বৌদ্ধ মন্দিরে হামলার এক বছর: বিচার করতে হবে

রামুসহ কক্সবাজারের বিভিন্ন বৌদ্ধ উপাসনালয় ও বসতিতে সাম্প্রদায়িক হামলার এক বছর পূর্তি হইল ২৯ সেপ্টেম্বর। বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটিকে স্মরণ করিবার আয়োজন করে রামু কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ যুব পরিষদ। স্মরণসভা পর্বে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখিয়াছিলেন সলিমুল্লাহ খান। অত্র তাহার বক্তব্যখানি সামান্য পরিমার্জনা করিয়া ছাপানো হইল

রামুতে সাম্প্রদায়িক হামলার বর্ষপূর্তি স্মরণে আয়োজিত অষ্টপরিষ্কার দান অনুষ্ঠানে ভক্তবৃন্দ ছবি: সর্বজন

রামুতে সাম্প্রদায়িক হামলার বর্ষপূর্তি স্মরণে আয়োজিত অষ্টপরিষ্কার দান অনুষ্ঠানে ভক্তবৃন্দ
ছবি: সর্বজন

আজকের স্মরণসভার সভাপতি, মঞ্চে উপবিষ্ট অতিথি এবং রামুর সর্বস্তরের বৌদ্ধ হিন্দু মুসলিম জনসাধারণ, আপনাদের শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করছি।

২৯ সেপ্টেম্বর যে ঘটনা ঘটেছিল সেখানে কারা আক্রমণ করেছিল আপনারা অনেকেই জানেন। আপনারা অনেকেই সাক্ষী আছেন। সরকারি তদন্ত কমিটি তাদের নাম খুঁজে পায় না। আপনারা জানেন যারা কোন কাজ — ভাঙ্গার কাজ — হাতে নেয়, আমাদের বাংলা ভাষায় তাদের বলে ক্রীড়নক। তারা খেলার হাতিয়ার। তাদের পিছনে পরিকল্পনাকারী থাকে। পরিকল্পনাকারীদের  পিছনে আরো বড় পরিকল্পনাকারী থাকে। আপনারা

দেখুন গত এক বছরে এদেশে কত ঘটনা ঘটেছে। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১২ সনে যখন রামুর বৌদ্ধমন্দিরে হামলা হয়, পরে উখিয়া টেকনাফে হামলা হয়, তখন আমরা মনে করেছিলাম এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এই ঘটনাগুলো যে বিছিন্ন নয় তা দেখাতে আমি বেশি দূরে যাব না। আমাদের এই দক্ষিণ এশিয়ায়, যাকে আমরা উপমহাদেশ বলি সেখানে, এই ধরনের ঘটনা প্রচুর হচ্ছে। আপনারা দেখেন ভারতে হচ্ছে কোথাও কোথাও , শ্রীলঙ্কায় হচ্ছে, বার্মাতেও কোথাও কোথাও হচ্ছে, পাকিস্তানে হচ্ছে, আফগানিস্তানে হয়েছে। আমি আর বেশি দূরে যাচ্ছি না।

মাঝে মাঝে আমাদের মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে এর পিছনের কারণটা কি। আমরা সকলেই মনে করি যে আমাদের দেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। তাহলে অসম্প্রীতি তৈরি করে কারা? সোজা কথায়, অসম্প্রীতি তৈরি করলে যাদের লাভ তারাই করে।

আমরা ১৯৭১ থেকে শুরু করি সবকিছুই। ৪২ বছর আগের ঘটনা। কিন্তু তার আগেও তো ইতিহাস ছিল। আমি পুরানা ইতিহাসে যাব না। ধরুন, ২০০ বছরের মত এদেশ ব্রিটিশের শাসনে ছিল। তখন বলা হয়েছিল এদেশে তো হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান এবং নানা ধর্মের মানুষ আছে। আবার বাঙ্গালি পাঞ্জাবি সিন্ধি গুজরাটি বিহারি নানা জাতির মানুষ আছে। আপনারা জানেন নানা অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য থাকে। পাকিস্তান আমলে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের বৈষম্য ছিল। তার পরিণতিতে আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি।

ব্রিটিশ আমলেও তেমন বৈষম্য ছিল। তখন মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছিল, ব্রিটিশরা যদি চলে যায়, এদেশ শাসন করবে কারা? তখন বড় বড় মনীষীরা বলেছিলেন এ সমস্যা সমাধানের সহজ কোন পথ নাই। সমাধান কি? এদেশের সব লোককে হয় হিন্দু হয়ে যেতে হবে না হয় সব লোককে মুসলমান হয়ে যেতে হবে। নাহলে এই সমস্যার কোন সমাধান নাই। এই কথা এমন সব বড় বড় লোক বলেছিলেন যাদের নাম আনলেও বিশ্বাস হবে না। আমি নাম নিচ্ছি না। কিন্তু আমরা জানি এটা কোন সমাধান নয়। এটা একটা অবাস্তব সমাধান। আমাদেরকে যার যার ধর্মে থাকতে হবে এবং আমাদেরকে একই দেশে বসবাস করতে হবে। তাহলে সমস্যার সমাধান কোথায়? আমরা তখন, ১৯৭১ সালে, বলেছিলাম ন্যায়, সাম্য, মানবিক মর্যাদা। এই দাবিতেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল।

কিন্তু আমি দেখি দেশে এখন কিছু কিছু বুদ্ধিজীবী বের হয়েছেন যারা বলেন ধর্মনিরপেক্ষতা কোথা থেকে আসল আমরা টের পাচ্ছি না। আমি তাদেরকে সবিনয়ে প্রশ্ন করতে চাই, যদি বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সমানাধিকার, ন্যায়, সাম্য প্রতিষ্ঠিত না হয় তাহলে মানবিক মর্যাদা থাকবে কোথায়? আর যদি বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সমান আচরণ করার দায়িত্ব রাষ্ট্র না নেয় — যাকে আমরা ধর্মনিরপেক্ষতা বলি — তাহলে মানবিক মর্যাদা, সাম্য এবং ন্যায় কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে? যারা বলছেন বাংলাদেশে সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং ন্যায় থাকবে কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা থাকবে না তারা আন্তরিক কথা বলছেন না। আমার ধারণা, এই কথা যারা বলছেন তারাই এই আক্রমণটা করেছেন। তার একটা দীর্ঘমেয়াদী কারণও আছে।

এদেশে চিরকাল শাসন করতে পারবে না এটা ব্রিটিশ বুঝতে পেরেছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর তারা নিজেরাই বলেছিলেন আমরা চলে যাব। তারা বাংলাদেশ থেকে চলে গেছেন। শ্রীলঙ্কা থেকে চলে গেছেন। তারা বার্মা থেকে চলে গেছেন। তারা পৃথিবীর প্রায় সব দেশ থেকে চলে গেছেন। ওটা চলে যাবার সময়। আমরা ওটার নাম দিয়েছি পরাধীনতার শেষকাল।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন সলিমুল্লাহ খান ছবি: সংগৃহীত

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন সলিমুল্লাহ খান
ছবি: সংগৃহীত

তাহলে স্বাধীনতার কালে আমরা কিভাবে দেশ চালাব? পাকিস্তান আমলের ২৩-২৪ বছরে আমরা বিশ্বাস করেছিলাম, ভারতবর্ষে যে আঞ্চলিক বৈষম্য হয়েছিল সেটার অবসান হবে। তখন মানুষকে প্রবঞ্চিত করে বলা হয়েছিল তোমার মধ্যে বহু পরিচয় আছে। তুমি পূর্বাঞ্চলের লোক, একই সাথে তুমি ভারতের, সেটাও তোমার পরিচয়। ঘটনাচক্রে যারা নির্যাতিত তাদের কোন না কোন ধর্মপরিচয় থাকে। তখন তাদের ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে একটা কলা — তোমরা মুসলমান। সেই জন্য পাকিস্তান হয়েছে। কিন্তু সেই মানুষেরাই কিছুদিন পর বুঝতে পেরেছে এই পাকিস্তান তাদের সমস্যার সমাধান করবে না। এখন বার্মার মধ্যে মুসলমানদের উপর অত্যাচার হয়। ধরে নিলাম। তো সেটা বলে রামুর বৌদ্ধদের উপর অত্যাচারের যুক্তি যারা দেখায় তারা মানবিক মর্যাদায়, সাম্যে, ন্যায়ে, ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করে না। এই আক্রমণ করেছে তারাই। এগুলো হচ্ছে লম্বা কথা। আমরা এখন নগদ কথায় আসি।

গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে আজকের এই ২৯ তারিখ পর্যন্ত এই এক বছরে কত ঘটনা ঘটেছে। আপনারা জানেন এই বছর ফেব্রুয়ারি মাসের ৫ তারিখে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের একটি রায় ঘোষিত হল। ঢাকার শাহবাগে তরুণরা সমাবেশ করে বলল যুদ্ধাপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি চাই। তখন কয়েক দিনের মধ্যে দেখা গেল — আমি লম্বা কাহিনীকে সংক্ষেপ করছি, আপনারা সকলেই জানেন — দেশের কত জায়গায় ৯৪-৯৫ জায়গায় হিন্দু মন্দিরে হামলা হল। আমি আমার সেই সমস্ত বৌদ্ধ বন্ধুরা যারা আগে বক্তৃতা দিয়েছেন তাঁদের বক্তব্যের সাথে সহমর্মিতা প্রকাশ করেই বলছি, আক্রমণ একলা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপর হয় নাই। পৃথিবীর নানা দেশে যেখানে যে দুর্বল — তথাকথিত সংখ্যালঘু — তার উপরেই হামলা হয়। এই বাংলাদেশে হয়েছে। ভারতে দেখেন মুসলমানদের উপর হচ্ছে। এগুলো করে কারা? দেখেন আমরা এখন ইন্টারনেটের যুগে এসছি। সেদিন দেখলাম একজন সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, কক্সবাজার জেলা পরিষদ এখন কম্পিউটার আউটসোর্সিং করছে। মানে কম্পিউটার বেশি শিখে আমরা এখন পয়সা কামাতে পারব। কিন্তু তার বিপদের দিকও আছে। বলে ঘুঘু দেখেছ ফাঁদ দেখনি? ফাঁদ হচ্ছে এই — রামুতে যা ঘটেছিল সেটাই। সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা — একজনের নামে অপবাদ দিয়ে আরেক জনকে দোষী করা। এটাকে ইংরেজিতে বলে ব্ল্যাক প্রপাগান্ডা। আমি কথাটা পছন্দ করি না। আমি বলব এটা হোয়াইট প্রপাগান্ডা। এটা সাদা মিথ্যা, নির্জলা মিথ্যাপ্রচার। কিন্তু পরিণতিতে যা হবার তা তো হয়ে গেছে। আপনারা সবাই দেখেছেন। আমরা সকলেই তার ভুক্তভোগী।

কিন্তু ৫ ফেব্রুয়ারির পর বুঝতে পারলাম তার পিছনে একটা সংঘবদ্ধ হাত আছে। এটা কোন বিছিন্ন ব্যক্তি, রামুর কয়েকজন ব্যক্তি করেছে বললে পুরাপুরি সত্য বলা হবে না। তাহলে দেশের পঁচানব্বইটা জায়গায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দিরের উপর, বাড়ির উপর কেমন করে হামলা হল? এটা কি করে সম্ভব? এমনকি রামুতেও আক্রমণ করার জন্য ট্রাকে ট্রাকে যে লোক এসেছে সেটা তথাকথিত লোকের মনের রাগ থেকে সম্ভব নয়। এটা দুইদিনের ঘটনা হতে পারে না।

এই জন্যই বলছি বৌদ্ধ মন্দির পুনরায় নির্মাণ করার জন্য আমরা সরকারকে ধন্যবাদ অবশ্যই দেব। এটা না দিলে অন্যায় হবে। আমাদের সুলতানা কামাল আপাও বলেছেন, সরকার যে এটা নির্মাণ করে দিয়েছে সেটার জন্য আপনারা তাকে সাধুবাদ জানাবেন। বৌদ্ধমন্দিরগুলোর পুনর্নির্মাণ করাটা সমস্যার স্বীকৃতি মাত্র, সমাধান নয়। এই ধরনের ঘটনা আর যেন না ঘটে সেটা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমে আমাদের প্রত্যেককে বুঝতে হবে ঘটনাটা কেন ঘটে। সে জন্য আমি বললাম ব্রিটিশ আমল থেকে  শুরু করে আমরা দেখেছি ঘটনাগুলি সবসময় ঘটে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের পিছনে কি থাকে? থাকে স্বার্থবুদ্ধি, বিশেষত অর্থনৈতিক স্বার্থ। ভবিষ্যতে এদেশে শাসন চালাবে কে? কে এদেশের উপর প্রতাপ করবে? যারা করতে চায় তারা নিজের শাসন ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক শোষণের ক্ষমতাকে অক্ষুণœ রাখার জন্য মানুষের মধ্যে ক্রমাগত ভীতির সঞ্চার করে। বলে এদেশ থেকে চলে যেতে হবে তোমাকে। আমি বলি, এটা কি তোমার বাপের সম্পত্তি? হ্যাঁ, রাজনীতি শুধু তোমাকে সেই বাপের সম্পত্তি করে দেয় অন্যকে তার বাপের সম্পত্তি থেকে উৎখাত করার জন্য। এজন্য তা যদি আমরা বুঝতে চাই তো আমাদের ঘটনার গভীরে যেতে হবে।

এখন দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে দেশে একটা বিচার প্রক্রিয়া চলছে। এটাকে ‘নামে’ই  আমি বলব, কারণ বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে বিলম্বিত হচ্ছে বিলম্বিত হচ্ছে। একটা রায় ঘোষিত হল। প্রথম রায়ে একজনের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল কারণ সে দেশে নাই, পালিয়ে গেছে। সেই একই ধরনের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর আরেকজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হল। তখন ছাত্রজনতা সহ দেশের সর্বস্তরের মানুষ শাহবাগে এসে বিক্ষোভ করল। তখন সেটাকে ঠেকানোর জন্য কি ধরনের মিথ্যা, সাদা প্রচারণার সুযোগ নেওয়া হল, আপনারা দেখেছেন। বলল কি শাহবাগে যারা সমবেত হয়েছে তারা সকলেই নাস্তিক। ভাগ্যিস বলে নাই শাহবাগে যারা সমবেত হয়েছে তারা সকলেই বৌদ্ধ। এখন নাস্তিকদের তো মন্দির নাই। ভাঙ্গবে কোনটা? তারা পারবে নাস্তিকদের ধরে ধরে হত্যা করতে। আমি সবিনয়ে নিবেদন করতে চাই, রামুর ঘটনা সেই ঘটনার অংশ। যেহেতু ঘটনাটা ৫ মাস আগে ঘটেছিল তাই আমরা প্রথমে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। এটা কেমন করে সম্ভব? আসলে এটা সম্ভব সেইভাবে যেভাবে অন্য ঘটনাগুলো ঘটেছে। অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার উদাহরণ তো ভারতে স্থাপন করা হয়েছে। নিশ্চয় সেখান থেকে এরা শিক্ষা নিয়েছে।

এজন্য বলছি এই অত্যাচারের কাহিনী কোন বিশেষ ধর্মের সাথে যুক্ত নয়। এসলাম ধর্মের কোথাও বলে না যে মন্দির ধ্বংস করতে হবে। এসলাম ধর্ম বৌদ্ধধর্মের চেয়ে বয়সে ১,০০০ বছরের ছোট ধর্ম। আমিও এসলামি সমাজে জন্মগ্রহণ করেছি। এসলাম ধর্মের বাণী আমি যেটুকু বুঝি তা হল আল্লাহর চোখে সকল মানুষ সমান। আর আমি কার্ল মার্কসের বই পড়ে কার্ল মার্কসের শিষ্য হয়েছি অতি অল্প বয়সে। সেখানে আবার কার্ল মার্কসের শিক্ষা বলতে আমি বুঝেছি, মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্যকে নির্মাণ করে, দেবতারা নির্মাণ করে না। এই দুইয়ের মধ্যে আমি কোন বিরোধ দেখি না। মানুষ নিজের ভাগ্যের নির্মাতা নিজেই। তার ভাগ্য ভাগ্যদেবীর উপর নির্ভর করে না। ভাগ্য তাকেই সহায়তা করে যে বীরদর্পে সাহসের সাথে এগিয়ে যায়। কাজেই যে ঘটনা ঘটেছে এখানে, যারা আক্রমণ করেছে, সেটাকে ঠেকাবার জন্য রামুতে অন্তত একজন হলেও তো মানুষ ছিল। একজন হলেও ঠেকাতে গিয়েছে। মানুষের মাথা তো ফেটেছে। এটাই আমাদের গৌরবের কথা।

এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগে, আমাদের জনগণের যদি চাপ না থাকত, সারা পৃথিবীতে দুর্নামে আমাদের নামে যদি রি রি পড়ে না যেত, তাহলে হয়তো বাংলাদেশ সরকারও এই মন্দিরগুলি নির্মাণ করে দিতেন না। বিশ্ব জনমতের চাপ আছে, দেশের জনমতের চাপ আছে। তাই সরকার যদি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে তাহলে তাকে কাজ করতে হবে। আমি সরকারকে ধন্যবাদ দেব। একই সাথে বলব এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধের জন্য কমপক্ষে দুইটা কাজ করা দরকার। এক হচ্ছে: এ কাজ যে বা যারা করেছে তাদেরকে ধরে ধরে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে। এটার কোন ক্ষমা নাই। যদি ৪২ বছর পরে ১৯৭১ সালে করা যুদ্ধাপরাধের বিচার হতে পারে তাহলে রামুর বৌদ্ধমন্দিরে হামলাকারী অপরাধীদের অনুসন্ধানে যদি ৪০ বছরও লাগে, তার বিচার করতে হবে। যদি এই বিচার না হয় তাহলে এই ধরনের আক্রমণকারীরা আবারও উৎসাহিত হবে। এই বিচার হবে তখনই যখন আমরা সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে — শুধু বৌদ্ধদের মধ্যে নয় — মুসলমানদের মধ্যে, হিন্দুদের মধ্যে, দেশের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে এই বিচারের দাবি জনপ্রিয় করতে পারব।

আপনাদের সন্তান, আমার বন্ধু ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়–য়া একটা অসাধারণ সমৃদ্ধ ভাল বই বের করেছেন। এটা হয়তো হাজার হাজার কপি ছাপা হয় নাই। আপনাদের যাদের সাধ্য আছে দেখবেন। তাতে দলিল অনেক আছে। সরকারি তদন্ত কমিটিতে যে সমস্ত কথা লোকে বলে নাই তার চেয়ে বেশি কথা এই বইতে বলা আছে। ‘রামু: সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সংকলন’ এই বইটা আপনারা নিশ্চয় দেখবেন। তাতে অনেক কাহিনী আছে।

আমি আজকে বক্তৃতা সংক্ষিপ্ত করব। আমি বলব যে বিচাররের দাবিটা আমরা তখনই প্রতিষ্ঠিত করতে পারব যখন জানব আক্রমণকারীদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কি। প্রকৃত উদ্দেশ্য আমি এইভাবে সংক্ষেপে বলি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটা তৈরি হওয়ার আগের ইতিহাস দেখেন। পাকিস্তান আমলে আমরা বিভ্রান্তিতে পড়েছিলাম যে মানুষে মানুষে বিভেদের মূল কারণ বুঝি ধর্ম। আমরা পাকিস্তানের অভিজ্ঞতায় প্রমাণ করেছি সেটা আসল কারণ ছিল না। আসল কারণ ছিল মানুষের উপর মানুষের শোষণকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য মানুষকে ধর্ম পরিচয় দিয়ে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা। সেজন্য ব্রিটিশ শাষিত ভারতবর্ষের একটা অংশ পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম করেছিল, আরেকটা অংশ ভারত রাষ্ট্র করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ আমরা গড়েছিলাম একটা মহান আদর্শ নিয়ে — ধর্ম পরিচয় দিয়ে আর কেউ কাউকে শোষণ করতে পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার তিন চার পাঁচ বছরের মধ্যেই আবারও সেই ধর্ম পরিচয় বড় করে তোলার যে রাজনীতি দেশে গড়ে উঠল সেটাই সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয়। পরিতাপের বিষয়।

ছবি: সর্বজন

ছবি: সর্বজন

এটা কি করে সম্ভব হল? মুক্তিযুদ্ধ আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এদেশে আর কোন দিন পাকিস্তানিরা শাসন করবে না। শুধু তাই নয়, এদেশে বাঙ্গালিরাও বাঙ্গালি কি অন্য জাতির লোকদের আর শোষণ করবে না — এটা কি মানুষের আশা ছিল না? অন্তত বেশির ভাগ মানুষের আশা তো তাই ছিল। সে আশা পূরণ হয়নি। যারা মানুষের উপর মানুষের অত্যাচার, মানুষের উপর মানুষের শোষণ এবং শাসনকে প্রতিষ্ঠিত রাখতে চায় তাদের কোন না কোন ছুতা লাগবে। আমরা সকলেই শ্রমজীবী মানুষ। আমরা সকলেই কৃষক মানুষ। এই পরিচয় যদি বড় হয়ে ওঠে তাহলে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ ভেদটা বড় থাকে না। কিন্তু সেটা বাদ দিয়ে যদি আমি মানুষের মধ্যে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ভেদাভেদটাকে বড় করে রাখতে পারি তাহলে যারা বড় লোক হয়েছে নতুন করে, এদেশ হয়ে যাদের নতুন জমিনদারি হয়েছে, যারা নতুন শিল্পপতি হয়েছে তাদের সুবিধা হয়। তারা পুরানো আমলের পাকিস্তানি রাজনীতিকে আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।

সেজন্য আজকে তারা বলছে, দেশ আজ দুই ভাগে বিভক্ত। আমি বলব দেশ আজ দুই ভাগে বিভক্ত নয়। প্রত্যেক দেশেই কিছু চোর, কিছু ডাকাত, কিছু দুর্বৃত্ত থাকে। তাই কি আপনি বলবেন, দেশ আজ দুই ভাগে বিভক্ত? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন সাহেব — তিনি প্লেবয় টাইপের মানুষ — একবার বলেছিলেন পৃথিবীর মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত। যারা তাজমহল দেখেছে আর যারা তাজমহল দেখে নাই। পৃথিবীতে সব মানুষকে এভাবে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। আপনারা দেখছেন আমার সামনে দিলীপবাবু আছেন। বাংলাদেশে আপনারা কয়েক হাজার দিলীপ পাবেন। কেউ বলবে, বাংলাদেশের মানুষ আজ দুই ভাগে বিভক্ত। যাদের নাম দিলীপ আর যাদের নাম দিলীপ নয়। চাইলে তো এরকম ভাগাভাগি আপনি করতেই পারেন।

এদেশের মানুষ কেউ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, আর কেউ এসলামের পক্ষে এরকম দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে — এটা একটা মিথ্যা প্রচারণা। আমরা সকলেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। এ হিশাবে আমরা সকলেই বাংলাদেশের পক্ষে। কিন্তু ধর্ম হিশাবে আপনার এসলাম ধর্মের পক্ষে হয়েও বাংলাদেশের পক্ষে থাকা যায়, বৌদ্ধধর্মের পক্ষে হয়েও বাংলাদেশের পক্ষে থাকা যায়। এটাই তো ছিল বাংলাদেশের বাণী।

আজ সেটাকে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য তারা বলছে দেশ আজ দুই ভাগে বিভক্ত। কারণ আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার চেষ্টা করছি। কিন্তু যারা যুদ্ধাপরাধ করেছিল তারা কত জন? তারা সংখ্যালঘু ছিল। আজকে রামুতে ব্যাপক মানুষের সাক্ষ্য, সারাদেশে মানুষের প্রতিবাদের ¯্রােত দেখে বোঝা যায়, যারা এই অপরাধ করেছে তারাও স্বীকার করতে পারছে না যে আমরা এই অপরাধ করেছি। তাদের লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে। ছদ্মবেশে এর ছবির সাথে ওর ছবির সাথে নিজের ছবি ছাপিয়ে তাদেরকে প্রমাণ করতে হচ্ছে আসলে এটা আমি বা আমরা করি নাই। এখানেই তাদের পরাজয়। আজ এই জনসভায় আপনি তাকে আহ্বান করছেন না। অর্থাৎ জনগণের বিচারের একটা পদ্ধতি আছে। জনগণের সেই বিচারের পদ্ধতিকে অক্ষুণœ রাখুন।  আমাদের দেশ ঐক্যবদ্ধ থাকবে। দেশ দুই ভাগে বিভক্ত হবে না। আমরা সবাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আছি। আমরা সবাই বাংলাদেশের পক্ষে আছি। কিন্তু যার যার ধর্ম সে সে রাখতেই পারি।

এই বৌদ্ধমন্দির পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণ সেই উদার ঐতিহ্যের একটু হলেও দেখিয়েছে। জানি মনের দাগ অত সহজে যাবে না। নদী মরে গেলেও রেখ রেখে যায়। এই স্মৃতি বহুদিন থাকবে। কিন্তু এই স্মৃতি থেকে আমরা একটাই শিক্ষা নেব — এই ধরনের ঘটনা যেন আর একবার না ঘটে। এটার যেন আবৃত্তি না হয়। সেটা করতে হলে আমাদের — আমি আগেই বলেছিলাম — ৪০ বছর লাগলেও যেমন বিচার করতে হবে, এটা বুঝতে যদি আমাদের ৮০ বছরও লাগে এই বিচার অব্যাহত রাখতে হবে।

আমাদের দেখতে হবে কোন জিনিশটা মানুষকে দুই ভাগে ভাগ করে। আর কোন জিনিশটা সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। আসুন আমরা ঐক্যের পথেই হাঁটি। এই বিভক্তির পথে যারা মানুষকে ধাবিয়ে দেয় তাদেরকে আমরা পরাজিত করি। তাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলি।

আমি আপনাদের আর বেশি সময় নেব না। ঢাকা থেকে মহান অতিথি যারা এসছেন তাদের কথা আপনারা শুনুন। আমার জন্মও আপনাদের কক্সবাজার জেলায়। আমার বাড়ি মহেশখালিতে। আমি চাঁটগাইয়াতেও বলতে পারতাম। কিন্তু আমি আমার অতিথি অভ্যাগত বন্ধুদের সৌহার্দ্যরে জন্য বাংলাতেই বললাম। তো অঁনারা বেয়াজ্ঞুনে ভালা থাইক্কন। আসসালামুলাইকুম। নমস্কার।

অনুলিখন: মুহাম্মদ তাসনিম আলম

 

২৩ নবেম্বর ২০১৩, সর্বজন: নবপর্যায় ২৮

Leave a Reply