মানবতাবিরোধী অপরাধ বনাম ধর্মবিরোধিতার জিগির

গত ৫ ফেব্রুয়ারি হইতে ঢাকা শাহবাগ মোড় হইতে যে আন্দোলন শুরু হইয়াছে এতদিনে — বিশেষ ২২ ফেব্রুয়ারির পর — তাহার একটা মোড় ঘুরিয়া গিয়াছে।

শাহাবাগ আন্দোলনের মূল দাবি ছিল যুদ্ধাপরাধ তথা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল গঠিত হইয়াছে তাহার একটি রায়ের (সঠিক হয় নাই বলিয়া) পুনর্বিবেচনা বা পুনর্বিচার। আন্দোলনের চাপে ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকার সংশ্লিষ্ট আইনের একটা সংশোধনীও জাতীয় সংসদে পাশ করাইয়া লইয়াছেন। ইহাকে আন্দোলনের প্রাথমিক বিজয় হিশাবে দেখা হইতেছে।

যুদ্ধাপরাধীর পক্ষের লোকেরা শাহাবাগ আন্দোলনকে একেবারে গোড়া হইতেই ‘ফ্যাসিবাদী’ বলিয়া গালিগালাজ করিতেছিলেন। কিন্তু তাহাতে কাজ হয় নাই। যাঁহারা সামান্য হইলেও ইতিহাসের মূল্য স্বীকার করেন তাঁহারাই বলিবেন ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর ‘রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত’ ভুল ছিল। কিন্তু সেই ভুলের মধ্যেই তাহাদের কাজকর্ম সীমিত ছিল না। তাহারা দলগত ও ব্যক্তিগত উভয় নিরিখেই মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত হইয়াছিলেন। সুতরাং তাহাদের বিচার একান্তই ন্যায়সঙ্গত।

১৯৭১ সালে যাঁহারা নিহত, নির্যাতিত ও ধর্ষিত হইয়াছিলেন এই ন্যায়বিচার তাঁহাদের হক কিছু পরিমাণে হইলেও আদায় করিতে পারিবে। তবে তাহাই শেষ কথা নহে। রাষ্ট্র হিশাবে বাংলাদেশ যে জাতির অভিব্যক্তি সেই জাতির সামান্য হকও তাহাতে আদায় হইতেছে। এই দিকটা অনেকেই আমল করেন না। জাতি বা রাষ্ট্রেরও হক বলিয়া একটা কথা কিন্তু আছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার না হইলে সেই হক অনাদায়ি থাকিয়া যাইবে।

অনেকে বলিতেছেন জামায়াতে ইসলামী যদি ১৯৭১ সালে তাহাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভুল স্বীকার করিয়া ক্ষমা প্রার্থনা করিত তবে তাহাদের পুনর্বাসনটা জায়েজ হইত। সেই পুনর্বাসনকেই ইহারা বলিতেছেন ‘জাতীয় ঐক্য’। যেন জামায়াতে ইসলামী দলটির সাহায্য ছাড়া বাংলাদেশকে ‘একটি একক ও ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী’ হিশাবে টিকাইয়া রাখা যাইবে না। পরিতাপের বিষয় ইহারা জামায়াতের কোন অপরাধ বিচারের যোগ্য কিনা তাহা ভুলেও বলিবেন না।

শাহবাগের তরুণ আন্দোলনকে ‘ফ্যাসিবাদী’ বলিয়াই ইহারা নিস্তার পাইতেছেন না। আরো বলিতেছেন এই আন্দোলন বাংলাদেশের জনগণকে দুইটা ‘রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীতে ক্রমে ক্রমে বিভক্ত’ করিয়া তুলিতেছে। বলিতেছেন না, যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রশ্নে বিভক্ত করিতেছে। মাত্র যোগ করিতেছেন ‘ধর্মের প্রশ্নে’।

প্রশ্ন হইতেছে ‘ধর্মের প্রশ্নে’ কেন? বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭১ সনে কি ধর্মের প্রশ্নে বিভক্ত ছিল? উত্তরে কি বলিবেন এই যুদ্ধাপরাধী সমর্থকরা? তবুও তো জামায়াতে ইসলামী তাহাদের ভাষায় বলিতেছে ‘রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভুল’ করিয়াছিল। তাহাতে কি ‘ধর্মের প্রশ্নে’ জাতি বিভক্ত হইয়াছিল? উত্তর, হয় নাই।

তাহা হইলে আজ নতুন কি ঘটনা ঘটিল? ‘চিন্তা পাঠচক্র’ নামক একটি সংগঠন দাবি করিয়াছে, ‘গত ১০-১২ বছরে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরিসরে ইসলামি রাজনীতির উত্থান একটা ফেনোমেনা হিসাবে হাজির’ হইয়াছে। এই পাঠচক্র বলিতেছে শাহবাগের আন্দোলনকারীরা এই ইসলামি রাজনীতির উত্থানকে ঠেকাইতে চাহিতেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নামে যে যুদ্ধ চালাইতেছে তাহারই ছাতার তলায় দাঁড়াইয়াছেন ইঁহারা। ইঁহাদের পুঁজি একটাই। সেই পুঁজির নাম ‘শহুরে সেকুলার মধ্যবিত্তের শংকা’।

এই বিশ্লেষণ বেশ মুখে রোচে। এই বিশ্লেষকরা বলিতেছেন শাহবাগের আন্দোলনকারী ও তাহাদের সমর্থকরা ‘দুনিয়া ব্যাপী লড়াই সংগ্রাম, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ইসলামী রাজনীতি ও চিন্তাকে’ ‘রাজাকার আর যুদ্ধাপরাধী তকমা’ দিয়া বিনাশ করিতে চাহেন।

শাহবাগের তরুণদের বিরুদ্ধে তাই পাল্টা আক্রমণের সূচনা করা হইয়াছে। বলা হইয়াছে ইহারা ধর্মের বিরুদ্ধে উৎকট আক্রমণ চালাইতেছেন। ইহারা নাস্তিক। অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে এই দুনিয়ার সকল দেশেই কিছু কিছু নাস্তিক বা ধর্মাবিদ্বেষী লোক  বসবাস করে। সঙ্গত কারণেই যে সমস্ত দেশ মুসলমান প্রধান বা যে সমস্ত দেশে মুসলামানরা বিদেশি হিশাবে বড় সংখ্যায় বসবাস করেন সেখানেও কিছু কিছু এসলামে অবিশ্বাসী, এসলামবিদ্বেষী বা ধর্মের অবমাননাকারী বসবাস করে। শাহবাগ আন্দোলনে সমবেত তরুণদের মধ্যেও এমন কোন কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী থাকা বিচিত্র নহে।

কিন্তু এই ধরনের জাতীয় ন্যায়বিচারের আন্দোলনকে নিছক ধর্মবিরোধী আন্দোলন হিশাবে দেখাইবার পুরাতন পদ্ধতি নতুন করিয়া ব্যবহার করিবার কারণ কি? কারণ তাহাদের ভাঁড়ারে যুক্তির মজুর ফুরাইয়া আসিয়াছে।

মনে রাখিতে হইবে ‘ধর্মের প্রশ্নে’ জাতিকে বিভক্ত করিবার চেষ্টা যাহারা করিতেছেন তাহাদের সহিত ঐক্যবদ্ধ না হইয়াও একদা বাংলাদেশ নিজেকে ধরার পৃষ্ঠে কায়েম করিতে পারিয়াছিল। ভবিষ্যতেও পারিবে কিনা তাহা ইহাদের সহিত আপোস করিবার উপর নির্ভর করিতেছে না। করিতেছে ‘শঙ্কিত মধ্যবিত্তের’ গণ্ডি হইতে ছাড়া পাইবার উপর।

বাংলাদেশ ও এসলাম পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নহে। তাই বলিব বাংলাদেশের আন্দোলনে যাহারা আস্তিকতা ও নাস্তিকতার লড়াই আবিষ্কার করিতেছেন তাহাদের ‘রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভুল’ গুরুতর। এই ভুল স্বীকার করিলেও এখন আর কোন ফায়দা নাই।

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

 

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ১৬

Leave a Reply