রাষ্ট্রের হৃদরোগ

বর্তমান নিবন্ধটি মূলত ভূমিকা — লেখা হইয়াছে বিধান রিবেরু রচিত ও প্রকাশিতব্য ‘শাহবাগ: রাজনীতি ধর্ম চেতনা’ কিতাবের জন্য। ঐ ভূমিকাটি অত্র ‘রাষ্ট্রের হৃদরোগ’ শিরোনামে প্রকাশিত হইতেছে

গত দশ বছরে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে যে সকল তরুণ চিন্তাবিদের সহিত আমার পরিচয় ঘটিয়াছে তাঁহাদের মধ্যে বিধান রিবেরু সম্ভবত সবচেয়ে উজ্জ্বল। গায়ের রঙ্গের কথা বলিতেছি না। বলিতেছি তাঁহার চিন্তাশক্তির কথা। আপনার হাতে ধরা এই প্রবন্ধ সংকলনেও তাহার সামান্য প্রমাণ পাওয়া যাইবে বলিয়া আমার বিশ্বাস।

বর্তমানে যে প্রজাতন্ত্রে আমরা বসবাস করিতেছি তাহার প্রতিষ্ঠা হইয়াছিল ১৯৭১ সালে। প্রজাতন্ত্রের বয়স সেই হিশাবে আজ বিয়াল্লিশ বছর অতিক্রম করিতেছে। ক্ষুদ্র মানবশিশুর সহিত রাষ্ট্রের তুলনা করা কোনক্রমেই সঙ্গত নহে। হইলে এই রাষ্ট্রকেও এতদিনে প্রাপ্তবয়স্ক বলা যাইত। দুর্ভাগ্যের মধ্যে আমাদের এই রাষ্ট্র এখনো তাহার প্রাণের অর্থাৎ হৃদপিণ্ডের সংকট কাটাইয়া উঠিতে পারে নাই।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ যে সামাজিক ন্যায়বিচারের জাতীয় দাবিতে পরিচালিত হইয়াছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্যে তাহার একাংশ পূর্ণ হইয়াছে — এই সত্যে সন্দেহ নাই। কিন্তু দাবির আরেক অংশ অপূর্ণই থাকিয়া গিয়াছে। এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ফলে শ্রমিকশ্রেণির তথা সর্বজন সাধারণের মুক্তি ঘটে নাই। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ভোট দিতে পারেন। কিন্তু প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতিভা এমনই যে তাহাতে জনগণকে দেশশাসনের কঠোর কর্তব্য হইতে দূরে রাখাই নিয়ম হইয়া দাঁড়ায়। সর্বজনের মুক্তির শর্ত তাহার পরও এই প্রজাতন্ত্র — এ কথা ভুলিয়া যাওয়া ঠিক হইবে না। তবে ফ্যাসিতন্ত্রের নব্য প্রবর্তকরাই এই জাতীয় মনভোলানো প্রচারণা চালাইয়া থাকেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যাঁহারা গণহত্যা চালাইয়াছিলেন তাঁহারা ছাড়া পাইয়া গিয়াছেন। তাঁহাদের বিচার হয় নাই। আর যাঁহারা ঐ গণহত্যার সহযোগী ছিলেন তাঁহাদের কেহ কেহ মাত্র সুদীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে বিচারের মুখোমুখি হইয়াছেন। এই বিচার না হওয়া (বিচারে বিলম্ব ঘটার মানেও প্রবাদ বাক্য অনুসারে বিচার না হওয়া বটে) মানে বিপ্লব বেহাত হওয়া।

তাহার পরও বলিতে হইবে বিপ্লব মানে ঘটনা বিশেষ নহে। বিপ্লব মানে যাহা ভাসিতে থাকে। প্লব হইতে প্লাবন তাই বিপ্লব চলিতেই থাকে। সেই বিচারে বিচার করিতে হইলে বলিতে হইবে ১৯৭১ সালে যে বিপ্লব শুরু হইয়াছিল তাহারও পর আছে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসিত ও ব্রিটিশ প্রভাবিত ভারত ভাগ হইয়াছিল ধর্মভিত্তিক স¤প্রদায় পরিচয়কে বড় করিয়া। আর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ গঠন করা হইয়াছে সেই পরিচয়কে নাকচ করিয়া। ভারতবর্ষের জাতি সমস্যা বলিতে যাহা একদা বুঝাইত — ১৯৪৭ সাল যাহার সত্য সমাধান বাতলাইতে পারে নাই — ১৯৭১ সাল তাহার সত্যকার সমাধান কিভাবে হইতে পারে তাহা একপ্রকার দেখাইয়া দিয়াছে। বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের পথ সারা দক্ষিণ এশিয়া মহাদেশের ভবিষ্যৎ পথের রূপরেখা মাত্র।

এ সত্যে যাঁহাদের সন্দেহ তাঁহারা ১৯৭১ সালের মর্মকথা ধরিতে পারেন নাই। বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্র গঠনের এই তাৎপর্য আন্তর্জাতিক। দক্ষিণ এশিয়ার সকল নিপীড়িত জাতির মুক্তির রাজনৈতিক পথ দেখাইতে পারে বাংলাদেশ। আজ অনেকেই এই সত্য ভুলিতে বসিয়াছেন।

3.1বাংলাদেশে জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হইয়াছিল বিভিন্ন ধর্ম-স¤প্রদায়ের অন্তর্গত ঐক্য ও মিলিত সংগ্রামের মধ্যে। তাই যাঁহারা এই নতুন রাষ্ট্রের জন্ম ঠেকাইতে পারেন নাই তাঁহারা এখনো চেষ্টা করিতেছেন কি করিয়া ইহার সা¤প্রদায়িক ঐক্য বিনষ্ট করা যায়। এই চেষ্টা দুই দিক হইতেই হইতেছে। একদিকে আছেন তাঁহারা যাঁহারা এই দেশকে অভাগা পাকিস্তানের আদর্শে মুসলমান রাষ্ট্র বানাইতে চাহিতেছেন। আরদিকে আছেন ভারতে নতুন করিয়া প্রবল হওয়া হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকারীর দল। তাই বলিতেছিলাম বাংলাদেশের রাজনীতি এখনো এই মহাদেশের রাজনৈতিক হৃদরোগ হইতে মুক্ত হয় নাই। এই হৃদরোগ কথাটি আমি আন্তনিয়ো গ্রামসির লেখা হইতে ধার করিয়াছি। ইংরেজি অনুবাদে এই রোগের নাম ‘অর্গানিক ক্রাইসিস’। এই রোগে প্রাণ কিন্তু বিপন্ন হইতে পারে।

সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সূত্রপাত ব্রিটিশ জাতির শাসনকালে। এখনো তাহারই জের এই দেশে চলিতেছে। এই হৃদরোগ হইতে মুক্তি পাইতে হইলে আমাদের হৃদয়বান চিন্তাবিদ দরকার। শুদ্ধ একজন নহে। সর্বজনের মধ্যে এই চিন্তাবিদরা যতদিন দেখা না দিবেন ততদিন আমাদের হৃদরোগ নিরাময় হইবে না। রাষ্ট্রকে যদি কোন জীবদেহের সহিত তুলনা করা যাইত তবে আমি যাহাকে হৃদরোগ বলিতেছি তাহার অর্থ অনুধাবন সহজ হইত।

আমার বন্ধু বিধান রিবেরু আমাদের দেশ ও জাতির এই দীর্ঘস্থায়ী হৃদরোগের একটা বিশেষ আলামত বিশ্লেষণের সামান্য চেষ্টা করিয়াছেন। এই সংকলনে তাহার কিছু প্রমাণ আপনি পাইবেন। আমিও পাইয়াছি।

বিধান রিবেরু দেখাইয়াছেন ১৯৭১ সালে যাঁহারা যুদ্ধাপরাধ করিয়াছিলেন তাঁহাদের কেহ কেহ বিচারের সম্মুখীন হওয়ার পর দেশে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া হইয়াছে। যাঁহারা যুদ্ধাপরাধীদের যথার্থ বিচার চাহিয়াছেন তাঁহারা প্রথম দল। গত ৪২ বছর ধরিয়াই এই দাবি জাগরুক। এই দাবির সর্বশেষ চিহ্ন শাহবাগে সংগঠিত প্রতিবাদ। এই প্রতিবাদ স্বাভাবিক নিয়মেই ১৯৭১ সালের স্মৃতিতে স্মার্ত হইয়াছে।

আর এই বিচারকে ব্যাহত করিবার জন্য যাঁহারা ছলে বলে কৌশলে লড়াই করিতেছেন তাঁহারা দ্বিতীয় দল। এই দলের শেষ হাতিয়ার হইয়া দাঁড়াইয়াছে ধর্ম-সা¤প্রদায়িক প্রচারণা। ইঁহারা এসলাম রক্ষার আওয়াজ তুলিতেছেন। কিন্তু এই আওয়াজের আশু লক্ষ্য যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ব্যাহত করা বৈ নহে। বিধান রিবেরু বর্তমান সংকলনভুক্ত তাঁহার সকল লেখায় এই সত্যটি প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন।

আশা করি তিনি ভবিষ্যতে এই ধর্ম-সা¤প্রদায়িক রাজনীতির দূরবর্তী লক্ষ্য বিষয়েও মুখ খুলিবেন। শাহবাগে সমবেত প্রতিবাদ সমাবেশ হইতে বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের হৃদরোগ কোন জায়গায় তাহার আলামত স্পষ্ট — নতুন করিয়া স্পষ্ট — হইয়াছে। যুদ্ধাপরাধীরা আত্মরক্ষার হাতিয়ার হিশাবে পাল্টা হামলার কৌশল বাছাই করিয়াছেন। তাঁহারা প্রতিবাদকারী ও বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষকে ‘নাস্তিক’ বলিয়া আক্রমণ করিতেছেন। এই কৌশল নতুন নহে। বেগম জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে অন্যূন ২০ বছর আগে যে প্রতিবাদ আন্দোলন সংগঠিত হইয়াছিল তখনো এই কৌশল দেখা গিয়াছিল।

এইবারের নতুন দিক অনেক। তাহার শুদ্ধ একটির উপর বিধান এখানে মনোনিবেশ করিয়াছেন। কোন দিক এইটি? যুদ্ধাপরাধী মহলের সমর্থনে এইবার মুখোশ খুলিয়া আগাইয়া আসিয়াছেন সুপ্রসিদ্ধ কবি ও যশপ্রার্থী দার্শনিক ফরহাদ মজহার। বিধান একাধিক লেখায় এই নব্য ফ্যাসিবাদী প্রচারকের মুখোশ খুলিয়া দিয়াছেন।

সত্যের খাতিরে স্বীকার করিতে হইবে — বর্তমানে ফরহাদ মজহারের সমকক্ষ প্রচারক যুদ্ধাপরাধী মহলে দ্বিতীয়টি নাই। তিনি মহাত্মা আহমদ ছফার লেখা কিভাবে বিকৃত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করিতে পারেন তাহার একটি নমুনা এই সংকলনের ‘ঘুরিয়া দাঁড়াইব কোথায়’ প্রবন্ধে বিধান দেখাইয়াছেন। এই প্রবন্ধ লিখিয়া তিনি আমাদের ঋণী করিয়া রাখিলেন।

যাঁহারা কাম ক্রোধ লোভ মোহ মদ ও মাৎসর্য হইতে মুক্ত হইয়া এই সংকলনের রচনা পড়িবেন তাঁহারা দেখিবেন বিধান রিবেরু কিভাবে পদে পদে আমাদের নতুন যুগের সংগ্রামে নেতৃত্ব

দিবার যোগ্য হইয়া উঠিতেছেন। আমিও তাঁহার সংগ্রামে যোগ দিতে চাহি।

বিধানের বহিটা আমি যতদূর পারি আদ্যোপান্ত পড়িয়াছি। শুদ্ধ একটা জায়গায় আমার মনে হইল তিনি আরো একটু ভাবিলে ভাল করিতেন। ‘মদিনার সনদ’ প্রসঙ্গে তিনি লেবাননী বংশোদ্ভূত ইতিহাসবিদ ফিলিপ হিট্টির কথা উদ্ধৃত করিয়াছেন। হিট্টি বলিয়াছিলেন এই ‘মদিনার সনদ’ জিনিশটা এসলামি সাম্রাজ্যের ভিত্তিস্বরূপ হইয়াছিল। ইহা লইয়া তর্ক চলিতে পারে। মনে রাখিতে হইবে আড়াই হাজার বছর আগের রোম প্রজাতন্ত্র কয়েকশত বৎসর পর রোমান সাম্রাজ্যে পরিণত হইয়াছিল। তাই বলিয়া নিকোলো মেকিয়াবেলি ‘প্রজাতন্ত্র’ জিনিশটাকে খাট করিয়া দেখেন নাই। আমরাও বলিব প্রজাতন্ত্র বা জনসাধারণের কতৃত্বই গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাভূমি।

‘মদিনার সনদ’ একটা রূপকথা। কিন্তু ইহার মর্মকথা কি? সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। একাধিক ধর্মবিশ্বাসের মানুষ এক রাষ্ট্রে বসবাস করিতে পারেন কিনা তাহার নমুনা বলিয়া ইহাকে গ্রহণ করা যায়। বিধান প্রশ্ন তুলিয়াছেন এই রূপকথার তুলনীয় অন্য রূপকথা বিলাতের সনদ — ওরফে ‘ম্যাগনা কার্টা’ বা মহাসনদ — প্রসঙ্গ তোলা উচিত কিনা। মনে রাখিতে হইবে রূপকথা ভাষার মতন। তাহার বাসস্থান অজ্ঞানলোকে। ইহা পছন্দ বা অপছন্দের কথা নহে। গান্ধিজি রামরাজ্যের কথা তুলিয়াছিলেন। কিন্তু বর্তমান যুগের ভারত রামরাজ্য হইয়াছে কি?

বিধানের পরামর্শ আমরা গ্রহণ করি কি না করি তাহা বড় কথা নহে। তাঁহার প্রশ্নটা গুরুর প্রশ্ন, গুরুতর প্রশ্ন। আমরা এই প্রশ্ন কাঁথাচাপা দিতে পারিব না। ইহা জাগিয়া উঠিবেই।

তাঁহার প্রশ্ন আমার কাছে আরো এক কারণে তৎপর হইয়া উঠিয়াছে। বিধান বাংলাদেশের ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্ম স¤প্রদায়ের মধ্যে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। এই ঘটনাটিকে ছোট করিয়া ভাবিবার কোন উপায় নাই। বাংলাদেশের জাতীয় সমাজে তাঁহার প্রতিভা যতই উজ্জ্বল হইবে এই দেশের জন্ম ততই সফল বলিয়া অভিনন্দিত হইবে। তিনি এই বই বাংলায় লিখিয়াছেন। একদিন এই বইও ‘ঢাকার সনদ’ বলিয়া বিখ্যাত হইবে কিনা কে জানে!

এই সামান্য ভূমিকা লিখিবার সম্মান আমাকে দান করিয়া বিধান রিবেরু আপনকার হৃদয়ের ঔদার্যেরই প্রমাণ দিয়াছেন। আমি ক্যাথলিক বলিতে ‘ঔদার্যের অধিকারী’ বলিয়াই ভাবিয়া থাকি। এই বই পড়িতে হইলেও সেই ঔদার্য আমাদের পক্ষে অপরিহার্য।

গ্রন্থ পরিচিতি: বিধান রিবেরু, শাহবাগ: রাজনীতি ধর্ম চেতনা (ঢাকা: প্রকৃতি প্রকাশনী, প্রকাশিতব্য)

২৭ নবেম্বর ২০১৩, সর্বজন: নবপর্যায় ২৯

Leave a Reply