আহমদ ছফার হুমায়ূননামা

[এই রচনাটি লিখিয়াছিলাম ইংরেজি ২০১২ সালের আগস্ট মাসের গোড়ায়। দুঃখের বিষয়, পাক্ষিক ‘অন্যদিন’ পত্রিকার সম্পাদক মহোদয় রচনাটি ছাপাইতে রাজি হন নাই। সত্যের মধ্যে লেখাটি তাঁহাদের উপরোধেই লেখা হইয়াছিল। সহকারী মোমেন সাহেবের মধ্যস্থতায় সম্পাদক মহাশয় জানাইয়াছিলেন, হুমায়ূন আহমেদ মাত্র পরলোকগমন করিয়াছেন, এই লেখাটি পরলোকগত লেখকের স্মৃতির সহিত যাহাকে বলে মানানসই হইবে না। সম্প্রতি আমার বাসার পুরানা আবর্জনা সাফ করিতে বসিয়া লেখাটি খুঁজিয়া পাইয়াছি। এতদিন পর পড়িয়া দেখিতেছি ইহার সকল বাক্যই বর্জনীয় হয় নাই। অন্তত আহমদ ছফা ব্যবসায়ী সমাজে ইহার একপ্রকার চাহিদা থাকিতে পারে—এই বিবেচনায় রচনাটি পুনশ্চ সম্পাদিত হইল। ইহার ভিতর দেখিতে দেখিতে ছয় বৎসর পার হইয়া গিয়াছে। যৎসামান্য মাত্র পরিমার্জনার পর লেখাটি আরেকবার হাজির করিতেছি।—ইতি ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮]

ঈদসংখ্যার অজুহাতে ‘অন্যদিন’ পত্রিকার মোমেন সাহেবকে কথা দিয়াছিলাম এই বছরও একপ্রস্ত লেখা তাহার হাতে তুলিয়া দিব। বিষয় ঠিক করিয়াছিলাম ‘মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’। অতি অল্পবয়সে দত্তজ কবির মুণ্ডুপাত করিয়া ঠাকুরবাড়ি হইতে প্রকাশিত ‘ভারতী’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মোট ছয় কিস্তিতে একপ্রস্ত ভয়াবহ নিবন্ধ প্রকাশ করিয়াছিলেন। প্রবন্ধটি একদা সহজে পাওয়া যাইত না। হালে এক বন্ধুর দয়ায় ‘ভারতী’ পত্রিকার আদি সংস্করণ হইতে ছাপ লওয়া এই অচলিত সংগ্রহটি হাতে পাইলাম। আর বিশ্বভারতী হইতে মুদ্রিত সংস্করণের সহিত তাহা মিলাইবার সুযোগও হইল। বলা যায় আমি এক প্রকার হালে পানি পাইলাম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অচলিত প্রবন্ধটির পর্যালোচনা লিখিব স্থির করিয়াও লেখাটা শেষ পর্যন্ত শেষ করিতে পারি নাই। ‘অন্যদিন’ পত্রিকার দেনাশোধ করিবার নিমিত্ত অগত্যা এই নিবন্ধ লিখিতেছি। মনে হইতেছে নিজে মরিয়া হইলেও হুমায়ূন আহমেদ আমাকে—এই ঈদসংখ্যা দায়গ্রস্ত অনাহারী লেখককে—বাঁচাইলেন, অন্তত এই যাত্রা প্রাণে বাঁচাইয়া গেলেন।

আহমদ ছফার এন্তেকাল উপলক্ষে হুমায়ূন আহমেদও একদা একপ্রস্ত স্মৃতিকথা প্রকাশ করিয়াছিলেন। আহমদ ছফার লেখা কোন উপন্যাস বা প্রবন্ধ কি অন্য রচনা লইয়া তিনি নিশ্চয় আরো কিছু লিখিবার অধিকার রাখিতেন। সে অধিকার তিনি আদায় করিয়াছেন কিনা তাহা কালে জানা যাইবে। আজিকার লেখায় আমি ঐদিকের কথা তুলিতে চাহিতেছি না। এইদিকে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস কিংবা গল্প লইয়া যাঁহারা বিশেষ প্রবন্ধ লিখিয়াছেন আজ পর্যন্ত তাঁহাদের সংখ্যাও ক্ষুদ্রই রহিয়াছে। সেখানে আহমদ ছফার নামও আমি এখন পর্যন্ত দেখি নাই। সান্ত্বনার মধ্যে, সাক্ষাত্কার নামধেয় কয়েকটি রচনায় মহাত্মা আহমদ ছফা হুমায়ূন আহমেদ প্রসঙ্গে যে সকল মন্তব্য করিয়াছিলেন তাহা হইতেও বিশেষ শিক্ষা করিবার জিনিশ আমি কয়েকটা খুঁজিয়া পাইয়াছি। স্থির করিয়াছি আজিকার লেখায় তাহার কিছু নমুনা তুলিয়া আনিব।

মহৎ মানুষেরও কখনও কখনও স্মৃতির বিভ্রম হয়। এক জায়গায় দেখিলাম মহাত্মা আহমদ ছফারও খুব সম্ভব একটা স্মৃতিবিভ্রম ঘটিয়াছিল। আহমদ ছফা এক জায়গায় লিখিয়াছেন, ‘সকলে যে মধুদার টাকা মেরে দিতেন এটা সত্যি নয়। কাউকে কাউকে আমি বিদেশ থেকে ফিরে এসেও মধুদার টাকা শোধ করতে দেখেছি। একজনের কথা আমার মনে আছে। তিনি এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবির। তিনি কলেজে আমার শিক্ষক ছিলেন। ফরেন সার্ভিসে আড়াই কি তিন বছর কাজ করার পর—আমি তাঁকে দেখেছি—দোকানে এসে মধুদার বাকি পাওনা পরিশোধ করতে।’ (ছফা ১৪০৪)

আহমদ ছফার বয়ানে উক্ত ‘এখন’—মানে ১৯৯৭ সালে—যিনি ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন—তিনি নিজেই সম্প্রতি ঢাকায় আমাকে জানাইয়াছেন—তিনি আহমদ ছফার শিক্ষক ছিলেন না—ছিলেন শিষ্যস্থানীয় বা বন্ধুতুল্য অনুজ মাত্র। বিভ্রমের একটা সম্ভাব্য কারণ এই যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র দপ্তরে একদা একই নামের অপর একজন সিনিয়র কূটনীতিকও কর্মরত ছিলেন। ঐ ভদ্রলোক শুনিলাম সম্প্রতি প্রয়াত হইয়াছেন। তিনি ১৯৬০ দশকের গোড়ায় চট্টগ্রাম জেলার অন্তপাতী নাজিরহাট কলেজে শিক্ষক ছিলেন। আহমদ ছফা ছিলেন সেই কলেজেরও ছাত্র। আহমদ ছফার কলেজ শিক্ষক হুমায়ুন কবির সাহেব একসময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কোন এক শাখার পরিচালক পদে আসীন হইয়াছিলেন বলিয়া জানা যায়। এদিকে মধুদা তো ১৯৭১ সালের আগের কালের—অতীত দিনের—স্মৃতি বৈ নহেন।

আহমদ ছফা একাধারে হুমায়ূন আহমেদকে—মানে তাঁহার কোন কোন লেখা পদার্থ—পছন্দ করিতেন, আবার কখনো কখনো তাঁহার কঠিন সমালোচনাও করিতেন। আমাদের জিজ্ঞাসা করিতে হইবে—এই পছন্দ আর অভিযোগের গোড়ায় কি লুকাইয়া আছে? এখানে আমরা আহমদ ছফার পরিণত বয়সের একটি জবানবন্দী হইতে শুরু করিব। ১৯৯৪ সালের জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম হইতে বিমানযোগে ঢাকা আসিয়া দুইটি তরুণ আহমদ ছফার একটি সাক্ষাত্কার আদায় করেন। ১৯৯৫ সালের নভেম্বর নাগাদ নিজ হাতে সংশোধন করিয়া সাক্ষাত্কার রচনাটি তিনি আরেকবার লিখিয়াছিলেন। সেই সংশোধিত পাঠ হইতে আমি এখানে কিছু সারগ্রহণ করিতেছি। চট্টগ্রামীণ ঐ সাক্ষাত্কারপ্রার্থীর নাম ছিল মীজানুর রহমান। এক জায়গায় আসিয়া তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন, “আমাদের এখানে আপনার প্রিয় লেখক কে কে আছেন?” উত্তরে আহমদ ছফা অনর্গল বেশ কয়েকজন লেখকের নাম বলিয়াছিলেন। তাঁহাদের মধ্যে প্রথমেই দেখি হুমায়ূন আহমেদের নাম—অন্তত তাঁহার লেখা একটি বহির নাম—জ্বলজ্বল করিতেছে। পুরা উত্তরটা তুলিয়া দিলে হয়ত আখেরে আমার রক্ষা হয়।

আহমদ ছফা বলিলেন: ‘এককভাবে প্রিয় লেখক কেউ নেই। বিশেষ লেখকের বিশেষ বই আমার ভাল লেগেছে। ভাল লাগা বইগুলো হল: হুমায়ূন আহমেদের “নন্দিত নরকে”, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের “চিলেকোঠার সেপাই,” হাসান আজিজুল হকের ছোটগল্পগুলো, শওকত আলীর “প্রদোষে প্রাকৃতজন,” শওকত ওসমানের “জননী,” শাহেদ আলীর কোন কোন ছোটগল্প, রাজিয়া খান আমিনের “বটতলার উপাখ্যান,” মঞ্জু সরকারের “তমস,” সেলিম আল দীনের নাটক “কেরামতমঙ্গল,” সত্যেন সেনের “সেয়ানা,” “আলবেরুনী” এ সকল বই। আমি সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর “লাল সালু” এবং তাঁর দুটি নাটককে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে থাকি। আবু ইসহাকের “সূর্য-দীঘল বাড়ী”, আলাউদ্দিন আল আজাদের কোন কোন গল্পের কথা অবশ্যই উল্লেখ করব। আমার পছন্দের তালিকায় আরো কিছু লেখকের বই আছে। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না।’ (ছফা ২০০৮: ৩৮০)

আরো দুই কি তিন জায়গায় আহমদ ছফা হুমায়ূন আহমেদের—বিশেষ তাঁহার ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসটির—তারিফ করিয়াছিলেন। সাজ্জাদ শরিফ ও ব্রাত্য রাইসুর সহিত একখণ্ড সাক্ষাত্কারের তারিখ জানুয়ারি ১৯৯৬। এই রচনায়ও তিনি প্রাণ খুলিয়া বলিয়াছিলেন, হুমায়ূন আহমেদের প্রথম লেখা ‘নন্দিত নরকে’ সেই সময়ের জন্য ‘রেয়ার’ [মানে দুর্লভ অর্থাৎ অসাধারণ] লেখা। হুমায়ূন আহমেদের নাম মুখে আনিবার আগে তিনি আর যে দুই দুইজন লেখকের বিশেষ গুণকীর্তন করিয়াছিলেন, তাঁহারা হইলেন যথাক্রমে শওকত ওসমান ও সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ। আহমদ ছফার জবানিতেই পড়িতেছি: ‘যুগলক্ষণ আছে, কিন্তু যুগলক্ষণ অতিক্রম করে টিকে থাকবে দুজন লোক খুব সম্ভবত—আগের শওকত ওসমান, তাঁর “জননী”—আর ওয়ালিউল্লাহ সাহেব। তাঁর উপন্যাসগুলোর চাইতে নাটকগুলো মিনিংফুল বেশি। এগুলো সমাজে ইয়ে পায়নি। তারপরে এই হুমায়ূন আহমেদের প্রথম লেখাটা, “নন্দিত নরকে” … সেই সময়ের জন্য রেয়ার লেখা।’ (ছফা ২০০৮: ৩৪৮)

হুমায়ূন আহমেদের অসাক্ষাৎ তারিফ উপলক্ষে আহমদ ছফা আরও বলিলেন, হুমায়ূন ‘একবিন্দুও সেক্স না লিখে শ্রেষ্ঠ বাজারসফল বই’ লিখেছেন। এই জায়গায় তিনি তাঁহার বিপরীত-কোটির লোক পরিচয়ে সৈয়দ শামসুল হকের—বিশেষ তাঁহার ‘বাজার সুন্দরী’ নামক একটি বইয়ের—কথা উঠাইয়াছিলেন। বলিয়াছিলেন: ‘বাজার সুন্দরী বলে একটা উপন্যাস আমি পড়েছি তাঁর। মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখা। কি এগুলো! কি করে এগুলো মানুষ লেখে! সেক্স দিলে লোকে বই কিনবে, সেটার জন্যই করছে, বাজারের জন্য করছে।’ (ছফা ২০০৮: ৩৪৯)

এইদিকে আবার হুমায়ূন আহমেদের নামে একটা অভিযোগের ফিরিস্তিও দাখেল করিয়াছেন আহমদ ছফা। এই অভিযোগের তালিকাটা তেমন হ্রস্বও নহে। সাক্ষাত্প্রার্থীর নাতিদীর্ঘ এক সওয়ালের জবাবে তিনি আপনকার পরিচিত উপপাদ্য পুনঃপ্রকাশ করিয়াছিলেন। প্রার্থী জিজ্ঞাসা করিতেছিলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদের এই জনপ্রিয়তার সাক্ষাৎ কারণ কি?’ উত্তরের জন্য আহমদ ছফা যেন তৈয়ার হইয়াই ছিলেন। তিনি বলিলেন: ‘হুমায়ূনের সঙ্গে আমার সম্পর্কের ইতিহাস যাঁরা জানেন, তাঁদের অনেকেই তাঁর এই উন্নতি বা অবনতির জন্য অংশত আমাকেই দায়ী করতে চান। তাঁর প্রথম বই যখন বেরিয়েছিল, আমিই সবচাইতে বেশি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছি। তখন আমার মনে হয়েছিল হয়ত হুমায়ূনের মধ্যে কালে কালে আমরা চেখভের মত একজন প্রতিভার সন্ধান পাব। তিনি তো সে পথে গেলেন না।’ (ছফা ২০০৮: ৩৫৩)

আহমদ ছফার মতে, হুমায়ূন আহমেদ গেলেন উন্নতির পথে নয়, অবনতির পথে। মানে গেলেন যে পথ চিন্তাহীনের—যে পথ অরাজকের—সেই পথে। আহমদ ছফার ভাষায়, ‘উপর্যুপরি সামরিক শাসন, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার পরাজয়, সব মিলিয়ে এখানে যে চিন্তাহীন অরাজক পরিস্থিতি— হুমায়ূন সেই সময়ের প্রোডাক্ট।’ তাহার পরও প্রশ্ন থাকে। থাকে জনপ্রিয়তার প্রশ্ন। আহমদ ছফা কবুল করিলেন হুমায়ূন আহমেদ কামেল লেখক। কামেল না হইলে পাঠকদের মধ্যে তিনি জায়গা পাইলেন কেমন করিয়া? জায়গা শব্দের স্থলে ‘স্থান’ শব্দটাও বাংলাদেশের ভাষায় ব্যবহার্য। তাহার সত্য ব্যবহার করিয়া আহমদ ছফা জিজ্ঞাসিলেন: ‘আমার প্রশ্ন—এটা কি স্থান? হুমায়ূনের পরবর্তী রচনা চানাচুরের মত। খেতে মজা লাগে কিন্তু পেট ভরে না এবং সারপদার্থও বিশেষ নেই।’

একটু আগেই তিনি ব্যাখ্যা করিতেছিলেন ‘সফলতা’ কাহাকে বলে। বলিতেছিলেন, ‘সফলতা একটা আপেক্ষিক ব্যাপার। জাতির মর্মমূল স্পর্শ করে যদি ব্যর্থও হই, তার একটা আলাদা মূল্য আছে। মামুলি সার্থকতার চাইতে মহৎ ব্যর্থতার মূল্য অনেক বেশি। হুমায়ূন আহমেদ [প্রভৃতি] এঁরা ওই অর্থে সফল লেখক যে লিখে তাঁরা টাকা কামিয়েছেন। টাকা কামানোটাই কি সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি?’ (ছফা ২০০৮: ৩৫৩)

হুমায়ূন আহমেদ সম্বন্ধে এই পর্যন্ত আহমদ ছফা যাহা যাহা বলিয়াছেন তাহার সার তিন কথায় গ্রহণ করা যায়। একে আছে তাঁহার জনপ্রিয়তা মানে তিনি ভাল গল্প লেখেন—দুই নম্বরে তিনি সেক্স বিক্রয় করেন নাই, মানে সেক্স ছাড়াও বিক্রয় করার মতন অন্য পদার্থ তাঁহার আছে—আর তিন নম্বরে বলা যায় তিনি মার্শাল ল ওরফে সামরিক শাসনের প্রোডাক্ট। ‘প্রোডাক্ট’ মানে কি? ফসল বা সম্পত্তি বা পণ্য। যদি তাই হয় তো একটা ব্যাখ্যা আমিও পেশ করিতে পারি। তিনি কি সামরিক শাসনের শরিক বা সামরিক সমাজের সমর্থক বা বেসামরিক পৃষ্ঠপোষক ছিলেন? তবে কি একথা সত্য যে, যে সকল সমাজে একনায়কতান্ত্রিক শাসন স্বাভাবিক হুমায়ূন আহমেদ সেই ধরনের সমাজ হইতে আসিয়াছেন কিংবা সেই ধরনের সমাজেই ফিরিয়া যাইবেন?

আহমদ ছফাকে যাহারাই সামান্য চিনিতেন বা জানিতেন তাহারাই জানেন, নিরুত্তর থাকিবার লোক ছিলেন না তিনি। সাজ্জাদ শরিফও বেশ শরিফ লোক। তাঁহার সেদিনের সওয়ালটাও যথেষ্ট আশরাফ সওয়াল ছিল। রাখিয়া-ঢাকিয়া পরাণে কাচুলি পরিয়া তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন হুমায়ূনের সহিত বিবাদটা আহমদ ছফার একান্ত ব্যক্তিগত মামলা কিনা। আহমদ ছফা সঙ্গে সঙ্গে জানাইয়া দিলেন এই মামলার একটি এজমালি কিংবা পাবলিক তরফও আছে। বলিলেন, ‘না, না, হুমায়ূনের বড় প্রবলেমটা হচ্ছে মার্শাল ল।’ মানে ইঁহারা মার্শাল লয়ের মধ্যে বাড়িয়া উঠিয়াছেন। এই জায়গায় ইমদাদুল হক মিলনের নামটাও আসিয়াছিল।

সাজ্জাদ শরিফের সঙ্গে ঐদিন তাঁহার সহকর্মী, তাঁহার পেশাত ভাই, ব্রাত্য রাইসুও হাজির-নাজির ছিলেন। রাইসু সাহেব পোঁছ করিলেন, ‘মার্শাল লয়ের মধ্যে’ কথাটা জানি কি অর্থ বহন করিতেছে? আপনকার স্বভাবধর্ম মতেই এ কথাটার জবাব দিয়াছিলেন আহমদ ছফা। বলিয়াছিলেন, ‘মার্শাল ল’র ভেতরেই একদম’ বাড়িয়া উঠিয়াছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। ছফার জবানবন্দী ছিল এই রকম, ‘লেখক হিশেবে সেভেন্টি—ফোরে তাঁর উপন্যাস বেরিয়েছে, সেভেন্টি—ফাইভ থেকে এদের গ্রোথ। মার্শাল ল’র মধ্যে আমাদের গ্রেটেস্ট সোশ্যাল ডিসকোর্স যেগুলো… একজন লেখককে সোশ্যাল ডিসকোর্সে অংশগ্রহণ করতে হয়।’ আহমদ ছফার মুখ হইতে কথাটা কাড়িয়া লইলেন ব্রাত্য রাইসু। ফোড়ন কাটিলেন: ‘ওনারা করেন নাই?’ ছফা বলিলেন, ‘হুমায়ূন করে নাই একদম।’ (ছফা ২০০৮: ৩৪৩)

এই জায়গায় আসিবার পর হঠাৎ ইমদাদুল হক মিলনের কথাটা উঠিল। আহমদ ছফা জানাইলেন, মিলন ভারতবর্ষের দক্ষিণপন্থী হিন্দু সাম্প্রদায়িক পত্রিকা ‘আনন্দবাজার’ যে ডিসকোর্স বাংলাদেশে রপ্তানি করিতেছে তাহার সহিত গলা মিলাইয়াছেন। এক্ষণে সাজ্জাদ শরিফ পর্যন্ত অগত্যা আপনকার শরিফ মুখোশটি সরাইয়া লইতে বাধ্য হইলেন। তাঁহার সহি বড় খোদ চরিত্রটি প্রকটিত করিলেন। অন্তরের অন্তস্থলে যে আদি ও আসল সত্য এতদিন লুকাইয়া ছিল সেই নিম্ন-মধ্যবিত্ত থলির সত্য বিড়ালের মত বাহির হইল। তিনি দাবি করিলেন, ‘কিন্তু নূরজাহানের ঘটনা তো সত্যি, ছফা ভাই।’ আহমদ ছফা মনে হইল এই দাবিটার সত্যকার জবাব আর দিতে পারিলেন না। সুতরাং নিম্ন-মধ্যবিত্তের জয় হইল। না, জয় হইল কই? তিনি মাত্র প্রসঙ্গান্তরে গমন করিলেন। বলিলেন, ‘তসলিমা কিন্তু আমাদের সোশ্যাল ডিসকোর্স থেকে জন্মেছে, ইন্ডিয়ানরা ব্যবহার করেছে তাঁকে। কিন্তু মিলন আমাদের ডিসকোর্স থেকে জন্মায়নি। আর হুমায়ূন ডিসকোর্সটা এভয়েড করেছে।’ এই প্রতিপাদ্যের প্রমাণ বাবদ আহমদ ছফা তসলিমা নাসরিনের দোহাই পাড়িয়াছিলেন। তিনি বলিয়াছিলেন, ‘তসলিমা একটা ইন্টারভিউতে বলেছিল, আমি হুমায়ূন আহমেদের মত লিখতে পারতাম, লিখি নাই।’ (ছফা ২০০৮: ৩৪৪)

আহমদ ছফা ঠিকই ধরিতে পারিয়াছিলেন, হুমায়ূন আহমেদ শেষের দিকে সোশ্যাল ডিসকোর্সে ঢুকিবার পথ—তক্কে তক্কে মোকামে যাইবার খানকা—খুঁজিতেছিলেন। দুর্ভাগ্যের মধ্যে সেই মোকাম পর্যন্ত পৌঁছিতে তিনি পারেন নাই। কেন পারেন নাই তাহার একটা নির্ণয়ও তিনি বাতলাইয়াছিলেন। চেষ্টা করিয়াও হুমায়ূন পারেন নাই। কারণটা হয়ত তাঁহার মনের মধ্যেই লুকাইয়া ছিল। আহমদ ছফা পদার্থটার নাম রাখিয়াছিলেন বড়ই কোমল: ‘মানসিক শুদ্ধতা’। বাহিরের রাস্তার লোক যাহা চায় তাহা লিখিব বলিয়া যাঁহারা পণ করেন তাঁহাদের মানসিক শুদ্ধতায় টান আছে। আমার প্রাণ যাহা চায় তাহা লিখিবার কোশেস করিব—এই পণ করিলে অশুদ্ধিদোষ খানিক কাটিয়া যায়। আহমদ ছফার গুরু অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক একবার বর্তমান লেখককে কহিয়াছিলেন, ‘চায়ের পেয়ালায় দুই ফোঁটা লেবুর রস টিপিয়া দিবেন, দোষটোষ কিছু থাকিলে এক্কেরে কাইট্টা যাইব।’ আহমদ ছফার ভাষা প্রাঞ্জল। তাঁহার ভাষা বুঝিবার আশায় জলাঞ্জলি দিতে হইবে না। তিনি পরিষ্কার লিখিয়াছেন, ‘আমাদের পরাজয়গুলো আমাদের অক্ষমতাগুলো কেউ যদি বলতে পারতেন খুব সরল ভাষায়, সেটা হত সবচাইতে গ্রেটনেসের ব্যাপার। এটা কেউ বলছে না।’ (ছফা ২০০৮: ৩৪৬)

আর কিছুদিন যদি বাঁচিয়া থাকিতেন তো আহমদ ছফা দেখিতেন হুমায়ূন আহমেদও সোশ্যাল ডিসকোর্সে প্রবেশের নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করিতেছিলেন। গোঁফ দেখিয়া যদি বিড়াল চিনা যায় তো বলিব সেই গোঁফওয়ালা বিড়ালটি সামরিক যুগে মোটেও ইঁদুর মারিবার মতন ছিল না। ২০০৭ হইতে ২০০৯ পর্যন্ত যে অলৌকিক সরকার তত্ত্বাবধানের নামে বাংলাদেশের আইনসঙ্গত ক্ষমতায় আসীন ছিলেন সেই সরকারকেও হুমায়ূন আহমেদ ‘স্বাগতম’ বলিয়াছিলেন। আহমদ ছফার আশার গুড়ে বালি পড়িতে দেরি যে হয় নাই তাহা আমরাও ঠাহর করিতেছিলাম। শেষ পর্যন্ত তিনি পত্রিকায় যে উপন্যাসটি ছাপাইতেছিলেন সেখানেও লোকে একই সমস্যা খুঁজিয়া পাইয়াছে। কথাটা আদালত পর্যন্ত উঠিয়াছিল—এ কথা সকলেই জানেন। বিশেষ কি লিখিব?

এই নিবন্ধ সংহার করিবার আগে আমাকে অবশ্য দুইটা আনকোরা কথাও যোগ করিতে হইতেছে। একনম্বরে মনে পড়িল, হুমায়ূন আহমেদের তুলনা দিতে গিয়া মহাত্মা আহমদ ছফা সবচেয়ে বড় যে লেখকের নাম খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন তাঁহার নাম আন্তন চেখভ (ওরফে শেখভ)। এইটা কিন্তু খুব বড় কথা নয়। প্রসঙ্গক্রমে আমার আরও একটি কথা মনে পড়িতেছে। ইতালির বিখ্যাত দার্শনিক ও রাজনৈতিক নেতা আন্তনিয়ো গ্রামসি তখন বেনিতো মুসোলিনির কারাগারে আটক। তাঁহার সন্তানেরা রুশদেশে—মামাবাড়িতে—বড় হইতেছে। ১৯৩৪ সালের দিকে তাঁহার দশবছর বয়সী পুত্র দেলিয়ো মস্কো হইতে কারারুদ্ধ বাবাকে লেখা একটি পত্রে চেখভের বিশেষ ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছিল। দেলিয়ো লিখিয়াছিল, তাহার স্কুলের মাস্টার মহাশয় বলিয়াছিলেন চেখভ পৃথিবীর সেরা লেখক বা এই জাতীয় কিছু একটা। জবাবে পুত্রকে কারারুদ্ধ বাবা লিখিয়াছিলেন, চেখভ বড় ভাল লেখক সন্দেহ নাই, কিন্তু পৃথিবীর সেরা লেখক তিনি নহেন। সে রকম একটি লেখক খোদ রুশিয়াতেও আছেন অবশ্য। তাঁহার নাম লিও তলস্তয়। (গ্রামসি ২০০৮: ৩৬০-৬১)

এই তুলনাটি সেদিন আহমদ ছফার সাক্ষাত্কারধাত্রীদের  খুব পছন্দ হইয়াছিল এমন মনে করিবার কোন কারণ নাই। একটুখানি পরে আহমদ ছফাকে সাজ্জাদ শরিফ মহাশয় জিজ্ঞাসিয়াছিলেন, ‘আপনার নিজের সাহিত্যিক ব্যর্থতাগুলো কি?’ উত্তরদাতা শেষ পর্যন্ত যাহা বলিয়াছিলেন তাহা প্রাতঃস্মরণীয়: ‘আমি যে সমস্ত লেখককে পড়েছি, পুজো করেছি তাঁদের ধারেকাছেও যেতে পারি নাই।’ এই সার্থকনামা লেখকদের মধ্যে তিনি এয়োহান গ্যেটে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর ফিয়োদর দস্তয়েভস্কির সহিত লিও তলস্তয়ের নামও করিয়াছিলেন।

আমার কেন জানি মনে হয়, হুমায়ূন আহমদের সমস্যা কি তাহা আহমদ ছফা ধরিতে পারিয়াছিলেন ঠিকই কিন্তু তাঁহার প্রকাশটা অপূর্ণ থাকিয়া গিয়াছে। হুমায়ূন আহমেদ যাঁহাদের জন্য লিখিতেন তাঁহাদের মাপেই তিনি গড়িয়া উঠিয়াছিলেন। তিনি যাঁহাদের জন্য লিখিতেন তাঁহারা কাঁহারা? যদি বলি সাজ্জাদ শরিফ কিংবা ব্রাত্য রাইসুর মত পাঠকদের জন্য তবে পরিচয়টা পূর্ণ হয় না। ইঁহারাও একটি দলের সভ্য। কি তাঁহাদের পরিচয়? তাঁহারা ‘বাঙ্গালি মুসলমান’ বা বাংলাদেশের ‘বাঙ্গালি’ বলিলেও কথাটা ফুরাইতেছে না। তাঁহারা আরও। তাঁহারা অধিক। তাঁহারা নিম্ন-মধ্যবিত্ত। ফরাশি আওয়াজে ‘লো পুতি বুর্জোয়া’। ইংরেজিতে বলে ‘মিডল ক্লাস’। আহমদ ছফা সেই শ্রেণি-বিশ্লেষণে প্রবেশই করেন নাই। কিন্তু আকলমন্দের জন্য যথেষ্ট ইশারা তিনি রাখিয়া গিয়াছেন। সান্ত্বনা এইটুকুই। (ছফা ২০০৮: ৩৪৯-৫০)

হুমায়ূন আহমেদের এন্তেকালের পর আজ অনেকে বলিতেছেন, তিনি শরত্চন্দ্রের মত জনপ্রিয় হইয়াছিলেন কিংবা জনপ্রিয়তায় তাঁহাকেও ছাড়াইয়া গিয়াছিলেন। কথাটা মিছা নয় তবে আরও একটা কথা আছে। শরত্চন্দ্র কি চরিত্রের বস্তু ছিলেন? আমার হাতে বিশেষ সময় নাই। হুমায়ূন আহমেদ সম্বন্ধে আজ আমি নতুন কোন কথা বলিব না। শুদ্ধ শরত্চন্দ্র সম্বন্ধে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় একদা যে উক্তি করিয়াছিলেন তাহার পুনরাবৃত্তি করিব মাত্র। শরত্চন্দ্র স্থলে কাটিয়া হুমায়ূন শব্দটা বসাইলে হয়ত কাজ হইবে। চট্টোপাধ্যায়ের জায়গায় আহমেদ বসাইলেও মন্দ হইবে না। ১৯৩০ দশকের শেষাশেষি ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কোথায়ও বা লিখিয়াছিলেন: ‘আমাদের সমাজ এখনও প্রধানত নিম্নবিত্তশালীর সমাজ—এই গঠন যদি আরো কিছুকাল থাকে কিংবা অমর হয় তবে শরত্চন্দ্র অমর হবেন। আর যদি বদলায় তবে দ্বীপসৃষ্টিতে প্রবালের মতনই তাঁর কীর্তি আত্মবলির সমতুল্য হলেও হবে কেবল ব্যবহারিক।’ (মুখোপাধ্যায় ১৩৯৬: ৫৮)

দোহাই

১. আহমদ ছফা, ‘মধুদার স্মৃতি,’ জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী গয়রহ (সম্পাদিত), মধু দা: শহীদ মধুসূদন দে স্মারকগ্রন্থ (ঢাকা: মধু দা স্মৃতি সংসদ, ১৪০৪) এবং আহমদ ছফা, ‘মধুদার স্মৃতি,’ বাংলালিপি, ২য় বর্ষ ১ম সংখ্যা (জানুয়ারি-মার্চ ২০১৪/ পৌষ-ফাল্গুন ১৪২০), পৃ. ৩৪-৩৭।

২. আহমদ ছফা, আহমদ ছফা রচনাবলি, ৩য় খণ্ড, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮)।

৩. ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, ‘আমার দৃষ্টিতে শরত্চন্দ্র,’ শরত্-স্মৃতি, বিশ্বনাথ দে (সম্পাদিত) (কলিকাতা: সাহিত্যম্, পুনর্মুদ্রণ ১৩৯৬)।

৪. Antonio Gramsci, Letters from Prison, vol. II, trans. F. Rosengarten, (New York: Columbia University Press, 2008).

২ আগস্ট ২০১২

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বণিকবার্তা

Leave a Reply