বিচারপতি হাবিবুর রহমান: মহাপ্রয়াণের পর

কিমাশ্চর্যম্! টানা আট বছর কোমায় থাকার পর গতকাল–১১ জানুয়ারি ২০১৪–পশ্চিম এশিয়ার ত্রাস জঙ্গিরাষ্ট্র ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারন শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়াছেন। তাঁহার বিরুদ্ধে অনেক মানবতাবিরোধী অপরাধের, অনেক যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ ছিল। বিশেষ করিয়া ১৯৮২ সনে লেবাননের দক্ষিণে দুই ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরে বিস্তর অসামরিক নিরস্ত্র মানুষকে পাইকারী হারে হত্যা করিয়াছিলেন তিনি। শিবির দুইটার নাম শাবরা ও শাতিলা।

গায়ের জোরে তিনি রেহাই পাইয়াছেন। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা এই বাবদ তাঁহাকে আজও ক্ষমা করে নাই। আমি সন্ধ্যায় এই খবরটা দেখিয়া ঘুমাইতে গিয়াছিলাম। সকালে ঘুম হইতে জাগিয়া পত্রিকায় দেখিলাম আরেক শিরোনাম: ‘আরেক এক গুণীজনের প্রস্থান’। বিচারপতি হাবিবুর রহমান সাহেব গত হইয়াছেন গতকাল। গতকাল ছিল ১১ জানুয়ারি। কিমাশ্চর্যম্! বাংলাদেশের ইতিহাসে ১১ জানুয়ারি একটি আশ্চর্য দিন।

পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হিসাবে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের জন্ম হইয়াছিল ইংরেজি ১৯২৮ সালের ৩ ডিসেম্বর। অতয়েব হিসাবমাফিক বলিতে তিনি ৮৫ বছর পরমায়ু পাইয়াছিলেন। আমার পরম সৌভাগ্য ২০০০ সালের পরে কোন এক সময় তাঁহার সহিত পরিচিত হইয়াছিলাম। এমনকি বার কয়েক ইস্কাটনের উপকণ্ঠে ইস্পাহানি উপনিবেশে তাঁহার বাসাবাড়িতে তাঁহার মহান সান্নিধ্যও লাভ করিয়াছিলাম। সাবেক সরকার প্রধান বলিয়া তাঁহার বাসার সামনে একটি কি দুইটি পুলিশের লোক দণ্ডায়মান থাকিত।

শুমার করিয়া দেখিতেছি বয়সে তিনি আমার তিরিশ বছরের বড় ছিলেন। কিন্তু ব্যবহার দেখিয়া কখনও কখনও বুঝিতাম তিনি আমার সহিত বয়স্যোচিত আচরণই করিতেছেন। তিনি নানাবিদ্যায় এবং নানান বিদ্যায় মনোনিবেশ করিয়াছিলেন। এমন কি কবিতার মতন ক্ষেত্রেও তিনি কখনও কখনও কাচা ফসল ফলাইয়াছিলেন। সাহিত্যের নানারাজ্য-পর্যটক রাজু আলাউদ্দিন তাঁহার রূপক নাম রাখিয়াছেন ‘গালিভার’। আর এক আলোক-বিশারদ সাজ্জাদ শরিফ তাঁহাকে বলিয়াছেন ‘আলোর দিশারি’। দুইটি উপাধিই যথার্থ হইয়াছে।

যখন তাঁহার পরিচয় লাভ করিয়া ধন্য হই ততদিনে তিনি সাবেক হইয়াছেন। সকলেই বলিতেন তিনি ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা।’ পত্রিকা সম্পাদকরা শুদ্ধ ব্যাকরণে লিখিতেন ‘সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা।’ যতদূর মনে পড়ে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের সহিত আমার পরিচয় ঘটাইয়া দিয়াছিলেন সাজ্জাদ শরিফ। আজিকার ‘প্রথম আলো’ পত্রিকার প্রথম পাতায় তিনি যাহা লিখিয়াছেন তাহার কিয়দংশ উদ্ধার করিবার উপযুক্ত। কি কঠিন সময়ে না দেশ পরিচালনার ভার কাঁধে লইয়াছিলেন বিচারপতি হাবিবুর রহমান! তাঁহার পথ ফুলে ফুলে ছাওয়া ছিল না।

সাজ্জাদ শরিফ লিখিতেছেন, ‘বাংলাদেশের অবিশ্বাসের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি প্রবর্তিত হয়। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে সুচারুভাবে তাঁর দায়িত্ব পালন করেন।’ তাহা সত্ত্বেও স্বীকার করিতে হইবে তিনি সকল পক্ষকে সন্তুষ্ট করিতে পারেন নাই। নির্বাচনে যাঁহারা সেইবার পরাজিত হইয়াছিলেন তাঁহারা নির্বাচনের পর তাঁহার বাড়িঘরে পর্যন্ত হামলা করিয়াছিলেন। কথাটা সত্যই মিথ্যা নহে।

তাঁহার অন্যতর কীর্তির কথা সাজ্জাদ শরিফ উল্লেখ করিয়াছেন এইভাবে: ‘এ দায়িত্ব পালনকালে সেনাবাহিনীর তৎকালীন প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবু সালেহ মোহাম্মদ নাসিম বিদ্রোহ করলে জাতির উদ্দেশে এক নেতাসুলভ প্রজ্ঞাপূর্ণ ভাষণের মাধ্যমে জাতিকে সুসংবদ্ধ ও পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন।’ এই কথাটাও সত্য। অস্বীকার করিবার উপায় নাই।

কিন্তু চাঁদেরও কলঙ্ক আছে। বিচারপতি হাবিবুর রহমান ভরাযৌবনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতর রাষ্ট্রভাষা করিবার আন্দোলনে এক প্রকার নেতৃত্ব দিয়াছিলেন। দেশ স্বাধীন হইবার পর একসময় প্রায় কুড়ি বছর ধরিয়া তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারক পদে আসীন ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি প্রধান বিচারপতিও হইয়াছিলেন। ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’–সংবিধানের এই প্রস্তাবনার তাৎপর্য কি? তাহা কি তিনিও ধরিতে পারেন নাই? সমালোচকরা বলিতেছেন তিনিও রাষ্ট্রভাষায় আদালতের রায় বিশেষ লেখেন নাই। কেন এমন হয়?

উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার প্রবর্তনে তাঁহার ভূমিকা তিনি পালন করিয়াছেন। তবে পরে। অবসর গ্রহণের পরে তিনি অনেক প্রবন্ধে এই বিষয়ে তাঁহার মতামত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় লিখিয়াছেন। রাষ্ট্রের অন্যান্য বিভাগের মত বাংলাদেশে আদালতের ভাষাও বাংলা হওয়াই উচিত। দুঃখের মধ্যে এদেশের বিচার বিভাগে বাংলা ভাষার ব্যবহার এখনও অবাধ হয় নাই। তাহার দায় একা বিচারপতি হাবিবুর রহমানের উপর চাপান ঠিক হইবে না। তবে একথা ঠিক যে লোকে তাঁহার কাছে কিছু বাংলা রায় উদাহরণস্বরূপ আশা করিত।

বিচারপতি হাবিবুর রহমান বাংলাটা নিজে ভাল লিখিতেন। তাঁহার লেখা যে বহিটির সহিত আমার প্রথম পরিচয় ঘটে সেই বহির নাম যথাশব্দ। বইটা ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমী হইতে বাহির হইয়াছিল। এই বহির লেখক হিসাবে তাঁহার নামযশ আমি এখনও করিতেছি। অনেক দিনই করিব। এই জাতীয় বইকে ইংরেজিতে ‘থেসরাস’ বলা হয়। তাঁহার লেখা বাংলা থেসরাসটি বেশ উপকারী বই হইয়াছিল। তিনি বাংলা ভাষাটাও খুঁটাইয়া পড়িতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা তাঁহার প্রিয় ছিল–একথা বলাই বাহুল্য। শেষ বয়সে–আমাকে একবার বলিয়াছিলেন–তিনি চীনা ভাষাও শিখিতেছিলেন।

সমালোচকরা তাঁহার দুইটি দোষ ধরিতেন। একেত তিনি বেশি লিখিতেন। দ্বিতীয়ে অন্যের লেখা হইতে অধিক উদ্ধৃতি ব্যবহার করিতেন। কেহ কেহ এমন অভিযোগও করিয়াছেন তিনি উদ্ধৃতি না দিয়াও অন্যের লেখা কখনও কখনও ব্যবহার করিতেন। দৃষ্টান্তের মধ্যে পরলোকগত মহান লেখক আহমদ ছফা আমাকে একবার একথাটি বলিয়াছিলেন। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের স্মৃতি রোমন্থন করিয়া আহমদ ছফা যে বইটি লিখিয়াছিলেন তাহার নাম যদ্যপি আমার গুরু। ইহা হইতে কোন কোন অংশ হাবিবুর রহমান সাহেব তাঁহার লেখায় চাকা চাকা ব্যবহার করিয়াছেন। অভিযোগটির সত্যতা আমি যাচাই করিয়া দেখি নাই। তবে অস্বীকার করিবার উপায় নাই। অনুবাদেও তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন।

বিচারপতি হাবিবুর রহমান সাহেবের রাজনৈতিক চিন্তাধারা ছিল ইংরেজিতে যাহাকে বলে ‘লিবারেল’ তাহার প্রমাণস্বরূপ। বাংলায় এই শব্দটির প্রচলিত অনুবাদ ‘উদারনৈতিক’। লিবারেল অর্থ যাঁহারা লিবার্টি বা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন। জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আজম এখন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দণ্ডপ্রাপ্ত। এই গোলাম আজমের নাগরিকত্ব বাতিল মামলার আপীলের যে রায় ১৯৯৪ সালে দেওয়া হইয়াছিল তাহাকে উদারনৈতিক ব্যবহারশাস্ত্রের পরাকাষ্ঠা বলা যায়। বিচারপতি হাবিবুর রহমানও এই মামলার অন্যতম বিচারক–সত্য বলিতে প্রধান বিচারক–ছিলেন। এই মামলায় গোলাম আজমের নাগরিকত্ব মঞ্জুর করা হইয়াছিল। প্রকাশ থাকে যে গোলাম আজম সাহেব ১৯৭৮ সাল হইতে বিনা ভিসায় বিনা নাগরিকত্বে বাংলাদেশে অবস্থান করিতেছিলেন। ১৯৯৪ সাল নাগাদ তিনি নাগরিক হইলেন। ইহার সামান্য কৃতিত্বে বিচারপতি হাবিবুর রহমানেরও ভাগ আছে।

এই মামলায় মাননীয় বিচারপতিরা যে সিদ্ধান্ত লইয়াছিলেন তাহার গোড়ায় একটি চিন্তা কাজ করিতেছিল। সেই চিন্তা অনুসারে, নাগরিকত্ব জিনিশটা জন্মের–অর্থাৎ প্রাণীবিজ্ঞানের–বিষয়। অথচ রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনুসারে নাগরিকত্ব জিনিশটা কর্মের–কৃতকর্ম বা রাজনৈতিক ব্যবহারের–বিষয় বটে। যাহারা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহিত সহযোগিতা করিয়াছিলেন–মায় হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ প্রভৃতি মানবতাবিরোধী অপরাধে অপরাধী–তাহাদের নাগরিকত্ব বা ভোটাধিকার বাতিল হইবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সামান্য তত্ত্ব যাহা ‘সমাজচুক্তি উপপাদ্য’ নামে পরিচিত–অন্তত সপ্তদশ শতাব্দী হইতে যাহা আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি বলিয়া গণ্য–তাহাতে সাব্যস্ত আছে যে যুদ্ধাপরাধীর নাগরিকত্ব বাতিল হইতেই পারে।
কিন্তু সেদিন–১৯৯৪ সালে–বাংলাদেশের বিচারপতিরা অন্য চিন্তা করিতেছিলেন। মনে হইতেছে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের পবিত্র স্মৃতির তলায়ও এই শ্যামল ছায়াটি পড়িয়াই থাকিবে। কতদিন থাকিবে কে জানে!

১২ জানুয়ারি ২০১৪

১২ জানুয়ারি ২০১৪, bdnews24.com

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.