ধর্ম ও স্বাধীনতা

যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করিয়া গণ আন্দোলন শুরু হইবার পর কোন কোন মহল বলিতেছেন এই আন্দোলনটি পরিচালিত হইতেছে ধর্মবিশ্বাসের — বিশেষ এসলাম ধর্মের — বিরুদ্ধে আমরা এই মতের পোষকতা করি না আমরা বরং মনে করি এই আন্দোলন ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের দমনকে লক্ষ্য রাখিয়াই শুরু হইয়াছে ইহার ফলাফল কি দাঁড়াইবে তাহা কয়েকটি মোটা দাগের উপর নির্ভর করিতেছে বাংলাদেশের জাতি ১৯৭১ সালে যদি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ না করিত তবে কি বর্তমান বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্র আদপেই প্রতিষ্ঠা লাভ করিত প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইলেও সেই প্রজাতন্ত্র এতদিনে নানান দিক হইতে ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হইয়াছে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে যাহারা গণহত্যায় লিপ্ত হইয়াছিলেন কিংবা হত্যাকারীদের সহিত যোগসাজশে কাজ করিয়াছিলেন তাহাদের বিচার সম্যক না হওয়াকে সেই ক্ষয়রোগের আলামত বিশেষ বলিতেই হইবে এক্ষণে অনেকে বলিতেছেন এই বিচারটা না করিলে ‘জাতীয় ঐক্য’ প্রতিষ্ঠা হইবে আমাদের বিশ্বাস এই বিচারের অনুষ্ঠান হইলেই জাতীয় ঐক্য একধাপ আগাইয়া যাইবে

যুদ্ধাপরাধী পক্ষের উকিল মহোদয়েরা কহিতেছেন এই বিচার জাতিকে দুই ভাগে বিভক্ত করিতেছে। আমরা বলিব এই দাবি সত্য নহে। তাঁহারা বলিতেছেন এই বিভক্তিটা ধর্মের প্রশ্নে। আমরা বলিব কাঠগড়ায় ধর্ম দাঁড়ায় নাই। ধর্মের প্রশ্নে বাংলাদেশে কোন বিভক্তি দেখা দেয় নাই। কিছু কিছু লোক বা কোন কোন মহল অকারণে ধর্ম লইয়া বাড়াবাড়ি করিতেছেন। তাহাতে — অস্বীকার করার উপায় নাই — বেশ রক্তপাত হইতেছে। কিন্তু কোন বিভক্তির প্রশ্ন উঠিতেছে না। বাংলাদেশে ধর্মের পক্ষে ও ধর্মের বিপক্ষে এমন কোন কুঠুরি নাই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকেও এই রকমের বিভাজনের প্রমাণ আকারে হাজির করার কোশেস হইয়াছিল বটে, কিন্তু সেই কোশেস সফল হয় নাই। গত চল্লিশ বছরে এমন কিছু ঘটে নাই যাহাতে ধর্মের কল নড়া বন্ধ হইয়া গিয়াছে।

পরিবর্তনের মধ্যে আমরা দেখিতেছি বাংলাদেশের শহরে ও বন্দরে মধ্যবিত্ত সমাজেই মাত্র নহে, শ্রমজীবী শ্রেণির মধ্যেও নারীজাতির অনেক বেশি সদস্য এখন গণআন্দোলনে আগাইয়া আসিতেছেন। আজ আমি এই প্রশ্নে সামান্য আলোচনা করিতে চাহি। দোহাই আলজিরিয়ার বিপ্লব ১৯৫৪-১৯৬২।

ফরাশি ভাষার লেখক ফ্রানৎস ফানোঁর লেখা পড়িয়া আমরা জানিয়াছি ১৯৫৪-১৯৬২ সালের বিপ্লবে আলজিরিয়ার নারীজাতি একটা বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করিয়াছিলেন। যুদ্ধের কারণে সে দেশে নারীজাতির সামাজিক চরিত্রেও বেশ নাটকীয় পরিবর্তন আসে। বাংলাদেশের পরিবর্তনটা খানিক অন্য মাপের।

বিপ্লবের আগে আলজিরিয়ার নারীরা মাথায় একটা চাদর পরিতেন। তাহারা এই চাদর গায়ে দিয়া একদিকে নিজেদের একটা আলাদা জাতির পরিচয় দিতেন। আবার নিজেদের মধ্যে ঐক্যের নিশানা আকারেও এই চাদরের একটা পরিচয় দাঁড়াইয়াছিল। বিপ্লবী যুদ্ধের সময় এই চাদরকে যুদ্ধের হাতিয়ার আকারেও ব্যবহার করা শুরু হইল।

ফরাশি উপনিবেশবাদী সরকার ১৯৩০ সালের পর হইতে জোর চেষ্টা করিতেছিল কি করিয়া আলজিরিয়ার নারীজাতিকে এই চাদরের হাত হইতে মুক্ত করা যায়। তাহারা নানান ধরনের যুক্তি, লোভ এমনকি ভয় দেখাইয়াও সফল হয় নাই। শেষ পর্যন্ত যখন সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হইল তখন নারীজাতির সদস্যরা দলে দলে বিপ্লবে যোগ দিলেন। তখন ফরাশি সৈন্যরা কখনো কখনো নারীদের রাস্তাঘাটে ধরিয়া চাদর খুলিতে বাধ্য করিল, কখনো কখনো নারীর শরীরে তল্লাশিও চালাইল। লক্ষ্য একদিকে তাহাদের সম্ভ্রমে হাত দেওয়া, অন্যদিকে চাদরের তলায় কোন গ্রেনেড কিংবা স্টেনগান লুকান আছে কিনা খুঁজিয়া দেখা। সেই সময় নারী মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্রশস্ত্র সত্য সত্য লুকাইয়া আনা নেওয়া করিতে এই চাদরের ঘোমটাখানি ব্যবহার করিতেছিলেন। তাহারা গ্রেনেডের থলিয়া বা বোমার পুঁটুলি গায়ের সহিত দড়ি পরাইয়া বাঁধিয়া চলাফেরা করিতেছিলেন। চেকপোস্ট পার হইবার সময় শুধু দুইখানা খালি হাত দেখাইতেন। মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েরাও তখন কাজের বুয়া তথা ফাতেমার পোশাক পরিয়া চলাফেরা করিতেন যাহাতে দখলদার সৈন্যরা কোনপ্রকার সন্দেহ পর্যন্ত করিতে না পারে।

এইভাবে চাদরকে সামরিক সরঞ্জামে পরিণত করার পরিণতি ভাল হয় নাই। তখন ফরাশি সামরিক বাহিনী পথে ঘাটে যেখানে পায় নারীজাতির যে কোন সভ্যকেই তল্লাশির আওতায় লইয়া আসে। কোনরকম বাছবিচার না করিয়াই তাহারা সকল শ্রেণি ও পেশার আলজিরিয়াবাসী নারীর দেহ তল্লাশি শুরু করে। কাহাকেও ছাড় দেওয়া হয় নাই। ‘এই একটা সময় আসিয়াছিল যখন পুরুষ, নারী, শিশু নির্বিশেষে সারা আলজিরিয়ার জাতি বুঝিতে পারিল যে জাতি হিসেবে তাহাদের কর্তব্যটা কি। একই দিনে তাহারা আরো বুঝিতে পারিলেন আলজিরিয়ায় একটা নতুন জাতিও গড়িয়া উঠিতেছে,’ — কথাটা লিখিয়াছিলেন মহাত্মা ফ্রানৎস ফানোঁ।

তবে কিনা সামরিক কৌশলের অংশ হিসেবে আলজিরিয়ার মুক্তিযোদ্ধা নারীরা একসময় চাদর পরাটা বাদ দিতে শুরু করিলেন। একসময় অন্য কৌশলের প্রয়োজন দেখা দিল। আলজিরিয়ার মুক্তিযোদ্ধা নারীটিকে এয়ুরোপিয়া নারীর বেশভূষা পরিয়া চলাফেরা করিতে হইবে বলিয়া সিদ্ধান্ত হইল। প্রথম প্রথম একটু অসুবিধা হইত। কিন্তু শেষমেশ এই নারীরা এয়ুরোপিয়া পোশাক পরিলেন। চাদর পরা বাদ দিলেন। জাতীয় প্রয়োজনে, যুদ্ধের কৌশলজ্ঞানে, আলজিরিয়ার নারীজাতির অনেকে যুগযুগান্তরের প্রথাসম্মত চাদর পরা বাদ দিলেন। মাথায় চাদর না দিলে নারীর মর্যাদা থাকিবে না — এই ভয়ের হাত হইতে তাহারা ছাড়া পাইলেন। আলজিরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম সেই অসম্ভবকে সম্ভব করিল যে অসম্ভব সম্ভব করিবার জন্য ফরাশি স্বাধীনতা ব্যবসায়ীরা শত চেষ্টা করিয়াও বিন্দুমাত্র সফল হইতে পারেন নাই।

একই ধরনের ঘটনা ঘটিল রেডিও নামক নতুন গ্রাহকযন্ত্রটি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও। একদা ফরাশি উপনিবেশবাদীরা যখন রেডিও প্রযুক্তির প্রচলন করেন তখন আলজিরিয়ার মুসলমান জনগোষ্ঠী সে রেডিওতে মোটেও কান দিতেন না। মনে করিতেন উহা দখলদারদের অত্যাচারের আরেকটি হাতিয়ার বৈ নহে। ফরাশিদের রেডিও স্টেশনের নাম ছিল ‘রেডিও আলজের’। তাহাতে ফরাশি সংস্কৃতির প্রচারণা, ফরাশি গান বাজনা চলিত। অদূরের বা পাশের দেশ মিশরের রেডিও মাঝে মধ্যে শুনা হইলেও আলজিরিয়ায় বেতারযন্ত্র জিনিশটা বড় একটা জনপ্রিয় হইয়া উঠিতে পারে নাই।

কিন্তু ১৯৫৬ সালের পর একটা বিপ্লবী পরিবর্তন আসিল। চালু হইল ‘ভয়েস অব আলজিরিয়া’ অথবা স্বাধীন আলজেরিয়া বেতার কেন্দ্র। ১৯৫৬ সালের শেষাশেষি দেখা গেল বেতার গ্রাহক যন্ত্র বা ট্রানজিস্টর জিনিশটার চাহিদা অসম্ভব বাড়িয়া গেল। হেন পরিবার রহিল না যাহাদের ঘরে একটা ট্রানজিস্টর সেট নাই। সকলেই এখন ‘স্বাধীন আলজিরিয়া বেতার কেন্দ্র’ ধরে। ফানোঁ লিখিয়াছেন: ‘এতদিনে বুঝা গেল বেতার জিনিশটা আর পরদেশলোভীর সংস্কৃতি দিয়া পিটাইবার হাতিয়ার বিশেষ নহে।’

আরো অধিক কিছু। নতুন প্রবর্তিত এই বেতার যন্ত্র আলজিরিয়ার সকল এলাকার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করিতে সহায়ক শক্তি হইয়া দাঁড়াইল। আলজিরিয়ায় সকলেই আরবি জবানে কথা কহিতেন না। বিশেষ পাহাড়ি বা কাবিল এলাকায় কাবিল ভাষায় কথাবার্তার চল। কিন্তু ফরাশি পরদেশীদের হইতে ছাড়া পাইতে হইলে এক হওয়ার বিকল্প নাই। আলজিরিয়ার নতুন জাতীয় ভাব তৈরি করিতে বেতার বড় একটা কাজ করিয়া দিল। ফানোঁ লিখিতেছেন, ‘এই রেডিও জিনিশটাই গ্রামেগঞ্জে এবং পাহাড়ি অঞ্চলে (আলজিরিয়ার) কণ্ঠস্বরটার শিকড় ছড়াইয়া দিল। একটা বেতার যন্ত্রের মালিক হওয়ার মানে দাঁড়াইল যুদ্ধে যাওয়া।’

আলজিরিয়ার মুক্তিযুদ্ধ সে দেশে একটা নতুন জাতির সৃষ্টি করিল। শুদ্ধমাত্র চাদর কিংবা বেতারযন্ত্রের মধ্যেই এই বিপ্লব সীমিত ছিল না।

দোহাই

Frantz Fanon, A Dying Colonialism (London: Progressive Books,1970).

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

(চলবে)

 

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ১৯

Leave a Reply