পাক বাহিনীর গণহত্যা: আহমদ ছফার শেষ সাক্ষ্য


আহমদ ছফা বংশাল রোডে গেলেন। লক্ষ্য ‘দৈনিক সংবাদ’ পত্রিকার দপ্তরটি কেমন আছে দেখিবেন। দেখিলেন, ‘কামানের ঘায়ে সমস্ত অট্টালিকাই উড়িয়ে দিয়েছে। কিছুই অবশিষ্ট নেই।’ দেখিলেন একজন মানুষের মরদেহ বিকৃত অবস্থায় তালগোল পাকাইয়া আছে। কেহ একজন জানাইলেন এই লাশ এককালের প্রতিশ্র“তিশীল কথা সাহিত্যিক শহীদ সাবেরের। তিনি শেষের দিকে বিকৃতমস্তিষ্ক হইয়া গিয়াছিলেন। ‘দৈনিক সংবাদ’ দপ্তরেই তাহার থাকার ব্যবস্থা হইয়াছিল। তাহাকেও প্রাণ দিতে হইয়াছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে।
পরদিন– এতদিনে ৩১ তারিখ হইবে নিশ্চয়– আহমদ ছফা উয়ারি গেলেন। সেখানে খবর পাইলেন কলাভবন, ফার্মগেট আর তেঁজগাও এলাকা হইতে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কমসে কম আটশত ছাত্র ধরিয়া ক্যান্টনমেন্টে লইয়া গিয়াছে পাকিস্তান বাহিনী।
শুদ্ধ তাহাই নহে। দলে দলে তরুণ মানুষ না খাইয়া না ঘুমাইয়া পায়ে হাঁটিয়া ঢাকার বাহিরে চলিয়া গিয়াছে। পথে যে সকল দলের সঙ্গে মিলিটারি মোলাকাত হইয়াছে তাহাদের মেশিনগানের গুলিতে হালাক করা হইয়াছে।
আহমদ ছফা নিত্যদিনের দৃশ্য বর্ণনা করিয়াছেন এইভাবে: ‘ঢাকা শহর জনশূন্য হতে চলল। সন্ধ্যের পরপরই কোন না কোন বাড়িতে আগুন জ্বলে ওঠে। কোথাও গুলির শব্দ শোনা যায়। গাড়ি, ঘোড়া, সাইকেল, রিক্সা কিছুই চলে না। শুধু মিলিটারি জিপগুলো বাতাসে পেট্রোলের গন্ধ ছড়িয়ে এ রাস্তা ও রাস্তায় ছুটোছুটি করে। আর গর গর বিকট আওয়াজ তুলে মাঝে মাঝে ট্যাংক যায়। বাজারে খাবার মেলে না। তরিতরকারির বাজার সব আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। রেশনের দোকান থেকে চাল আটা গম সব লুট করে নিয়ে গেছে।’
যুদ্ধাপরাধের অপর পর্বের বিবরণও দিয়াছেন মহাত্মা আহমদ ছফা। তিনি দেখিয়াছেন, বাঙ্গালি ব্যবসায়ীদের দোকানপাট একের পর এক লুট করিয়া যাইতেছে অবাঙ্গালির দল। ছফার কথায় মিরপুর, মোহাম্মদপুর অঞ্চলের অবাঙ্গালিরা এসে বাঙ্গালিদের পরিত্যক্ত ঘরবাড়িতে তালা লাগিয়ে দিয়ে দখল প্রতিষ্ঠা করেছে।’
হিন্দু-সম্প্রদায় চিহ্নিত করিয়া আলাদা নির্যাতন করার কাজটি অবিলম্বে শুরু হইল। যুদ্ধাপরাধের অন্যতর দিক এই গণহত্যাও। ছফা লিখিলেন, ‘দিনের বেলা চরদের সহযোগে হিন্দু অধিবাসীদের বাড়িতে গিয়ে চিহ্ন দিয়ে আসে। রাতের বেলা গিয়ে চারদিক দিয়ে ঘিরে ধরে। গুলি করে হত্যা করে। শহর থেকে পালিয়ে যাবার কোন পথ নেই। চারিদিকে কড়া পাহারা বসিয়েছে।’
আহমদ ছফা আরো জানাইতেছেন, ‘প্রত্যক্ষদর্শীর কাছে শুনেছি, একজন মাঝি দুজন হিন্দু ভদ্রলোককে বুড়িগঙ্গা পার করে দেয়। সৈন্যরা একথা জানতে পারে। তারা পার করে দেওয়া মাঝিটির খোঁজ করতে থাকে। মাঝি ওপার থেকে দুজন তরকারি বিক্রেতাকে এপারে নিয়ে এসে আবার চলে যায়। সেকথা জানতে পেরে মাঝিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে [সৈন্যরা]। কিন্তু মাঝি ওপারে গুলির রেঞ্জের বাইরে গিয়ে আত্মরক্ষা করে। তারা তখন সেই তরকারি বিক্রেতা দুজনকে ধরে ফেলে। হুকুম করে বুড়িগঙ্গায় ডুব দিতে। যেই ডুব দিয়েছে জলের ভেতরেই মেশিনগানের গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ মানুষ দুজন মরা মাছের মত ভেসে ওঠে।’

এই তো ঘটনা। কিন্তু পরের মুখে শোনা আর পরের ঘটনাটি মহাত্মা আহমদ ছফা নিজের চোখেই দেখিয়াছেন। ‘সেদিন মার্চ মাসের একত্রিশ তারিখ হবে। দুপুর থেকেই তারা মঠটা ঘিরে রাখে।’ মঠ মানে নারিন্দার গৌড়ীয় মঠ। ‘তাদের দালালেরা বলতে থাকে মঠের মধ্যে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ এবং একটি শক্তিশালী ট্রান্সমিটার পাওয়া গেছে।’ আর সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মন্দিরের চূড়া লক্ষ্য করিয়া কামানের গোলা ছুঁড়িতে থাকে পাকবাহিনী।
‘আশ্চর্য শক্তি পাথুরে মন্দিরের।’ লিখিতেছেন আহমদ ছফা, ‘গোলার আঘাতে একটুও ভেঙ্গে পড়েনি। তারপর তারা আগুন লাগাতে চেষ্টা করল। আগুন জ্বলল না। তারপর রাইফেলের আওয়াজ শোনা যেতে লাগল। পরদিন দেখা গেল চার পাঁচটি গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ পরে রয়েছে।’
এখন হইতে অত্যাচার সাম্প্রদায়িক খাতে বহাইয়া দেওয়া হইল। সংখ্যালঘুদের ধনসম্পদ লুট করিতে অবাঙ্গালিদের লেলাইয়া দেওয়া হইল। আহমদ ছফার সাক্ষ্য শুনুন: ‘তাদের সঙ্গে যোগ দিল জামাতে ইসলামি এবং মুসলিম লীগের গুণ্ডাবাহিনী। এই লুণ্ঠনকর্ম শক্তিশালী করার জন্য ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দাগী আসামীদের ছেড়ে দেওয়া হল।’ এখানে নজর না করিয়া পারা যাইতেছে না। আহমদ ছফা জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগকে দাগী আসামীদের সহিত একই কাতারে দেখিতে পাইলেন।
অন্যদিকে অত্যাচারের ‘সাধারণ চেহারাটিও’ বহাল রহিল। সেও কম ভয়ংকর নহে। আহমদ ছফা লিখিয়াছেন, ‘ঘোষণা করেছে সরকারি কর্মচারীদের মাইনে দেওয়া হবে। মাইনেও দিয়েছে। অফিসের ফটকের কাছে আবার সে মাইনে কেড়ে রেখেছে। ঢাকা শহরের প্রতিটি অফিসেই এরকম ঘটেছে। পথেঘাটে হঁাঁটবার উপায় নেই। তল্লাশি করার নামে মানুষের হাত থেকে ঘড়ি আংটি টাকা পয়সা সব ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। শুনলে গল্প মনে হবে, কিন্তু ঢাকাতে এসব সত্যি সত্যি ঘটেছে।’
আহমদ ছফার ভাষায়, ‘ঢাকা শহর তরুণ ছাত্র যুবকদের আশ্রয় দিতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। দেখলেই গুলি করে, ধরে নিয়ে যায়।’
পাকিস্তানি সৈন্যরা ঢাকা শহরের জ্বালানো, পোড়ানো, হত্যা, ধর্ষণ একরকম শেষ করিল। তারপর যাত্রা করিল গ্রামের দিকে। প্রতিদিন খবর পাওয়া যাইতেছে নানান জায়গা হইতে জালের মত বেড় দিয়া পাকবাহিনী মানুষ খুন করিয়া যাইতেছে। তরুণীদের ধরিয়া ব্যারাকে লইয়া যাইতেছে।
আহমদ ছফা সিদ্ধান্ত লইলেন আর ঢাকায় থাকা চলিবে না। তিনি শ্যামপুরের ঢাকা ম্যাচ ফ্যাক্টরির পাশ দিয়া বুড়িগঙ্গা পার হইলেন। পার হইবার সময় নৌকার বাচ্চা বয়সি মাঝিটি পানিতে ভাসমান লাশের বহর দেখাইলেন। বলিলেন, ‘ওই যে, দেখুন, কত লাশ গাঙ্গে।’ আহমদ ছফা দেখিলেন দশ বারোটা পেটফোলা লাশ কচুরিপানার দামের পাশে ভাসছে।
মহাত্মার মন্তব্য: ‘এরাই তো স্বাধীনতার নিশান উড়িয়েছিল, এরাই তো রণধ্বনি তুলেছিল।’ আমার মনে পড়িল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের মৃত ছাত্রদের লাশ দেখিয়াও তিনি একই কথা লিখিয়াছিলেন: ‘এই নিহত তরুণ ছাত্ররা একদিন আগে দৃপ্ত কণ্ঠে শ্লোগান দিয়েছিলেন। ক্ষিপ্র পায়ে মিছিল করেছিলেন, বলিষ্ঠ আশা নিয়ে স্পন্দিত হাতে উড়িয়ে দিয়েছিলেন লোহিতে সবুজে মেশানো বাংলার নকশা আঁকা স্বাধীনতার নিশান।’
(শেষ)
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩

দোহাই
আহমদ ছফা, আহমদ ছফা রচনাবলী, নূরুল আনোয়ার সম্পাদিত, উত্তর খণ্ড (ঢাকা: খান ব্রাদার্স, ২০১১), পৃ. ৪৮-৬১।

 

১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, সর্বজন, বুলেটিন ৮

Leave a Reply