অমৃত সমান: আহমদ ছফার তিন দফা সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে

প্রবীণ আহমদ ছফা সাধক সৈয়দ মনজুর মোরশেদ চট্টগ্রাম শহর হইতে বেশ দূরে রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় বসবাস করেন। একদা তিনি তাঁহার সযত্ন সংগ্রহ হইতে আহমদ ছফার ‘অলাতচক্র’ নামধেয় মহান উপন্যাসের প্রথম (পত্রিকা) সংস্করণ উদ্ধার করিয়া বাংলা সাহিত্যের অশেষ উপকার করিয়াছিলেন। কিছুদিন আগে তিনি আমাদের আরো ঋণী করিয়াছেন। তাঁহার সংগ্রহশালা হইতে আমরা মহাত্মা আহমদ ছফার দুইটি দুষ্প্রাপ্য সাক্ষাৎকার জাতীয় রচনা পাইয়া আরো অধমর্ণ হইয়াছি। ‘সর্বজন’ পত্রিকায় এই দুইটি রচনা প্রকাশ করিবার অনুমতি দিয়া তিনি আমাদের চিরানুগৃহীত করিয়াছেন। বলা বাহুল্য, এই দুই রচনা এখনো নয় খণ্ড ‘আহমদ ছফা রচনাবলি’র অন্তর্গত হয় নাই।

এই সাক্ষাৎকার দুইটির একটিতে তারিখ পাওয়া গিয়াছে ২৩ এপ্রিল ১৯৯৪। ইহা প্রকাশিত হইয়াছিল দৈনিক ‘আজকের কাগজ’ পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী ‘সুবর্ণরেখা’য়। প্রকাশের তারিখ পাওয়া যায় নাই, তবে আলোচনার তারিখ উল্লেখ করা হইয়াছে। পত্রিকার ফাইল ঘাঁটিলে এখন প্রকাশের তারিখও পাওয়া যাইবে। এই পত্রিকার সম্পাদকেরা জানাইয়াছেন রচনাটি তাঁহাদের ভাষায় ‘একটি অংশগ্রহণমূলক আলোচনার সংক্ষিপ্ত অনুসৃতি’; আর শিরোনামায় ব্যবহৃত ‘চাই সমান্তরাল সংস্কৃতি’ কথাটিও মনে হইতেছে সম্পাদক সাহেবানের দান। অবশ্য আহমদ ছফার বক্তব্য হইতে এই শিরোনাম চয়ন করা। অবশ্য ‘সমান্তরাল সংস্কৃতি’ বলিতে কি বুঝায় তাহা বড় পরিষ্কার হয় নাই। আহমদ ছফার জবানিতে বলা হইয়াছে — বলা বাহুল্য এই জবানিটা ১৯৯৪ সালের — ‘এখন সর্বাগ্রে প্রয়োজন সমান্তরাল সংস্কৃতির জোয়ার’।

আলোচনটি পুরাপুরি পড়িলে অনুমান করা যাইবে তখন দেশে সংস্কৃতির নামে যাহা চলিতেছিল আহমদ ছফা কেন তাহার অনুমোদক ছিলেন না। যাহা চলিতেছিল তাহাকে প্রতিরোধ করিতে হইবে। আর প্রতিরোধ হইতে জন্মাইবে নতুন সংস্কৃতি। এই ঘটনাকেই — যাহা সম্ভব অথচ যাহা এখনো ঘটে নাই — আহমদ ছফা বলিয়াছেন ‘সমান্তরাল সংস্কৃতি’; কথাটা বড় বেমানান হয় না। বুঝিতে কষ্ট হয় না তাঁহার বাসনাটা কোথায়। তিনি চাহিতেন এই স্থবিরতা গতিশীলতার দিকে ধাবিত হৌক।

একটা উদাহরণ দিলেই স্পষ্ট হইবে। আহমদ ছফা বলিতেন, ‘আমাদের তথাকথিত প্রগতিশীল লেখকেরা নতুন সমাজ নির্মাণের কথা বলেন। তারা ম্যান্ডেলার মুক্তি নিয়ে কবিতা লেখেন। রাজনীতিকরা ঢাকার রাজপথে ম্যান্ডেলার জন্য মিছিল করেন। অথচ ফারাক্কার মত এত জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আজ পর্যন্ত কোন লেখক একটি কথাও বলেন নি। একটি বাক্যও লেখেন নি।’ (ছফা [১৯৯৪]: ৫)

আরেকটি উদাহরণ আশা করি বাহুল্য বিবেচিত হইবে না। বাংলাদেশের ‘প্রগতিশীল’ শিল্পীদের হাড়িও তিনি হাটে ভাঙ্গিয়া দিয়াছেন। বলিয়াছেন, ‘নন্দলাল বসুর প্রথম পেইন্টিং যেটি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল তা একটি নামাজের দৃশ্য। মুসলমান কৃষকেরা ধান কাটার পর নামাজ পড়ছে। বাংলাদেশের যে কোন পেইন্টার বা চারুশিল্পী জানাযা, নামাজ এ সকল বিষয়ে কোন পেইন্টিং করতে নারাজ। এতে যে তারা প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে যাবেন!’ (ছফা [১৯৯৪]: ৫)

কবিতার ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি। যতদূর জানি আহমদ ছফার কোন ব্যক্তিগত শত্রু ছিল না। শুধুমাত্র স্পষ্ট কথা স্পষ্ট শব্দে বলার দোষে তিনি শাসক বুর্জোয়াশ্রেণির বিরাগ উপার্জন করিয়াছিলেন। একটি নমুনা হাজির করা যাইতে পারে। তখন কোন কোন মহল কবি শামসুর রাহমান ও তাঁহার মতন দুই চারিজন কবি ও লেখককে বাজারে বড় লেখক বলিয়া চালাইতেছিলেন। আহমদ ছফা কাট কাট ভাষায় বলিলেন, ‘শামসুর রাহমান যা নন, তাঁকে যদি তাই বানানো হয় তা হলে দেশের যেমন লাভ হবে না; শামসুর রাহমানেরও কোন লাভ হবে না।’ যোগ করিতে কসুর করিলেন না আহমদ ছফা,

আমার ধারণা শামসুর রাহমান এখন যে ধরনের গদ্য পদ্য লিখছেন পাকিস্তানের শেষপর্বে কবি গোলাম মোস্তাফার লেখার সংগে তার তুলনা করা যেতে পারে।

বর্তমানে শামসুর রাহমানের রচনায় কোন আবিষ্কার নেই, কোন বিস্ময়বোধ নেই। তাঁর কবিতার অভ্যাসের জের এবং গদ্য একাদশ দ্বাদশ শ্রেণীর বালক-বালিকাদের রচনার চাইতে একটুও উৎকৃষ্ট নয়। এ রকম একজন লোক নিয়ে কি করে বড় স্বপ্ন দেখেন, সাহিত্যিক উঁচু অবস্থান দাবি করেন, আমি তার হিসেব মেলাতে পারি না। (ছফা [১৯৯৪]: ৫)

হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন ও তসলিমা নাসরিন প্রমুখ লেখকদের তিনি অন্যশ্রেণিতে তালিকাভুক্ত করিয়াছিলেন। তাঁহার বিচারে ইঁহারা পাঠককুলের ‘জ্ঞান ও রুচি’ ধ্বংস করিতেছেন। আহমদ ছফার কথায়, ‘এ সকল লেখকদের আমি সৈয়দ মুজতবা আলীর “দেশে-বিদেশে”-র বাচ্চা সাকাও-র সাথে তুলনা করি।’ (ছফা [১৯৯৪]: ৫)

আহমদ ছফার মীমাংসা পরিষ্কার: ‘এভাবে জাতি বাঁচতে পারে না। সংস্কৃতির দূষণ থেকে এ জাতিকে উদ্ধার করা জরুরি।’ তিনি তাকাইয়া ছিলেন বাংলাদেশের তরুণদের দিকে। আর ভরসা রাখিয়াছিলেন, তাঁহার নিজস্ব মুদ্রায়, ‘বাঙালি জাতির প্রথম নিজস্ব স্বাধীন’ রাষ্ট্রের উপর। সেই রাষ্ট্র তাঁহার আশা পূরণ করে নাই।

সৈয়দ মনজুর মোরশেদ দ্বিতীয় যে লেখাটি সংগ্রহ করিয়াছেন তাহার প্রকাশস্থল ‘সচিত্র স্বদেশ’। এই পত্রিকাটি দীর্ঘায়ু হয় নাই। আমাদের হাতের সাক্ষাৎকার গোত্রের লেখাটির শিরোনান বেশ দীর্ঘ: ‘মুক্তিযুদ্ধের ওপর তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য বিশুদ্ধ বই আমি দেখিনি’। পত্রিকার কোন সংখ্যায় এই রচনা মুদ্রিত হইয়াছিল জানিতে পারি নাই। আমাদের হাতের এই একপাতায় শুদ্ধ মুদ্রিত আছে ‘সচিত্র স্বদেশ’, পৃষ্ঠা ৫৩। রচনার অন্তরীণ সাক্ষ্য অনুসারে সময়টা ১৯৮০ সালে যে দশক শুরু হইয়াছিল তাহার মাঝামাঝি।

আহমদ ছফা একবাক্যে বলিয়াছিলেন, ‘আমি আগেই বলেছি, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত অবস্থাকে ধারণ করে সত্যিকার সাহিত্য রচনা এখনো হয়নি। আমার ধারণা, ১৫ বছর সময় যথেষ্ট নয়।’ তাই অনুমান করি এই রচনাটি পত্রস্থ হইয়াছিল ইংরেজি ১৯৮৬ কিংবা ১৯৮৭ সালের দিকে। ১৯৭১ হইতে ১৫ বছর পর আর কি হইতে পারে!

এই স্বল্পায়তন রচনাটিতেও টের পাওয়া যায় কেন আহমদ ছফার কথা অমৃত সমান।

সৈয়দ শামসুল হকের ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নামক কাব্যনাট্যটি ততদিনে বাজারে বিরাজ করিতেছে। আহমদ ছফা বলিতেছেন, ‘এটি মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে লেখা। কাঠামো ও আঙ্গিকের দিক থেকে ঠিক আছে, কিন্তু প্রাণপ্রবাহের দিক থেকে সেটা ব্যর্থ। মনে হয়, এটি দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় ব্যক্তির অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে লেখা।’ (ছফা [১৯৮৬]: ৫৩)

এহ বিশেষ। এখন আহমদ ছফা সামান্যে প্রবেশ করিবেন। তিনি প্রথমেই অঙ্গীকার করিতেছেন, স্বাধীনতা সংগ্রাম আমাদের সাহিত্যকে প্রবলভাবে নাড়াইয়া দিয়াছে। সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে সম্ভাবনার দুয়ার খুলিয়া দিয়াছে। অথচ ১৫ বছরেও সেই সম্ভাবনা মূর্তি ধরিতে পারে নাই। আহমদ ছফার নালিশ: ‘মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করে লেখা সাহিত্যে যুদ্ধের জীবন অনুপস্থিত।’

তিনি বিশদ করিতেছেন:

আসলে যুদ্ধের শুরু কিভাবে, কারা ভারতে গেলো, কিভাবে গেলো, শরণার্থী শিবিরে কারা কিভাবে ছিলো? কারা শরণার্থী শিবিরে ছিলো না, কারা থিয়েটার রোডে ছিলো কিংবা কারা ঘরে ফিরে এলো, কারা ফিরতে পারলো না — সে সব বিষয়ের দিকে দৃষ্টিপাত না করে একটা যুদ্ধ হয়ে গেছে মনে করে একটি কল্পনার নায়ক বানিয়ে, পাক বাহিনীকে কষে গালি দিলে, দুয়েক জন ধর্ষিতা বোনের চিত্র অংকন করলে একটি যুদ্ধের সাহিত্য রচনা করা যায় এ রকম একটা অপচেষ্টা আমাদেরকে পেয়ে বসেছে। এই প্রবণতা সাহিত্যক্ষেত্রে আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে জানি না। (ছফা [১৯৮৬]: ৫৩)

এতদিনে সে আশঙ্কা সত্য হইয়াছে।

আহমদ ছফার নিজের হাতের ‘অলাতচক্র’ ঠিক এই সময়েই রচিত হইয়াছে। নিজের লেখা সম্পর্কে এই জায়গায় তাঁহাকে বিশেষ বলিতে দেখি না। নিজের লেখা লইয়া বলিতে আহমদ ছফার যে বড় লাজুকভাব ছিল ঘটনা কিন্তু তেমনও নহে। এক তরুণ সাহিত্য ব্যবসায়ী একদা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, ‘বাংলাদেশে বর্তমানে কোন লেখকের কোন লেখা কি ভবিষ্যতে ক্লাসিক হিসেবে চিহ্নিত হবে বলে আপনি মনে করেন?’ আহমদ ছফার উত্তর ছিল সোজা: ‘একটা লেখা ক্লাসিক হিসেবে চিহ্নিত হবে বলে আমি মনে করি। সেটা হলো আমার লেখা “ওঙ্কার”।’ (ছফা ২০০৮: ৩৯৯)

সাক্ষাৎকার শিকারির নাম বিপ্লব রহমান। তিনি অতঃপর জিজ্ঞাসিলেন, ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের “চিলেকোঠার সেপাই”?’ আহমদ ছফা কহিলেন, ‘লেখাটা আমি পড়েছি। অসাধারণ গ্রন্থ। আমার একটা নালিশ আছে, এর ভাষাটা খুব নিরস।’ ইলিয়াস যথাসময়ে এই নালিশের শোধ তুলিয়াছিলেন। ‘অলাতচক্র’ উপন্যাসকে তিনি ক্রোধের কাছে আত্মসমর্পণ বলিয়া খাট করিয়াছিলেন।

১৯৯৩ সালের কথা। বিপ্লব রহমান জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন: ‘আপনার কাছে আমাদের শেষ প্রশ্ন, আপনি কেন লেখেন?’ আহমদ ছফা নিবেদন করিলেন: ‘আমি সাধারণত তিনটি কারণে লিখি। মানুষের কল্যাণ করার উদ্দেশ্য যদি থাকে, তখন লিখি। যদি আর্টিস্টিক কিছু সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য থাকে, তখন লিখি। আর যখন কোন কিছুর প্রতিবাদ করার ইচ্ছা থাকে, তখন লিখি।’ (ছফা ২০০৮: ৪০১)

বঙ্গের নবীন লেখকদিগের উদ্দেশে প্রথম দুইটি কথা বঙ্কিমচন্দ্রও নিবেদন করিয়াছিলেন। তিন নম্বর কথাটিই — ‘প্রতিবাদ করার ইচ্ছা থাকে, তখন লিখি’ — আহমদ ছফার এক ফোটা শিশির। বঙ্কিমচন্দ্রের শিব ও সুন্দরের সহিত আহমদ ছফা যোগধন একটিই। সেই যোগ প্রতিবাদ। সেই যোগ সত্যম্।

১৯৯৯ সালের মধ্যভাগে মহাত্মা আহমদ ছফা একদফা মার্কিন দেশে তশরিফ আনিয়াছিলেন। উপলক্ষ উত্তর আমেরিকা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন। ১৯৯৯ সালের সম্মেলনটি ছিল ঐ ঘরানার চতুর্থ মিলন। সম্মেলনটি আয়োজন করিয়া থাকেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ হইতে যাহারা মার্কিন মুলুক ও কানাডায় বসবাস করিতে গিয়াছেন তাহাদের পরিজন। বাংলাদেশের কোন কোন প্রবাসী নাগরিকও তাহাদিগকে সমর্থন করেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ শুদ্ধ পূর্ববাংলার ক্ষতি করে নাই পশ্চিমবঙ্গকেও নাজেহাল করিয়াছে। বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র আকারে দাঁড়াইবার পর পশ্চিমবঙ্গে একটা নতুন চিন্তার আকার দানা বাঁধিতেছে। আহমদ ছফার লেখা এই নতুন চিন্তাবিদদের আকৃষ্ট করিয়াছিল। তাই তাহারা তাঁহাকেও সেবার টেক্সাস রাজ্যের আরভিং শহরে ডাকিয়াছিলেন।

আমাদের সংগ্রহ করা এই তিন নম্বর সাক্ষাৎকারটি সেই যাত্রার ফসল। এই চয়নিকা ইন্টারনেট পত্রিকা ‘পরবাস’ সম্পাদকদের পছন্দের ফসল। ইহার পহিলা প্রকাশ ঘটে ‘পরবাস’ সাময়িকীর ৩য় বর্ষ ২য় সংখ্যায় — মানে ১৪০৬ বাংলা সালের (মোতাবেক ইংরেজি ১৯৯৯ সালের) শরৎ সংখ্যায়। এই সাক্ষাৎকারে প্রধানত স্থান পাইয়াছে আহমদ ছফার সহিত খ্যাতনামা পশ্চিমবঙ্গীয় গবেষক প্রবীণ সুধীর চক্রবর্তীর বাতচিত। আলোচনার গতিপথ বাংলাদেশের বর্তমান সাহিত্যক্ষেত্র হইতে বাংলাদেশের নিকট অতীত হইতে অদূর ভবিষ্যৎ পর্যন্ত গড়াইয়াছিল।

এই আলোচনার অল্প আয়তনের মধ্যেও আহমদ ছফার চিন্তার ব্যাপ্তি ও বেধ দুইটাই পড়িয়াছে। আগের দুই রচনায় যেমন দেখা গিয়াছিল এখানেও তেমন দেখা যাইতেছে। আহমদ ছফার কোন বাক্যই কপট নহে। তিনি এক পর্যায়ে বলিতেছিলেন, একসময় তাঁহার যুগের লেখকেরা যখন লেখায় আত্মনিয়োগ করিয়াছিলেন তখন লেখকদের সামনে একটা লক্ষ্য ছিল। আহমদ ছফার কথায়, ‘আমরা দেশকে স্বাধীন করব, তারও পরে দেশটাকে তৈরী করব।’ আর এখন? আহমদ ছফার মতে, ‘এখন তরুণদের সামনে কোন স্বপ্ন নেই।’ (ছফা ১৪০৬)

কিন্তু আহমদ ছফা অনেক দূরের সম্ভাবনাও দেখিতে পাইলেন। তিনি মনে করেন ইংরেজি বিংশ শতকে ‘বাঙ্গালির শ্রেষ্ঠ অর্জন’ হইতেছে ‘বাঙ্গালির একটা নিজস্ব জাতীয় রাষ্ট্র’। বলা প্রয়োজন, ‘পশ্চিম বাংলা এর বাইরে নয়’ কথাটিও তিনি যোগ করিতে ভোলেন নাই। (ছফা ১৪০৬)

ইতিহাস হাজির নাজির মানিয়া তিনি নির্দেশ করেন এখন উত্তর ভারতে যে রাজনৈতিক তৎপরতা দেখা যাইতেছে তাহা ভারতকে একত্রে, একসাথে রাখিতে নাও পারে। ভারতের ইতিহাস বার বারই সাক্ষ্য দেয় কেন্দ্র হইতে বেশি চাপ দেওয়ার ফলে দেশের নানা অংশ স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করিয়াছে। ভবিষ্যতে তাহার ব্যতিক্রম হইবে কেন? আহমদ ছফার মতে দক্ষিণ এশিয়া কিংবা ভারতবর্ষ উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র তৈয়ার হইবার তাৎপর্য অশেষ। সুধীর চক্রবর্তীর মত, ‘দুই বাংলা মিলেও যেতে পারে’ শুনিয়া আহমদ ছফা কবুল করিলেন, ‘আমার তাই বিশ্বাস।’ (ছফা: ১৪০৬)

আহমদ ছফা এই সাক্ষাৎকারটি সোনার চেয়ে দামি। ইহার এক জায়গায় তিনি বলিয়াছেন বাংলাদেশ না ভাঙ্গিলে হয়ত ভারতও ভাগ হইত না। তাহা হইলে প্রশ্ন উঠিবে বাংলা ভাগ করিল কে? আহমদ ছফা সহজ ভাষায় দায়ী করিয়াছেন একদিকে শাসক ব্রিটিশ জাতিকে, অন্যদিকে ভারতের অন্যান্য জাতি, বিশেষ পাঞ্জাবি ও মাড়োয়ারি জাতির ব্যবসায়ী শ্রেণিকে। আহমদ ছফার এই কথাগুলি হয়তো অকথিতপূর্ব নহে, কিন্তু এখনো এইসব কথার মধ্যে আবিষ্কার আছে, বিস্ময়বোধ আছে। যেমন তিনি এক জায়গায় বলিলেন, প্রথম হইতেই ব্রিটিশ সরকারের একপ্রস্ত ষড়যন্ত্র ছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে পর্যন্ত তিনি ষড়যন্ত্রের একটা সোপান ধরিয়া লইয়াছেন। অবশ্য ইতিহাসকে মাত্র ‘ষড়যন্ত্র’ শব্দে ঠিক কতটুকু হজম করা যাইবে বলা কঠিন।

কিন্তু আহমদ ছফার দ্বিতীয় কথা ১৯৪৭ সালের দেশভাগ বা দ্বিতীয় বঙ্গভঙ্গ যে বাঙ্গালি মধ্যবিত্ত শ্রেণির ‘আত্মহত্যা’ বিশেষ তাহা এতদিনে অনেক ইতিহাস ব্যবসায়ীর নজরে পড়িতেছে। চিত্তরঞ্জন ওরফে সি. আর. দাশের বঙ্গীয় সমঝোতা বা বেঙ্গল প্যাক্ট যদি ভাঙ্গিয়া না যাইত তো বাংলাদেশ ভাগ হইত না। আহমদ ছফার এই বিশ্বাসও ইতর বস্তু নহে। এই প্যাক্ট ভাঙ্গার পিছনে যাহাদের হাত ছিল তাহা পরিষ্কার হইয়াছে আরো পরে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মধ্যে। এই যুদ্ধে বাংলার অর্থনীতি নষ্ট হইয়া গেল। শুদ্ধ যে অনুমান ৫০ লাখ লোক না খাইয়া মরিল তাহাই নহে, (আহমদ ২০০৬: ১৮২) আরো কথা আছে, ‘তারপর যা কিছু তৈরী হতে লাগল অবাঙ্গালিদের পয়সায়…।’ (ছফা ১৪০৬)

আহমদ ছফার শেষ কথাটি বেশ:

আমি সে সময়, ১৯৭১-এ যখন কলিকাতায় গেলাম, ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে আমি তখনকার পত্রপত্রিকা খুঁজলাম। সুভাষ বসু যখন কলিকাতা ছেড়ে চলে যাচ্ছে তখন পত্রিকাগুলো কি লিখছে… তা আমার খোঁজাখুঁজিতে যা পেলাম, বাঙালিদের পয়সা ছিল না রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর — সুভাষ বসু যে দেশ থেকে চলে গেল তার কারণ হচ্ছে পাঞ্জাবিরা, মাড়োয়ারিরা তাকে পয়সা দেয়নি আন্দোলন চালানোর জন্য, এ জন্য তাঁকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হল। বাংলার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনও মুখ থুবড়ে পড়ল। (ছফা ১৪০৬)

এই সাক্ষাৎকারের পর আহমদ ছফা আর বেশিদিন বাঁচিয়া থাকেন নাই। ২০০১ সালের ২৮ জুলাই — অনুমান দুই বছরের মাথায় — তিনি পরলোক লাভ করিলেন। সুখের বিষয়, তাঁহার অমৃত সমান কথা এখনো বাঁচিয়া আছে। এখানেও তাহার দুই চারিটি নিদর্শন ধরিয়া রাখি না কেন?

দোহাই

১.      আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পুনর্মুদ্রণ (ঢাকা: খোশরোজ কিতাব মহল, ২০০৬)।

২.      আহমদ ছফা, ‘আহমদ ছফা বললেন…,’ আহমদ ছফা রচনাবলি, ৩য় খণ্ড (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮), ৩০২-৪২৪।

৩.     ———- ‘সাক্ষাৎকার: আহমদ ছফা,’ পরবাস [ইন্টারনেট পত্রিকা], ৩য় বর্ষ ২য় সংখ্যা, শরৎ ১৪০৬ [১৯৯৯ ইংরেজি]।

৪.      ———- ‘চাই সমান্তরাল সংস্কৃতি,’ সুবর্ণরেখা, আজকের কাগজ [আনুমানিক প্রকাশকাল এপ্রিল ১৯৯৪]।

৫.      ———- ‘মুক্তিযুদ্ধের ওপর তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য বিশুদ্ধ বই আমি দেখিনি,’ সচিত্র স্বদেশ [আনুমানিক প্রকাশকাল ১৯৮৬]।

 

৩১ জুলাই ২০১৩, সর্বজন: নবপর্যায় ১৯

Leave a Reply