বাংলাদেশের মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ইতিহাস প্রসঙ্গে: হবীবুল্লাহ বাহারের সাক্ষ্য

‘হবীবুল্লাহ বাহার রচনাবলী’ প্রকাশিত হইয়াছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের এক চরম সন্ধিক্ষণে। একরকম দুঃসময়ে। ১৯৭১ সালের নবেম্বর মাসে। ঐ বছরের মার্চ মাসে এই রচনাবলীর ভূমিকা লিখিয়াছিলেন একাডেমীর তৎকালীন পরিচালক অধ্যাপক কবীর চৌধুরী। ভূমিকায় কবীর চৌধুরী একটি সমস্যার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিলেন। আমি সেই সমস্যাটিকেই আমার নিবন্ধের বিষয় নির্বাচিত করিয়াছি।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের প্রথম দিকে বাংলার মুসলমান সমাজে, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী মনে করেন, ‘পশ্চাদমুখী ধ্যানধারণা ও জীবনবোধ’ অপসারণের চেষ্টা শুরু হয়। তিনি লিখিয়াছেন: ‘নওয়াব আবদুল লতীফ ও সৈয়দ আমীর আলী প্রমুখ কতিপয় ব্যক্তির উদ্যোগে পরিচালিত এ-প্রচেষ্টার সুফল ফলে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে। আধুনিক শিক্ষা প্রসার লাভ করে; এবং আধুনিক কালের অন্যান্য মানবগোষ্ঠীর লোকজনের সাথে মেলামেশার ফলে বঙ্গীয় মুসলিম সমাজ তার ভ্রান্ত ধারণা ও জীবনবোধ ক্রমে ক্রমে কিছু কিছু করে পরিত্যাগ করতে থাকে।’ (কবীর চৌধুরী ১৯৭১: পাঁচ)

এই পরিত্যাগের প্রক্রিয়াও–কবীর চৌধুরী বলিতেছিলেন–সহজ হয় নাই। কোন পথে গেলে মুসলমান সমাজের সত্যকার উন্নতি হইবে তাহা পূর্ব হইতে কেহ বলিয়া রাখে নাই। উন্নতি চাহিয়াছিলেন সকলেই। কিন্তু কেহ কেহ উন্নতির যে পথ বাতলাইয়াছিলেন তাহা অধোগতির নামান্তর বৈ ছিল না। কবীর চৌধুরীর কথায়, ‘কিছু লোক প্যান-ইসলামিজমের মাধ্যমে পাক-ভারতের ‘জাতীয় স্বাধীনতা’ অর্জনের কৌতুকপ্রদ কার্যে কায়মনোবাক্যে আত্মনিয়োগ করেন। সামন্ততান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পতন যুগের প্রতীক সাম্রাজ্যবাদের ক্রীড়নক মুসলিম রাজা-বাদশাদের সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্যকে মুসলিম সমাজের সৌভাগ্য–দুর্ভাগ্যরূপে গণ্য করতেন অনেকে। কোন কোন মনীষী ভ্রান্ত আস্থা-অনাস্থারাজিকে ততোধিক ভ্রান্ত-যুক্তিতর্কের দ্বারা রক্ষা করার কার্যে অবতীর্ণ হন এবং যেটার সমর্থনে আদৌ কোন যুক্তি উপস্থিত করা যায় না সেটার নতুন ব্যাখ্যায় মনোযোগ দেন।’ (কবীর চৌধুরী ১৯৭১: পাঁচ-ছয়) অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর মতে হবীবুল্লাহ বাহার বাংলার মুসলমান সমাজের এই দ্বন্দ্বমুখর যুগেরই সন্তান। তাঁহার মন্তব্য যদি ভুল না হইয়া থাকে তবে, ‘তাঁর জীবনেও তাই এ-দ্বন্দ্বের পুরোপুরি সমাবেশ দেখতে পাওয়া যায়।’

ChowdhuryHabibullahBahar (190x243) (2) (190x243)

হবীবুল্লাহ বাহার

আমাদের জানিতে হইবে এই দ্বন্দ্বের প্রকাশটা কি দাঁড়াইয়াছিল? কি দাঁড়াইয়াছিল ইহার ফলাফলই বা? এই দ্বন্দ্ব হইতে পরিত্রাণ লাভের আর কি পথ খোলা ছিল? মনে রাখিতে হইবে মানুষ ইতিহাস গড়ে, তবে ‘যাচ্ছেতাই’ বলিয়া কোন ইতিহাস নাই। ইতিহাস গড়িতে হয় অতীত হইতে সরাসরি বা আড়াআড়ি পাওয়া মৌরসী বিধি অনুসারে।

হবীবুল্লাহ বাহার জন্মিয়াছিলেন যে যুগে তাহাকে–আরো ভাল কোন পদের অভাবে–বলা যায় বাংলার মুসলমান জাগরণের দ্বিতীয় যুগ। মানে মুসলমান সমাজে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গঠন যুগ। এই যুগেও প্রথম যুগের দ্বন্দ্ববিরোধ সমস্ত শেষ হইয়া যায় নাই, নতুন চেহারা লইয়াছিল মাত্র। কবীর চৌধুরী লিখিয়াছেন, ‘নির্জলা ইংরেজি স্কুলে বিদ্যার্জনের ব্যাপারটাও তখন পর্যন্ত মুসলিম সমাজ মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি। নিউ স্কীম মাদ্রাসার জনপ্রিয়তার এটাই ছিল কারণ। কাজী নজরুল ইসলামের মতো জনপ্রিয় এবং অনন্য প্রতিভাবান কবিকে নির্ভয়ে কাফের ফতোয়া দেয়ার মত আলেম এবং তাদের শিষ্য ও ভক্তের সংখ্যা তখন অসংখ্য।’ (কবীর চৌধুরী, ঐ, সাত)

হবীবুল্লাহ বাহার সেই দিনে ছিলেন নজরুল ইসলামের দলে। তিনি নিজেকে নজরুল ইসলামের ভক্ত-শিষ্য কিংবা অনুরাগী বলিয়া প্রকাশ করিতে কুণ্ঠিত হন নাই। একবার তিনি নিজের পারিবারিক সমস্ত সম্পত্তি নজরুল ইসলামের নামে লিখিয়া পড়িয়া দিতে পর্যন্ত চাহিয়াছিলেন। এই সত্যের অন্যতম সাক্ষী বেগম সুফিয়া কামাল। তিনি লিখিয়াছেন: ‘মরহুম হবীবুল্লাহ বাহারের (বাহার ভাইয়ের) সাথে আমার পরিচয় ১৯২৭ সনে। আমরা তখন কলিকাতায় ভাড়াটিয়া বাড়ীতে থাকি। একদিন দুপুর বেলা বাড়ীতে পুরুষ কেউ নেই, কলেজে-অফিসে সকলে চলে গেছেন, আমি ও আমার আম্মা বাড়ীতে ছিলাম। হঠাৎ সুফিয়া সুফিয়া ডাক শুনে বসবার ঘরে এসে দেখি, বাহার ভাই এসেছেন–উস্কো-খুস্কো চুল, অস্থির ভাব, ভয়ানক উত্তেজিত। কী ব্যাপার জিজ্ঞাসা করতেই তিনি বললেন, কাজীদাকে আমার তামাকুমুন্ডির যা সম্পত্তি আছে সে সব লিখে দিতে ইচ্ছে করেছি, তুমি আর নাহার থাকবে তাতে সাক্ষী হয়ে।’ (সুফিয়া কামাল ১৩৭৭: ৬১)

ইহা ছিল তাঁহার সাংগঠনিক প্রতিভার একদিক মাত্র। তবে বাহারের সাংগঠনিক প্রতিভা শুদ্ধ নজরুল ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ ছিল না। ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’ এবং ‘পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’ প্রভৃতি অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ‘বুলবুল’ পত্রিকা এবং প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান তাঁর সাংগঠনিক প্রতিভার সাক্ষী। কবীর চৌধুরীর মতানুসারে, ‘মুসলিম সমাজে চিন্তার মুক্তি আন্দোলনে বা আনয়নে “বুলবুল” পত্রিকার অবদানকে ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র “শিখা”র অবদানের সাথে তুলনা করা যায়।’

একটা জায়গায় অবশ্য তিনি নজরুল ইসলামকেও ছাড়াইয়া গিয়াছিলেন। সেই জায়গার অপর নাম রাজনীতি। হবীবুল্লাহ বাহারের একপ্রস্ত পূর্ণাঙ্গ জীবনকাহিনী আজও লেখা হয় নাই। আবু জাফর শামসুদ্দীন সান্তনাস্বরূপ একটা ছোট বই ছাপাইয়াছেন। তাহাতে একটি মন্তব্য পাইলাম। বুঝা যাইতেছে শামসুদ্দীন সাহেব বাহারের রাজনীতির সহিত ষোল আনা একমত নহেন। তিনি লিখিয়াছেন: ‘সাহিত্যিক বাহার সাহেব ছিলেন তাঁর গুরু কাজী নজরুল ইসলামের মতোই রোমান্টিক। রাজনীতিতে গভীরভাবে প্রবেশ করার পরেও তিনি স্বপ্নবিলাস এবং রূঢ় বাস্তবতার দোদুল্যমানতা হতে মুক্ত হতে পারেন নি।’ (শামসুদ্দীন ১৯৮৭: ৪৫)

আবু জাফর শামসুদ্দীনের এই তির্যক মন্তব্যের উপলক্ষ্য হবীবুল্লাহ বাহারের মুসলিম লীগ রাজনীতি। শামসুদ্দীন লিখিতেছেন, ‘বাহার সাহেব শুধু সাহিত্যিক সাংবাদিক ছিলেন না; ছিলেন একজন সুদক্ষ বাগ্মী। ইংরেজী বাংলা উর্দু ভাষায় তিনি ঘণ্টার পর ঘন্টা বক্তৃতা দিতে পারতেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রসালো গল্প করেও মজলিসকে রাখতে পারতেন সম্মোহিত। তাঁর স্মরণশক্তিও ছিল বিস্ময়কর। গল্প ও বক্তৃতার মাঝে মাঝে তিনি বিস্মৃত ইতিহাস হতে নজীর দিতে পারতেন। তাঁকে কলকাতার বিদগ্ধ মহল “গল্প-এ-আজম” পদবী দিয়েছিলেন। আপন গুণেই বাহার মুসলিম লীগের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি হয়ে উঠেন। ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগের লক্ষৌ অধিবেশনে প্রদত্ত বাহার সাহেবের বক্তৃতা মি. জিন্নাহর প্রশংসা অর্জন করে।’ (শামসুদ্দীন ১৯৮৭: ৪৫-৪৬)

হবীবুল্লাহ বাহার ১৯৩৭ সালের ডিসেম্বর মাসে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য নির্বাচিত হইলেন। হবীবুল্লাহ বাহার কেন মুসলিম লীগে যোগ হইলেন তাহার পেছনের কথা ব্যাখ্যা করিবার কোশেস করিয়াছেন আবু জাফর শামসুদ্দীন। তিনি লিখিয়াছেন, ‘রাউন্ড টেবল কনফারেন্সের ব্যর্থতার পর বৃটিশ সরকার ঘোষিত সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ, পৃথক নির্বাচন, আসন সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রভৃতির ভিত্তিতে রচিত ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন ভারতীয় রাজনীতির মোড় সম্পূর্ণরূপে ঘুরিয়ে দেয়। বৃটিশ সরকারের ‘ভাগ করো ও শাসন করো নীতি’ পুরোপুরি সফল হয়। বৃটিশ সরকার বুঝেছিলেন যে, যদি ভারত ছেড়ে যেতেই হয়, তাহলে তার আগে এমন ব্যবস্থা করে যেতে হবে, যাতে ঐক্যবদ্ধ ভারত কখনও সাম্রাজ্যবাদের মুনাফার বাজারে সাংঘাতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে না পারে। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন ছিল সেই ষড়যন্ত্রেরই ভূমিকা বা ফাঁদ।’

ফাঁদ কেন? আবু জাফর শামসুদ্দীন লিখিতেছেন, ‘পৃথক নির্বাচন, সংরক্ষিত আসন প্রভৃতির ভিত্তিতেই যে রাজনীতি করতে হবে সেখানে যারা সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করতে চান তাদের পৃথক পৃথক পথ বেছে নিতেই হবে। মিঃ জিন্নাহ বিলেতে স্বনির্বাচিত নির্বাসন ছেড়ে ভারতে প্রত্যাবর্তন করলেন, নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভাপতিরূপে ভারত সফর করতে শুরু করলেন, মুসলিম লীগের প্লাটফরমে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আসন্ন নির্বাচনে মুসলিম সমাজকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বললেন। নির্বাচনের আগে স্ব-সৃষ্ট কৃষক প্রজা পার্টির হয়ে এবং অধিকাংশ মুসলিম আসনে জয়লাভ করার পর এ.কে. ফজলুল হক নিজেই মুসলিম লীগে যোগ দিলেন এবং হলেন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট।’ (শামসুদ্দীন ১৯৮৭: ৪৫)

তিনি কেন মুসলিম লীগে যোগ দিলেন এই প্রশ্নের একটা উত্তর হবীবুল্লাহ বাহার নিজেও দেওয়ার চেষ্টা করিয়াছিলেন। তাহা শোনা আমাদের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। আমার ভয় হইতেছে, আবু জাফর শামসুদ্দীনের মতন আরো অনেকেই এই কর্তব্যটা সঠিক পালন করেন নাই। ব্যতিক্রমের মধ্যে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। আনিসুজ্জামান জানাইতেছেন–হবীবুল্লাহ বাহার ‘মুসলমানের ব্যাপক জাগরণ কামনা করিয়াছিলেন–রাজনীতির ক্ষেত্রে, জ্ঞানের ক্ষেত্রে, ব্যক্তিগত বিচারবুদ্ধি প্রয়োগের ক্ষেত্রে।’ (আনিসুজ্জামান ১৩৭৭: ২১৪) এই কামনার কোপে–অথবা আনিসুজ্জামানের ভাষায় ‘এই বোধ থেকেই’–তিনি মুসলিম লীগের অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান দাবির দিকে ঝুঁকিয়াছিলেন।

১৯৪১ সালে হবীবুল্লাহ বাহার ‘পাকিস্তান’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। সেই বইয়ে পাকিস্তান দাবির পক্ষে তিনি যে সকল তথ্যপ্রমাণ উপস্থিত করেন সেইগুলি এখনও পর্যন্ত কেহ বস্তুনিষ্ঠ বিচারে বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খণ্ডন করেন নাই। আবু জাফর শামসুদ্দীন সে প্রশ্ন তোলেনই নাই। সুখের মধ্যে, আনিসুজ্জামান বাহার যুক্তির সারবত্তা প্রকারান্তরে স্বীকার করিয়া লইয়াছেন।

হবীবুল্লাহ বাহার লিখিয়াছেন: ‘অনেকেই প্রচার করে থাকেন মুসলমান নেতারা সরকারের ইঙ্গিতেই স্বতন্ত্র নির্বাচনের দাবী উপস্থিত করেছিলেন। এমন কি মোহাম্মদ আলী পর্যন্ত আগা খাঁ ডেপুটেশানকে অভিহিত করেছেন Command performance [কমান্ড পারফর্মেন্স অর্থাৎ কর্তার ইচ্ছায় কর্ম–সলিমুল্লাহ খান] বলে। কিন্তু একথা তাঁরা ভুলে যান, স্বতন্ত্র নির্বাচনের প্রচলন একদিনে হয়নি। নানা পরীক্ষার ভিতর দিয়ে ধীরে ধীরে এই প্রথা দেশের জীবনে শিকড় গেড়েছে। ১৮৯২ সনের আইনে যুক্ত-নির্বাচনের নীতিই প্রচলিত হয়েছিল। এমন কি ১৯০৯ সনের আইনেও স্বতন্ত্র নির্বাচন সোজাসুজি গৃহীত হয়নি। এই আইনের প্রবর্তকদেরও প্রবণতা ছিল যুক্ত-নির্বাচনের দিকে।’

তিনি আরো গিয়াছেন: ‘একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দেই। মর্লি-মিণ্টো সংস্কারে মুসলমানদের সংখ্যাতিরিক্ত আসন দেওয়ার নীতি স্বীকৃত হয়েছিল। এই নীতি অনুসারে বাংলা দেশের ব্যবস্থাপক সভায় সাধারণ নির্বাচকমণ্ডলীতে মুসলমানদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবার অধিকার ছিল। অধিকন্তু বাঙ্গলার পাঁচটি বিশেষ মুসলিম আসন নির্দিষ্ট হয়েছিল স্বতন্ত্র নির্বাচনের ভিত্তিতে। লর্ড মর্লি আশা করেছিলেন বাংলা দেশের সাধারণ নির্বাচকমণ্ডলী থেকে জনসংখ্যা অনুপাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান সদস্য নির্বাচিত হবে। তা ছাড়া স্বতন্ত্র নির্বাচনের ভিত্তিতে পাঁচটি আসন হবে সংখ্যাতিরিক্ত আসন–in excess of their numerical strength. অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় একজন দোর্দণ্ডপ্রতাপ জমিদার ছাড়া মুসলিম নেতাদের কেহই সাধারণ নির্বাচকমণ্ডলী থেকে নির্বাচিত হতে পারেননি। এককথায় বলতে গেলে মর্লি-মিণ্টো শাসন-সংস্কারে স্বতন্ত্র নির্বাচনের ‘সংখ্যাতিরিক্ত’ আসনগুলোই ছিল সেকালে মুসলমানদের একমাত্র আশ্রয়স্থল। শুধু মর্লি-মিণ্টো শাসন-সংস্কার কেন, মন্টেগো-চেমসফোর্ড শাসনবিধিতেও যুক্ত-নির্বাচনের আসনগুলির একই অবস্থা দেখতে পাই। দিল্লীর যুক্ত-নির্বাচনের আসনের প্রতিযোগিতায় স্বরাজ্যদলভুক্ত জাতীয়তাবাদী ব্যারিষ্টার মিঃ আসফ আলীর অখ্যাতনামা হিন্দু উকিলের হাতে পরাজয় ইতিহাসের অন্তর্গত হওয়ার উপযুক্ত।’

তাই হবীবুল্লাহর সিদ্ধান্ত: ‘স্বতন্ত্র নির্বাচনকে মুসলমানের সাম্প্রদায়িকতা ও সরকারের উসকানির ফল বলে যাঁরা মনে করেন তাঁহাদের দৃষ্টি উপরে উল্লিখিত তথ্যগুলির দিকে আকৃষ্ট হওয়া উচিত। ১৮৯২ সনের আইন ও মর্লি-মিণ্টো শাসনবিধির নির্বাচনে হিন্দুসমাজ যদি মুসলিম প্রার্থীদের প্রতি এরূপ অপ্রেমের পরিচয় না দিতেন, ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস হয়ত অন্যভাবে লিখিত হত।’ (হবীবুল্লাহ বাহার ১৯৭১: ১৭৯-১৮০)

আনিসুজ্জামান এই বিশ্লেষণের অর্থ গ্রহণ করিয়া বলিয়াছেন: ‘পাকিস্তান আন্দোলনের ইতিহাস যারা আওরঙ্গজেবের সময় বা মুজাদ্দেদে আলফে সানীর সময় থেকে শুরু করার পক্ষপাতী, কথাটা তাদের ভেবে দেখবার যোগ্য। ‘পাকিস্তান’ লেখকের মতে ১৮৯২ থেকে ১৯৩১-এর মধ্যে হিন্দু মুসলমান মিলন প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হল বলে বাধ্য হয়েই স্বাতন্ত্র্যের এই পথ নিতে হল ভারতের মুসলমানকে।’ (আনিসুজ্জামান ১৩৭৭: ২১৫-১৬)

পাকিস্তান দাবির পক্ষে হবীবুল্লাহ বাহারের আরও একটি যুক্তি ছিল। এই যুক্তিটির উল্লেখ করিয়াছেন বসুধা চক্রবর্তী। মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জাগরণ যখন হইতেছে তখন চিন্তার একটা ধারার নাম দাঁড়াইয়াছিল ‘প্যান-ইসলামিজম’। হবীবুল্লাহ বাহারের ‘পাকিস্তান’ সেই ধারা অতিক্রমের চেষ্টা বলেই মনে করেন বসুধা চক্রবর্তী। তিনি লিখিয়াছেন: ‘পরাধীন জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামের অধীর মুহূর্তে এমন কারও রাজনীতিকে এড়াবার উপায় ছিল না, যার প্রাণ একেবারে নিঃসাড় হয়ে যায়নি। জীবনকে ভালবাসা যখন স্বদেশকে ভালবাসায় প্রসারিত হয়, তখন আর তাতে কোন খাদ থাকে না, অনাবিল আদর্শবাদে তখন তা রূপ পরিগ্রহ করে। বাহার সাহেবকে তা বিচিত্র কর্মিষ্ঠতায় ডেকে নিয়েছিল আর তাঁর “বুলবুল” পত্রিকা হয়েছিল মুক্ত বুদ্ধির আধার ও আশ্রয়; কোনো দ্বিধা, কোনো সংস্কার, বা বাধানিষেধ সেখানে কোন বিষয় বিচারকে বিড়ম্বিত করেনি। “বুলবুল” এর পাতায় ঘটেছিলো জীবনের সঙ্গে অকুণ্ঠ মোকাবিলা।’

বসুধা চক্রবর্তী আরো গিয়াছেন। তাঁহার মতে: ‘কিন্তু মুক্তবুদ্ধি দিয়ে সব বিষয়ের মোকাবিলা করলেই সবকিছু সহজ হওয়ার উপায় নেই; অনেক সময়ে মুক্তবুদ্ধি প্রয়োগেই একটা সমস্যা হয়ে পড়ে। তাই যখন বেসুরো কিছু সামনে এসে দাঁড়াতো বাহার সাহেব তখন তার মধ্যে যেটুকু ভাল, যেটুকু সুসংগত তার উপর জোর দিয়ে নিজের মানসিক সামঞ্জস্য ফিরে পাবার চেষ্টা করতেন। এলো দেশে বিষম সাম্প্রদায়িক বিভেদ–ফলে স্বাতন্ত্রধর্মী রাজনীতি। বিভেদ কারোরই স্বাভাবিক কাম্য নয়। বিভেদ ভিত্তিক স্বাতন্ত্র্যও বাঞ্ছনীয় নয়। তবু তা যখন এলো, হবীবুল্লাহ বাহার তার মধ্যেও তাকে পেরিয়ে যেটুকু ভালো, যেটুকু প্রীতিকর, যেটুকু আশাপ্রদ তাকেই আঁকড়ে ধরলেন। তিনি জোর দিলেন একথার উপর যে, ভারতীয় মুসলমানের পাকিস্তান আন্দোলন প্যান ইসলামিজম থেকে তার মুখ ফিরিয়ে দেশের ভিতরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়েছে। খিলাফত আন্দোলন ও যে জাতীয় অন্যান্য আন্দোলনের পরিবেশে তার যে এক্সট্রা-টেরিটরিয়েল দৃষ্টি ও আনুগত্য প্রবল ছিল তা দূর করে দেশের ভিতরে তার ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সংকল্প যুগিয়েছে। স্বাতন্ত্র্যধর্মী রাজনীতির সঙ্গে স্বদেশপ্রেমের সমন্বয় হবীবুল্লাহ বাহার এমনি করেই খুঁজে পেয়েছিলেন।’ (বসুধা চক্রবর্তী ১৩৭৭: ৫৮-৫৯)

বাঙ্গালি মুসলমানের জাগরণের তৃতীয় যুগ (অর্থাৎ বাংলাদেশের মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দ্বিতীয় যুগ) শুরু হইল ১৯৪৭ সনের পর। এই যুগে হবীবুল্লাহ বাহার পরাজিত হইয়াছিলেন। তাহার একটি প্রকাশ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে দেখা যায়। আর একই মুদ্রারই অপর পিঠ দেখা যায় সাম্প্রদায়িক অত্যাচার অবিচারের নবপর্যায়ে। এই পর্যায়ে হবীবুল্লাহ বাহারকে তাঁহার নিজ দল ও নিজ সরকারের বিরুদ্ধেও দাঁড়াইতে হইয়াছিল। হয়ত পরোক্ষে। এমন অবস্থায় তিনি প্রবল রোগের কাছে পরাজিত হইলেন। তখন তিনি ৪৬ বছর বয়সে পা দিয়াছেন মাত্র।

পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর হবীবুল্লাহ বাহার পূর্ববাংলা সরকারের মন্ত্রীত্ব লাভ করিয়াছিলেন। মন্ত্রীত্বটা তিনি খুব নির্বিঘ্নে লাভ করিয়াছিলেন এমনও নহে। এই বিষয়ে প্রভাস চন্দ্র লাহিড়ীর বিবরণ এই রকম: ‘পূর্ববঙ্গের প্রথম মন্ত্রীসভা গঠন করেন খাজা নাজিমউদ্দিন সাহেব। পাকিস্তান সৃষ্টির সংগ্রামে যাঁকে সত্যিকারের ফিল্ড-মার্শাল আখ্যা দেওয়া যেতে পারে, সেই সুরাবর্দ্দী সাহেব পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হতে পারলেন না–মুখ্যমন্ত্রী হন খাজা নাজিমউদ্দিন। তিনি তাঁর প্রথম মন্ত্রীসভাতে হিন্দুদের সম্পর্কে নরমপন্থী কোনো মুসলিম লীগ সদস্যকেই প্রথমতঃ নেন নি। এ্যাসেম্বলির প্রথম অধিবেশনে তিন দিন পর্যন্ত মুসলিম লীগের বেশ কিছু সংখ্যক সদস্যদের বিরোধিতায় মোটেই কাজ চালাতে পারেননি তিনি। কায়েদ-ই-আজম (আমার মতে পাকিস্তান সংগ্রামের ‘অ্যাটর্নি জেনারেল’) মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কাছে জরুরী বার্তা (S.O.S.) পাঠান নাজিমউদ্দিন সাহেব। জিন্নাহ সাহেব ঢাকায় এসে একটা আপোস মীমাংসা করে দেন। আপোসের ফলে জনাব হবীবুল্লাহ্ বাহার, ডাঃ এ. এম. মালেক, জনাব তোফাজ্জল আলী–নাজিমউদ্দিন সাহেবের মন্ত্রীসভায় স্থান পান এবং অপর বিরোধী সদস্য জনাব মোহাম্মদ আলী (বগুড়ার) বার্মায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন। বাহার সাহেব জন-স্বাস্থ্য দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হন।’ (প্রভাস চন্দ্র লাহিড়ী ১৩৭৭: ৩৪-৩৫)

১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৪

 

দোহাই

১.             কবীর চৌধুরী, ‘ভূমিকা’, হবীবুল্লাহ বাহার রচনাবলী (ঢাকা: বাঙলা একাডেমী, ১৯৭১), পৃ. পাঁচ-আট।২.             বেগম সুফিয়া কামাল, ‘বাহার ভাই’, আনোয়ারা বাহার চৌধুরী ও শওকত ওসমান সম্পাদিত, হবীবুল্লাহ বাহার (ঢাকা: বাহার স্মৃতি কমিটি, ১৩৭৭ (১৯৭০), পৃ. ৬১-৬৪।
৩.            আবু জাফর শামসুদ্দীন, হবীবুল্লাহ বাহার (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৮৭)।
৪.             আনিসুজ্জামান, ‘হবীবুল্লাহ বাহার: শ্রদ্ধাঞ্জলি’, আনোয়ারা বাহার চৌধুরী ও শওকত ওসমান সম্পাদিত, ঐ, পৃ. ২১২-২১৬।
৫.             বসুধা চক্রবর্তী, ‘স্মরণ’, আনোয়ারা বাহার চৌধুরী ও শওকত ওসমান সম্পাদিত, ঐ, পৃ. ৫৮-৬০।৬.            প্রভাস চন্দ্র লাহিড়ী, ‘হবীবুল্লাহ্ বাহার স্মরণে’, আনোয়ারা বাহার চৌধুরী ও শওকত ওসমান সম্পাদিত, ঐ, পৃ. ৩৪-৩৫।

Leave a Reply