শাহবাগ ও পাকিস্তান

পাকিস্তানের রাজধানী এসলামাবাদে কায়েদে আযমের নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা পড়াইতেন পারভেজ হুদাভাই (চধৎাবু ঐড়ড়ফনযড়ু)। স¤প্রতি অবসর লইয়াছেন তিনি। বিখ্যাত পাক মনীষী একবাল আহমদের এন্তেকাল উপলক্ষে তিনি একটি শোকসন্তপ্ত প্রবন্ধ লিখিয়াছিলেন। আমার সৌভাগ্য হইয়াছিল সেই প্রবন্ধটি পঠিবার। তাই তাঁহার লেখা পাইলেই আমি আগ্রহ করিয়া পঠি।

স¤প্রতি তিনি ‘শাহবাগ কোথায় আর আবদুল কাদের মোল্লা কে’ নামে একটি নিবন্ধ লিখিয়াছেন। এই নিবন্ধযোগে জানিতে পারিলাম অধ্যাপক হুদাভাই একদিন এসলামাবাদে কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া তালেবেলেমের সহিত আলাপ করিতেছিলেন। বলা যায় এক ধরনের আড্ডা পিটাইতেছিলেন। তিনি লিখিতেছেন, দেখা গেল এই পাক তালেবেলেমদের কেহই জানে না শাহবাগ চত্বরটা কোথায় আর আবদুল কাদের মোল্লা লোকটাই বা কে। ইহারা অবশ্য তাহরির চত্বর কোথায় কিংবা আফজাল গুরু কে তাহা বিলক্ষণ জানেন।

যখন এই তালেবদের বলা হইল শাহবাগ জায়গাটা ঢাকায় আর সেখানে লাখো মানুষ প্রতিবাদে ফাঁটিয়া পড়িতেছে তখন তাহারা মোটেও গা করিলেন না। পারভেজ হুদাভাই জানাইলেন শাহবাগ নামক জায়গায় ১,০০,০০০ হইতে ৫,০০,০০০ লোক — তাহার ভাষায় ‘বাঙ্গালি লোক’ — একত্র হইয়াছেন। তাহারা দেশাত্মবোধক গান গাহিতেছেন, কবিতা আবৃত্তি করিতেছেন আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ধরিয়া নানা পর্বের কাহিনী বলিতেছেন। প্রতিবাদকারীদের দাবিনামার কেন্দ্রস্থলে রহিয়াছেন আবদুল কাদের মোল্লার নিয়তি।

অধ্যাপক সাহেব লিখিয়াছেন ৫ ফেব্র“য়ারি তারিখে আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনিত ছয় অভিযোগের মধ্যে পাঁচটিতেই তাহাকে অপরাধী সাব্যস্ত করিয়াছেন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ঢাকার মিরপুর এলাকার বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে নৃশংসতা সুবিদিত বলিয়া তাহার নাম দাঁড়াইয়াছে ‘মিরপুরের কসাই’। একজন কবির শিরোচ্ছেদন, ১১ বছর বয়সী একটি বালিকার উপর বলাৎকার আর ৩৪৪ জন সাধারণ মনুষ্য হত্যার অভিযোগ রহিয়াছে তাহার বিরুদ্ধে। তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সাধারণ সম্পাদক বটেন। আন্তর্জতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাহাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করিয়াছেন। শাহবাগে সমবেত প্রতিবাদী জনতা এ দণ্ডকে যথাযথ বলিয়া মনে করেন না। তাহারা চাহেন মোল্লার প্রানদণ্ড। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীও হিংসাত্মক পথে প্রতিবাদ করিয়াছেন, বাহির করিয়াছেন শোভাযাত্রা। ‘কিন্তু বিশ্বজনমতকে তাহারা প্রভাবিত করিতে পারেন নাই’ বলিয়া লিখিয়াছেন অধ্যাপক হুদাভাই। সঙ্গে তিনি যোগ করিতে ভোলেন নাই যে ‘এই কাজে তাহারা বিস্তর টাকা পয়সা খরচ করিয়াছেন’। তাহার পরও কাজ হয় নাই।

মজার বিষয়, হুদাভাই লিখিতেছেন, তুরস্কের রাষ্ট্রপতি গত মাসেই গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত সকলের সাজা মওকুফের দাবি পেশ করিয়া বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বরাবর একখানা পত্র পাঠাইয়া দিয়াছেন। সৌভাগ্যের মধ্যে, এই বিষয়ে তুরস্কের রাষ্ট্রপতি এখনো একলা রহিয়াছেন। তাঁহার ডাক শুনিয়া আর কেহ এখনো আগাইয়া আসেন নাই। গণহত্যাকারী ঘাতকদের রক্ষা করিতে কেহই আপাতত আগ্রহী নহেন।

পারভেজ হুদাভাই জানাইতেছেন মোল্লার কপাল ফিরাইতে পাকিস্তান সরকারও তেমন আগ্রহ দেখায় নাই। পাকিস্তানের খবরাখবর জগৎ এই প্রশ্নে নীরবই রহিয়াছেন আর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কোন বক্তৃতা বিবৃতি প্রচার করে নাই। আপাতত তাহারা অন্য বিষয়ে ব্যস্ত।

পাকিস্তানের এই নীরবতা কেন? বুঝিবার চেষ্টাও করিয়াছেন এই অধ্যাপক মহোদয়। বাংলাদেশ কেন পাকিস্তান হইতে আলাদা হইল? এই প্রশ্নের উত্তরে পাকিস্তানের স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা কি পড়িতেছে তাহা পরীক্ষা করিলেন তিনি। দেখিলেন সেখানে আজও লেখা আছে ‘ভারতের সাহায্য লইয়া পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হইয়া গিয়াছে।’ এই কথা পাওয়া যায় ৫ম শ্রেণির একটি ইংরেজি মিডিয়াম পাঠ্য বইতে। আরো উপরের ক্লাশেও একই কথা। সেখানেও ভারতের সাহায্য, হিন্দুদের প্রাধান্য ও পূর্ব পাকিস্তানি নেতাদের ভূমিকা লইয়া আলোচনা। ইংরেজি ও উর্দু উভয় মিডিয়ামের বইতেই একই কথা। কোথাও সত্য ঘটনার উল্লেখ দেখা যায় না।

পারভেজ হুদাভাই মনে করেন এই অল্প ও ভুল শিক্ষার কারণেই আজিকার পাকিস্তানের ছাত্রছাত্রীরা বাংলাদেশের বিষয়ে মাথা ঘামাইতে পারিতেছে না। তিনি সাক্ষ্য দিতেছেন তাঁহার মতন যাঁহারা ১৯৫০ কি ১৯৬০ সালের দশকে বড় হইয়াছিলেন তাঁহারও শিখিয়াছিলেন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলিয়া এক দেশ বটে কিন্তু তাহারা এক জাতি ছিল না। তিনি লিখিয়াছেন, ‘সেকালের পশ্চিম পাকিস্তানিদের মনে বাঙ্গালি-বিদ্বেষী বর্ণবাদ কি পরিমাণে উচ্চকিত ছিল তাহা একালের তরুণ তরুণীদের ধারণারও বাহিরে।’ পারভেজ সাহেব অকপটে স্বীকার করিয়া বলেন, ‘তখন আমিও তো একজন চিন্তালেশহীন বালক মাত্র। আমিও তখন ছোটখাট কাল কাল এই লোকগুলি আমার দেশের মানুষ ভাবিয়া বড়ই বেজার হইতাম। এ কথা ভাবিয়া আজ চরম লজ্জা পাইতেছে আমার। তবুও সত্য সত্যই, স্বীকার না করিয়া উপায় কি!’

পারভেজ হুদাভাই স্বীকার করিয়াছেন তিনিও ছিলেন একটা ভুল ধারণার বলি। সেই ধারণার প্রকোপে তিনি ও তাঁহার সমবয়সীরা ভাবিতেন ‘সুবোধ মুসলমান’ আর ‘পাকিস্তনি’ মাত্রই উচা উচা, ফর্শা, আর চোস্ত উর্দু জবান বলিয়ে। রেডিও পাকিস্তান হইতে বাংলায় প্রচারিত খবর শুনিয়া তাঁহার সঙ্গী সাথীদের কেহ কেহ কেবল হাসাহাসি করিত।

অনেক পাকিস্তানি এখনো মনে করেন ১৯৭১ সালে তাহারা পরাজিত হইয়াছিলেন নিছক সামরিক অদক্ষতার কারণে। তাহারা আজও বুঝিতে পারেন না কোন জায়াগায় — বিশেষ রাজনীতির ক্ষেত্রে কোন জায়গায় — তাহাদের ভুল হইয়াছিল। তাহারা আজও বাংলাদেশকে তাহাদের দেশের হারানো অর্ধাংশ মনে করেন। এই ফেব্র“য়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে পাকিস্তানের জগদ্বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আবদুল কাদের খান জামায়াতে ইসলামীর প্রধান সৈয়দ মুনাওয়ার হাসানের সহিত দেখা করিয়াছেন। এই বিজ্ঞানীকে পাকিস্তানের পারমাণবিক বোমার জনক মনে করা হয়। তিনি স¤প্রতি লিখিয়াছেন, ‘১৯৭১ সালের আগে যদি আমাদের হাতে পরমাণু বোমা ছুঁড়িবার ক্ষমতা থাকিত, তবে আমরা এহেন একটা লজ্জাজনক পরাজয় বরণ করিয়া আমাদের দেশের অর্ধেক অংশ — অর্থাৎ আজিকার বাংলাদেশ — হারাইতাম না।’

দোহাই: Pervez Hoodbhoy, ‘Shahbag Square — why we Pakistanis don’t know and don’t care, ‘The Express Tribune, February 16th 2013.

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ১৮

Leave a Reply