যুদ্ধাপরাধ ও ধর্ম ব্যবসায়

 ১৯৭১ সালের মার্চ হইতে ডিসেম্বর পর্যন্ত নয় মাস ধরিয়া বর্তমান বাংলাদেশের চারি সীমানার মধ্যে ধারাবাহিক গণহত্যা ও অন্যান্য যুদ্ধাপরাধের ঘটনা ঘটিতেছিল। এই সত্যে কাঁহারও সন্দেহ নাই। কিন্তু কেন, কি কারণে ঘটিয়াছিল এই গণহত্যা? সেদিনের আগ্রাসী পাক সেনাপতিদের অনেকেই — যেমন লে: জেনারেল গুল হাসান, মে: জেনারেল খাদিম রাজা ইত্যাদি — এতদিনে স্মৃতিকথা লিখিয়াছেন। ইঁহাদের অনেকেই বলিয়াছেন পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার প্রয়োজনেই পাক বাহিনীকে অভিযান শুরু করিতে হইয়াছিল। তাঁহারা আরো গলা চড়াইয়া দাবি করিয়াছেন, ২৫ মার্চের আগে বাঙ্গালিরা অবাঙ্গালি (বিশেষ বলিতে বিহারি) জাতির লোকজনকে হত্যা করিতেছিল। তাই তাঁহারা বাংলাদেশের আনাচেকানাচে সর্বত্র হানা দিতেছিলেন। কিন্তু নয় নয় মাস ধরিয়া কেন চালাইতে হইল এই হানাদারি? কারণ ভারত হইতে পাঠানো গেরিলারা অনবরত পাল্টা হামলা চালাইতেছিলেন।

পাকিস্তানি হামলা ও দখলদারির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে যাঁহারা সরাসরি লিপ্ত হইয়াছিলেন তাঁহারাই বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশের প্রায় সমস্ত জনগোষ্ঠী ও শ্রেণির মানুষ এই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়াইয়াছিলেন। যাঁহারা সরাসরি অস্ত্র হাতে লইতে পারেন নাই তাঁহারাও নানান উপায়ে বিচিত্র পথে এই লড়াইয়ে শামিল হইয়াছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এইভাবে হইয়া দাঁড়ায় জাতীয় মুক্তির জনযুদ্ধ।

দুঃখের মধ্যে বাংলাদেশের কিছু কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা কোন কোন দলের সদস্যরা পাক সেনাবাহিনীর গণহত্যায় নানাভাবে সহযোগিতা করিয়াছিলেন। নিজেরা উদ্যোগী হইয়াও হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত হইয়াছিলেন। আর গঠন করিয়াছিলেন হরেক নামের সামরিক আধা-সামরিক বাহিনী। আলবদর আলশামস ইত্যাদি। ইঁহারাই ধর্মব্যবসায়ী। ইঁহাদের মধ্যে কেহ কেহ — যেমন অধ্যাপক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসাইন — পরে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরিয়া যুদ্ধের দিনের স্মৃতিকথাও লিখিয়াছেন। অনুশোচনাহীন নিষ্প্রাণ এইসব স্মৃতিকথায় দেখা যায় পিছনমুখী এই অপরাধী ও সহযোগীদের প্রধান যুক্তি ছিল তাঁহারা পাকিস্তান রক্ষার খাতিরে লড়াই করিতেছিলেন। কেহ কেহ বলিয়াছেন তাঁহারা লড়াই করিতেছিলেন সাক্ষাৎ এসলামধর্মকে বাঁচাইবার জন্য। ধর্মব্যবসায়ীদের যুক্তি এমনধারা।

আসল সত্য তাহা হইলে কি? ইঁহাদের এই ধর্মব্যবসায়ীদের, কথা যদি সত্য হইত তো বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে এসলাম ধর্মও শেষ হইয়া যাইত। এসলাম এত হালকা ধর্ম নহে। তাহা ছাড়াও মনে রাখিতে হইবে পাকিস্তান আর এসলাম এক কথা নহে। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিতেও এসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ কাঁহারও চাহিতে কম বসবাস করেন না। ১৯৭১ সালের নয় মাসে যাঁহারা গণহত্যায় জড়িত ছিলেন আজিকালি যখন তাঁহাদের কাঁহারও কাঁহারও বিচার শুরু হইয়াছে তখন আবার নতুন করিয়া বলা হইতেছে এসলাম বিপন্ন। সত্য বলিতে এসলাম নহে ধর্মব্যবসায়ীদের ব্যবসায় মাত্র অসামান্য বিপদে পড়িয়াছে।

নতুন করিয়া বলা হইতেছে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত কেহ কেহ নাকি এসলামধর্ম প্রবর্তক মহানবী হজরত মোহাম্মদের পবিত্র নামে কুৎসা রটাইতেছেন। যদি এই কথা বিন্দুমাত্রও সত্য হইয়া থাকে তবে তাহার বিচার হওয়া দরকার। ধর্ম যাহারটা তাঁহার তাঁহার। ধরা যাইতে পারে যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নাস্তিক তাঁহারও একটা ধর্ম আছে। কিন্তু আরেকজনের ধর্মবিশ্বাসে আঘাত করিবার অধিকার কি তাঁহাকে দেওয়া যাইতে পারে? উত্তরে পরম স্বাধীনতা ব্যবসায়ীকেও বলিতে হইবে: না, না।

অপরের ধর্মবিশ্বাসবিরোধী এই ধরনের কুৎসা বা অপপ্রচারের রাজনৈতিক মতলবটা তো মোটেও অস্পষ্ট নহে। শুদ্ধ এই মুহূর্তের কথা বলিতেছি না। মাত্র বলিতেছি যে ভুলিলে চলিবে না এই ধরনের অপপ্রচার অশ্র“তপূর্ব নতুন বিষয় নহে। ইহার একটা সুদীর্ঘ ইতিহাস কিন্তু আছে।

তবু বলিব এই মুহূর্তের অপপ্রচারে একটা ভয়ানক শঙ্কার কারণ আছে। অপপ্রচারের হোতারা একটা অঘটন ঘটাইবার মতলবে আছেন। যে বা যাঁহারা এই ধরনের কুৎসা রটনার সহিত জড়িত তাঁহারা যেমন দুনিয়ার মুসলমান জনসাধারণের তেমনি বাংলাদেশের জনগণেরও বন্ধু হইতে পারেন না। বর্তমানে সারা জাহান জুড়িয়া মহানবীর নামে অসম্মানজনক কথা প্রচার করিতেছে কাঁহারা? কাঁহারা জারি রাখিয়াছে এসাবি ১১০০ হইতে ১৩৫০ সনের মধ্যে ঘটিত অনেকানেক ক্রুসেড (বা এয়ুরো-আরব) যুদ্ধের স্মৃতি ?। ইঁহাদের মধ্যে এয়ুরোপ ও আমেরিকার কিছু সংখ্যালঘু গোষ্ঠী আছেন। আছেন সালমান রুশদির মতন কিছু সংখ্যালঘু অনেয়ুরোপিয়া লেখকও।

একটা কথা মনে রাখিতে হইবে। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনে যাঁহারা শহিদ হইয়াছিলেন তাঁহারা কি মুসলমান ছিলেন না? ১৯৫২ সনের শহিদরা সবাই ছিলেন মুসলমান ঘরের সন্তান। অথচ সে যুগে তাঁহাদেরও এসলামের (আসলে পাকিস্তানের) দুশমন বলিতে কসুর করে নাই পাকিস্তানওয়ালারা।

মুক্তিযুদ্ধের শহিদদেরও এইভাবে অপমান করা হইয়াছে শতবার। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে নিহত, নির্যাতিত, ধর্ষিতদের বেশির ভাগ বলিই তো ছিলেন মুসলমান। পাকিস্তান সেনাপতিরা গণহত্যার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়া বলিয়াছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা ভারতের চর, অমুসলমান কিংবা আরো অধিক কিছু — বলিয়াছিলেন তাঁহারা এসলামের দুশমন। পাকিস্তানিদের এই অপপ্রচার মিছা প্রমাণিত হইয়াছে। বাংলাদেশ শত্র“মুক্ত হইয়াছিল। এসলামও বিপন্ন হয় নাই। যুদ্ধাপরাধবিরোধী আন্দোলন ঠেকাইবার মতলবে কোন কোন গোষ্ঠী এখন অপ্রাসঙ্গিক হইলেও জোরের সহিত প্রচার করিতেছেন শাহবাগের আন্দোলন সংগঠন যাঁহারা করিয়াছেন তাঁহারা নাকি এসলামবিরোধী।

আমরা মনে করি বাংলাদেশের জনগণ এখন অনেক বেশি সজ্ঞান। তাঁহারা এই সস্তা প্রচারের ফাঁদে পা দিবেন না। সত্যের খাতিরে মানিতে হইবে যুদ্ধাপরাধবিরোধী আন্দোলনে নানান স্রোতধারার মানুষ জড় হইয়াছেন। সেখানে নানান ধর্মের নানান বর্ণের মানুষ। আন্দোলন সংগঠকরা পরিষ্কার ভাষায় বলিয়াছেন তাঁহাদের আন্দোলন এসলামের বিরুদ্ধে নহে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে এসলামবিরোধী অপবাদ দিয়া বাংলাদেশকে ঠেকান সম্ভব হয় নাই। যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকাইয়া দেওয়া কি সম্ভব হইবে?

কে জানে ঠাকুরদাদার থলিতে কোন ভবিতব্য লুকাইয়া আছেন!

২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ১৩

Leave a Reply