রাষ্ট্র এখন নিজেই বিচারের মুখোমুখি

[এই সাক্ষাৎকারটি সম্প্রতি দৈনিক বণিক বার্তার পক্ষ হইতে গ্রহণ করা হইয়াছিল। দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটির প্রথম কিস্তি আজ ছাপানো হইল  — সম্পাদক।]

বণিক বার্তা: একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে সৃষ্ট সংকটকে কিভাবে দেখছেন?

সলিমুল্লাহ খান: এখানে প্রেক্ষাপট দুটি। বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্র হিসেবে জন্ম নিয়েছে একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ২৩ বছর ধরে এখানে সংগ্রাম হয়েছে। সেটাকে আমরা বলি স্বাধীনতা বা স্বাধিকার আন্দোলন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে চূড়ান্ত মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। ১৯৭৭ সালে লেখা  বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা শীর্ষক প্রবন্ধে আহমদ ছফা লিখেছিলেন, বাংলাদেশে একটা মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, সেটা ভালো বা মন্দের জন্য হোক। হতে পারে এর ফল অন্যে আত্মসাৎ করেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। একে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। দুই, মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির পক্ষে একমত হয়েছিল। ঐতিহাসিক এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে বাকি ১ শতাংশ লোক বাংলাদেশে ছিল যারা পাকিস্তান রাষ্ট্র চেয়েছিল। তাতেও কোনো অপরাধ হতো না, যদি না তারা পাকিস্তানি বাহিনীকে গণহত্যায় সহায়তা করত। এটাও একটা ঘটনা।

দুর্ভাগ্য, গণহত্যায় অংশ নেয়া পাকিস্তানি সেনারা বিচারের মুখোমুখি হওয়ার আগেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। এর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কারণ আছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করেছিল। তাদের বিচার করা যাবে না, এমন কোনো কথা চুক্তিতে ছিল না। তারা আত্মসমর্পণ করে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ডের কাছে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বন্দিরা প্রথমে ভারতে যায় এবং সেখান থেকে তাদের পাকিস্তানে পাঠানো হয়। স্বীকার করতে হবে, তাদের বিচার হয়নি।

কিন্তু বাংলাদেশের যেসব রাজনৈতিক দল মুসলীম লীগ, জামায়াতে ইসলামীসহ আরো ছোট ছোট দল পাকিস্তান আর্মিকে সহায়তা করেছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাদের অনেকে দেশ ছেড়ে চলে যান। মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী খুব কম লোকই নিহত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজাকার বা দালালদের গণহারে পিটুনি দেয়া হয়নি। হয়েছে বলে যে কথা প্রচারিত আছে তা সঠিক নয় ।

আরো কয়েকটি কথা বাজারে প্রচলিত আছে। যারা যুদ্ধ করেছিল তাদের মধ্যে যারা সবচেয়ে ভয়াবহ (যেমন আল বদরের কিছু লোক) তারা দেশ ছেড়ে চলে যায়। গোলাম আজমও দেশ ছেড়ে গিয়েছিলেন, পরে ফেরত এসেছেন। সংক্ষেপে বললে, জামায়াতে ইসলামীর অধিকাংশ লোক যারা পাকবাহিনীকে যুদ্ধে সহায়তা করেছেন, তারা বিচারের মুখোমুখী হননি। ফলে আমরা বলতে পারি প্রথম প্রেক্ষাপট — মুক্তিযুদ্ধ।

দ্বিতীয় প্রেক্ষাপট হলো বর্তমান মহাজোট সরকার তাদের বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে জিতেছিলেন। এটি পূরণ করতে বা অন্য কোনো কারণেই হোক তারা ট্রাইব্যুনাল তৈরি করেছেন। এর বিরুদ্ধে কিছু অপপ্রচার চলছে। আমি বলবো, যারা এসব করছে তারা জামায়াতের সমর্থক। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে তারা চিঠি লিখছেন, বলেছেন এ ট্রাইব্যুনাল বৈধ নয়।

আমরা মনে করি জামায়াতের দাবি অসার। বৈধ বলতে আমরা আইনের পরিভাষায় যা বুঝি এটাও সেরকম বৈধ ট্রাইব্যুনাল। ট্রাইব্যুনালের আন্তর্জাতিক মান বলে একটা কথা আমরা বাজারে শুনি। কিন্তু এটা তো বাংলাদেশি ট্রাইব্যুনাল। কথাটা হলো, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল; ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল ফর ক্রাইমস, তা নয়। ইন্টারন্যাশনাল শব্দটা এখানে ক্রাইমের বিশেষণ। এক দেশে যুদ্ধের সময় অন্য দেশের নাগরিক যে অপরাধ করেÑ এ জাতীয় অপরাধ আন্তর্জাতিক অপরাধ বলে, এ ট্রাইব্যুনাল তার বিচার করছে না। এ ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশি বিচারকদের  দ্বারা গঠিত। এর বিষয়বস্তু কিন্তু সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ নয়। ইন্টারন্যাশনাল শব্দটি একটি ভদ্রশব্দ। আর ওয়ার ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল জনবোধ্য শব্দ । আর আমরা মুখে মুখে জনবোধ্য কথাটাই বলি। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এ দেশে যে অপরাধ হয়েছিল তা বিচারের জন্য এ দেশের একটি বৈধ সরকার এটি গঠন করেছে।

এখন যে কোন ট্রাইব্যুনালেরই সমালোচনা করা যাবে। যাবে না কেন? নুরেমবার্গ, টোকিও ট্রাইব্যুনালেরও সমালোচনা করা যাবে। সমালোচনা এক কথা নাকচ বা নিকুচি করা সম্পূর্ণ আর। বাংলাদেশের  ট্রাইব্যুনালকে নাকচ করে দেয়ার জন্য একটা আন্দোলন শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিকভাবে। এই হচ্ছে বর্তমান সংকটের প্রেক্ষাপট। এ ট্রাইব্যুনাল বৈধ, এটি রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনের উদ্যোগে গঠিত। আর এতে বাংলাদেশের জনসাধারণের সমর্থন আছে। যদি না থাকতো, তাহলে এ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকার নির্বাচনে জিততে পারতো না। বিচার প্রক্রিয়ায় ক্রুটি থাকলে তা সংশোধনে উচ্চ আদালতে আপিলের ব্যবস্থাও তো আছে।

বণিক বার্তা: এ প্রেক্ষাপটে হিন্দুদের ওপর আক্রমণ হলো কেন?

সলিমুল্লাহ খান: যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালকে নাকচ (বা বানচাল) এবং এর বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য যে প্রচারাভিযান শুরু হয়েছে সেটা শুধু কাগজে কলমে নয়, বাস্তবেও। যা ইস্যু নয় তাকে ইস্যু করছে । যা ইস্যু নয় সেটাকে ইস্যু না করলে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালকে চ্যালেঞ্জ করা যাচ্ছে না। অতএব ইস্যু বদলানোর জন্য তারা এটা করছে। উদাহরণস্বরূপ: এমন কোনো দেশ নেই যেখানে দুচারজন নাস্তিক নেই। সেটা ইহুদি, খ্রিষ্টান এমনকি হিন্দুদের মধ্যেও রয়েছে। শিবনারায়ণ রায়ের মতো লোক নিত্য বলে গেছেন, আমি নাস্তিক, আমি নাস্তিক। লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও হামেশা বলতেন, আমি নাস্তিক। কিন্তু শিবনারায়ণ রায় বা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিচার তো ভারত করেনি। মুসলিম সমাজেও এমন লোক থাকতে পারে।

কে নাস্তিক আর কে নয় এটা এখানে আন্দোলনের ইস্যু হয়ে গেল। ইসলামধর্মের প্রতিষ্ঠাতা হযরত মুহাম্মদ (সঃ) তাঁহাকে, তাঁহার পবিত্র নামের, নিন্দা করে এয়ুরোপে নিত্যদিন আন্দোলন চলছে। এর বিরুদ্ধে সারা বিশ্বের মুসলিম সমাজ বিক্ষুব্ধ। বাংলাদেশেও এধরনের কোনো কোনো তুচ্ছ লোক থাকতে পারে। তবে এখানকার ছাপা কোনো পত্রিকায় এ ধরনের কোনো কার্টুন ছাপানো যাবে না। এমন কোনো সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন করা যাবে না। এখন নতুন যে ইন্টারনেট মিডিয়া এসেছে, যার ব্যবহার সর্বস্তরের মানুষ ভালো করে জানেও না, তার সুযোগ নিয়ে আমেরিকানরা ইউটিউবে একটি খারাপ ছবি তুলে দিয়েছে। এজন্য আমেরিকাতেও সে লোকের বিচার হচ্ছে। বাংলাদেশেও কিছু কিছু লোক এমন করেছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, যুদ্ধাপরাধের বিচারে যখন ট্রাইব্যুনাল বসলো তখন কেন এ ইস্যুগুলোকে বড় করে সামনে আনা হচ্ছে। এটা অবশ্যই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। হয়তো এ বিচারকে দুর্বল করার জন্য কতগুলো লোক একে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। আরেক দল এসে সেটাকে বড় করে বলছে নিন্দাকারীদের বিচার করো। উদ্দেশ্য কি? মুসলমানদের ধর্মীয় ঐক্যের মূল জায়গাটি হলো নবী হযরত মুহম্মদ (সঃ)। সে জায়গায় আঘাতের উদ্দেশ্য পরিস্কার। আপনাকে পাল্টা জিজ্ঞাসা করবো, আঘাতটা এ মুহূর্তে কেন? এ আঘাত বা তার বিচারের উদ্দেশ্যই হলো যুদ্ধাপরাধের বিচার ইস্যুকে গৌণ ও সন্দেহপূর্ণ করে তোলা। হিন্দুদের ওপর আক্রমণের কারণ একই।

২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ প্রথমে করেছে ইকবাল হল আর জগন্নাথ হলে । বেশি করেছে। অন্য হলে যে আক্রমণ করেনি, সে কথা আমি বলছি না। ইকবাল হলে একজনও প্রাণে বাঁচেনি। সলিমুল্লাহ হলেও আক্রমণ হয়েছে। তবে জগন্নাথ হলকে তারা একেবারে ধুলিস্মাৎ করে দিয়েছে। এতেই বোঝা যায়, হিন্দুদের হিন্দু বলে পয়েন্ট আউট করা ১৯৪৮ সালের পর থেকে পাকিস্তান সরকারের বৈশিষ্ট্য ছিল। সেটারই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে এখন। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলো যে ধরনের অপরাধের কারণে সে ধরনের অপরাধই তো পুনরায় সংঘটিত হচ্ছে।

কয়েকদিন আগে বেগম খালেদা জিয়া একটি বিবৃতি দিলেন। খুব দুঃখ লাগলো, তিনি বললেন — আমরা খবর পেয়েছি সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ হচ্ছে। কিন্তু আক্রমণটা কারা করছে সে ব্যাপারে তিনি কোনো ইঙ্গিত দিলেন না। কবি ফরহাদ মজহারও বেগম জিয়ার মতো অভিযোগ করলেন দেশে গণহত্যা চলছে। আর তিনিও কোনোভাবেই উল্লেখ করলেন না সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের বিষয়টি। চ্যানেল আইয়ে প্রচারিত তৃতীয় মাত্রায়ও তাঁকে দেখলাম। কয়েকটি নিবন্ধও লিখেছেন তিনি। তিনি ক্রমশ ভোল পাল্টাতে পারেন। তিনি স্পষ্ট পারেন।

মজহার লিখেছেন, এ পরিস্থিতিতে নাগরিকদের দিক থেকে সব পক্ষের কাছে কিছু দাবি তোলা খুব জরুরি। যাতে কয়েকটি আশু ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়ে জাতীয় সম্মতি তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তাতে প্রথমেই থাকবে যে সব নাগরিকের বাড়িঘরে হামলা হয়েছে, জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে এবং উপাসনালয় ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অনেকে বাড়িঘর হারিয়ে সর্বহারা হয়ে পথে বসেছে, তাদের আর্থিক সহযোগিতা দেয়া। ২. যারা পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন তারা যে পক্ষেরই হোক তাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা। ৩. গণহত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত করা এবং এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানোর নীতিমালা গ্রহণ করা। ৪. পুলিশকে জাতিসংঘের বিধান মেনে চলতে বাধ্য করা। তিনি কিন্তু কোথাও একবারও হিন্দু সম্প্রদায়ের নাম নেননি। মাত্র লিখেছেন, ‘যে সব নাগরিকদের’। এমন ভান করছেন যেন সব নাগরিকের ওপর হামলা হয়েছে।

অথচ এবার সংঘবদ্ধ কমিউনিটি হিসেবে হিন্দুদের বাড়িতে সিস্টেমেটিক্যালি আক্রমণ হয়েছে । অনেক সময় হয়তো বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যেত মুসলমানদের বাড়িতেও আক্রমণ হয়েছে। এযাত্রা ব্যাপক আকারে হিন্দুদের মন্দিরে-বাড়িতে আক্রমণ হয়েছে। একই ঘটনা ঘটেছিল রামুতে। তখন বৌদ্ধরা কি অপরাধ করেছিল? আমি পরিস্কার দেখতে পাচ্ছি রামুর ঘটনা যারা ঘটিয়েছিল তারা ছিল অনেক বেশি কৌশলী। কিন্তু এবারেরটা পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে। এতে স্পষ্ট হয়ে গেল রামুর ঘটনাও কারা ঘটিয়েছিল। জামায়াতে ইসলামী ঘটিয়েছিল। ওখানে পবিত্র কোরআন শরিফ অবমাননাকে কেন্দ্র করে একজন বাঙ্গালি বৌদ্ধকে দায়ী করে ওই আক্রমণ চালানো হয়েছে। সেটা হয়েছিল পরীক্ষামূলক বা পাইলট প্রজেক্টের মতো। এখন তারা সারা দেশে এটি করল। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার নিয়ে যে সহিংসতা তৈরি হয়েছে সেটাকে বাদ দিয়ে রামুর ঘটনা কিছু বোঝা যাবে না।

ইন্টারনেটে নবী করিমের (সঃ) নামে অবমাননাকর প্রচার কেন? হিন্দুদের বাড়িতে কেন আক্রমণ হচ্ছে? একা একা কোনটাই বোঝা যাবে না। তিনটি ঘটনাকে এক জায়গায় দাঁড় করালে দেখা যাবে সবগুলোরি উদ্দেশ্য একটাই — যুদ্ধাপরাধের বিচারটা থামিয়ে দেয়া।

বণিক বার্তা: তাহলে তো মনে হয় সরকার যে প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে এর মধ্যে কোন ত্রুটি ছিল না। ত্রুটি না থাকলে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ কেন তৈরি হল?

সলিমুল্লাহ খানত্রুটি একশ থাকতে পারে, কিন্তু কোন মৌলিক ত্রুটি ছিল না। মহামতি লেনিন বলেছেন, যে কোন কাজ করে না সে কোন ভুলই করে না। কাজ করলে ভুল হবে। তবে মৌলিক ভুল করা চলবে না। আমি বলব, সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের যে আয়োজন করেছে তা ভুল নয়। বিচার প্রক্রিয়ায় ভুল আছে কিনা, সেটা বিশেষজ্ঞরা বলবেন। তবে ট্রাইব্যুনাল গঠনের ব্যাপারে আগেই বলেছি, এটা তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু সেখানে কাকে বিচারক নিয়োগ করা হবে, কাকে ক্রিমিনাল প্রসিকিউটর করা হবে প্রভৃতি বিষয়ে আমি বলতে পারব না।

বণিক বার্তা: এসব ক্ষেত্রে তো আঁতাতের অভিযোগ উঠেছে…

সলিমুল্লাহ খান: এগুলো রাজনৈতিক অভিযোগ। এসব তো থাকবেই। কোন দেশের বিচার ব্যবস্থা অরাজনৈতিক? জামায়াতের কোন উকিলকে দিয়ে আপনি ট্রাইব্যুনাল গঠন করবেন? তাহলে এখানে ভুল কোথায়? দেখতে হবে, যাদের নিয়োগ করা হয়েছে তাদের যোগ্যতা আছে কিনা। তাদের কেউ হয়তো আওয়ামী লীগের মধ্যে থাকতে পারে। এখানে আমি আপনার সঙ্গে উকিল হিসেবে কথা বলছি না। বলছি, যুদ্ধাপরাধের বিচার জনগণের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ কিনা। সরকার টেকনিকালি যোগ্যদের নিয়েছে কিনা সে ব্যাপারে অনেকের অভিযোগ আছে। ত্রুটি থাকতেই পারে। সে ব্যাপারে তো আমি জবাবদিহি করব না। আমি আইনমন্ত্রী বা অ্যাটর্নি জেনারেল নই। আমি দেশের একজন সাধারণ নাগরিক। আমি মনে করি, এ বিচার ১৯৭২ সালেই হওয়া উচিত ছিল। ১৯৭৫ সালের পর যুদ্ধাপরাধী হিসেবে যারা বন্দি ছিল, জেনারেল জিয়াউর রহমান তাদের মুক্ত করে দিয়েছেন। ঐ বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তিনি প্রায় ১০-১৫ হাজার লোকের মুক্তি দেন। এগুলো গোপন করে কার লাভ?

দেখছি, আমাদের কিছু তরুণ বুদ্ধিজীবীও গোপন করার অপরাধটুকু করছেন। তাঁরা নিরন্তর বলে চলেছেন শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব সব অপরাধীকে মাফ করে দিয়েছিলেন। আমি শেখ সাহেবের ভক্ত না হলেও মিথ্যা কথা তো বলতে পারি না। যারা জ্বালাও-পোড়াও, খুন, ধর্ষণের মত অপরাধ করেছে তাদের ছাড়া বাকিদের তিনি মাফ করে দিয়েছেন। এটা করে তিনি তো রাষ্ট্রনায়কসুলভ কাজই করেছেন। তার ত্র“টি থাকতে পারে। তবে যেটা তার ত্রুটি নয়, সেটাকে ত্রুটি হিসেবে তার ওপর চাপান কি কোন ভাল মানুষের কাজ? এটা কি ন্যায়বিচার হল? যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন বিলম্বে হলেও এটা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া আমাদের রাষ্ট্র এগুতে পারবে না।

বণিক বার্তা: সম্প্রতি রামুতে বা ২০০১ সালে সাতক্ষীরায় যে ঘটনা ঘটেছিল, সেগুলোর বিচার না হওয়ার জন্যই কি এবার তারা সাহস পেল?

সলিমুল্লাহ খান: যারা মনে করে এখানকার হিন্দু নাগরিকদের উপর আক্রমণ করলে রাজনৈতিক ফায়দা লোটা যাবে, তারা এটা করেছে। কাদের ফায়দা হয়েছে সেটাও সবাই জানে। ২০০১ সালে কার ফায়দা হয়েছিল? এখন হয়তো একই ফায়দার জন্য তারা এসব করছে। কিন্তু তারা একটি বিষয় ভুলে যাচ্ছেন, এটা ফৌজদারি অপরাধ শুধু নয়; এটা রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক অপরাধ। কারণ ধর্ম, ভাষা, নৃতত্ত্ব এসবের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের কোন গোষ্ঠীর উপর আক্রমণ দেশদ্রোহিতার শামিল। রাষ্ট্র এটাকে সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখলেও আমি মনে করি তা যথেষ্ট নয়। ১৯৯২ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার পর বোম্বে ও অন্যান্য জায়গায় যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল, সেটাকে আসলে দাঙ্গা বলা যায় না। তখন এক পক্ষ অপর পক্ষকে নিধন করেছে। একে দাঙ্গা বলা হবে কেন? এটাই প্রকৃতপক্ষে গণহত্যা। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় বেগম খালেদা জিয়া এবং ফরহাদ মজহারের মত লোকেরা এখন বলছেন গণহত্যার বিচার করতে হবে। এটা গণহত্যা শব্দটির নিকৃষ্ট ও বিকৃত ব্যবহার। আমি এসব মৃত্যু সমর্থন করি না। কিন্তু সাম্প্রতিক এসব মৃত্যুকে গণহত্যা বলাটা ঠিক হয়নি।

বণিক বার্তা: এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে উত্তরণের পথ কি? বিচার না ফাঁসি?

সলিমুল্লাহ খান: মনে করেন, আপনার দেশ শত্র“দের দ্বারা আক্রান্ত। ধরুন আপনার দেশকে চীন বা আমেরিকা এসে আক্রমণ করেছে। আপনিই বলেন, এর থেকে উত্তরণের পথ কি? আমেরিকা ইরাক আক্রমণ করেছে। তারা এর নাম দিয়েছে অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম। কিন্তু ইরাকের কয়জন লোক তার সঙ্গে সহযোগিতা করেছে? ইরাকের একটি অংশ সাদ্দাম হোসেনকে পছন্দ করত না। শিয়ারা করত না। কুর্দিরা করত না — তারা সুন্নি। ত্রিমুখী বিভক্তির কারণে কিছু লোক আমেরিকাকে সহযোগিতা করেছে। তারা জাতির অতি ক্ষুদ্রাংশ। যদি কোনদিন ইরাক স্বাধীন হয় তাহলে এ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে। যে কোন কারণে হোক কোলাবরেশন করাটা যুদ্ধাপরাধ। কাউকে হত্যা করা ধর্ষণ করা মানবতাবিরোধী অপরাধ। এক্ষেত্রে স্বাধীন ইরাকের কর্তব্য কি হবে?

কোন যুদ্ধে যদি আপনার জেতার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে মাঝে মাঝে আপনি পশ্চাদপসরণ করতে পারেন। কিন্তু এমন কোন সম্ভাবনা যদি না থাকে, তাহলে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও লড়াই করতে হবে। বাংলাদেশকে বাইরে থেকে কেউ আক্রমণ করলে দেশপ্রেমিক হিসেবে আপনি যে পজিশন নিতেন, সে পজিশন নিতে হবে। প্রত্যেক নাগরিককে স্বেচ্ছায় মুক্তিযুদ্ধে যেতে হবে। আমি মনে করি বর্তমান সংকট সে রকম হয়নি। যদিও অনেকে গৃহযুদ্ধের হুমকি দিচ্ছে।

বর্তমানে যারা বিচারাধীন আছেন, সরকারের দৃষ্টিতে তারা অভিযুক্ত। যতক্ষণ পর্যন্ত অপরাধ প্রমাণিত না হয়, ততক্ষণ তারা অপরাধী নন। এখন পর্যন্ত তিনজনের মামলার রায় হয়েছে। রায়ের ব্যাপারে আমরা মতপ্রকাশ করতেই পারি। এতে আদালত অবমাননা হয় না। আদালতের যে কোন রায় সম্পর্কে মন্তব্য করা যায়। ন্যায়বিচার না পাওয়ার কথাটি অভিযুক্ত, অপরাধী বা বিচারপ্রার্থী যে কোন পক্ষই বলতে পারে। কিন্তু এ ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে অপপ্রচার যারা চালাচ্ছেন তারা বলছেন ১৯৭১ সালের প্রকৃত অপরাধীদের বিচার না করে বিরোধীদলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বিচার করা হচ্ছে।

এ জাতীয় প্রচারণা যে মতলবে করা হচ্ছে সেই মতলবেই রামুতে বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা করা হয়েছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস একই মতলবে হিন্দু মন্দির কি ঘরবাড়িতে আক্রমণ করা হয়েছে।

বণিক বার্তা: রাষ্ট্র এক্ষেত্রে কি করতে পারে?

সলিমুল্লাহ খান: রাষ্ট্র নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে প্রতিশ্র“তিবদ্ধ। রাষ্ট্রকে নিরাপত্তা দিতে হবে। ব্যর্থ হলে সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। ধরে নিতে হবে, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিপ্লব হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র এখন নিজেই বিচারের মুখোমুখি। এটা এখন পরীক্ষার বিষয়।

রাষ্ট্রের বাইরে জনগণেরও দায়িত্ব আছে। আমরা যাকে বলি সিবিল সোসাইটি বা জাতীয় সমাজ তাদেরও চেষ্টা করতে হবে। জনমত গঠনের কাজ আছে। ৯৯ শতাংশ জনগণকে যদি একমত করা যায়, তাহলে কোন সহিংসতা হবে না। মনে রাখা দরকার এখন যুদ্ধাপরাধীদেরও অনেক ক্ষমতা হয়েছে।

কেউ ব্যক্তিগতভাবে সহিংসতা করলে রাষ্ট্র কি করবে? চাঁপাইনবাবগঞ্জে কানসাট বিদ্যুৎকেন্দ্রে আগুন দেয়া হল। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের নিরাপত্তার জন্য ডাকাতের উপর গুলি না চালায়, তাহলে নাগরিকের জীবন রক্ষা করবে কি করে? সে ডাকাত ব্যক্তি হিসেবে বা দলবদ্ধ হয়েও আসতে পারে। সেটাকে তো দমন করতেই হবে। পুলিশকে নির্মমভাবে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে পুলিশ কি করবে? বলছি না পুলিশের প্রত্যেকটি কাজ সমর্থনযোগ্য। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণে বহু পুলিশকে এখন অপসারণ, ট্রান্সফার করা হচ্ছে। সেগুলো সঠিক না বেঠিক তা বলার ক্ষমতা আমার নেই। পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব হল, নাগরিক ও সমষ্টি হিসেবে রাষ্ট্রকে রক্ষা করা। সেটা করতে গিয়ে যে রাষ্ট্রকে আক্রমণ করে, সে স্বদেশি বা বিদেশি যেই হোক, পুলিশ তাকে মোকাবেলা করবেই।

বণিক বার্তা: মহিলা ও শিশুদেরও মটিভেশন করে নিয়ে আসা হচ্ছে আন্দোলনে…

সলিমুল্লাহ খান: বর্তমানে শাসকশ্রেণি (আওয়ামী লীগ বা বিএনপি বা জাতীয় পার্টি) গ্রামে ধনী কৃষকভিত্তিক ও শহরে মধ্যবিত্তভিত্তিক। তাদের একটা শ্রেণিচরিত্র আছে। আমি মার্কসের সেই বিশ্লেষণের দিকে যাচ্ছি না। সেটা যদি বলেন, বর্তমান সরকারের নীতিতে তো অনেক রকম গলদ আছে। প্রথম গলদ হল, ৪২ বছর পর বিচার করা। গ্রামে তারা কিছুটা গণবিচ্ছিন্ন হয়েছে। সেই বিচ্ছিন্নতার সুযোগ সমাজতান্ত্রিক সাম্যবাদী দলগুলোর নেয়ার কথা ছিল। তারা সেটা নিতে পারেনি।

দেখবেন, ফরাশি বিপ্লবের সময় এ রকম একটি কৃষক অভ্যুত্থান হয়। এক বছর ধরে লড়াই চলে এবং তাতে ২০ হাজার লোক নিহত হয়। ফরাশি বিপ্লব পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিপ্লবগুলোর একটি। এটিকে আমরা বুর্জোয়া বিপ্লব বলি। সেই বিপ্লবেও প্রতিক্রিয়াশীল কৃষকরা পুরোহিতদের নেতৃত্বে রাজতন্ত্রকে পুনরুদ্ধারে লড়াইয়ে নেমেছিল। সেখানকার ভঁদে প্রদেশে কৃষকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে নির্যাতনমূলক ব্যবস্থা নিতে হয়েছিল। কারণ ফ্রান্স তখন চতুর্দিক থেকে আক্রান্ত। তখন দেশের মধ্যে যারা রাজতন্ত্রীদের পক্ষ হয়ে কাজ করেছিল, তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। তাতে অনেক নিরাপরাধ লোকেরও মৃত্যু হয়েছে। নেপোলিয়নের সঙ্গে যুদ্ধে প্রতিবিপ্লবীরা কয়েক লাখ লোককে হত্যা করেছে। সেটার কথা তো কেউ বলে না?

আমরা কথায় কথায় বলি এয়ুরোপে মৃত্যুদণ্ড রহিত হয়েছে, বাংলাদেশেও রহিত করা উচিত। আমি এয়ুরোপীয়দের জিজ্ঞাসা করি, আফগানিস্তান ও ইরাকে যেসব লোককে হত্যা করা হয়েছে তা কি পরোক্ষ মৃত্যুদণ্ড নয়? তারা রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে মৃত্যুদণ্ড না দিলেও তা রফতানি করেন। গিলোটিনে কেটে যেসব লোককে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে, তাদের ৯৯ শতাংশই ছিল বিপ্লব বিরোধী। বিপ্লব জিনিসটাই নির্মম প্রক্রিয়া। মাও সেতুং বলেছেন, বিপ্লব মানে ভোজসভা বা প্রবন্ধ রচনা নয়। বিপ্লব বলপ্রয়োগের ঘটনা, যার মধ্যস্থতায় এক শ্রেণি আরেক শ্রেণিকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করে।

১৯৭১ সালের ঘটনাও এক রকম বিপ্লব ছিল। আমাদের দুর্ভাগ্য, এর ফল আমরা পুরোপুরি ঘরে তুলতে পারিনি। তাই আহমদ ছফার সেই কথাটিই আমি স্মরণ করি। ১৯৭৭ সাল নাগাদ লেখা বাংলাদেশের রাজনৈতিক জটিলতা নামক প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের কোন ভবিষ্যৎ নেই। কাজেই ভবিষ্যতে বাংলাদেশ কোন ধরনের রাষ্ট্র হিসেবে থাকবে তা নির্ভর করছে বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার উপর। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নিয়েও কেউ যদি তা করতে না পারে, তাহলে গণপ্রজাতন্ত্র আকারে বাংলাদেশ থাকবে কিনা সন্দেহ আছে।

(অনুলিখন: জহিরুল ইসলাম)

১৩ মার্চ ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ৩৩
১৪ মার্চ ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ৩৪
১৫ মার্চ ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ৩৫

Leave a Reply