আহমদ ছফার সত্য ও সাহিত্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ

মহাত্মা আহমদ ছফা এন্তেকাল করিয়াছেন ইংরেজি ২০০১ সালের ২৮ জুলাই। দেখিতে দেখিতে এক যুগ — বলিতে ১২ বছর — পার হইল। আমার পরম সৌভাগ্য আমার যৌবনের প্রারম্ভেই তাঁহার দেখা পাইয়াছিলাম। আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে — অকুণ্ঠ ভাষায় বলিব — তাঁহার মতন মানুষ আর দ্বিতীয়টি দেখি নাই।

দুর্ভাগ্যের মধ্যে এইটুকু মাত্র বলিবার আছে। তাঁহার যথার্থ কদর করিবার ক্ষমতা আমার আয়ত্ত হয় নাই। একবার ভাবিয়াছিলাম যে বছর তাঁহার বয়স ষাট বছর হইবে সেই বছরের সম্মানে একটি সংবর্ধনার ডাক দিব। মানুষ ভাবে এক, খোদা করেন আর। সেই ভাবনা বুদবুদ হইল। তিনি লোকান্তরিত হইলেন। কিন্তু যাহা রাখিয়া গিয়াছেন তাহার মূল্য কত তাহাও আমরা ঠিক করিতে পারি নাই। আজিকার এই লেখায় আমি তাঁহার একটি নাতিদীর্ঘ লেখার দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে চাহিতেছি।

আমার এক সময় একটি ভুল ধারণা জন্মাইয়াছিল। মনে করিতাম আহমদ ছফা এক জীবনে যেখানে যত লেখা প্রকাশ করিয়াছেন তাহার প্রতিটি অক্ষর আমি পড়িয়া রাখিয়াছি। এতক্ষণে আমার ভুল ভাঙ্গিল। ১৯৭১ সালে আমাদের দেশে যে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ দানা বাঁধিয়াছিল আহমদ ছফার সকল লেখার কেন্দ্রে সেই মুক্তিযুদ্ধ। তাহার প্রস্তুতি এবং পরিণতি। ১৯৭৭ সালের গোড়ার দিকে তিনি ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা’ নাম দিয়া একটি বড় প্রবন্ধ লিখিয়াছিলেন। তাহাতে বলিয়াছিলেন বাংলাদেশ হইবে আমাদের দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের আদর্শ। যাহাকে বলে জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, তাহার আদর্শ। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের অমীমাংসিত জাতি সমস্যার মীমাংসা কোন পথে হইতে পারে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তাহার একটি প্রমাণ হাজির করিয়াছে। এই বিশ্বাসে আহমদ ছফা আমৃত্যু অবিচল ছিলেন।

১৯৮০ সালে যে দশকটি শুরু হইয়াছিল তাহার মাঝামাঝি প্রকাশিত একটি মুখ রচনায় তিনি অনুযোগ করিয়াছিলেন সাহিত্য এই দেশের মহান মুক্তিসংগ্রামকে কিভাবে, কতটুকু অনুপ্রাণিত করিয়াছে বলা মুশকিল। তিনি মনে করিতেন স্বাধীনতা যুদ্ধ এই দেশের সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে সম্ভাবনার দুয়ার খুলিয়া দিয়াছে অথচ তখন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধকে অবলম্বন করিয়া লেখা সাহিত্যে যুদ্ধের জীবন অনুপস্থিত। এই লেখাটি আমার আগে পড়ার সৌভাগ্য হয় নাই। চট্টগ্রামের সৈয়দ মনজুর মোরশেদ ইহার সন্ধান দিয়া আমাদের সবাইকে বাধিত করিয়াছেন।

তাঁহার কথা একটুখানি হুবহু তুলিয়া ধরি:

আসলে যুদ্ধের শুরু কিভাবে, কারা ভারতে গেলো, কিভাবে গেলো, শরণার্থী শিবিরে কারা কিভাবে ছিলো? কারা শরণার্থী শিবিরে ছিলো না, কারা থিয়েটার রোডে ছিলো কিংবা কারা ঘরে ফিরে এলো, কারা ফিরতে পারলো না — সেই সব বিষয়ের দিকে দৃষ্টিপাত না করে একটা যুদ্ধ হয়ে গেছে মনে করে একটি কল্পনার নায়ক বানিয়ে পাকবাহিনীকে কষে গাল দিলে, দু’একজন ধর্ষিতা বোনের চিত্র অংকন করলে একটি যুদ্ধের সাহিত্য রচনা করা যায় — এরকম একটা অপচেষ্টা আমাদেরকে পেয়ে বসেছে।

এই প্রবণতা তিনি, বলা বাহুল্য, অনুমোদন করেন নাই। তাঁহার আশঙ্কা ছিল এই প্রবণতা সাহিত্যক্ষেত্রে আমাদের বিপথগামী করিবে। দুঃখের সহিত স্বীকার করিতে হইবে আজও সেই আশঙ্কা অমূলক প্রমাণিত হয় নাই।

আহমদ ছফা লক্ষ্য করিয়াছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে আমাদের সাহিত্যের প্রধান উপজীব্য ছিল ত্রিকোণাকৃতির প্রেম। এই ধরনের ছকেই রচিত হইত গল্প। উদাহরণ আকারে তিনি শওকত ওসমানের রচিত ‘ক্রীতদাসের হাসি’ উপন্যাসটির কথা উল্লেখ করিয়াছিলেন। বলিয়াছিলেন শওকত ওসমানের মতন সাহিত্যিকেরও বাগদাদের কাহিনী লইয়া লিখিতে হইয়াছে ‘ক্রীতদাসের হাসি’।

আহমদ ছফা বিশ্বাস করিতেন স্বাধীনতা যুদ্ধ সেই ধারাটা ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছে। তবে সেই বিশ্বাস কোথাও তখন পর্যন্ত কোন সন্তান প্রসব করে নাই। সৈয়দ শামসুল হকের একটি কাব্যনাট্যের নাম — ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ — উল্লেখ করিয়া তিনি বলিতে কসুর করেন নাই — বইটিতে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ছাপ অনুপস্থিত। আহমদ ছফা বলিয়াছেন, নাটকটি মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করিয়া লেখা, তবে ‘মনে হয়, এটি দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় ব্যক্তির অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে লেখা’। আহমদ ছফা সত্যকে সত্য আকারেই প্রকাশ করিতেন।

একই ধরনের অকপট সত্য তিনি উচ্চারণ করিয়াছেন সেলিনা হোসেন প্রসঙ্গেও। উঁহার একখানি উপন্যাসের নামোল্লেখ না করিয়াই তিনি বলিয়াছেন উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লেখা। কাহিনীর কাল মুক্তিযুদ্ধের বছর। স্থান কোন এক বস্তি। শুদ্ধ অভিজ্ঞতা কিংবা মানবিক আবেদন থাকিলেই যে লেখাবস্তু সাহিত্য পদবাচ্য হইয়া উঠে না সে সত্যে আহমদ ছফার সংশয় ছিল না। অপ্রীতিকর সত্যকে যে অবশ্য প্রীতির ভাষায় প্রকাশ করা যায় তাহার প্রমাণ আহমদ ছফার এই দুই বাক্যে উপস্থিত হইয়াছে। তিনি বলিয়াছেন, ‘সাহিত্যে এই উপন্যাসটির স্থান কোথায় হবে জানি না। কিন্তু উপন্যাসটির মানবিক আবেদন আমাকে দারুণভাবে স্পর্শ করেছে।’

সৈয়দ শামসুল হকের লেখা ‘কাঠামো ও আঙ্গিকের দিক থেকে ঠিক আছে, কিন্তু প্রাণ-প্রবাহের দিক থেকে সেটা ব্যর্থ।’ আর সেলিনা হোসেনের উপন্যাস ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রচিত’ অথচ সাহিত্যে তাহার কোন স্থান হইবে না। এই যে সরল ঘটনা আহমদ ছফা তাহাকে তির্যক করেন নাই। তঁাঁহার দুঃখ — এখন পর্যন্ত আমি ইংরেজি ১৯৮৫ কিংবা ১৯৮৬ সালের কথা পাড়িতেছি — ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত অবস্থাকে ধারণ করে সত্যিকার সাহিত্য রচনা’ হয় নাই।

কিন্তু আশা নাছোড়বান্দা। ছফার সঙ্গ পরিত্যাগ করেন নাই। ছফা লিখিয়াছেন, ‘আমার ধারণা, ১৫ বছর সময় যথেষ্ট নয়। “ওয়ার এন্ড পীসের” মত গ্রন্থ যুদ্ধের পরপরই রচিত হয়নি — হয়েছে অনেক পরে। সুতরাং এ পর্যন্ত সত্যিকার অর্থে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন সাহিত্যে না ঘটলেও, ভবিষ্যতেও যে ঘটবে না, আমি তা মনে করি না।’ আহমদ ছফা মনে করিতেন স্বাধীনতা সংগ্রামের মত একটি গৌরবময় সংগ্রাম যেহেতু আমাদের জাতীয় জীবনে আসিয়াছে সুতরাং সেরকম সাহিত্যও রচিত হইবে। ধন্য আশা, কুহকিনী।

সেই আশা এখনো ফলবতী হয়েন নাই। ব্যতিক্রমের মধ্যে স্বয়ং আহমদ ছফা। তাঁহার মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ — বেশ খানিকটা যাহাকে বলে আত্মজীবনীর মত — ধরা আছে ‘অলাতচক্র’ নামধারী একটি অসাধারণ উপন্যাস কণিকায়। এই উপন্যাসের দুইটি পাঠ আমরা পাইয়াছি। একটি ১৯৮৪/৮৫ সালের। আরটি ১৯৯৩ নাগাদ প্রকাশিত হইয়াছিল। সেই কাহিনী অন্যত্র লিখিয়াছি। আরো লিখিতে হইবে।

আজ মাত্র একটি বাক্য লিখিয়াই বিদায় হইতেছি। এই উপন্যাসে ‘ওয়ার এন্ড পীস’ গ্রন্থের গুণাবলি বিদ্যমান। পার্থক্যের মধ্যে, ইহার আকারটাই মাত্র ছোট্ট।

দোহাই

১ আহমদ ছফা, ‘মুক্তিযুদ্ধের ওপর তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য বিশুদ্ধ বই আমি দেখিনি,’ সচিত্র স্বদেশ [আনুমানিক প্রকাশকাল ১৯৮৬], পৃ. ৫৩।

 

৩১ জুলাই ২০১৩, সর্বজন: নবপর্যায় ১৯

Leave a Reply