জেনারেল এরশাদের রাজনীতি লইয়া আহমদ ছফার দুইটি নিবন্ধ

পরলোকগত মনীষী মহাত্মা আহমদ ছফা ইংরেজি ২০০০ সালের আগায় ও ২০০১ সালের গোড়ায় প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদকে মুখ্য বিষয় করিয়া দুই দুইটি নিবন্ধ লিখিয়াছিলেন। লেখা দুইটি দৈনিক ‘আজকের কাগজ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিল যথাক্রমে ২০০০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ও ২০০১ সালের ৪ এপ্রিল তারিখে। দ্বিতীয় নিবন্ধটি প্রকাশের কিছুদিন পর তিনি পরলোকগমন করেন। বলা প্রয়োজন লেখা দুটি এখনও আহমদ ছফার রচনাবলিতে যোগ করা হয় নাই।

জীবনের শেষদিকে তিনি অনেক সময় নিজের হাতে লিখিতে পারিতেন না। কিম্বা লিখিতে চাহিতেন না। তাঁহার তিনদিকে জড় হওয়া তরুণতরুণীরা অনেক সময় শ্র“তি লিখিতেন। এখানে উৎকলিত প্রথম নিবন্ধটির শ্র“তি লিখিয়াছিলেন মেকী খীসা। দ্বিতীয় লেখাটির শেষে এমন কাহারও নাম লেখা আছে কিনা দেখা যাইতেছে না। অধুনালুপ্ত ‘আজকের কাগজ’ কর্তৃপক্ষের ঋণস্বীকার করিয়া আমরা লেখা দুটি নতুন করিয়া এখানে ছাপাইতেছি। ছাপার সময় আমরা কিছু কিছু মুদ্রণপ্রমাদ সংশোধন করিয়াছি। কোন কোন জায়গায় বানানরীতির সমতা বজায় রাখার স্বার্থে এই সংশোধন আবশ্যক হইয়াছে আর কোথাও কোথাও সঙ্গতিবিধানের জন্য একটা দুইটা শব্দ যোগ করা হইয়াছে। সংযুক্ত শব্দগুলি তৃতীয় বন্ধনীযোগে দেখান আছে।

 3

এই দুই নিবন্ধযোগে মহাত্মা আহমদ ছফা বাংলাদেশের রাজনীতির একটি গোড়ার গলদ চোখে বুড়া আঙ্গুল দিয়া দেখাইয়া দিয়াছিলেন। এই আদি গলদের প্রকাশ্য লক্ষণ বা আলামত আকারে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদের নাম লওয়া যায়। জেনারেল এরশাদ ১৯৮০ সালের দশকটার বলিতে গেলে প্রায় পুরাটা জুড়িয়াই বাংলাদেশ শাসন করিয়া তটস্থ রাখিয়াছিলেন। তিনি ক্ষমতা দখল করিয়াছিলেন একটি পূর্বঘোষিত সামরিক অভ্যুত্থানের দৌলতে। আর ১৯৯০ ইংরেজি নাগাদ একধরনের ব্যাপ্তিতে জনপ্রিয় অথচ ব্যঞ্জনায় সীমাবদ্ধ রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের মধ্যস্থতায় তিনি ক্ষমতাচ্যুত হইয়াছিলেন। তবে সকলেই জানেন সেই অভ্যুত্থানে তিনি নিহত কিম্বা নির্বাসিত কোনটাই হন নাই। তাঁহাকে কিছুদিন একটি কারাগারে রাখা হইয়াছিল।

কারাগার জায়গাটা বিশেষ সুখের জিনিশ নহে। তাই বেশিদিন না যাইতেই জেনারেল এরশাদ রাজনীতিতে ফিরিয়া আসিলেন। শুদ্ধ আসিলেন বলিলে যথেষ্ট বলা হইবে না। তিনি রীতিমত পুনর্বাসিতই হইলেন। পর পর দুইটি সংসদীয় নির্বাচনে তাঁহার দল গর্ব করিবার মতন অনেকগুলি আসনে জয়লাভ করিল। লোকের মনে প্রশ্ন দেখা দিল — এরশাদ সাহেবের এই শক্তির উৎস কোথায়?

আহমদ ছফা এই নিবন্ধে এই প্রশ্নের একটি যুক্তিসংগত উত্তর দিয়াছেন। ১৯৯০ সালের পর যে দুই দুইটি চাঁদ — যাঁহাদের নাম যথাক্রমে হাসিনা ও খালেদা — বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে পালা করিয়া উদিত হইয়াছেন, তাঁহাদের সামনে ধ্র“বনক্ষত্রের জ্যোতির মতন জ্বল জ্বল করিয়া জ্বলিতেছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নামবাহী এই বিশেষ রাজনীতিবিদটি। এখানে উৎকলিত প্রবন্ধদ্বয়ের প্রথমটিযোগে আহমদ ছফা লিখিয়াছিলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদ একটা নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করছেন। হাসিনা-খালেদার সাধ্য নেই এরশাদকে কোথাও ছুঁড়ে ফেলে দেয়ার। কারণ হাসিনা-খালেদা যে ধরনের রাজনীতি করছেন এরশাদের অবস্থান সে রাজনীতির মধ্যেই।’

আমাদের দুর্ভাগ্য এই নিবন্ধ দুটি লেখার এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে মহাত্মা আহমদ ছফা এই ধুলির ধরা হইতে বিদায় লইয়াছেন। কিন্তু জেনারেল এরশাদ আজও — এই ভূমিকা মুসাবিদার ক্ষণ ২০১৩ ইংরেজির ডিসেম্বর মাসেও — বাঁচিয়া আছেন। নিছক বাঁচিয়াই নহেন, দিব্যই আছেন। কেন এবং কিভাবে আছেন তাহার জবাবে নানান মুনি নানান মত প্রকাশ করিবেন একথা নিশ্চিত জানি। আমাদের হাতে আহমদ ছফার যে মতটি আছে তাহাও — কম করিয়া বলিলেও বলিতে হইবে — বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। আহমদ ছফার কথা আমরা যদি ভুল না বুঝিয়া থাকি তো বলিব তিনি বলিয়াছেন এরশাদ সাহেবের পতন হইলেও তিনি যে সামরিক স্বৈরতন্ত্রের প্রতিনিধি প্রকৃত প্রস্তাবে সেই স্বৈরতন্ত্রের পতন হয় নাই। তাহা একটা বেসামরিক লেবাস পরিয়াছে মাত্র।

এখানে উৎকলিত প্রথম প্রবন্ধে — অর্থাৎ ২০০০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নাগাদ — আহমদ ছফার সিদ্ধান্ত এইরকম: ‘আমাদের দেশে অনেক লোক ব্যক্তি হিসেবে এরশাদের নিন্দা করে থাকেন। হাসিনা-খালেদা ব্যক্তি হিসাবে ভালো কি মন্দ সেটা পুরোপুরি আমরা জানি না। কিন্তু তাঁদের রাজনীতি এরশাদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁদের রাজনৈতিক নিয়তির নিয়ন্ত্রক ভূমিকা এরশাদই পালন করেন।’ আহমদ ছফার এই সিদ্ধান্তের সহিত যাঁহারা একমত হইবেন না, তাঁহারাও নিচের বাক্য দুইটি পড়িয়া বিশ্বাস করি ক্ষণকাল তিষ্ঠাইবেন। আর নিঃশ্বাস চাপিয়া বলিবেন, সাধু! সাধু! তিনি লিখিয়াছেন, ‘এরশাদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে পারমাণবিক বর্জ্যপদার্থের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারমাণবিক বর্জ্যপদার্থের তেজস্ক্রিয়তা অনন্তকাল ধরে টিকে থাকে।’

মাস ছয়েক পর অর্থাৎ ২০০১ সালের গোড়ায় প্রকাশিত দ্বিতীয় নিবন্ধযোগে আহমদ ছফা ঘোষণা করিয়াছিলেন, ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মূলকথা হল লড়াইরত দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না। প্রতিযোগিতার মধ্যে নিয়মকানুন এবং নীতিবোধ সক্রিয় থাকে [কিন্তু] প্রতিহিংসা নিয়মনীতি কিছুই মানে না।’ সেই দিন আহমদ ছফা যে পরিস্থিতি দিব্যচোখে দেখিতে পাইয়াছিলেন আজ — এক যুগ পর — আমরা তাহা দানবের চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিতে বাধ্য হইতেছি। তিনি লিখিয়াছিলেন, ‘আরেকটা কথা চালু আছে। রাজনীতিতে শেষকথা বলে কিছু নেই। কিন্তু শেষকথার আলামত হিসেবে চরিত্রহীনতা, নীতিহীনতা এবং রাজনৈতিক ভোজবাজির যে চিত্রগুলো একটার পর একটা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে তা থেকে এটা অনুমান করা কষ্টকর নয় যে আগামীতে আমরা একটি প্রচণ্ড জাতীয় সংকটের সম্মুখীন হতে যাচ্ছি।’ আর আজও আমরা বলিতে পারিতেছি না সংকট কাটিয়া যাইতেছে।

৮ জানুয়ারি ২০১৪, সর্বজন: নবপর্যায় ৩৬

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.