আমি ব্যাখ্যাকার: সলিমুল্লাহ খান

সমাজতাত্ত্বিক, লেখক ও শিক্ষাবিদ সলিমুল্লাহ খান ৬০ বছর পূরণ করছেন এ বছর। তিনি ১৯৫৮ সালের ১৮ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন কক্সবাজারে। ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সলিমুল্লাহ খানের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিধান রিবেরু। গত ২৮ জুলাই সলিমুল্লাহ খানের বাসায় এ সাক্ষাৎকার নেয়া হয়

বিধান রিবেরু : কবিতা লেখা বা অনুবাদ করলেও আপনি যেহেতু প্রচুর প্রবন্ধ লিখেছেন, তাই প্রশ্ন করছি, প্রবন্ধ লেখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা কী বলে আপনার মনে হয়। আর প্রবন্ধ লেখার জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নেন?
সলিমুল্লাহ খান : 
লেখক হবই সেভাবে তো শুরু করিনি, ঘটনাচক্রে পেছন ফিরে দেখি, আমি আর সে রকম কিছুই লিখিনি, শুধু প্রবন্ধ লিখেছি। তাতে বোঝা যাচ্ছে কি, আমি অন্য কিছু আর লিখতে পারি না। কবি সাখাওয়াত টিপু একটা ভালো প্রশ্ন তুলেছিলেন, যারা ব্যর্থ কবি তারাই ভালো গদ্যকার হয়, কিন্তু ব্যর্থ গদ্যকাররা কী হয়?

রিবেরু : অনেকেই বলেন, আপনার মুখ থেকেও বহুবার শুনেছি, অনেকে অনুযোগ করেন আপনার লেখা উদ্ধৃতিসর্বস্ব হয়। তবে সেখানে উদ্ধৃতিগুলো জাক্সটাপোজ হয়, এতে নতুন দৃশ্যপট তৈরি হয়। তাই কি?
সলিমুল্লাহ খান : 
এটা পুরনো কথা। সিনেমা শিল্পের কথা। আপনি ভালো জানেন, যেটাকে একাধারে মন্তাজ বলে। লেখক কী? লেখক একাধারে সম্পাদক, চলচ্চিত্রের মন্তাজ শব্দের অর্থ হচ্ছে সম্পাদনা। ফরাসিতে মন্তাজ মানে এডিটিং। চলচ্চিত্রকারের যে কাজ, একটি ছবির ওপর আরেকটি ছবি বসিয়ে নতুন অর্থ তৈরি করা, প্রবন্ধ লেখার মধ্যেও সেটা আছে। চলচ্চিত্র প্রবন্ধকে প্রভাবিত করবেই। এ প্রভাবে প্রধান নাট্যকার, আমি দেখলাম, ওয়াল্টার বেঞ্জামিন। ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের লেখার ভেতর আপনি কোথাও ‘আমি’ শব্দ খুঁজে পাবেন না, ‘আই’ নেই। ‘আমি’ হচ্ছে রোমান্টিকতার চিহ্ন, উনি বলেন। তার কোনো প্রবন্ধে ‘আমি’ পাবেন কিনা সন্দেহ, দু-একটা থাকলেও খুব গোপনে আছে। তার লেখা হলো মন্তাজের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আপনি যদি নিকটতম উদাহরণ খুঁজতে চান, আমি ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের কথাই বলব।
আরেকজনের কথা বলব জাক লাকাঁ, যার লেখার ধরন আমাকে প্রভাবিত করেছে। এর কারণ হচ্ছে, আপনার কথা যদি আপনার ঐতিহ্যের সহায়তায় বলতে পারেন, তাহলে সমস্যা কি? লাকাঁ বলছেন, আমি তো ফ্রয়েডের ব্যাখ্যাকার মাত্র। লোকে যখন আমাকে অনুবাদক বলে তখন আমার হাসি পায়। পৃথিবীতে অনুবাদ বলে কোনো কাজ নেই, সবই ব্যাখ্যা। আমি ব্যাখ্যাকার। আমি গদ্য লেখার সময় লক্ষ করি, আমার উদ্দিষ্ট কী? আমি কোন কথাটা পাঠকের কাছে নিতে চাই। আমাকে যদি বলা হয়, আপনি ২ মিনিটের মধ্যে লেখেন, তাহলে প্রথম কথাটা আমি আগে বলব। আমি সাধারণত লিনিয়ার ওয়েতে লিখি না। যেগুলো বিশ^বিদ্যালয়ে লেখা হয়, সেখানে একটি প্রস্তাবনা থাকে, তার একটি বিকাশ থাকে, প্রমাণ থাকে, তারপর সিদ্ধান্ত থাকে। আমি প্রথমেই আমার সিদ্ধান্তটা জানাই, এ কথাটি আমি বলতে চাই। তখন তার চারপাশে আমি ঘুরতে থাকি। সেভাবে লিখলে লেখাটা স্পাইরাল হয়, লিনিয়ার হয় না। এখন লেখার বহু ধরন আছে, আমি একটি ধরনের কথা বললাম।

রিবেরু : আপনার লেখালেখিসংক্রান্ত আরেকটি অভিযোগ শোনা যায়, হঠাৎ করেই সাধু ভাষায় লেখা শুরু করেছেন, আপনি উল্টোপথে হাঁটছেন, কারণ এখন তো কেউ আর ওই ভাষায় লেখেন না। আগে আপনি চলতি ভাষায় লিখেছেন। মুখের ভাষাও এসেছে লেখায়। সাধু ভাষায় লেখা নিয়ে আপনি কী বলবেন?
সলিমুল্লাহ খান :
 আমি পেছনে হাঁটছি বা সামনে হাঁটছি, এগুলো মেটাফোর। লেনিনের একটি উক্তি আছে না, এক কদম পেছনে যান, দুই কদম আগানোর জন্য। লক্ষ্যটা আগানোই, মেটাফরিক্যালি। আমাদের বাংলা ভাষার যে ক্ষমতা আছে, সেটা আমি দেখেছি। বর্তমানে যারা চলিত গদ্য লিখছেন, তাদের গদ্য কোনো গভীর চিন্তাভাবনা প্রকাশের উপযোগী আর নেই। এটা ছিল আমার প্রথম সমস্যা। আমি ২০০৩-০৪-০৫-এর দিকে চিন্তা করেছিলাম এ সমস্যা নিয়ে। আজ থেকে ১৫-১৬ বছর আগে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি সাধুতে লিখব। সাধুতে লেখার সমস্যা আছে, কিন্তু চলিত ভাষার সমস্যার মুখোমুখি হয়ে আমি সেখানে ফিরেছি। নদী যেমন মাঝেমধ্যে বাঁক পরিবর্তন করে, আপনারা এটাকে পিছ পরিবর্তন বলতে পারেন, আমি বাক পরিবর্তনই বলি। এ বাঁক পরিবর্তনকেই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন আধুনিকতার আরেক নাম। আমি মনে করি, আমাদের আধুনিক গদ্য হচ্ছে সাধু ভাষা। চলিত ভাষা হচ্ছে প্রাগৈতিহাসিক। মানুষ বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলত এ দেশে, এখনও পূর্ব বাংলার আঞ্চলিক ভাষায় সাধু টান আছে। জসীমউদ্দীনের গদ্য দেখেন, এটাকে পিছুটান বলা যাবে না। জসীমউদ্্দীন রবীন্দ্রনাথের পরে লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথও অর্ধেক সাধু ভাষাতেই লিখেছেন। ১৯১৪ সালে তিনি সাধু ভাষা ছেড়েছেন, তবে এর আগেও চলতি লিখেছেন, ‘য়ুরোপ-প্রবাসীর পত্র’ তো চলতি ভাষায় লেখা।
থিওরিটা হলো এই- সাধু ভাষার পর হলো চলিত ভাষা, এই যে পর্যায়ক্রম, যেটা আপনার প্রশ্নের মধ্যে নিহিত আছে, আগে আর পিছে, এটা কিন্তু সঠিক নয়, আমার মতে। বরং বাংলা ভাষায় বিভিন্ন রেজিস্টার আছে। গদ্যও আছে, পদ্যও আছে, কেউ কি বলবেন, পদ্য প্রাচীন, গদ্য আধুনিক? তো পদ্য লেখা মানে তো পেছনে ফিরে যাওয়া। কাজেই পদ্য লেখেন কেন? আমি এজন্য বলব, গদ্য-পদ্য যেমন পাশাপাশি থাকে, তেমনি সাধু ও চলিতও পাশাপাশি থাকে। এটাকে ইংরেজিতে রেজিস্টার বলে। বাংলায় আমরা অনুবাদ করে বলতে পারি, নানা রকমের খাতা খোলা আছে। আমরা সেরেস্তা কথাটা ফারসিতে ব্যবহার করি, ইংরেজিতে রেজিস্টার। অর্থাৎ আপনি এক খাতা থেকে আরেক খাতায় যাচ্ছেন। একসময় আমরা একটা বই শেষ করে আরেকটা বই পড়ি। আবার অনেক সময় পাশাপাশি দুইটা বই পড়ি। কিছুক্ষণ এ বই পড়ে ক্লান্ত হলাম, তারপর আরেকটি বই পড়লাম। তো সাধু আর চলিত দুটি ভাষা রীতি বাংলাদেশে অনেকদিন ধরেই স্বীকৃত। আমি মনে করি, এরা ঐতিহাসিক ক্রম নির্দেশ করে না। এটা বরং কাঠামোগত অবস্থান নির্ধারণ করে।
আমাদের ভাষার একটা সাধু রীতি আছে, একটা চলিত রীতি আছে। আপনি যেকোনো একটাতে সুইচ করতে পারেন। এখন বেশির ভাগ লোক চলিত রীতি ব্যবহার করে, এর কারণ কী? এখন বেশির ভাগ লোক তো সংবাদপত্র পড়ে। আমিও বক্তৃতা চলিত ভাষাতেই দিই, কিন্তু লেখার সময় সাধুতে লিখি। এটা আমাকে এক ধরনের স্বাধীনতা দেয়। অর্থাৎ আসল কথা হচ্ছে, আমার প্রকাশভঙ্গি ও বক্তব্য কোনটাতে বেশি সহজে করতে পারি, আমার মতে কোনটাতে বেশি ফল লাভ করতে পারি। এখন যেসব পাঠক আমাকে বলে, আপনি সাধু ভাষায় লেখেন কেন, তাতে আপনার বিক্রি কমে যায়, এটা এম্পেরিক্যালি সত্যি নয়। ধরেন, নীরদচন্দ্র চৌধুরী সাধু ভাষায় লেখেন, তাতে কি আপনি মনে করেন তার পাঠক একজনও কমেছে? তিনি চলিততে লিখলে যত পাঠক পেতেন, তার চেয়ে কি কমেছে? উনি ইংরেজিতেও লিখেছেন। এখন যদি বলেন, আপনি ইংরেজিতে লেখেন কেন? জবাব কি? সে বলবে, আমি ইংল্যান্ডের লোকজনকে পড়ানোর জন্য লিখি। আসলে কি সেজন্যই লেখেন? না, আমাদের সাহেবদের পড়ানোর জন্য তিনি লেখেন। সাদা বাঙালি সাহেবরা পড়বে। কালো সাহেব বাঙালিরা পড়বে।
তাহলে আমি আপনাকে তিনটা উদাহরণ দিলাম, আমি ইংরেজিতে লিখি, আমি সাধুতে লিখি, আমি চলিততেও লিখেছি, আমি পদ্যও লিখি। আমি এই চার ধরনের অপকর্ম করেছি। যেমন আমি প্লেটো অনুবাদ করেছি চলিত ভাষায়, সেটা ২০০৫-এ। ‘ফ্রয়েড পড়ার ভূমিকা’ আমি প্রথম সাধু ভাষায় লিখেছি। ভূমিকাটা, কিন্তু মূল লেখাটি চলিত ভাষায় লেখা। এর পর থেকে ধীরে ধীরে সাধু ভাষায় লিখতে শুরু করি। আমি হঠাৎ করে চলিত ভাষা ছেড়ে সাধু ভাষায় আসিনি। এখনও আমি মনে করি, সাধু ভাষার শক্তি চলিত ভাষার চেয়ে বেশি।

রিবেরু : অধ্যাপক রাজ্জাকের বক্তৃতার ওপর আপনি যে লেখাটা লিখেছিলেন সেটা চলিত ছিল, আবার সংস্কৃত শব্দের আধিক্যও ছিল। ১৯৮৩ সালে বেরিয়েছিল।
সলিমুল্লাহ খান : 
ওটা লিখেছি ১৯৮১ সালে, বের হয়েছে ১৯৮৩ সালে। তার আগেও প্রাক্সিস জার্নালে যে লেখা শুরু করেছি, সেখানে আমাদের গদ্যের মধ্যে দেখবেন কিছুটা সংস্কৃতবহতা আছে। তবে আমার লক্ষ্য ছিল সবসময় প্রাঞ্জল্য। প্রাঞ্জল্যের অভাব যেখানে হয়েছে, সেখানে আমার অক্ষমতা মাত্র। আমি তো গদ্য লেখা শুরু করেছি ১৯৭৬ সালেই। ১৯৭৬-এর আগে আমি কখনও গদ্য প্রকাশ করিনি। পদ্য প্রকাশ করেছি ১৯৭২ সাল থেকে। আমি প্রথম গদ্য লিখেছি পরীক্ষার খাতায় ছাড়া, ১৯৭৬ সালে, প্রকাশ হয়েছিল ১৯৭৭ সালে। মুহম্মদ নুরুল হুদা সম্পাদিত একটি পত্রিকা ছিল, আমি সেটা হারিয়ে ফেলেছি, পত্রিকার নাম ‘বিশ্বাস’, সেখানে আমার প্রথম একটি লেখা ছাপা হয়। তারপর আরেকটি পত্রিকা বেরিয়েছিল ‘স্বরূপের সন্ধানে’, সেখানেও আমার একটা গদ্য ছাপা হয়, ১৯৭৮-এ। ১৯৭৭-৭৮ সালে আমি প্রচুর গদ্য লিখেছি। হুদার ওখানে যা লিখেছিলাম, তা ছিল খুবই সংস্কৃতবহুল। কিন্তু লিখতে গিয়ে আমি যখন পরিচিত হলাম, বিশেষ করে কমরেড মোজাফফর আহমদের লেখা, প্রবন্ধ সংকলনের সাথে যখন পরিচিত হলাম, তখন দেখলাম, আরও প্রাঞ্জল ভালো বাংলা তো লেখা যায়! তারপর ধীরে ধীরে আমার উপলব্ধি হলো।

রিবেরু : আপনি বলেছিলেন জসীমউদ্‌দীনের লেখা পড়েও আপনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।
সলিমুল্লাহ খান : 
এটা ২০০৩-এর পরে। আগে যখন লিখেছি, তখন কমরেড মোজাফফর আহমদকে আমার ভালো লেগেছে। যেমন একটি প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন কেন তিনি কমিউনিস্ট হয়েছিলেন, ওটার গদ্য বেশ প্রাঞ্জল, ওটা কিন্তু বেশি পরে দেখিনি। এই ১৯৮০/৮২তে দেখেছি। তার মানে একটা পরিবর্তন হয়েছে। আমার দ্রুত পরিবর্তন হয়েছে ১৯৭৬ থেকে ১৯৮১-এর মধ্যে, আমি লেখক হয়েছি।

রিবেরু : একটা সময় পর, ১৯৯০-এর গোড়ার দিকে, আপনার গদ্যের মধ্যে আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার বেশি দেখা গেছে।
সলিমুল্লাহ খান : 
আমি প্রথম থেকেই আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছি। বাংলা ভাষার প্রথম গদ্য ‘হুতুম পেঁচার নকশা’ বা ‘আলালের ঘরের দুলালে’ যে আরবি-ফারসি শব্দ আছে, আমি এর চেয়ে বেশি ব্যবহার করিনি। আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার আমি শিখেছি, বিশেষ করে নজরুল ইসলামের লেখা পড়ে। আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমি ডেফিনিটলি প্রভাবিত হয়েছি হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর দ্বারা। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যত আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছেন, সেটা পড়ে দেখলাম, আরে এটা তো বাংলা ভাষার মহাসম্পদ। প্রমথ চৌধুরীও ব্যবহার করেছেন, সেগুলো অল্প অল্প, পায়েসের মধ্যে কিশমিশের মতো। আরবি-ফারসি শব্দ একই কারণে ব্যবহার করি, যে কারণে নজরুল ইসলাম ব্যবহার করেছেন। এটা ভাষার প্রকাশভঙ্গিকে প্রসারিত করা। বাংলা ভাষার মজা হচ্ছে, এখানে সংস্কৃতও চলে, আরবি-ফারসিও চলে।

রিবেরু : আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহারের কারণে ২০১৩ সালের আগ পর্যন্ত আপনার সম্পর্কে মানুষের এক ধরনের পারসেপশন ছিল। মৌলবাদের সঙ্গেও অনেকে আপনাকে গুলিয়ে ফেলতেন।
সলিমুল্লাহ খান : 
আপনি তো বলেছেনই ‘পারসেপশন’, এ শব্দটির অর্থ হচ্ছে, যেমন আমার কোনো একটি আইডিয়া আছে, হেগেল বলছেন, আইডিয়াই পারসেপশনের প্রকাশ। কিন্তু আইডিয়ার সাথে কনসেপ্টের পার্থক্য কী? অর্থাৎ আপনি একটা সাপ দেখে দড়ি মনে করতে পারেন, এটা আপনার পারসেপশন নয়, এটা আপনার আইডিয়া, কেননা সাপও লম্বা, দড়িও লম্বা। কামড় দিলে না বুঝবেন, এটা সাপ। কামড় খাওয়ার আগে তারা এটা বোঝেনি। ২০১৩কে আপনি কামড় মনে করতে পারেন। তারা বোঝেনি, এজন্য আমি আমার লেখার কোনো নিন্দা করব না। আমি আমার লেখায় কোনো গুণগত উত্তরণ দেখি না, তার মধ্যে ক্রমাগত উত্তরণ আছে, ধীরে ধীরে যেটা হয় আর কি। কাজেই যারা আমার লেখাকে মৌলবাদী বা ইসলামি মনে করেছে, সেটা তাদের সমস্যা, আমার সমস্যা নয়। আমি সবসময়ই ইসলামি, আমি সবসময়ই মৌলবাদী, যদি তখনও থাকি, এখনও আছি, আর এখনও না থাকলে তখনও নেই। এর মধ্যে কোনো গুণগত রূপান্তর হয়নি আমার লেখায়। এখন আমি বলি, আমাকে যদি মৌলবাদী বলেন, তাহলে নজরুল ইসলামকে কী বলবেন? অর্থাৎ আমি যত উর্দু-আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছি, এর চেয়ে কম বঙ্কিমচন্দ্র ব্যবহার করেননি, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলা ভাষার চরিত্র সম্পর্কে যাদের পরিচয় নেই, এটা তাদের অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। একটা উদাহরণ দিই, যেমন আমার একটি বইয়ের নাম ‘আদম বোমা’। ‘বোমা’ শব্দটা হচ্ছে ইংরেজি থেকে নেয়া, ‘বোম্ব’ থেকে আমরা বানিয়েছি। ‘আদম’ হলো আরবি ও হিব্রু শব্দ। ফার্স্ট ম্যান। আদম ব্যাপারি, আদম ব্যবসা, সে রকম দুটো মিলিয়ে আমি নাম রেখেছি ‘আদম বোমা’। আরেকটি বইয়ের নাম ‘স্বাধীনতা ব্যবসায়’, কাছাকাছি ধরেন, ‘আহমদ ছফা সঞ্জীবনী’, অথবা ‘সত্য সাদ্দাম হোসেন ও স্রাজেরদৌলা’। এখন আমার নতুন একটি বই বেরোবে ‘মর্সিয়া’, মর্সিয়া মানে শোককথা। ‘ত্যাগ চাই, মর্সিয়া-ক্রন্দন চাহি না’। মর্সিয়া মানে যারা মারা গেছে, তাদের জন্য আমি কাঁদছি। এখন বাংলা ভাষায় মর্সিয়ার চেয়ে ভালো শব্দ আর নেই। যেমন জার্মান ভাষায় ‘ট্রাউয়ারস্পিয়েল’, মর্সিয়া তো এটারই অনুবাদ। এটা মোর্নিং প্লে নয়, এটা মোর্নিং সং। কিন্তু মোর্নিং এটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। মোর্নিং অ্যান্ড ম্যালানকলিয়া, এটা দিয়ে লাকাঁ হেমলেটের ক্রাইসিস ব্যাখ্যা করেছেন। সমস্যা হলো, এটা জানতে হবে ম্যালানকোলিয়ায় ভোগা যাবে না। হেমলেট মোর্ন করতে পারছিলেন না, তাই ম্যালানকলিয়ায় ভুগছিলেন। তো মোর্নিং শব্দটি জার্মান ভাষায় ট্রাউয়ারস্পিয়েল, গ্রিক ভাষায় ট্র্যাজেডি। গ্রিক শব্দ ট্র্যাজেডি ইংরেজি ভাষায় চালু হয়েছে। এখন বাংলায় আমি জার্মান ট্রাউয়ারস্পিয়েল চালানোর চেষ্টা করছি, লোকে নিচ্ছে না। আমার আরেকটি বইয়ের নাম খুব মজার, সেটি হলো ‘আল্লাহর বাদশাহী’, এটা একটা খ্রিস্টান ধর্মতত্ত্বের বই। ইংরেজিতে আছে ‘কিংডম অব গড’, এখন গডকে আল্লাহ অনুবাদ করা যায় কিনা বা আল্লাহকে গড অনুবাদ করা যায় কিনা, সে সমস্যা তো আছেই। কিন্তু আমি করেছি। কিংডমের অনুবাদ করেছি বাদশাহী।

 

সাম্প্রতিক দেশকাল, বর্ষ ৫, সংখ্যা ২৮, ৩০ আগস্ট ২০১৮

Leave a Reply