অলাত চক্র: আহমদ ছফার একখানা চিঠি প্রসঙ্গে

ইংরেজি ২০০৯ সালে ‘মুক্তধারা’ প্রকাশনা সংস্থা হইতে ‘চিঠিপত্রে চিত্তরঞ্জন সাহা’ নামে একটি মূল্যবান গ্রন্থ প্রকাশিত হইয়াছিল। গ্রন্থটির সম্পাদক হিশাবে আবদুল মান্নান সৈয়দের নাম ছাপা আছে। এই গ্রন্থে মহাত্মা আহমদ ছফার লেখা একপ্রস্ত পত্রও স্থান পাইয়াছে। আমরা কৃতজ্ঞতার সহিত তাহা অত্র পত্রস্থ করিতেছি।

পত্র সম্পর্কে কিছু বলিবার আগে ইহার প্রাপকের কথা দুই বাক্যে বলিতে হইবে। ‘মুক্তধারা’ প্রতিষ্ঠার স্বত্বাধিকারী চিত্তরঞ্জন সাহা আহমদ ছফার একাধিক গ্রন্থ প্রকাশ করিয়াছিলেন। তিনি ব্যবসায় করিতেন। যুগপৎ নোয়াখালি জেলার চৌমুহনি শহর আর ঢাকা শহরের ফরাশগঞ্জ মহল্লায় তাঁহার প্রতিষ্ঠান। পুঁথিঘর নামক প্রতিষ্ঠান হইতে তিনি উঠিয়াছিলেন ‘মুক্তধারা’ পর্যন্ত। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলিকাতা মহানগরে ইহার প্রতিষ্ঠা। তখন প্রকাশিত বইপত্রে মুক্তধারা নামের পাশে অথবা নিচে ‘স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ’ কথাটাও মুদ্রিত থাকিতে আমরা দেখিয়াছি।

আহমদ ছফার ‘স্মৃতির দিয়া’ নামক স্মৃতিকথায় চিত্তরঞ্জন সাহার কথাও পাওয়া যায়। তিনি লিখিয়াছেন, “চিত্তবাবুর ‘মুক্তধারা’ অফিসটি ছিল ছয় নম্বর এন্টনি বাগান লেনে। তিনি আমার ‘জাগ্রত বাংলাদেশ’ বইটি ছাপছিলেন।” ‘জাগ্রত বাংলাদেশ’ বইটির প্রথম সংস্করণ ছাপা শেষ হইয়াছিল ২৮ জুলাই ১৯৭১। আর আহমদ ছফা এন্তেকাল করিয়াছিলেন একই দিনে। শুদ্ধ তিরিশ বছর পর। মানে ২০০১ সাল নাগাদ। বইটার আরো কয়েকটা সংস্করণ হইয়াছিল। স্বাধীন বাংলাদেশেও হইয়াছিল। চিত্তরঞ্জন সাহাকে লেখা এই পত্রে দেখা যাইতেছে ‘অলাতচক্র’ বইটির কথাও আছে।

এখানে অতি সংকোচের সহিত একটি কথা নিবেদন করিয়া রাখিতে চাই। ‘চিঠিপত্রে চিত্তরঞ্জন সাহা’ বইটিতে সম্পাদক হিসেবে আবদুল মান্নান সৈয়দ ছাড়াও আরো দুইজন মহান মানুষ অন্তত জড়িত আছেন দেখিতে পাইলাম। একজনের নাম আহমাদ কাফিল, আরেকজনের পরিচয় শ্যামল দত্ত। তদুপরি পরিকল্পক বলিয়া আরো একটি নাম শোভা পাইতেছে শিরোনাম পাতায়। ‘অলাত চক্র’ বইটির নাম এত সম্পাদক ও পরিকল্পকের চারিজোড়া চক্ষু এড়াইয়া ছাপা হইয়াছে ‘অলাত ফ্রে’। (সৈয়দ ২০০৯: ৫১) টাকা পয়সা মন্দ জিনিশ নহে। তাহা আমাদের সকলেরই কাজে লাগে। তবে সম্পাদনা না করিয়া কেন আমরা সম্পাদক বলিয়া আপনাপন নামধাম ধার দিতে যাই, বুঝিতে বড় বেগ লাগে। ইহাতে চিত্তরঞ্জন সাহারও অগৌরব হয়।

যাহা হৌক এতক্ষণে পত্রে প্রবেশ করা যাইতেছে। পত্রের তারিখ দেওয়া আছে ১১ জুলাই ১৯৯১। আহমদ ছফা জানাইতেছেন তিনি মার্চ মাসের মাঝামাঝি জার্মানি হইতে ফিরিয়াছেন।

দেখা যাইতেছে আহমদ ছফা একটা কৈফিয়ৎ দিতেছেন ‘অলাত চক্র’ সম্বন্ধে। আমরা জানি বইটি তিনি পত্রিকান্তরে প্রকাশ করিয়াছিলেন ইংরেজি ১৯৮৫ সনের দিকে। দেখা যাইতেছে এই ১৯৯১ সনের মাঝামাঝি আসিয়াও তাহা শেষ করেন নাই। চিত্তরঞ্জন সাহার সমীপে তিনি লিখিতেছেন,

লেখাটি আমি অবহেলা করে ফেলে রেখেছি সে কথা ঠিক নয়। এই বইটির মধ্যে আমার জাতি ও দেশ সম্পর্কে বিশেষ কিছু বক্তব্য রাখতে চাই। আমার মনে হচ্ছে তাতে আমি সফলও হয়েছি। কিন্তু একটি কথা: বইটি যেভাবে ছাপা হয়েছে, তাতে দৃষ্টি আকর্ষণের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। সে জন্য আমিই দায়ী। লেখাটি তো আমার প্রেস থেকেই ছাপা হয়েছে। অযোগ্য মানুষকে সাহায্য করলে কোনো কাজে আসে না এটা নতুন করে প্রমাণিত হলো। পুরোনো ফর্মাগুলো ফেলে দিয়ে আবার নতুনভাবে ছাপাতে চাই। বলা বাহুল্য এই বাড়তি খরচটা আমিই করবো। এ ব্যাপারে আপনার সদয় মতামত জানতে পেলে খুশী হবো।

এই প্রসঙ্গটা আহমদ ছফার চিঠিতেই আমরা জানিতে পারিলাম। দেখিতেছি বইটা ১৯৯৩ সালে মাত্র বাহির হইয়াছিল। ‘প্রিয় প্রজন্ম’ নামক একটি ক্ষুদ্র ম্যাগাজিনের ১৯৯৩ সালের ডিসেম্বর তারিখ দেওয়া এক সংখ্যায় মহাত্মা আহমদ ছফার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ পায়। তাহাতেও প্রশ্নটির বয়ান পাওয়া যাইতেছে। আহমদ ছফার উল্লেখ করিতেছেন,

তবে আমি কিন্তু ‘ওঙ্কার’ [উপন্যাসের] পরে আরো তিনটি উপন্যাস লিখেছি। বিষয় গৌরবে এ গুলো ‘ওঙ্কার’ [লেখাটির] চেয়ে আরো সিরিয়াস লেখা। তাছাড়া বাংলাদেশের উত্থান নিয়ে আরেকটি উপন্যাস আমি লিখেছি, সেটার নাম হচ্ছে ‘অলাত চক্র’। লেখাটা ‘নিপুণ’ পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় খানিকটা ছাপা হয়েছে। বইটা প্রায় পুরোটাই ছাপা হয়ে গিয়েছে মুক্তধারা থেকে। শুধু লাস্ট ত্রিশ পাতা লেখা বাকি। এই ত্রিশ পাতা আমি লিখতে পারছি না। কি লিখব জানি না। প্রতি সপ্তাহ্য় চিত্তরঞ্জন বাবু আমাকে তাগাদা দেন। কিন্তু লেখা আর হয়ে ওঠে না। (ছফা ২০০৮: ৩৯৩)

মহাত্মা আহমদ ছফার এই চিঠিতে আরো একটি বাক্য আছে যাহা উদ্ধার করিবার     মতন। তিনি লিখিয়াছেন, ‘আমি কোন দল করিনে এবং ছোটো ছোটো মানুষদের মধ্যে  মিশে ছোট হতে পারিনে সেটাই [আমার]  অপরাধ এবং আমাকে অবহেলা করার কারণ সেটাই। এ অবস্থার কোনোদিন পরিবর্তন বোধ করি ঘটবে না।’

এই দীর্ঘ বাক্যটিতেও সম্পাদক মহোদয়গণ একটি ভুল মুদ্রণের অনুমতি করিয়াছিলেন। ‘আমার অপরাধ’ কথাটা ছাপা হইয়াছিল ‘আবার অপরাধ’ আকারে। (সৈয়দ ২০০৯: ৫২)

এই দুই ভুল শোধন করিয়া আমরাও চিঠিটি আবার ছাপাইবার স্বাধীনতা গ্রহণ করিলাম। চিত্তরঞ্জন সাহার উদ্দেশে আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, ‘বেঁচে থাকা মানে কর্ম করা, এটা তো আপনার কাছেই শিখেছি।’

দোহাই

১      আবদুল মান্নান সৈয়দ গয়রহ সম্পাদিত, চিঠিপত্রে চিত্তরঞ্জন সাহা (ঢাকা: মুক্তধারা, ২০০৯)।
২   আহমদ ছফা, ‘আহমদ ছফা বললেন…’; আহমদ ছফা রচনাবলি, ৩য় খণ্ড (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০০৮), ৩০৩-৪২৪।

৩০ জুলাই ২০১৩, সর্বজন: নবপর্যায় ১৯

Leave a Reply