জাতীয় চেতনা কি পদার্থ?

আমরা ধর্মে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান হইনা কেন, জাতিতে যে বাঙ্গালী এবং ভাষায় যে বাংলা ভাষী, সে বিষয়ে আমাদের মনে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল না। তাই তো বাঙ্গালী হিসাবে মাতৃভাষায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ইতিহাস-চর্চা আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে এই পরিষদের মধ্যস্থতায় বিষয়টির অনুশীলন করব, — এটি ছিল আমাদের মূল উদ্দেশ্য ও করণীয় কাজ। রাজনীতির সাথে আমাদের সম্বন্ধ কোন কালেই ছিল না — এখনও নেই।

© মুনেম ওয়াসিফ

© মুনেম ওয়াসিফ

এই কয়েকটি কথা বলিয়াছিলেন স্বনামধন্য পণ্ডিত মুহম্মদ এনামুল হক। ১৯৭৩ সালেন মে মাসে ঢাকায় বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের উদ্যোগে যে ইতিহাস সম্মেলন হইয়াছিল তাহাতে তিনি সভাপতির ভাষণ দিয়াছিলেন। উপরের কথাগুলি সেই ভাষণের মধ্যে পাওয়া যাইবে।

এতদিনে মনে হইতেছে কেহ কেহ হয়ত পণ্ডিত এনামুল হককেও ‘বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী’ বলিয়া গালিগালাজ করিতে কসুর করিবেন না। এনামুল হকের চোখে মাতৃভাষায় ইতিহাস লেখার কর্তব্য একটা আদর্শ পদার্থ। ইহাকে তিনি রাজনীতি বলিতে সচারাচর যাহা বুঝায় তাহার অন্তর্গত বলিয়া গণ্য করেন নাই। কিন্তু ১৯৭১ সালের ‘পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী ও তাদের তাঁবেদার খানসেনা’ তাঁহার সহিত একমত হয় নাই। ১৯৭১ সালের রাষ্ট্রবিপ্লবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ অধ্যাপক — সন্তোষকুমার ভট্টাচার্য, আবুল খায়ের এবং গিয়াসুদ্দিন আহমদ — আর দেশের বিভিন্ন কলেজের বহু ইতিহাসবেত্তা অমানুষিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হইয়াছিলেন। তাঁহাদের দোষটা কোথায় ছিল? সম্ভবত তাঁহারা ‘বাঙ্গালি’ ছিলেন, বিশেষ করিয়া বলিতে গেলে ‘বাঙ্গালি বুদ্ধিজীবী’ ছিলেন। ইহাই তাঁহাদের দোষ। যদি আপনি এই উত্তরটা দিয়া থাকেন তো কেহ কেহ আপনাকে ‘বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদী’ বলিয়া গালি পাড়িতে পারেন। দেখিয়া শুনিয়া তাহাই মনে হইতেছে।

এই কথা অসত্য নহে যে বাংলাদেশের চারি সীমানার মধ্যে যাহারা বসবাস করিতেছেন তাহারা সকলেই বাঙ্গালি জাতির অন্তর্গত নহেন। তাহা সত্ত্বেও দেশটির নাম হইয়াছে বাংলাদেশ। নাম একটা তো লাগিবেই। এখানে মাতৃভাষা হিসাবে বাংলা ভাষাভাষী নহেন এমন জনগোষ্ঠীও আছেন। তাহাদের ভাষাও এই দেশের ভাষা। এই কথাটি মানিয়া লইতে হইবে। যুক্তিটা কি? যুক্তি আগেরটাই।  যে যুক্তিতে অবাঙ্গালি বাংলাদেশীও মাতৃভাষায় লিখিবেন পড়িবেন। বাঙ্গালি যদি অন্য জাতির ন্যায্য অধিকারকে অস্বীকার করিয়া বসে তবে তাহা হইবে গর্হিত কাজ। আমরা হয়ত ন্যায্য অর্থেই তাহাকে ‘বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদী’ বলিতে পারিব।

কিন্তু ‘জাতীয় চেতনা’ আর ‘জাতীয়তাবাদ’ এক জিনিশ নহে। বাঙ্গালি যদি নিজের অধিকার মনে করিয়া অন্যজাতির জাতীয় অধিকারও স্বীকার করিয়া লয় তবেই না রাষ্ট্র হইবে জাতি-নিরপেক্ষ। এই জাতি-নিরপেক্ষতাই আমাদের জ্ঞানে জাতীয় চেতনার সার্থক আকার। পুরানা দিনের মার্কস অনুসারী চিন্তায় এই ধারণার অপর নাম দাঁড়াইয়াছিল (পরাধীন জাতির) জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার। এই অধিকারের ভিত্তি-পদার্থের নামই দাঁড়াইয়াছে জাতীয় চেতনা। মহাত্মা ফ্রানৎস ফানোঁর লেখায় মন যোগ করিলেই দুই পদার্থ যে আলাদা বস্তু তাহা ঠাহর করা যাইবে।

‘আমাদের স্বাধীনতা-সংগ্রাম শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল না। এ ছিল বিশ্বের নির্যাতিত, নিপীড়িত ও নিষ্পিষ্ট মানুষের মুক্তি সংগ্রামের একটি অংশ।’ আমার ধারণা নিপীড়িত জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ বা স্বাধীনতার সংগ্রাম হইতে যে শিক্ষা পাওয়া যায় তাহার নাম ‘জাতীয়তাবাদ’ হইতেই পারে। কিন্তু ‘জাতীয় চেতনাই’ তাহার সারকথা।

ড. এনামুল হকের ১৯৭৩ বক্তৃতায় আমার এই ধারণার সমর্থন পাইতেছি। পণ্ডিত মহোদয় কহিয়া যাইতেছেন: ‘বাংলার স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাসকে কোন সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন অথবা কোন জাতি বিশেষের জয়-পরাজয়ের ইতিহাস বলে ধরে নেওয়া যায় না।’ এই ইতিহাস ‘আধুনিক বিশ্বের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটা নবীনতম সংযোজন।’

ড. হকের বিচারে যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস লিখিবেন তাহাকে স্থান দিতে হইবে একাধিক পদার্থকে। তাহার মধ্যে থাকিবে ‘নানাবিধ আর্দশের সংঘাত, ঔপনিবেশিকতার সাথে গভীর জাতীয়তাবাদের সংঘাত, হীনতম চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের সাথে একাত্ম স্পষ্টবাদিতা ও ন্যায়পরায়ণতার সংঘাত, সশস্ত্র ও সক্রিয় হামলার সাথে নিরস্ত্র ও নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধের সংঘাত আরও কত কি!’

আজিকার দিনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা নতুন করিয়া সংকটের মুখে কেন পড়িতেছে তাহা বুঝিবার চেষ্টা করিতে হইবে। বাংলাদেশ শুধুমাত্র বাঙ্গালির জন্য স্বাধীন হয় নাই। বাংলাদেশ স্বাধীন হইয়াছিল দুনিয়ার সমস্ত মজলুম জাতির জন্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে, ড. হক বলিয়াছেন, ‘বিশ্ববিবেক যে মহতী-ভূমিকা পালন করেছে এবং বাঙ্গালী নতুন করে যে পরিচয় লাভ করেছে, তাও তার স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাসে স্থান পাবে।’

গত ৪২ বছরেও আমরা কোন কোন কর্তব্য পালন করিতে পারি নাই। যুদ্ধাপরাধী বা মানবতাবিরোধী অপরাধী মহলের বিচার তাহারই একাংশ মাত্র। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাহার দোসরেরা এই দেশে যে গণহত্যা করিয়াছিল আমরা তাহার কোন শুমার করি নাই। মুহম্মদ এনামুল হক ১৯৭৩ সালের সেই অবিস্মরণীয় বক্তৃতায় যে অনুযোগ করিয়াছিলেন আজ ২০১৩ সালেও আমাকে একই অনুযোগের আবৃত্তি করিতে হইতেছে। তিনি বলিয়াছিলেন:

আমরা ত্রিশ লক্ষ বাঙ্গালী এই যুদ্ধে আত্মাহুতি দিয়েছে বলে একটা আন্দাজ করে নিয়েছি ও ঘোষণা করেছি। আদমশুমারির মতো কোন বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থার দ্বারা আমাদের আন্দাজ আজও সমর্থিত হয়নি। ইতিহাস কি আমাদের কথা বেদবাক্যের মতো নেবে? কি কারণে পাকিস্তানী সামরিক শাসকচক্র বাঙ্গালীকে ধরাপৃষ্ঠ হতে নিশ্চিহ্ন করবার সংকল্প গ্রহণ করলেন, কি কারণে পাকিস্তানের বেসামরিক গণমানব তো দূরের কথা, বুদ্ধিজীবীরাও বাংলাদেশে গণহত্যার জন্য কোন উচ্চবাচ্য করলেন না, কি কারণে পাকিস্তানী ষড়যন্ত্রের, পাকিস্তানী বিশ্বাসঘাতকতার, পাকিস্তানী জনবল, পাকিস্তানী অর্থবল প্রভৃতির কোন সঠিক খবর আমাদের কাছে এসে পৌঁছল না, তার কিছুই এখন পর্যন্ত আমাদের জানা নেই।

আজ ৪০ বছর পরও জানা নাই। এমনই দুর্ভাগ্য আমাদের।

আর নাই বলেই তো এই বছরও আমরা দেখিতেছি কেহ কেহ প্রচার করিতেছেন ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে নাকি বাছিয়া বাছিয়া বিরোধীদলের মাথা মাথা নেতাদের বিচার করা হইতেছে। আর আসল অপরাধীরা পাড় পাইয়া যাইতেছে। আরও দুঃখের কথা, যাহারা ইতিহাসের সেই যুগে বাঁচিয়া ছিলেন তাহারা পর্যন্ত এহেন প্রচারে নাচিয়া বেড়াইতেছেন।

এই দুঃখ রাখিবার জায়গা নাই।

১১ মার্চ ২০১৩

দোহাই

মুহম্মদ এনামুল হক, ‘ইতিহাস-সম্মেলনে সভাপতির ভাষণ,’ মুহম্মদ এনামুল হক রচনাবলী, ৫ম খণ্ড, মনসুর মুসা সম্পাদিত (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৯৭), পৃ. ৪০১-৫।

 

১১ মার্চ ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ৩১

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.