রাষ্ট্রচিন্তা: গণতন্ত্র ও ফ্যাসিতন্ত্র

রাষ্ট্রনায়কেরা কিভাবে দেশ শাসন করেন আর কিভাবে তাহাদের শাসন করা উচিত তাহা লইয়া আমি আলোচনা করিয়াছি। সামাজিক অবস্থা ও পদবিচার করিলে স্বীকার করিতে হইবে আমি নিচুপদের ও অধস্তন শ্রেণির লোক। তাই বলিয়া আমার প্রচেষ্টা আশা করি ধৃষ্টতা বলিয়া গণ্য হইবে না। কেননা দেশগ্রামের ছবি আঁকিতে হইলে যাহা করিতে হয় এখানেও তাহাই করিতে হইবে। যাঁহারা পাহাড়পর্বত আর মালভূমির নকশা আঁকেন তাঁহারা নিচু জায়গায় দাঁড়াইয়া থাকেন আর সমতল জমিনের নকশা আঁকিতে হইলে পাহাড়চূড়ায় উঠিয়া যান। একই কারণে সর্বসাধারণের স্বভাব চরিত্র কি বুঝিতে হইলে আপনাকে যাইতে হইবে রাষ্ট্রনায়কের জায়গায় আর রাষ্ট্রনায়কদের স্বভাবচরিত্র বুঝিতে হইলে আপনাকে হইতে হইবে সর্বসাধারণেরই একজন।

— নিকোলো মেকিয়াভেলি

লড়াইয়ের মাঝে এই ধরনের প্রস্তাবের মূল্য কম ধরিয়া লওয়া কিন্তু ভুল কাজ হইবে। এই সব প্রস্তাবের অনুবলে আমরা কতগুলি চিরাচরিত ধ্যানধারণার উচ্ছেদ ঘটাইতে পারি। এইসব ধ্যানধারণার মধ্যে আছে ঐশ্বরিক ক্ষমতা, অলৌকিক প্রতিভা, অক্ষয় কাব্য (‘চিরকেলে বাণী’, ‘কালাম’) এবং মরমিয়া ভাব (‘রাহসিকতা’) ইত্যাদি। এই সমস্ত ধ্যানধারণার বেপরোয়া ব্যবহার ইতিহাসের ঘটনাবলীকে এমনভাবে সাজায় যাহাতে ফ্যাসিতন্ত্রের পথ সুগম হয়। এই মুহূর্তে এই ধরনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ একপ্রকার অসম্ভব হইয়া দাঁড়াইয়াছে।

— বাল্টার বেনিয়ামিন

দিনকয়েক আগে আমি ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আহমদ ছফা’ নাম রাখিয়া একটি নাতিদীর্ঘ নিবন্ধ এই জায়গায় [বিডিনিউজ২৪ডটকম] প্রকাশ করিয়াছিলাম। কেহ কেহ সদয় হইয়া কয়েকটি প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করিয়াছেন। তাই আজ এই অতিরিক্ত নিবন্ধটি লিখিতে হইতেছে। কেহ বলিয়াছেন নিবন্ধটি পড়িয়া তিনি কিছুই বুঝিতে পারেন নাই। আর কেহ বা জানাইয়াছেন এই নিবন্ধে কোন নতুন কথা নাই। কেহ কেহ আহমদ ছফা বিষয়ের নিবন্ধে ফরহাদ মজহারের কবিতা আলোচনা করাটা পছন্দ করেন নাই। এই তিন প্রকারের প্রতিক্রিয়াতেই কিছু না কিছু সত্য আছে।

নিজের লেখার দুর্বলতা প্রথমেই স্বীকার করিতেছি। দ্বিতীয়ত নতুন কথা বলিবার জন্য আমি লিখিতেছি না। জানা কথাও মাঝেমধ্যে সর্বসাধারণের উদ্দেশে প্রচার করিতে হয়। এই জায়গায় আমি দীনহীন নবীন লেখক। তবে নতুন কথা বলার ক্ষমতা আমার বিশেষ নাই। তবু সম্পাদক মহাজনেরা আমাকে কেন জানি নিতান্ত অপত্য স্নেহ করেন বলিয়া তাহাদের প্রশ্রয় পাই। তিন নম্বর কথা আমার মূল বক্তব্য ছিল মহান লেখক আহমদ ছফাকে ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ’ বলা যায় কিনা এই প্রশ্নের সহিত জড়ানো। তিনি সমাজের কোন শ্রেণি হইতে আসিয়াছেন তাহা বড় কথা নহে। অথচ আমি যদি ভুল বুঝিয়া না থাকি ফরহাদ মজহার বলিয়াছেন আরশোলাতুল্য মানুষের ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ’ হইবার অধিকার নাই।

আমার সবিনয় নিবেদন এই যে আহমদ ছফা সেই অধিকার অর্জন করিয়াছিলেন নিজের সাধনায়। শুদ্ধ অধিকার কেন, আমি বলিব তিনি সিদ্ধিও লাভ করিয়াছিলেন। যাহারা অনুগ্রহ করিয়া আমার লেখাটি পাঠ করিয়া সাধুবাদ জানাইয়াছেন তাহাদের কর্জ না হয় শোধ নাই-বা করিলাম।

আজিকার লেখায় আমি অধিক যাইতে চাহিতেছি। আমার প্রস্তাব মহাত্মা আহমদ ছফা যে ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ’ ছিলেন সে সত্যে সন্দেহ রাখা চলে না। তিনি ছিলেন যাহাকে লোকে বলে নয়া গণতান্ত্রিক সেই ধরনের রাষ্ট্রচিন্তাবিদ। ‘নয়া গণতান্ত্রিক’ কথাটা আমি জানিয়া শুনিয়াই এস্তেমাল করিলাম। বর্তমান যুগে গণতন্ত্রের পরম শত্রু ফ্যাসিতন্ত্র। এই ফ্যাসিতন্ত্রবাদীরাও নিজেদের আজিকালি গণতান্ত্রিক বলিতে কসুর করেন না। আর দুনিয়া জুড়িয়া গণতন্ত্র কথাটা এতদিনে তো ধরতাই বুলি হইয়া দাঁড়াইয়াছে। চিনদেশের মহান নেতা মাও জেদং একসময় তাই ত্যক্তবিরক্ত হইয়া ‘নয়া গণতন্ত্র’ কথাটি চালু করিয়াছিলেন। ‘নয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচিন্তা’ কথাটি তাই মোটেও আনকোরা কথা নহে।

আমার একটি বক্তব্য ছিল যে আহমদ ছফার সাধনা বুঝিতে হইলে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের সাধনা আলোচনা করাটা অপ্রাসঙ্গিক নহে। আলাউদ্দিন খান যে ধরনের সামাজিক ভূমি হইতে গজাইয়াছিলেন আহমদ ছফাও কমবেশি একই ধরনের সামাজিক জমি হইতে উঠিয়াছিলেন। একজনের জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়া আর অন্যজনের বাড়ি গাছবাড়িয়া। এই মিলটা একান্তই আপতিক! একজনের সাধনা সঙ্গীতে, আরজনের চিন্তার বিষয় জাতি বা রাষ্ট্র– এইটাও ধরিলাম আপতিক। কিন্তু যাহা দুইজনের আকাশেই ধ্রুবতারার জ্যোতির মতন জ্বলিতেছে তাহার নাম ‘গণতন্ত্র’। আলাউদ্দিন খান ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের ধারায় ‘গণতান্ত্রিক মনীষা’ বা– মেকিয়াভেলির কথা ধার করিয়া বলিতে– ‘গণতান্ত্রিক বীরত্ব’ ছড়াইয়া দিয়াছিলেন।

এই সত্যটা আহমদ ছফা জানিতেন। যে বছর তিনি ‘সুরসম্রাটের মৃত্যুস্বপ্ন’ নামক অধ্যায়টি লিখিয়াছিলেন সেই বছরই– মোতাবেক ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৯৮– ‘আচার্য আলাউদ্দিন খান’ নাম রাখিয়া ক্ষীণকায় একটি নিবন্ধও পত্রস্থ করিয়াছিলেন। এই প্রবন্ধটির উল্লেখ না করিয়াই আমি আমার ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আহমদ ছফা’ নিবন্ধটি লিখিয়াছিলাম। কবুল করি ইহাতে আমার গোস্তাকি হইয়াছে। পাঠিকা আশা করি দয়া করিবেন।

আহমদ ছফা লিখিয়াছিলেন, ‘উস্তাদ আলাউদ্দিন খান নামটি পূর্ণতার সাক্ষাৎ প্রতীক।’ সেই পূর্ণতার তিনটি দিক তাঁহার নজরে আসিয়াছে। এক নম্বরে আলাউদ্দিন খান ছিলেন শিল্পী-সঙ্গীতশিল্পী। মহাত্মা ছফা লিখিয়াছেন:

‘আলাউদ্দিন খান সাহেব তাঁর দীর্ঘ জীবনের দুশ্চর তপস্যায় মিয়াঁ তানসেনের ঘরানার সঙ্গীতকে শুধু অধিগতই করেননি, অন্যান্য প্রচলিত ঘরানাগুলোর মর্মবস্তুর সঙ্গে সংশ্লেষ-বিশ্লেষ ঘটিয়ে সঙ্গীতের কান্তিকে অধিকতর উজ্জ্বল এবং ব্যঞ্জনার মধ্যে অধিক দিব্যতা সঞ্চার করে সুরকে এমন দুরধিগম্য উচ্চতায় স্থাপন [করেছেন], যেখানে সুর ব্যক্তিগত অর্জনের সঙ্কীর্ণ সীমারেখা অতিক্রম করে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ার একটা অমোঘ দাবি তুলে ধরল।’

আলাউদ্দিন খানের পূর্ণতার দ্বিতীয় দিক তাঁহার সাধকভাব। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন:

‘নিজে সিদ্ধিলাভ করা এক কথা, কিন্তু নিজের সিদ্ধিকে অন্যের মধ্যে সঞ্চারিত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। সঙ্গীতের ইতিহাসে অনেক অসাধারণ প্রতিভার সন্ধান পাওয়া যায়, যাঁরা সুন্দরের আগুনে নিজেদের নিঃশেষ করতে সক্ষম হয়েছিলেন, কিন্তু নিজের দাহিকাশক্তিকে অন্যের মধ্যে সঞ্চারিত করা তাঁদের সাধ্যসীমার মধ্যে ছিল না। সঙ্গীতে অপরকে দীক্ষিত, যোগ্য এবং পারঙ্গম করে তোলার জন্য বিশেষ চরিত্রশক্তির প্রয়োজন। প্রকৃতির দিক থেকে সাধক না হলে এই চরিত্রশক্তি অর্জন করা অসম্ভব।’

আলাউদ্দিন খানের এই চরিত্রশক্তি কোথা হইতে আসিয়াছিল তাহার একটি সূত্রও আহমদ ছফা উল্লেখ করিয়াছেন। আমরা তাহার আলোচনা করিব পরে। আপাতত এইটুকু বলিলেই চলিবে যে আলাউদ্দিন খানের মধ্যে শিল্পী আর সাধক যুগপৎ এক জায়গায় সমবেত হইয়াছিলেন।

এইখানেই কিন্তু তাঁহার কীর্তির শেষ নহে। আলাউদ্দিন খানের সর্বশেষ কীর্তির পরিচয় দিতে বসিয়া আহমদ ছফা ‘রীতিমত একটি বিপ্লব’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করিয়াছেন। আমরা সবিনয়ে বলিব এই বিপ্লবেরই অপর নাম ‘নয়া গণতন্ত্র’। তো ‘নয়া গণতন্ত্র’ কি বস্তু? ইহা বুঝাইয়া বলিতে হইলে আবারো একটু লম্বাচওড়া উদ্ধৃতি শুনাইতে হয়। আহমদ ছফা বেশ লিখিয়াছেন,

‘আলাউদ্দিন খান সাহেবের আচার্য-জীবনের অভিনবত্ব এইখানে যে, তিনি মাইহারে সর্বপ্রথম সর্বসাধারণের জন্য ধ্রুপদ সঙ্গীতের দুয়ার উন্মুক্ত করে দিলেন। ধ্রুপদ সঙ্গীত প্রসারের ইতিহাসে খান সাহেবের এই সাহসী পদক্ষেপ রীতিমত একটি বিপ্লব বললে অধিক বলা হবে না।’

এইখানে বিপ্লবটি কোথায় সমঝাইতে হইলে ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে হাতেখড়িটা অন্তত প্রয়োজন। আহমদ ছফা অতি সংক্ষেপে তাঁহার সার লিখিয়াছেন:

‘এ [যাবত] ধ্রুপদ সঙ্গীত রাজা-বাদশাহদের দরবারে চর্চিত হয়ে আসছিল। সামন্তপ্রভুদের মর্যাদার স্মারক হিসাবে ধ্রুপদ সঙ্গীত চিহ্নিত হয়ে আসছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই সঙ্গীতের চল একেবারে ছিল না বললেই চলে। এই সঙ্গীতের যাঁরা চর্চা করতেন, তাঁরা নিজেদের ঘরানার মধ্যেই সঙ্গীতচর্চা সীমাবদ্ধ করে রাখতেন। আপন পুত্রকন্যা এবং আত্মীয়স্বজনের বাইরে অন্য কোন সঙ্গীত শিক্ষার্থীকে সঙ্গীত শিক্ষা দিতেন না। অনেক সময় জীবিকার তাগিদে বাধ্য কিংবা তাঁদের পৃষ্ঠপোষক কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে বাইরের লোককে সঙ্গীত শিক্ষা দিলেও সঙ্গীতের বিশুদ্ধ অংশটি আপন ঘরানার লোকদের জন্য চোখের মণির মত সযত্নে গোপন করে রাখতেন। ফলে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বাইরে ধ্রুপদ সঙ্গীত কখনো বিস্তারিত এবং প্রসারিত হতে পারত না।’

ভারতবর্ষের ধ্রুপদী সঙ্গীত যে পরে সারা দুনিয়ায় ছড়াইয়া পড়িয়াছে তাহার পিছনে আলাউদ্দিন খান সাহেবের একক কৃতিত্বের কথা প্রায় সকলেই স্বীকার করিয়াছেন। কিন্তু আরও একটি কৃতিত্বের কাহিনী আহমদ ছফার বিচারে স্বীকৃতি পাইয়াছে। এই দিকটাকেই আমরা বলিয়াছি ‘নয়া গণতান্ত্রিক’। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন,

‘আলাউদ্দিন খান সাহেবের আচার্য জীবনের মহত্তম কীর্তি হল, সামন্ত সংস্কৃতির ভেতরে ওতপ্রোত নিমজ্জিত সঙ্গীতের এই সুন্দর ধারাটিতে কোনরকম নান্দনিক বিচ্যুতি না ঘটিয়ে আধুনিক গণতান্ত্রিক যুগের উপযোগী করে তার নতুন জন্ম সম্ভাবিত করেছিলেন [তিনি]।’

এই কীর্তিটির পিছনে আলাউদ্দিন খান সাহেবের সাধকধর্ম মোটেও সক্রিয় ছিল না এমন কথা বলা আমাদের লক্ষ্য নহে। তবে কিনা বলিব এই কীর্তি ছিল সচরাচর প্রচলিত সাধকধর্মের অধিক। আহমদ ছফা বলিয়াছেন,

‘সুপ্রাচীন ধ্রুপদ সঙ্গীতের একটি বিশেষ ধারাকে আলাউদ্দিন খান সাহেব যখন তাঁর শিষ্য-শিষ্যাদের শিখিয়ে পড়িয়ে লায়েক করে তাদের মাধ্যমে প্রচারিত করতে কৃতসঙ্কল্প হলেন, খান সাহেবকে [তখন] সম্পূর্ণ নতুন একটি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হল।’

এই চ্যালেঞ্জের অবসানও একদিনে হয় নাই। ‘সঙ্গীতের ক্ষেত্রে,’ আহমদ ছফা লিখিতেছেন,

‘বিশেষ একটি গোষ্ঠীর মনোভাব, একচেটিয়াপনার অবসান ঘটানোর জন্য খান সাহেবকে জীবনভর সংগ্রাম করে যেতে হয়েছে।’

আমি যখন ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আহমদ ছফা’ নিবন্ধটি লিখিতে বসিয়াছিলাম তখন– পাঠিকা বিশ্বাস নাও করিতে পারেন– এই আশ্চর্য প্রবন্ধটির কথা আমার মনেও ছিল না। শুধুমাত্র রাজু আলাউদ্দিনের সহিত সাক্ষাৎকার আর ‘সুরসম্রাটের মুত্যুস্বপ্ন’ পাঠ করিয়া আমি লিখিতে বসিয়াছিলাম। যাঁহারা ভালমন্দ প্রতিক্রিয়া পাঠাইয়াছেন তাঁহাদের ঋণ স্বীকারপূর্বক নিবেদন করিতেছি ‘আচার্য আলাউদ্দিন খান’ পাঠ করিয়া বুঝিলাম– নতুন করিয়া বুঝিলাম– দুইজনের মধ্যে মিলটা অনেকান্ত। দুইজনই পূর্ব বাংলার শ্যামল জমিনে জন্মাইয়াছেন– এহ বাহ্য! অন্তরের বাজনায়ও দুইজনের মিল পাওয়া যায়। দুইয়ের চিন্তায় নয়া গণতন্ত্র বা– আহমদ ছফার ভাষায়– ‘আধুনিক গণতন্ত্র’ হাজির।

আহমদ ছফা অকারণে লেখেন নাই, ‘এই আশ্চর্য মানুষটির জীবন এবং তাঁর সাধনার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে একটা পবিত্র আতঙ্কের স্রোত শিরদাঁড়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। মানুষের ইচ্ছাশক্তি মানুষকে কতদূরে নিয়ে যেতে পারে, এ মানুষটির জীবনই তার এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।’

আহমদ ছফার শেষ আশাটি পূর্ণ হয় নাই। তাঁহার আশা ছিল আলাউদ্দিন খানের জীবন উদ্যাপন করিয়া একটি উপন্যাস লিখিবেন। এই উপন্যাসটির কথা স্মরণ করিয়াই তিনি রাজু আলাউদ্দিনকে বলিয়াছিলেন,

‘আমি যদি গোটা জীবন ব্যয় করে একটা উপন্যাস লিখতে পারতাম…।’ আহা, যদি পারিতেন! তিনি বলিয়াছিলেন, ‘তাঁকে নিয়ে উপন্যাস লেখার প্রস্তুতি আমি নিয়ে ফেলেছি। এখন বসলে আমি ১৫ দিনের মধ্যে শেষ করতে পারি।’

এখন আর কি করিতে পারি আমরা! সেই উপন্যাস-দুগ্ধের স্বাদ একটি ক্ষুদ্রকায় নিবন্ধের ঘোলেই মিটাইতে হইবে। আহমদ ছফার নিবন্ধে পাঠ করিতে হইবে এই বাক্য:

বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার প্রত্যন্তবর্তী শিবপুর গ্রামের আলম নামে যে কিশোরটি সঙ্গীত-সুন্দরের আবেদনে ঘরবাড়ি ছেড়ে মা-বাবা, ভাইবোনের মায়া-মমতার বন্ধন ছিন্ন করে নিরুদ্দেশের পথে বেরিয়ে পড়েছিল, সেই তীর্থপথিকের যাত্রার শেষ প্রান্তটিতে আমরা দেখতে পাব এমন এক দিব্যপুরুষের আবির্ভাব যার সর্বাঙ্গে মাখানো রয়েছে আশ্চর্য বিভূতি এবং ললাটদেশ থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে সাফল্যের স্বর্ণরশ্মি।

আহমদ ছফার ‘আচার্য আলাউদ্দিন খান’ নিবন্ধটি তাঁহার জীবনের শেষ ইংরেজি বছর–অর্থাৎ ২০০১ সাল–নাগাদ প্রকাশিত একটি গ্রন্থে সংকলিত হয়। গ্রন্থটির নাম ‘উপলক্ষের লেখা’। সেই গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি একটি ব্যক্তিগত কৈফিয়তও দিয়াছিলেন। পাঠিকা অনুমতি করিবেন আশা করি। তাহা হইতে খানিক তুলিতেছি। এই গ্রন্থের বিষয়বস্তু প্রসঙ্গে আহমদ ছফা জানাইলেন:

‘আমাদের এই দেশে সকলে নিজের ঢাক ছাড়া অন্য কারোও ঢাক বাজায় না। ব্যক্তিজীবনের পূর্ণতা সম্পর্কে আমাদের এই দেশের মানুষের সঠিক ধারণার অভাবের কারণে অনেক সময় তারা মারমুখী হয়ে প্রচার করে– আমি ছাড়া জগতে আর কারও অস্তিত্ব নেই। অন্যান্যদের অস্তিত্ব মনে মনে হত্যা করে একমাত্র আমাকেই জীবিত মানুষ প্রতিপন্ন করার উদগ্র আকাক্ষা আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে একটা পুঁতিগন্ধময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।’

আহমদ ছফা প্রশ্ন করিতেছেন, ‘অন্যের অবস্থান যেখানে নেই সেখানে আমার অবস্থান কোথায়?’’ তিনি মনে করেন, ‘‘আমার অবস্থান তখুনি গৌরবান্বিত প্রমাণিত হয় যখন আমি অকপটে অন্যদের অস্তিত্বের স্বীকৃতি দিতে পারি। অন্যকে গৌরব দিতে গেলে নিজেকে কিছু পরিমাণে হলেও ছোট করতে হয়। নিজেকে ছোট করার ক্ষমতা যার জন্মায়নি তার মধ্যে মহত্ব সন্ধান করা বৃথা।’

আমি দীনহীন মানুষ। ছোট মুখে বড় কথা বলা মানায় না। আমাদের দেশে কেন দুনিয়ার কোন দেশেই তাহা বরদাস্ত করা হয় না। প্রেমে পড়িলে কখনো পঙ্গুরও গিরিলঙ্ঘনের দুঃসাহস হয়। আমারো হয়তো হইয়াছে তাহাই। অপেক্ষাকৃত কম বয়সে আহমদ ছফার সহিত পরিচয় না হইলে হয়তো এই দুঃসাহস আমার হইত না। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের মধ্যে আমার মনে হয় আহমদ ছফা কিছু পরিমাণে হইলেও নিজের চরিত খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন। পাওয়াটা দোষের নহে। কারণ আমরা সকলেই কিছুটা দোসর খুঁজিয়া পাই নিজ নিজ উত্তমর্ণের মধ্যে।

‘আলাউদ্দিন খান সাহেব,’ আহমদ ছফা লক্ষ করেন, ‘একটা বিশেষ বয়স পর্যন্ত তাঁর বড় ভাই ফকির আফতাবউদ্দিনের সাহচর্য লাভ করেছিলেন। ফকির আফতাবউদ্দিন সাহেব একজন বড় মাপের সঙ্গীতশিল্পী এবং স্বভাবের দিক দিয়ে ছিলেন সাধক। খুব সম্ভবত আলাউদ্দিন খান সাধকসুলভ প্রকৃতিটি তাঁর জ্যেষ্ঠভ্রাতার কাছ থেকে পেয়েছিলেন। একই ব্যক্তির মধ্যে সাধক এবং শিল্পীর সমন্বয় ঘটার কারণে প্রতিভাবান সঙ্গীতশিল্পীদের মধ্যে যে সব বদগুণের প্রকাশ ঘটতে দেখা যায় আলাউদ্দিন খানকে সেগুলো স্পর্শও করতে পারেনি।’

আহমদ ছফা যদি অকালে এন্তেকাল না করিতেন তো– আমার বিশ্বাস– একখণ্ড আত্মচরিতও লিখিয়া যাইতেন। আহা, তাহা আর হইবার নহে। এক্ষণে আমাদের তৃপ্ত থাকিতে হইবে তাঁহার চিঠিপত্র আর নানা ক্ষুদ্রবৃহৎ নিবন্ধের ফাঁকফোকরে আত্মগোপন করিয়া থাকা আত্মকথা লইয়া। ‘উপলক্ষের লেখা’ গ্রন্থটির মধ্যে এই রকম একপ্রস্ত আত্মচরিতের খসড়াও আছে। ইহার নাম ‘রোগশয্যায় বিরচিত’।

এই লেখায় তিনি জানাইতেছেন ততদিনে তাঁহার বয়স ৫৩ বছর হইয়াছে। তাই ধরিয়া লইতেছি ইহাও ১৯৯৮ সালের লেখা হইতে পারে। এই লেখার এক অংশে তিনি জানাইতেছেন, ‘এটা আমার আত্মজীবনী না, পারিবারিক কাহিনীর অংশও নয়। তবু এক বিশেষ প্রয়োজনে উদ্বুদ্ধ হয়ে এই কাহিনী আমাকে লিখতে হচ্ছে। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, ‘আমার পিতার নাম মরহুম হেদায়েত আলী ওরফে ধনমিয়া। তিনি নিতান্ত সাধারণ অবস্থা থেকে শ্রম, ধৈর্য, সাহস ও সততার বলে নিজেকে একজন ভূমিবান সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং একটি প্রাচীন পরিবারের সম্মান অনেকাংশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন।’

বাবার ঋণস্বীকার করিতে গিয়া আহমদ ছফা এক জায়গায় কহিতেছেন, ‘যদিও লেখাপড়া করার বিশেষ সুযোগ তাঁর ঘটেনি, তথাপি তিনি অত্যন্ত বিদ্যোৎসাহী মানুষ ছিলেন। তিনি নিজের জমিতে মসজিদ এবং মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। যতদিন বেঁচে ছিলেন একহাতে সেই প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যয়ভার বহন করেছেন। তিনি আমাদের অঞ্চলে তাঁর বন্ধুদের নিয়ে যে প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, আমি সে বিদ্যালয়ের তৃতীয় ব্যাচের ছাত্র।’

খানিকক্ষণ পরে আবার তিনি পিতৃপ্রসঙ্গে ফিরিয়া বলিলেন:

‘আমার পিতার কাছে আমি আরো একটা বিশেষ কারণে ঋণী। আমাদের এলাকায় কমিউনিস্ট পার্টির কর্মতৎপরতা শুরু হলে তিনি ঝুঁকি নিয়ে আমাকে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের সঙ্গে কাজ করতে উৎসাহিত করতেন। দূরে সভা হলে আমার হেঁটে যেতে কষ্ট হত। তখন বাস রিকশা ছিল না। তিনি অনেক সময় [আমাকে] ঘাড়ে করে সভাস্থানে পৌঁছে দিয়ে আসতেন। আমার দুই পাঁচ মিনিট বক্তৃতা শোনার জন্য তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতেন। সভা শেষ হলে সঙ্গে করে নিয়ে আসতেন। হাঁটতে অসুবিধে হলে ঘাড়ে করে তুলে নিতে হত।’

একটা কথা পরিষ্কার। আহমদ ছফার রাষ্ট্রচিন্তার গোড়ায় পিতাজির একটা ঋণ ছিলই। এই ঋণ কেহ শোধ করার জন্য করে না। আহমদ ছফা তাহা শোধ করিয়াছিলেন জেল খাটিয়া। তিনি লিখিয়াছেন, ‘এই সময়ে আমাদের পরিবারে আরো একটা বিপর্যয় ঘটে যায়। পুকুরের পেছনের ঘাটে পা ফসকে গিয়ে [তিনি] সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যান এবং পঙ্গু অবস্থাতেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। সেই সময়ে আমি জেলে ছিলাম।’

এইবার ভাইয়ের ঋণ প্রসঙ্গ। আহমদ ছফার একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সৎভাই ছিলেন। তিনি ছিলেন শারীরিক কারণে রাতকানা। রাতকানা হওয়াই, দুর্ভাগ্যের মধ্যে, উঁহার একমাত্র দোষ ছিল না। তিনি এমনিতেও ছিলেন একটি আমড়া কাঠের ঢেঁকি বিশেষ। আহমদ ছফার নিজের কথায় বলি, ‘আমার অপদার্থ ভাইটির অনেক দোষ ছিল। ব্যবসা করলে গুনাহগারি দিতেন, মামলা করলে হারতেন, কিন্তু একটা জায়গায় অন্তরের বিশ্বাস ধ্রুব-নক্ষত্রের মত স্থির ছিল।’

কি সেই বিশ্বাস? আহমদ ছফা বয়ান করিতেছেন, ‘কি কারণে জানিনে তিনি বিশ্বাস করতেন আমি একজন বাঘের মত মানুষ। আমি তার অবর্তমানে পরিবারের সম্মান রক্ষা করব, ছেলেমেয়েদের মানুষ করব। মজার কথা হল তিনি অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করতেন এসব অলৌকিক কাণ্ড ঘটাবার ক্ষমতা আমার আছে। আমার বোকাসোকা ভাইটির মৃত্যুকালীন বিশ্বাসের সম্মোহনী শক্তিতে আমি অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম।’ আহা! ভাই বলে একটা কথা বাংলা ভাষায়ও আছে। ফকির আফতাবউদ্দিন না হোন, তবুও ভাই তো!

‘ছোটবেলা থেকেই,‘ আহমদ ছফা আরো জানাইতেছেন, ‘আমি অল্পস্বল্প লেখালেখি করতাম। এইজন্য পাড়ার মানুষ আমাকে ঠাট্টা করত, ভ্যাঙ্গাত। আমার ভাইটি তাদের সঙ্গে মারামারি করত এবং অনেক সময় নিজে জখম হত।’

ভ্রাতৃচরিত্র বিশদ করিবার ছলে আহমদ ছফা নিজের জীবনসাধনার গোড়ায় হাত দিয়েছেন এইভাবে:

‘সন্ধ্যা অন্ধতার কারণে বেশিদূর লেখাপড়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তিনি পদ্মাবতী, শহীদে কারবালা, সয়ফুল মুল্লুক বদিউজ্জামানের নির্বাচিত অংশ মুখস্থ গান করে পড়তেন। আমাদের চট্টগ্রামের বিরাট একটা অংশ মনে করত ‘আলাওল’ শব্দের অর্থ কবি। কেউ কবিতা লিখতে চেষ্টা করলে লোকে ঠাট্টা করে বলত অমুকের ছাওয়াল আলাওল বনার চেষ্টা করছে। আমার বড় ভাই মনে করতেন আমি একজন সত্যিকারের আলাওল। যে সব লোক আলাওল হয়, তারা সামান্য নয়, একেকজন নবী-পয়গম্বরের মত মানুষ।’

আমরা জানি– আশা করি আহমদ ছফাও এখানে আমাদের দলভুক্ত– আমাদের যুগে আর কোন নবী বা পয়গম্বর জন্মাইবেন না। এসলাম ধর্মের প্রবর্তক শেষ নবী হজরত মোহাম্মদের পবিত্র নামের কাছে আমরা আর কিছু না হৌক অন্তত এই একটি কারণেই কৃতজ্ঞ থাকিতে পারি। তিনি জানাইয়াছেন তাঁহার পরে আর কোন নবী বা পয়গম্বর আসিবেন না।

মানবজাতির শৈশবদোষ কাটিয়া গিয়াছে। আলহামদুলিল্লাহ! আহমদ ছফার সাধনা বিফলে যায় নাই। তাঁহার ভ্রাতার মৃত্যুকালীন বিশ্বাসও ব্যর্থ হয় নাই। আমাদের দেশে আহমদ ছফার তুলনা দিবার মতন দ্বিতীয় কোন মানুষ আজও পাওয়া যাইতেছে না।

আমার ক্ষমতায় নাই আহমদ ছফার যোগ্য প্রাপ্য প্রশংসা লিখি। তাই গঙ্গাজলেই এই গঙ্গাপুজার আয়োজন। আহমদ ছফা স্বয়ং লিখিয়াছিলেন, ‘মানুষ পর্বতও নয়, সমুদ্রও নয়। তথাপি জন্ম এবং মৃত্যুর সীমানা দিয়ে ঢাকা কোন কোন মানুষের জীবনের সাধনা থেকে [এমন] অমৃতলহরী এমন উচ্ছ্বসিত ধারা উচ্ছ্রিত হতে থাকে, যার স্পর্শে জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভগ্নাংশগুলো অনন্ত সময়ের দোলায় দোলায়িত হয়। সে ধরনের মানুষদের সম্পর্কে মন্তব্য করায় অতিশয়োক্তি স্পষ্টতই প্রশ্রয় পেয়ে যায়।’

কিন্তু আমার জ্ঞান যতদূর যায় দেখিতে পাই আহমদ ছফা সম্পর্কে আজ পর্যন্ত কাহারও কোন উক্তিই অতিশয়োক্তি প্রমাণিত হয় নাই।

আমি বলিতেছিলাম আহমদ ছফার সকল চিন্তার, সকল শিল্পের, সকল সাধনার মূলে ছিল তাঁহার রাষ্ট্রচিন্তা। অবশ্য রাষ্ট্র বলিতে নিছক রাষ্ট্রযন্ত্র বুঝিলে চলিবে না, রাষ্ট্রের অন্তরও বুঝিতে হইবে। রাষ্ট্রের অন্তর কি বস্তু? এই প্রশ্নের উত্তর আহমদ ছফা দিয়াছেন– সর্বসাধারণই রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রাণ, তাহার অন্তর। ইহার সহিত আহমদ ছফার বর্ণিত আলাউদ্দিন খানের স্বপ্নের মিল আছে। আহমদ ছফা বিবরণটা এইভাবে লিখিয়াছেন:

‘অপরাধ বোধটুকু কাটিয়ে ওঠার জন্য খান সাহেব অপেক্ষাকৃত উচ্চকণ্ঠে মদিনা বেগমকে বললেন, শুন আজ খোয়াবে বড়দার লগে দেহা হইল। তাইনে আমারে কইলেন, আলম অহন তোমার আসল সঙ্গীত শিক্ষার সময় অইছে। আমি কইলাম, বড়দা একটু বুঝাইয়া কন। বড়দা হাতের সারেঙ্গিখানা ঘুরাইয়া এমন এক সুর বাজাইলেন, সে রকম সুর আমি কুনোদিন কোথাও শুনি নাই। শরীর মন একেবারে ঠাণ্ডা অইয়া জুড়াইয়া যায়। আমি কইলাম, বড়দা এইটা কোন রাগ বাজাইলেন। বড়দায় কইল, এই রাগের নাম নাই। সঙ্গীত তো মহাসাগর। যে মাঝি যতদূর নাও লইয়া গেছে, একস্থানে নাও লাগাইয়া থুইছে। তানসেনের সেই কথাটা একবার মনে কইর‌্যা দেখ, সঙ্গীত এমন অমৃত সাগর, কোন মানুষ সেই সমুদ্রে পাড়ি দিবে, কেমন কইর‌্যা, স্বয়ং দেবী সরস্বতী বুকের কাছে তানপুরাখান ধইরা রাখছেন। তাইনের ভয়, হাতে তানপুরাখান না থাকলে তাইনে রসের সমুদ্রে ভাইস্যা যাইবেন। খান সাহেব বললেন, বড়দা আসল কথা কইছেন। যেই জিনিসটা বাজাইলেন, আমারে শিখাইয়া দেন, একটু দাঁড়ান আমি যন্তরখানা নিয়া আসি। বড়দা কইলেন, আলম তামাম জীবন তো বস্তু বাজাইলি এইবার অন্তরখানা বাজা। আমি বললাম, বড়দা কেমনে অন্তর বাজাইতে অয়, শিখায়া দেন। বড়দা কইলেন, আচ্ছা।’

আহমদ ছফার এই উপলব্ধির সহিত আধুনিক অথবা নয়া গণতন্ত্রবাদের প্রথম গুরু পুরানা জমানার ইতালিদেশের রাষ্ট্রচিন্তাবিদ নিকোলো মেকিয়াভেলির বক্তব্যের মিলও আমি ষোল আনা খুঁজিয়া পাইতেছি। মেকিয়াভেলি দুইটা জিনিশের উপর সমান গুরুত্ব আরোপ করিতেন। এক নম্বরে থাকা চাই রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রনায়ক। দুই নম্বরে চাই সক্রিয় জাতীয় সমাজ বা সর্বসাধারণ। তাঁহার বিখ্যাত বইটির নাম ‘রাষ্ট্রনায়ক’ হইলেও সেই বইয়ের পাতায় পাতায় তিনি আহাজারি করিতেছেন ইতালির জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষা ও গৌরব– অর্থাৎ হারানো সম্মান– পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বজনসাধারণকে রাজনীতিতে টানিয়া আনিতে হইবে। রাষ্ট্রনায়কের নিকট দাবি জানাইতেছেন অভিজাত বা সামন্তপ্রভুদের উপর ভর না করিয়া জনসাধারণের উপর নির্ভর করিতে হইবে।

একথা মিথ্যা নহে যে বিংশ শতাব্দীর ইতালিতে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা আন্তনিয়ো গ্রামসি মেকিয়াভেলির লেখা পড়িয়া এই সত্য পুনরাবিষ্কার করিয়াছিলেন। মেকিয়াভেলিকে তিনি তাই ‘সময়ের আগে জন্মানো বিপ্লবী’ বা ‘ইঁচড়ে পাকা জাকোবাঁ’ উপাধি দিয়াছিলেন। গ্রামসির পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া কেহ যদি আহমদ ছফাকেও ‘সময়ের আগে জন্মানো নয়া গণতন্ত্রবাদী’ বলেন আপত্তি করা যাইবে না।

রাষ্ট্র কিংবা রাষ্ট্রনায়ক বলিতে কি বুঝায় তাহার সামান্য ইশারা আমরা ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আহমদ ছফা’ নিবন্ধে খানিক দিয়াছি। এখানে শুদ্ধ জনসাধারণ বলিতে আহমদ ছফা কি বুঝিতেন তাহার একটি মাত্র সাক্ষ্য হাজির করি। ১৯৭১ সালের গোড়ার দিকে যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করিল তখন এই দেশের হাজার হাজার নহে, লাখ লাখ মানুষ হয় অস্ত্র হাতে প্রতিরোধ সংগ্রামে জড়াইয়া পড়ে, নয় এক কাপড়ে দেশ ছাড়িয়া যায়। ইংরেজি ১৯৭২ সালের গোড়ায় প্রকাশিত একটি ছোটগল্পে আহমদ ছফা তাহার বিবরণ কিছু পরিমাণ হইলেও দিয়াছেন। গল্পটির নাম ‘পাথেয়’। গল্পটার শুরু এইভাবে।

‘মানুষের স্রোতটা এঁকেবেঁকে আলপথ ধরে, বোরো ক্ষেতের উপর দিয়ে, ঝোপঝাড়ের ভিতর দিয়ে, চৌদ্দপুরুষের বাস্তুভিটের মায়া কাটিয়ে শিকারিতাড়িত একপাল ভীতসন্ত্রস্ত পশুর মতো পালিয়ে আসছে। যতই সামনে যায় সংখ্যা বাড়ে। একটু জিরোয় মাঝেমধ্যে। জিরোয় না, আত্মীয়স্বজন, মাবাপ, ছেলেমেয়ে কে এলো, কে এলো না, কে জন্মের মতো গেলো ভাবতে চেষ্টা করে। গুলিগোলার আওয়াজ আর আত্মীয়স্বজনের টাটকা লাল রক্তের স্মৃতি আবার তাড়া করে। মানুষগুলো আবার হাঁটে–সোজা পথে নয়। বাঁকা চোরা ঘুপচি ঘাপচি জংলা পথ বেছে নেয়। প্রাণের মায়া বড়ো মায়া।

পাকিস্তানি বিমান হইতে বোমা ফেলা হইতেছে, গুলিবর্ষণ চলিতেছে। আর শরণার্থীর দল পথের মধ্যে দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া দেখিতেছে।

সত্যি সত্যি চারটি এরোপ্লেন দেখা গেলো। প্রথমে চারটি সাদা বিন্দুর মতো দেখাচ্ছিলো। নীচের দিকে নামলে সমস্ত গতরটা দেখা গেলো। বোঁ বোঁ চক্কর দিয়ে ঘুরছে। প্যাট প্যাট করে মেশিনগানের গুলি ফুটছে। একবার ওপরে উঠছে আবার শিকারি বাজের মতো ছোঁ মেরে নিচে নামছে। মাঝে মাঝে দ্রƒম দ্রƒম শব্দ হচ্ছে–ওগুলো বোমা। আতঙ্কিত মানুষগুলো আবার পা চালিয়ে দিল। আকাশ থেকে মৃত্যু ছুঁড়ে দিলো পাকিস্তানি সৈন্য। বেশি দূর যেতে হল না’।

এই মানুষগুলো কে? কে তাঁহারা? আহমদ ছফা লিখিতেছেন:

‘যে সমস্ত মানুষ জন্মের জন্য দায়ী নয়– অথবা রাজনীতির জন্য দায়ী নয়– অর্থাৎ যুগ যুগ ধরে মুসলমান এবং দেশের হালচাল নিয়ে মাথা ঘামায়নি, মাটি– নরম জলে ভেজা বাংলাদেশের মাটি– গাছের মতো আঁকড়ে ছিল তারাও আশপাশের গ্রামগুলো থেকে গরুবাছুর ধানচাল, কাঁথাবালিশ, হাতের কাছে যা পেয়েছে নিয়ে দলে দলে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বাসাভাঙ্গা পাখীর মত বেরিয়ে, বিল মাড়িয়ে রেলের লাইনের দিকে ছুটে আসছে।

আরেক জায়গায় পড়ি।

‘মানুষগুলো সামনে যাচ্ছে। দেশগেরামের স্মৃতিচিহ্ন অন্তর থেকে মুছে ফেলেছে, জন্মভূমির ছবি দৃষ্টি থেকে মুছে ফেলেছে। চারদিকে মৃত্যু জাল পেতেছে। তারই মধ্য দিয়ে তারা হাঁটছে। কান পাতলে শোনে কামানের গর্জন। চোখ মেললে আগুনের শিখা দাউ দাউ নাচে, আত্মীয় স্বজনের রক্ত লাল হয়ে জেগে থাকে। তবু প্রাণের দায়। মানুষগুলো হাঁটছে। চারদিক থেকে বৃত্তাকারে লোহার সাঁড়াশির মতো ভয়ঙ্কর মৃত্যু, করুণ পাইকারী মৃত্যু দ্রুত তাদের ঘিরে ফেলছে। তাই তারা যাচ্ছে, ভিটেমাটি ছেড়ে, দেশগেরাম ছেড়ে, মাতৃভূমির আঁচল ছেড়ে, নাড়িকাটা ভূমি ছেড়ে। জীবন ভারী সুন্দর। বড়ো মধুর এই বেঁচে থাকা। কোথায় জীবনের উপর মেলে দেয়া সে শান্ত সুন্দর ছায়া।’

আরো একটু। ‘দুঃখের কথা কয়ে লাভ নেই, কষ্টের কথা বয়ান করে লাভ নেই, চৌদ্দপুরুষের ভিটেমাটির জন্য চোখের জল ফেলে কি হবে। সব তো গেছে। এখন প্রাণ নিয়ে চলো। মানুষগুলো পা চালায়। কেউ কাউকে তাড়া দেয় না। কোথায় যাবে কোন পথ দিয়ে যাবে কারো কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। শুধু জানে বর্ডার পেরিয়ে আগরতলায় ঢুকতে হবে। তারপরে কি হবে, কি হবে তারপরে কেউ কিছু জানে না। সব অদৃষ্ট, অদৃষ্টের ফের।’

কেহ যদি বলেন আহমদ ছফা কোন কিসিমের রাষ্ট্রচিন্তাবিদ বুঝিতে পারিলাম না, তাহাকে বলিব, মিনতি করিয়া বলিব নিজের মুখেই ঝাল খাইয়া দেখিবেন। পরের কথায় কান দিবার পরিণতি সব সময় ভাল হয় না।

যাঁহারা মনে করেন ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ’ কি ‘তত্ত্ববিদ’ কি– খোদার কসম– ‘কবি’ হইতে হইলে মুখে ইংরেজি ভাষায় যাহাকে বলে সোনার চামচ ও রুপার চামচ লইয়া জন্মাইতে হইবে তাঁহারা অভিজাত শ্রেণির বা উচ্চবর্ণের মানুষ। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান সাহেবকে যে সমস্ত গোষ্ঠীর রক্ষণশীল মনোভাব বা একচেটিয়া ব্যবসায়ের অবসান ঘটাইবার জন্য জীবনভর সংগ্রাম করিতে হইয়াছিল ইঁহারাও দেশকালের ভেদটা তুচ্ছ করিলে সেই শ্রেণির বা গোষ্ঠীরই সদস্য।

যে সমস্ত সমাজে বর্ণবিভাজন, জাতিবিদ্বেষ কিংবা শ্রেণিভেদ অদ্যাবধি বিরাজমান সেই সকল সমাজে আমরা যতদূর জানি রাষ্ট্রক্ষমতা আজও অভিজাত শ্রেণি, পুণ্যবান পুরোহিত কিংবা উচ্চবর্ণের হাতে আছে। শুদ্ধ রাষ্ট্রক্ষমতায় নহে রাষ্ট্রচিন্তায়ও তাঁহারা একচেটিয়া অধিকার হাতছাড়া করিতে চাহেন না। আভিজাত্যের বড়াই কখনো ধনদৌলতের রূপান্তর বিশেষ। কখনো তাহা মেধা প্রতিভা ও মনীষার পাটাতনে দাঁড়ায়। আমাদের দেশেও এই নতুন আভিজাত্য দেখা দিয়াছে। কোথাও বা নবার্জিত ধনদৌলতের বড়াই আকারে, কোথাও মনীষা প্রতিভা ও মেধার বড়াই আকারে তাহার প্রকাশ দেখা যায়। আহমদ ছফার মতন সর্বসাধারণের সন্তানকে ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ’ বলিলে ইঁহাদের গাত্রদাহ হইবে–তাহাতে বিস্ময়ের কি! কাহিনীটা একটু জায়গা করিয়া বলিতে হইতেছে।

গত ২৮ জুলাই ২০১৩ তারিখ ছিল মহাত্মা আহমদ ছফার ত্রয়োদশ মৃত্যুদিবস। ঐ দিন আমি বহুল প্রচারিত একটি বাংলা দৈনিকে ‘আহমদ ছফার বাংলাদেশ’ নামে একটি নিবন্ধ প্রকাশ
করি। পরের সপ্তাহে– মানে ৫ আগস্ট– আরেকটি প্রবন্ধ ছাপাই একই পত্রিকায়। নাম রাখি ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংকট: আওয়ামী লীগ পর্ব’। দুই লেখাতেই আমি ছফার রাষ্ট্রচিন্তার পরিচয় যতদূর সম্ভব তুলিয়া ধরি। ইহার পরদিন একটি অনলাইন পত্রিকায় এদেশের স্বনামধন্য কবি ও চিন্তাব্যবসায়ী ফরহাদ মজহার একটি কবিতায় লেখেন, ‘জানালায় উড়ে বসছে আরশোলা, সেও আজ রাষ্ট্রতত্ত্ববিদ’।

ফরহাদ মজহারের এই ব্যবহারে আমি অবাক হই নাই। তাহার পর আমি আরো দুই নিবন্ধ লিখিতে সমর্থ হই। ১৯ আগস্ট লিখি ‘বাংলাদেশের নিয়তি’, আর ২৯ আগস্ট ‘আহমদ ছফার রাষ্ট্রচিন্তা’। শেষমেশ লিখি ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আহমদ ছফা’। আরেকটু পর ‘নতুন জাতির জন্ম’। ইহাদের প্রথমটি ২ সেপ্টেম্বর অনলাইনে স্থান পায় আর শেষেরটি যায় ৮ সেপ্টেম্বর।

এই তালিকাটি দিয়াছি তাঁহাদের জন্যই যাঁহারা জানিতে চাহেন কেন আমি ফরহাদ মজহারের কবিতায় আক্রান্ত চরিত্র বা ব্যক্তির সহিত আহমদ ছফার মিল আবিষ্কার করিয়াছি। কবিতাকার বা কথাশিল্পীর সুবিধা এই যে তিনি আকারে ইঙ্গিতে আঘাত হানিতে পারেন। কিন্তু অন্ধ হইলে তো প্রলয় বন্ধ থাকিবে না। সালমান রুশদি নামক প্রখ্যাত উপন্যাস ব্যবসায়ী কি কাল্পনিক নাম ব্যবহার করিয়া দায়মুক্ত হইতে পারিয়াছেন?

ফরহাদ মজহারের কবিতাটি কেবল আহমদ ছফার উদ্দেশে রচিত তাহা আমার বক্তব্য নহে। এই কবিতার ইঙ্গিত যদি আমি ভুল না বুঝিয়া থাকি তবে তাহা এই যে সমাজের নিচুশ্রেণির বা নিচুতলার মানুষের পক্ষে রাষ্ট্রচিন্তা বেমানান। এই কবিতার এক জায়গায় তিনি যেমন কহিয়াছেন, ‘জানালায় উড়ে বসছে আরশোলা, সেও আজ রাষ্ট্রচিন্তাবিদ’, তেমনি আরেক জায়গায়– খানিক আগাইয়া– জিজ্ঞাসিয়াছেন ‘চামচিকা তত্ত্ববিদ?’ অনেক রূপান্তর, হরেক মেটাফর তিনি এস্তেমাল করিয়াছেন। মানুষ যাহাদিগকে ‘ইতর প্রাণী’ বলিয়া অবজ্ঞা করে তিনি তাহাদের স্থান দিয়াছেন ঘৃণার ভাষায়।

ঘৃণা মানুষকে কোথায় লইয়া যায় তাহার হিশাব করা মুশকিল। জার্মানদেশের পুরানা তত্ত্ববিদ হেগেল বলিতেন আথেনা ওরফে মিনার্বাদেবির পেঁচা কেবল সন্ধ্যারাতেই উড়াল দিয়া থাকে অর্থাৎ ইতিহাসের ঘটনা ঘটিয়া যাইবার পর মাত্র তাহার চৈতন্যোদয় হয়। গ্রিক পুরাণে অন্ধ পুরুষ তেইরেসিয়াস ত্রিকালদর্শী বটে। চামচিকা বা বাদুড়ও রাত্রেই কেবল দেখে। অথচ ফরহাদ মজহার বেমক্কা লিখিয়াছেন:

‘চামচিকা তত্ত্ববিদ? কী দোষে যে তারা দিনে কিছুই দেখে না
তবুও তাদের ধার্য অন্ধকারে উড়বার বিশিষ্ট সময়।’

আমাদের দেশের প্রধান ভাষা বাংলা। এই ভাষায় ‘কুত্তার বাচ্চা’ কথাটা একটা গালি আর ‘বাঘের বাচ্চা’ পদটি বাহবা বাহবা বলিবার পর বলা হয়। ফরহাদ মজহারও যে শ্রেণির চরিত্রদের পছন্দ করেন না তাহাদের স্থলে বলিয়াছেন ‘নেড়িকুত্তা’ আর যে চরিত্র তাঁহার আপনকার অহম বৈ নহে তাহাকে বলিয়াছেন ‘বাঘের বাচ্চা’। তিনি লিখিয়াছেন, ‘আমি শুধু লিখে যাব বাঘের বাচ্চার মতো জিহ্বা হ্রস্ব করে/ দুধে তৈরী দাঁত গুলো গুটিয়ে …’।

নিজেকে ‘বাঘের বাচ্চা’ আর অপরকে ‘নেড়িকুত্তা’ বলার মধ্যে শুদ্ধ পুরানা কথার পুনরাবৃত্তিই আছে বলিলে সব বলা হইবে না। এই অলঙ্কারের মধ্যে যে চিন্তার বৈভব প্রকাশ পাইতেছে তাহা কিছু পরিমাণে নতুন তো বটেই। অভিজাত শ্রেণি চিরকালই আভিজাত্যের বড়াই করিয়াছে। কিন্তু যে যুগে অভিজাত শ্রেণির রাষ্ট্রক্ষমতা নড়বড়ে, যেখানে তাহাকে নতুন শাসকশ্রেণির হাতে ক্ষমতার বিশেষ অঙ্গটি ছাড়িয়া দিতে হয় সে যুগে আসিয়াও যখন সে সেই পুরানা অভিজাত্যের গর্বই করে তখন তাহা বিশেষ ব্যঙ্গের রূপ গ্রহণ করে।

বুর্জোয়াশ্রেণির যুগে সামন্ত প্রভুর মতন ক্ষমতাবান হওয়ার ইচ্ছাকেই এয়ুরোপিয়া রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে ‘ফ্যাসিতন্ত্র’ বলা হইয়াছে। ইতালিতে মুসোলিনির দলের নাম আর জার্মানিতে হিটলারের দলের নাম ভিন্ন। কিন্তু তাহাদের অভিন্ন চিন্তাকেই আমরা এতদিনে ‘ফ্যাসিতন্ত্র’ বা ‘ফ্যাসিবাদ’ বলিয়া চিনিতেছি। কথাটা নিছক গালি নহে, একটা ছকের বিবরণ মাত্র। এতদিনে তাহা যদি গালির পর্যায়ে উন্নীত হইয়া থাকে তাহার জন্য আমরা দায়ী নহি।

ফরহাদ মজহারের আলোচ্য কবিতার ভাষা যে আপাদমস্তক ফ্যাসিতন্ত্রের বার্তা বহন করিতেছে তাহাতে কাহারও সংশয় থাকিলে অনুরোধ করিব শুদ্ধমাত্র শেষ অনুচ্ছেদটি পড়িবেন। তিনি এলান করিতেছেন:

‘অক্ষয় আমার কাব্য শহরের জঙ্গলে শেষ রাত্রে অক্ষয় আহ্বান
জানাবেন যিনি তাঁর পাগড়ি আলোকপ্রাপ্ত জোৎস্নার মুক্তায়
শিবানির স্বামী তিনি আল্লার মোয়াজ্জিন এ কালাম ভোরের আগেই
কোন রক্তপাত ছাড়া তাঁকেই দাখিল করব, ইনশাল্লাহ, তাঁরই উসিলায়।’

নিজের কবিতাকে অক্ষয় মনে করিতে যে কোন কবিই পারেন। তাহা লৌকিক। তাহাতে দোষের বিষয় নাই। কিন্তু তাহার সহিত যখন অলৌকিক মাজেজা বা ‘তন্ত্র’ আসিয়া যুক্ত হয় তখন ফ্যাসিতন্ত্র সরব হইয়া উঠে। কথাগুলি আমার রচিত নহে। বাল্টার বেনিয়ামিন নামক বিখ্যাত তত্ত্ববিদ কথাটা এইভাবে বলিয়াছিলেন। আমি জার্মান মূলের বাংলা ভাবানুবাদ দিতেছি।

বেনিয়ামিন বলিতেছেন সমাজের গোড়া বা উৎপাদন প্রণালিটা যত দ্রুত বদলায় আগা বা ধ্যানধারণার জগতটা তত দ্রুত বদলাইতে পারে না। ইংরেজি বিংশ শতাব্দীর চতুর্থ দশকে লিখিতে বসিয়া তিনি সময়ের ঢেউ গুনিতেছিলেন। তাঁহার গণনায় দেখা যায় ধ্যানধারণার জগৎ গোড়াকার ঘটনার অন্তত অর্ধশতাব্দী পিছনে পড়িয়া রহিয়াছে। কিন্তু বেনিয়ামিনের দাবি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের তত্ত্ববিদদের কয়েকটি বিষয়ের খবর আগাম রাখিতে হইবে। যেমন গণতন্ত্রের দাবি সর্বজনীন হওয়ায় শিল্পকলার ক্ষেত্রেও কয়েকটি প্রচলিত ধারণা প্রশ্নের মুখামুখি হইতেছে।

বেনিয়ামিন চারিটি প্রচলিত ধারণার কথা বলিয়াছেন। ইহাদের মধ্যে পড়িতেছে ‘ঐশ্বরিক ক্ষমতা’ ও ‘অলৌকিক প্রতিভা’ আর ‘অক্ষয় কাব্য’ বা ‘চিরকেলে বাণী’ ওরফে ‘কালাম’ এবং (চোখের মণির মত সযত্নে গোপন রাখা) ‘মরমি রহস্য’। বেনিয়ামিনের মতে এই চিরাচরিত ধ্যানধারণাগুলির বেপরোয়া ব্যবহার ইতিহাসের ঘটনাবলিকে এমনভাবে সাজায় যাহাতে ফ্যাসিতন্ত্রের পথ পরিষ্কার হইতে থাকে। ইহার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার গুরুত্ব কম করিয়া দেখার কোন উপায় নাই।

ফরহাদ মজহারের এই ঘোষণাপত্রের মধ্যে আমি এই পুরাতন, পরিত্যক্ত ধ্যানধারণার বেপরোয়া ব্যবহার দেখিয়া স্বভাবতই মুগ্ধ হই নাই। সত্য বলিতে ব্যথিতই হইয়াছি। তাঁহার কবিতা লিখিবার ক্ষমতা আছে– এ সত্যে সন্দেহ নাই। অতীতে তাঁহার কাব্যের যতদূর বুঝি প্রশংসা করিতে আমি কুণ্ঠিত হই নাই। দুঃখের মধ্যে তিনি কবিতায় ফ্যাসিতন্ত্রের এহেন বন্দনা করিবেন– অন্তত বাল্টার বেনিয়ামিন কথিত ফ্যাসিতন্ত্রের আলামত মোতাবেক ফ্যাসিতন্ত্রের এহেন নকিব হইয়া উঠিবেন– তাহা আগে ভাবিয়া দেখি নাই। আজ আমাকেও দেখিতে হইল। নিজের কাব্যকে তিনি শুদ্ধমাত্র ‘অক্ষয়’ বলিয়া ক্লান্ত হইলেন না, তাহাকে গূঢ় মরমি ভাষার আশ্রয়ে বলিলেন ‘কালাম’ বিশেষও। এই ধরনের হর্ষকাম বা বেপরোয়া ব্যবহারকেই বেনিয়ামিন ফ্যাসিতন্ত্রের পথপ্রদর্শক বলিয়া হুঁশিয়ার করিয়াছিলেন।

এই স্বাধীনতা ব্যবসায়ী বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক রক্তপাত হইয়াছে সন্দেহ নাই। ইতিহাস দেবতা হয়তো আরো রক্ত দাবি করিতেছেন। ফরহাদ মজহার আশ্বাস দিয়াছেন ‘রক্তপাত ছাড়াই’ তাঁহার ‘কালাম’ দাখিল করা হইবে। ইহা ঠাকুরঘরের কলা কিনা জানি না। কিন্তু একটি বিষয়ে আমাদের সন্দেহ নাই। ফরহাদ মজহারের কবিতা আর কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা এই প্রশ্নে মুখামুখি দাঁড়াইয়া আছে। নজরুল ইসলামের কবিতা যদি হয় ‘গণতন্ত্র’ পথের পথিক, ফরহাদ মজহারের কবিতা তাঁহার সমস্ত ‘কালাম’ লইয়া ফ্যাসিতন্ত্রের নিশানবরদার।

এই নিবন্ধ এতটা দীর্ঘ হইবে ভাবি নাই। তবু তামাম শুদ করিবার আগে কাজী নজরুল ইসলাম ওরফে ‘মহাবিদ্রোহী’ কবির ‘আমার কৈফিয়ত’ কবিতাটির একটি থোকা আবৃত্তি করিব।

‘বন্ধু গো আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে!
দেখিয়া শুনিয়া খেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে ॥
রক্ত ঝরাতে পারি না তো একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা।
বড় কথা বড় ভাব আসে নাকো মাথায়, বন্ধু, বড় দুঃখে!
অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছো সুখে!’

নজরুল ইসলাম যে অমর কাব্য লিখিতে পারেন নাই, হইতে পারে ফরহাদ মজহার সেই অমর কাব্যই লিখিতেছেন। ফরহাদ মজহারের বাণী চিরকালের বাণী। তাঁহার কবিতা অভিজাত শ্রেণির জোৎস্নার মুক্তায় আলোকপ্রাপ্ত পাগড়ির ন্যায় শোভা পাইবে। আর কাজী নজরুল ইসলামের নাম একদিন না একদিন লোকে ভুলিয়া যাইবে।

কে জানে আহমদ ছফার কি হইবে?

টিকা

১. ‘Né voglio sia reputata presunzione se uno uomo di basso ed infimo stato ardisce discorrere e regolare e’ governi de’ principi; perché, così come colore che disegnano e’ paesi si pongono bassi nel piano a considerare la natura dé monti e dé luoghi alti, e per considerare quella dé bassi si pongono alti sopra é monti, similmente, a conoscere bene la natura de’ populi, bisogna essere principe, e a conoscere bene quella de’ principi, bisogna essere populare.’

— Niccolo Machiavelli, Il Principe

২. ‘Darum wäre es falsch, den Kampfwert solcher Thesen zu unterschätzen. Sie setzen eine Anzahl überkommener Begriffe – wie Schöpfertum und Genialität, Ewigkeitswert und Geheimnis – beiseife – Begriffe, deren unkontrollierte (und augenblicklich schwer kontrollierbare) Anwendung zur Verarbeitung des Tatsachenmaterials in faschistischem Sinn führt.’

— Walter Benjamin, ‘Das Kunstwerk im Zeitalter seiner technischen Reproduzierbarkeit’

দোহাই

১. কাজী নজরুল ইসলাম, ‘আমার কৈফিয়ত’ [‘সর্বহারা’], নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ, খ- ২, পুনর্মুদ্রণ (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ২০১১), ১২৭-৩১।

২. সলিমুল্লাহ খান, ‘আহমদ ছফার বাংলাদেশ,’ বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৮ জুলাই ২০১৩।

৩. — ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংকট: আওয়ামী লীগ পর্ব,’ বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৫ আগস্ট ২০১৩।

৪. — ‘বাংলাদেশের নিয়তি,’ বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৯ আগস্ট ২০১৩।

৫. — ‘আহমদ ছফার রাষ্ট্রচিন্তা,’ বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৯ আগস্ট ২০১৩।

৬. — ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আহমদ ছফা,’ বিডিনিউজ২৪ডটকম, ২ সেপ্টেম্বর ২০১৩।

৭. — ‘নতুন জাতির জন্ম,’ বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩।

৮. আহমদ ছফা, ‘সুরসম্রাটের মৃত্যুস্বপ্ন,’ আহমদ ছফা রচনাবলি, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত, খ- ৮ (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮), ৪৪৯-৬১।

৯. — ‘আচার্য আলাউদ্দিন খান’ [‘উপলক্ষের লেখা’], আহমদ ছফা রচনাবলি, খ- ৪, ১১৫-১৭।

১০. — ‘রোগশয্যায় বিরচিত’ [‘উপলক্ষের লেখা’], আহমদ ছফা রচনাবলি, খ- ৪, ২১০-২৮।

১১. — ‘পাথেয়,’ বাঙলাদেশ লেখক শিবির সম্পাদিত, হে স্বদেশ: গল্প (ঢাকা: বাঙলা একাডেমী, ১৯৭২), ১৩৮-৪৮।

১২. — ‘আমি যদি পুরো জীবন ব্যয় করে একটা উপন্যাস লিখতে পারতাম,’ রাজু আলাউদ্দিন সম্পাদিত, আলাপচারিতা: রাজনীতি, সংস্কৃতি, সমাজ ও সাহিত্য বিষয়ক সাক্ষাৎকার (ঢাকা: পাঠক সমাবেশ, ২০১৩), ২১১-২৪।

১৩. ফরহাদ মজহার, ‘ইস্পাতের ঠোঁট,’ পরিবর্তনডটকম, ৬ আগস্ট ২০১৩।

১৪. Walter Benjamin, ‘Das Kunstwerk im Zeitalter seiner technischen Reproduzierbarkeit’ [The Work of Art in the Age of its Technological Reproducibility], in Illuminationen [Illuminations], Ausgewählte Schriften 1 (Frankfurt am Main: Suhrkamp, 1977), ss. 136-69.

১৫. Antonio Gramsci, Selections from the Prison Notebooks, trans. Q. Hoare and G. Nowell-Smith, reprint (London: Lawrance & Wishart, 1973).

১৬. Niccolo Machiavelli, ‘Il Principe’ [The Prince], in Tutte le Opere, ed. Mario Martelli (Firenze: Sansoni Editore, 1971), pp. 255-98.

 

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩, bdnews24.com, মতামত বিশ্লেষণ

Leave a Reply