১৯৭১: সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতা

‘ইতিহাসে কোন কোন সময় আসে যখন এক একটা মিনিটের ব্যাপ্তি, গভীরতা এবং ঘনত্ব হাজার বছরকে ছাড়িয়ে যায়। আমাদের জীবনে একাত্তর সাল যে রকম। একাত্তর সালকে যারা দেখেছে, ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে যারা বড় হয়েছে, একাত্তর সালের মর্মবাণী মোহন সুন্দর বজ্রনিনাদে যাদের বুকে বেজেছে, তারা ছাড়া কেউ একাত্তরের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।’ এই দুইটি বাক্য পরলোকগত মহাত্মা আহমদ ছফা হইতে উদ্ধার করিলাম। ১৯৭১ সালের অন্যূন ২২ বছর পর ‘একাত্তর: মহাসিন্ধুর কল্লোল’ নামে এক নাতিদীর্ঘ নিবন্ধের একেবারে বিসমিল্লায় এই বাক্য দুটি তিনি পেশ করিয়াছিলেন। কি বলিয়াছিলেন সেই কল্লোল, মহাসিন্ধুর কল্লোল? আর আমরা কে কি শুনিয়াছিলাম?

বৃহদারণ্যক উপনিষদের একটি গল্পে জাহির আছে প্রজাপতি তাঁহার তিন ছাত্রকেই এক কথা বলিয়াছিলেন: দ, দ, দ। কিন্তু দেবতাছাত্র বুঝিয়াছিল দ মানে দম্যত, মানে দমন করিতে হইবে। মনুষ্য ছাত্র বুঝিয়াছিল দ মানে দত্ত, মানে দান করিতে আজ্ঞা হয়। সবিশেষ অসুরছাত্র বুঝিয়াছিল দ মানে দয়াধ্বম, মানে দয়া করাই বিধেয়। ১৯৭১ সালের মহাসিন্ধু কি বলিয়াছিলেন? আর আমরা কে কি বুঝিয়াছিলাম? সেই পুরাতন ইংরেজি, মার্কিন, ফরাশি বিপ্লবের বাণী: স্বাধীনতা , মৈত্রী, সাম্য? নাকি ফরাশি, রুশ, চিনা বিপ্লবের বজ্রনির্ঘোষ: সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা?

এয়ুরোপ মহাদেশে ‘স্বাধীনতা’ বলিতে কি বুঝায় তাহার প্রথম দোহাই শুনিতে পাই ইংলন্ডের ইতিহাসে। এখানে ১৭ শতকের গোড়া — মানে শেকসপিয়র সাহেবের এন্তেকালের সময় — হইতে সেদেশে যে বিপ্লব শুরু হইয়াছিল তাহাতে দুই হিশাব করা গিয়াছে। এক হিশাবে বিপ্লব ছিল হজরত এসার অনুসারীদের দুই শাখার মধ্যে লড়াই — একদিকে গোঁড়া বা পিয়ুরিটান দল, আর দিকে মহাবিশপ লডের দল। দ্বিতীয় হিশাব মোতাবেক ইংলন্ডের বিপ্লবটি ছিল একপাশের নিরঙ্কুশ রাজার সহিত আর পাশের আম জনগণের বা সর্বজনের সংঘাত। বহুদিন যাবৎ ইতিহাস লেখকেরা এই বিপ্লবের নাম রাখিয়াছিলেন পিযুরিটান বা ধর্মীয় গোঁড়ামির বিপ্লব। অথচ কার্যক্ষেত্রে দেখা গিয়াছে ধর্মের পর্দায় এই সমাজ বিপ্লবের ঢাকের আওয়াজ লুকাইয়া রাখা যায় নাই। এই বিপ্লব ইংলন্ডে রাজার নিরঙ্কুশ বা বেপরোয়া ক্ষমতার কেয়ামত ডাকিয়া আনিয়াছিল। তাহার জায়গায় ষোল আনা না হইলেও কিছু পরিমাণে গণতান্ত্রিক অর্থাৎ প্রতিনিধির সরকার কায়েম করিয়াছিল। সবচেয়ে বড় কথা রাষ্ট্রধর্ম নামক বিশেষ ধর্মের জাতীয়তাবাদ উচ্ছেদ করিয়াছিল। অন্যান্যের মধ্যে, দেশে ধনদৌলতের রাজত্ব বা ধনতন্ত্র কায়েমের পথ প্রশস্ত করিয়াছিল।

সতের শতকের শেষ নাগাদ ইংলন্ডের বিপ্লব এক জায়গায় আসিয়া আপোসরফার পথ ধরিয়াছিল। পুরাতন জমিদার আর নতুন সওদাগর মিলিয়া দেশ শাসনের নতুন বন্দোবস্ত কায়েম করিয়াছিল। ইংরেজ জাতির অভিধানে তখন ‘স্বাধীনতা’ শব্দটির অর্থ দাঁড়াইয়া গেল ধনদৌলতের স্বাধীনতা।

ইংরেজ জাতির ইতিহাস হইতে সারা দুনিয়ার লোক শিখিল কি করিয়া রাজনৈতিক স্বাধীনতার সংগ্রামকে জয়ী করিয়াও ধনদৌলতের অসাম্যকে বজায় রাখা সম্ভব হইতে পারে। মানুষে মানুষে যে ভেদাভেদ তাহাকে এড়াইয়া ইংলন্ড ব্যবসায়ী ও ধনিক শ্রেণির সমতা স্থাপন করিতে সমর্থ হইয়াছিল। এই ব্যবসায়ী শ্রেণির স্বাধীনতার ধ্বনিকেই ইতিহাসে লিবারেলিজম বা স্বাধীনতা ব্যবসায় বলা হইয়া থাকে।

ইহাদের গুরুর নাম জন লক। ১৬৮৮ সালের ইংলন্ড বিপ্লবের সময় ইনি বিকশিত হইয়াছিলেন। তাঁহার বিচারে প্রজার স্বাধীনতাকে রক্ষা করিবার ওয়াস্তেই সমাজ স্থাপিত হইয়াছিল। আর প্রজাসাধারণের মধ্যকার স্বাধীনতা চুক্তির উপরই সমাজের সৌধ দাঁড়াইয়া আছে। এই চুক্তিটা এক নম্বর। লক সাহেব আরো একটা চুক্তি বা একরারনামার কথা মনে করাইয়া দিলেন। এই দোসরা চুক্তিটা হইয়াছিল সর্বেসর্বা শক্তি বা সর্বজনের সহিত তাহাদের কর্মচারীস্বরূপ মনোনীত সরকার বা শাসন কর্তৃপক্ষের। সরকারের কাজ হইবে জনে জনে সর্বজনের স্বাধীনতা পাহারা দেওয়া।

দুঃখের মধ্যে লক সাহেবের এই যুক্তির সিঁড়ি বা মই বাহিয়া ইংলন্ডের নতুন ধনিক শ্রেণি রাষ্ট্রক্ষমতায় বসিয়াও কিছুদিন পর তাঁহাকে ভুলিয়া গেলেন। ইংলন্ডের ইতিহাসে ইহারা হুইগ দল বা স্বাধীনতা ব্যবসায় দল নামে খ্যাত আছেন। ইহারা কহিলেন দর্শন ব্যবসায়ীর কপোলকল্পিত স্বাধীনতায় কাজ নাই। দাবি করিলেন ইংরেজ জাতির স্বাধীনতার মূলা গজাইয়াছে তাহার ইতিহাসে। তাহারা ফিরিয়া গেলেন বেপরোয়া রাজার বিরুদ্ধে বড় জমিদারদের সংঘাতের গল্পে।

১২১৫ এসায়ি সালের মহাসনদ বা ম্যাগনাকার্টা হইতে শুরু হইল ইংরেজ জাতির স্বাধীনতার ইতিহাস। সার কথা দাঁড়াইল ‘স্বাধীনতা’ পদার্থটা শুদ্ধ ইংরেজ জাতির সম্পত্তি। অন্যের কভু নহে। ইংরেজ বা ক্ষেত্রানুসারে ব্রিটিশ জাতির স্বাধীনতা স্বীকার করা সম্ভব হইবে না। ইংলন্ডের ইতিহাস হইতে আমরা মহাসিন্ধুর এই কল্লোলটুকু শুনিয়াছিলাম।

ইংলন্ড হইতে রাজা আর রাষ্ট্রধর্মের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হইয়া যাঁহারা মার্কিনখণ্ডে পলাইয়াছিলেন তাঁহারাও জন লকের যুক্তি — স্বাধীনতার গোড়ার চুক্তি — গ্রহণ করিয়াছিলেন। এই স্বাধীনতা ও চুক্তির দোহাই দিয়াই মার্কিন জাতির স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হইয়াছিল এসায়ি আঠার শতকের মাঝামাঝি। মার্কিনিরা একটা নতুন কথা শুনাইলেন — স্বাধীনতা জিনিশটার মালিক খালি ইংরেজ জাতি হইবে কেন? সকল মানুষের বা মনুষ্যজাতির সম্পত্তি এই স্বাধীনতা পদার্থটি। না শুনাইলে মার্কিনজাতির নিজ রাষ্ট্র কোন যুক্তিতে নিজেকে কায়েম করিবে? মার্কিনিরা শুদ্ধ মার্কিন জাতির স্বাধীনতা লাভের অধিকার আছে না বলিয়া কবুল করিলেন দুনিয়ার সকল জাতিরই স্বাধীন হইবার অধিকার আছে।

কিন্তু ইংরেজ হুইগ বা স্বাধীনতা ব্যবসায়ীদের পথ ধরিতে নব্য স্বাধীন মার্কিন জাতিরও বেশি বেগ পাইতে হয় নাই। মার্কিনিরাও ব্যক্তি মানুষের স্বাধীনতা বা সাম্য স্বীকার করিলেন না। লাল আদিবাসীদের কথা না হয় ছাড়িয়া দিলাম, কালা আদমিদের মানুষ বলিয়া গণ্য করা হইল না। কালা দাসেরা দাসই রহিল স্বাধীন আমেরিকায়। আর ধলাদের মধ্যে ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের স্বাধীনতা সমান স্বীকার করা হইলেও কার্যক্ষেত্রে ইংলন্ডের মত অসাম্য শুদ্ধ কায়েমই হইল না, দিন দিন তাহার শ্রীবৃদ্ধিও ঘটিতে থাকিল।

স্বাধীন আমেরিকার শরিক অঙ্গরাজ্যের পর অঙ্গরাজ্যে যাহাদের নির্দিষ্ট পরিমাণ ধনদৌলতের মালিকানা নাই তাহাদের ভোট দিবার স্বাধীনতা কাড়িয়া লওয়া হইয়াছিল। মার্কিন মুলুকের স্বাধীনতার চরিত্র কি রকম ছিল তাহা বুঝিতে হইলে সেই দেশের জাতির পিতা বলিয়া খ্যাত দুইজনের ইতিহাস পড়িবেন। ওয়াশিংটন দক্ষিণে ছিলেন বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক জমিদার শ্রেণির নেতা আর বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ছিলেন উত্তরের নতুন শিল্প কারখানার মালিক ও কারিকর শ্রেণির নেতা। মার্কিনদেশে স্বাধীনতার এত জয়গান অথচ সেখানে ধনসম্পত্তির সাম্যের কথা তোলা এক প্রকার হারাম হইয়া গিয়াছিল।

মার্কিনদেশ স্বাধীন হইয়াছিল সেই সময় যখন ভারতবর্ষ ইংরেজ জাতির হাতে পরাধীন হইতেছে। আর সেদিন ভারতবর্ষ স্বাধীনতার স্বাদ লাভের জন্য জিহ্বা বাহির করিয়াছে যেদিন মার্কিন জাতির সাম্রাজ্যলিপ্সা পূর্ব এশিয়ায় আণবিক বোমা লইয়া হাত মকশো করিতেছে। বুর্জোয়া স্বাধীনতার সহিত সাম্যের বিবাহবিচ্ছেদ এতদিনে চূড়ান্ত হইয়াছে। ইংলন্ড ও আমেরিকার বিপ্লব হইতে আমরা শুদ্ধ স্বাধীনতার আওয়াজ শুনিলাম। যে আওয়াজে সাম্যের পদার্থ নাই সে আওয়াজ ফাঁকা। সাম্যহীন স্বাধীনতাকেই তো লোকে বলে স্বাধীনতা ব্যবসায়।

ফরাশিদেশের বিপ্লবটা এই তালিকার সর্বশেষ। এই বিপ্লবে সাম্য ও মৈত্রীর কথা জোরেশোরে উঠিয়াছিল। কেন উঠিয়াছিল তাহার কারণও আছে। ফরাশিদেশের জমিদার আর রাজার পরিবার যদি কিছু পরিমাণে কম একগুয়ে হইতেন তাহা হইলে সেদেশের নতুন ধনিক বা বুর্জোয়াশ্রেণিও আপোস করিবার একটা রাহা বাহির করিতে পারিতেন। ফরাশি বুর্জোয়ারা আদপে জমিদার বা অভিজাত শ্রেণির সম্পূর্ণ পরাজয় মাগেন নাই। জমিদাররাই গোঁয়ারের মত গোঁৎ গোঁৎ করিয়া নিজেদের সর্বনাশ করিয়াছিলেন। জমিদারি প্রথার সহিত সেখানে জোট পাঁকাইয়াছিলেন বড় বড় ধর্মব্যবসায়ীরাও। ফলে ফরাশি বিপ্লব অনেক বেশি সংঘাতে জড়াইয়া পড়িয়াছিল।

ফরাশি বিপ্লবে সাম্যের আওয়াজটা কেন বেশি সামনে আগাইয়া আসিল তাহার উত্তর পাইতে হইলে সে দেশের শহরের কারিকর আর শ্রমিকদের কথা যেমন হিশাব করিতে হইবে তেমনি আমলে আনিতে হইবে কৃষকের সমস্যা বা জমির মালিকানার দাবিটিও। ফরাশিদেশের ইতিহাস লেখকরা তাহাদের বিপ্লবের চারি ক্ষেত্র নির্দেশ করিয়া থাকেন। জমিদারদের ক্ষেত্র, বুর্জোয়াদের ক্ষেত্র, সর্বজনের ক্ষেত্র এবং চাষীর ক্ষেত্র।

ফরাশিদেশে রাজার শাসন শেষ হইল। জমিদারদের ক্ষমতা শেষ হইল। কিন্তু সামাজিক সমতা সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হইল না। নতুন সম্পর্ক কায়েম করিতে হইলে বিপ্লবের বিস্তার দরকার ছিল। দরকার ছিল আরো সময়ের। ফরাশিরা সেই কালক্ষেপণে কসুর করেন নাই।

ইংলন্ডে স্বাধীনতার ধ্বনি পরিণত হইয়াছিল সাম্যের প্রতিপক্ষে। মার্কিনদেশেও সাম্যের প্রশ্ন কিছুদিন পর চাপা পড়িয়া গেল। কিন্তু ফরাশিদেশে এই প্রশ্নের মিমাংসা করিতে প্রায় শত বছর পার হইয়া গিয়াছিল। এসায়ি উনিশ শতকের শেষদিকে পারি নগরী শ্রমিকের রক্তে ভাসিয়া গেল। বুঝা গেল ফরাশিদেশেও বুর্জোয়া শ্রেণিরই জয় হইয়াছে। তাহা হইলে সকলই বৃথা হইয়া গেল বলিবেন কি?

না, বলিব না। ফরাশি বিপ্লব হইতে যে দাবি উঠিয়াছিল তাহার গোড়ার কথা সাম্য। সাম্য না হইলে মৈত্রী কথা ফাঁকাবুলির অধিক হয় না। ফরাশিজাতির জনগণ ‘মৈত্রী’ কথাটাকে একটা নতুন ভিত্তি যোগাইলেন। মৈত্রীর প্লাবন বলিয়া ফরাশি বিপ্লব পরিচিত হইয়াছিল। মৈত্রীর অপর নামই তাই জাতি হইল। ফরাশিরা বলিলেন জাতিকে টুকরা টুকরা ভাগ করা যাইবে না। জাতি একক ও অবিভাজ্য থাকিবে। সর্বৈব ক্ষমতা থাকিবে জাতির হাতে। জাতির অপর নাম দাঁড়াইল ‘সর্বজন’। প্রতিষ্ঠিত হইল সর্বজনই সর্বেসর্বা বা সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকার প্রয়োগ করিবেন।

এই ‘মৈত্রী’ ধারণাটি  ফরাশি বিপ্লবের মর্যাদা রক্ষা করিয়াছিল। কিন্তু মৈত্রী বা জাতীয় ঐক্য গঠিত হইলে তো সাম্য প্রতিষ্ঠার দরকার আছে। ফরাশি বিপ্লবের প্রথম পর্বে — মানে ১৭৮৯ সালের গঠন পরিষদে যে অধিকারনামার ঘোষণা গ্রহণ করা হয় তাহাতে — সাম্য বলিতে বুঝানো হইয়াছিল মাত্র অধিকারের সাম্য। ১৭৮৯ সালের ইশতেহারে ফরাশিদেশের স্বাধীনতা ব্যবসায়ীরা সাম্য কথাটা ব্যবহার করিয়াছিলেন স্বাধীনতা শব্দের মানিকজোড় আকারে।

বুর্জোয়া স্বাধীনতা ব্যবসায়ীদের দাবি ছিল পুরানা জমিদার আর ধর্মব্যবসায়ীদের বিশেষ অধিকার বাতিল করিতে হইবে। কায়েম করিতে হইবে সকলের সমান অধিকার। এই দাবির গূঢ় তাৎপর্য পুরানা জমিদারতন্ত্রের পতন তাড়াতাড়ি ঘটানো। সর্বসাধারণ কিন্তু সমানাধিকার বলিতে অধিক বুঝিতেন। অধিকার প্রয়োগের উপায়ের বা সম্পত্তির সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত না হইলে সাম্য কখনোই প্রতিষ্ঠা পাইতে পারে না। স্বাধীনতা ব্যবসায়ীরা ইহা জানিতেন। তাই তাহারা গোড়াতেই লিখিয়া রাখিলেন স্বাধীনতা মানে ‘সম্পত্তি অর্জন ও রক্ষার স্বাধীনতা’।

এই বুর্জোয়া স্বাধীনতাই শেষ পর্যন্ত ফরাশিদেশে কায়েম হইল। কিন্তু স্বাধীনতার দুই ধারণার সংঘাত সারা দুনিয়ায় ছড়াইয়া পড়িল। ১৯১৭ সালে রুশিয়ার বিপ্লব আর ১৯৪৯ সালে চিনা বিপ্লবের মধ্যে এই সংঘাত আরো বড় আকার লাভ করিল।

ফরাশি বিপ্লবে অনেক ধারা উপধারার সংঘাত স্ফূর্তিলাভ করিয়াছিল। অনেক ধারা মরুপথে হারাইয়া গিয়াছে বটে কিন্তু কোন কোন ধারা এখনো তরতাজা। ১৭৮৯ সালে প্রজা অধিকারের এশতেহারে ব্যক্তি মনুষ্যের বিবেকের স্বাধীনতা অর্থাৎ ধর্মবিশ্বাসের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়। ভিন্নমতাবলম্বী খ্রিস্টান বা প্রতিবাদী নাসারা ধর্মমণ্ডলি এবং এয়াহুদি ধর্মাবলম্বীদের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়ারও অঙ্গীকার করা হয়। আরো বড় কথা ১৭৯২ এসায়ি সালের ২০ সেপ্টেম্বর তারিখে গৃহীত সংবিধান বা জাতীয় গঠনতন্ত্রে বলা হয় যে কোন মানুষের অধিকার বা হক আছে প্রচলিত কোন ধর্মের পায়রবি না করিয়া স্বাধীনভাবে বসবাস করিবার।

এই ধরনের স্বাধীনতার ঘোষণা আজিকার মাপেও চারিটিখানি কথা মাত্র নহে। বলিতে পারেন শুকনা ঘোষণায় কি চিড়া ভিজিবে? কথার শক্তি আছে কিন্তু। না, এই স্বাধীনতা তো মাত্র ধলা মানুষের স্বাধীনতা নহে। ১৭৯৪ এসায়ির ৪ ফেব্র“য়ারি তারিখে পাশ করা এক আইনের বলে ফরাশিদেশের সকল উপনিবেশে বা পরাধীন দেশে ‘নিগ্রোজাতির’ অন্তর্গত সকল দাসকে মুক্ত করিয়া দেওয়া হয়। সেই আইন অবশ্য পরে নাপোলেয়ঁ বাতিল করেন।

এই কারণেই বলিতেছিলাম ফরাশি বিপ্লবের তিন আওয়াজের মধ্যে সাম্যের স্থান সর্বাগ্রে হওয়াই যুক্তিযুক্ত। ফরাশিরা যে পদবিন্যাসে বলিয়াছিলেন স্বাধীনতা, সাম্য, মৈত্রী আমরা তাহার সামান্য পুনর্বিন্যাস করিতেই পারি। বলিতে পারি সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা। বলিতে পারি সাম্য, মৈত্রী আনিয়াছি আমরা, বিশ্বে করিয়াছি জ্ঞাতি। ইহ্ইা আমাদের জাতি।

১৯৭১ সালের মহাসিন্ধু আজও কল্লোল করিতেছে। যাহার ইচ্ছা কান পাতিতে পারেন। দেবতারা শুনিবেন ‘সাম্য’। মনুষ্যের কানে বাজিবে ‘মৈত্রী’। আর অসুরেরা কেবল একটা বেসুরই পাকড়াইবেন — স্বাধীনতা।

আহা, আমার স্বাধীনতা রে! তোমাকে একেলা আগলাইয়া আমি কি করিব? আমার মৈত্রী চাই। চাই নতুন দাসপ্রথার অবসান। চাই সাম্য, সম্পত্তির সমানাধিকার। আমরা তিনটাই চাই। কারণ তিনের যে কোনটাই পড়িয়া গেলে সকলই যায়।

২১ মার্চ ২০১৩

২২ মার্চ ২০১৩, সর্বজন: নবপর্যায় ১

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.