ফরহাদ মজহারের বোমা অথবা রেটরিক প্রসঙ্গে

প্রবীণ কবি ও বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার সম্প্রতি একটি টকশোযোগে (একুশে টিভি, ২৮ অক্টোবর রাত) কিছু কথা বলিয়াছেন যাহাতে দেশের বুদ্ধিজীবী–বিশেষ সাংবাদিক–সমাজ আপত্তি জানাইয়াছেন। তিনি নিজেও প্রকারান্তরে স্বীকার করিয়াছেন যাহা তিনি বলিয়াছেন তাহা বলাটা উচিত কাজ হয় নাই। ব্যাখ্যা দিয়াছেন তিনি যাহা বলিয়াছিলেন তাহা নিছক কথার কথা বা রেটরিক। যাহা একজনের কাছে কথার কথা তাহা অন্যের গায়ে ঢিল আকারে পড়িতে পারে–এই সত্যটা উপকথা আকারেও সমাজে বিরাজ করে। তিনি পরোক্ষে হইলেও এই সত্য স্বীকার করিয়াছেন। তাহাতে তিনি সাধুবাদ পাইবেন।

গত ২রা নবেম্বর একটি দৈনিক পত্রিকাযোগে (দৈনিক যুগান্তর) তিনি আমার মতো এক নগণ্য ব্যক্তিকে আক্রমণ করিয়া বসিয়াছেন। অভিযোগ করিয়াছেন আমি তাঁহার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনিয়া তাঁহাকে হত্যা করিতে চাহিয়াছি। তিনি যে উষ্ণ হইয়াছেন তাহাতে আর সন্দেহ কি! আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলিয়া রাখিতেছি আমি তাঁহাকে হত্যা করিতে চাহি না, তাঁহাকে কেহ হত্যা করুক তাহাও চাহি না। প্রার্থনা করি তিনি চিরায়ুষ্মান হউন।

আমি অতীতে যেখানে প্রয়োজন তাঁহার সমালোচনা করিয়াছি। সমালোচনাই করিয়াছি, বোমা মারি নাই। কর্তৃত্বের বল কিম্বা গায়ের জোর ফলাই নাই। ওয়াকেবহাল সকলেই জানেন আমি যুক্তি প্রয়োগ করিয়াছি। আমার সমালোচনাকে তিনি নিছক ‘গালিগালাজ’ বলিতেছেন। আমার সমালোচনা ভুল হইতে পারে। কিন্তু আমি সমালোচনার হাতিয়ারকে কখনোই হাতিয়ারের সমালোচনা দিয়া দায় সারি নাই। ফরহাদ মজহার নিঃসন্দেহে আমার বক্তব্য পছন্দ করেন নাই। কিন্তু একই সাথে সেই বক্তব্যের আলোচনা করা তিনি প্রয়োজনও মনে করেন নাই। আমাকে তিনি হেয় করিয়াছেন।

একাত্তর টিভি আমাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন আগের দিন একুশে টিভির অনুষ্ঠানে ফরহাদ মজহার যাহা বলিয়াছেন তাহার বিষয়ে আমার বক্তব্য কি? আমি বলিয়াছিলাম ফরহাদ মজহার শিশুও নহেন, পাগলও নহেন সুতরাং তিনি যাহা বলিয়াছেন তাহার দায় তাঁহাকেই লইতে হইবে। গণতন্ত্রে বাক-স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার বলিয়া স্বীকৃতি পাইয়াছে। মনে রাখিতে হইবে এই স্বাধীনতা অবাধ বা অসীম নহে। আমার বাক-স্বাধীনতার সীমা অন্য নাগরিকের বাক-স্বাধীনতা হরণ করিবার সুবিধা পর্যন্ত প্রসারিত হইতে পারে না। একালের উদারনৈতিক বা স্বাধীনতা ব্যবসায়ী গণতন্ত্রের সংজ্ঞার মধ্যেই এই সীমার কথা বলা আছে। বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানের ৩৯(২) অনুচ্ছেদের দোহাই দিয়া আমি এই বক্তব্য সমর্থন করিয়াছিলাম।

কথাটা পরিষ্কার করিবার জন্য আরও দুই কথা বলিতে আমি বাধ্য হইয়াছিলাম। যাহাকে বলা হয় ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা’ তাহার কিন্তু কোন সীমা নাই। বাংলাদেশের হাল সংবিধানের ৩৯(১) অনুচ্ছেদ এই প্রস্তাবেরই প্রকাশ। বিপরীত বিচারে দেখা যায়, বাক স্বাধীনতা বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রভৃতি মৌলিক অধিকার নানান সীমার মধ্যে বাঁধা থাকে। এই প্রসঙ্গেই কথা ওঠে বাক-স্বাধীনতার অপব্যবহার বা সীমালঙ্ঘন শুদ্ধ অপর নাগরিকের বিরুদ্ধে কৃত অপরাধ এমন নহে। এই অপরাধ গোটা জাতি বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও সংঘটিত হইতে পারে। ফরহাদ মজহার গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে পটকা (বা ককটেল) মারা পর্যাপ্ত নহে মনে করেন। গণমাধ্যমে হামলা পরিচালনা পাবলিক অর্ডার বা রাষ্ট্রীয় শান্তিভঙ্গের শামিল। ইহার অর্থ রাষ্ট্রদ্রোহিতা বটে। দেশের প্রায় সকল মানুষই তাঁহার এই বক্তব্যের নিন্দা করিয়াছেন। বলিয়াছেন এই বক্তব্য বেপরোয়া, এই বক্তব্য দুর্ভাগ্যজনক। আমিও বলিয়াছি। কারণ অন্যায়কে অন্যায় বলিতেই হইবে। দুর্ভাগ্যের মধ্যে তিনি আমাকেই যাহাকে বলে ‘চিহ্নিত’ করিয়াছেন। হামলার ‘টার্গেট’ করিয়াছেন।

যুগান্তরে প্রকাশিত লেখায় ফরহাদ মজহার বলিতেছেন ‘গণমাধ্যমের সমালোচনা করলে সেটা কিভাবে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হয় সেই পা-িত্য বোঝার ক্ষমতা আমার নাই’। তিনি এখানে সত্য কথা বলেন নাই। গণমাধ্যমের সমালোচনা করিলে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হইবে কেন? কেহ তো সেই কথা বলে নাই। গণমাধ্যম বা গণমাধ্যম কর্মীর উপরে বোমা ছুঁড়িলে দুই ধরনের অন্যায় হয়। ইহাতে যাহাকে মারা হইতেছে তাহার বাঁচিবার অধিকার হরণ হয়। আর দুই নম্বরে ইহাতে ‘নৈরাজ্য’ সৃষ্টি হয়। সমালোচনার হাতিয়ারের জায়গায় ফরহাদ মজহার হাতিয়ারের সমালোচনা প্রয়োগ করিতে বলিয়াছেন। বোমা মারিতে উস্কানি দিয়াছেন। ইহাতেও যদি অপরাধ না হইয়া থাকে তবে আমার কোন বক্তব্য থাকিতে পারে না। তিনি আবারও কথার হেরফের করিতেছেন। মানুষ মাত্রেই ভুল করিতে পারে। তিনি ভুল স্বীকার করিলেই পারেন। ক্ষমা চাহিবার অধিকার তাঁহারও আছে।

কিন্তু একটা প্রশ্ন থাকিয়া যায়। ‘গণমাধ্যম’ কোন পদার্থ? তাহার মালিকানার প্রশ্নটি অবশ্যই অবান্তর নহে। কিন্তু আমরা কথা বলিতেছি গণমাধ্যমের কর্মী ও তাহাদের কর্তব্য লইয়া। যুদ্ধক্ষেত্রেও দূত, সাংবাদিক আর চিকিৎসক অবধ্য। যাহারা তাঁহাদিগকে বধ্য মনে করেন তাহারা সভ্যতার সামান্য নিয়ম লঙ্ঘন করেন। কবি ফরহাদ মজহার যদি সেই ধরণের কাজে উস্কানি না দিয়া থাকেন তবে তাঁহার কোন অপরাধই হয় নাই। কিন্তু কোটি দর্শক যাহা দেখিয়াছেন ও শুনিয়াছেন তাহাতে অপরোক্ষে প্রকাশ হইয়াছে তিনি কয়েকটি গণমাধ্যমকে পরিষ্কার ভাষায় ‘সন্ত্রাসী’ বলিয়াছেন। তাহার ভাষা ছিল বেপরোয়া, দায়িত্বজ্ঞানহীন। এখন তিনি বলিতেছেন, উহা ছিল কথার কথা, রেটরিক।

রেটরিক প্রয়োগের অধিকার তাঁহার যদি থাকে, অন্যের থাকিবে না কেন? তিনি লিখিয়াছেন ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার শাস্তি মৃত্যুদ-’। এই কথাও অর্ধসত্যের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কে না জানে পরাধীন যুগে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বিদেশি দখলদার রাষ্ট্র এক বৎসরের সশ্রম কারাদ- দিয়াছিল। অপরাধ ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’। বলা নিষ্প্রয়োজন রাষ্ট্রদ্রোহিতার শাস্তি নানা প্রকার হইতে পারে। মৃত্যুদ-ও অকল্পনীয় নহে। প্রশ্নটা হইতেছে জবাবদিহিতার। শাস্তির নয়। জবাব পাইবার অধিকার আছে আমাদের। কারণ তিনিই আমাদের হত্যা করিবার প্ররোচনা দিয়াছেন। আমরা দিই নাই। রাষ্ট্র বলিতে রাজনৈতিকভাবে সংঘবদ্ধ ‘জনগোষ্ঠী’– বা আজকালকার ভাষায় ‘জাতি’– বুঝায়। নিঃসন্দেহে এই পা-িত্য বুঝার ক্ষমতা তাঁহার আছে। আর যদি না থাকে তবে তিনি ক্ষমার যোগ্য। কেননা অবুঝ লোকের কোন অপরাধ নাই।

ফরহাদ মজহার যে বিদিশা হইয়াছেন–মানে দিশা হারাইয়াছেন–তাহার আরেক প্রমাণ দেখুন। তিনি আমাকে ‘রাজসাক্ষী’ বলিয়াছেন। ‘রাজসাক্ষী’ কাহাকে বলে? যাহারা একযোগে অপরাধ করে তাহাদের কেহ যদি সহযোগীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়া নিজের অপরাধের দ- মওকুফ করাইয়া লয় তাহাকেই লোকে ‘এপ্রুবার’ বা রাজসাক্ষী বলে। এমনই এতদিন জানিতাম। এখন তিনি শিক্ষা দিতেছেন ‘টেলিভিশন টকশোর বরাতে রাজসাক্ষী’ হওয়া যায়! নাকি তিনি প্রকারান্তরে আমাকেও ‘অপরাধী’ বলিতেছেন!

বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার আমার বাক্য ছাড়াইয়া গিয়াছেন। প্রায় বর্ণবাদী ভাষায় আমাকে আমার ‘মুখভঙ্গির মধ্যে’ আবিষ্কার করিয়াছেন তিনি। আমার সমালোচনাকে বিচার না বলিয়া তিনি রাজসাক্ষীর জবানবন্দী ঠাওরাইয়াছেন। বলিয়াছেন আমি তাঁহাকে ‘গালিগালাজ’ করিয়াছি, শাস্তি দিতে চাহিয়াছি। তাঁহার লেখায় সকলেই পড়িয়াছেন এই কথাগুলি: ‘টিভিতে তার মুখভঙ্গির মধ্যে আমাকে রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক যন্ত্রের দ্বারা শাস্তি দেয়ার জিঘাংসা দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। তার চোখে-মুখে যে হিংস্রতা ও প্রতিহিংসাপরায়ণতা ফুটে উঠেছে তাতে আমি অবাক না হয়ে পারিনি।’

এই কথাগুলি পড়িয়া আমার ধারণা হইয়াছে তিনি আমার বাক্য কানে শোনেন নাই, চোখ ও মুখের ভঙ্গি দেখিয়াছেন মাত্র। এহেন হিতাহিতজ্ঞানশূন্যতা কাহারও জন্য কল্যাণকর নহে।

কবি ফরহাদ মজহারকে আমি চিনি আজ কম করিয়া হইলেও ছত্রিশ বছর হইবে। তাঁহার মনীষা ও কবিত্বের তারিফ আমি করিয়াছি বহুবার। যেখানে প্রয়োজন সমালোচনা করিয়াছি। তিনি কোনদিন জওয়াব দেওয়ার দরকার বোধ করেন নাই। না দিবার অধিকার তাঁহার আছে। কিন্তু তাঁহার রাজনীতির সহিত–বিশেষ করিয়া বর্তমানে তিনি যে রাজনীতির দিকে আগাইতেছেন–তাহার সহিত আমার ভিন্নমত আছে। বিশেষ করিয়া গত ২০০৫ সালে তিনি যখন জে.এম.বি. নামক রাজনৈতিক আন্দোলনের সমর্থনে কিছু লেখা লিখিলেন তখন আমি তাঁহার সংস্রব পরিপূর্ণভাবে ত্যাগ করি। সম্প্রতি তিনি যুদ্ধাপরাধের বিচার লইয়া দেশে যে আন্দোলন চলিতেছে তাহার বিরোধিতা করিলে আমি নিরব থাকাটা আর সমীচীন মনে করি নাই।

এই লেখায় আর নতুন কথা তুলিতে চাহি না। যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে শাহবাগে সমবেত তরুণ-তরুণীদের দাবিকে নস্যাৎ করিয়া তিনি একাধিকবার বলিয়াছেন ইহারা ‘পাবলিক লিঞ্চিং’ চাহিতেছে। অথচ শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ অপরাধীদের বিচারের দাবি ছাড়া আর কোন দাবির মতো দাবিই তোলে নাই। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ফরহাদ মজহার এখন যে অবস্থান নিতেছেন তাহা–সংক্ষেপে বলিতে–বিস্ময়কর। যেন ফুলের শয্যায় বসিয়া দেশটা স্বাধীন হইয়াছে।

মুক্তিযুদ্ধের পর পর প্রকাশিত একটি কবিতার বইয়ের উৎসর্গপত্রে কবি ফরহাদ মজহার লিখিয়াছেলেন, ‘রাখিস মা এ দাসরে মনে/ কেউ কি এমন রক্ত ঢালে!’ আর যাঁহারা এই রক্তপাত করিয়াছিলেন আজ তাঁহাদেরই গাত্ররক্ষার জন্য তিনি ‘ইসলামের নৈতিক ও দার্শনিক আদর্শ’ আবিষ্কার করিতেছেন। এই দুঃখ রাখিবার পাত্র কোথায় পাই!

বাংলাদেশের ত্রিসীমানা হইতে দখলদার পাকিস্তানের শেষ সৈনিকটি যেদিন অপসারিত হইয়াছিল সে দিনই বাংলাদেশ স্বাধীন হইয়াছিল–একথা আমরা একদিন ভাবিয়াছিলাম। আজ স্বীকার করিয়া বলিতে হইবে–আমরা ভুল ভাবিয়াছিলাম। দেশকে সত্য সত্য স্বাধীন করিতে হইলে পাকিস্তানী যুগের বিভেদমূলক ‘কদর্য’ সাম্প্রদায়িক মানসিকতাও অপসারিত করিতে হইবে।

দেখা যাইতেছে দেশ স্বাধীন করার সংগ্রাম আজও শেষ হয় নাই। বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার এখন সাম্প্রদায়িক বিভেদের দার্শনিক আদর্শ প্রচার করিতেছেন। বোমা মারার নৈতিকতাকে তিনি ইসলামের নামে জাহির করিয়া খোদ ইসলামেরই অমর্যাদা করিতেছেন।

ঢাকা
৫ নভেম্বর ২০১৩

 

৫ নভেম্বর ২০১৩, bdnews24.com, মতামত বিশ্লেষণ

Leave a Reply