জাতীয় চেতনার চোরাগর্ত: আফ্রিকা পর্ব

‘জাতি’ বলিতে বাংলায় কি বুঝায় এখনো তাহার ঠিকানা সাব্যস্ত হয় নাই। ‘জাতি’ বলিতে বাংলায় ‘রেস’, ‘নেশন’, এমনকি ‘প্রকার’ বা লিঙ্গভেদও বুঝায়। কেহ বলেন ‘পাঁচ হাজার বাঙ্গালি জাতি’ বিরাজ করিতেছে। আর কেহ বা বলেন জাতিগঠনের কাজটি এখনো সম্পূর্ণ হয় নাই। এই দ্বিতীয় কাহিনীর প্রবক্তাগণ জাতি বলিতে জাতির রাজ বুঝাইতেছেন বলিয়াই মনে হয়। ইহারা স্বীকার করিয়াছেন জাতি পদার্থটা গঠিয়া তুলিতে হয়, এমনি এমনি হাওয়ায় ভাসিয়া আসে না। এই জন্যই বলি, জাতি মানে জাতির ইতিহাস বৈ নহে।

‘জাতীয় চেতনা’ বলিতে যাহা বুঝায় তাহাকে যদি একটা ক্ষেত্র বা মাঠের সহিত তুলনা করা যায়, তবে সেই মাঠের মধ্যে মধ্যে কিছু কিছু অদৃশ্য গর্তও থাকিতে পারে। মহাত্মা ফ্রানৎস ফানোঁ ১৯৬১ সালে প্রকাশিত ‘দুনিয়ার মজলুম’ নামা কেতাবে এই ‘চোরাগর্ত’ কথাটা ব্যবহার করিয়াছিলেন। আমরা জাতি এখনো গঠিতেই পারি নাই কেন তাহা এস্তেমাল করিতে চাহিলে তাঁহার সাহায্য পাওয়া যাইবে।

একপ্রকার চোরাগর্তের নাম ‘সাম্প্রদায়িকতা’। ফানোঁ যে শব্দটা এস্তেমাল করিয়াছিলেন তাহার ইংরেজি হইয়াছে ‘ট্রাইবালিজম’। আমরা বাংলায় তাহাকে বলিতে পারিতাম ‘গোষ্ঠীবাদ’ বা ‘উপজাতীয়তাবাদ’। তাহা না করিয়া অদ্য আমি ‘সাম্প্রদায়িকতা’ কথাটা পুনরাবৃত্তি করিলাম। কারণ ফানোঁ যাহাকে ‘ট্রাইবালিজম’ বলিয়াছেন আমাদের জাতীয় ইতিহাসের মধ্যে এই ধরনের গর্তের নামই দাঁড়াইয়াছে সাম্প্রদায়িকতা।

আফ্রিকা মহাদেশের ইতিহাস ভর করিয়া ফানোঁ বলিয়াছিলেন নিখিল আফ্রিকার ঐক্যের ডাক দিয়াই আফ্রিকার নানান দেশের মধ্যমশ্রেণির রাজনীতি ব্যবসায়ীরা বিদেশি দখলদারদের আফ্রিকাছাড়া করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের মধ্যে বিদেশিরা দেশ ছাড়িবার আগেই দেশে দেশে আঞ্চলিকতার জয়গান শুরু হইয়া গিয়াছিল। আফ্রিকার ঐক্য একটা কথার কথায় পরিণত হইয়াছিল। জাতীয় চেতনা সম্বল করিয়া যে ঐক্য গড়িয়া তোলা হইয়াছিল বিদেশি প্রভুর শাসন অবসানের সঙ্গে সঙ্গে সে ঐক্য চুরমার হইয়া গেল। আফ্রিকা মহাদেশে নানান স্বাধীন রাষ্ট্র কায়েম হইবার পর একই রাষ্ট্রের মধ্যে এক জাতির সহিত আরেক জাতির, এক গোষ্ঠীর সহিত আরেক গোষ্ঠীর লড়াই ক্ষমাহীন আকার ধারণ করিল।

ফানোঁ বর্ণিত এই ক্ষমাহীন সংঘর্ষ এক ধর্মীয় গোষ্ঠীর সহিত আরেক ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিবাদের মধ্যেও ঢুকিয়া পড়িল। ইহাতে উপনিবেশবাদী বিদেশিদেরই লাভ। ফানোঁ দেখাইয়াছেন সেনেগালের একটি পত্রিকা — নাম ‘নিয়ু আফ্রিকা’ — কেবলমাত্র এসলামধর্ম ও আরবজাতির বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াইতে লাগিল। বিশেষ লেবাননী বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ীরা হইল এই প্রচারণার শিকার। খ্রিস্টান মিশনারিরা জনসাধারণকে মনে করাইয়া দিলেন এয়ুরোপীয় পরদেশব্যবসায় শুরু হইবার বহুদিন আগে হইতেই আফ্রিকা মহাদেশের বড় বড় সাম্রাজ্য তছনছ করিয়া দিয়াছিল আরবজাতির হামলা। আরবরা আফ্রিকায় দখল কায়েম না করিলে এয়ুরোপীয় সাম্রাজ্যগুলি এত সহজে আফ্রিকায় উপনিবেশ গঠিতে পারিত না বলিয়া দাবি করিতে কোন কুণ্ঠা দেখা গেল না। লোকে বিনা ভূমিকায় ‘আরব্য সাম্রাজ্যবাদ’ আর ‘এসলামধর্মের সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ’ বলিয়া গালিগালাজ শুরু করিল। বাছিয়া বাছিয়া মুসলমানদের সরকারি চাকুরি হইতে ছাঁটাই করা হইল। ইহা হইতেছে সেনেগালের গল্প। আর কোন কোন দেশে বাছিয়া বাছিয়া ছাঁটাই করা হইল খ্রিস্টান বা নাসারাজাতির লোক। ফ্রানৎস ফানোঁ এই জাতীয় সাম্প্রদায়িকতার নাম রাখিলেন ‘জাতীয় চেতনার চোরাগর্ত’।

ইহার ফল দাঁড়াইল বিষম। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার রক্তে আফ্রিকার ঐক্য ভাঙ্গিয়া গেল। দেশে দেশে কোথাও এসলামের, কোথাও খ্রিস্টধর্মের ক্যাথলিক গোষ্ঠী, আবার কোথাও বা প্রতিবাদী গোষ্ঠীর পোয়াবারো হইল। সারা আফ্রিকার মাপে মাপিলে বলিতে হইবে ধর্মীয় বিভেদকে কেন্দ্র করিয়াই ছড়াইয়া পড়িল বর্ণবাদী দাঙ্গা। কথাটা খোদ ফানোঁর বহি হইতে তুলিয়া দিতেছি।

আফ্রিকাকে দুইভাগে ভাগ করা হইল। ধলা আফ্রিকা ও কালা আফ্রিকা। ধলা আফ্রিকা মানে হাজার বছরের পুরানা গ্রিক ও রুমি সভ্যতা ও সংস্কৃতির ওয়ারিশান আফ্রিকা। এই আফ্রিকা এয়ুরোপের সহোদরা। আর কালা আফ্রিকা মানে অচল, অনড়, পশুর মতন, অসভ্য আফ্রিকা। এক কথায় বন্য আফ্রিকা। এই আফ্রিকার মেয়েরা মাথায় কাপড় দেয়, পুরুষেরা গণ্ডা গণ্ডা বিবাহ করে। আরবেরা নারীজাতির নিকুচি করে। এই জাতীয় প্রচারণার ঠেলায় আপনার কান রি রি করে। ফানোঁ বলিতেছেন, এই ধল আর কাল দুই আফ্রিকার ‘জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণি’ — যাহারা উপনিবেশ ব্যবসায়ীদের চিন্তাধারার বদ্ধ দুর্নীতিটা আকণ্ঠ পান করিয়া পেট ফুলাইয়াছেন তাহারা — এয়ুরোপিয়া শাসকদের হাত হইতে এই মহাদেশে এমন একটি বর্ণবাদী দর্শন গ্রহণ করিয়াছেন যাহা আফ্রিকার ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত বেশি ক্ষতির কারণ হইবে।

নবীন আফ্রিকার বুর্জোয়া শ্রেণি জাতিগঠনের কর্তব্য বুঝিতে পারিলে উপনিবেশ ব্যবসায়ীদের পাতানো ফাঁদে এইভাবে পা দিত না। ফানোঁ বলেন নবীন জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণি যে জাতিগত বা বর্ণবাদী বিদ্বেষে ভুগিতেছে তাহার গোড়ায় আছে একপ্রকার ভয়। এই ভয়কে ভর করিয়াই তাহারা আত্মরক্ষায় তৎপর হয়। শেষবিচারে আফ্রিকায় যে বর্ণবিদ্বেষ বা বর্ণদাঙ্গা দেখা দেয় তাহাও একপ্রকারের অন্ধ, যুক্তিহীন গোত্রকেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িকতার অধিক নহে। এই কারণেই আফ্রিকা মহাদেশের নানান জাতির নেতারা যখন আফ্রিকা মহাদেশের ঐক্য বলিয়া চিৎকার করিতেন তখন বিদেশি প্রভুরা মুচকি হাসির ধারা বহাইয়া দিতেন। আফ্রিকা মহাদেশের ঐক্য প্রতিষ্ঠার আগে এই জাতীয় সহস্র সমস্যার সমাধান করিতেই হইবে। যতদিন সে সমাধান বাস্তব না হইতেছে ততদিন আফ্রিকার ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হইবে না। মনে রাখিতে হইবে, গর্তটা অলীক নহে।

এতদিন পর পড়িলেও ফানোঁর অন্তর্দৃষ্টিতে মুগ্ধ না হইয়া পারা যায় না। আর আমাদের দেশের মতন দেশ হইতে কান পাতিলেও ইহার ব্যঞ্জনা শুনা যায়। সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে লাভের গুড় শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদের পিঁপড়াতেই খায়।

৯ মার্চ ২০১৩

দোহাই

Frantz Fanon, The Wretched of the Earth, Constance Farrington, trans., 20th reprint (New York: Grove Press, 1979), pp. 148-205.

 

৯ মার্চ ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ২৯

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.