১৯৭১: কবি জসীম উদ্দীনের সাক্ষ্য

১৯৭১ সালের ছায়া বাংলাদেশের সাহিত্যে কতদূর পর্যন্ত পড়িয়াছে তাহা এখনও পর্যন্ত সঠিক পরিমাপ করা হয় নাই। উদাহরণস্বরূপ কবি জসীমউদ্দীনের কথা পাড়া যায়। এই মহান কবি ১৯৭১ সালেও বাঁচিয়া ছিলেন। সেই বাঁচিয়া থাকার অভিজ্ঞতা সম্বল করিয়া তিনি ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ একটি ক্ষীণকায় কবিতা সংকলনও ছাপাইয়াছিলেন।

স্বীকার করিতে হইবে, এই কবিতা সংকলনের খবর অনেকেই রাখেন না। যাঁহারা রাখেন তাঁহারাও রাখিতে বিব্রত বোধ করেন। জসীমউদ্দীন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়কে দ্বিতীয় দলের দৃষ্টান্তস্বরূপ স্মরণ করা যায়। তিনি ১৯৭২ সালে প্রকাশিত এই ক্ষুদ্র সংকলন প্রসঙ্গে লিখিয়াছেন, “বিশেষ উদ্দেশ্যমূলকতার দায় বহন করতে গিয়ে কবিতার প্রাণশক্তি এখানে যে দারুণভাবে পীড়িত হয়েছে তা না মেনে উপায় নেই।”


১৯৭১ সালের প্রায় তিরিশ বছর আগে–১৯৪০সালে–অধ্যাপক হুমায়ুন কবির দুঃখ করিয়াছিলেন নজরুল ইসলামের মতন জসীমউদ্দীনেরও সৃজনীপ্রতিভা অল্পদিনেই শেষ হইয়া গিয়াছিল। ইহার কারণ কি দেখাইতে গিয়া তিনি বলিয়াছিলেন, নজরুল ইসলামের মতন জসীমউদ্দীনেরও ‘মানস সংগঠনে’ কোন রূপান্তর হয় নাই। নজরুল ইসলামের কবিতায় যে বিপ্লবধর্ম তাহা পুরাতন ঐতিহ্যের পুরুজ্জীবন ঘটাইয়াছে কিন্তু কল্পনা ও আবেগের নতুন নতুন রাজ্য জয়ে অগ্রসর হতে পারে নাই। আর জসীমউদ্দীনের কাব্যসাধনায় সিদ্ধি আসিয়াছিল দেশের ‘গণমানসের অন্তর্নিহিত শক্তি’ হইতে। হুমায়ুন কবিরের মতে, তিনিও কল্পনা আর আবেগের নতুন নতুন রাজ্য জয়ে বিশেষ অগ্রসর হইতে পারেন নাই। দুই বড় কবির কথা মনে করিয়া হুমায়ুন কবির আক্ষেপ করিয়াছিলেন, “আজ আত্মকেন্দ্রিক পুনরাবৃত্তির মধ্যেই তাঁদের সাধনা নিবদ্ধ।”

১৯৪০ সালে যে দশক শুরু হইয়াছিল সেই দশক নাগাদ বাঙালি মুসলমান সমাজের অন্তর্গত কবি ও সাহিত্য সাধকেরা মোটের উপর তিন ভাগে ভাগ হইয়া গিয়াছিলেন। একভাগে ছিলেন সংরক্ষণশীলরা। ইহাদের সম্পর্কে হুমায়ুন কবির জানাইয়াছিলেন, “তার ঝোঁক অতীতের দিকে, তার ধর্ম প্রচলিত ব্যবস্থার সংরক্ষণ। ইসলামের অন্তর্নিহিত সামাজিক সাম্যকেও তা ব্যাহত করে।” ইহার ফলে বাংলার মুসলমান সমাজ যেমন ‘অনিশ্চিত মতি’ তেমনি ‘গতিহীন’ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল।

দ্বিতীয় ভাগে ছিলেন প্রতিক্রিয়াশীলরা। ইঁহারা স্রোতের বিরুদ্ধে পুরাতন বন্দরে ফিরিয়া যাইতে চাহিতেন। অসম্ভবের পায়ে আত্মনিবেদন বৃথা জানিয়াও ইঁহারা সমাজ মানসের সমস্ত উদ্যম সেই অসম্ভবের পায়ে উৎসর্গ করিয়াছিলেন।

সবশেষে ছিলেন আরেক দল ইঁহারা সংখ্যায় ও শক্তিতে দুর্বলতম। ইঁহারা ভবিষ্যতের সাধক। এই দলের কথা মনে রাখিয়াই হুমায়ুন কবির লিখিয়াছিলেন, “ভবিষ্যতের অভিযানে আশঙ্কা থাকতে পারে, কিন্তু সম্ভাবনা আরো বেশি, অথচ আজো বাঙালি মুসলমানের যৌবন সে দুঃসাহসিকতায় বিমুখ।”
jasimuddin.gif
হুমায়ুন কবির এই তৃতীয় ভাগের উপরই ঈমান আনিয়াছিলেন। তিনি লিখিয়াছিলেন, “সমস্ত পৃথিবীতে বর্তমানে যে আলোড়ন, তারও নির্দেশ ভবিষ্যতের দিকে। সেই প্রবাহ যদি বাঙালি মুসলমানকে নূতন সমাজসাধনার দিকে ঠেলে নিয়ে যায়, তবে মুসলমান সমাজসত্তার অন্তর্নিহিত ঐক্য ও উদ্যম দূর্বার হয়ে উঠবে, বাঙলার কাব্যসাধনায়ও নতুন দিগন্ত দেখা দিবে।” হুমায়ুন কবিরের এই আশা ও আশীর্বাদ সত্য হইয়াছিল ১৯৭১ সাল নাগাদ। বাংলার কাব্যসাধনায় নতুন দিগন্ত দেখা দিয়াছিল শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ প্রভৃতি কবির জন্মের পর।

জসীমউদ্দীনের কবিতা এই তিনভাগের মাপে বিচার করিলে দেখা যায় একই সাথে দুই ভাগ জুড়িয়া বিরাজ করিতেছিল। তাঁহার কবিতাকে আকারের দিক হইতে দেখিলে সংরক্ষণশীল ভাগে দেখা যায়। অথচ বাসনার বিচারে তাঁহাকে তৃতীয় ভাগে ফেলা যায়। এই স্ববিরোধ আমলে লইয়াই হুমায়ুন কবির ১৯৪০ সালে লিখিয়াছিলেন, “সাম্প্রতিক বাঙালি মুসলমান কবিদের মধ্যে প্রায় সকলেই পশ্চাদমুখী এবং নতুনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও প্রাচীনপন্থী। সাহিত্যের আঙ্গিক নিয়ে নতুন পরীক্ষা করবার উদ্যম তাদের নাই, সমাজ ব্যবস্থার রূপান্তরে নতুন নতুন পরিস্থিতির উদ্ভাবনায়ও তাঁদের কল্পনা বিমুখ।”

ইতিকথার পরেও একটা কথা থাকে। কথায় বলে, মরা হাতির দাম লাখ টাকা। বাংলাদেশের পুরাতন আঙ্গিকের চৌহদ্দির মধ্যেও জসীমউদ্দীনের প্রাণশক্তি পুরাপুরি নিঃশেষিত হইয়া যায় নাই। তাহার প্রমাণ ১৯৭১ সালের অভিজ্ঞতা লইয়া লেখা এই ক্ষীণকায়–সুনীলবাবুর ভাষায়‘জসীম উদ্ দীনের ক্ষুদ্রতম’–কাব্যগ্রন্থেও মিলিতেছে।

এই গ্রন্থে ‘বঙ্গ-বন্ধু’ নামে একটি কবিতা আছে। তাহার নিচে তারিখ দেওয়া আছে ১৬ মার্চ ১৯৭১। এই কবিতার উপর মন্তব্য করিতে বসিয়া সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায় লিখিয়াছেন, “এক আশ্চর্য ব্যক্তিত্ব এই বঙ্গবন্ধু, যাঁর হুকুমে অচল হয়ে গিয়েছিল শাসকের সকল নিষ্পেষণ যন্ত্র, বাঙালী নরনারী হাসিমুখে বুকে বুলেট পেতে নিয়েছিল শোষক সেনাবাহিনীর।” কথাটি মিথ্যা নহে। জসীমউদ্দীনের শ্লোকে:

তোমার হুকুমে তুচ্ছ করিয়া শাসন ত্রাসন ভয়,
আমরা বাঙালী মৃত্যুর পথে চলেছি আনিতে জয়।

জসীমউদ্দীন বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমানের আরও একটি জয়ের কথা বলিয়াছেন যাহা বিশারদ অধ্যাপকদের দৃষ্টি এড়াইয়া গিয়াছে। যাহা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন করিতে চাইয়াছিলেন কিন্তু পারেন নাই বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমান তাহা পারিয়াছেন। হিন্দু ও মুসলমানকে তিনি প্রেম-বন্ধনে মিলাইয়াছেন। যাহা মহাত্মা মোহনদাস গান্ধী জীবন দান করিয়াও পারেন নাই, তিনি তাহা সম্ভব করিয়াছেন। জসীমউদ্দীন লিখিয়াছেন:

এই বাঙলায় শুনেছি আমরা সকল করিয়া ত্যাগ,
সন্ন্যাসী বেশে দেশবন্ধুর শান্ত মধুর ডাক।
শুনেছি আমরা গান্ধীর বাণী জীবন করিয়া দান,
মিলাতে পারেনি প্রেম-বন্ধনে হিন্দু-মুসলমান
তারা যা পারেনি তুমি তা করেছ, ধর্মে ধর্মে আর,
জাতিতে জাতিতে ভুলিয়াছে ভেদ সন্তান বাঙলার।

১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ তারিখ দিয়া লিখিত একটি কবিতার নাম ‘কবির নিবেদন’। তাহার কয়েক পঙক্তি:

প্লাবনের চেয়ে–মারীভয় চেয়ে শতগুণ ভয়াবহ
নরঘাতীদের লেলিয়ে দিতেছে ইয়াহিয়া অহরহ
প্রতিদিন এরাঁ নরহত্যার যে কাহিনী এঁকে যায়
তৈমুর লং নাদির যা দেখে শিহরিত লজ্জায়।

পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পোড়ামাটি নীতির একটি প্রতীক ধামরাই রথে আগুন। জসীমউদ্দীন পাকিস্তানের রক্ষাকারী সেনাবাহিনীর কীর্তিস্তম্ভস্বরূপ এই ধামরাই রথ ভস্মীভূত করিবার কাহিনী লিখিয়া রাখিয়াছেন। এই কবিতা হইতে অংশবিশেষ বাছিয়া লওয়া সহজ কর্ম নহে।

বছরে দুবার বসিত হেথায় রথ-যাত্রার মেলা
কত যে দোকান পসারী আসিত কত সার্কাস খেলা।
কোথাও গাজীর গানের আসরে খোলের মধুর সুরে
কত যে বাদশা বাদশাজাদীরা হেথায় যাইত ঘুরে।
শ্রোতাদের মনে জাগায়ে তুলিত কত মহিমার কথা,
কত আদর্শ নীতির ন্যায়ের গাথিয়া সুরের লতা।

পুতুলের মত ছেলেরা মেয়েরা পুতুল লইয়া হাতে,
খুশীর কুসুম ছড়ায়ে চলিত বাপ ভাইদের সাথে।
কোন যাদুকর গড়েছিল রথ তুচ্ছ কি কাঠ নিয়া,
কি মায়া তাহাতে মেখে দিয়েছিল নিজ হৃদি নিঙাড়িয়া।

তাহারি মাথায় বছর বছর কোটি কোটি লোক আসি
রথের সামনে দোলায়ে যাইত প্রীতির প্রদীপ হাসি।
পাকিস্তানের রক্ষাকারীরা পরিয়া নীতির বেশ,
এই রথখানি আগুনে পোড়ায়ে করিল ভস্ম শেষ।
শিল্পী হাতের মহা সান্তুনা যুগের যুগের তরে
একটি নিমেষে শেষ করে গেল এসে কোন বর্বরে।

এই কবিতার নিচে তারিখ লেখা আছে ১৬ মে ১৯৭১।

১৯৭১ সালে জসীমউদ্দীনের বয়স প্রায় সত্তর বছর ছুঁই ছুঁই করিতেছে। তাঁহার সৃষ্টিক্ষমতাও ততদিনে নিঃসন্দেহে কমিয়া আসিতেছে। তবু ধন্য আশা কুহকিনী। দেশ স্বাধীন হইয়াছে। কবি গাহিতেছেন:

ঝড়ে যে ঘর ভাঙিয়া গিয়াছে আবার গড়িয়া নিব
ঝড়ের আধারে যে দীপ নিভেছে আবার জ্বালায়ে দিব।

এই ধরনের সরল পঙক্তি পড়িবার বহু আগেই হুমায়ুন কবির লিখিয়াছিলেন, “আজ আত্মকেন্দ্রিক পুনরাবৃত্তির মধ্যেই তাঁদের সাধনা নিবদ্ধ।” কাব্যসাধনার প্রকরণে ইহা সত্য হইলেও কাব্যের ‘নিরাকারে’ কোথায় যেন একটা দুর্মর নাদ আছে যাহা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ১৯৭০ সালের ১৪ আগস্ট ছিল পাকিস্তানের শেষ স্বাধীনতা দিবস। সেদিন জসীমউদ্দীন লিখিয়াছিলেন সেই অপ্রকাশের বেদনা।

আজি আজাদীর এ পুত দিবসে বার বার মনে হয়
এই সুন্দর শ্যাম মনোহরা এ দেশ আমার নয়।

এই বেদনা নিঃসন্দেহে পুনরাবৃত্তির অযোগ্য।

স্বাধীনতা সংগ্রামের মাহেন্দ্রক্ষণে সংগঠিত সংগ্রামী সংগঠন বাংলাদেশ লেখক শিবির ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘হে স্বদেশ’ নামে তিনটি সংকলন প্রকাশ করিয়াছিলেন। তাহাদের কবিতা সংকলনে জসীমউদ্দীনের একটি কবিতা দেখা যায়। নাম ‘একুশের গান’। কবিতাটি যখন লেখা হইয়াছিল উল্লেখ নাই। কবিতার অন্তর্গত সাক্ষ্য হইতে অনুমান করি ইহার রচনাকাল ১৯৫২ সালের কাছাকাছি কোন এক সময় হইবে। কারণ তখন পূর্ববঙ্গ প্রদেশের জনসংখ্যা চার কোটি বলিয়াই প্রসিদ্ধ ছিল।

আমি কবিতাটির দোহাই দিয়া শেষ করিতেছি। ইহার যে রূপকল্প তাহাতেও জসীমউদ্দীনের শক্তি তাজা বোমার মত বিস্ফোরিত হইয়াছে। ‘একুশের গান’ কবিতাটিতে মোট বাইশটি পঙক্তি দেখা যায়। টুকরা টুকরা উদ্ধার না করিয়া আমি গোটা কবিতাটি ছাপাইয়া দিতেছি।

আমার এমন মধুর বাঙলা ভাষা
ভায়ের বোনের আদর মাখা
মায়ের বুকের ভালোবাসা।

এই ভাষার রামধনু চড়ে
সোনার স্বপন ছড়ায় ভবে
যুগযুগান্ত পথটি ধরে
নিত্য তাদের যাওয়া আসা।

পূব বাংলার নদীর থেকে
এনেছি এর সুর
শস্যদোলা বাতাস দেছে
কথা সুমধুর।

বজ্র এরে গেছে আলো
ঝাঞ্ঝা এরে দোলদোলালো
পদ্মা হলো সর্বনাশা।

বসনে এর রঙ মেখেছি
তাজা বুকের খুনে
বুলেটেরি ধূম্রজালে
ওড়না বিহার বুনে।

এ ভাষারি মান রাখিতে
হয় যদি বা জীবন দিতে
চার কোটি ভাই রক্ত দিয়ে
পূরাবে এর মনের আশা।

অধিক মন্তব্য করিব না। শুধু লক্ষ্য করিব ‘দেছে’ শব্দের ব্যবহার। আরো শব্দের মধ্যে আছে ‘এরে’। সবচেয়ে দুর্ধর্ষ রুপকল্প ‘ওড়না বিহার’– ‘বুলেটের ধূম্রজালে ওড়না বিহার বুনে’। ইহাকে অসাধারণ বলিলে কমই বলা হয়। এই রকম আরেকটি শ্লোক পাইয়াছিলাম “ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে” কবিতা সংকলনের ‘জাগায়ে তুলিব আশা’ কবিতায়। জসীমউদ্দীন লিখিয়াছিলেন:

শোন ক্ষুধাতুর ভাইরা বোনেরা, উড়োজাহাজের সেতু
রচিত হইয়া আসিছে আহার আজি(কে) মোদের হেতু।

স্বীকার করিব রূপকল্প পরিচয়ে ‘উড়োজাহাজের সেতু’ ‘ওড়না বিহার’ বা উড়ন্ত ধর্মাশ্রমকে ছাড়াইয়া যায় নাই।

 

 

 

দোহাই

১। জসীমউদদীন, ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে (ঢাকা : নওরোজ কিতাবিস্তান, ১৯৭২)।
২। হুমায়ুন কবির, বাঙলার কাব্য, পুনর্মুদ্রণ (ঢাকা: বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ২০১২)।
৩। সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়, জসীমউদ্দীন , ৩য় সংস্করণ (ঢাকা: নওরোজ সাহিত্য সম্ভার, ১৯৮৮)।
৪। বাংলাদেশ লেখক শিবির সম্পাদিত , হে স্বদেশ : কবিতা (ঢাকা : বাঙলা একাডেমী, ১৯৭২)।

 

১৬ ডিসেম্বর ২০১৩, bdnews24.com, মতামত বিশ্লেষণ

Leave a Reply