এসলাম ও বাংলাদেশ

এমন একদিন ছিল যখন লোকে ‘বাঙ্গালি’ বলিতে বুঝিত বাঙ্গালি হিন্দু বা আরো বিশেষ করিয়া উচ্চবর্ণের বাঙ্গালি হিন্দু। এতদিনে আবার ‘বাঙ্গালি’ শব্দের অর্থ বাড়িয়াছে। বাংলাদেশের বাসিন্দা মুসলমান মাত্রই এখন বাঙ্গালি বলিয়া পরিচিত। এই পরিবর্তন হইল কি করিয়া? প্রশ্নটার উত্তর ইতিহাসে খুঁজিতে হইবে। কিন্তু ধারণার জগতে ইহার যৎসামান্য জবাব পাওয়া যাইতে পারে।

এইভাবে একদিন এসলাম বলিতে কেবল আরব দেশের কোন এক ধর্ম বুঝাইত। কিন্তু যেদিন পারস্যদেশ বা আরো একটু দূরের তুরস্ক এসলাম ধর্ম গ্রহণ করিল সেদিন এসলাম বলিতে বোঝাইল আরো বড় এক দুনিয়ার ধর্ম। পারস্য হইতে তুরস্ক এসলামের মধ্যে কিছু নতুন ধ্যানধারণাও যোগ করিয়াছিল। এই নতুন ধ্যানধারণার মধ্যে ছিল ফার্সি ভাষার দাবি। ইরানের নতুন মুসলমানরা আরবদের চোখে ‘মাওয়ালি’ বা খাতক পরিচয়ে পরিচিত হন। কিন্তু মাওয়ালি বা নতুন মুসলমানরা উচ্চশ্রেণির আধিপত্য ও অসাম্য বিরোধী নতুন ধ্যানধারণা প্রবর্তন করেন। আরব জাতির শাসনে থাকিলেও পারস্যের মুসলমানরা ফার্সি ভাষায় এসলাম ধর্মের অধিকার প্রতিষ্ঠা করিলেন। ইহাতে এসলামের যেমন বিস্তার ঘটিল তেমনি গভীরতাও বৃদ্ধি পাইল।

একদিন আরব দেশ হইতে যে এসলাম ছড়াইয়া পড়িয়াছিল তাহার মূলে ছিল রাজনীতির দিকে নেতৃত্ব ও সামরিক নেতৃত্বের শ্রেষ্ঠত্ব। কিন্তু ইরানের উত্তর দিকে বা মধ্য এশিয়া কি ভারতবর্ষ বা দক্ষিণ এশিয়ায় এসলামের প্রসার ঘটে ধর্ম প্রচারক সাধু দরবেশ ও জ্ঞানীদের প্রযতেœ। বাংলাদেশও এই পরিধির ভিতরের দেশ। ইরানের মুসলমানরা আরবদের তুলনায় মোটেও কম মুসলমান না হইয়াও নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির দাবি প্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন। এই দাবি কিছু পরিমাণে উত্তর ভারতের মুসলমানরাও প্রতিষ্ঠিত করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। উর্দু ভাষা তাহার সাক্ষী।

শুদ্ধ বাংলাদেশের মুসলমানরা এই বিচারে অনেক দূর পিছাইয়া পড়িলেন। এই মাত্র বিশ শতকের গোড়ায় কিংবা তাহার খানিক আগে বাঙ্গালি মুসলমান আপনকার বাঙ্গালি পরিচয় গ্রহণ করিলেন। বাংলায় এসলাম প্রচার করিলে এসলামের মর্যাদা ক্ষুণœ হয় না বলিয়া প্রমাণিত হইল। আর ১৯৭১ সালের সংগ্রামে পরিষ্কার হইল বাংলা ভাষায় কথা বলিলে মানুষ কম মুসলমান হয় না। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পারস্যদেশের উদাহরণ অনুসরণ করিতেছে বলিলে বড় একটা ভুল হইবে না।

এসলামের মূল ধর্মবিশ্বাস জাতি-নিরপেক্ষ ঈশ্বর বা আল্লাহর বিশ্বাস। এই বিশ্বাসের পার্থিব তাৎপর্য অনেক। ইহার মর্মকথা এই যে জাতি বা বর্ণের ভিত্তিতে মানুষে মানুষে ভেদ করা চলিবে না। কারণ সকল মানুষই একই পরমের জীব। সকলেই একই সংসারের সভ্য। অন্যান্য বিধান এই মূলবিশ্বাসেরই অনুসিদ্ধান্ত। যেমন সামাজিক ন্যায়বিচারের দাবি। দৈনিক প্রার্থনা, দান, নির্দিষ্ট মাসে পানাহার না করা এবং বছরের নির্দিষ্ট দিনে এসলামের মূল পবিত্র স্থানগুলিতে উপস্থিত হওয়ার বিধান একই নীতির প্রতিফলন বৈ নহে।

এসলাম সারা দুনিয়ায় ছড়াইয়া পড়িয়াছে কমপক্ষে তিন পর্যায়ে। প্রথম পর্যায়ে আরব জাতির সামরিক জয় হইতে এসলামের প্রসার ঘটে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ইরানে ও তুরস্কে ব্যাপক সংখ্যায় জনসাধারণের এসলাম গ্রহণ। আর শেষ পর্যায়ে সামরিক বিজয় প্রধান থাকিল না। সুফি ও সাধক দরবেশদের শিক্ষা ও নেতৃত্ব এসলাম প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করিল।

ইতিহাসের এই প্রধান প্রধান দিক যদি আমরা ভুলিয়া না যাই তবেই দেখিব এসলাম গ্রহণ করিয়া বাংলাদেশের বাঙ্গালি জাতির এক বড় অংশ যেমন কম বাঙ্গালি হইয়া যায় নাই, তেমনি বাঙ্গালা দেশে আসিয়া এসলামকেও অন্য দেশের তুলনায় কম এসলাম হইতে হয় নাই। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তাহার সাক্ষী। বাংলাদেশের সকল মানুষ এই যুদ্ধে যোগ দিয়াছিল। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও তাহাদের সমর্থক বিভিন্ন গোষ্ঠী প্রচার করিয়াছিলেন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হইলে এসলাম থাকিবে না। ইতিহাস তাঁহাদের দাবি মিথ্যা প্রমাণ করিয়াছে।

কিছুদিন হইল বাংলাদেশের রাজনীতিতে কেহ কেহ নতুন করিয়া এসলামের নামে বিবাদ বাধাইবার চেষ্টা করিতেছেন। এই বিবাদ যাহারা বাধাইবার প্রয়াস পাইয়াছেন তাহাদের দাবি বাংলাদেশে এসলাম বিপন্ন। সত্য বলিতে বাংলাদেশে এসলাম বিপন্ন নহে, যাহারা রাজনীতিতে নিজেদের বিপন্ন দেখিতেছেন তাহারাই এসলামকে কেন্দ্র করিয়া নিজেদের পুনর্বাসিত করিবার সুযোগ খুঁজিতেছেন মাত্র।

কিন্তু প্রশ্ন হইল, এই সুযোগ খুঁজিবার সুযোগটা তাহারা কোথা হইতে পাইলেন? ইহার উত্তরে আমাদের অনেক কথা আছে। ইহাদের কিছু কথা ধারণার জগতে পাওয়া যাইবে। আর কিছু কথা ইতিহাসের গতি হইতে ধার করিতে হইবে।

বর্তমান দুনিয়ায় যে ব্যবস্থার রাজত্ব চলিতেছে সে ব্যবস্থা আর যাহাই হৌক ন্যায়ের রাজত্ব মোটেও নহে। এই রাজত্বকে পাশ্চাত্য গণতন্ত্র বা ধনতন্ত্র যাহাই বলুন তাহার বিরুদ্ধে সারা দুনিয়ায় বিক্ষোভ আছে। এই ব্যবস্থা একদা দুনিয়ার বেশির ভাগ দেশকে নিজেদের অধীনে রাখিয়াছিল। যাহাদের অধীনে রাখা হইয়াছিল তাহাদের মধ্যে অনেক দেশের জনসাধারণই বেশি সংখ্যায় এসলাম অবলম্বন করেন। বাংলাদেশও সেই ধরনের একটি দেশ বটে।

সামাজিক ন্যায়বিচারের যে আকাক্সক্ষা বাংলাদেশের জনগণকে ১৯৪৭ সালে এবং ১৯৭১ সালে দুই দুই বার মহা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল সে সংগ্রামের ফলাফল বাংলাদেশ রাষ্ট্র। এ সত্যে সন্দেহ নাই। কিন্তু সে সংগ্রাম এখনো এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ঘরে ঘরে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করিতে পারে নাই। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ফলে সমাজের যে সকল শ্রেণি লাভবান হইয়াছেন তাহারা কিন্তু অন্যদের কাছ হইতে আলাদা হইয়া পড়িতেছেন।

এই পরিস্থিতিতে কেহ কেহ এসলামকে সম্বল করিয়াও যদি সামাজিক ন্যায়ের দাবি তুলিতে পারেন তবে তাহারা আবার জনসমর্থন লাভ করিতে পারেন। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত (তথা শাসক) শ্রেণির এই অবিমৃষ্যকারিতাই সেই পরিবেশ তৈরি করিয়াছে। এসলামের সহিত এদেশের পরিচয়ও নতুন নহে বলিয়া অনেকে বলিতেছেন বর্তমান সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামে এসলাম হইতে সহায়তা পাওয়া যাইবে।

১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলার বিপুল সংখ্যক মানুষ যে কারণে পাকিস্তান আন্দোলনে যোগ দিয়াছিল ঠিক সেই কারণেই তাহারা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন করিয়াছিল। অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের সাক্ষ্য হইতে আমরা ইহার সার গ্রহণ করিতে পারি।

প্রশ্ন হইতেছে, অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মানুষ কোন পথে আগাইবে? স্বাধীনতার ৪২ বছর পর বাংলাদেশ কি আরেকবার পরিবর্তনের মুখামুখি দাঁড়াইয়াছে? সামাজিক ন্যায়বিচারের উপযোগী সংস্কার করা না হইলে সেই পরিবর্তন বৈপ্লবিক পদ্ধতিতেও হইতে পারে। এ কথা মনে রাখিতেই হইবে।

বিপ্লবের যুগে ইতিহাস শুদ্ধ বিপ্লবই তৈরি করে না — মাঝে মাঝে বিপ্লবের বিরোধী বা শত্রুপক্ষও বিপ্লবের নাম লইয়া আগাইয়া আসে। বাংলাদেশে যাহারা এসলামের নামে প্রতিবাদ করিতেছেন সামাজিক ন্যায়বিচারের কোন প্রতিশ্র“তি তাহাদের কর্মসূচিতে নাই। তাহারা নিছক এসলামের বুলি আওড়াইয়া জনসাধারণকে উত্তেজিত করিতেছেন মাত্র। কিন্তু শাসকশ্রেণির বন্ধ্যাত্ব ও শোষণের বিরুদ্ধে বর্তমানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের কোন বিকল্প কর্মসূচি না থাকায় বাংলাদেশে রাজনৈতিক শূন্যতা দেখা দিয়াছে। এই শূন্যতা ভয়াবহ প্রতিবিপ্লবেও পরিণত হইতে পারে। আশঙ্কার কথাটা এখানেই। এখনো তাহা শঙ্কায় পরিণত হয় নাই।

 ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

 

২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ১৪

Leave a Reply