এসলাম ও জাতীয়তাবাদ: একবাল আহমদের সাক্ষ্য

এয়ুরোপ মহাদেশে গত কয়েক শত বছরে যে রাষ্ট্রনীতি গড়িয়া উঠিয়াছে তাহাতে একপ্রকার স্থির হইয়াছে রাষ্ট্রের ক্ষেত্র হইতে ধর্মের ক্ষেত্র আলাদা থাকিবে। ইহার একপ্রস্ত কারণও আছে। খ্রিস্টান ধর্মমণ্ডলি বা গির্জার সহিত রাষ্ট্রের পুরাতন বিবাদের একপ্রকার মিমাংসা এই আকার ধারণ করিয়াছে। ধনতান্ত্রিক সভ্যতার গৌরব যখন মধ্যগগনে তখন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা প্রজাসাধারণের স্নেহধন্য রাষ্ট্রনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবিও ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। সেই প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আমরা দেখিলাম এই দাবিটিও উঠিয়াছে: রাষ্ট্র হইতে ধর্ম আলাদা করিতে হইবে। নহিলে প্রজাতন্ত্র নিরাপদ রাখা কঠিন হইবে।

কেহ কেহ বলেন এসলামধর্মের পরিমণ্ডলে এই দাবির কোন সার্থকতা নাই । তাহারা বলেন এসলামধর্মে তো রাষ্ট্রক্ষেত্র হইতে ধর্মক্ষেত্র আলাদা করিবার বিধান নাই। কারণ এসলামি রাষ্ট্র মানে খেলাফত। আর খেলাফত বা খলিফার শাসন মানে রাষ্ট্র আর ধর্মের একত্রীকরণ বৈ নহে। একবাল আহমেদ এই আপ্তবাক্যের সহিত একমত নহেন। তিনি বলিতেছেন এই আপ্তবাক্যটি সত্য ধরিয়া আগাইলে এসলাম জগতের প্রকৃত ইতিহাস বুঝা একপ্রকার অসাধ্যই হইয়া যায়। তিনি অবশ্য স্বীকার করেন যে এক অর্থে রাষ্ট্র আর ধর্ম একে অপরের আত্মীয়। কেননা রাষ্ট্র তো জাতীয় জীবনের সহিত বল বা ক্ষমতার নানাপ্রকার সম্বন্ধের অপর নাম মাত্র। অতয়েব রাষ্ট্র যেমন থাকিবে ধর্মও তেমন থাকিবেই। কেহ কাহাকেও উচ্ছেদ করিবে না। প্রশ্ন হইতেছে এই সম্বন্ধের আরও প্রকারভেদ আছে নাকি নাই। একবাল আহমেদ মনে করেন আছে, বিলকুল আছে। এই প্রকারভেদ স্বীকার করিলে মানিতে হইবে বহুদিন হইতেই এসলাম জগতে রাষ্ট্র হইতে ধর্ম আলাদা ক্ষেত্রে বিরাজ করিতেছে।

একবাল আহমেদ দেখাইয়াছেন এসলামের ইতিহাসে মোটা চৌদ্দশত বছরের মধ্যে অন্তত এগারশত বছর ধরিয়াই এসলামি দুনিয়ায় রাষ্ট্র হইতে ধর্ম প্রকৃত প্রস্তাবে আলাদা আকারে বসিয়া আছে। তিনি বলিতেছেন খলিফার শাসন বলিতে যাহা বুঝায় তাহা  তো বড়জোর তিনশত বছর টিকিয়াছিল্। এসায়ি ৬৩২ হইতে ৯৪৫ এই কিছু বেশি তিনশত বছর। এসায়ি ৯৪৫ সালের একদিন বুয়াহিদ বংশের রাজপুরুষ মুয়িজুদ্দৌলা আহমদ বাগদাদে বলপূর্বক প্রবেশ করিয়া আব্বাসিয়া খলিফার রাষ্ট্রক্ষমতা কাড়িয়া লইলেন। আর সেই দিনই খেলাফতের অবসান হইল। রাষ্ট্র হইতে ধর্ম আলাদা হইল। মানে ‘খলিফা’ পদের মধ্যে রাষ্ট্রক্ষমতা ও ধর্মক্ষমতার যে একত্র সমাবেশ হইয়াছিল সেই দ্বৈতক্ষমতার লোপ হইল। মানে এই দুই ক্ষমতা আলাদা আলাদা ক্ষেত্রযোগে ভাগ করা হইল। তাহার পরও অনেকদিন ‘খলিফা’ কথাটার চল ছিল। কিন্তু পুরানা সেই দ্বৈতক্ষমতা আর অক্ষুন্ন ছিল না। খলিফা ছিলেন নামমাত্র শাসক। আসল ক্ষমতার মালিকরা সুলতান, আমির, খান প্রভৃতি নানান নামে পরিচিত হইতেন।

বুয়াহিদ বংশ ১১০ বছর ধরিয়া এরাক ও পারস্যদেশের একাংশ (ফরস প্রদেশ) শাসন করে। এসায়ি ১০৫৫ সন নাগাদ তুর্কিজাতির (সেলজুক বংশধর) রাষ্ট্রবীর তুর্গিল তাহাদের পরাজিত করিলেন। দুইশত বছর পর ১২৫৮ এসায়িতে মোঙ্গলজাতির লোকেরা বাগদাদের খলিফাকে সপরিবার কোতল করিল। ইহার পর অনেকবার অনেক শাসকই খেলাফত পুনরুদ্ধার বা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি করিয়াছেন কিন্তু সত্যকার খেলাফত কোনদিনই আর কায়েম করা সম্ভব হয় নাই। সারা জাহানের মুসলমান জনসাধারণ আর কোনদিনই কাহাকেও সাকার খলিফা মানিতে পারে নাই। রাষ্ট্র এই কারণেই এসলাম জগতে রাষ্ট্রক্ষমতা ধর্মনিরপেক্ষ হইয়া যায় ।

একবাল আহমদ খেলাফতের আয়ু ধরিয়াছেন তিনশত বছর। কিন্তু এসলামধর্মের উলেমা বা শাস্ত্রজ্ঞানীরা এতটুকুও বা মানিতে প্রস্তুত নহেন। সুন্নি বা সংখ্যাগুরু শাস্ত্রজ্ঞানীরা বলেন এসায়ি ৬৫০ সালে যেদিন ওমাইয়া বংশ মুসলমান জগতের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করিল সেইদিনই খেলাফত শেষ হইয়া গেল। সুন্নিরা বলেন হজরত মোহাম্মদের (দঃ) এন্তেকালের পর তাঁহার যে চারিজন সাহাবি রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করিলেন একমাত্র তাঁহারাই সত্যপথবর্তী প্রতিনিধি বা সঠিক খলিফা। অন্যেরা কদাচ নহেন। শিয়া বা সংখ্যালঘিষ্ট ধারার জ্ঞানীগণ বলেন বৈধ খলিফা তো শুদ্ধমাত্র দুইজনই। তাঁহারা হজরত ওমর (র) আর হজরত ওসমানের (র) বৈধতা মানেন না।

যাহারা বলেন ৬৫০ সালের পর আর খেলাফত কায়েমমোকাম ছিল না তাহাদের যুক্তিটা কি? একবাল আহমেদ দেখাইতেছেন যুক্তি আছে তিনপ্রস্ত। একে তো পরের শাসকরা আগের খলিফাদের মতন পরহেজগার বা ধর্মমতি ছিলেন না। ব্যতিক্রমের মধ্যে ওমাইয়া শাসক ওমর এবনে আবদুল আজিজের (এসায়ি ৭১৭-৭২০) নাম করা যায়। দোসরা যুক্তি মুসলমান দুনিয়ার আইন-কানুন তখন হইতেই দুনিয়াদারিময় বা ধর্মনিরপেক্ষ হইয়া গিয়াছিল। আলেমগণের শেষ যুক্তি অনুসারে এসলামি দুনিয়াটা যেদিন হইতে অগণিত রাষ্ট্রে ভাগ হইয়া গিয়াছে খেলাফতও সেই দিনই কার্যত ফুরাইয়া গিয়াছে। এই অগণিত রাষ্ট্রের রূপও অজস্র: সুলতানের, আমিরের, খানের, শেখের, বাদশাহের, আর এখনকার দিনে রাষ্ট্রপতির রাষ্ট্র। সব ধরণের, রাজতন্ত্র প্রজাতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র। আলেমদের মধ্যে প্রায় সকলেই বলিবেন সারা দুনিয়ার মুসলিম ‘উম্মাহ’ বা মুসলমান জনগোষ্ঠী তো একটাই উম্মাহ। আর তাহাদের খলিফা বা এমামও তো একজনই। মুসলমান মাত্রই একই পয়গম্বরের উম্মাহ আর তাহারা সকলেই একই কোরানের আইনে শাসিত হইবেন। কিন্তু কোন আলেমই দ্বিমত করিবেন না যে ইতিহাস অন্য কথা বলে। এক মুসলমান দুনিয়ায় কত রাষ্ট্র! রাজতন্ত্র প্রজাতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র!

আজ একহাজার বছরেরও বেশি হইল রাষ্ট্রক্ষমতা ধর্ম হইতে আলাদা আছে। তাই বলিয়া এই সকল রাষ্ট্রকে অবৈধ বলিয়া কেহই বর্জন করেন নাই। করিলেও করিয়া সুফল পান নাই। এসলামধর্মের আদর্শ আর নথিবদ্ধ ইতিহাসের সাক্ষ্য ঠিক এক জায়গায় দাঁড়াইয়া নাই। এসলামি দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ আলেমগণ তো এই সত্য মানিয়াই লইয়াছেন । একবাল আহমদ কয়েকজনের নাম লইয়াছেন। তাহাদের মধ্যে আছেন আলমাওয়ার্দি (৯৪৭-১০৫৮), আলগাজ্জালি (১০৫৮-১১১১), আর আছেন এবনে জামায়া (১২৪১-১৩৩৩)। একবাল আহমেদ ইহারই নাম দিয়াছেন ঐতিহাসিক রফা । এই রফার পরও যে এসলামধর্মটা শেষ হইযা যায় নাই তাহ্ওা কম কথা নহে।

কিন্তু মনে রাখিতে হইবে মুসলমান সমাজের সংকটকালে বার বার দাবি উঠিয়াছে আবার খেলাফত কায়েম করিতে হইবে। রাষ্ট্র আর ধর্মকে এক করিতে হইবে। আজিকার দিনেও এই দাবি নতুন করিয়া উঠিতেছে। আজিকার সংকটটা কি? কম করিয়াও যদি বলি তো বলিতে হইবে এসায়ি আঠার শতকের পর হইতে তামাম মুসলমান জগত এয়ুরোপ আর তাহার বংশধর সাম্রাজ্যের পায়ের নিচে আসিয়াছে। মুসলমান জনগোষ্ঠীর কোন কোনটি আজ এয়ুরোপের বা তাহাদের মোসাহেবদের পদানত। একদিকে ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান হয় নাই। অন্যদিকে মিসর, লেবানন আর সিরিয়ার কিছুটাও এসরাইল দখল করিল। আফগানিস্তান আর এরাক পার হইয়া তাহারা লিবিয়ায় গেল আর এখন সিরিয়ার গলায় হাত ছুঁইয়াছে। ইরানের মাথায় খড়গ ঝুলিতেছে। তালিকা দীর্ঘ হইতেছে ।

এই সংকটের চাপে মুসলমান জগতে একদিকে যেমন নানাপ্রকার নিরবতা বিরাজ করিয়াছে তেমনি আবার আওয়াজও শুনা যাইতেছে নানান কিসিমের। কোন কোন মহল বলিতেছেন তাহারা খেলাফত উদ্ধার করিবেন। ইহার অর্থ কিন্তু গুরুতর। তাহারা শুদ্ধমাত্র রাষ্ট্র তাহারা জাতীয়তাবাদ (মানে জাতিকেন্দ্রিক রাষ্ট্র) মানিয়া লইবেন না। তাহারা বিদ্রোহ করিবেন। সমস্যার মধ্যে তাহারা সঙ্গী পাইতেছেন না। বিদ্রোহেও কাজ হইতেছে না। তুরস্কের শিক্ষায় তাহারা শিখিতে চাহেন নাই।

আরেক দল মুসলমান মনে করেন বিদ্যমান রাষ্ট্রের মধ্যে কিছু কাটছাঁট করিয়াই রফা করিতে হইবে। আবার গঠিতে হইবে। ইঁহারা জানেন খেলাফতের দাবিটা পুরণ করা কঠিন, মায় একপ্রকার অসম্ভব। তাই ইঁহারা জাতীয় রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে এসলামি আইন প্রতিষ্ঠায় মন দিবেন। এসলামি আইন করিতে হইলে যে জনমত সংগ্রহ করা দরকার তাহা পাইলেই হইত । সে আইন, সে দিল্লি হনুজ দূর আস্ত! তাহারা মানেন পাকিস্তানে সেনাপতি জিয়াও এসলামি শাসন কায়েম করিয়াছিলেন।

সর্বশেষ একদল মনে করেন রাষ্ট্রের তেল আর ধর্মের জল কদাচ এক হইবার জিনিশ নহে। তাহারা এসলামের কল্যাণ এই পথেরই কোন এক জায়গায় দেখিতে পাইয়াছেন। খোদ একবাল আহমেদকে এই পথের পথিক বলা যায়। আমাদের যুগের বেশির ভাগ মুসলমানও এই পথেই চলিয়াছেন।

একটা কথা ভুলিলে বিপদ। এসলামধর্ম বিশেষ ভুঁইফোড় পদার্থ নহে। ইহার ইতিহাস আছে। আর এসলাম একটা ধর্মমাত্রও নহে। এসলাম একপ্রস্ত সভ্যতা। এই সভ্যতা আরব্য সভ্যতা মাত্র নহে। ইহার মধ্যে আরবদেশ বা মধ্যপ্রাচ্য মাত্র নাই। আছে ইরান, তুরান, ভারত, বাংলা, চিন, ইন্দোচিন, আরও কত সভ্যতা! এয়ুরোপিয়া সভ্যতার নাহান এসলামেও বাম আছে, ডান আছে। আছে প্রগতিশীল। রক্ষণশীল আছে।

যাহারা এসলাম বলিতে ‘এক নেতা এক দেশ’ শ্লোগানের মতন একটা একাট্টা আওয়াজ মাত্র মনে করেন তাহারা এয়ুরোপের অসহিষ্ণু ফ্যাসিবাদের এসলামি সংস্করণ মাত্র চালু করিতে চাহেন। তাহারা ‘এসলামবাদী’ বলিয়া পরিচয় জাহির করেন। বিন্দুমাত্র ভিন্নমত পুষিলে বলেন, ‘তুমি অমুসলমান’। আসলে ইহারা ফ্যাসিবাদী। এই এসলামি ফ্যাসিবাদীরাই আজিকালি বলিতেছেন বাংলামুলুকের মানুষ দুইভাগে ভাগ হইয়া গিয়াছে। একদল আছেন ‘বাংগালি জাতীয়তাবাদী’ আর আছেন অন্যদল ‘মুসলমান’। এইভাবে তাহারা মুসলমান জগতে গৃহযুদ্ধ বাধাইবার জন্যও কাজ করিতেছেন। তাহারা ভুলিয়া গিয়াছেন রাষ্ট্রকে আলাদা রাখিয়াও এসলামধর্ম বাঁচিয়া আছে। আর জাতীয় রাষ্ট্রের মধ্যেও তাহার কবর হইবে না।

কথায় বলে না প্রত্যেক কারবালার পর এসলাম আবার জিন্দা হইয়া উঠে ।

৬ মার্চ ২০১৩

দোহাই

Eqbal Ahmed, ‘Islam and Politics,’ in M. Asghar Khan, ed., Islam, Politics and the State: The Pakistan Experience (London: Zed Press, 1985), pp.13-30.

 

৬ মার্চ ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ২৬

Leave a Reply