গুজব না গজব: স্বাধীনতার সংকট

‘পরাধীন ভারতবর্ষে চাষীর লড়াই’ নামা সুবিখ্যাত ইতিহাসের লেখক রণজিৎ গুহ একদা লিখিয়াছিলেন, গুজব না ছড়াইয়া পৃথিবীর ইতিহাসে নিচুতলার মানুষ কোনদিন কোন বড় আকারের বিদ্রোহ ঘটাইতে পারে নাই। তিনি প্রাচীন রোম হইতে একালের এয়ুরোপ ও আফ্রিকা হইয়া পরাধীন ভারতের যুগ-পর্যন্ত ইতিহাস ঘাঁটিয়া দেখাইয়াছেন যে সকল দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে অক্ষর পরিচয় ব্যাপক হয় নাই সে সকল দেশে গুজবের প্রকোপ বেশি। বড় গুজব ছাড়া বড় বলাৎকারের ঘটনা ঘটানো একপ্রকার অসম্ভবই বলিতে হইবে।

গত শনিবার দিবাগত রাত্রে — মার্চের এক তারিখ পার হইবার রাতে — চট্টগ্রাম হইতে নদীয়া পর্যন্ত গুজব ছড়াইয়া পড়িয়াছিল মৌলবি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী চাঁদে দাঁড়াইয়া আছেন। ১৮৩২ সালের কোল বিদ্রোহে, ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহে, এমন কি খোদ ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামেও এই ধরনের বহু গুজব ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। ফরাশি বিপ্লবের আগের দশ বছরে ফরাসিদেশের গ্রামে গ্রামে চাষীদের লড়াইয়ে গুজব বড় ভূমিকা পালন করে। ১৮৩০ সালেও বিলাতের কৃষক বিদ্রোহে গুজব বড় ভূমিকায় অভিনয় করে।

সচরাচর গুজব প্রথম কে ছড়াইয়া দেয় তাহার কোন হদিশ পাওয়া যায় না। সাঈদীর গুজবের সহিত তুলনা করিলে একটা প্রভেদ চোখে পড়িবে।

এবারের গুজব ছড়াইয়া পরে গত শনিবার গভীর রাত্রে। পত্রিকায় লিখিয়াছে, শনিবার রাত বারোটার পর সাতকানিয়া উপজেলার বিভিন্ন মসজিদ হইতে সাঈদীকে চাঁদে দেখা যাইতেছে বলিয়া মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়। ঝিনাইদহের অনেক এলাকায়ও মাইকিং করা হয়।

গুজবের কারণেই বিপুল জনসাধারণ রাস্তায় নামিয়া আসিয়াছে। এই সত্যে সন্দেহ নাই। কিন্তু এই সত্যের তলায় আরও সত্য আছেন কিনা ভাবিয়া দেখিতে হইবে। গুজব — বিদ্বানেরা বলেন — হইতেছে সমাজ মনের ভাষা। সমাজে কি চলিতেছে তাহার খবর শহরের টেলিভিশন ধরিতে পারে না। গুজবই তাহার প্রমাণ। আমি জানি আলেম সমাজ বলিয়াছেন সাঈদীকে চাঁদে দেখা গিয়াছে এহেন কথার কোন ভিত্তি শরীয়তে নাই। যাহারা এহেন বক্তব্য প্রচার করিতেছেন তাহাদের ঈমান নষ্ট হইয়া যাইবে। সবই সত্য। তাহার পরও কথা থাকিয়া যায়।

কথা হইতেছে, বাংলাদেশ স্বাধীন প্রজাতন্ত্র আকারে গঠিত হইবার চল্লিশ বছর পরও দেশে এ ধরনের গুজবে কান দিবার মত এত মানুষ কিভাবে থাকিয়া গেল? আরও কথা আছে, গুজবে কান দিতে যাহারা তৈয়ার থাকে, তাহারা কেন তৈয়ার থাকিবেন ?

আমাদের রাষ্ট্র জনসাধারণ হইতে বেশ তফাতে বসবাস করিয়া থাকে। এই তফাত কতখানি তাহা পাঁচ দশ বৎসর পর পর যে নির্বাচন অনুষ্ঠানাদি হইয়া থাকে তাহাতে পুরাপুরি ধরা পড়ে না। গুজবে এই তফাতটা খানিক মাপা যায়। গুজবের বিষয়টা কি তাহাও দেখিতে হইবে। কিন্তু এক্ষণে আমি গুজবের ‘প্রকার’ নিয়া কথা বলিতেছি না। বলিতেছি ‘আকার’ নিয়া।

সকলেই জানে বাংলাদেশ এখনও চাষাভুষার দেশ। ভদ্রলোকের ভাষায় আমাদের সমাজ কৃষক সমাজ। এমনকি শহরে যে বিপুল ভাসমান জনসমাজ তাহাও কৃষক জনসমাজ। কি ভাষায় কি ভাবে। সমাজে প্রতিদিন নতুন নতুন কথা যোগ হইতেছে কিন্তু ভাষা বদলাইতে আরও সময় লাগে। আমরা দেখিয়া শুনিয়া মনে হইতেছে তাসের ঘরে বসিয়া আছি। কথাটা খুলিয়া বলা দরকার।

এমন এক সময় ছিল বাংলাদেশের মাটিতে জমিদারশ্রেণি রাজত্ব করিতেন। জমিদারদের মধ্যে হিন্দু ছিলেন, মুসলমানও ছিলেন। ইংরেজ জাতির অধীনে চলিয়া যাইবার পর এই ব্যবস্থায় পাকা হইল। কলিকাতা হইতে নিলামে জমিদারি কিনিয়া অনেকে নতুন জমিদারও হইলেন। দেশের বাদবাকি জনসাধারণের সকলকে জমিদাররা এক কথায় ‘প্রজা’ বা ‘চাষী’ বলিতেন। কিন্তু চাষীদের মধ্যেও নানান অর্থপ্রকার তৈয়ারি হইতেছিল। দেশ যখন ‘স্বাধীন’ হইল তখন অনেক ‘প্রজা’ জমির ‘মালিক’ হইলেন।

দেখা গেল চাষীর দেশে ধনী, মাঝারি ও ছোট চাষী ছাড়াও আরও মানুষ আছে। গ্রামে শতে পঞ্চাশ লোকের কোন জমি নাই। তাহারা খেতে-খামারে কাজ করে। মোট বহন করে, কাঠ কাটে। এই রকমই আমাদের গ্রামের সমাজ। কেহ এখন রিকশা চালাইতেছে, কেহ ধান ভাঙ্গার কলে খাটিতেছে। কৃষক সমাজের এই স্তরভেদ দেখিলেই বুঝা যাইবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মত ‘জাতীয়তাবাদী’ দল বড় ও মাঝারি চাষীর গায়ে ভর দিয়া দাঁড়াইয়া আছে। মানে তাহাদের নীতিতে এই বড় চাষীরাই জেতেন।

গ্রামে আরও মানুষ আছে। তাহারা শুদ্ধ ভোট দেয়। কখনও তাহাদের কাজ থাকে। কখনও কাজ নাই। বাংলাদেশের ‘জাতীয়’ রাজনৈতিক দলগুলি ইহাদের ভোট লইয়া দেশ চালায়। প্রমাণিত হয় জনপ্রিয়তা। এই জনপ্রিয়তার ভিত্তি কত যে ঠুনকা তাহা কেবল সংকটের সময় বুঝা যায়।

আজ যে সংকট দেখা যাইতেছে তাহাতে বুঝা যায় এদেশের শাসক মহাজনেরা দেশের খবর রাখেন না। তাই জনসাধারণ তাহাদের কানে গুজব দেয়। গুজব শব্দটির সহিত গজব শব্দটির মিল আছে। এই মিল হইতে পারে আপতিক। তাহার পরও বলিব, ইহা গজবই।

কেহ কেহ বলিতেছেন দেশের যে যে এলাকায় জামায়াত ও বিএনপির শক্তি বেশি সে সে এলাকায় পুলিশের সহিত সংঘর্ষ তীব্র হইয়াছে। দেখা যাইতেছে খালি দেশের উত্তরাঞ্চলেই এই সংঘর্ষ তীব্রতর হয় নাই, দক্ষিণ-পূর্বেও, দক্ষিণ-পশ্চিমেও। এক কথায় গ্রামঞ্চলে, মফস্বলে সংঘর্ষের মাত্রা বাড়িয়াছে। প্রাণহানির সংখ্যা বৃদ্ধি পাইয়াছে। সংঘর্ষের আরও কয়েকটি চেহারা চোখে না পড়িয়া যাইবে না। চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে জনতা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির একটা সাবস্টেশন পোড়াইয়া দিয়াছে। তাহাতে এলাকার সেচ কার্য পর্যন্ত বন্ধ হইতেছে। এখানে গ্রামাঞ্চলে শ্রেণি সংগ্রামের একটা হালকা ছায়া চোখে পড়ে।

বড় ভূমিকম্পের আগে যেমন ছোট ছোট কম্পন হয় এবারের সংকটের সহিত সেই ছোট ছোট কম্পনের তুলনা করা যায়। দুর্ভাগ্যের মধ্যে এবার এই চাষীদের মধ্যে গুজব ছড়াইয়াছে এমন একটি দল যাহারা দেশের জন্য ‘গজব’ বিশেষ। তাহারা মুসলমানকে লাগাইতেছে হিন্দুর বাড়িতে, হিন্দুর মন্দিরে হামলার কাজে। ১৯৭১ সালের মহাযুদ্ধের আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনী শত চেষ্টা করিলেও বাংলাদেশে একটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধাইতে পারে নাই। এতক্ষণে ইহারা পারিতেছে। কেন পারিবে?

গ্রামাঞ্চলে শ্রেণি বিভাজন আগেও ছিল। দেশ স্বাধীন হইবার পর এই বিভাজন কমে নাই। বরং বাড়িয়াছে। এতদিনে আর জমিদার নাই। আছে ধনী কৃষক ও মাঝারি কৃষক। আছে গরীব কৃষক ও কৃষি মজুর। আছে ভাসমান জনগোষ্ঠী। স্বাধীনতার রাজনৈতিক আদর্শ দেশকে এক জায়গায় আনিয়াছিল।

শুদ্ধ জামায়াতকে দোষ দিয়া পার পাওয়া যাইবে না। স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা ব্যবসায় যে একবস্তু নহে তাহা বুঝিতে হইবে। দেশ স্বাধীন হইয়াছিল সকলের জন্য। এখন যেন মনে হয় দেশটা স্বাধীন হইয়াছে শুদ্ধ ব্যবসায়ীদের জন্য। ইহার মূল্য দিতে হইবে না?

একটা জিনিশ চোখে পড়িবে। শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে যে সমৃদ্ধির জোয়ার দেখা দিয়াছে তাহাকে বলা হইতেছে বার্ষিক এত এত শতকরা হারে প্রবৃদ্ধি। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যেও নানা স্তর আছে। আজ সেই আলোচনার জায়গা নাই। শুদ্ধ তফাতটাই দেখিতে বলিতেছি।

গ্রামের চাষীদের মধ্যে যে ক্ষোভ তাহাকে পুঁজি করিয়াছে এমন একটি শ্রেণি যাহারা নিজেরাই শহরের নিম্নমধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্তের জোট হইতে তৈয়ার হইয়াছেন। তাহারা জনসাধারণকে এসলামের কলা দেখাইতেছেন। এই কলাই গুজব আকারে চাঁদে গিয়া দাড়াইয়াছে।

এই ধরনের নিয়তিকেই গ্রীক পুরাণে বলা হইত ট্রাজেডি। বাংলায় আমরা বলি নিয়তি। নিয়তি মানে মনে রাখিতে হইবে যাহার ‘য়তি’ অর্থাৎ ‘যতি’ নাই। যাহার পরিণতিতে যতি নাই বাংলায় তাহাকেই আমরা ‘নিয়তি’ বলিয়া থাকি।

৪ মার্চ ২০১৩

৪ মার্চ ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ২৪

Leave a Reply