মানবাধিকার ও মৃত্যুদণ্ড

খবরে প্রকাশ বহুজাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল’ সম্প্রতি বলিয়াছেন বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল আইনের সংশোধন করিয়া বিচারাধীন ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ডের দিকে ঠেলিয়া দিতে পারে। তাঁহারা বলিয়াছেন মৃত্যুদণ্ড অমানবিক ও নিষ্ঠুর সাজার রূপবিশেষ। তাঁহাদের মতে মৃত্যুদণ্ডের মতন সাজা মানবাধিকারের লঙ্ঘন। আর সেই কারণেই সরকারের উচিত মৃত্যুদণ্ডের সাজাটা উঠাইয়া দেওয়া।

এই সংস্থার বাংলাদেশ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আব্বাস ফাইয়াজের বক্তব্য উদ্ধার করিয়া বাংলাদেশের অগ্রণী দৈনিক ‘প্রথম আলো’ পত্রিকা লিখিয়াছেন, চল্লিশ বছরের বেশি সময় পর বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সংঘটিত ভয়ংকর সব অপরাধের বিচারের ঐতিহাসিক সুযোগের সৃষ্টি হইয়াছে। তিনি একদিকে কবুল করিয়া বলিয়াছেন এই সকল অপরাধের ন্যায়বিচার হইতে হইবে। সঙ্গে সঙ্গে এই দাবিও করিয়াছেন যে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মানবাধিকারের প্রতি অবশ্যই সম্মান জানাইতে হইবে। আব্বাস ফাইয়াজ মৃত্যুদণ্ডের মতন সাজাকে মানবাধিকারের লঙ্ঘন মনে করেন।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে মৃত্যুদণ্ডই যে সবচেয়ে বড় সে কথা না বলিলেও চলে। মৃত্যুদণ্ডের বিধান এখনো এইদেশের ফৌজদারি আইনে বলবৎ রহিয়াছে। তবে মৃত্যুদণ্ড যে দিতেই হইবে এমন কোন কথা নাই। ব্যতিক্রমের মধ্যে একটি বিধান আছে যাহাতে বলা হয় কোন যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া ব্যক্তি যদি আরেকবার খুনের অপরাধ করেন তবে তাঁহাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিকল্প নাই।

অ্যামনেস্টির বিশেষজ্ঞ মহাশয়েরা বলিতেছেন, তাঁহারা ন্যায়বিচার চাহেন তবে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন করেন না। সমস্যাটা ঠিক এই জায়গায়। আমরা জিজ্ঞাসা করিব যে ব্যক্তি বা সংস্থা বার বার খুন করিয়াছে তাহাকে কোন দণ্ড দিবেন? কোন দণ্ড দিলেই বা ন্যায়বিচার হইবে? বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যে সকল ভয়ংকর অপরাধ সংঘটিত হইয়াছে সে সকল অপরাধ পৌনঃপুনিক অপরাধ বৈ নহে। অতয়েব এইখানে প্রচলিত আইনে ন্যায়বিচার করিতে হইলেও অন্য দণ্ড দিবার পথ নাই।

মানবাধিকারের কথা যদি বলিতেই হয় তবে বলিতে হইবে মহাদেশ এয়ুরোপের ইতিহাস তো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইতিহাস বৈ নহে। মানবাধিকার লঙ্ঘন করিতে করিতে এয়ুরোপ আজিকালি নিজ বাসভূমে মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করিতে পারিয়াছে। কিন্তু কোন মূল্যে! একবার ভাবিয়া দেখিলে ভালো হয়। আফ্রিকায় আর এশিয়ায় এয়ুরোপ যেভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করিয়া মজা পাইতেছিল সে মজা একদিন নাৎসি জার্মানির নেতা হিটলার যখন খোদ এয়ুরোপখণ্ডেও মারিতে লাগিলেন তখনই না এয়ুরোপ প্রমাদ গুনিল। বুঝিল মানবাধিকার বলিয়া একটা জিনিশ তাহা হইলে আছে! অথচ এই অপরাধের কোনটা এয়ুরোপ তাহার অধীন দুনিয়ার দেশে দেশে করে নাই? করে নাই ভিয়েতনামে? আলজেরিয়ায়? আজ করিতেছে না এরাকে? আফগান মুলুকে?

আর কে না জানে সেই অমানবিক ও নিষ্ঠুর মৃত্যুদণ্ড এয়ুরোপের নতুন সংস্কার মার্কিনদেশে শতে পঞ্চাশ ভাগাধিক রাজ্যে এখনো তবিয়তে বহাল আছে। সারা দুনিয়ার পরাধীন দেশের পর আরেকটি পরাধীন দেশে মৃত্যুর পর মৃত্যু রপ্তানি করিয়া স্বাধীন এয়ুরোপ বিশ্ববাসীর প্রশংসা কুড়াইতেছে। আজিকার আফগানিস্তানে কিংবা এরাকে মৃত্যুর পর মৃত্যুর ফিরিস্তি কি খুব বেশি হ্রস্ব হইয়াছে?

সকল স্বাধীন দেশই হয়তো সমান স্বাধীন হয় না। বাংলাদেশও কি একদিন স্বাধীন এয়ুরোপের সমান স্বাধীন হইবে না? আমরা না হয় সেইদিনের অপেক্ষায় থাকিব! ইতিহাসের রসিকতাটা মাঝে মাঝে বড়ই বিরস হইয়া যায়।

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

 

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ১০

Leave a Reply