এসলামের সংকট

কোন কোন পশ্চিমদেশীয় পণ্ডিত বলিয়া থাকেন জগৎ জুড়িয়া এসলাম ধর্ম প্রচারিত হইয়াছে তলোয়ারের জোরে। হজরত এসা নবীর সপ্তম শতকে এসলাম ধর্ম আরবদেশ হইতে বাহির হইয়া বিদ্যুতের গতিতে এশিয়া, আফ্রিকা ও এয়ুরোপ — তিন মহাদেশেই ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। এই গতিতে তলোয়ারের একটা ভূমিকা ছিল — কথাটা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। কিন্তু তাহার পরও স্বীকার করিতে হইবে পশ্চিমা পণ্ডিতদের দাবিটি পুরাপুরি সত্য নহে। বড়জোর অর্ধসত্য মাত্র। এসলাম শুদ্ধমাত্র তলোয়ারের জোরে প্রচারিত হয় নাই।

এসলামের শিক্ষা সেই জমানার দুনিয়ায় এক প্রকার সমাজবিপ্লবের পথ সুগম করিয়াছিল। সেই কারণেই পারস্যদেশের শ্রমজীবী জনগণ — আরব জাতির বিভিন্ন গোত্র যাহাদের ‘মাওয়ালি’ (অর্থাৎ মোওয়াক্কেল) উপাধি দিয়াছিল — দলে দলে এসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। এই ইরানি শ্রমজীবীদের প্রভাবেই এসলাম সাম্যের ধর্ম বলিয়া নতুন পরিচয় লাভ করে। কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় আমরা যে সাম্যের গান শুনি — সরলতা যাহার ভূষণ — তাহা সেই ইরানি মাওয়ালিদের দান বলিয়াই এখন সকলে জানেন।

এই ইরানিদের কল্যাণেই আমরা বাংলায় এতদিন যাবৎ এসলামের সকল অনুষ্ঠানের নাম আরবির জায়গায় ফার্সিতে পাইয়া আসিয়াছি। আল্লাহর জায়গায় খোদা, সালাতের জায়গায় নামাজ, সাওমের জায়গায় রোজা, হাফিজের জায়গায় হাফেজ, ইসলামের জায়গায় এসলাম — এই ফার্সি প্রভাবেরই ফল।

এই সকল শব্দ সাক্ষ্য দেয় বাংলাদেশে এসলাম কোন পথে দলে দলে প্রবেশ করিয়াছিল। ইরানি মাওয়ালিদের নাহান বাঙ্গালি মাওয়ালিরাও এসলাম কবুল করিয়াছিলেন। আশা বর্ণাশ্রম সমাজ ও ধর্ম হইতে মুক্তিলাভ। এই সমাজবিপ্লবের নৈতিক ভিত্তি এসলামই যোগাইয়াছিল। আল্লাহ বা খোদার উপর বিশ্বাসের গোড়ায় মনুষ্যজাতির একত্বই প্রকৃত প্রস্তাবে প্রকাশ পাইয়াছিল। এসলামের শিক্ষা এই নৈতিক নেতৃত্ব বা হেজিমনির কল্যাণে দুনিয়ার আর দশ দেশের নাহান বাংলা মুলুকেও আসন পাইয়াছিল। নামাজ, রোজা, হজ, যাকাতের মতন এসলামের অন্য চারি অনুষ্ঠান এই বিশ্বজনীনতার প্রকাশ রূপ বৈ নহে। ইহার পরও আরো অনেক অনুষ্ঠান ও বিশ্লেষণ এসলামের সহিত বিকাশ লাভ করিয়াছে। তাহাদের অনেকগুলি নিতান্ত আরব সংস্কৃতির উপাদান। এ কথা চতুর্দশ শতকের আরব মনীষী এবনে খলদুন আর অষ্টাদশ শতকের ভারতরতœ শাহ ওয়ালি আল্লাহ পর্যন্ত জানাইয়া গিয়াছেন। একই কারণে এসলামের কিছু কিছু আচার ও ভাষা ইরান হইতে আসিয়াছে। তুরস্ক, পূর্ব এয়ুরোপ আর মধ্য এশিয়াও স্ব স্ব শিশিরবিন্দু এসলামের দীঘিজলে যোগ করিয়াছে। বাংলায় এসলাম প্রচার করিলে এখন পূণ্যকর্ম বা সওয়াবের কাজ বলিয়া বিবেচিত হয়। পবিত্র কোরানের বাংলা অনুবাদ এখন একাধিক।

গত ২২ ফেব্রুয়ারির কোন কোন মিছিলে দেখা গিয়াছে এসলামি দলগুলোর সভ্যরা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ছিঁড়িয়াছেন। কেহ কেহ শহিদ মিনার গুড়াইয়া দিয়াছেন। কেহ কেহ বলিতেছি এই জন্য যে এই দলগুলির নেতৃত্ব এখনো ঘোষণা করেন নাই বাংলাদেশের পতাকার বিরুদ্ধে তাঁহাদের আপত্তিটি কি। তাঁহারা কি শহিদ মিনার গুড়াইয়া দিবার দাবি উত্থাপন করিয়াছেন? আমরা আশঙ্কা করি ব্যবহারটা যদি তাঁহাদের বিশ্বাসের প্রতিফলন হইয়া থাকে তবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বই সংকটের মুখে পড়িয়াছে।

তাহা হইলে আরো প্রশ্ন করিতে হইবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সহিত এসলামের দ্বন্দ্বটা কোথায়? ইতিহাসের সহিত যাঁহাদের অল্প হইলেও পরিচয় আছে তাঁহারই স্বীকার করিবেন এসলামের সহিত বাংলাদেশের কোন বিবাদ নাই। এসলাম বলিতে কেহ যদি মনে করেন শুধুমাত্র আরবাজতির ধর্ম — বিশ্বের অন্য দেশ বা জাতির ধর্ম নহে — তাঁহারাই এহেন ধারণার বশবর্তী হইতে পারেন। এই ধারণা পকিস্তানি, ভারতীয়, চিনা, বাংলাদেশি কেহই এসলাম অবলম্বন করিতেন না — করিতে পারিতেন না। যাঁহারা একদা বলিয়াছিলেন পাকিস্তান না থাকিলে এসলাম থাকিবে না তাঁহাদের ধারণা মিথ্যা প্রমাণ করিয়া এসলাম আজও বাংলা মুলুকে টিকিয়া আছে। ভবিষ্যতেও থাকিবে, ইনশা আল্লাহ।

তাহা হইলে সংকটটা কোন জায়গায়? এসলাম সম্পর্কে তাঁহাদের ধারণায়। ইদানিং দেখা যাইতেছে কেহ কেহ ‘খোদা হাফেজ’ না বলিয়া ‘ আল্লাহ হাফেজ’ বলিতেছেন। ‘নামাজ’ না বলিয়া ‘সালাত’ আর ‘রোজা’ রাখ না বলিয়া ‘সিয়াম সাধনা’ করি বলিতেছেন। ইহা সেই সংকটেরই এক ধরনের প্রকাশ বিশেষ। কি এমন দরকার ছিল এই তর্জমা? বলিতেছি, পাল্টা তর্জমার বা ব্যাক ট্রান্সলেশনের? আরবি না হইলে আল্লাহ আমার কাতোরক্তি শুনিবেন না? তাহলে আমাদের শত সহস্র মোনাজাত যাহা বাংলায় হইতেছে তাহার পরিণতি কি হইবে?

একদা আমাদের ধর্মশিক্ষার অনুষ্ঠানে, মাদ্রাসায় লেখাপড়ার ভাষা শুদ্ধমাত্র উর্দু অর্থাৎ হিন্দুস্থানি ছিল। আমরা আশা করিয়াছিলাম বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠার তাৎপর্য আমরা বুঝিতে পারিব। কিন্তু মনে হইতেছে তাহা পারি নাই।

আমাদের ওলামা মাশায়েকদের আমি শ্রদ্ধা করি। তাঁহাদের জ্ঞান ও গরিমার প্রতি যথোপযুক্ত ভক্তি জানাইয়া নিবেদন করিতেছি, একটা কথা ভাবিয়া দেখিবেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি একদা পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ ছিল। তাহার আগে ছিল ব্রিটিশের অধীন ভারতবর্ষের একটি প্রদেশ। তাহার আগে দিল্লির মোগল সাম্রাজ্যের একখানি সুবাহ। তাহার আগে স্বাধীন সুলতানদের রাষ্ট্র। এত রাষ্ট্র বদলাইয়াছে গত আটশত বছরে। এসলামের প্রগতি রুদ্ধ হয় নাই। বাংলা ভাষার গতিও থামিয়া থাকে নাই। আজ যাহারা বাংলায় কথা বলেন তাহাদের বেশির ভাগই এসলাম ধর্ম আমল করিয়া থাকেন। এই মুসলমানদের কি আপনারা এসলাম হইতে বাহির করিয়া দিতে চাহিতেছেন?

আমি আমার তরুণ মুসলমান ভাইদের বলিব, ভাবুন। শহিদ মিনারে হামলা করা বাংলা ভাষার ইতিহাসের উপর হামলা করা। আর স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ছিঁড়িয়া ফেলা স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে যুদ্ধ ঘোষণা করা। কাজটা ঠিক হইতেছে না।

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ১৫

Leave a Reply