গৃহযুদ্ধ না সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা?

২৮ ফেব্রুয়ারির ঘটনাবলিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণহত্যার সহিত তুলনা করিয়াছেন। মির্জা সাহেব বলিয়াছেন জামায়াতে ইসলামীর সহিত সরকারের পুলিশ বাহিনী (ও সরকারি দলের) এই সংঘর্ষ নৃশংসতায় ১৯৭১ সালের পাকিস্তানী হানাদারদের গণহত্যাকেও ছাড়াইয়া গিয়াছে। একটা জিনিশ কারও নজরে না পড়িয়া যায় নাই। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের তৃতীয রায় ঘোষণা উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামী আগেই হরতাল ডাকিয়াছিলেন ২৮ ফেব্রুয়ারি। ঐ দিন দুপুরের দিকে রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সারাদেশে হরতাল মারাত্মক রূপ ধারণ করে। পুলিশের সহিত জামায়াতের কর্মীবাহিনীর সংঘর্ষই এই দিনের একমাত্র বৈশিষ্ট্য নহে। দেখা যাইতেছে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করিয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি বা মন্দিরেও হামলা হইয়াছে।

কিছুদিন আগে হইতেই আশংকা করা হইতেছিল জামায়াত ও বিএনপি নেতাদের বিচারকে কেন্দ্র করিয়া দেশ একটা সংঘাতপর্বে প্রবেশ করিতেছে। জামায়াত নেতাদের কেহ কেহ প্রকাশ্যে গৃহযুদ্ধের হুমকিও দিয়াছিলেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে সেই ‘গৃহযুদ্ধ’ শুরু হইয়া গিয়াছে। গত কালিকার ঘটনাবলিতে যদি তাহা পরিষ্কার না হইয়া থাকে তো আমরা সামনের দুই কি এক সপ্তাহে আরো অনেক ঘটনা দেখিব। কেহ কেহ পরামর্শ দিতেছেন উভয়পক্ষকে সংযত হইতে হইবে। নহিলে জাতীয় নিরাপত্তা পর্যন্ত বিঘিœত হইবার সম্ভাবনা। কেহ কেহ বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ হইতে পারে বলিয়া ভয় দেখাইতেছেন। বলা বাহুল্য সেই ভয় মোটেও অলীক নহে। কেহ কেহ সামরিক শাসনের দিকেও অঙ্গুলি হেলাইতেছেন। এক কথায়, কিছুই আর অসম্ভব নহে।

আমাদের বক্তব্য সামান্য। অন্ধ হইলে কি প্রলয় বন্ধ থাকিবে? ‘জাতীয় ঐক্য’ আর গণতন্ত্রের প্রবক্তারা প্রকারান্তরে বলিতেছেন সংঘাত এড়াইতে হইলে যুদ্ধাপরাধের বিচারটা বন্ধ করিতে হইবে। কারণ ‘নিরপেক্ষ’ বিচার তো সম্ভব নহে। আরেক মহল বলিয়াছেন বিচারগুলি আন্তর্জাতিক মানের হইতেছে না। অতয়েব বিচারটা বন্ধ করিতে হইবে। কোন যুক্তি যখন কাজে আসিতেছে না তখন তৃতীয় যুক্তি পথে নামে। এই যুক্তির নাম শক্তি। তাই তাহারা শক্তির পরীক্ষায় নামিয়াছেন। এই পরীক্ষাকেই খুব সম্ভব ‘গৃহযুদ্ধ’ বলিয়া ঘোষণা করা হইয়াছিল। আপাতদৃষ্টে মনে হইতেছে গৃহযুদ্ধ শুরু হইয়াছে। হয়ত তাহার আরো চরম রূপ এখনো দেখা দেয় নাই। এই মুহূর্তে তাহা হইলে আমাদের কি করিবার আছে?

জামায়াতের শক্তি কিরকম তাহার একটা নমুনা দেখা গিয়াছে ২৮ ফেব্রুয়ারি। বিশেষ করিয়া মফস্বল শহরে ও গ্রামাঞ্চলে তাহারা যে প্রতিরোধের ক্ষমতা দেখাইয়াছেন তাহা বড় কম নহে। ১৯৭১ সালে তাহাদের এহেন শক্তি ছিল কি? গ্রামের কৃষকশ্রেণির মধ্যে তাহাদের ভীত বেশ বাড়িয়াছে এ কথা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। কিন্তু মনে রাখিতে হইবে কৃষকেরা কোন কোন সময় রক্ষণশীল এমনকি স্বাক্ষাৎ প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকায়ও নামিতে পারে।

১৭৮৯ হইতে ১৭৯৪ সাল পর্যন্ত ফরাশি বিপ্লবের যে পর্যায়টা প্রথম পর্যায় বলিয়া পরিচিত সেই পর্যায়ে ফরাশিদেশের পশ্চিমাংশের একটা প্রদেশে — নাম বঁদে (Vendee) প্রদেশ — কৃষকেরা তাহাদের পুরাতন বুর্বো (Bourbon) রাজবংশের পক্ষে বহুদিন ধরিয়া সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হইয়াছিল। ঐ বিদ্রোহ দমন করিবার জন্য ফরাশি বিপ্লবকে চরম মূল্য দিতে হইয়াছিল। কৃষকদের এ রাজতন্ত্রী প্রতিরোধ সংগ্রাম ফরাশি প্রজাতন্ত্রকে খানিক বিপদেই ফেলিয়াছিল। যাহার ফলে শেষ পর্যন্ত একনায়কতন্ত্রের উদ্ভব ঘটে। বিখ্যাত ঔপন্যাসিক বালজাক এই কৃষক অভ্যুত্থান লইয়া একটি চমৎকার উপন্যাস লিখিয়াছেন।

যাহারা এই বিচারকে থামাইতে চাহিতেছেন তাহারা একদিকে গৃহযুদ্ধের হুমকি দিতেছেন, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধাইতেও তৎপর হইতেছেন। চার পাঁচ মাস আগে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বৌদ্ধ মন্দিরে কাহারা হামলা করিয়াছিল এখনো কেন তাহা জানা যায় নাই জানি না। কিন্তু এতদিনে পরিষ্কার হইতছে সেই ঘটনার সহিতও যুদ্ধাপরাধের বিচার বিষয়টা জড়িত। হালে জোর করিয়া ধর্মের বিষয় বার বার আনা হইতেছে কি কারণে তাহা পরিষ্কার হওয়া দরকার।

গৃহযুদ্ধটা যদি নিবারণ করিবার মতন ঘটনা না হয় তখন আপনি কি করিবেন? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ১৮৬০-১৮৬৫ সালের যে সকল ঘটনাকে ‘গৃহযুদ্ধ’ বলা হইয়া থাকে তাহার কারণ ও ফলাফল লইয়া একটা আলোচনা হওয়া দরকার। মার্কিনদেশের গৃহযুদ্ধের বিষয় ছিল সে দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যগুলিতে দাসশ্রমের যে প্রথা চালু ছিল সেই দাসপ্রথা। সকলেই আজ জানেন ১৭৮৭ সালে গৃহীত মার্কিনদেশের গঠনতন্ত্রে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করা হয় নাই। এমনকি চারি বৎসর পর ১৭৯১ সালে যে মৌলিক অধিকারের সনদ (বিল অব রাইটস) সেই সংবিধানে যোগ করা হয় তাহাতেও দাসপ্রথা সম্বন্ধে কিছু বলা হয় নাই। কিন্তু সেই দাসশ্রম ও মজুরিশ্রমের মধ্যে কোনটা রাষ্ট্র অনুমোদন করিবে তাহার মীমাংসাও হয় নাই। হইয়াছিল ১৮৬৫ সালে। গৃহযুদ্ধের সফল সমাপ্তি ও দাসমালিকের পরাজয়ের পর।

সকলেই জানেন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম গঠিত হইয়াছিল মাত্র ১৩টি অঙ্গরাষ্ট্র (বা প্রদেশ) লইয়া। তাহাদের মধ্যে কোন কোনটা সেই সময় — মানে ১৭৭৬ হইতে ১৮৬৫ পর্যন্ত — দাসপ্রথার পৃষ্ঠপোষক, আর কোন কোনটা তাহার বিরোধী। অনেক রাষ্ট্রনেতাও সে দেশে প্রথমদিকে দাসমালিক ছিলেন। জর্জ ওয়াশিংটন, টমাস জেফারসন কেহই বাদ পড়িবেন না এই হিশাবে। দাসপ্রথার উচ্ছেদকে অনেকে তখন খোদ সম্পত্তিপ্রথার উচ্ছেদ বলিয়া প্রচার করিতেন। দাসপ্রথা যে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘বৈধ’ তাহা প্রমাণ করিবার জন্য শুদ্ধ ‘বাইবেল’ কেন, গ্রিক মনীষী আরস্ততালেসের লেখা পর্যন্ত হাজির করা হইত।

দাসপ্রথা বিলোপের আন্দোলনকে কেন্দ্র করিয়াই শেষ পর্যন্ত আমেরিকার গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধ ছিল উনিশ শতকের নৃশংসতম যুদ্ধ। সরকারি হিসাবে ৬ লক্ষ মানুষ তাহাতে মারা যায়। ইতিহাসের একটা অধ্যায়ের অবসান তাহাতে ঘটিয়াছিল বলিয়া আজ আমরা মনে করি। মহাত্মা কার্ল মার্কসও এই যুদ্ধে আব্রাহাম লিংকনকে সমর্থন দেন।

১৯৭১ সালের যে সংগ্রাম ও যুদ্ধের মধ্যস্থতায় বাংলাদেশের বর্তমান প্রজাতন্ত্রটি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে — মনে পড়িতেছে — সেই মুক্তিযুদ্ধকেও জামায়াতে ইসলামী ‘গৃহযুদ্ধ’ বলিয়া থাকেন। অতয়েব তাহারা তাহাদের নতুন যুদ্ধকেও যে ‘গৃহযুদ্ধ’ই বলিবেন তাহাতে বিস্ময়কর কি আছে?

১ মার্চ ২০১৩

 

১ মার্চ ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ২১

Leave a Reply