka University. ‘Taking 1800 A.D. to be roughly the date of commencement of the modern era of Bengali Literature,’ this literary historian also claims: ‘The problem of English education now decisively settled, the triumph of the West was fully proclaimed; and the literature as well as the society, in trying to adjust itself to this new order of things, began to take a distinctly new tone and colour.’ This view of our literature, which is still accorded ‘almost an axiomatic status,’ indicates at best ‘nothing but a failure of memory.’ I wish only to raise a point or may be two here.

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ (১৮৭১-১৯৫৩)

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ (১৮৭১-১৯৫৩)

I

Even a cursory review of early Bengali literature, for instance of the works rediscovered by Abdul Karim (1871?-1953) at the turn of the twentieth century, makes this inflexible ‘historical’ argument quite vulnerable. This is perhaps the burden of my slight endeavour here. Who is then this Abdul Karim, anyway? When Haraprasad Shastri (1853-1931) introduces him as ‘a Muhammadan gentleman in Chittagong’ no one is surprised, for in putting it that way Shastri is only furrowing a well-worn tradition, if in reverse. Muhamamedan gentlemen are not supposed to be reading and writing Bengali, or procure Bengali manuscripts, let alone produce them. And that too in far away Chittagong, a land forsaken by Indian gods!

‘The search for manuscripts of Bengali Literature,’ as a visibly moved Haraprasad Shastri put it in Calcutta Review in 1917, ‘is still going on unabated, the newspapers and magazines teem with descriptions of old manuscripts of old works brought to light and two names stand prominent in this department of literary activity: one is a Muhammadan gentlemen in Chittagong, Moulvi Abdul Karim, who has collected and described several thousands of Bengali manuscripts of works written both by Hindus and Muhammadans and his descriptions are always full and accurate and possess much literary and historical value.’ ‘The other gentleman,’ Haraprasad adds, ‘is Babu Siva Ratan Mitra who has made a large collection of manuscripts and described them but has not yet been able to publish much.’

On Abdul Karim, or rather on Chittagong, his site of being, Haraprasad Shastri throws up also a highly excitable comment: ‘Chittagong being an out-of-the–way place free from the vicissitudes of the richer and more favoured districts of Bengal have preserved many valuable relics of the past and among these the manuscripts of the works of Bengali Literature, and it is a matter of congratulation that these have fallen into the hands of such an earnest and enthusiastic worker like our friend Abdul Karim.’

Haraprasad Shastri, being his well-cultivated self, upheld his own cause only in the wake of the other two explorers: ‘While these earnest men were enthusiastically working in the plains with Bengali manuscripts, Bengali works, their history, their influence, their literary merit and so on, a Bengali Brahman, who for obvious reasons should be nameless here, was working patiently, quietly with the dusty heaps of palmleaf manuscripts in the Royal and private collections in the depth of the Himalayas, in the city of Kathmandu and in its neighborhood.’ It is in course of this not a slight endeavor that he discovered manuscripts of those now famous oldest extant Bengali texts, better known as Caryapadas in the annals of our literature.

Let’s get it then from the good old Brahman’s own mouth:  ‘But the delight of this Brahman knew no bound when he laid his hands, one fine morning, on a palmleaf manuscript in the early 12th century Bengali script, of a collection of Bengali songs with Sanskrit commentary attached. About the date of the script he had no doubt. It was Bengali on the face of it, much older Bengali handwriting than that given in Professor Bendall’s photo etching at the end of his catalogue of Buddhist manuscripts in the Cambridge University Library, and belonging to the year 1198.’

‘If so, he argued,’ goes on our good Brahman, ‘the script belongs to the early 12th century, the Sanskrit commentary must be [of] earlier [vintage] than that time. The collection of songs must precede the commentary, and the composition of the songs must precede the collection. The songs belong to 20 different authors, whose signatures are invariably attached to the last lines of their songs. The authors therefore must belong to the 10th century at least, and all these afforded food for his thought, reflection and study for several years.’ Besides the fifty songs, two collections of dohas, or dohakosas, were also discovered shortly afterwards.

These reflections on the songs and dohas led to a number of tentative judgments. First, their language was identified to be a form of old Bengali: ‘When the songs are Bengali of the 10th century, the dohas represent the archaic dialect of that period.’ Secondly, ‘the originality claimed by the Vaisnavas in inventing Kirtana [some ‘six hundred years later,’ as adds Shastri] does not hold good any longer,’ as those old Buddhist songs are in no way inferior to these later Vaishnava marvels.

Not least, the social standing of the Buddhist authors of the old differed not inconsiderably from that of the Vaisnava authors. In Haraprasad Shahstri’s own words:  ‘In those old days Brahmans were few in Bengal and their followers almost a negligible quantity. The little Aryan culture the people then had came filtered through Buddhism. But still the poets of the songs came from the highest society of the time. Their language was not boorish but elevated and dignified and they tried to make it as much Sanskritized as they could for even then Sanskrit was supposed to give dignity and add respectability.’ ‘The comparisons, ‘Haraprasad notes, ‘are drawn from natural objects such as [lotuses], mountains, rivers, etc., but what strikes one as peculiar is the oft-repeated simile with boats and their constituent parts, the oars, helms, ropes, pegs, and so on. Another fruitful source of comparison is the milking of cows. The authors seem to have been substantial boatmen, cowherds and men in a similar position.’

For some time this must have sounded seditious, or sacrilegious to Shastri’s compatriotic ears, whom he called ‘spiteful people’. ‘Spiteful people may magnify a printing mistake here and a clerical there into grave serious mistakes and inexcusable faults, but that is the storehouse of information to which everyone must turn in his need, he wrote at the time in turning to the Buddhist contribution to proto-Bengali and Bengali literature of our early modern ages.

II

I condescend to cite here the discoverer of the oldest known Bengali songs of the 10th century or thereabouts, in some detail, for two reasons. First, these remarks do suggest that origins of the Bengali language itself must be a modern incident and that the literature it spawns is also nothing if not modern. My second point is that these remarks of Haraprasad Shastri’s anticipates mutatis mutandis conclusions we might draw from the more than remarkable new discoveries made by Abdul Karim, better known as the Sahityavisarad, since 1893.

What’s new, then? Abdul Karim discovered that there existed also Muslim writers of quality in Bengali literature and, what’s more, their quantity also is far from negligible. In diction their works, for instance, those of the 17th century lauraetes Kazi Daulat (1600-1638) or Syed Alaol (1607-1680) are no less ‘elevated and dignified,’ i.e., Sanskritized in measure than Bharatchandra Ray’s (1712-1760)  or Madhusudan Datta’s (1824-1873) of later fame. Genealogically speaking, the Bengali Muslim writers drew on both pre-Islamic Indian and Indo-Islamic materials found in languages such as Arabic, Persian and Hindusthani. In terms of thematic apperception, they made forays into much terra incognita for Bengali literature. In their desire to relay to a Bengali reading public or rather auditors the culture of Islam by way of a standard Bengali, they gave pride of priority to the secular motifs. Apart from a few manuals drafted for religious purposes, the dominant motifs in all works of the time are secular.

Syed Sajjad Husain, English translator of the Descriptive Catalogue of Bengali Manuscripts by Abdul Karim, writes in his introduction: ‘Syed Sultan’s Nabi Bangsa [Genealogy of the Prophets], perhaps the most ambitious work of its kind in which the author’s aim is to give a biographical account of the prophets from Adam to Muhammad, was undoubtedly inspired by the desire to create for the Bengali Muslims a kind of a national religious epic. It was intended to be both historical and imaginative. In his descriptions of Satan in particular the author gave free rein to his imagination though the didactic purpose is never lost sight of.’ Sayed Sultan (1550?-1648?) is, per Muhammad Enamul Haq, ‘one of the oldest known poets of Bengal.’

To provide a second instance here let’s quote Sajjad Husain once more: ‘Similarly, Muhammad Khan [1580-1650], author of Maqtul Husain [The Slaying of Husain], and one of the disciples of Syed Sultan, took up the story of the conflict between Husain, grandson of Prophet Muhammad and Yazid, ruler of Damascus culminating in the former’s defeat and assassination at Karabala. The purpose clearly was not only to write history but to impress upon the Muslim the lessons of one of the greatest tragedies in the annals of Islam.’ I hope a third instance, in addition, should suffice for now. In Muhammad Hanifar Larai [Muhammad Hanifa’s Battles] ‘we meet a semi-historical person called Hanifa believed to be a son of Caliph Ali, who engaged in a series of adventures which are far from being historical,’ and ‘Fatemar Suratnama [In Praise of Fatima’s  Beauty] recreates the daughter of prophet Muhammad in the likeness of a Bengali beauty.’ The words inside inverted commas, let it be noted, are Syed Sajjad Husain’s.

This free rein of imagination, only to be expected in modern literature, has caused some consternation—nay concern—in late colonial Bengal’s learned circles. One hypothesis, advanced by Syed Sajjad Husain,  holds that it ‘appears to have been to create in Bengali for the Muslim readers something like an exact equivalent, built out of Muslim history, of the Hindu myths and legends which formed the stuff and substance of contemporary Bengali literature.’

Bengali Muslim authors, c. 15th-18th centuries found themselves confronted with two main modes of literary works, ‘as part of the general heritage of the Bengali language,’ as Sajjad Husain puts it. ‘One was a corpus of lyrical literature developed by the [Vaisnava] poets. The central figures in the [Vaisnava] cult were Krishna and Radha, and the literature which these poets produced wove beautiful fantasies around their passionate attachment to each other.’ In course of the development, Krishna and Radha got refined into symbols into which profound cosmic and spiritual meanings could be read.’ The manifest eroticism of Vaisnava lyric poetry is often explained away as a metaphor for ‘a deeper mysticism,’ with Krishna and Radha substituting for aspects of ‘the timeless and the temporal,’ of the transcendent and the subject. ‘The second type of literature that the Muslim poets confronted,’ Sajjad Husain observes, ‘was represented by the Mangala Kavyas, poems celebrating a pantheon of local deities.’

III

Syed Sajjad Husain, not unlike the hoi polloi of this minor profession, seems to have collapsed most works of Muslim writers into the category of puthi literature, of a literature of mere imitation, of Dobhashi puthi vintage 18th century, and what’s more, he seems to completely deny the genre any literary worth whatsoever. He, however, would grant them some negligible felicity in the ethnographic archive of the modern. To wit: ‘As the traditional culture of the villages disintegrates gradually under the impact of industrial and technological change, the puthi seems destined to die out as literary form sooner or later. Recognition of this truth need not however prejudice our appreciation of the puthi as a magnificent record of the workings of the popular mind in East Pakistan [what is now Bangladesh], as vast storehouse of legends and stories, as social document of incalculable value providing an index to the thoughts and beliefs of the people of East Pakistan.’

Unfortunately, Husain is not alone. He seemingly would find himself in good company. His not so strange bedfellows are certain Brahminical gentlemen from the West Bengal State of our great neighbor India (i.e., Bharat). Sometime ago Dipesh Chakrabarty, a Brahmanical gentleman as well as a world shattering historian in Chicago among other sites, made the remarkable discovery that the old Bengali literary historian and editor Dineshchandra Sen (1866-1939), a Baiddya of East Bengal, by the way, had been long fascinated with the folk-literature of Eastern Bengal on account of an affliction, of a species of parochial nationalism, or even better put, a pathology named ‘politics of identity.’ Our good friend Dipesh Chakrabarty gives it a pretty hoary sounding title: ‘Romantic Archives,’ that is to say a species of medieval relic, now fortunately adrift in the global ocean.

Gautam Bhadra, another distinguished historian and a Kayastha gentleman, in his ‘Abdul Karim Sahityavisarad Memorial Lecture’ delivered in Dhaka in 2003, i.e. on the savant’s 50th death anniversary, also applies the Chakrabarty thesis. He too finds Abdul Karim as a nationalist of sorts, a hysterical type that is. Bhadra translates ‘Politcs of Identity’ as ‘Atmasattar Rajniti’.

Does he pay any attention to Abdul Karim’s mumerous writings or for that matter to the arguments of the old Haraprasad Shastri? Apparently, and sadly I must say, not at all. He depends only on the catalogue, without reading into the texts at all. Thus in Bhadra’s view Abdul Karim appears to embody it all, the contradictions of all nationalism in Bangladesh. He stops just short of calling it ‘Muslim nationalism’. What is right or wrong with Abdul Karim? Bhadra finds it in Abdul Karim’s putative accent on Chittagong, where he just happened to find almost all of his manuscripts, as also on his valorization of Bangladesh as a privileged site where he found himself domiciled on partition in 1947 and, finally, in his fervor on the identity of Muslim poets, his co-religionists, as indicative, nay proof of his identity politics. It seems Syed Sajjad Husain is not dead, nor Sir Jadunath Sarkar either.

Time, if not space here, today hardly permits me to take up the issue further. But I chuckle. I will limit myself here to only flagging some of the holes in their cosmos. These gentlemen are yet to address the question of modernity in Bengali Literature. Syed Alaol, as everyone now knows, was by all evidence Abdul Karim’s most favourite star. There may be more reason than one for his appreciation of a savant of a poet like Alaol. It just happened that he also was a Muslim, a rather good Muslim well-embroiled in letters. Dusan Zbavitel, a European specialist in Bengali literature, has not long ago written: ‘It was not easy for a Muslim poet to be recognized by the Hindu-dominated Bengali society, in the subsequent era, but Alaol did win distinction and general recognition. His diction was flawless and his style was truly poetic. As a good narrator he was able to enlarge the thematic repertory of Bengali literature by attractive and widely read renderings of foreign sources and to invigorate the tendencies towards a definite secularization of Bengali poetry.’

If secularization indeed arrives how far could our modern age lag behind? This will take us back to square one: what is modernity anyway? ‘When the sun dipped into the Ganges behind the blood-red field of Plassey, on that fateful evening of June, did it symbolize the curtain dropping on the last scene of a tragic drama?’ Or, ‘Was that followed by ‘a night of eternal gloom for India,’ as the poet of Plassey imagined Mohan Lal foreboding from the ranks of the losers?’ This hoary cry coming from the wilderness once mastered, Tarzan-like, by Sir Jadunath Sarkar now seems to have found its resounding echo in the worldly voices of our new philosophers in global times, you know them, Dipesh Chakrabarty, Gautam Bhadra and their many readers who must remain nameless here for obvious reasons. One never knows who knows.

References:

  1. Gautam Bhadra, Nera Bottolai Jai Ko’bar?’ 2nd ed. (Kolkata: Chatim Books, 2011).
  2. Dipesh Chakrabarty, ‘Romantic Archives: Literature and Politics of Identity in Bengal,’ Critical Inquiry, no. 30 (Chicago: Spring 2004), pp. 654-82.
  3. Sushil Kumar De, Bengali Literature in the Nineteenth Century (1757-1857), 2nd ed. (Calcutta: Firma K. L. Mukhopadhyay, 1962).
  4. G. N. Devy, The G N Devy Reader (Himayatnagar, Hyderabad: Orient Blackswan, 2009).
  5. Munshi Abdul Karim and Ahmad Sharif, A Descriptive Catalogue of Bengali Manuscripts in Munshi Abdul Karim’s Collection, Syed Sajjad Husain, trans. (Dacca: Asiatic Society of Pakistan, 1960).
  6. Jadunath Sarkar, ed., History of Bengal, Muslim Period: 1200-1757, 3rd ed. (Dacca: University of Dacca, 1976).
  7. Haraprasad Shastri, ‘Bengali Buddhist Literature,’ in Haraprasad Shastri Racana-Samgraha, vol. II, Satyajit Chaudhuri et al., eds. (Calcutta: West Bengal State Book Board, 1981), pp. 840-859.
  8. Dusan Zbavitel, Bengali Literature (Weisbaden: Otto Harrassowitz, 1976).
  9. Slavoj Zizek, The Most Sublime Hysteric: Hegel with Lacan, Thomas Scott-Railton, trans. (Cambridge: Polity Press, 2014).

This piece was first published by The Daily Star on October 10, 2015

Copyright 2015 Salimullah Khan

বাজে জসীমউদ্দীন

jasim-uddinজসীমউদ্দীনের ‘সৃজনী প্রতিভা’ কেন অল্পদিনেই নিঃশেষ হইয়া গেল, তাহার এক অভিনব ব্যাখ্যা উপস্থিত করিয়াছিলেন ভারতের বিখ্যাত লেখক হুমায়ুন কবির। হুমায়ুন কবির এক ঢিলে দুই পাখি মারিতে চাহিয়াছিলেন। তাঁহার বিচারে দেশের গণমানসের অন্তর্নিহিত শক্তিকে কাজে রূপান্তরিত করিয়াছিলেন জসীমউদ্দীন। সেই রূপান্তর যতটুকু করিতে পারিয়াছিলেন তিনি, তাঁহার কাব্যসিদ্ধিও ঠিক ততখানিই।

কিন্তু কবির বলিয়াছিলেন, গণমানসের অনুবাদই প্রতিভাবানের একমাত্র ধর্ম নয়। তাঁহাকে সেই মানসের সংগঠনেও রূপান্তর ঘটাইতে হইবে। মানসের সংগঠনে সেই রূপান্তর হয় নাই বলিয়াই জসীমউদ্দীনের ‘সৃজনী প্রতিভা’ অল্পদিনেই শেষ হইয়া আসিল। গণমানসের অন্তর্নিহিত শক্তি তাঁহার ঘাড়ে চড়িয়াছে বটে, তবে ‘কল্পনা ও আবেগের নতুন নতুন রাজ্য’ জয়ে তিনি অগ্রসর হইতে পারেন নাই। আত্মকেন্দ্রিক পুনরাবৃত্তির মধ্যে তাঁহার সাধনার অগতি এই সত্যেরই পরিণতি। (কবির ২০০২: ৬১)

হুমায়ুন কবির যশস্বী বিচারক। তাঁহার কথা অনেকেই মানিয়া লইয়াছেন। (মুখোপাধ্যায় ২০০৪: ৫০-৫১)

সান্ত্বনার কথা, হুমায়ুন কবিরের ধারণা যদি সত্য হয়, তো জসীমউদ্দীন একা নহেন। একজন অন্তত সঙ্গী আছেন তাঁহার। তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। হুমায়ুন কবির লিখিয়াছেন, নজরুল ইসলামও নিপীড়িত জনমানসের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে রূপ দেওয়ার সাধনা করিয়াছিলেন। তাঁহার বিশ্বাস, নজরুল ইসলাম ‘পুরাতন পুঁথিসাহিত্যের আবহাওয়ায় লালিত’। আর বাংলার বিপুল মুসলমান কৃষকশ্রেণীর সহিত তাঁহার ‘সহজ আত্মীয়তা’ এই কারণেই। পুরাতন ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনের মধ্যেই—হুমায়ুন কবির দেখিয়াছেন— নজরুল ইসলামের ‘ভাষা ও ভঙ্গিতে বিধৃত বিপ্লবধর্ম’।

নজরুল ইসলাম ও জসীমউদ্দীন দুইজনকেই নির্দ্বিধায় তিনি বলিয়াছেন ‘পশ্চাদমুখী’। এখনকার ভাষায় আমরা হয়তো বলিব ‘প্রতিক্রিয়াশীল’। হুমায়ুন কবিরের প্রবন্ধটি বাহির হইয়াছিল বাংলা ১৩৪৯ সালে। ১৬ বৎসর পরে মুদ্রিত দ্বিতীয় সংস্করণেও তিনি এই মত বদলাইবার প্রয়োজন অনুভব করেন নাই।

হুমায়ুন কবিরের এই অভিমত অবশ্য আচানক কি সম্পূর্ণ আনকোরা ছিল না। নজরুল ইসলাম আর জসীমউদ্দীন দুই জনেরই প্রতিভা কেন অল্পদিনে নিঃশেষ হইয়া যাইবে তাহা খানিক ভবিষ্যদ্বাণী আকারে বলিয়াছিলেন কাজী আবদুল ওদুদও। ইংরেজি ১৯৩২ সালের ২৬ ডিসেম্বর কলিকাতায় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সম্মিলনের পঞ্চম অধিবেশনে তিনি জানাইয়াছিলেন, এই দুইজন মুসলমান সাহিত্যিক ‘ভাগ্যবান’, কেননা তাঁহারা বৃহত্তর দেশের—মানে দেশের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকদের—সমাদর লাভ করিয়াছেন।

একই কথাটি তিনি আরও সাজাইয়া-গুছাইয়া বলিলেন ইংরেজি ১৯৪৫ সালে। কাজী আবদুল ওদুদের লেখা সাধু বাংলায় তর্জমা করিয়া দিতেছি:

‘নজরুল ইসলাম একালের বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে প্রথম সাহিত্যিক যিনি বাংলার মুসলমান ও হিন্দু উভয়ের চিত্ত আন্দোলিত করিতে সক্ষম হইলেন। তাঁহার পূর্বে একালেও শক্তিশালী মুসলিম সাহিত্যিক যে বাংলায় না জন্মিয়াছেন তাহা নয়। মীর মোশাররফ হোসেন, কায়কোবাদ, এয়াকুব আলি চৌধুরী, লুৎফর রহমান, বেগম রোকেয়া, কাজী ইমদাদুল হক প্রভৃতির নাম একালের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে স্মরণীয় হইয়া থাকিবে। কিন্তু নজরুল ইসলামই হইতেছেন এযুগের প্রথম বাঙালি মুসলমান যিনি সমস্ত দেশের সম্ভ্রম ও সমাদর লাভ করিলেন। শুধু বাংলায় নয় ভারতেও তাঁহার যশ আজ ছড়াইয়া পড়িয়াছে। তাঁহার পরে সমস্ত দেশের সমাদর লাভ করিয়াছেন মুসলমান পল্লী-কবি জসীমউদ্দীন।’ (ওদুদ ১৯৮৩: ৭৬)

কাজী আবদুল ওদুদ সদা সত্যকথা বলিবেন, কদাচ মিথ্যা বলিবেন না। সেই ১৯৩২ সালেই তিনি জানাইয়াছিলেন, ‘এই দুই তরুণ শিল্পী’ ধন্য হইয়াছিলেন সে কালের ‘মুসলমান সমাজের অন্তরে’ তাহার সাহিত্যিক সার্থকতা সম্বন্ধে এক নব আশার সঞ্চার করিবার কারণে।

তাঁহারা যে অদূর ভবিষ্যতে আর ধন্য হইবেন না, অবাঞ্ছিত হইয়া যাইবেন তাহার ইঙ্গিতও তিনি করিতে কসুর করেন নাই। ওদুদ বলিতেছিলেন, ‘বাংলার মুসলমান সমাজে তখন সাহিত্যচর্চার যে অবস্থা, অর্থাৎ লেখক ও পাঠকের যে সমন্ধ’ তাহা শুদ্ধ অসন্তোষজনকই নয়, অনেকখানি আপত্তিকরও। ওদুদের কথার সরল তর্জমা করিতেছি: ‘পাঠক-সমাজের বিচার-শক্তি এখনো অত্যন্ত দুর্বল, সেই দুর্বলতার সুযোগ পুরাপুরি লইবার উদ্দেশ্যে আমাদের অনেক লেখককে অনেক সময়ে দেখিতে পাওয়া যায় অত্যন্ত অকিঞ্চিৎকর রচনায় হাত দিতে।’ (ওদুদ ১৯৮৩: ২৬৯)

 

হুমায়ুন কবির ও কাজী আবদুল ওদুদের কথার জওয়াব লিখিবার সময় নজরুল ইসলামের হয় নাই। জসিমউদ্দীনও সরাসরি জওয়াব লিখিয়াছিলেন কি না আমার তাহা জানিবার সুযোগ ঘটে নাই। তাঁহার অনেক লেখা—বিশেষ প্রবন্ধনিবন্ধ এখনও পত্রপত্রিকায় ছড়ানো। এই বিষয়ে জসীমউদ্দীনকে ভাগ্যবান বলিলে সত্যের অপলাপ হইতে পারে। তাঁহার পুত্র-কন্যারাও এই সম্বন্ধে সত্যকার দায়িত্বশীল বলিয়া গণ্য হইবেন না। রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা তুলিয়া লজ্জা পাইতে চাহি না।

পাকিস্তান আমলে কোন এক লেখায় সৈয়দ আলী আশরাফও একই নালিশের পুনরুক্তি করিলেন। ১৯৫১ নাগাদ মাটির কান্না বইটি পড়িয়া তিনিও বলিলেন জসীমউদ্দীন আর নতুন কিছু লিখিতে পারিতেছেন না। কবির বিদেশি তর্জমাকারিনী শ্রীমতি বার্বারা পেইন্টার জানাইয়াছেন জসীমউদ্দীন সেই নালিশ কবুল করেন নাই। তিনি বরং ঘৃণাভরে এই ব্যাখ্যা নাকচ করিয়াছিলেন। ( জসীমউদ্দীন ১৯৬৯: ২৬)

করাই স্বাভাবিক। তাহার কিছু প্রমাণ আমিও অন্য জায়গায় পাইতেছি। সওগাত পত্রিকায় পত্রস্থ এক লেখায় জসীমউদ্দীনের সাক্ষ্য পাওয়া যায়। তাঁহার দৃষ্টি আলাদা। জসীমউদ্দীন নিজেকে শুদ্ধ মুসলমানের কবি কিংবা গ্রামাঞ্চলের কবি পরিচয়ে আটক রাখিতে চাহেন নাই। তিনি যাহা করিতে চাহিয়াছেন তাহা ‘জনসাধারণের’ সাহিত্য।

পরাধীন যুগে যে বাংলা সাহিত্য গড়িয়া উঠিয়াছিল জসীমউদ্দীন সেই সাহিত্যের নাম দিয়াছেন ‘জমিদার ও ডেপুটি সাহিত্য’। তিনি লিখিয়াছেন, ‘এতদিন সাহিত্য ছিল দেশের বড়লোকদের হাতে। আমাদের বাঙলা-সাহিত্য এই সেদিনও জমিদার ও ডেপুটিদের হাতে ছিল।’ (জসীমউদ্দীন ২০০১খ: ৩১)

ইঁহাদের হাতে দেশের জনসাধারণের সাহিত্য গড়িয়া উঠিবার আশা করা বাতুলতা। কিন্তু তাহার পরও কথা থাকিয়া যায়। জসীমউদ্দীন তাহা আমল করিতে ভুল করেন নাই। তিনি বলিলেন, এই দেশের জনসাধারণ নিজেদের আনন্দ দিবার জন্য যে সাহিত্যের নীড়টি গড়িয়া তুলিয়াছিল, ইঁহারা ‘রুচি, নীতি এবং সমালোচনার কষাঘাতে’ তাহা ভাঙিয়া চুরমার করিয়া দিয়াছেন। এই অপরাধে ‘মহাকালের দরজায়’ ইঁহাদের জবাবদিহি করিতে হইবে।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস হইতে জসীমউদ্দীন কিছু সাক্ষ্যসহায় কুড়াইয়া আনিয়াছেন। স্বয়ং বাংলা ভাষার অবস্থিতিতেই প্রমাণ, এই সাহিত্য বড়লোকি সংস্কৃত সাহিত্য বর্জন করিয়াই নিজের পায়ে দাঁড়াইয়াছিল।

জসীমউদ্দীনের কথার সারমর্ম গ্রহণ করিলে এই দাঁড়াইতেছে। বাংলা সাহিত্য একদিন বিরাট সংস্কৃত সাহিত্যের সামনে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইয়াছিল। সেই কারণেই সেইদিন জয়যুক্ত হইয়াছিল জনসাধারণের রসপিপাসা। আমরা এখন যে পদার্থকে কখনও ‘জাতীয় সাহিত্য’ বলিয়া শ্লাঘা অনুভব করিতেছি তাহাই জসীমউদ্দীনের বুলিতে শুনাইত ‘জনসাধারণের সাহিত্য’।

তিনি লিখিয়াছেন, আমাদের দেশে ইংরেজের দখল কায়েম হইবার আগে পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য বলিতে আমরা ‘জনসাধারণের সাহিত্য’ বুঝিতাম। তিনি অবশ্য একথা কবুলও করিয়াছেন সংস্কৃত সাহিত্য হইতে কোন কোন কবি মণিমাণিক্য আহরণ করিয়াছিলেন, ‘কিন্তু মোটামুটি বাংলা সাহিত্য ছিল জনসাধারণের সাহিত্য।’ বাংলার মনসামঙ্গল, কবিকঙ্কণ চণ্ডী, অগণিত বৈষ্ণব কবিতা—এইগুলিকে জসীমউদ্দীন ‘গণ-সাহিত্যের পর্যায়ে’ ফেলিয়াছিলেন। (জসীমউদ্দীন ২০০১খ: ৩২)

তিনি দেখাইয়াছেন চৈতন্যের আন্দোলন আমাদের কোন ক্ষতি করে নাই। তাঁহারাও জনসাধারণের জন্য সাহিত্য রচনা করিয়াছিলেন। ‘কারণ, চৈতন্যের ধর্ম ছিল জনসাধারণের জন্য।’ কবিকঙ্কণ চণ্ডীর ‘দুর্গার কাঁচলী’ নির্মাণের সঙ্গে গাজীর গানের ‘শাড়ির বর্ণনা’, মনসামঙ্গলের বাইশ কাহন নৌকার বর্ণনার সঙ্গে গ্রাম্যগানের চৌদ্দ ডিঙ্গা মধুকোষের বর্ণনার তুলনা করিবার প্রস্তাবও তিনি পেশ করিয়াছেন। বংশীদাস, লোচনদাস, বলরামদাস, চণ্ডীদাস ও জ্ঞানদাসের পদাবলীর সহিত গ্রাম্যগানের যোগ তিনি আবিষ্কার করিয়াছেন।

হুমায়ুন কবিরের সহিত জসীমউদ্দীনের পার্থক্যের গোড়া আমরা এই জায়গাতেই দেখিতে পাইতেছি। হুমায়ুন কবির লিখিয়াছিলেন, বাংলার জীর্ণ পুরাতন সামন্ততন্ত্রের বোঁটা আলগা হইয়া আসিয়াছিল। এয়ুরোপের পহিলা ধাক্কা লাগিতেই তাহা পাকা ফলের মতন খসিয়া পড়িল। এয়ুরোপের বাড়ন্ত ধনতন্ত্র সেদিন বিপ্লবী শক্তি হিসাবেই বাংলায় আসিয়াছিল। আনিয়াছিল নতুন অর্থনৈতিক সংগঠনের সম্ভাবনা ও নতুন জগতের ভাবধারা। তাহার ফলে বাংলার কাব্যধারার বিপ্লবী রূপান্তর হইল। শুরু হইল বাংলার কাব্যের নবযুগ। তাঁহার উচ্ছ্বাসের সঙ্গে অনেকেই গা ভাসাইয়া দিবেন—বলিবেন এয়ুরোপের ছোঁয়ায় বাংলা কাব্যের পরিণতি হইয়াছে বিস্ময়কর। আজ বাংলার কাব্যসাহিত্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্যের পর্যায়ে আসিয়া পৌঁছিয়াছে। (কবির ২০০২: ৩৩-৩৪)

জসীমউদ্দীনের দেখা একেবারেই আলাদা জায়গা হইতে। তিনি বলিলেন, ইংরেজ জাতির আগমনের পরে এয়ুরোপের ‘তীব্র মদিরা’ পান করিয়া আমরা ধীরে ধীরে সব খোয়াইলাম। খাঁটি এয়ুরোপের ভাবে বিভোর হইয়া সংস্কৃত অলংকার ও শব্দশাস্ত্রের পানপাত্র ভরিয়া মাইকেল যে কাব্যরস আমাদের পরিবেশন করিলেন তাঁহার সঙ্গে সঙ্গেই তাহা নিঃশেষ হইয়া গেল।

মাইকেল—জসীমউদ্দীন বলিতেছেন—অবশ্য বাংলা ভাষায় তাঁহার অসামান্য প্রতিভার জন্য বাঁচিয়া থাকিবেন। কিন্তু কাব্যের যে নতুন নাট্যমঞ্চ তিনি খুলিয়াছিলেন, যেখানে হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র প্রভৃতি দিকপাল আসর জমাইতে প্রয়াস পাইয়াছিলেন, তাহা অল্পদিনেই ভাঙ্গিয়া গেল। জসীমউদ্দীনের মতে, মাইকেলের কাব্যধারাটি যে বাংলাদেশে টিকিল না, তাহার কারণ বাংলার মাটির সঙ্গে তাঁহার কাব্যের ধারা শিকড় গাড়িতে পারে নাই।

গল্প বুনিবার যে ধারাটি মধুসূদন, হেমচন্দ্র ও নবীনচন্দ্র গ্রহণ করিলেন—জসীমউদ্দীন বলিতেছেন—তাহার সহিত বাংলার মাটির যোগ ছিল না। সেইজন্য বাংলার মাটিতে তাঁহারা শিকড় গাড়িতে পারেন নাই। গল্প বুননের যে ধারাটি চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল, রামায়ণ প্রভৃতি কাব্যে চলিতেছিল মধু হেম নবীনের ধারা তাহার সহিত কোন যোগ রাখে নাই।

এখন কি কর্তব্য? মনসামঙ্গলের, চণ্ডীমঙ্গলের বুননির উপর যদি কোন কবি মিল্টন ও হোমারের কাব্যধারার সংযোগ স্থাপন করিতে পারেন, তবেই তিনি বাংলায় অমর হইয়া থাকিবেন। জসীমউদ্দীন বলিলেন এ পদার্থ হয়তো অসম্ভব ঠেকিতে পারে। কিন্তু সাহিত্যের ইতিহাস তো ‘অসম্ভবকে সম্ভব করা’রই অপর নাম। এই জায়গায় জসীমউদ্দীন খোদ মধুসূদনকেই সাক্ষী মানিলেন। কে জানিত বাংলা পয়ারের পুরাতন পানপাত্রের মধ্যে ব্ল্যাংক ভার্স তথা খোয়া পদ্যের গতিবৈচিত্র্য ভরা যাইতে পারে?

ইংরেজ এদেশে আসিয়া আমাদের মধ্যে হিন্দু মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় সৃষ্টি করিলেন। কারণ সহজ। তাঁহাদের মধ্যেই ইংরেজ জাতি নিজেদের সমর্থক খুঁজিয়া পাইলেন। নতুন যে মধ্যবিত্ত হিন্দু দলটি নতুন শহরে আসিয়া আস্তানা তুলিলেন তাহাতে শহরের কোন বনিয়াদ ছিল না। তাহাতে ইংরেজের নগরে এয়ুরোপের পানপাত্র তাঁহারা পরিপূর্ণ মনে গ্রহণ করিলেন। শুদ্ধ কি তাহাই? নিজের দেশের গ্রাম্য জীবনের প্রাচীন ভাবধারার বনিয়াদও লাথি মারিয়া দূরে ছুঁড়িয়া ফেলিলেন তাঁহারা।

জসীমউদ্দীন সালিশ করিলেন। বলিলেন, বাংলা সাহিত্যের উৎসাহ দিবার ভার যতদিন মুসলমান রাজাদের হাতে ছিল, ততদিন তাহা জনসাধারণের সাহিত্য ছিল। ‘কারণ, আমাদের ধর্ম’, জসীমউদ্দীন বলিতেছেন, ‘জনসাধারণকে নিয়ে’। ইংরেজ আসিবার পরে বাংলাদেশ হইতে মুসলমানের প্রভাব নষ্ট হইয়া গেল। বাংলা সাহিত্য মুষ্টিমেয় কয়েকজন ভদ্রলোকের সাহিত্য হইয়া দাঁড়াইল। (জসীমউদ্দীন ২০০১খ: ৩৩-৩৪)

এদিকে হুমায়ুন কবিরের রায় ইহার ষোল আনাই বিপরীত। বাংলার ইতিহাস তিনি অন্য জায়গা হইতে পড়িয়াছেন। তাঁহার বিচারে নবাবী আমলে ফারসি সাহিত্যের প্রভাব বাংলাকে নানাভাবে আচ্ছন্ন করিয়াছে কিন্তু সে প্রভাব ছিল ভারতের আর দশ ভাষার উপরেও সমান কার্যকর। তাঁহার যুক্তি অনুসারে, অন্যান্য দেশজ ভাষার তুলনায় বিকাশের বিচারে বাংলার কাব্য সর্বশ্রেষ্ঠ। আর কোন ভারতীয় ভাষাতেই সাহিত্য সাধনা বোধ হয় এতখানি সিদ্ধিলাভ করে নাই। কিন্তু তিনি দাবি করিতেছেন ফারসির এই সর্বভারতীয় প্রভাবের ফলে ভারতের অন্যান্য ভাষার কাব্যের তুলনায় বাংলার কাব্যে কোন মূলগত পার্থক্য দেখা দেয় নাই। কবিরের ভাষায়, ‘সেদিনকার বাংলা কাব্যের উৎকর্ষ তাই গুণে এবং পরিমাণে—স্বভাবে নয়।’

কবির সিদ্ধান্ত করিয়াছেন উনিশ শতকের মাঝামাঝি হইতে বাংলার কাব্য বিকাশের যে নতুন ধারা শুরু হইল, তাহা আগাগোড়াই নতুন। ভারতের আর দশ ভাষা হইতে শুদ্ধ গুণে বা পরিমাণে নয়, গোত্রেও আলাদা হইয়া গেল বাংলার কাব্য। এই ঘটনার নাম তিনি রাখিয়াছেন বাংলার কাব্যের ‘বিস্ময়কর পরিণতি’। (কবির ২০০২: ৩৪)

জসীমউদ্দীন স্বভাবতই এই বিচারের সহিত একাত্ম হইবেন না। তিনি মনে করেন বাংলার নতুন কবিতার মধ্যেও দেশের ধারা কতক মিলিয়াছে। আর ইহাই রবীন্দ্রনাথকে মধুসূদন হইতে আলাদা করিবার কারণ। বাঙালি রবীন্দ্রনাথকে কতক গ্রহণ করিয়াছে, কারণ তাঁহার কবিতায় রহিয়াছে চারিশক্তির সমাহার—সংস্কৃত, বৈষ্ণব, বাংলার জাতীয় বা লোকজ এবং এয়ুরোপীয়। জসীমউদ্দীনের কথায়, ‘বিহারীলালের লিরিকের ধারাটি’ রবীন্দ্রনাথে আসিয়া টিকিয়া রহিল। (জসীমউদ্দীন ২০০১খ: ৩৩)

হুমায়ুন কবির ও কাজী আবদুল ওদুদের মতন অনেক মনীষী দাবি করিয়াছেন ‘পুরাতন ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন’ ছাড়া নজরুল ইসলাম ও জসীমউদ্দীন আর কিছুই করেন নাই। জসীমউদ্দীন বলিলেন কথাটি পুরাপুরি সত্য নয়। নজরুল ইসলাম তাঁহার রচনায় আরবি, পারসি বহু শব্দ প্রয়োগ করিয়াছেন একথা অসত্য নয়। কিন্তু একটা পার্থক্যের কথাও এখানে মনে রাখিতে হইবে। তিনি বাংলা সাহিত্যকে হিন্দু ও মুসলমান ভাগে ভাগ করিবার চেষ্টা করেন নাই।

জসীমউদ্দীন লিখিয়াছেন, নজরুল ইসলাম পুঁথি সাহিত্যের মানসপুত্র নহেন। তিনি তাঁহার অনেক লেখায় বরং পুঁথি সাহিত্যকে অবহেলা আর বিদ্রূপই করিয়াছেন। জসীমউদ্দীন কহিতেছেন, ‘তিনি যে কোনদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে এই পুঁথি সাহিত্য উপভোগ করিয়াছিলেন তাহারও প্রমাণ পাওয়া যায় না।’ তাঁহার রচনা হইতে খানিক তুলিয়া লইতেছি:

‘পুঁথি সাহিত্যের লেখকরা আরবী, পারসী শব্দের ধ্বনিতরঙ্গ না বুঝিয়াই এবড়োথেবড়োভাবে যেখানে ভাব প্রকাশের উপযুক্ত বাঙলা শব্দ খুঁজিয়া পান নাই সেখানে ইচ্ছামত আরবী পারসী শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন। নজরুল আরবী, পারসী শব্দের ধ্বনিতরঙ্গ বুঝিয়া কোন [কোন] রচনার মধ্যে মুসলমানী আবহাওয়া ফুটাইয়া তুলিতে এইসব শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন।’ (জসীমউদ্দীন ২০০১ক: ১০২-৩)

আমাকে লেখা এখানেই শেষ করিতে হইতেছে। শুদ্ধ একটি কথা যোগ করিয়া শেষ করিব। জসীমউদ্দীন নজরুল ইসলামকে ভর করিয়া পরোক্ষে নিজের সাফাইও গাহিয়াছেন। গাহিয়া মোটেও অন্যায় করেন নাই। তাঁহার নালিশের জবাব হুমায়ুন কবির কেন, কেহই দিতে পারিবে না। বাংলা ১৩৫০ সালে জসীমউদ্দীন লিখিয়াছিলেন, বাংলা সাহিত্য শুদ্ধমাত্র দেশের মধ্যবিত্ত সমাজের পকেটেই আবদ্ধ রহিল। দেশের জনসাধারণ আর ইহার অন্দর মহলে প্রবেশ করিতে পারিল না। আবদুল কাদিরকে লেখা পত্রের এক জায়গায় এই দুঃখই বিশদ করিতেছেন তিনি। আমি সাধু ভাষায় তাঁহার তর্জমা লিখিলাম:

‘আজ যত করিয়াই আমরা বঙ্কিমচন্দ্র, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের জন্য গৌরব বোধ করি না কেন, একথা ভাবিতে সত্যই বড় কষ্ট। আজ বঙ্গভাষার বংশীধ্বনিতে যমুনা উজান বহে না, শ্যামলী ধবলী গৃহে চলে না। বাংলার নবেল উপন্যাস শুধু কলিকাতাবাসী কয়েকজন মধ্যবিত্ত লোকের কথায় ভরা। দেশের জনসাধারণ তাহার ভিতরে নিজেদের খুঁজিয়া পায় না।’ (জসীমউদ্দীন ২০০১ক: ৩৪)

জসীমউদ্দীনের সিদ্ধান্ত আজ এই অভাজন আমাকেও নতুন করিয়া ভাবাইতেছে। কারণ আমি তাঁহার বাজে লিখিতেছি। তিনি বলিতেন, সাহিত্য যেমন বিশ্বের তেমনি তাহা ঘরেরও। বিশ্বসাহিত্যই বল আর সাম্প্রদায়িক সাহিত্যই বল, সব সাহিত্যই তৈরি হয় ঘরের প্রদীপ জ্বালাইবার জন্য। যে সাহিত্য ঘরে প্রদীপ জ্বালাইল না, সে সাহিত্য বিশ্বেও আলোকপাত করিতে পারিবে না। দেশের জনসাধারণের জন্যই এ সাহিত্য তৈরি হয়।

দোহাই

১. কাজী আবদুল ওদুদ, শাশ্বত বঙ্গ, ২য় মুদ্রণ (ঢাকা: ব্র্যাক প্রকাশনা, ১৯৮৩)।

২. জসীমউদ্দীন, জসীমউদ্দীনের প্রবন্ধসমূহ, ১ম খণ্ড, ২য় মুদ্রণ (ঢাকা: পলাশ প্রকাশনী, ২০০১ক)।

৩. জসীমউদ্দীন, জসীমউদ্দীনের প্রবন্ধসমূহ, ২য় খণ্ড, ১ম প্রকাশ (ঢাকা: পলাশ প্রকাশনী, ২০০১খ) ।

৪. হুমায়ুন কবির, বাঙলার কাব্য, ২য় সংস্করণ, পুনর্মুদ্রণ (ঢাকা: বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ২০০২)।

৫. সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়, জসীমউদ্দীন: কবি মানস ও কাব্য সাধনা, ২য় মুদ্রণ (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ২০০৪)।

৬. Jasim Uddin, Gipsy Wharf (Sojan Badiar Ghat), B. Painter and Y. Lovelock, trans. (London: George Allen and Unwin, 1969).

প্রথম প্রকাশঃ দৈনিক প্রথম আলো। ১৮ মার্চ ২০১১।

Modernity’s many lineages: a tribute to Jasimuddin

jasim-uddin

And when old words die out on the tongue, new
melodies break forth from the heart; and where the
old tracks are lost, new country is revealed with its wonders.
−Rabindranath Tagore, Gitanjali

As old Greece had its Iliad and Odyssey and old India its Mahabharata and Ramayana, so modern Bengal does its Nakshi Kathar Math and Sojan Badiar Ghat. Good old great poems of the Ionian and Indian peninsulas, as everyone knows, are epics. And our two modern poems, however, belong to the genre of things known as ballads or sagas if you will. They are significantly named for a peasant society: Math and Ghat, i.e. field and wharf, in that order. But they are two, one almost says twin, ballads of modern Bengal, a country of two (or more) rivers, of two (or more) communities, a country that is no more, or almost no more. And Jasimuddin (occasionally ‘Jasim Uddin’ in a manner of rendering in English) is their author. Let us say a few words about the poet before turning to the poems themselves.

Jasimuddin was born on a very convenient date, namely January 1, 1903. It may be perhaps more of a legend than real. His place on earth is however less prone to legendary treatment. Tambulkhana, in Faridpur, is a lesser village where the poet was born. It is some eight miles off Govindpur, the village on his father’s side where he grew up. ‘I had been born and brought up,’ to put it in Jasimuddin’s own words, ‘in a village populated entirely by cultivators, and the folk songs were in my blood.’ Jasimuddin then did not have to look further up than his own folks for his motifs, fields and wharfs. Jasimuddin’s work is about the folk, as Verrier Elwin said it many years ago. ‘I do not know whether The Field of the Embroidered Quilt can be classed as folk-poetry, but it is obviously poetry about the folk.’ It is in fact a little more than that as we will presently see.

Dineshchandra Sen, Jasimuddin’s early mentor, too wrote: ‘I consider Maulvi Jasimuddin’s Nakshi Kathar Math as one of the best lyrical poems in our language.’ Writing three quarters of a century later the present writer would likewise concur. ‘Its pastoral descriptions and a unique array of picturesque scenery introduced off and on in this love tale,’ reasoned Sen, that grand old chronicler, ‘will acquaint one with the purity, strength, devotion and poetry of Bengali domestic life.’ ‘The author’s penetrating insight into the very character of our masses, his talented grasp of the characteristics of feminine feelings,’ Sen remarked, ‘have invested the poem with life-like presentation of the moral and cultural traits of Bengalis.’

‘In fact,’ Sen went on saying, ‘I do not know of any modern poets who have such an intimate knowledge of this beautiful land of ours.’ Why on earth, one wonders. Western civilization or the new education, its grand trope, spreading out from Calcutta, ‘reaching the remotest country town where any middle class inhabitant aspired to be educated,’ belonged to the town and its denizens, the middle classes. It brought many challenges along with the well churned out responses.

‘It created its own culture and its own literature,’ Jasimuddin wrote in the 1950s, ‘with themes and rhymes which were partly European in spirit, and partly linked up with the upper levels of culture in other parts of India. Almost every literate man’s eyes looked westward. The songs of the middle classes were sung to the accompaniment of modern European instruments such as the violin and the abominable portable harmonium, and the traditional instruments of Bengal fell out of fashion.’ ‘In the dazzling light of the western sun,’ as Jasimuddin’s own metaphor has it, ‘the little earthen lamps with which people used to see into the corners of their own rooms had lost their power of illumination. They look out at the whole world, but the beautiful things which lay at hand were hidden from sight.’

By the turn of the twentieth century, Jasimuddin laments, there was hardly anyone around to dare turning the tides about. Even Rabindranath Tagore, for all his fame, was writing for the middle-classes. ‘He hesitated to present the old tunes in their original form to people who would have despised them.’ ‘What he did,’ Jasimuddin noted, ‘was to create ‘a kind of sophisticated version of them.’

It is at this conjuncture that Jasimuddin finds himself in the middle of a small group of middle class ballad-collectors under Dineshchandra Sen. Jasimudddin was already there before he would be looking out with Sen to find out his own passage to modernity. Let’s get it from the horse’s own organ: ‘To me, unlike [Dineshchandra] Sen, the tunes meant even more than the words: they embodied the meaning of the traditional life I loved. They made me mad with their beauty and power, and I was set on making the reading public understand what was in them. It was not only for the sake of the reading public; it was a question of preserving the life of the tradition itself.’

Thus speaks our modern poet out loud: one awaited the poet who will have loved the new learning but will give no short shrift to old treasures either. ‘The old songs and ballads were too long-drawn-out for the new time-conscious man to spend hours listening to them: they repeated themselves interminably and were full of ideas and incidents unpleasing to the modern mind. Yet there was so much in them that might have been preserved. Had there been any great mind with a touch of poetry, someone who loved the new learning and loved his country’s past, it might have been possible to save both. The old songs and tunes, still alive among the people could have been collected and revised, purged of their corrupt and outworn elements and recreated. They might have become a link, making the people’s mind intelligible to the educated man and bringing the new outlook down to the consciousness of the illiterate.’

In the ballad Sojan Badiar Ghat [rendered Gipsy Wharf in English] modernity already arrived in the guise of communal riots. Sojan, the lover, is Muslim man and Dulali, his beloved, is a Namasudra woman or a Hindu of the ‘scheduled’ caste in the colonial register. As Barbara Painter, translator into English, notes, ‘Sojan and Dulali were destined from the beginning to be ill-starred lovers. It is not acceptable for them to marry outside their fellow religions and elopement into the forest seems the only solution. For some time they live happily in their forest cottage, but eventually Sojan is caught and imprisoned. Dulali is remarried by her orthodox parents to a farmer in a distant village. When Sojan is released from jail he finds his family gone, his village disrupted and his beloved remarried. In despair he joins a band of wandering water gypsies.’

Further: ‘In his wanderings with the gypsies, Sojan has been living in the hope of finding Dulali. When he finds her in the water-side village happily remarried, she at first rebuffs him for seeking her out. Then her love for him proves too strong. She steals away in the night, and rejoins Sojan, only to find that his grief at her cold reception has led him to take poison. She takes poison too and the lovers die like Romeo and Juliet.’ ‘The two communities, however, do not embrace each other because of this tragedy,’ thus concludes Barbara Painter her melancholy introduction to the UNESCO edition of the poem in 1969.

Relations between the Muslim and the Namasudra communities in certain districts of lower Bengal, including Faridpur, have been tense since the beginning of the twentieth century. In 1933, when Sojan Badiar Ghat saw the light of day, things could not have been worse. The question of communal award was taking its toll. Times could not be more unpropitious in Bengal to depict Hindu-Muslim affairs in such terms. It is a pity to learn that Jasimuddin was accused of nurturing a communal (i.e. pro-Muslim) bias, in writing this ballad. Many, including the eminent Suniti Kumar Chatterjee and the learned Narendra Dev, reportedly joined the fray. Such misunderstanding was in fact symptomatic and was part of the times. Jasimuddin’s ballad of the gipsy, in retrospect, seems to have been a prophetic saga. The partition of Bengal was anyway not far away, a decade and a half at most.

Jasimuddin’s political outlook is not naïve, on the contrary, it was a remarkably ‘communitarian’ worldview that he embraced. His was emphatically not a ‘communal’ outlook at all. He will be the last man to disregard ruling contradictions among the people. He in fact grasps it well how trouble might arise out of nowhere when the milieu is always already brittle, as was the case of a quarrel at the Muharram festival in the village of Shimultali. Jasimuddin however misses no opportunity to identify the role of the privileged classes, personified aptly in the Naib, or rent collector for the bhadralok Zamindar in stirring up the riots.

Although historians of modern Bengal give it habitually a short shrift, one ignores the communal tension at a great cost to their professional integrity. Since the end of the 19th century relations between the two communities in southern and south central Bengal had been very tense. ‘There was always a strong under-current of ill-feeling and whenever petty incidents occurred between individuals, large numbers on both sides would be ready to vindicate the honour of their respective communities,’ writes Sekhar Bandyopadhyay.

Communal collisions were legion between circa 1911 -1947. But their configurations changed midway quite palpably for those who have an aptitude for analysis. The Muslim-Namsudra relations were ‘seriously agitated during the convulsions of 1911 in Jessore-Khulna’. As Sekhar Bandyopadhyay enumerates, two years later in 1913, a dispute culminated in violence at Silna, a marketplace near Gopalganj. Likewise, in the same year ‘there was also a disturbance at Tarail in Kasiani police station. And then during the Non-cooperation [also the Khilafat] movement a political dimension was added to the already embittered relationship.’ It continued till 1921-22. In the high tide of Non-cooperation movement, the Muslims and the Namasudras found themselves on the opposite sides of the fence.

Things overturned themselves, however, by 1925-26. By then, when the Khilafat movement had died down, ‘the two peasant communities were again coming closer, if not in Faridpur, then definitely in other surrounding districts, against the Hindu bhadralok and their nationalist agitation.’ ‘In Narail subdivision of Jessore the Muslim and Namasudra sharecroppers has already combined again under the leadership of Nausher Ali to demand two-thirds share of the produce from their caste Hindu jotedars,’ notes Sekhar Bandyopadhyay. And this was to prove their undoing. ‘The movement which continued for greater part of 1924-25 was dubbed by the Congress as communal and was repressed ultimately by the police.’

Jasimuddin had these convulsions in mind when he undertook his task. No individual, not even a poet of such integrity, would prove equal to these trends of the times. Until partition in 1947, the tides were not to subside. After 1947, on both sides of the fence, it is as they say a different story.

 

REFERENCES

  1. Jasimuddin, ‘Folk Music of East Pakistan,’ Journal of the International Folk Music Council, vol. 3 (1951), pp. 41-44.
  2. Jasim Uddin, Gipsy Wharf, Barbara Painter and Yann Lovelock, trans. (London: George Allen and Unwin, 1969).
  3. Jasimuddin, The Field of the Embroidered Quilt: A tale of two Indian villages, E. M. Milford, trans. (Calcutta: Humphrey Milford, Oxford University Press, 1939).
  4. Sekhar Bandyopadhyay, Caste, Protest and Identity in Colonial India: The Namasudras of Bengal, 1872-1947, 2nd (New Delhi: Oxford University Press, 2015).

আমার বন্ধু তারেক মাসুদ

‘I have not purchased my freedom through writing.’

– Franz Kafka, 1922

‘লেখার বিনিময়ে আমি আমার স্বাধীনতা কিনিয়া রাখি নাই।’

–ফ্রান্স কাফকা, ১৯২২

তারেক মাসুদের এন্তেকালের পরদিন সকালে উঠিয়া ‘আমার শিক্ষক তারেক মাসুদ’ নাম দিয়া একটি লেখা লিখিয়াছিলাম। আজকের লেখাটির নাম সামান্য বদলাইয়া রাখিলাম ‘আমার বন্ধু তারেক মাসুদ’। যিনি শিক্ষক তিনিই বন্ধু। আমার শিক্ষকের কথা এক নিবন্ধে শেষ করিতে পারি নাই। এখানে কিছু উদ্বৃত্ত কথা বলিব। কথা আরও থাকিলে পরে বলিব। আর উপায় কি?

তারেক মাসুদ, সলিমুল্লাহ খান ও আলম খোরশেদ [tarequemasud.org থেকে নেওয়া]

তারেক মাসুদ, সলিমুল্লাহ খান ও আলম খোরশেদ [tarequemasud.org থেকে নেওয়া]

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দশকে পড়িতে আসিয়াছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আসিয়া যে কয়জন গুণীর দেখা পাইয়াছিলাম তাঁহাদের মধ্যে তারেক মাসুদ স্থান ছিলেন সমুখে, প্রথম সারিতে। তিনি বলিয়াছিলেন চলচ্চিত্র করিবেন। আর আমি শুরুতেই এক প্রকার ধরিয়া লইয়াছিলাম নাম করিবেন। তিনি আমাকে নিরাশ করেন নাই। তারেক মাসুদের সাধনা বিফলে যায় নাই। তিনি শুদ্ধ নামই করেন নাই, তাহার মানও হইয়াছে। শুদ্ধ পুরস্কারই পাইয়াছেন এমত নহে, সত্যকার মহত্ত্বও তিনি অর্জন করিয়াছেন। তাঁহার ছবি সমাদৃত হইয়াছে, আর্থিক অনটনের কঠোর কশাঘাতে তাহাকে শেষ পর্যন্ত জর্জরিত থাকিতে হয় নাই।

আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইয়াছি। কিছুদিন হয় দেশে একটা দুর্ভিক্ষ, বেশ কয়েকটা রক্তঝরা অভ্যুত্থান ঘটিয়া গিয়াছে। দেশ স্বাধীন হইবার পাঁচ-ছয় বৎসর পরের কথা। দেশের ভবিষ্যত লইয়া নানান জল্পনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সমুখে শরিফ মিয়ার ক্যান্টিন বলিয়া একটি পরম রমণীয় খাবারের দোকান ছিল সেই সময়। সেখানেই একদিন দেখা তারেক মাসুদের সঙ্গে। পরিচয়স্বরূপ জানিলাম তিনি একাধারে ইতিহাস বিভাগ আর অন্যদিকে লেখক শিবিরে দাখেল হইয়াছেন। তখন লেখক শিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় আরো ছিলেন পিয়াস করিম। মোহন রায়হান ঢাকা কলেজের ছাত্র। তাঁহার প্রথম কেতাব ‘জ্বলে উঠি সাহসী মানুষ’ পহিলা ছাপা হইয়াছিল বাঙলাদেশ লেখক শিবিরের পতাকাতলে।

আমি লেখক শিবিরের ছায়াতলে কখনও ভিড়িবার জায়গা পাই নাই। তারেক আর মোহনের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই আমার পরিচয় ঘটে মহাত্মা আহমদ ছফার সহিত। হয়ত সেই কারণেই। লেখক শিবিরের ইতিহাস আহমদ ছফার মুখে কিছু শুনিয়াছিলাম। তাহাতেই আমার উৎসাহে ভাটা পড়ে। ছফা জানাইয়াছিলেন তিনিও ছিলেন লেখক শিবিরের আদিকালীন উদ্যোক্তাদের দলে। আদিকাল মানে বাংলাদেশ স্বাধীন হইবার আগের কাল। ঐসময় যাঁহারা ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’ প্রতিষ্ঠাকর্মটিকে মোটেও সুনজরে দেখেন নাই–বরং প্রকারান্তরে প্রতিকুলতা করিয়াছিলেন, স্বাধীনদেশে তাঁহারাই শিবিরটি দখল করিয়া লইলেন আর প্রতিষ্ঠাতাদের দিলেন বাহির করিয়া। এরকম জীবিত অন্যায়ের খবর জানিয়াশুনিয়া কি করিয়া সেই শিবিরে যোগ দিই!

একটুখানি পিছনের কথা না বলিলে ভুল ধারণা হইতে পারে। দেশ স্বাধীন হইবার পর যাহারা সরকারি দল কিংবা খোদ সরকারেরই গরিব আত্মীয় শ্রেণীর বা দুই নম্বর দল করিতেন না তাহাদের আশ্রয়স্থল হয় লেখক শিবির নামা প্রতিষ্ঠানটি। ‘প্রতিষ্ঠান’ না বলিয়া ইহাকে ‘অনুষ্ঠান’ বলিলে অন্যায় হয় না। ১৯৭১ সালের গোড়ায় রক্তঝরা সংগ্রামের দিনে গঠিত হইয়াছিল ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’। তার আগে ১৯৬০ সালের যুগে পাকিস্তান সরকারের আজ্ঞাবহ মধ্যম শ্রেণীর লেখকরা ভিড়িয়াছিলেন পাকিস্তান লেখক সংঘ নামা সরকারি শিবিরে। অনেকের মনে আছে দেশ স্বাধীনের আগে এই দলের ছাত্র শাখাটির নাম ‘ইসলামী ছাত্র সংঘ’ ছিল। লেখক শিবিরের আগুনটুকু চুরি করিয়া স্বাধীন বাংলাদেশে ইহারা ‘ইসলামী ছাত্র শিবির’ নাম গ্রহণ করেন। আহমদ ছফা বলিতেন জামায়াত আমাদের নামটা ‘হাইজ্যাক’ করিয়াছে।

জানিতে পারিলাম নতুন লেখক শিবির হইতে আহমদ ছফা বিদায় হইয়াছেন। বদরুদ্দীন উমর সমুখে আসিয়াছেন। শিবিরের কয়েকজন কর্মকর্তা সেযুগে সরকারি কাগজ ‘বিচিত্রা’ ও ‘দৈনিক বাংলা’য় কাজ করিতেন। কেমন জানি তালগোল লাগিয়া গেল আমার মনে। এই মহাত্মারা আহমদ ছফার নামটি পর্যন্ত শুনিতে রাজি ছিলেন না। কালের প্রহারে ইঁহারা এতদিনে অনেক সরকারের সেবা করিয়া লইয়াছেন। বর্তমান সরকারও ব্যতিক্রম নহে। তারেক মাসুদকে এই দলের মধ্যে দেখিয়া আমার মনে একটি অঙ্কুশ বিন্ধিয়াই রহিল।

এই সময়ে কোথা হইতে জানি শেখ মোহাম্মদ ওরফে এস এম সুলতান ঢাকায় আবির্ভূত হইলেন। সুলতানকে ঢাকা শহরের মধ্যম শ্রেণীর চিত্রশিল্পীরা বড় সুনজরে দেখিতেন না। তাঁহাদের নজরকে উচিত শিক্ষা দিবার মহান উদ্দেশ্যে আহমদ ছফা সেই সময় ‘অভিনব উদ্ভাসন’ নামে একটি নীতিদীর্ঘ প্রবন্ধ রচিয়া ফেলিলেন। ১৯৭৭ ইংরেজি পার হইতেছে। আহমদ ছফার প্রবন্ধটি কতজনের মতামত বদলাইল তাহার কোন জরিপ হয় নাই। তবে অন্তত একজনের মতামত তাহাতে বদলাইয়াছিল জানি। তিনি তারেক মাসুদ। আহমদ ছফার লেখা পড়িয়া তিনি সুলতান আবিষ্কার করিলেন।

আর অনেক আগেই চলচ্চিত্রকে জীবনের ধ্রুবতারা ঘোষণা করিয়াছিলেন তারেক মাসুদ। সেখানে আসিয়া দাঁড়াইলেন ‘কালপুরুষ’ এস এম সুলতান। তাঁহার ছবি লইয়া চলন্ত ছবি বানাইবেন তিনি। নাম রাখিলেন কোমল শব্দে ‘আদমসুরত’। যাহারা এই ছবি দেখিবেন তাহারা এই আরবি-ফারসি নামটা খুব পছন্দ করিবেন ভাবিয়া নাম রাখেন নাই তিনি। উঠন্তি মুলো পত্তনেই চিনা গিয়াছিল। শুদ্ধ উচ্চাভিলাষ নহে, দৃঢ়চেতনাও তারেক মাসুদের আরেক নাম। ‘আদমসুরত’ তারেকের পহিলা সৃষ্টি। আমরা কথায় কথায় ‘আটপৌরে জীবন’ কথাটা বলিয়া থাকি। আটপৌরে কথাটার সংস্কৃত ‘অষ্টপ্রহর’ বা আট পাহারা। এস এম সুলতানের জীবনকে দিনের আট পাহারা আবর্তনের মধ্যে ধরিয়াছিলেন তারেক মাসুদ। সকাল দুপুর, সন্ধ্যা রাত্রি নিশীথ প্রভাত–এইভাবে তিনি একটি গানের মতো বাঁধিলেন শিল্পীর জীবনবৃত্ত–তাঁহার আট পাহারা।

এই ছবির মূল পদার্থ বাহির করিবার জন্য তারেক মাসুদ ও তাহার বন্ধু মিশুক মুনীর পাকিস্তানে গিয়াছিলেন। কারণ সুলতানের জীবনবৃত্তের এক চাপ সেখানেই থাকিয়া গিয়াছিল। করাচি লাহোর ঘুরিয়া তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর সেই ছবির ছবি তুলিয়া আসিলেন। তৈরি করিলেন শিল্পীর জীবনবৃত্ত। ঢাকার কূপমণ্ডুক মধ্যম শ্রেণীর খাইয়া পরিয়া এহেন ছবিতে হাত দেওয়া সহজ কাজ ছিল না। তারেক মাসুদ এই অসাধ্য সাধন করিলেন। কি করিয়া করিলেন আজও ভাবিয়া শেষ করি নাই।

লেখক শিবিরের সভ্য হইয়াও আহমদ ছফাকে অপাংক্তেয় ভাবেন নাই তারেক মাসুদ। এখানেই তাঁহার বিশেষত্ব। এখানেই তাঁহার মহত্ত্ব। লেখক শিবিরের নেতাদের সততা সম্পর্কে আমি ছিলাম সন্দিহান। তাঁহারাও আমাকে দেখিলে চুম্বন কি আলিঙ্গন করিতেন না। তারপরও তারেক এই অভাজন সম্পাদিত একটি পত্রিকার কমিটিতে নাম লিখাইতে কুণ্ঠা করেন নাই। এইখানে তারেক মাসুদের বুদ্ধিমত্তা। আসলে ইতিহাস শিবির ছফা প্রাক্সিস কোন কিছুই তারেককে বাঁধিতে পারে নাই। তাঁহার গন্তব্য ছিল অন্য কোথাও, অন্য কোনখানে ছিল তাঁহার ঘরদুয়ার। আমরা ছিলাম তাঁহার পান্থপথ–বলা যাইতে পারে নিতান্ত সরাইখানা।

তারেকের সহিত পরিচয়ের দুগ্ধ একটুখানি ঘন হইয়া আসিলে একদিন জানিতে পারিলাম তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসিয়াছেন মাদ্রাসার পথ পার হইয়া। কি করিয়া তিনি কৌমি মাদ্রাসায় ঢুকিয়াছিলেন আর কি করিয়াই বা ঐ খাঁচা হইতে ছাড়া পাইলেন তাঁহার বয়ান তদীয় কাহিনীচিত্র ‘মাটির ময়না’ যোগে কিছু পাওয়া যাইবে। যে কায়দায় তিনি কৌমি মাদ্রাসা ছাড়িয়াছিলেন একদিন সেই কায়দায় তিনি লেখক শিবিরের খাঁচা হইতেও বাহির হইয়া গেলেন। প্রশ্ন হইল, গেলেন কোন জায়গায়? সেই জায়গাটার পরিচয় এখনও লই নাই।

এই জায়গাটার নামই কি ‘স্বাধীনতা ব্যবসায়’? ইংরেজি মতে যাহাকে বলে ‘লিবরেল’ তাহার গোড়ায় আছে লিবর বা স্বাধীন কথাটা। সেই গোড়ার রসুন হইতেই তৈরি হইয়াছে ‘লিবাটির্’, ‘লিবারেলিজম’ প্রভৃতি অমুক পদের। তাই বলি লিবারেলিজম বা লিবরের ব্যবসায় মানে বাংলায় দাঁড়ায় ‘স্বাধীনতা ব্যবসায়’। তারেক মাসুদের সম্মানে সত্য বলা কর্তব্য। তাই প্রশ্ন করিতে হয় তিনিও কি শেষের দিকে স্বাধীনতা ব্যবসায়ের পথই ধরিয়াছিলেন?

আজ এ প্রশ্নের উত্তর পুরা করা চলিবে না। কেহ কেহ বলেন তারেক মাসুদ যৌবনের অপরাহ্নে খানিক দক্ষিণে ঝুঁকিয়াছিলেন। সূর্যদেব যখন মকরক্রান্তির কাছাকাছি তখনও আমরা বলি তিনি দক্ষিণে ঝুঁকিয়াছেন। যৌবনের আদৌভাগে তারেক মাসুদের স্বপ্ন ছিল শিল্পীর স্বাধীনতা। এস এম সুলতানের জীবনবৃত্ত বানাইয়া তাঁহার স্বপ্ন ভাঙ্গিল না। একটা জিনিশ স্থির হইল কাহারও চাকরি করিবেন না তিনি । ‘স্বাধীনতা’ হইল তাহার বীজমন্ত্র। চাকরি করিলে স্বাধীনতা রক্ষা করা যায় না। আর স্বাধীনতা রক্ষা করিলে জীবনটা তরল পদার্থের মতন হইয়া যাইবে, যে পাত্রে রাখিবেন জীবন তাহার আকার ধারণ করিবে, আপনি হইবেন দশের মজুর।

১৯৮০ সাল হইতে যে দশকের শুরু তাহাতে অনেক বন্যাপ্লাবন ঘটিয়া গেল। শুরু হইল ধনতন্ত্রের নতুন বিজয়। এ সময় জীবিকার ডাকে তারেক মাসুদকেও হাত পাতিতে হইল নানান কিসিমের সাম্রাজ্যবাদী কি ধনিকবাদী সংস্থার দক্ষিণা বিভাগে। একদা এ দেশে ব্রিটিশ ধনতন্ত্র আসন গাড়িয়াছিল শুদ্ধ কৃষক সমাজকে রক্ষা করিবার অজুহাতে। এক্ষণে তাহারা আসিলেন নারীজাতির মুক্তিমন্ত্র মূলধন করিয়া। এই যুগে তারেক মাসুদ ‘সোনার বেড়ী’ নামে একটি বিজ্ঞাপন ছবিও বানাইয়াছিলেন। সেই ছবি দেখিবার দুর্ভাগ্য আমার হইয়াছিল মার্কিন মুলুকে। শিল্পী ও লেখকের দারিদ্র আমাদের সম্পূর্ণ অজানা জিনিস নহে। তারপরও আমি জানিতাম তারেক মাসুদ তাঁহার লক্ষ্য ছাড়িবেন না। তিনি লড়াই করিবেন।

muktir gaan

১৯৮৯ সালের আগেপরে কোন এক সময় তারেক মাসুদের মার্কিন মুলুকযাত্রা। সেখানে তাঁহার সহিত আমার বন্ধুত্ব অভিমানের দ্বিতীয় যুগ। আমি গিয়া পহুঁছিয়াছিলাম দুই কি তিন বছর আগে। তখন একে একে গিয়া জুটিয়াছিলেন আলম খোরশেদ, নাসির আলী মামুন। আর মাহমুদ হক নামে আমাদের আরেক বন্ধু আগে হইতেই ওখানে। সারা দুনিয়া জুড়িয়া তখন পট পরিবর্তনের হাওয়া বহিতেছে। দেশের স্বৈরশাসন হটাইবার জন্য মধ্যম শ্রেণীর নেতারা মধ্যে মধ্যে বিদেশ সফর করিতেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ততদিনে ইতিহাসের বিষয় হইয়া উঠিয়াছে। এই সময়ই তারেক মাসুদ তাঁহার ‘মুক্তির গান’ ছবিটি খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ হইতে যে সকল শরণার্থী ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে আশ্রয় লইয়াছিলেন এই ছবি তাহাদের লইয়া। চিত্রগুলি গ্রহণ করিয়াছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হইতে সদলবলে উপনীত সাংবাদিক লিয়র লেবিন। এই দলিলচিত্রমণ্ডলী বা ফুটেজ আনুমানিক বিশ বছর ধরিয়া কোন বাড়ির গুদামঘরে হাজিয়া মজিয়া যাইতেছিল। তারেক সাধনাবলে এই খনি আবিষ্কার করিলেন। এই আবিষ্কার তারেক মাসুদের সেরা কীর্তির মধ্যে। সম্পাদনা করিয়া যে ছবি তিনি দাঁড় করাইলেন তাহাকে সম্পূর্ণ নতুন ছবি বলিতে হইবে। ছবির শুরুতে তিনি জহির রায়হান নির্মিত ‘স্টপ জেনোসাইড’ ছবির অংশবিশেষ কাজে লাগাইলেন আর শেষে কিছু অংশে গেরিলাযুদ্ধের অভিনয় জুড়িয়া দিলেন।

যে গানের দলটি শিবিরে শিবিরে উদ্দীপনাময় গান গাহিয়া দেশত্যাগী শরণার্থীদের (আর কখনও কখনও দেশের ভিতরে আসিয়া মুক্তিযোদ্ধা সৈনিকদের) সাহস যোগাইতেন তাঁহাদের অনেকের সহিতই তারেক মাসুদ পরিচিত ছিলেন। এমনকি তাঁহার পরিবারের সদস্যরাও ইহার মধ্যে জীবনধারণ বা চলাফেরা করিতেছেন। ফলে এই ছবির মূল্য দুই রকমই হইল তারেকের নিকট।

জার্মান দার্শনিক বাল্টার বেনিয়ামিন ছবি ও চলচ্চিত্রের দুই মূল্যের দুই নাম রাখিয়াছিলেন। এক মূল্য ছবিকে আর দশ পদার্থ হইতে আলাদা করে ও সম্ভ্রম জাগায়, দূরের হাতছানি এমনকি পবিত্রতার আমদানি ঘটায়। মার্কস কথিত পণ্যের ব্যবহার মূল্যের নকশা ধরিয়া বেনিয়ামিন ইহার নাম রাখিয়াছিলেন ছবির ‘ধর্মমূল্য’। দ্বিতীয় ধরনের মূল্য ছবিকে জনসাধারণের মধ্যে ছড়াইয়া দিবার মধ্যে। যন্ত্রবিজ্ঞানের দৌলতে একই ছবির লক্ষ লিপির ব্যবস্থা ছবিকে ‘গণতান্ত্রিক’ করিয়াছে। তবে কথা আছে, এই গণতন্ত্র বাজারে টিকিবার গণতন্ত্র। কার্ল মার্কস এই মূল্যের নাম রাখিয়াছিলেন পণ্যের ‘বিনিময় মূল্য’ বা দাম। বেনিয়ামিন ইহার নাম দিলেন শিল্পের ‘প্রদর্শন মূল্য’।

চলচ্চিত্রের ধর্ম ও প্রদর্শন–দুই মূল্য মূলধন করিয়া তারেক মাসুদ ছবিটি শেষ করিলেন ১৯৯৫ সাল নাগাদ। ছবি লইয়া ঢাকায় ফিরিবার আগে তিনি মার্কিনদেশে বিশেষ করিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী জনসাধারণের মধ্যে ছবিটির একাধিক প্রদর্শনী করেন। আমি বন্ধুতাভিমানের সুযোগ লইয়া–চলচ্চিত্রকারের অনুমতিক্রমে–দুইটা জায়গায় পরিবর্তনের প্রস্তাব করিয়াছিলাম।

তারেক মাসুদ নিজেই একটা কথা ঘন ঘন রাষ্ট্র করিতেন। কথাটা ইংরেজিতেই বলিতেন–‘ডকুফিকশন’। ‘মুক্তির গান’ ছিল তারেকের নিজ বিচারেই এক প্রকার ডকুফিকশন বা খবরকল্প কাহিনী। ইহাতেই তারেক মাসুদের পথ আমরা পরিষ্কার দেখিতে পাইলাম। একটা প্রশ্নের উত্তর আমরা আজও পাই নাই। বাংলাদেশ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ করিয়া স্বাধীন হইয়াছে কিন্তু দেশের সমাজ কাঠাম আমূল বদলাইয়া যায় নাই। দেশে গণতন্ত্র কায়েম হয় নাই। কেন? ইহার উত্তর সন্ধান করিতে করিতে সেই সময় নাগাদ আমাদের শিক্ষক আহমদ ছফা ‘অলাতচক্র’ নামক কাহিনীটি লিখিয়াছিলেন। তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’ ছবিটি যেন অলাতচক্রেরই অপর পিঠ আকারে হাজির হইল।

‘অলাতচক্রে’ আহমদ ছফা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নানান সামাজিক শ্রেণীর ভূমিকা লইয়া বিচারসভা বসাইয়াছিলেন। আর আমি দেখিলাম ‘মুক্তির গান’ বানান হইল এমন কায়দায় যেখানে বাংলাদেশের জনগণের নহে, ঘোষিত হইল মধ্যম শ্রেণীর জয়। এক হিসাবে তারেক মাসুদ সত্য কথাই বলিয়াছেন। তাহার ছবি তো খবর নহে, খবরকল্প কাহিনী। আমি করজোড়ে বলিলাম কল্পাংশটা খানিক ছাঁটিয়া বা বদলাইয়া দিন । কিম্বা আহমদ ছফা যে জায়গা হইতে যুদ্ধ ও রাজনীতিকে যুক্ত করিয়াছেন তাহার কিছু অংশও থাকুক।

আহমদ ছফার পদতলে একদিন তারেকও বসিয়াছিলেন। তিনি জানিতেন কত ধানে কত চাউল। আহমদ ছফার পথ ধরা তাহার পক্ষে সহজ ছিল না। এখন পিছনে ফিরিয়া তাকাইলে বুঝি ‘মুক্তির গান’ ছবিটি প্রাণ হইতে গ্রহণ করিতে কেন পারি নাই। দুঃখের মধ্যে, তারেক মাসুদের সহিত আমার সম্পর্কটা ক্রমশ শিথিল হইতে, নিছক ধর্মমূল্য লইতে, দূরান্বয়ী হইতে শুরু করিল। এই দূরত্ব পারস্পরিক। অস্বীকার করিতে পারি নাই তারেক মাসুদ আমার পাঁচপ্রাণের বন্ধু, কিন্তু ‘মুক্তির গান’ ছবিটিও আমার বন্ধুর ছবি বলিয়া স্বীকার করিতে পারিতেছিলাম না। এই দশা ঈর্ষা করিবার দশা নহে।

‘মুক্তির গান’ ছবির অপূর্ণ বাসনা পূরণ করিতে তারেক পরে ‘মুক্তির কথা’ বানাইয়াছিলেন। আমাকে সেই মর্মে জবাবদিহিও করিয়াছিলেন তিনি। সৌভাগ্য হয় নাই ছবিটি দেখিবার। কিন্তু তাঁহার মহত্তম কীর্তি এখনও সম্মুখে পড়িয়া আছে বলিয়া বিশ্বাস করিতেন তারেক মাসুদ। ‘মাটির ময়না’ ছবিটি দেখিবার সৌভাগ্য আমার হইয়াছিল।

matirঅনেক কথা মনে নাই। একটি কথা মনে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হইবার পর কোন এক সময় তারেক মাসুদ বলিয়াছিলেন তিনি তাহার মাদ্রাসা জীবনের স্মৃতি বা অভিজ্ঞতা সম্বল করিয়া একপ্রস্ত ছবি বানাইবেন। ‘মুক্তির গান’ তাঁহাকে সেই জায়গায় পৌঁছাইয়া দিল যেখানে পৌঁছিলে আর পিছনে তাকাইতে হয় না। ‘মাটির ময়না’ সেই অমৃতের পুত্র–তারেক মাসুদের স্বপ্ন পূরণ হইল। ভারতবর্ষের নামজাদা চিত্রবিশারদ বাবা গাস্তঁ রোবের্জ বলিয়া ফেলিলেন এই ছবি সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’র সমান। অনু আর তাহার বোনের চরিত্র, অপু আর তাহার বোনের আদল পাইয়াছে। বোনের মৃত্যু দুই সংসারেই আগুন লাগিয়াছে। এই মৃত্যুকে–বোনের মৃত্যুকে– নানাভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

এক জায়গায় আসিয়া তারেক সত্যজিৎকেও অতিক্রম করিলেন। সত্যজিৎ রায় ভারতবর্ষের গ্রামীণ দারিদ্র ও ধর্মবিশ্বাসের মধ্যে ‘পথের পাঁচালী’ বানাইয়াছিলেন ১৯২০ সালের যুগে লেখা এক কাহিনীর পিঠে পা রাখিয়া। তারেকের ঘটনার পট ১৯৬০ সালের দশক। পূর্ব বাংলার কোন এক গ্রাম। বাংলাদেশের গ্রামীণ দারিদ্র ও শোষণ তারেকের চোখে এসলাম ধর্মের অন্তর্গত দুই ধারার বিরোধ আকারে হাজির হইল। জনৈক কলিকাতাফেরত ইংরেজি শিক্ষিত বাঙ্গালি মুসলমান ভদ্রলোক তাহার ছেলেকে মাদ্রাসায় পড়িতে পাঠাইলেন। তিনি নিজে কিন্তু মাদ্রাসায় পড়েন নাই। ইংরেজি শিক্ষা বর্জন করিবার চিন্তা হইতেই তিনি মাদ্রাসা শিক্ষা আঁকড়াইয়া ধরিলেন। যে শিশুকে মাদ্রাসায় পাঠান হইল তাহার চোখেই ছবির বয়ান গড়িয়া উঠিয়াছে।

এমন সময় আসিল ‘স্বাধীনতার অকাল বোধন’–বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম। জাতীয় পরিচয়ের মুক্তিযুদ্ধ। মাদ্রাসা হইতে অনুরও মুক্তি হইল। এই মুক্তি প্রতীকী বা আকার হিসাবেও পড়িতে হইবে। আমি অন্তত সেইভাবেই পড়িয়াছি। তারেক মাসুদের মধ্যে আমি সেই মহান চলচ্চিত্রকারের খোঁজ পাইয়াছিলাম যাহাকে প্রশ্ন করা যায়, যাহার কাছে আরও শেখা যায়। তিনি আমাকে এই জায়গায় আর পড়াইতে রাজি হইলেন না। আমারও দুঃখের আর অবধি রহিল না।

প্রশ্ন করিয়াছিলাম বাংলা মুলুুকে এসলাম ধর্মের যে রূপকে তারেক মাসুদ কাঠগড়ায় দাঁড় করাইয়াছেন তাহার বিকল্প কি? মনে হইয়াছিল শিশু অনু যে গ্রাম্যমেলায় যাইতে চাহে, যে মাটির ময়না সে কিনিয়া আনে, যে ময়না কিনে বাবার ভয়ে লুকাইয়া রাখে তার মধ্যে সেই বিকল্প তারেক দেখিয়াছেন। ইহাকে কেহ কেহ নতুন গড়িয়া উঠা–মানে ১৯৪৭ সালের পরে গড়িয়া উঠা ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ বলিতে চাহিয়াছেন।

আমার জিজ্ঞাসাটা ছিল অন্য জায়গায়। মাদ্রাসা শিক্ষাই আমাদের সমস্ত অনুন্নতির মূল এই পরামর্শ কতখানি সৎ পরামর্শ? ইহার অর্থ কি এই নহে যে ইংরেজি শিক্ষার মধ্যেই আমাদের মুক্তির গান শোনা যাইবে। পরাধীনতার যুগ শেষ হইয়াও কেন শেষ হইতেছে না বাংলাদেশে? তাহাতে সমস্ত দোষ মাদ্রাসা শিক্ষার–এ কথা বলিলে আমরা অর্ধসত্য বলিবার দোষে দুষ্ট হই। পরাধীনতার বলে বলীয়ান নতুন মধ্যম শ্রেণীর হেজিমনি ওরফে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এই অর্ধসত্য বেশ কাজে লাগিবে এ কথা মিথ্যা নহে। কিন্তু শিল্পীর কাজ কি কেবল শাসক শ্রেণীর উপকরণ মূল্য যোগাইয়া যাওয়া?

বাংলাদেশের সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ধর্মবিশ্বাসে মুসলমান। তাহাদের মানসগঠনে এসলাম ধর্মের আগমন ঘটিবার পূর্বে যে পদার্থ ছিল এসলাম ধর্মও তাহা বিশেষ বদলাইতে পারে নাই। এই কথা নতুন করিয়া প্রচার করিয়াছিলেন মহাত্মা আহমদ ছফা। সে কথায় ইংরেজি ১৯৭৬ কিংবা ১৯৭৭ সালে আমরা কান দিয়াছিলাম। যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্বদিকের রমনা ময়দানে প্রাতভ্রমণের সময় আহমদ ছফা আবুল ফজলের সাক্ষাৎ পাইলেন তখন তাঁহার মনে এই প্রস্তাবের জন্ম। আহমদ ছফা সিদ্ধান্ত করিয়াছিলেন বাঙালি মুসলমান হইতেছেন আবুল ফজলের মতন। সারাজীবন ধরিয়া প্রচার করিলেন একের ঘরে আর শেষ জীবনে ধর্না দিলেন আরেক দুয়ারে।

তারেক মাসুদ তাঁহার বাবার মধ্যে সেই বাঙ্গালি মুসলমানের প্রতিকৃতি আবিষ্কার করিলেন। এক শ্রেণীর বাঙ্গালি মুসলমান বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে সন্দেহ করিয়াছে। অনেকে তাহাদের প্রতীক আকারে মাদ্রাসা শিক্ষাকে দায়ী করেন। কিন্তু ইতিহাসকে ইচ্ছামতো পায়ের বেড়ী পরান যায় না। ইতিহাস হইতে দেখা যাইবে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মাদ্রাসা ছাত্রদের একটা বড় ভূমিকা ছিল। কৌমি বা জাতীয় মাদ্রাসার ছাত্ররা ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে লড়িয়াছিলেন কিন্তু পাকিস্তান বানাইতে রাজি হয়েন নাই।

বাংলাদেশ স্বাধীন হইয়াছে কিন্তু দেশের সমাজ কাঠাম বদলাইয়া যায় নাই। দেশে গণতন্ত্র নামে যাহা চলিতেছে তাহাতে জনগণের শাসন কায়েম হয় নাই। ইহার দায় কতখানি মাদ্রাসা শিক্ষার? আর কতখানিই বা ইংরেজি শিক্ষার? যদি আমরা বলি এসলাম ধর্ম বা তাহার ব্যাখ্যাবিশেষই ইহার জন্য দায়ী তবে আমাদের জবাবদিহি আছে। কেহ কেহ বলেন, এসলাম ধর্ম পশ্চিম এশিয়া হইতে আমদানি করা দ্রব্যবিশেষ–ইহা দেশজ পদার্থ নহে। এই বিশেষণ বিপজ্জনক–সত্য বলিতে বর্ণবিদ্বেষী বা উগ্র জাতীয়তাবাদী।

মধ্যম শ্রেণীর একাংশ আজিকালি এই বিশেষণ অঙ্গীকার করিতেছেন। আমি তাহাদের সমজদার হইতে পারি নাই। আমার ভয় হইয়াছিল তারেক মাসুদের ছবি এই বর্ণবিদ্বেষী, বর্ণাশ্রমধর্ম ব্যবসায়ী মনোভাবকে উসকাইয়া দিতে পারে। বাংলাদেশে এই ব্যবসায় ‘মানব ব্যবসায়’ ওরফে ‘হিয়ুুম্যানিজম’ আকারে উপস্থিত আছে। বর্তমানে দেশ চলিতেছে এয়ুরোপিয়া এনলাইটেনমেন্ট বা চেরাগের আলো ধার করিয়া। তাহা তো দেশজ নহে বলিয়া নিন্দার ভাগ পায় নাই। বাংলাদেশের কৃষক– মজুর কৃষক ও গৃহস্থ কৃষক– যে ধর্মবিশ্বাস আঁকড়াইয়া ধরিয়াছে শুধু তাহার মধ্যে বিদেশী দ্রব্য আমদানির সাক্ষ্য খোঁজা সত্যসন্ধানীর কাজ হইতে পারে না। পল্লবগ্রাহী বাঙালি মুসলমান সমাজের কেহ কেহ এক সময় মুখে মার্কসবাদও গ্রহণ করিয়াছিল। ‘মাটির ময়না’ ছবির এক চরিত্র বলিয়াছেন মার্কসবাদ ও হোমিওপ্যাথি সমতুল্য–দুইটাই জার্মান পদার্থ।

সত্য ও ন্যায়বিচারের খাতিরে–আজ এই শোকের মধ্যেও–মনে রাখিতে হইবে অভিজ্ঞতাই শেষ কথা নহে। ‘মাটির ময়না’ প্রসঙ্গে তারেক মাসুদ বলিতেন, ‘এই ছবির গল্প আমার নিজ জীবনবৃত্তের একটা ছিলা বা বৃত্তচাপ’। আমি বলিতাম, ‘সূর্য পূর্বদিকে উঠিবে। কারণ ইহা আমাদের অভিজ্ঞতা। তো সূর্য এই পৃথিবী নামক গ্রহের চারিদিকে ঘুরিয়া মরিতেছে, ইহাও কি আমাদের অভিজ্ঞতার অন্তর্গত নহে?’ তো কেন আমরা অভিজ্ঞতার মধ্যে এককে গ্রহণ করি, আর অন্যকে বর্জন করি? তারেক মাসুদের সঙ্গে অনেক বিনিদ্র রজনী আমরা কাটাইয়াছি। এই তর্কের শেষ হয় নাই।

‘সূর্য পৃথিবীর চারিধারে ঘুরিতেছে’, কিংবা ‘মানুষ যুক্তিশীল প্রাণী’ ইত্যাদি অর্ধসত্য ভর করিয়া পঞ্জিকা লিখিয়াছে, সভ্যতা গঠিয়াছে মানুষ। এই ক্রমে বলিতে পারি বিশ্বাস ভুল হইলেও মানুষের কীর্তি থাকিয়া যাইতে পারে। তারেক মাসুদ আকর্ষণীয় চলচ্চিত্র বানাইয়াছিলেন। এই বানানোর কাজটি সহজ ছিল না। তাঁহার ছবিতে বাংলাদেশ চিত্ররূপময় হইয়া উঠিয়াছে। তিনি তাহাতে সৌন্দর্য ছাড়াইয়া পবিত্রতার মহিমাও ফুটাইয়া তুলিয়াছেন। তিনি এককথায় বলা যায় সার্থক হইয়াছেন। যে নৈপুণ্য যে দক্ষতা তিনি দেখাইয়াছেন তাহার স্বীকৃতি তিনি কিছু পরিমাণে হইলেও পাইয়াছেন। বাঁচিয়া থাকিলে তাঁহার কীর্তিতে আরও নতুন অধ্যায় যোগ হইত, দেশের মুখোজ্জ্বল হইত সন্দেহ নাই।

আমার সবিনয় জিজ্ঞাসা, এই সার্থকতার মধ্যে কি এক প্রকারের ব্যর্থতাও লুকাইয়া নাই? এমনও কি হইতে পারে যে তিনি যে সার্থকতার মধ্যে নিজেই চিত্ররূপময় হইয়া রহিলেন, তাঁহার স্বপ্নের স্বাধীনতা তাহাতেই অপূর্ণ রহিয়া গেল?

এখন আমাদের কি কর্তব্য? তিনি যে কীর্তি রাখিয়া গেলেন আমরা কি তাহার মধ্যে শুদ্ধ নিজেদের চেহারা দেখিব? নাকি ‘কলবের মধ্যে আয়না বানাইয়া’ তাহার পারদটা মুছিয়া দিব? তাঁহাকেও দেখিব?

তারেক মাসুদের এন্তেকাল হইয়াছে অকালে। এই এন্তেকাল মানিয়া লওয়া যায় না। তাঁহার অন্তিম যাত্রা হইল জীবনের মধ্যভাগে। এই ক্ষতির পূরণ নাই। তাঁহার বিদায় সমাবেশে যে জনসাধারণ আসিয়াছিলেন তাহারা ‘সর্বস্তরের’। এ কথা সংবাদপত্র হইতে জানিয়াছি। আমি নিজেও সেখানে হাজির ছিলাম। একটা জিনিশ অবশ্য সংবাদপত্রে খুঁজিয়া পাই নাই। শহীদ মিনারের পাদদেশে আমি তিন ঘণ্টার মতো দাঁড়াইয়া ছিলাম। অনেক মানুষ, ততোধিক ফুলের শ্রদ্ধা। এইসব মিছিলে আমি মাদ্রাসার ছাত্র বিশেষ কিন্তু দেখি নাই। কথাটা মনে পড়িল। তারেক মাসুদ চলচ্চিত্রের বিনিময়েও মাদ্রাসা ছাত্রদের স্বাধীন করিতে পারেন নাই।

এক সময়ে আমরা শুনিতাম কবিতা তিন নম্বর বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাইতে পারে। এখন অত শুনি না। চলচ্চিত্রও হয়তো বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাইতে পারিবে না। কিন্তু স্বপ্ন দেখা মানুষের সংশোধনের অতীত নিয়তি। শুধু একটা কথাই সত্য– মানুষ স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নটা এক অর্থে কিছুই নহে। স্বপ্নকে আমরা যতই দূরে ঠেলিয়া দিই ততই সে আমাদের কাছে টানে। অথচ এই স্বপ্নটাই–অজ্ঞানের এই স্বতস্ফূর্ত আত্মপ্রকাশটাই–আমার একমাত্র অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতার জোরেই হয়ত আমি তারেক মাসুদকে আত্মীয় ভাবিয়াছি।

প্রথম প্রকাশ: দৈনিক যুগান্তর, সাহিত্য সাময়িকী, ১৯ আগস্ট ২০১১।