জাতীয় চেতনার চোরাগর্ত

অনেকদিন আগে ফ্রানৎস ফানোঁ বলিয়াছিলেন যেসকল পরাধীন দেশে মধ্যম শ্রেণি স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা হইয়া বসে সেসকল দেশে পরাধীনতার সংকট সহজে কাটে না। বিদেশি প্রভুর দল দেশ ছাড়িয়া যাইবার পর এই শ্রেণির লোকেরাই রাষ্ট্রক্ষমতাটা হাতে পায়। আর পাইয়াই তাহারা উচ্চশ্রেণি হইয়া বসে। দেশের ব্যবসায় ও বাণিজ্য, সরকারি পদ ও পদবী হাতে পাইয়া তাহারা হইয়া উঠে মহাজন। দেশের মজুর ও চাষি শ্রেণির লোকজনের সহিত তাহারা বিদেশির মতন ব্যবহার করে। আর তাহাদের শ্রমও শোষণ করে বিদেশি প্রভুশ্রেণির মতনই। খুব কম পরাধীন দেশই একলাফে স্বাধীনতার স্বাদ পায়।

পরাধীন (কলোনিয়াল) ও বাজে-পরাধীন (পোস্টকলোনিয়াল) কালের মাঝামাঝি একটা কাল দেখা যায় যাহাকে ‘নয়া পরাধীন’(নিয়োকলোনিয়াল) যুগ বলা যাইতে পারে। ‘নয়া পরাধীন’কথাটার সত্যকার তর্জমা দাঁড়াইবে ‘স্বাধীন-পরাধীন’বা এই জাতীয় কিছু। কিন্তু ‘ইহা আদপেই সোনার পাথরবাটি জাতীয় অপদার্থ নহে। মধ্যম শ্রেণি সিংহাসন আরোহন করিলেই দেশ স্বাধীন হয় না। দেশ স্বাধীন করিবার জন্য যেখানে হাতে হাতিয়ার লইয়া যুদ্ধ হইল সেখানেও কেন এই স্বাধীন-পরাধীনতা? নয়া পরাধীন বা স্বাধীন-পরাধীন দেশের প্রকৃষ্ট উদাহরণ আকারে আমাদের দেশের নামটি লওয়া যায়। বাংলাদেশ যে একলাফে স্বাধীন হয় নাই তাহা প্রমাণের জন্য বেশিদূর যাইতে হইবে না। এখন দেশে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সহিত বিজড়িত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার লইয়া যে তুলকালাম চলিতেছে তাহাতেই চলিসেদিন এক প্রবীণ সাংবাদিককে টেলিভিশনযোগে বলিতে দেখিলাম এখনো পর্যন্ত দেশে জাতি গঠিবার কাজটাই ঠিকভাবে করা হয় নাই। জাতি কিভাবে গঠিবেন? তিনি যাহা বলিলেন তাহার মর্ম এই: ৪২ বছরের আগের যুদ্ধাপরাধের বিষয়টা ভুলিয়া গেলেই তো হয়! কিংবা অভিযুক্তদের মাপ করিয়া দিলেই জাতি গঠার কর্তব্যটা সুচারুভাবে সম্পন্ন হইবে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি আরো সমঝাইয়া দিলেন একবার তো এই অপরাধীদের অনেককেই মাপ করিয়া দেওয়া হইয়াছিল। আমাদের জিজ্ঞাসা করিবার সাধ হয়, একবার যদি মাপই করিয়া দেওয়া হইয়া থাকে তো তাহাতেও জাতি গঠন হইল না কেন? উত্তরে বলিতে হইবে: হয় মাপটা ঠিকমতন করা হয় নাই, নয়তো জাতি গঠনের কাজটা হইয়াই গিয়াছে। বাকি নাই কিছু। তাহা হইলে এত হাঙ্গামা কেন?

সত্যকথা বলিতে কি আমাদের বাড়ির খবরও আমরা রাখি না। আমাদের চিত্ত দুর্বল বলিয়া কেহ আমাদের সব সংবাদ দিতেছে না। কোথায় আমাদের জাতি! কোথায়ই বা তাহার গঠন! জাতি গঠিবার গোড়ায় ছিল দেশের সকল মানুষের সমানাধিকারের বাসনা। দেশের উপর সকলের হক বা অধিকার সমান না হইলে জাতি গঠিয়া উঠিবে কি করিয়া? ‘গণতন্ত্র’ আর ‘সমাজতন্ত্র’ নামক দুইটা মোটা শব্দের মধ্যে এই বাসনাটা বাঁধা হইয়াছিল। যে দেশের স্বাধীনতা জাতির সকল সভ্যের সমানাধিকারের ভিত্তিতে গড়া হয় নাই সে দেশ প্রকৃত প্রস্তাবে স্বাধীন হইতে পারে না। ফরাশিদেশের বিপ্লবে আওয়াজ উঠিয়াছিল তিনটি: ‘স্বাধীনতা’, ‘সমতা’ ও ‘মৈত্রী’। বাংলাদেশের বিপ্লবেও উঠিয়াছিল সেই একই আওয়াজ। ফরাশি ভাষার ‘মৈত্রী’ কথাটাই প্রকারভেদসহ আমাদের ভাষায় ‘জাতীয়তাবাদ’ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। কেহ কেহ গুজব ছড়াইয়াছেন ‘জাতীয়তাবাদ’কথাটা নিছক উর্বর কল্পনা বৈ নহে। ইহার পিছনে রক্তমাংসের একটা ইতিহাস আছে। সে কথা ভুলিলে চলিবে না।

কথাটা সামান্য। প্রজাসাধারণের মধ্যে সমতার বাসনা যদি কদাচ না জাগিত তবে স্বাধীনতার চেতনাও কোনদিন জাগিত না। ইতিহাস বলিতেছে সমতার ভাষা হইতেই স্বাধীনতা নামক ভাব জন্মাইয়াছে। আর সমতা না জন্মাইলে মৈত্রী বা জাতিও জন্মাইবে না। বাংলাদেশে হালফিল যে সংকট তাহা বুঝিতে হইলে বুঝিতে হইবে স্বাধীনতার চেতনা বলিতে যাহা বুঝান হয় তাহার আসল রহস্য এইখানেই। আপনি সমতার চেতনাকে কবর দিয়া তাহার সমাধিতে স্বাধীনতার চেরাগ জ্বালাইতেছেন মাত্র। এ চেরাগে তেল আছে তো সলিতা নাই, সলিতা আছে তো তেল নাই। আমরা এখন যশোহরের মুনশি মেহেরুল্লার মতন পিন্ধনের লুঙ্গি ছিঁড়িয়া চেরাগের সলিতা বানাইতেছি। আমরা অনেক কিছুই হারাইয়াছি। কিন্তু সব খবর একদিনে বলিতে গেলে কাজ হইবে না ভাবিয়া মাত্র একটা একটা করিয়া বলিতেছি। যুদ্ধাপরাধের গল্পটা মনে হইতেছে সেই রকমই।

গতকাল কাকতালীয় দোষে উর্দুভাষার একটা গল্প পড়িতেছিলাম। বিশেষ জ্ঞানীরা এই আকারের গল্পকে ‘লোককাহিনী’ বলিয়া পরিচয় দেন। তা দিন। গল্পের নায়ক জনৈক ‘জমিনদার’ (চাষা অর্থে নহে)। ইনি ধনী ভূস্বামী বটেন। বাংলায় যাহাদের আমরা ‘জমিদার’ বলিয়া ডাকি অনুমান তাহাদেরই বেরাদর হইবেন। তো আমাদের জমিনদারটি অল্প আশ্লেষেই চটিয়া যাইতেন। ইংরেজিতে যাহাকে বলে ‘শর্ট টেম্পার’ ভদ্রলোকের ছিল সেই রোগ। আপদের মধ্যে ইহার আবার হৃদরোগের বালাইও ছিল। পরিবারের লোকজন জানিতেন লোকটা দুর্বলচিত্ত। তাই বাড়ির চাকরনফর সবাইকে একপ্রকার বলিয়া দেওয়া ছিল ইহার সহিত কথাবার্তা বলিবার সময় সকলেই যেন বিশেষ খেয়াল রাখে। খেয়াল থাকে যেন কি কথা বলিতে হইবে তাহাকে। আর কথাটা কিভাবে বলিতে হইবে তাহাও যেন মনে থাকে।

একবার ইনি গাঁও ছাড়িয়া কি কাজে যেন শহর গিয়াছেন। আর ইহাকে কি একটা খবর দিবার জন্য শহরে একটি চাকর পাঠান হইয়াছে। মালিক উহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘ও তুই বাড়ির থাইকা আইসস, তো বল দেহি খবরবার্তা কি, বল।’ চাকর ছেলেটি আমতা আমতা বলিল, ‘ভালা খবর, কর্তা, খবরবার্তা বেবাক ভালাই। মগর আমাগো বাড়ির বড় কালাকুত্তাটা না মইরা গেছে গা।’ কর্তা বলিলেন, ‘তাই নাকি! আহা, কি হইছিল বেচারার? আমি তো কুত্তার বেটারে জবর হৃষ্টপুষ্ট দেইখা আইলাম!’

তখন চাকরের বেটা কহিল, ‘বেচারার না বদহজম হইছিল, কর্তাহুজুর! এত্তখানি ঘোড়ার গোশ চিবাইয়া খাইলে মরণ ছাড়া আর কিই বা গতি, বলেন!’ কর্তা কহিলেন, ‘কি সব বাজে বকছ, মিঞা, কুত্তার বাচ্চা কুত্তা ঘোড়ার মাঁস পাইল কৈ?’ উত্তর হইল, ‘কেন, আমগো ঘোড়াশালার ঘোড়ার গোশই তো খাইল।’

কর্তা ভড়কাইয়া গেলেন। বলিলেন, ‘আমগো ঘোড়া মানে! আমাদের ঘোড়াটোড়াও মইরা গেল নাকি?’ চাকরটি বলিল, ‘সহিসটহিস কিছু না থাইকলে ঘোড়া বি বাঁচব কেমনে! হেগো দানাপানি কে দিব?’ জমিনদার কহিলেন, ‘কেন, সহিসগুলির কি হইল আবার?’ চাকর বলিল, ‘কিছু না। খাইতে না পাইয়া উপাস দিলে আর লোকের যাহা হয় উহাদেরও তাহাই হইয়াছে, হুজুর। ওগোর মাহিনা দিবার কেহ নাই তো তাই গরিব বেচারাদের খাইবার পয়সাই জোটে নাই বইলা…।’

‘কি বলতাসস তুই? উহাদের মাহিনা দেওয়া হয় নাই কেন?  নায়েব সাহেব কোথায় গেলেন? বাড়ির গিন্নি কোথায়?’ চাকর খানিক চুপ থাকিয়া বলিল, ‘বাড়িতে রান্না করিবার লোকজনই নাই। আর রান্নাবান্না না হয় তো ওঁরা খাইবেন কি? বাঁচিয়া থাকিবেন কি উপায়ে!’ কর্তা বলিলেন, ‘ও মা! কেন, কি ব্যাপার, আমাদের পাকা রাঁধুনির কি হইয়াছে?’ চাকর বেচারা পরিশেষে মুখ খুলিয়া বলিল: ‘সে আর বাঁচিয়া নাই। কি করিয়া থাকিবে, হুজুর, রসুইখানায় আগুন লাগিয়াছিল। সে আগুন ছড়াইয়া গেল। বাড়িটাই পুড়িয়া ছাই হইয়াছে। কেহই বাঁচিয়া নাই আর।’

আমার কেমন জানি মনে হইতেছে এই গল্পটার মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের চেহারা দেখা যাইতেছে। আমরা জমিনদার বাড়ির চাকরের মতন কিছু একটা খবর লইয়া আসিয়াছি যেন। শুদ্ধ ঠিক করিতে পারিতেছি না কতটুকু বলিব।

৭ মার্চ ২০১৩

দোহাই

A. K. Ramanujan, ed., Folktales from India, reprint (New Delhi: Penguin Books, 2009).

৮ মার্চ ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ২৮

Leave a Reply