মানবাধিকার ও মৃত্যুদণ্ড বিষয়ক অধিকন্তু

সম্প্রতি — মানে বেশিদিন হয় নাই — দুনিয়ার কোন কোন দেশে অপরাধের প্রতিকারস্বরূপ অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের আইনটি রহিত করা হইয়াছে। আমরা বিশেষ করিয়া এয়ুরোপিয়া যুক্তরাষ্ট্রের উদাহারণটা স্মরণ করিতেছি। এই উদাহারণ ভর করিয়া অনেকে বলিতেছেন মৃত্যুদণ্ডের মতন কঠিন সাজা মানবাধিকারের লঙ্ঘন। কথাটা ফেলিয়া দিবার জিনিশ নহে। তবে তাহাকে ইতিহাসের মধ্যে যাচাই করিয়া দেখিবার দরকার আছে। যেখানে তরল সাজায় কাজ হয়, সেখানে কঠিনে কাজ কি? একসময় এয়ুরোপ মহাদেশে — বিশেষ করিয়া ইঙ্গদেশে সামান্য চুরির শাস্তিও ছিল মৃত্যুদণ্ড। মাত্র পাঁচ পাউন্ড চুরি প্রমাণিত হইলেও ইংলন্ডে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হইত। এই আইন কখন হইতে চালু হইয়াছিল জানা যায় না। তবে উনিশ শতকের গোড়ায় পর্যন্ত এই আইন রহিত করা হয় নাই। শুদ্ধ তাহাই নহে, ইংরেজি ১৮২৫ সালের আগে পর্যন্ত শিল্প বিপ্লবের দেশ খোদ ইংলন্ডে শ্রমিকশ্রেণির ট্রেড এয়ুনিয়ন বা শ্রমিক সমিতি গড়ার অধিকার ছিল না। কেহ এই রকম সমিতি গঠার চেষ্টা করিলেই শাস্তি দেওয়া হইত। সে শাস্তি ছিল — বলা প্রয়োজন — মৃত্যুদণ্ড।

স্যার টমাস মোরের ‘এয়ুটোপিয়া’ নামক অতিবিখ্যাত বহি পঠিলে জানা যায় ষোল শতকের ইংলন্ড দেশে ছিচকা চোর ধরিয়া ধরিয়া ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলান হইত গণ্ডায় গণ্ডায়। সেই বইয়েরই একটি আইনজ্ঞ চরিত্র জানাইতেছেন ইংলন্ডের সর্বত্র চুরির অবধারিত শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। কোন কোন দিন একই ফাঁসিকাষ্ঠ বা যূপকাষ্ঠ হইতে কুড়িজনকে ফাঁসিতে ঝোলান হইয়াছে। কি পরিমাণ লোককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হইত তাহা এতদিনে অনুমান করাও কঠিন।
রাজা অষ্টম হেনরি সিংহাসনে আরোহণ করিলেন ১৫০৯ সালে। শুদ্ধ তাঁহার রাজত্বকালেই — একজন ইতিহাসবিদ দেখাইয়াছেন — ঐ দেশে মোট ৭২,০০০ চোরকে ফাঁসিতে লটকাইয়া মারা হইয়াছিল। (মোর ২০০৩: ১৫)
তাহাতে কি চুরির প্রকোপ কমিয়াছিল? টমাস মোর রচিত আইনজ্ঞ পাত্রটি বলিতেছেন, কমে নাই। টমাস মোরের বইটি লেখা হইয়াছিল ১৫১৬ সালে। সেই বইয়ের পাত্রটি বিস্মিত। কারণ তিনি জানেন খুব কম চোরই তখন আইনের হাত এড়াইতে পারিত। তবু দেশে এত চোর পয়দা হইত? ভাবিয়া অবাক তিনি।

এতদিনে ইংলন্ড কেন, সারা এয়ুরোপে আর মৃত্যুদণ্ড নাই। অনুমান করা অন্যায় নহে, এই সব দেশে ছিচকা চুরিও কমিয়া আসিয়াছে। কেন ও কিভাবে? ইহাই ভাবিবার বিষয়।
টমাস মোর পরামর্শ দিয়াছিলেন মৃত্যুদণ্ড রহিত করিতে। তাহার যুক্তি ছিল মানুষকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়া জীবিকা আয় করার সুযোগ দিলে বরং চুরির প্রকোপ ঢের কমিয়া যাইবে। তিনি বলিতেছিলেন, মানুষ চুরি করে জীবনধারণের মতন প্রয়োজনের তাগিদে। আর সেই চুরি করিতে গিয়া তাহাকে প্রাণের ঝুঁকি লইতে হয়। প্রয়োজনে দিতে হয় প্রাণ। অথচ প্রয়োজন পূরণের বা প্রাণ বাঁচাইবার অন্য উপায় থাকিলে সে চুরির পথে পা বাড়াইত না।
টমাস মোরের উপদেশ ইংলন্ড কিন্তু শোনে নাই। এয়ুরোপও না। এই এতদিনে এয়ুরোপের চৈতন্য হইয়াছে। তাহারা বলিতেছেন মৃত্যুদণ্ড মানবাধিকারের লঙ্ঘন। অপরাধ তা যতই নিষ্ঠুর ও অমানবিক হোক না কেন মৃত্যুদণ্ড না দেওয়াই বিধেয়। মনে রাখিতে হইবে এই জায়গায় আসিতে এয়ুরোপ মহাদেশকে কমপক্ষে পাঁচশত বৎসর পার হইতে হইয়াছে।
একটা সওয়াল পেশ করিলেই বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার হয়। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ বা জাতিসংঘ কেন মাত্র ১৯৪৮ সালে ‘সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা’ নামক দলিলটি গ্রহণ করিলেন? এক কথায় ইহার জবাব নাই। দুই কথায় বলা যায়, এয়ুরোপের দুই মহাযুদ্ধ না ঘটিলে হয়তো এই দলিলের জন্ম আরো বিলম্বে হইত। এই দলিলটিতেও কিন্তু মৃত্যুদণ্ড মানবাধিকারের লঙ্ঘন কথাটি বলা হয় নাই। জার্মানির বা জাপানের যুদ্ধাপরাধী রাজনীতিবিদ ও সমরনেতাদের মৃত্যুদণ্ড কোন সময় দেওয়া হইয়াছে? এ দলিল যখন গ্রহণ করা হইতেছিল তখনই নয় কি?
এয়ুরোপের ইতিহাস যদি কোন শিক্ষা দিয়া থাকে তাহা এই যে মৃত্যুদণ্ড দিয়া চৌর্যবৃত্তি বন্ধ করা যায় না। অধিকন্তু বলা চলে যে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বিকল্প নাই। যে দেশে ন্যায়বিচার আছে সে দেশে মানুষ না খাইয়া মরিবে কেন? সে দেশে মানুষ চুরিই বা করিবে কেন? অতয়েব অভাবের রাজত্ব আর ন্যায়ের রাজত্ব একসাথে চলিতে পারে না। যে দেশে ন্যায় আছে সে দেশে চুরির প্রসারও সংকুচিত হইবে — এমনকি উঠিয়াও যাইতে পারে।
মৃত্যুদণ্ডের বিধানকে আরেক দিক দিয়াও দেখা যাইতে পারে। সেই দিকের নাম জন্মনিয়ন্ত্রণ। বর্তমান যুগের এয়ুরোপে একটি জনসংখ্যা সমস্যা দেখা দিয়াছে। এই মহাদেশের প্রায় প্রত্যেক দেশেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমিয়া গিয়াছে। অথচ বাংলাদেশের মতন দেশে জনসংখ্যা এখনো বৃদ্ধি পাইতেছে। মনে রাখিবেন, জনসংখ্যা সমস্যা দুই দুইটি। একটি নহে।
এয়ুরোপের ইতিহাস শিক্ষা দিতেছেন যে আর্থিক ও বৈষয়িক উন্নতি ঘটিলে মানুষ আপনার ইচ্ছাতেই পরিবার আকারে ছোট করিয়া তোলেন। আর আমাদের দেশে তাঁহারা প্রচার করিতেছেন জনসংখ্যা কমিলেই মাত্র শনৈ শনৈ আর্থিক ও বৈষয়িক উন্নতি ঘটিবে। তাঁহাদের দেশে উন্নতির ফলে জনসংখ্যা কমিতেছে আর আমাদের দেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ফলে উন্নতি ঘটিতেছেন। সকল প্রশংসা জন্ম-শাসনের।
অপরাধ আর শাস্তি বিষয়েও বোধ করি একই তুলনা চলিবে। এয়ুরোপে সামাজিক অগ্রগতি মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করিতে সাহায্য করিয়াছে। আর তাঁহারা বলিতেছেন, বাংলাদেশের মতন অভাগা দেশে মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করিলে হয়তো সামাজিক অগ্রগতি ঘটিবেন।
প্রস্তাবটা ভাবিয়া দেখিবার মতন। দুর্ভাগ্যের মধ্যে, আমরা দুই পৃথিবীতে বাস করি না। দুনিয়া আমাদের একটাই। এই একটি দুনিয়ায় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই মৃত্যুদণ্ড রহিত করিবার একমাত্র পথ। মৃত্যুদণ্ড রহিত করিলেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হইবে এমন কোন প্রমাণ আজ পর্যন্ত কোথাও পাওয়া যায় নাই।

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

দোহাই

Thomas More, Utopia, trans. R M Adams, eds. G M Logan and R M Adams, revised ed

 

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ১১

Leave a Reply