রাষ্ট্রচিন্তাবিদ আহমদ ছফা

জীবনের উপসংহারভাগে পৌঁছিয়া মহাত্মা আহমদ ছফা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান সাহেবের উপর একটি উপন্যাস লেখায় হাত দিয়াছিলেন। দুর্ভাগ্যের মধ্যে, তিনি উপন্যাসটি শেষ করিয়া যাইতে পারেন নাই। তবে তাহার একটি অধ্যায় অন্তত তিনি শেষ করিয়াছিলেন।

শেষ করিয়াছিলেন শুদ্ধ লিখিয়াই নহে। ছাপাইয়াও। ‘সুরসম্রাটের মৃত্যুস্বপ্ন’ নাম রাখিয়া ‘রোববার’ নামক একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় তাহা ছাপাও হয়। ছাপা অংশটি পড়িয়া রাজু আলাউদ্দিন মন্তব্য করিয়াছিলেন, “সঙ্গীত সম্পর্কে খুব গভীর ধারণা না থাকলে ওটা লেখা সম্ভব নয়।’’

সেই খণ্ডাংশের একটি অংশ এই রকম। একটা স্বপ্ন দেখিয়া অসুস্থ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের নিদ্রাভঙ্গ হইল। তখন রাত তিনটা বাজিয়াছে। বড় অশক্ত শরীর তাঁহার, পাশ ফিরিতে কষ্ট হয়। তিনি স্বপ্ন দেখিয়াছেন তাঁহার বড় ভাই ফকির আফতাব উদ্দিন সাহেব স্বপ্নযোগে তাঁহাকে একটি আদেশ দিয়াছেন, “আলম, তামাম জিন্দেগি তোম যন্তর বাজায়া, আভি আপনা অন্তর বাজাও।’’

তখন তিনি আপনার অন্তর বাজানোর কোশেস করিতেছিলেন। সেই রাগ তাঁহার গুণবতী বিদুষী কন্যা অন্নপূর্ণারও অচেনা। আলাউদ্দিন খান আপনার অন্তর বাজাইতেছেন। আহমদ ছফা লিখিতেছেন, “আলাউদ্দিন খান সাহেব যন্ত্রের তারে টোকা দিচ্ছিলেন। আর প্রতি আওয়াজে আনন্দের স্ফুলিঙ্গ বেরিয়ে আসছিল। আর আগুন থেকে একটা আনন্দধারা নির্গত হয়ে চরাচর ভাসিয়ে দিয়ে এল। অন্নপূর্ণার হাসতে ইচ্ছে হল, কাঁদতে ইচ্ছে হল, নাচতে ইচ্ছে হল। তাঁর সমস্ত ইন্দ্রিয় সুরের বশীভূত হয়ে পড়েছে।”

সেই সময় সুরসম্রাটের সহধর্মিনী মদিনা বেগম বাটির বাহিরে দাঁড়াইয়া একটা অভিনব জিনিস প্রত্যক্ষ করিতেছিলেন। আহমদ ছফার বর্ণনা মোতাবেক, “আঙ্গিনায় গন্ধরাজ গাছের কলিগুলো তাঁর চোখের সামনে আপনা-আপনি ফুটে উঠতে থাকল। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ে এসে বাড়ির চারপাশের গাছে চুপচাপ বসতে থাকল। মদিনা বেগম আরও লক্ষ্য করলেন, তাঁদের বাড়ির আঙ্গিনায় মরা শুকনো দুর্বাঘাসের চাপড় ঠেলে নতুন নতুন তাজা শীষ অলসভাবে উঁকি দিতে আরম্ভ করেছে। মদিনা বেগমের দুই চোখ পানিতে ভরে উঠল। তাঁর ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠল, ওই মানুষকে আর কেউ ধরে রাখতে পারবে না। ফকির আফতাব উদ্দিনের বেশ ধরে সঙ্গীত স্বয়ং তাকে নিয়ে যেতে এসেছে।”

আমার কেন যেন মনে হয় আলাউদ্দিন খানের নামে আহমদ ছফা আসলে নিজের মৃত্যুস্বপ্নটিই দেখিয়াছিলেন। না হইলে তিনি কেন, কী কারণে, প্রথম কিস্তিতেই মৃত্যুদৃশ্যের অধ্যায়টি প্রকাশ করিবেন? সাপ্তাহিক ‘রোববার’ কাগজে ছাপার সময় যে শীর্ষ টিকাটি ছাপা হইয়াছিল তাহাতেও আহমদ ছফা সেই ইঙ্গিতই দিয়াছিলেন বলিয়া মনে হইতেছে।

তিনি লিখিয়াছিলেন, “আমাকে সঙ্গীত সম্রাট আলাউদ্দিন খান সাহেবের ওপর একটি উপন্যাস লেখার জন্যে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র জনাব মোবারক হোসেন খান সাহেব একাধিকবার অনুরোধ করেছিলেন। তাঁর কথা আমি কানে তুলিনি। কারণ স্বপ্নেও আমি ভাবিনি খান সাহেবের উপর একটা উপন্যাস লেখার যোগ্যতা আমার কোনোদিন হবে। তারপর এক রাতে হঠাৎ করে মনে হল খান সাহেবের উপর আস্ত একটি উপন্যাস লেখার ক্ষমতা আমার নেই, সত্য। কিন্তু দুটি অধ্যায় লিখতে পারি। একটা হল তাঁর মৃত্যু এবং অন্য অধ্যায়টা হল খান সাহেবের নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি।”

ছবি : নাসির আলী মামুন
ছবি : নাসির আলী মামুন

‘রোববার’ কাগজে মৃত্যুদৃশ্যের অধ্যায়টি বাহির হইয়াছিল। আহমদ ছফা জানাইয়াছিলেন, ‘অনতিবিলম্বে নিরুদ্দেশ যাত্রার অধ্যায়টিও রচনা করার বাসনা রাখি। আয়ুতে যদি কুলোয়, হয়তো মাঝখানের অধ্যায়গুলো কোনোদিন শেষ করব।’

আহা, আয়ুতে কুলায় নাই।

আমি একটু লম্বাচওড়া উদ্ধৃতিই দিলাম। না দিলে যাহা বলিতেছি তাহা হয়তো বলা যাইবে না। রাজু আলাউদ্দিনের সহিত আলাপের মুহূর্তে তিনি একটু আলাদা কথাই অবশ্য বলিয়াছিলেন। জানাইয়াছিলেন, “তাঁকে নিয়ে উপন্যাস লেখার প্রস্তুতি আমি নিয়ে ফেলেছি। এখন বসলে আমি পনেরো দিনের মধ্যে শেষ করতে পারি।”

রাজু আলাউদ্দিন যেন-বা আপন নামের মহিমায় বলিলেন, “এত অল্প সময়ের মধ্যে এত গভীর লেখা আপনি কীভাবে শেষ করবেন?”

আহমদ ছফা এক্ষণে গোমর ফাঁস করিলেন। বলিলেন, “না, অল্প সময় নয়, এটা ভেতর ভেতর তৈরি, মাথার মধ্যে কাজ করছে হয়তো বারো বছর কি বিশ বছর আগে থেকে।”

রাজু আলাউদ্দিনের সঙ্গে এই আলাপটা ১৯৯৮ সালের ঘটনা। আহমদ ছফা ইহার তিন বছরের মাথায় নিজেও মৃত্যুর সাক্ষাৎ পাইলেন। আহা, আয়ু।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের জীবন উপজীব্য করিয়া উপন্যাস লেখার এই বাসনা কোথা হইতে জন্মাইয়াছিল আহমদ ছফার? ইহার সামান্য উত্তর তিনি নিজেই একটি যোগাইয়াছেন। রাজু আলাউদ্দিনকে উদ্দেশ্য করিয়া আহমদ ছফা বলিলেন, “এই লোকটাকে আমার কাছে খুব … এনিগম্যাটিক মনে হয়।”

‘এনিগম্যাটিক’ মানে কী, এই কথার উত্তরে তিনি আবার বয়ান করিতে লাগিলেন, “.. এই যে হঠাৎ করে একটি কৃষি ব্যাকগ্রাউন্ড (কৃষক সমাজ) থেকে ভারতের ক্লাসিক্যাল মিউজিকের একদম চূড়োয় ওঠা, সেটা আমার কাছে বিস্ময়কর ব্যাপার মনে হয়।”

আমার প্রশ্নের উত্তরও এইখানে (বিশেষ) পাইয়া গেলাম। প্রশ্নটা ছিল, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান যে ধরনের কৃষি ব্যাকগ্রাউন্ড হইতে উঠিয়াছেন, আহমদ ছফাও কি তাহার কম কিংবা অন্য কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড হইতে আসিয়াছেন?

বাকি রহিল সিদ্ধির প্রশ্ন। আলাউদ্দিন খান সাহেব ভারতবর্ষীয় সঙ্গীতের চূড়ায় উঠিয়াছিলেন। কিন্তু আহমদ ছফার জন্য আল্লাহতায়ালা কোন পর্বতের চূড়া নির্ধারণ করিলেন? আমার সবিনয় নিবেদন এই ছোট্ট প্রশ্নটিই। আলাউদ্দিন খান সাহেবের ভিতরে যে আগুন, সুরের আগুন, আহমদ ছফার ভাষায় বলিলে ‘অগ্নি, পবিত্র অগ্নি’ আমরা প্রত্যক্ষ করি তাহা ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

আহমদ ছফা নিছক বিনয়ের অবতার নহেন। তবু তিনি আপন জবানে বলিলেন, “আমি সেই ব্যাখ্যাটা করতে পারব, এই দাবি করাটা বেয়াদবি হবে।”

তারপরও তিনি যোগ করিতে কসুর করিলেন না, “আমি যদি গোটা জীবন ব্যয় করে একটা উপন্যাস লিখতে পারতাম, দ্যাট উডবি এ ওয়ান্ডারফুল থিং [তাহা হইত একটি আশ্চর্য জিনিস]।”

রাজু আলাউদ্দিন জিজ্ঞাসিলেন, তো, তাহা কি আলাউদ্দিন খাঁকে নিয়াই? উত্তরে আহমদ ছফা– বলাবাহুল্য– হ্যাঁ-ই বলিয়াছিলেন।

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের কীর্তিতে আহমদ ছফা আপ্লুত হইয়াছিলেন শুদ্ধ সঙ্গীতের খাতে নহে। পূর্ব বাংলার শ্যামলিমায় তাঁহার জন্ম হইয়াছিল বলিয়াও। সঙ্গীতের মধ্যেও আহমদ ছফা সমাজ– বিশেষ বলিতে জাতীয় সমাজ– আবিষ্কার করিয়াছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া হইতে গাছবাড়িয়া কত আর দূরে? আমার বিশ্বাস, আহমদ ছফা সেই দূরত্বও মাপিয়াছিলেন।

আর জাতীয় সমাজের পরাকাষ্ঠা কে না জানে স্বয়ং রাষ্ট্র আকারে দেখা দেয়। জার্মান তত্ত্বচিন্তাবিদ গেয়র্গ হেগেলের দোহাই পাড়িয়া আহমদ ছফা প্রায়ই বলিতেন, কোনো জাতির সবচেয়ে বড় সৃষ্টিকর্ম হইতেছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রকে এই গুরুত্ব দিতেন বলিয়াই তিনি জীবনের পাকাভাগে আসিয়া বুঝিতে পারিলেন, বাংলার গত তিন হাজার বছরের ইতিহাসে শেখ মুজিবের তুলনা নাই। কারণ, “শেখকে আশ্রয় করে এ অঞ্চলের লোক একটি রাষ্ট্র পেয়েছে।”

আহমদ ছফা জাতীয় রাষ্ট্র স্থাপনকে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মনে করিতেন? তিনি বিশ্বাস করিতেন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়াই কোনো জাতি বিশ্ব ইতিহাসে প্রবেশ করার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। সেই জন্যই তিনি শেখ মুজিবের স্থান কোথায় তাহা লইয়া সংশয়ে ভোগেন নাই।

১৯৭৭ সালের দিকে লেখা একটি প্রবন্ধে তিনি লিখিয়াছিলেন, শেখ মুজিব ইতিহাসের স্রষ্টা নহেন, বরং ইতিহাসই তাঁহাকে সৃষ্টি করিয়াছে। সেই বিশ্বাস হইতে তিনি এক পাও নড়েন নাই। তিনি শেখকে ‘বড় মানুষ’ মনে করিলেও কখনও ‘অতিমানুষ’ ভাবেন নাই। ১৯৯১ সালের মাঝামাঝি দেওয়া একটি জবানবন্দীতে তিনি– সঙ্গত কারণেই– বলেন, “শেখকে আশ্রয় করে এ অঞ্চলের লোক একটি রাষ্ট্র পেয়েছে। এটা অস্বীকার করলে নিজের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা হবে। কিন্তু ‘বঙ্গবন্ধু’, ‘জাতির পিতা’ ইত্যাদি বলে অতিশয়োক্তি করতে বিরক্ত লাগে।”

রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করারও একটা ইতিহাস কিন্তু আছে। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করিয়াছে, সন্দেহ নাই। কিন্তু ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার জন্যও বাংলাদেশ কম সংগ্রাম করে নাই। বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পিছনে শুদ্ধ ব্রিটিশ পরাধীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের দুইশত বৎসর কেন, তাহার আগেকার পাঁচ কী সাতশত বৎসরের হিন্দুস্তান বা দিল্লিবিরোধী জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লড়াইও তো ভুলিয়া যাইবার ঘটনা নহে। কথাপ্রসঙ্গে ১৯৯২ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলিয়াছিলেন, “আমাদের রাজনীতির বয়স কত? ৩০ বছর? কিন্তু বাংলাদেশের সমাজের বয়স ১০০০ বছর।”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পো ধরিয়া আহমদ ছফাও বলিয়াছেন, রাষ্ট্র যদি সমাজের সবকিছুর উপরে খবরদারি করে তাহার ফল সচরাচর শুভ হয় না। সমাজকেই– মানে রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার পর যে নতুন সমাজ দানা বাঁধে সেই সমাজকে– জাতীয় সমাজকেই ভার দিতে হইবে রাষ্ট্র দেখাশোনার। স্বর্গ হইতে রাষ্ট্র গড়িয়া দিতে কেহ আসিবে না। লন্ডন, পিন্ডি, দিল্লি হইতেও কেহ আসিতে পারিবে না।

আহমদ ছফা বলিতেছেন, “আমাদের নিজেদের মধ্য থেকে একটা রেনেসাঁসের দরকার। এর আগেও এ কাজটি যে করা হয়নি তা নয়। এমনকি [মওলানা] আকরম খাঁ বা [তোফাজ্জল হোসেন] মানিক মিয়া সাহেবও তাঁদের লিমিটেড ক্যাপাসিটি, সীমিত সামর্থ্য থেকে এটা করেছেন। এটা করার জন্য যা দরকার তা হল মাটি ও মানুষের প্রতি আনুগত্য।”

শুদ্ধ রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠাই, দুর্ভাগ্যের মধ্যে, শেষ কথা নহে। মানুষকে উদ্ধুদ্ধ করিবার জন্য প্রচণ্ড মানসিক শক্তিও দরকার। এই মুহূর্তে যাহাকে খবরের কাগজ হইতে শুরু করিয়া ভাড়াটিয়া লেখিকা সকলেই বলেন বিশ্বযোগের ক্ষণ– সেই মুহূর্তে জাতীয় সমাজের দিশাহারা হইবার যোগাড়।

আহমদ ছফা বলিতেছিলেন, “আমাদের উচিত এ সময় একটি জাতীয় মানস তৈরি করা, যাতে করে পৃথিবীর তরঙ্গগুলো আমরা রিসিভ (গ্রহণ) করতে পারি।”

কিন্তু আরও দুর্ভাগ্যের কথা, আমাদের দুই প্রধান নেতা মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিব। আহমদ ছফার আক্ষেপ– আহা, এ দুজনের যদি আধুনিক শিক্ষার আলো থাকত! তিনি ব্যাখ্যা করিতেছেন এইভাবে: “মাওলানা সাহেব ছিলেন ট্রাডিশনাল লিডার (অর্থাৎ মান্দাতার আমলের মানে নেতারা যেমন হইয়া থাকেন তেমন নেতা) আর শেখ সাহেব ছিলেন একেবারে জননন্দিত ব্যক্তি।’’

জনপ্রিয়তাই শেষ কথা নহে, যোগ্যতাও একটি ঘটনা বিশেষ। আহমদ ছফা একটি প্রশ্নে অকপট: “রাজনৈতিক অঙ্গনে শেখ মুজিবের অবদান খুবই মূল্যবান। তিনি হাজার বছরের সবচাইতে মূল্যবান ব্যক্তি। কিন্তু একটা রাষ্ট্র চালানোর জন্য যে সব বিষয়ে আধুনিক শিক্ষা থাকা দরকার ছিল, আমলাতন্ত্র, শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এগুলো তাঁর দখলে ছিল না।”

আহমদ ছফার বাসনা, “এই অভাব কাটিয়ে উঠতে হবে। এখন যাঁরা আছেন তাদেরকে সবদিক দিয়ে আধুনিক করে গড়ে তুলতে হবে।”

এখন কাঁহারা এই কাজটি করিবেন?

আরেক সাক্ষাৎকারপ্রার্থী তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, “এত বিভিন্ন ধরনের কাজ করেন আপনি। আসলে কী হতে চেয়েছিলেন?”

জবাবে আহমদ ছফা বলিয়াছিলেন, “ইচ্ছে ছিল লেখক, ব্যবসায়ী বা রাজনীতিক হব। রাজনীতিক হওয়া সম্ভব না এটা বুঝেছি অল্পদিনেই। কারণ রাজনীতি করতে গেলে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। যে ধরনের কৌশল করতে হয় সে সবের যোগ্য আমি নই।”

ঠিকই বলিয়াছিলেন তিনি। ব্যবসায়ী হওয়ার মতো পরিষ্কার কপালও তাঁহার হয় নাই।

অগত্যা এই লেখক হওয়া ছাড়া আহমদ ছফার আর গতি ছিল না। অথচ তাহাতেও তাঁহার পুরাপুরি সাড়া ছিল না। একই প্রশ্নকর্তাকে তিনি আরেক উত্তরে বলিতেছিলেন, “কবি-লেখক-শিল্পী এগুলো তো মানুষ পরিচয়ের খণ্ডাংশ!”

পূর্ণাঙ্গ মানুষ হইয়া বাঁচার ইচ্ছা তাঁহার প্রচণ্ড ছিল। এমন দিনে তাঁহাকে কী বলা যায়? আমিও অনন্যোপায় হইয়া তাঁহাকে কিছুদিন ধরিয়া ‘রাষ্ট্রচিন্তাবিদ’ বলিয়া আসিতেছি। ইহাতে তিনি কি সায় দিতেন? নিশ্চিত বলিতে পারি না। রাজনীতিক হইবার বাসনা তিনি যদি-বা ত্যাগও করিয়া থাকেন, পুরাপুরি বোধহয় করিতে পারেন নাই। রাষ্ট্রচিন্তার আড়ালে সেই দলিত বাসনাই কি উঁকি মারিতেছে না? আহমদ ছফা আসিয়াছিলেন আমাদের সমাজের সেই স্তর হইতে যাহাকে ১৯৭১ সালের পর হইতে ভারতবর্ষের চিন্তা-ব্যবসায়ীরা ‘দলিত’ নাম দিয়াছেন।

আমাদের দেশের এক প্রধান চিন্তা-ব্যবসায়ী (যিনি নিজের পরিচয় ‘বাঘের বাচ্চা’ বলিয়াই দিয়াছেন তিনি) রায় দিয়াছেন, ‘‘জানালায় উড়ে বসছে আরশোলা, সেও আজ রাষ্ট্রচিন্তাবিদ।’’

আমার কেবল জানিতে সাধ এই ‘আরশোলা’ পতঙ্গটির অপমান করিয়া তিনি কাঁহার নাম গোপন করিতেছেন? আহমদ ছফার না তো? একমাত্র আল্লাহ রব্বুল আলামিন মালুম।

আমরা কয়েকজন আহমদ ছফার ছাত্রও আজ প্রাণধারণ করি। আমরা তাঁহাকে মাঝেমধ্যে যেমন এই নিবন্ধেও ‘মহাত্মা’ বলিয়া শান্তি পাই। খুব কম লোককেই আমরা ‘মহাত্মা’ বলি। তাই ভাবিতেছি আহমদ ছফার ‘মহাত্মা’ উপাধিকে না শ্লেষ করিয়াই আমাদের দেশের চিন্তা-ব্যবসায়ী লিখিলেন:

“নেকড়ে মতো চোখ মহাত্মা ইঁদুর আমি তোমাকেও চিনি
খুঁদকুড়া খেয়েছিলে রাত্রিদিন আমারই ভাণ্ডার থেকে জানি
কতোবার ভেংচি কেটে লুকিয়ে গিয়েছ গর্তে কখনও ধরিনি।”

আমাদের প্রশ্ন, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান ও শেখ মুজিব, মাওলানা আকরম খান ও মাওলানা ভাসানী, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া– ইঁহারা সকলেই কি আরশোলা অথবা ইঁদুর পদবাচ্য প্রাণি? যদি না হইয়া থাকেন তাহা হইলে মহাত্মা আহমদ ছফার দোষটা কোথায়?

অনন্ত জলিল একজন চলচ্চিত্র ব্যবসায়ী। তাঁহার ‘নিঃস্বার্থ ভালোবাসা’ নামক সিনেমার একটা বিজ্ঞাপন শুনিলাম। অনন্ত নামটা ইংরেজি অক্ষরে লিখিতে পহেলা ‘এ’ অক্ষরটা লাগে। আর অ্যাকশন লিখিতেও ‘এ’ লাগে। অতএব অনন্ত জলিলের ছবিতে অ্যাকশন থাকিবেই।

আহমদ ছফার নাম লিখিতে বাংলায় ‘স্বরে আ’ লাগে। আর ‘আরশোলা’ লিখিতেও প্রথমে লাগে ‘আ’ অক্ষর।

চিন্তা-ব্যবসায়ীও কি এ কথাই ভাবিতেছেন?

ঢাকা, ৩১ আগস্ট, ২০১৩

দোহাই

১. আহমদ ছফা, ‘সুর সম্রাটের মৃত্যুস্বপ্ন’, আহমদ ছফা রচনাবলী, ৮ম খণ্ড (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮) পৃ. ৪৪৯ -৪৬১।

২. আহমদ ছফা, ‘আমি যদি পুরো জীবন ব্যয় করে একটা উপন্যাস লিখতে পারতাম’, রাজু আলাউদ্দিন, আলাপচারিতা, (রাজনীতি, সংস্কৃতি, সমাজ ও সাহিত্য বিষয়ক সাক্ষাৎকার ঢাকা : পাঠক সমাবেশ, ২০১৩), পৃ. ২১১-২২৪)।

৩. আহমদ ছফা, ‘আহমদ ছফা: প্রজ্ঞার আলো,’ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন রাজু আলাউদ্দিন ও জুলফিকার হায়দার, বাংলাবাজার পত্রিকা, ২৩ শ্রাবণ-১৩৯৯।

৪. আহমদ ছফা, ‘বাংলার গত তিন হাজার বছরের ইতিহাসে মুজিবের তুলনা নেই’- সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন মারুফ রায়হান, সাপ্তাহিক পূর্বাভাস, ২৬-২৯ জুলাই, ১৯৯১।

৫. ফরহাদ মজহার, ‘ইস্পাতের ঠোঁট’, ৬ আগস্ট ২০১৩, পরিবর্তনডটকম

 

 

২ সেপ্টেম্বর ২০১৩, bdnews24.com, মতামত বিশ্লেষণ

Leave a Reply