ফরহাদ মজহারের মানবাধিকারধর্ম

ফরহাদ মজহার দেশের প্রথিতযশা কবি। আমিও তাঁহার কবিতার গুণমুগ্ধ পাঠককুলে বাস করি। তাঁহার ‘এবাদতনামা’ বাংলার সাহিত্যাকাশে ইহারই মধ্যে কালপুরুষ বা আদমসুরতের স্থান গ্রহণ করিয়াছে। বর্তমান সরকার কি তাহার আগের সরকার কেইই তাঁহার প্রতিভার উপযুক্ত সম্মান দেন নাই। উদাহারণস্বরূপ বলা যায়  তিনি কোনদিন বাংলা একাডেমী পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের সুযোগ পর্যন্ত পান নাই। তাঁহার লেখার আলোচনাও বিশেষভাবে চোখে পড়ে না। দেশের মধ্যবিত্তসমাজ তাঁহাকে একপ্রকার বর্জন করিয়াছেন বলিয়াই মনে হয়। হয়তো অন্যান্যের মধ্যে এই কারণেও তিনি এদেশের ডানপন্থী এসলামবাদীদের পত্রপত্রিকায় লিখিতে বাধ্য হইয়াছেন।

দৈনিক ‘আমার দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে সম্প্রতি তিনি নিজের পরিচয় দিয়াছেন ‘মানবাধিকার কর্মী’ আকারে। সেই নিবন্ধে তিনি ‘হত্যাযজ্ঞ’ বন্ধের আবেদন জানাইয়াছেন। আমরা তাঁহার আবেদনের সহিত সহমর্মিতা প্রকাশ করি। তবে শুদ্ধ একটা বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিতে চাহি। এই ‘হত্যাযজ্ঞ’ — যাহাকে ‘গণহত্যা’ বলিয়াছেন বেগম খালেদা জিয়া — শব্দটি তিনি কেন ব্যবহার করিয়াছেন? নিশ্চয়ই তিনি ‘গণহত্যা’ কথাটি ব্যবহার করা যুক্তিযুক্ত মনে করেন নাই। ইংরেজি ‘ম্যাসাকার’ কথাটির নিকটতম বাংলা বোধ হয় ‘হত্যাযজ্ঞ’ই হইবে — ‘গণহত্যা’ হইবে না। গণহত্যার ইংরেজি যদ্দূর জানি ‘জেনোসাইড’। অনেকে আবার ‘রেপ’ বা বলাৎকারও বলিয়া থাকেন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলিয়াছেন ২৮ ফেব্র“য়ারির (বা পরের) ঘটনাবলিকে ‘গণহত্যা’ বলিলে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশে যে নৃশংসতা দেখাইয়াছিল তাহাকে ছোট করা হয়। হয়তো সেইজন্যই ফরহাদ মজহার ‘গণহত্যা’ না বলিয়া ‘হত্যাযজ্ঞ’ বলাটা বাছিয়া লইয়াছেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতের ‘অপারেশন সার্চলাইট’ বা ‘সন্ধানী আলো’ অভিযান শুরু করিবার যুক্তি আকারে পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশের বিক্ষোভকারীদের হাতে এক লাখ ‘অবাঙালি’ হত্যাযজ্ঞের দোহাই দিয়াছিলেন। ফরহাদ মজহার সেই ইতিহাস নিশ্চয় ভুলিয়া যান নাই।

ফরহাদ মজহার একটা বিষয়ে বলিতে গেলে কিছুই বলিলেন না দেখিয়া অবাক হইলাম। রাষ্ট্র যখন নাগরিক বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে তখন আমরা সঙ্গত কারণেই ব্যথিত হই। কিন্তু নাগরিক যখন অন্য নাগরিককে হত্যা করে তখন আমরা হই আতঙ্কিত। ফরহাদ মজহার আপন বইয়ের ফ্ল্যাপপাতায় নিজের পরিচয় দেন নোয়াখালি জেলার (বিশেষ মাইজদি কোর্টের) সন্তান হিশাবে। অথচ বৃহত্তর নোয়াখালি জেলার বেগমগঞ্জ হইতে ছাগলনাইয়া পর্যন্ত হিন্দু জনগোষ্ঠীর উপর যে ব্যাপক হামলা হইল তাহা কে করিয়াছে সে বিষয়ে কিছুই বলিলেন না। শুদ্ধমাত্র নোয়াখালি কেন, সারাদেশেই কেন এই হামলা? কারা এই হামলার পশ্চাতে? বাংলাদেশের হিন্দু জনসাধারণ কি ‘মানব’ নহেন। ‘মানবাধিকার কর্মী’ ফরহাদ মজহারের কাছে দেশ এই প্রশ্নে নীরবতা আশা করে না।

গত ডিসেম্বর মাসে কক্সবাজার জেলার রামুতে যখন বৌদ্ধমন্দিরে হামলা হয়, আগুন দেওয়া হয় মন্দিরে মন্দিরে তখন তিনি লিখিয়াছিলেন রামুর আগুনে বাংলাদেশ পুড়িয়া ছাই হইতে পারে। রামুতে কাহারা আগুন দিয়াছিলেন? আর আজ বাগেরহাট হইতে ছাগলনাইয়া পর্যন্ত হিন্দুবাড়ি ও মন্দিরে মণ্ডপে কাহারা ধ্বংসযজ্ঞ চালাইতেছে? হিন্দু কি তাসের প্যাকেটে ‘জোকার’ বিশেষ? কিংবা বৌদ্ধরা?

ফরহাদ মজহারকে একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হইবে। ভারতে যে বিজেপি দল তাহার একটা ‘হিন্দুত্ব’ মতবাদ আছে। বাংলাদেশের হিন্দুদের কি এমন কোন মতবাদ আছে? এদেশে তাহাদিগকে ‘সংখ্যালঘু’ বলা হয়, যেমন ভারতে মুসলমান জনগোষ্ঠীকে বলা হইয়া থাকে। বলা প্রয়োজন  ভারতে কোন মুসলমান এখন — এমনকি ভারতবর্ষের জামায়াতে ইসলামী দলও — ‘এসলামী রাষ্ট্র’ বা খেলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে না। তবুও কেন সেদেশে ১৯৯২-৯৩ সালের পর মুসলমানদের উপর চরম নির্যাতন নামিয়া আসিল? বাংলাদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর অন্যায় কাজটা কি? কোন দোষে তাহাদের বাড়ি, ব্যবসায় ও ধর্মশালায় এই আক্রমণ? ফরহাদ মজহার এখন কি বলিবেন? রামুর আগুনে বাংলাদেশ নিশ্চয়ই পুড়িতেছে। লক্ষ্মীপুরের আগুনে কি সে গা পোহাইবে?

জামায়াতে ইসলামী গতকাল — ২ মার্চ — বিবৃতিযোগে বলিয়াছেন এই কর্ম তাহাদের দল করে নাই। তো প্রশ্ন থাকিয়াই যাইবে, কে করিয়াছে? কে করিয়াছে?

আমরা সকল হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করি। এই নিন্দা ‘সামান্য’। কিন্তু যে হত্যাকাণ্ড অকারণে তাহার নিন্দা ‘বিশেষ’ করিয়া করিতে হইবে। যাঁহারা রাষ্ট্রক্ষমতায় বসিয়া আছেন তাঁহাদের দায়িত্ব সমানের অধিক। মানবাধিকার কর্মীদেরও দায়িত্ব আছে। ফরহাদ মজহার সেই দায়িত্ব স্বীকার করেন নাই। দেখিয়া আমরা চরম ব্যথিত। তিনি নিশ্চয়ই অস্বীকার করিবেন না দুর্বল জাতি ও জনগোষ্ঠীর উপর বিদ্বেষকে পুঁজি করিয়াই এয়ুরোপে ফ্যাসিবাদ নামক মতাদর্শ তাহার ব্যবসায় শুরু করিয়াছিল। সেই ব্যাপারে মুনাফা হইয়াছিল প্রবল জনগোষ্ঠীর ধর্মকে রাজনীতিক্ষেত্রে বিনিয়োগ করিয়া। এয়ুরোপে প্রবল ধর্মের নাম ছিল খ্রিস্ট বা নাসার ধর্ম।

খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও হিন্দু জনগোষ্ঠীর উপর আক্রমণ দেখিয়াই বুঝিতে হইবে বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদ কোন প্রকার অর্থ গ্রহণ করিয়াছে। গ্রামাঞ্চলের কৃষক ঢাকার এলিট শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে যে ন্যায়সঙ্গত ক্ষোভ পোষণ করে তাহার সুবর্ণসুুযোগ গ্রহণ করিতে ফ্যাসিবাদ পিছপা হইতেছে না। তাহারা এক্ষেত্রে এসলামধর্মের ঐতিহাসিক নামটি ব্যবহারের সুযোগ ষোল আনাই কাজে লাগাইতেছে।

ফরহাদ মজহার এই ফ্যাসিবাদকেই নিঃশর্ত সমর্থন জানাইয়াছেন। যদি বাড়তি প্রমাণের প্রয়োজন আছে মনে করেন পাঠিকা তাহা খুঁজিয়া পাইবেন তাঁহার আর একটি প্রস্তাবে। সেই প্রস্তাব অনুসারে বাংলাদেশের মধ্যমবিত্ত শ্রেণির অন্তরে একপ্রকার এসলামবিদ্বেষ লুকাইয়া আছে। এই প্রস্তাব লইয়া বারান্তরে।

মার্চ ৩, ২০১৩

৩ মার্চ ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ২৩

Leave a Reply