স্বাধীনতার সংকট: মুক্তিযুদ্ধ, মানবাধিকার ও এসলাম

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতাকামী জনগোষ্ঠী কি বিপ্লবী সরকার এমনকি পাকিস্তানি সেনাশাসকরা পর্যন্ত ধর্মের জিগির তোলে নাই। নয় মাস ধরিয়া  চলা গণহত্যার সমর্থনে বাংলাদেশের যে কতিপয় বাসিন্দা আগাইয়া আসিয়াছিলেন তাহারাই এসলামকে টানিয়া আনিয়াছেন। মুক্তিযুদ্ধের ৪২ বছর পর আবার রব উঠিয়াছে এসলাম বিপন্ন। ১৯৭১ সালে প্রকৃতপক্ষে কে বিপন্ন ছিল? আর এখনই বা কে?

স্বাধীনতার ঘোষণা লইয়া বাংলাদেশে একপ্রস্ত বিতর্ক আছে। বিশেষ বলিতে স্বাধীনতার ঘোষক লইয়া। প্রকৃত প্রস্তাবে স্বাধীনতার ঘোষণা আসিয়াছিল ২৫ মার্চ তারিখে নহে, ২৬ কি ২৭ মার্চেও নহে, আসিয়াছিল গোটা ২০ কি ২১ দিন পরে। ১৭ এপ্রিল তারিখে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠন করিবার পর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ স্বাধীনতা যুদ্ধের কার্য ও কারণ ব্যাখ্যা করিয়া একপ্রস্ত বিবৃতি প্রচার করিয়াছিলেন। বিবৃতিটি ১৯৭১ সালে ভারত সরকার কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলা দেশ ডকুমেন্টস’ [Bangla Desh Documents] নামক গ্রন্থে নথিভুক্ত আছে।

‘বাংলা দেশ’ তাজউদ্দিন আহমেদ বলিয়াছিলেন, ‘যুদ্ধে লিপ্ত। পশ্চিম পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক অত্যাচারের মুখে দাঁড়াইয়া জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের মধ্যস্থতায় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিশ্চিত করা ছাড়া আমাদের সামনে আর কোন পথ খোলা ছিল না।’

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বর্ণবাদী ঘৃণা ও ধর্ষকামের সহিত বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনসাধারণের মানবাধিকার দলন — অর্থাৎ গণহত্যা — শুরু না করা পর্যন্ত বাংলাদেশের নেতারা স্বাধীনতার কোন প্রত্যক্ষ ঘোষণা দেন নাই। এই কথার পরম প্রমাণ তাজউদ্দিন আহমেদের এই বক্তব্যে এখনও যাহার ইচ্ছা পাইতে পারেন।  তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেন, বাংলাদেশকে স্বাধীন করা তাঁহাদের ইচ্ছা ছিল না। তাঁহার জবানে, ‘পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করার সম্ভাব্য সকল সমাধানের মধ্যে শেষ সমাধান ছিল ছয়দফা। তাই আওয়ামী লীগ সর্বান্তকরণে পাকিস্তানের চৌহদ্দির মধ্যে বাংলাদেশকে স্বায়ত্বশাসন দেওয়ার জন্য ছয়দফা দাবি পেশ করিয়াছিল।’

লক্ষ করার বিষয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হইয়াছিল জাতীয় অধিকার নিশ্চিত করিবার লক্ষ্যে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাহার আগেই সেই অধিকার লঙ্ঘন করিয়াছিল। বাংলাদেশ যে জাতির দেশ সে জাতির জাতিত্ব কোন ভিত্তির উপর দাঁড়াইয়া?  তাজউদ্দিন আহমেদের ১৭ এপ্রিল বিবৃতির কোন ছত্রেই তাহার বিস্তারিত ব্যাখ্যা ছিল না। তিনি শুদ্ধ দুই কথায় বুঝাইয়া দিয়াছিলেন বাংলাদেশ দাঁড়াইয়াছে তাহার সাড়ে সাত কোটি মানুষের ‘অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর সাহসের উপর’। এই নতুন জাতিত্বের শিকড়ে প্রতিদিন পুষ্টি যোগাইয়াছে তাহাদের রক্ত।

বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করিয়া পাকিস্তান একপ্রকার আত্মহত্যাই করিয়াছিল। একই সঙ্গে সেই গণহত্যাভিযান বাংলাদেশেরও কম ক্ষতি করে নাই। তাজউদ্দিন আহমেদ অনুমান করিয়াছিলেন যে বাংলাদেশকে পশ্চিম পাকিস্তান ২৩ বছর ধরিয়া শোষণ করিয়াছে তাহাকে এখন সে ৫০ বছরের মত আরও পিছাইয়া দিল।

পাঠিকা দেখিবেন, এই বিবৃতিতে কোথাও কোনক্রমে এসলাম ধর্মের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে কোন কথা নাই। পাকিস্তানি সেনাশাসকরা পর্যন্ত এসলাম ধর্মের জিগির তোলে নাই। তাহারা বড়জোর অসহযোগ আন্দোলনের সময় — মানে ১ মার্চ হইতে ২৫ মার্চ পর্যন্ত — বাঙ্গালিদের আক্রমণে পূর্ব পাকিস্তানের অবাঙ্গালি অধিবাসীদের ক্ষতি হইয়াছে বলিয়া অভিযোগ তুলিয়াছিলেন।

কিন্তু বাংলাদেশের যে অল্পসংখ্যক বাসিন্দা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত্র হইতে শুরু হইয়া ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত যে গণহত্যা চলিয়াছিল তাহার সমর্থনে আগাইয়া আসিয়াছিলেন তাহাদের বক্তব্যে এসলাম প্রসঙ্গ উত্থাপিত হইত। তাহারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকে ভারতের ষড়যন্ত্র বলিয়া প্রচার করিতেন।

তাজউদ্দিন আহমেদের আশংকাভুক্ত ৫০ বছর পার হইতে এখনও কয়েক বছর বাকি। এখন রব উঠিয়াছে এসলাম ধর্ম বিপন্ন। আসলে কে বিপন্ন? প্রকৃত সত্য কি? এসলাম না এসলাম লইয়া যাহারা রাজনীতি করিতেছেন তাহারা? কে বিপন্ন?

কয়েকজন রাজনীতিবিদ ও কিছু বুদ্ধিজীবি কিছুদিন আগে বাংলাদেশে নতুন করিয়া ‘গণহত্যা’ কথাটা চালু করিয়াছেন। প্রকারান্তরে তাহারা বলিতেছেন বাংলাদেশে এখন ১৯৭১ সালের মতন পরিস্থিতি বিরাজ করিতেছে। সরকারের বিরুদ্ধে তাহাদের অভিযোগ গুরুতর। এই অভিযোগ যদি সত্য হইয়া থাকে তবে তাহারা আরেকটি ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শুরু করিবার যুক্তিও পাইয়া যাইতেছেন। ‘মানবাধিকার’ কথাটির সংজ্ঞা যাহাই হৌক, প্রাণের অধিকার তো তাহার মধ্যে পড়িবেই। ‘গণহত্যা’ অবশ্যই প্রতিরোধ সংগ্রাম বা প্রয়োজনে যুদ্ধের বৈধতা তৈরি করে।

মানবাধিকার দাবির সহিত এখন যুক্ত হইয়াছে এসলামধর্মের অবমাননার অভিযোগ। বুদ্ধিজীবীরা বেশ চালাকি করিতেছেন। তাহারা বকধার্মিক সাজিয়াছেন। তাহারা এখন এসলামপন্থী হইয়াছেন। দাবি করিতেছেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই — নিপীড়কের বিরুদ্ধে নিপীড়তের লড়াই। কিন্তু তাহারা কি বলিতে পারিবেন কোন এসলামপন্থী দলটি এই লড়াইকে জালিম আর মজলুমের লড়াই বলিয়াছিল? উত্তর, পারিবেন না। কারণ এমন কথা কেউ তখন বলে নাই। এই স্বঘোষিত নতুন এসলামপন্থীরা আরো দাবি করিতেছেন ‘বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদী’রা নাকি বলিতেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল ‘পাঞ্জাবি আর বাঙ্গালির সাম্প্রদায়িক লড়াই’। এই তাহাদের চালাকি।

তাহারা বলিবেন কি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে জালিমের ভূমিকা কে গ্রহণ করিয়াছিল, আর মজলুমই বা কে ছিল? তাজউদ্দিন আহমেদের ১৭ এপ্রিলের বিবৃতিতে জালিমের নাম হিশাবে কোথাও পাঞ্জাবি কথাটি উচ্চারিত হয় নাই। উচ্চারিত হইয়াছিল পশ্চিম পাকিস্তান ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নাম। অবশ্য স্বীকার করিতে হইবে, দুনিয়ার সামনে মজলুম জাতি বলিয়া যাহাদের পরিচয় তিনি তুলিয়া ধরিতে কুণ্ঠাবোধ করেন নাই তাহাদের নাম হিশাবে ‘বাঙ্গালি’ শব্দটি তিনি ব্যবহার করিয়াছিলেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের উপর যাহারা গণহত্যা চাপাইয়া দিয়াছিলেন তাহাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সমগ্র জনগণ — যাহাদের অধিকাংশ ‘বাঙ্গালি’ পরিচয় ধারণে লজ্জা পান নাই — এই মুক্তিযুদ্ধে জড়াইয়াছিলেন। এই জনগণ পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করিয়াছিলেন। কিন্তু এসলামধর্মকে কদাচ করেন নাই। পাকিস্তান না থাকিলে এসলামধর্মও থাকিবেনা বলিয়া যাহারা মানুষকে ভয় দেখাইয়াছিলেন তাহারা সঠিক কাজটি করেন নাই। ইতিহাস তাহা প্রমাণ করিয়াছে। নিরপেক্ষ বিচারক বলিয়া কেহ আছেন কিনা জানি না, থাকিলে তিনি বলিবেন স্বাধীন বাংলাদেশে কোন নিক্তির মাপে এসলামধর্ম পালনের অধিকার কমিয়াছে? কমে নাই। বরং ক্ষেত্রবিশেষে বাড়িয়াছে।

এসলামধর্ম ও খেলাফত যে এক জিনিস নহে তুরস্কের বিপ্লব তাহা প্রমাণ করিয়াছিল। মোস্তফা কামাল সেই ১৯২৪ সনে খেলাফত উঠাইয়া দিয়াছিলেন। কিন্তু পৃথিবীর কথা দূরে থাকুক, খোদ তুরস্ক হইতেও এসলাম উঠিয়া যায় নাই। পাকিস্তান গত হইয়াছে, এসলাম জারি রহিয়াছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে লড়িবার জন্য আর কোন অস্ত্র না পাইয়া যাহারা শেষ অস্ত্র হিসাবে  এসলামকে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত লইয়াছেন তাহারাও একই ভুল করিতেছেন।

বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনসাধারণের ‘অদম্য ইচ্ছা ও সাহস’ ছাড়া বাংলাদেশের জন্ম হইত না। এ কথা আজ স্বীকার করিতে হইবে সেই ইচ্ছা ও সাহসের জগতে এখন কিছু ঘাটতি দেখা দিয়াছে। কারণ শ্রেণিবিভাজন দেশে বৃদ্ধি পাইতেছে। দিন দিন পাইতেছে।

এই শ্রেণিবিভাজন রাজনীতিতেও যে নতুন বিভাজন সৃষ্টি করিবে তাহাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু সেই বিভাজন যদি পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা সাম্প্রদায়িক বিভাজন মাত্র হয়, যদি এসলামধর্মকে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ বলিয়া হাজির করিয়া থাকে, তবে তাহা হইবে অনেক দুর্ভাগ্যের জননী।

মনে রাখিতে হইবে কাশ্মীরের ভাগ্য এখনও পরাধীন দেশের ভাগ্যই।  ফিলিস্তিনের ভাগ্যও ইহার ব্যতিক্রম নহে। জাতীয় স্বাধীনতার এই যুগেই ফিলিস্তিন পরাধীন হইয়াছে। বাংলাদেশ এখন যে সংকটের মুুখামুখি তাহা ইহার চেয়ে কিছুতেই কম নহে। অতয়েব কাণ্ডারী হুঁশিয়ার!

মনে রাখিতে হইবে এসলামধর্মের জিকির পাকিস্তানকে রক্ষা করে নাই। বাংলাদেশ কেন সেই নিয়মের ব্যতিক্রম হইবে?

দোহাই

‘Statement Issued by Mr. Tajuddin Ahmad, Prime Minister of Bangladesh, on April 17, 1971, After the Inauguration of the Government of the People’s Republic of Bangladesh,’ in Bangla Desh Documents, vol. 1 (New Delhi: Ministry of External Affairs, Government of India, 1971), pp. 291-98.

 

৫ এপ্রিল ২০১৩, সর্বজন: নবপর্যায় ৩

Leave a Reply